Showing posts with label উপনিবেশবাদ বিরোধীচর্চা. Show all posts
Showing posts with label উপনিবেশবাদ বিরোধীচর্চা. Show all posts

Monday, February 20, 2017

উপনিবেশবাদ বিরোধীচর্চা - ভারতীয় অঙ্করচর্চায় বৃহত্তম এবং ক্ষুদ্রতম সংখ্যা গণন

গত কয়েকশ বছর ধরেই ভারতীয় নানান শাস্ত্রে বিপুল বিশাল সংখ্যার আধিক্য নিয়ে পশ্চিমি ঐতিহাসিক, সমাজতাত্ত্বিকেরা খুব হাসাহাসি করেছেন, বাঁকা কথা বলেছেন। প্রয়োগ নেই, মানে নেই এমন কিছু বিশালতম বা ক্ষুদ্রতম সংখ্যা নিয়ে পুরাণকার(আদতে এদেশের ঐতিহাসিকেরা)দের উৎসাহ নিয়ে তাঁদের কটু মন্তব্য বেশ প্রতুলই। যেমন বিনয় ঘোষ/সরকার বা বড় দেবীবাবুর রচনায় পুরাণকারদের ব্যবহৃত এ ধরণের অঙ্ক ব্যবহারের বিরুদ্ধউক্তি আজও পশ্চিমি জ্ঞানচর্চকদের মুখে মুখে ঘোরে। আমরা যারা ছোটবেলা থেকেই পশ্চিমি জ্ঞানচর্চা্র মানুষদের ভারতীয় জ্ঞানচর্চা, ইতিহাসচর্চা বিষয়ে উন্নাসিকতার পরিবেশে শিক্ষিত হয়ে উঠে, নিজেদের(মানে ব্রিটিশপূর্ব) সভ্যতা নিয়ে কথা বলার উৎসাহ, নিজেদের জ্ঞানচর্চা, নিজেদের শিক্ষাপদ্ধতির কথা বলতে গিয়ে রক্ষণশীল হয়ে পড়ি - কেননা সে সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য কেউই প্রস্তুত নই – কেননা সেই আলোচনা খুব একটা এই পরিসরে হয় না।
ভারত শুদ্র সভ্যতার জ্ঞানচর্চার পক্ষে(রামায়ণ এবং মহাভারতের রচয়িতা কিন্তুই শুদ্র) দাঁড়িয়ে একটা কথা বলা দরকার, যে তাঁরা সেই সংখ্যা ভাবার পরিকাঠামো তৈরি করে সেই খুব বৃহত আর খুব ক্ষুদ্র সংখ্যা ভাবার পরিবেশ তৈরি করেছিলেন। এবং পশ্চিম(প্রাতিষ্ঠানিক খ্রিষ্টধর্ম আচারিত অঙ্ক – যাকে আন্তর্জাতিক অঙ্ক নাম দিয়েছে পশ্চিম, যার উৎস নাকি প্রাচীন গ্রিসে, যে গ্রীসে শুন্যের ধারণাটাই ছিল না) বিগত চারশ বছর আগেও যেহেতু শূন্যকে শয়তানের প্রতিভূ বলে মনে করত ফলে সে বিশালতম বা ক্ষুদ্রতম অঙ্কের কাজ করবে কি করে। শেষে ইওরোপ থেকে তাড়িয়ে দেওয়া জেসুইট পাদ্রিদের ভারত সভ্যতা নথি করণে দশমিক অঙ্ক ব্যবস্থা গৃহীত হল। তার পরে ইওরোপে শুরু হল বড় অঙ্ক করার পরবেশ।
ভারতে বড় অঙ্ক ভাবার সেই পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন ছিল কেননা দু সহস্র বছর ধরে ভারত পৃথিবীর ব্যাস বা আলোর গতিবেগ, বিভিন্ন নক্ষত্রের স্থান নির্ণয়, ধুমকেতুর পথ বা দশমিকের পরে ছাপান্নটি সংখ্যায় পাইএর মান নির্ণয় করে ফেলেছে।
তো এই পর্বে আমরা আলোচনা করব কত বড় সংখ্যা নিয়ে ভারতীয় শাস্ত্রবিদেরা আলোচনা করেছেন। সরস্বতী-হরপ্পা সভ্যতায় দশমিক ব্যবস্থার প্রয়োগ শুরু হয়ে গিয়েছে। মাইকেল ড্যানিনো বলছেন, সেই ধ্বংস হওয়া সভ্যতার জ্ঞানচর্চার রেশ চারিয়ে যাচ্ছে তার পূর্বের দিকে গড়ে ওঠা সভ্যতায়। যজুর্বেদে ঘাত হিসেবে এক(১০০) থেকে পরার্ধ(১০১২) পর্যন্ত আলোচনা করা হয়েছে(এই খেয়েছে ১০এর ঘাত বা আজকের ভাষায় টু দ্য পাওয়ার তো লেখা যাচ্ছে না ফেবুতে। পাঠকেরা দয়া করে দশের পরে যে অঙ্কটি আছে সেটিকে তার ঘাত হিসেবে পড়ুন)।
রামায়ণে রাবণের সৈন্য সংখ্যা বলা হয়েছে ১০১২ + ১০৫ + ৩৬(১০১০)। তার বিপরীতে যে সৈন্য বাহিনী রাম দাঁড়িয়ে রয়েছে তার সংখ্যা হল ১০১০ + ১০১৪ +১০২০ + ১০২৪ + ১০৩০ + ১০৩৪ + ১০৪০ + ১০৪৪ + ১০৫২ + ১০৫৭ + ১০৬২ + ৫ জন। এই প্রত্যেকটি ঘাতের নাম দেওয়া হয়েছে।
এর সঙ্গে গ্রিক সভ্যতার বড় সংখ্যার তুলনা করুণ ১০৪ এর ওপরে তাঁদের সংখ্যার নামই নেই – সাধে কি আর বার্ণল সাদা গ্রিস সভ্যতা নিয়ে হেসেছেন – আর বাংলার নাট্য বা জ্ঞনচর্চায় গ্রিসের নামে শিক্ষিত ভদ্রলোকেদের দুই কর জোড় হয়ে মাথায় উঠে যায়।
বা জৈন অঙ্কে আরও বড় সংখ্যা আলোচনা করা হচ্ছে ১ পূরবী = ৭৫৬ গুণ ১০১১ দিন; আর ১ শীর্ষ প্রহেলিকা = ৮৪০০০০০২৮ পূরবী(২৮ টা হল ৮৪০০০০০ ঘাত)। হিসেব করলে দেখা যাবে শীর্ষ প্রহেলিকায় রয়েছে ১৯৪টা সংখ্যা। আজও আমরা প্রহেলিকা শব্দটা ব্যবহার করি তার সূত্র না জেনেই।
১০ ঘাতের ক্রমাংক ধরে অতীত ভারতে প্রত্যেকটির নাম তৈরি করা হয়েছেল। আজকে যেমন আমরা খুব সহজেই ১৬৪৮৩৭৬কে ভেঙে বলতে পারি ১৬ লক্ষ ৪৮ হাজার তিনশ ছিয়াত্তর। যে ক্রমাঙ্কে সঙ্খ্যাগুলি বসেছে, সেটির একটি ওলটপালট হয়ে গেলেই গোটা সঙ্খ্যাই পালটে যাবে – এবং এই ব্যবস্থায় আসতে কত সহস্র বছর কেটেছে আমরা আজ হয়ত জানি না, বুঝিই না। এবার শুধু ভাবুন যে গুণীরা অতীত ভারতীয়দের বড় সংখ্যা ভাবা নিয়ে আজও কটাক্ষ করে চলেছেন, তাঁদের প্রিয় সভ্যতার রোমিয় অক্ষর দিয়ে যদি আমাদের আলোচ্য এই ছোটতম ১৬৪৮৩৭৬ সঙ্খ্যাকে প্রকাশ করতে হত? সেটা সাতটা সঙ্খায় আবদ্ধ থাকত না সাতের কয়েকশ গুণ সংখ্যা ব্যবহার করতে হত।
যেমন প্রথমে ভূত-সংখ্যা ৯টি সঙ্খার নাম দেওয়া হল। তাকে মনে রাখার জন্য জুড়ে দেওয়া হল প্রাত্যহিক জীবনে ব্যব্যহৃত কিছু ছবি/ধারণা। এক সূর্য/চন্দ্র, ২ পক্ষ/চোখ, ৩ নেত্র(শিবের), চার বেদ ইত্যাদি – এগুলিকে পর পর বসিয়ে পাওয়া যেত অঙ্ক বেদ সূর্য পক্ষ হল ২১৪(অঙ্কস্য বামগতি ধরে)। পরে এ নিয়ে আরও কথা বলা যাবে –ভারতে কোন কিছুরই স্টন্ডার্ডাইজেশন করা হয় নি - পক্ষ কোন জ্ঞানচর্চায় ২ আবার কোন জ্ঞানচর্চায় ১৫ রূপে ব্যবহৃত হত – এই বৈচিত্রতে ভারত সভ্যতা বেড়ছে, জোরদার হয়েছে। এর পর দশের সঙ্গে ১, ২, ৩ গুণ করে পেলাম দু সংখ্যার দশ, বিশ, ত্রিশ, চল্লিশ ইত্যাদি। এর পরে ১০এর ঘাতে ব্যবহৃত হল ১, ২, ৩ তৈরি হয়ে এল শত, সহস্র, আযুত, নিযুত, প্রযুত, অর্বুদ, নির্বুদ, সমুদ্র, মধ্য, অন্ত্য, পরার্ধ ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি। এই নামগুলির মধ্যে আমরা কিন্তু অঙ্ক ক্রিয়ারও নাম দিলাম যেমন ৫০-১ উনপঞ্চাশ।
এই নামগুলি দেওয়ার বড় কারণ হল মৌখিক জ্ঞানচর্চাকে সম্মান জানানো। আজ যেমন সাধারণ অঙ্ক করতে আমরা ক্যালকুলেটর ব্যবহার করি, সেকালে কেন কয়েক দশক আগেও এমনকি শহরেও অঙ্কের সূত্রগুলি ধরে সাধারণ মানুষ মৌখিকভাবেই মানসাঙ্ক করতেন। তার জন্য খাতা কলমের আয়োজনের প্রয়োজন পড়ত না। যে মানুষটা্র ওপর নির্ভর করে বণিকেরা সমুদ্রে ভেসেছেন বিপুল সম্পদ নিয়ে, তিনি কলণবিদ্যা অনুসরণ করে মানসাঙ্কতেই সূর্যের রশ্মির নতি মেপে নৌবহরটার দিক নির্ণয় করতেন, আর ছিল কমল নামক একটি যন্ত্র। ব্যাস।
এই দক্ষতা আর জ্ঞানচর্চা হাতিয়ার করে খাল কেটে ইওরোপিয় কুমির এনেছিল মালামো কানা, মেলিন্দে থেকে গোয়ায়।

Monday, February 29, 2016

উপনিবেশবাদ বিরোধীচর্চা - আর্যভট থেকে আম্বেদকর৩



কোন গবেষক যদি ‘সঠিক’তার দাবি করা উইকিপিডিয়ায় আর্যভট বিষয়ে দেখতে যান তাহলে কিন্তু কোথাও তাঁর জাত সম্বন্ধে একটা কথাও বলা নেই - বরং তিনি যে উপবীতধারী ব্রাহ্মণ, তাঁর চিহ্নওয়ালা একটা মূর্তির ছবি ছাপা হয়েছে সেখানে। পরোক্ষে বলে দেওয়া হয়েছে তাঁর জাত কি, যেভাবে পাঠ্য অঙ্কপুস্তকে কালো গ্রিসের অঙ্কচর্চকদের ককেসাসিয় চেহারার দেখানো হয়। Inter University Centre for Astronomy and Astrophysics (IUCAA), Puneতে এই অনৈতিহাসিক মূর্তিটি রাখা হয়েছে। রাজুজী বলছেন, IUCAAর জনসংযোগ আধিকারিক তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রশ্ন করেন আর্যভট পৃথিবীকে কোথায় কদম্বাকার বলেছেন তাঁর উল্লেখ জানতে। তিনি তাঁর যথাবিহিত উত্তর দিয়ে বললেন যে তাঁর নামের বানানটা যেন ঠিক করে নেওয়া হয়। সেই আধিকারিক তাঁকে জানালেন সংস্থার প্রতিষ্ঠাকার জয়ন্ত বিষ্ণু নার্লিকর তাঁকে ঠিক বানানটি জানিয়েছেন। তার উত্তর যখন রাজুজী তাঁকে প্রশ্ন করলেন, তাহলে কেন নার্লিকর সম্পাদিত পাঠ্য পুস্তকে আর্যভটের নাম বিকৃত ছাপা হয়েছে, তিনি সেই প্রশ্ন এড়িয়ে যান।

IUCAAসূত্রে উইকিপিডিয়ায় যে ছবিটি ব্যবহার করা হল তাতে একটাই বার্তা গেল ভারতীয় বিজ্ঞানচর্চায় দলিতদের/অব্রাহ্মণদের কোন স্থান ছিল না। ব্রিটিশ অনুগামীরা নতুন ধরণের জাত ব্যবস্থা ভারতে পত্তন করলেন। মেকলে এবং মার্ক্স-এঙ্গেলসদের হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত জ্ঞানে বিজ্ঞানে প্রযুক্তিতে উপনিবেশ উন্নত ছিল – যার তাত্ত্বিক প্রতিধ্বনি বিদ্যাসাগর এবং রামমোহন রায়ের কাজে ছড়িয়ে পড়েছে নব্য জ্ঞানচর্চায় এবং তাঁরা দেশজ পড়াশোনা ছেড়ে ঔপনিবেশিক বিজ্ঞান পড়ানোর দাবি করছেন বুক বাজিয়ে। বা জেসুইট পাদ্রিরা কনণবিদ্যার অক্ষহৃদয় না বুঝেই নকল করে আর্যভটের হাতে শুরু হওয়া বিদ্যাটিকে ইওরোপে নিয়ে গেলেন। তখনকার শ্রেষ্ঠ ইওরোপিয় মাথা, দেকার্ত আর নিউটন সেটাকে বুঝতেই পারলেন না। এ প্রসঙ্গে রাজুজীর অসাধারণ স্তবকটি তুলে দেওয়ার লোভ সামলাতে পারছি না - In the spirit of Kant, a reverse racist might say white-skinned people lacked the brains. However, the inferior Western misunderstanding of the calculus, coated with a redundant Western metaphysics, is what is taught in our universities today. Academics (mostly Western dominated) are unwilling to discuss publicly the claim why Western calculus is superior. The claim of superiority will fall to pieces if discussed publicly

আবেদন নতুন করে ভাবি। নতুন করে আমাদের পূর্বজরা যে সভ্যতা তৈরি করে গিয়েছেন তার জোরের জায়গা আলোচনা করি। তবেই তৈরি হবে আন্দোলনের ভিত। নয়ত ফক্কা।

উপনিবেশবাদ বিরোধীচর্চা - আর্যভট থেকে আম্বেদকর২



ভারতের অঙ্ক দর্শন এবং ইতিহাসকার চন্দ্র কান্ত রাজুর দারুণ একটা দুপাতার হিন্দি প্রবন্ধ দলিত ঔর বিজ্ঞান। যদিও আমরা পশ্চিমি মতে ভারতীয় ইতিহাসে যুগ বিভাজনে বিশ্বাস করি না, বলতে পারি প্রাচীন থেকে মধ্যযুগে বাংলার দলিতেরা শুদ্ররা মূলত তান্ত্রিক, বৌদ্ধ, এবং পরে ইসলামি রাজত্বের অংশ হয়ে ঈর্ষনীয় বৌদ্ধিক, কৃষ্টিগত এবং অকেন্দ্রিভূত উৎপাদনভিত্তিক বিশ্বজোড়া বাণিজ্য বিকাশের স্তরে পৌছে ছিল। রাজুজী তাঁর কালচারাল ফাউন্ডেশন অব ম্যাথেমেটিক্স শুরুই করছেন আর্যভট(এই নামের বুৎপত্তি নিয়ে কয়েকদিন আগেই একটা প্রকাশনা দিয়েছিলাম। আশাকরি সেটি মাথায় রয়েছে – শুধু বলি, ক্ষমতায় থাকা মানুষজন যখন আর্যভটকে সুচতুর ভাবে আর্যভট্ট বলতে শুরু করে, সেই উচ্চারণকে পাঠ্যপুস্তকের অংশ করে দেন তখনই ইতিহাসকে নতুন করে দেখতে হয়)এর জ্ঞানচর্চার অবদান দিয়ে। তিনি বিলছেন, আর্যভট used a numerical technique of solving differential equations to compute precise sine values। আজও মঙ্গলে চন্দ্রযান পাঠাতে সেই পদ্ধতিতেই গণনা করতে হয়। এবং আর্যভট প্রথম গোল পৃথিবীকে তুলনা করেছেন কদম্বের সঙ্গে তাঁর গোলধ্যায়৭এ।

গত কয়েক দশকে ঔপনিবেশিক পশ্চমি লুঠেরা বড় পুঁজি নির্ভর কেন্দ্রিভূত প্রযুক্তি/বিজ্ঞানকে উচ্চতর বিশ্বজ্ঞনের শ্রেণীতে ফেলে ভারতীয় জ্ঞান-বিজ্ঞানকে দেশজ জ্ঞান হিসেবে দাগিয়ে দিয়েছে এবং এটি আমরা সোনা মুখে মেনে নিয়েছি, ঠিক যেমনভাবে ভুলে ভরা পশ্চিমে কলণবিদ্যাকে উচতর জ্ঞানার্জন বলা হয়েছে। এই যুক্তিতে বলা হচ্ছে নিম্নবর্ণের ভাগ্যভাল তাঁরা এই উচ্চজ্ঞানচর্চার বেদীতে আরোহন করছেন। অর্থাৎ কেউ কেউ সফল হচ্ছেন মাত্র, সেটি নিয়ম নয়। কিন্তু ভারতে আর্যভট একমাত্র অউচ্চবর্ণ ছিলেন না। বলা যাবে না তিনি দলিত হিসেবে ভারতীয় জ্ঞানচর্চায় ব্যতিক্রম ছিলেন। ঠিক তাঁর পাঁচ দশক পরে আবির্ভূত হয়েছিলেন দ্বিতীয় আর্যভট। কৌসাম্বী বা আম্বেদকরের মতে এই সময়ে কিন্তু মনুস্মৃতি সঙ্কলিত হচ্ছিল। তবুও কিন্তু দ্বিতীয় আর্যভট তৈরি হয়েছিলেন। আর পঞ্চম শতের পাটনার আর্যভটের অনুগামী হিসেবে ১৫শ শতে এলেন দক্ষিণ ভারতের উচ্চতম জাতের নাম্বুদ্রি ব্রাহ্মণ, যিনি আর্যভট পদ্ধতির অঙ্কবিদ্যাকে চারিয়ে নিয়ে গেলেন নতুন উচ্চতায়। নীলকান্তের পুঁথি শীর্ষক সোমস্তুভমএ তিনি আর্যভট সম্বন্ধে ভাষ্য লিখছেন। আমাদের নতুন করে ঔপনিবেশিক সময়ের তৈরি করা বিভাগকে নতুন করে ভাঙ্গার চিন্তা করতে হবে যেখানে বলা হয়েছে ভারতের জ্ঞানচর্চায় দলিতদের স্থান ছিল না, এবং দুস্তর ভৌগোলিক ব্যবধান ছিল বিন্ধ্যর দুপাশে।

ভারতে জাতিভেদ একটা বাস্তব কাঠামো। সেটা যেমন বাস্তব, তেমনি ভারতীয় জ্ঞানচর্চায়, উতপাদন-বিতরণ ব্যবস্থায় অউচ্চবর্ণের, দলিতদের অবদান উচ্চবর্ণদের থেকে অনেক বেশি। সেটা আরও ঘোর বাস্তব। গত প্রকাশনায় বাংলার উৎপাদন-বিতরণ, জ্ঞানচর্চার পরিবেশ বর্ণনাতে তা কিছুটা চুম্বকে বলা গিয়েছে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতা এবং তার ধ্বজাধারীদের জ্ঞানচর্চায় নব্য পশ্চিমি জ্ঞানচর্চকদের সূত্রে ভারতে এক্কেবারে অন্য ধরণের জাতিবাদী আখ্যান তৈরি হল। যে ভিত্তিভূমি গড়ে গিয়েছিলেন পূর্বের অব্রাহ্মণ জ্ঞানতাত্ত্বিকেরা, সেই ভিত্তিভূমিকে অস্বীকার করার প্রবণতা শুরু হল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার ছাতায়।

তাঁর জ্বলন্ত উদাহরণ হয়ে উঠলেন আর্যভট। তাঁর জাতি চরিত্র পালটে ফেলার উদ্যম গ্রহণ করা হল। নামের বানান উদ্দেশ্যপূর্ণভাবে পাল্টে দিয়ে তাঁকে দেখানো হল ব্রাহ্মণ রূপে। ব্রহ্মগুপ্ত কিন্তু তাঁর গুরুর নাম আর্যভট লিখেছেন অন্তত একশ বার তাঁর রচনায়। যে মানুষটি পাইএর মান নির্ণয় করলেন, দশমিক ব্যবস্থাকে জোর ভিত্তি দিলেন, আর্ভটিয়া লিখলেন, আল খোয়ারজমি যার নাম উল্লেখ করেছেন তাঁর রচনায়, যিনি সাইন(জ্যা), কোসাইন(কোজ্যা), ভারসাইন(উতক্রমজ্যা), ইনভার্সসাইন(অতক্রম জ্যা), সাইন নামতা(টেবল) নয়, দশমিকের পরে, শুন্য থেকে নব্বই ডিগ্রি পর্যন্ত ৩.৭৫ ডিগ্রি অন্তরে ভার্সসাইন (1 − cos x) তালিকা সঠিক চার সংখ্যা পর্যন্ত গণনা করেছিলেন, আজও মঙ্গলগ্রহে উপগ্রহ পাঠানো হয় আর্যভটের অঙ্ক কষার পদ্ধতিতে, সেই মানুষটার জাতি চরিত্র পাল্টে দিলেন আধুনিক ভারতের জ্ঞানচর্চকেরা।

Sunday, February 28, 2016

উপনিবেশবাদ বিরোধীচর্চা - আর্যভট থেকে আম্বেদকর১




কয়েকদিন আগেই পড়ছিলাম সঞ্জয় পাসোয়ানের কালচারাল ন্যাশনালিজম এন্ড দলিত বইটি। আমরা, বঙ্গীয় পারম্পরিক কারু ও বস্ত্র শিল্পী সংঘ বা গঠিত হতে চলা উইভার, আরটিজান ট্রাডিশনাল আর্টিস্টস গিল্ডের সদস্য, যারা গ্রামজ উতপাদন ব্যবস্থা, প্রযুক্তি আর সংগঠন বিষয়ে অল্পস্বল্প নজর দিয়েছি। আমাদের পথচলা দর্শনের সঙ্গে, এই বইটির ভাষ্য কিছুটা হলেও মিলে যায়। তাঁর বক্তব্য ব্রিটিশ উপনিবেশপূর্ব সময়ে ভারতে দলিতদের অবস্থান খুব খারাপ ছিল না – এই ভাষ্যে কিন্তু তিনি জাত ব্যবস্থায় কোনভাবেই উচবর্ণের অবস্থান সমর্থন করছেন না - আমরাও। তিনি বাল্মিকী, বেদব্যাস, কবীর থেকে রবিদাসের জীবনী আলোচনা করেছেন। দক্ষিণের এজাভা পরিবারের নারায়ণ গুরুর কথা এ প্রসঙ্গে বলা যায়। আমরা এখানে বাংলার নানান সম্প্রদায়ের কথা বলতে পারি। সঞ্জয়জী জোর দিচ্ছেন এডাম সমীক্ষার বাংলা-বিহারের শিক্ষা ব্যবস্থার তথ্যে, যেখানে তথাকথিত বর্ণাশ্রমের উপরের দিককার মানুষদের থেকে সংখ্যাগরিষ্ঠ শিক্ষক-ছাত্র ছিলেন দলিত মানুষেরা।

আজ ভারতে দলিত আন্দোলন নতুন উচ্চতায় পৌঁছচ্ছে। অনাচারের বিরুদ্ধে লড়াইটা তো করতেই হবে, তার আগে প্রয়োজন আমার কি ছিল, সে বিষয়ে নিরন্তর আলোচনা, যার একটি ঝাঁকি আমরা সঞ্জয় পাসোয়ানজীর বইটিতে পেয়েছি, নিজেরা আলোচনা করছি পরম নামক এক চটি মাসিক পত্রিকায়। কি হারিয়েছি, তার হাহুতাশ তো আছেই। কিন্তু যে কেন্দ্রিভূত দর্শনের জাতিবিদ্যা তৈরি হয়েছে ভারতে বিগত কয়েক শতক ধরে ঔপনিবেশিক জ্ঞানচর্চায়, তাকে সবার আগে প্রশ্ন করতে হবে। হাজার হাজার বছর ধরে বিকেন্দ্রীভূত, বৈচিত্র্যময়, আসাধারণ এক সভ্যতার ভিত্তিভূমি গড়ে তুলেছেন মূলত দলিতেরা – তাই ভারত সভ্যতা শুদ্র সভ্যতা – দলিত সভ্যতা – এটা বলতে হবে। তাঁরাই পারেন কেন্দ্রীভূত ক্ষমতাকে নিজেদের দর্শন দিয়েই প্রশ্ন করতে। বড় পুঁজির দর্শনের ভেতরে দাঁড়িয়ে তা হয়ত হবে না। নতুনভাবে দেখতে হবে বড় পুঁজি ভিত্তিক লুঠেরা পশ্চিমি গণতন্ত্র, বিজ্ঞান, সমাজতত্ত্বের ভিত্তিকে – নিজেদের তৈরি পঞ্চায়েতি গণতন্ত্র, নিজেদের বিকশিত জ্ঞানচর্চার মহিমা দিয়ে। ভারতে তৃণমূল স্তরে আজও সেই দর্শনে টিকে থাকার উদ্যম রয়েছে।

দুঃখের বিষয় সেই উদ্যমের অভাব রয়েছে ইংরেজি শিক্ষিতদ দলিত নেতৃত্বের মধ্যে। তাঁদের অধিকাংশই বড় পুঁজির তৈরি করা বিজ্ঞনের অংশ হতে চান, হতে চান এই উৎপাদন ব্যবস্থার একটি শৃঙ্খল। বিনীতভাবে বলার চেষ্টা করব শিক্ষিত দলিত নেতাদের এই তাত্ত্বিক অবস্থানে বড় পুঁজিরই লাভ – যখন তাঁরা বলেন ‘একবিংশ শতাব্দীর জ্ঞান-বিজ্ঞানের এই চরম উৎকর্ষের যুগে সমাজ ও সভ্যতায় অভূতপূর্ব বিপ্লব ঘটেছে। সমাজের সাধারণ মানুষের চিন্তা-চেতনার ক্ষেত্রও প্রসারিত হয়েছে বহুল্যাংশে। আজ প্রত্যন্ত-অজপাড়াগাঁয়ে বসবাসকারী নিতান্ত আখ্যাত, হত-দরিদ্র মানুষও আগামী দিনে উন্নত সভ্যতার সংস্পর্শে এসে নিজের জীবন গড়ার স্বপ্ন দেখে... ইত্যাদি(সমাজ বিপ্লবে মতুয়াধর্ম, কপিলকৃষ্ণ ঠাকুর, সঙ্ঘাধিপতি, মতুয়া মহা সংঘ, শ্রীশ্রীহরিচাঁদ ঠাকুর স্বর্ণ-সংকলন, পাতা ১৭)’। এ নিয়ে এখন তর্কে প্রবেশ করব না। তোলা রইল।

ভারতকে দলিত সভ্যতা বলতে গেলে নিজেদের জোরের জায়গা, কেন আমরা আলাদা, আমরা কি গড়ে তুলেছিলাম, সেটা জানাতে হবেই। ‘উন্নত সভ্যতা’বিশিষ্ট ‘একবিংশ শতাব্দীর জ্ঞান-বিজ্ঞানের এই চরম উৎকর্ষের’ কেন্দ্র বড় শরিকের দর্শনের অনুবর্তী হয়ে হাতেগোণা মানুষ হয়ত স্বচ্ছল থাকতে পারবেন, পিঠ চাপড়ানি পাবেন, কিন্তু নিজস্ব সভ্যতার যে পরিচয় গড়ে উঠেছিল কয়েক সহস্র বছর ধরে, সেই পরিচয় তৈরি হবে না।