Showing posts with label উপনিবেশ. Show all posts
Showing posts with label উপনিবেশ. Show all posts

Monday, November 11, 2019

উপনিবেশ বাবরি আর বিপ্লব

১) বাবরি মামলায় যা রায় দিয়েছে কোর্ট তাতে গুরু আদবানিকে ফাঁসিকাঠে ঝোলাবার সুযোগ করে রাখল।
২) এটাও ঔপনিবেশিক আদালতীয় প্রমান নির্ভর ব্যবস্থার বাইরে দাঁড়ানোর একটা ঘটনা হয়ে রইল। ব্রিটিশ কেস ল'র বিপরীতে এটা একটা উদাহরণ হয়ে থাকল। ভবিষ্যতে শুধুই ভোটে জিতে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেখিয়ে এবং জনগণের ধারণার দোহাই দিয়ে কোনও প্রমান ছাড়া উচ্চ আদালতে এরকম একটা রায় দিতে পারে। অর্থাৎ এরপরে কোনও দিন হয়ত কোর্ট বলবে জনগণের চাহিদা হল ওমুক তমুক, সেগুলি পালন করা হোক।
পেন্ডিং বিপ্লব নিয়ে বামপন্থীরা এরকম কিছু ভেবে দেখতে পারেন।
৩) ভদ্রবিত্তের শেষ দিন আসন্ন। এর থেকে বড় মন্দা দুর্যোগ ভারত বা বিশ্ব দেখেছে। ভদ্রবিত্তের দুরবস্থা মন্দায় খাবি খাওয়া থেকে আরও গভীর। রাষ্ট্র তার লুঠের কাজে ভদ্রবিত্তকে বাঁচাতে উতসাহী নয়।ভদ্রবিত্ত শ্রম নিরপেক্ষা প্রযুক্তি তার হাতে।
৪) নেহরু-মহলানবিশ ইত্যাদিদের চেষ্টায় ইওরোপমন্য মধ্যবিত্তকে বাঁচানোর রাষ্ট্রীয় রক্ষাকবচগুলির গুষ্টির ষষ্ঠিপুজো হচ্ছে।উপনিবেশের ফল, কংগ্রেস এবং বাম তাত্বিকদের হাতে তৈরি ঔপনিবেশিক হিন্দি হিন্দু হিন্দুস্তানি তত্ত্ব শেষ অবদি আদবানী-বাজপেয়ীও রক্ষা করেছিলেন, তার পোংগা মারছে দুই গুজরাটি।
৫) মোদি-শা জুটি ঔপনিবেশিক কাঠামোগুলো একে একে দুর্বল করে যতটুকু তার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা তৈরি হয়েছিল, তাকে ভাঙছেন। কেন্দ্রিয় প্রশাসনে ল্যাটারাল এন্ট্রির ব্যবস্থা, কেন্দ্রিয় ব্যাঙ্কের তথাকথিত স্বস্বাধীনতা কাড়া এবং এনআরসি আর অযোধ্যার মত গুরুত্বপূর্ণতম মামলায় কেন্দ্রিয় বিচার তথাকথিত নিরপেক্ষতাকে চুরচুর করে ব্যবস্থাকে উলঙ্গ করে দেওয়া।

Thursday, March 1, 2018

আহা উপনিবেশ, বাহা উপনিবেশ, অহো উপনিবেশ!

ভদ্র বাঙালির মনের মধ্যে ঘাপটি মেরে বসে থাকা একটুকরো মিষ্টি মিষ্টি, গাবলুগুবলু, টিনিটিনাদ্য ইওরোপিয় উপনিবেশিক মানসিকতা স্ফূরণের কর্মউদ্যমগুলির জয় হোক!
জয় ঔপনিবেশিক ইওরোপের জয়!
জয় হোক! জয় হোক! জয় হোক!
এই সূত্রটা দেখুন
ড্যানিশ কাফে!
http://www.getbengal.com/home/story_detail/have-a-coffee-date-at-the-danish-tavern-of-serampore

Wednesday, April 24, 2013

দই খেলেন গোবর্ধন, বিকারের বেলায় হর্ষবর্ধন - ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের লুঠ, রেলপথ এবং মন্বন্তরনামা বা গণহত্যা৩ - loot, railway, famine, genocide in colonial india3


অবাধ রপ্তানির ফলে দামও অবাধে বেড়েচলে। তার ওপর মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা।  টাকার দাম কমিয়ে দেওয়া হোল(অবমূল্যায়ন) ব্রিটিশদের ভারতীয় শস্য কেনা আরও সস্তা হয়ে গেল। আরও পরিহাসের কথা, যে রেলপথটি তৈরিই হয়েছিল মন্বন্তর রোখার জন্য সেতো মন্বন্তর রুখলই না, বরং যে স্টেশনের নামে রেলপথ, সেই নাগপুরেই ১৮৯৬-৯৭র মাঝামাঝি নাগাদ খাদ্যশস্যর জন্য দাঙ্গা হল। পাশের রাজ্য ডুঙগারগঢ়ে শাস্তির হুমকি আর সেনা নামিয়ে অবস্থা সামাল দেওয়া হয়। এই রেলপথেরই পাশে সাগর জেলায় ঊল্টো পুরাণ- ১৮৬৫-৯৫ পর্যন্ত জনসংখ্যা বাড়ল ১৮ শতাংশ, চাষযোগ্য জমির পরিমাণ বাড়ল ৪৮ শতাংশ, রেলযোগে গম রপ্তানির পরিমাণ, ১৮৮৭-৯৭, এই এক দশকে, ৪০,০০০ মণ থেকে ৭,৫৮,০০০ মণে গিয়ে পৌঁছল। 
মন্বন্তর ফান্ডের সুযোগ পাওয়া অন্য রেলপথটি কী করল দেখা যাক ইন্ডিয়ান মিডলাণ্ড রেলওয়ে কোম্পানির ঘাড়ে চেপে বোম্বাইয়ের গ্রেট ইন্ডিয়ান পেনিনসুলার রেলওয়ে(জিআইপিআর) নিজেদের রেলপথ এলাকা আরও বিস্তারলাভ করাবার সুযোগ পেল।  দুটি রেল কোম্পানির পরিচালন ব্যব্যস্থা প্রায় সমান সমান। ফলে জিআইপিআর, মিডলাণ্ডকে দখলে নিল। ভারতে রেল ব্যবসার জিআইপিআরএর প্রধান প্রতিযোগী ইস্ট ইণ্ডিয়ান রেলওয়ে। কোম্পানিটি বেসরকারি কিন্তু সরকারি মদত পুষ্ট। সরকারের গ্যারান্টি তার রয়েছে। ১৮৭০এ রেলের জাতীয়করণ হাওয়ার সময় ইণ্ডিয়া অফিস জিআইপিআরএর শেয়ার কেনেনি। ফলে পরের ২৫ বছর রেলপথটির রোজগার, ভারত সরকারের সামনে, উপভোগ করেছে জিআইপিআরএর অংশিদারেরাফেমিন কমিশনের সামনে সাক্ষীরা বলেছেন, মন্বন্তরের সময় জিআইপিআর অতিরিক্ত শুল্ক ধার্য করেছে। তার জন্য কমিশন জিআইপিআরকে সমালোচনাও করেছে। এতদিন যে জিআইপিআরএর ডাইরেকটরেরা ৫ শতাংশ গ্যারান্টি ভোগ করে এসেছে, তারাই, মিডলাণ্ড কোম্পানির ঘাড়ে চেপে ফেমিণ ফাণ্ডএর সুযোগ তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করল।
অন্যদিকে কলকাতায় ইস্ট ইন্ডিয়ান রেলওয়ের জাতীয়করণএর গুনাগার দিল ভারতীয় করদাতারা। ইআইআরএর অংশীদারদের সরকারকে দিতে হল মূলের ওপর ৩০ শতাংশ বেশী এছাড়াও বছরে বছরে লভ্যাংশএর অংশীদারি।  ১৮৮০র ফেমীন কমিশনের প্রধান স্যর রিচার্ড স্ট্রাচি, রেল কোম্পানিটির প্রধান মনোনীত হয়ে বছরে বছরে বিশাল অংশ এন্যুইটি, বার্ষিক রোজগার অর্জন করেন। আমলা হিসেবে চাকরি করে যে পেনসনের খুদকুঁড়ো অর্জন করেছেন, তার তুলনায় এই এন্যুইটির পরিমান প্রায় পাহাড় প্রমাণ। স্ট্রাচির ইআইআরএর দায়িত্ব ছিল খাদ্যশস্য বিতরণের। বেঙ্গল নাগপুর রেলপথের সঙ্গে মিলে তারা খাদ্যশস্যএর সঙ্গে কয়লার ব্যবসা শুরু করে। তবে স্ট্রাচি বলেন, তার কোম্পানি, লন্ডনের ফেমিন রিলিফ চ্যারিটিতে বিন্দুমাত্র অংশগ্রহণ করে নি।
রেল কোম্পানিতে অপরিকল্পিত বিনিয়োগও হয়েছে। আসামের বেশ কিছু অলাভজনক বেসরকারি রেল প্রকল্পে সরকারি গ্যারান্টি যোগাড় করেন স্ট্রাচি। আসাম বাঙলা রেলওয়ে তৈরি হয় চট্টগ্রাম বন্দর ব্যাবহার, আসামে খাদ্য বিতরণ আর বার্মায় সেনা পাঠানোর জন্য। রমেশ দত্ত একে সব থেকে খারাপ পুঁজিবাদী পরিকল্পনাগুলির মধ্যে সর্বাগ্রে রাখার কথা বলেন। কার্জন একে মন্বন্তর, সামরিক পরিকল্পনা ও ব্যবসায়িক পরিকল্পনার সুচতুর ককটেল হিসেবে মন্তব্য করেন। এই প্রকল্পটিতে ভারতের করদাতাদের ৯ মিলিয়ন(তৈরির খরচ ৫ মিলিয়ন) ডলার খরচ হয়। এই রেলপথ তৈরিতে সবথেকে বেশি লাভ করেছেন ব্রিটেনের কারখানা মালিক আর ভারতের ফড়েরা। তিনি বলছেন ব্রিটেন থেকে যত পরিমাণ রেল যন্ত্রাংশ এসেছে, তার তুলনায় সেচের সরঞ্জাম এসেছে বিন্দুবৎ। এছাড়াও সাম্রাজ্যের পরিচালকরাও সেচ ব্যবস্থায় বিনিয়োগের বিপক্ষে রায় দিয়েছেন। ভারত সচিব, পরে প্রধানমন্ত্রী, সলিসবেরি ব্রাডফোর্ডে ১৮৭৬-৭৮এর মন্বন্তরের সময়, এক সভায় বলেন, ভারতে সেচ ব্যবস্থা বিনিয়োগ করার অর্থ গরীব অর্থ করদাতাদের ওপর আরও বেশী কর আর খরচের বোঝা চাপানো। ফলে দারিদ্র আরও বৃদ্ধি পাবে। উল্টোদিকে তিনি এত কঠিন কথা রেল বাজেট তৈরির সময় বলেন নি। বরং তিনি ভারতের কৃষকদের উপদেশ দিয়ে বলেছেন, তারা বাণিজ্যিক ফসল উৎপাদন না করে খাদ্য শস্য উৎপাদন করুক যাতে কৃষক মহাজনের শোষণের হাত থেকে মুক্তি পায়। এবং তিনি বলেন কৃষকের কাছে এটি একটি বীমাও বটে। অথচ মন্বন্তর রোখার নামে ভারতীয় রেল তৈরি করেছে ফড়ে, মহাজন, বাণিজ্য চাষ এবং শস্য বণিকদের। এমনকি ম্যানচেস্টারের মিলমালিক এবং কোয়েকার দর্শনে বিশ্বাসী জন ব্রাইট ১৮৭৭এ বলছেন মাত্র ৩০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করলেই, মন্বন্তরে ভোগা লাখো লাখো কৃষক উপকৃত হতে পারত। ঠিক এর আগের বছরে ব্রিটিশ উপনিবেশ রেলে ১৬০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করলেও সেচে বিনিয়োগ হয়েছে ২০ মিলিয়ন ডলার।
রেলে বিনিয়োগ এই ধারণা থেকে করা হয়েছে যে, ভারতের মন্বন্তর খাদ্যশস্যের অপ্রতুলতার দরুন হয় নি, হয়েছে এলাকায় খাদ্য শস্য না পাওয়া যাওয়ার জন্য। ফলে ভারতে খাদ্যশস্যের চলাচল হওয়া ভীষণ জরুরী। তার জন্য রেল। ভারতীয় রেলের এক প্রাক্তন পরামর্শদাতা, হোরেশ বেল এই সাম্রাজ্য তত্ত্ব খারিজের জন্য কোমর বাঁধেন। তিনি ১৮৯৮এর ফেমিন কমিশনের তথ্য তুলে বলছেন, সাম্রাজ্যে ১৮৯৬-৯৭তে ১৮-১৯ মিলিয়ন টনের মতো খাদ্য শস্যের অভাব রয়েছে। মন দিয়ে খুঁজলে ১৮৯৮-১৯০০র মন্বন্তরে হয়ত আরও বেশী ঘাটতির খবর পাওয়া যেতেপারে।
মন্বন্তর রুখতে সরকারের প্রয়োজন ছিল আরও বেশী খাদ্য শস্য আমদানি করা। শুধু রেল তৈরি করে অথবা দাম নিয়ন্ত্রণ করে মন্বন্তর রোখা সম্ভব নয়। আর মন্বন্তরে দান শস্যর দাম বেশী হলেও স্থানীয় শস্য ব্যাবসায়ীরা এই শস্য নিয়ে ব্যবসা করতে পারেন নি, কেনোনা, প্রায় সবই বিদেশে চড়া দামে রপ্তানি হয়ে যাচ্ছিল। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে একমাত্র বার্মাতেই মন্বন্তরে ভর্তুকির দামে খাবার দেওয়ার  সুযোগ ছিল। কিন্তু খাদ্যশস্যের দাম আর পরিবহন খরচের দরুন সেটা হয়ে ওঠে নি। বার্মার রেলে আকাশ ছোঁয়া ভর্তুকি দিয়েও খাদ্য দ্রব্যের দাম কমিয়ে রাখা যায় নি। অন্যভাবে বললে, মন্বন্তরে লাভ করে, ফুলে ফেঁপে উঠেছে রেল কোম্পানিগুলো। ১৮৯৬-৯৭ সালের মন্বন্তরে মেইকটিলা-মিনগিয়ান রেলপথ, বর্মার মন্বন্তর বরাদ্দের ৯৫ শতাংশ খাদ্যসশ্য রপ্তানি করে। বার্মার প্রশাসকেরা এই রেলজালের মাধ্যমে ইউরোপে আরও বেশি দামে গম পাঠাতে সুরু করেন। বার্মা রেলওয়ে কম্পানির জন্য সস্তার শ্রমিক, আরও লাভের গ্যারান্টি আর মন্বন্তর ভর্তুকি দিয়েও কোম্পানির লাভ বাড়লেও জনগণের মন্বন্তরের কবলে পড়ে।
সরকারি মদতে, করদাতাদের অর্থে তৈরি হয়ে ফুলে ফেঁপে ওঠা এই রেল কোম্পানিগুলো, মন্বন্তরের সময়, মন্বন্তর এলাকাগুলোয় সস্তার খাদ্যশস্য সরবরাহ করতে ব্যার্থ হয়েছে। গম পরিবহনএর শুল্ক বেশ চড়া ছিল, বিশেষ করে আমেরিকারমত যেসব দেশে গম রপ্তানি হয়েছে, তার তুলনায়। রয়্যাল এগ্রিকালচারাল কমিশন সস্তায়, প্রতি মাইলে ২৫ পেনি শুল্কে গম পরিবহনের জন্য আমেরিকার চেষ্টাকে সাধুবাদ জানায়। ভারতের শুল্ক এর তুলনায় অনেক বেশি ছিল, বিশেষ করে জিআইপিআর অথবা ইআইআর রেলপথে। সরকারি প্রচেষ্টায় পরিবহন শুল্ক কমলেও তাও আমেরিকার তুলনায় অনেক বেশি। আর এই পরিবহন ব্যাবস্থায় মধ্যসত্ত্বভোগীদের সংখ্যা বাড়ায় খরচও বেড়ে চলে।
 ১৮৭৫-১৯১৪ সময়ে ১ কোটি ৬০ লক্ষ ভারতীয় মন্বন্তরের কবলে পড়ে মারা যান। অন্যভাবে বললে তাদের খুন করা হয়, এটি আসলে গণহত্যাই। মন্বন্তর বলা আসলে ভাবের ঘরে চুরি। ব্রিটিশ অর্থ ব্যবস্থাকে মন্বন্তরের ছোঁয়ার বাইরে রাখার চেষ্টা হয়েছিল ইন্ডিয়া অফিস মারফৎ, যাতে তৃতীয় দুনিয়ার এসব খারাপ সারাপ ব্যাপারে তাদের নাম উঠে না আসে। ১৮৯৬-৯৭ এবং ১৮৯৯-১৯০০ অর্থবর্ষে ব্রিটেন, ইন্ডিয়া অফিসকে মন্বন্তরের জন্য দান দিতে চাইলেও ভারত সরকার সেই দান নিতে অস্বীকার করে। বিদেশী বা ভারতের কোনও মন্বন্তর সাহায্য নেওয়া হয় নি। অথচ, মন্বন্তর রোখার অর্থ বিনিয়োগ করে ভারত জুড়ে রেল সংযোগ বেড়ে চললেও, সেই কোম্পানিগুলো মন্বন্তর রোখার কাজে বিন্দুমাত্র সাহায্য করে নি, বরং প্রকোপ বাড়াবার কাজ করেছে। দ্বিতীয়বারের জন্য রেল কোম্পানিগুলোকে অর্থ সাহায্য করার সময়, ভারত সরকার রেল আমলাদের মন্বন্তর তৈরির জন্য বিন্দুমাত্র দায়ি করে নি, এবং যে তিনটি ফামিন কমিশন তৈরি হয়, তারাও রেল আমলাদের প্রশ্ন করে নি।
সাম্রাজ্য মনে করত ভারতএর জনগন নিজেদের দোষেই মারাযাচ্ছে। এই ঘটনায় ব্রিটেনএর বিন্দুমাত্র হাত নেই। ভারতের জনঘনত্ব এই মন্বন্তরগুলোর জন্য দায়ি, এরকম এক ধারনা ইউরোপ ছড়িয়ে ছিল। যেমন, ম্যালথাসবাদী ভাইসরয় লিটন। তিনি মনে করতেন ভারতই তার দুর্দশার জন্য দায়ি, The population of this country is still almost wholly dependent upon agriculture. It is a population which, in some parts of India, under the security for life which are the general consequence of British rule, has a tendency to increase more rapidly than the food it raises from the soil.
ভারতের বিশিল্পায়নের অন্যতম কারবারি, উপনিবেশিক রেল ভারতের জনগণকে আরও বেশি জমির ওপর নির্ভরশীল করে তোলে। ১৮৯৮-১৯০০র পরে অনেক বেশি বিনিয়োগ সেচ ব্যাবস্থায় বরাদ্দ হয়। কিন্তু রেল কোম্পানিগুলোকে আরও সাহায্যের নীতি আরও বেশি আঁকড়ে ধরছিল, যার লাভ সুদে আসলে উসুল করেছে কোম্পানিগুলোর লন্ডনের বোর্ড সদস্য আর অংশিদারেরা। এ ছাড়াও লাভ করেছেন শস্য ব্যাবসায়ী, মজুতদার, মহাজনেরমত মধ্যসত্তভোগীরা। 

দই খেলেন গোবর্ধন, বিকারের বেলায় হর্ষবর্ধন - ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের লুঠ, রেলপথ এবং মন্বন্তরনামা বা গণহত্যা২ - loot, railway, famine, genocide in colonial india2


ব্রিটিশরা বরাবরই বোঝাবার চেষ্টা করেছে, মন্বন্তর রুখতে রেলপথ দাওয়াইয়ের জুড়ি নেই। দাদাভাই নৌরজী এই তত্ত্ব সরাসরি খারিজ করে দিয়েছেন। জুল্যান্দ দানভারস, ভারত অফিসের পাব্লিক ওয়ার্কস দপ্তরের সদস্য, নৌরজিকে এক চিঠি লিখে বলেন, রেলের দরুন নতুন নতুন বাজার সৃষ্টি হচ্ছে, দানা শস্যের দাম বাড়ছে। তিনি পরিসংখ্যানের হিসেব দেখিয়ে বলেন, এই বাড়তি দাম ভারতের জাতীয় আয় বাড়াতে সাহায্য করছে। এই পরিসংখ্যানের যাদুবিদ্যাকে নস্যাৎ করে নৌরোজী বলেন, if the mere movement of produce can add to the existing wealth, India can become rich in no time. All it would have to do is to go on moving its produce continually.. .the magic wheels of the train wealth will go on springing till the land will not suffice to hold it. বাজার অর্থনীতির সূত্রে জাতীয় আয় বাড়ার সংবাদের মরীচিকায় ক্ষমতার কাছে থাকা অর্থনীতিবিদের দেহে রক্ত চলাচল বাড়তে পারে, কিন্তু সাধারণের আয় আরও কমে, ফড়েদের আর শিল্পপতিদের ব্যাঙ্ক ব্যাল্যান্স বাড়ায় সেই তত্ত্ব সাধারণ মানুষ জানে।
তবুও রেলকথা শেষ হয় না। ভাইসরয়এর পাবলিক একাউন্টস কমিটির সদস্য স্যর থিওডর হোপ, ১৮৮০র দশকে ভারতীয় করদাতাদের অর্থকে আরও কাজে লাগাতে অতি উতসাহে রেলপথে বিনিয়োগ করতে এগিয়ে এলেন। তিনি রেলকে মন্বন্তর(না গণহত্যা)এর সমাধান আর সেনাবাহিনীর সহযোগী হিসেবে দেখলেন। হোপ, লুই ম্যালে(Louis Mallet), এবং হোপএর গুরু ইভিলিন বারিং(Evelyn Baring) মন্বন্তরের জন্য তৈরি চ্যারিটেবল ফেমিন ইন্সিওরেন্সের অর্থ সম্পদ, সরকারের দেওয়া আর্থিক নিরাপত্তার চাদরে মোড়া রেল কোম্পানিগুলিতে বিনিয়োগের কথা বলেন। কয়েকটি কেন্দ্রিয় প্রদেশ উনবিংশ শতকের শেষ দিকে মন্বন্তরে প্রায় উজাড় হয়ে যেতে বসে। ১৮৮৬তে লন্ডনের ষ্টক বাজারে দ্য বেঙ্গল নাগপুর রেলওয়ের ষ্টক ছাড়া হয়। অংশিদেরেরা সরকারের গ্যারান্টি পেলেন এবং কর্তৃপক্ষ ভারতীয় করদাতাদের অর্থে তৈরি মন্বন্তর নিরোধের জন্য তৈরি চ্যারিটেবল ফেমিন ইন্সিওরেন্সের সাহায্য পেলেন। ১৮৭৮এ রক্ষণশীল ভাইসরয়, লর্ড লিটন, এই চ্যারিটেবল ফেমিন ফান্ড স্থাপন করেন। এর উদেশ্য ছিল যারা এই ফান্ড থেকে সাহায্য পেলেন তারা মন্বন্তরে সাহায্য করবেন। গরীব চাষিদের থেকে বাধ্যতামুলকভাবে খাজনা নেওয়া হয়।
১৮৮৫তে প্রধানমন্ত্রী চার্চিলের বাবা, ভারত সচিব, রান্দলফ চার্চিল(ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আর ব্যাঙ্ক অফ ইংল্যান্ডের অংশিদার – গবেষকরা বলেন যারাই ভারত সচিব হয়েছেন তাদের অধিকাংশই বদমাশ কম্পানি আর ব্যাঙ্ক অফ ইংল্যান্ডের অংশিদার, রথসচাইলড পরিবারের অনুগত, চার্চিলরা বংশপরম্পরায় ব্যাঙ্ক অফ ইংল্যান্ডের অংশিদার ছিলেন, ব্যাঙ্ক অফ ইংল্যান্ড ১৯৯৭তে পরিপুর্ণ সরকারি ব্যাঙ্ক হিসেবে গন্য হল), এই ফান্ড, বেঙ্গল নাগপুর রেলওয়ে আর ইন্ডিয়ান মিডল্যাণ্ড রেলওয়ে কোম্পানিতে বন্ড আর ডিভিডেন্ডে বিনিয়োগ করেন। বেঙ্গল নাগপুর রেলওয়ে রথসচাইলড পরিবারের(বকলমে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সবথেকে বড় অংশিদার। বিশ্বেন্দুর লেখা বদমাশ কোম্পানি দেখতে পারেন) উদ্যম। উনবিংশ শতকের প্রকল্পগুলি ধরলে, এই একটিমাত্র প্রকল্প, যেটিতে সবথেকে বেশী পরিমান সম্পদ বিনিয়োগ হয়েছে। এই প্রকল্পে বিভিন্ন রেল মালিক, প্রাক্তন সরকারি আমলা, পার্লামেন্টের সদস্য বিনিয়োগ করে। তবে মন্বন্তরএর জন্য সরিয়ে রাখা অর্থ ভুল ব্যাবহারের জন্য অন্য দুই প্রধান সাম্রাজ্য পুরুষ ভাইসরয় কার্জন এবং ভারত সচিব লর্ড হামিলতন চার্চিলএর সমালোচনা করেন।
১৮৯০তে রেলপথ তৈরি সম্পূর্ণ হয়ে গেলে ধরে নেওয়া হোল এই কেন্দ্রিয় অঞ্চলগুলোর অধিবাসীদের জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে আর সবথেকে বড় কথা মন্বন্তর রোখা যাবে। ব্যাবসার মাধ্যমে জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়েছিল কিনা তা না বলা গেলেও, বিভিন্ন শুল্ক, কর আর খাজনার পরিমান যে বৃদ্ধি পেয়েছিল, ১৮৯৮এর ফেমিন কমিশনের সাক্ষ্যতে বহু মানুষ উল্লেখ করেছেন। রেলওয়ে সবথেকে বড়ও যে কাজটি করেছিল সেটি হল এই অঞ্চলগুলো থেকে খাদ্যশস্যএর ব্যাপক হারে বিদেশে রপ্তানি হওয়া। খাদ্য শস্যর দাম ৫০ থেকে ১০০ গুণ বাড়ল। সম্বলপুরের মত এলাকায় এত দাম বাড়ে যে সাধারণ মানুষের চাল-গমও কেনার ক্ষমতা লোপ পেয়ে যায়। কিন্তু শস্য রপ্তানি বন্ধ হয় নি বরং মন্বন্তরের সময় সেই পরিমান বেড়েছে। অথচ বেঙ্গল নাগপুর লাইন তৈরি হয়েছিল মন্বন্তর রোধ করার জন্য সেই লাইন অবলম্বন করে মন্বন্তর এলাকাগুলো থেকে শস্য রপ্তানি হচ্ছে অবাধে, মুক্ত বাণিজ্যের বন্ধু সরকার সেই চেষ্টায় বাধা দেয় নি
যদিও গবেষকেদের আজও ধারনা রয়েছে ভারত সরকার ভারতের জনগণের জন্য কাজ করতে বাধ্য। কেন ধারনা করেছিলেন কে জানে! স্বাধীনতা-পূর্ব ভারতে(বা পরেও ঘোমটা পালটালেও চরিত্র যে পাল্টায় নি তাতো দেখাই যাচ্ছে) যে সরকার তাকে ভুলে ভারত সরকার বলা হত ঠিকই, কিন্তু তার সত্যিকারের কাজ ছিল ব্রিটেনের স্বার্থ দেখা। সে কেন ভারতের জনগণের স্বার্থ দেখবে? ভারত সরকারতো কথার কথামাত্র।

দই খেলেন গোবর্ধন, বিকারের বেলায় হর্ষবর্ধন - ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের লুঠ, রেলপথ এবং মন্বন্তরনামা বা গণহত্যা১ - loot, railway, famine, genocide in colonial india1

ভারতবর্ষে ১৯০বছরের রাজত্ব চালাতে, ব্রিটিশ সাম্রাজ্য একটি পেনিও খরচ করে নি। সাম্রাজ্যের নীতি ছিল, শুধু ভারতের প্রশাসনএর খরচ তোলাই নয়, ব্রিটেনে হোয়াইটহল চালানো, বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগএর খরচ, বিশাল সেনাবাহিনী পুষে বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ চালানো, লুঠের সম্পদে ব্রিটেনে শিল্প বিপ্লব এবং সেই দৈত্যসম কারখানাগুলোতে অপরিসীম পরিমানে কাঁচামাল সরবরাহ করা এবং সেই কাঁচামাল ব্যাবহার করে যে উতপন্ন দ্রব্য তৈরি হবে, তাকে আবার উপনিবেশের বাজারে এনে বিক্রি করার পরিকাঠামো তৈরির খরচ বহন করবে ভারতেরমত প্রধান উপনিবেশগুলি এবং সেই জন্য ভারতে লুঠের ফলে অর্জিত বিপুল বিনিয়োগে বিস্তৃত রেলপথ তৈরির পরিকল্পনা, ব্রিটিশের ধ্রুপদী উপনিবেশিক অর্থনীতির অন্যতম অঙ্গ এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সবথেকে বড়ও বিদেশী বিনিয়োগের প্রকল্প।

১৯১৪ পর্যন্ত ভারতে রেল রাস্তা তৈরি করতে গিয়ে বেসরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে ২০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা হয়েছে। এই বিনিয়োগের অর্থ ১৭৫৭ থেকে ভারত লুঠের অর্থে সঞ্চিত হয়েছে। ১৮৬৯ পর্যন্ত ভারতেড় রেল প্রকল্পগুলোতে ব্রিটিশ গ্যারান্টি প্রথার মাধ্যমে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ ফেরত দেওয়ার ব্যাবস্থা হয়েছে। ফলে ভারতে রেল তৈরির খরচ কমে যায়। ১৮৭০এ দ্বিতীয় আফগান যুদ্ধ আর ভারতে একেরপর এক মন্বন্তর ঘটার ফলে সরকারি খরচ আকাশ ছোঁয়। ভারত সরকার রেলপথ তৈরিতে অনেক বেশি গুরুত্ব দেয় দুটো কারনে ১) সেনাচলাচল ২) কাঁচামাল ব্রিটেনে নিয়ে যাওয়া আর তৈরি দ্রব্য ভারতের বাজারে এনে সস্তায় বিক্রি করা।
কিন্তু আজও ভারতে ব্রিটিশ রেলপথ কুখ্যাত হয়ে থাকবে মন্বন্তর তৈরির কারন হিসেবে। তীর্থঙ্কর রায় বলছেন ১৮৭৬-৭৮, ১৮৯৬-৯৭ এবং ১৮৯৯-১৯০০ এই তিন সময়েড় মন্বন্তরে ভারতে খুব কম করে ১ কোটি ৩০ লক্ষ থেকে ১ কোটি ৬০ লক্ষ হতভাগ্য মানুষ মারাগিয়েছিল। আমরা বলছি তাদের খুন করা হয়েছিল। এইগুলিকে আজ গণহত্যা বলতে হবে। পার্লামেন্টের মন্বন্তর কমিশনের সামনে নানান সাক্ষ্য এবং তথ্য প্রদানের পরে, রেলপথ তৈরি হয়েছে ভারতের উন্নতির জন্য, সেই মিথ্যে-মিথটি প্রথম ভাঙল। সেই প্রথম বোঝাগেল, রেলপথ কিভাবে ব্রিটিশ কারখানাগুলির জন্য ভারতের কৃষি উৎপাদন নির্বিচারে ব্রিটেনের জন্য রপ্তানি করছে যাতে ৪০ বছর ব্রিটেনে মন্বন্তরের অবস্থা তৈরি না হয়। ভারতজুড়ে শস্যদানার কৃত্রিম অভাব তৈরি হয়েছে। এই অভাব এলাকায় শস্যদানার দাম বাড়িয়ে সাধারনের নাগালের বাইরে নিয়ে গিয়েছে। রেল পরিবহন আর রেলরাস্তার পাশে তৈরি টেলিগ্রাফ লাইনের দরুন কোথায় সস্তায় শস্যদানা পাওয়া যাচ্ছে আর কোথায় দাম বেশী, সেই খবর বিদ্যুৎ গতিতে পৌঁছে যাচ্ছে ফড়েদের কানে। ফলে নিত্যদিন নতুন নতুন মন্বন্তর এলাকা তৈরি হচ্ছে রেলপথের পাশের গ্রামগুলোয়। আর শস্যে মড়ক লাগলেতো কোথাই নেই। কমিশনের সামনে বহু ভারতীয় রেলপথের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন। তারা বলছেন রেল বিশ্বজুড়ে ভারতীয় ভাল আর গমের চাহিদা তৈরি করেছে, কিন্তু ভারতে উৎপাদন খুব একটা বাড়ে নি। ফড়েরা রেলপথ আর টেলিগ্রাফের মদতে, ভারতজুড়ে, কম দামের শস্য বেশি দামের অঞ্চলে নিয়ে যাওয়ার একটা অস্বাভাবিক দামী শস্যবাজার  তৈরি করে।
১৮৭৭এর মাদ্রাজ মন্বন্তরে দানাশস্যর দাম ৫ থেকে ৮ গুণ বেড়ে যাওয়ায় খাদ্য শস্য কেনার ক্ষমতা সাধারনের হাতের বাইরে চলেযায়। আরও অস্বাভাবিক কাণ্ড হল, তখনও কৃষি শ্রমিকদের কাজ ছিল। সেবছরও ভারত অফিস বলে গিয়েছে শস্য সরবরাহ স্বাভাবিক। অথচ ১৮৭৬-৭৮এর সময়ে বোম্বে আর মাদ্রাজ প্রদেশে ২৩টি তালুকে মন্বন্তর শুরু হয়ে গিয়েছে।  ১৮৮০র মন্বন্তর কমিশনার স্যর রিচার্ড স্ত্রাচি মন্বন্তর রুখতে আরও ১০,০০০ মাইলের রেলপথ তৈরি করার প্রস্তাব দেন। এত বড় কথা বলার পেছনে ছোট একটা সুতোর গিঁট রয়ে গিয়েছে। ১৮৭৭এ রিচার্ড স্ত্রাচি ভারতের সবথেক বড় রেল কোম্পানির প্রধান ছিলেন। এর পরে বহু কমিশন বলেছে কেন রেল, মন্বন্তর এলাকাগুলো থেকে তার শস্য পরিবহনের দায়িত্ব পালন করতে পারলনা।  
রমেশ দত্ত বলছেন, যেহেতু সাম্রাজ্যের নীতিই হল ভারতে রেলপথেই সমস্ত বিনিয়োগ করা, সেহেতু, সেচ বা অন্যান্য সামাজিক উদ্যমে বিনিয়োগের পরিমান যথেষ্ট ছিল না। তিনি বলছেন ফাটকা কারবারি আর মিলমালিকদের জন্য তৈরি ১৮৭৮এর পরে তৈরি  রেললাইনগুলো ফাটকা কারবারি আর পুঁজিপতিদের জন্য তৈরি হয়। দানাসশ্যর দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ায় কৃষককে অনেক বেশি পরিমানে খাজনা দিতে হয়। ১৮৯৭র পর রমেশ দত্তর নিদান ছিল বিন্দুমাত্র রেলে বিনিয়োগ না করে মাঠে উৎপাদন বাড়ানোর দিকে নজর দেওয়া। কেননা, রেল তৈরির অজুহাত দেখিয়ে জমির খাজনা বহুগুণ বাড়ানো হয়েছে, ফলে শস্য দানার দাম বেড়েছে এমনকি গরীব কৃষককে অনেক বেশি কর দিতে হয়েছেকৃষি উৎপাদন কমায় ছোট শিল্প উতপাদকেদের উৎপাদন কমেছে লক্ষণীয় হারে।

Saturday, April 20, 2013

উপনিবেশ, রেলপথ, মড়ক, মন্বন্তর কিংবা গণহত্যা - colonial india, railways, famine, british genocide

রেল আর রোগ
সালটা ১৮৫৯। ইস্ট ইন্ডিয়া রেলওয়ের এক স্থানীয় এনজিনিয়ার কাজের জায়গায় মড়ক লাগা নিয়ে তার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে চিঠি লিখে জানান, বাংলার বিভিন্ন স্থান থেকে কাজ করতে আসা শ্রমিকদের অধিকাংশ কলেরা মড়কে মারা গিয়েছে - Large masses continued to arrive almost daily, the utmost exertions of the Engineers failed to get together materials for at once hutting them, and a large proportion had no shelter for many days after their arrival and when cholera was raging among them. Kerr, , p 98। সেই সময়ের হিসেব বলছে সেই মড়কে মারাগিয়েছিল হতভাগ্য ৪০০০ কুলি। শুধু কলেরাই নয়, ম্যালেরিয়া, গুটিবসন্ত, নিউমোনিয়া, পেটখারাপ, ডায়রিয়া, আলসার ইত্যাদিতেও বহু মানুষ মারা গিয়েছেন। যে সব অঞ্চলে বেশিদিন কাজ হত, সেখানে ৩০ শতাংশের বেশী কুলি মারা গিয়েছে। ১৮৮৮ বেঙ্গাল-নাগপুর রাস্তায় কোনও একটা সময় কোনও একটি ট্রেঞ্চে ২০০০-৩০০০ কুলি মড়কে মারা গিয়েছে। তাদের দেহ চাইতে কেউ আসেনি। রেল রাস্তায় ট্রেঞ্চের ধারেই দেহগুলো গাদা করে ফেলে রেখে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। 
কার তার বই Building the Railways of the Rajএ বলছেন, কুলিদের থাকার ব্যাবস্থা এতই অস্বাস্থ্যকরভাবে করা হত যে এই মৃত্যু খুব একটা আশ্চর্যজনক ছিল না। ঠিকমত থাকার জায়গার অভাব, প্রাতকৃত্য করার অসুবিধে, পানিয় জলের সমস্যার সঙ্গে জুড়ত বৃষ্টি, গরম, ঠাণ্ডার প্রকোপ। ঠিকেদাররা এক লপ্তে কুলিদের বয়ে নিয়ে যেত কাজের এক যায়গা থেকে অন্য যায়গায়। ফলে মড়ক খুব তাড়াতাড়ি ছড়িয়ে পড়ত। তার আঁচ লাগত স্থানীয় গ্রামগুলোয়। যে ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করে রেলপথ তৈরি করা হত, তাতে ম্যালেরিয়া হওয়া খুব সাধারণ ঘটনা ছিল। ১৯২৭ সালে জনৈক চিকিতসককে ম্যালেরিয়ার উৎস খোঁজার কাজ দেওয়া হয় তিনি ঠিক এই কথাই জানিয়ে ছিলেন(Cutting down hundreds of trees for every mile of railway ties for every mile of trackage laid, left poorly rooted trees nearby open to buffeting by winds which soon toppled them over. These collapses greatly increased the area of thin soil exposed. Blasted during the dry season by the rays of the sun and by torrential downpours during the rains, these laterite-based soils were soon leeched out, forming water-filled cracks and potholes which female mosquitoes intent on laying eggs found irresistible. Watts, Epidemics and History: Disease, Power and Imperialism, p 171.)। আর যেহেতু কাজের ধরণটাই ছিল  যাযাবরী ধরনের, সেহেতু রোগের চলনশীলতাও ছিল বেশ ভালরকমের।
ম্যালেরিয়ায় সব থেকে বেশি মৃত্যু ঘটেছে। রেল পাতার সময় মোটামুটি একটা স্লিপার পিছু একটা মৃত্যু ধরে নেওয়া হত। গ্রেট পেনিন্সুলার রেলওয়ের ঘাট সেকসানে, প্রত্যেক মাইল রেলপথ পাততে প্রয়োজন ছিল ১৭০০ স্লিপারের। ফলে প্রত্যেক মাইল রেল পথ পাততে মৃত্যু হত ১৭০০ শ্রমিকের। এবং এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটানর চেস্টাও হয় নি। পরবর্তী কালে ১৮৯৭(২৭৩২ মাইল), ১৮৯৮(২৯৬৩ মাইল) রেল লাইন পাততে আরও সস্তা মন্বন্তরে ভোগা মানুষকে যুতে দেওয়া হয়। মনেরাখতে হবে, সরস্বতী-সিন্ধু সভ্যতা থেকেই কলেরা ছিল। কিন্তু এত ব্যাপক নয়। এবং যদিও কোনও মড়ক লাগত তাও সীমাবদ্ধ ছিল ছোট অঞ্চলে। ঔপনবেশিক সময়ে যেখানেই রেলপথ গিয়েছে তার পেছনে পেছনে ম্যালেরিয়া আর কলেরা গিয়েছে। রেলএর জলাধারে বহুদিন কলেরার জীবাণু বেঁচে থাকতে পারে। সেই জলেই এলাকা থেকে এলাকায় ছড়িয়ে যেত মড়ক। এই প্রসঙ্গে দুজন লেখকের দুটি উধৃতি তুলে দেওয়া গেল। Modernising works created serious ‘obstacles’ to water flows, caused river systems to become ‘silted up’ and ‘moribund,’ deprived soils of enriching nutrients and damaged crop yields, drainage and sanitation. Klein, ‘Imperialism, Ecology and Disease: Cholera in India, 1850-1950’, p 512 While cholera slaughtered millions thus, the British government continued to invest heavily in railways and not much in public health. Watts, Epidemics and History: Disease, Power and Imperialism, 168

রেলপথ মন্বন্তর বা গণহত্যা
ব্যবসায়ী কৃষি আর রেলরাস্তা পরস্পরের হাট ধরাধরি করে চলেছে। ব্যবসা নির্ভর কৃষি পশুচারনভুমি দখল করে ফলে গ্রামে পশুদের অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকে। ফলে ঘাসের দাম বাড়ে। জ্বালানি জোগাড় করতে পশু বেছেদিতে হয়। পশু গোবরের পরিমান হ্রাস পাওয়ায় জমির উরবরাশক্তি হ্রাস ঘটে এবং ভুমিক্ষয় হয়। পুরনো বাঁধ বা ছোট নালায় খরা রুখে দেওয়া যায়। কিন্তু ঔপনিবেশিক সরকার সব বিনিয়োগই রেলপথে করলেন। এই স্বাভাবিক কাণ্ডের ফল মন্বন্তর। এবং কোথাও সরাসরি কোথাও পরোক্ষে রেলরাস্তা এর জন্য দায়ী হয়ে রইল। মুক্ত বানিজ্যের অন্যতম প্রবক্তা ভারত সারকার মন্বন্তরে পড়া মানুষদের সাহায্য করতে অস্বীকার করল। রেলকে ব্যাবহার করে ফড়েদের দানা শস্যের ফাটকা বানিজ্য করার চেস্টা রোখা হল না। কমদামেড় এলাকা থেকে শস্য কিনে বেশি দামের এলাকায় বিক্রি করার চেষ্টায় মদত দিল রেল রাস্তার পাশে টেলিগ্রাফ লাইন। আধুনিক প্রযুক্তি ভারতে গণহত্যা বহন করে এনেছে। অত্যধিক করের হারে ন্যুব্জ কৃষক রেল রাস্তা আর টেলিগ্রাফের জুগলবন্দীতে মন্বন্তরের মুখে এসে পড়ল।
খাদ্য এবং অন্যান্য কৃষি উতপাদন রেলরাস্তা ধরে রপ্তানি হয়ে যেত ব্রিটেনে। ভারতের ১৩ শতাংশ গম ব্রিটেনে রপ্তানি হত। ইংল্যান্ডের আগের বছরের খারাপ চাষের জন্য১৮৯৬তে ব্যাপক হারে কৃষি দ্রব্য রপ্তানি হল। ফলে আবার মন্বন্তর।  ১৮৮৬তে ভারত ব্রিটেনের গম আমদানির ২৩ শতাংশ সরবরাহ করত। হায়দারাবাদের পুতুল রাজন্যকে প্রভাবিত করে জঙ্গলে বা অন্য এলাকায় গমের বদলে ব্যাপকভাবে তুলোর চাষ শুরু হয়, ফলে খাদ্য নিরাপত্তার হানি ঘটল। ধান এবং গমের অধিকাংশ লন্ডনে রপ্তানি হত(The idea that Berar enjoyed immunity from famine was dispelled by the experiences of 1896-97 and 1899-1900. The former year was one of scarcity, amounting to famine in parts of the province, in the latter year the famine was severe, and affected the whole of Berar - Report on the Administration of the Hyderabad Assigned Districts for the Year 1901-02, Residency Government Press, Hyderabad, 1902, para 13.)। বেরার ব্রিটিশের ঘটান মন্বন্তরের একটা ছোট উদাহরণ মাত্র।
আজও শুধু ব্রিটনরাই নয় বহু ভারতীয়ও বিশ্বাস করে নতুন প্রযুক্তি আর ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সরকারের মাহাত্ম্যে। এই সব উপকথা আজ নতুন করে প্রশ্ন করার সময় এসেছে। 

সুত্রঃ British Imperial Railways in Nineteenth Century South Asia
Laxman D Satya (lsatya_99@yahoo.com) is at the  Department of History, Lock Haven University of Pennsylvania, US.
November 22, 2008Economic & Political Weekly

উপনিবেশ, রেলপথ, ব্রিটিশ বিনিয়োগ - colonial india, railways & secured british investment


১৮৪৬ সালে বম্বের রেভিনু কমিশনার টমাস উইলিয়ামসন গ্রেট ইন্ডিয়ান পেনিনসুলার রেলওয়ে কোম্পানির চেয়ারম্যানকে একটি চিঠি লেখেন। সেটির বয়ানটি এইরূপ -  The great trunk-line, running by the Malseje Ghaut in the direction of Nagpur, would be most direct which could possibly be selected to connect Bombay to Calcutta. Commercially, it would be best for the cotton of Berar, while for the first 120 miles from Bombay we would proceed in the immediate direction of the military stations of Ahmed­nuggur, Jaulna and Aurangabadএই চিঠিটির চার বছর পর এই কোম্পানিটি ভারতের প্রথম রেলপথ, বোম্বে থেকে থানের রেলপথ ১৮৫৩তে চালু করে। ১৯০০ সালের মধ্যে ২৪০০০ মাইলএরও বেশী রেলপথ পাতা হয়ে যায়। এই বিশাল পরিমান বিনিয়োগ আসে ব্রিটিশ বিনয়গকারিদের থেকে।
ব্যক্তিগত মালিকানার কোম্পানিগুলি পুরোপুরি সরকারি মদতে শুধু রেলপথই তৈরি করে নি, সেগুলোর মালিকানাও তাদের ছিল। উনবিংশ শতকের শেষ পর্যন্ত প্রত্যেক বছর মোটামুটি ১,৪০৫ মাইল রেলপথ তৈরি হতে থাকে। বিনিয়োগ হয় ১৫০ মিলয়ন পাউন্ড। এই এই বিনিয়োগ শুধু বিশাল অঙ্কই নয়, বিশ্বে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সবথেকে বড়ও বিনিয়োগ বটে।
কোমপানিগুলো ৫ শতাংশ হারে বিনিয়োগের ফেরতের সরকারি আশ্বাস পায়। ১৮৬৯ থেকে ১৮০০ পর্যন্ত ব্রিটিশ কোম্পানিগুলিই ভারতে রেলপথ তৈরির বরাত পায়। রেল রাস্তা তৈরি বা চালানোয় কোম্পানিগুলির ক্ষতি হলে সেই ক্ষতিপূরন হিসেবে ভারত সরকার রাজস্ব খাত থেকে ৫০ মিলিয়ন পাউন্ড সরকারি গ্যারান্টি প্রদান করে। এই গ্যারান্টি ব্যবস্থার বলে, কোম্পানিগুলি তাদের অংশিদারদের আশ্বাস দিয়ে বলে, কোম্পানির যদি ক্ষতি হয় তাহলে ভারতের করদাতারা সেই ক্ষতি পূরণ করতে বাধ্য থাকবে। অর্থাৎ এ এক বিচিত্র ব্যবসাচক্র। লাভ হলে কোম্পানির আর ক্ষতি হলে ভারতের করদাতাদের। ব্রিটিশ বিনিয়োগ ভারতে এল এই শর্তে, ব্যক্তিগত বিনিয়োগ হবে সরকারি ঝুঁকি আর দয়িত্বে(রিস্ক)। ১৮৭০এ ভারতে রেলপথে ব্রিটিশ বিনিয়োগ আসার পরিমানকে ছাড়িয়ে গেল ভারত থেকে ব্রিটেনে যাওয়া সুদের পরিমান। এবং উনবিংশ শতকের শেষে, ভারতের রেলপথে ব্রিটেনের বিনিয়োগ ৩৫০ মিলিয়ন পাউন্ড-স্টার্লিং – ব্রিটেনের বাইরে সাম্রাজ্যের সব থেকে বড় বিনিয়োগ।   
এই গ্যারান্টি সিস্টেমে সবকটি চুক্তি ব্রিটিশ কোম্পানির সঙ্গে করতে হত। সরকার নিশ্চিন্ত বিনিয়োগ ফেরত দেওয়ার গ্যারান্টি ছাড়াও দিত বিনামুল্যে জমি, আর সস্তা শ্রমিক। ভারতে বিনিয়োগ হওয়া প্রত্যেকটি অর্থ ব্রিটেনেই তোলা হয়েছে এবং একমাত্র লন্ডনের শেয়ার বাজারেই সেই শেয়ার বিক্রি করাযেত। গ্যারান্টি সিস্টেম ব্যবসায়ীদের চাহিদা না থাকলেও আরও বেশী করে রেলপথ তৈরির প্রণোদনা যোগাত। ১৮৪৯ থেকে ১৯০০ পর্যন্ত ৫৬৮ কোটি টাকা ভারতকে শোধ করতে হয়েছে। ১৮৮২-৮৩ সালেই রেলকে ধরে ব্যালেন্স অফ পেমেন্ট ছিল ভারতের জাতীয় আয়ের ৪।১৪ শতাংশ(The great trunk-line, running by the Malseje Ghaut in the direction of Nagpur, would be most direct which could possibly be selected to connect Bombay to Calcutta. Commercially, it would be best for the cotton of Berar, while for the first 120 miles from Bombay we would proceed in the immediate direction of the military stations of Ahmed­nuggur, Jaulna and Aurangabad - Irfan Habib, Essays in Indian History: Towards a Marxist Perception, Madras, 1995, pp 279 and 360)। 
উনবিংশ শতকের শেষ অব্দি ভারত ব্রিটিশ তৈরি দ্রব্যের সবথেকে বড়ও বাজার ছিল। ভারত তার বদলে ব্রিটেনকে দিত কাঁচামাল, অপ্রক্রিয়াজাত কৃষি উতপন্ন।  এই সমস্ত কাঁচামাল পোতাশ্রয় পর্যন্ত পৌঁছত ভারতীয়দের করের সাবসিডিতে তৈরি রেলপথে। রেলপথ তৈরির উদ্যমে অন্য কোনও দিকেই নজর ঘোরায় নি ভারত সরকার। ১৮৮০ সাল নাগাদ সেচ ব্যাবস্থায় বিনিয়োগের তুলনায় রেলপথে বিনিয়োগ হয় ১৩গুণ। ১৮৭৭-৭৮এ স্যর আরথার কটন আর ফ্লোরেন্স নাইটিংগল সেচ ব্যবস্থায় বিনিয়োগের দিকে সকলের নজর ঘোরাতে চেয়েছিলেন। তারা বলেছেন গরীব ভারতীয়দের ওপর ১৬০ মিলিয়ন টাকার বোঝা চাপানো হচ্ছে। গান্ধীও পরে একই কথা বলেছেন।
 রেল ভারতজুড়ে বছরের পর বছর একচেটিয়া ব্যাবসা করেছে। সরকারি বা বেসরকারিস্তরেও জলপথ, সড়ক অথবা অন্যান্য পরিবহনে বিনিয়োগে উতসাহ দেখা যায় নি। রেল কোম্পানিগুলির ওপর সরকারের কোনও নিয়ন্ত্রন ছিলনা, করতেও চায়নি। ভারতের মোট রেল ব্যাবসা নিয়ন্ত্রন করত মাত্র পাঁচটি ব্রিটিশ কোম্পানি। প্রত্যেকটির উদ্দেশ্য সর্বোচ্চ  লাভ। কোম্পানিগুলির মূল ব্যাবসা যেহেতু ছিল সরকার আর সরকারের অন্যতম অংশ সেনাবাহিনীর সঙ্গে, তাই কোম্পানিগুলো পরিবহন শুল্ক কমাতে চাইত না।  মনেরাখতে হবে ভারত সরকার এই ব্যবসার অন্যতম বড় অংশিদার। ফলে সরকারের কাছে ছাড় চাওয়ার কোন সুযোগও ছিলনা।
তবে ব্রিটিশ ব্যাবসার মুনাফার জন্য রেল কম্পানিগুলি নানাধরনের শুল্ক বরাদ্দ করত। বন্দর থেকে ভারতের যে কোনও স্থানে পন্য আনতে গেলে কম শুল্ক দিতে হত।  ভারত থেকে কাঁচামাল বন্দর পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার খরচও কম ছিল।  কিন্তু ভারতের এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় মাল পরিবহন করতে অনেক বেশী পরবহন শুল্ক দিতে হত। অর্থাৎ ব্রিটিশ ব্যবসায়ীদের জন্য সরকারি মদতে অতিরিক্ত ছাড় আর ভারতীয় ব্যবসায়ীদের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক। সবথেকে বেশি ছাড় পেয়েছে লন্ডনের লোহা আর রং কোম্পানিগুলি। কেননা রেলপথ তৈরিতে এই দুটি ব্যাপকভাবে ব্যবহার হত।

সুত্রঃ British Imperial Railways in Nineteenth Century South Asia
Laxman D Satya (lsatya_99@yahoo.com) is at the  Department of History, Lock Haven University of Pennsylvania, US.
November 22, 2008Economic & Political Weekly

উপনিবেশ, রেলপথ এবং জঙ্গল, colonial india, railways & looting of jungle

রেল লাইন পাতার জন্য ভারতের জঙ্গল উজাড় হয়ে যায়। গোটা গাছ কেটে রেল লাইন স্লিপার তৈরির কাজ হত। সঙ্গে কাঠের গুঁড়ি দিয়ে ইঞ্জিন চালানো হত। রেল লাইন এবং তাঁর সঙ্গে নানান পরিকাঠমোর জন্য প্রচুর ইট তৈরি করতে হয়। সেতু, কালভারট, স্টেশন, কর্মশালা করার জন্যও অপর্যাপ্ত পরিমানে ইট ব্যাবহার করা হয়েছে। ১৮৫৮র মাঝের দিকে, ইস্ট ইন্ডিয়ান রেলওয়েজএর হুলহোর ডিভিশনে ১৭ মাইল রেলপথ পাতার জন্য ২০ লক্ষ ইট ব্যাবহার হয়। ৪৫ লক্ষ ইট রাখা ছিল ভাটায় পোড়াবার জন্য, আরও ৭০ লক্ষ কাঁচা ইটের জন্য মাটি তৈরি করে রাখা ছিল। শুধু এই ডিভিশনে ৫০টি ইট ভাটা আড় ১৬টি চুনের ভাটি দিনরাত কাজ করত কাঠের জ্বালনে। ভারতের রেলপথ তৈরির অন্যতম প্রধান কাজ ছিল ইট তৈরি করা। এই কাজ সরকারি বরাতে রেল কম্পানিগুলি করত।
ভারতের জঙ্গলের শত শত বছরের পুরনো গাছ কেটে রেলপথএর স্লিপার তৈরি হয়েছে। The forests of India were searched and ravaged for supplies of sleeper wood….Indian wood would be felled in a forest, possibly quite distant, by foresters in the employ of timber contractors, …it is clear that the demands for the railways for wood – prime wood for sleepers, buildings and carriages, and lesser wood for firewood for kilns and for fuel for early locomotives-increased the exploitation of India’s forests and the pressure on forest-dwelling people.( Kerr, Building the Railways of the Raj, p 145.) । এই সময় থেকেই ব্যাবসায় কাঠ ব্যবহারের জন্য জঙ্গল সংরক্ষিত করার নীতি শুরু হয়। উদ্দেশ্য শিল্পের জন্য অযুত পরিমান কাঠ সংগ্রহ। ফলে বহু জঙ্গলে থাকা আদিবাসী সমাজ উজাড়-উচ্ছেদ হয়ে যায়। হাজার হাজার বছর ধরে জঙ্গলে বাসকরা, জঙ্গল বাঁচানো, জঙ্গলের অধিবাসীদের বিরুদ্ধে ভারত সরকার প্রায় অঘোষিত যুদ্ধ ঘোষণা করে। লড়াই চলতে থাকে। জঙ্গলে থাকা মানুষদের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়।
ভারি, দামী মজবুত কাঠের জন্য ভারতের জঙ্গল বিখ্যাত ছিল। ভারতের কাঠ বহু শত বছর ধরে বিশ্ব বাজারে চড়া দামে বিক্রি হয়েছে।  টিক, শাল, দেওদার, সেডার, চির, পাইন ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে পাওয়া যায়। ভারতজুড়ে যেহেতু রেলপথ পাতার কাজ চলছিল, ফলে প্রায় সব ধরনের জঙ্গল নির্বিচারে কাটা ও ধ্বংস হয়েছে। এই ধ্বংস সুরু হয় পাশ্চিম ঘাটের মালাবার উপকুলের জঙ্গল কাটা দিয়ে। রেলপথ তৈরির বহু পূর্বে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর জাহাজ তৈরির জন্য মালাবার উপকুলের জঙ্গল সাফ করা চলছিল। শেষ ঘা-টি দিল ভারত সরকারের রেলপথ তৈরির প্রকল্প। ১৮৭০ নাগাদ মালাবার জঙ্গল প্রায় সাফ হয়ে যাওয়ার পরে আপার-বার্মার জঙ্গলের দিকে ব্রিটিশ ব্যাবসায়ীদের নজর পড়ে। গঙ্গা অবধৌত এলাকায় রেলপথ পাতার কাজ সুরু হলে ব্যাবসায়ীদের হাত পড়ল হিমালয়ের ঘন জঙ্গলে। বাংলার হাজার হাজার মাইলজোড়া পশ্চিম-তরাই অঞ্চলের শাল জঙ্গলও রেল প্রকল্পর জন্য সাফ করা হতে থাকল। এই জঙ্গলগুলোয় নতুন গাছ বসাবার দায় কেউ গ্রহণ করল না। শাল কাঠ দীর্ঘ, মজবুত অথচ নমনীয় তন্তুর জন্য রেল প্রকল্পগুলোর জন্য আদর্শ কাঠ হিসেবে গণ্যও হতে থাকে। উনবিংশ শতকে শাল কাঠের অপ্রতুলতা সুরু হয়, দামও আকাশ ছোঁয়।
১৮৬০এর পর থেকে টিক আর শাল কাঠের দাম বাড়ায় উত্তর ভারতের রেল উদ্যমীদের নজর পড়ল উত্তর ভারতের পাহাড়ি দেওদার গাছের দিকে। Exploitation of the deodar forests soon became the central focus of the first half century of Forest Department’s work in the Himalayas, first for the continuing depletion of the deodar stands and later for the gradual stabilisation of commercially valuable timber lands in the system of Reserved Forests(Richard Tucker, ‘The British Colonial System and the Forests of the Western Himalayas, 1815-1914’ in Richard Tucker and John Richards (eds), Global Deforestation and the 19th Century World Economy, Durham, 1983, p 158-59.). ১৮৭০-৮০র দশকে উত্তর পশ্চিম ভারতে রেলরাস্তা পাতা শুরু হওয়ার পর হিমালয়ের দেওদার জঙ্গল পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়।
১৮৭০এর প্রথম দিকে ভারতের সবথেকে বড় রেল প্রকল্প, দিল্লি থেকে রাজস্থান রেলপথে ৮ লক্ষ স্লিপারএর প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। এই অযুত পরিমানের স্লিপারের জন্য উত্তর গঙ্গা আর সিন্ধু নদী উপত্যকা, পাহাড়ি পাঞ্জাব এবং কাশ্মীরের জঙ্গল পুরপুরি সাফ হয়ে যায়। একই সময়ে লাহোর থেকে করাচির রেল রাস্তা তৈরি হয় পাঞ্জাবের গম ইউরোপ রপ্তানি করার জন্য। শুধু উত্তরপ্রদেশেই ১৮৭০এ ৭৮০০০ থেকে ১৪৭০০০ গাছ কাটা হয়। ৮০র দশকে এই পরিমান দ্বিগুণ হয়(ঐ)। এক মাইল রাস্তা পাতার জন্য প্রয়োজন ছিল ১০, ১২ আর ৬ ইঞ্চির ১৭০০ স্লিপার আর ১।৫ টন কাঠের চাবির(উডেন কী)। একটি স্লিপার তৈরির জন্য পুরো একটা বয়স্ক গাছ কাটার প্রয়োজন হত।
জনৈক জার্মান ব্যবসায়ী(ফরেস্ট এজেন্ট) ডীয়েত্রিশ ব্রান্দিস(Dietrich Brandis)কে ভারত সরকার বন দপ্তরের নিরীক্ষক (ইন্সপেকটর জেনারেল) হিসেবে নিযুক্ত করে ১৮৫৬ সালে, প্রথমে বার্মায় পরে ভারতে। ভারতে তিনি ২০ বছর চাকরি করেন।  তিনি বেশ কয়েকটি সমীক্ষা করে ভারত সরকারকে সেই সমীক্ষাগুলো পেশ করেন। তাঁর সমীক্ষার মূল সুরটিই ছিল জঙ্গলকে আরও বেশি ব্যবসায়ী কাজে ব্যবহার কি করে করা যায়। ১৮৭৮এর এক সমীক্ষায় ব্রান্দিস লেখেন ভারতের রেলপথের স্লিপার সরবরাহের জন্য সরকারের উচিত হিমালয়য়ের জঙ্গল ব্যাবহার করা। ১৮৮০র দিকে প্রথমদিকে রেলপথে পাতা স্লিপার বদলানোর প্রয়োজন হয়ে পড়ল। তিনি ভারত সরকারকে জানান রেলপথ তৈরির জন্য বছরে ৫ লক্ষ স্লিপার প্রয়োজন। অথচ রেল কর্তৃপক্ষ ঠিক এর দ্বিগুণ স্লিপার ব্যাবহার করে। ব্রান্দিসএর বহু আগেই জঙ্গলকে রেলপথের প্রয়োজনে ব্যবহার করতে ১৮৬৪তে ভারত সরকার বন দপ্তর গঠন করে। মনেরাখতে হবে ভারত সরকার শুধু প্রশাসনিক কাজের জন্য অথবা বন রক্ষা করার জন্য বন দপ্তর তৈরি করে নি। এই দপ্তরের সঙ্গে রেলপথ বিকাশের ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ ছিল। রেলপথএর বিকাশ প্রয়োজন ছিল ঔপনিবেশিক অর্থনীতি বজায় রাখার জন্য। সেই প্রয়োজনেই বন দপ্তরের সৃষ্টি।
ভারতজুড়ে রেলপথ বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে বনের নির্মূলীকরন ঘটতে থাকে। মাদ্রাজ রেলপথ তৈরির জন্য মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির জঙ্গল কাটা হয়। মাদ্রাজে রেল চালাতে কয়লা না ব্যবহার করে কাঠ জ্বালানো হয়। কাঠের থেকে কয়লার দাম বেশি ছিল। কিন্তু কাঠ বেশি ব্যাবহার করতে হত। প্রতি ইঞ্জিন মাইল চালাবার কাঠ ব্যবহার হত ৮৯.৫৩ পাউন্ড, কয়লা ২৬.৭৩ পাউন্ড।  বন ধ্বংসের জন্য সরকার ব্যক্তি নিয়ন্ত্রিত জঙ্গল থেকে কাঠ কিনতে শুরু করে।  তবে জঙ্গল সংরক্ষণের এই উদ্যোগ যতটা না পরিবেশ বাস্তুতন্ত্র বাঁচাবার জন্য, তাঁর থেকে বেশি ব্যবসায়িক কাজে জঙ্গলের কাঠ তৈরির ভাবনায়। আদতে জঙ্গলের কাঠ সংরক্ষণ করে তাকে বাড়িয়ে আবার বিক্রি বা ব্যবহারের উপযোগী করে তোলা। 
রেলের উত্তুঙ্গ চাহিদায় জঙ্গল ব্যাপকভাবে ধ্বংস হতে শুরু করে। ১৮৫৯-৬০এর রেভেন্যু বছরে, মাদ্রাজ রেলওয়ের জন্য ২৪৫৭৬৩টি বারথ সরবরাহ করা হয়, এবং সবকটি কাঠের তৈরি। এমনকি মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির রেলপথের জন্য ব্রান্দিস প্রস্তাব দেন, সরকারি জঙ্গলের তুলনায় ব্যক্তিগত মালিকানার জঙ্গলের কাঠ ব্যাবহারের জন্য। ফলে শুধু সরকার নিয়ন্ত্রিত জঙ্গলই নয়, ব্যক্তি নিয়ন্ত্রিত জঙ্গল থেকেও সমান পরিমানে কাঠ ব্যবহার হয়েছে।

সুত্রঃ British Imperial Railways in Nineteenth Century South Asia
Laxman D Satya (lsatya_99@yahoo.com) is at the  Department of History, Lock Haven University of Pennsylvania, US.
November 22, 2008Economic & Political Weekly

Wednesday, July 20, 2011

অহিফেন ঠাকুর৩

আফিম আর পার্সি ব্যবসায়ীরা
সেদিনের বোম্বাই বা আজকের মুম্বই গড়ে উঠেছিল মালব অঞ্চলের উত্পাদিত আফিম, মুম্বই বন্দর হয়ে চিনে পাঠাবার উদ্বৃত্তের গুড়ে বম্বে থেকে যে ৫০ জন পার্সি ব্যবসায়ী মালওয়া আফিম চিনে পাঠাতেন তার মধ্যে ছিলেন টাটা, ওয়াদিয়ারা(পারিবারিকভাবে জাহাজ তৈরির ব্যবসায় ছিলেন)ও আছেন জামশেদজী টাটাই ব্রিটিশ আমলে চিনের সঙ্গে আফিম ব্যবসার একচ্ছত্র অধিপতি ছিলেন এমন নয়, বম্বের কম করে পঞ্চাশটি পার্সি পরিবার এই চোরাচালানের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল এরা প্রায় সকলেই ম্যানিয়ার এন্ড কোংএর আফিমব্যবসার সঙ্গী ছিলেন হাতে গোণা কয়েকজন যুক্ত ছিলেন রাসেল এন্ড কোম্পানির সঙ্গে ১৯৩০এ প্রকাশিত D.E. Owenএর British Opium Policy in China and India সমীক্ষার ওপর নির্ভর করে স্মগলিং এজ সারভারসান, কলোনিয়ালিজম, ইন্ডিয়ান মার্চেন্টস এন্ড পলিটিক্স অব ওপিয়াম পুস্তকে(প্রকাশক লেক্সিংটন বুকস) দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অমর ফারুকি লিখছেন ১৮২০ নাগাদ কলকাতার দ্বারকানাথেরমত বাঙালি ভদ্রলোকেদের আফিম ব্যবসার পথ ধরে, ভারতের মধ্য-পশ্চিমাঞ্চলের পার্সি, গুজরাটি বানিয়া, কোঙ্কনি মুসলমানেদের এক বিশাল গোষ্ঠী মালব আফিম ব্যবসার পরতে পরতে জুড়ে ছিলেন ১৮৩০, এই দশকটিতে ৪২টি বিদেশি কোম্পানি এই ব্যবসাটি চালাত, তার মধ্যে ২০টির সরাসরি নিয়ন্ত্রণ ছিল পার্সিদের হাতে তত্কালীন ভারতের সমুদ্র পরিবহন আর আফিম ব্যবসা ছিল একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠমাত্র সব থেকে বড় জাল ছড়ানো ছিল জামসেদজী জিজিবয়ের(১৭৮৩-১৮৫৯) জিজিবয় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সব থেকে বড় এজেন্সি হাউস, জার্ডিন ম্যাথিসনের অন্যতম অংশিদার তিনি নাইট(১৮৪২), ব্যারণ(১৮৫৭) উপাধি পাওয়া প্রথম ভারতীয় আফিম পরিবহনের জন্য তাঁর অনেকগুলি জাহাজও ছিল তিনি ব্যাঙ্ক অব বোম্বের ছজন নির্দেশকের মধ্যে অন্যতম
আজকের বম্বে শহরটি গড়ে উঠেছে বাঙালি-বিহারি, সিন্ধ্রি রক্ত জলকরা আফিম চাষী, পার্সি, হং আফিম ব্যবসায়ী আর চৈনিক আফিমখোরদের নেশার অর্থ ব্যবহার করে তৈরিকরা অর্থিক লাভের বনিয়াদের ওপর বসে দশকের পর দশক জুড়ে অবৈধ আফিম ব্যবসার লাভ থেকেই আজকের দক্ষিণ বম্বের বিশাল বিশাল প্রাসাদোপম হর্ম্যগুলি গড়ে ওঠে আজকের ধণতান্ত্রিক ভারতের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র বম্বে শহরটির ভ্রুণটি তৈরি হচ্ছিল ১৭৯০ থেকে ১৮৪০এর মধ্যে অবৈধ আফিম ব্যবসার অপরিমিত লাভের পাহাড়ের ওপর বসে মনে রাখতে হবে ১৮২০ থেকে ১৮৪০ সালের মধ্যে, বম্বেতে অবৈধ আফিম ব্যবসা থেকে যে রূপো আসত তার পরিমান দ্বারকানাথেরমত কলকাতার ইংরেজ-বাঙালি ব্যবসায়ীদের লাভ্যাংশের থেকে অনেক অনেক বেশি কলকাতা থেকে যে সরকারি আফিম চিনে অবৈধভাবে সরাসরি রপ্তানি হত, তার লাভের হকদার ছিল সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ কোম্পানি সরকার, ছিটেফোঁটা লাভের গুড়ের অংশিদার হতেন সেই ব্যবসাকে সাজনোগোজানের প্রক্তিয়াতে জুড়ে থাকা দালালেরা এদের একাংশ বাঙালি
কিন্তু বম্বের বিষয়টা ঠিক উল্টো সরাকারকে নির্দিষ্ট একটা অংশ কর দিয়ে এই লাভের গুড়ের পুরো অংশটাই যেত এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত পার্সি অংশিদারদের সিন্দুকে চিনেদের আফিমের মৌতাতে রেখে পার্সিদের সেই লাভের অর্থে গড়ে উঠেছে মালাবার হিল, কাম্বালা হিল, ব্রিচ ক্যান্ডি, আঙ্ক্লেশ্বরেরমত জনপদসমূহ পরে সেই অঞ্চলের বিলাসবহুল পার্সি বাংলোগুলো লিজে দেওয়া হয়েছে ইওরোপিয়দের ১৮৩০-১৮৪০এর মধ্যে এই পার্সিরাই গড়ে তুলেছিলেন বম্বের শহরতলী অঞ্চলগুলো যেমন কার্সেটজী মানকজীর অধিকার ছিল অনিকের, ঢাকজী দাদাজীর ভারাসাভি(আজকের ভারসোভা), ফারমজী কাওয়াসজীর পোয়াই লেন, জামসেদজী বোমানজীর ভিলে পার্লে, জুহু, কারসেটজী কাওয়াসজীর জর্জগাঁও, রতনজী এদুলজীর ঘাটকোপর, কৃষণরাও রঘুনাথের বোরবিদে এবং লক্ষ্ণণ হরিচাঁজদীর চিনচোলি

আফিম বাম রাজনীতি আর টাটারা
ঐতিহাসিকেরা সাধারণতঃ নতুন বম্বের সঙ্গে আফিমের সম্পর্ক দেখাতে গিয়ে প্রায় প্রত্যেক পার্সি পরিবারের নামোল্লেখ করলেও টাটা পরিবারের নাম উল্লেখ করতে ভুলে যান উদ্দেশ্যপূর্ণ কীনা বলা মুশকিল
তবে সাধরণে প্রচলিত বিশ্বাস টাটারা অনেক রক্ত-ঘাম ঝরিয়ে তবে আজকের ভারতের প্রধাণতম শিল্পপরিবার হয়ে উঠেছেন রক্ত-ঘাম তাঁরা ঝরিয়েছিলেন, তবে তা চিনের সাধারণকে আফিম সেবন করাতে গুজরাটের অধিবাসী জামশেদজী টাটার বাবা যোরাথ্রুষ্টবাদী পার্সি পুরোহিত নাসিরনজী টাটা এই পরিবারের স্রষ্টা নাসিরনজী তার পুত্র জামশেদজী এবং অন্যান্য ভাইদেরকে হংকং, সাংহাই এবং ইংলন্ডে আফিম ব্যবসার দপ্তর খুলে দেন  
ভারতীয় বামপন্থীরাও এই পথের পথিক অনেক বামপন্থীই টাটা পরিবারকে আদতে ভারতের পুঁজিপতিদের মধ্যে প্রহ্লাদরূপে দেখতে চান বাংলার তদানীন্তন বামপন্থী সরকারের ন্যানো মোটর গাড়ির কারখানা করার উদ্যমেই তা স্পষ্ট টাটা পরিবারের সঙ্গে ব্রিটিশ বামপন্থার যোগাযোগ অনেক দিনেরই, বলছেন মেরি এল কিয়েনহোলজ তাঁর ওপিয়াম ট্রেডার্স এন্ড দেয়ার ওয়ার্ল্ডস ভলিউম টু-  আ রিভিসনিস্ট এক্সপোজার অব দ্য ওয়ার্ল্ডস গ্রেটেস্ট ওপিয়াম ট্রেডার পুস্তকে  পুঁজিপতি জামশেদজী টাটার ছোট পুত্র স্যর রতন টাটা গোপাল কৃষ্ণ গোখলের সঙ্গে মিলে সোসালিস্ট সার্ভেন্টস অব ইন্ডিয়া সোসাইটি গঠন করেন জামশেদজীর পুত্র বামপন্থীদের দুর্গ, লন্ডন স্কুল অব ইকনমিক্সএর একটি চেয়ারেরও স্রষ্টা আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হল রতন এবং দোরাবজী টাটার কাজিন শাপুরজি সাকলতওয়ালা (১৮৭৪-১৯৩৬), যিনি টিসকোর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, ব্রিটিশ পার্লামেন্টের প্রথম কমিউনিস্ট সদস্য তিনি একাদিক্রমে ১৯১৪ থেকে ১৯২৯ পর্যন্ত ব্যাটারসি(লন্ডনের একটি বরো) থেকে পার্লামেন্টে নির্বাচিত হন

অহিফেন ঠাকুর২


মালওয়া আফিম
পূর্ব ভারতে আফিম তৈরির পরিকাঠামো ছাড়াও আরও রাজস্ব বাড়াতে ব্রিটিশ শাসিত ভারতের বাইরে ব্রিটিশ আশ্রিত রাজন্যদের মালব অঞ্চল থেকে আফিম তৈরির পরিকাঠামো তৈরি হল যাকে তত্কালীন কোম্পানি কাগজপত্রে মালওয়া আফিম বলা হচ্ছে বাজারের আফিমের সরবরাহ আর চাহিদার তুল্যমূল্য অঙ্ক কষে ব্যক্তিগত উদ্যমীরা চাষীদের দাদন দিয়ে চাষ করাতেন মালওয়া আফিম ব্যবসায়ীদের দুধরণের কর দিতে হত, প্রথমটি রাজ্যে, আর দ্বিতীয়টি রাজ্যটি ছেড়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে প্রবেশ পথে, যা বম্বের বন্দর থেকে চিনের উদ্দেশ্যে রওনা করানোর ছাড়পত্র ভারতীয় দালালদের সঙ্গে চিনে আফিম ব্যবসার ইংরেজদের অন্যতম সহযোগী ছিল হং ব্যবসায়ীরা হংদের প্রত্যক্ষ্য সাহায্যে, ভারত থেকে চিনে অবৈধ আফিম রপ্তানির পরিমান বেড়েছে গুণোত্তর প্রগতিতে- ১৭৭৩এ ১০০০ চেস্ট, ১৭৯০তে ৪০০০ চেস্ট, ১৮২০র দশকের আগে ১০,০০০ চেস্ট, ১৮২৮এ ১৮,০০০ চেস্ট, ১৮৩৯এ ৪০,০০০ চেস্ট, ১৮৬৫তে ৭৬,০০০ চেস্ট, ১৮৮৪তে ৮১,০০০ চেস্ট ১৮৮১তে এই রপ্তানি সর্বোচ্চ মাত্রায় পৌঁছয় ১৮০০ থেকে ১৮৩৯ সালের মধ্যে আমেরিকার ব্যবসায়ীরা চিনে সরবরাহ করে দশ হাজার চেস্ট আফিম (সূত্র চাইনিজ রাউন্ডএবাউট, জনাথন স্পেন্স)
চিনের সঙ্গে পুরো আফিম ব্যবসাটাই ছিল অবৈধ চিন সম্রাট এই ব্যবসা অনুমোদন করতেন না বৈধতা পেতে দুটি যুদ্ধ করতে হয়েছিল প্রথমটিতেও সুবিধে হয় নি, পরে ১৮৫৬-১৮৬০এর ব্রিটেন-ফ্রান্সএর যৌথ দ্বিতীয় আফিম যুদ্ধে বেজিং দখল করা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছিল ১৮৮০ পর্যন্ত ব্রিটিশ ভারতের সবথেকে দামি রপ্তানি ছিল আফিম দেড় কোটি চিনা আফিমখোরের চাহিদা মেটাতে রপ্তানির পরিমান ছিল চুয়ান্ন হাজার মেট্রিক টন আফিম ব্যবসায় প্রত্যক বছর নয় কোটি তিরানব্বই লক্ষ পাউন্ডের রূপো টাকা আসত ভারত সরকারের সিন্দুকে বৈদেশিক মোট রপ্তানির ১৬শতাংশ

পার্লামেন্টের আফিম কমিশন আর বাঙালি রাজনীতিকরা
আফিমবাদীদের আতঙ্ক জাগিয়ে পার্লামেন্টারি কমিটির সমীক্ষায় ব্রিটিশ পার্লামেন্ট জানিয়ে দিল আফিম বেচতে সরকার আর বলপ্রয়োগের দ্বারস্থ হবে না আফিম ব্যবসায় যাঁদের প্রত্যক্ষ্য বা পরোক্ষ স্বার্থ জড়িয়ে রয়েছে তারা কী ছেড়ে কথা বলবেন আফিম থেকে তখন কোটি কোটি ডলার লুঠ করা ভারত সরকার, সেসময়ের আবসৃত উচ্চপদস্থ এক রাজকর্মচারী জেমস লায়ালকে ব্রিটেনে নিযুক্ত করল তাদের স্বার্থ দেখার জন্য ভারতেও লড়াই করার জন্য সরকার মাদ্রাজের দ্য হিন্দু সংবাদপত্রকে নিয়েগ করল ১৮৯৫তে দ্য হিন্দুতে লেখাহল, “Opium may be a great evil, but national bankruptcy is a greater evil” তত্কালীন কংগ্রেস সদস্যদের সসোমিরা আবস্থা তারা যেকোনো আফিম ব্যবসা বিরেধী আন্দোলনের পক্ষে নন, এ কথা সরাসরি জানাতেও যেমন পারছেন না, তেমনি আবার জনগণের ইচ্ছেও অমান্য করতে পারছেন না এ বড় আজব কুদরতি
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল এই কমিশনে সদস্যতা মোট নয় সদস্যের মধ্যে ভারতীয় সদস্য থাকার কথা দুজনের ভারত সচিবকে এই দুজন সদস্য মনোনীত করতে বলা হল তত্কালীন বাংলার লেফটেনেন্ট গভর্ণর ম্যাকডোনেল জানালেন, ভারতীয় নেতারা আফিম ব্যবসা বিরোধিতা পছন্দ করেন না, তবে তাঁরা পার্লামেন্টের রাডিক্যাল সদস্যদের ভারতবন্ধু বলে মান্য করেন তিনি লিখলেন, There is no Bengali whom I would recommend to your Excellency for nomination to the Opium Commission. There are several who are of the standing requisite, and whose views on the question are reasonable, such as Sir Jotendro Mohun Tagore and Sir Romesh Chunder Mitter. But they will not themselves, or run the risk of putting themselves, into opposition to the anti-opiumists, who are at the same time, like Mr. Caine, M. P. Congress men. They condemn the anti-opium agitation, but will not oppose it at the risk of alienating their English supporters in “Congress” matters.  (সূত্র ডিউক বিশ্ববিদ্যালয়ের জে এফ রিচার্ডস Opium and the British Indian Empire: The Royal Commission of 1895  journals.cambridge.org/article_S0026749X02002044)
সে সময়ের আগে প্রায় এক শতক ধরে সত্যি সত্যিই কলকাতা এবং মুম্বাইএর শহরেরে কোনো না কোনো উদ্যমী পরিবার হয় আফিম, নয় নীল অথবা নুনের ব্যবসা অথবা রপ্তানির কাজে সরাসরি জড়িয়ে ছিলেন সমাজে তাঁদের মতামত এতই গুরুত্বপেত যে, সে সময় ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী কলকাতাতে কোনো বাঙালিই সেই লবির বিরুদ্ধাচরণ করতে রাজি হননি এটাই বাস্তব যে, ভারতীয় সমাজ-রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা যতীন্দ্র মোহন ঠাকুর অথবা রমেশ মিত্ররমত গুরুত্বপূর্ণ সদস্যও আফিমপন্থীদের প্রতীকী বিরুদ্ধাচরণও করতে পারেন নি তাঁদের কাছে প্রস্তাব গেলে তাঁরা সরাসরি না করে দিয়েছেন রামমোহন, দ্বারকানাথের আগেও কলকাতার নামী পরিবারগুলি জমিদারি, গোমস্তাগিরি, দেওয়ানি, বেনিয়ানি আর মুতসুদ্দিগিরি করে, যে সনাতন ভারত মারার ব্যবসার মুখপাত করে গিয়েছেন, সেই ট্রাডিশন বজার রেখে ভারতের জমিদারদের একতা, ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান এসোসিয়েশনের সদস্যরা নীলকরদের কৃতকর্মের সমালোচনা করলেও, আফিমবিরোধী কমিশনের সদস্য হতে পারেন নি তাঁরা সরাসরি মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন
এর সঙ্গে শুধু কয়েকটি শুকনো তথ্যের জন্য বলা যাক, দুর্জয় বাঙালিদের মুখলুকোনো প্রত্যাখ্যানে ভারতের ভাইসরয় তখন দ্বারভাঙার মহারাজা লক্ষ্মীশ্বর সিংএর দ্বারস্থ হলেন তবে দ্বারভাঙার মহারাজের কোনো প্রজাই আফিম উত্পাদনে যুক্ত ছিলেন না লক্ষ্মীশ্বর নিজে জমিদারদের সংঘ ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান এসোসিয়েশনএর গুরুত্বপূর্ণ সদস্য এবং বিদেশে যথেষ্ট পরিচিত মুখ তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের অন্যতম পৃষ্ঠপোষকও বটে রয়েল কমিশনে সদস্য হওয়ার সময় তিনি ভাইসরয়ের পরামর্শদাতা দল, সুপ্রিম লেজিসলেটিভ কাউন্সিলেরও সদস্য ছিলেন ম্যকডোনেল তাঁর পক্ষ থেকে মহারাজার নাম গুরুত্বসহকারে সুপারিশ করলেন, The only man of sufficient standing and strength of character whom I know to be willing to take a nomination to the Opium Commission is the Maharajah of Durbhungah. His views are in favour of the maintenance of the opium revenue; and I think he would assert these views on the Commission, though I am not prepared to say that the anti-opiumists and pro-Congress people, such as Mr. Caine, may not influence him. But I should be disposed to run that risk, and I should be very glad to see Durbhungah get some mark of your Excellency’s confidence…. [H]e is a man of wide influence here, and I think he can be, if he likes, of great help to us. He and I are personally good friends and I find him very reasonable,… সুপারিশপত্র থেকে পরিস্কার তত্কালীন রাজনীতিতে মহারাজার গুরুত্ব কতখানি তবে রয়েল কমিশন ভারতে ভ্রমণকালে মহারাজার বুকের অসুখ বেড়ে যাওয়ায় তিনি তার সঙ্গে ঘুরতে পারেন নি, না কংগ্রেসিদের নানান চাপে চাননি তা বলা মুশকিল দ্বিতীয় মনোনীত সদস্য ছিলেন গুজরাটের জুনাগড় রাজত্বের প্রাক্তণ প্রধাণমন্ত্রী হরিদাস বিহারিদাস ব্রিটিশ সরকার তাঁকে এই কমিশনে নিয়েছিল মালব আফিম এলাকার উত্পাদক-ব্যবসায়ীদের খুশি করতে তবে হরিদাসের রাজত্বও কিন্তু আফিম উত্পাদনে যুক্ত ছিল না