Showing posts with label দাম. Show all posts
Showing posts with label দাম. Show all posts

Monday, October 2, 2017

মুঘল মুদ্রাব্যবস্থা৪ - ওম প্রকাশ

উপমহাদেশে কড়ির নানা ধরণের ব্যবহার ছিল। কড়ি আজও গয়নার উপকরণ হিসেবে ব্যবহার হয়, সেদিনও হত। আর এটির ব্যবহার ছিল শিক্ষা ব্যবস্থায় যাতে ছেলেরা সওদাগর হয়ে উঠতে পারে। ১৬৮৭ সালে ডাচ ভিওসির বাংলা কুঠিয়ালকে হিন্দু বানিয়া সম্বন্ধে ডাচ কমিশনার Hendrik Adriaan van Reede tot Drakenstein, heer van Mijdrecht নির্দেশ দিচ্ছেন, ‘The merchants…are exceptionally quick and experienced. When they are still very young and in the laps of their parents and hardly able to walk, they already begin to be trained as merchants. They are made to pretend to engage in trade while playing, first buying cauris, followed by silver and gold. In this training as moneychangers, they acquire the capability of engaging in large-scale trade. They are always sober, modest, thrifty, and cunning in identifying the source of their profit, which they are always at pains to maximize. They have an exceptional capacity of discovering the humour of those who are in a position to help or hurt them. They flatter those they need to be in the good books of. In case of loss, they console themselves easily and can hide their sorrow wonderfully…In general they are a people with whom one could get along well so long as one is on one’s guard।’
ওপরের বর্ণনাটা আমাদের জানায় যে, বাংলার আর্থ ব্যবস্থায় কড়ি একটি বিপুল ভূমিকা পালন করত। তামার দামে মুঘল ভারতে তুচ্ছ পণ্য বিনিময় হত, কিন্তু বাংলায় কড়ির মাধ্যমে তুচ্ছ এবং বড় লেনদেনের বাণিজ্য হত। এর কোন ব্যখ্যা নেই, শুধু অভ্যেস হিসেবে দাগিয়ে দেওয়া ছাড়া। বাংলা এবং ওডিসায় বিপুল পণ্য বিনিময় কড়িতেই হত।

সপ্তদশ শতকের শুরুতে মালদ্বীপে এক কুইন্টাল কড়ির দাম ছিল দুই শিলিং এবং দস পেন্স, কিন্তু বাংলাতে এই পরিমানের দাম উঠে যেত ৩০০-৪০০ গুণ। ফলে কড়ি ব্যবসা এশিয়া জোড়া বিশাল লাভের ব্যবসা ছিল। টমাস বাউরে বলছেন একগণ্ডা = চার কড়ি, ২০ গণদা, ১ পণ, ১৬ পণ এক কাহন, আড়াই কাহনে (৩২০০ কড়ি) এক টাকা। তবে মুঘল টাকা, দাম আর পয়সার সঙ্গে কড়ির কোন স্থায়ী বিনিময়মূল্য ছিল না। বাজারে সেই মুহূর্তে চাহিদা সরবরাহের তারতম্যের ওপর নির্ভর করত দুটি মুদ্রার তুল্যতা।

আগে বলেছি বাংলা ওডিসার বাজারে ছোট ছোট লেনাদেনার জন্য কড়ি ব্যবহার হত। আসলে তামার পয়সা যে জন্য ব্যবহার হত, ঠিক সেই জন্য বাজারে ব্যবহার হত কড়ি। কিন্তু কড়ি মানের খুব ছোট লেনদেন ছাড়া কড়ি দিয়ে বড় বিনিময় হত। মুঘল বাংলার সব থেকে বড় রাজস্ব, ভূমি রাজস্ব, কড়িতে সংগ্রহ করা হত, এবং সিক্কা টাকায় রুপান্তরিত করে দিল্লির খাজাঞ্চিতে পাঠানো হত। সিলেটে একমাত্র কড়িই মুদ্রা হিসেবে ব্যবহৃত হত। ১৭৭৮ এবং ১৭৮৯ সালে ২৫০০০০ টাকা রাজস্ব দেওয়া হত কড়িতে। তখন বিনিময় ছিল ১ সিক্কা টাকা সমান ৫১২০টি কড়ি। কড়ি রাখার জন্য বিশাল বিশাল গুদাম তৈরি করা হয়েছিল এবং সেগুলিকে ঢাকায় নৌকো করে পাঠানো হত। কড়ি ব্যবস্থাপনার জন্য সে সময়ে রাজস্বের ১০% মূল্য খরচ হত। ঢাকায় সিক্কা টাকার বনিময়ে কড়ি নিলাম হত। ১৮২০ সালে কড়ি নিষিদ্ধ ঘোষণা হয়। এরপর থেকে রাজস্ব তামার পয়সায় নেওয়া হত।



আমরা বলতে পারি মুঘলদের মুদ্রা ব্যস্থায় যেমন প্রমিত মুদ্রাও ছিল তেমনি কড়ির মত অপ্রমিত বাজারি মুদ্রারও অস্তিত্ব ছিল। মুদ্রা ব্যবস্থা খুবই জটিলতম ব্যবস্থা কেননা ধাতু মুদ্রার সঙ্গে নিয়মিত এই অপ্রমিত মুদ্রার বিনিময়ের ধারা তৈরি করে করে যেতে হত রাষ্ট্রকে।

মুঘল মুদ্রাব্যবস্থা৩ - ওম প্রকাশ

এইরকম অবস্থা এড়ানোর জন্য প্রয়োজন ছিল মুদ্রাগুলির মধ্যে সরকারিভাবে আন্তঃসম্পর্ক নির্দেশ কঠোরভাবে প্রয়োগ করা, এবং যখন লেনদেন হবে তখন যেন সেই সম্পর্ককে মান্য করা হয়, এটাও নির্দেশ দেওয়া। কর্মচারীদের মুদ্রার মানের সঠিক মূল্য পাওয়ার জন্য প্রয়োজন, দামঃটাকার মধ্যেকার সম্পর্ক নির্ণয়, এবং দামে বেতন দিলে সে সময় সে কত পেল তা যাতে সে বুঝতে পারে সেটা জানা এবং সেই মুদ্রার সাধারণ বিনিময় হার নির্নয় করা। এটা হয়ত হত, কিন্তু সবসময় করা যেত না। যদি রূপোর টাকায় কোন বড় পেমেন্ট হত, তাহলে তা যাতে ঠিকঠাকভাবে বিভিন্ন মুদ্রায় মূল্যায়িত হত তা নিশ্চিত করা জরুরি ছিল।

আইনিআকবরিতে দৈনিক বা পাক্ষিক বা মাসিক অর্থাৎ সময় নির্ধারিত বা পণ্যপ্রতি যে শ্রমের মূল্যের উল্লেখ পাচ্ছি, তা কিন্তু মূলত দামেই চোকানো হত। সে সময় সাপ্তাহান্তে বেতন চোকানোর রেওয়াজ ছিলই না বলা চলে, কারণ সেটা আইনিআকবরিতে বলা নেই। সপ্তদশ শতকে ১৬২০র পর থেকে অবস্থাটা পাল্টায়, যখন এক আনা, দু আনা, চার আনা, আট আনা(এগুলি সব রূপোর টাকার অংশ, এক আনা সমান এক রূপোর টাকার একের ষোল ভাগ) ছাপানো শুরু হল। তবে এগুলির বাজারে ছাড়ার পরিমান খুব বড় ছিল না। ষোড়শ শতে তামার দাম বাজারে সব থেকে বেশি দেখা যেত, চলত বেশি করে, কিন্তু পরের শতকে সেটা আর বলা যাচ্ছে না। উদাহরণ স্বরূপ, জন ডেয়েল দেখাচ্ছেন, আকবরের রাজত্বের শেষের দিকে তামার মুদ্রা আর প্রায় বাজারে পাওয়াই যাচ্ছে না৯। এর সময়ে শ্রমের উপাত্ত মূলত টাকার হারে দেখতে পাচ্ছি, যদিও তামার দামের প্রচলন তখনও কিন্তু খুব বেশি কমে নি।

অষ্টাদশ শতে যখন সাম্রাজ্যের পতন হতে শুরু করল, তখন আরেক দফা পরিবর্তন এল। সাম্রাজ্য জুড়ে সিক্কা টাকার পতন হতে শুরু করল। ১৭১২ সালের কলকাতার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কলকাতার কুঠিয়াল লিখছেন, ‘বাংলার সিক্কাগুলো অন্য এলাকায় যে ধরণের বাটা পায় অন্য এলাকার টাঁকশালের সিক্কাগুলোর ১০শতাংশ বাটা পায়, কিন্তু ঢাকা, পাটনা বা কটকের সিক্কাগুলি একই ওজন এবং ঔজ্জ্বল্যে বরাবর হলেও, মুকসুদাবাদের থেকে হুগলিতে ২ থেকে ৩ শতাংশ কম এবং যেখানে টাঁকশাল নেই, সেখানে কম বাটা পায়’১০। তবুও মুদ্রা ব্যস্থার অবস্থা তখনও মোটের ওপর স্বাস্থ্যকর ছিল, যতক্ষণ বাংলা ব্রিটিশদের হাতে যায় নি। এবং কোঁম্পানির প্রথম যুগে বাংলা বাজারে অনিশ্চয়তা এবং বিশৃঙ্খলা বেড়ে চলতে শুরু করে। আফসোস এই সময়ে গুরুত্ব দিয়ে এই বিষয়ে কোন বিশ্লেষণী লেখা কেউ লিখেছেন বলে জানা নেই।

বাজারী(humble) মুদ্রা
মুঘল আমলে প্রমিত মুদ্রার সঙ্গে বাজারজুড়ে সাধারণ অপ্রমিত মুদ্রাও চালু ছিল, যাকে আমরা বাজারী মুদ্রা বলতে পারি। এগুলি অমুঘল মুদ্রা আবার হয়ত পণ্য মুদ্রা। ১৫৭২ সালে গুজরাত মুঘল রাজত্বের আওতায় চলে এলেও, সুরাত, ভারুচ এবং বরোদায় সপ্তদশ শতএর মধ্য সময় পর্যন্ত মহমুদি নামক একটি অপ্রমিত মুদ্রা চলত। ১৬৩০ সালে সুরাটের মুতাসাদ্দিরা মহমুদিতে রাজস্ব নিয়ে, দিল্লীতে পাঠানোর আগে সেটিকে টাকায় রূপান্তরিত করেছে১১। সুরাট কুঠির হিসেবের খাতা থেকে দেখছি, বহু পণ্য লেখা হয়েছে টাকায় নয়, মহমুদিতে১২। মুঘল রাষ্ট্রের সাধারণ নীতি ছিল, যত তাদের রাজত্ব বহরে বাড়বে, তত স্থানীয় সমস্ত মুদ্রা বাতিল করে কেন্দ্রিয় মূলমানের মুদ্রা চালু করা হবে। তবে গুজরাটে এই ব্যতিক্রমের কোন ব্যখ্যা আজও পাওয়া যায় নি। তবে হ্যান্স ভন সান্তেনের ব্যখ্যাই হয়ত ঠিক, স্থানীয়ভাবে যে মুদ্রাগুলি জনপ্রিয়, সেগুলিকে বজায় রেখে কেন্দ্রিয় মুদ্রাগুলি উত্তরভারতে চলে যেত১৩।

পণ্য মুদ্রা হল নির্দিষ্ট ওজনের টিনের মুদ্রা, বা বাদাম(bitter almonds) ইত্যাদি ইত্যাদি। এই পণ্য মুদ্রাগুলি বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন মানে বিনিময় হিসেবে ব্যবহার হত। গুজরাতে সব থেকে জনপ্রিয় পণ্য মুদ্রা হল বাদাম, ১৬৩৬ সালে এক তামা মুদ্রার বিনিময়ে ৩৬টা বাদাম পাওয়া যেত।

তবে মুঘল ভারতে সব থেকে গুরুত্বপূর্ন বাজারী মুদ্রা হল কড়ি। সমুদ্র জাত কড়ি আমদানি করা হত মূলতঃ মলদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা এবং ভারত মহাসাগর থেকে। মুঘল ভারতের বাংলা বিহার ওডিসা মূলত এই দ্বীপগুলির সঙ্গে কড়ির বিনিময়ের জন্য বিপুল পরিমান ব্যবসা করত। এর বিনিময়ে দ্বীপগুলি বিপুল পরিমানে আমদানি করত পরিধেয়, চাল, তেল আর ঘি। পিপলি বালেশ্বর আর হুগলি বন্দর থেকে ওডিসি এবং বাঙ্গালি নাবিক আর সওদাগরেরা বিপুল পরিমানে কড়ি বহন করে আনত। বিশ্ব কড়ির বাজারে মালদ্বীপ সব থেকে বড় সরবরাহকারী ছিল। স্থানীয়ভাবে ব্যবসায়ীরা পুর্ব ভারতের তিন রাজ্য এবং দক্ষিণের মালাবার এবং দক্ষিণ পশ্চম উপকূলে কড়ি বহন করে নিয়ে আসত। এই ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পাল্লা দিত ষোড়শ শতে পর্তুগিজ এস্তাদো দা ইন্দিয়া এবং সপ্তদশ এবং অষ্টদশ শতে ডাচ ভিওসি। তারা এগুলি জাহাজের খোলের মধ্যে ভরে(যাতে জাহজ ভারি হয়, ঝড়ে সহজে উল্টে/ডুবে না যায়) দেশে নিয়ে যেত। এগুলি আফ্রিকায় দাস কেনার জন্য ব্যবহৃত হত।

মুঘল মুদ্রাব্যবস্থা২ - ওম প্রকাশ

টাঁকশালে মুদ্রা ছাপানো এবং ধাতুর শুদ্ধতার ওপর কড়া নদরদারির ফলে সারা ভারতে কোথাও মুঘল মুদ্রা, তার মূল মূল্যে গ্রহণ করার সমস্যা হয় নি। নিয়মিতভাবে বাজারে মুদ্রার সরবরাহ ক্রমশ বাড়তে থাকায় বাজারে টাকার সরবরাহ বাড়ে, উৎপাদন এবং ব্যবসাপাতির পরিমান বাড়তে থাকে। মুঘল টাঁকশাল সারা সাম্রাজ্য জুড়ে ছড়িয়ে ছিল। তারমধ্যে অনেকগুলোর ভৌগোলিকতা, মুদ্রা উৎপাদন ইত্যাদির গুরুত্ব অন্যগুলোর থেকে কোথাও বেশি ছিল কোথাও কম ছিল।

যদিও মনে রাখা দরকার টাঁকশালগুলির অন্যতম কাজ ছিল পরিশ্রুত ধাতু থেকে মুদ্রা তৈরি করা, এই কাজটা কড়া নজরদারিতে, চুক্তিতে, প্রযুক্তিতে বেশ কিছু সময়ে অন্যান্য উদ্যমীদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হত। বেসরকারি মুদ্রা উৎপাদনের দুটি মডেল ছিল, প্রথমটি হল মুঘল আধিকারকরা নিজেরা ব্যক্তিগতস্তরে কাজটা করত। দ্বিতীয়ত, সরাফেরা(স্রফ) তাদের অভিজ্ঞতা, জ্ঞান, উদ্যম কাজে লাগিয়ে মুদ্রা ছাপানোর কাজ করত। তবে এই দুটো ব্যবস্থাতেই রাষ্ট্রীয় কড়া নজরদারি ছিল। প্রতিটা মুদ্রা সরকারি নিয়ম মেনে বাজারে আসার জন্য উত্তীর্ণ হতে হত।

এক ধাতু মুদ্রাসমাজে ছোট মুদ্রাগুলি ছিল সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ মুদ্রা হয়ে ওঠত এবং সমাজের সঙ্গে তার একটা নির্দিষ্ট সম্পর্ক থাকত। এটা বহুধাতু মুদ্রাবিশিষ্ট সামাজিক ব্যবস্থাতেও কার্যকর, অবশ্যই সেখানে প্রত্যেকটা ধাতু মুদ্রার সঙ্গে অন্য ধাতু মুদ্রার নির্দিষ্ট সম্পর্কটাও জরুরি ছিল। এই সব সমাজে বিভিন্ন ধাতুর, বিভিন্ন মানের মুদ্রা উৎপাদন নির্ভর করত ধাতুর সরবরাহ এবং সামাজিক উপযোগিতা আর ব্যবহারের ওপর। ধাতুগুলির মধ্যে স্থায়ী সম্পর্কের ওলটপালট হয়ে গেলে যে ধাতু মুদ্রার দাম বাড়তে থাকে, সেটিকে গলিয়ে ফেলার প্রবণতা বাড়তে থাকে। মুঘল ভারতের মুদ্রা ব্যবস্থা এই জটিলতার থেকেও অনেক বেশি জটিল ছিল। সেই সমাজে মুদ্রা শুধু যে বহু ধাতুর(সোনার মোহর, রূপোর টাকা আর তামার দাম/পয়সা) ছিল তাই নয়, জনগণ দামি ধাতু বা পুরোনো মুদ্রা টাঁকশালে নিয়ে গিয়ে নতুন মুদ্রা বানানোর অধিকারী ছিল। বিভিন্ন ধাতুর মুদ্রার মধ্যে কোন স্থায়ী সম্পর্ক ছিল না।

আগেই বলেছি সোনার মোহরের উপযোগিতা ছিল উৎসব বা উপহারের জন্য। তবে তার ব্যাপক ব্যবহার ছিল সঞ্চয় করার উদ্দেশ্যে। কিন্তু সাধারণ দৈনন্দিনের লেনদেনে রূপোর সিক্কা টাকা বা তামার দাম বা পয়সার যে গুরুত্ব ছিল, মোহরের সেই ব্যবহার ছিল না। ফলে বিশেষভাবে বলা না হলে টাকা শব্দটা বলা থাকলে বুঝতে হবে এটা সেই বছর বা তার আগের বছরে তৈরি হওয়া রূপোর সিক্কা টাকার কথা বলা হয়েছে। দুবছরের আগের ছাপা মুদ্রা, যার নাম ছিল চালানি না খাজানা টাকা, তার পেমেন্টের ওপর বাজার নির্ধারিত একটা বাটা ধরে নেওয়া হত। বাস্তবে এই বাটাটির হার মোটামুটি নির্ধারিতই ছিল। এটা খুব বেশি কমত বা বাড়ত না। কিন্তু সিক্কা টাকা আর তামার দামের পয়সায় হারটা বেশ বাড়া কমা করত। আইনিআকবরি সূত্রে জানছি এর হার ছিল ৪৮ঃ১। এটা নির্ণিত হয়েছিল ১৫৭৫এ সরকারি খরচের উদ্দেশ্যে। কিন্তু বাস্তবিক বাজার দর এর থেকে অনেক আলাদা ছিল। দামের দাম বেড়ে দাঁড়ায় ৩৫ঃ১, ১৫৮৩র আগেই এবং তখন নতুন বিনিময় স্থির হয় ৪০ঃ১। আইনিআকবরি বলছে এই হারটা ১৫৯৫-৯৬ সালের জন্য, যে বছরে এটি লিখিত হয়। এর ফলে সমাজের একটি স্তরে বেশ বিশৃঙ্খলা এবং তকলিফ দেখা দেয়।

আকবরের মনসবদারদের সেনাদের মাইনে দেওয়া হত দামে। ১৫৭৫ সালে রূপিতে ৫০%, ২৫% মোহরে এবং বাকি ২৫% দামে বা পয়সায় মাইনে মেটানো হল। সেনাদের হাতে রূপি আর দামের মধ্যে বিনিময় করতে পাদশাহ নির্দেশ দিলেন দামের আর রূপি(সিক্কা)র তুলনা হবে ৪০ঃ১(Irfan Habib, ‘A System of Trimetallism in the Age of the ‘Price Revolution’: Effects of the Silver Influx on the Mughal Monetary System’ in J.F. Richards (ed.), The Imperial Monetary System of Mughal India)।

মন্তব্যঃ মনসবদার - মুঘল সাম্রাজ্যে সব সেনা আর প্রশাসনিক পদের নাম ছিল মনসবদার। এদের দু ধরণের পদ ছিল জাট আর সওয়ার। জাট পদ নির্ধারিত হত প্রশাসনিক শৃঙ্খলে সরকারিভাবে ওঠাপড়ার জন্য, সেখানে তিনি সাম্রাজ্যকে বছরের সেবা দেওয়ার মাইনে পেতেন। আর সওয়ারে তাকে কিছু সঙ্খ্যক সেনা, ঘোড়সওয়ার এবং তোপখানা(গোলাবারুদ) পালতে হত সাম্রাজ্যের যুদ্ধের জন্য। তিনি বাৎসরিকভাবে এই বিশাল সেনাবাহিনী পালনের একটা আর্থিক বরাদ্দ পেতেন। এগুলো তাকে নগদে দেওয়া হত না। তার জন্য তাকে একটা ভৌগোলিক এলাকা দিয়ে দেওয়া হত, যাকে বলা হত জায়গির, সেখানকার রাজস্বে তিনি সব ব্যয় মেটাতেন। প্রথম দিকে আকবর মনসবদারদের অর্থে মাইনে মেটাতেন। পরের দিকে গোটা বেতনটাই জায়গির থেকে তুলতে হত। আওরঙ্গজেবের সময় সারা দেশের রাজস্বে জমির ৪/৫ অংশই বরাদ্দ ছিল মনসবদারদের অর্থ মেটানোর জন্যে

Friday, January 20, 2017

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা - বিশ্ববাংলা বিপনী

আমলারা সাংসদ যোগেন চৌধুরীর ছবি কেনার সময় তাঁর ছবির উতপাদন ব্যয় চাইবেন তো?

বেশ বড় লেখা হবে। দয়াকরে চোখ বুলোবেন। ভাঙ্গড়ের বিপ্লবী উত্তাপে যেন এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি পিছনে চলে না যায়।

আমরা মনে করি মমতা সরকার গ্রামের বিকাশের জন্য যা করেছেন, সেই কাজ বিগত ২৫০ বছরে কোন সরকার করে নি।

অথচ সরকারের গ্রাম-লক্ষ উদ্দেশ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প - বিশ্ববাংলাকে রাস্তা ছাড়া করতে আমলারা উঠে পড়ে লেগেছেন।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিশ্ববাংলা বিপনী প্রকল্প শুরু করেছিলেন সরকারে আসার প্রথম বছর থেকেই। অসাধারণ ছিল সেই প্রকল্পটি - অতীতের ভুলগুলি থেকে শিক্ষা নিয়ে গ্রাম উদ্যোগীদের থেকে পণ্য কিনে বিক্রি করা।

সমস্যা ছিল। বিশ্ববাংলার দাম।

বিপনীগুলোয় পণ্য কি দামে বিক্রি হয়, তা ভুক্তোভুগীরা নিশ্চই খেয়াল করেছেন। মাস পাঁচেক আগে দীপঙ্কর(দে)দা একটা শাড়ি কিনতে গিয়ে ছিটকে বেরিয়ে এসেছিলেন।

যে দামে আমলারা পণ্য কিনতেন তার থেকে অন্তত চারগুণ দামে সেই পণ্য তাদের দোকানে বিক্রি করতেন। সেই চড়ানো দামের ভাগিদার হতেন না গ্রামীন উতপাদকেরা। এই নীতি হয়ত কর্পোরেট/ব্যক্তিগত উদ্যমের আপণে চলতে পারে, কিন্তু কেন কোনও সরকারি উদ্যমে চলবে তার কোন সদুত্তর ছিল না।

এবং গত কয়েক বছর ধরেই গ্রামীন উদ্যোগীরা তাদের পণ্যের নির্দিষ্ট দাম বাড়াবার দরবার করছিলেন। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতার ধুয়ো দেখিয়ে সেগুলি এড়িয়ে গিয়েছেন কর্মকর্তারা। আর দাম বাড়াবার কথা বললেই পণ্য না নেওয়ার পরোক্ষ হুমকি তো ছিলই।

এ প্রসঙ্গে বলা ভাল বিশ্ববাংলার পণ্য কেনে এবং টাকা দেয় মঞ্জুষা। সেখানে তিন/চার মাসের আগে টাকাই পাওয়া যায় না।

তবুও চলছিল। বেশ ভালই। নানান অসুবিধে মোটামুটি মেনেই নিয়েছিলেন বাঙলার গ্রামীন উতপাদকেরা।

কিন্তু গোল লাগল গত পাঁচ ছ মাস আগে।

দপ্তরের আমলারা একটা ফরমান জারি করলেন, যাতে বলা হল প্রত্যেক সরবরাহকারীকে তাদের উতপাদনের ব্যয় দপ্তরকে জানাতে হবে - এবং একটা নির্দিষ্ট দিনে সেই ব্যয়ের তালিকা নিয়ে উতপাদকেদের আমলাদের কমিটির সামনে উপস্থিত হয়ে তাদের সন্তষ্ট করতে হবে। আমলারা যদি তাদের জবাবে সন্তুষ্ট হন, তাহলে তাদের থেকে যে দামে পণ্য কেনা হচ্ছে সেই দাম বজায় থাকবে, নয়ত কমবে।

পণ্যের দাম বাড়ানোর দাবি তো খারিজই করা হল, উলটে এমন একটা পরিবেশ তৈরি করা হল, যাতে উদ্যমীরা দাম কমাতে বাধ্য হয়।

এই নব্য আমলাতান্ত্রিক দাম কমানোর নীতি কি আদৌ বিশ্ববাংলা তৈরির নীতির সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ?

সেই প্রসঙ্গে কতগুলি প্রশ্ন; সেগুলি জরুরি কি না ঠিক করবেন সরকারের সঙ্গে যুক্ত মানুষেরা -

১। সরকার গ্রামীন যে উৎপাদনগুলি কিনছে সেগুলির উতপাদন খরচ জানতে চেয়ে ফরমান জারি করতে পারে? এটি কতটা নীতি সাপেক্ষ? সেই বৈঠকে উপস্থিত না হলে কি তাদের কালো তালিকভুক্ত করার হুমকি দিতে পারে?

২। আমুল বা ব্রিটানিয়ারমত নামি ব্রাণ্ডের পণ্যের উতপাদন ব্যয় চাওয়া হবে তো? কোম্পানির আমলাদের জবাবে সরকারি আমলারা যদি সন্তুষ্ট না হন, তাহলে তাদের পণ্যের দাম কমাতে বলার বুকের পাটা ক'জন আমলার রয়েছে ?

২। গত চার/পাঁচবছর ধরে বিশ্ববাংলাকে এক পাটের জুতো উতপাদক(এক জোড়ার দাম মাত্র ১০০-১১০টাকা, এই দামে বাজারে অন্য কোন জুতো কিনে দেখুন) একই দামে জুতো সরবরাহ করে আসছেন।গত দু'বছর ধরে তাঁর দাম বাড়ানোর আকুতি সরকারের আমলারা প্রত্যেকবার খারিজ করে দিয়েছেন। সরকার কি মনে করে, শ্রমের মূল্য তো ছেড়েই দিলাম, এই কয়েক বছরে বাজারে কাঁচামালের দাম বাড়ে নি একই আছে?

৩। একটা ৫০০ টাকার মুখোশ আর ১০টাকার পুতুলের দাম কি তার কাঁচা মাল আর শ্রমের মূল্য দিয়ে নির্ধারিত হয়, নাকি তার পরম্পরারগুণে, তার ঐতিহ্যের টানে নির্ধারিত হয়।

৪। তাহলে প্রশ্ন এবার থেকে সরকারের আমলারা, সাংসদ যোগেন চৌধুরীর ছবি কেনার সময় তাঁর ছবির উতপাদন ব্যয় চাইবেন তো?

আমরা যারা এই মানুষদের সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত, তাদের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের কাছে প্রশ্ন হল, আপনার সরকার মানুষের কাছে দায়বদ্ধ, আমলারা নয়। এই আমলারাই সরকারকে পথভ্রষ্ট করার জন্য অন্যতম অনুঘটক। মন্ত্রীরা কি আমলাদের এই নীতি সমর্থন করছেন?

আমরা মনে করি গ্রামীনেরা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ আমলাদের কাছে নয়।