Showing posts with label বাংলা যখন বিশ্ব সেরা. Show all posts
Showing posts with label বাংলা যখন বিশ্ব সেরা. Show all posts

Tuesday, November 21, 2017

বাংলা যখন বিশ্ব সেরা৭ - বাংলার দাদনি বণিক ইওরোপিয় কোম্পানির উদ্ধারকর্তা - বাংলার কার্যকর, বিস্তৃত, উন্নত ঋণ ব্যবস্থা - সুশীল চৌধুরী

(State and Finance in the Eurasian Continuum in the Early Modern Times: INDIAN MERCHANT/BANKERS TO THE RESCUE OF THE EUROPEAN COMPANIES, EASTERN INDIA, C. 1650 – 1757: SUSHIL CHAUDHURY)

উচ্চ সুদের হার
১৭৪০ পর্যন্ত বাংলা সুবায় উচ্চসুদের হার কোম্পানির পক্ষে বিপুল পুঁজি ধার করার বাধা হয়ে দাঁড়ায়। কোম্পানির কেন্দ্রিয় দপ্তর বারবার ১২ শতাংশ হাতে ধার নেওয়ার বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি দিতে থাকে। এই সুদের হার ‘অত্যাধিক’ তাদের ব্যবসায় ‘rank poison’। তারা প্রায়শই বিভিন্ন কুঠিয়ালদের ঋণ নিয়ে অনুতসাহিত করত কেননা, ‘the interest of which eats deep and insensibly’। কিন্তু আমরা দেখেছি, কুঠিয়ালেরা ঋণ নেওয়া বন্ধ করে নি, এবং একে অত্যাবশ্যক ঝামেলা বলেই মনে করত।

১৭৪০এ কোম্পানির জন্য সুদ শেঠ এবং অন্যান্য স্রফে ৯ শতাংশে কমালেও, এই হারেও কুঠিয়ালদের পক্ষে ধার নেওয়া মুশকিল ছিল। বহু সময় কোম্পানির অসহায় অবস্থা দেখে ব্যাঙ্কার/স্রফেরা বেশি সুদ দাবি করে বসত। ১৭৪৬ সালে ব্রিটিশ ফ্যাক্টর লিখল, ‘১২%এর নিচের সুদে বাজার থেকে ধার তোলা সম্ভব হয়ে উঠছে না’ এবং তারা কলকাতার কাউন্সিলের কাছে অনুমতি চাইল এই হাতেই তাদের ধার করার অনুমতি দেওয়া হোক।

কলকাতা কাউন্সিল লিখল, ‘positively ordered that on no account they give more than 9 percent for money at interest
for it would be of utmost ill consequence to our Hon’ble Masters should they give any higher premium to any person and we doubt not that who have money to spare will let them have at the same rate as we get everywhere else’। এর উত্তরে ঢাকার কুঠিয়ালেরা ১৬ সেপ্টেম্বর ১৭৪৬এ লিখল, ১২ শতাংশে ধার করার জন্য আমরা স্রফেদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছি। ১২ অক্টোপবর ১৭৪৬এ কলকাতাকে লিখল, ‘স্রফেদের থেকে ১২ শতাংশের নীচে ৯ শতাংশে ধার পাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছে’।

কলকাটা কাউন্সিলের বিশ্বাস ছিল, ইওরোপ থেকে অক্টোবরে জাহাজ এলেই সব সমস্যার সমাধান হবে, ‘we hope the arrival of these ships will give them credit to Borrow money at the usual rate’। ঢাকা প্রত্যুত্তরে লিখল; না ধার পাওয়া যাচ্ছে না। ১৭৪৭এ ঢাকা লিখল তারা ৯ শতাংশে কোন ধার পাচ্ছে না। এবং নভেম্বরেও কোন জাহাজ ইওরোপ থেকে এসে না পৌঁছনোয় অবস্থা আরও সঙ্গীন হয়ে পড়ে। ঢাকা লিখল, ‘no one being willing to let them a single rupee, their credit being quite gone, none of the Company’s ships arriving with treasure’। ইতোমধ্যে ইওরোপ থেকে পাঁচটি জাহাজ এসে পৌছনোয় কলকাতা লিখল, ‘it will raise their credit to enable them to go on with the Investment’। কিন্তু তাতেও সমাধান হল না। ১৭৪৮ সালে তারা লিখল কলকাতা আর কাশিমবাজার থেকে কোন রকম আর্থ সরবরাহ নবা থাকায় তারা কোন রকম পণ্যদ্রব্য পাঠাতে পারছে না।

শেষ কথা
অবশ্যই পুরো অবস্থা পাল্টে গেল ১৭৫৭র পরে – ইওরোপ থেকে দামি ধাতু আর মশলা আনতে হল না। এরপর থেকে ব্রিটিশ কোম্পানির বাংলার অর্থের বাংলার পণ্য কেনার পুঁজি জোগাড় হল। অন্যন্য ইওরোপয় কোম্পানির অবস্থা দুর্দশাগ্রস্ত হল। ব্রিটিশেরা ইওরোপিয় আর এশিয় প্রতিযোগীদের বাজার থেকে হঠিয়ে দিল। পলাশীর পর বাংলা থেকে বিপুল অর্থের লুঠ হল, যার নাম পলাশীর লুঠ। তারপরে এতদনের অধমর্ণ ইওরোপ উত্তমর্ণে পরিণত হল(লুঠ আলোচনার জন্য সুশীলবাবুর The Prelude to Empire এবং Holden Furber, John Company at Work আর নরেন্দ্র কৃষ্ণ সিংহের Economic History of Bengal দেখুন)।


(শেষ)

Monday, November 20, 2017

বাংলা যখন বিশ্ব সেরা৬ - বাংলার দাদনি বণিক - ইওরোপিয় কোম্পানির উদ্ধারকর্তা বাংলার কার্যকর, বিস্তৃত, উন্নত ঋণ ব্যবস্থা - সুশীল চৌধুরী

(State and Finance in the Eurasian Continuum in the Early Modern Times: INDIAN MERCHANT/BANKERS TO THE RESCUE OF THE EUROPEAN COMPANIES, EASTERN INDIA, C. 1650 – 1757: SUSHIL CHAUDHURY)
ধারের সমস্যা
ইওরোপিয় কর্পোরেটদের পুঁজির ঘাটতি মেটাতে বাংলার ব্যাঙ্কারেরা হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল কি ভাবে সে বিষয়টা এর আগে বিশদে আলোচনা করেছি। কিন্তু স্থানীয় ঋণের বাজার থেকে ধার পাওয়া খুব সহজে সমাধা করা যায় নি, অনেকগুলি বাধা ছিল।

কম সময়ের ধার
আমরা যে সময় পর্বটি নিয়ে বিশদে আলোচনা করছি, সে সময়ে বাংলার ঋণ ব্যবস্থার সাধারণ নিয়ম ছিল নগদ অর্থ ধার দেওয়া হত কম সময়ের জন্য, এবং দীর্ঘ সময়ের ধারের কোন ধারণাটাই ছিল না তখন। এর কারণে শুধু জগতশেঠের গদিই নয়, বাংলার সব স্রফ্রই ইওরোপিয় জাহাজ বন্দরে ঢুকলেই কোম্পানিগুলোর থেকে নগদে ধার শোধের দাবি জানাত। কোম্পানির পক্ষে আগের বছরের ধার শোধ করে, দাদনি বণিকদের দাদন দিয়ে তারপরে বহু পরিমান উত্তমর্ণকে একসঙ্গে ধার শোধ করা কঠিন কাজ ছিল। নির্দিষ্ট সময়ে কোম্পানি টাকা ফেরত না দিলে তাদের সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করার হুমকি দিত জগতশেঠেরা। জগতশেঠ ফতেচাঁদের উত্তরাধিকারী জগতশেঠ মহতাব রাইএর গোমস্তা ১৭৪৯ সালে নভেম্বরে ঢাকার কুঠিয়ালকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলে ঠিক সময় ধার শোধ না করলে শুধু যে সমস্ত সেবা বন্ধ করে দেওয়া হবে তাই নয় তাদের উচিৎ শিক্ষাও দেওয়া হবে(absolutely insisted on the payment of the sum due to his master threatening in rough terms that in case of non-payment, he would immediately put a stop to our Business)। ২০ অক্টোবর ১৭৪৯ সালে কাশিমবাজার কাউন্সিল কলকাতাকেকে লিখল শেঠের গোমস্তা রুইদাস, ‘complained heavily of our not having paid them anything this season of the large debt the Company owed them at that factory notwithstanding so much treasure had been imported by several ships lately arrived’। যেই কোম্পানির জাহাজগুলি ভিড়ত বন্দরে তাদের ধার উদ্ধারে শেঠেরা নাছোড়বান্দা হয়ে লেগে থাকত – এর জন্য বহু সময় কোম্পানিকে অস্বস্তিকর অবস্থায় পড়তে হয়েছে। ১৭৫০ সালের ২৫ আগস্ট কাশিমবাজার কুঠি এই বিষয়টা বিশদে লিখল, … the Seths on the arrival of the treasure sent [their gomasta] to demand it and gave them to understand and they expected the whole of their debt at that factory should be paid off out of the money which might arrive by this year’s shipping and instead of being able to raise a further credit with them it was with the utmost difficulty they could obtain their consent to apply any part of what was lately sent them to the use of the investment ….

১৭৫১র চিঠিতে ঢাকার কুঠিয়াল লিখছে শেঠের গোমস্তা দাবি করছে, অবিলম্বে কোম্পানিকে সব টাকা শোধ করতে হবে, এবং কাশিমবাজার কাউন্সিলকে লিখছে, তারা যেন শেঠ মহতাব রাইএর ওপর প্রভাব খাটিয়ে কোন ভাবেই একটা টাকা শোধ না করে, কেননা ‘as it would stop their business and render it unpracticable for them to purchase any ready money goods’। সে সময়ের বাংলা জোড়া ধারের ইতিহাস খুঁজে দ্যাখা গিয়েছে কোন ধারই কয়েক মাসের বেশি সময়ে দেওয়া হয় নি, এক বছরের ধার খুব কম দেওয়া হয়েছে এবং মাসে মাসে সুদের হার গোনা হত, বছর ঘুরতে ঘুরতেই সেই টাকা শোধ করার প্রথা গয়ে উঠেছিল।

ধারের আকাল
বহু সময় ধারের বাজারে আকাল পড়ে যেত, বিশেষ করে সরকারি দোহন রুখতে, ব্যাঙ্কার বা স্রফেরা ধার দেওয়া বন্ধ করে দিত। আমরা যে সময়টা নিয়ে আলোচনা করছি যেই সময়ের জন্য এই তত্ত্বটা সত্যি হলেও, ১৭৪০-৫০ সালের মারাঠা আগ্রাসনে এই ভয়টা বেড়ে যায়। নবাবের পারিবারিক বন্ধু হলেও জগতশেঠেরাও এই ভয়ের বাতাবরণ থেকে বেরোতে পারে নি। মারাঠাদের ক্রমণ রুখতে আলিবর্দিকে সেনাবাহিনীতে প্রচুর অর্থের জোগান বজায় রাখতে হয়েছিল। ১৭৪৬এর কাশিমবাজারের চিঠি থেকে এই মনোভাব স্পষ্ট হয়, ‘…they have not a prospect of borrowing more … for the scarcity of money is so great that it has been with some difficulty Futtichund’s house has been able to pay for the bullion sold them.’। কাউন্সিল আরও লিখল, ‘it appears to us that if they [the Seths] have money, they don’t care to produce it for fear of government’। নবাবের ঘনিষ্ঠতম সহচর যাদের ক্ষমতার রাজনীতি আর অর্থনীতির ওপর প্রভূত নিয়ন্ত্রণ ছিল, তাদেরই যদি এই হালত হয়, তাহলে অন্যান্য স্রফ, মহাজনদের কি অবস্থা সহজে অনুমেয়।


আরেকটা বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ছিল, বাংলার অর্থনীতিতে সুদের আর টাকার বাটার হার আগ্রার বাজারের ওপর নির্ভর ছিল। আগ্রার হার যদি বেশি হত তাহলে বাংলায় পুঁজিতে টান পড়ত, স্রফেরা, ব্যাঙ্কারেরা তাদের বাংলার টাকা নিয়ে চলে যেত আগ্রায় বিনিয়োগের জন্য, যা বাংলার ১২ শতাংশের থেকে অনেক বেশি ছিল। আমাদের আলোচ্য সময়ে এটাই ছিল অর্থের বাজারের চরিত্র। ১৭০০ সালে কাশিমবাজার কাউন্সিলের লেখায় পাচ্ছি, ‘We cannot get any money at interest here being very little ready money in the country and the exchange current from hence to Delhi and Agra is but 6 percent and the shroffs make use of what ready money they have that way’। তবে তৃতীয় দশকের পর আর আগ্রার প্রভাব বাংলায় ততটা রইল না। হয়ত ততদিনে জগতশেঠেরা উত্তরভারতের আর্থব্যবস্থার ওপর তাদের কব্জা এঁটে দিয়ে তাদের ১২ শতাংশের নিয়ন্ত্রণে এনে ফেলেছে।

বাংলা যখন বিশ্ব সেরা৫ - বাংলার দাদনি বণিক ইওরোপিয় কোম্পানির উদ্ধারকর্তা - বাংলার কার্যকর, বিস্তৃত, উন্নত ঋণ ব্যবস্থা - সুশীল চৌধুরী

(State and Finance in the Eurasian Continuum in the Early Modern Times: INDIAN MERCHANT/BANKERS TO THE RESCUE OF THE EUROPEAN COMPANIES, EASTERN INDIA, C. 1650 – 1757: SUSHIL CHAUDHURY)

যদিও ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাংলা জোড়া প্রত্যেক কুঠি আলাদা আলাদা করে বাজার থেকে পুঁজি ধার করত, তবে সব থেকে বেশি ধার নিত কাশিমবাজার। এর চারটে কারণঃ প্রথমতঃ কোম্পানি বিশাল পুঁজি এখানে বিনিয়োগ করত; দ্বিতীয়তঃ অষ্টাদশ শতে কাশিমবাজার বাংলার গুরুত্বপূর্ণতম বাজার হয়ে উঠেছে, ভারতজোড়া বিভিন্ন ধরণের শ্রেণীর স্রফেদের বাস ছিল এই কাশিমবাজারে, ফলে চাইলেই ধার পাওয়া সহজ ছিল,। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাশমবাজার কুঠি নির্দিষ্ট মরশুমে এখান থেকেই বিপুল পরিমাণ ধার তুলত। ১৭২৮ সালের মার্চ মাসে দাদনি বণিকদের অগ্রিম দেওয়ার জন্য ০.৪ মিলিয়ন ধার তুলছে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। কিন্তু বিপুল সুদের হারে এত পরিমান টাকা ধার করার পরিকল্পনায় লন্ডনের কোর্ট অব ডিরেক্টর্সদের খুব বেশি সায় ছিল না। তারা কলকাতাকে লিখল, কাশিমবাজারে মে ১৭৩০ থেকে এপ্রিল ১৭৩১ পর্যন্ত ৪০০০ পাউণ্ড শুধু সুদ হিসেবে দেওয়া হয়েছে। ৬৪৩৮৩২ টাকা ধার নেওয়া হয়েছে বিপুল ১২ শতাংশ হারে, এছাড়াও কাশিমবাজারের কুঠিয়ালেরা আরও ২৫৭১৮০ টাকা পরে ধার নেয়। তারা কলকাতার কাউন্সিলকে লিখল, কোম্পানির বাগানে এই বিপুল হারের(১২%) দুষ্ট ক্ষতকে মূলোচ্ছেদ করতে হবে।

কিন্তু আমরা যে সময়ের কথা বলছি, সে সময় ধরে বারবার কেন্দ্রিয় দপ্তরের হুঁশিয়ারি সত্ত্বেও বাংলা জুড়ে বিভিন্ন কুঠি স্থানীয় বাজার থেকে বিপুল পরিমান অর্থ ধার করতেই থাকে। ১৭৪৫এ কলকাতায় কোম্পানির ধার ছিল ০.৯ মিলিয়ন কাশিমবাজার আর ঢাকায় ছিল ১ মিলিয়ন টাকা। ১৭৪৯ সালে ঢাকায় ব্রিটিশ কোম্পানির ধার ছিল ৭৫৫৪০০। এর মধ্যে ৫৮৫০০০ জগতশেঠের গদি থেকে বাকি পরিমান নানান গদিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। কলকাতায় ১৭৪৩ সালে এক দিনে দাদনি বণিকদের থেকে কোম্পানি ধার নিয়েছিল ৮২৫০০০ টাকা। এর এক সপ্তাহ পরে জগতশেঠেদের গদি থেকে দাদনি বণিকদের অগ্রিম দেওয়ার জন্য নিয়েছিল ৩২৬৭৫০ টাকা।

এ প্রসঙ্গে বলে রাখা দরকার বাংলার পুঁজির বাজার(capital market) অষ্টাদশ শতকের প্রথম দিকে জগতশেঠের কুঠিকে আবর্তন করেই ঘুরত। আমরা যে সময়কে অক্ষদণ্ড নিয়ে এগোচ্ছি সে সময় সারা বাংলা তথা ভারত জুড়ে জগতশেঠের কুঠি বাংলার অর্থনীতির অন্যতম স্তম্ভ ছিল। আমরা এর আগে দেখেছি কিভাবে তারা ইওরোপিয় কোম্পানিগুলিকে বাঁচাতে ধারের হাত উন্মুক্ত করে দিয়েছিল। ফলে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শেঠের কুঠির ওপর নির্ভরতার একটা ছোট্ট আন্দাজ একটা তথ্যেই পাই, কলকাতা আর কাশিমবাজারের তুলনায় অনেক কম ব্যবসা করা ঢাকা কুঠি ১৭৪৪এর ৩ ডিসেম্বরে থেকে ২০ অক্টোবর ১৭৪৫ পর্যন্ত শেঠেদের গদি থেকে ধার করেছিল ৪৭০০০০ টাকা। কাশিমবাজারে কোম্পানি কুঠি ১৭৪৬এ সুদসহ ৮৩৬০৩৭ টাকা এবং ১৭৪৮ সালে ৬৩০২১৩ টাকা ধার করে। ১৭৫১য় ব্রিটিশদের থেকে শেঠেরা পেত ৫৬২৮২০ টাকা। কলকাতায় এক দিনে ১৭৪২ সালে কলকাতা কাউন্সিল ধার করে ২ লক্ষ টাকা। কোম্পানি শেঠেদের থেকে ধার করত তার কারণ তাদের ধারণা ছিল জগতশেঠ তাদের হয়ে দরবারে সাহায্য করবে।

সে সময় বাজারে চালু ১২ শতাংশ হারে কোম্পানিকে শেঠেরা ধার দিত। কোম্পানির অনুরোধে ১৭৪০এর পর এই হারটা কমে দাঁড়ায় ৯ শতাংশে। তাদের দেখাদেখি অন্যান্য ব্যাঙ্কারও হার কমিয়ে ৯ শতাংশ করে। তবুও কোম্পানি জগতশেঠেদের গদি থেকে ধার করা সুবিধেজনক মনে করত। ১৭৪১এ কাশিমবাজার কাউন্সিল লিখছে, Futtychand having favoured us in lowering the Interest and as we are apprehensive he may be displeased, should we take up money of other people and so raise the interest again on us, agreed that we give him preference।

কোম্পানিগুলি সাধারণত কলকাতা বা কাশিমবাজারে স্রফেদের থেকে টাকা ধার করে নগদে বা হুণ্ডিতে নানান কুঠিতে পাঠাত। জগতশেঠেদের কুঠি থেকে ধার করার একটা সুবিধে ছিল, শুধু বাংলার গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসাকেন্দ্রই নয়, ভারতের বিভিন্ন ব্যবসাকেন্দ্রেও তাদের গদি ছিল। তাই অনেক সময় কুঠিগুলিও শেঠেদের যে কোন গদি থেকে প্রয়োজনে টাকা ধার করত। আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার ছিল, যাদের কোম্পানি দাদন দিত, সেই ব্যবসায়ীদের থেকে কোম্পানি কলকাতায় টাকা ধার করত।
(চলবে)

বাংলা যখন বিশ্ব সেরা৪ - বাংলার দাদনি বণিক - ইওরোপিয় কোম্পানির উদ্ধারকর্তা - বাংলার কার্যকর, বিস্তৃত, উন্নত ঋণ ব্যবস্থা - সুশীল চৌধুরী

(State and Finance in the Eurasian Continuum in the Early Modern Times: INDIAN MERCHANT/BANKERS TO THE RESCUE OF THE EUROPEAN COMPANIES, EASTERN INDIA, C. 1650 – 1757: SUSHIL CHAUDHURY)

স্থানীয় ঋণ বাজার থেকে ধার নেওয়া
স্বাভাবিকভাবেই পুঁজির অভাব মেটাতে কোম্পানিগুলোর কাছে স্থানীয় ঋণ বাজারে যাওয়া ছাড়া অন্য কোন উপায় থাকত না। কোম্পানির আমলারা বাজারে গিয়ে দেখল বাংলার ঋণ বাজারের ব্যবস্থা অসাধারণ নিয়ন্ত্রিত এবং অসম্ভব কার্যকর। সপ্তদশ শতের শেষে এবং অষ্টাদশ শতের শুরুতে বাংলার ঋণের নানান  ব্যবস্থা এবং আর্থিক machinery খুবই বিকশিত হয়েছে। বাজারে বিপুল সংখ্যক বৃহৎ সওদাগর, বিশেষ করে স্রফেদের(ব্যাঙ্কার, অর্থ বিনিময়ী) উপস্থিতি আমাদের তত্ত্ব প্রমান করে, যে সময়টা আমরা আলোচনা করছি, সে সময়ে সওদাগরি পুঁজি(merchant capital), এবং ব্যবসায়ী সংগঠন(commercial organization) অসম্ভব বিকশিত হয়েছে। ফলে ইওরোপিয় কোম্পানিগুলি স্থানীয় ঋণ বাজার থেকে তাদের বিনিয়োগের জন্য ঘাটতি পুঁজি ধার করার সিদ্ধান্ত নিল। যদিও বাৎসরিক ভাবে আলাদা আলাদা কোম্পানি আলাদা আলাদা করে কত পরিমান অর্থ স্থানীয় বাজার থেকে ধার নিয়েছে সে তথ্য পরিষ্কার না হলেও যে সব তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলি আপনাদের সামনে আমি সাজিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছি।

অষ্টাদশ শতকের শুরুতে কলকাতা এবং কাশিমবাজারের স্রফ/সওদাগরেদের গদিতে নির্দিষ্ট তারিখে ব্রিটিশ কোম্পানির ধার ছিল ০.৭ মিলিয়ন এবং ০.২৫ মিলিয়ন। ১৭২০/২১ সালে বাংলায় কোম্পানির মোট দেনা ছিল ২.৪ মিলিয়ন এবং এটা ১৭৪৭/৪৮এ বেড়ে দাঁড়ায় সুদ ছাড়া ৫.৫ মিলিয়ন। ডাচ কোম্পানিও স্থানীয় বাজার থেকে নিয়মিত ধার নিত। ১৭২৪ সালে সুদ সহ কাশিমবাজারে ডাচেদের ধারের পরিমান ছিল ১.৫ মিলিয়ন। প্রথম দিকে জগতশেঠেরা ডাচেদের উত্তমর্ণ ছিল। ১৭৩৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর জগতশেঠেদের গদিতে কোম্পানির মোট ধারের পরিমান ছিল ০.২৬ মিলিয়ন। কাশিমবাজারের কাটমারাও পিছনে ছিল না। কাটমা পরিবারের আটজন ধার দিত, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাদের থেকে ধার করেছিল ১০৬৭৯৪ টাকা। এমন কি বেলজিয়ান(Ostend) আর ফরাসী কোম্পানিও স্থানীয় ঋণ বাজার থেকে ধার নিত। বেলজিয়ানদের স্থানীয় ব্যাঙ্কার আর স্রফেরা ধার দিত। তাদের বাংলা প্রধান আলেকজান্ডার হিউম লেখেন যে ১৭৩০ সালে  ফতেচাঁদদের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়, নয়নসুখবাবু (Nainsook Babu) কোম্পানিকে বিপুল পরিমান অর্থ ধার দিয়েছে। একইভাবে ফরাসীরা তাদের পুঁজি জোগাড়ে স্থানীয় বাজারের ওপর নির্ভর করেছে। ফতেচাঁদ ছিলেন ফরাসীদের সব থেকে বড় উত্তমর্ণ। সে সময়ের ফরাসি নির্দেশক ডুপ্লে ফতেচাঁদকে ইহুদিরও ইহুদি আর আমাদের খুনি বলে অভিহিত করেছেন, কিন্তু তাঁকেও সময়ে সময়ে শেঠেদের কুঠির শরণাপন্ন হতে হয়েছে ৩ লক্ষ টাকার জন্যে। ডুপ্লে ধার করার জন্য কোন আলাদা গদিতে আস্থা রাখতেন না, ধনী থেকে গরীব কাটমা, সক্কলের গদিতে তিনি ধারের জন্য আস্থা রেখেছিলেন।

তবে ইওরোপিয় কোম্পানিগুলোকে সব থেকে বেশি ধার দিয়েছে জগতশেঠের পরিবার। ১৭১৮ থেকে ১৭৩০ পর্যন্ত ব্রিটিশ কোম্পানি শেঠেদের গদি থেকে বছরে গড়ে ধার করেছে ০.৪ মিলিয়ন ডলার। ১৭৫৫-৫৭, এই তিন বছরে জগতশেঠেদের গদিতে তাদের ধারের পরিমান দাঁড়ায় ২.৪ মিলিয়ন। ১৭৫৭য় ডাচেরা শেঠেদের থেকে ০.৪ মিলিয়ন ধার করে আর মার্চে চন্দনগরের পতনের সময় ফরাসীদের ধার ছিল ১.৫ মিলিয়ন টাকা। সে সময়ে বাংলায় আসা ব্রিটিশ ব্যক্তিগত ব্যবসায়ী ক্যাপ্টেন ফেনউইক বলছেন ১৭৪৭-৪৮ সালে ফরাসীদের মোট ধার ছিল ১৭ লক্ষ টাকারও বেশি, অন্য দিকে বাংলার ব্রিটিশ আমলা উইলিয়াম ওয়াটস ক্লাইভকে ১৭৫৭র ১৮ ফেব্রুয়ারি লিখছেন, শেঠেদের কাছে ফরাসিদের ধার ছিল ১৩ লক্ষ। 

বাংলা যখন বিশ্ব সেরা২ - বাংলার দাদনি বণিক - ইওরোপিয় কোম্পানির উদ্ধারকর্তা - বাংলার কার্যকর, বিস্তৃত, উন্নত ঋণ ব্যবস্থা - সুশীল চৌধুরী

(State and Finance in the Eurasian Continuum in the Early Modern Times: INDIAN MERCHANT/BANKERS TO THE RESCUE OF THE EUROPEAN COMPANIES, EASTERN INDIA, C. 1650 – 1757: SUSHIL CHAUDHURY)
১) পুঁজির দীর্ঘস্থায়ী ঘাটতি
আমরা যে সময়পর্ব নিয়ে আলোচনা করছি, শুধু ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নয়, ডাচ, ফরাসি এবং অন্যান্য কোম্পানিগুলোর, দীর্ঘস্থায়ী পু&জির ঘাটতি ছিল। ফেব্রুয়ারি মার্চে ইওরোপ থেকে জাহাজ পূর্বের পানে সমুদ্রে বেরোনোর সময়ই দাদনি বণিকদের পণ্যের জন্য দাদন/অগ্রিম দিয়ে দেওয়ার শ্রেষ্ঠ সময়। কিন্তু যতটা দেওয়া দরকার ছিল, কোম্পানিগুলোর হাতে তত পরিমান অর্থ থাকত না। আরও ঝামেলার ব্যাপার ছিল আগের বছরের বাণিজ্যের বকেয়া পড়ে থাকা অর্থ দেওয়ার মত অবস্থায় থাকত না কোম্পানিগুলো। প্রত্যেক বছরের এই সময়েই যখন ইওরোপ থেকে জাহাজ ছাড়ার এবং দাদনি বণিকদের অগ্রিম অর্থ দেওয়ার সময় হত, সেই সময় স্থানীয় দাদনি বণিকেরা এক দিকে আগের বছরের বকেয়া অর্থ আর চলতি বছরের কারিগরদের অগ্রিম দেয় অর্থ চাইত কোম্পানির আমলাদেরকে। প্রত্যেকটা ইওরোপিয় কোম্পানির বাংলা কাউন্সিলগুলি অসহায় ছিল।
এই ঘটনা কোম্পানিগুলোর বহু চিঠিপত্রে উল্লিখিত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ১৭২০ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কলকাতা কাউন্সিল বলছে তাদের বণিকদের অস্বস্তিকর অবস্থায় পড়তে হচ্ছে কেননা তারা, daily complaining for want of usual advancement on Dadney besides their last year’s arrears due to them। অবস্থা নিতান্তই বিরক্তিকর হয়ে ওঠার নিদর্শন পাচ্ছি ১৭২১ সালের ১৯মে তারিখের ফোর্ট উইলিয়ম কাউন্সিলের কনসাল্টেশনের বৈঠকের বর্ণনায় There being due … [a large amount] to our merchants on balance of past year’s account and we having no money to clear off those balances or advance them on this year’s contract … they are very clamourous for either money or bills at interest to be given them alleging they cannot perform the new contract without being forced to borrow all the money they can get at interest to send to the aurungs [production centers].
এই সমস্যা নিরন্তর কোম্পানিকে বিপদে ফেলতে থাকে। এমন কি ১৯২১ সালের ৮ আগস্ট চলে যাবার পরেও কাউন্সিল হতবাক হয়ে দেখছে, ‘We as yet having no news of any ship from England, Our merchants are very clamourous for the Dadney to be advanced them on the goods contracted for this year, and insist upon giving them Bills of Debt for that and the Balance of their last year’s account’।

২) পণ্য কেনার জন্য ঠিক সময়ে দাদন দেওয়া দরকার

আরেকটা সমস্যা হল ঠিক মরশুমে ঠিক পরিমান দাদন দিয়ে নির্দিষ্ট পণ্যটি আগ্রিমভাবে কেনার জন্য নির্দিষ্ট করে রাখা। এবং এই সময়টা শুরু হয় হাজাহ ছাড়ার সময় পেরিয়ে গেলেই। কেননা এর পরে যত দিন যায় পণ্যের দাম তত বাড়তে থাকে, এবং জাহাজ ছাড়ার দিন যত এগিয়ে আসতে থাকে এবং জাহাজ ছাড়া কাছাছি সময়ে পণ্যের দাম ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। ফলে ইওরোপের পানে জাহাজ ছেড়ে যাওয়ার পরে পরেই অর্থাৎ ফেব্রুয়ারি-মার্চের মধ্যের সময়টাই অগ্রিম দেওয়ার কাজ শেষ করার জন্যে আদর্শ। তার জন্য তাদের কিছু পুঁজি দরকার ছিল, যা দিয়ে তারা আগের বছরের বকেয়া মেটাবে এবং চলতি বছরের জন্য অগ্রিম দেবে। কিন্তু অধিকাংশ সময়েই মোটামুটি কোম্পানির সুবিধে মত দামে পণ্যটি চুক্তির দামে পেতে, দাদনি বণিকদের অগ্রিম অর্থ দেওয়ার মত অবস্থায় থাকত না কোম্পানিগুলো। আমরা গেই দেখলাম, অগ্রিম দেওয়া ত দূরস্থান, আগের বছরের বকেয়া অর্থ ফেরত দেওয়ার মত অবস্থায় থাকত না তারা। ফলে তাদের এই ঘাটতি মেটাতে নগদ ধারের অর্থের উৎসের দিকে নজর দিতে হত। 

বাংলা যখন বিশ্ব সেরা৩ - বাংলার দাদনি বণিক - ইওরোপিয় কোম্পানির উদ্ধারকর্তা - বাংলার কার্যকর, বিস্তৃত, উন্নত ঋণ ব্যবস্থা - সুশীল চৌধুরী

(State and Finance in the Eurasian Continuum in the Early Modern Times: INDIAN MERCHANT/BANKERS TO THE RESCUE OF THE EUROPEAN COMPANIES, EASTERN INDIA, C. 1650 – 1757: SUSHIL CHAUDHURY)

৩) ইওরোপের সোনা/রূপো আর মশলা
পূর্বের দেশে যে সব জাহাজ আসত তারা নিয়ে আসত রূপো/সোনা আর মশলা, এটা তাদের জাহাজের মোট বহনের ৮০-৯০ শতাংশ ছিল। এই পণ্যগুলি মরশুমি ছিল এবং বহুবার সঠিক সময়ে এসে পৌঁছত না। আর যে সোনা/রূপা ইওরোপ থেকে আনা হত, দেশের বাজারের চাহিদা অনুযায়ী তার পরিমান ছিল অতি অল্প। কিন্তু আরও সমস্যা ছিল, তারা যে পরিমান এই পণ্যগুলো নিয়ে আসত সেগুলিকে স্থানীয় মুদ্রায় রূপান্তরিত করে সেই অর্থ দাদনি বণিকদের তুলে দেওয়া, যাতে তারা পণ্য আগ্রিম করতে পারে। খোলা বাজারে এই দামি ধাতু বিক্রি করে সেই অর্থ দাদনের জন্য ব্যবহার করতে পারাটা তাদের পক্ষে সুবিধেজনক ছিল। কিন্তু সে সময়, ভারতের সব থেকে বড় ব্যাঙ্কার, জগতশেঠের পরিবার একচেটিয়াভাবে রাষ্ট্রের মদতে টাঁকশাল নিয়ন্ত্রণ করত(দেখুন J. H. Little, The House of Jagat Seth, Calcutta, 1956; S. Chaudhury, From Prosperity to Decline – Bengal in the Eighteenth Century; S. Chaudhury, The Prelude to Empire – Plassey Revolution of 1757)।

বাস্তবিকই বাংলার নবাব মুর্শিদকুলিখাঁর অভয়হস্ত মাথায় নিয়ে, জগত শেঠের পরিবার বাংলার টাঁকশালের ওপর একচেটিয়া ব্যবস্থা কায়েম করে রেখেছিল। ১৭২১এ ফোর্ট উইলিয়ম কাউন্সিল লিখছে, ‘… Futtichund [Jagat Seth] having the entire use of the mint, no other shroff [money changer/banker] dare buy an ounce of silver’। কোম্পানি বহুকাল ধরে বাংলার টাকা ছাপাবার ব্যবস্থা হাতে নেওয়ার চেষ্টা করছিল, এবং তারা কাশিমবাজার কাউন্সিলকে নির্দেশ দিয়ে রেখেছিল, যাতে নবাবি দরবার থেকে এই ফরমানটা সংগ্রহ করে। স্বাভাবিকভাবেই কোম্পানি দরবারের কিছু উচ্চপদস্থ আমলার সঙ্গে সাঁট করতে শুরু করেছিল। কিন্তু তারা কোম্পানি আমলাদের জানাল যে ফতেচাঁদের কড়া মুঠো থেকে বেরিয়ে একটাকাও ছাপাবার ব্যবস্থা করা যাবে না, while Futtichund was so great with the Nabob, they can have no hopes of that grant, ha alone having the sole use of the mint nor any other shroff dare buy or coin a rupee’s worth of silver।

টাঁকশালের ব্যবসা সোনার ডিম পাড়া হাঁস পোষার মত রোজগেরে অবস্থা, ফলে জগতশেঠ যে কোন মূল্যে টাঁকশালের নিয়ন্ত্রণ নিজের পরিবারের কব্জায় রাখতে আগ্রহী ছিল। ১৭৪৩ সালে কাশিমবাজারের কুঠিয়াল (ফ্যাক্টর) লিখছেন, … but this [minting] privilege they [the English] can never hope while Futtichund subsists and has that weight with the government which his usefulness to them and great influence at Court naturally gives him। ফলে ইওরোপিয় কোম্পানিগুলি বাধ্য হয়ে তাদের রূপো আর মশলা জগতশেঠদের কুঠিতে, জগতশেঠেদের দেয় দামেই বিক্রি করতে বাধ্য হত(এখানে সুশীলবাবু বলছেন যে, বাংলার টাঁকশালে জগতশেঠেদের একাধিপত্য ছিল, এই তত্ত্ব ওম প্রকাশ খণ্ডন করলেও তাঁর From Prosperity to Decline, বইএর চতুর্থ অধ্যায়ে তিনি প্রয়োজনীয় প্রমান দিয়ে এই তত্বটি প্রতিষ্ঠা করেছেন। তিনি ওম প্রকাশের সমালোচনাটি দেখতে বলছেন Indiasn Economic and Social History Review, পত্রিকায় প্রকাশিত ‘On Coinage in Mughal India’ প্রবন্ধে)।

ব্যতিক্রম ঘটনা ছাড়া দাদনি বণিকেরা যেহেতু সোনা/রূপো আগ্রিম হিসেবে নিত না। ফলে কোম্পানিগুলোর সমস্যা বাড়ত বই কমত না। ১৭৪৬ সালে ব্রিটিশ কোম্পানি, ‘due to them on account of the investment’ হিসেবে দাদনি বণিকদের সোনা/রূপা নগদে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু দাদনি বণিকেরা এই শর্তে রাজি হয় নি কেননা, আড়ঙে নগদ অর্থ দিতে হয়, আর জগতশেঠের গদিতে রূপো বিক্রি করার তাদের কোন সুযোগই নেই, তারা তাদের থেকে রূপো কিনবেই না, ‘Rupees would pass at the aurungs [and] that they could no ways turn the Bullion into Rupees but by selling it to Juggutseat’s house who they were well assured would not buy it of them’। ফলে কোম্পানিকে এদেশে আনা আমদানি শেষ পর্যন্ত জগতশেঠের গদিতে শেঠেদের তৈরি করা দামে সঁপতে হত, সে দাম খোলা বাজারের তুলনায় যতই কম হোক না কেন। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় ১৭১৮ সালে ২৪০ সিক্কা ওজনের ব্রিটিশ স্টান্ডার্ড রূপোর দাম পাওয়া গিয়েছে ২১৮.৭৫ সিক্কা টাকা স্রফ ব্যবসায়ীর কাছে ৫ শতাংশ চুঙ্গী কর দিয়ে ২৪০এর বিনিময়ে পাওয়া যেত ২১০.৭.৯ সিক্কা ওজনের টাকা। তবে সাধারণত ২৪০এর বিনিময়ে জগতশেঠেরা দিত মোটামুটি ২০৩ সিক্কা টাকা।
ডাচেদেরও অবস্থা খুব একটা আলাদাও ছিল না, ভালও ছিল না। তাত্ত্বিকভাবে বাংলা সুবার মুঘল টাঁকশালগুলি খোলা বাজারের জন্য উন্মুক্ত ছিল, যে কেউ সেখানে ধাতু নিয়ে গেলে টাঁকশালের দায়িত্ব থাকত নির্দিষ্ট বাটার বিনিময়ে টাকা ছাপিয়ে দেওয়ার। কিন্তু বাস্তবে মুর্শিদাবাদের দরবারের ওপর কড়া নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে জগত শেঠেরা টাঁকশালে একচেটিয়া কারবার চালাত। ডাচেরা টাঁক্সাল থেকে টাকা ছাপাত ঠিকই কিন্তু তার জন্য মাঝে মধ্যে বেশ কিছু অলঙ্ঘ্য বাধার মুখোমুখি দাঁড়াতে হত। তারা তাদের আনা রূপো শেঠেদের কুঠিতে বিক্রি করতে বাধ্য হত। বাধার একটা ছোট্ট উদাহরণ দেওয়া যাক, তাদের দেওয়া রূপো টাকায় পরিণত করতে শেঠেরা ইচ্ছে করেই কিছুটা বেশি সময় নিয়ে নিত, ঠিক সময়ে সেই অর্থ তাদের দিত না। কিন্তু যেহেতু দাদনি বণিকদের সঙ্গে পণ্য চুক্তি অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ে দাদন দেওয়া জরুরি ছিল, পুরোনো বকেয়া মেটানোরও দায় ছিল, তাই তাদের পক্ষে টাকা শেঠেদের টাঁকশাল থেকে কখন বেরোবে তার জন্য হাপিত্যেস করে বসে থাকা চলত না। বাংলার ডাচ ডিরেক্টর Sichtermann স্মৃতিকথায় লিখছেন, ১৭৪৪ সালে টাঁক্সাল থেকে তাদের দেয় রূপোর বিনিময়ে টাকা পেতে এত দেরি হচ্ছে যে তারা ভাবছে যে শেঠেদের টাঁকশাল থেকে টাকা না বানিয়ে, যদি ঠিকঠাক দাম পাওয়া যেত তাহলে সেই রূপো নগদে শেঠেদের কুঠিতে বেচে দেওয়াটা ভাল রণনীতি ছিল। ১৭৫৫ সালে বাংলার ডাচ ডিরেক্টর লিখছেন, শেঠেরা ইচ্ছে করেই অস্বাভাবিক দেরি করছে ‘unheard of delays in the mint which he suspected was partly because of the intrigues of the house of Jagat Seth’। ফলে ডাচেরাও বাধ্য হত শেঠেদের কুঠিতে তাদের দেওয়া দামে রূপো বেচে দিতে। এবং আমরা ১৭৫৫ সালে দেখব, ডাচেরা হুগলি বন্দরে(S. Chaudhury, ‘The Rise and Decline of Hughli – A Port in Medieval Bengal’, Bengal Past and Present,) শেঠেদের গোমস্তাকে তাদের নিয়ে আসা সমস্ত রূপো বিক্রি করে দিচ্ছে।
(চলবে)

বাংলা যখন বিশ্ব সেরা১ - বাংলার দাদনি বণিক ইওরোপিয় কোম্পানির উদ্ধারকর্তা - বাংলার কার্যকর, বিস্তৃত, উন্নত ঋণ ব্যবস্থা - সুশীল চৌধুরী

(State and Finance in the Eurasian Continuum in the Early Modern Times: INDIAN MERCHANT/BANKERS TO THE RESCUE OF THE EUROPEAN COMPANIES, EASTERN INDIA, C. 1650 – 1757: SUSHIL CHAUDHURY)
(ইওরোপ বিশেষ করে কেম্ব্রিজ তাত্বিকেরা বলে থাকেন বাংলা তথা উপমহাদেশে ব্রিটিশেরা/ইওরোপিয়েরা উত্তম, কার্যকর, সুবিধের ব্যাঙ্কিং, ঋণ, বীমা ব্যবস্থা চালু করেছিল। ডাহা মিথ্যে কথা। এই অনুবাদের মাধ্যকে সেই তত্ত্বের অন্তঃসার শূন্যতা দেখানো।)

এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য হল কিভাবে বাংলার স্থানীয় ব্যাঙ্কিং/ঋণ ব্যবস্থা সপ্তদশ শতের দ্বিতীয়ার্ধে এবং অষ্টদশ শতকের প্রথমার্ধে ইওরোপিয় কোম্পানিগুলিকে উদ্ধার করেছে। ইওরোপিয় কোম্পানিগুলি, বাংলার পণ্য কিনতে এই সময় নিদারুণ আর্থিক দুর্দশায় পড়ত। ভাগ্যভাল, সে সময়ে বাংলা জুড়ে অসাধারণ উন্নত, কার্যকরী এবং বিস্তৃত আর্থিক ব্যবস্থাপনা ছড়িয়েছিল, যার মাধ্যমে অসাধারণ ঋণ দেওয়ার কাজকর্ম চলত। এই কোম্পানিগুলি স্বাভাবিকভাবে উৎসুক হয়ে ওঠে এই স্থানীয় আর্থব্যবস্থা্র ঋণ ব্যবস্থার সুযোগ নিতে। এবং এইভাবে আমরা যে সময়ের কথা আলোচনা করছি, সেই সময়ে এই ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে কোম্পানিগুলি তাদের এশিয় ব্যবসার আর্থিক মহাবিপর্যয়গুলি কাটিয়ে ওঠে।

আমরা আজ সকলেই জানি ষোড়শ শতকে পর্তুগিজেদের এস্তাদো দা ইন্দিয়া ভারত ব্যবসায় যে বিপুল লাভ করতে থাকে, সেই নিদর্শন দেখে বহু উত্তর ইওরোপিয় জাতিরাষ্ট্র সপ্তদশ শতের প্রথম দিকে যৌথ কারবারের (joint stock companies) সংগঠন তৈরি করা শুরু করে। পূর্বের সঙ্গে ব্যবসা করার উদ্দেশে যে সব সংগঠন তৈরি হল, তাদের মধ্যে প্রধানতম হয়ে ওঠে ১৬০০ সালের ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, ১৬০২ সালের ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। যদিও তাদের প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল পূর্বের দ্বীপপুঞ্জ থেকে মশলা ব্যবসা, কিন্তু তারা পূর্বের দেশগুলিতে এসে অবাক বিষ্ময়ে দেখল, মশলা দ্বীপপুঞ্জে ইওরোপিয় বাজার থেকে বিপুল পরিমানে যে রূপো নিয়ে ইওরোপের অসীম চাহিদাবন্ত বাজারের জন্য মশলা কিনতে এসেছিল, সেই সব এলাকায় তাদের বয়ে আনা রূপোর কোন চাহিদা নেই, বরং ভারতীয় মোটা শস্তা কাপড়ের উত্তুঙ্গ চাহিদা বর্তমান। এবারে তাদের নজর মশলা দ্বীপপুঞ্জ থেকে ভারতের দিকে ঘোরাতে বাধ্য হল, বিশেষ করে পূর্বের করমণ্ডল উপকূলে। সেখানে প্রচুর পরিমানে মোটা শস্তা কাপড়ের উৎপাদন হয়। কিন্তু দক্ষিণে দীর্ঘস্থায়ী রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, মন্বন্তর, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তাদের লাভের গুড়ে কামড় বসাচ্ছে। তারা বিশেষভাবে মুঘল সাম্রাজ্যের শ্রেষ্ঠতম সম্পদশালী সুবা বাংলার দিকে নজর দিল।

আমরা বাংলার যে সময়কাল নিয়ে আলোচনা করছি, সেটা শুধু যে সে সময়ের ভারতের তাঁত সহ অন্যান্য শিল্প উৎপাদনের কেন্দ্র ছিল তাই নয়, সেই অঞ্চলটির আরও নানান সুযোগসুবিধে ছিল। বাংলার (কাশিমবাজারের) রেশম চিনা আর পারসি রেশমের তুলনায় একটু নিচুস্তরের হলেও সেটি এত শস্তায় পাওয়া যেত যে সেই রেশম ইওরোপের রেশম কারখানাগুলিতে ছেয়ে যেতে শুরু করল। এর পাশাপাশি বাংলার পাটনার সরকার সারণ বিশ্বের শ্রেষ্ঠ এবং শস্তাতম সোরা উতপাদন করত। ইওরোপ জুড়ে দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধ লেগে থাকায় সেই সোরার চাহিদা অন্তত আকার ধারন করল। জাহাজগুলি ভারতীয় পণ্য নিয়ে ইওরোপে যাওয়ার সময়, সোরা জাহাজের খোলে ভার দ্রব্য হিসেবে বয়ে নিয়ে যেত। এর অন্যতম সুবিধে ছিল, অত্যন্ত ভারি সোরা ঝড় ঝঞ্ঝায় মাঝ সমুদ্রে জাহাজগুলিকে স্থিতিশীলতা দেয়, জাহাজ ডুবি কম হতে থাকল তারপরের সময়ে।

মধ্য সপ্তদশ শতকের সময় থেকেই কোপম্পানিগুলি বাংলায় নজর দিতে শুরু করল। বাংলা ক্রমশ হয়ে উঠল কোপম্পানিগুলির মূল বাণিজ্যকেন্দ্র এবং এর পরের দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাই তাদের কর্মকাণ্ডের অক্ষদণ্ড হয়ে উঠতে শুরু করে। বাংলার তিনটি মূল দ্রব্য তাঁত, কোরা রেশম আর সোরা রপ্তানি করতে শুরু করে ইওরোপিয় কোম্পানিগুলি। এখান থেকে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জায়মান হয়ে উঠতে শুরু করে এটা আমাদের লক্ষ্য করা দরকার। শুরুর সময় কোম্পানিগুলির এশিয় বাণিজ্য ছিল ইওরোপ এবং মশলা দ্বীপপুঞ্জের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক ব্যবসা। সময়ের প্রভাবে এটির চরিত্র পাল্টে যেতে থাকে। দ্বিপাক্ষিক ব্যবসা থেকে আস্তে আস্তে এটি ত্রিপাক্ষি ব্যবসাতে পর্যবসিত হয় – ইওরোপ, ভারত(শস্তা কাপড়) এবং মশলা দ্বীপপুঞ্জ(যেখানে ভারতীয় শস্তা মোটা কাপড়ের বিনিময়ে মশলা কেনা হত এবং সেই মশলা ইওরোপে রপ্তানি হত)। শেষ পর্যন্ত এটা আবার দ্বিপাক্ষিক ইওরোপ-বাংলা ব্যবসায় এসে দাঁড়ায় ১৬৮০র পর থেকে; কোম্পানিগুলির এশিয় ব্যবসার মূল ঘাঁটি হয়ে ওঠে বাংলা। এই প্রসঙ্গে মনে রাখা দরকার এই সময়টিতে বাংলা কিন্তু ব্যবসায় উদ্বৃত্ত অর্থনীতি ছিল।


কিন্তু সমস্যা দাঁড়াল বাংলায় ব্যবসা করার অর্থ জোগাড় করা নিয়ে – যাকে ইওরোপিয় কর্পোরেট কাজগপত্রে বলা হচ্ছে ইনভেস্টমেন্ট। তাদের রতানিযোগ্য পণ্য কেনার পুঁজি জোগাড় করাই সমস্যা হয়ে উঠল। পুঁজি জোগাড়ে সমস্যাটা বড় হয়ে দ্যাখা দিল, তার কারণ ইওরোপিয় কম্পানিগুলি বাংলায় বিক্রি করার জন্য যে সব পুণ্য নিয়ে আসত, সেগুলির বাজার ছিল না বাংলায়। যদিও বাংলায় খুব বড় পরিমান পণ্য তারা বয়ে নিয়ে আসত না, কিন্তু সেই ক্ষুদ্র পরিমাণ পণ্যেরও বাজার বাংলায় ছিল না বললেই চলে। বাংলায় তারা মূলত বিক্রি করত দামি ধাতু আর মশলা। কিন্তু সেগুলির মরশুমি বাজার আর পরিমানে কম হওয়ায় বাংলায় তাদের পুঁজি জোগাড়ে মন দিতে হল। এছাড়াও তাদের আমদানি করা রূপো/সোনা আর মশলায় স্থানীয় বাজারের মুদ্রার সঙ্গে সঙ্ঘাত লাগল।

কিভাবে তারা এই সমস্যা কাটিয়ে উঠল সেটা জানার আগে এই সমস্যাটা নিয়ে একটু দীর্ঘ আলোচনা করা জরুরি।

(চলবে)

Tuesday, September 19, 2017

বাংলা যখন বিশ্ব সেরা - পলাশীপূর্ব বনাম পলাশীপর – বিহঙ্গ দৃষ্টিতে২

(পলাশীপূর্ব পর্ব সমাপ্ত হল। এবারে পলাশীর পরের লুঠ)

বিদেশিদের অর্থলোভ আর দস্যুবৃত্তির সংগে বাংলা সুবার রায়তরা খুব বেশি অপরিচিত ছিল না। বছর পনের আগেই অর্থের জন্য বাংলায় হানা দিয়েছিল। রূপি না পেলে বর্গিরা নাকে জল ভরে দিত ঠিকই, কিন্তু বিত্তবাসনায় তারাও ইংরেজদের সমকক্ষ ছিল না। তারা যা পেত লুঠে নিয়ে চলে যেত। কিন্তু ইংরেজরা এদেশে এসেছে ইওরোপের বাণিজ্য অধমর্ণতা ঘোচাতে। তারা যা পায় তা নিয়ে ছেড়ে দেওয়ার পাত্র ছিল না। তাদের অর্থবাসনা এতই অপরিসীম যে যে ক্লাইভ আজকের হিসেবে জানা ঘুষে ১২২৮ কোটি টাকা নিয়েছে, অজানা লুঠে কত কে জানে, যে পনের বছর পর পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে বলছে, ‘আই ওয়াকড থ্রু ভল্টস হুইচ ওয়ার থ্রোন আপন টু মি আলোন, পাইল্ড অন ইদার হ্যান্ড উইথ গোল্ড এন্ড জুয়েলস! মিস্টার চেয়ারম্যন, এট দিস মোমেন্ট আই স্ট্যান্ড এস্টনিশড এট মাই ওন মডারেশন!’ মডারেশনই বটে!

বর্গিরা মুর্শিদাবাদে হানা দিয়ে যা পেয়েছিল ঘোড়ায় চাপিয়ে নাগপুর নিয়ে গিয়েছিল। ক্লাইভ তার বদলে লুঠের পাকাপাকি ব্যবস্থা বানিয়ে ফেল্ল। আগে ইওরোপ থেকে ধরত্ন বোঝাই জাহাজ আসত বাংলার বন্দরে, এবারে মুর্শিদাবাদ থেকে বছরে বছরে শয়ে শয়ে ধনরত্ন বোঝাই নৌকো মুর্শিদাবাদ থেকে কলকাতা সেখান থেকে ইওরপে যাওয়া শুরু করল। মীরজাফর প্রতিশ্রুত তিন কোটি টাকা দিয়ে এই লুঠের দস্যু বৃত্তি শুরু হল। তারপর বছর বছর উসুল। এই ব্যবস্থায় লাভের গুড় সব থেকে বেশি খেল ক্লাইভ নিজে, সে বাবার কাছে লিখল, ‘জাফর আলি খান(মীর জাফর) যে উপকার পেয়েছেন তার বদলে সরকারি ও বেসরকারি খাতে তিন কোটি টাকা দিতে সম্মত হয়েছেন – অর্ধেক আমার হাতে এসেগেছে। তার বদান্যে আম দেশে এমন ঠাঁটে থাকতে পারব যা আমার স্বপ্নের অতীত। বাকি টাকাও এসে যাবে আশাকরি।... বোনেদের জন্য বিশ হাজার টাকা দিচ্ছি। তাদের বিয়ে দিয়ে দিও।... ভাইদের ব্যবস্থা করে দেবে। আপনারও উকিলি করার দরকার নেই।’

লুঠ লুঠ আর লুঠ। সিলেক্ট কমিটির সক্কলে অভূতপূর্ব ধনী হয়ে গেলেন। এডমিরাল ওয়াটসনের মৃত্যু হলে তিনি ফাঁকিতে পড়লেন, তার আত্মীয়েরা মামলা ঠুকলে বাঁহাতে ক্লাইভ কিছু উচ্ছিষ্ট দিয়ে তাদের মুখ বন্ধ করালেন।

এই বিপুল অর্থের যোগান বাংলার সমাজ বেশিদিন সইতে পারল না। ওপরতলায় সবার আগে আঘাত লাগল। মনসবদার, জমিদার ও সওদাগরেরা ভূপতিত হলেন। গোটা সমাজের কাঠামো ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেল। পলাশীর দিনের লুঠের পরে তিন কোটি মেটাতে নবাবের খাজাঞ্চিখানার কোমর ভেঙ্গে গেল। সেনারা মাইনে না পেয়ে বিদ্রোহী হল। নবাবের বিরুদ্ধে তারা যুদ্ধ ঘোষণা করল। তাদের দমন করতে গিয়ে ইংরেজদের ফৌজ ব্যবহার করলেন নবাব। গোরা আর তেলেঙ্গাদের সমস্ত খরচ বহন করতে হবে এই শর্তে এগিয়ে এলেন ক্লাইভ। বিদ্রোহীরা শায়েস্তা হল, কিন্তু যুদ্ধের খরচ মেটাবার টাকা কই? মীর জাফর বর্ধমান, নদীয়া এবং আরও কয়েকটি জেলার খাজনা ইংরেজদের তুলে দিলেন। নবাবী শাসনযন্ত্র সব অচল হয়ে গেল।

ক্লাইভের লোকেদের সংগে নবাবের আমীর বন্ধুদের রজ প্রায় হাতাহাতি হয় – একদিন বহুত জোর হল। পরের দিন তিনি এলে, বন্ধুকে নবাবকে বললেন, ‘ক্লাইভের লোকেদের সংগে আপনি ঝগড়া করছেন? জনাবের কি জানা আছে এই কর্নেল ক্লাইভ কে – জন্নাতের হুকুমে জাহানে তাঁর কি জায়গা?’ মির্জা শামসুদ্দিন সোজা উত্তর দিলেন, ‘কর্নেলের সংগে ঝগড়া করব আমি? যে রোজ সকালে উঠে তার গাধাটাকেও তিনি বার সিজদা না করে যে কোন কাজ করে না? কোন সাহসে আমি গাধাটার সওয়ারের সংগে লাগতে যাব?’ মীরজাফর, মহবৎ জং নামে পরিচিত হতে চেয়েছিলেন, কিন্তু ক্লাইভের গাধা নামে তার প্রসিদ্ধি হল। বারবার অপমানিত হতে হতে তিনি আত্মগ্লানিতে ভাং খেয়ে নেসায় সারাদিন ডুবে থাকতেন। নবাবি করতেন মীরণ।

ঐতিহাসিক গোলাম হুসেন তবতবায়ি পলাশিকে বলেছেন ইনকিলাব। এই ইনকিলাবের বিষে বাংলায় শিরদাঁড়াহীন নবাবের জন্যে বাংলা আস্তে আস্তে ইংরেজদের হাতে চলে যেতে শুরু করল। ইংরেজদের বেসরকারি বাণিজ্য একেবারে নিরঙ্কুশ হয়ে ওঠায় বাংলার গাঁয়ে গঞ্জে তাদের গোমস্তারা রাতারাতি কুঠি বানিয়ে দৌরাত্ম্য শুরু করল। রায়ত ব্যাপারী আর জমিদারেরা ত্রাহি ত্রাহি রব ছাড়তে শুরু করল। সেলাভিয়ার, টেক্সিরার মত কয়েকজন ইংরেজ রাণী ভবানীর রাজত্বে সব ব্যবসা দখল করে বসলেন – শুধু রাণীর এলাকা নয় সমস্ত বাংলায় জরুরি অবস্থা। রায়ত আর ব্যবসায়ীরা পালাতে লাগল। খাজনা আদায় ব্যর্থ হল। মীর জাফরকে সরিয়ে মীর কাসেম ক্ষমতায় এলেন।

ইংরেজ বণিকেরা জেলার ফৌজদারকে আটক করে মারধোর করেছে এমন নজির খুব ব্যতিক্রম নয়। কোম্পানির মাঝারি আমলা রিচার্ড বিচারের আত্মগ্লানি, ‘এই দেশটি চরম স্বেচ্ছাচারী সরকারের অধীনেও উন্নতি করেছে, এখন সে ধ্বংসের কিনারায়।’ পলাশীর মাত্র পাঁচ বছর পর ১৭৬২/১১৬৯র ২ মে নবাব মীরকাশিম গভর্নর ভ্যকান্সিস্টার্টকে যে চিঠি দিচ্ছেন, তাতে প্রশাসনিক নিষ্কাম এবং সর্বব্যাপী লুঠের অবয়ব পরিষ্কার হয়ে যায়, ‘এই হল আপনাদের ভদ্রলোকেদের ব্যবহার। আমার দেশে সর্বত্র তারা উপদ্রব করে, জনগণকে লুঠ করে আর আমার কর্মচারীদের অপমান ও জখম করে। ...প্রত্যেক পরগণা, গ্রাম ও ফ্যাক্টরিতে তারা লবণ, সুপারি, ঘি, চাল, খড়, বাঁশ, মাছ, চট, আদা, চিনি, তামাক, আফিম এবং অন্যান্য অনেক জিনিস কেনা বেচা করে। আমি আরও অনেক বস্তুর নাম করতে পারি, অপ্রয়োজনে বিরত হলাম। তারা বলপ্রয়োগ করে কৃষক ও বণিকদের কাছ থেকে বিভিন্ন প্রকারের পণ্য এক চতুর্থাংশ দামে ছিনিয়ে নেয়, আবার বলপ্রয়োগ ও অত্যাচারের মাধ্যমে একটাকার জিনিসের জন্য কৃষকদের পাঁচ টাকা দিতে বাধ্য করে। আবার পাঁচটি টাকার জন্য তারা এমনকে অপমান ও আটক করে, যে একশ টাকা ভূমিরাজস্ব দেয়। তারা আমার কর্মচারীদেরকে কর্তৃত্ব করতে দেয় না। প্রতি জেলাতে আমার কর্মচারীরা সমস্তরকমের কাজকর্ম থেকে বিরত আছে এবং স্মস্ত শুল্ক থেকে বঞ্চিত হওয়ার ফলে আমার মোট বার্ষিক রাজস্ব ক্ষতির পরিমান দাঁড়াচ্ছে প্রায় পঁচিশ লক্ষ টাকা।’

এ হল পলাশী চক্রান্তের পাঁচ বছর পরের অবস্থা। এর পরে আমরা বাংলা লুঠপর্বে ঢুকব।

পলাশীপূর্ব বাংলা পর্ব সমাপ্ত হল।

বাংলা যখন বিশ্ব সেরা - পলাশীপূর্ব বনাম পলাশীপর বাংলা – বিহঙ্গ দৃষ্টিতে১

পলাশীর অর্ধশতাব্দ পূর্বের(এবং তার কয়েক শতাব্দ পূর্বের) যে বাংলা আমরা আলোচনা করলাম তাতে বাংলাকে কোন দৃষ্টিকোণ থেকেই গরীব দাগিয়ে দেওয়ার কারণ নেই। বাংলায় প্রচুর পরিমানে কৃষিজ দ্রব্য এবং শিল্প দ্রব্য রপ্তানি করত। এছাড়াও সে ছিল ভারত ও বিশ্বের নানান দ্রব্যের পরিবহনের মঝামাঝি স্থান। বিশ্ব তথা ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের পণ্য দ্রব্যের এশিয়া বা ইওরোপে নিয়ে যেতে বাংলা হয়ে। এশিয়ায় বাংলার স্থানগত গুরুত্বটাকে বিচার করা হত বলে, প্রচুর অবাংলার উৎপাদন বাংলায় আসত বিভিন্ন দেশে যাওয়ার জন্য। ফলে বাংলা জুড়ে যে বিশ্ব-বাণিজ্যের সুযোগ আর বিকেন্দ্রিভূত উৎপাদন ব্যবস্থা তৈরি হয়েছিল, সেটি বাংলার মানুষকে মোটামুটি স্বচ্ছল করে তুলেছিল।

পলাশী পরবর্তীকাল আদতে লুঠের কাল। ইসলামের সংগে স্থানীয় পন্থগুলোর মিলমিশে যে মিলনের আবহাওয়া তৈরি হয়েছিল, সেই পরিবেশটি বজায় রাখার ইওরোপিয়দের ভাবনাতেই ছিল না। তাদের প্রথম এবং মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল বাংলা লুঠ। পলাশীর পরে পরে শুধু ক্লাইভ ঘুষ বাবদ রোজগার করেছিলেন আজকের মূল্যে ১২২৮ কোটি টাকা। তারপর ১০০ বছর কোম্পানি, তার ৯০ বছর পর ব্রিটিশ রাজ এবং তাদের সাঙ্গপাঙ্গরা কত হাজার লক্ষ কোটি টাকা লুঠ করে নিজেদের দেশের বিশাল বিশাল কারখানাগুলো তৈরি আর মানুষ লুঠ আর খুন করার প্রযুক্তি বিকাশ করতে প্রযুক্তিবিদদের(যাদের মান্য করে বিজ্ঞানী বলা হয়) অর্থসাহায্য আর ভর্তুকি দিয়েছেন বিভিন্ন সংগঠন এবং রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সে অঙ্ক আজও কষা হয় না, নানান বাধ্যবাধকতায়। ফলে সুলতানি আমল থেকে সুবা বাংলা মুঘল আমল হয়ে যে বাণিজ্যিক আর উতপাদনিক ব্যবস্থা পরিচালনার উচ্চতায় উঠতে উঠতে নবাবী আমলের শৃঙ্গে উঠতে পেরেছিল, ঠিক সেই শৃঙ্গ থেকে নামিয়ে দেওয়ার বলপ্রয়োগের কাজ করল মির্জাফরের সংগে ক্ষমতায় যাওয়া ব্রিটিশ।

তার আর বাংলাকে সুশাসন দেওয়ার কোন দায় থাকল না। যে কোন উপায়ে বিপুল অর্থ লুঠ করে ব্রিটেনে নিয়ে গিয়ে শিল্পবিপ্লবের নানান কাজে বিনিয়োগ/ভর্তুকি দান করাই প্রথমত কর্ম হয়ে দাঁড়াল। যে মোটামুটি ধর্মনিরপেক্ষ, সুপ্রশাসন উপহার দিয়েছিল নবাবী বাংলা তাকে ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে ফেলে বাংলাকে ঠেলে ফেলে দেওয়া হল ক্ষমতাবানেদের লুঠের রাজত্বে। যে নবাবী দরবারে জমিদার নায়েব উকিলেরা ঢোকার আগে দেখে নিত কাছাকাছি তার অঞ্চলের কোন বিক্ষুদ্ধ কৃষক বা কারিগর আছেন কি না, নাহলে তাদের অত্যাচারের খবর নবাবদের কানে পৌঁছলে জমিদারদের ওপরে নেমে আসবে শাস্তির খাঁড়া, সেই বাংলার পালিত কৃষক আর কারিগরদের ছেড়ে দেওয়া হল সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্য পোষিত বাঙ্গালি/অবাঙ্গালি লুঠেরা হায়নাদের সামনে।

রাষ্ট্রের কৃষক-কারিগরকে পালনের নীতি বদলে গিয়ে প্রশাসনের কাজ হল এক এবং অদ্বিতীয়ম লুঠের কাজে আত্মনিয়োগ করা। ইংরেজ বণিকেরা রাতারাতি নবাব হওয়ার এবং স্বদেশের শিল্পবিপ্লবের ভর্তুকি জোগাড় করার চেষ্টায় সোনার বাংলাকেই শ্মশানে তোলার তোড় জোড় করল। ফরাসি আর ডাচেদের ফণা তখন পর্যুদস্ত। ব্রিটিশদের অবাধ মুক্ত বাণিজ্যের একটি কথার কথা। ছুতো। ইংরেজদের ভাষায় অবাধ বাণিজ্য নীতি হল, ইংরেজদের বাণিজ্যের হবে অবাধ, আর দেশি ব্যাপারীদের বাণিজ্যের রেশ থাকবে ইংরেজদের হাতে।

ইংরেজরা মির কাশেমের বকলমে এই অদ্ভুত বাণিজ্য নীতি প্রয়োগ করতে গিয়ে দেখল তার শ্বশুরের তুলনায় মির কাশেম অতি কড়া ধাতের মানুষ। মির কাশেম রুখে দাঁড়ানোয় পুরোনো কিছু জমিদারির দেওয়ানরা, যেমন রাণী ভবানীর দেওয়ান দয়ারাম রায় ইংরেজ ব্যবসায়ীদের কুঠির রেশম আটক করেন। সেই আটক কাণ্ডে রাণীর এলাকার বোয়ালিয়া কুঠির দ্রব্যও ছিল। ইংরেজদের ভয় হল দেশিয় বণিকদের ভয় দেখিয়ে আর বল প্রয়োগ করে যে অবাধ লুঠ ব্যবসার জাল ছড়িয়েছে ইংরেজ শাসক বণিকেরা, সেই জাল সহজেই ছিঁড়ে যেতে পারে। পাটনা কুঠির ব্যবসাদার আর বড় সাহেব এলিস নবাবের ফৌজএর ওপর চড়াও হলেন। যুদ্ধ শুরু হল। ইংরেজরা মির জাফরকে আবার নতুন করে মুর্শিদাবাদের মসনদে বসাল, লক্ষ্য আরও লুঠের বহর বাড়ানো। নবাব অযোধ্যায় পালিয়ে যাওয়ায় অবাধ লুঠের মাঠ উন্মুক্ত হয়ে গেল ইংরেজদের সামনে। লড়াইতে বোয়ালিয়া কুঠির আটক দ্রব্য ছাড়তে মাথার ঘাম পায়ে ফেলতে হল ইংরেজদের।

১৭৬৬/১১৭৩এ এই অভিজ্ঞতায় জমিদারদের নগদী সৈন্য বরখাস্ত করল ইংরেজরা। দেশের অভ্যন্তরে পাঁচশোর বেশি বাণিজ্য কুঠি বানিয়ে গোমস্তি কারবারের, যে বাঙলাজোড়া লুঠের ব্যবসা শুরু হল, তাতে দেশের সনাতন উৎপাদক ব্যবসায়ীদের ব্যবসার মাজা ভেঙে গেল, তাঁরা প্রতিবাদ করলেও প্রতিরোধ করতে পারলেন না। লুঠের রাজত্বে মানিয়ে নিয়ে টিকে গেলেন ইংরেজদের তাঁবেদার গেমস্তা, বেনিয়ান আর দেওয়ানদেরমত দালালচক্র। এরাই বাঙলার নবজাগরণের অগ্রদূতরূপে পরিগণিত হবেন।

পলাশীর পর বোয়ালিয়া কাণ্ড বাংলার ক্ষমতার ভারসাম্য পাল্টে যাওয়ার সময় বোঝার একটা বড় সূচক।

বাংলা যখন বিশ্ব সেরা - পলাশী পূর্ব কিছু মিথ মিথ্যে২

তৃতীয় অভিযোগ হল হিন্দুদের ওপর নির্যাতন। সালিমুল্লাহ তারিখিবাংলায় জানিয়েছেন, হিন্দু-জমিদার ঠিক সময়ে খাজনা না দিতে পারায় মুর্শিদকুলি তাদেরকে ইসলাম-গ্রহণে বাধ্য করেছিলেন – এই বিষয়টাকে ধরে সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজরা নিজের মত মনগড়া গল্প সাজিয়ে পলাশীপূর্ব বাংলাকে বদনাম করার কাজ করে গিয়েছেন। অথচ সালিমুল্লাহ তার গ্রন্থে একটাও ধর্মপরিবর্তনের উদাহরণ দেন নি। সমকালীন কোন গ্রন্থে এ ধরণের কোনও উদাহরণ দেখা যায় না।

একটা ধর্মপরিবর্তনের উদাহরণ পাওয়া যায়, কিন্তু সেটা আবার মুর্শিদকুলির পক্ষে যায়। চুনাখালির জমিদারকে কাজী সরফ মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেন। বৃন্দাবন তার বাড়ির সামনে একটি উন্মাদ ফকিরের তৈরি খেলনা মসজিদ ভেঙ্গেছিলেন। এই অপরাধে তার প্রাণদণ্ড। প্রধান কাজী সরফএর সংগে এই প্রাণদণ্ড নিয়ে যতদূর সম্ভব মুর্শিদকুলির বিরোধ দেখা দেয়। মুর্শিদকুলি এই প্রাণদণ্ডের বিরুদ্ধে আওরঙ্গজেবকে আবেদন করেন। এর পরে কাজী বাংলার প্রধান কাজীর পদ থেকে সরে দাঁড়ান।

তার বিরুদ্ধে আরেকটি অভিযোগ তিনি নিজের সমাধিস্থল আর মসজিদের স্থানের জন্য মন্দির ভেঙ্গেছিলেন। এ অভিযোগও হয়ত সত্য নয়। তাঁর কর্মচারী অতিউতসাহে কোন বাড়াবাড়ি করে থাকেতে পারেন। কিন্তু মুর্শিদাবাদের কাছাকাছি মন্দিরগুলো অক্ষত ছিল। বিশেষ করে কিরীটেশ্বরী মন্দির আজও টিকে আছে। ভারতচন্দ্র অন্নদামঙ্গলে আলিবর্দির বিরুদ্ধে ভূবনেশ্বরে মন্দির লুঠের অভিযোগ এনেছেন। এটাও কতদূর সত্য বলা মুশকিল। ভারতচন্দ্র নিজে কৃষ্ণচন্দ্রের সভাকবি। খাজনা না মেটানোর দায়ে কৃষ্ণচন্দ্রকে কয়েদ করেন আলিবর্দি। ফলে ভারতচন্দ্র হয়ত রুষ্ট হয়েছিলেন।

গঙ্গারাম তার মহারাষ্ট্রপুরাণে মুসলমান শাসনের বিরুদ্ধে হিন্দুদের ক্ষোভের কথা মোটামুটি বাড়িয়ে চড়িয়ে লিখেছেন। মারাঠারা নাকি হিন্দুদের উদ্ধারের জন্য বাংলায় এসেছিল। কিন্তু তাঁর বয়ানেই পাচ্ছি কি করে মারাঠা দস্যু লুঠেরারা বাংলার হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে মানুষএর সম্পত্তি লুঠ খুন জখম অগ্নিকাণ্ড করেছে। গঙ্গারাম জানিয়েছেন বাংলার হিন্দুদের ত্রাণকর্তাদের বিরুদ্ধে বাংলার হিন্দুরা, বিপন্ন মুসলিম শাসনের পিছনে দাঁড়িয়ে মারাঠাদের বাংলা ছাড়া করার লড়াই করেছিল।

বাড়াবাড়িযে কিছু হয় নি এটা দাবি করা অনুচিত এবং অনৈতিহাসিক। কিন্তু ব্রিটিশরা যে খুন লুঠ অত্যাচার করে বাংলার সম্পদ জ্ঞান লুঠ করে নিয়ে গিয়েছিল সাগরপারে নিজেদের দেশ সাজিয়ে তুলতে রাষ্ট্রীয় মদতে, অন্তত সে সময় বাংলার নবাবদের পরিচালনায় ধর্মান্তরকরণ বা অত্যাচার রাষ্ট্রের নীতি ছিল না, এ কথা সরাসরি বলা যায়।

মুর্শিদকুলি থেকে সিরাজ পর্যন্ত নবাবেরা বিপুল পরিমান অমুসলিমকে রাষ্ট্রের প্রশাসানে বসানোর যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তা সে সময়ের রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রকেই সুস্পষ্ট করে। সালিমুল্লাহ অভিযোগ করেছেন হিন্দুরা ছাড়া মুর্শিদকুলি অন্য কাউকে রাজস্ব বিভাগে চাকরি দিতেন না। তার যুক্তি, ভিতু সরল আর নিরীহ বলে নবাবেরা অমুসলিমদের রাজস্ব বিভাগে একচেটিয়া চাকরি দিতেন। রাজস্ব বিভাগে আসা টাকা তছরূপ করলে সহজেই অমুসলিমদের শাস্তি দেওয়া যাবে, চিহ্নিত করা যাবে। এরা তার কর্তৃত্বের ওপর আঘাত হানতে ইচ্ছুক ছিল না। আদতে তার সময়ে উত্তর পশ্চিম ভারত থেকে প্রশাসনে লোক নেওয়া বন্ধ হয়ে যায়, সেখানে নতুন রাজবংশ স্থাপনের কারণে। পারস্য পশ্চিম এশিয়া আফগানিস্তানইত্যাদি অঞ্চল থেকে বাংলায় ভাগ্যান্বেষী আসা বন্ধ হয়ে যায় নানা কারণে। ফলে বাংলার প্রশাসনে হিন্দুদের নিয়োগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। এবং স্থানীয়দের তিনি উপেক্ষা করেন নি। সুজাও একই ঘটনা ঘটিয়েছিলেন। গোলাম হোসেন আলিবর্দিকে আখ্যায়িত করছেন যে তিনি বাংলার হিন্দু-মুসলমান যৌথ পরিবারের প্রধান। অথচ হিন্দুদের প্রতি তাঁর পক্ষপাত বেশি। সামরিক বা প্রশাসন উভয় ক্ষেত্রে তিনি হিন্দুদের নিয়োগ করতেন। আবার লাহোরিমল্ল ও দলিপ সিংহকে তিনি পাঠিয়েছিলেন হিন্দু জমিদারদের দমন করতে। নন্দলাল, রাজা জানকীরাম, দুর্লভরাম, রামনারায়ণ প্রভৃতি তার সেনাবাহিনীর সেনাপতি ছিলেন। উচ্চপদস্থ হিন্দুরা নবাবদের অধীনে বহু যুদ্ধ করেছেন। মাণিকচাঁদ, দুর্লভরাম, মোহনলাল, শ্যামসুন্দর লালার মত হিন্দু সেনাপতির নাম পাওয়া যায়।

অভিযোগ, সরফরাজকে পরাজিত করে আলিবর্দি যখন সিংহাসনে আরোহন করেন, তখন তিনি পূর্বসূরীর আমলাদের ক্ষমতায় রাখা জায়েজ মনে করেন নি। তার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আশংকা থাকে। ফলে তিনি কাঁতা সরাতে হিন্দুদের নিয়োগ করেন। কিন্তু আলিবর্দি ছিলেন সরফরাজের থেকে অনেক বেশি যোগ্য প্রসাসক। তিনি সরফরাজের সেনার ওপর নির্ভর করেন নি। তাঁর নিজস্ব সেনাবাহিনী তাঁর সাসনকে নিশ্চয়তা দিয়েছিল। কূটনৈতিক এবং প্রসাসনিকভাবে তিনি সরফরাজীয় পক্ষকে মোকাবিলা করেন। সুবার সংখ্যাগুরুকে দূরে রেখে তাঁর রাজত্বের এবং বংশের স্থায়িত্ব দেখেন নি। এবং এবাবদে তারা সকলে মোগল আমল থেকে চলে আসা রীতিকেই পালন করে গিয়েছেন।