Showing posts with label ধংস-লুঠের বয়ান. Show all posts
Showing posts with label ধংস-লুঠের বয়ান. Show all posts

Thursday, July 4, 2013

লুঠ শাসনের সম্পদ১৩ - ঘুষের লুঠের নভেলা, Loot of British Raj13 - Novella of Bribe & Loot

হেস্টিংসের দুই রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী জেনারেল ক্লেভারিং আর ফিলিপ ফ্রান্সিস বিলেত থেকে এলেন চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের নিদান দিতে প্রথম সুযোগেই হেস্টিংসের দুই লুঠেরা হাত, কান্তবাবু আর গঙ্গাগোবিন্দ সিংহের বড়লোকিতে কাতর মহারাজা নবকৃষ্ণ, সাহেবদের সামনে ঠুকে দিলেন এক পত্র বোমা। এই চিঠির ছত্রে ছত্রে প্রকাশ পেয়েছে, ব্রিটিশ প্রভু হেস্টিংস এবং বাংলা সুবার জমিদার, তালুকদার, বড়ও চাষী সাঙ্গপাঙ্গদের ডান হাতে, বাঁ হাতে, চোখের চামড়া না ফেলে ঘুষ নেওয়ার অসামান্য দক্ষতার বর্ণনা। লেখা হয়েছে নজর(উপহার), দামী মনিমুক্তো, অলঙ্কার, পরিধেয়র সঙ্গে নানান আনুষঙ্গিক দ্রব্য ছাড়াও দেওয়া হয়েছে অজস্র অর্থ। চিঠিতে লেখা অর্থের পরিমানে চোখ কপাল ছাড়িয়ে চাঁদিতে ওঠার উপক্রম। এরও প্রায় অর্ধ শতাব্দী পরে, ১৮২০র মাগ্যি-গণ্ডার কলকাতায় ২ টাকা রোজগার করে ঠাকুরদাস মেদিনীপুরে মাকে টাকা পাঠাবার মত সচ্ছল হয়ে উঠেছিলেন। চিঠিতে লেখা হচ্ছে An account of the money received by Governor Hastings and other gentlemen from the Zaminders, Talookdars and Farmers of the subah of Bengal from his accession to the government till the arrival of the General(Clavering) and other gentlemen; exclusive of Nuzzers(presents), pearls, Jewels, Cloths and complementary presents…
Dacca                                                                                  Rs.
Ready money                                                                5,00,000
Mr.Barwell                                                                   4,00,000
Rungpore etc                                                                        
Ready money                                                               1,00,000
Promisery                                                                    1,00,000
Moorshidabad-Exclusive of MrMiddleton                   3,00,000
Dinagepore                                                                  2,00,000
Boglepore                                                                    2,00,000
Beerbhum, Bishnupur etc.,                                            1,50,000
Midnapore
Mr.Vansitart and other Gentlemen                                3,50,000
Raja Kissenchand                                                        1,50,000
Burdwan-Exclusive of Mr. Chas Stewart
Through Diwan Brojkishore                                         2,00,000
Phoolbundy                                                                 1,50,000
Mundalghat salt contract                                              1,50,000
Hooghly, Hijli etc.
Ready Money                                                               1,00,000
Settlement for salt                                                         6,00,000
Jessore etc.,
On account of sault of Raymangal etc.,                         2,00,000
Farmers of 24 praganas                                               0,50,000
From Raja Huzuri Mul and Madan Duttfor relinquishing the farm of
Poornea                                                                               1,00,000
Profit of Butta, premium of bills from Raja Huzuri Mal & Doyalchand     1,50,000
From servants wages                                                               1,00,000
Total                                                                                   42,00,000
Governor Hastings received from Nawab Shuja-ud-Daula & others without participation as follows –
From Nawab Mubarak-ud-Daula through Munny Begam          
Munny Begam                                                              2,00,000
From the sets                                                               50,000
Raja Rajbullav                                                              1,00,000
From the Zamindari of Rani Bhowani                            1,25,000
From Nawab Shuja-ud-Daula in cash                           5,00,000
Promisory                                                                    5,00,000
From the raja of Benaras in cash                                  2,00,000
Promisory                                                                   1,00,000
                                                                                  17,75,000
Mr George Vansittart without participation –
From Shuja-ud-Daula                                                 2,00,000
From the raja of Benaras                                            1,00,000
                                                                                  62,75,000
(সূত্রঃ রজতকান্ত রায়, পালাশির ষড়যন্ত্র ও সেকালের সমাজ)

মীর কাসীম পুস্তকে অক্ষয় কুমার মৈত্রেয় বিচারের হিসেব তুলে বলছেন পলাশির পর কোন কোন আমলা কীভাবে পুরস্কৃত হলেন
Mr. Drake                                    280,000                                280,000
Col. Clive
                   As a member            280,000
                   As a commander        200,000
                   As a donation            1600,000                              2080,000
Mr. Watts
                   As a member            240,000
                   As a donation            800,000                                1040,000

Major Kil Patrik
                   As a member            240,000
                   As a donation            300,000                                540,000
Mr. Manningham                          240,000                                240,000
                             Mr. Beecher    240,000                                240,000
Six members of council 1 Lakh each    600,000
Mr. Walsh                                    500,000
Mr. Scraftom                                200,000
Mr. Lushington                              500,000                               
Cap. Grant                                   100,000
Army & Navy                       600,000                                      
ঐ পুস্তকেই বলা হচ্ছে, ১৭৬০ খৃষ্টাব্দের ১৫ই সেপ্টেম্বর কলিকাতায় এই ইতিহাস-বিখ্যাত গুপ্ত-দরবারে অধিবেশন হয়. তাহাতে ভ্যান্সিস্টার্ট সভাপতি এবং কর্ণেল কেলড, সমনার, হলওয়েল এবং ম্যাগুয়ার সদস্য স্বরূপ উপস্থিত ছিলেন. ...এই গুপ্তসন্দর্শন শেষ হইলে ... মীর কাসিমের পক্ষাবলম্বন করাই স্থির হইল। কৃতজ্ঞ মীর কাসিম সকলকেই যথাযোগ্য পুরস্কার বিতরণে সম্মত হইয়া ছিলেন,
Resolution in favour of Cassim 1760(in pound)
Mr. Summer                                 28000
Mr. Hallwell                                  30000
Mr. M’c Guire                               20635
Mr. Smirh                                      15354
Major York                                   do
Gen. Caillaud                               22916
Mr. Vansistart                              58333
ওপরের তালিকাটি পলাশি উত্তর কয়েক দশকের মধ্যে বাঙলার একটিমাত্র প্রান্তে দেওয়া ঘুষের অংকটি বাঙলা সুবা থেকে ইংরেজদের ওপর মহলের ঘুষ আদায়ের গা ছমছমে উপন্যাস না হলেও নভেলাতো বটেই এই লুঠ(কু)কর্মটি পরবর্তী দেড় শতাব্দকালে ক্রমশঃ ক্রমশঃ আকাশ ছোঁবে কত সম্পদ ইংলন্ডে ঘুষ বাবদ গিয়েছে যদিও তা হিসাব করা অসম্ভব, তবুও এই পরিমান আঁকতে পারলে সভ্যতার রঙিন মুখোশপরা ইংরেজদের সরাসরি নগ্ন করে দাঁড় করয়ে দিতেপারে খোলা বাজারে ঐতিহাসিকদের সাফাই, উচ্চপদস্থ আমলারা মাঝের অথবা নিচের তলার কর্মচারীদেরমত সরাসরি ঘুষের টাকাটা নিতেন না তাঁরা ক্লাইভ, হেস্টিংস, পিটদের ঘুষের রোজগার দেখতে পাননি রাণী ভবানী শুধু হেস্টিংসকে সরাসরি দিয়েছেন সে যুগের ১,২৫,০০০ টাকা ঘুষ, মির জাফরের বিধবা মুন্নি বেগম ক্লাইভকে দিয়েছে সে যুগে ৫ লক্ষ টাকা এ চোখে দেখা হাতে লেখা হতিহাস এর বাইরে! যদি চোখ বুজেই ধরেই নেওয়া যায় যে, প্রাগুক্ত প্রবক্তাদের কথাই বেদবাক্য, তাহলে বামহস্তক্রিয়ার শেকড় চারিয়ে যায় অনেক নিচ পর্যন্ত এঁদের দাবি অনুযায়ী যারা মহামহিম কোম্পানির বড় আমলাদের জন্য হাতে হাতে অর্থ নেওয়ার বামহস্তক্রিয়ায় জড়িয়ে থাকতেন, সেই মাঝারিতলার না দেখতে পাওয়া মুখেদের, বাম হাতের রোজগার বড় কম ছিল না বোধহয় বড়, মাঝারি আর ছোট রুইকাতলাদের সঙ্গে পুঁটিমাছেদের সরকারি-বেসরকারি ঘুষ প্রাপ্তিযোগ জুড়লে লুঠের বখরার টাকা আজকের অর্থেরমানে আকাশ ছাড়িয়ে যাবার আশংকা থাকে
বাঙলা সুবা জুড়ে তখন ঘুষের আর লুঠের রাজত্ব সূর্যাস্ত আইনে জমিদারি বাঁচাতে রাণী ভবানী হেস্টিংসকে ১,২৫,০০০টাকা ঘুষ দিয়েও পার পেলেন না সদাশয় পালক ইংরেজ বাহাদুরকে বাংলা জানালেন ১১৭৯ আর ১১৮০তে নিজের জমিদারি ইজারা নিতে সেলামি দিতে হয়েছে ৪,৪০,০০১ টাকা মাত্র মুরলী পোদ্দার, সদানন্দ পোদ্দার আর হটু বিশ্বাসের হাত দিয়ে হেস্টিংসের দেওয়ান কান্তবাবু সরাসরি নিয়েছেন ১,২৫,০০০টাকা যুগল উকিল, রূপ পোদ্দার আর মুরলী পোদ্দারের হাত দিয়ে আর প্রায় মরতে বসা জগতশেঠের কুঠির মাধ্যমে শান্তিরাম সিংহ(ইনিই কী কালিপ্রসন্ন সিংহর পিতা এবং জোড়াসাঁকো সিংহ পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা?) ২ লক্ষ টাকা রোজগার করেছেন এর মধ্যে এক লক্ষ টাকা রাজবাড়ি আর শেঠভবনে গয়নাগাটি বেচে জোগাড় করতে হয়েছে এ ছাড়াও যে তৃতীয় ব্যক্তিটি প্রণামী পেয়েছেন তার নাম ভবানী মিত্র নয়ান পোদ্দার, মুরলী পোদ্দার, রামকৃষ্ণ পোদ্দার, অখিল পোদ্দার, সদানন্দ, আনন্দরাম উকিল, পরীক্ষিত মোরারের হাতে হাতে এবং আনন্দরাম উকিলের মধ্যস্থতায় মোতিচাঁদ শেঠের পাট ও দর্পনারায়ণ(ঠাকুর!) উকিলের মাধ্যমে পরগণা নুরুল্লাপুরের উপর ঢাকায় প্রদেয় পাট মার্ফত মোট ৩,৭৫,৪৫২ টাকা পেয়েছেন এতসব ঘুষঘাস দিয়েও শেষ পর্যন্ত রাণীর হারবন্দ পরগণা হেস্টিংসের বেনিয়ান কান্তবাবুর পুত্র লোকনাথ নন্দীর গ্রাসে পতিত হয় কান্তবাবুর স্বজাতি দেওয়ান দয়ারাম রায়ও রাণীকে বন্ধকীমহলের ওপর ধার দিয়ে জমিদারির একঅংশ দখল করে নাটোরের পাশে দীঘাপাতিয়া জমিদার রাজ সৃষ্টি করলেন(রানী ভবানী, যিনি সরাসরি না হলেও সিরাজ হত্যা এবং পলাশীর ষড়যন্ত্রের অন্যতম অংশী, প্রায়শ্চিত্ত করলেন নিজেকে নিঃস্ব করে আর ছিয়াত্তরের মন্বন্তরে নিজের জমিদারির সব উজাড় করে দিয়ে, ব্রিটিশ গণহত্যার মুখে পড়া বাংলার  মানুষকে খাইয়ে) ) ১৭৮১তে উত্তর স্বরূপপুর নামক বিরাট পরগণা কলকাতার বেনিয়ান দর্পনারায়ণ ঠাকুরকে বেচে দেওয়া হয় সমগ্র বাঙলার শ্রদ্ধা অর্জণকরা নাটোরের রাণী ভবানীরমত বাঙলা সুবাতে একডাকে চেনা এক জমিদারিতেই ইংরেজরা যদি এই ঘুষের রাজত্বের লুঠতরাজ চালাতে পারে, তাহলে বাঙলা থেকে শুধুমাত্র কত ঘুষের টাকা ব্রিটেনে গিয়েছে তা আদপেই অংক কষার বাইরে
ভারত থেকে রপ্তানি হওয়া, আরও গভীরভাবে বললে, বাঙলা সুবা থেকে বছরে বছরে লুঠ হয়ে যাওয়া অর্থে আর প্রযুক্তিতেই ব্রিটেনের মানুষমারা, পৃথিবী ধংসকারী শিল্পবিপ্লবের ভিত গড়ে ওঠে এর সঙ্গে ঢাকের বাঁয়া হিসেবে যোগদেয় ওয়েস্ট ইন্ডিজের দাস ব্যবসা ভিত্তিক চিনি(আখ)র ব্যবসা আর আফ্রিকা থেকে লুঠ করে আনা দাস ব্যবসার উদ্বৃত্ত ইংলন্ডের মূলধন নানান ইওরোপিয় দেশে বিনিয়োগ হত ১৮১৫ থেকে ১৮৩০ পর্যন্ত ইওরোপিয় রাষ্ট্রগুলির সরকারি সিকিউরিটিতে প্রায় ৫ কোটি ব্রিটিশ পাউন্ড স্টার্লিং মূলধন নিযুক্ত হয় লাতিন আমেরিকায় ২ কোটি পাউন্ড আর আমেরিকায় প্রায় ১ কোটি পাউন্ড নিবেশিত হয় এইসব উদ্বৃত্ত জমা হয়ে ইংলন্ডের শিল্পজাত দ্রব্যের বিকাশ হতে থাকে বছরের পর বছর
এ প্রসঙ্গে ১৯১৩কে ভিত্তিবর্ষ ধরে ব্রিটেনের ঐ সময়ের জিডিপির ইতিবৃত্ত ১৭২০-২১ ২.১, ১৭৬০-৬১ ২.৬, ১৭৭০-৭১ ৩.৩, ১৭৮০-৮১ ৩.৫, ১৭৯০-৯১ ৪.৬, ১৮০০-০১ ৫.৭, ১৮১০-১১ ৭.১, ১৮২০-২১ ৯.৭, ১৮৩০-৩১ ১৮.৩, ১৮৪০-৪১ ১৯.৬ লক্ষ্য করার বিষয় ১৮০০র পর থেকে ব্রিটেনের জিডিপি ৫ ছাড়িয়ে উর্ধমুখী ১৮৩০এর পর লাফিয়ে লাফিয়ে দুই অংক ছাড়িয়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে কুড়ির ঘরে প্রবেশ করেছে তবুও মার্শাল আর আর তার পূর্বসূরীদের পথ বেয়ে বলতেই হবে বাঙলা লুঠের অর্থে ইংরেজদের শিল্পবিপ্লবসাধন একটি অতিকথামাত্র, এর মধ্যে বিন্দুমাত্র সত্যতা নেই বললেই চলে এর পাশাপাশি বাঙলা থেকে শিল্পজাত পণ্যদ্রব্য ও কাঁচামাল আমদানি রপ্তানির হিসেবটুকু দেওয়া যাক
                               ১৮৭০                  ১৮৯২                       ১৯০৭
শিল্পজাত পণ্যদ্রব্য        
টাকার হিসাব              
আমদানি                    ২৫৯,৮৬৫,৮৭২      ৩৬২,২৩১,৮২৭           ৬৯৮,৮৯৫,০০০
রপ্তানি                        ৫২,৭৮০,৩৪০        ১৬৪,২৪৭,৫৬৬            ৩৯২,৯৮১,০০০

কাঁচামাল
টাকার হিসাব              
আমদানি                    ১৩৭,৫৫৫,৮৩৭      ২৬৩,৮১৮,৪৩১           ৫৯৯,৬৬৮,৩৭৪
রপ্তানি                        ৫৯৬,৭২৭,৯৯১        ৮৫৫,২০৯,৪৯৯           ১,১৪১,২৩১,৩৩৫

লুঠ শাসনের সম্পদ১২ - বন্ধু ভাগ্যে ব্যবসা, Loot of British Raj12 - Helping Friends to Business

সোরার ব্যবসা থেকে পঞ্চাশ হাজার টাকা আসছে অথচ এক টাকাও দাদন দিতে হচ্ছেনা কাঠের ব্যবসায়ও একই অবস্থা শুধু রেশমের ব্যবসায় অগ্রিম দিতে হচ্ছে সরকারি প্রভাব খাটিয়ে এই তিন ব্যবসায় লাভ হচ্ছে বছরে আড়াই লাখ টাকা (হেস্টিংসের বন্ধু-ব্যবসায়ীদের ক্লাব বোর্ড অব ট্রেডএর প্রভাবশালী বন্ধু বারওয়েলের বাবাকে লেখা চিঠি, সূত্রঃ রজতকান্ত রায়, পালাশির ষড়যন্ত্র ও সেকালের সমাজ) 
ব্যবসার নামে লুঠ ছাড়াও সরকারের সঙ্গে লাভের চুক্তিতে ব্যক্তি ইংরেজরা রোজগার করত বাঙালা সুবায় ব্যবসার আধিপত্য চালাবার জন্য বোর্ড অব ট্রেড তৈরি করেছিলেন হেস্টিংস সদস্যরা নিজেদের মধ্যে গোপন চুক্তি করত, উত্পাদকদের সঙ্গে সঙ্গে কোম্পানিকে পর্যন্ত ঠকিয়ে টাকা বানাতেন ঠকচাচা হেস্টিংস সব জানতেন শুধু নয়, নিজে এই পরিকল্পনাটির জন্মদাতাও বটে ঘনিষ্ঠ বন্ধুবান্ধবসহ ওয়ারেন হেস্টিংসএর উপবৃত্তে ঘোরাফেরা করা বন্ধুরাই এই ধরনের পড়ে পাওয়া চৌদ্দ আনা লাভের সুযোগ পেতেন ১৭৬৩ থেকে দাউদাউ জ্বলতে থাকা গ্রামীণ বাঙলার বিদ্রোহ দমন করার সাথীরূপে, সক্রিয়ভাবে দেশিয় ব্যবসায়ীদের মাজা ভেঙে সম্রাজ্যের ভিত শক্ত করার প্রতিক্রিয়ায়, গ্রাম বাঙলা ছেড়ে কলকাতা শহরে চলে আসা বাঙালি গোমস্তা, বেনিয়ান, দালাল, সেরেস্তাদার আর পাইকারেরা, এই লাভের লুঠের বখরা পেয়েছেন এঁরা আর এঁদের উত্তরসূরীরা আগামীদিনে বাঙলার নবজাগরণের উদিতসূর্য অভিধা অর্জন করবেন, সর্বজনমান্য হয়ে রইবেন আজও
বোর্ড অব ট্রেডএ বন্ধু-ব্যবসায়ীদের(বন্ধুরা সবসময়ে ব্যবসায়ীই যে হতেন এমন নয়) সঙ্গে বাঁধ দেওয়া, রাস্তা চওড়া করা, রাস্তা তৈরি করা, কোম্পানিকে ঘোড়া, ষাঁড়, আফিম, নানান উচ্চলাভের অসামরিক-সামরিক দ্রব্য যোগান দেওয়ারমত লোভনীয় সরকারি চুক্তি হত স্টিফেন সুলিভান, চার্লস ক্রফটস, চার্লস ব্লান্ট, জন বেলি প্রভৃতিরা এই সমস্ত উচ্চ মুনাফাদার সরকারি ব্যবসার সুযোগ পেতেন মাটিতে দাঁড়িয়ে ব্যবসা পরিচালনা করতেন কিন্তু ইংরেজ অনুগামী বাঙালি গোমস্তা, বেনিয়ান, দালাল, সেরেস্তাদার, পাইকার আর ব্যবসায়ীরা বোর্ড অব ট্রেডএর ব্যবসার আকাশ ছোঁয়া লাভের অধিকাংশ যেত ইংরেজদের সিন্দুকে, ছিটেফোঁটাতেই খুশি থাকতে শিখেছিলেন এদেশিয় দালালেরা
বোর্ড অব ট্রেডএর চুক্তিতে ক্ষুব্ধ কোম্পানির ডিরেক্টর সভা কর্মচারীদের দেশে ফেরার পর কয়েকজনের নামে মামলা দায়ের করে যাদের মধ্যে প্রভাবশালী হেস্টিংসও ছিলেন ভারতে কোম্পানির আমলাদের ব্যবসায় বাস্তবিক যে ইতরবিশেষ ঘটেনি তার প্রমাণ ব্যবসায়ীদের থেকে হেস্টিংসের বেনিয়ান কান্তবাবু, আরও পরে রামমোহন, দ্বারকানাথদেরমত মানুষদের অবাধে বেড়ে চলা দস্তুরি নেওয়ার প্রবণতা থেকে দেশিয়দের খুঁটি ইংরেজ বড় আমলারা, যাঁরা বাঙালি গোমস্তা, বেনিয়ান, দালাল, সেরেস্তাদার আর পাইকারদের মাধ্যমে বাঙলায় অবৈধ ব্যক্তিগত ব্যবসা করত পণ্য কেনার সময় বাঙালি কর্মচারীরা দস্তুরি নিত, প্রতি টাকায় পাঁচ গণ্ডা থেকে ৩০ গণ্ডা দরে কোম্পানি কর্মচারীদের লুঠের কাজে সরাসরি সাহায্য করত বাঙালি গোমস্তা, বেনিয়ান আর দেওয়ানরা দুহাত ভরে এরাই বেনিয়ান রামমোহন রায় অথবা ব্যবসায়ী দ্বারকানাথ ঠাকুরের পূর্বসূরী ইংরেজেদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায়রত দেশিয় ব্যবসায়ী আর রায়তদের অসীম দুর্দশায় ইংরেজ কর্মচারীরা আর ইংরেজমুখী বাঙালি কর্মচারী, দালালেরা রোজগার করতেন বাঙলায় মুক্তিসূর্য রামমোহন-দ্বারকানাথসহ কলকাতার অমিততেজেরা, অথবা রেনেসাঁজাত খ্যাত অখ্যাত নানান ব্যক্তিত্ব কোথা থেকে তাদের ব্যবসা শুরুর অর্থ অথবা নিজেদের ঠাটবাট বজায় রাখার সম্পদ পেতেন, তার রহস্য বাঙালি গোমস্তা, বেনিয়ান, দালাল, সেরেস্তাদার আর পাইকারদের অবৈধ দস্তুরির রোজগার আর ব্রিটিশদের সঙ্গে লুঠের অবৈধ ব্যবসার সাথী হওয়া থেকে পরিস্কার মুর্শিদাবাদের দরবারে রেসিডেন্ট কমিশনার সাইক্স সোরা, রেশম আর কাঠের ব্যবসার সেলামি থেকে একা রোজগার করেছেন বার থেকে তের লক্ষ টাকা, তার দেওয়ান অথবা বেনিয়ান কত রোজগার করেছে তা অনুমানযোগ্য
দ্বারকানাথের উত্তরসূরী ক্ষিতীন্দ্রনাথ ঠাকুর্দার বাবার সময়ে ঘুষের কথা বলতে গিয়ে বলছেন ৩৫ টাকা মাইনের কর্মচারী, ব্রিটিশ বড়বাবুকে মাসে ৫০০ টাকা করে ঘুষ দিতেন আমরা যেন মনেরাখি ১৮২০ সালে মাসে দুটাকা রোজগার করে ঈশ্বরচন্দ্রের পিতা ঠাকুরদাস নিজেকে স্বচ্ছল ভেবে বাড়িতে অর্থ পাঠাবার উদ্যোগ করছেন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে এ ধরণের ছোটখাট ঘুষের বিষয়তো আলোচনাই হয় নি যেসব বিষয় আলোচনা হয়েছে তা শুধুই বড় বড় পরিমানের ঘুষের পরিমান
ভারত দেশের রীতনীতি বিষয়ে অজ্ঞ ইওরোপিয়রা বাঙালি বেনিয়ান, গোমস্তা, মুন্সি আর সরকারদের মাধ্যমে তাদের ব্যবসা পরিচালনা করতেন বাঙলায় নতুন ইওরোপিয় পদার্পণ করলেই তাদের দালালি করার জন্য প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যেত এদেশিয়দের মধ্যে এদের অধিকাংশই ছিলেন চিরাচরিত ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের মানুষ দাদনি ব্যবসায়ী পলাশির পর ইওরোপিয়দের প্রধাণ ব্যবসায়ী কর্মচারী দালালদের বেনিয়ান নামে ডাকা শুরু হয় একজন ইওরোপিয়র দরবারে বেনিয়ান ছাড়াও ছিলেন দোভাষী, দালাল, হিসাবরক্ষক, প্রধাণ অমাত্য (সেক্রেটারি), পুঁজির যোগানদার আর খাজাঞ্চি নানান বৈধ অবৈধ ব্যবসায় এদেশিয়রা মাহির ছিল ইওরোপিয়রা তাদের নাম ধার দিতেন ব্যবসায় মূল লাভ্যাংশটা পেতেন একজন বেনিয়ান আবার অনেকসময় একের বেশি ইওরোপিয় ব্যক্তি অথবা প্রাইভেট এজেন্সির বেনিয়ানরূপে কাজ করতেন
অসীম রায় নবাববাঁদী উপন্যাসে সদ্য ভারতে পা রাখা প্রভাবশালী এক ইংরেজ রাজপুরুষের রাইটার ভ্রাতুষ্পুত্রকে, বানিয়ান গোকুল মুখার্জীর দেওয়া মাইনের যে ফর্দ উল্লেখ করেছেন তা উল্লেখ করা গেল-
পালকিতে দুলতে দুলতে গোকুলের দেওয়া লম্বা কাগজের ফালিটা চোখের সামনে মেলে ধরে
খানসামা                                               ১২ টাকা
বাটলার                                                ৮
খিদমতগার                                            ৬
পাচক                                                  ১৫
পাচকদের যোগানদার                                ৬
মশালচী                                                ৩
পিয়ন ও হরকরা                                      ৪
চুলফেলা নাপিত                                      ২
৩টাকা হিসেবে ৬ জন বেয়ারা                      ১৮
হেড বেয়ারা                                            ৫
লোকজনদের বাড়িভাড়া                             ২৬
দাড়িফেলা নাপিত                                    ২
হুঁকোবরদার                                           ৫
নালি সরদার                                          ৪
সর্দারের অনুচর                                       ৩
সহিস                                                   ৩
ধোবি                                                   ২
ইস্ত্রিওয়ালা                                             ২
দর্জি                                                    ৩
                                                          মোট ১২৯ টাকা
মাই গড এরপর গোকুলের সুদ এ ছাড়া কাপড়-চোপড়, পালকি, বগি, বজরা, বাড়ি তার ওপর টাকা জমানো নাঃ প্রাইভেট ট্রেড ছাড়া কোনও  উপায় নেই
গ্রামীণেরা তখন ব্রিটিশ সৈন্যের সঙ্গে সম্মুখ সমরে লড়ছেন সে সময় কলকাতার মধ্য-উচ্চবিত্ত শ্রেণী নানান প্রকারের ব্যবসায় ব্রিটিশ শক্তিকে সরাসরি সাহায্য করছেন দেশের শিল্প-ব্যবসা পরিকাঠামো ধংসে ব্রিটিশদের সহায়তা দিচ্ছেন সাম্রাজ্যের লাভের গুড়ের ছোট্টঅংশিদার হয়ে উঠেছেন রাজভক্তির ছায়ায় দাঁড়িয়ে এই মহাতেজেরা কখোনো সরাসরি(রামমোহন, দ্বারকানাথসহ অন্যান্য নিমক মহলের দেওয়ান বানিয়ান, জমিদার), আবার কখোনো পরোক্ষভাবেই (বিদ্যাসাগর গ্রাম বাঙলার একলাখ পাঠশালা ধংস করে শহুরেদের সরকারি সাহায্যে পাঠদানের সরকারি নীতি প্রণয়নের উদ্যোক্তা) দেশের পরিকাঠামে ধংস করতে, স্বাধীণতাকামী সরাসরি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে লড়াই করা গ্রামীণ জনগণকে খুন করতে, উচ্চশিরদাঁড়া বেঁকিয়ে দিতে ব্রিটিশদের সহায়তা করেছেন রাজানুগত্য এমনস্তরে পৌঁছয়, লবন মহলের লুঠতরাজে প্রতিবাদী মালঙ্গীরা স্বাধীণতা সংগ্রাম করলে, পালকি বেহারারা কাজ বন্ধ করে দিলে, আফিম চাষীরা সরাসরি লড়াই করলেও, তিতুমীর প্রাণ দিলেও তাদের পাশে দাঁড়াবার জন্য একজনও নবজীবনের অগ্রদূতেদের দেখা পাওয়া যায়না, ব্রিটিশ বিরোধিতায় কারোর গলা একবিন্দুও ওঠেনা শুধুমাত্র নীল সংগ্রামে এঁরা নড়ে চড়ে বসেছিলেন জমিদার, ব্রাহ্মণ আর শহুরেদের গায়ে হাত পড়েছিল তবুও আজও সকলেই বাঙলার নবজীবনের অগ্রদূত

লুঠ শাসনের সম্পদ১১ - অত্যাচারমূলক লুঠের বাণিজ্য, Loot of British Raj11 - The Business of Loot

১৭৬৫ সনের ১৮ই সেপ্টেম্বর ক্লাইব এবং তাহার কৌন্সিলের মেম্বরগণ লবন তামাক ও গুবাকের বাণিজ্য সম্বন্ধে আর কয়েকটি কঠিন নিয়ম প্রচার করিলেন, নবাবের লাভালাভ কিংবা প্রজাসাধারণের সুবিধার প্রতি একবার ভ্রমেও দৃষ্টিপাত করিলেন না কিন্তু পাছে ডিরেক্টরগণ এই নিয়ম না মঞ্জুর করেন সেই আশংকায় এইরূপ বন্দোহস্ত করিলেন যে লবণ, তামাক, এবং গুবাকের বাণিজ্যে বণিকসভার যে লাভ হইবে তাহাতে শতকরা পাঁচিশ টাকা হারে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি পাইবেন বাকী টাকা গবর্ণর কৌন্সিলের মেম্বর, সৈন্যাধ্যক্ষ এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সমুদায় ছোট-বড় সমুদায় কর্মচারীগণ স্বীয় স্বীয় পদমর্যাদা অনুসারে ভাগ করিয়া লইবেন এই বাণিজ্যের লাভ হইতে প্রায় কোন কর্মচারীই বঞ্চিত হইলেন না খ্রীষ্টধর্ম প্রচারার্থ যে দুইজন ধর্মযাজক(chaplains) কলিকাতায় তত্কালে অবস্থান করিতেন তাঁহারাও কিছু কিছু পাইতেন
লবণের বাণিজ্য এইরূপ একচেটিয়া করিবার অব্যবহিত পূর্বে ক্যারাপিট আরাটুন নামক জনৈক আরমানিয়ান বণিক ত্রিশ হাজার মণ লবণ গোলায় ক্রয় করিয়া তাঁহার দিনাজপুরস্থ গোলায় মজুদ রাখিয়া ছিলেন তিনি যখন শুনিতে পাইলেন যে, দেশের সমুদয় লবন ইংরেজরা ক্রয় করিয়া, পরে অত্যাধিক মূল্যে দেশিয় বণিকদেগের নিকট বিক্রয় করিবেন বনিয়া স্থানে স্থানে নবাবের পরওয়ানা জারি করাইয়াছেনব, তখন তাঁহার নিজের গোলার লবন বিক্রয় বন্ধ করিয়ে রাখিলেন তিনি মনে করিলেন যে এই নিয়ম প্রচারের পর লবণের মূল্য পাঁচগুণ বৃদ্ধি হইবে, সুতরাং সেই মূল্যে বাজারে আপন লবন বিক্রয় করিয়া অন্তত এই বত্সরে কিছু লাভ করিতে পারিবেন, মনে মনে এই সংকল্প করিয়া আরাটুন সাহেব স্বীয় গোম্তাকে লবনের গোলা বন্ধ করিয়া রাখিতে আদেশ করিলেন. কিন্তু ইংরেজগণ তাহার গেলার নবণ আত্মসত্ করিবার অভিপ্রায়ে নানানবিধ অবৈধ উপায় অবলম্বন করিতে লাগিলেন ত্রিশ হাজারমণ লবণ তাঁর গোলায় মজুদ রহিয়াছে. এখন একটাকা হারে মণ ক্রয় করিতে পারিলেও বাঙালি বণিকদিগের নিকট পাঁচটারা হারে বিক্রয় করিয়া একলক্ষ বিশ হাজার টাকা লাভ করিতে পারিবেন
বণিকসভার বেরেলস্ট এবং সাইক সাহেব এই আরমানিয়ান বণিকের লবন হস্তগত করিবার নিমিত্ত বিশেষ চেষ্টা করিতে লাগিলেন. অবশেষে তাংহাকে দুইটাকা হারে প্রত্যেক মণের মূল্য দিতে স্বীকার করিলেন কিন্তু আরাটুন সাহেবে তাঁহার লবন দুই টাকা হারেও বিক্রয় করিতে সম্মত হইলেন না তকন ইংরাজগণ বল পূর্বক তাঁহার গোলা ভাঙিয়া সমুদয় লবণ হস্তগত করিবেন বলিয়া কৃতসংকল্প হইলেন বাণিজ্যে লাভ হইলেই হইল টাকা সঞ্চয় করাই তাঁহাদিগের একমাত্র খ্রিষ্টীয়ধর্ম বণিকসভার অধ্যক্ষ বেরেলস্ট এবং সাইক সাহেব আরাটুন সাহেবের গোলা ভাঙিয়া, তাঁহার তাঁহার দিনাজপুরের গোলার লবণ হস্তগত করিবার নিমিত্ত লেপ্টেন্যান্ট ডবসনকে কয়েকজন গোরা ও সিপাহীর সহিত দিনাজপুর প্রেরণ করিলেন ডবসন সাহেব দিনাজপুর পৌঁছিয়া আরাটুন সাহেবের লবণের গোলা ভাঙিয়া, তাঁহার সমুদয় লবণ হস্তগত করিলেন (চন্ডীচরণ সেনের নন্দকুমার ও শতবত্সর পূর্বের বঙ্গ সমাজ থেকে)

বাঙলা থেকে যে বিপুল পরিমান সম্পদ লুঠে নিয়ে যাওয়া হয়েছে সমগ্র পলাশির শতাব্দটি থেকে, তাকে মোদ্দাভাবে চার ভাগে ভাগ করছেন রজতকান্ত রায়(যদিও অন্যান্য লুঠ প্রক্রিয়াগুলি এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। লুঠ সংক্রান্ত তৃতীয় পোস্টে সেগুলি বিশদে আলোচনা করা হয়েছে)  ঘুষের অর্থ, হিরে, জহরত, মণিমুক্তো নানান প্রক্রিয়ায় দেশে পাঠানো, ২ ইওরোপ-ইংলন্ডে প্রায় বিনামূল্যে বাঙলার রপ্তানি পণ্য আর সোনা-রূপো পাঠানো, ৩ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ওপর বিল অব এক্সচেঞ্জ, ৪ বাণিজ্যে অন্যান্য বিদেশি কোম্পানির ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পদাঙ্ক অনুসরণ ইংরেজ ব্যবসায়ীরা তেল, নুন, আফিম, আদা, চিনি, সুপারি, তামাক, ঘি, মাছ, শুঁটকি, খড়, চট, বাঁশ, কাঠেরমত তুচ্ছাতিতুচ্ছ ব্যবসায় একচেটিয়া দখল কায়েম করল এই দ্রব্যগুলোর একচেটিয়া ব্যবসা সাধারণের জীবনে প্রভাব ফেলবে, এ তথ্য জানতে বিশেষজ্ঞ হতে হয় না দেশের মানুষের জীবন দুর্বিসহ হয়ে উঠল পলাশির পর সত্তর বছর ধরে বাঙলার বাণিজ্যে এত কমদামি মাল নিয়ে কারবার বাঙলার মানুষ এর  আগে দেখেনি
ক্রমে ক্রমে ইংরেজরা ধান চালের বাণিজ্যে হস্তক্ষেপ করতে লাগল মির কাশেমের সময় বাঙলা জুড়ে অন্ততঃ পাঁচশো ইংরেজ কুঠি গজিয়ে উঠেছে ইংরেজদের সহায়তায় বাঙালি গোমস্তা, বেনিয়ান আর দেওয়ানরা কোম্পানির দস্তক দেখিয়ে অবাধ মুক্ত বাণিজ্য চালাচ্ছে ইংরেজদের লুঠতরাজের নেতৃত্বে যোগ্য সঙ্গত প্রদান করছে শুধু ইংলন্ডেই নয়, বাঙলায় ইংরেজরা মুক্ত বাণিজ্যের দাবি করল অবাধ, মুক্ত বাণিজ্য বলতে কোম্পানির সহায়তায় সেনাবহর সঙ্গে নিয়ে ব্যবসায়ী আর ছোট উত্পাদক রায়তদের কাছ থেকে দাদনের নামে সিকি দামে, অথবা পণ্যদ্রব্য লুঠ করে, ৫০০ শতাংশ দামে সেই দ্রব্য আবার রায়তদের বিক্রি করত এই ব্যবসায় বাঙালি আর ইংরেজরা কত অর্থ লুঠ করেছে তার লেখাজোখা নেই
১৭৬২র মে মাসে মির কাশেম ভ্যন্সিস্টার্টকে লিখছেন, এই হল আপনাদের ভদ্রলোকেদের ব্যবহার আমার দেশে সর্বত্র তারা উপদ্রব করে, জনগণের ওপর লুঠতরাজ চালায়, আমার কর্মচারীদের অপমান জখম করে, প্রত্যেক গ্রাম পরগণা, ফ্যাক্টরিতে তারা লবন, সুপারি, ঘি, চাল, খড়, বাঁশ, মাছ, চট, আদা, চিনি, তামাক, আফিম, ও অন্যান্য জিনিষ কেনা বেচা করে আমি আরও অনেক বস্তুর নাম করতে পারি অপ্রয়োজনে বিরত হলাম তারা বলপ্রয়োগ করে কৃষক বণিকদের পণ্য একচতুর্থাংশ দামে ছিনিয়ে নেয়, জবরদস্তি করে কৃষককে এক টাকার জিনিষ পাঁচ টাকায় কিনতে বাধ্য করে আবার পাঁচটি টাকার জন্য তারা এমন এক মানুষকে অপমান ও আটক করে, যে একশ টাকা ভূমি রাজস্ব দেয় আমার কর্মচারীকে কর্তৃত্ব করতে দেয় না প্রত্যেক শুল্ক থেকে বঞ্চিত হওয়ায় আমার রাজস্ব ক্ষতির পরিমান দাঁড়াচ্ছে পঁচিশ লক্ষ টাকা(পালাশির ষড়যন্ত্র ও সেকালের সমাজ - পালাশির ষড়যন্ত্র ও সেকালের সমাজ, রজতকান্ত রায়) মির কাশেম দেখলেন দেশিয় বা ইংরেজ, কোনও ব্যবসায়ীই সরকারি মাশুল দিচ্ছেনা ঘোষণা করলেন ব্যবসায়ীদের আর শুল্ক দিতে হবে না দস্তকও দেখাতে হবে না
ইংরেজ বণিকেরা রাতারাতি নবাব হওয়ার চেষ্টায় দেশটাকেই শ্মশানে তোলার তোড় জোড় করছিল অবাধ মুক্ত বাণিজ্যের একটি কথার কথা ছুতো ইংরেজদের ভাষায় অবাধ বাণিজ্য নীতি হল, ইংরেজদের বাণিজ্যের হবে অবাধ, আর দেশি ব্যাপারীদের বাণিজ্যের রেশ থাকবে ইংরেজদের হাতে ইংরেজরা মির কাশেমের বকলমে এই অদ্ভুত বাণিজ্য নীতি প্রয়োগ করতে গিয়ে দেখল তার শ্বশুরের তুলনায় মির কাশেম অতি কড়া ধাতের মানুষ মির কাশেম রুখে দাঁড়ানোয় পুরোনো কিছু জমিদারির দেওয়ানরা, যেমন রাণী ভবানীর দেওয়ান দয়ারাম রায়, ইংরেজ ব্যবসায়ীদের কুঠির রেশম আটক করেন বোয়ালিয়া কুঠির দ্রব্যও ছিল ইংরেজদের ভয় হল দেশিয় বণিকদের ভয় দেখিয়ে আর বল প্রয়োগ করে যে অবাধ ব্যবসার জাল ছড়িয়েছে ইংরেজ বণিকেরা, সেই জাল সহজেই ছিঁড়ে যেতে পারে পাটনা কুঠির ব্যবসাদার আর বড় সাহেব এলিস নবাবের ফৌজএর ওপর চড়াও হলেন যুদ্ধ শুরু হল ইংরেজরা মির জাফরকে আবার নতুন করে মুর্শিদাবাদের মসনদে বসাল, লক্ষ্য আরও লুঠের বহর বাড়ানো নবাব অযোধ্যায় পালিয়ে যাওয়ায় অবাধ লুঠের মাঠ উন্মুক্ত হয়ে গেল ইংরেজদের সামনে লড়াইতে বোয়ালিয়া কুঠির আটক দ্রব্য ছাড়তে মাথার ঘাম পায়ে ফেলতে হল ইংরেজদের ১৭৬৬তে এই অভিজ্ঞতায় জমিদারদের নগদী সৈন্য বরখাস্ত করল ইংরেজরা দেশের অভ্যন্তরে পাঁচশোর বেশি বাণিজ্য কুঠি বানিয়ে গোমস্তি কারবারের, যে বাঙলাজোড়া লুঠের ব্যবসা শুরু হল, তাতে দেশের সনাতন ব্যবসায়ীদের ব্যবসার মাজা ভেঙে গেল, তাঁরা প্রতিবাদ করলেও প্রতিরোধ করতে পারলেন না টিকে গেলেন ইংরেজদের তাঁবেদার গেমস্তা, বেনিয়ান আর দেওয়ানদেরমত দালালচক্র এরাই বাঙলার নবজাগরণের অগ্রদূতরূপে পরিগণিত হবেন
উইলিয়ম বোল্টস বলছেন ইংরেজদের আর কোম্পানি এজেন্টদের শুধু আভ্যন্তরীণ বাণিজ্যই অত্যাচারমূলক ছিলনা, রপ্তানির জন্য দ্রব্য কেনাও ছিল অভিসন্ধিমূলক অর্থনীতিবিদ বা ঐতিহাসিকেরা যদিও বলছেন কোম্পানির ব্যবসায়ী বা উত্পাদকদের কাছ থেকে দ্রব্য কিনত, কিন্তু কেনাটা আদতে অভিনয়মাত্র, আদত পদ্ধতিটা ছিল যথাসামান্য অর্থ ব্যয় করে লুঠ, না পারলে হুমকি চন্ডীচরণ যে আরাটুনের ঘটনা বলেছেন সেটি সর্বৈব বাস্তব এদেশিয় শহুরে বেনিয়ান গোমস্তাদের সহায়তায় আগে থেকেই কোম্পানি, বাঙলার উত্পাদকের ঘর থেকে কত পরিমান দ্রব্য, কত দামে কিনবে তা ঠিক হয়ে যেত গোমস্তা, বেনিয়ান, দালাল আর পাইকারেরা তাঁতিদের আড়ংএ ডেকে পাঠাত দাদন দিয়ে পণ্য সরবরাহ চুক্তি করত কোম্পানি কোম্পানির কাছ থেকে টাকা নিতে অস্বীকার করলে তাদের বেত মারা হত গোমস্তাদের খাতায় উত্পাদকদের নাম লেখা থাকত কখোনো আবার এক গোমস্তা থেকে আর এক গোমস্তার অধীনেও চালান করা হত তাঁতিরা চাহিদামত পণ্য তৈরিতে ব্যর্থ হলে তার সব পণ্য আটকে বিক্রি করে সেই টাকা উশুল করত দেশের কারিগরদের উত্পাদনের কাঠামো ধংস করে  ক্রমশঃ রেমশ ও সুতি বস্ত্র ইংলন্ডে পাঠানো বন্ধ করে সুতো পাঠানোর জন্য তুলো চাষে বাধ্য করা হত চাষীদের (সূত্রঃ সুপ্রকাশ রায়, ভারতের স্বাধীণতা সংগ্রাম ও কৃষক বিদ্রোহ )
পলাশি উত্তরকালে সুসভ্য ব্যবসায়ী শাসক ইংরেজদের অবাধ এই বাণিজ্যের লুঠতরাজী দেখানো পথে, দ্বিতীয় সহস্রাব্দের বিশ্বায়ণের মহাভাগে সুসভ্য গণতান্ত্রিক ইওরোপিয়-আমেরিকীয় ব্যবসায়ী আর তাদের দেশিয় ব্যবসায়ী ফড়েরা বিশ্বের চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছেন দেশিয় সম্পদ লুঠের রাজত্ব কীভাবে তৈরি করতে হয় দেশগুলির ধণসম্পদ প্রাকৃতিক সম্পদ অভিধা দিয়ে, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেখানো পথে, সরকার-বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে স্থানীয় জনগোষ্ঠীগুলিকে পাশ কাটিয়ে অবাধে লুণ্ঠন করার কাজ শুরু হয়েছে দেশের জনগোষ্ঠীগুলো হাজার হাজার বছর ধরে এই সম্পদগুলির রক্ষণাবেক্ষণ করে এসেছে এশিয়া, আমেরিকা বা আফ্রিকার সনাতন সমাজের হাজার হাজার বছরের বিকশিত মেধা ভিত্তি করে গড়ে ওঠা সম্পদ, জ্ঞাণ, ভাবনা অপহরণ করে, তার ওপর আন্তর্জাতিক মেধাস্বত্ব আইন প্রয়োগ করে, তথাকথিত তৃতীয় বিশ্বের অবশ্য বধ্য জনগণের রায়ে গঠিত অবোধ সরকারগুলোকে ঠুঁটো জগন্নাথ বানিয়ে বিশ্বজোড়া আবাধ বাণিজ্য বিস্তার করে অগাধ লাভ করেছে ব্রিটেন