Showing posts with label হকার. Show all posts
Showing posts with label হকার. Show all posts

Friday, July 13, 2018

প্রাতিষ্ঠানিক ঔপনিবেশিক জ্ঞানচর্চার বাইরের গুরুরা - হকার, কারিগর, কলিম খান - ছকে বাঁধা উপনিবেশের শেকড় উপড়োবার হাতিয়ার

গুরুপ্রতীম কলিম খানএর স্মরণ সভায় উদ্যোক্তারা আমায়(আদতে কারিগরদের) বলতে ডেকেছিলেন, তার জন্যে Narayan Chandra Das, Samik Saha Debasish Das এবং আরও অনেকেকে প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। অনুষ্ঠানে দুর্গাপুর থেকে এসেছিলেন Subhrajyoti Basu, খড়গপুর থেকে Somnath Roy Subhas Das Dhritiman Bhattacharjee এবং আরও অনেকে। দুএকজন আলাপও করলেন। সমস্যা হল আমি নতুন চেনা মানুষদের নাম মনে রাখতে পারি না। তাদের থেকে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। আমরা একসঙ্গে বসব। আদান-প্রদান জরুরিতম কাজ।
---
আমরা কলিম খানকে দেখছি উপনিবেশ বিরোধী জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্র থেকে। গোটা শিক্ষা জগত ছেয়ে আছে উপনিবেশিক জ্ঞানর্চায়। যারা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে উত্তরউপনিবশিক জ্ঞানচর্চা আলোচনা করেন, তারাও এক পক্ষে মোটামুটি ঔপনিবেশিক পশ্চিমের কথাই বলেন, তাদের লেখায় পশ্চিমের পথেই মুক্তির তত্ত্ব উঠে আসে, উপনিবেশের ধারণা থেকে মুক্তির পথ নয়। পশ্চিমের উতপাদন ব্যবস্থা, লুঠেরা বড় পুঁজির বিনিয়োগ, তার কেন্দ্রিভূত জ্ঞানচর্চা, উপনিবেশ সম্পর্কে প্রাচ্যবাদীদের তত্ত্ব আর অপচয়ী জীবনযত্রাকে মান্যতা দিয়ে উপনিবেশ বিরোধী আন্দোলন লড়া যায় না, দেশের মানুষ আর তার দর্শনকেও বোঝা যায় না।
এখানেই কলিম খনের তত্ত্বের সঙ্গে আমাদের হকার কারিগরদের উতপদন কৃষ্টি আর দর্শনে মিল। তত্ত্ব এবং প্রয়োগে হাতে কলমে কাজ করে আমরা বুঝেছি আড়াইশ বছর ধরে আমাদের মনে যে ধারনাগুলোর চাষ হয়েচলেছে সেগুলো শেকড় গেড়ে বসেছে বংশ গুরু এবং রাষ্ট্র পরম্পরায়, সেই থানা গেড়ে বসে থাকা উপনিবেশের উতপাটন না হলে ওনার তত্ত্বে ঢোকা মুশকিল, আর উপনিবেশের নিগড় থেকে মুক্তি মুশকিল।
এই উপনিবেশিক তত্ত্ব আমাদের মনে প্রবেশ করিয়েছে কোম্পানির প্রথম দিককার ভারতে আসা প্রাচ্যবিদেরা। নম নম করে দেশিয় ভাষা এবং প্রায় সংস্কৃত না জানা, ভারতীয় সমাজ না জানা, বোঝা জোনস, কোলব্রুক, প্রিন্সেপ ভারতে এসে সংস্কৃত শিখেছেন কয়েক বছর মাত্র, তাদের লুঠের কাজ সম্পন্ন করেই( প্রাচ্য বিদদের সংস্কৃত জ্ঞান বিষয়ে আমাদের দলের সাথীর লেখাটা কৌলাল পত্রিকায় পড়তে পারেন koulal.com/2018/07/10/প্রশ্নঃ-ইংরেজ-আমলের-ইয়োর/)। যতটূকু হাতে বাড়তি সময় ছিল, সে সময়ে সংস্কৃত শিখে এবং সেই ভাষা জ্ঞান নিয়ে তারা নানান প্রাচীন বই অনুবাদ এবং সেই সঙ্গে আমাদের কৃষ্টিকে বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁদের সেই বিশ্লেষণ অবলম্বন করে আজও প্রাচীন ভারত বিশ্লেষণের জ্ঞানচর্চা চলছে।
এই তত্ত্ব উপড়িয়ে ফেলার কাজে কলিমখানের তত্ত্ব আমাদের নির্ভরযোগ্য হাতিয়ার হতে পারে। কিছু কিছু বিষয়ে মতভেদ আছে। থাকুক। সেটা স্বাস্থ্যকর। তবে মতভেদ এমন নয় যে আমরা কিছুটাও একসঙ্গে হাঁটতে পারব না। একসঙ্গে হাঁটতে আমাদের হবেই।
বাংলার কারিগর হকার সংগঠন মনে করে ধরমপাল, চন্দ্র কান্ত রাজু, ক্লদ আলভারেজ, আশিস নন্দী, অনুপম মিশ্র, জয়া মিত্রদের সঙ্গেই উপনিবেশিক জ্ঞানচর্চা থেকে মুক্তির পথের অন্যতম দিশারী কলিম খান।
জয় বাংলা!

Friday, November 18, 2016

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা - হকার এবং পরম্পরার উদ্যমীদের সাংবাদিক সম্মেলন


আজ কলকাতার প্রেস ক্লাবে হকার সংগ্রাম কমিটির উদ্যোগে আগামী ২৬ নভেম্বর অপারেশন শানসাইনের কুড়ি বছর এবং কেন্দ্রিয় সরকারের টাকা বাতিলের বিরুদ্ধে একটি সাংবাদিক সম্মেলন আয়োজিত হয়। সেই সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন উইভার্স আর্টিজান এন্ড ট্রাডিশনাল আর্টিস্টস গিল্ডের সম্পাদক বিশ্বেন্দু নন্দ। হকার সংগঠনের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন মুরাদ হোসেন, দেবাশিস দাস, প্রতীম নাগ, অসিত সাহা এবং অর্থনীতিবিদ দীপঙ্কর দে।
এই সম্মেলনে দুটি সংগঠনের প্রতিনিধিরা অপারেশন শানসাইনের কুড়ি বছর পালন করার ডাক দেন এবন্ং বিশদে নরেন্দ্র মোদির টাকা বাতিল পরিকল্পনা সমাজের প্রত্যেক স্তরে কি ক্ষতি করছে তা বলেন।
অধ্যাপক দীপঙ্কর দে ভারতের সমাজজীবনে এই প্রকল্পের ক্ষতিকর দিকগুলি বিশদে তুলে ধরেন।


Saturday, March 28, 2015

হকারদের স্বার্থ দেখতে চাইলে ভেন্ডিং কমিটি তৈরি করেই এগোতে হবে শক্তিমান ঘোষ

সম্প্রতি রাজ্যে সংবাদপত্র দেখলে মনে হবে হয়ত হঠাতই হকার সমাজ যেন খুব প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। ব্যাপারটা কতটা সত্যি তলিয়ে দেখা যাক। গৌতম বুদ্ধের আগেও ভারতীয় সমাজ সংস্কৃতি, অর্থনীতিতে হকারদের বিপুল ভূমিকা ছিল। বিশ্বায়নের প্রভাবে গ্রাম থেকে উচ্ছেদ হয়ে আসা চাষী, হস্তশিল্পী, কারখানা বন্ধ হওয়া শ্রমিক, বেকার যুবক শহরের ফুটপাথে হকার হতে বাধ্য হন। অনেকেই সম্প্রদায়গতভাবে ব্যবসায়ী। এই হকারেরা দেশিয় বাস্তবতায় নতুন এক মাটির অর্থনীতি বা লো-সার্কিট ইকনমি তৈরি করেছেন, যে অর্থনীতিতে তাঁরা শুধু নিজেরাই রোজগার করে না, স্থানীয় উৎপাদন দেশে বিদেশে বিক্রি করে স্থানীয় মানুষদের রোজগার দেন এবং স্থানীয় সংস্কৃতি রক্ষা করেন। সারা বিশ্বে বড় পুঁজির আর্থনীতিতে ধ্বস নামলেও হকার অর্থনীতি এই বাজারের বাইরে থাকায় ভারতে এর আঁচ পড়ে নি। শপিং মলে আশি কোটি চাষী, ছোট উৎপাদকের উৎপাদন থাকুক চাই না থাকুক, ভারতের এই মানুষদের শহুরে বাজার তৈরি করে দেন চার কোটি হকার। এর বিনিময়ে তাঁরা সরকারের কাছে চাকরি চাইতে যাননি, ব্যবসার পুঁজিও ধার হিসেবে চাননি – যদিও সেটি তার সাংবিধানিক অধিকার ছিল। নিজেরা পুঁজি জড়ো করে  শহরের নানান এলাকা সমৃদ্ধ করেছেন, ব্যবসা, বসবাসের উপযোগী করেছেন। এর বদলে নয়ের দশকে তাদের কর্মস্থল থেকে, বাসস্থান থেকে রাষ্ট্রের থেকে উচ্ছেদের হুমকির সামনে পড়তে হয়েছে। ১৯৯৬ সালের কলকাতায় আপারেশন সানসাইনে(না সানসেট?) ১৮ জন হকার মারা যান। বিযয়টা হল বড় পুঁজি দশ হাজার কোটি টাকার কলকাতার রাস্তার ব্যবসা দখল নিতে চাইছে। তারা সংগঠিত ভাবে হকার বিরোধিতা চারিয়ে দিতে চাইছে জনগণের মধ্যে। কিন্তু রাস্তায় হকারদের ব্যবসা জনগণ-সমর্থন ছাড়া হয় না। ২০০০ সালে হকার সংগ্রাম কমিতির গ্রাহক সমীক্ষায় পরিষ্কার হকারদের থেকেও মানুষ যে সেবা পান তা যে কোনও সংগঠিত সেবা ক্ষেত্র থেকে ২৫-৭৫ শতাংশ শস্তা, ভাল এবং হাতের কাছে পাওয়া যায়। ২০০৪ সালে হকারদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিয়ে কলকাতায় চারটি মডেল হকার জোন(পার্ক স্ট্রিট, রাসেল স্ট্রিট, ক্যামাক স্ট্রিট, এলগিন রোড) তৈরি হলে হকারদের গ্রাহক বেড়েছে। ফুড হকারেরা কলকাতায় দিন আসা কয়েক কোটি মানুষের মুখে অন্ন তুলেদেন। এঁদের সেবা দেওয়ার সামর্থ নেই সংগঠিত হোটেল রেস্তোরাঁর। ১৯৯৩ সালের অল ইন্ডিয়া ইন্সটিউট অব হাইজিন এন্ড পাব্লিক হেলথের সমীক্ষা বলছে ফুটপাথে ৩০০ ধরণের গরম এবং টাটকা খাবার পাওয়া যায়। তাই জীবানু বাসা বাঁধে না। হকারেরা বাসি খাবার বিক্রি করেন না। শুধু ব্যবহারিক জলের মান উন্নত করতে পারলে টুকরো সমস্যাগুলো নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আনা যায়। সমাধানে সরকারের অংশগ্রহণ জরুরী। কিন্তু দীর্ঘ দিন ধরে বাংলায় সে উদ্যমের অভাব রয়েছে। ২০১৩, ৯ সেপ্টেম্বরে সালে সুপ্রিম কোর্ট রাজ্যগুলোর সচিবদের নির্দেশ দিয়ে বলে চার মাসের মধ্যে পৌরসভাগুলোতে টাউন ভেন্ডিং কমিটি তৈরি করে হকারদের রেজিস্ট্রেশন, হকিং জোন নন হকিং জোন তৈরি করতে হবে, তাদের পরিচয়পত্র দিতে হবে। যতদিন না কমিটি হবে ততদিন কোনও হকার সরানো যাবে না। ভারতে ৮৫ শতাংশ কর্পোরেশন সেটি করলেও বাংলায় আজও টাউন ভেন্ডিং কমিটি তৈরি হয় নি। ২০১৪ সালে ২০ ফেব্রুয়ারি সংসদে সর্বসম্মতিক্রমে, ৪ মার্চ, রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরে গৃহীত হওয়া হকার সম্বন্ধীয় আইনে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পন্ন হল। শহরে মানুষের চলাচল, যান চলাচল বাধাহীন হয় এবং একি সঙ্গে হকারদের জীবন জীবিকার স্বার্থ সংরক্ষণ হল। আমরা মনে করি শহরে গতি আনতে হবে। তাই টাউন ভেন্ডিং কমিটি সর্বসম্মতিক্রমে ঠিক করবে হকারেরা কোথায় বসবে আর কোথায় নয়। যদিও বলা হয় কলকাতায় মাত্র ১১ শতাংশ রাস্তা। কিন্তু সেই ফাঁকা স্থান বজায় রেখে হকারদের মূলতঃ ফুটপাথে পুনর্বাসন সম্ভব। বাকিদের কলকাতার পৌর বাজারগুলো বহুতল করে নিচের একটি তলা হকারদের জন্যও কর্তৃপক্ষ দিয়েও দেন তাহলেও প্রচুর হকার বসতে পারেন। কোনও ডেভেলাপার যদি হকারদের ব্যবসার জন্য নিচে তলাটি ছেড়ে দেন তাহলে তাঁকে একটা তলা বাড়িয়ে নেওয়ার জন্য ছাড় দেওয়া যায়। ইচ্ছে থাকলে উপায় হয়। আইন এবং কোর্টের রায় বলছে আগামী দিনের নতুন শহরে শহর পরিকল্পনায় আড়াই শতাংশ স্থান হকারদের জন্য ছেড়ে দিলে বড় শহরের ওপর হকারদের চাপ কমে যাবে। আমরা মনে করি আরবান রিনিউয়াল মিশনের দর্শনে যারা সব কিছু কিনে নিতে পারেন তাদের জন্য শুধু উন্নয়ন নয়, ফ্লাইওভার, বড় বড় বাড়ি, শপিং মলও উন্নয়ন নয়। দরকার মানুষের উন্নয়ন। আরবান লাইভলিহুড মিশনের বিপুল টাকার মধ্যে পাঁচ শতাংশ হকারদের সমীক্ষা, প্রশিক্ষণ, পারিবারিক সুরক্ষা আর পুনর্বাসনের উন্নয়নের পরিকল্পনায় খরচ করতে পারবে রাজ্যগুলো। কোর্টের রায় এবং কেন্দ্রীয় আইনে বলা হয়েছে শহরে টাউন ভেন্ডিং কমিটিতে স্থানীয় সরকার, পুলিশ, হকার এবং অন্যান্যদের প্রতিনিধিত্ব থাকবে। এরাই ঠিক করবেন আগামী দিনে শহরে কোথায় হকার স্থায়ী ভাবে, আর কোথায় নিয়ন্ত্রিত ভাবে বসবেন। আগামী দিনে যখন শহরের লোকসংখ্যা বাড়বে, তখন সেই বাড়তি জনসঙ্খ্যাকে সেবা দিতে হকারদের জন্যও যে আড়াই শতাংশ জায়গা রাখা হয়েছে, সেখানে কোন নীতিতে হকারেরা বসবেন। আমি সংগঠন করতে গিয়ে মহাদেশগুলোর চল্লিশটি দেশ ঘুরে দেখেছি দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় থাইল্যান্ডের হকার পরিকল্পনা সব থেকে ভাল। এদের সমাজ বাস্তবতা ভারতের মত। প্রচুর মানুষ, প্রচুর হকার। এঁরা নিজেদের মত করে হকারদের সাজিয়ে নিয়েছেন। রাস্তার জায়গা নিয়ে দখলদারি নেই। কিন্তু খুব গুছোনো। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। শহরের হকার নেতাদের সেগুলো দেখালে তাদের চোখ ফুটবে। আমরা মনে করি শহর জনগণের,  হকারেরাও এই শহরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি সুন্দর রাখা হকাদের দায়িত্ব। এই শহরের যে হকার পিচের রাস্তায়, গুরুত্বপূর্ণ মোড়ের ৫০ ফুট, ফুট জুড়ে বসে তারা হকারদের বন্ধু নয়। এদের মদত দিচ্ছে প্রশাসন, পুলিশ আর তথাকথিত ইউনিয়নের নামে তোলাবাজ। সারা দেশে এরা বিপুল অর্থ হকারদের থেকে তোলা তোলে। আমরা কলকাতা পুরসভাকে বলেছি, সারা বছর হকারেরা ১০০ কোটি টাকা সরাসরি কর দেবেন। এই রাজ্য হকারদের স্বার্থ দেখতে চাইলে ভেন্ডিং কমিটি তৈরি করেই এগোতে হবে। এই কমিটি ঠিক করবে কোনও হকার বিধি ভঙ্গ করলে তার কি সাজা হবে। হকার ইস্যুতে দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা। মাননীয় মুখ্যমন্ত্রীও আশাকরি এই ভাবনাই ভাবছেন। নান্যঃপন্থা।

Wednesday, October 2, 2013

Indian Bazar6, ভারতের বাজার৬

Selling barley by weight in Jeypore, a stereoscopic view, 1908

sociable aspects of a bazaar street, with residential spaces above many of the shops; a photo taken in or near Simla, c.1915

The Palace of the Seths, in Ajmer, with shops on the street level; a wood engraving by E. Therond, 1878

Vegetable vendor, Bombay,1900

Indian Bazar5, ভারতের বাজার৫

Market stall, India,John Saché , c.1870

meatmkts1940s

nashik  shop-surrounded temple, in a photograph from 1892

ommercial activity at a temple at Nasikh, on the Godavari; a photo from c.1880

roadside grocer, 1910's, Simla

second-floor temple in Jodhpur, with shops at street level; c. 1950

Indian Bazar4, ভারতের বাজার৪

Bengalee Beniah or Grain-seller,Illustrated London News, 1874

calcuta bazar

Durzies, Jammu and Kashmir, a photo from the 1890's

grocer with some of his wares, c.1820

hillstation market

Jodhpur market, a news bureau photo, 1950

Indian Bazar3, ভারতের বাজার৩

Roadside vendor, 1916; perhaps Karachi

snack seller in wheeled cart, with a cow hovering nearby c.1960's, Jaipur

Street vendor, a photo c.1944, attributed to Anita M. Beer

Sunday, September 8, 2013

ভারতের তৃণমূলস্তরের ব্যবসায়ী আর ব্যবসা৯, Grassroot Hawkers of India9

হাজার হাজার বছর ধরে ভারতীয় বণিক কিন্তু সেই পণ্যদ্রব্যগুলি নিয়ে প্রায় একচেটিয়া ব্যবসা করে এসেছে বিশ্ববাজারজুড়ে। কিন্তু সেই একচেটিয়া বাজার বাড়াতে, বিশ্ব বাজারের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে এনে, প্রাকৃতিক সম্পদকে নিংড়ে অতিরিক্ততম উতপাদনকরে, নিজের দেশের, সাম্রাজ্যভুক্ত দেশের উত্পাদকদের উতপাদনক্ষমতা শেষপর্যন্ত ব্যবহার করার অধিকার দেয় নি ভারতীয় সমাজ। এবং ভারতীয় বণিকেরাও, সে তৃণমূলস্তরেরই বণিকই হোক অথবা পাইকারি বিশ্ববাজারের বণিকই হোক, সেই নিয়ন্ত্রণ মেনে ভারতে এবং বিশ্ব বাজারে ব্যবসা করে এসেছে। এই সামাজিক শৃঙ্খল ছিঁড়ে গেল ইংরেজের ভারত তথা বাঙলা দখলের মধ্যে দিয়ে। কয়েক স্তবক আগেই আমরা দেখেছি বিকেন্দ্রিকৃত ভারতীয় সভ্যতার নানান রেণুকে ভাঙতে ইংরেজ আর ইংরেজদের স্নেহধণ্য ব্যবসায়ীরা এক যোগে বংলার সমাজ সংগঠণের ওপর বিশাল একটা অত্যাচার নামিয়ে এনেছিল। বিপরীতভাবে আমরা দেখেছি সেই অত্যাচারী লুঠেরা সময় পেরিয়ে আজও ভারতীয় অর্থনীতিতে পথ ব্যবসায়ীরা তাদের চিরাচরিত সামাজিক-ব্যবসায়িক জ্ঞাণ প্রয়োগ করে বিশ্বায়ণের ব্যবপারীদের বিপরীতে দাঁড়িয়ে তৈরি করার চেষ্টা করছেন ভারতবর্ষের চিরাচরিত দর্শণ, যে দর্শণের মূল লক্ষ্য সবাইকে নিয়ে সমানতালে সমভাবে বাঁচা।
স্বাধীণোত্তর ভারতের প্রচলিত রাষ্ট্রিক অর্থনীতি যে ভাষ্যই পেশ করুক না কেন, প্রথাগত ভারতীয় সমাজে তৃণমূলস্তরের উত্পাদক এবং ব্যবসায়ীরা যে সামাজিক সুরক্ষার বলয়টির পরিবেশ অনুভব করতেন ইংরেজ শাসনের পূর্বে, ইংরেজ আমল থেকে আর সেই পরিবেশ বর্তমান নেই। সনাতন সমবায়ী সমাজের সামাজিক রীতিনীতি, সমাজবন্ধন বিলয় হয়ে যাওয়ার পর থেকেই বিগত আড়াইশ বছর ধরে বহু উত্পাদক, ব্যবসায়ী তাঁদের বংশপরাম্পরিক ব্যবসা ছেড়ে কায়িক শ্রম থেকে রোজগারের তুলনামূলকভাবে সহজ সোজা পথ ধরেছেন। পশ্চিমি জ্ঞাণচর্চা পদ্ধতিতে কায়িক শ্রম অর্থে অদক্ষ অথবা অর্ধদক্ষ শ্রমিক- শ্রমিক দক্ষতা বিরোধী, ভারতীয় সামাজিক সভ্যতা বিরোধী এই তত্ব প্রচারের কাজ যে লেখকেরা করছেন না সে কথা কম্বুকন্ঠে জনিয়ে দেওয়া যাক। অস্বীকার করার উপায় নেই, ব্রিটিশ পূর্ব সময় পর্ষন্তু ভারতীয় গ্রামীণ উত্পাদক, ব্যবসায়ীরা যে সামাজিক সুরক্ষার অদৃশ্য বলয়ে বাস করতেন, ভারতের বহুগ্রামসমষ্টিতে সেই অবস্থাটি ভেঙে দিতে সক্ষম হয়েছে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য। তবু আজও যতটুকু পাওয়া যায় সেইটুকু নিয়েই গ্রামীণ উত্পাদক এবং তৃণমূলস্তরের ব্যবসায়ীরা সমাজের তৃণমূলস্তরের মানুষদের নানান সামান্য চাহিদাটুকুও মিটিয়ে আসতে পেরেছেন।
দীনেশ সেন মশাইএর ভাষায় বিগত একসহস্র বছর ধরে গৌড়বঙ্গের রাষ্ট্রিক-সামাজিক পরিবর্তন নিরন্তর ভাঙাগড়ার মধ্যেদিয়ে চলেছে। প্রথমে আগ্রাসী মুসলিম সাম্রাজ্য, পরে ধংসাত্মক ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রতিঘাতে বাঙলার সমাজজীবনে এসেছে নানান পরিবর্তন। ইসলামের সঙ্গে বাঙলার অভিঘাতি পারম্পরিক সংস্কৃতির পরিবর্তন ঘটেছে, অনেক অত্যাচারও ঘটেছে ঠিকই- কিন্তু ইসলামের বড় একটি দিক ছিল, সে বাঙলা তথা ভারতের সম্পদ লুঠ করে যে দেশগুলি থেকে ভারত আক্রমণ করতে এসেছিল, সেই সব দেশে নিয়ে যাওয়ার কথা ভাবেনি। প্রথম যুগে লুঠেরা সাম্রাজ্য স্থাপন করলেও, দীর্ঘ সময় ধরে ভারত তথা বাঙলার সংস্কৃতির সঙ্গে মিলেমিশে বাস করে নতুন এক সংশ্লেষী সংস্কৃতির নমুনা স্থাপন করে গিয়েছে। যতটুকু অত্যাচারী পরিবর্তন এসেছে, তা সমাজের বহিরঙ্গে, অন্তরে যে পরিবর্তন ঘটেছে তা দেওয়া নেওয়ার। পারম্পরিক সমাজের ভেতরে প্রবেশ করে নিজের কেন্দ্রীভূত দর্শণ ভিত্তিকরে, সমাজকে ভেঙেচুরে নিজের সংস্কৃতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে নি।
মুঘল শাসনের উত্তুঙ্গ সময়েই ব্রিটিশ বণিক-শাসকেরা ভারতে পদার্পণ করেছেন। ভারতে পা রাখার অনেক আগে থেকেউই সারা বিশ্বে অন্যান্য ইওরোপিয় শক্তিরমত ব্রিটিশরা যে ধংসাত্মক অত্যাচার চালিয়ে এসেছিল, সেই কাজটি তারা অনেক আগেই ভারতের মাটিতে শুরু করতে চাইছিল, কিন্তু নানান কারণে পারছিলন না। ১৭৭৫৭র পর থেকেই ভারতের শাসন ব্যবস্থায় তারা মাথাগলিয়েদেওয়ার কাজটি করতে সক্ষম হল তারা। মুঘলদেরমত শুধুই শাসন করে তাদের আশ মেটেনি, ব্রিটিশদের প্রথমথেকেই উদ্দেশ্য ছিল ইংলন্ডের বিকাশ, এবং ভারতবর্ষসহ এশিয়ার আমূল ধংস প্রক্রিয়া। তাই যে কোনও  মূল্যেই তারা চেষ্টা করেগিয়েছে, প্রথমে বাঙলা, পরে ভারতের নানান স্থানের সম্পদ আহরণ করে, ভারতের বিকশিত প্রযুক্তি আর জ্ঞাণ দখল করে, ভারতের শিল্পউত্পাদন ব্যবস্থাকে সমূলে ধংস করে, ভারতের চিরাচরিত শিক্ষাব্যবস্থা ধংস করে এক বিকশিত সভ্যতা থেকে অধস্তন দেশ হিসেবে গড়ে তুলবে। তার জন্য তার যা যা করণীয় ঠিক ততটুকু করতে পিছপা হয় নি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীরা। পলাশির পর প্রথম ৭০ বছর লুঠতরাজি চালাবার পর ভারত এবং তার মধ্যবিত্তকে নিজেদের দর্শণে পাখিপড়ারমতকরে গড়ে তুলেছে। ১৯০বছরের শাসন ব্যবস্থায় দেশ স্বাধীণ হয়েও ব্রিটিশ শিক্ষায় শিক্ষিত বিপুল সংখ্যক মধ্যবিত্ত আজও বিশ্বাস করে ব্রিটিশের ভারত শাসনের আগে ভারত এক গরীব পিছিয়ে পড়া দেশ ছিল, ব্রিটিশরা না এলে ভাকত পড়ে থাকত মধ্যযুগে, তথাকথিত নতুন প্রযুক্তি আর সমাজের বিকাশ ঘটত না। ব্রিটিশ যে শিক্ষাব্যবস্থার বীজ রোপণ করে গিয়েছে, সেই বীজ আজ মহীরূহ হয়ে শহরে শহরে ছড়িয়ে পড়েছে।
ব্রিটিশ সরকার দেশের অকেন্দ্রীভূত শিক্ষাব্যবস্থাকে ভেঙে, এমন এক শিক্ষাব্যবস্থার বীজ রোপণ করে গিয়েছিল, যে ব্যবস্থায় ভারতের বাস্তব সামাজিক পরিস্থিতির বিন্দুমাত্রও যোগাযোগ ছিলনা। যোগাযোগ থাকুক এমন কেনো উদ্দেশ্যও তাদের ছিল না। তত্কালীন বঙ্গের মহাবলীরা যে সময় হিন্দু কালেজ থেকে সে যুগে মাসে পাঁচ টাকা(ঠিক সেসময় কলকাতায় বিদ্যাসাগরমশাইএর পিতাঠাকুর ঠাকুরদাসমশাই দুটাকা রোজগার করেই নিজেকে স্বচ্ছল এবং গাঁয়ে অর্থ পাঠাবার যোগ্য ভাবতে শুরু করেছিলেন) দেয় অর্থে ব্রিটিশ পদ্ধতিতে পড়াশোনা করেছেন, তাঁরাও বিচ্ছিন্ন থাকতে চেয়েছিলেন কীনা সে বিষয়ে অনেকেই অনেক কথা লিখেছেন – বিশেষ করে ভারতের নবজাগরণ বিষয়ে গবেষণায় এধরণের অনেক তথ্য প্রকাশ পেয়েছে। সমস্যা হল, যে সব বামপন্থী, ডানপন্থী অথবা মধ্যপন্থী গবেষক এই বিচ্যুতি নিয়ে আলোচনা করেছেন, তারা প্রগতিকে দেখেছেন ব্রিটিশিয় প্রগতির শিল্পবিপ্লবীয় মাপকাঠিতে। ফলে দেশের মানুষ যখন স্বাধীণতা ঘোষণা করছেন, যখন গ্রামে গ্রামে সেনা আর চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে উদ্ভুত নব্য জমিদারদের লেঠেলরা মানুষমারার রক্ত হোলি খেলছে, দেশের সমাজ-শিল্পধংস করার পরিকল্পনায় মাতোয়ারা, শিল্পভিত্তিক গ্রামের পর গ্রাম মানুষ বাপদাদার বৃত্তি থেকে উচ্ছেদ হয়ে মজুরে পরিণত হচ্ছে, ভারতের অকেন্দ্রিকৃত সমাজের পরিকাঠামো ভেঙে যখন ব্রিটিশিয় নানান পরিকাঠামোর বীজ বোণা হচ্ছে, তখনকার অবস্থা বিশ্লেষণে গবেষকেরা হাহুতাশ করছেন যে, কেন বড় শিল্প স্থাপনে ভারতের ধণীরা উদ্যোগী হচ্ছেন না, ভারত তথা বাঙলার সমাজ ভেঙে কেন ব্রিটেনের সমাজের মতকরে ভারত তথা বাঙলাকে গড়ে তোলা হচ্ছে না।

ডান, বাম, সাবঅল্টার্ণ সব ঐতিহাসিক-গবেষকই ব্রিটিশ তথা ইওরোপের বিকাশের পথকেই একমাত্র বিকাশের পথরূপেই দেখেছেন। সাবঅল্টার্ণরা বলছেন ব্রিটিশেরা ভারতে অমিত অত্যাচার চালিয়েছে, ব্রিটিশেরা যাকে ডাকাত বলেছে, তাকে আমরা স্বাধীণতা সংগ্রামী বলছি। ঠিকই। অসম্ভব সাধুবাদযোগ্য প্রকল্প। কিন্তু, এর সঙ্গে সঙ্গে এটাও হয়ত পরোক্ষে মানতে বলছেন, ব্রিটিশদের তৈরি করা প্রায় সবকটি পরিকাঠামো, দর্শণ প্রগতিশীলতার লক্ষণযুক্ত। আমলাতন্ত্র, শিক্ষাব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থার আদতেই কিন্তু ন্যায়ের ধারণা ভিত্তিকরেই গড়ে উঠেছে। ভারতে সার্বজনীক ন্যায়ের ধারণাটি পশ্চিমের কাছ থেকে পেয়েছে, এ তথ্য লেখকদের ই-মেল করে দাবি করেছেন প্রখ্যাত ঐতিহাসিক রামচন্দ্র গুহন। ফলে দেশের গ্রামীণ মানুষ এক তিমিরে ভাবছেন, জাবন ধারণ করছেন, ঠিক বিপরীতে শহুরে, উচ্চবর্ণ অথবা পড়াশোনা করে প্রায়উচ্চবর্ণ হয়ে ওঠা মানুষেরাও ইংরেজি পদ্ধতিকেই নিজেদের সমাজ বিকাশের মোক্ষরূপে ভাবছেন। শহরে এসে উচ্চবর্ণের দেখানো পথকেই নিজেদের বিকাশের পথরূপে ভাবছেন। ভাবছেন সেই বিকাশের পথ রূদ্ধ করতুলছে উচ্চবর্ণ। শহরে এসে সকলেই কমবেশি নিজেরমতকরে উচ্চবর্ণীত হয়ে উঠছেন। আদতে ব্রিটিশ এককেন্দ্রিক দর্শণ চারিয়ে যাচ্ছে প্রায় প্রতিটি ইংরেজি জানা মানুষের মধ্যে। এরমধ্যে হয়ত হাতেগেণা কয়েকজন ব্যতিক্রমমাত্র।

ভারতের তৃণমূলস্তরের ব্যবসায়ী আর ব্যবসা৮, Grassroot Hawkers of India8

আবারও বলা যাক, বংশ পরম্পরায় এই তৃণমূলস্তরের ব্যবসায়ীদের হাত ধরে আজও বেঁচে এসেছে এ দেশ, ভারতবর্ষের উত্পাদন ব্যবস্থা, সর্বোপরি ভারতীয় গ্রামীণ সমাজ। ইংরেজদের বলপ্রয়োগে পরিকাঠামো ধংসযজ্ঞের পরও যতটুকু পরিমান ভারতের উত্পাদনব্যবস্থা বেঁচেবর্তেছিল, সেই উত্পাদন ব্যবস্থার অস্তিত্ব নির্ভর করত দেশিয় এই তৃণমূলস্তরের ব্যবসায়ীদের ব্যবসার জ্ঞাণে, পরিশ্রমে আর ভালবাসাসম ব্যবসায়। আজকের শহুরে ভারতের জ্ঞাণচর্চা নিজের চিরাচরিত পথ থেকে সরে, সরাসরি শেকড়ছেঁড়া পশ্চিমি জ্ঞাণ ও বিদ্যাচর্চার ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে, যার মূল মন্ত্র আর দর্শণ, সনাতন ভারতের অকেন্দ্রিকৃত সামাজিকতার দর্শণের সরাসরি বিপরীত। ভারতে আজ জ্ঞাণ ও বিদ্যাচর্চার প্রাঙ্গণে তাই ব্রাত্য তৃণমূলস্তরের ব্যবসার উদ্যমের নানানস্তর, নানান দিক চর্চার বিষয়টি। এর একটি বড় কারণ হল শিল্পবিপ্লব নির্ভর পশ্চিমি সভ্যতা কেন্দ্রীকরণের দর্শণে বিশ্বাসী এবং সেই দর্শণ ভিত্তিকরেই গড়ে উঠেছে মূলগত পশ্চিমি জ্ঞাণচর্চার প্রক্রিয়া, সেই পরিবেশে ভারতীয় গুণীদের জ্ঞাণের বিকাশ। উল্টোদিকে ভারতীয় গ্রামীণ সমাজের তৃণমূলস্তরের নানান উদ্যম সামগ্রিকভাবেই বিকেন্দ্রিকৃত দার্শণিকতার ভিত্তি।
তৃণমূলস্তরের ব্যবসায়ীরা এই ভারতীয় সমাজেরই অন্যতম বিকাশ শৃঙ্খল। সমাজের অন্যান্য অংশেরমতই তাঁরা তাঁদের অবদান পেশ করে এসেছেন হাজার হাজার বছর ধরেই সমাজের রীতি নীতি মেনেই, সামাজিক নানান বিধিবাধাবন্ধন মান্য করেই। শিল্পবিপ্লবোত্তর পশ্চিমি ব্যবসায়ীরা সমাজ শৃঙ্খলের সমস্ত বেড়াজাল ভেঙে পৃথিবীকে শোষণ করে ব্যক্তিগত সম্পত্তির পাহাড় বানিয়ে বিশ্বকে, মানব সভ্যতাকে ঠেলে দিচ্ছেন ধংসের মুখোমুখি, তখনই ভারতের তৃণমূলস্তরের ব্যবসায়ীরা, যাদের অন্যতম অংশ এই পথ ব্যবসায়ীরা, সেরিবা-সেরিবানের উত্তরাধিকারীরা, আজও চেষ্টা করে চলেছেন যতটুকু তাঁরা রোজগার করছেন, তাদের ব্যবসার জ্ঞাণের এক অংশ সমাজগঠণের কাজে লাগাতে, মুনাফা একহাতে জড়ো না করে সমাজের নানান অংশিদারের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে। বংশ পরম্পরায় তাঁরা সেই নৈতিকতা এবং সামাজিক ব্যবসার ধর্ম, জ্ঞাণটুকু অর্জন করেছেন। এই বিশ্বায়ণের লুঠেরা বাজারেও পথ ব্যবসায়ীরা যতটাসম্ভব পরম্পরা মেনে দেশিয় নানান দ্রব্য নিজেরা বিক্রি করার চেষ্টা করছেন নানান লোভ লালসার বেড়াজাল পেরিয়েও।

ভারতীয় শহুরে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে তৃণমূলস্তরের ব্যবসায়ীদের ব্যবসার পারস্পরিক রীতিনীতি সম্পূর্ণভাবে বিপরীতধর্মী হলেও, একটিমাত্র বিন্দুতে তারা পরস্পরের সঙ্গে মিলতেন, সেটি হল সামাজিক নিয়ন্ত্রণ মেনে ব্যবসা – দেশেই হোক আর বিদেশের মাটিতেই হোক, সমবায়িক সমাজের সুকঠোর অকেন্দ্রিভূত দর্শণের রীতিনীতি মেনে চলতেন তাঁরা। অন্ততঃ ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য স্থাপণের পূর্বে, ভারতীয় বণিকেরা সমাজের এঁকে দেওয়া সামাজিক রীতিনীতিবিশিষ্ট অদৃশ্য লক্ষণরেখা টকপাবার বিন্দুমাত্র প্রচেষ্টা করেননি। একরমই ছিল বণিকদের ওপর সমাজের নিয়ন্ত্রণ। অথচ এর তুঙ্গবিপরীতদর্শণবিন্দুতে দাঁড়িয়ে ইংলন্ডের শিল্পবিপ্লবের প্রাক্কালে সারা বিশ্বের সম্পদ লুঠ করতে বণিকের তুলাদন্ড, শাসকের রাজদন্ডে পরিণত হয়েছে অবলীলায়। বিশ্বের নানান প্রান্তের নানান দেশের নানান সমাজের প্রকৃতিক, সামাজিক, পরমার্থিক নানান ধরণের সম্পদ লুঠ আর চুরি (যে কোনও  সমাজেই তথ্য, জ্ঞাণ, সম্পদ আহরণের সূত্র লোপাট করে ফেলাকেই চুরি বলে বোধহয়) করে, এমনকী বলপ্রয়োগে নিজের দেশেরও সামাজিক নিয়ন্ত্রণ ভেঙে, মাটির তলার সম্পদকে প্রাকৃতিক সম্পদ আখ্যাদিয়ে, বলপ্রয়োগ করে দখল করে, কয়েকজন হাতেগোণা বণিকের উদ্যমে বিশ্বপণ্য, বিশ্বসম্পদ বাজার দখলের চেষ্টা শুরু হয়েছিল। মনেরাখতে হবে, ভারতীয় বণিককে সেই অবাধ বাণিজ্যের, অবাধ উত্পাদনের ছাড়পত্র শহুরে অথবা গ্রামীণ সমাজ কোনও দিনই দেয় নি। একদা বিশ্ববাজারে যেসব ভারতীয় পণ্যদ্রব্য প্রায় একচেটিয়া ব্যবসা করত সেগুলোর মধ্যে কাপড় ছোপানোর নীল রং যার ব্যবসায়ী নাম ইন্ডিগো, অথবা ডেকরা কামারদের তৈরি লোহারমন্ড, তাঁতিদের তাঁত অথবা রেশম তন্তু, বাঙলার সুপুরি, হাতি ইত্যাদি ছিল অন্যতম চাহিদাবন্ত পণ্যবস্তু।

ভারতের তৃণমূলস্তরের ব্যবসায়ী আর ব্যবসা৭, Grassroot Hawkers of India7

পশ্চিমি ব্যবসা অথবা উত্পাদন প্রক্রিয়ার একটা বড় প্রক্রিয়াই হল ব্যবসা অথবা উত্পাদনের একচেটিয়াকরণ, আজকের ব্যবসার ভাষায় কনসোলিডেশন। আজ ভারতীয় বড় ব্যবসায়ীরা দার্শণিকভাবে সেই দর্শণএর অংশিদার। কিন্তু তৃণমূলস্তরের ব্যবসায়ীরা তাঁদের পালক সমাজের চিরাচরিত সামাজিক রীতিনীতি মান্যকরেই সামাজিক বিকেন্দ্রিক পণ্য উত্পাদকদেরমতই কোনও  ব্যবসাকেই একজন অথবা এক ব্যক্তির একচেটিয়া ব্যবসারূপে প্রতিভাত করার চেষ্টা করেন নি কোনও দিনই। ব্যবসায় অথবা উত্পাদনে ব্যক্তিগত দখলদারি ছিল সমাজেরকাছে ঘৃণ্য দর্শণ। চিরাচরিত সমাজে তাই ব্যবসাজাত মুনাফা একহাতে না রেখে বেঁটে দিয়েছে সমাজের নানান স্তরে।
তৃণমূলস্তরের ব্যবসার অন্যতম বড় দর্শণ, সাম্যবোধেরভাব। পশ্চিমি জ্ঞাণ আর শিক্ষাচর্চার দর্শণ অনুসরণ করে ছোট ব্যবসায়ীদের বড় ব্যবসায়ী হয়ে ওঠাকে এতদিন পর্যন্ত সামাজিক প্রগতির অন্যতম সহায়করূপে ভেবে নেওয়া হয়েছে, এবং এই প্রক্রিয়াকে সহর্ষে সমর্থনও করা হয়ছে মধ্যবিত্তপোষিত নানান গবেষণা উদ্যমে, এমনকী বামপন্থী রাজনৈতিক আঙিনাতেও। লেখকদের দৃঢ় বিশ্বাস, চোখের সামনে থেকেও সহজে দেখতে না পাওয়া, এই তৃণমূলস্তরের ব্যবসায়ীদের বড় ব্যবসায়ী না হয়ে ওঠার দর্শণএর মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে এদের প্রতি শাসক মধ্যবিত্তিয় অবহেলার প্রতিক্রিয়া। মধ্যবিত্তের গবেষণায় তাই এতদিনই উজ্জ্বলসম বড় ব্যবসার প্রক্রিয়াই নজরে এসেছে। সে তথ্য জেগাড় করাও তুলনামূলকভাবে সহজ। পশ্চিমের বিদ্যাচর্চা বড়ব্যবসার গুণগ্রাহী। তাদের পাতে সহজে সে তথ্য পরিবেশন করলে প্রচারলাভ ঘটে। তবুও অনেকসময় মনে হয় আবার নতুনভাবে নতুন দর্শণে পুরোনো ভারতীয় সাম্যভাবী ব্যবসার, উত্পাদনের নীতিতে কী ফিরে যেতে পারি না। পারিনা যদি সিদ্ধান্তও হয়, তাহলে কী তৃণমূলস্তরের উত্পাজন এবং ব্যবসার উদ্যমের এই আলোচনাও কী ব্রাত্য থেকে যাবে!

তৃণমূলস্তরের ব্যবসার মূলগ্রন্থিটি ছিন্ন হয়ে যায়, রাষ্ট্রভিত্তিক ইংরেজ শাসন, দেশের পারম্পরিক উত্পাদন আর ব্যবসার পরিকাঠামোকে ধংস করে দেওয়ার পর থেকেই। হাজার হাজার বছর ধরে বিকশিত বাঙলার পারম্পরিক সামাজের রীতিনীতিগুলি ছিন্ন করে ব্রিটেনে বিকশিত কেন্দ্রিভূত নেশনরাষ্ট্রভিত্তিক দর্শণএর গোড়াপত্তন করা হয় এদেশে। বিকশিত ভারতীয় সমাজের নানান রূপরসগন্ধও একইসঙ্গে বিলীন হয়ে যেত শুরু করে এই উত্পাদন আর ব্যবসার ব্যবস্থা ধংসের মধ্যে দিয়ে। এর আগেই আমরা বলেছি, পথ ব্যবসায়ী অথবা তৃণমূলস্তরের ব্যবসায়ীরা এই দেশজ উত্পাদকেদের সঙ্গে সরাসরি আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়েছিলেন। তাই দেশজ উত্পাদকেদের পরিকাঠামো জ্ঞাণভান্ডার ধংসের সঙ্গে সঙ্গে তৃণমূলস্তরের ব্যবসায়ীদের অবস্থাও আর্থিক ও সামাজিকভাবে নিম্নাভিমুখী হয়ে পড়ে। তবুও তৃণমূলস্তরের পথ ব্যবসায়ীদের তৈরি পরিকাঠামোর মজা হল, এরা গায়েগতরে খেটে, তৃণমূলস্তরে দাঁড়িয়ে থেকে যে বাজারটি তৈরি করেছেন দার্ঘ দিন ধরে, সেই বাজারে সহজে অন্য এককেন্দ্রিক ব্যবসায়ীর দখলি প্রবেশ খুব সহজে হয় না। এঁদের ক্রেতা যেহেতু মূলতঃ ছোট গৃহস্থ এবং এক্কেবারে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, তাই ক্রেতা-বিক্রেতার সরাসরি ব্যক্তিগত সম্পর্কও তৈরি হয়ে পড়ে খুব সহজেই। ভারতীয় তৃণমূলস্তরের ব্যবসার রীতিনীতি মেনে শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে কিন্তু সম্পর্কটুকু। এই সম্পর্ক দিয়ে তৈরি হয় মানবিকতা।

ভারতের তৃণমূলস্তরের ব্যবসায়ী আর ব্যবসা৬, Grassroot Hawkers of India6

ইংরেজ আমলে কলকাতায় আশ্রয় নেওয়া বাঙালির নুনের ব্যবসায় নজর ফেলে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে, সরকার অথবা রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত লবন মহলে, লবন উত্পাদন করে কলকাতায় নিয়ে এসে বিপুলপরিমান লবন নীলামবাজারে তুলেদিয়েই হাত ধুয়ে ফেলত ইংরেজ। বাজার থেকে ইংরেজ আশ্রিত বাঙালি নানান পাইকার, সেই লবন নীলাম বাজার থেকে কিনে তার গোষ্ঠীভূক্ত ব্যবসায়ী মার্ফত ছড়িয়ে দিতেন জেলার বাজারে, জেলার পাইকারদের হাতে, যার উল্লেখ বিশদে করা হয়েছে আগেই। জেলার পাইকারদের কাছ থেকে কিনে নিয়ে আরও একধরণের ব্যবসায়ীরা লবন ছড়িয়ে দিতেন নানান আঞ্চলিক বাজারে। কলকাতার বাজারে যিনি খুচরো ক্রেতা তিনি আবার জেলার বাজার পাইকার। এই আঞ্চলিক বাজার থেকে আরও গভীরে পণ্য পরিবহন করে নিয়ে যেতেন কিন্তু পথ ব্যবসায়ীরাই। শুধু নুনই নয়, হাজারো উত্পাদকের পণ্যদ্রব্য বাঙলা তথা ভারতের নানান গ্রামে গঞ্জে পথে প্রান্তরে পৌঁছে দিতে মাহির ছিলেন এই তৃণমূস্তরের পথ ব্যবসায়ীরা।
ভারতবর্ষের মূল সামাজিক দর্শণ আলোচনার সময় আমরা দেখেছি, ভারতের হাজারো সমাজ নিদেরমত করে শাসনের নীতি তৈরি করে নিয়েছিল। কোনও  শাসকের উপায় ছিলনা সেই স্বশাসিত ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ করে। নিজেদের শাসন এলাকায় গ্রামীণরা নিজেরই স্বরাট। প্রত্যেকটি গ্রামগোষ্ঠী উত্পাদনের সঙ্গে প্রশাসনকর্মেও ছিল স্বয়ংসম্পূর্ণ। একটি সমাজের শাসননীতি অন্যসমাজের সেই নীতির সঙ্গে নানান ধারায় নানাবিধ পার্থক্য থাকতেই পারত, সেটাইছিল স্বাভাবিক। শুধু একটি মৌলিক বিষয়ে ভারতের গ্রামগোষ্ঠীগুলি একাট্টা ছিল সেটি হল স্বশাসিত শাসন ব্যবস্থা। ভারতীয় সমাজের নানান বিভাগ সাধারণে অসাধারণ বিকেন্দ্রিকতার দর্শণ নিষ্ঠাভরে পালন করত। এবং সে অর্থে কোনও  কেন্দ্রিভূত শক্তিদ্বারা চালিত হত না বলেই মস্ত এক সভ্যতার রথের চাকা গড়গড়িয়ে চলেছে হাজার হাজার বছর ধরে। পশ্চিমি লুঠভিত্তিক শিল্পবিপ্লবজাত সভ্যতারমত কয়েক শতকেই ভেঙেপড়ার অবস্থা হয় নি। তাকে ধংসকরতে গিয়ে লড়াই চালাতে হয়েছে প্রায় একশতাব্দ।
এই অকেন্দ্রিভূত সভ্যতার অন্যতম বড়, গুরুত্বপূর্ণ অংশিদার ছিলেন আমাদের আলোচ্য তৃণমূলস্তরের ব্যবসায়ীরা, যারা সমাজের মৌল দর্শণবিন্দুটুকু মেনে সমাজের নানান উত্পাদন পৌঁছে দিতেন অন্যান্য সমাজের দোর গোড়ায়। বংশপরম্পরায় তাঁরা এই কাজটি করতে গিয়ে নিজেদেরমতকরে একটি ব্যবসাভিত্তিক জ্ঞাণভান্ডার রচনা করতে পেরেছিলেন, যার মৌল উদ্দেশ্য ছিল সমাজেরমধ্যে মানুষে মানুষে যতটাসম্ভব সাম্যবোধেরভাব তৈরি করা। বড় পাইকারি ব্যবসার অন্যতম অন্তর্নিহিত দর্শণ মানুষে মানুষে বিভেদ, কেন্দ্রিকতা আর অবশ্যম্ভাবীভাবে ব্যক্তির অথবা সংস্থার অতিরিক্ততম মুনাফা অর্জণ। সব থেকে বড় কথা এই শহর কেন্দ্রিক বড় ব্যবসাগুলির সঙ্গে ভারতীয় সমবায়ী সমাজগুলির মৌলকাঠামো দর্শণের বিন্দুমাত্র মিলমিশ ছিলনা। শহুরে বড় ব্যবসায়ীদের ব্যবসা দর্শণএর অন্যতম উদ্দেশ্য হল মানুষে মানুষে বঞ্চনা আর বিভেদ সৃষ্টি আর ব্যবসার মাধ্যমে অমিত ঐশ্বর্য নিজের হাতে আনয়ণ।
অথচ ঠিক উল্টো দর্শণে বিশ্বাসী ছিলেন কিন্তু ভারতীয় তৃণমূলস্তরের ব্যবসায়ীরা। তাঁদের অন্যতম দর্শণ মানুষের মধ্যে বেঁচে থাকা, মানুষকে নিয়ে বাঁচা। দৈনন্দিনের নানান চাহিদাবস্তুগুলি তাঁরা মানুষের দোরে দোরে পৌঁছনোর কাজ করতেন সমবায়ী সমাজের বিকেন্দ্রিকতার সূত্র মেনেই। এঁদের কাজে মুনাফা একটা বড় ব্যাপারছিল সন্দেহ নেই, কিন্তু এঁরা কেউই কিন্তু দার্শণিকভাবে সবমুনাফা একহাতে নিয়ে আসার বিরোধী ছিলেন, আজও আছেন। এর আগে সোনাধর বিশ্বকর্মার উদ্যম আলোচনায় দেখেছি সনাতন সমবায়ী সমাজ ব্যক্তির হাতে অতিরিক্ত পুঁজি কেন্দ্রিভূত হওয়ার নীতির ঘোরতর বিরেধী ছিল।

ভারতের তৃণমূলস্তরের ব্যবসায়ী আর ব্যবসা৫, Grassroot Hawkers of India5

স্বাধীণতার পর গ্রামীণ সমাজবদ্ধ মানুষদের ইংরেজি পড়াতে, ইওরোপের ধাঁচে শিল্প পরিকাঠামোয় যোগ্য করে তুলতে, নতুন উত্পাদনব্যবস্থায় টেনে আনতে রাষ্ট্রব্যবস্থার অর্বুদ পরিমান অর্থ ব্যয়িত হচ্ছে। কিন্তু সাদাচোখে দেখা যাচ্ছে, কাজের কাজ খুব একটা কিছু হচ্ছে না। এই কাজে গ্রামীণ মানুষের অংশগ্রহণই নেই। বিশাল সংখ্যক এই মানুষেরা যে সমাজে বাস করতেন, সেই সমাজকে বলপূর্বক ভেঙে দেওয়া হয়েছে মধ্যবিত্ত পরিচালিত রাষ্ট্রব্যবস্থার নানান পরিকাঠামো ব্যবহার করে। ইংরেজদের নীতি অনুসরণ করতেগিয়ে প্রশাসনে এবং পাইকারি ব্যবসার বড় অংশে উচ্চবেতনের চাকরি দখলকরে রাখা মধ্যবিত্তরাই আজও কেন্দ্রিকৃত দর্শণে বিশ্বাসী এবং আজও তৃণমূলস্তরে সেই নীতিই প্রয়োগ করে চলেছেন। পশ্চিমি নানান দর্শণের প্রভাবে আজও তারা চেষ্টা করে চলেছেন সেই শহুরে পাইকারি ব্যবসা পরিকাঠামোর গ্ল্যামার বৃত্তান্ত প্রচারের। তৃণমূলস্তরের ব্যবসার মূলগত প্রকৃতিই হল অকেন্দ্রীকৃত ব্যবসার নীতি যা আদতে চোখে পড়ে না। এই ব্যবসা কেন্দ্রিকৃত শক্তির পক্ষে চিরকাল দখল রাখাও কঠিন। সেই ব্যবসায় আঘাত করেও অতীতের অভিজ্ঞতায়দেখা গিয়েছে, সামরিক কেন্দ্রিভূত দৃঢ়তায় সাময়িক সাফল্য পাওয়া গেলেও, এক সময়ে সেই সফল্য কর্পুরেরমত উবে গিয়েছে। বাঙলায় অন্ততঃ তৃণমূস্তরে ব্যবসা দখলের ইংরেজি সাফল্য খুব একটা দীর্ঘস্থায়ী হয় নি।
ভারতবর্ষের বিভিন্ন সনাতন সমবায়ী সমাজের বিকেন্দ্রভূত দর্শণকে তাঁদের ব্যবসার মাধ্যমে বাঁচিয়ে রাখতে সাহায্য করেছেন তৃণমূলস্তরের পথ ব্যবসায়ীরা। পথ ব্যবসায়ীরা ছিলেন বলেই ভারত সমাজের ছোট ছোট উত্পাদকেরা, লুঠেরা ইংরেজদের সময়েও তাদের উত্পাদিত নানান দ্রব্য স্থানীয় অথবা আঞ্চলিক বাজারে এমনকী ব্যক্তিমানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছনোর কাজ করতে পারতেন। বৌদ্ধ আমলের সৃষ্টি জাতকের সেরিবা সেরিবানের গল্প আমরা অনেকেই জানি। এঁরা মাথার ঝাঁকা নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় ঘুরতেন স্থানীয় উত্পন্ন দ্রব্য বিক্রি করতে। এ ছাড়াও পঞ্চতন্ত্র অথবা নানান অতীতের সাহিত্যে ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের উত্পন্ন দ্রব্য বিভিন্ন এলাকায় পাওয়া যাওয়ার উল্লেখ রয়েছে। এই কাজগুলিও করতেন এই পথ ব্যবসায়ীরা। যেহেতু পাইকারদের সঙ্গে দামদস্তুর করা বেশ ঝামেলার কাজ ছিল, সেহেতু এই ধরণের তৃণমূলস্তরের ব্যবসায়ীদের হাত ধরেই অনেক শিল্পী সমাজই বেঁচে থাকতেন, নিজেরদের আবিষ্কারকে বাঁচিয়ে রাখতে পারতেন, আবার কেউ কেউ উত্পাদনের সঙ্গে ব্যবসাও করতেন সমান তালে। এই দুই পরস্পরেরপ্রতি নির্ভরশীল গোষ্ঠীবদ্ধ সমাজ দার্শণিকভাবেও পরস্পরের সঙ্গে টান অনুভব করতেন।
পূর্ব মেদিনীপুরের চন্দনপুরের কাঁসার নানান দ্রব্য যারা তৈরি করেন, তাঁরা লেখকদের জানিয়েছিলেন, সুদূর অতীত থেকেই পাইকারদের তাঁরা ধারে পণ্যদ্রব্য বেচতেন ঠিকই, কিন্তু সেই ব্যবসা এই গ্রামীণ উত্পাদকদের পক্ষে খুব সুখপ্রদ হত না। পাইকারদের পাশাপাশি ছিলেন নানান খুচরো বিক্রেতা, যারা প্রাথমিকভাবে ধারে এই বিচিত্র ধরণের উত্পাদিত দ্রব্য ঝাঁকায় নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন বৃহত বাঙলার নানান অঞ্চলে – ওড়িশা, বিহার(এখন কিছুটা ঝাড়খন্ড), অসম রাজ্যের গাঁয়ে গাঁয়ে। সেখানে সহজেই গ্রমীণদের কাছে বিক্রি করতেন এইসব কাঁসার দ্রব্য। তাঁরা বিক্রি করে এনে দাম মেটাতেন নানান উপায়ে – কখোনো অর্থ, কখোনোবা পণ্যে। তৃণমূলস্তরের খুচরো ব্যবসায়ীরাই ভারতের নানান খোলা বাজারে সাধারণ গৃহস্থ, ছোট ব্যবসায়ীদের নানান নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য বিক্রি করতেন বিভিন্ন হাট, মেলা, উত্সব, পরব, পুজোসহ নানান মানব সংমিলনে। আজও আমরা দেখি বিভিন্ন পারম্পরিক মেলা, উত্সবে সারা ভারত থেকেই নানান পারম্পরিক ব্যবসায়ী বিভিন্ন এলাকার উত্পাদিত দ্রব্য নিয়ে এসে বিক্রি করছেন। এই প্রচেষ্টাটি কিন্তু অতীতেও ছিল। বাণভট্টের হর্ষচরিতে উজ্জয়ণীর হোলি উত্সবের সাড়ম্বর বর্ণনায় পথ পাশের দেকানগুলির বর্ণনা যেমন পাওয়া যাচ্ছে, তেমনি পরোক্ষে অস্থায়ী নানান দেকানদারদের কথাও তিনি উল্লেখ করছেন। পারস্পরিক একটি নির্ভরতাবোধও ছিল সমমাজের নানান সেবা প্রদাণকারী এবং উত্পাদক-তৃণমূলস্তরের পণ্য বিক্রেতাদের মধ্যে। আজ মধ্যবিত্ত আমলারা এয় উদ্যম উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ধংস করে দিয়েছেন বড় পুঁজির স্বার্থে। নিরক্ষর ঝাঁকাওয়ালাদের কাগজপত্রদেখতে চাওয়া হয়, হিসেব চাওয়া হয়, নানানভাবে হেনস্থাও করা হয়। কাগজ না থাকলেই জরিমানা। মুখে বর্ণিত ইতিহাসের চর্চা করি পশ্চিমের দেখাদেখি, ঐ টুকুই। সে যে গবেষণা। বাস্তবে কাগজ না থাকলে সবই মিথ্যে। ফেরিওয়ালারা বলেন ভিক্ষে চাই না মা, কুকুর সামলাও। নিজের দেশে যেন নিজেরাই পরদেশি।