Showing posts with label Jagadish Chandra Bose. Show all posts
Showing posts with label Jagadish Chandra Bose. Show all posts

Tuesday, May 27, 2014

জগদীশ চন্দ্র বসু - দেশের মাটিতে পা রাখা এক সারস্বত সাধক৪, Jagadish Chandra Bose A True Indian Scientist4

আজকের কর্পোরেট আধিপত্যের খবরদারির যুগে বুঝতে পারাযাচ্ছে তিনি কতটা দূরদর্শী ছিলেন। জগদীশচন্দ্র তাঁর শিকড়ে দাঁড়িয়ে থাকার দূরদৃষ্টিতে বুঝেছিলেন, উপনিবেশের বিনিয়োগে বিজ্ঞান-প্রযুক্তির সাধনার দুটি ফল- ১) হয় জাতি রাষ্ট্রের যুদ্ধপ্রস্তুতিতে সাহায্য করা, ২) নয়ত প্রকৃতিকে প্রাকৃতিক সম্পদ হিসেবে ছাপ্পা মেরে তাকে কর্পোরেটদের জন্য আরও বেশিকরে লুঠ, মুনাফার বাজার তৈরি করা এর জন্য প্রফুল্ল রায় মশাইকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় সেনা বাহিনীকে নানান ভাবে সাহায্য করতে হয় উৎপাদন বাড়িয়ে। তার উপহারও পেয়েছেন হাত ভরে। অন্যদিকে জগদীশ চন্দ্র পরম সুহৃদ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ১৭ মে, ১৯০১ সালের লন্ডন থেকে লেখা ২৭ সংখ্যার চিঠিতে (পত্রাবলী, আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসু, দিবাকর সেনের সম্পাদনা, প্রকাশনা বসু বিজ্ঞান মন্দির) জগদীশ চন্দ্র লিখছেন, ‘...আমার বক্তৃতার কিয়ৎক্ষণ পুর্ব্বে একজন অতি বিখ্যাত টেলিগ্রাফ কম্পানির ক্রোড়পতি প্রোপ্রাইটর টেলিগ্রাফ করিয়া পাঠাইলেন, দেখা করিবার দরকার; আমি লিখিলাম সময় নাই, তার উত্তরে পাইলাম আমি নিজেই আসিতেছি, অল্পক্ষণ মধ্যে স্বয়ং উপস্থিত। হাতে পেটেন্ট ফর্ম। আমাকে বিশেষ অনুরোধ করিলেন, আপনি আজ বক্তৃতায় সব কথা খুলিয়া বলিবেন না  There is money in it – let me take out patent for you. You do not know what money you are throwing away ইত্যাদি। আশা  I will only take half share in the profit – I will finance it ইত্যাদি। এই ক্রোড়পতি আর কিছু লাভ করিবার জন্য আমার নিকট ভিক্ষুকের ন্যায় আসিয়াছে। বন্ধু তুমি যদি এদেশে টাকার ওপর মায়া দেখিতে – টাকা – টাকা – টাকা - কি ভয়ানক সর্বগ্রাসী লোভ। আমি যদি এই যাঁতাকলে পড়ি তাহা হইলে উদ্ধার নাই। দেখ আমি যে কাজ লইয়া আছি তাহা বাণিজ্যের লাভালাভের উপরে মনে করি, আমার জীবনের দিন কমিয়া আসিতেছে, আমার যাহা বলিবার তাহারও সময় পাই না, আমি অসম্মত হইলাম। কিন্তু সেদিন আমার বক্তৃতা শুনিতে অনেক টেলিগ্রাফ কম্পানির লোক আসিয়াছিল, তাহারা পারিলে আমার সম্মুখ হইতেই আমার কল লইয়া প্রস্থান করিত। আমার টেবলে এসিস্টেন্টএর জন্য হাতে লেখা নোট ছিল, তাহা অদৃশ্য হইল।’ ১১ জুলাই, ১৯০১ তারিখের লন্ডন থেকে পাঠানো ৩১ সংখ্যার চিঠিতে লিখছেন, ‘আমরা বহুবাদী এরূপ কিংবদন্তী আছে। - প্রকৃত বহুবাদী কে এখন বুঝিতে পারিয়াছি। তুমি হিং টিং ছট লিখিয়া আমাদের দেশবাসীকে গালাগালি দিয়াছ। যদি এদেশের হিং টিং ছট দেখিতে। সম্পূর্ণ অর্থহীন ঘোর বাগাড়ম্বর – যে বিষয় সর্বাপেক্ষা কম জানে সে বিষয়েই সর্ব্বাপেক্ষা শব্দাড়ম্বর’।

জগদীশচন্দ্রের দেশজ শিকড় বোঝার আরও একটা দিক, তিনি একটাও আবিষ্কারকে কুক্ষিগত করেননি সেই আবিস্কার পেটেন্টযোগ্য করে ধনী হতে চাননি তার প্রযুক্তি ব্যাবহার করে বিশাল আকৃতির শিল্প কারখানা করতে চান নি। জগদীশচন্দ্রের দুই বান্ধবী সিস্টার নিবেদেতা আর সারা বুল, আমেরিকায় জগদীশচন্দ্রের বিশেষ এক আবিষ্কারের পেটেন্ট নিয়েছেন কিন্তু জগদীশচন্দ্র তার লভ্যাংশ নিতে অস্বীকার করেন (Exasperated by Bose's "quixotic" approach towards money, two of his lady friends, British-born Margaret Noble (better known as Sister Nivedita) and American-born Mrs Sara Bull on their own initiative obtained in 1904 an American patent in Bose's name (for his " galena single contact-point receiver"). Bose, however, remained unmoved and refused to encash the patent. The irony of the situation seems to have gone unnoticed. Here in Nivedita we have a spiritualist advocating the cause of patents and royalties and a physics professor dismissing the idea. The reason must be sought in their backgrounds: Nivedita was a product of industrial Europe while Bose was a child of the orientalised East -  J.C. BOSE: The Inventor Who Wouldn’t Patent -Prof Rajesh Kochhar, http://www.qsl.net/vu2msy/JCBOSE1.htm)  মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন। 

জগদীশ চন্দ্র বসু - দেশের মাটিতে পা রাখা এক সারস্বত সাধক৩, Jagadish Chandra Bose A True Indian Scientist3

তিনি পশ্চিমের দেখানো পথ থেকেও ক্রমশঃ সরতে যে চাইছিলেন তার প্রমান নিজের আবিষ্কৃত যন্ত্রগুলোর নাম সংস্কৃত বা মাতৃভাষায় দিয়েছিলেন। পত্রাবলীর সম্পাদক লিখছেন ‘সম্ভবতঃ তিনি এ ব্যাপারে রবীন্দ্রনাথের সাহায্য চেয়েছিলেন। জগদীশ চন্দ্র প্রথম দিকে তাঁর যন্ত্রের নাম করণ করেছিলেন মাতৃভাষায়। কিন্তু অল্প সময়ের ব্যবধানে তিনি তাঁর সিদ্ধান্ত পাল্টাতে বাধ্য হয়েছিলেন। এ বিষয়ে জগদীশ চন্দ্রের বর্ণনা উপভোগ্য, ‘রেস্কোগ্রাফ’ যন্ত্রের নামকরণ প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন, ‘ইচ্ছা ছিল যন্ত্রের নাম রেস্কোগ্রাফ না রাখিয়া ‘বৃদ্ধিমান’ রাখি। কিন্তু হইয়া উঠিল না। আমি প্রথম প্রথম আমার কলগুলির সংস্কৃত নাম দিয়াছিলাম। যেমন ‘কুঞ্চনমান’, ‘শোষণমান’। স্বদেশী প্রচার করিতে যাইয়া অতিশয় বিপন্ন হইতে হইয়াছে। প্রথমতঃ এই সকল নাম কিম্ভুতকিমাকার হইয়াছে বলিয়া বিলাতি কাগজ উপহাস করিলেন। কেবল বোস্টনের প্রধান পত্রিকা অনেকদিন আমার পক্ষ সমর্থন করিয়াছিলেন। সম্পাদক লেখেন ‘যে আবিষ্কার করেন তাহারই নামকরণের প্রথম অধিকার। তাহার পর কলের নাম পুরাতন ভাষা ল্যাটিন ও গ্রীক হইতেই হইয়া থাকে। তাহা যদি হয় তবে অতি পুরাতন অথচ জীবন্ত সংস্কৃত হইতে কেন হইবে না?’ বলপূর্ব্বক যেন নাম চালাইলাম। কিন্তু ফল হইল অন্যরূপ। গতবারে আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়ের বক্তৃতার সময় তথাকার বিখ্যাত অধ্যাপক আমার কল ‘কাঞ্চনম্যান’ সম্বন্ধে ব্যাখ্যা করিবার জন্য অনুরোধ করিলেন। প্রথমে বুঝিতে পারি নাই। শেষে বুঝিলাম ‘কুঞ্চনমান’ কাঞ্চনম্যানে রূপান্তরিত হইয়াছে। হান্টার সাহেবের প্রণালীমত কুঞ্চন বানান করিয়াছিলাম, ইহা হইয়া উঠিল কাঞ্চন। রোমক বর্ণমালার বিশেষ গুণ যে ইহার কোনও একটি স্বরকে অ হইতে ঔ পর্যন্ত যথেচ্ছরূপে উচ্চারণ হইতে পারে; কেবল হয় না ঋ আর ৯। ...সে যাই হউক বুঝিতে পারিলাম হিরণ্যকশিপুকে দিয়া বরং হরিনাম উচ্চারণ করানো যেতে পারে, কিন্তু ইংরেজকে বাংলা কিম্বা সংস্কৃত বলানো একেবারেই অসম্ভব। এই জন্যই আমাদের হরিকে হ্যারি হইতে হয়। এই সকল দেখিয়া কলের ‘বৃদ্ধিমান’ নামকরণের ইচ্ছা একেবারেই চলিয়া গিয়াছে।(সম্পাদকীয় টিকা – পত্রাবলী, পত্র ২৫। পাতা ৫৫। )’। সামগ্রিক বিষয়টি জগদীশ চন্দ্র হাল্কা চালে পেশ করলেও উপনিবেশের তাত্ত্বিক এই বিষয়টি বেশ গুরুত্বপূর্ণ, আজও। জগদীশ চন্দ্র পিছু হটেছিলেন। ততদিনে পিছু হটে গিয়েছিল দেশীয় জ্ঞান বিজ্ঞান চর্চা। তখনও জগদীশ চন্দ্র পশ্চিমের বিজ্ঞানচর্চায় সম্পূর্ণরূপে আস্থাবান। জগদীশ চন্দ্র শুধু নির্বিষভাবে নাম করণ করতে চেয়েছিলেনমাত্র। পিছিয়ে পড়া, বিজিত পূর্বের এই দাবি মেনে নেবে কেন সাম্রাজ্য জ্ঞানগর্বী পশ্চিম!

শেষ বয়সে প্রযুক্তির বিধ্বংসী অগ্রগতিতে আতঙ্কিত হয়ে রেডিও তরঙ্গ গবেষণার ভাবনাটিই ত্যাগ করেছিলেন একজনও ছাত্র তৈরি করেননি, যিনি রোডিও তরঙ্গের আবিষ্কারকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেন এই “অবিমৃষ্য” কাজের জন্য রাজেশ কোছারমশাই জগদীশচন্দ্রকে যথেষ্ট অভিশাপমন্দ করেছেনMore importantly, he would perhaps have become an Indian role-model for production of wealth through science - J.C. BOSE: The Inventor Who Wouldn’t Patent - Prof Rajesh Kochhar (http://www.qsl.net/vu2msy/JCBOSE1.htm) ঋষি বলে, কিহোতর বাজে নকল বলে গালি দিয়েছেন জগদীশচন্দ্র বড় পুঁজি নির্ভর ব্যবসা বা সেনা উদ্যমের সঙ্গে প্রযুক্তি বা বিজ্ঞানচর্চা মেলাতে পারতেন না তিনি সচেতনভাবেই পুঁজিবাদের রোলমডেল হতে চান নি। হয়ত বুঝেছিলেন, শেষ পর্যন্ত তাঁর উদ্ভাবনীটি সেনাবাহিনীর খপ্পরে পড়বে, এবং শেষে বড় পুঁজি সেটিকে নিয়ে যথেচ্ছ মুনাফা কামানোর পরিকাঠামো তৈরি করবে। রাজেশ কোছারের আফসোস, জগদীশচন্দ্র সেই গবেষণার সুযোগ নিলে ভারত তরঙ্গ গবেষণায় আজ অনেক দূর এগিয়ে থাকতে পারত। এই আক্ষেপ ছিল দেশজ রসায়ণ চর্চারপ্রতি নিবেদিতপ্রাণ প্রফুল্ল রায়মশাইএর। শিল্পবিপ্লবের মহত বেকনিয় মনোভাবের স্বপ্নে গড়ে তুললেন বিশালতম বেঙ্গল কেমিক্যাল(চরখার অন্যতম সমর্থক তিনি, শেষের দিকে তাকে তাঁর প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়) বহিরাঙ্গে দেশজ কিন্তু অন্তরে পশ্চিমের শিল্পবিপ্লবের অনুকরণপ্রিয়তায় আত্মগর্বী ১৯১৬তে জগদীশচন্দ্রের নাইটহুডের সম্বর্ধনায় রায়মশাই আচার্যকে বেশ একটু খোঁচা দিয়েই বললেন, If he had taken out patents for the apparatus and instruments which he had invented, he could have made millions by their sale.  (J.C. BOSE: The Inventor Who Wouldn’t Patent -Prof Rajesh Kochhar, http://www.qsl.net/vu2msy/JCBOSE1.htm)

জগদীশ চন্দ্র বসু - দেশের মাটিতে পা রাখা এক সারস্বত সাধক২, Jagadish Chandra Bose A True Indian Scientist2

৭ সংখ্যার ২রা মার্চ, ১৯০০ তারিখের চিঠিতে জগদীশ চন্দ্র, রবীন্দ্রনাথকে লিখছেন, ‘আমাদের কর্ম্মফল অনেক এবং অনেক দুরাশা আমাদিগকে পদে পদে লাঞ্ছিত করে। কতদূর মন সঙ্কীর্ণ করিতে হইবে, কতদূর কার্য্যক্ষেত্র সঙ্কুচিত করিতে হইবে – ইহার শেষ কোথায়? আপনি এ সব শুনিয়া কষ্ট পাইবেন জানিয়াও না লিখিয়া পারিলাম না। কোন্‌ দিন কোন্‌ অপ্রত্যাশিত পতন আছে জানি না।’ ৬ মার্চ ১৯০০, ৮ সংখ্যার চিঠিতে লিখছেন, ‘আমি ইতিপূর্ব্বে(বিলেত) গিয়াছিলাম এবং তখনও কলেজ এক প্রকার চলিয়াছিল এ কথা জানা থাকাতেও যখন এ আপত্তি করিলেন তখন আর আমি কি করিব? তার পর বলিলেন যে, Send me your letter of invitation from Paris and I will send a report.  বলিতে লজ্জিত হইতেছি যে সেই নিমন্ত্রণ পত্র অনেক দিন আমার পকেটে থাকিয়া সম্ভবত হয়ত ধোপাবাড়ী গিয়াছে – অন্ততঃ আমি খুঁজিয়া পাইতেছি না। ...বলিলাম যদি পাঁচ সপ্তাহ অপেক্ষা করিতে পারেন তবে একখানা নিমন্ত্রণ পত্র হাজির করিতে পারি। কিন্তু সে চিঠি না হইলে নাকি চলিবে না। যাওয়ার কোন সম্ভাবনা দেখিতেছি না।’ ২৭ সংখ্যার লন্ডন থেকে লেখা চিঠিতে বলছেন, ‘আমাকে যে আর ছুটী দিবে এ রূপ বিশ্বাস হয় না। দেশে ফিরিলে কিরূপ কার্যের সুরাহা হইবে তাহার নমুনা স্বরূপ একখানি চিঠি পাঠাই। উক্ত হতভাগ্য আমার রেকমেন্ডেশনে রিসার্চ স্কলারশিপ পাইয়াছিল, তাহার উপর বিশেষ জুলুম। দেখ এ কথা আর কাহাকে বলিও না, কারণ ছেলেটির অনিষ্ট হইবে, আর যদি কোন বিষয় রেস কশ্চেনএ দাঁড়ায় তাহা হইলে শেষে কি হয় তাহা জান।’ ৩২ সংখ্যার চিঠিতে লিখছেন, ‘আমি এক বছরের ছুটী চাহিয়াছিলাম তাহার পরিবর্ত্তে ৬ মাস পাহিয়াছি। সুতরাং সমস্ত কার্য সমাধা করিতে পারিব না। জার্মানি ইত্যাদি স্থানে বক্তৃতা করিবার নিমন্ত্রণ রক্ষা করিতে পারিব না।’
হয়ত ভারতে শাসক ইংরেজরা বুঝতে পারছিল জগদীশ্চন্দ্রের গবেষণা মননটি সেনা প্রস্তুতি অথবা বিশ্বজোড়া দৈত্যসম ব্যবসার অনুকূল নয়। নানান ছোট বড় ধাক্কায় বেসামাল হয়ে পড়ছে। শুরুর দিকে পশ্চিমি বিজ্ঞানের প্রতি মুগ্ধতা কিছুটা ছিল। কিন্তু ১৯০০ সালে লন্ডনে যা বুঝলেন, তা হল বিজ্ঞানের ঘোমটায় কর্পোরেটিয় প্রযুক্তির আধিপত্য। তখন থেকে সে পশ্চিমী মুগ্ধতাটির রেশ কাটতে শুরু করেছে। ৪৫ সংখ্যার চিঠিতে লিখছেন, আইডিয়াল ভাঙ্গিয়া গেলে আর কি থাকে? এতদিন এ দেশের বিজ্ঞানসভায় অনেক বিশ্বাস করিয়াছি – তাহা দূর করিয়া লাভ কি? অধিক দিন থাকিতে পারিলে আমি একাই এই ব্যুহ ভেদ করিতে পারিতাম – কিন্তু আমার মন ভাঙ্গিয়া গিয়াছে। ’। ৪১ সংখ্যার চিঠিতে লিখছেন, ‘বন্ধু আমি এতদিনে আমার জাতীয় মহত্ব বুঝিতে পারিতেছি। স্বদেশীয় আত্মম্ভরী আর বিদেশীয় নিন্দুকের কথায় চক্ষে আবরণ পড়িয়াছিল। এখন তাহা ছিন্ন হইয়াছে – এখন উন্মুক্ত চক্ষে যাহা প্রকৃত তাহাই দেখিতেছি। অঙ্কুরিত বীজের উপর পাথর চাপা দিলে  প্রস্তর চূর্ণীকৃত হয়। সত্য ও জ্ঞানকে কেহ পরাভব করিতে পারে না। জীবনে সেই পুরাকালের লক্ষ্য অঙ্কিত করিয়া দাও। আমাকে যদি শতবার জন্মগ্রহণ করিতে হয়, তাহা হইলে শতবারই যেন হিন্দুস্থানে জন্মগ্রহণ করিতাম।

তিনি দেশজ জ্ঞাণের সঙ্গে পশ্চিমি জ্ঞাণচর্চাকে মেলাবার ভাবনা থেকে সরতে সরতে, দেশজ বিজ্ঞাণ ভাবনায় আশ্রয় নিতে চাইছিলেন ১৮৯৬ সালে নিজের গবেষণা ইত্যাদি নিয়ে লন্ডনে যান। ১৯০০ থেকে নতুন করে লন্ডনে থেকে যাওয়ার কথা ভাবতে শুরু করেন। সারা জীবন না হলে অন্ততঃ পাঁচ বছর। কিন্তু নানান বৌদ্ধিক অত্যাচারে তিনি ক্রমশঃ নিজের ভেতরে ডুবে দেখতে শুরু করেন। স্বদেশমুখী হতে শুরু করেন। পত্রাবলীর ২৭ সংখ্যার চিঠিতে লিখছেন, ‘বন্ধু আমাদের যাহা অমুল্য আছে তাহা ভুলিয়া মিছামিছি না বুঝিয়া হিন্দুয়ানি লইয়া গর্ব্ব করি। আমাদের প্রকৃত ইনহেরিটেন্স বুঝাইয়া দেও – প্রকৃত মহত্ব বুঝাইয়া দেও।’ ৩৯ সখ্যার ২৯এ নবেম্বর ১৯০১ এর চিঠিতে লিখছেন, ‘গাছ মাটী হইতে রস শোষণ করিয়া বাড়িতে থাকে, উত্তাপ ও আলো পাইয়া পুষ্পিত হয়। কাহার গুণে পুষ্প প্রষ্ফুটিত হইল? – কেবল গাছের গুণে নয়। আমার মাতৃভূমির রসে আমি জীবিত, আমার স্বজাতির প্রেমালোকে আমি প্রষ্ফুটিত। যুগ যুগ ধরিয়া হোমানলের অগ্নি অনির্ব্বাপিত রহিয়াছে, কোটি কোটি হিন্দুসন্তান প্রাণবায়ু দিয়া সেই অগ্নি রক্ষা করিতেছেন, তাহারই এক কণা এই দূর দেশে আসিয়া পড়িয়াছে। আমি যে তাহাদেরই প্রাণের অংশ তোমাদের দুঃখসুখের অংশী একথা সর্ব্বদা হৃদয়ঙ্গম করাইয়া দিও।’ ৪৮ সংখ্যার চিঠিতে স্পষ্টভাবে লিখছেন, ‘তোমার আহ্বান আমাকে দেশের দিকে টানিতেছে – শীঘ্রই তোমাদের সহিত দেখা করিব এই মনে করিয়া মন উৎসাহে পরিপূর্ণ হইতেছে। তুমি যাহার সূত্রপাত করিতেছ(আশ্রম বিদ্যালয়) তাহাই আমাদের প্রধান কল্যাণ। আমাদের সাম্রাজ্য বাহিরে নয় – অন্তরে। পুণ্যভূমি ভারতবর্ষ – ইহার অর্থ বুঝিতে অনেক সময় লাগে। নিরাশার কথা শুনিয়া মন ভাঙ্গিয়া যায় কিন্তু তোমার নিকট উৎসাহের কথা শুনিয়া বড়ই আশান্বিত হইয়াছি। ভারতের কল্যাণ আমাদের হাতে, আমাদের জীবন দিয়া আমাদের আশা, আমাদের সুখ দুঃখ আমরাই বহন করিব। মিথ্যা চাকচিক্যে আমরা যেন ভুলিয়া না যাই; যাহা প্রকৃত যাহা কল্যাণকর তাহাই যেন আমাদের চিরসহচর হয়। বিদেশে যাহা উন্নতি বলে তাহার ভিতরে দেখিয়াছি। আমরা যেন কখনও মিথ্যা কথায় না ভুলি। পুণ্যি আমাদের প্রধান লক্ষ্য। অন্তরে কিম্বা বাহিরে প্রতারণা দ্বারা আমরা কখনও প্রকৃত ইষ্ট লাভ করিব না। পরের চিঠিতে তাঁর বইএর উৎসর্গ পত্রে লিখবেন ভাবছেন, ‘To my countrymen who will yet claim the intellectual heritage of their ancestors. কিন্তু বন্ধু এমন কথা বলিতেও লজ্জিত হইতে হয়। তোমরা আমার কামনা বুঝিয়া লইও।’ এ ছাড়াও তাঁর রচনাগুলি এই পরিবর্তনের সাক্ষ্য বহন করে

জগদীশ চন্দ্র বসু - দেশের মাটিতে পা রাখা এক সারস্বত সাধক১, Jagadish Chandra Bose A True Indian Scientist1

পার্থ পঞ্চাধ্যায়ী

রয়েল সোসাইটির হনুকরণে ইন্ডিয়ান এসোসিয়েশন অব কাল্টিভেশন অব সায়েন্সএর প্রতিষ্ঠাতা মহেন্দ্রলাল সরকার এই প্রথম বিদেশিয় প্রথায় সংঘ তৈরি করে দেশিয় বিজ্ঞান চর্চার পরম্পরাকে মুছে ফেলার কাজের শুরু – যদিও দোহাই ছিল দেশিয় জ্ঞান বিজ্ঞানের উন্নতি আদতে বিজ্ঞান মানে তখন পশ্চিমী সামরিক অভিযানের জন্য, কর্পোরেট লাভের জন্য বিকশিত বিজ্ঞান গবেষণা। ততদিনে বড় পুঁজি আর সামরিক আস্ফালন পরস্পরের সঙ্গে হাত ধরাধরি করে হাঁটার রাস্তা তৈরি করে নিয়েছে। যে কাজের প্রধান তাত্ত্বিক ভারত লুঠেরা খুনি শাসক কোম্পানি আর ব্রিটিশ সাম্রাজ্য।
এর অনেক আগে থেকেই ইওরোপে পশ্চিমি প্রযুক্তি প্রকৃতি ধংসের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে ভারতে সে উদ্যমের মুখড়া দেখা গিয়েছে দ্বারকানাথের খনি উদ্যমের মধ্যে, রেল লাইন পাতার চেস্টার মধ্য দিয়ে সমস্তটাই পশ্চিমের অনুকরণ ইওরোপের জ্ঞাণচর্চার ইতিহাসকে বিশ্বজ্ঞাণচর্চার ইতিহাসরূপে বৈধতা দিতে তৈরি করা সাম্রাজ্যের জ্ঞাণাঞ্জণ লাঠ্যৌষধি প্রকল্প ভারতে ধাতু বিদ্যা বহু প্রাচীন কিন্তু কোনও ভাবেই সামরিক বা বড় পুঁজির আস্ফালনের হাতিয়ার হয়ে ওঠে নি। কিন্তু বিশ্বের সম্পদ লুঠ করে অযুত সম্পদ কিছু মানুষের কুক্ষিগত করানোর উদ্যমের হাতিয়ার হয়ে উঠল পশ্চিমি প্রযুক্তি চর্চা। এই প্রকল্পেই সমাধি ঘটবে দেশজ বিজ্ঞাণচর্চার দীর্ঘ ইতিহাসের ধারা মহেন্দ্রলালই প্রথম যিনি হাতে কলমে দেশি বিজ্ঞাণকে জলাঞ্জলি দিয়ে পশ্চিমের ইতিহাসকে বৈধতা দেওয়া শুরু করলেন – তিনি হয়ত ব্রিটিশ উপনিবেশের বিরোধী কিন্তু পশ্চিমের জ্ঞান চর্চার অনুগামী মহেন্দ্রলাল কালিকে নগ্ন সাঁওতালি রমণী বললেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সগর্বে সেই তথ্য উপন্যাসে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে প্রকাশ করে পশ্চিমধন্য হলেন আজও বাঙলায় তাত্বিক নিরাপত্তার কাঁটাবেড়ার সংরক্ষণ আর নিরাপত্তা পেয়ে আসছেন সাম্রাজ্যেরবন্ধু রামমোহন, দ্বারকানাথ, বিদ্যাসাগর, মহেন্দ্রলালবেয়ে সুনীলও

প্রথম জীবনে পশ্চিমি বিজ্ঞাণচর্চায় অনুপ্রাণিত জগদীশচন্দ্র, দেশিয় ইংরেজদের গবেষণা বিরোধিতায় বিরক্ত বিতৃষ্ণ হয়ে সমস্ত কাজের আর্থিক সম্মতি আদায় করতেন বিদেশি বন্ধুদের সাহায্যে ঔপনিবেশিক সময়ে বেড়ে ওঠায় ধারায় ব্রিটেনে গিয়ে নিজের কাজ দেখাবার ইচ্ছে এবং পশ্চিমীদের কাছে বাহবা নেওয়ার একটা উতসাহ জগদীশ্চন্দ্রের ছিল। কিন্তু বিভিন্ন ঔপনিবেশিক চাপ আর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে বন্ধুত্ব তার জীবনের দিক নির্দেশ বদলে দিল। তাঁর এই বিবর্তনের ভাবনার প্রতিফলন পাই দিবাকর সেনের সম্পাদনায় পত্রাবলী – আচার্য্য জগদীশ চন্দ্র বসু বই থেকে। নিচের আলচনার মূল সূত্র সেই পুস্তকখানি। এই আলোচনায় আমরা দেখব কিভাবে জগদীশ্চন্দ্রের মানস ভূমিটির জমির চরিত্র বদল হয়েছে।