Showing posts with label Samacar Chandrika. Show all posts
Showing posts with label Samacar Chandrika. Show all posts

Thursday, November 7, 2013

ভবানীচরন বন্দ্যোপাধ্যায়, Bhabani Charan Bandopadhyay

ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় (জন্ম জুলাই ১৭৮৭মৃত্যু ২০ অক্টোবর, ১৮৪৮) ‘সমাচার চন্দ্রিকাপত্রিকার সম্পাদক ও বাংলা সাহিত্যের প্রথম কথাসাহিত্যিক। বর্ধমান জেলার উখড়ার নারায়ণপুর গ্রামে ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম। পিতা রামজয় বন্দ্যোপাধ্যায় কলকাতার কলুটোলা অঞ্চলে বসবাস করতেন। ছেলেবেলার পিতার তত্ত্বাবধানে নানা বিষয় এবং বাংলা, সংস্কৃত, ফারসি ইংরেজি ভাষা শিক্ষা করেন। ১৬ বছর বয়স থেকে তিনি ডাকেট কোম্পানিতে সরকার পদে ১১ বছর ধরে চাকরি করেন। ১৮২১এ তিনি উইলিয়াম কেরির সঙ্গে ভাগ্যান্বেষনে মিরাটে যান। এই মিরাটেই সেনাবাহিনীতে ছিলেন উত্তরপাড়ার ভাবি জমিদার জয়কৃষ্ণ এবং তার পিতা।
কেরি কলকাতায় কলকাতার দুর্গের মেজর জেনারেল হয়ে ফিরে এলে তিনি তার অধীনস্থ কর্মচারীরূপে কাজ করতে থাকেন। এরপর কেরি লন্ডনের উদ্যেশ্যে রওয়ানা হয়ে যান। ভবানীচরণ নিজ যোগ্যতায় বিভিন্ন ইউরোপীয় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান ও বিশপ মিডল্টন ও রেজিনাল্ড প্রমুখ ইউরোপীয়ের অধীনে কর্ম করেন। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি স্যর হেনরি ব্লাপেটের সহকারীও হন। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি বিশপ হেবার তার সম্বন্ধে Narrative of a Journey Through the Upper Provinces of India, from Calcutta to Bombay (1824–25)  পুস্তকে লেখেন, “...the most conspicuous-a tall fine looking man, in a white muslin dress, speaking good English, and the editor of a Bengali newspaper, who appeared with a large silken and embroidered purse full of silver coins, and presented it to us....it was the relic of the ancient Eastern custom of never approaching a superior without a present.. ...a shrewd fellow, well acquainted with the country...his account of the tenure of lands very closely corresponded with what I had previously heard from others.”। পরে তিনি কর দপ্তরে প্রধান হিসেবে কাজ করেন। হিস্ট্রি অব শ্রীরামপুর মিশনে জে সি মাশম্যান লিখছেন, “...Bhobany Churun, a Brahmin of great intelligence and considerable learning though no pundit, but remarkable for his tact and energy, which gave him great ascendency among his fellow-countrymen...”
৪ ডিসেম্বর ১৮২ সালে সমাচার কৌমুদী পত্রিকা প্রকাশ করেন। মালিক রামমোহন রায়। কিন্তু নাম প্রকাশ হত ভবানীচরনের। রামমোহনের সঙ্গে মত পার্থক্যে তিনি সমাচার  চন্দ্রিকা পত্রিকা প্রকাশ করেন ১৮২৮ সালে প্রভাবশালী সমাজপতি হিসাবে জুরি নিযুক্ত হন। ১৮৩০ সালে রাজা রামমোহন রায়ের সংস্কার আন্দোলনের বিরুদ্ধে রাধাকান্ত দেবের নেতৃত্বে ধর্মসভা গঠিত হলে তিনি তার সম্পাদক নিযুক্ত হন। সতীদাহ প্রথা রদ, ভারতের অর্থনীতিতে বিদেশি বিনিয়োগ ও বিদেশি ধাঁচে সংস্কার প্রবর্তনের তীব্র বিরোধিতা করেন এবং দেশে বিদেশি অর্থনৈতিক উপনিবেশ স্থাপন রোধে জমিদারদের দেশীয় সম্পদ উন্নয়নের প্রস্তাব করেন। তাঁর রচিত সাহিত্যগ্রন্থগুলি তৎকালীন সমাজের দুর্নীতির আবরণ উন্মোচন করে দিয়েছিল। যদিও তাকে গোঁড়া হিন্দু রূপে দাগিয়ে দিতে মেকলের পুত্রকন্যাদের বিন্দুমাত্র বাধেনি, তবুও বলাযাক, তিনি সামাজিক নানান অবিধান রোধে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করেছিলেন। তিনি কোনোদিন সরাসরি সতীর পক্ষে কথা বলেন নি।
১৮২১ সালে সাপ্তাহিক সংবাদ কৌমুদি পত্রিকায় সাংবাদিকতা শুরু করেন ভবানীচরণ। পরে রামমোহন রায়ের সঙ্গে ধর্মমত নিয়ে বিরোধ বাধায় তিনি এই কাজ ত্যাগ করেন। ১৮২২ সালের ৫ মার্চ কলুটোলায় নিজে প্রেস স্থাপন করে প্রকাশ করেনসমাচার চন্দ্রিকা। রক্ষণশীল হিন্দুসমাজের মুখপত্র হিসাবে পত্রিকাটি সপ্তাহে দুই দিন প্রকাশিত হত। শ্রীরামপুরের সমাচার দর্পনে তার পত্রিকা প্রকাশের বিজ্ঞাপন প্রকাশ করেন ভবানীচরন। তবে সম্পাদকীয় অধিকার নিয়ে হরিহার দত্তর সঙ্গে তার বিবাদ হয়। ক্যালকাটা জার্নালে এক বিজ্ঞাপন ছাপিয়ে হরিহর দত্ত ভবানির সম্পাদক হবার দাবি খারিজ করেন। তার জীবনচরিতে তিনি এবিষয়য়ে বিশদে লিখেছেন।
কলিকাতা কমলালয় (১৮২৩) ও নববাবুবিলাস (১৮২৫) গ্রন্থদুটিতে তাঁর আক্রমণের লক্ষ্য ছিল কলকাতার বাবু কালচার ও নব্যোদ্ভূত ইয়ং বেঙ্গল গোষ্ঠী। এছাড়া দূতীবিলাস নামে একটি কাব্য (১৮২৫) ও নববাবুবিলাস-এর দ্বিতীয় পর্ব নববিবিবিলাস (১৮৩১) উল্লেখযোগ্য। এছাড়া শ্রীশ্রীগয়াতীর্থ বিস্তার (১৮৩১), আশ্চর্য্য উপাখ্যান (১৮৩৫) ও পুরুষোত্তম চন্দ্রিকা (১৮৪৪) নামে তিনটি গ্রন্থ রচনা ও হাস্যার্ণব (১৮২২), শ্রীমদ্ভাগবত (১৮৩০), প্রবোধ চন্দ্রোদয় নাটকং (১৮৩৩), মনুসংহিতা (১৮৩৩), উনবিংশ সংহিতা (১৮৩৩), শ্রীভগবদ্গীতা(১৮৩৫) ও রঘুনন্দন ভট্টাচার্য কৃত অষ্টাবিংশতি তত্ত্ব নব্য স্মৃতি (১৮৪৮) সম্পাদনা করেন।

সংস্কার বিরোধী আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব হওয়ায় নবজাগরণের পরবর্তী পর্যায় থেকেই ভবানীচরণ সমালোচিত ও নিন্দিত হতে থাকেন। তাঁর সাহিত্যের অশ্লীলতার মোড়কে নীতিবাক্য প্রচারের অভিযোগ ওঠে। ডক্টর অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের তাঁর রচনা সম্পর্কে বলেছেন, “‘বাবুর উপাখ্যানবা ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যঙ্গ আখ্যানগুলি অর্ধশিক্ষিত ধনী সন্তানদের কুৎসিত আমোদ-প্রমোদের কথা সাধুভাষায় বলা হলেও উদ্দেশ্যটি তত সাধু ছিল না। বাইরের দিক থেকে এসব নকশায় রঙ্গকৌতুক, ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ ও গল্পের আমেজ থাকলেও ভিতরে ছিল পর্নো’ (porno)-কেচ্ছা-কেলেংকারি। সমাজের কুরীতি দেখিয়ে সভ্যভব্য মানসিকতা সৃষ্টি, এই জন্যই ভবানীচরণ ও অন্যান্য নকশাকারেরা কলম ধরেছিলেন; কিন্তু রোগের চেয়ে ঔষধই হয়েছিল প্রাণঘাতী।

Friday, August 23, 2013

সংবাদপত্রে, সমাচার চন্দ্রিকায় এক চরকা কাটনির দরখাস্ত, Letter of a Charka Lady to a News Paper, Samacar Chandrika

শ্রীযুত সমাচার পত্রকার মহাশয়। আমি স্ত্রীলোক অনেক দুঃখ পাইয়া এক পত্র প্রস্তুত করিয়া পাঠাইতেছি আপনারা দয়া করিয়া আপনারদিগের আপন ২ সমাচারপত্রে প্রকাশ করিবেন শুনিয়াছি ইহা প্রকাশ হইলে দুঃখ নিবারণকর্ত্তারদিগের কর্ণগোচর হইতে পারিবেক তাহা হইলে আমার মনস্কামনা সিদ্ধ হইবেক অতয়েব আপনারা আমার এই দরখাস্তপত্র দুঃখিনী স্ত্রীর লেখা জানিয়া হেয়জ্ঞান করিবেন না।

আমি নিতান্ত অভাগিনী আমার দুঃখের কথা তাবৎ লিখিতে হইলে অনেক কথা লিখিতে হয়। কিন্তু কিছু লিখি যখন আমার সাড়ে পাঁচ গণ্ডা বয়স তখন বিধবা হইয়াছি কেবল তিন কন্যা সন্তান হইয়াছিল। বৃদ্ধ শ্বশুর শাশুড়ি আর ঐ তিনটি কন্যা প্রতিপালনের কোন উপায় রাখিয়া স্বামি মরেন নাই তিনি নানা ব্যবসায়ে কাল যাপন করিতেন আমার গায়ে যে অলঙ্কার ছিল তা বিক্রয় করিয়া তাঁহার শ্রাদ্ধ করিয়াছিলাম শেষে অনাভাবে কএক প্রাণী মারা পড়িবার প্রকরণ উপস্থিত হইল তখন বিধাতা আমাকে এমত বুদ্ধি দিলেন যে জাহাতে আমারদিগের প্রাণ রক্ষা হইতে পারে অর্থাৎ আসনা ও চরকায় সুতা কাটিতে আরম্ভ করিলাম প্রাতঃকালে গৃহকর্ম্ম অর্থাৎ পাটি ঝাট্টি করিয়া চরকা লইয়া বসিতাম বেলা দুই প্রহর পর্য্যন্ত কাটনা কাটিতাম প্রায় এক তোলা সুতা কাটিয়া স্নানে যাইতাম স্নান করিয়া রন্ধন করিয়া শ্বশুর শাশুড়ি আর তিন কন্যাকে ভোজন করাইয়া পরে আমি কিছু খাইয়া সরু টেকো লইয়া আসনা সূতা কাটিতাম তাহাও প্রায় এক তোলা আন্দাজ কাটিয়া উঠিতাম এইপ্রকার সূতা কাটিয়া তাঁতিরা বাটীতে আসিয়া টাকায় তিন তোলার দরে চরকার সূতা আর দেড় তোলার  দরে সরু আসনা সূতা লইয়া যাইত এবং যত টাকা আগামি চাহিতাম তৎক্ষণাৎ দিত ইহাতে আমাদের অন্ন বস্ত্রের কোন উদবেগ ছিল না পরে ক্রমে ২ ঐ কর্ম্মে বড়ই নিপুন হইলাম কএক বৎসরের মধ্যে আমার হাতে সাত গণ্ডা টাকা হইল এক কন্যার বিবাহ দিলাম ঐ প্রকারে তিন কন্যার বিবাহ দিলাম তাহাতে কুটুম্বতার যে ধারা আছে তাহার কিছু অন্যথা হইল না রাঁড়ের মেয়্যে বলিয়া কেহ ঘৃনা করিতে পারে নাই কেননা ঘটক কুলীনকে যাহা দিতে হয় সকলি করিয়াছি ততপরে শ্বশুরের কাল হইল তাঁহার শ্রাদ্ধে এগার গণ্ডা টাকা খরচ করি তাহা তাঁতিরা আমাকে কর্জ্জ দিয়াছিল দেড় বৎসরের মধ্যে তাহা শোধ দিলাম কেবল চরকার প্রাসাদাৎ  এত পর্য্যন্ত হইয়া ছিল এক্ষনে তিন বৎসরাব্ধি দুই শাশুড়ি বধূর অন্নাভাব হইয়াছে সূতা কিনিতে তাঁতি বাটীতে আসা দূরে থাকুক হাটে পাঠাইলে পুর্ব্বাপেক্ষা সিকি দরেও লয় না ইহার কারন কি কিছুই বুঝিতে পারি না অনেক লোককে জিজ্ঞাসা করিয়াছি অনেকে কহে যে বিলাতি সূতা বিস্তর আমদানি হইতেছে সেই সকল সূতা তাঁতিরা কিনিয়া কাপড় বুনে। আমার মনে অহঙ্কার ছিল যে আমার যেমন সূতা এমন কখন বিলাতি সূতা হইবেক না পরে বিলাতি সূতা আনাইয়া দেখিলাম আমার সূতা হইতে ভাল বটে তাঁহার দর শুনিলাম ৩।৪ টাকা করয়া সের আমি কপালে ঘা মারিয়া কহিলাম হা বিধাতা আমা হইতে দুখিনি আর আছে পুর্ব্বে বিলাতে তাবৎ লোক বড় মানুষ বাঙ্গালি সব কাঙ্গালী এক্ষণে বুঝিলাম আমা হইতেও সেখানে কাঙ্গালিনী আছে কেননা তাঁহারা যে দুঃখ করিয়া এই সূতা প্রস্তুত করিয়াছে সে দুঃখ আমি বিলক্ষণ জানিতে পারিয়াছি এমত দুঃখের সামগ্রী সেখানকার হাটে বাজারে বিক্রয় হইল না একারণ এ দেশে পাঠাইয়াছেন এখানেও যদি উত্তম দরে বিক্রয় হইত তবে ক্ষতি ছিল না তাহা না হইয়া কেবল আমারদিগের সর্ব্বনাশ হইয়াছে সে সূতায় যত বস্ত্রাদি হয় তাহা লোকে দুই মাসও ভালরূপে ব্যবহার করিতে পারে না গলিয়া যায় অতয়েব সেখনাকার কাটনিদিগকে মিনতি করিয়া বলিতেছি যে আমার এই দরখাস্ত বিবেচনা করিলে এদেশে সূতা পাঠান উচিত কি অনুচিত জানিতে পারিবেন। শান্তিপুর কোন দুঃখিনী সূতা কাটনির দরখাস্ত। সং চং

(সমাচার চন্দ্রিকা, ৫ জানুয়ারি ১৮২৮, ২২ পৌষ ১২৩৪)