Showing posts with label বাংলার বাণিজ্য. Show all posts
Showing posts with label বাংলার বাণিজ্য. Show all posts

Tuesday, September 12, 2017

বাংলা যখন বিশ্ব সেরা - বাংলার বাণিজ্য৬

বাংলার আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ডাচেরাই ছিল ব্রিটিশদের প্রতিদ্বন্দ্বী। ডাচেরা যে বিপুল অর্থ নিয়ে আর কূট বাণিজ্য বুদ্ধি নিয়ে ব্যবসা শুরু করেছিল তা বহুকাল ব্রিটিশদের দমিয়ে রেখেছিল। বাংলায় ব্রিটিশদের একটু পরে যাত্রা শুরু করেও, সমস্ত ব্যবসায়িক এবং শিল্পপ্রধান এলাকায় তাদের কুঠী ছিল। এবং ১৭৫৭র কিছু আগে পর্যন্ত ব্রিটিশদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তারা বাংলার পণ্য কিনত। এবং ইওরপিয় কোম্পানিগুলোর মতই তারা বিভিন্ন এলাকায় লুঠপাট চালিয়ে যে সোনারূপো দখল করত সেগুলি নিয়ে তারা বাংলায় বিনিয়োগ করত পণ্য কেনার জন্য। একটু আগে যে কূট বাণিজ্য বুদ্ধি কথাটা ডাচেদের বাণিজ্য বিশেষণ হিসেবে বলেছি, সেটা হল তাদের গোটা এশিয় বাণিজ্য স্বনির্ভরতা, যা সব ইওরোপিয় কোম্পানির ছিল না। এশিয়ায় বাজার বুঝে হিঁয়াকা মাল হুঁয়া, আর হুঁয়াকা মাল হিঁয়া করে তার এশিয় বাণিজ্যে বিপুল উদ্বৃত্ত তৈরি হত। তারা জাপান থেকে তামা, মালয় উপদ্বীপ থেকে টিন আর দস্তা, তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা পূর্ব ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জ থেকে লঙ্কা, লবঙ্গ, জৈত্রী, জায়ফল ইত্যাদি বাংলায় নিয়ে আসত। শুধু বাংলা নয় দক্ষিণ ভারত আর পশ্চিম ভারতের নানান এলাকাতেও তারা ব্যবসা করত। আর বাংলার পণ্য তারা নিয়ে যেত তাদের দক্ষিণ পূর্ব এশিয় উপনিবেশ এবং পূর্ব ভারতীয় দ্বীপুঞ্জে আর ইওরোপে। হল্যান্ডে নিয়ে যেরত সুতিবস্ত্র, রেশমি বস্ত্র, কাঁচা রেশম আর সোরা।

১৮৩১/১১৩৮এ ডুপ্লে ফরাসী কোম্পানির বাংলার গভর্নর হয়ে এলেন। আলেকজান্দার হ্যামিলটনের বর্ননায় জানতে পারি চন্দননগরে ফরাসীদের সুন্দর একটা চার্চ রয়েছে। তারা সক্কলে সেই চার্চে সমবেত হয়ে প্রার্থনা করে। ডুপ্লে আসার আগে মাত্র ছ খানি দেশি নৌকোয় তাদের বাণিজ্য চলত, মাঝে মধ্যে তাদের ব্যবসাও থাকত না, তখন সেগুলি বসেও থাকত। তিনি ৩০ থেকে ৪০ টি বড় জাহাজ ব্যবস্থা করলেন বাংলায় ফরাসী ব্যবসার জন্য। চন্দননগরের ইন্দ্রনারায়ণ চৌধুরী আর খ্বাজা ওয়াজেদ হলেন ফরাসীদের দেওয়ান, অর্থাৎ তাদের মাধ্যমে বাংলার উতপাদকেদের সঙ্গে বাণিজ্য করত ফরসীরা। তিনি যখন তার দশ বছর পরে পণ্ডিচেরির গভর্নর জেনারেল হয়ে গেলেন, তখন বাংলায় ফরাসী বানিজ্যে ৭০ খানা জাহাজ খাটছে, বাংলার পণ্য ফরাসীরা পাঠাচ্ছে সুরাট, বসরা, জেড্ডা, মোখা, এবং চীনে। তারা বাংলা থেকে সূতী আর রেশম বস্ত্র আর বাংলার সোরা কিনত আর কিনত চিনি আফিম, লাক্ষা, চাল, কড়ি ইত্যাদি।

ডুপ্লের পর বাংলায় ফরাসী ব্যবসা উদ্যম সঠিক নেতৃত্বের অভাবে ঝিমিয়ে পড়ে। আর ইওরোপে ফরাসিদের সঙ্গে ইংরেজদের নিয়মিত লড়াই তাদের বাণিজ্য মন্দার আরেকটি কারণ। তবুও ১৭৪১/১১৪৮ থেকে ১৭৫৩/১১৬০ পর্যন্ত ফরাসীদের বাণিজ্যের পরিমান নেহাতই মন্দ নয়। চুঁচুড়ার ডাচেদের ফ্যাক্টরদের চিঠি সূত্রে জানা যাচ্ছে ফরাসীদের বাংলা ব্যবসা বিপজ্জনকভাবে ঢালের দিকে যাচ্ছিল। ইওরোপে ফরাসীদের সঙ্গে ইংরেজদের সাত বছর ব্যাপী যুদ্ধ শুরু হলে ক্লাইভ ১৭৫৭/১১৬৪র মার্চ মাসে চন্দননগর দখল করে নেন।

আদতে বাংলায় পলাশীর আগে শাসকেরা অত্যন্ত দূরদর্শী ছিলেন। তারা ইওরোপিয়দের সঙ্গে ব্যবসা করতেন ঠিকই, কিন্তু ইওরোপিয়দের রাজনীতিতে মাথা গলানো, বা সামরিক ক্ষমতা বা আঞ্চলিক এলাকা দখল এবং সেই সূত্রে ক্ষমতা বৃদ্ধি বৃদ্ধি তারা সহ্য করেন নি। মোগলদের সঙ্গে ইংরেজরা বহু লড়াই হেরেছে, পলাশীর আগে বাংলায় বহুবার ইংরজরা নবাবী ফৌজের হাতে জোর মার খেয়েছে। একমাত্র আরমেনিয়দের কোন সামরিক বাহিনী ছিল না। বাংলার নবাবেরা চাইতেন অন্যান্য ইওরপিয়রা আরমেনিয়দের মত শুধুই ব্যবসা করুক, কোন রাজনৈতিক প্রভুত্বের উচ্চাশা ছাড়া। দিল্লি থেকে তারা যে সব সুযোগ সুবিধের ফরমান পতাকা বয়ে নিয়ে আসতেন সেগুলো সাধারণভাবে মান্য করেও নবাবেরা নিজেদের মত করে আইন করে তাদের ব্যবসার ওপর খবরদারি করে গিয়েছেন।

ফরাসী আর ডাচেরা দিল্লিতে দরবার করে বাণিজ্য শুল্কের হার সাড়ে তিন থেকে আরাই শতাংশে নামিয়ে নিয়েছিলেন। ১৭১৬/১১২৩শে ইংরেজরা তিন হাজার টাকার বিনিময়ে ফারুখশিয়রের ফরমান বলে বাংলায় বিনা শুল্কে ব্যবসা করার অনুমতি পেয়েছিল। ইওরোপিয় কোম্পানিগুলি দেশিয় বহির্বাণিজ্য উভয়েতেই অংশ নিত। দেশি বণিকদের কাছে কোম্পানি দস্তক অবৈধভাবে বিক্রি করা, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে ব্যবসা করা, শুল্ক ফাঁকি দেওয়া ইত্যাদি নিয়ে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে নিয়মিত বিরোধ বাধত। সোরা আর লবনের ব্যবসায় বেশি করে বিরোধ নিয়মিত চলত। ইওরোপিয়দের জলদস্যুতা, পলাতক নবাবী কর্মচারীদের আশ্রয় দেওয়া, দেশিয় মহাজন-বণিকদের সঙ্গে বিরোধ, ইত্যাদিতে বাংলার নবাবদের সঙ্গে ইওরোপিয়দের তিক্ততা বাড়িয়ে তুলত। কর্মচারীদের উতকোচ গ্রহণ আর বাড়তি লাভের আশা এই বিরোধ আরও বাড়িয়ে তুলত।

বাংলা যখন বিশ্ব সেরা - বাংলার বাণিজ্য৫

এই পর্ব শুরু করতে গিয়ে বলা গিয়েছিল যে বাংলা তথা ভারতের উৎপাদন ব্যবস্থার ধরণ ইওরোপিয় চাপিয়ে দেওয়া কেন্দ্রিভূত উৎপাদন ব্যবস্থার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। কর্পোরেটরা তাদের মত ব্যসা করত, আর বাংলা তাদের মত করে উৎপাদন। ইওরোপিয়রা সারা বিশ্ব লুটে বিপুল সোনাদানা নিয়ে বাংলায় পণ্য কিনতে আসত, তার নাম ছিল ইনভেস্টমেন্ট। প্রত্যেক কর্পোরেট একই ধরণের ব্যবসা পদ্ধতি অনুসরণ করত। তারা উতপাদকেদের অগ্রিম দাদন দিত, যাতে উৎপাদকেরা নির্দিষ্ট পরিমান পণ্য তাদের দিতে বাধ্য থাকে।

কোম্পানি কিন্তু দাদনি বণিকদের সঙ্গে প্রাথমিকভাবে চুক্তিবদ্ধ হচ্ছে না, তারা চুক্তিবদ্ধ হচ্ছে উৎপাদকের সঙ্গে, মাঝখানে থাকছে দালাল, সেই দালালই কোম্পানির হয়ে উতপাদকেদের অগ্রম দিত। যে দালাল ব্যবসায়ীরা দাদন দিত তাদের নাম ছিল দাদনি বণিক। এদের একটা বড় অংশ নবজাগরণের অগ্রদূতেদের পূর্বজ। এরা নির্দিষ্ট দিনে নির্দিষ্ট দামে নির্দিষ্ট গুণমানে নির্দিষ্ট পণ্য নির্দিষ্ট কুঠিতে সরবরাহ করতে বাধ্য থাকত। এরা পণ্যের অর্ধেক অগ্রম পেত, যা উতপাদকেদের দিতে হত, আর মোট ব্যবসার একটা অংশ দালালি পেত। এ প্রসঙ্গে বলা দরকার বহু ঐতিহাসিক স্বীকারই করেন নি, কিন্তু হাতে গোণা ঐতিহাসিক – যেমন দাক্ষিণাত্যে্র তাঁতিদের নিয়ে কাজ করা প্রসন্নন পার্থসারথি বা বাংলায় ডাচেদের নিয়ে কাজ করা ওমপ্রকাশ দাবি করেছেন তাঁতিরা(এবং হয়ত অন্যান্য উৎপাদকেরাও দাদন ফিরিয়ে দিতে পারত, এবং পলাশীর পরে রাষ্ট্রীয় অত্যাচারে তাদের এই হাজার হাজার বছরের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়। বলা দরকার পলাশীর আগে নবাবেরা বা তার আগের মুঘল আমলে উতপাদকেদের অস্বাভাবিকভাবে লালন পালন করা হত। তাদের ওপর যে কোন অত্যাচার কঠোর হাতে দমন করা হত। তাই হয়ত উৎপাদকেরা অনেক বেশি জোর পেতেন যে কোন অত্যাচার রুখবার। ফলে দাদন বাতিলের মত অসাধারণ অধিকারের জন্ম হয়েছিল বাংলা তথা ভারতের মাটিতে। অধিকার রক্ষার আন্দোলনে কোন দিনই এই বিষয় আলোচনা হয় নি, যতটা আলোচনা হয়েছে এই সময়ের কথিত সামন্ততন্ত্রের ভুত নিয়ে) দাদন বাতিল করতে পারতেন। ছোটলোকেদের দাদন কারণ না দেখিয়ে ফেরৎ অধিকার বজায় থাকলে কর্পোরেট ব্যবসা জমে না। তাই বারবার কোম্পানিগুলোর খাতায় অভিযোগ করা হয়েছিল যে তারা নির্দিষ্ট সময়ে মাল্পত্র পাচ্ছে না। তাই ইওরোপিয় ব্যবসায় একচ্ছত্র ইংরেজ কোম্পানি নতুন এজেন্সি ব্যবস্থা নিয়ে এল বাংলায় ১৭৬৫/১১৬০ সালে, পলাশী হতে তখনও বছর চারেক বাকি। এবারে কোম্পানি প্রাথমিকভাবে চুক্তিবদ্ধ হল নতুন ধরণের দালালদের সঙ্গে, যাদের নাম গোমস্তা। এই দালালেরা কোন উতপাদকেদের কি দেবে সেটা তাদের মাথা ব্যথা, কোম্পানির ঘরে নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট পরিমান পণ্য এলেই হল। এবারে আর দাদনি বণিকদের আর অস্তিত্ব থাকল না।

এই সময় পর্যন্ত কর্পোরেট কোম্পানিগুলি সারা বিশ্ব লুঠ করে বাংলায় আসছিল পণ্য কেনার জন্য। এশিয় বিশ্বের বাইরে এমন কিছু উৎপন্ন হয় না যা বাংলা তথা এশিয়ার বাজারে চলতে পারে। ফলে ইওরোপ, আমেরিকা, আফ্রিকা আর এশিয়ার অন্যান্য দেশ উজাড় করে সোনা রূপো জাহাজে ভর্তি করে বাংলায় নিয়ে আসত। পলাশীর আগে ইওরোপের আমদানির ৭৪ শতাংশ ছিল সোনা আর রূপো। আর ছিল ব্রড ক্লথ, পশমের কাপড়, দস্তা, সীসে, লোহা, টিন, তামা, পারদ, অস্ত্রশস্ত্র, মদ্য ইত্যাদি যা মোট বাণিজ্য পরিমানে নগণ্য থেকে নগণ্যতর। ডাচেরা যে তামা আনত, তা তাদের ব্যবসার তুলনায় এতই কম যে, সেগুলি তাদের পণ্য নিয়ে আসার জাবদা খাতায় লেখাই হত না, তার ইতিহাস পাওয়া গিয়েছে বাংলার শুল্ক চৌকিতে কোম্পানির শুল্ক দেওয়ার হিসেবের খাতায়। বেচু ইংরেজরা জাহাজ ভর্তি করে প্রচুর ব্রড ক্লথ নিয়ে আসত বাংলায় কিন্তু একটাও বিক্রি হত না(লেটার টু দ্য কোর্ট দ্রষ্টব্য), পড়ে থাকত কুঠির গুদামে – হয়ত কোন ইংরেজ পালিত দাদনিবণিক গর্ব সহকারে নিয়ে যেত বাড়িতে, যদিও তারা হাতে গোনাও নয়, করগোণা (রীলা মুখার্জীর কাশিমবাজারের রেশম শিল্পের গবেষণা – সেন্টারের ওকেশনাল পেপার, The_story_of_kassimbazar_stil_merchants_and_commerce_in_the_eighteenth_century)। এদেরই উত্তরপুরুষেরাই হয়ত ব্রিটিশের পা-চাঁটা নবজাগরণের অগ্রদূত হয়েছেন। রপ্তানি বাণিজ্যের লাভ আমদানি বাণিজ্যের ক্ষতিকে পুষিয়ে দিত। ইওরোপে ভারতীয় বস্ত্রের ওপর উচ্চহারে আমদানি শুল্ক ধার্য করা হয়েছিল। তবে ইওরোপের বাজারে বাংলার সুতি আর রেশম বস্ত্রের এত চাহিদা ছিল যে তার প্রভাব কিছুই ছিল না। ইংরেজরা বাংলায় এই সময়ে যে বাণিজ্য করত, তার বার্ষিক পরিমান দাঁড়াত তিন লক্ষ পাউন্ড বা চব্বিশ লক্ষ টাকা। ১৭০৮/১১১৫ থেকে ১৭৫৬/১১৬৩ পর্যন্ত বাংলায় ইংরেজরা ৬৪০৬০২৩ পাউন্ড দামের সোনারূপো আর ২২,৮৩,৮৪৩ পাউন্ডের পণ্য এনেছিল। ১৭০০/১১০৭এ রপ্তানি আবণিজ্যের পরিমান ছিল ১৮,৯৬,৯৬৮ টাকা বা ২৩৭১২১ পাউন্ড। ১৭৫৫য় রপ্তানি বাণিজ্যের পরিমান গিয়ে দাঁড়াল ৩২৯২০৪০ টাকা বা ৩৩০৯৩৮ টাকা। প্রাক পলাশী যুগে ১৭৪২/১১৪৯ সালে সব থেকে বেশি বাণিজ্য করেছিল ৪৪৮৩১৬০ টাকা বা ৫৬০৩৯৫ পাউন্ড। এই সময়ে অংশীদারেরা ৫ থেকে ১০ শতাংশ হারে লভ্যাংশ পেতেন।
(ক্রমশঃ)

বাংলা যখন বিশ্ব সেরা - বাংলার বাণিজ্য৪

ইয়োরোপীয়রা ছাড়া বাংলা বানিজ্যে চিনা, তুর্কি, ইরানী, আমিসিনিয়, জর্জীয়, আর্মেনিয়, গ্রিসিয় ইত্যাদি দেশের বণিকদের দেখা মিলত। বলা দরকার কোন দেশের ব্যবসায়ী বাংলায় আসত না! লোহিত সাগর আর পারস্য উপসাগরের উপকূল জেড্ডা(আরব), মোখা(য়েমেন), বসরা(ইরাক), গোম্ব্রুন(পারস্যের বন্দর আব্বাস) আর পূর্ব, দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার ইন্দোনেশিয়া, সুমাত্রা, মালয় এবং আফ্রিকার পূর্ব উপকূলে কেনিয়া ও মোজাম্বিকে এই ব্যবসায়ীরা বাংলার পণ্য নিয়ে যেত। ঐতিহাসিক ভাবে চিনে আর ম্যানিলাতে বহু শপ্ত বছর ধরে বাংলা আর বিদেশি ব্যবসায়ীরা বাংলার পণ্য রপ্তানি করত। বাংলা থেকে তারা সংগ্রহ করত বাংলার নিজস্ব শিল্পজাত পণ্য সূতি আর রেশম কাপড়, কাঁচা রেশম, মসলিন, আফিম, চাল, চিনি, আদা, হলুদ, লম্বা লঙ্কা ইত্যাদি। এরা বাংলায় ঐ সব অঞ্চল থেকে বয়ে আনত তুলো, লঙ্কা, ফল, ওষুধ, শাঁখা, কড়ি, টিন, তামা, বাদাম, ঘোড়া, গোলাপজল, সিরাজী মদ্য ইত্যাদি। ১৭১৭/১১২৪ সালে পাঁচশ টন মাল পারস্যে গিয়েছিল। ১৭৩০/১১৩৭এ রাজনৈতিকভাবে পারস্য আর ইরাকি অঞ্চলে অশান্তি থাকায় লোহিত সাগর আর পারস্যে কম মাল গিয়েছিল। ব্রহ্মদেশে বাংলার বাণিজ্য ছিল। ব্রহ্মদেশ থেকে আনা হত জাহাজ তৈরির দামি কাঠ, টিন, চন্দন, সাপান কাঠ ইত্যাদি।

পলাশীর আগেই বাংলায় ইওরোপিয় তিনিটি কোম্পানি ইংরেজ, ফরাসি আর ওলান্দাজদের বিস্তৃত কুঠি আর দুর্গ তৈরি করে ফেলেছিল। ইংরেজদের কলকাতা আর ফোর্ট উইলিয়াম, ফরাসিদের চন্দননগর ও ফোর্ট অরলিও আর ওলান্দাজদের চুঁচুড়া আর ফোর্ত গুতাভাস ছিল ইওরোপিয় বণিকদের বাংলাজোড়া বাণিজ্য আর সুরক্ষার প্রধান ঘাঁটি। কলকাতার আশেপাশের এলাকা ছাড়া ঢাকা, কাশিমবাজার, মালদা, রাজমহল, বর্ধমান, মেদিনীপুর, হুগলি, দিনাজপুরে কোম্পানির ব্যবসা আর বাণিজ্য কুঠি ছিল। এদেশের রাষ্ট্র শক্তির সঙ্গে ইওরোপিয়দের অম্লমধুর সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছিল। ইওরোপিয় করপোরেটরা এদেশে তাদের অনুগত বেশ কিছু বণিকগোষ্ঠী গড়ে তোলে। ফলে তাদের মূলধনের অভাব হত না। এদেশের বণিক মহাজাওন তাদের অক্লেশে টাকা ধার দিত। জগতশেঠেরা অপরিমিত সম্পদের মালিক ছিল এবং এদের সুদের হারও খুব বেশি ছিল না, বার্ষিক ৯ শতাংশের আশেপাশে।

এই তিনটি ইওরোপিয় কর্পোরেট কোম্পানি ছাড়া এ সময়ে আরও তিনটি ইওরোপিয় কোম্পানি বাংলার আন্তর্জাতিক ব্যবসায় ভাগ বসাবার ব্যর্থ চেষ্টা করেছে। এরা হল দিনেমার, বেলজিয়ামের অস্টেন্ড আর জার্মানির এমডেন কোম্পানি। ১৭১৪/১১২১ সালে দিনেমারেরা বাংলাদেশে কিছুটা ব্যবসা করেছিল। ললিত মোহন মিত্রর ডেনস ইন বেঙ্গল বই থেকে জানছি, বাংলা সরকারের সঙ্গে গণ্ডগোল দেখা দিলে তারা চন্দননগরের গোন্দলপাড়ার কুঠি উঠিয়ে নিয়ে, বাংলা ছেড়ে ত্রিভাঙ্কুর চলে যায়। ১৭৫৫/১১৬২র আলিবর্দির শেষ সময় পর্যন্ত তাদের বাংলার বাণিজ্য ক্ষেত্রে দেখা মেলে না। তারপরে তারা বাংলায় এসে শ্রীরামপুরে উপনিবেশ স্থাপন করে। অস্ট্রিয়ার সাম্রাজ্যের বেলজিয়ামের অস্টেন্ড কোম্পানি ১৭২৬/১১৩৩ সালে ব্যারাকপুরের বাঁকি বাজারে তাদের কুঠি খুলেছিল।

কালিকিঙ্কর দত্তের আলিবর্দি এন্ড হিজ টাইমসএ পাচ্ছি, প্রথম থেকেই ব্রিটিশ এবং ডেনিসেরা অস্টেন্ড কোম্পানির প্রতি বিদ্বেষভাবাপন্ন হয়ে পড়ে। অস্ট্রিয়ার সম্রাটের কাছে কুঠি বন্ধ করে দেওয়ার আবেদনও করেছিল। ১৭৩৩/১১৪০ সালে সুজাউদ্দিনের ওপর প্রভাব খাটিয়ে, ঘুষ দিয়ে তাদের বাংলা থেকে উচ্ছেদ করে। এরা বাংলার বেশ কিছু ইওরোপিয় পণ্য শস্তায় বিক্রি করত। আলিবর্দির সময় প্রুশিয়ার রাজা দ্বিতীয় ফ্রেডরিক এমডেন কোম্পানির হয়ে বাংলায় ব্যবসা করতে চেয়েছিলেন। আলিবর্দি বা ইংরেজ কেউই জার্মানদের পছন্দ করে বি। ফলে জার্মানদের এই প্রচেষ্টা অল্পকাল পরেই ত্যাগ করতে হয়।

শেষ পর্যন্ত টিকল ইংরেজ ডাচ আর ফরাসিরা। ফরাসি আর ডাচেদের অবস্থা পড়তির দিকে। চতুর্দশ লুইয়ের রাজত্বের শেষের দিকে স্পেনিয়দের উত্তরাধিকারের ফলে ফরাসিরা বাংলা বাণিজ্য সম্পর্কে উৎসাহ হারিয়ে ফেলে। ডুপ্লে বাংলা থাকার দশকটিতে(১৭৩১/১১৩৮-১৭৪১/৪৮) কিছুটা ব্যবসায় প্রাণ সঞ্চার করেছিলেন, তাঁর পণ্ডিচেরি চলে যাওয়ার পরে বাংলায় ফরাসি বিনিয়োগ আবার ঝিমিয়ে পড়ে। ডাচেদের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্রিটিশদের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার ছিল। তারা বাংলাকে ভিত্তি করে এশিয় উদ্বৃত্ত বাণিজ্য তৈরি করেছিল, কিন্তু পরিচালকদের মধ্যে প্রাসঙ্গিক-অপ্রাসঙ্গিক নানান বিতর্ক – বিশেষ করে কোম্পানির(ভিওসি – ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি) উচ্চপদস্থ কর্মচারীদের ব্যক্তিগত ব্যবসা নিয়ে বিতর্ক তাদের পিছিয়ে দেয়। বাটাভিয়ায় মশলা বাণিজ্য অনেক বেশি লাভজনক হওয়ায় তারা দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় ঝুঁকছিল। ফলে বাংলার বাণিজ্য মূলত ব্রিটিশদের হাতে চলে যায়।
(ক্রমশঃ)

বাংলা যখন বিশ্ব সেরা - বাংলার বাণিজ্য২

আভ্যন্তরীণ বাণিজ্যে দু ধরণের লবণ বিক্রি হত, একটি মাদ্রাজের করকচ আরেকটি বাংলা-ওডিসার সুন্দর সাদা লবণ। বাংলার লবনের চাহিদা ব্যপক ছিল। লবণ উত্তরভারতে পাঠানো হত কাশী আর মির্জাপুরে – সেখান থেকে অযোধ্যা, এলাহাবাদ, বুন্দেলখণ্ড আর মালব। অসম আর উত্তরপূর্বে বাংলার লবণ যেত বিপুল পরিমানে। ৫-৬শ টনের ভারবাহী চল্লিশটি নৌকো অসমে লবণ নিয়ে যেত প্রতিবছর। শুধু লনব বাণজ্যে বাংলার লাভ হত প্রায় ২০০ শতাংশ।

বাংলা যদিও বিখ্যাত ছিল বস্ত্রের জন্য কিন্তু যা উৎপাদন হত, তার কাছাকাছি কার্পাস উৎপাদন হত না বাংলায়। আর যত পরিমান রেশম উৎপাদন হত বাংলায় ঠিক ততপরিমান রেশমি বস্ত্র তৈরি হত না এখানে। ফলে তুলো-রেশমের কাঁচামাল আদান-প্রদানের বাণিজ্য গড়ে উঠেছিল বাংলা-গুজরাটে। গুজরাট রাজ্য থেকে বিপুল পরিমান তুলো দিত বাংলাকে যার দাম তুলনামূলকভাবে কম আর বাংলা কাঁচা রেশম দিত গুজরাটে, যার দাম তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। আলিবর্দীর সময় শুধু চুণাখালি(মুর্শিদাবাদ) শুল্কচৌকির যে হিসেব পাওয়া যায় তাতে বাংলার বার্ষিক ৭০ লক্ষ টাকার রেশম আভ্যন্তরীণ বাণিজ্যে ব্যবহার হত – এই হিসেবে ইওরোপিয়দের রেশম কেনার হিসেব ধরা হয় নি। ফলে বাংলা-গুজরাটের মধ্যে যে বিপুল বাণিজ্য ঘাটতি হত তা গুজরাট পোষাত বাংলা থেকে বিপুল পরিমান খাদ্যদ্রব্য কিনে, এবং এই বিপুল পরিমান খাদ্য ফ্রব্য বাংলা থেকে গুজরাটে দক্ষিণাপথ বেয়ে নিয়ে যেত যাযাবর জিপসিরা অতি ন্যুনতম ব্যয়ে।

যেহেতু বাংলার একটি বড় উৎপাদন ছিল আখ, এবং পুণ্ড্রবর্ধনের একটি আখের প্রজাতির নাম পুণ্ডু, এবং তার ব্যপ্তি ছিল সারা ভারত জুড়ে, তাই বাংলার একটি বড় উৎপাদন ছিল চিনি এবং তার সুনাম ছড়িয়েছিল বাংলা, ভারত ছাড়িয়ে বিশ্বজুড়েও। ১৭৫৬র হিসেবে বাংলার বাণিজ্য পণ্যের একটা বড় রপ্তানি হল চিনি – যেত মাদ্রাজ, মালাবার, বোম্বাই, সুরাট আর সিন্ধু এবং দক্ষিণ পূর্বের দেশগুলিতে। এই সময়ে বাংলার মোট বার্ষিক রপ্তানিযোগ্য চিনির পরিমান ছিল ৫০ হাজার মন। চিনির ব্যবসায় প্রায় ৫০ শতাংশ লাভ হত।

বাংলায় চটের বিপুল ব্যবহার ছিল। উত্তরবঙ্গের রাজবংশী সমাজের মেয়েরা হাতে চটের নানান রকম পণ্য বুনত। যার নাম ধোকড়া। এই ধোকড়া বা চটের শতরঞ্চির ব্যাপক ব্যবসা করত বাংলা। তবে ইওরোপিয়রা পলাশীর আগে চটের ব্যবসায় ঠিক মত ঢোকে নি। কোম্পানির বম্বে আর মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সি বাংলাকে কিছুটা চটের গানি থলের বরাত দিয়েছিল।

বেশ কিছু কৃষিজ পণ্য লঙ্কা, চাল, আফিম, আদা, হলুদ ভারতের বিভিন্ন উপকূলে রপ্তানি হত। বাংলা সে সব অঞ্চল থেকে আমদানি করত শঙ্খ, টিন, কড়ি, ফল, ভেষজ, ওষুধ ইত্যাদি। ফরাসি, ইংরেজ, ওলান্দাজেরা আভ্যন্তরীণ বাণিজ্যে অংশগ্রহণ করত। এরা বাংলা থেকে চিনি চাল থলে আদা হলুদ তেল ইত্যাদি বম্বাই মাদ্রাজ সুরাট পুদুচ্চেরি কালিকট মাহে প্রভৃতি এলাকায় বিক্রি করত। এছাড়াও ফ্রি মার্চেন্ট এবং কোম্পানির প্রাক্তন কর্মচারীরাও এই ব্যবসায় অংশ নিত।

একইরকমভাবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যও বিপুল পরিমান বাংলার পক্ষে ছিল। ইংরেজ, ফরাসি, ওলান্দাজ, দিনেমার, বেলজিয়াম আর জার্মানদের সঙ্গে বাংলার বাণিজ্য সম্পর্ক ছিল। এছাড়াও পূর্ব ও পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে বাংলার ভাল বাণিজ্য সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। পশ্চিমে আরব, পারস্য, জর্জিয়া, আর্মেনিয়া, ইরাক, সিরিয়া, মিশর এবং কায়রোর মধ্যে দিয়ে অটোমান সাম্রাজ্যের সঙ্গে বিপুল বাণিজ্য সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল বাংলার। ডাও বলছেন পূর্ব এশিয়ার বাটাভিয়া, সুমাত্রা, মালয়, বার্মা, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, ইন্দোচিন, পেগু, আরাকান আর চিনের সঙ্গে ব্যাপক বাণিজ্য সম্পর্ক ছিল বাংলা-ওডিশার নানান বন্দর মার্ফৎ। কার্তিক মাস লক্ষ্মী পূর্ণিমার দিন বাংলা ওডিসার মেয়েরা কলা গাছের খোলা পালতোলা জাহাজের মত করে সাজিয়ে যে কোন জলাশয়ে ভাসিয়ে দেন। এটি আদতে বাঙ্গালি-ওডিয়া নাবিকদের দক্ষিণ-পূর্ব দেশে যাওয়ার স্মৃতি। পি জে মার্সাল ইস্ট ইন্ডিয়ান ফর্চুনসএ লিখছেন, ওলান্দাজদের মোট এশিয় বাণিজ্যের এক তৃতীয়াংশ বাংলার সঙ্গে আর ইংরেজদের মোড় এশিয় বাণিজ্যের ষাট শতাংশ বাংলার সঙ্গে সম্পাদিত হত। ডাও বলছেন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বাংলার পক্ষে ছিল এবং এই বাণিজ্যে বাংলা বিপুল অর্থ উপার্জন করত। আভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক বাণিজ্যে বাংলার লাভের পরিমান দাঁড়াত এ কোটি ষোল লক্ষ টাকারও বেশি।

আলেকজান্ডার হ্যামিলটন হুগলিকে বাংলার সব থেকে বড় আমদানি রপ্তানি বন্দর বলে উল্লেখ করেছিলেন। এ সময় হুগলি ছিল বক্স বন্দর বা বক্সী বন্দর, বাংলা সুবায় সব থেকে বড় শুল্ক চৌকি – যেহেতু বক্সীরা বন্দরের শুল্ক আদায়ের প্রধান ছিলেন তাই যে কোন বন্দরই বক্সী বন্দর নামে পরিচিত। ১৭২৮/১১৩৫ সালে হুগলি বন্দরে আমদানি-রপ্তানি শুল্কে আদায় হয়েছিল দুলক্ষ বিয়াল্লিশ হাজার চৌদ্দ সিক্কা টাকা। এর সঙ্গে যদিও পাশাপাশি নটি গঞ্জের শুল্কও ধরা আছে।

পলাশীর সময় হুগলিকে ম্লান করে কলকাতার উত্থান। ফরাসী আর ডাচেদের বাংলা থেকে ক্রম বিলয়, বাংলায় ইংরেজদের ব্যবসা বাণিজ্য আর রাজনৈতিক, প্রশাসনিক পকড় বাড়াতে সাহায্য করে। এখানে গড়ে ৫০টা জাহাজ আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলার রপ্তানি ও আমদানি পণ্য পরিবহনে ব্যবহৃত হত। এক লক্ষ নিবাসী কলকাতার তখন বাণিজ্যের পরিমান ১ কোটি টাকা। গ্রোস বলছেন বাংলার আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে তখন ৫০/৬০টা বড় জাহাজ প্রয়োজন হত।
(ক্রমশঃ)

Monday, September 11, 2017

বাংলা যখন বিশ্ব সেরা - বাংলার বাণিজ্য২

বাংলার নিজস্ব প্রচুর পণ্য তো ছিলই, কিন্তু বাংলার মূল ব্যবসা ছিল বিভিন্ন আন্তরাজ্য, আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহনের মাঝের দাঁড়ি(ট্রাঞ্জিট পয়েন্ট)। এটা মনে রাখা দরকার। ঐতিহাসিকভাবে বাংলায় ঘোড়া আমদানি হত। এগুলি আসত তুর্কি, পারস্য থেকে। এখান থেকে নানান ভাবে এশিয়ার নানান দেশে যেত। তুর্কি(ইংরেজদের ভাষায় টাট্টু) ঘোড়া সোজাসুজি তুর্ক প্রদেশ থেকে চলে যেতে পারত চিনে, কিন্তু বাস্তবে তা হত না। সেগুলি বাংলায় আসত হয় গুজরাট বন্দর হয়ে বা আফগানিস্তান হয়ে গঙ্গার দুপাশের মধ্যে উত্তরের রাস্তা ধরে শোনপুর মেলা হয়ে বাংলায়। আর একদল দক্ষিওণের রাস্তা ধরে দাক্ষিণাত্যে গিয়ে আসত বাংলায় জল বা স্থলপথে ঘোড়া নিয়ে।
এই তাত্ত্বিক প্রেক্ষিতে আমরা বাংলার বাণিজ্য ও যোগাযোগ অবস্থা বুঝতে চেষ্টা করব। মুর্শিদাবাদের ভগবানগোলা আর ঢাকার রাজনগর বড় ব্যবসা কেন্দ্র। এছাড়া বাংলা জুড়ে ছিল বিচিত্র পণ্যের বৈচিত্র্যতম বাজার। বড় মহাজন থেকে ছোট দোকান পর্যন্ত এই শৃঙ্খলে যুক্ত ছিল। উৎপাদকেরা যেমন তাদের কিছুটা অতিরিক্ত উৎপাদন তার নির্দিষ্ট বাজারের বাইরে পাঠাত, তেমনি তার মূল উৎপাদন বিক্রি করত কিন্তু আঞ্চলিক বাজারে, এক জেলা থেকে অন্য জেলায়। কিছু কিছু সওদাগর বণিক এক একটা পণ্য বাজারে প্রায় একচেটিয়া ক্ষমতা ভোগ করত, যেমন খ্বাজা ওয়াজেদ, লবণের ব্যবসায় একচেটিয়া কারবার করত। তেমনি চট্টগ্রাম আর শ্রীহট্ট অঞ্চলে ফৌজদারেরা বেশ কিছু পণ্যের ওপরে একচেটিয়া বাণিজ্য অধিকার কায়েম করেছিলেন। অন্যদিকে বহুকাল ধরেই শুধু ব্রিটিশ কোম্পানির কর্মচারী, কোম্পানির প্রাক্তন কর্মচারী(ইন্টারলোপার্স) বা সাধারণ ব্রিটিশ ব্যবসায়ী(ফ্রি মার্চেন্টস)রাই নয়, কোম্পানির একচেটিয়া সনদের অধিকারকে চ্যালেঞ্জ করে ব্যক্তিগত ব্যবসা করত অন্যান্য ইওরোপিয় কর্পোরেট কোম্পানির কর্মচারী ও সেই দেশিয় বণিকেরা।পলাশীর পরে ব্রিটিশদের হাতে কার্যকর ক্ষমতা চলে আসায়, ব্রিটিশ কোম্পানি, অন্যান্য ইওরোপিয় কোম্পানিকে, বাংলায় ব্যবসা দখলের মত করে বাংলা বাজার থেকে বার করে দিল।
ইওরোপিয় বণিকেরা এবং কোম্পানিরাও এদেশিয় ব্যবসায়ী এবং দালালদের বাজারের জ্ঞান, পুঁজি, ব্যবসায়িক বুদ্ধি, সাংগঠনিক বুদ্ধি ধার করত। ইওরোপিয় বণিকেরা ২০ থেকে ৩০ শতাংশ লভ্যাংশ পেত। সমককালীন ব্যবসার হিসেবপত্রে দেখা যায় বাংলার চালের ব্যবসায় মোটামুটি লাভের পরিমান থাকত ২০-২৫ শতাংশ। পণ্যের দাম সারা বছর ঠিক থাকে না, বাড়ে বা কমে। সেই অনুযায়ী লভ্যাংশ ঠিক হত।
প্রাক পলাশী সময়ে ডাও সূত্রে জানতে পারছি, বাংলা শুধু যে আভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের বড় শক্তি ছিল তাই নয়, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে তার আবশ্যিক বাণিজ্য সম্পর্ক ছিল। তার বাণিজ্য বিস্তার ছিল অসম ভূটান তিব্বত নেপাল থেকে পশ্চিমের গুজরাট, উত্তরে কাশ্মীর এবং উত্তরভারতের বিভিন্ন অঞ্চল, আর দক্ষিণের করমণ্ডল আর মালাবার উপকূল। এছাড়া পশ্চিম উপকূল বোম্বাই আর সুরাটের(দুটিই তখন গুজরাট রাজ্যে অবস্থিত ছিল) সঙ্গে ভাল যোগাযোগ ছিল – সুরাটের একটি বন্দর দিয়ে বাংলার সুপারি যেত বলে সেই বন্দরটির নামই হয়ে গেল সোপারা। গঙ্গার দুপাশ দিয়ে যে রাস্তা বাংলাকে পশ্চিম আর উত্তর ভারতের সঙ্গে জুড়েছিল, সেই রাস্তা ধরে বাণিজ্য হত।
সাধারণত মির্জাপুর দুই এলাকার মধ্যিখানের ঘাঁটি হিসেবে কাজ করত। উত্তর মধ্য ভারতের দিল্লি, আগ্রা, এলাহাবাদ, অযোধ্যা, কাশী, বুন্দেলখণ্ড ও মালবের সঙ্গে বাংলার ঘনিষ্ঠ ব্যবসা সম্পর্ক ছিল। এ সময়ে বাংলায় ব্যবসা করতে আসত আফগান, শেখ, কাশ্মীরি, মুলতানি, পগেয়া(পাগড়িধারী উত্তরভারতের ব্যবসায়ি, যে জন্য কলকাতায় আজও পগেয়াপট্টি নাম আছে), ভুটিয়া এবং সন্ন্যাসীরা। সন্ন্যাসি আর ফকিরেরা হিমালয়ের উদ্ভিজ্জ, ফসল, চন্দনকাঠ, নানান ধরণের বীজ, রুদ্রাক্ষ, ভেষজ দ্রব্য আর গাছগাছালি বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে নিয়ে আসত। হলওয়েলের সূত্রে জানতে পারছি দিল্লি আগ্রা থেকে বণিকেরা বর্ধমানে বাণিজ্যের জন্য আসত এবং টিন, সীসা, তামা, লঙ্কা আর নানান রকম কাপড় নিয়ে যেত। বিনিময়ের অঙ্কে বিশাল বাণিজ্য করত এই বণিকেরা। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যগুলি নগদ মুদ্রায় কিনত। কিছু পণ্য বিনিময়ে হাত বদল হত। আফিম সোরা আর ঘোড়ার বিনিময়ে তারা চাল, ডাল ইত্যাদি খাদ্য দ্রব্য সংগ্রহ করত।
উল্টোটা ঘটত বাংলার বণিকদলের ক্ষেত্রে। এরা ঐ অঞ্চলে নিয়ে যেত লবণ, চিনুই, রেশম, রেশমি কাপড়, অসংখ্য সুতির কাপড় আর মসলিন। রেনেল(আ ফিলজফি এন্ড পলিটিক্যাল হিস্ট্রি অব দ্য সেটলমেন্টস) বলছেন আগ্রা দিল্লির সঙ্গে বাংলার বাৎসরিক বাণিজ্য পরিমান দাঁড়াত চার কোটি টাকা(১৭,৫০,০০০ পাউন্ড)। বাংলার বণিকেরা ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ব্যবসা করতে যেত, অসম্ন, নেপাল, কাছাড় থেকিএ আনত কাঠ আর হাতর দাঁত আর বনজ দ্রব্য। বালেশ্বরে পাঠাত তামাক। অসমেও পাঠাত লবণ, তামাক সুপারি। পূর্ব পশ্চিম উপকূলের বন্দর, শহর, দিল্লি আগ্রায় বাংলার বণিকদের দেখা যেত। তারা বাংলা থেজে নিয়ে যেত সূতির কাপড়, রেশমি কাপড়, মসলিন, চিনি, তামাক, সুপারি, লবণ, আদা, হলুদ, লঙ্কা ইত্যাদি। বাংলায় তারা নিয়ে আসত ফল, ওষুধ, কড়ি, টিন। তুলো, শঙ্খ ইত্যাদি। কাশ্মীরী আর আর্মেনিয়রা বাংলার ব্যবসায় বিপুল অংশগ্রহন করত। কাশ্মীরী বণিকেরা বাংলা থেকে লবণ সংগ্রহ করত। মালঙ্গীদের সঙ্গে তাদের দাদনের ব্যবস্থা থাকত…। এরা আন্তঃরাজ্য ব্যবসা করত। বাংলা থেকে লাপড়, রেশম, ঝিনুক, চামড়া, নীল, মুক্তো, তামাক, চিনি, লবণ, সুপারি, মশলা, ব্রডক্লথ, লোহার জিনিসপত্র, মালদা-সাটিন নিয়ে নেপাল, তিব্বত আর ভূটানে যেত। বাংলার নানান অঞ্চলের জন্য নানান ত্রকম ভেষজ, সোনা, রেশম, হাতির দাঁত, পশমের কাপড়, মুখোশ আর লাক্ষা নিয়ে আসত।
(ক্রমশঃ)