Showing posts with label মুঘলযুগে গ্রন্থাগার. Show all posts
Showing posts with label মুঘলযুগে গ্রন্থাগার. Show all posts

Friday, August 24, 2018

হস্তলেখাবিদ

হস্তলেখাবিদ হলেন সেই সব করণিক যাঁরা কলমের মোচড়ে লেখায় শিল্প ফুটিয়ে টোলার কাজে আত্মনিয়োগ করতেন। তারা শুধু যে পুথি নকল করতেন তাই নয়, তারা সেই পুথির লেখাটার সৌন্দর্যকে অসাধারণভাবে ফুটিয়ে তোলার কাজে তাদের অর্জিত দক্ষতাকে নিবেদন করতেন।
হস্তিলেখবিদের প্রাথমিক কাজ লেখার সৌন্দর্যবর্ধন। ইসলামি যুগে হস্তলেখার বিপুল বৈচিত্র উদ্ভাবন হতে থাকে। এবং সমাজের সর্বস্তরে এই শিল্পকে যথেষ্ট গুরুত্ব ও সম্মান দেওয়া হত।
১২০৩ খ্রির এক প্রখ্যাত হস্তিলেখবিদের নাম তাকত মুস্তাসামি এবং নকশ লেখক হিসেবে তাঁর বিপুল সম্মান ছিল। ১৩২৪ সালে তিনি আভেন্নার শাফা নকল করে মহম্মদ তুঘলককে পাঠান। রাজা ব্যাপক খুশি হয়ে তাঁকে ২০০ মিলিয়ন মিসকুয়াল মূল্যের সোনা পাঠান। হস্তিলেখবিদ এই দান তুচ্ছ মনে করে ফিরিয়ে দ্যান।
প্রখ্যাত হস্তলেখাবিদ খালিলুল্লা সাহ নউ-রসের একটি নকল দাক্ষিনাত্যের আদিলশাহকে পাঠান। এই কাজে তিনি এতই মুগ্ধ হন যে তিনি শুধু তাকে কলমের রাজা উপাধি দ্যান তাই নয়, তার সিংহাসন শিল্পীর বসার জন্যে কিছু সময়ের জন্যে ছেড়ে দ্যান।
নানান মুসলমান দেশের মতই ভারতে হস্তরেখাশিল্প যথোচিতভাবে বিস্তারলাভ করে। তবে তার আগের সময়ের কিছু নিদর্শন সময়ের ভ্রুকুটি সয়েও থেকে গিয়েছে।
হস্তলেখাশিল্প মুঘল সময়ে শৈল্পিক দক্ষতার চূড়ান্ত শীর্ষে ওঠে। উপমহাদেশ সে সময় বিপুল পরিমান দক্ষ ও যোগ্য হস্তলেখাবিদ তৈরি করেছিল যাদের কাজ আজও বিশ্বজুড়ে নানান জাদুঘর গ্রন্থাগার এবং ব্যক্তিগত সংগ্রহে শোভা পাচ্ছে
দক্ষ এবং যোগ্য হস্তলেখাবিদ তাদের দক্ষতা এবং যোগ্যতা অনুযায়ী সম্মানিত হতেন। তাদের যে সব উপাধি দেওয়া হয়েছে, সেগুলির মধ্যে ছিল জারিন-রাকম(সোনার লেখক), শিরিন-রাকম(মিষ্টি লেখক), রৌশন-রাকম(উজ্জ্বল লেখক) মুসকিন-রাকম(সুগন্ধিত লেখক)।
শাহজাহানকে যে সব হস্তলেখাবিদ নানান ধরণের উপহার দিয়েছেন, তাদের প্রত্যেককে তিনি ঈয়াক-সুতি (শতজীবি) উপাধি দিয়েছেন।
হস্তলেখার উচ্চাঙ্গের শিল্প হিসেবে যখন সমাদৃত হচ্ছে সে সময় বহু অনামী এবং ছাত্র প্রখ্যাত শিক্ষকদের নাম ধার করে লেখা তৈরি করতেন। জইনুদ্দিনের মোসলেমএর ক্যালিগ্রাফি বইতে আমরা পাচ্ছি, মুল্লা মীর আলির নামে বহু নকল তৈরি করেছিলেন মৌলানা খ্বাজা মুহম্মদ। তার ছাত্র সম্বন্ধে, ছাত্রদের কাছে লিখিতভাবে মীর আলি অভিযোগ করছেন, কিছু সময়ের জন্য খ্বাজা মুহম্মদ আমার ছাত্র ছিল, যতক্ষণ না তার হাতের লেখা একটা স্তরে বিকাশ লাভ করছে আমি তার বিরুদ্ধে যাই নি, সেও আমার কোন ক্ষতি করে নি, কিন্তু সে প্রচুর ভাল খারাপ লেখালিখি করে আমার নামে স্বাক্ষর করে।
হস্তলেখাবিদ যারা তাদের কাজ চরম দক্ষতায় তুলে নিয়ে গিয়েছিলেন, তারা তাদের দক্ষতা সম্পর্কে প্রভূতভাবে সচেতন ছিলেন। তার জন্যে তাঁরা জানও দিতে প্রস্তুত থাকতেন। জাহাঙ্গীরের প্রাণের হস্তরেখাবিদ মুল্লা মীর আলি লিখছেন - আমার কলম চমতকার সৃষ্টি করে, এবং সে শিল্প শব্দের মানের থেকেও অতিরিক্ত স্তরে উঠে যায়। আমার অক্ষরের বাঁক শেখানো আদে স্বর্গীয় দাসত্ব স্বীকার করে নেওয়া, এবং প্রত্যেক রেখার মূল্য অসীমের দ্যোতক।

মুঘল আমলের শেষের দিকে সাধারণ শিল্পকলা উৎসাহিত করা হতে থাকে। বাহাদুর শাহ নিজে শিল্পকলার অনুগামী ছিলেন, এবং দাক্ষিনাত্যের সুলতানেরা যে ঐতিহ্য সৃষ্টি করেছেন তা হায়দারাবাদের নিজাম বহুকাল পর্যন্ত বহন করে এনেছেন। 

নকলনবিশ

উপমহাদেশে ছাপাখানা আসার আগে পুঁথি নকল করা বহু মানুষের জীবিকা ছিল। সব থেকে পুরোনো যে সাহিত্যে নকলনবিশদের নাম পাওইয়া যায় সেটা হল জাতক, লেখক নাম সেখানে উল্লিখিত হয়েছেঅর্থশাস্ত্রেও একই নাম পাচ্ছি। তারপরে অশোকের ১৪তম শিলালেখতে লিপিকার বা লিবিকার নাম পাচ্ছি। সিদ্দপুর লেখতে লেখ লেখক নিজেকে লিপিকার বলছেন। সাঁচী শিলালিপিতে দেখছি রাজলিপিকার পদ। এই পদটা পাণিনিতেও পাচ্ছি(৪খ্রীপূ)।
ফারসি দেবির অর্থাৎ লেখক পশ্চিমভারত আত্তীকৃত করে। বহু ৭-৮ শতকের পহলবি লেখতে দিবীরা বা দিবীরাপতি শব্দটা পাচ্ছি।
হিউএনসাং কাশ্মীরে গেলে সেখানকার রাজা ২০জন লিপিকার নিযুক্ত করেছিলেন, তার থেকে জ্ঞানার্জন করে পুঁথি তৈরি করতে। কাশ্মীরে লেখকদের দিবীরা নাম ১১ শতকের রাজতরঙ্গিনীতে পাচ্ছি আর ১২ শতকে ক্ষেমেন্দ্র লোকপ্রকাশে দিবীরাকে কয়েকটিভাগে ভাগ করেন গঞ্জ দিবীরা, গ্রাম দিবীরা, নগর দীবিরা, খাসা দিবীরা ইত্যাদি।
৮শতে উত্তর এবং পূর্ব ভারতে লেখকেরা কায়স্থ নামে পরিচিত হলেন। যাজ্ঞবল্ক্যস্মৃতিতে এই শব্দটা প্রথম পাচ্ছি। লেখকদের অন্যান্য নামগুলিও করণ, করণিকা, করনিন, সাসনিকা এবং ধর্মলেখিন মাঝে মধ্যে ব্যবহৃত হত
সমাজে কায়স্থরা বেশ ভাল সম্মান অর্জন করতেন। চান্দেলা লেখতে বুঝতে পারি ১১ শতে তারা বেশ গুরুত্বপুর্ণ পদ হয়ে উঠছেনএই সময়ে চান্দেলা দেশে তারা কিরকম শক্তি হয়ে উঠছে তা নিচের লেখাতেই বোঝা যাবে – মোট ৩৫টা শহর; সত্যি বলতে কি লেখক জাতিরা সেই শহরগুলিতে বাস করেন(করণ-কর্ম-নিবসপুত) (এবং) তারা(অন্যান্য শহরেও) বেশ স্বচ্ছলভাবে বাস করেতাদের মধ্যে প্রখ্যাততম হলেন তক্ষরিক, যিনি অন্যদের কাছে ঈর্ষার পাত্র... (এবং) শহরগুলির (ছাত্রদের) ভিড়েতে বেদের শ্লোকের উচ্চারণ শোনা যায়, ...যে সব কায়স্থ বাস্তব্য পরিবারে জন্মেছেন তাদের সৌরভ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে, অন্ধকার দূর করছে।
গুজরাটের জৈন শ্রীসিদ্ধরাজা ছাত্রদের মধ্যে ১ লক্ষ ২৫ হাজার সিদ্ধহেম ব্যাকরণ বিতরণ করার জন্যে ৩০০ লিপিকার নিয়োগ করেছিলেন। প্রভাকর চরিত্র এবং কুমারপাল-প্রবন্ধে ভুরি ভুরি উদাহরণ আছে গরীব ছাত্রদের বিনামূল্যে পুস্তক সরবরাহের।
তুর্কি-আফগান সুলতান এবং অভিজাতরাও জ্ঞান, বিদ্যার পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। সে সময় বিপুল পরিমান পুথি লিখত, নকল এবং অনুদিত হয়েছে। তারা বিপুল পরিমান লেখক নিযুক্ত করতেন এবং বহু সময় দাসেদের শিক্ষিত করিয়ে রোমা্নদের মত নকলনবিশের কাজে নিযুক্ত করতেন।
বিপুল পরিমান কাগজের ব্যবহারের জন্যে মুঘল রাষ্ট্র কাগজনির্ভর রাষ্ট্র নামে পরিচিত ছিল। এই যুগে বিপুল পরিমান নকলনবিশ, করণিক এবং খবর লেখক বা ওয়াকিয়া নবিশ নিযুক্ত হন। কারকুনদের মাসে ১৫ থেকে ২৫ টাকা পর্যন্ত বেতন দেওয়া হত।
প্রত্যেক গ্রামের গ্রাম প্রধান পাতিলের সঙ্গে একজন করে করণিক দেওয়া হত। এদের নাম কুলকার্ণি বা গ্রাম-লেখক। তাদের সম্মান পাতিলদের পরেই। গ্রামের রাজস্ব দিয়েই তাদের বেতন হত। এছাড়াও তেল থেকে কালি পর্যন্ত নানান দৈনন্দিনের দ্রব্য গ্রামীনেরা তাদের দিয়ে সাহায্য করতেন।
আসামের রাজারা তাদের প্রাসাদে গ্রন্থাগার রাখতেন। রাজার প্রধান গ্রন্থাগারের প্রধানের নাম হল গান্ধিন বড়ূয়া। সরকারির হিসেবে তার ব্যাপক সামাজিক সম্মান। তার পরের আধিকারিকের নাম হল লিক্ষকর বড়ুয়া – তিনি বিশাল সংখ্যক লেখক, করণিকের ব্যবস্থাপনা করতেন।
ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানি ছাপাখানা আসার আগে রাইটার বা করণিক নিযুক্ত করত। বাংলা, মাদ্রাজ এবং বম্বের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শুধু আর্থিক লেনদেনের কাজগের পরিমান ছিল ১৩০০ বিশাল খণ্ড – এই কাজে বিপুল সংখ্যক দেশিয় করণিক নিযুক্ত হত। 

গ্রন্থাগার কর্মী

১০৫৮খ্রির নাগাই লেখ আমাদের চালুক্য সময়ের গ্রন্থাগার কর্মীদের পদমর্যাদা এবং তাদের বেতন সম্বন্ধে জানতে সাহায্য করে। এই লেখতে নাগাই অঞ্চলের একটি আবাসিক বিদ্যালয়ে কিভাবে জমির উদ্বৃত্তে শিক্ষকদের এবং গ্রন্থাগারিকদের বেতন কাঠামো হবে সেই তথ্য থেকে একটা বিষয় পরিষ্কার, শিক্ষক এবং গ্রন্থাগারিক উভয়েই একই সম্মান পেতেন, যে বেতন শিক্ষকদের দেওয়া হত সেই পরিমান বেতন গ্রন্থাগারিকেরা পেতেন।
সুলতানি আমলে রাজারা তার নিজের বাড়িতেই একটা আলাদা গ্রন্থাগার বা কিতাব খানা রাখতেন, যে সচিবের অধীনে তা থাকত তার পদের নাম ছিল কিতাবদার।
খলজি বংশের সুলতান জালালুদ্দিন জ্ঞানচর্চার উৎসাহী পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তিনি রাষ্ট্রীয় গ্রন্থাগারের গ্রন্থাগারিক হিসেবে প্রখ্যাত কবি আমির খুসরুকে নিযুক্ত করেন। সে সময় গ্রন্থাগারিকের বিপুল সম্মান ছিল। তাই আমীর খুসরুকে গ্রন্থাগারিক হিসেবে নিযুক্ত করতে গিয়ে তিনি তাঁকে তার দরবারের রত্ন ঘোষিত করে তার সম্মান বৃদ্ধি করেন।
মুঘল আমলে নিজাম ছিলেন গ্রন্থাগারের সর্বোচ্চ পদাধিকারী। মুল্লা পীর মুহম্মদ এবং শেখ ফৈজী পরপর আকবরের রাষ্ট্রীয় গ্রন্থাগারের গ্রন্থাগারিক নিযুক্ত হয়েছিলেন। জাহাঙ্গিরের সময় তাঁর দরবারের প্রখ্যাত এবং গুরুত্বপূর্ণ অভিজাত মুক্তব খানও গ্রন্থাগারিক নিযুক্ত হন।
তবে দিনে দিনে গ্রন্থাগারের আকার কাজকর্মের বহর বাড়তে থাকায় মুঘল এবং মুঘল পরবর্তী সময়ে গ্রন্থাগারের নানান ধরণের উপযোগী কর্মী/পদাধিকারী নিযুক্ত হতে শুরু করেন। পদগুলি নিচে বর্ণিত হল –
১) কিতাবখানার প্রধান দায়িত্বে যে সচিব ছিলেন তার পদের নাম ছিল নিজাম। আজকের দিনের বড় রাষ্ট্রপোষিত বা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান গ্রন্থাগারিকের সঙ্গে তুলনীয়। তাঁকে অবশ্যই বিদ্বান এবং উপযুক্ত প্রশাসকও হতে হবে।
২) তাঁর অধীনে ছিলেন দারোগা – প্রশাসনিক এবং প্রযুক্তিগত বিভাগ দেখার জন্যে। তার দায়িত্ব ছিল বই নির্বাচন, শ্রেণীবিন্যাস এবং খরিদ।
৩) সাহাফ এবং ওয়ারাক দারোগার নির্দেশে কাজ করতেন। তাদের কাজ ছিল গ্রাহককে বই দেওয়া এবং বইটি পেলে সেটিকে ঠিক জায়গায় আবার রাখা।
৪) পাণ্ডুলিপি সম্পাদনা, দেখাশোনা, পরিমার্জনকরার কাজ করতেন মুসাহিহ। পুঁথি পোকায় কাটিলে সেটিকে পূর্বাবস্থায় ফেরত দেওয়ার দায় ছিল এই পদাধিকারী ব্যক্তির। তিনি অবশ্যই একাধারে বিদ্বান এবং প্রযুক্তিবিদ। না হলে তার পক্ষে ক্ষতিগ্রস্ত পুঁথিটিকে সঠিকভাবে মেরামত করা অসম্ভব হত। খানখানানের কিতাবখানায় মৌলানা সুফিী এই পদ অলঙ্কৃত করতেন।
৫) অনুবাদক।
৬) কাতিব বা সাধারণ নকলনবিশ যিনি দুর্লভ পুঁথি নকল করতেন।
৭) খুশনবিশ বা হস্তলিপিবিদ
8) কাতিব আর খুশনসিবের কাজ নিরীক্ষণ করতেন মুকাবিলানবিশ। তিনি নকল পুঁথি মুল পুঁথির সঙ্গে মিলিয়ে দেখতেন।
৯) বইবাঁধাইকার
১০) চিত্রশিল্পী
১১) কাগজের প্রান্তে নানান রকমের কাজ করার জন্যে দক্ষ কারিগরের পদের নাম ছিল জিদওয়াল সাজ
১২) করণিকের কাজ ছিল হিসাব করা ও মোট বইএর হিসাব রাখা

১৩) ধুলা ও অন্যান্য কিছু পরিষ্কারের জন্যে ছিল ভৃত্য। 

Thursday, August 23, 2018

লাইব্রেরিজ এন্ড লাইব্রেরিয়ানশিপ ইন এনসিয়েন্ট এন্ড মেডিভ্যাল ইন্ডিয়া - বিমল কুমার দত্ত - মুঘলযুগে গ্রন্থাগার৯

(ছবি - ১৭০২ সালে আওরঙ্গজেবের তৃতীয় উইলিয়ামকে লেখা চিঠি)
এই যুগে আগরা আর দিল্লিতে জেস্বুঈটরা গ্রন্থাগার তৈরি করেছিলেন। বিভিন্ন ফাদারের লেখা বই এবং ধর্মতত্ত্ব বিষয়ে প্রাচ্য ভাষার বই ছিল এই গ্রন্থাগারে। শাহজাহানের নির্দেশে প্রথমবার লুণ্ঠিত হয় আগরার গ্রন্থাগটি, দ্বিতীয়বার লুণ্ঠিত হয় আহমদ সাহ আবদালির সময় ১৭৫৯ সালে, বই ছাড়া সব কিছুই।
১৬৫০ সালে ফাদার হেনরি বুসি প্রথমবার দিল্লি যান। তার উদ্দেশ্য ছিল দরবারে খ্রিষ্ট মিশন নিয়ে দরবার করা। তার কাজ সম্পাদনের জন্যে তিনি যুবরাজ দারা এবং আরও কিছু অভিজাতর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। সে সময় বেশ কিছু মুসলমান অভিজাত ইওরোপিয় ধর্মতত্ত্বের বই তাদের গ্রন্থাগারে রাখতেন। এক বড় গ্রন্থাগারওয়ালা শিক্ষিত মুসলমানের সঙ্গে ফাদার বুসি আলোচনা করেন। তিনি তার বাড়িতে দেখেন, সেই ব্যক্তি, কোন আরবি জ্ঞানীর মত খ্রিষ্ট ধর্ম বিষয়ে প্রচুর বই সংগ্রহ করেছিলেন।
১৬৫৬ সালে আওরঙ্গজেব রাষ্ট্রের ভার নেন। তিনি অসাধারণ বিদ্বান বুদ্ধিমান ছিলেন, অসাধারণ লেখক ছিলেন, দক্ষ প্রশাসক ছিলেন অসাধারণ সেনানী ছিলেন আর ধর্মীয় রাজা ছিলেন। তিনি ইসলামি শিক্ষার পৃষ্ঠপোষণা করেন। বিভিন্ন বিদ্যালয় ও উচ্চশিক্ষা কেন্দ্র খোলেন, পুরোনো মাদ্রাসা সারান। তার প্রশাসকদের হিন্দু মন্দির এবং হিন্দু বিদ্যালয় ধ্বংস করতে আর হিন্দুদের ধর্ম পালনে বাধা দিতে প্ররোচিত করে নির্দেশ দ্যান(যদিও লেখকের এই তথ্যটি সম্বন্ধে উল্টো মত পোষণ করি, এখন অনেক ধারনাই পাল্টে যাচ্ছে। যদুনাথ সরকারের মত ঔরঙ্গজেব বিরোধী ঐতিহাসিকদের কাজে এই সম্পূর্ণ ভুল ধারণাটি জন্মেছে। লেখকের বই যখন প্রকাশ পাচ্ছে ১৯৬০ সালে, এই ধারনাটা তখন প্রবল ছিল - অনুবাদক)।
আওরঙ্গজেব গোঁড়া ধর্মান্ধ ছিলেন। রাত দুটোয় প্রার্থনার পর তিনি কোরাণ অনুবাদ করতেন, তার পর আরবি বিচারব্যস্থার বই বা নানান ধরণের প্রচারপত্র থেকে ইসলামি ধর্ম বিষয়ে পড়াশোনা করতেন। তার শেষ ইচ্ছাপত্র থেকে পরিষ্কার এই কোরাণ নকলের কাজ বিক্রি করে তিনি ৩০৫ টাকা রেখে যান।
নিজে যেহেতু ধর্মান্ধ মুসলমান ছিলেন, তাই তিনি মুল্লা নিজামকে দিয়ে ফতাওয়াইআলমিগিরি সঙ্কলন করান। এছাড়াও হাদিস, ফিক ইত্যাদির তফসির বইও সংগ্রহ করেতেন। বিদরের মুহম্মদ গাওয়ানের গ্রন্থাগারটি রাষ্ট্রীয় গ্রন্থাগারে জুড়ে দিয়ে গ্রন্থাগারের আয়তন বাড়ান।
তার পূর্বজদের মতই আওরঙ্গজেব হস্তলেখাবিদদের রাজসভায় সাদরে পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। যুবরাজ দারাশুকো বা পাদশাপুত্রী জেবউন্নিসাকে হস্তলেখায় বিশেষভাবে পারদর্শী করে তোলা হয় প্রখ্যাত রেখাবিদ আকা আবদুর রশিদ এবং স্বয়ং সম্রাট নিজে তালিম নেন রাষ্ট্রীয় গ্রন্থাগারের প্রধান গ্রন্থাগারিক সৈয়দ আলি তবরেজির অধীনে।
রাষ্ট্রীয় গ্রন্থাগারের নিজাম ছিলেন মুহম্মদ সালেহ এবং মহম্মদ মনসুর এবং সঈদ আলিঅলহুসেইনি তার মুহতমিম ছিলেন। মহম্মদ মনসুরকে মকরমাত উপাধি দিয়ে সম্মানিত করা হয়।
সম্রাটের কন্যা জেবউন্নিসা বিদুষি কৃষ্টিশীল ছিলেন। তিনি নিজে কবি ছিলেন। তাঁর অনুরোধে ইমাম রাজির কবিতা তফসিরেকবীর ফারসিতে অনুবাদ করে নাম দেন জেবুততফসিরে। তিনি পাগলের মত বই সংগ্রহ করতেন। তাঁর নিজস্ব বিপুল বিশাল গ্রন্থাগারের নাম ছিল মাসিরিআলমগিরি এবং সেটি বিদ্বানেরা হামেশাই ব্যবহার করতেন।
আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর কিছুটা চেষ্টা হয় কিন্তু তার সত্তর বছরের মধ্যে বিশ্বে ধনীতম উপমহাদেশটি লুন্ঠনের ক্ষেত্র এবং অজ্ঞান আর মৃত্যুর উপত্যকা হয়ে ওঠে।
।।আপাতত শেষ।।

আকবর এবং উপমহাদেশের শাসকদের বিশ্ববিক্ষা - আকবরের গ্রন্থাগারে ইওরোপিয় পুস্তকের খণ্ডিত তালিকা - আকবরের জেসুঈটদের ইওরোপিয় পুস্তক দান

উপমহাদেশিয় মুঘল ইত্যাদি শাসকদের বিশ্ববিক্ষা নিয়ে প্রচুর প্রশ্ন ওঠে। মূলতঃ ইওরোমুখ্য আমাদের দিকে এই প্রশ্নগুলি ছুঁড়ে দ্যান। তাঁদের অবগতির জন্যে আকবর পাদশার গ্রন্থাগারের ইওরোপিয় বইএর তালিকা তুলে দেওয়া গেল। যে সব জেসুঈট তাঁকে অবাক করিয়ে দ্যাওয়ার জন্যে উত্তম ছাপা বই নিয়ে এসেছিলেন, তাঁরা যে তাঁরমত অশিক্ষিতর রাজার ইওরোপের ইতিহাস, ধর্মতত্ত্ব ইত্যাদিতে জ্ঞান আর তার গ্রন্থাগার দেখে হুব্বা বনে গিয়েছিলেন এটা পরিষ্কার। না হলে তৃতীয় ভারত মিশনে আসা জেসুঈট ফাদারদের, আকবর তাঁর গ্রন্থাগার ঘুরিয়ে দেখিয়ে ইওরোপিয় বই নিতে বলতেন না বা ইয়োরোপীয় বেশ কিছু বই উপহারও দিতেন না।
তার প্রচুর ইওরোপিয় বইএর সংগ্রহ ছিল, সেটা তিনি তৃতীয় মিশনে আসা ফাদারদের ঘুরিয়ে দেখান ১৫৯৫ সালে। তাদের বলেন যদি প্রয়োজন হয় তাহলে তারা সেই গ্রন্থাগার থেকে কয়েকটি বই নিতে পারেন। ফাদারেরা আকবরের গ্রন্থাগার থেকে রয়্যাল বাইবেল এবং তার নির্ঘন্টু, সেন্ট টমাস একুইনাসের সুমা এবং অন্যান্য বই, বিদ্বান লেখক ডোমিঙ্গো ডি সোটো এবং ফরসগলিওনের এস এন্টনিনো নানান বই, সিলভেস্টার পোপ(মৃ ১০০৩) এবং কার্ডিনাল ক্যাজনট্যান (১৪৭০-১৫৩৪)এর নানান বই, সেন্ট ফ্রান্সিসের ক্রনিকা, হিস্ট্রি অব পোপ, ল’জ অব পর্তুগাল, আলফান্সো আলবুকার্কের কমেন্টারিজ, জেরোম জেভিযার্সের আত্মীয় ব্রাজিলের মিশনারি নাভারের হুয়ান এসপিলেতা(মৃ ১৫৫৫)র বই, সেন্ট ইগনিসাসের এক্সারসিসিয়া স্পিরিচুয়ালিয়া, জেসুঈট ইমানুয়েল আলভারেজের (১৫২৬-১৫৮২) কন্সটিটিউসনস অব দ্য সোসাইটি এবং ল্যাটিন ব্যাকরণ এবং ইত্যাদি সংগ্রহ করেন।
সূত্রঃ বিমল কুমার দত্ত'র লাইব্রেরিজ এন্ড লাইব্রেরিয়ানশিপ ইন এনসিয়েন্ট এন্ড মেডিভ্যাল ইন্ডিয়া বই সূত্রে জ্ঞানচক্ষু উন্মোচন হল

লাইব্রেরিজ এন্ড লাইব্রেরিয়ানশিপ ইন এনসিয়েন্ট এন্ড মেডিভ্যাল ইন্ডিয়া - বিমল কুমার দত্ত - মুঘলযুগে গ্রন্থাগার৮

জাহাঙ্গিরের প্রখ্যাতা বিদুষী রাজ্ঞী নুরজাহানও বইএর অনুরাগী ছিলেন এবং একটি ব্যক্তিগত গ্রন্থাগার তৈরি করেছিলেন। তিনিও চড়া দামে বই কিনতেন। কামরানের দিওয়ান নামক বই তার গ্রন্থাগারের জন্যে তিন স্বর্ণ মোহর দিয়ে কেনেন। এটির একটি নকল পাটনার খুদাবক্স গ্রন্থাগারে রাখা আছে। দিওয়ানের প্রথম পাতায় লেখা আছে এই সম্পদের দাম তিন মোহর – নবাব নুরুন্নিসা বেগম।
জাহাঙ্গিরের দরবারের অন্যতম প্রধান মুখ ছিলেন অভিজাত শেখ ফরিদ বখরি লাহোর আর আহমেদাবাদে বহুকাল প্রশাসক ছিলেন। তিনিও ব্যক্তিগত গ্রন্থাগার তৈরি করে, হাসান দেহলভির দিওয়ান নামক বই একই দাম দিয়ে কেনেন। এটিও পাটনার খুদাবক্স গ্রন্থাগারে রাখা আছে।
সম্রাট জাহাঙ্গির তার পূর্বজর মত শিক্ষা আর জ্ঞানের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন।
তিনি জ্ঞানী আর বিদ্বানদের উপহার দিয়ে সম্মানিত করতেন। তাঁর সময়ে বহু কবি, ধর্মতাত্ত্বিক, ঐতিহাসিক বিকশিত হয়েছেন। তাদের মধ্যে যাদের নাম এই মুহূর্তে উল্লেখ করতে হয় তারা হলেন, পাদশানামার লেখক আবদুল হামিদ লাহোরি, আরেক পাদশানামার লেখক আমিনি কোয়াজিনি, আমলইশাহির লেখক মহম্মদ সালেহ, শাহজাহান নামার লেখক ইনায়েত খান প্রভৃতি। সম্রাটের জৈষ্ঠ সন্তান দারা শুকোর পৃষ্ঠপোষকতায় প্রচুর পুস্তক রচনা ও ফারসি ভাষায় অনুবাদ হয়।
বিভিন্ন ক্ষেত্রের মৌলিক জ্ঞানের বই ছাড়াও শাহজাহানকে উদ্দেশ্য করে ডিক্সনারিও তৈরি হতে থাকে। এগুলির মধ্যে আবদুর রশদ অল তাতভির ফারলাঙ্গিরশিদি এবং মন্তাখাবউললুঘাতইশাহজাহানি, আমানুল্লার চহর অনসার দানিশ মহম্মদ সাদিকের শাহিদিসাদিক। শেষতমটি ধর্মীয়, দার্শনিক, রাজনৈতিক, নৈতিক, এবং মহাজাগতিক বিষয় নিয়ে রচিত।
সম্রাট দিল্লিতে একটি উচ্চশিক্ষাকেন্দ্র গড়েন এবং দারুলবাকা নামক শিক্ষা কেন্দ্রটি সারাই করে নতুনভাবে গড়ে তোলেন। স্বাভাবিকভাবে প্রত্যেক শিক্ষাকেন্দ্রতে গ্রন্থাগার ছিল। যদিও সম্রাট নিজে বই সংগ্রহ এবং গ্রন্থাগার তৈরিতে খুব বেশি উৎসাহিত ছিলেন না কিন্তু তাকে মধ্যরাত্রে নিয়মিত বই পড়ে শোনানো হত। যদুনাথ সরকার লিখছেন, সন্ধ্যে সাড়ে আটটার সময় তিনি হারেমে প্রবেশ করতেন। প্রায় দুতিনঘন্টা মহিলাদের গান ও নৃত্য উপভোগ করতেন। এরপরে পাদশাহ বিছানায় শুতে যেতেন। সম্রাটের মুল শোবার ঘরে একজন পাঠিকা (না পাঠক?) পর্দার আড়ালে থেকে ভ্রমন কাহিনী, নবী এবং সাধুসন্তদের জীবন কাহিনী এবং পূর্ববর্তী রাজাদের বিষয় শুনতেন। এগুলির মধ্যে তার ব্যক্তিগত পছন্দের ছিল বাবর আর তৈমুরের জীবনী।
১৬৩৮ সালেওর এপ্রিলে সুরাটে যোহানন এলবার্ট ভন ম্যান্ডেলস্লো নামক এক যুবা জার্মান উপস্থিত হন। তিনি পরপর আহমেদাবাদ, বম্বে, আগরা আর লাহোরে ভ্রমন করেন। তিনি তার দিনপঞ্জীতে বলছেন শাহজাহানের রাষ্ট্রীয় গ্রন্থাগারে উত্তমরূপে বাঁধাই করা ২৪০০০ বই আছে। মুল গ্রন্থাগারিকের নাম দারোগাইকিতাবখানা। তার লেখায় আবদুর রহমান, রশিদআলি, হস্তলেখাবিদ মীর সালিস, মীর সৈয়দ আলি, ইত্রিমাদ খান, জাফর খানের পুত্র ইনায়েত খানএর নাম পাওয়া যায়।
(চলবে)

লাইব্রেরিজ এন্ড লাইব্রেরিয়ানশিপ ইন এনসিয়েন্ট এন্ড মেডিভ্যাল ইন্ডিয়া - বিমল কুমার দত্ত - মুঘলযুগে গ্রন্থাগার৭

আকবরের মৃত্যুর সাত দিনের মাথায় পুত্র সেলিম, নুরুদ্দিন মহম্মদ জাহাঙ্গির বাদশা গাজি নাম নিয়ে আগরার সিংহাসনে আরোহন করেন। দৈহিক সুখে অনেকটা উৎসাহী জাহাঙ্গির পাদশা পিতা এবং পিতার পিতামহের বেশ কিছু গুণাবলী অর্জন করেন। তার রচিত জীবনী তুজুক, সাহিত্য দক্ষতার অবিসংবাদী চিত্র।
তিনি জ্ঞানের পৃষ্ঠপোষক এবং শিক্ষার অনুরাগী ছিলেন। তিনি নির্দেশ দ্যান, শিক্ষিত উত্তরাধিকারহীন ধনীরা মাদ্রাসা, ধর্মস্থান এবং গ্রন্থাগার তৈরি এবং সারানোর কাজ করবে। তাঁর নির্দেশ ছিল ত্রিশ বছর ধরে যে মাদ্রাসাগুলিতে কোন কাজ হয় নি, যেটি পশুপাখিদের আস্তানা হয়ে আছে, বা যে সব মাদ্রাসায় পড়ুয়া আর বিদ্বানের পদক্ষেপ পড়ে, সেইসবগুলিই সারানোর নির্দেশ দ্যান। তাই সাম্রাজ্যের পৃষ্ঠপোষণায় আগরা শিক্ষাকেন্দ্রের যে ঐতিহ্য বহন করছিল তাকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
তিনি শুধু অসাধারণ বিপুল গ্রন্থাগার উত্তরাধিকারসূত্রে অর্জন করেছিলেন তাই নয়, তিনি প্রচুর চিত্রও উত্তরাধিকার সূত্রে পান। সেই চিত্রগুলিকে প্রদর্শন করার জন্যে তিনি একটি চিত্রশাল তৈরি করেন।
রাষ্ট্রীয় গ্রন্থাগার ছাড়াও তার নিজস্ব একটি গ্রন্থাগার ছিল। তিনি বই এত ভালবাসতেন যে তিনি যখনই গুজরাট যান, তখন তাঁর সঙ্গে একটি গ্রন্থাগারও ছিল। গুজরাটে তিনি উলেমাদের তার গ্রন্থাগার থেকে বই উপহার দিতেন। এই উপহারের একটি চিত্র জাহাঙ্গির লিখেছেন, “১৬ তারিখ, মঙ্গলবারে, গুজরাটের অভিজাতরা আমার কাছে দ্বিতীয়বার এলেন। আমি তাদের খেলাত, রাহাখরচ, জমি দিয়ে যেতে অনুমতি দিলাম। তাদের প্রত্যেককে আমার ব্যক্তিগত গ্রন্থাগার থেকে তাফসিরি কাশাফ, তাফসিরি হুসেইনি, রাহুজালতুলআহবাবএর মত পুস্তক উপহার দিলাম এবং প্রতেক পুঁথির পিছনে আমার গুজরাট আসার তারিখ লিখে দিয়ে সম্মান জানালাম।”
তার গ্রন্থাগারের জন্যে এবং তার বইপ্রেমের জন্যে তিনি উচ্চমূল্যে বই খরিদ করতেন। মার্টিন লিখছেন “যে পুথির জন্যে জাহাঙ্গির ৩০০০ স্বর্ণমুদ্রা খরচ করছেন, যার দাম ১০ হাজার পাউন্ড, সেটি আজকের প্যারিসে ২০০০ পাউন্ডেও বিক্রি হবে না। যদিও মানুষ পুরোনো বই আর চিত্রের জন্যে বিপুল দাম দিতে প্রস্তুত, ঠিক যেমন আমেরিকিয়রা রেম্ব্রাঁ এবং ভ্যান ডাইকসের ছবির জন্যে দ্যায়।”
জাহাঙ্গিরের সময়ও বইচিত্রণের কাজ আরও সমৃদ্ধ হয় এবং তিনি তা যথোচিত পৃষ্ঠপোষণাও করেন। আকবরের পছন্দ ছিল প্রায়-জীবন্ত চিত্রকলা, জাহাঙ্গিরও একইরকমভাবে বিশ্বাস করতে চিত্রাঙ্কনে জীবনকে তুলে ধরতে, তিনি বলতেন হাজার বর্ণনা দিয়ে যা বোঝানো যাবে না, সত্যিকারের জীবনের ছবি পাঠককে বিস্ময়াবিষ্ট করে তুলতে পারে। জাহাঙ্গির-নামায় চিত্রাঙ্কনের জন্যে তিনি চিত্রশিল্পী নিয়োগ করেন এবং মুকরব খান গোয়ার সমুদ্র বন্দর থেকে যেসব পশুপাখি ধরে আনেন সেগুলি তিনি তাঁকে দিয়ে জাহাঙ্গিরনামায় আঁকিয়ে নেন।
বিপুল গ্রন্থাগার চালু রাখার জন্যে তিনি বিপুল সংখ্যক আমলা বিশেষ করে নকলনবিশ নিয়োগ করেন। জাহাঙ্গির তুজুক লেখা শেষ করলে, তিনি গ্রন্থাগারের নকলনবিশদের সেটি নকল করে সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে নির্দেশ দ্যান। প্রথম নকলটি পান শাহজাহান। তিনি হস্তলেখকে গুরুত্ব দিতেন এবং তাঁর সময়ে লিপিকারদের সম্মান দিয়েছেন। প্রখ্যাত লিপিকার শেখ ফরিদ বাখরিকে তিনি রত্নখচিত তলোয়ার, খেলাৎ, কলম, দোয়াতদানি উপহার এবং মীর বক্সী উপাধি দিয়ে সম্মাননা জানান। তিনি বলেন আমি আপনাকে কলম আর তরবারির সর্বশক্তিমানরূপে স্বীকার করলাম (শাহিবুসসাইফওয়াইকালাম)।
(চলবে)

লাইব্রেরিজ এন্ড লাইব্রেরিয়ানশিপ ইন এনসিয়েন্ট এন্ড মেডিভ্যাল ইন্ডিয়া - বিমল কুমার দত্ত - মুঘলযুগে গ্রন্থাগার৬

(ছবি - আকবরনামায় আগরা দুর্গ তৈরির চিত্র।সঙ্গে আজকের আগরা দুর্গ, যেখানে আকবরের সময় রাষ্ট্রীয় গ্রন্থাগার ছিল)
আইনিআকবরিতে আবুল ফজল বিশদে সেই সব চিত্রশিল্পীর নামোল্লেখ করেছেন। একশর বেশি চিত্রকর এই সময় বিখ্যাত হন। আকবরের গ্রন্থাগারে অসামান্য দক্ষতায় চিত্রিত প্রচুর বই ছিল। হামজার গল্পের ১২টি খণ্ডের বইতে ১৪০০ ছবি ছিল। তার গ্রন্থাগারে চিংগিজনামা, জাফরনামা, রাজমনামা, রামায়ন, নল দমন, কালিয় দমন ইত্যাদি পুস্তকে অসাধারণ ছবি চিত্রিত ছিল। চিত্রকরদের পৃষ্ঠপোষণা করতে আকবর রাষ্ট্রীয় চিত্রশালা তৈরি করান।
আকবরের মৃত্যু ঘটে ১৬০৫ সালে। তাঁর মৃত্যুর পর আগরা দুর্গস্থিত রাষ্ট্রীয় গ্রন্থাগারের বইএর একটি সুমারি করা হয়। উপমহাদেশে আসা সেই সময়ের দুজন ইওরোপিয়, মনরিকে এবং ডি ল্যাক্ট, সরকারি মহাফেজখানা থেকে এই সুমারির তালিকা নকল করেন। সেখানে দেখি অসাধারণ চিত্রিত ২৪ হাজার পুঁথির বর্ননা। বইগুলির মূল্যমান ছিল ৬৪৬৩১৩১ টাকা। প্রত্যেক বইএর গড় দাম ছিল ২৭ থেকে ৩০ পাউন্ড, পাউন্ডে মোট মূল্যমান ছিল ৭৩৭১৬৯।
রাজার ব্যক্তিগত শিক্ষক মুল্লা পীর মহম্মদ এই গ্রন্থাগারের প্রধান গ্রন্থাগারিক হিসেবে কাজ করেছেন।
রাষ্ট্রীয় সংগ্রহ ছাড়াও উপমহাদেশজুড়ে প্রচুর গ্রন্থাগার গড়ে উঠেছিল। এই গ্রন্থাগারগুলি অভিজাত, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এবং বেশ কিছু রাজা ও রানীর পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছে। আকবরের অন্যতম রাজ্ঞী বিদুষী সালিমা সুলতানা বেগম ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্যে একটি গ্রন্থাগার তৈরি করেন। তিনি মাকফি ছদ্মনামে প্রচুর ফারসি বয়েত রচনা করেন। সালিমা বেগমের সংগ্রহের বাদাউনির অনুবাদের বত্রিশ সিংহাসন বইটি বাদাউনি বা অন্য কেউ পড়তে নিয়ে এসে হারিয়ে ফেলেন। বাবরের কন্যা, আকবরের পিসি, হুমায়ুন নামা রচয়িতা গুলবদন বেগমও অসাধারণ বিদ্বান ছিলেন এবং তাঁরও ব্যক্তগত গ্রন্থাগার ছিল।
অভিজাতদের মধ্যে প্রথম জীবনে বিদ্বান, আহমেদাবাদের প্রশাসক, আবদুর রহিম খানইখানান, এবং শেখ ফৈজির ব্যক্তিগত গ্রন্থাগার সে যুগে বিখ্যাত ছিল।
খানইখানানের ব্যক্তিগত গ্রন্থাগার দেখাশোনার জন্য ৯৫ জন কর্মচারী ছিল। এদের মধ্যে ছিল গ্রন্থাগারিক, বাঁধাইকর, নকলনবিশ, অনুবাদক, ইত্যাদি। অধিকাংশ বই লেখকেরা বা অনুবাদকেরা তাঁকে বই উপহার দেন। জ্ঞানভিখারী বহু মানুষ যারা নিজেদের আত্মপলব্ধির জন্যে পড়াশোনা করতে চাইতেন, তাঁর পুস্তকভাণ্ডারে নিয়মিত যেতেন। জ্ঞানী, লেখক, বইবাঁধাইকার, স্বর্ণমণ্ডক(গিল্ডার) ইব্রাহিম নক্স খানইখানানের কিতাবদার ছিলেন। মাখজানিআফগানির লেখক নিয়ামতুল্লা কিছু দিন খানইখানানের গ্রন্থাগারিক হিসেবে কাজ করেছেন, তারপরে তিনি জাহাঙ্গিরের দরবারে ইতিহাসকার হিসেবে যোগ দ্যান।
মুঘল আমলের শেখেরাও জ্ঞানের প্রত্যাশী ছিলেন। শেখ ফৈজির নিজস্ব গ্রন্থাগার ছিল তাতে বইছিল ৪৩০০ (যদিও এর আগে অন্য সংখ্যা বলা হয়েছে - অনুবাদক)। ১৫৯৫তে তাঁর মৃত্যুর পর তার বইগুলি আগরার রাষ্ট্রীয় গ্রন্থাগারে নিয়ে যাওয়া হয়।
আকবরের সময় জৌনপুরের প্রশাসক, সিপাহসালার মুনিম খান খনইখানান জ্ঞান ও জ্ঞানীর পৃষ্ঠপোষক ছিলেন এবং গোমতির ওপরে একটি সেতু তৈরি করে দ্যান। বই সংগ্রহ তার নেশ ছিল। তাঁর বন্ধু বাহাদুর খান উজবেগ তাঁকে কুলিয়া সাদি উপহার দ্যান। দেওয়ান মির্জা কামরানের মত তিনিও বই কিনতেন গ্রন্থাগারের জন্যে।
(চলবে)

লাইব্রেরিজ এন্ড লাইব্রেরিয়ানশিপ ইন এনসিয়েন্ট এন্ড মেডিভ্যাল ইন্ডিয়া - বিমল কুমার দত্ত - মুঘলযুগে গ্রন্থাগার৫

ভারতে আসা প্রথম জেসুঈট মিশন আকবরকে উত্তমরূপে বাঁধাই এবং– হিব্রু, ক্যালডিয়, ল্যাটিন এবং গ্রিক এই চার ভাষায় ছাপা বাইবেল উপহার দেন। এই বইগুলি সম্পাদনা করেন বহুভাষাবিদ মন্তানা এবং এন্টর্পে ১৫৬৯-৭২ সালে ছাপেন প্ল্যানটিন, রাজা দ্বিতীয় ফিলিপের জন্যে। এই বইগুলি আকবর ফাদারদের প্রত্যার্পণ করেন এবং ১৮৫৭ পর্যন্ত লক্ষনৌএর ক্যাথলিক গ্রন্থাগারে রাখা ছিল। তার প্রচুর ইওরোপিয় বইএর সংগ্রহ ছিল, সেটা তিনি তৃতীয় মিশনে আসা ফাদারদের ঘুরিয়ে দেখান ১৫৯৫ সালে। তাদের বলেন যদি প্রয়োজন হয় তাহলে তারা সেই গ্রন্থাগার থেকে কয়েকটি বই নিতে পারেন। ফাদারেরা আকবরের গ্রন্থাগার থেকে রয়্যাল বাইবেল এবং তার নির্ঘন্টু, সেন্ট টমাস একুইনাসের সুমা এবং অন্যান্য বই, বিদ্বান লেখক ডোমিঙ্গো ডি সোটো এবং ফরসগলিওনের এস এন্টনিনোর নানান বই, সিলভেস্টার পোপ(মৃ ১০০৩) এবং কার্ডিনাল ক্যাজনট্যান (১৪৭০-১৫৩৪)এর নানান বই, সেন্ট ফ্রান্সিসের ক্রনিকা, হিস্ট্রি অব পোপ, ল’জ অব পর্তুগাল, আলফান্সো আলবুকার্কের কমেন্টারিজ, জেরোম জেভিযার্সের আত্মীয় ব্রাজিলের মিশনারি নাভারের হুয়ান এসপিলেতা(মৃ ১৫৫৫)র বই, সেন্ট ইগনিসাসের এক্সারসিসিয়া স্পিরিচুয়ালিয়া, জেসুঈট ইমানুয়েল আলভারেজের (১৫২৬-১৫৮২) কন্সটিটিউসনস অব দ্য সোসাইটি এবং ল্যাটিন ব্যাকরণ এবং ইত্যাদি সংগ্রহ করেন।
ইওরোপিয় বইগুলি করা সংগ্রহ ও উপহার দেওয়া ছাড়াও জেসুঈট ফাদারেরা তাঁকে খ্রিস্টের ফারসিতে লিখিত জীবনী এবং কিছু ধার্মিক পুস্তকও উপহার দ্যান। সাধারণভাবে আকবর বইগুলির প্রশংসা করেন এবং তিনি মাঝেমধ্যেই বইগুলি পড়িয়ে নিতেন।
“ফাদার পিগনেরিও আগরা অবস্থানকালে(১৬০২) ফ্রান্সিস জেভিয়ারও সেই সময় সেখানে ছিলেন, তিনি রাজাকে ফারসি ভাষায় লিখিত আমাদের উদ্ধারকারী জেসাসের জীবনী, বাণী ও অলৌকিক কাহিনী সমূহ উপহার দ্যান, যেটি স্বয়ং রাজা তার কাছে চেয়েছিলেন। তিনি বলেন, তিনি এইগুলিকে অত্যধিক গুরুত্ব দ্যান, এবং এই বইগুলি তিনি তার অন্যতম সঙ্গী ক্যাপ্টেন আজিসকোয়া(আজিজ কোকা)কে দিয়ে পড়াতেন এবং এই বইতে এতই মজে যান যে তিনি ফাদারকে আরও কিছু নকলের বরাত দ্যান এবং এই বিধর্মী এবং অনাচারীদের শেষ পর্যন্ত আমাদের ভগবান স্পর্শ করতে পেরেছেন এটা স্পষ্ট হয়ে যায়। এর পরে তিনি ফাদারকে এপোস্টেল কয়েকজনের জীবনী চেয়ে নেন।
অক্সফোর্ডের জর্জ র‍্যাঙ্কিং কলকাতায় বোর্ড অব এক্সজামিনার্সএর প্রাক্তন সেক্রেটারি ছিলেন। তাঁর কাছে এপস্টলদের জীবনীর ফারসি অনুবাদএর নকল ছিল। এই বইএর বিভিন্ন পাতায় মুহম্মদ আকবর পাদিশাহিগাজি ১০১৩ (১৬০৪ খ্রি)র পাঞ্জা ছাপ ছিল, যার অর্থ এই বইটি আকবরের রাষ্ট্রীয় গ্রন্থাগারের।
সম্রাট সুন্দর বাঁধাই এবং অসাধারণ অঙ্কনওয়ালা বই ভীষণ পছন্দ করতেন। তার গ্রন্থাগারের জন্যে আকবর যে রাজমনামা সংগ্রহ করেন তার খরচ সে যুগে ছিল ৪০ হাজার পাউন্ড! এই ধরণের একটি সংস্করণ জয়পুরের দরার গ্রন্থাগারে আছে। অসাধারণ রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষণার জন্য বহু সামান্য দক্ষ হস্তলেখবিদ এবং চিত্র শিল্পী আকবরের সময় প্রভূত গুরুত্বপুর্ণ কাজ করেন এবং বিখ্যাত হন।
(চলবে)

লাইব্রেরিজ এন্ড লাইব্রেরিয়ানশিপ ইন এনসিয়েন্ট এন্ড মেডিভ্যাল ইন্ডিয়া - বিমল কুমার দত্ত - মুঘলযুগে গ্রন্থাগার৪

(মহাভারতের ফার্সি অনুবাদ রাজমনামার দুটি পাতার ছবি দেওয়া গেল)
মুল সংস্কৃত এবং অন্যান্য ভাষায় লিখিত বহু পুঁথি পাদসাহের নির্দেশে ফারসিতে অনুদিত হয়। মহাভারত অনুবাদ করেন পার্সি বিদ্বান নাকিব খান, বাদাউনের মৌলানা আদুল কাদির এবং থানেশ্বরের শেখ সুলতান। ১০০০ শ্লোক অনুদিত হওয়া মহাভারতের নাম হয় রাজমনামা(ফেবু পাঠকদের কয়েক মাস আগে(২৯ মে তারিখের) বইটির কয়েকটি সংস্করণের কয়েকটি পাতার নকলসহ আমার রাজমনামার প্রকাশনাটা আরেকবার মনে করিয়ে দিই – রাজমনামা, আকবরের নির্দেশে মহাভারত অনুবাদ।। ১৫৮২ সালে মহাভারতের ফার্সি অনুবাদের নির্দেশনামা প্রকাশিত হয়। ১ লক্ষ শ্লোকের মহাভারতের ফার্সি অনুবাদের সময় ১৫৮৪-৮৬ সাল। এর নাম হল রাজমনামা বা যুদ্ধ-কাহিনী। আবুল ফজল রাজমনামার মুখবন্ধ রচনা করেন। জয়পুরের প্রাসাদের পুথিখানায় এইটির প্রথম অনুবাদটি পাওয়া গিয়েছে। এই নকলের ১১ নম্বর পাতায় আবুল ফজল বইটির অনুবাদের সাল লিখেছেন ১৫৮৮। ১৬৯ পাতার জয়পুর রাজমনামাটিতে দেখা যাচ্ছে দৌলতাবাদে তৈরি কাগজে অনুবাদ করেন খ্বাজা ইনায়েতুল্লা। আঁকিয়ের নাম প্রতি পাতায় উল্লিখিত হয়েছে। এই নকলের আঁকিয়ের নাম বাসাওয়াঁ, দাসোয়ান্থ এবং লাল (Basawan, Daswanth and Lal)। এটি ১৮৮৩ সালে জয়পুর প্রদর্শনীর T.H. Hendly book Memorialsএ প্রথম প্রকাশিত হয়। ১৫৯৮-৯৯তে দ্বিতীয় নকল হয়। আকবরের নির্দেশে। রাজপরিবারের সদস্যদের হিন্দুদের ভালভাবে জানতে উপহার দেওয়া হয়। এটি আগের তুলনায় অনেক বেশি বিশদে করা। আকবর যে শিল্পীদের পছন্দ করতেন, সেই বার্তা এই পুঁথির প্রতি পাতার ছত্রে ছত্রে ছড়িয়ে আছে। বদাউনি জানাচ্ছেন আকবর এটি তাঁর রাজত্বের প্রত্যেক আমীরকে সর্বশক্তিমানের ইচ্ছা হিসেবে দেখে পড়তে নির্দেশ দেন। আবুল ফজলের মতে এটির বিতরণ করা পুণ্যতম কর্ম রূপে পরিগণিত হত।) বা যুদ্ধের পুস্তক।
১৫৮৯ সালে বাদাউনি চার বছরের কঠোর পরিশ্রমে রামায়ন অনুবাদ করেন। হাজি ইব্রাহিম শিরহিদ অথর্ববেদ অনুবাদ করেন। অঙ্কের প্রাচীন পুস্তক লীলাবতী অনুবাদ করেন ফৈজী, প্রখ্যাত জ্যোতির্বিদ্যা বিষয়ক পুথি তাজাক অনুবাদ করেন গুজরাটের মোকম্মল খান, বাবরের তুর্ক ভাষায় রচিত স্মৃতিকথা ফারসিতে অনুবাদ করান মির্জা আবদুর রহিম খান, শাহবাদের মৌলানা শাহ মহম্মদ কাশ্মীরের ইতিহাস অনুবাদ করান, আরবিতে লিখিত শহর এবং দেশের পরিচিতি সংগ্রহ মুয়াজ্জমআলবুলদান নানান বিদ্বানদ্বারা অনুদিত হয়।
যে উদাহরণগুলি আপনাদের দিলাম তাতে পরিষ্কার, আকবরের রাজত্বে একটা অনুবাদের দপ্তর তৈরি হয় এবং এই বিভাগ প্রচুর গুরুত্বপূর্ণ পুথি অনুবাদ করায় এবং রাষ্ট্রীয় গ্রন্থাগারে রাখতে শুরু করে।
রাষ্ট্রীয় এবং সম্রাটের ব্যক্তিগত গ্রন্থাগারে প্রচুর মৌলিক পুথিও ছিল। গাজালি, ফৈজী, নিসাপুরের মহম্মদ হুসেন নাজিরি, সঈয়দ জামালুদ্দিন, শিরাজুর উর্ফি ইত্যাদির লিখিত পুস্তকও ছিল। এক ব্যতিক্রমী জেসুইট জেরোম জেভিয়ার খ্রিষ্টিয় ধর্ম এবং দর্শন বিষয়ে বহু ফারসি বই আকবর এবং জাহাঙ্গিরকে উপহার দেন।
বইগুলির উতকর্ষ বাড়াতে আকবর হস্তলিখন এবং পুস্তক চিত্রণ ইত্যাদি গুরুত্ব দিতে থাকেন। অসাধারণ হস্তাক্ষরে লিখিত এবং অসামান্য চিত্রণে চিত্রিত বই তিনি ভালবাসতেন। তাঁর সময়ে লিখিত আইনি আকবরী আটটি সুলস, তাউলি, মুকাহকক, নকশ, রাইহান, রিকা, ঘুবার এবং তালিক নামক আলাদা আলাদা হস্তাক্ষরে লিখিত সংস্করণ হয়। আকবর নিজে নাস্তালিক নামক হস্তাক্ষরের দিওয়ানা ছিলেন এবং এই হস্তাক্ষরের প্রখ্যাত লিখনবিদ কাশ্মীরের মুহম্মদ হুসেইনকে তিনি জারিন-কলম অর্থাৎ সোনালি-কলম উপাধি দান করেন। সে সময়টি যেহেতু হস্তাক্ষর আর পুস্তকের অঙ্গসজ্জার অসামান্য নজির সৃষ্টি করেছিল এই উপমহাদেশ, তাই তাঁকে প্রথম জেসুঈট মিশন ছাপা বই উপহার দিলেও সেদিকে যেতে তিনি এবং তাঁর উত্তরাধিকারীরা খুব একটা উৎসাহ বোধ করেন নি। তবে আকবর ইতালির উরবিনোর ডিউক ফেডেরিগো/ফেডেরিকোর মত এক্কেবারে ছাপা অক্ষর বিরোধী ছিলেন না।
(চলবে)

লাইব্রেরিজ এন্ড লাইব্রেরিয়ানশিপ ইন এনসিয়েন্ট এন্ড মেডিভ্যাল ইন্ডিয়া - বিমল কুমার দত্ত - মুঘলযুগে গ্রন্থাগার৩

স্বশিক্ষিত আকবর পাদশা ছিলেন সাহিত্যানুরাগী এবং জ্ঞানার্জনে অদম্য উৎসাহী। তিনি তার জীবনের যাত্রাপথে নিজেকে শুদ্ধ করেছেন এবং অপরের প্রতি সহিষ্ণুতার দর্শন তৈরি করেছেন এবং সত্যিকারের বৌদ্ধিক উৎসাহ তৈরিতে সাহায্য করেছেন। তুজুকইজাহাঙ্গিরিতে পড়ছি “আমার পিতা(আকবর) হিন্দুস্থানের সব ধরণের জ্ঞানী ব্যক্তির বিশেষ করে পণ্ডিত এবং বৌদ্ধিকদের সঙ্গে সঙ্গ করেছেন। তিনি অক্ষরজ্ঞানহীন হলেও সারাক্ষণ তিনি জ্ঞানী এবং বিদ্যোৎসাহীদের সঙ্গ করতেন। তাঁর ভাষা এতই প্রমিত ছিল যে তাঁর সঙ্গে আলাপ করা একজনও মানুষ আন্দাজ করতে পারত না যে তিনি অশিক্ষিত। তিনি কবিতা আর গদ্যের নান্দনিকতা এই ভাল বুঝতেন যে তার থেকে আর কেউ এই বিষয়টি ভাল বুঝত না”। পুত্রের কলম থেকে উৎসারিত এই বাক্য থেকে পরিষ্কার তার শৈল্পিক মনের প্রকাশ এবং জ্ঞানার্জনের জন্যে আকাঙ্ক্ষিত পরম উৎসাহের বিষয়টি।
আলোচনা বা কথোপকথনেই যে তার গভীর মানসিকতা বোঝা যেত তাই নয়, তিনি বিপুল বড় এবং বৈচিত্র্যময় গ্রন্থাগারও তৈরি করে তাকে রোজ পুঁথিগুলি পড়ে বুঝিয়ে দেওয়ার জন্যে করণিক নিয়োগ করেছিলেন। এই প্রসঙ্গে আবুল ফজল আল্লামি লিখছেন, “মহামহিমের গ্রন্থাগার নানান অংশে বিভক্ত ছিল। কিছু অংশে বই থাকত আর কিছু অংশ ফাঁকা। হারেমে তিনি রোজ একটি করে প্রত্যেকটি বই আদ্যোপান্ত পড়াতেন। বইএর মাঝখানে রোজের পড়া বন্ধ হলে তিনি তার ব্যক্তিগত কলম দিয়ে তাঁর মত করে নির্দিষ্ট পাতায় দাগ চিহ্ন রাখতেন; এবং পড়ুয়া যতটা পাতা পড়ত তিনি তাঁকে ততখানি সোনা বা রূপার মুদ্রা দিতেন। তাঁর সময়ের প্রায় প্রত্যেকটি প্রখ্যাত বইই তিনি পড়েছেন, অতীতের কোন ঐতিহাসিক সত্য বা বিজ্ঞানের সূত্র বা দর্শনের আত্মকথা তার অজানা ছিল না, যা একজন জ্ঞানী ব্যক্তির কণ্ঠস্থ ছিল। একটি বই বার বার পড়ায়তেও তাঁর কোনও ক্লান্তি ছিল না, যেন প্রত্যেকবার আরও মন দিয়ে সেটি শুনতেন”। এইভাবে আকবর বিভিন্ন দার্শনিক ধারণা, সাহিত্যিক চলন এবং ঐতিহাসিক তথ্যের বিষয়ে অবগত থাকতেন।
তার বাবার থকে উত্তরাধিকার সূত্রে যে গ্রন্থাগার তিনি পেয়েছিলেন সেটিকে তিনি তাঁর বইএর প্রতি অসীম ভালবাসা দিয়ে বিপুলাকার চেহারা দিয়েছিলেন। পুঁথিগুলি এসেছিল মূলত ব্যক্তিগত সংগ্রহ এবং গুজরাট, জৌনপুর, কাশ্মীর, বাংলা এবং দাক্ষিণাত্যের নানান গ্রন্থাগার এছাড়াও দরবারের নানান অভিজাত এবং আমলার সংগ্রহ থেকে। এছাড়াও নতুন পুঁথি লেখানো, পুরোনোগুলি সম্পাদনা এবং অনুবাদও করানো হত।
ফৈজীর ব্যক্তিগত সংগ্রহে মোটামুটি ৪৩০০ পুঁথি ছিল। তাঁর মৃত্যুর পরে এই বিপুল সংগ্রহ চলে যায় রাষ্ট্রীয় গ্রন্থাগারে এবং সেখানে প্রত্যেক পুঁথিতে সংগ্রহ ও পরিচিতি চিহ্ন দেওয়া হয়। ফৈজীর সংগ্রহকে তিনটিভাগে ভাগ করা হয় এবং প্রত্যেকটির বেশ কয়েকটা নকলও ছিল। যেমন নল দমন পুঁথি ছিল ১০০টা।
গুজরাট অভিযানে ইতিমদ খানের গ্রন্থাগার আকবর দখল করে নিয়ে এসে এটিকে রাষ্ট্রীয় গ্রন্থাগারে জুড়ে দেন। যখন গুজরাট সম্পূর্ণভাবে দখল হল এবং মির্জা খান খানান দরতবারে নতুন করে যোগ দিলেন আকবরের ৩৪ তম রাজত্ব বছরে, তিনি পাদশাহকে তার ব্যক্তিগত সংগ্রহের বাবরের পারসি ভাষায় লিখিত চাঘতাইস্মৃতি বা ওয়াকিয়াতিবাবরএর অনুবাদ উপহার দেন।
(চলবে)

লাইব্রেরিজ এন্ড লাইব্রেরিয়ানশিপ ইন এনসিয়েন্ট এন্ড মেডিভ্যাল ইন্ডিয়া - বিমল কুমার দত্ত - মুঘলযুগে গ্রন্থাগার২

পিতৃসূত্রে গাজিখানের গ্রন্থাগার থেকে পাওয়া বইএর চর্চার সঙ্গে গ্রন্থাগার তৈরি বা সময় কাটানোর যে নেশা বাবরের ছিল সেটিও তিনি লালনপালন করেছেন আমৃত্যু। এমন কি যুদ্ধক্ষেত্রেও কিছু পছন্দিদা বই তিনি সঙ্গে নিয়ে যেতেন। বাংলা এবং গুজরাট অভিযানে তিনি এই ধরণের গ্রন্থাগার সঙ্গে নিয়েছিলেন। শের শাহের কাছে হেরে যখন তিনি ক্যাম্বেতে থানা গেড়েছেন, সেখানেও তার সঙ্গে বইএর ভাণ্ডার এবং একজন গ্রন্থাগারিক ছিল। পালিয়ে বেড়াবার সময় কোলি আদবাসীরা আক্রমন করে তাঁবু লুঠ করে যে সব সম্পদ নিয়ে যায় তার সঙ্গে তৈমুরলঙ্গের ইতিহাসটাও ছিল বলে ইতিহাস জানিয়েছে। এই ঘটনার সত্যতা পরে আবুল ফজলেরও লেখায় পাই “বহু প্রাচীন বই তার আমৃত্যু সঙ্গী ছিল এবং তার প্রচুর ব্যক্তিগত সংগ্রহ (এই আক্রমনে) নষ্ট হয়ে যায়। এগুলোর মধ্যে তৈমুরনামা অন্যতম। এটি মুল্লা সুলতান আলির অনুবাদ এবং উস্তাদ বিহজাতের হাতে চিত্রিত এবং এটি এখন শাহেনশাহের গ্রন্থাগারে রয়েছে।”
গ্রন্থাগার স্থাপনের বাদশার উৎসাহ আমরা বুঝতে পারি এই ঘটনায় – তার মৃত্যুর কিছু দিন আগেই পুরাতন দিল্লির একটি বিলাস ভবনকে তিনি গ্রন্থাগারে রূপায়িত করেন। এই বাড়িটি ১৫৪১ সালে শেরশাহ তৈরি করেন এবং এটির নাম দেন শের মণ্ডল। লালা বেগ বা বাজ বাহাদুরের পিতা নিজাম তার অন্যতম গ্রন্থাগারিক ছিলেন।
আগ্ররায় হুমায়ুন একটি মনোহরা প্রাসাদ, খানাইতিলিসিম তৈরি করেন। এই প্রাসাদের মুল কাঠামোয় তিনটির মধ্যে মধ্যেরটি একটি আটটকোণা বাড়ি ছিল তার নাম খানাওইসাদাত। এর ওপরের ছাদে ছিল একটি গ্রন্থাগার, একটি নামাজের গালিচা(জাই নামাজ), পুঁথির তাক, সোনার জলে চোবানো কলম দানি (কলমদান), পোর্টফোলিও(জুজদান), চিত্রিত পুঁথি, এবং হস্তলিপির বিপুল সম্ভার ছিল।
মৃত্যূর ঘটনাও জড়িয়ে আছে তাঁর প্রিয় গ্রন্থাগারের সঙ্গে। পুরাণা কিলার গ্রন্থাগারের সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়ে আহত হয়ে ১৫৫৬ সালের ২৫ জানুয়ারি রবিবার সূর্যাস্তের সময় মারা যান। তার জীবনের বৃহদংশ কেটেছে পালিয়ে বেড়িয়ে বা প্রবাসে বা উপমহাদেশে যুদ্ধবিগ্রহে। তার মধ্যেও গ্রন্থাগার তৈরি অথবা বইএর প্রতি ভালবাসা থেকে সারাজীবন নানান শৈল্পিক কর্মকাণ্ডতে তিনি জড়িয়ে থেকেছেন।
বাবরের মৃত্যুর পর হুমায়ুন এবং হুমায়ুনের মৃত্যুর পর সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হলেন আকবর, মোঘল বংশে সর্বশ্রেষ্ঠ পাদশা। ১৫৫৬ সালের ৫ নভেম্বরের পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধে আফগানদের পরাজিত করে তাঁর দীর্ঘ সময়ের শাসক জীবন শুরু করেন এবং মুঘল সাম্রাজ্যের সত্যকারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।
প্রথম জীবন তিনি তার অভিভাবক বৈরাম খাঁ এবং অন্দমহলের মহিলাদের অধীনেই কাটিয়েছেন। ১৫৬১তে বৈরাম খাঁর এবং ১৫৬২তে তাঁর মায়ের মৃত্যুতে তিনি প্রায় দীর্ঘ পঞ্চাশ বছর ধরে ১৬০৫ সাল পর্যন্ত উপমহাদেশ শাসন করবেন। তিনি আলেজান্ডারের মত নির্ভয় হৃদয় নিয়ে সমগ্রে উত্তরাপথ জয় করে যুদ্ধ-বিগ্রহে দীর্ণ দেশকে শান্তি দান করবেন। তাঁর রাজত্বে তিনি যে সব রেণু সমন্বয় করে আর্থ সামাজিক পরিবর্তন আনেন, তার মধ্যে ছিল শিল্প, সাহিত্য, চিত্রকলা, হস্তলিপি, বইচিত্রণ, অন্য ভাষা থেকে পুঁথি অনুবাদ, গ্রন্থাগার নির্মান ইত্যাদি। যার কারণে সে সময়ে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রীয় গ্রন্থাগার হিসেবে তাঁর প্রতিষ্ঠিত গ্রন্থাগারটি বিবেচিত হত এবং সারা উপমহাদেশজুড়ে যত শিক্ষাকেন্দ্র স্থাপিত হয়েছে, সব ক’টিতে তিনি গ্রন্থাগার তৈরি করার নির্দেশ দেন।
(চলবে)

লাইব্রেরিজ এন্ড লাইব্রেরিয়ানশিপ ইন এনসিয়েন্ট এন্ড মেডিভ্যাল ইন্ডিয়া - বিমল কুমার দত্ত - মুঘলযুগে গ্রন্থাগার১

তৈমুর বংশধরদের কৃষ্টির ইতিহাসের গোড়াপত্তন ঘটেছিল তুর্কো-আফগান সময়ে। তৈমুরী বংশধরেদের প্রত্যেকেই জ্ঞানচর্চার ধারক বাহক ছিলেন। ঔরঙ্গজেবের সময় বাদ দিলে প্রত্যেক শাসকই শিল্পকলা, সাহিত্য ও সঙ্গীতের বিকাশে বিপুল সহযোগিতা করেছেন। বই প্রকাশনায় এবং গ্রন্থাগার তৈরি করতে তাঁদের অবদান সুপ্রচুর।
জাহিরুদ্দিন মুহম্মদ বাবর ছিলেন জ্ঞানী, বিদ্বান এবং সাহিত্যসাধক। ব্যবহারশাস্ত্র এবং ছন্দ ইত্যাদি নিয়ে তাঁর বেশ কিছু কিতাবও রয়েছে। লিপিবিদ্যার তিনি গুণগ্রাহী ছিলেন বাবরি লিপি নামক একটি নতুন ধরণের লিপি আবিষ্কর্তা তিনি।
বাবর কিতাবের গুণগ্রাহী ছিলেন এবং তাঁর গ্রন্থাগার তৈরিতে মন দেন। ১৫২৫ সালে তিনি গাজি খানের গ্রন্থাগার অধিকার করেছিলেন এই আশায় যে সেখানে তিনি তার মনের খোরাক পাবেন, কিন্তু তিনি লেখেন “আমি যা ভেবেছিলাম তা পেলাম না”। সেই গ্রন্থাগার থেকে বেশ কিছু বই তিনি হুমায়ুন আর কামরনকে উপহার দেন।
বাবর যে সব শিক্ষিত এবং বিদ্বানদের পৃষ্ঠপোষণা করতেন, তাঁদের মধ্যে খ্বোয়ান্দামীর ছিলেন অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব। তিনি হিরাটের গ্রন্থাগারিক ছিলেন এবং পদশাহের সঙ্গে বাংলা অভিযানেও অংশ নেন।
তাঁর নির্দেশে সুরতেআম বা জন কৃত্য দপ্তর বহু মক্তব(বিদ্যালয়) এবং মাদ্রাসা(উচ্চশিক্ষা কেন্দ্র) তৈরি করে দেয়। প্রত্যেক মাদ্রাসার সঙ্গে আবশ্যিকভাবে একটি গ্রন্থাগার রাখতে হত।
বাবর তাঁর ব্যক্তিগত গ্রন্থাগার ছাড়াও রাষ্ট্রীয় গ্রন্থাগার তৈরি করেন। তিনি ব্যক্তিগত গ্রন্থাগারে চিত্রবিচিত বই নিয়ে প্রচুর সময় কাটাতেন এবং আয়েশ করতেন। তিনি পুঁথি চিত্রণে প্রচুর উৎসাহ দান করেছেন এবং তাঁর পুত্র এবং নাতি-পুতিরা এই বিষয়টিকে মহীরুহের আকার ধারণ করান।
বাবরের জৈষ্ঠ পুত্র হুমায়ুন সিংহাসনে আরোহন করেন ১৫৩০ সনে। তিনি পরিবারিক ঐতিহ্যের রেণুগুলি বংশের ঐতিহ্য সূত্রে অর্জন করেন। পিতার মতই তিনি শিক্ষা বিষয়ে উৎসাহী ছিলেন বিশেষ করে শিল্পকলা এবং বিজ্ঞান-প্রযুক্তিতে তাঁর উৎসাহ অসীম ছিল। পারস্যে তিনি প্রবাস জীবন কাটানোর সময় শাহ তামাসপাসের রাজ দরবারে সাহিত্য এবং শিল্পকলা চর্চায় প্রভূত প্রভাব ফেলেন। মৌলউপাদানগুলির(এলিমেন্ট) চরিত্র নিয়ে বই লেখা ছাড়াও তিনি ভূগোল এবং জ্যোতির্বিদ্যা নিয়েও পুঁথি রচনা করেন। তাঁর অন্য উৎসাহের বিষয়গুলি ছিল সাহিত্য এবং শায়েরি। তিনি পূর্বজদের মতই গুণিজনদের কদর এবং আদর করতেন আর প্রচুর সময় এই বিষয়গুলি নিয়ে কবি আর দার্শনিকদের সঙ্গে আলোচনায় সময় কাটাতেন। ফরিস্তা সূত্রে জানতে পারছি, সাত গ্রহের নামে সাতটি বিশাল কক্ষ তৈরি করেছিলেন তিনি। শণি এবং বৃহস্পতি নামাঙ্কিত ঘরে তিনি হিরাটের গ্রন্থাগারিক খান্দামীর, লেখক জওহর, তুর্ক বিদ্বান এবং নৌ সেনা নায়ক সিদ্দি আলি রঈস ইত্যাদিদের সঙ্গে মিলিত হতেন। রঈস তার যাত্রার দিনপঞ্জীতে লিখছেন, ... আমি রাতদিন এক করে জ্যোতির্বিদ্যা বিষয়ক নীরিক্ষণ লেখা শেষ করলাম... সেটি শিল্পকলা এবং শায়েরির বিকাশের সময় ছিল এবং আমাকে প্রায়শই পাদশার সঙ্গ দিতে হত।
(চলবে)