Showing posts with label সাম্রাজ্যের ঋণশোধ. Show all posts
Showing posts with label সাম্রাজ্যের ঋণশোধ. Show all posts

Friday, October 4, 2013

দ্বারকানাথ ঠাকুরের ঋণ এবং তাঁর সাম্রাজ্যের ঋণশোধ - তৃতীয়, Dwarakanath Tagore's England Visit

তাঁর এই রম্য ভ্রমণ কাহিনীতে, আমাদের কাছে সবথেকে আকর্ষনীয় তাঁর লন্ডনের প্রখ্যাতদের সামনে বক্তৃতা। প্রথমে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কোর্ট অব ডিরেক্টারদের সঙ্গে বৈঠক এবং পরে লর্ড মেয়র ম্যন্সন হৌসে বিপুল এক ভোজসভায় তার নতমস্তকে সাম্রাজ্যপৃষ্ঠকণ্ডুয়ন এবং সরাসরি পদলেহনকারী বক্তব্য পার্টনার ইন এম্পাইয়ার গ্রন্থে ব্লেয়ার বি ক্লিং লিখছেন, ‘হি এক্সপ্রেসড হিজ় গ্র্যাটিচিউড ফর হস্পিটালিটি অ্যান্ড ফ্রেন্ডশিপ হে হ্যাড রিসিভড ইন ইংল্যান্ড অ্যান্ড দেন, পারসিউমিং টু স্পিক অন বিহাফ অফ হিজ কান্ট্রিমেন, এক্সপ্রেসড তেয়ার গ্র্যাটিচিউড ফর ব্রিটিশ রুল। ‘ইট ওয়াজ ইংল্যান্ড হু সেন্ট আউট ক্লাইভ অ্যান্ড কর্নয়ালিস টু বেনিফিট ইন্ডিয়া বাই দেয়ার কাউন্সেলস অ্যান্ড আর্ম। ইট ওয়াজ দ্য কান্ট্রি দ্যাট প্রোটেক্টেড হিজ কান্ট্রিমেন ফ্রম দ্য টিরানি অ্যান্ড ভিলেইনি অব দ্য মহামেডান্স, অ্যান্ড থে নো লেস ফ্রেইটফুল অপ্রেসন্স অব দ্য রুসিয়ান্স। অ্যান্ড অল দিস ওয়াজ ডান – নট ইন দ্য এক্সপেকটেশন অব আ রেকুইটাল – নট ইন দ্য হোপ অব এনিথিং হোয়াট এভার ইন রিটার্ন, বাট ফ্রম দ্য মেয়ার লাভ অব ডুয়িং গুড ... ইট ওয়াজ ইম্পসিব্‌ল ফর দ্য কান্ট্রিমেন টু ট্রিট দ্য ইংলিশ উইথ ইনগ্রাচিউড।’’
তাঁর কান্ট্রিমেন যদি হয় কলকাতার আলালেরা তাহলে ঐতিহাসিকমশয় সঠিক কথা বলছেন, কিন্তু কান্ট্রিমেন মানে যদি বিলিতিমতে গ্রামবাংলার তেতে থাকা মানুষ হয়, তাহলে সরাসরি বলা যাক তিনি জেনেশুনে অনৃতভাষন করছেন। অতনু বসু বলছেন, ভারতে ইংরেজদের সুসাশনের দরাজ সার্টিফিকেট পেয়ে সমস্ত হৌস তুমুল হর্ষধ্বনিতে ফেটে পড়ে। তিনি সেই ভোজসভায় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে যে দরাজ প্রশংসাপত্র দিলেন, তাতে ভারতে ব্রিটিশ ইন্ডিয়া সোসাইটির সদস্যরা উত্তেজিত। আর ব্রিটেনে ব্রিটিশ ইন্ডিয়া সোসাইটির চার্লস ফোর্বস এবং জোসেফ পিজ়এরমত ঘনিষ্ট বন্ধুরা বেজায় খুশি। তারা তার বক্তৃতাকে কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে বর্ননা করলেন। স্রোতের বিপরীতে গিয়ে আজ বলা দরকার, তাঁর গুরু রামমোহন বা তাঁর এই দরকারি সাম্রাজ্য ভ্রমণের সঙ্গে, তাঁর দেশের কোটি কোটি গ্রামীণ প্রজার জীবন ধারনের বিন্দুমাত্র সম্বন্ধ ছিলনা। বরং তিনি এই কাজগুলির মধ্য দিয়ে, পরোক্ষে কলকাতার কয়েক লাখ ইংরেজি শিক্ষিত, সাম্রাজ্যের বন্ধু, উন্নতিশীল মধ্যবিত্তের চাকরি, দালালি এবং উমদোরির ব্যবস্থা করছিলেন। তাই তিনি আজও বাঙালি মধ্যবিত্তের নিত্যপুজ্য।
ভারতের আলেকজান্ডার কোম্পানির প্রাক্তন প্রধান কর্নেল জেমস ইয়ং তাকে পরিচয় করিয়ে দেন, ব্রিটিশ ইন্ডিয়া সোসাইটির র‍্যাডিক্যাল নেতা লর্ড ব্রুহামের সঙ্গে। ভারতে ফেরার সময় তাকে আবারও রানীর সঙ্গে আলাপ করানো হল। এবং নাইটহুড প্রদানের জন্য ইয়ং, ব্রুহামকে প্রস্তাব করলেন। ব্রুহামের ধারনা ছিল সাম্রাজ্য তাকে ব্যারোনেট সম্মানে ভূষিত করবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটি ঘটে ওঠেনি।

আশ্চর্যের কথা ঐতিহাসিকেরা তার জীবনী, লন্ডনের ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পদলেহনকারী এই ভাষনকে আজও অকুতোভয়ে সম্মান জানাচ্ছেন। আরেক রকম পত্রিকার উক্ত প্রবন্ধিক বলছেন, ‘তবে দ্বারকানাথের এই দরাজ ও খোলা সার্টিফিকেটের পেছনে ঐতিহাসিকেরা তাঁর প্রখর রাজনৈতিক বুদ্ধি এবং একজন সুদক্ষ কূটনীতিবিদের ছাপ খুঁজে পান।’ ঐতিহাসিকদের সাম্রাজ্যবন্ধুত্বের নিরাপত্তার বেড়াজাল আর বরাভয় বরাবরেরমত আজও তাকে বাঁচিয়ে চলেছে। অতনু বসুর প্রবন্ধ বা ব্লেয়ার বি ক্লিংএর জীবনী তাঁর উজ্জ্বল নিদর্শন। কিন্তু তিনি কি মনে করেন সেই মন্তব্য, বাসুজা বোধহয় যত্নসহকারে এড়িয়ে গিয়েছেন। কিন্তু তিনি যিদি ঐতিহাসিক হন তো সোনায় সোহাগা।

দ্বারকানাথ ঠাকুরের ঋণ এবং তাঁর সাম্রাজ্যের ঋণশোধ - দ্বিতীয়, Dwarakanath Tagore's England Visit

প্রথম জীবণে সাম্রাজ্য হাত উপুড় করে দ্বারকানাথকে যে সম্মান, প্রতিপত্তি, ধন, সম্পদ, প্রতিষ্ঠা দিয়েছে, সেই ঠাট বজায় রাখতে, তাকে  শেষ বয়সে বিপুল পরিমাণ ঋণ করেও সাম্রাজ্যের বন্ধুত্বের সম্মান রাখতে হচ্ছে (পিতার সহিত দেবেন্দ্রনাথের সম্বন্ধ বিষয়ে তাঁহার একজন চরিতাখ্যায়ক লিখিতেন, ‘শুনিয়াছি যে দেবেন্দ্রনাথ কোন দিন তাঁহার পিতার সম্বন্ধে বিশেষ কোন প্রসঙ্গের উত্থাপন করিতেন না। একদিন শুধু বলিয়াছিলেন যে, পিতা ইংলন্ডে থাকিতে তাঁহার হাতখরচের জন্য মাসিক লাখ টাকা করিয়া তাঁহাকে পাঠাইতে হইত। সুতরাং লোকে যে তাঁহাকে ‘প্রিন্স’ বলিয়া ডাকিবে, তাহাতে আর আশ্চর্য্য কি!’ - মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের আত্মজীবনী, সতীশচন্দ্র চক্রবর্তীর পরিশিষ্ট)। সঙ্গে জুড়ল দ্বারকানাথের মৃত্যুর পর প্রায় সবকটি ব্যবসার গণেশ ওলটানোর ঋণ(মহর্ষি আত্মচরিতে বলছেন কোম্পানিগুলোর গণেশ ওলটানোয় ঠাকুর বাড়ির ঋণ ১ কোটি আর পাওনা ৭০ লক্ষ। অর্থাৎ দেনা ৩০ লক্ষ।)
যতদিন দ্বারকানাথ বেঁচে ছিলেন ততদিন নিজের ব্যক্তিত্ব এবং খুঁটির জোরে বেঁচেছেন। কিন্তু সেই সবকটি ঋণ, কড়ায় ক্রান্তিতে ফেরত দিতে হয়েছিল দেবেন্দ্রনাথেদের দেবেন্দ্রনাথ নিজে বলছেন, তাঁর উচ্ছৃঙ্খল কর্পোরেট পিতার শেষ ঋণটি শোধ করে গিয়ে প্রায় জেলে যেতে হয়েছিল এবং আঙ্গুলের শেষ আংটিটি বাঁধা রাখার উদ্যোগ নিয়েছিলেন(দেবেন্দ্রনাথের অঙ্গুলিতে একটি বহুমুল্য অঙ্গুরীয় ছিল। তাঁহার বিষয় সম্পত্তির তালিকা প্রস্তুত করিবার সময়ে তিনি এই অঙ্গুরীটি সেই তালিকাভুক্ত করিতে ভুলিয়া গিয়াছিলেন। যখন গর্ডন সাহেব সভার মধ্যে তাঁহাদের বিষয় সম্পত্তির তালিকা পাঠ করিতেছিলেন, তখন দেবেন্দ্রনাথ সভাতে গাত্রোত্থান করিয়া বলিলেন, ‘আমার অঙ্গুলিতে একটি বহুমুল্য অঙ্গুরী আছে; তালিকা প্রস্তুতের সময়ে আমি তাঁহার উল্লেখ করিতে ভুলিয়া গিয়াছিলাম। এই অঙ্গুরিও তালিকাভুক্ত করুন।’ মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের আত্মজীবনী, সতীশচন্দ্র চক্রবর্তীর পরিশিষ্ট)তাও সম্ভব হয় নি। অন্য এক পারিবারিক বন্ধু সেই দায় নেন। ফলে দ্বারকানাথ তাঁর সন্তানদের কাজকর্ম দিয়েই হয়ত অনুভব করতে পারছিলেন যে তাঁর উত্তরসূরীদের তাকে মনে রাখার কোনও কারণ নেই
শেষ পর্যন্ত তিনি লন্ডনে ব্রিটিশ পোস্ট অফিসে মাত্র দুঘণ্টায় দুলাখ চিঠিপত্র বিলির ব্যবস্থা প্রত্যক্ষ করেন। ব্যাঙ্ক অব ইংল্যান্ডের কাজও দেখেন। দেখেন নোট ছাপানর পদ্ধতি। রেল ব্যবস্থা দেখেন। লিভারপুলে রেল ইঞ্জিন তৈরির কারখানায় যান। সামরিক এবং অসামরিক জাহাজ নির্মান কারখানাও দেখেন। আরও অনেক কাজ কারবার দেখেন যা এই প্রবন্ধের উল্লেখের বিষয় নয়। তাঁর মত উদ্যোগী কর্পোরেট সংস্কৃতিঋদ্ধ মানুষ, সাম্রাজ্যের মূল কেন্দ্র, মেট্রপলিটনে গিয়ে যে যে কাজগুলি করার দরকার, ঠিক সেই কাজগুলি মন দিয়ে করেছেন।

দ্বারকানাথ ঠাকুরের ঋণ এবং তাঁর সাম্রাজ্যের ঋণশোধ - Dwarakanath Tagore's England Visit

দ্বারকানাথ ঠাকুর যখন বিলেত যাচ্ছেন, তার আশংকা ছিল, তার উত্তরাধিকারীরা হয়ত শেষ পর্যন্ত তার এই মহার্ঘ বেলগাছিয়া ভিলা রক্ষা করতে পারবেন না। অন্য রকম পত্রিকার প্রথম বর্ষ, চতুর্দশ সংখ্যার ২৭ পাতায় ‘পিতামহ-পৌত্রের প্রথম সমুদ্রযাত্রা’ প্রবন্ধে অতনু বসু বলছেন, ‘রওনা হবার প্রাক্কালে দ্বারকানাথ বেলগাছিয়ায় সুবৃহৎ ভিলা এবং তার অভ্যন্তরস্থ মুল্যবান সামগ্রী বিক্রির জন্য সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন দিচ্ছেন।’ ইংলিশম্যান পত্রিকা লিখছে,‘যেসব মহামূল্যবান সামগ্রী এই একটি মনোরম স্থানে – এই পরীদের রাজ্যে দ্বারকানাথ সমাহৃত করেছেন, সে সমস্তই কি বাকপটু নীলামদারের হাতুড়ির ঘায়ে বিকিয়ে যাবে, সর্বচ্চ দাম যে হাঁকবে তার কাছে, জলের দরে?’
বাস্তব সম্পর্কে দারুন সচেতন দ্বারকানাথ যে খুব খারাপ ভেবেছিলেন তা বলা যাবে না। পুত্রদের যে তাঁর সাম্রাজ্যের নানান কলকব্জায় কর্পোরেটিয় তৈলমর্দন এবং লুঠের কাজে খুববেশী উৎসাহ ছিল, সে কথা বোধহয় দেবেন্দ্রনাথের জীবনী পড়লে বোঝা যায় না- ‘আমাদের বাড়ীতে বিদ্যাবাগীশ সাহস করিয়া আমাকে পড়াইতে পারিতেন না। যে হেতুক আমার পিতার একটি কথা শুনিয়া তিনি ভয় পাইয়াছিলেন। তিনি বিদ্যাবাগীশের প্রতি এক দিন বিরক্ত হইয়া বলিলেন যে, ‘আমি ত বিদ্যাবাগীশকে ভাল বলিয়া জানিতাম, কিন্তু এখন দেখি যে, তিনি দেবেন্দ্রের কাণে ব্রহ্মমন্ত্র দিয়া তাঁহাকে খারাপ করিতেছেন। একে তাঁর বিষয়-বুদ্ধি অল্প – এখন সে ব্রহ্ম ব্রহ্ম করিয়া আর বিষয় কর্ম্মে কিছুই মনোযোগ দেয় না।’ আমার পিতার বিরক্ত হইবারও একটা হেতু ছিল। যখন এখানে গবর্ণর জেনারেলের ভগিনী মিস্‌ ইডেন প্রভৃতি অতি প্রধান প্রধান বিবি ও সাহেবদিগের এক ভোজ হয়। রূপে, গুণে, পদে, সৌন্দর্য্যে, নৃত্যে, মদ্যে, আলোকে আলোকে বাগান একেবারে ইন্দ্রপুরী হইয়া গিয়াছিল, এই ইংরাজদের মহা ভোজ দেখিয়া কোন কোন বিখ্যাত বাঙ্গালীরা বলিয়াছিলেন যে, ‘ইনি কেবল সাহেবদের লইয়া আমোদ করেন, বাঙ্গালীদের ডাকেন না।’ এই কথা আমার পিতার কর্ণগোচর হইল। অতয়েব ইহার পরে তিনি একদিন ঐ বাগানে প্রধান প্রধান বাঙ্গালীদের লইয়া বাইনাচ ও গান বাজনা দিয়া একটা জমকাল মজলিস্‌ করিলেন। সেদিন তাহাঁদিগকে অভ্যর্থনা ও পরিতোষণ করা আমার একটি নিতান্ত কর্ত্তব্য কর্ম্ম ছিল; কিন্তু ঘটনাক্রমে সে দিন আমাদের তত্ববোধিণী সভার অধিবেশনের দিন পড়িয়া গিয়াছিল। আমি সেই সভা লইয়া ব্যস্ত ও উতসাহী – আমরা সেই দিন ঈশ্বরের উপাসনা করিব, অতয়েব এই গুরুতর কর্ত্তব্য ছাড়িয়া আমি আর বাগানের মজলিসে যাইতে পারিলাম না। পিতার শাসনে ও ভয়ে একবার তাড়াতাড়ি করিয়া সেই বিলাস ভূমি ঘুরিয়া চলিয়া আসিলাম। এই ঘটনাতে আমার মনের ঐ দাস্য তাঁহার নিকটে বিশেষ প্রকাশ হইয়া পড়িল(মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের আত্মজীবনী)

পার্থিব সম্পদে সন্তানের প্রায়বৈরাগ্য দেখে, বেলগাছিয়া ভিলার বিপুল মুল্যবান সামগ্রী নিলামে তুলে, অজস্র ঋণে জর্জরিত হয়ে লন্ডন থেকে ভারত ফেরত হলেনদ্বারকানাথ যেন মহাভারতের অর্জুন। এককালে দেবতারা মধ্যম পাণ্ডবকে যে মহার্ঘসব শস্ত্র উপহার দিয়েছিল, শেষ জীবনে, একটি একটি করে সেগুলি তারা ফেরত নিচ্ছেন। মূষলপর্বের শুরুতে অসহায় অর্জুন তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছেন, তাঁর মাথায় আর দেবতাদের অভয় হস্ত নেই। চির পরিচিত গাণ্ডীবও মহাভারি