Showing posts with label বিনয় লাল. Show all posts
Showing posts with label বিনয় লাল. Show all posts

Tuesday, May 8, 2018

ইওরোপিকেন্দ্রিকতা বিরোধী চর্চা - ইওরোপবিদ্য ভাবনার শেষ বিদায়৫ - ক্লদ আলভারেজ

বিনয় লালের মুখবন্ধ

পেনাং মালেশিয়ায় মাল্টিইউনিভার্সিটির পক্ষ থেকে এই চটিগ্রন্থাবলী প্রকাশিত হচ্ছে বিদ্বান, শিক্ষক, কর্মী এবং জনবুদ্ধিজীবিদের ২০০২ সালে একসঙ্গে হওয়ার পর। উদ্দেশ্য নতুন একটা মঞ্চ গড়ে তোলা। আধুনিক জ্ঞানচর্চার তীব্র সমালোচক হয়ে উঠতে চায় মাল্টিভার্সিটি যাতে জগদ্ব্যাপী নতুন ধরণের রাজনৈতিক এবং কৃষ্টিগত ভবিষ্যত নির্মান করা যায়। মাল্টিভার্সিটির সদস্যরা পশ্চিমের সঙ্গে আলোচনার বদলে অনেক বেশি দক্ষিণের মানুষদের মধ্যে আলোচনার পরিকাঠামো তৈরি করতে আগ্রহী। ভারত, চিন, দক্ষিণপূর্ব এশিয়া এবং আফ্রিকা, ইওরোপের সঙ্গে আলাপ শুরু করার বহু আগে থেকে তারা নিজেদের মধ্যে আলাপ চালিয়েছে। একক সময় ভারত সাগর ছিল বিশ্বকেন্দ্র, বহু রাস্তার মিলনের ক্ষেত্র, কিন্তু উপনিবেশের একটা সাফল্য হল তারা এই পুরোনো ইতিহাসকে ভুলিয়ে দিতে পেরেছে। আজ বিশ্ব বলতে বহু মানুষই বোঝেন তার নিজের দেশের চারিয়ে যাওয়া ইওরো-আমেরিকিয় বিশ্বের জ্ঞান। আমাদের আন্তর্জাতিকতাবাদের এটাই সীমান্ত।
পশ্চিম তার শর্তে যতদিন আলাপ আলোচনার কাঠামো তৈরি করে দেবে, ব্যবস্থাপনা তৈরি করে দেবে, ততদিন সত্যকারের আলাপ-পরিচয় আদানপ্রদান সম্ভব নয়। আজকে বলতে হবে, আমাদের নিজেদের উদ্যোগেই মাল্টভার্সিটি আর মাল্টিওয়ার্ল্ডের মাল্টি শব্দটিকে, মাল্টিকালচারিজমের মাল্টি থেকে সযত্নে আলাদা করে রাখতে হবে। আজকের পশ্চিমের অবিসংবাদী নেতা, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র এতদিন বর্বরভাবে এককেন্দ্রিকতাবাদ চর্চা করে এসে আজকে সে সারা বিশ্বে মাল্টিকালচারালিজমের প্রচারবিদ হিসেবে নিজেকে উপস্থাপিত করতে চাইছে এবং দেখাতে চাইছে সে খোলামেলা সমাজ এবং সহ্যশক্তির চূড়ান্ত রূপ। আমেরিকয় বৈচিত্রের মাল্টিকালচারালিজমএর যার এক এবং একমাত্র অর্থ হল ভোক্তার পছন্দ আর সাদা চামড়ার কর্তৃত্ব(যা অনেক সময় primus inter paresএর কৃপালু সংস্করণ বলে মনে হয়), তারা আজকাল দেখাতে চাইছে তারা নাকি এমন একটা সমাজ বানিয়েছে যেখানে বাস্তবতাই হল বহুত্ববাদ। মাল্টিভার্সিটি এই চটিপ্রকাশনাগুলির মাধ্যমে নব্য উপনিবেশিকতাবাদের উতসারকে রুখতে চাইছে এবং এমন একটা পরিবেশ তৈরি করতে চাইছে যেখানে প্রতিবাদী জ্ঞানচর্চা বিকশিত হয়।
বহুকাল ধরে চটিবই বিদ্রোহ, সামাজিক পরিবর্তনের, জনদাবিতে সরকারের সংস্কার কর্মের অন্যতম উপাদান আর বাহক ছিল। পশ্চিমের রাজনৈতিক বিদ্রোহ আর বিরুদ্ধতার গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠেছিল, টম পেইনের কমন সেন্স থেকে থুরোর অন দ্য ডিউটি অব সিভিল ডিসওবিডিয়েন্সএর মত চটিবই। যখন শিক্ষার হার অতি কম, এবং শিক্ষা মাত্র কিছু উচ্চশ্রেণীর হাতিয়ার তখন চটিবইগুলি মানুষের হাতিয়ার হয়ে উঠেছিল। জন মিলটনের এরিওপাজিটিকা নামক চটির নিচে লেখা ছিল For the Liberty of Unlicensed Printing। এই বক্তব্য আমাদের বুঝতে সাহায্য করে কোন সময়ে কোন মুহূর্তে চটিসাহিত্য বিকাশলাভ করেছিল। আমেরিকার বিপ্লব বলা হয়ত অতিশোয়াক্তি হবে না, যতটা সে কামান বন্দুক দিয়ে সফল লড়াই করেছিল এর সঙ্গে মনার্কিস্ট, দেশহিতৈষী এবং বিদ্রোহীরা আটলান্টিকের উভয় পাশে চটিবই হাতবদল করেও বিপ্লবকে চালনা করে নিয়ে গিয়েছিল। ইতিহাসের বিখ্যাততম চটিলেখকের নাম কার্ল মার্ক্স। ১৮৮৩ সালে ১৭ মার্চ বন্ধুর স্মৃতিতে এঙ্গেলস দ্মরণ করছেন দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিদ্রোহাত্মক চটিবই ১৮৪৮এর বিদ্রোহের স্মরণের লিখিত ক্লাস স্ট্রাগলস ইন ফ্রান্স এবং এইটিনথ ব্রুম্রেয়ার অব লুই বোনাপোর্ট। ১৮৭১ সালে মার্ক্স তাঁর হৃদয় দিয়ে প্যারি কমিউনকে সমর্থন করে লিখছেন দ্য সিভিল ওয়ার ইন ফ্রান্স।
চটিগ্রন্থগুলির সামাজিক ইতিহাস আমাদের বলছে এটি শ্রমিক শিক্ষার বাহন হয়েছে এবং আত্মশিক্ষিত শ্রেণী সৃষ্টি করেছে। উনবিংশ শতকের প্রায় প্রত্যেক সমাজে চটিগ্রন্থ জনগনের মনের কথার বাহন। ভোটাধিকারের ওপরে বিধিনিষেধ তোলার দাবিতে চটিপুস্তক একটা বড় ভূমিকা গ্রহণ করেছিল। আমরা আজ বলতে পারি কয়েক শতাব্দের চটিপুস্তক রচয়িতাদের চেষ্টায় সার্বজনীন ভোটাধিকারের ফলে রাজনীতিতে জনগণের প্রবেশে চটিপুস্তকের ভূমিকা প্রায় লোপ পেয়েছে। এটা পরিষ্কার আধুনিক পশ্চিমে বিপুল বিশাল প্রচার মাধ্যমের জয়যাত্রা – যাকে বলা হয় তথ্যবিপ্লব - তার ফলে বিংশ শতকে চটিপুস্তক রচনার তাগিদ প্রায় নেই বললেই চলে। তবে মাধ্যমগুলোর বিগণতন্ত্রীকরণ, মাধ্যমগুলিতে একচেটিয়াকরণের উদ্যমে নতুন ধরণের তথ্য সরবরাহের চাহিদা দেখা যাচ্ছে। হয়ত মিলটনের সময় চটিপুস্তকগুলি নতুন ধারণা, নতুন কৃষ্টি, এবং বিদ্রোহের সংস্কৃতি তৈরির পরিবেশ এবং বিপুল অনুগামী সৃষ্টি করেছিল, কিন্তু তারপরে উতকর্ষের দিকে নজর দিতে গিয়ে তারা সত্যকারের পাঠক হারিয়েছে আর চটি হয়ে উঠেছে অন্তঃসারশূন্য শব্দভাণ্ডার। আজকের ভারতে নাগরিক সমাজ এবং মানবাধিকার কর্মীরা মূলত চটিপুস্তকের ওপর নির্ভর করেই তথ্য আদানপ্রদান করেন। নতুন সময়ের নতুন দাবি চটিপুস্তকের আবহাওয়া আবার নতুন করে তৈরি করা।
নয়া দিল্লি
২০১১

ইওরোপিকেন্দ্রিকতা বিরোধী চর্চা - ইওরোপবিদ্য ভাবনার শেষ বিদায়৪ - ক্লদ আলভারেজ

বিনয় লালের মুখবন্ধ

পশ্চিমের ঔপনিবেশিক বৈজ্ঞানিকেরা যদি গেটেরে মত মানুষকেই চুপ করিয়ে দিতে পারেন এবং উপহাসের পাত্র করে তুলতে পারেন সারা বিশ্বের কাছে তার বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গীর দিক থেকে, তাহলে দেশিয় পরম্পরার সমাজের জ্ঞানভাণ্ডারকে আধুনিক বিজ্ঞানের ধারক বাহকদের তারা যে আরও বড় উপহাসের পাত্র করে তুলবে তা তো বলাই বাহুল্য, যদিও আধুনিক পশ্চিম তার জ্ঞানচর্চায় সারাক্ষণ বহুত্ববাদ, বহুকৃষ্টিবাদের মালা জপে চলছে। কিছু কিছু সময় পশ্চিমের বিজ্ঞানীরা ‘অন্যদের’ জানার চেষ্টায় সেই জ্ঞানচর্চাকে কিছুটা হলেও ছাড় দিয়ে থাকেন, তাও তাদের শর্ত মেনে। অতলান্ত সাগরের দ্বীপুঞ্জের অধিবাসিন্দারা না জানি কত কাল ধরে পশ্চিমের সমুদ্র বিজ্ঞান এবং আধুনিক প্রযুক্তি ছাড়াই হাজার হাজার মাইল পাড়ি দিয়েছেন। আমেরিকার কোন বিশ্ববিদ্যালয়েরই দর্শন বিভাগেই পরম্পরার, আদিবাসীদের স্থানীয় জ্ঞানের পাঠ্যক্রম তৈরি করে নি, এই দায়িত্বটা পড়েছে নৃতত্ত্ব বিভাগের ওপরে। দর্শনের সত্য আদতে বিজ্ঞান এবং ঔষধ বিভাগেরে ক্ষেত্রেও সত্য – সে মনে করে দর্শন মানেই পাশ্চাত্য দর্শন এবং ওষুধ অর্থে পশ্চিমি এলোপ্যাথিক ওষুধ ব্যবস্থা। আমরা কেউ যখন দর্শনের মাধ্যমে অন্য একটু কিছু আলাদা করে উপস্থাপন করার চেষ্টা করি, তখন তৈরি হয় আফ্রিকিয় দর্শন, ভারতীয় দর্শন ইত্যাদি। পশ্চিমের সঙ্গীত বিভাগ আদতের সঠিক বিশুদ্ধ সঙ্গীত অর্থাৎ পশ্চিমের ধ্রুপদী সঙ্গীতই চর্চা করে; অন্যান্যদের সব ধরণের সঙ্গীত চর্চা এথনোমিউজিওলজিতে ঢুকে পড়েছে, যেমন করে অন্যান্যদের বিজ্ঞান, এথনোসায়েন্স হিসেবে পশ্চিমে পদবাচ্য। আজকের আমাদের কাজ হল জ্ঞানসমষ্টিরচর্চার রূপান্তরকরণ, বিশেষ করে সেই সব জ্ঞানচর্চা যেগুলোকে এত কাল প্রান্তিক করে রাখা হয়েছিল, দমিয়ে রাখা হয়েছিল, তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা হয়েছিল এবং তাদের সামগ্রিক কৃষ্টিগত বৌদ্ধিক চেতনার মর্যাদাকে চোখা রাঙ্গিয়ে পায়ের তলায় ফেলেরাখা হয়েছিল।
বক্ষ্যমান চটিটায়, লেখক, আন্দোলনকর্মী, দেশিয় চাষী এবং রাজনৈতিক বিপ্লবী ক্লদ আলভারেজ, যিনি নিজে মাল্টিভার্সিটির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, বহুকাল ধরে অবিশ্রান্তভাবে পশ্চিমের বৈজ্ঞানিক জ্ঞানচর্চাকে এবং তার দাসত্ব আর নকলকরার মাত্রার বিশ্বজোড়া বিদ্বানদের কড়া সমালোচনা করে বলেছেন, এদের জ্ঞানচর্চা শুধুই উচ্চশিক্ষার শিক্ষাকেন্দ্রগুলোতেই আবদ্ধ থাকে। আলভারেজ ১৯০৯ সালের মোহনদাস গান্ধীর ছোট্টতম হিন্দ স্বরাজ বা ইন্ডিয়ান হোমরুল বইটির বিংশ পরিচ্ছেদের কিছু স্তবক উল্লেখ করে বলছেন deportation for life to the Andamans is not enough expiation for the sin of encouraging European civilisation। গান্ধী আন্দামান পছন্দ করতেন উদ্দেশ্যপূর্ণভাবে, কেননা, এই অঞ্চলেই বাইরের সাহায্য ছাড়াই বহু আদবাসী বেঁচেছেন, এবং এই আন্দামানেই বিপজ্জনক স্বাধীনতাকামীদের নির্বাসন দেওয়া হত। আন্দামানে সারা জীবনের জন্যে নির্বাসিত হওয়া বিপ্লবীদের অন্য সামাজিক মৃত্যু দেখছেন না গান্ধী, ইওরোপিয়দের হাতে তৈরি সমাজ থেকে নির্বাসন দেখছেন। তিনি তার কুড়ি বছর পরে বলবেন, whatever service I have been able to render to the nation has been due entirely to the retention by me of Eastern culture to the extent that it has been possible।
গান্ধী পুরোপুরি পশ্চিমকে অস্বীকার করতে পারেন নি। আমরাও পরিষ্কার নই যে তিনি আদৌ তা চেয়েছিলেন কি না, কিন্তু তার কাছে একটা বিষয় পরিষ্কার ছিল স্বাধীনতা কিন্তু অবিভাজ্য। এটা স্বীকৃত যে আধুনিক পশ্চিম তার টলস্টয় বা থুরোর মত বিদ্রোহী তাত্ত্বিকদের অস্বীকার করেছে, গান্ধী তাদের  সঙ্গেই বন্ধুত্ব পাতিয়েছেন, যাদের তত্ত্বের মধ্যে বৃহত্তর বহুত্ববাদ, সাম্য এবং বিচারের দৃষ্টিভঙ্গী জায়মান হয়ে আছে। একটা শর্ত গান্ধী জুড়ছেন, এটা যতটাদূর সম্ভব টেনে নিয়ে যাওয়ার। তার তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গী বিশ্লেষণ করে তিনি আরও বৌদ্ধিক স্বাধীনতা আর কৃষ্টিগত সম্মান চাইছেন, একই সঙ্গে তিনি বলছেন, এমনকি দেশজ এবং আদিবাসী জ্ঞান তার শুদ্ধ কাঠামোয় ব্যবহার করা যাবে না। যেমন আয়ুর্বেদে দেহ, রোগ এবং সেরে ওঠার দর্শন আর তত্ত্ব এলোপ্যাথির থেকে সম্পূর্ণ আলাদা, কিন্তু তা সত্ত্বেও আয়ুর্বেদকে আধুনিক বায়োমেডিসিনের শরণাপন্ন হতে হচ্ছে। উনবিংশ শতকে জাতীয়তাবাদীদের আন্দোলনে আয়ুর্বেদ গর্বিত উত্তরাধিকার বহন করলেও, বৈদ্যকেরা বললেন এর পাঠ্য, জ্ঞানচর্চা, শিক্ষার পদ্ধতিকে পশ্চিমি বায়োমেডিক্যাল পদ্ধতি অনুসরণ করে ঢেলে সাজাতে হল, কারণ বাজার অর্থনীতির বাধ্যবাধকতা। যদিও খুব কঠিন কাজ, কিন্তু আলভারেজ রাজনৈতিক, নৈতিক এবং কৃষ্টিগত পছন্দের বিষয়ে পশ্চিমি জ্ঞানচর্চার একচ্ছত্র আধিপত্য থেকে বিশেষ করে সমাজবিজ্ঞান চর্চা থেকে স্বাধীনতা পেতে একবগগা ভূমিকা নিয়েছেন।

Monday, May 7, 2018

ইওরোপিকেন্দ্রিকতা বিরোধী চর্চা - ইওরোপমন্যতার শেষ বিদায়৩ - ক্লদ আলভারেজ

বিনয় লালের মুখবন্ধ
এটি আজ প্রতিষ্ঠিত সত্য, বহু শিক্ষিত নবজাগরণের জ্যোতির্বলয়ের বিশ্বাসে বাস করেন। ছোটবেলা থেকেই তাদের বিশ্বাস করিয়ে দেওয়া হয়েছে যে কোন বিশ্বমানবিকতাবাদের উতস ইওরোপিয় ভাবনা, তারা বিশ্বাস করেন না যে উপনিবেশ দেশের মানুষের চরম ক্ষতি করেছে, জীবনযাত্রার মানকে ধ্বংস করেছে, কৃষ্টি, জীববৈচিত্র, এবং সামাজিক উত্তরাধিকারকে দূষিত করেছে। প্রত্যেক উপনিবেশে ঔপনিবেশিক প্রভুরা তাদের উপনিবেশিকতার তত্ত্ব উপনিবেশের প্রজাদের মনে ঢুকিয়ে দেওয়ার কাজ মন দিয়ে করেছে। উপনিবেশ এবং উত্তর উপনিবেশিক সময়ে আজ এটা পরিষ্কার করে বলা দরকার, প্রাথমিক স্তরে উপনিবেশ তৈরি হয় জ্ঞান দখলদারির মাধ্যমে। ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের প্রথম দুই তিন দশকের কাজ হয় খুব গুরুত্বপুর্ণ কিছু জ্ঞাণী আর বিদ্বানদের মাধ্যমে জ্ঞান আহরণ করার। ভারত এর একটা প্রকৃষ্ট উদাহরণ, এবং বিশ্বের কোন দেশের এই রকম কাণ্ড ঘটে নি, তারা প্রথম কয়েক বছর ভারতের সামাজিক এবং বিদ্যা বিষয়ক জ্ঞানচর্চার পরম্পরা অধ্যয়ন করে, ভারতীয় ভাষাগুলির ব্যকরণ তৈরি হল, বিভিন্ন শাস্ত্রের বচন সুগ্রন্থিত এবং সেটা যে ঠিক সেটাও তারা বলে দিল, হিন্দু আর মুসলমানেদের আইন লিপিবদ্ধ হল; দেশের মানচিত্র তৈরি হল, মানবসুমারি হল, তাদের দেহকাণ্ডের আকারের মাপ নেওয়া হল এবং শ্রেণিবিন্যাস ঘটল; সমাজগুলির সুবারি হল, পরিচিত তৈরি হল এবং নামকরণ ঘটল।
আজকের বিশ্বায়নের প্রেক্ষিতে বিশ্বের গোটা সমাজকে পশ্চিমি জ্ঞানচর্চা সফলভাবেদখল করে নিয়েছে। আজ বিশ্বকে আমরা যে নামে যে শ্রেণীতে জানি আর চিনি, সেগুলি মূলত পশ্চিমি জ্ঞানচর্চার দ্বারা সৃষ্ট। এই প্রাকৃতিক এবং বিশ্বের শুধু বস্তুগত জ্ঞানের শ্রেণীবিভাগই নয়, মানব সমাজের প্রায় সমস্ত সামাজিক রাজনৈতিক, ধার্মিক, কৃষ্টিগত এবং আইনি জ্ঞানের বৌদ্ধিক নথিকরণ, পড়াশোনা, ব্যবস্থাপনা, প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ এবং প্রবাহিত করেছে উপনিবেশ তাদের স্বার্থ অনুযায়ী। বিকাশ, দারিদ্র, অভাব এবং উন্নয়ন বিষয়ে অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গী সব কটা সমাজবিজ্ঞান চর্চা প্রাধান্য দিয়ে প্রচার করে বিশ্বের প্রায় সমস্ত জ্ঞানের ওপর একচেটিয়া অধিকার কায়েম করে ফেলেছে। পশ্চিমি সমাজ বিজ্ঞানের মোদ্দা যোগফলটি যে শুধু তথাকথিত উন্নয়নশীলদেশকে গরীবি নিয়ে কাদা ছোঁড়ার চেষ্টাই নয়, সে বলার চেষ্টা করে, উন্নয়নশীল দেশের জীবন পশ্চিমের জীবনশৈলীর মত উন্নত নয়। সামগ্রিক উন্নয়নের তত্ত্ব সময়ফাঁকে উপনিবেশের নেটিভটি ঢুকে থাকে। তাদের নিদান অনুন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশের একাংশ গোটা উন্নয়নশীল দেশের বিকাশের পথ অনুসরণ করুক। কিন্তু উন্নয়নশীল দেশগুলই যখন উন্নতদের কাছাকাছি পৌঁছবে ততক্ষণ সে তাদের ছাড়িয়ে আরও উন্নত স্তরে পৌঁছে যাবে। উন্নয়নের তত্ত্ব উপনিবেশের মানুষদের পরম্পরার জীবনযাত্রায় জীবন কাটাতে দেয় না, তাকে উপনিবেশের শাসকদের জীবনযাত্রার ধারণা ধার করে বাঁচতে হয়। উপনিবেশ তার অতীতে ঝুঁকে দেখার মানসিকতাটাই কেড়ে নেয় আর বিশ্বায়ন আর ভবিষ্যতের জীবনে থাবা মারে। নেটিভের বর্তমান যদি ইওরোপিয়র অতীত হয়, তাহলে নেটিভের ভবিষ্যত ইওরোপিয়র বর্তমান।

সাম্প্রতিক অতীতের বিশ্বায়ন সংক্রান্ত বিপুল বিশালাকার নানান তাত্ত্বিক গবেষণায় কখোনোই স্বীকার করা হয় নি বিশ্বায়নের সব থেকে পড় পণ্যটাই হল (প্রাচ্যের জ্ঞানচর্চা লুঠ করে) পশ্চিমের তৈরি জ্ঞানচর্চার পদ্ধতিটি। আজ যে কোন উপনিবেশ বিরোধী আন্দোলনের কর্মীর সব থেকের বড় কাজ হল, পশ্চিম যে জ্ঞানচর্চার ধারাটা উপনিবেশের ওপর কয়েকশ বছর ধরে চাপিয়ে দিয়েছে, সেই চাপানোর ফল কি সমাজগুলীতে পড়েছে যে বিষয়ে গবেষণা করা। আদতে গোটা ব্যাপারটা হল পাঠসূচী আর জ্ঞানচর্চা থেকে ঔপনিবেশিক উপাত্ত, পদ্ধতিগুলিকে ছেঁটে ফেলা। আধুনিক পশ্চিমেরর জ্ঞানচর্চার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল, তারা অন্য কোন জ্ঞানচর্চার অস্তিত্বই স্বীকার করে না, জ্ঞানচর্চার বহুত্ববাদে তাদের আস্থা নেই। আধুনিক পশ্চিম তার জয়যাত্রায় কোন ইতিহাস এবং বিজ্ঞানের কৃষ্টিকে অস্বীকার করতে চায়? একটা উদাহরণ নেওয়া যাক – গ্যাটেকে পশ্চিমি মানবতাবাদের চরমোতকর্ষ হিসেবে দেখা হয়, তিনি কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার এবং প্রখ্যাত-বিখ্যাত মানুষ হিসেবে তুলে ধরা হয়। বলা হয় না তিনি মানব শরীর, পশু, পাখি, গাছ, খণিজ। পাহাড়, জীবাশ্ম রঙ এবং আলো নিয়েও উৎসাহ দেখিয়েছিলেন। কেননা তিনি প্রখ্যাত তিন প্রত্যক্ষ্যবাদী বেকন, নিউটন, দেকার্তএর তত্ত্বের বিরুদ্ধে মত প্রকাশ করেছেন – natural objects should be sought and investigated as they are and not to suit observers, but respectfully as if they were human beings (David Seamon আর Arthur Zajoncএর Goethe’s Way of Science: A Phenomenology of Nature থেকে)। আধুনিক বিশ্ব এই তত্ত্বে বিশ্বাসই করে না। তাকে সবার আগে প্রকৃতির ওপর প্রভুত্ব করতে হবে। নইলে আধুনিকতার রথ চলে না। 

ইওরোপিকেন্দ্রিকতা বিরোধী চর্চা - ইওরোপমন্যতার শেষ বিদায়২ - ক্লদ আলভারেজ

বিনয় লালের মুখবন্ধ
সীমান্ত পেরিয়ে কত পরিমান পণ্য বিভিন্ন দেশে গেল এল এই প্রশ্নটাকে আপাতত সরিয়ে রেখে বিশ্বায়ন সংক্রান্ত ডামাডোল আরও সব হাজারো প্রশ্ন তুলে দিয়েছে, সেগুলির কয়েকটা নিয়ে আলোচনা করি। মানব সভ্যতার ইতিহাসে এই প্রথম বিপুল পরিমানে পণ্য সীমান্তজুড়ে অবাধে পেরোলেও শ্রমের অবাধ চলাচলের ক্ষেত্রে বিপুল বাধা তৈরি করে রাখা হয়েছে। কেন? বার্লিনের দেওয়াল মানুষ ভেঙ্গে ফেললেও বাংলাদেশ ভারত, গাজা এবং ইস্রায়েল, আমেরিকা আর তার মেক্সিকোর মত দক্ষিণের দেশগুলির মধ্যে নিরেট সীমান্ত তোলার ব্যবস্থা হচ্ছে। কেন? কেন অভিবাসন আমলারা সারাবিশ্বের অচেনা অজানা শ্রমিকদের অবাধ গতায়াত নিষিদ্ধ ঘোষনা করছে? কেউ কেউ হয়ত তুলবেন জঙ্গি আক্রমনের হুমকির প্রশ্ন। আজ জঙ্গিবাদ রোখার নামে ৯/১১র অনেক আগে থেকেই রাষ্ট্র প্রণোদিত জঙ্গিপনা সারা বিশ্বজুড়ে চলছে – কেননা এই জঙ্গিবাদের শিকার কোন লিবিয় নয়, সোমালিয় নয়, পাকিস্তানি নয়, ভারতীয় নয়, নিকারাগুয়ান নয়, যেন শুধুই আমেরিকয়রা। ফলে জঙ্গি দমনে যুক্তির ধারধারেণা বৃহৎ শক্তিগুলো। আজ জাতিরাষ্ট্রের মধ্যে কড়া নজরদারিতে চলা সীমান্ত নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, এর আগে সীমান্তে কি ছিল? সারা বিশ্ব জুড়ে কি অসাম্য বেড়েই চলবে? আউটসোর্সিং যদি বিশ্বায়নের কর্মকাণ্ডের তাতক্ষণিক উদর্পূর্তির উদাহরণ হয়, তাহলে কি বলতে পারি না, ধনী দেশগুলি সীমান্তে শ্রমিকের ভিড় বাঁচিয়ে শস্তার শ্রমে উদ্বৃত্ত তৈরির ফায়দা তুলছে? উনবিংশ শতকের চুক্তি ভিত্তিক শ্রমিকের ছবি আমরা একুশ শতকের সাইবার-কুলিদের মধ্যে দেখি না? আমাদের সময়ের হরমিন্দর বা সতীন্দ্ররা হরি আর স্যামের মুখোশে উন্নতিশীল দেশের নব্য সুযোগবাদী হয়ে উঠছে না কি তারা উন্নতদেশের জন্যে জীবনপাত করা প্রায় চুক্তিবদ্ধ শ্রমিকের কাজ করছে এই প্রশ্ন তোলা যাবে না? মনে রাখা দরকার আজও শ্রমের বাজার উন্নতদেশগুলির হাতে বিপজ্জনকভাবে নিয়ন্ত্রিত।
বিশ্বায়নের শাখাপ্রশাখাগুলি বুঝতে আমাদের চলে যেতে হবে আধুনিক বিশ্ব ইতিহাসের সেই পর্বে যখন উপনিবেশবাদ নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করত। বিশ্বের বিপুল অংশ তখন হাতেগোনা কয়েকটা লুঠেরা জাতিবাদী রাষ্টের লৌহ মুঠিতে বদ্ধ ছিল, যাদের কাছে কোন নীতিকথার কোন মূল্যই ছিল না। পাঁচশ বছর আগে যারা বিশ্বে যে সব অভিযান এবং নৌযাত্রা বেরিয়েছিল তার ফলশ্রুতিতে পরবর্তী ২০০-৩০০ বছর ধরে আমেরিকা, দক্ষিণ, দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া, নিকট পূর্ব, পলিনেশিয়া, আফ্রিকা এবং বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে লুঠেরা খুনি উপনিবেশ তৈরি করে। ঐতিহাসিকেরা বাগিচা উপনিবেশ, বসতি উপনিবেশ এবং অনান্য উপনিবেশের মধ্যে পার্থক্য টেনেছেন কিছুটা সরাসরি আর পরোক্ষ প্রশাসন চালানোর প্রক্রিয়ায়। গোটা আমেরিকা এবং অস্ট্রেলিয়ায় পরম্পরার সমাজকে ধ্বংস এবং নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হল। বুয়ারদের নেতৃত্বে দক্ষিণ আফ্রিকায় সাদা আর কালোদের মধ্যে বিপুল বৈষম্য চালিয়ে কালোদের চরমভাবে দাবিয়ে রাখা হল। কঙ্গোতে ঠিক সেইভাবে ইওরোপিয়রা সেদেশের মানুষদের ওপর ব্যাপক অত্যাচার ধ্বংসলীলা চালিয়ে ইওরোপিয়দের মালিকানায় রাবার বাগিচা উপনিবেশ তৈরি করল। ভারতে ব্রিটিশদের ইতিহাস শুরু হল ব্যাপক মন্বন্তর (গণহত্যা)এর মধ্যে দিয়ে যেখানে ক্লাইভের দখলের প্রায় এক দশকের মধ্যে ১ কোটি মানুষ মারা যাবে না খেতে পেয়ে। সঙ্গে সঙ্গে ব্রিটিশ আমলারা ভারত ছাড়ার সময়ে বিপুল সম্পদ চুষে দেশে নিয়ে যাবে। আর তার দেড়শ বছর পর ভারত ছেড়ে যাওয়ার সময় তারা ৩০ লক্ষ বাঙ্গালিকে খুনের উপহার দিয়ে যায়, যাতে সারা বিশ্বকে বাঁচাতে যে সেনারা লড়ছিল তাদের মুখে খাওয়ার তুলে দিতে পারে। এই ইতিহাস অসীমভাবে লিখে যাওয়া যায় না থেমে। এখানেই দাঁড়ি টানলাম।

যে সব বৈদ্ধিক লব্জর মধ্যে লুকিয়ে মুখ ঢেকে উপনিবেশবাদ আজও টিকে আছে নানা আলাপ আলোচনায় তাদের মধ্যে দুটি হল, ভাল উপনিবেশ এবং খারাপ উপনিবেশ। যে সব সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ(এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যপন্থী) ঐতিহাসিক কেম্ব্রিজ, হার্ভার্ড কেন্দ্রগুলির অধ্যাপনার আসন অলঙ্কৃত করে বসে আছেন, তারা আজও অসীম উৎসাহে সেই বস্তাপচা সাম্রাজ্য ইতিহাস চর্চা চালিয়ে যাচ্ছেন। আমাদের তারা বিশ্বাস করিয়ে ছাড়ছেন, ব্রিটিশেরা অসাধারন ভালমানুষ – তার হয়ত এখানে ওখানে এদিক সেদিক কিছু দুর্ঘটনা ঘটিয়েছে, কিন্তু যারা বিশ্বকে ক্রিকেটের মত ভদ্রলকিয় খেলা উপহার দিতে পারে, তাদের প্রতিনিধিরা কখোনোই গণহত্যাকারী বা পাইকারিহারে হত্যা করতে পারে না। ২০০৫ সালে পূর্ব আফ্রিকায় রাষ্ট্রীয় সফরে গিয়ে ব্রিটেনের চ্যান্সেলর গর্ডন ব্রাউন খুব সরলভাবে বললেন, আফ্রিকা ভ্রমন করতে এসে আমি বহু মানুষের সঙ্গে কথা বলে দেখেছি উপনিবেশের ইতিহাসের জন্যে ব্রিটিশদের কৈফিয়ত দেওয়ার দিন শেষ হয়ে গিয়েছে। অতীতের কর্মকাণ্ডের জন্যে আমাদের আত্মসমালোচনা না করে গর্বিত হতে হবে(ডেলি মেল ১৫ জানু, ২০০৫)। উপনিবেশের জন্যে ক্ষমা চাওয়া এখন অতীত কর্ম, ব্রিটেন বিশ্ব শক্তি হিসেবে আজ আর অনুশোচনা করতে চাইছে না। শালীনতা কোনদিনই উপনিবেশের পরিচ্ছদ ছিল না, ব্রাউন শুধু যে তার অতীতের জন্যে অশ্লীলভাবে একাই মুখরিত হচ্ছে, তা নয়, এই কথা বলার এক মাসের মধ্যেই ২০০৫এর ২৩ ফেব্রুয়ারির আইনে ফ্রান্সের শিক্ষকদের আইন করে বলে দেওয়া হল, বিদেশে উপনিবেশের জন্যে বিশেষ করে উত্তর আফ্রিকায় দেশ যে সব সদর্থক কাজ করেছে, তা শিক্ষার্থীদের জানাতে হবে। ফ্রান্সে যদি কেউ আজ আরব বিশ্বে এবং মাঘ্রেবে আন্দোলনের জন্যে সাম্য আর স্বাধীনতার গান গায় তাহলে অবাক হওয়ার কারণ নেই। ব্যক্তিস্বাধীনতা নতুন উচ্চতায় উঠে – ইতিহাসের মৃত্যু ঘোষণা করছে। আজ স্বাধীনতা মানে ম্যাকডোয়েল অথবা বার্গার কিং, কোক অথবা পেপসিকে নির্বাচনের স্বাধীনতা। মুক্ত বিশ্বে স্বাধীনতা আদতে ফাঁকা কলসির আওয়াজ।

ইওরোপিকেন্দ্রিকতা বিরোধী চর্চা - ইওরোপমন্যতার শেষ বিদায়১

ক্লদ আলভারেজ
মাল্টিভার্সিটি এন্ড সিটিজেন্স ইন্টারন্যাশনাল, পেনাং, ২০১১

ভিন্নমত জ্ঞানচর্চার চটিমালার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক, বিনয় লালের মুখবন্ধ

এই চটিমালা পেনাঙ্গের মাল্টিভার্সিটির নেওয়া বেশ কয়েকটি প্রকাশনার অন্যতম, যেখানে জনগণের বিদ্বতজন, জ্ঞানী এবং আন্দোলনের কর্মীরা দক্ষিণবিশ্ব থেকে প্রথমবার ২০০২ সালে একসঙ্গে পেনাঙ নগরের মত বহু প্রাচীন কালের বহুকৃষ্টির আদানপ্রদানের শহরে জড়ো হয়েছিলেন নিজেদের মপধ্যে ভাবনার আদানপ্রদানের জন্যে। আমাদের সময়ে সব থেকে বেশিবার উচ্চারিত শব্দ বিশ্বায়ন, এবং বিভিন্ন জনপ্রিয় সংবাদমাধ্যম থেকে বৌদ্ধিকস্তরে মুক্ত বাণিজ্যের নামে প্রায় উন্মুক্ত সীমান্তের ওপর এটির প্রভাব, বিপুল পরিমান পণ্যের গতায়াত, জাতীয় অর্থনীতিগুলির মধ্যে সংযোগ এবং বিভিন্ন দেশের বদ্ধ অর্থনীতির দরজা খোলা উদ্যম নিয়ে বিশদ চর্চা চলছে। বলা দরকার, বিশ্বজোড়া ব্যাপক মন্দা, আমেরিকার বাড়িবাজারের ধ্বস(যেটি আদতে বিশ্ব পুঁজির কাঠামোরই ব্যাপক গোলমালের চিহ্ন কি না) অথবা ব্যাপক খরুচে ইসলামি সন্ত্রাসবাদের জয়যাত্রা কোনটাই গোটা ১৯৯০এর দশক থেকে একবিংশ শতক পর্যন্ত চলা বাজার অর্থনীতির বিপুল অগ্রগতিকে ঠেকাতে পারতে নি। জাপাটিসমোর বিদ্রোহ থেকে শুরু করে সিয়াটেলে বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভ প্রদর্শন সত্ত্বেও সারা বিশ্বে মুক্ত বাণিজ্য এবং মুক্ত বাজারের কথা ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে এবং দীর্ঘকাল ধরে শীতঘুমে ডুবে থাকা চিন আর ভারতের মত এশিয় অর্থনীতির জাগরণ ঘটছে। এটা বলা দরকার প্রাচীন সভ্যতাগুলি বলশালী বাজারের প্রবল ধাক্কায় দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে কিনা সে নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ দেখা দিচ্ছে।
বিশ্বায়ন নিয়ে বেশ কিছু জনপ্রিয় বুলি তৈরি করেছে, যার মধ্যে জনপ্রিয় ‘সারা বিশ্বই একটি বিশ্বগ্রাম মার্কা’ বস্তাপচা বুলি নিয়ে বিপুল গবেষণায় কোন অন্তর্দৃষ্টি তৈরি হয় নি। কিন্তু বিশ্বায়নের ফলে নতুনভাবে তৈরি হয়েছে ভয়ঙ্কর ধরণের দাস ব্যবসা, যাদের কাছে সীমান্তের বিধিনিষেধের কোন মূল্য নেই, কিছু মধ্যজীবির হাতে শ্রম লুন্ঠিত হচ্ছে। শুধু এইটুকুর জন্যে বিশ্বায়নের কুফলগুলি নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন হয়ে উঠতে পারি। ইওরোপিয় সাম্রাজ্যবাদ যখন তুঙ্গে বা তারও আগে যখন ভারত মহাসাগর জুড়ে সারাবিশ্বে বিপুল বাণিজ্য পদ্ধতির বিকাশ ঘটেছিল, সে সময়কে কিন্তু বিশ্বায়ন দাগিয়ে দেওয়া যায় নি। আজ আমরা বলতে পারি বিশ্বায়ন আমাদের বৌদ্ধিক চেতনার বড় একটা অংশ দখল করে নিয়েছে, ফলে কষ্ট হলেও এই রাজনীতিকে আমাদের আরও গভীরভাবে বুঝে দেখতে হবে।
আজকের বিশ্বে, বিশ্বায়নের সবথেকে বড় সমর্থকেরা বলে থাকে পণ্যের এবং সেবার হাতবদল ঘটছে বিপুলভাবে, অস্বাভাবিক দ্রুতলয়ে। ইন্টারনেট বিশ্বায়নের অন্যতম সহায়ক এবং বিশ্বায়নের নীতির মূর্ত প্রকাশ। এ সত্ত্বেও কেউ কেউ বলতেই পারে ইন্টারনেট এসে একমুখী তথ্য প্রবাহকে বহুমুখী করতে পেরেছে। আজকে যারা মাত্র যুবক, তাদের কাছে দুদশকের পুরোনো ইন্টারনেট শুধুই যোগাযোগের আর মাধ্যম হয়ে নেই টুইটের মাধ্যমে তারা মুক্তি খোঁজে। আজও বহু মানুষের কাছে বিশ্বায়নের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ আইকনগুলি হল কোকাকোলা এবং ম্যাকডোনাল্ডের মত উদ্যম, ম্যাডোনা বা প্রয়াত মাইকেল জ্যাকসনের মত তারকা বা রোনাল্ডো, বেকহ্যাম এবং অপবসৃত মাইকেল জর্ডনের মত খেলোয়াড়। আজ আর অভিকর শিল্পের বিশ্বায়নে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র একা দাঁড়িয়ে নেই, জাপান তার এনিমেশন, মাঙ্গা, নিন্টেন্ডো গেম এবং বেবি ব্লেড আর বাকুগান নিয়ে মধ্যবিত্ত ঘরে ঝড়ের মত ঢুকে পড়েছে।