Showing posts with label সোনার বাঙ্গলা. Show all posts
Showing posts with label সোনার বাঙ্গলা. Show all posts

Wednesday, September 4, 2013

সোনার বাঙ্গলা – নিখিলনাথ রায়৬, Sonar Bangla - Nikhilnath Ray6

বার্ণিয়ের ন্যায় টাভার্ণিয়েও বাঙ্গলার অনেক পণ্যদ্রব্যের বিষয় উল্লেখ করিয়াছেন। তিনি প্রথমত ইহার রেশমের বিষয় উল্লেখ করিয়া বলিয়াছেন যে, ইহার অন্তর্গত কাশিমবাজার হইতে বিশহাজার গাঁইট রেশমের রপ্তানী হয়। ওলান্দাজগণ ছয় সাত হাজার গাঁইট চালান দিয়া থাকে। তাতার দেশীয় ও অন্যান্য বণিকেরাও ইহার ব্যবসায় করিয়া থাকে, এই সমস্ত রেশম গুজরাট, আমেদাবাদ ও সুরাট প্রভৃতি স্থানে প্রেরিত হয় এবং এতদ্দেশে তদ্দারা বস্ত্রাদিও নির্ম্মিত হইয়াথাকে। কাশীমবাজারবাসিগণ তাহাকে শ্বেতবর্ণ করিয়াও থাকে। ওলান্দাজেরা সেই সমস্ত রেশম হুগলী পর্য্যন্ত লইয়া গিয়া জাহাজে বোঝাই করে। বঙ্গদেশে সাদা কার্পাসথানও প্রস্তুত হয়। এখান হইতে নীলেরও রপ্তানী হইয়া থাকে। বঙ্গদেশে লাক্ষাও জন্মে। তদ্দারা বস্ত্রাদি রঞ্জিত হয়। এখান হইতে অনেকপরিমাণ চিনির রপ্তানী হইয়া থাকে। হুগলী, পাটনা, ঢাকা প্রভৃতি স্থানে তাহার বাণিজ্য হয়।
বার্ণিয়ে ও টাভার্ণিয়ের বর্ণনা হইতে অবগত হওয়া যায় যে, তৎকালে ইউরপিয়গণের মধ্যে ওলান্দাজগণই বঙ্গদেশে অধিক পরিমাণে বাণিজ্যকার্য্যে লিপ্ত ছিল। কিন্তু তৎকালে ইংরেজ প্রভৃতি অন্যান্য ইউরোপীয় বণিকগণও এতদ্দেশের সহিত বাণিজ্যকার্য্যে প্রবৃত্ত হইয়াছিল। ইংরাজদিগের বাণিজ্যকার্য্যের বিষয় ও তাহাদের দ্বারা কিরূপে এতদ্দেশের বাণিজ্যের স্রোত রুদ্ধ হইতে আরম্ভ করে, আমরা আরও সে বিষয়ের উল্লেখ করিব (কিন্তু আমরা, লোকফোক তার পুস্তকের এই অংশ অন্ততঃ এই বার প্রকাশ করছি না); 
ইংরাজরা এতদ্দেশে বাণিজ্যার্থে উপস্থিত হইলে তাহাদের বহুসংখ্যক বাণিজ্যজাহাজ বঙ্গদেশে আগমণ করিত এবং তাহা পণ্যদ্রব্যে পরিপুর্ণ হইয়া দেশবিদেশে প্রেরিত হইত। এই সমস্ত জাহাজের আরোহিগণ বঙ্গদেশের যেরূপ বিবরণ প্রদান করিয়াছেন, তন্মধ্যে টমাস-বাউরী নামক একজন কাপ্তেনের বর্ণনা আমরা এস্থলে উদ্ধৃত করিতেছি। বাউরী ১৬৬৯ হইতে ৭৯  পর্য্যন্ত এদেশে অবস্থিতি করিয়াছিলেন।
বাউরী বলিয়াছেন তাঁহার সময় বাঙ্গলা অত্যন্ত সমৃদ্ধিশালী হইয়া উঠিয়াছিল। গঙ্গা ও তাহার শাখানদীসমূহের তীরবর্ত্তী গ্রাম ও শস্যশ্যামল ভূমিতে ইক্ষু, কার্পাস, লাক্ষা, মধু, মোম, ঘৃত, তৈল, ধান্য, বুট প্রভৃতি অনেক পণ্যদ্রব্য জন্মিত। ইংরেজ ওলান্দাজ ও পর্টুগিজগণের ক্ষুদ্র ও বৃহৎ জাহাজসমূহ এই সমস্ত দ্রব্যে পরিপূর্ণ হইয়া ভারতের নানা স্থানে, পারস্য, আরব, চীন ও দক্ষিণসমুদ্রের অভিমুখে যাত্রা করিত। এই সমস্ত পণ্যদ্রব্য ব্যতিত নানাপ্রকার কার্পাসনির্ম্মিত থান ও ছিট, রুমাল, রেশম, রেশমীবস্ত্র, অহিফেন, মৃগনাভি, লঙ্কা প্রভৃতি দ্রব্যও উৎপন্ন হইত। নবাব সায়েস্তা খাঁ এবং বণিক্‌গণ ঢাকা, বালেশ্বর, পিপলী প্রভৃতি স্থান হইতে বংশতি পালের জাহাজ বণিজ্যার্থে সিংহল, টেনাসরিম প্রভৃতি স্থানে প্রেরণ করিতেন। ঐ সমস্ত জাহাজ হস্তী আনয়ণ করিত ও মালদ্বীপ হইতে কড়ি প্রভৃতি আনিত। বাউরী কাশীমবাজারকে বাঙ্গলার সর্ব্বপ্রধান বন্দর বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। ইহার আড়ঙে সর্ব্বপ্রকার পণ্যদ্রব্যের আমদানী রপ্তনী হইত বলিয়া তিনি বর্ণনা করিয়াছেন।

এইরূপে বঙ্গভূমি বহু প্রাচীন কাল হইতে ধনধান্যে পরিপুর্ণ হইয়া বাণিজ্য ও স্বাস্থ্যগৌরবে প্রকৃত সোনার বাঙ্গলারূপেই পরিচিত ছিল। স্বাধীন হিন্দু নরপতিগণের রাজত্বাবসান হইলেও বঙ্গভূমিতে অন্নের হাহাকার পড়ে নাই। মুসলমানরাজত্বকালেও সোনার বাঙ্গলার মস্তকে অশেষ কল্যাণ বর্ষিত হইত। নবাব সায়েস্তা খাঁ ও সুজাউদ্দীনের সময় টাকায় ৮ মণ ও মুর্শিদকুলী খাঁর সময় টাকায় ৪ মণ চাউল বিক্রীত হইত। তখনও ইহার শিল্পবাণিজ্যগৌরব সমগ্র এশিয়া ও ইউরোপের বিস্ময় উৎপাদন করিত। ইহার হিন্দু অধিবাসিগণের বাসভবনের অদূরে মুসলমানগণ বাস করিয়া সানন্দে কালযাপন করিত। ধর্ম্মবিদ্বেষ প্রথম কিছুকাল উভয়জাতির হৃদয়ে নানা তরঙ্গের উদয় করিয়াছিল বটে, কিন্তু পরিণামে শান্তভাব ধারণ করে। উভয়জাতির নানা সম্প্রদায় আপন আপন জাতীয়ব্যবসায় অবলম্বন করিয়া উদারন্নের ব্যবস্থা করিয়া লইত। এই উভয় জাতির হস্তপ্রসূত অসংখ্য পণ্যদ্রব্য অর্ণবযানে দেশবদেশে নীত হইত। সর্ব্বাপেক্ষা কার্পাসসূত্র হইতে তন্তুবায় ও ব্রাহ্মণ পরিবার পর্য্যন্ত যথাসাধ্য চেষ্টা করিতেন। কৃষকেরা ইহার চাষে, তন্তুবায়েরা বস্ত্রবয়নে, আর অন্যান্য জাতি ইহার সূত্রকর্ত্তনে নিযুক্ত হইত। প্রত্যেক সাধারণ গৃহস্থের ভবনে কার্পাসবস্ত্রবয়নরূপ মহাযজ্ঞের জন্য অল্পবিস্তরায়জন হইত। অন্যান্য দ্রব্যেরও কৃষি ও শিল্পে ইহার অধিবাসিগণ মনোযোগ দিত। তাই বঙ্গভূমি শস্যশ্যামলা ও শিল্পবাণিজ্যগৌরবে গরীয়সী ছিল। ইহার প্রত্যেক গ্রামে স্বাস্থ্যের কল্যাণকারী ছায়া বিস্তৃত হইত। শ্যামল বৃক্ষরাজির তলে বসিয়া পল্লীবাসিগণ শারীরিক পরিশ্রমে আপনাদের জীবিকার উপায় করিত। বর্ত্তমান সময়ের বাঙ্গলির ন্যায় তাঁহারা শীর্ণদেহ ও কঙ্কালাবশেষ ছিল না। তাহাদের বাহুতে অপরিসীম শক্তি ছিল। সময়ে সময়ে তাঁহারা সে বাহুবলের পরিচয়ও প্রদান করিয়াছে। একদিন তাঁহারা আপনাদের বাহুবলের পরিচয় করিবার জন্য পাঠান, মোগল, মগ ও ফিরিঙ্গির সহিত অসি যুদ্ধ ও অগ্নিক্রীড়া করিয়াছিল। ইহা কাহিনী নহে ইতিহাস। মুসলমান ও পাশ্চাত্য লেখকগণ বাঙ্গলার এই বাহুবলের কথা মুক্ত কণ্ঠে স্বীকার করিয়াছেন। ভারতের ইংরেজশাসনকর্ত্তগণ বাঙ্গালীর যে অপবাদ দিয়া জগতের সমক্ষে তাঁহাদিগকে হেয় বলিয়া প্রচার করিয়া থাকেন ইতিহাস তাহা স্বীকার করে না। বাঙ্গালীর এরূপ অধঃপতনের কারণ ভারতে ইংরেজশাসননীতি ও আমাদের চিত্তদৌর্বল্য। যে বাঙ্গালিগণ স্বর্গীয় স্বাস্থ্যে বলশালী হইয়া দুর্ধর্ষ শত্রুগণের সম্মুখীন হইতে পশ্চৎপদ হইত না, আজ তাঁহারা কঙ্কালাবশেষ প্রেতমূর্ত্তি ব্যতীত আর কিছুই নহে, যাহার প্রত্যেক পল্লীতে শান্তিদেবী বিরাজ করিতেন, যাহার গৃহ হইতে এককালে রামায়ণ, চণ্ডী ও কীর্ত্তনের আনন্দগীতি অনন্ত আকাশ স্পর্শ করিবার জন্য উত্থিত হইত, আজ তাহা শৃগাল পেচকের ধ্বনিতে মুখরিত, যাহার পল্লীললনাগণ স্বদেশী বস্ত্রের অন্তরাল হইতে আপনাদের লাবণ্যবিকাশ করিয়া দেবীমূর্ত্তিরূপে বিরাজ করিতেন, আজ বিদেশীয়বস্ত্রে তাঁহারা আপনাদের কর্কশকায় আবরণ করিবার জন্য ব্যগ্র! যাহার প্রত্যেক নগরে ও গ্রামে হাস্যমুখ অধিবাসিগণ স্ব স্ব জাতি ও সম্প্রদায়ানুমোদিত কৃষি, শিল্প ও বাণিজ্যে স্বচ্ছন্দচিত্তে বাস করিত, এক্ষণে তাহার সর্ব্বত্র উদরান্নের সংস্থানের জন্য হাহাকারের রোল উঠিয়াছে, আজ জীবন সংগ্রামে সকলেই আহত। কোথায় সে স্বাস্থ্য, কোথায় সে শান্তি, কোথায় সে কল্যাণ! আজ সোনার বাঙ্গলা শ্মশান ভূমি! কেন এমন হইল, আমরা পরে তাহার উল্লেখ করিতেছি। 

সোনার বাঙ্গলা – নিখিলনাথ রায়৫, Sonar Bangla - Nikhilnath Ray5

বাদশাহ সাহজাহানের রাজত্বকালে সুপ্রসিদ্ধ ফরাসী পরিব্রাজক বারণিয়ে ও টাভার্‌নিয়ে ভারতবর্ষে আগমন করিয়াছিলেন। তাঁহারা আরঙ্গজেবের রাজত্বকালেও অবস্থিতি করিয়াছিলেন। উভয়েই বঙ্গদেশে আগমন করিয়া তাঁহার বিশেষরূপ বিবরণ প্রদান করিয়াছেন। বারণিয়ে বঙ্গভূমিকে প্রকৃত সোনার বাঙ্গলা বলিয়া বর্ণনা করিয়াছেন। তিনি বলেন যে, মিশর চিরদিন হইতে জগতের মধ্যে সৌন্দর্য্যশালী ও শস্যপূর্ণ বলিয়া বর্ণিত আসিতেছে। কিন্তু বঙ্গদেশই সেই প্রশংসা পাইবার যোগ্য। এই দেশে অপর্য্যাপ্ত পরিমাণে ধান্য উৎপন্ন হয়, এবং তাহার নিকটস্থ ও দূরস্থ দেশ সমুহে তাহা নীত হয়। গঙ্গার দ্বারা পাটনা পর্য্যন্ত এবং সমুদ্রের দ্বারা মছলীপত্তন ও করমন্ডল উপকূলের অনেক স্থানে ইহার রপ্তানি হয়। তদ্ভিন্ন সিংহল, মালদ্বীপ ও অন্যান্য রাজ্যেও নীত হইয়া থাকে। বাঙ্গালায় অনেক পরিমাণে চিনি প্রস্তুত হইয়া থাকে, তাহা গোলকুণ্ডা, কর্ণাট, এনং মোচা, বসরা হইতে আরব মেসপটেমিয়া ও বন্দর আব্বাস হইতে পারস্য দেশে নীত হয়। এখানে নানা প্রকার মিষ্টান্ন প্রস্তুত হইয়া থাকে। পর্টুগিজগণই তাহা বিশেষরূপে প্রস্তুত করিয়া তাঁহার ব্যবসায় করিয়া থাকে। এতদ্ভিন্ন জামীর, শতমূল বা অনন্তমূল, আম, আনারস, হরীতকী, লেবু ও আতার মোরব্বা প্রস্তুত করে। বাঙ্গলায় গমও উৎপন্ন হইয়া থাকে, এবং ইউরোপীয় জাহাজের অধিবাসীগণ তদ্দারা আপনাদের খাদ্যদ্রব্য প্রস্তুত করিয়া থাকে। তণ্ডুল, তিন চারি প্রকার উদ্ভিজ্জ, ঘৃত প্রভৃতি নিত্য খাদ্যদ্রব্য অতি সুলভ মুল্যে বিক্রীত হইয়া থাকে। এক টাকায় বিংশতি বা ততোধিক কুক্কুট পাওয়া যায়। রাজহাঁস, পাতিহাঁসও সুলভমূল্যে বিক্রীত হয়। ছাগ, মেষ ও শূকরমাংসে জীবনধারণ করে, লবনাক্ত শূকরমাংসও  ইংরেজ ও ওলান্দাজ জাহাজের আরোহীগণ ব্যবহার করিয়া থাকে। এক কথায় বাঙ্গলা জীবনধারণের উপযুক্ত উপযোগী দ্রব্য সমুহে পরিপূর্ণ।  এইজন্য পর্টুগীজ, ফিরিঙ্গী ও অন্যান্য খৃষ্টানগণ ওলান্দাজগণকর্ত্তৃক তাহাদের উপনিবেশ হইতে বিতাড়িত হইয়া এই শস্যপূর্ণ রাজ্যে বাস করিয়াছে, বাঙ্গলায় বহুমূল্য নানানবিধ পণ্যদ্রব্য বৈদেশিক বণিককে আকরষণ করিয়া থাকে। চিনি ব্যতীত এতদ্দেশে এত অধিকপরিমাণে তুলা ও রেশম উৎপন্ন হয় যে, ইহাকে ভারতবর্ষ, তাহার নিকটবর্ত্তী দেশ সমূহ, এমন কি ইউরোপের তুলা ও রেশম ভাণ্ডার বলা যাইতে পারে। ইহার শ্বেত ও রঞ্জিত, স্থূল ও সুক্ষ্ম নানাবিধ কার্পাসবস্ত্র দর্শনে চমৎকৃত হইতে হয়। ওলান্দাজগণ নানানস্থানে, বিশেষত জাপান ও ইউরোপে, ইহাদের রপ্তানী করে। ইংরেজ, পর্টুগীজ এবং দেশীয় ব্যবসায়িগনও বহুল পরিমাণে এই সমস্ত বস্ত্রের ব্যবসায় করিয়া থাকে। রেশম ও রেশমীবস্ত্র সম্বন্ধেও ঐরূপ বলা যাইতে পারে। সুদূর লাহোর ও কাবুল পর্য্যন্ত সমগ্র মোগলসাম্রাজ্যের ও অন্যান্য রাজ্যের জন্য কত পরিমাণে কার্পাসবস্ত্র নীত হইত, তাহা বিবেচনারও অতীত। রেশম তাদৃশ চিক্কণ না হইলেও মূল্য অতি সুলভ। তাহদিগকে বাছিয়া বুনিতে পারিলে তদ্দ্বারা সুন্দর বস্ত্রসমূহ প্রস্তুত হইতে পারে। ওলান্দাজেরা কাশীমবাজারে ইহার জন্য সাত আট শত দেশীয় লোক নিযুক্ত করিয়া থাকে। ইংরেজ ও অন্যান্য বণিকগণও সেইরূপ অধিকসংখ্যক লোক নিযুক্ত করে। বাঙ্গলায় যথেষ্ট পরিমাণে সোরাও উতপন্ন হয়। এই সমস্ত দ্রব্য ব্যতীত বাঙ্গলায় বহুল পরিমাণে লাক্ষা, অহিফেন, মোম, মৃগনাভি, লঙ্কামরিচ প্রভৃতি জন্মে। তদ্ভিন্ন ইহা হইতে অনেক পরিমাণে ঘৃত সমুদ্র পথে নানা দেশে নীত হয়, বার্ণিয়ে সোনার বাঙ্গলার সৌন্দর্য্যের কথাও বিশেষরূপে বর্ণনা করিয়াছেন। রাজমহল হইতে সমুদ্র পর্য্যন্ত গঙ্গার উভয়তীরে বিস্তৃত বহুসংখ্যক খাল ও অগণ্য-অধিবাসী-পরিপুর্ণ গ্রাম ও নগর এবং ধান্য, ইক্ষু, সর্ষপ, তিল, তুঁত প্রভৃতি নানাবিধ শস্য ও উদ্ভিজ্জে শোভিত প্রান্তর সমূহ ইহাকে সৌন্দর্যময় করিয়া রাখিয়াছিল তদ্ভিন্ন সহস্রখালবেষ্টিত, অরন্যশোভিত ও আনারসাদি-নানাবিধ-ফল্পাদিপূর্ণ দ্বীপপুঞ্জও ইহার সৌন্দর্য্য বৃদ্ধি করিত। 

সোনার বাঙ্গলা – নিখিলনাথ রায়৪, Sonar Bangla - Nikhilnath Ray4

খৃষ্টীয় ষোড়শ শতাব্দীর শেষ ভাগে ও সপ্তদশ শতাব্দীর প্রারম্ভে বঙ্গভূমির অবস্থা চরমসীমায় উপনীত হয়। সেই সময়ে বাঙ্গালায় পাঠানরাজত্বের অবসান হওয়ায়, বঙ্গভূমি বাঙালীগণেরই শাসনাধীনে আইসে। বিশেষতঃ পুর্ব্ব ও দক্ষিণ বঙ্গ বারভূঁইয়ার অধীন থাকায় তৎপ্রদেশের অনেক উন্নতি সাধিত হইয়াছিল। বারভূঁইয়ার মধ্যে হিন্দু ও মুসলমান এই দুই জাতিই ছিল। ইঁহাদের মধ্যে অনেক পরিমাণ সৌহার্দ্দও ছিল। এই সময়ে রালফ ফিচ্‌ বঙ্গভূমিতে আগমন করেন, তিনি কোন কোন ভুঁইয়ার বিষয় উপস্থিত করিয়াছেন। তাঁহার পর জেসুইট পাদ্রীগণ বঙ্গদেশে উপস্থিত হন। ফার্ণাণ্ডেজ, সোসা, ফন্সেকা ও রাউস নামে চারিজন পাদরী ষোড়শ শতাব্দীর শেষভাগে উপস্থিত হইয়া সপ্তদশ শতাব্দীর কয়েক বৎসর পর্য্যন্ত এতদ্দেশে অবস্থিতি করিয়াছিলেন। তাঁহারা ভুঁইয়াদিগের ও বঙ্গদেশের অবস্থা বিশেষরূপে বর্ণনা করিয়া গিয়াছেন। তাহাদের বিবরণ লইয়া ডুজারিক নামে একজন ফরাসী ঐতিহাসিক স্বীয় গ্রন্থে বাঙ্গালার বিবরণ বিস্তৃতভাবে লিপিবিদ্ধ করিয়া গিয়াছেন।  ডুজারিকের গ্রন্থ ১৬১০ খৃঃঅব্দে প্রকাশিত হয়। তাঁহার পর সামুয়েল পার্শা নামে ইংরেজ গ্রন্থকার স্বীয় গ্রন্থে বাঙ্গালার সম্বন্ধে অনেক বিবরণ প্রদান করেন। পার্শা গ্রন্থ হইতে আমরা জানিতে পারি যে, আমাদের সোনার বাঙ্গালায় তৎকালে ধান্য, গম, চিনি, আদা, লঙ্কা, তুলা, ও রেশম অপর্য্যাপ্ত পরিমাণে জন্মিত এবং সন্দ্বীপ প্রভৃতি স্থান হইতে অনেক পরিমাণে লবনের রপ্তানী হইত। পার্শার গ্রন্থ ১৬২৫ খৃঃ অব্দে প্রকাশিত হয়।  এই সময় হইতে পর্টুগীজগণের অনুসরণ করিয়া ওলান্দাজগণ বঙ্গদেশে বাণিজ্যার্থে আগত হয়। তাঁহারা চুঁচুড়া, বরাহনগর, কালিকাপুর, ঢাকা প্রভৃতি স্থানে কুঠি স্থাপন করে। ইহাদের পর ইংরাজ ও ফরাসী বণিকগণ এতদ্দেশে উপস্থিত হয়।
ইউরোপীয় বণিকগণ ক্রমে বঙ্গভুমিতে বণিজ্যব্যাপারে লিপ্ত হইলে ইউরোপীয় পরিব্রাজক বঙ্গদেশে আগমন করেন। সপ্তদশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে ফ্রান্সিস পাইরার্ড নামে একজন ইউরোপীয় এতদ্দেশে আগমন করিয়াছিলেন। তিনি বঙ্গভূমিকে স্বাস্থ্যকর ও নাতিশীতোষ্ণ বলিয়া বর্ণনা করিয়াছেন এবং তাঁহাকে অত্যন্ত উর্ব্বর বলিয়াও উল্লেখ করিয়াছেন। ইহা হইতে অপর্য্যাপ্তপরিমাণে ধান্য ভারতবর্ষের সর্ব্বত্র গয়া, মালাবার, সুমাত্রা ও মালাক্কা প্রভৃতি দ্বীপপুঞ্জে নীত হইত। বঙ্গভুমি মাতার ন্যায় ঐ সমস্ত স্থানের অধিবাসীদিগকে অন্ন বিতরণ করিতেন। অসংখ্য জাহাজ ঐ সমস্ত দ্রব্যবহনের জন্য প্রতিদিন বঙ্গভুমিতে আগমণ করিত। এই বঙ্গভূমিতে নানাপ্রকার পশু জন্মগ্রহণ করিত, এবং তাহাদের মাংস সুলভ মুল্যে বিক্রীত হইত। কেবল দুগ্ধ ঘৃত ব্যবহার করিয়া লোকে তথায় জীবন ধারন করিতে পারিত। বঙ্গবাসিগণ নানাপ্রকার সতরঞ্চ বয়ন করিত। ইহাতে নানা প্রকার ফল জন্মিত, যথা – জামীর, লেবু, কমলা, দাড়িম, আনারস, লঙ্কা। ইক্ষু অপর্য্যাপ্ত পরিমাণে জন্মিত। তাহা হইতে চিনি প্রস্তুত হইয়া নানা স্থানে নীত হইত। এতদ্ভিন্ন নানাপ্রকার তৈল প্রস্তুত হইত। তুলা এত অধিক পরিমাণে জন্মিত যে উহার অধিবাসিগণের পরিধেয়বস্ত্র প্রস্তুত হইয়া তাঁহার পর বহুল পরিমাণে তুলা ও বস্ত্র নানা স্থানে নীত হইত। এতদ্ভিন্ন রেশম ও রেশমীবস্ত্র অনেক পরিমাণে হইত। এই দেশের অধিবাসীগণের মধ্যে স্ত্রীপুরুষ উভয়েই সূতী ও রেশমী বস্ত্র প্রস্তুত ও সূচীকার্য্য প্রভৃতি সুন্দররূপে সম্পাদন করিতে পারিত। এরূপ শিল্পকার্য অন্যত্র দৃষ্ট হইত না। এই সমস্ত বস্ত্র এত সূক্ষ্ম হইত যে, কেহ তাহা পরিধান করিলে তাঁহাকে নগ্ন বলিয়া বোধ হইত – বস্ত্র পরিহিত বলিয়া বুঝা যাইত না। বঙ্গবাসীগণ চিনবাসির ন্যায় গৃহ সজ্জার উপকরণ ও বাসনাদি নির্ম্মাণ করিতে পারিত। রক্ত ও কৃষ্ণবর্ণের মৃত্তিকানির্ম্মিত দ্রব্যাদি হইত। এই সমস্ত দ্রব্যের বাণিজ্যের বিষয়েও তিনি উল্লেখ করিয়াছেন।

ইংলণ্ডেশ্বরী মহারাজ্ঞিই এলিজাবেথ বাদশাহ জাহাঙ্গীরের দরবারে ‘সার টমাস রো’কে দূতস্বরূপ প্রেরণ করিয়াছিলেন। সপ্তদশ শতাব্দীর প্রারম্ভে রো ভারতবর্ষে উপনীত হইয়াছিলেন। তিনিও বাঙ্গালার বিষয় বিবৃত করিয়াছেন, এবং তাঁহার প্রধান নগর, রাজমহল ও ঢাকা ও পোর্ট গ্রান্ডি, পোর্ট পেকিনো, পিপলী ও সাতগাঁ প্রভৃতি বন্দরের বাণিজ্যের কথা উল্লেখ করিয়াছেন।

সোনার বাঙ্গলা – নিখিলনাথ রায়৩, Sonar Bangla - Nikhilnath Ray3

ঊক্ত শতাব্দীতে নিকলি কোন্টি এতদ্দেশে আগমন করিয়াছিলেন। তিনি বাঙ্গালার অনেক সমৃদ্ধশালী নগরের উল্লেখ করিয়াছেন()। ষোড়শ শতাব্দীর প্রারম্ভে ভারথেমা নামে একজন ইতালীয় পরিব্রাজক বঙ্গদেশে উপস্থিত হইয়াছিলেন। তিনিও সোনার বাংলার সমৃদ্ধির কথা উল্লেখ করিয়াছেন। ভারথেমা বলেন যে, এখানে অপর্য্যাপ্ত শস্য ও সর্ব্বপ্রকার মাংস প্রচুরপরিমাণে পওয়া যাইত। তদ্ভিন্ন অপর্য্যাপ্ত চিনি, আদা ও তুলাজন্মিত। পৃথিবীর কোন দেশে এই সমস্ত দ্রব্য এত অধিক পরিমানে পাওয়া যাইত না। ভারথেমা এখানে অনেক ধনশালী বণিকের সহিত সাক্ষাৎ করিয়াছিলেন। প্রতি বৎসর পঞ্চাশখানি জাহাজ সূতী ও রেশমী বস্ত্রে পরিপুর্ণ হইয়াবঙ্গদেশ হইতে বহুস্থানে গমন করিত। ভারথেমা তাহাদের ভিন্ন ভিন্ন প্রকারের নামোলেখও করিয়াছেন। ঐ সমস্ত বস্ত্র তুরষ্ক, সিরিয়া, আরব প্রভৃতি দেশে ও ভারতের সর্বত্র নীত হইত। এতদ্ভিন্ন বঙ্গদেশে অনেক জহরতব্যবসায়ী বণিকের সমাগম হইত()।
ষোড়শ শতাব্দীর প্রথমভাগ হইতে পুর্টুগীজগণ বঙ্গদেশে আগমন করিয়া ইহার অধিবাসিগণের সহিত বাণিজ্যব্যাপারে লিপ্ত হয়। এই সময় সপ্তগ্রাম বাঙ্গালার সর্বপ্রধান বন্দর ছিল। কিন্তু ক্রমে তাঁহার নিম্নস্থ নদীপ্রবাহ রূদ্ধ হইতে আরম্ভ হওয়ায়, তাহার অবস্থা দিন দিন হীন হইয়া পড়ে। পুর্টুগীজগণ চট্টগ্রামকেপ্রধান বন্দর করিয়া তুলে। ক্রমে সপ্তগ্রামের পরিবর্তে হুগলী তাঁহার স্থানে বন্দরে পরিণত হয়। পুর্টুগীজেরা যে যে স্থানে বাণিজ্যপলক্ষে বাস করিয়াছিল, সেই সেই স্থানকে তাহারা ব্যান্ডেল বা বন্দর নামে অভিহিত করিত। অদ্যপি হুগলী ও চট্টগ্রামের নিকট ব্যান্ডেলের অস্ত্বিত্ব বিদ্যমান রহিয়াছে।
পুর্টুগীজগণএর সময়ে বঙ্গদেশের মানচিত্র ইয়োরোপে প্রচারিত হয়। ডি ব্যারো ইহার বিবরণসহ মানচিত্র প্রকাশ করেন। তাঁহার মানচিত্রে এসিয়ার সমস্ত প্রদেশের উল্লেখ থাকিলেও বঙ্গদেশেরও উল্লেখ বিশেষরূপে দৃষ্ট হইয়া থাকে। সপ্তগ্রাম ও চট্টগ্রামের বিবরণে বাঙ্গালার বাণিজ্যের বিষয় বিশেষরূপে উল্লিখিত হইয়াছে()। পুর্টুগীজগণ চট্টগ্রামকে পোর্টো গ্রান্ডি বা বৃহৎ বন্দর ও সপ্তগ্রামকে পোর্টো পেকিনো বা ক্ষুদ্রবন্দর নামে অভহিত করিত। সময়ে সময়ে হুগলী ও পিপলী পোর্ট পেকিনো নামে কথিত হইত।
১৫৭০ খৃঃ অব্দে ফ্রেড্রিক নামে একজন ইউরোপীয় বঙ্গদেশে আগমন করিয়াছিলেন, তিনি সপ্তগ্রামের বাণিজ্যের বিষয় উল্লেখ করিয়াছেন। ষোড়শ শতাব্দীর শেষভাগে ১৫৮৬ খৃঃঅব্দে প্রথম ইংরেজ র‍্যালফ ফিচ্‌ বঙ্গদেশে উপস্থিত হন। ফিচ বাঙ্গালার বহুস্থানের কার্পাস, কার্পাসবস্ত্র ও রেশমীবস্ত্রের প্রাচুর্যয়্যের বিষয় উল্লেখ করিয়াছেন। টাঁডা, কুচবিহার, হিজলী, বাকলা, শ্রীপুর প্রভৃতি স্থানের কার্পাস, কার্পাসবস্ত্র ও রেশমীবস্ত্রের বিষয় তাঁহার বিবরণে দৃষ্ট হয়। ফিচের বিবরণে সোনারগাঁওয়ের মসলিনের উল্লেখ আছে। তিনি উল্লেখ করিয়াছেন যে, হিজলীর একপ্রকার তৃণ হইতে রেশমীবস্ত্রের ন্যায় সুন্দর বস্ত্র নির্ম্মিত হইত। এতদ্ভিন্ন অপর্য্যাপ্তপরিমাণে ধান্য চাউলের উতপত্তি ও বাণিজ্যের কথা তাঁহার বিবরণে দৃষ্ট হইয়া থাকে। সপ্তগ্রাম প্রভৃতির যে বাজারের বিষয় তিনি বর্ণনা করিয়াছেন, তাহা হইতে জানা যায় যে, সেই সমস্ত বাজারের অনেক দ্রব্যের আমদানী রপ্তানী হইত()। 

সোনার বাঙ্গলা – নিখিলনাথ রায়২, Sonar Bangla - Nikhilnath Ray2

হিউয়েন্‌সিয়ঙের আগমনের পূর্ব্বে যখন ভারতবর্ষ উজ্জয়নাপতি বিক্রমাদিত্যের প্রতাপ ও বিদ্যোৎসাহীতার আলোকে উদ্ভাসিত হইয়া উঠিয়াছিল, তখন সে আলোকে এই সুদূর বঙ্গভূমিও দৃষ্টির অন্তর্ভুক্ত হইয়াছিল। সেইজন্য কালিদাস ও বরাহমিহিরের গ্রন্থে বঙ্গের উল্লেখ দৃষ্ট হইয়া থাকে। কালিদাস বঙ্গের অধিবাসীগণকে নৌযুদ্ধকুশল বলিয়া বর্ণনা করিয়াছেন। বরাহমিহিরও বঙ্গ ও উপবঙ্গের উল্লেখ করিয়াছেন। প্রাচীন গ্রন্থাদিতে ও প্রাচীন লোকের নিকট আমাদের মাতৃভূমি বঙ্গনামেই অভিহিত হইতেন। কিন্তু ক্রমে তিনি বাঙ্গালা নাম ধারণ করিয়া সাধারনে পরিচিত হইয়া উঠেন। খৃষ্টীয় নবম শতাব্দী হইতে একাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে আমরা প্রথম বাঙ্গলা নামের উল্লেখ দেখিতে পাই। দাক্ষিণাত্যের রাজেন্দ্র চোল দেবের তিরুমলয়নামক স্থানের শিলালিপিতে প্রথমে এই বাঙ্গালাদেশের উল্লেখ দেখা যায়। রাজেন্দ্র চোল দেব তথাকার গোবিন্দচন্দ্রকে পরাজিত করিয়াছিলেন বলিয়া তিরুমলয়ে আপনার গৌরব খোদিত করিয়াছেন। তাঁহার পর আমাদের মাতৃভূমি বঙ্গনাম পরিত্যাগ করিয়া বাঙ্গলানাম ধারন করিয়াছেন। সেই ফুলফলসুশোভিতা, শস্যশ্যামলামাতাকে আমরা সোনার বাঙ্গলা বলিয়া থাকি।
ক্রমে মুসলমান গৌরব ও প্রতিভা সুদূর ইউরোপখণ্ড হইতে চীনদেশ পর্য্যন্ত পরিব্যাপ্ত হয়, সেই সময় বঙ্গভূমি মুসলমান পরিব্রাজকগণের নিকট অপরিজ্ঞাত ছিল না। মুসলমানগণকর্ত্তৃক ভারতবিজয় আরব্ধ হইলে বঙ্গদেশও তাঁহাদের দৃষ্টিপথে পতিত হয়। খৃষ্টীয় অষ্টম শতব্দীতে সুলেমান আমাদের সোনার বাঙ্গলায় আগমন করিয়াছিলেন। তিনি ইহাকে সমৃদ্ধশালী বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন, এবং ইহার বাণিজ্যগৌরবের বিষয়ও উল্লেখ করিতে বিস্মৃত হন নাই। ইবনবাটুটানামক একজন মুসলমান্‌ পরিব্রাজক অনেক পরে এ দেশে আগমন করেন, তিনি ইহাকে অত্যন্ত শস্যসুলভ বলিয়া বর্ণনা করিয়াছেন। বৈদেশিকগণের বিবরণ যতই আলোচনা করা যায়, ততই আমাদের মাতৃভূমিকে সোনার বাঙ্গলা বলিয়া প্রতীয়মান হয়। পুরাকাল হইতে স্বর্ণপ্রসবিনী বঙ্গভূমি বৈদেশিকগণের চক্ষে স্বর্ণকিরণ প্রতিফলিত করিয়া আসিতেছেন। ফলেফুলে সুশোভিনী মা আমাদের কৃষিবাণিজ্যে সমৃধিশালী হইয়া জগতের নিকট সগৌরবে আদৃত হইতেন। তাঁহার সন্তানগণ জ্যোৎস্নাচুম্বিত-সৈকতশালিনদীমালিনী শস্যশ্যামলা মাতৃভূমির সেবায় আপনাদের জীবন উৎসর্গ করিত। কৃষি বাণিজ্যেও তাঁহাকে গৌরবশালিনী করিয়া তুলিয়াছিল। মা তাহাদিগকে পবিত্র ও তৃপ্তিকর জলবায়ু প্রদান করিয়াছিলেন, এবং তাহাদিগকে সাহসী, কর্মঠ ও কষ্টসহিষ্ণু করিয়াছিলেন, মাতৃসেবার সহিত তাঁহারা বিদ্যারও আরাধনা করিত। চীনপরিব্রাজকগণ তাঁহাদের জ্ঞানগরিমার বিষয় ভূয়োভূয় উলেখ করিয়াছেন। তাহারাও যেমন মাতৃসেবা করিত, মাতাও তাহাদিগকে তেমনই সুখসম্পদ প্রদান করিয়াছিলেন। তাঁহাদের সেই সন্তানোচিত মাতৃসেবায় মাতা প্রকৃত সোনার বাঙ্গলা হইয়াছিলেন, তাই সোনার বাঙ্গলার গৌরব দিগ্দিগন্তে বিকীর্ণ হইয়াছিল।
খৃষ্টীয় দ্বাদশ শতাব্দীর শেষভাগে বা ত্রয়োদশ শতাব্দীর প্রারম্ভেই বঙ্গভূমিতে মুসলমান্‌বিজয়নিশান প্রোথিত হয়। পুর্ব্ববঙ্গে কিন্তু তাহার পর শতাধিক বৎসর পয্যন্ত হিন্দুরাজন্যগণের অধীনেই ছিল। ক্রমে সমগ্র বঙ্গদেশ মুসলমান্‌ আধিপত্য বদ্ধমূল হয়। মুসলমান্‌গণ বঙ্গের শ্যামলপ্রান্তরে বাস করিয়া হিন্দুসাধারণের প্রতিবেশী হইয়া উঠেন। উভয়ের জাতিগত ও ধর্ম্মগত পার্থক্য অনেকদিন পর্য্যন্ত উভয়কে স্বতন্ত্র করিয়া রাখিয়াছিল। ক্রমে এক দেশে, এক গ্রামে, এক পল্লীতে বসবাস করিয়া উভয়ের বিদ্বেষভাব অন্তর্হিত হইয়া উভয়েই সোনার বাঙ্গলার সন্তান হইয়া উঠে, উভয়েই মাতৃসেবায় প্রবৃত্ত হয়, উভয়েই কৃষি বাণিজ্যে মাতৃভুমকিকে সোনার বাঙ্গলা করিয়া তুলে। হিন্দু ও মুসলমান্‌ উভয় সন্তানের সেবায় মাতার সমৃদ্ধি দিন দিন বর্দ্ধিত হইতে থাকে। নানা প্রকার শিল্পে বঙ্গভূমি পরিপুর্ণ হইয়া উঠে। তাঁহার গৌরব দেশে বিদেশে বিঘোষিত হয়। বহুদেশ হইতে বণিকগণ সোনার বাঙ্গলার দ্র্যব্যসম্ভারগ্রহণের জন্য অসংখ্য অর্ণবযান লইয়া প্রধান বন্দরসমুহে সমাগত হইত। ভারতবর্ষের সর্বত্র, এশিয়ার বহুদেশে, এমনকি সুদূর ইউরোপখণ্ড পর্য্যন্ত ইহার শিল্পজাত দ্রব্যসমূহ প্রেরিত হইত।
সোনার বাঙ্গলার এই গৌরবের কথা শুনিয়া দূরদূরান্তর হইতে বৈদেশিকগণ তাঁহার দর্শর্নাভিলাষে উপস্থিত হইতেন। অনেক বৈদেশিক গ্রন্থে আমাদের বঙ্গভূমি প্রকৃত সোনার বাঙ্গলারূপেই চিহ্নিত হইয়াছেন। খৃষ্টীয় ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষভাগে ইতালীয় পরিব্রাজক মার্কপোলো এশিয়ার নানাস্থানে পরিভ্রমণ করিয়া চীনদেশে গমন করিয়াছিলেন। তিনি বাঙ্গালী জাতি ও বাঙ্গালাভাষার উল্লেখ করিয়া ইহার কৃষিবাণিজ্যের বিষয় বর্ণনা করিয়াছেন। তাঁহার বর্ণনা হইতে জানিতে পারা যায় যে, বঙ্গভূমিতে পর্য্যাপ্ত পরিমাণে তূলা জন্মিত ও তাঁহার সমৃদ্ধ বাণিজ্য হইত। জটামাংসী, আদা, ইক্ষু প্রভৃতি অনেক দ্রব্য বঙ্গভূমিতে উৎপন্ন হইত। ভারতবর্ষের অনেক স্থান হইতে বণিকগণ তাঁহাদের বাণিজ্যের জন্য সমাগত হইত। এইরূপে মার্কপোলো গ্রন্থ হইতে বাঙ্গলা সম্বন্ধে অনেক বিষয় অবগত হওয়া যায়। পঞ্চদশ শতাব্দীর প্রথমভাগে চিনপরিব্রাজক মাহু বঙ্গদেশে আগমন করিয়াছিলেন। তিনি চট্টগ্রাম, সোনার গাঁ, বাঙ্গলা(এই বাঙ্গালানগর অনেক পরিব্রাজকের গ্রন্থে উল্লিখিত হইয়াছে। কিন্তু ইহার অস্ত্বিত্বসম্বন্ধে বিশেষরূপে প্রমাণ পাওয়া যায় না। কেহ কেহ ইহাকে কাল্পনিক নগর বলেন, কেহ বা গৌড়ের সহিত অভিন্ন বলিয়া প্রকাশ করিয়া থাকেন, কেহ বা ইহার স্বতন্ত্র অস্ত্বিত্ব ছিল বলিয়া থাকেন। তাঁহারা বলেন যে, জলপ্লাবনে উক্ত নগরের ধ্বংস হয়।) প্রভৃতি অনেকস্থান পরিভ্রমণ করিয়াছিলেন। তাঁহার বিবরণে লিখিত আছে, বঙ্গদেশে নানান প্রকার শস্য উৎপাদন হইত। গম, তিল, নানাজাতি কলায়, চিনা(চিনি?), আদা, সর্ষপ, পলাণ্ডু, গাঁজা, বার্ত্তাকু, কাঁঠাল, আম্র, দাড়িম্ব, গুড়, চিনি, কদলী ও নানানপ্রকার ফলোৎপাদনের কথা তিনি উল্লেখ করিয়াছেন। এতদ্ভিন্ন নারিকেল ও তণ্ডুলজাত মদ্য, তাড়ী ও কাঁজী ও পাঁচ ও ছয় প্রকার মসলিনের কথা তাঁর বিবরণ হইতে জ্ঞাত হওয়া যায়। মাহু বলেন যে, বঙ্গদেশের অধিবাসিগণ রেশমী রুমাল, সোনালীকাজকরা টুপী, চিত্রিত মাটীর বাসন, গামলা, পাত্র, সারলৌহ, বন্দুক, ছুরী, কাঁচী ও বৃক্ষত্বগ্‌জাত মৃগচর্ম্মের ন্যায় চিক্কণ শ্বেতবর্ণের এক প্রকার কাগজ ব্যবহার করিত()। 

Tuesday, September 3, 2013

সোনার বাঙ্গলা – নিখিলনাথ রায়১, Sonar Bangla - Nikhilnath Ray1

সোনার বাঙ্গলা - আমাদের ভাবনা
নিখিলনাথ রায় এই পুস্তকখানি লিখেছিলেন বাংলার বিদেশী দ্রব্য বর্জনের সময়ের দাবির প্রেক্ষিতে। সেটি ছিল তেতে থাকা বাঙলা নামক দেশটির শেকড়ের সন্ধানে যাওয়ার সময় যে মধ্যবিত্ত এতদিন শাসক বণিক  ইংরেজের অভয়হস্ত মাথায় রেখে চাকরি, উমদোরি, দালালি, ব্যবসা ইত্যাদিতে ফুলে ফেঁপে উঠে দেশের গ্রামীণদের সমস্ত কষ্ট, দুঃখ, বেদনা, সংগ্রাম উপেক্ষা করে নিজেকে কালো ইংরেজ ভাবতে ভালবাসত, ইংরেজরা না এলে দেশের কী দুর্দশা হত তা নিয়ে চায়ের কাপে তুফান তোলা আলোচনায় মগ্ন থেকে ইংলন্ডের ভূমিকে নিজের মাতৃস্থানীয়া, ইংলন্ডের সমাজকে নিজের সমাজ ইত্যাদি ভেবে আনন্দলাভ করত, বিংশ শতকে তাঁরা হঠাৎ জেগে উঠে দেখল, যে সাম্রাজ্য বিরোধী যুদ্ধ শুরু হয়েছিল পলাশীর ৫ বছর পরে ১৭৬৩ থেকে ফকির-সন্ন্যাসী স্বাধীনতা সংগ্রামের তুমুল লড়াইতে, সেই যুদ্ধের আগুনের তেজ সে সময়ে এসে লাগেছে নিজের গায়ে, আগুন ঢুকে আসছে নিজের ঘরে, নিজের সন্তান সন্ততিদের সে আঁচ থেকে সরিয়ে রাখা যাচ্ছে না। নতুন প্রজন্ম নতুন ভাবে বাঁচতে চায়, দেশকে জানতে চায় এতদিনের তৈরি করা কুয়াশা সরিয়ে। প্রৌঢ মধ্যবিত্ত আন্দাজ করতে পারছে এখন জন অরণ্যে না মিশলে ভবিষ্যতের ক্ষমতার দণ্ডটি হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে।
সেই ১৯০৫ আর ১৯১১, এতদিনকার তৈরি করা বোধ বুদ্ধি চেতনা হিসেব সমস্ত  কিছু পাল্টে দিল। তখনও নিখিলনাথেদের দ্বিধা ছিল না এমন নয়। হয়ত এই কিস্তিগুলোয় প্রকাশ পাবে না, কিন্তু নদিয়া কাহিনীর লেখক সোনার বাঙ্গলা বইয়ের শেষের দিকে কিছুটা দ্বিধা জড়ানো গলায় বলছেন রাণীর অভয় হস্তের কথা, কার্জনের দেশীয় শিল্পে সাহায্যদানের আশার কথা। কিন্তু তবুও প্রায় পুরনো দেড়শ বছরের অভিজ্ঞতা তাঁর চেতনাকে কোথায় যেন ঘা দিয়ে বলে আর কিছু ঠিক হবার নয়। হাল ধরো বন্ধু। মায়ের ডাকে, সকলে আবার নতুন করে তাঁকে খোঁজার চেষ্টা কর।
সেই এত্ত জোর দিয়ে, এত্ত ভালবাসায়, এত্ত আবেগ মথিত করে, পাঠকের এত চোখের জল ফেলে এর আগে বোধহয় কেউ বাংলার ছারখার হয়ে যাওয়াকে তাঁর লেখার আঙটপাতে বলেন নি। তবুও মনে পড়ে সখারাম, দাদাভাই বা রমেশ দত্তের লড়াই দেওয়ার ইতিহাস- কিন্তু সে ছিল মধ্যবিত্ত জাগানোর কাজ। 
সোনার বাঙ্গলায় সেই সময়ের দাবি মেনে কি করিতে হইবে উপদেশও তিনি লিপিবদ্ধ করেছেন বইতে আজ সেটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক এই বিশ্বায়নের মুখে বোধহয় সেই সময়ে তাত আমরা আজ আমরা দাঁড়িয়ে টের পাছি।  সুযোগ পেলে অন্য কোনও দিন তাকে পাঠকদের সামনে তুলে ধরা যাবে। 
আমরা নিখিলনাথমহাশয়ের প্রথম পর্বটি কয়েক কিস্তিতে এখানে তুলে দেব। 
নিখিলনাথেরা ছিলেন বলে, এই কাজগুলো অকপটে করে গিয়েছিলেন বলেই, আজ এই টালমাটাল সময়েও লোকফোক নিজেরমত করে দেশের মাটি দেখতে চায়, ছুঁতে চায় সেই সব কাজ যা এক সময়ে বাংলার হৃদয়াবেগের উৎস্রোতকে উন্মুক্ত করে দিয়েছিল। 
নিখিলনাথেরা তার অনেক আগে থেকেই সোনার বাংলারমত অজস্র পুস্তক লিখে চলেছিলেন বলেই আজও আমরা আমাদের শিকড়ের টান অনুভব করি, ভারতের এই মাঝরাতে বসে বিশ্বকে নিখিলনাথদের দুঃখ কষ্ট জানাবার উদ্যম অর্জন করি

নিখিলনাথের একটি লেখার চুম্বকটুকু প্রকাশের মাধ্যমে প্রত্যেক নিখিলনাথকে প্রমাণ জানাই।
জয় গুরু!!!



জানি না, ভগবানের কোন অভিশাপে তাঁহার এরূপ দুর্গতি ঘটিল? ভগবানের যে অভিশাপ থাকে, থাকুক, কিন্তু ইহার প্রত্যক্ষ কারণ ইংরেজবণিকের আসুরিক স্বার্থপরতা ও আমাদের অকর্মণ্যতা। এই সোনার বাঙ্গলা পুর্ব্বেই বা কেমন ছিল, আর ইংরেজবণিকই বা কেমন করিয়া ইহাকে ছারখার করিল আমরা সংক্ষেপে তাহাই দেখাইতে চেষ্টা করিব।
বৈদিককাল হইতে এই বঙ্গভূমির অস্ত্বিত্বের বিষয় অবগত হইতে পারা যায়। ঐতরেয় আরণ্যক প্রভৃতিতে ইহার উল্লেখ আছে। যে বিস্তীর্ণ ভূভাগ এক্ষণে সোনার বাঙ্গলা বলিয়া পরিচিত তাহার প্রধান অংশ ছিল । তাহার সন্নিহিত পুণ্ড্র, অঙ্গ প্রভৃতির কিয়দংশ এক্ষণে ইহার সহিত মিলিত হইয়াছে, বৈদিকগ্রন্থে সেই সমস্ত স্থানেরও উল্লেখ দৃষ্ট হইয়া থাকে।
মনুসংহিতায়ও বঙ্গ প্রভৃতির উল্লেখ আছে। তাহার পর, রামায়ণের সময় হইতে ইহাকে প্রকৃত সোনার বাঙ্গলা বলিয়া জানিতে পারা যায়। সেই সময় বঙ্গভুমি ধনধান্যে পরিপুর্ণ হইয়া উঠিয়াছিল। মহাভারতের সময় ইহা একটি বিস্তৃত জনপদ হইয়া উঠে। যুধিষ্ঠিরের রাজসূয়যজ্ঞকালে বঙ্গাধিপতি সমুদ্রসেন ভীমের নিকট পরাজিত হইয়াছিলেন। পাণ্ডবেরা গঙ্গাসাগরসঙ্গমে স্নান করিয়া কলিঙ্গ বা বর্ত্তমান উত্তর উড়িষ্যায় গমন করিয়াছিলেন। তাহার পর বিষ্ণু, গরুড়, মৎস্য প্রভৃতি পুরাণেও ইহার উল্লেখ আছে। মহাভারত ও বিষ্ণুপুরাণ প্রভৃতিতেও ইহার নামকরণেরও বিবরণ দৃষ্ট হয়।
ইহার পরে বৈদেশিকগণের বিবরণ হইতে সোনার বাঙ্গলার পরিচয় পাওয়া যায়। গ্রীক পরিব্রাজক মেগাস্থিনিসের বর্ণনায় বঙ্গরাজ্যের সুস্পষ্ট উল্লেখ না থাকিলেও গঙ্গারিডি বা গণকরের উল্লেখ আছে। এই গঙ্গারিডি বা গণকরদেশ গঙ্গার পশ্চিমে ব’দ্বীপের শীর্ষভাগে অবস্থিত ছিল। মুর্শিদাবাদজেলার জঙ্গীপুর উপবিভাগে অদ্যাপি গ্যাঙ্গারিডি ও গণকর নামে দুইখানি গ্রাম বিদ্যমান আছে। এরিয়ান কটডুপানগরের নিকটস্থ আমিষ্টিসনদীর উল্লেখ করিয়াছেন, এই কটডুপা কটদ্বীপ বা কাটোয়া ও আমিষ্টিসই অজয়াবতী বা অজয়। টিলেমি ‘ব’দ্বীপের বিশেষরূপে বিবরণ প্রদান করিতেছেন। এই সমস্ত বিবরণ হইতে জানিতে পারা যায় যে, গ্রীকদিগের নিকট সোনার বাঙ্গলা বিশেষরূপেই পরিজ্ঞাত ছিল। তাহার পর যখন ইউরোপভূখণ্ড রোমকসভ্যতায় আলোকিত হইয়া উঠিল, তখন এই প্রাচ্যদেশের পণ্যদ্রব্যে তাহার বিলাসভাণ্ডার পরিপূর্ণ হইয়া উঠে। রোমক বণিকগণের ভারতের সহিত বাণিজ্যসম্বন্ধে রোমের সৌভাগ্যলক্ষ্মীও শ্রীসম্পন্না হইয়াছিলেন। এই সমস্ত পণ্যদ্রব্যের মধ্যে যে সকল মসলিন, রেশম, ও রেশমীবস্ত্র নীত হইত, তাহার অধিকাংশই বঙ্গদেশ হইতে সংবাহিত হইত। রোমকমহিলাগণ সে সমস্ত সুচিক্কণ মসলিনের অন্তরাল হইতে আপনাদের অঙ্গসৌষ্ঠব প্রকাশ করিতেন। প্রসিদ্ধ রোমক লেখক প্লিনি বাঙ্গলার শ্রেষ্ঠবন্দর সপ্তগ্রামের কথাও উল্লেখ করিয়াছেন।
যে সময়ে চীনপরিব্রাজকগণ ভারতের নানাস্থানে পরিভ্রমণ করিতে আরম্ভ করেন। সেই সময় তাঁহারা সোনার বাঙ্গলায় উপস্থিত হইয়া তাঁহাকে ধনধান্যে পরিপুর্ণ দেখিয়াছিলেন। ভারতাগত প্রথম চীনপরিব্রাজক ফাহিয়েন্‌ বাঙ্গলার তৎকালীন প্রসিদ্ধ বন্দর তাম্রলিপ্ত বা তমলুকে উপস্থিত হইয়াছিলেন ও প্রসিদ্ধ বণিকগণের সমাগম দেখিয়াছিলেন। তাম্রলিপ্ত হইতে তিনি বাণিজ্যযানে আরোহণ করিয়া সিংহলযাত্রা করেন। সুপ্রসিদ্ধ চীনপরিব্রাজক হিউয়েন্‌সিয়াং বাঙ্গলার নানাস্থানে পরিভ্রমণ করিয়াছিলেন। তিনি পুণ্ড্রবর্দ্ধন বা বরেন্দ্রভুমি, সমতট বা পূর্ব্ববঙ্গ, কর্ণসুবর্ণ বা পশ্চিমমুর্শিদাবাদ ও তাম্রলিপ্ত বা মেদিনীপুর প্রদেশে আগমন করিয়া অনেক দিন অবস্থিতি করেন। তাঁহার বিবরণ হইতে জানা যায় যে, তৎকালে আমাদের সোনার বাঙ্গলা ‘সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা’ই ছিলেন। ইহার অধিবাসিগণ স্বগীয় স্বাস্থ্য লাভ করিয়া কৃষিবাণিজ্যে তাহাদের মাতৃভূমিকে স্বর্ণপ্রসবিনী করিয়া রাখিয়াছিল। তাঁহার পুণ্ড্রবর্ধনের বিবরণ হইতে জানাযায় যে, তথায় নানা প্রকার শস্য জন্মিত। হিউয়েন্‌সিয়ং তথাকার পনসফলের অত্যন্ত প্রশংসা করিয়াছেন। তাঁহার মতে পুণ্ড্রবর্ধণের জলবায়ু নাতিশীতোষ্ণ ও অধিবাসিগণ বিদ্যোৎসাহী ছিল। সমতটের বর্ণনায় তাঁহাকে উর্ব্বর, শস্যপরিপূর্ণ ও ফুলেফলে সুশোভিত বলিয়া প্রতীত হয়। তিনি তাহার জলবায়ুকে কোমল ও অধিবাসিগণের ব্যবহারকে মনোজ্ঞ বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। ইহার কষ্ট সহিষ্ণু, খর্ব্বকায়, কৃষ্ণবর্ণ অধিবাসিগণ বিদ্যার সমাদর করিত। তাম্রলিপ্তির বর্ণনায় লিখিত আছে যে, উক্ত দেশও উর্ব্বর ছিল ও অপর্য্যাপ্ত ফলফুল উৎপাদন করিত। বায়ু উষ্ণ, অধিবাসিগণ ক্ষিপ্র ও সাহসী। হিউয়েন্‌সিয়াং এখান হইতে অর্ণবপোতে সিংহল যাত্রা করেন। কর্ণসুবর্ণের বিবরণে তাহাকে উর্ব্বর ও পুস্পশালী বলিয়া জানা যায়। লোকের ব্যবহার নম্য ও মনোজ্ঞ, জলবায়ুও তৃপ্তিকর। অধিবাসিগণ বিদ্যার সমাদর করিত। হিউয়েন্‌সিয়ঙের বর্ণনা হইতে সুস্পষ্টরূপে বুঝিতে পারাযায় যে, আমাদের সোনার বাঙ্গলা ফলশস্য-পরিপূর্ণ হইয়া সুস্থকায় ও বিদ্যোৎসাহী সন্তানের মাতৃভূমিরূপে বিরাজ করিত।