Showing posts with label চান্দোল. Show all posts
Showing posts with label চান্দোল. Show all posts

Tuesday, June 18, 2013

মেয়েটির নাম দিল্লি সরকার। চান্দোল হাট মেলার একটি অতুলনীয় অভিজ্ঞতা, A Lady Named Dilli Sarkar, an unforgettable experience at Chandol Hat Mela, Uttor(North) Dinajpur

 মেয়েটির নাম দিল্লি সরকার। 

ছোটবেলায় তিন সন্তানের মৃত্যুর পর পিসি নতুন মেয়েটির নাম রাখলেন দিল্লি। তত্ব হল দিল্লি বহু দূর। সন্তানের এই নামটি রাখলে যদি সন্তানটি বাঁচে(তখন ভারত সরকার অথবা দেশি, বিদেশি দাতা সংস্থার দেওয়া অর্থে তখন স্বেচ্ছাসেবীরা কন্যা ভ্রূণ হত্যা বিরোধী প্রকল্প রচনা করেছিলেন কিনা সে তথ্য লোকফোকের কাছে নেই, কিন্তু দিনাজপুরের{তখন রাজনৈতিকভাবে পশ্চিম উপসর্গযুক্ত জেলা} এক অজ পাড়াগাঁয়ে, আজকের মানুষ আর জনগণের ভালকরা রাজনীতির ভাষায়, প্রায় সহায়-সম্বলহীন এক আদিবাসী, রাজবংশী পরিবারের মাথারা কন্যা শিশুকে মুখে নুন দিয়ে মেরে ফেলতে চাননি। প্রাণপণে চেষ্টা করে গেছেন কীভাবে মেয়েদের বাঁচিয়ে রাখাযায়। কে জানে শহরের মানুষেরা কাদের কথা বলেন, কাদের কথা ভেবে প্রকল্প রচনা করেন!)। 
সবার প্রার্থনা কীভাবে এবারটি কাজে লেগে গিয়েছিল(আদতে ততদিনে ভারত সরকারের মদতে আর স্পন্সরশিপে দেশিয় চিকিৎসাবিদ্যার গঙ্গা প্রাপ্তি ঘটেছে। আরও অনেক বিদেশি ধারকরা ভাবনার মত বড় পুঁজির অ্যালোপ্যাথি চিকিৎসা একমাত্র চিকিৎসাব্যবস্থার মর্যাদা পেয়েছে। আর সকলে গ্রাম্ভারি নামে দুয়ো রানিমাত্র। কিন্তু দেশিয় চিকিৎসাবিদ্যা অর্থে আজকের দিনে সরকারি ভাষায় মান্যতাপ্রাপ্ত শুধুই আয়ুষের কথা বলছিনা, দেশিয় গ্রামীণ লৌকিক চিকিৎসা ব্যবস্থার কথা বলছি। পরে পড়ে দেখেছি, আয়ুর্বেদও ক্ষমতার বাইরে থাকা দেশিয় গ্রামীণ চিকিৎসাবিদ্যাকে দুচ্ছাই করে আজও। আয়ুর্বেদ তখন অ্যালোপ্যাথির আক্রমণে নাভিশ্বাস(অগ্নিশ্বর সিনেমাটি মনে করুন, অ্যালোপ্যাথি মানেই বিজ্ঞান আর সব ঝাড়ফুঁক, তন্ত্রমন্ত্র, জলপড়া।)। আয়ুর্বেদ ডাক্তারেরা আজও অ্যালোপ্যাথি চিকিৎসা করেন। আয়ুর্বেদের যখন নাভিস্বাস তখন তার পাশে দাঁড়াবার জন্য কেউ নেই, কেননা তত দিনে অ্যালোপ্যাথি আর আয়ুর্বেদের যৌথ-আক্রমণে লৌকিক চিকিৎসা মুখ লুকিয়েছে।)। সমবেত প্রার্থনায় দিল্লি শুধু বাঁচল না, ক্রমশঃ বড়ও হয়ে উঠল। সবার মুখে ছাই দিয়ে তার বিয়ে হল, সন্তানও প্রসব করল। দিল্লির তখন ভরা সংসার। অন্যান্য রাজবংশী মেয়েদের মত সেও বুনতে ওস্তাদ হয়ে উঠল। অঞ্চলের একদা ডাকসাইটে কাঠের মুখা শিল্পী প্রয়াত আজিত সারকারের হাত ধরে অন্যান্য ঢোকড়া (ঢোকড়া সংস্কৃতি সম্বন্ধে বিশদে জানতে http://lokfolk.blogspot.in/2012/08/blog-post_14.html) শিল্পীদের সঙ্গে (ঢোকড়া তাঁতের চেহারা দেখার জন্য এই লিঙ্কটা  http://lokfolk.blogspot.in/2012/04/dokra-weavers-at-work.html দেখুন। কলকাতায় শিক্ষিতরা এই তাঁতকে মণিপুরী তাঁত বলেন। কেন? তারাই জানেন) কলকাতায় মেলায়ও এসেছে(২০০৯এ কলকাতা মেলায় দিল্লির ছবিসেখানেই তার সঙ্গে আলাপ। পরে দেখেছি দিল্লি সেই আলাপ ভুলে গিয়েছে। কিন্তু তার নামের জন্যই হোক বা তার অত্যন্ত আদুরে ভাবে তার কাজ দেখানোর জন্যই হোক, বা কাজের গুনমানেই হোক, দিল্লিকে আমার মনে থেকে গিয়েছে। 
চান্দোল মেলা আয়োজন করছিল সঙ্ঘের দিনাজপুর জেলা কমিটি। তাদের যোগাযোগেই দিল্লি চান্দোল মেলায় এসেছেন অংশ নিতে। সঙ্গে আরও কয়েকজন শিল্পী। দিল্লিকে মেলার শেষেরদিকে পুরনো ঘটনাটা বলেছিলাম। গ্রামের কর্মঠ মহিলাদের মত সে চোখেমুখে বিস্ময় ফুটিয়ে শুধুই হেসেছিল। অন্যদের মত, প্রথমে সে মেলা দেখে হতাশ হয়েছিল। যদিও শহুরে বা স্থানীয় রাজনীতি করা কারু শিল্পীদের মত উচ্চৈঃস্বরে বলেনি, কিন্তু তার মনে, হাটে তার মাল বিক্রি নিয়ে বেশ দ্বিধায় ছিল। পাড়াগাঁয়ের অনপনীয় ভদ্রতায় সে মুখবুজে সব মেনে নিয়েছে। কিন্তু সে শুধু নয়, তার পরিবারও যে তাঁকে মেলায় আসতে বারন করেছিল, তার প্রমান পেলাম শেষের আগের দিনের রাতের মিটিঙে।
মেলা উদ্বোধন করলেন স্থানীয় বিধায়ক অমল আচার্য মহাশয়। ছিলেন স্বপন সারকার এবং আশিম ঘোষ। উদ্বোধনের বিশদ বিবরণ কয়েক মাস আগের পোস্টে পাওয়া যাবে। আজ আর সেই গালগল্পে যাচ্ছি না। যাই হোক, প্রথম দিনই প্রায় সকলের বউনি হল, দু একজনের বাদে। আরও অনেকের সঙ্গে, দিল্লির বিক্রি হল প্রায় পাঁচ হাজার টাকার। ব্যাপারটা খুব একটা ছোট করে আমরা দেখলাম না। আগে থেকেই সিদ্ধান্ত নিয়ে সবাইকে জিজ্ঞেস করে রোজের বিক্রির হিসেব রাখতাম। ব্যাপারটা খুব কম দাঁড়াল না। প্রথম দিনেই আমরা বেশ উত্তেজিত। একে অজ পাড়াগাঁয়ে মেলা। তারপরে প্রচার নেই। বাংলাদেশের দুই শিল্পী এসেই চলে গেছেন। তাঁরা বললেন আমাদের এত দামী কাপড় এখানে বিক্রি হবে না(বলা ভাল মেলার যায়গা দেখে পালিয়ে গিয়েছে। কলকাতার, নিদেন পক্ষে জেলা সদর ছাড়া, সরকারি-বেসরকারি প্রচারে এটি যেন আজ প্রমাণিত, গ্রামে শিল্প দ্রব্যের বাজার নেই, কারোর শিল্পবোধ নেই। স্থানীয় মালগার কার্পেট শিল্পী আবু তাহের[সে আবার মালগা পঞ্চায়েত প্রধান। কংগ্রেস করে] বলল দাদা কোন ভাগাড়ে এনে ফেললেন!!! অথচ তাকে চান্দোল মেলায় ডাকার জন্য পি এন রায় পর্যন্ত আমাদের কাছে দরবার করেছেন। আবুর বিক্ষোভে আমরা প্রায় মুহ্যমান। আবু কংগ্রেস করে, উদ্বোধন এবং অন্যান্য সাহায্য করছে তৃণমূল আর সঙ্ঘের জেলা সম্পাদক সিপিএম। গোলযোগ লাগলেই চিত্তির। এত দিনের সব পরিশ্রম ভেস্তে যাবে। কোনও বিতর্কে না গিয়ে আবুর সামনে হাত জড়ো করে তাকে সামাল দিই। মনে খচখচানিতো ছিলই। সবাই এত খারাপ বলছে। মেলা খারাপ হলে কেউ আস্ত রাখবে না)। আবুর কার্পেট বিক্রি হল প্রত্যাশার তুলনায় শুধু ভাল নয়, বেশ ভাল, এত ভাল বোধহয় কলকাতাতেও হয় নি। উদ্বোধনী মেলা শেষে তার গাল ভরা, কান এঁটো করা হাসি। পরের দিনই তার একটা দোকান চারটা হল।
তো শেষের আগের রাতে মুখ খুলল দিল্লি। আমরা ত পেরিয়ে থ, থ পেরিয়ে দ। বর আর ছেলে তাকে মেলায় আসতে দিতে চায়নি। বলেছিল এই দিনাজপুর জেলার চান্দোল হাটে কে তার ঢোকড়া কিনবে? সপ্তাহে, স্থানীয় এলাকার পাঁচ ছটা হাটে ট্রাক বোঝাই করে ঢোকড়া চালান যায়। আর প্রত্যেকের বাড়িতেই তিন চারটের বেশি ঢোকড়া আছে। এতগুলো বিক্রিতো হবেই না। সে গাঁয়ের লোক হাসাবে। কিন্তু দিল্লি জেদ ধরেছিল, মেলায় সে যাবেই। তাকে মেলায় পাঠিয়েছিল জেলা শিল্প দপ্তর, আমাদের অনুরোধে। তাই তার বর খুব একটা জোর ফলাতে পারে নি। প্রথমদিন তার ৫ হাজার বিক্রি হতেই প্রায় হতভম্ভ দিল্লি প্রথমে তার বরকে ফোন করে। বর বিশ্বাস করেনি। ছেলে হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল। এখন লিখতে লিখতে মনে পড়ল, সেই রাতে দিল্লি সবার সঙ্গে ছিল না। সে আমাদের বলেই বাড়ি গেল। আমরা একটু বিরক্তই হয়েছিলাম। ইস্কুল বাড়িতে সবার সঙ্গে থাকার ইচ্ছে হলনা বলে পেছনে বেশ নিজেদের মধ্যে তার প্রতি কটুক্তি করেছিলাম। শেষদিন পর্যন্ত সে বেশ ভাল টাকার ঢোকড়া এবং বাতিল শাড়ি থেকে হাতপাখা, পাটের তৈরি জলের বোতল বয়ে নিয়ে যাওয়ার জালসহ অনেক কিছু বিক্রি করল। সে বাড়িতে মাত্র একটা ঢোকড়া ফিরিয়ে নিয়ে গেল। খালি হাতে কোনও বিবাহিত মেয়ের শ্বশুরবাড়ি বাড়ি ফিরতে নেই।

দিল্লির বরেরমত আমরা মেলায় বিক্রি নিয়ে সন্দিগ্ধ ছিলাম না ঠিকই, কেননা আমরা সন্দেহ কাঁটাকে পাত্তা দিই নি। এই মেলা আসলে দিল্লিরমত শিল্পীদের শুধুই নিজেদের চিনতে সাহায্য করেছে তাই নয়, তাদের কাছের বাজারকে নতুন চোখে দেখতেও সাহায্য করেছে। দিল্লি এখন তার এলাকায় রোজ মিটিং করতে ডাকে। তাঁকে জানিয়েছি আমরা পঞ্চায়েত ভোটের পর যাব।  

Friday, June 7, 2013

IPL Betting vs Grassrootlevel Gambling, আইপিএল জুয়া, বাংলার জেলার মেলা-জুয়ায় হাত বাড়াচ্ছেনা তো

সম্প্রতি ৪০ ওভারের আইপিএল ক্রিকেটের সঙ্গে সংলগ্ন নানান মহলের বেটিং বিষয়ে নিরন্তর সংবাদ প্রকাশে আমরা উদবিগ্ন। আমরা বাংলার পারম্পরিক কারু, বস্ত্র এবং অভিকর শিল্পীদের সংগঠন, বঙ্গীয় পারম্পরিক কারু ও বাস্ত্র শিল্পী সংঘ, এবিষয়ে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, ভাবনা নিবেদন করতে চাই। এই সংগঠন শিল্পীদের জন্য তৈরি মধ্যবিত্তের সমাজ সেবা বিলাসী সংগঠন নয়। শিল্পীদের নিজেদের সংগঠন। সংগঠনে ৮০ শতাংশই পরম্পরার শিল্পী। অন্ততঃ ছহাজার বছরের বাংলার ঐতিহ্যবান পারম্পরিক শিল্পীদের জীবন জীবিকা, তাদের অধিকার রক্ষা, বিশ্বায়নের খোলা বাজারে তাদের বিপন্ন অস্ত্বিত্ব, পুরনো ইতিহাস বিষয়ে গবেষণা, ইতিহাসে নতুন করে তারিখ নির্ণয়, জ্ঞান নথিকরন ইত্যাদি বিষয়ে শিল্পীরা নিজেরাই আন্দোলন করে থাকে। কেন্দ্রিয় এবং ১৭টি জেলার জেলা সংগঠন বিগত তিন বছর ধরে সদস্য চাঁদা, আর বন্ধুদের সহায়তার ওপর ভিত্তি করে চলছে। নানান দাবি আদায়ের আন্দোলন ছাড়াও পশ্চিমবঙ্গের নানান গ্রামীণ অঞ্চলের সঙ্গে, ভারতের নানান স্থানে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পশ্চিমবঙ্গের নানান পারম্পরিক, ঐতিহ্যশালী নানান উৎপাদন নিয়ে প্রদর্শনী করে থাকে। 
বেটিং অর্থে জুয়া – আইনি বা বেআইনি যাই হোক। খেলোয়াড়, আম্পায়ার, এমনকি দল মালিকদের বিরুদ্ধে হয় বিশেষ এক ক্রিকেট খেলার দিনে বিশেষ কোনও সময়ের খেলার নির্দিষ্ট অংশে কি হতে যাচ্ছে তার ওপর বাজি ধরা, নয়তো গোটা খেলাটির পরিনাম আন্দাজ করার ওপরে বাজি ধরার অভিযোগ(বেটিং) উঠেছে। অভিযোগ খেলোয়াড়, দল মালিক, আম্পায়ারা যৌথভাবে নিজেদের মধ্যে খেলার জন্য যে কলাকৌশল তৈরি হয়, সেই তথ্য এবং পান্টারদের বিক্রি করে নিজেরা জুয়ায় অর্থ বিনিয়োগ করত। এই অভিযোগে মুম্বাইএর অভিনেতাদের সঙ্গে ক্রিকেটের সঙ্গে জুড়ে থাকা ভারতজোড়া নানান ব্যক্তি, সংগঠনকে দিল্লি এবং মুম্বাই পুলিস হয় জেরা নয়ত গ্রেপ্তার করেছে। শোনাযাচ্ছে এই ব্যাবসায়, শুধু আইপিএলেই (যদি লোকঠকানোকে, নৈতিকভাবে ব্যবসা বলা উচিত নয়) বছরে ৪০ হাজার কোটি টাকা খাটে(ক্রিকেটে সব মিলিয়ে প্রায় হাজার লক্ষ কোটি টাকা), এই কাজে মদত দিচ্ছে ভারতের বাইরে বসে থাকা অন্ধকার জগতের মাথারা।
আইপিএল প্রসঙ্গে বলা যাক, জেলায় সংগঠনিক কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, জুয়ার জাল একেবারে তৃনমুলস্তরেও ছড়িয়েছে অনেকদূর। সংগঠন চালাতে কিভাবে জুয়ার সহজ অর্থের প্রস্তাবের মুখোমুখি হচ্ছি, সেই অভিজ্ঞতাটি এবং এই উচ্চসমাজের জুয়ার সঙ্গে বাংলার তৃনমুলস্তরের জুয়ার যোগাযোগের আশঙ্কা যে থেকেই যায়, সেই বিষয়টি আপনাদের বহুল প্রচারিত সংবাদপত্রে প্রকাশ করার অনুমতি চাইছি।
সংগঠন তৈরি হওয়া থেকে গত তিন বছর ধরে বাংলার নানান অঞ্চলে সদস্যদের নিয়ে প্রদর্শনী করে চলেছে সঙ্ঘ। প্রদর্শনীর  বেশ কিছু সময়ের আগে, জেলা কমিটিগুলোর সঙ্গে বসে প্রদর্শনীর জন্য প্রয়োজনীয় স্থান নিরূপণ, অর্থ তোলার ব্যাবস্থা করা হয়। প্রত্যেক সংগঠনের মতই, প্রত্যেক প্রদর্শনীর আগের কয়েক মাস সংগঠনে প্রয়োজনীয় অর্থ তোলা নিয়ে বেশ চুল ছেঁড়াছেঁড়ি চলে। শেষ পর্যন্ত প্রত্যেকটা কাজ, স্থানীয় মানুষ, সংগঠনের সহায়তায় বেশ সন্তোষপূর্ণভাবে শেষ হয়। সেই প্রদর্শনী থেকে আবার নতুন পরিকল্পনা নতুন উদ্যমে নেওয়া হয়েছে।
সংগঠনের ১০১২র কুচবিহারে অনুষ্ঠিত উত্তরবঙ্গ সম্মেলনে সিদ্ধান্ত হয়, ২০১৩র মে মাসে উত্তর দিনাজপুরের কোনও একটি গ্রামীণ এলাকায় একটি প্রদর্শনী করা হবে। কেননা, মুলতঃ শহরাঞ্চলের বাইরে, যেখানে শিল্পীদের বাসস্থান, সেখানের সাধারনেরা কি বলছেন, তা বোঝা, এবং গ্রামের বাজারকেও বুঝতে চেষ্টা করা। ঠিক হয়, প্রস্তাবিত মেলাটি কালিয়াগঞ্জের, ফতেপুর মোড়ের থেকে আড়াই কিমি ভেতরে, চান্দোল হাটে হবে সাতদিন ধরে। দিনখন ঠিকঠাক হয়ে যাওয়ার পর এল অর্থের সমস্যা। জেলা সম্পাদক সেখানের বেশ কিছু ক্লাব সংগঠনকে নিয়ে মিটিং ডাকেন। বেশ কয়েকবার বৈঠক হয়। কিন্তু আর্থিক সমস্যার সমাধান হয় না। স্থানীয় সংগঠনগুলো নানানভাবে পিছিয়ে যেতে থাকে।
মেলা প্রায় করা যাচ্ছে না, এমন এক অবস্থায়, চতুর্থ বৈঠকের মাঝের বিরতিতে, সংগঠনের কেন্দ্রিয় এক নেতার কাছে সঙ্গোপনে ঘুরপথে প্রস্তাব আসে, মেলার অর্থের সমাধান হয়ে যেতে পারে, যদি সংগঠন মেলায় জুয়ার বোর্ড বসানোর অনুমতি দেয়। সেই নেতা, প্রস্তাবটি শোনা মাত্রই খারিজ করে দেন। ফলে প্রস্তাবটি আর মিটিংএর পরের অর্ধে পেশ হওয়ার কথা নয়, কিন্তু উঠল। বোঝাগেল যে আটটি সংগঠন সঙ্গে নিয়ে আমরা এই অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করছি, তার একটির অন্যতম কর্মকর্তা এই প্রস্তাবটি দিয়েছেন। তাঁর সঙ্গে বোর্ডওয়ালাদের যোগাযোগ আছে। একজন বোর্ড মালিক তাঁর গ্রামের মেলা দেখাশুনো করে। প্রত্যাখ্যাত হয়েও তিনি দমেন নি। মরীয়া হয়ে মিটিঙে তিনি এই সমাধানটি প্রস্তাব করে ফেলেন। হয়ত ভেবেছিলেন প্রায় ১ লাখ টাকার প্রস্তাবটা আমরা হয়ত অনুষ্ঠানের স্বার্থে লুফে নেব। মিটিঙে প্রায়-সর্বসম্মতিক্রমে প্রস্তাবটি বাতিল হয়ে যায়। আমাদের স্বস্তি দিয়ে অন্য সংগঠনগুলো শিরদাঁড়া সোজা করে আমাদের সমর্থন করে সেদিন। সেই ক্লাবটি আর প্রদর্শনী সংগঠনে থাকে নি। বুঝলাম, শুধু অর্থ-লালসার জেরে মানুষকে দিয়ে অনৈতিক অনেক কিছু করিয়ে নেওয়া যায় না, আজও মানুষকে নৈতিকতা চালোণা করে। সংগঠনের কেন্দ্রিয় অর্থ, স্থানীয় সংগঠনগুলোর উদ্যম, নানান ব্যক্তির সহায়তায় মেলাটি অসম্ভব সফল হয়। আমরা গ্রামের বাজার সম্বন্ধে নতুন দৃষ্টি লাভ করি। সে এক অন্য দীর্ঘ আলোচনা।  
মিটিঙ শেষে, আমাদের অসীম কৌতূহল মেটালেন জেলা সম্পাদকমশাই। তিনি বললেন, গ্রামেগঞ্জে চাঁদা দিয়ে আর মেলা আয়োজন করা হয় না। মেলার পরিকল্পনা করার সময় থেকেই স্থানীয় জুয়া সংগঠনগুলো নিলামে মেলার ডাক হয়। সেই নিলামে যে দল, মেলা কমিটিকে সব থেকে বেশি টাকা দেওয়ার অঙ্গিকার করে, সেই জুয়ার বোর্ড বসানোর অধিকার পায়। শুধু থোক টাকা দেওয়াই নয়, জমকাল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করার জন্য আলাদা অর্থের বরাদ্দ থাকে। যত বেশি মানুষ, তত বেশি জুয়ার বোর্ডে অর্থ বিনিয়োগ, তত বেশি রোজগার। মেলার জন্য সংগঠকেরা আলাদা করে চাঁদা তোলেন। লাভের গুড় সংগঠকেদের সিন্দুকে। নামী মেলা হলেতো কোথাই নেই। জুয়া দলগুলোর রেষারেষিতে সে ডাক যে গিয়ে কোথায় থামবে কেউ জানে না। আমাদের মেলা চলাকালীন সময়ে শুনলাম মাত্র তিন দিনের একটি স্থানীয় পুরনো মেলার ডাক উঠেছে প্রায় সাড়ে চার লাখ টাকা! নতুন মেলা হলে প্রাথমিক তহবিলটি স্থানীয় যুবকেরা চাঁদা দিয়ে তৈরি করে। পুরনো মেলা হলে মাছের তেলে মাছ ভাজা। জুয়ার বোর্ডের অর্থ উঠে আসে সুদে আসলে। তবে জুয়ার বোর্ড মেলার একটু দূরেই বসে, বেশ অনেকটা যায়গা নিয়ে। শোনাগেল, মোটামুটি আমাদের মত নতুন মেলায়(রোজ অন্ততঃ হাজার দশেকের বেশি মানুষ এসেছেন এই মেলায়) সাত দিনের জন্য খুব কম করে ১ লাখ টাকার ডাক ওঠে। এছাড়াও প্রসাশন, স্থানীয় প্রভাবশালী মানুষ, সংগঠনের জন্যও বিশেষ প্রণামী বরাদ্দ থাকে। সব ক্ষমতাশালী দেবতা তুষ্ট করে সমগ্র বাংলা জুড়ে চলছে জুয়ার টাকায় মেলা নামক মোচ্ছব।
এক একটি জুয়ার দল খুব কম করে বছরে ৫০-৬০ লাখ টাকা রোজগার করে। জেলায় মানুষ ঠকানোর ব্যাবসা হিসেবে খুব কম সম্পদের ব্যাবসা নয়। একটি জেলায় খুব কম করে ১০টি(থাকে অনেক বেশি) দল থাকলে, সেখানেই রোজগার ৫ কোটি। ১৯টা জেলা ধরলে সারা বাঙলায় কমবেশি প্রায় ১০০ কোটি। মোটব্যবসার পরিমান কত? আমরা জানিনা এই জেলার ছোট ছোট জুয়াড়িদের সঙ্গে কোনভাবে এশিয়াজোড়া জুয়ার ব্যাবসার যোগাযোগ আছে কি না। মুঠোফোন, অন্তরজাল ইত্যাদির মাধ্যমে যেভাবে সহজেই যোগাযোগের সুযোগ বেড়ে চলেছে তাতে এই আশঙ্কা বেড়েই চলে বই কমে না। বার্ষিকভাবে জেলাওয়ারি এই জুয়াড়িদের রোজগার খুব কম নয়। ফলে এই রোজগারে এদের যদি আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বাড়ানোর সাধ হয়ে থাকে তাহলে পুরো ব্যাপারটাই খুব শঙ্কার। ভারত বিরোধী বহু সংগঠন আইপিএলেরমত জুয়ার শৃঙ্খল থেকে অর্জিত অর্থ ভারত ধংসের কাজে ব্যাবহার করছে। এবার যদি বাংলার গ্রামস্তরে তাদের বেটিং বা স্পট ফিক্সিং নেমে আসে, তাহলে নিশ্চিত বাঙলা বড় এক ধ্বংসযজ্ঞের জন্য অপেক্ষা করছে। এবিষয়ে প্রশাসন কি কিছু করতে পারেন না?

Friday, May 31, 2013

ঋতুর প্রতি দ্বিতীয় এলিজি - শঙ্করের কথা।। শঙ্করের কথা - second elegy to iswor ritu

এই লেখাটি তৈরি করেছিলাম মার্চ মাসে, যখন আমরা দিনাজপুরের এক অজ পাড়াগাঁয়ের একটি হাট, চান্দল থেকে মেলা শেষ করে ফিরি।

আজ ঋতুর মৃত্যুর পরের দিনে কেন যেন মনে হল এই লেখাটা বড্ড প্রাসঙ্গিক। কিছুটা হলেও ইঙ্গিতে ঋতুর প্রতি হুল ফোটানো আছে।
পাঠকেরা নিশ্চয় বুঝবেন।
বিশ্বেন্দু



সদাহাস্য দম্পতিকে চিনে নিন 

নীল জামা গলায় কণ্ঠী এই প্রায়-যুবকটি বঙ্গীয় পারম্পরিক কারু ও বস্ত্র শিল্পী সংঘের অন্যতম সক্রিয় সদস্য শংকর সরকার বয়স খুব বেশ হলে ১৭ সাকিন উত্তর দিনাজপুর জেলার কালিয়াগঞ্জের ফতেপুর গ্রাম বছরখানেক হল শঙ্কর বিয়ে করেছে  গত বছর সংঘের ঠাকুরপুকুরের মেলায় অভিনয় করে যাওয়ার পরপর 


শঙ্কর অসামান্য অসামান্য অভিনেতা দিনাজপুর জেলার নিজস্ব নাটক খন খনে মহিলার ভূমিকায় অভিনয় করে সে মঞ্চে বোঝার উপায় নেই তার পুরুষত্ব অসামান্য তার বাচনিক দক্ষতা, অসামান্য তার সম্মোহনী যাদু, অসামান্য তার শারীরি আবেদন, অলৌকিক তার উপস্থাপন ক্ষমতা অঞ্চলে তার অসামান্য জনপ্রিয়তা  

আমরা শহুরে কলকাত্তাইরা স্ত্রীবেশী অভিনেতা পুরুষ নিয়ে প্রচুর আদিখ্যেতা করেছি রাতের পর রাত তিন দিক ঘেরা শহুরে মঞ্চে নাটক করেছি সবুজ পত্রে গল্প লিখেছি তার সামাজিক অবস্থাকে দুর্বিসহ ভেবে আহাউহু করেছি। ইন্তালেকচুয়াল সিনেমা বানিয়েছি সিনেমা হিট করেছে। বহু অর্থ লাভ করেছি দেশে-বিদেশে খ্যাতিও লাভ করেছি সেইখ্যাতির পিছন পিছন এসেছে আরো অনেক উপাদান হয়ে উঠেছি গুরুঠাকুর।

চলচ্চিত্র এক্কেবারেই পশ্চিমি শিল্প মাধ্যম। নির্দেশকের পশ্চিমি সভ্যতার শংসাপত্র লাভকরার মান্যতা অর্জন করা অন্যতম উদ্যেশ্য হয়ে পড়ে। পশ্চিমি দর্শণ,সামাজিক প্রথা, সংস্কৃতির প্রতি আদিখ্যেতা প্রদর্শণ করতে হয় অসীম দাম্ভিকতায়  এই দম্ভিকতা জন্মায় নিজের দেশ, নিজের সমাজকে না জানার শর্তে কেননা শহুরেরা আজন্ম ভেবেছিএ দেশে জন্মে পদাঘাতই শুধু পেলাম। গ্রামীণ সত্যি জানলে দেশের সমাজকে ন্যুন দেখানোর শর্ত জুড়ে থাকে অদৃশ্যভাবে। ফলে বাস্তবতা প্রকাশ পায় না বললেই চলে বাল্যে পড়াশোনাই(ইংরেজি অথবা বাংলা মাধ্যম) দম্ভ প্রকাশের দক্ষতা তিলে তিলে তৈরি করে দেয় (একটা ছোট্ট উদাহরণ দিলে বিষয়টা স্পষ্ট হবে আজও ভারতীয় সিনেমার অন্যতম দিক ফলক মৃগয়া আথচ ছো নাচে মাদল বাজে থাকে না বিন্দুমাত্র ছো নাচের শাস্ত্রীয়তার ব্যকরণ একজনও বিশেষজ্ঞ এই তুচ্ছ দেশী বিষয়ে বিন্দুমাত্র অসূয়া প্রকাশ করেন না(বোধহয় জানেনও না) আজও মৃগয়া নিয়ে শহুরে আদিখ্যতা শেষ হয় নি আর মনের মানুষ নিয়ে যত কম কথা বলাযায় তত ভাল)  

নারীবেশী, পুরুষ অভিনেতাদে বিষয়ে তৈরি সিনেমার পরিচালক আরও প্রগতিশীল - এমন এক ছাপ্পা পেয়ে সামাজিকভাবে অন্যান্য শহুরে ছাপ্পায় কুসংস্কারগুলো নিয়ে ছবি করার পিঠচাপড়ানি এবং বিনিয়োগ লাভ করেন অসামান্য ব্রিটিশ উচ্চারণে ভারতীয় (গ্রাম)সমাজ কত পিছিয়ে পড়া, এই তত্ব পরিস্কার বুঝিয়ে ছাড়েন বিভিন্ন চলচ্চিত্র উত্সবে সিনেমায় তিনি গুরুঠাকুর জুরির মর্যাদা পা বাঙলা সিনেমা পথ ভাঙা কাজ করেছে, এই চিন্তায় কলকাত্তাই মধ্যবিত্ত আহ্লাদে ডগমগ - অনুগামীরা আনন্দে উদ্বাহু 

মাত্র হাজার দেড়-দুয়েক বছরের সভ্যতায় আজও পশ্চিমের নারীরা লড়াই করছেন অধিকারের জন্য গ্রামীণ ভারতীয় সমাজে মহিলারা নানান বিধিনিষেধ মান্য করেই অসম্ভব নিজস্বতা বজায় রাখেন তাঁত চালান, চাষ করেন, সংস্কৃতির নানান দিক ধরে রাখেন অসামান্য ঋজুতায় কৌম স্মৃতিতে ধরা থাকে সামাজিক ইতিহাস ভারতের পশ্চিমি জ্ঞাণচর্চা গ্রামীন মহিলাদের কোনও দক্ষতা স্বীকার করে না। অথচ বহু সমাজে আজও নারীরা চালিকা শক্তি বুননে, চাষেশিল্প উত্পাদনে, সংসার পরিচালনায় নারীদের দক্ষতা অপ্রতিদ্বন্দ্বী তবুও শহুরেরা মনেকরে সমাজের কোন স্তর কেন্দ্রীয় ক্ষমতার কত কাছাকাছি, তাই দিয়ে সেই স্তরের সামজিক অবস্থান বিচার হয়, দক্ষতা নির্ণয় হয় হয়ত সেই জন্যই গ্রামীণদের বর্ণনা করতে প্রান্তিক, দলিত, পিছড়ে বর্গ ইত্যাদিসব অশ্লীল অভিধা তৈরি হয় জ্ঞাণচর্চায়

শহুরেরা অধিকাংশই গ্রাম থেকে শহরে এসেছি। গ্রামের বাস্তবতা ভুলেছি। ঠিক যেমন ভুলে ছিলেন বিদ্যাসাগর, রামমোহনসহ অগুন্তি প্রায় সব আলকপ্রাপ্তরাই তাদের পথ ধরে সহজ স্বাভাবিক গ্রামীণ প্রকাশভঙ্গী ভুলেছি অসামান্য শহুরে সভ্যতার মোড়কে কেউ কেউ দেখিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলেও সেই দেখাকে গ্রামীণ দর্শণে বোঝার চেষ্টা করিনা ঠেকায় পড়ে কিছুখানি স্বীকার করলেও তাকে পশ্চিমি আধুনিকতার ছোঁয়ায় কোনও না কোনও একটা মোড়ক দিতে ভীষণ ব্যস্ত হয়ে পড়ি একই ঘটনা নারী বেশী পুরুষ অভিনেতা সাবজেক্টদের জীবন আলোচনায়ো ঘটেছে। তার সঙ্গে ক্যামারা বা কলম বাগিয়ে মাত্র তিন চার দিন কাটিয়েই পশ্চিমি বয়ানে সামাজিক এই কুসংস্কারটি ডকু করে বিভিন্ন ফোরামে ছুঁড়ে সাংস্কৃতিক মসিহার মর্যাদা অর্জন করেছেন নানান গবেষক কেউ আখের গুছিয়ে ইউরোপ-আমেরিকার নামি-অনামিসব বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজতত্ব বিভাগে অধ্যাপনার সম্মান(আদতে আরও সাংস্কৃতিক চাটুকারিতা) অর্জন করেছেকেউবা গবেষণা, অথবা লাখোইয়েন-পাউন্ড-ডলারের সাংস্কৃতিক প্রজেক্ট বাগিয়ে বিভিন্ন ফোরামে আমার এই কাজ এই প্রথমবার আপনাদের সামনে এল, এই তথ্যে সব্বাইকে রাঙিয়ে, এগিয়ে থাকা ইওরোপের(আরআমেরিকার) দেশগুলির তুলনায় ভারত কত পিছিয়ে তার বয়ান বিবৃত করার কাজ করেছেন 

অথচ পুরুষ শঙ্কর, রাতের পর রাত, খন নাটকে স্ত্রী বেশে অভিনয় করে চলে সমাজ তাকে শহুরেদের দৃষ্টিতে দেখে না তার দাদা, বাবা অথবা মা কেউই অনুযোগ করে না, কেন মহিলা চরিত্রে আভিনয় করে সে তাদের সামাজিক সুনামে সে কলঙ্ক লেপন করছে না, তথাকথিত পিছিয়েপড়া, কুস্কারগ্রস্ত গ্রামবাংলার সমাজ তাকে একঘরে করে রাখে নি শহুরে ভাষায় নারীবেশী পুরুষ অভিনেতা শঙ্করকে সামাজিক ট্যাবুর বিরুদ্ধে লড়াইও করতে হয় নি উত্তর দিনাজপুরের ফতেপুর এলাকায় তার মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকতে বিন্দুমাত্রও কষ্টতো হয়ই নি বরং সে অসামান্য এক সামাজিক মর্যাদা প্রতিদিন সে এনজয় করে তাই শঙ্করকে নিয়ে সিনেমা হয় না, গল্পও অসম্ভব।  

সম্প্রতি তার বিয়ে হয়েছে সে এক ছোট্ট সুন্দর বউ ঘরে এনেছে(এই দম্পতির বয়স পশ্চিম প্রভাবিত বুদ্ধিজীবিদের তৈরি সংবিধান অনুমোদিত না হলেও হাজার হাজার বছরের পরম্পরা বাজার রাখা বাঙলার সমাজ অনুমোদিততো বটেই) শ্বশুরবাড়ির লোকেরা মাঝেমধ্যে বড্ড আহ্লাদ করে শঙ্করের  অভিনয় দেখতে এসে আনন্দে লুটোপুটি খায় নাটকে তার তথাকথিত অশ্লীল বাক্যবাণে আঁচলের তলায় মুখ লুকোয় না অথবা শঙ্করকে বলে না নাটকে তার অশ্লীল বাচন সমাজকে দূষিত করছে অভিনয়ে শঙ্কর যখন শাড়ি তুলে অসম্ভব যৌনআবেদনময় কমনীয় উরুতট প্রকাশ করে পটু হাতেতার এলাকায় তৈরি সোনালী পাটের সুতো তক্তিতে পাকায় অসম্ভব সামাজিক লাস্যে, যখন পর-পুরুষের সঙ্গে হাতের চুড়ির রিনিঝিনি তুলে ফস্টিনস্টি  করে গায়ে গা ঠেকনা লাগিয়ে, যখন বুকের আঁচল সরিয়ে একটি নকল সোনালী গোলার্ধ খুলে স্বামীর বন্ধুকে হাল্কা করে যৌনতার প্রলোভন দেখায় রাজবংশী ছড়ায়, যখন অসামান্য পুরুষালি মহিলা গলায় ও মা... বলে লাস্যের ঢং করে তখন নাটক দেখতে জড়ো হওয়া পুরুষদের শ্বাস ঘন হয়ে আসে, কারোর কারোর দীর্ঘশ্বাস পড়ে, কারোর প্রাণ হয়ত আকুলিবিকুলি করে একটিবার অন্তত শঙ্করের হাত ধরতে, পাশে দাঁড়াতে, হয়ত নিষিদ্ধস্থানগুলো ছুঁয়ে দেখতে  আবার যখন মায়ের ভুমিকা অথবা অন্য অভিঘাতের হালুয়া-হালুয়ানিতে বোকা হালুয়ার চালাক স্ত্রীর চরিত্রে অভিনয় করে তখনও তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর হৃদয় আকুলিবিকুলি করে কেঁদে বা হেসে ওঠে খলবলিয়ে। সে যৌনতা পারিবেশন করে না, নারী চরিত্র উপস্থাপন করে মাত্র।  

মঞ্চে উঠলেই শঙ্কর যেন রূপান্তরিত হয়ে যায় অপার্থিব কিন্তু বাস্তবের রেণুগুলোয় ঢালা এক মায়াময় বাঙালি নারীর ভুমিকায়- যার পরিবার নেই, যার স্ত্রী নেই, যার সংসার নেই, যার রোজ দোকানে বসার দায় নেই, যার বাইকে চড়ে ঘোরার আকাঙ্খা নেই, যার মোবাইলে নতুন ধরণের গান বাজাবার ইচ্ছে নেই শুধু রয়েছে ভারতীয় সভ্যতার এই অসামান্য দানের প্রতি অসামান্য আনুগত্য প্রদর্শণের নিবেদন। হাজার হাজার বছরের স্বীকৃত গ্রামীণ এই পরম্পরাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়া আর সামনে বসে থাকা আকুলিবিকুলি অগুন্তি দর্শককে জীবনের মধুর স্বাদ দেওয়ার দায় সে এই কাজ সজ্ঞাণে মাথায় তুলে নেয় 

আমরা ভুলে যাই বাঙলার অথবা অধিকাংশ ভারতীয় সমাজেই নারীর যৌনতা কোনও দিনই আলাদা চর্চার বিষয় ছিল না - আদতে দৈনন্দিন জীবনযাত্রার অঙ্গ আজও। বাঙলার পোড়ামাটিমধ্যপ্রদেশের খাজুরাহো অথবা  কোণার্কএর মন্দির অলঙ্করণে রতিচিত্র, কালিদাসের কাব্যে শিবপার্বতীর বিপরীত রতিতুরাম বর্ণনা অথবা কুচযুগলশোভিত মুকুতা হারের প্রার্থনাসম্বলিত স্ত্রোত্র অথবা নানান গ্রামীণ কাব্যে সহজ স্বাভাবিকভাকে দেহবল্লরী বর্ণনা অথবা মৈথুন ভঙ্গীমা অতীতে প্রকাশিত হয়েছে, আজও হয়। মধ্যবিত্ত শহুরেরা ভিক্টোরিয় সংস্কৃতিতে আবাল্য জারিত থেকে যেগুলিকে গালাগালি ভেবে এসেছে, আজও গ্রামীণ সমাজ সেই শব্দবন্ধগুলো, সেই সাংস্কৃতিক প্রকাশভঙ্গীগুলো অসামান্য স্বাভাবিকতায় দৈনন্দিন ব্যবহার করে বহন করে নিয়ে চলে তাই গ্রাম গ্রামই আছে, শহর হয় নি।

স্ত্রীবেশী পুরুষ শঙ্করই ১০ দিন ধরে অপার্থিব দক্ষতায় মেলা সঞ্চালন করে তার স্বেচ্ছাসেবক বন্ধুদের সঙ্গে মেলাস্থান ঝাঁটা নিয়ে ঝাঁট দিয়ে পরিষ্কার করে, মেলায় উদ্ধত যুবক সাইকেল চড়ে ঢুকে এসে স্বাভাবিকভাবেখবরদারি করে (কেউ বলার সাহস রাখে না তুই মেয়ের ভুমিকায় আভিনয় করিস, আমাকে কিছু তোর বলার অধিকার নেই), গ্রামের বাইরে থেকে আসা শিল্পী বন্ধুদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে দোকান সাজায়-তোলে, আমন্ত্রিতসব্বাইকে খেতে দেয়, মেলায় কাজ ছাড়াও বাড়িতে গিয়ে দোকান দেয়, চাষ করে, হাট করে, বাড়ির কাজ করে, রুগ্ন মায়ের সেবা করে সব কিছুই এত্ত স্বাভাবিকএত্ত সামাজিক যে তাকে নিয়ে নতুন করে গল্পলেখা খুবই কষ্টকর 

গ্রামীণ সংস্কৃতিতে এত্ত স্বাভাবিক এই ঘটনা শহুরে আমাদের দৃষ্টি এড়িয়ে যায় গ্রাম কত্ত পিছিয়ে পড়া তাই নিয়ে পরিশিলীত নাটক নভেল প্রবন্ধ লেখা হয়, রাজনৈতিক দল তৈরি হয়, এনজিওরা কোটি কোটি টাকায় মহিলাদের ক্ষমতায়ণের নামে করে-কম্মে খায়, টিভিতে মুখ দেখিয়ে সমাজ সংস্কারে ব্রতী হয়, অর্থনীতিবিদ-সমাজতাত্বিকেরা ভারি ভারি প্রবন্ধ লিখে বিশ্ববন্দিতসব প্রাইজ কুড়োন, সমাজ সংস্কারের নামে, গ্রাম সমাজকে আরও ইওরোপিয়-আমেরিকিয় করে গড়ে তুলতে উঠতি যুবক যুবতীরা নতুন করে সাগর পারের সমাজ পরিবর্তনের তত্বে দীক্ষিত হয় 

এই মেলার সাত দিনে দেখলাম শঙ্করের বড় বন্ধু হয়ে উঠছেন মেলায় আসা গ্রামের শিল্পী দিদিরা আমার সঙ্গে শঙ্করের যত বন্ধুত্ব, ঠিক তত বন্ধুত্ব বাতসীদি অথবা আরতিদি আথবা দিল্লিদির সঙ্গে। আদতে আজও গ্রামের মেয়েরাই ভারাতীয় সংস্কৃতির প্রায় সবকিছু বয়ে নিয়ে চলেছেন। অসম্ভব মরমী স্বর-এ তারা শোনে শঙ্করের জীবন কথা। সে আক্ষেপে বলছিল তার মৃত বড় দাদার কথা শঙ্করেরা তিন ভাই ১০-১২ বিঘা সম্পত্তি, একটা দোকান, বাবা মা, বড় ভাই, বৌদিদি তাদের বাচ্চা কাচ্চা নিয়ে ভরা সংসার। সে তার এলাকায় প্রায় তারকার মর্যাদা অর্জন করেছে নিজস্ব দক্ষতায় শঙ্কর জানে বোঝে এক জীবনে একজনের এর থেকে বেশি আর কী চাই! আমাদের জীবন খুব সুন্দরভাবে চলছিল আমাকে নিয়ে পরিবারের সব্বাই আর পরিবারের সব্বাইকে নিয়ে আমি ভীষণ সুখী ছিলাম

সময়মত বড় দাদার বিয়ে হল বৌদি সংসারের সঙ্গে মিশে গেলেন আমাদের সংসার যেমন ভাবে চলছিন তেমনিই চলতে লাগল কিন্তু হঠাত দাদার মনে হতে লাগল বাড়ির চাষের, দোকানের রোজগারের তার পোষাচ্ছে না আমি জানি দাদার এই মন বদলে বৌদির হাত ছিল না দাদা পাশের ইটভাটায় কাজ নিল ট্রাক্টর চালানোর বৌদি না চাইলেও উদয়াস্ত খাটুনি যে দাদার পোষাচ্ছে না বোঝা যাচ্ছিল তার স্বাভাবের পরিবরতনে চাষের কাজে আনন্দ আছে, মেসিনের কাজে দুঃখ দিনের শেষে ধুলিধুসরিত শরীর নিংড়ে অর্জিত অর্থ নিয়ে বাড়ি ঢোকা বাড়িতে থেকেও যেন দিন দিন অচেনা হয়ে ওঠে দাদা ট্রাক্টরের সঙ্গে থাকতে থাকতে দাদা মেসিন হয়ে যায় যেন হঠাত একদিন ট্রাক্টরের পেছনে দাঁড়ানো দাদাকে অন্য ট্রাক্টরে পিষে দিল হাসপাতাল পর্যন্ত পৌঁছতে দেয়নি তার আগেই শেষ হয়ে গেল জীবন

বাবা আজ বিছানা শয্যায় বৌদির দীর্ঘশ্বাস আমি আর পারি না শঙ্কর কেঁদে বলে এত টাকার কী দরকারছিল! আমরাতো বেশ সুখে ছিলাম কেন যে দাদার অত টাকার দরকার হল আজও বুঝিনি টাকাই দাদাকে মেরে ফেলল  কে উত্তর দেবে! মেলায় দোকান দিতে আসা শিল্পী মেয়েরা মুখে কাপড় দিয়ে কেঁদে ওঠে। 

নারীবেশের পুরুষত্ব নয়, শঙ্করের পরিবারের জীবনকে ছারখার করেদিল আরও বেশি আরও বেশি চাওয়ার উন্নয়ণ তত্ব এ নিয়ে কোনও গল্প লেখা হবে না, কোনও হাহুতাশ হবে না মেশিন আর আরও চাওয়ার দর্শনেরউন্নয়ণ তত্ত্ব যে আধুনিকতার শহুরে চিহ্নবাহী সেই তত্বে প্রশ্ন তোলার অধিকার কারোর নেই।

তবুও মঞ্চে নারীর বেশ ধরা শঙ্করেরা গ্রামেই সুস্থভাবে বেঁচে থাকে রাতের পর রাত জমিয়ে অভিনয় করে অসামান্য লাস্যে, অদম্য উতসাহে গ্রাম-ভারত সভ্যতার প্রবাহমানতা বয়ে নিয়ে যায় নিজেরমত করে গ্রামীণ এই সভ্যতার অন্যতম ধারকবাহক তারমত অভিনেতারা তার দ্বায়িত্ব বোধহয় সে বোঝে জানে এই বোধই তাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায় মঞ্চে মঞ্চে রাতের পর রাত দাদার মৃত্যুর পর সে বোঝে উন্নয়ণ আসলে মৃত্যুই ডেকে আনে কেউ শরীরে মরে কেউবা মনে

শঙ্করেরা তাদের চোখ দিয়ে দেখে সেই উন্নয়ণ যজ্ঞথেকে গ্রামীণদের চোখ ফেরাবার চেষ্টাকরে নিজেদেরমত করেই খন আর তার অভিনয় প্রকাশভঙ্গী হয়েওঠে আরও ধারালো আরও মায়াময়, জীবনের বড্ড কাছাকাছি সংস্কৃতি যে জীবনেরই প্রকাশভঙ্গী আরও বেশী করে জীবন আঁকড়ে ধরার কাজ সে করে চলে।