Friday, September 1, 2017

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা - পলাশীর ঠিক অব্যবহিত পরে ব্রিটিশ লুঠ - শুধু আইনিভাবে ক্লাইভ পেয়েছিলেন ১১২৮ কোটি টাকা

এই ছোট্ট কাজে আমরা দেখার চেষ্টা করব ঠিক পলাশীর পরে পরে বাংলায় কি ধরণের লুঠছত্র বসেছিল এবং আজকের হিসেবে তার পরিমান কত। এখন করব শুধু ক্লাইভের হিসেব, যিনি ঘোষিতভাবে পেয়েছিলেন ১১২৮ কোটি টাকা।

তুলনা
সেদিন আর এদিনের তুলনা টানব চালের দামের মধ্যে। কারণ পণ্যের মধ্যে চালের দাম সব থেকে কম হারে বাড়ে। সেই হিসেবে, পলাশীর আগে মীরজাফর খাঁ কলকাতায় এলে তাকে ব্রিটিশদের সিধা দেওয়া তালিকা থেকে জানি প্রতিমন চাল ১ টাকা চৌদ্দ আনা হিসেবে কেনা হয়েছিল। হিসেবের সুবিধের জন্য চৌদ্দ আনা বাদ দিলাম। ১ টাকা। অর্থাৎ বালাম চাল ১ টাকায় ৪০ কিলো পাওয়া যেত। আজ সেই পরিমান চাল খুব কম করে ১৫০ টাকা কিলো হবে। অর্থাৎ আজ ৪০ কিলো চাল পাওয়া যাবে ৬০০০ টাকায়। অর্থাৎ সেদিনের টাকার হসেবে ৬০০০ গুণ করলে আমরা পেয়ে যাব মোটামুটি আজকের বাজার দরে সেদিনের টাকার মূল্য।

এবারে লুঠ
তো ১১ জুন হল মীর জাফর খাঁয়ের অভিষেক। সিরাজের কোষাগার দখল করলেন তিনি। সেটায় ছিল ১ কোটি ৭০ লক্ষ টাকা, ২ কোটি ৩০ লক্ষ টাকার মোহর, ২ সিন্দুক সোনার বাট, ৪ সিন্দুক মণিখচিত সোনার অলঙ্কার আর ২ সিন্দুক মণিমুক্তো। উপস্থিত ছিলেন ওয়াটসন, দেওয়ান রামচাঁদ আর মুন্সি নবকৃষ্ণ অবশ্যই ক্লাইভ আর মীরজাফর। এই সম্পদ ভাগ হল! আজকের বাজার দরে মূল্য কত ছিল আমরা কেউ জানি না। ধরে নিচ্ছি সমান সমান মূল্যে ভাগ হল। কিন্তু যেহেতু মোট সম্পদের মূল্য নিরূপণ করা গেল না, তাই প্রত্যেকে যদি সমানও সম্পদ লাভ করে থাকেন, তাহলেও কে কত পেলেন তা আন্দাজ করা গেল না।

এবারে সিরাজের গোপন কোষাগার। আট কোটি টাকা। আর্থাৎ আজকের হিসেবে ৪৮০০০ কোটি টাকা। এই টাকা ভাগ হল মীরজাফর, আমীর বেগ খাঁ, রামচাঁদ আর নবকৃষ্ণের মধ্যে। এটা ক্লাইভ জানতেন না।

এবারে পলাশীর চক্তান্ত জেতার পুরস্কার।
ক্লাইভ পেল ২ লক্ষ ৮০ হাজার টাকা।
ড্রেক পেল ২ লক্ষ ৮০ জাহার টাকা।
সিলেক্ট কমিটির প্রত্যেকে ২ লক্ষ ৪০ হাজার টাকা করে।

এছাড়া মির জাফর ক্লাইভকে দিল ১৬ লক্ষ টাকা।
ওয়াটসনকে ৮ লক্ষ টাকা
কিলপ্যাট্রিককে ৩ লক্ষ
ওয়াটসকে ৫ লক্ষ
স্ক্র্যাফটনকে ২ লক্ষ

শুধু ক্লাইভ পেয়েছিলেন ১৮লক্ষ ৮০ হাজার টাকা। ১১২,৮০,০০,০০,০০০ - ১১২৮ কোটি টাকা সিরাজের সিন্দুকের বিপুল সম্পদ বাদ দিয়ে।

বাংলার জমিদারি৭ জাফরখানি বন্দোবস্ত

আদতে এই প্রক্রিয়াটির শীর্ষক করা যেতে পারত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের লুঠ প্রক্রিয়ার আরম্ভ

{বাংলায় মুর্শিদকুলি খাঁ - মুতামিন-উল-মুলক আলা-উদ-দৌলা জাফর খান নাসিরী নাসির জঙ্গ বাহাদুর' উপাধি পেয়ে সাত হাজারি মনসব পান এবং ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে রাজধানী স্থাপন করেন। বাংলাকে তিনি ১৩টি চাকলায় ভাগ করে সেগুলিকে ২৫টি জমিদারি ও ১৩টি জায়গিরে বন্দোবস্ত করেন। এই বন্দোবস্তের নাম জমা কামেল তুমারী, এবং সমগ্র ব্যবস্থাটি জাফর খানি জমিদারি বন্দোবস্ত নামে পরিচিত। এই আলোচনায় পরিষ্কার হবে বাংলার জমিদারেরা বংশপরম্পরায় জমিদারি ভোগ করছিলেন। মোটামুটি আগামী দিনে, পলাশীর পরে এবং ব্রিটিশ আমলেও বাংলার রাজস্ব ব্যবস্থা জাফর খানি কাঠামো ধরে তৈরি হয়েছে।
এবারে সপ্তম অংশ}

৪। তৌজির জায়গির-দারান - নির্ধারত জায়গির মহালের বর্ধিত রাজস্ব
ক) জায়গির সরকার আলি - সুবাদারের জায়গির। মীরজাফর খাঁ পর্যন্ত এই এই সুবাদারি জায়গিরের অধিকাংশ রাজসাহী ও নদীয়া জমিদারির অন্তর্ভূক্ত ছিল। রাজসাহীর ভাতুড়িয়া পরগণার হস্তবুদ বহুল পরিমানে বেড়েছে দেখে মীর কাশিম খাঁ এই দুই জমিদারি এবং আরও কয়েকটি লাভজনক জমিদারি থেকে এই সরকারি জায়গির খারিজ করে আরও বেশি রাজস্ব দেখিয়ে অন্যান্য স্থানে ঢুকিয়ে দিলেন। এইভাবে রাজশাহী, নদীয়া এবং ঢাকার কয়েকটি এলাকা থেকে সরকারি জায়গির বিনিময় খালিসা-সেরেস্তায় যে রাজস্ব বাড়ল তা হল ১৫৩১২৩৫ টাকা।

খ) বন্দেওয়ালা দরগা(বাদসাহী দেওয়ানের জায়গির)য় রাজস্ব বাড়ল ২১৮৬৭৮ টাকা।

গ) আমির উল উমরা বাদসাহী সেনাপতির আগে দেখান জায়গির থেকে লাভ হল ১৫৩৮১ টাকা।

ঘ) আমলে অসম(সীমান্ত রক্ষা থানাদার জায়গির প্রভৃতি) থেকে নতুন লাভ হল ১১৫৭২৪ টাকা।

মোট বৃদ্ধি ১৮৮১০১৪ টাকা।

৫) সেরফ সিক্কা - ওপরে উল্লিখিত কয়েকটি রাজস্ব বৃদ্ধির ওপরে টাকার বাট্টাস্বরূপে প্রতি টাকায় দুই পয়সা করে যে নতুন আবওয়াব জারি হল তার আয় ৪৫৩৪৮৮ টাকা।

মীর কাসেমের মোট বৃদ্ধি ৭৪৮১৩৪০ টাকা।

মীর কাসেমেরে বন্দোবস্তে জায়গির বিভাগ নিচে স্থির হয় - তাতেও নয় লক্ষ টাকা উদ্বৃত্ত থাকে

১) জায়গির সরকার আলি - মীরজাফর রাজ্যচ্যুত হলেও তার নামেই সুবাদারি চলত। রাজ্যচ্যুতির পর তিনি নবাবি জায়গির থেকে উপসত্ত্ব মীরজাফর ভোগ করবেন তা ঠিক ছিল। কিন্তু তিনি জায়গিরের সমস্ত আয় কিভাবে করবেন তা বিবেচনা করা হয় নি। অন্যান্য মহালে পরিওর্তন করে জায়গিরে যে আয় দেখানো হল তার পরিমান ১১৫২৮৭৯ টাকা।

২) ক্লাইভের কলকাতা জমিদারির উপসত্ত্ব ২২২৯৫৮ টাকা

৩) বাদসাহী দেওয়ানের(এখন মীরকাসেম) জায়গির ২৩৮৯৯২ টাকা

৪) জায়গির বক্সীয়ান আজম(প্রধান সেনাপতিরা) বাদসাহী সেনাপতির জায়গিরের পরিবর্তে বাংলার প্রধান সেনাপতির জায়গির ১০৮৫০৩ টাকা।

৫) নাজিমউদ্দৌলা(মীরজাফরের বড় পুত্র) ৪৫৮৩১২ টাকা।

৬) সইফউদ্দৌলা (মীরজাফরের দ্বিতীয় পুত্র) ২৯৮৫৬৭ টাকা

৭) জমিদারান - সীমান্ত প্রদেশের জমিদারেরা ৫২৩২২ টাকা

৮) মদৎ মাশ - (ধর্মাচরণের নন্য) ৩৯৭৪৩ টাকা

৯) মসরুৎ থানাজাৎ(থানাদারদের বৃত্তি)
আকবর নগর - রাজমহল তেলিয়াগড়ি ১৬৬৬৬ টাকা
মহম্মদ হুসেন সংগ্রামগড় ৮৭৩৩ টাকা
মুতসুদ্দিন খালসা - রাজস্ববিভাগের কর্মচারী ৭২৯১ টাকা
রাজা যুগলকিশোর বাদশাহ দরবারের উকিল ৩৬৪৫ টাকা
মহম্মদ আসরফ খাঁ ফৌজদার যশোর ৪১৬৬ টাকা
হোসেন রেজা খাঁ ফৌজদার ভূষণা ৩৩৩৩ টাকা
নাওয়ারা, তোপখানা, টঁকশাল, দাঘ, প্রভৃতির দারোগা আমিল ১৭২৩৭ টাকা

১০) পাই বাকি - পূর্ব আমলের নির্দিষ্ট জায়গির জমা থেকে যে টাকা উদ্বৃত্ত থাকল(আমলে নাওয়ারা প্রভৃতি বিভাগের অবশিষ্ট) ৯০৭১৭৩ টাকা।

সমগ্র জায়গিরের পরিমান ৩৫৫৪৭১৮ টাকা।
এইভাবে মীর কাশেমের সময় বাংলার রাজস্ব ১,১০,৩৬,০৫৮ টাকা বেড়েছিল


সূত্রঃ বাংলার ইতিহাস(আষ্টাদশ শতাব্দী) - নবাবী আমল - কালীপ্রসন্ন বন্দ্যোপাধ্যায়

বাংলার জমিদারি৬ জাফরখানি বন্দোবস্ত

{বাংলায় মুর্শিদকুলি খাঁ - মুতামিন-উল-মুলক আলা-উদ-দৌলা জাফর খান নাসিরী নাসির জঙ্গ বাহাদুর' উপাধি পেয়ে সাত হাজারি মনসব পান এবং ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে রাজধানী স্থাপন করেন। বাংলাকে তিনি ১৩টি চাকলায় ভাগ করে সেগুলিকে ২৫টি জমিদারি ও ১৩টি জায়গিরে বন্দোবস্ত করেন। এই বন্দোবস্তের নাম জমা কামেল তুমারী, এবং সমগ্র ব্যবস্থাটি জাফর খানি জমিদারি বন্দোবস্ত নামে পরিচিত। এই আলোচনায় পরিষ্কার হবে বাংলার জমিদারেরা বংশপরম্পরায় জমিদারি ভোগ করছিলেন। মোটামুটি আগামী দিনে, পলাশীর পরে এবং ব্রিটিশ আমলেও বাংলার রাজস্ব ব্যবস্থা জাফর খানি কাঠামো ধরে তৈরি হয়েছে।
এবারে ষষ্ঠ অংশ}

আবওয়াব
মুর্শিদকুলি খাঁ সুজার বন্দোবস্তের ওপরে নিজের উদ্ভাবনী প্রশাসনিক মোহর অঙ্কিত করেন। তিনি জমিদারি বন্দোবস্তের ওপর অতিরিক্ত কর বসালেন যার নাম আবওয়াব খাসনবিশি। খাস অর্থাৎ নিজের সরকারের খালসা সেরেস্তার প্রধান কর্মচারী ও মুতসুদ্দিদের পার্বনীর খরচ যোগানোর জন্য এটির উদ্ভব। রাজস্বের ওপর পড়তা করে সামান্য এক নজরানাও ধরে নেওয়া হত। এটা এবং বাদশাহী নজরানা মিলে মোট খাসনবিশি হল ১৮৫৮৫৮৭ টাকা।

১। নজরানা মোকররি - সুজা খাঁ নবাবি ব্যয়ের জন্য রাজস্বের ওপর চার ধরণের আবওয়াব চাপিয়ে ১৯১৪০৯৫ টাকা আয় করেন। সুজার প্রথম কর নজরানা মোকররি বা স্থায়ী নজরানা। সমগ্র খালসা জমার ওপর সাড়ে ছয় টাকা অনুপাতে হয়ে এর পরিমান দাঁড়ায় ৬৪৮০৪০ টাকা।

২। জার মাথট হল দ্বিতীয় আবওয়াব মাথটের অর্থ হল হারাহারি বা অনুপাত অনুসারে দেয় আলগা খাজনা। চারটি বিষয়ের জন্য কর চাপানো হয় -

ক) নজর পুণ্যাহ - প্রতিবছর নবাব দরবারে বছরের প্রথম দিনে পুণ্যাহের দিন নিজের জমিদারির স্থির থাকল এটা জানার জন্য কর।

খ) বয় খেলাৎ - পুণ্যাহের দিন জমিদারদের যে খেলাৎ বা উপহার দেওয়া হত তার মূল্যস্বরূপ এই কর।

গ। পোস্তাবন্দী - নবাবি কেল্লার সম্মুখে ও লালবাগে ভাগীরথীতীরে পোস্তা বাঁধার(দেওয়াল বাঁধার) ব্যয়

ঘ। রসুম নেজারৎ - মফঃস্বল থেকে রাজস্ব আনার জন্য নাজির পদাতিক প্রভৃতির খরচের জন্য।

মোট চার দফায় ১৫২৭৮৬ টাকা।

মাথট ফিলখানা - সরকারি ফিলখানা বা হাতিশালার ব্যয় - কানুনগো রুকনপুর, জালালপুর, ত্রিপুরা, শ্রীহট্ট, পূর্ণিয়া রাজমহল, বীরভূম, বিষ্ণুপুর, পঞ্চকোট ইত্যাদি জমিদারি ছড়া পড়তা করে অন্যন্য জমিদার থেকে এই মাথট আদায় হত - মোট ৩২২৬৩১ টাকা।

৪। আবওয়াব ফৌজদারি - সুজা খাঁর সঙ্গে তার ফৌজদারেরা এলাকায় এলাকায় কর বৃদ্ধি করেন - তবে কর এলাকা অনুযায়ী নানান পরিমানে হয়।

১) পূর্নিয়ার আবওয়াব - পূর্ণিয়া ১৮৩০২৭ টাকা, শ্রীহট্ট ১৫৯৫৩৫ টাকা, ত্রিপুরা - ১৮৪৭৫১ টাকা, নিখাস বা মুর্শিদাবাদে পশু বিক্রির জন্য ১১৬৭৯ টাকা, থানাজাৎ - বাংলার যে সব এলাকায় সেনা বা প্রহরী নিবাস ছিল সেগুলোকে থানা বলত - সেগুলির ব্যয়ের জন্য বাজার থেকে কর আদায় করা হত। সুজার সময় থেকে এগুলি সরকারি নিয়মে রূপান্তরিত হয়। কাটোয়া থেকে ৪৮০০০, রাঙ্গামাটি থেকে হাতি ধরার খরচ ২৪০০০ টাকা, ভূষোয়ান্র নলদি থেকে ২৪০২৫ টাকা মাহামুদশাহী থেকে ১০৮৬০ টাকা এবং অন্যনায় ছোটখাট থানা থেকে ৮৮৪৩ টাকা মোট ১১৫৭২৮ টাকা আদায় হত। এই ফৌজদারির মট মোট আয় ১৫৪৭২০ টাকা।

২) ঘোড়াঘাটের আবওয়াব ১৯২৭৯ টাকা।

৩) মুর্শিদাবাদের ফৌজদারি আবওয়াব - ১৬৬৩৯ টাকা।

মোট ফৌজদার আবওয়াব ৭৯০৬৩৮ টাকা।

এতে দেখা যাবে মুর্শিদ কুলিখাঁ আর সুজার বাড়া আওবাব মিলিয়ে ২১৭২৯৫২ টাকা কর বৃদ্ধি ঘটে। আলিবর্দির সময়ে চৌথ মারাঠা, নজরানা মনসুরগঞ্জ প্রভৃতিতে ২২২৪৫৫৪ টাকা কর বৃদ্ধি পায়।

এরপর মীর কাসেমের রাজস্ব বৃদ্ধি
১) কেফায়াৎ হস্তবুদ(জমাবেশী)
ক) বীরভূমের জমিদার আসদ জামান খাঁকে উৎখাত করে নানা রূপে কর বৃদ্ধি ঘটে ৮২৬২৭৫ টাকা।
খ) দিনাজপুরের জমিদারি থেকে অন্যান্য আবওয়াব ছাড়া রাজকরের ওপর যে বৃদ্ধি হয় তা হল ৫৭৬৩২৪
মোট কেয়াফৎ হস্তবুদ ১৪৭২৫৯৯ টাকা।

২) কেয়াফৎ ফৌজদারান(ফৌজদারি রাজকর)
ক) পূর্ণিয়া - ১৭৫২তে মুর্শিদকুলিখাঁর প্রতিষ্ঠিত জায়গিরদার সইফ খাঁয়ের এন্তেকালের পরে আলিবর্দিখানের ভাইপো খাদেম হোসেনকে ফৌজদারি আয় দেওয়া হয়। মীরকাসেম এতার রাজস্ব খালসা সেরেস্তায় আনলেন। মজমা হল - ১৪২৩৭২৫ টাকা।

খ) ঢাকা জালালপুর - আলিবর্দীর সময়ে ঢাকার একাংশ নোয়াজিস মহম্মদের ব্যয়ের জন্য দেওয়া হয়েছিল। মীরজাফরের সমর এর একাংশ রাজবল্লভের হাত দিয়ে ননানের কাছে পোঁছত। রাজবল্লভ পাটনার নবাবি প্রাপ্তির আসায় ঢাকা বিভাগের পুরো আয় দেখিয়ে দিলেন। ঢাকার সরকারি ব্যয় করেও যা পড়ে থাকে তার পরিমাণ হল ১২০১৩১৫ টাকা।

গ) রঙ্গপুর কোচবিহার জঙ্গলমহল সীমান্ত প্রদেশর ফৌজদারেরা সামান্য কর দিতেন। এই সমস্ত আয় খালসা দপ্তরে জমা পড়ে দাঁড়াল ১৫১৪৯৮ টাকা।

ঘ) রাজমহল বা কাঁকজোল ফৌজদারি অধীনে যে খালসা ও ফৌজদারি ছিল তার ওপর বর্ধিত কর ৪২৭৫৭টাকা।

ঙ) চট্টগ্রাম আর বর্ধমান কোম্পানি চিরদিনের জন্য দেওয়া হয় নি এটা মীরকাশেম ধরে নিয়ে ছিলেন। অন্যান্য জায়গিরদারকে দেওয়া ভূমির মত, কোম্পানির সৈন্য সাহায্য প্রয়োজন না হলে সুবিধা মত তা পুনরুদ্ধার হবে এই আসা ছিল। এই তিনটে বিভাগ সরকারি কাগজে ও কানুনগো দপ্তরে ফৌজদারি বিভাগে পরিণত হয়েছিল। আদায় না হলেও এতে বৃদ্ধির পরিমান কাগজে দেখানো হল ২৯৬০০০ টাকা।

মোট ফৌজদারি আয় বৃদ্ধি ৩২১৫২৯৫ টাকা

৪) সায়ারাৎ(শুল্ক) বিভাগে বর্ধিত জমা
ক) চুনাখালি(মুর্শিদাবাদের প্রধান শুল্ক দপ্তর) ২৩১৭৯৩ টাকা।
খ) নবাবগঞ্জ (মহানন্দার আর গঙ্গার সঙ্গমস্থলে আদায়স্থান) ১১৮৭৯৩ টাকা।
গ) আসদ নগর(মুর্শিদাবাদের শুল্কবৃদ্ধি জমা) ৭০৭৮৭ টাকা।
ঘ) ভাণ্ডারদহ(মুর্শিদাবাদের উত্তরপূর্ব থেকে ভাগীরথীর একটা শাখা বের হয়ে জলঙ্গীর সঙ্গে মিশত। এর তীরে আদায়স্থান) ২৭৬০১ টাকা।
ঙ) আজিমগঞ্জ (দুমকল) কলকলীর তীরে ৬৪০১ টাকা
চ) চক চাঁদনী(মুর্শিদাবাদের বাজার) ৩৫৬০ টাকা
মোট সায়ারাৎ ৪৫৮৯৪৪ টাকা।

(ক্রমশঃ)


সূত্রঃ বাংলার ইতিহাস(আষ্টাদশ শতাব্দী) - নবাবী আমল - কালীপ্রসন্ন বন্দ্যোপাধ্যায়

বাংলার জমিদারি৫ জাফরখানি বন্দোবস্ত

{বাংলায় মুর্শিদকুলি খাঁ - মুতামিন-উল-মুলক আলা-উদ-দৌলা জাফর খান নাসিরী নাসির জঙ্গ বাহাদুর' উপাধি পেয়ে সাত হাজারি মনসব পান এবং ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে রাজধানী স্থাপন করেন। বাংলাকে তিনি ১৩টি চাকলায় ভাগ করে সেগুলিকে ২৫টি জমিদারি ও ১৩টি জায়গিরে বন্দোবস্ত করেন। এই বন্দোবস্তের নাম জমা কামেল তুমারী, এবং সমগ্র ব্যবস্থাটি জাফর খানি জমিদারি বন্দোবস্ত নামে পরিচিত। এই আলোচনায় পরিষ্কার হবে বাংলার জমিদারেরা বংশপরম্পরায় জমিদারি ভোগ করছিলেন। মোটামুটি আগামী দিনে, পলাশীর পরে এবং ব্রিটিশ আমলেও বাংলার রাজস্ব ব্যবস্থা জাফর খানি কাঠামো ধরে তৈরি হয়েছে।
এবারে পঞ্চম অংশ}
সায়ারাৎ মহাল(শুল্ক প্রভৃতি)
১) চুনাখালি - ১১৩০ সালে মুর্শিদাবাদ ও উপকণ্ঠ নগরগুলির(কাশিমবাজার ইত্যাদি) আমদানি রপ্তানি দ্রব্যের মাশুল ও হাটবাজার প্রভৃতির কর(ভূমি রাজস্ব বাদে) ৩১১৬০৩ টাকা।
২) বখসবন্দর বা হুগলি (৩৭টা গঞ্জ ও বাজারের রাজস্ব ও নানা প্রকার মাশুল কর প্রভৃতি) মোট ৩৪২৭০৮ টাকা। এর থেকে কলকাতার ৪৪৭৬৭ টাকা বাদ দিয়ে ২৯৭৯৪১ টাকা
৩) দার উল জারব মুর্শিদাবাদের ট্যাঁকসালের আয়৩০৪১০৩ টাকা।
মোট সায়ের রাজস্ব ৯১৩৬৪৭ টাকা।
বাংলা ১১৩৫ সালের সমগ্র খালসা ও সায়ের জমা - ২৫ জমিদারি বিভাগে মোট ১২৫৬ পরগণায় ১০৯১৮০৮৪ টাকা।
জায়গির জমা
সে সময় বাংলার নানা স্থানে ভূমি নির্দেশ করে তার আয় থেকে নাজিম, দেওয়ান ও সৈন্যবিভাগের ব্যয় তোলা হত
১) সরকার আলি - সুবাদারের নিজস্ব ব্যয়ের জন্য জায়গির, চাকলা ঢাকা আর হিজলির মধ্যে এর অর্ধাংশ, অবশিষ্ট ভাগ যশোহর, রাজশাহী, কৃষ্ণনগর ও দিনাজপুরের মধ্যে ছড়ানো ছিল। বাদসাহ সেরেস্তায় এই জায়গিরের উৎপন্ন (রেকমি জমা) ১৬০৫৬৯৩ টাকা লেখা থাকলেও বর্তমান বন্দোবস্তে অন্যান্য জমিদারির মত আয় ধরে এই বিস্তীর্ণ ভূভাগের নির্দিষ্ট জমা - ৬০ পরগণায় ১০৭০৪৬৫ টাকা।
২) বন্দেওয়ালা দরগা বাদশাহী দেওয়ানের জায়গির। বাহিরবন্দ ও ভিতরবন্দ পরগণা। বাদশাহী সেরেস্তায় জমা ২৯২৫০০ টকা। কিন্তু মোট ২০ পরগণায় ১৪৬২৫০ টাকা মাত্র ছিল।
৩) জায়গির আমির উল উমরা বক্সী(প্রধান সেনাপতি) - মুর্শিদকুলিখানের সময় প্রধান সেনাপতি সামসামউদ্দৌল্লা খানদৌরান। বাংলার প্রতিনিধি মার্ফত তার আয় হত। বাদশাহী সেরেস্তায় জমা ৩৩৭৫০০ টাকা। এই জায়গির অসম ঢাকা শ্রীহট্টের দিকে নির্দিষ্ট হয়েছিল।সেনাপতির প্রতিনিধিরা জায়গিরের কাজ, ভাগ রক্ষা এবং আয় করবে এটাই উদ্দেশ্য ছিল - ১৮ পরগণায় ২২৫০০০ টাকা।
৪) জায়গির ফৌজদারান
ক) ঢাকার নায়েব নাজিমের(প্রতিনিধি শাসন কর্তার) জায়গির। রেকমী জমা ২৪০৭৫০ টাকা। ১১ পরগণা ১০০১৪৫ টাকা।
খ) শ্রীহট্ট জেলার ফৌজদার(সামসের খাঁ) ও অন্য চার জন সীমান্ত-রক্ষকের জায়গির - রেকমি জমা ৪৩০০০০ টাকা। ৪৮ পরগণা ১৭৯১৬৬ টাকা।
গ) পূর্নিয়ার ফৌজদার(সইফ খাঁ) ৯ পরগণা ১৮০১৬৬ টাকা
ঘ) ঘোড়াঘাট ফৌজদারি (মনসুর খাঁ) ৩ পরগণা ১৬৬৬৬ টাকা
ঙ) রাজমহল ও তেলিয়াগড়ির ফৌজদার (সুজার সময়ে আলিবর্দি খাঁ) ৪ পরগণা ১৬৬৬৬ টাকা।
মোট ফৌজদারি ৭৫ পরগণা ৮৯২৮০০ টাকা।
৫) মনসবদরান(সেনাদের জন্য)। মনসবদরান পাঁচশ সেনার নায়ক হয়েও হাজারী নামে খ্যাত ছ্যিল। তাদের সেনাদলের বেতন শ্রীহট্ট, ঢাকা, হিজলি ও রাজমহল সীমান্তে ছিল। ২০ পরগণা ১১০৮৫২ টাকা।
৬) জমিদারান - ত্রিপুরা মাকোয়া, সুসঙ্গ তেলিয়াগড়ি - এই চার জন সীমান্তের জমিদারের জায়গির ২ পরগণা ৩৯৭৫০ টাকা।
৭) মদৎ মাশ(ধর্মের জন্য দেয় জায়গির) বর্ধমান রাজমহলের বিভিন্ন এলাকায় আর হুগলির পেঁড়োর মসজিদ তৈরির জন্য ৭ পরগণা ২৫৬৬৫ টাকা।
8) শালিয়ানাদারান(বাৎসরিক বৃত্তি) শ্রীহটতের কয়েকজন তালুকদারের জন্য ৯ পরগণা ২৫৯২৭ টাকা।
৯) ইনাম আলতগমা(উত্তরাধিকার ক্রমে ভোগের জন্য) ২ জন মৌলবিকে দেয় ১ পরগণা ২১২৭ টাকা।
১০) রুজিআনদারান, জনৈক মোল্লাকে প্রদত্ত লস্করপুরের অন্তর্গত সামান্য তালুক ৩৩৭ টাকা।
মোট ৩৯ পরগণা ২১৪৭১৮ টাকা।
১১) আমলে নাওয়ারা - নৌসৈন্য বিভাগ আর তার জায়গির
উপকূলে বা নদীমুখে মগ ফিরিঙ্গি প্রভৃতি জলদস্যুর উপদ্রব নিবারণের জন্য প্রথমে স্থাপিত হয়। এই সময়ে ৯২৩ জন ফিরিঙ্গি বা পর্তুগিজ নাবিক এই বিভাগে নিযুক্ত ছিল। ৭৬৮টি সুসজ্জিত সশস্ত্র তরণী থাকত, মাসিক ব্যয় ছিল ২৯২৮২ টাকা। এটা আর নতুন নৌকো তৈরির খরচ হিসেবে ৮৪৩৪৫২ টাকা নির্দিষ্ট ছিল। ঢাকা ও শ্রীহট্ট চাকলায় জায়গির ভূমির ব্যবস্থা ছিল। ঢাকার মধ্যেই ছিল মোটের ৪/৫ অংশ। এই টাকার মধ্যে সীমান্তের জমিদারদের থেকে পেশকাশ রূপে ৫০ হাজারের কিছু বেশি টাকা আদায় হত। এটা আগের বন্দবস্তের বাইরে ছিল। ৫৫ পরগণা ৭৭৮৯৫৪ টাকা।
১২) আমলে অসম - পূর্বপ্রান্তের বিশেষ করে অসমের সীমান্ত, নদীতীর ও উপকূলভাগের বন্দর ইত্যাদি শত্রুর থেকে রক্ষার জন্য সেনানিবাস, সৈনিক ও প্রহরী প্রভৃতির ব্যয় নির্বাহের জন্য 'আমলে অসম' মানে এই জায়গিরের প্রতিষ্ঠা হয়। এর মধ্যে ঢাকায় স্থাপিত ২৮২০ জন সেনার জন্য ১৩ পরগণায় ১৩৫০৬০ টাকা, ইস্লামাবাদ বা চট্টগ্রামের ৩৫২২ জনের জন্য ১১৭ কিসমতে ১৫০২৫১ টাকা, রাঙ্গামাটি বা কামরূপ অঞ্চলের ১৪৭৮ জন সেনার জন্য ৪ পরগণায় ৬৩৪৪৫ টাকা ও শ্রীহট্টের ২৮২ জন সেনার জন্য ৪ পরগণায় ১০৮২৪ টাকা রাজস্ব রাজস্ব নির্ধারিত ছিল।মোট ৮১১২ জন সৈনিকের জন্য ক্ষুদ্র ও বৃহৎ ১৩৮টি পরগণার নির্দিষ্ট রাজস্ব ৩৫৯১৮০ টাকা।
১৩) খোদা আ ফিল - হাতি ধরার জন্য - হাতি ধরা হত ত্রিপুরা শ্রীহট্ট জঙ্গল থেকে। হাতি ধরার খরচের জন্য ত্রিপুরা ও শ্রীহট্টে খোদা আ ফিল জায়গির নির্দিষ্ট ছিল। তারজন্য রাজস্ব ছিল ৪০১০১ টাকা।
মোট বাংলার রাজস্ব-
খালসা ও সায়ারাৎ ১২৫৬ পরগণা ১০৯১৮০৮৪ টাকা
জায়গির ২১২ পরগণা ২১৩৯২৪২ টাকা
সৈন্য বিভাগ ১৯২ পরগণা ১১৭৮২৩৫ টাকা
সুজার সংশোধিত হিসেব ১৬৬০ পরগণায় ১৪২৪৫৫৬১ টাকা
বাদ নাজাই ৪২৬২৫ টাকা
মুর্শিদকুলি খাঁর জমা কামেল তুমারী ১৪২৮৮১৪৬ টাকা।
(ক্রমশঃ)
সূত্রঃ বাংলার ইতিহাস(আষ্টাদশ শতাব্দী) - নবাবী আমল - কালীপ্রসন্ন বন্দ্যোপাধ্যায়

বাংলার জমিদারি৪ জাফরখানি বন্দোবস্ত

{বাংলায় মুর্শিদকুলি খাঁ - মুতামিন-উল-মুলক আলা-উদ-দৌলা জাফর খান নাসিরী নাসির জঙ্গ বাহাদুর' উপাধি পেয়ে সাত হাজারি মনসব পান এবং ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে রাজধানী স্থাপন করেন। বাংলাকে তিনি ১৩টি চাকলায় ভাগ করে সেগুলিকে ২৫টি জমিদারি ও ১৩টি জায়গিরে বন্দোবস্ত করেন। এই বন্দোবস্তের নাম জমা কামেল তুমারী, এবং সমগ্র ব্যবস্থাটি জাফর খানি জমিদারি বন্দোবস্ত নামে পরিচিত। এই আলোচনায় পরিষ্কার হবে বাংলার জমিদারেরা বংশপরম্পরায় জমিদারি ভোগ করছিলেন। মোটামুটি আগামী দিনে, পলাশীর পরে এবং ব্রিটিশ আমলেও বাংলার রাজস্ব ব্যবস্থা জাফর খানি কাঠামো ধরে তৈরি হয়েছে।
এবারে চতুর্থ অংশ}
মজকুরি তালুক
১। বহরুল - সরকার শরীফাবাদের মধ্যে এই জমিদারির ১৩ পরগণায় ২৪১৩৯৭ টাকা জমা ধার্য হয়। ১১৩৫ সালে সুজার সময়ে এই জমিদারি রামকৃষ্ণকে দেওয়া হয়, পরে এর অধিকাংশ রাজশাহীর মধ্যে ঢুকে যায়।
২। মণ্ডল ঘাট - সরকার সাতগাঁ চাকলা বর্ধমানের অন্তর্গত। এই জমিদারিতে মুর্শিদ কুলী খাঁর বন্দোবস্ত পদ্মনাভের নামে ৫ পরগণায় ১৪৬২৬১ টাকা জমা ধার্য ছিল। পরে এটা বর্ধমান রাজের অধিকারে আসে।
৩। আর্ষা - সাতগাঁর মধ্যে, রঘুদেবের জমিদারির অন্তর্ভুক্ত; পরে এটা বর্ধমানের সঙ্গে মিশে যায়। ১১ পরগনায় জমা ছিল ১২৫৩৫১ টাকা।
৪। চুণাখালি - এর মধ্যে মুর্শিদাবাদ শহর ছিল। এর কিয়দংশ নবাবের খাস তালুক হয়ে যায় এবং অন্য অংশ রাজশাহী জমিদারির অংশভুক্ত হয়ে যায়। ৩ পরগণার রাজস্ব ৯৫৪০৭টাকা।
৫। আসদ নগর ও মহলন্দী দিগর - মুর্শিদাবাদের মধ্যে এই জমিদারির একাংশ রাজশাহীর অংশ হয়। অবশিষ্টাংশ ৩ পরগণায় ৬০৭৯৮ টাকায় বন্দোবস্ত হয়।
৬। জাহাঙ্গীরপুর দিগর - চাকলে ঘোড়াঘাটের অন্তর্গত ছিল। দিনাজপুরের মহাদেবপুরের রাঢীয় ব্রাহ্মণ বংশের নয়নচাঁদ চৌধুরী জাহাঙ্গীরের থেকে এটা পান। মুর্শিদিকুলি খাঁর সময় রাম দেবের সঙ্গে ১১ পরগণায় সদর জমা ছিল ৬৪২৪৯ টাকা। পরে এটা তিন জনের মধ্যে বিভক্ত হয়। মীর কাশেমের সময় ১১৯০৪০ টাকা রাজস্ব নিরূপিত হয়।
৭) আতিয়া, কাগমারী, বড়বাজু, হোসেনশাহী ইত্যাদি চাকলা ঘোড়াঘাটের অন্তর্ভূক্ত এই তালুকগুলো ১০ পরগণায় ৬৭৮৮৩ টাকায় বন্দোবস্ত হয়। মীর কাশেমের সময় ৪ জন মুসলমান তালুকদারে ভাগ হয়ে হয় ১১০০৪১ টাকা।
৮) শালবাড়ি - সরকার বাজুহার অন্তর্গত(১৯০০র দিনাজপুরে) এই প্রসিদ্ধ পরগনার রাজস্ব ৫৭৪২১ টাকা ধার্য হয়। পরে বিভিন্ন তালুকদারের অধিকারে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশে বিভক্ত হয়। মীরকাশেমের সময় এর সঙ্গে বারবেকপুর মসিদা প্রভৃতি পরগণা মিলিয়ে সদর জমা হয় ১৬৬৪৭৭ টাকা।
৯) তাহেরপুর, বারবেকপুর ও মসদা এই তিন পরগণা ভিন্ন ভিন্ন জমিদারের সঙ্গে ৫৫৭৯১ টাকা জমায় বন্দোবস্ত হয়েছিল। তাহেরপুর সে সময় কংসনারায়ণের বংশধরগণের অধিকারে ছিল। পরে বারকেকপুর দুবলহাটি রাজবংশের অধিকারে আসে।
১০) চাঁদলাই সহ ক্ষুদ্র মহাল - মুর্শিদাবাদ, আকবর নগর, ঘোড়াঘাট ও জাহাঙ্গীর নগর এই চার এলাকায় ছড়িয়ে ছিল। নবাব সরকারের একজন হিন্দু আধিকারিককে ২৪ তালুক ৭ পরগণা ৫৫৭২৯ টাকায় দেওয়া হয়। পরে সত্রাজিৎ আর ভোলানাথের মধ্যে বারো আনা আর সিকিতে বিভক্ত হয়।
১১) পাতিলয়াদহ ও কুণ্ডী - চাকলা ঘোড়াঘাটের মধ্যে এই দুই তালুক ৭ পরগণায় ৬৭৬৩২ টাকায় জমা ধার্য হয়। পরে এটা রাজসাহীতে ঢুকে যায়।
১২) সন্তোষ এবং অন্যান্য- ঘোড়াঘাটের(আজকের ময়মনসিংহ) এই বন্দোবস্তে ২ পরগনায় ৯৪৮০৭ টাকায় জম্যা ধার্য হয়। রঘুনাথ এর দায়িত্বে ছিলেন। পরে দিনাজপুর আর রঙ্গপুরের মধ্যে ভাগ হয়ে যায়।
১৩) আলাপ সিংও মমিন সিং - দুই পরগণা ৭৫৭৫৫ টাকা জমায় টিকরার মহম্মদ মেহন্দির নামে লেখা ছিল।
১৪) সাতসইকা - (সাতশ ব্রাহ্মণের বাসের জন্য - প্রাচীন নাম সপ্তশতিকা) বর্ধমান জেলার পূর্ব পাশে অবস্থিত। মুর্শিদকুলি খাঁয়ের সময় এই বংশের একরাম চৌধুরীর সঙ্গে ৩ পরগণায় ৫১১৬৭ টাকা জমা ধার্য হয়। পরবর্তীকালে জমিদারি হাতছাড়া হলে এরা পরে সমুদ্রগড়ের রাজা নামে অভিহিত হতেন।
১৫) মহম্মদ আমিনপুর - এই জমিদারি বর্ধমান ও হুগলি জেলায় ভাগীরথীর তীরে কলকাতার উল্টো দিকে অবস্থিত ছিল। এরা উত্তর রাঢীয় পাটুলির রাজা নামে বিখ্যাত। পরে বাঁশবেড়িয়া শ্যাওড়াফুলিতে বাস করেন। ১৪ পরগনায় এদের রাজস্ব ১৪০০৪৬ টাকা ধার্য হয়। মীর কাসেমের সময় ৩২৬৭৪৭ টাকা হয়।
১৬) পাত্তাস, করদিহা, ফতেজঙ্গপুর - চাকলা ঘোড়াঘাটের অন্তর্গত। নয় পরগনায় জমা ১০০৮৭৮ টাকা ধার্য হয়। তিনটে জমিদারি দিনাজপুর রাজের সঙ্গে মিলে যায়।
১৭) পুখুরিয়া ও জাফরশাহী এই দুই মহাল বাজুহার অন্তর্গত ছিল। ৫ পরগণায় এই জমিদারি সদর জমা ৫৪৫১৯ টাকা নির্দিষ্ট হয়। প্রথমটি রাজসাহী ও পরেরটি জালালপুরের মধ্যে পড়ে।
১৮) মাইহাটি - সরকার সাতগাঁর মধ্যে। জনৈক সীতারামের সঙ্গে ১৫ পরগণায় ২৮৮৩১ টাকায় বন্দোবস্ত হয়।
১৯) হুজুরি তালুকান - এই জমিদারিগুলি ছাড়া ৯৮ জন ছোট ছোট তালুকদার খালসা সেরেস্তায় স্বয়ং রাজস্ব দান করতেন - এদের হুজুরি তালুকদার বলা হত। এগুলির অধিকাংশ চাকলা মুর্শিদাবাদ আর সাতগাঁর অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই তালুককে ২ পরগনা ধরে ৯৫৮৫৫ টাকা জমা ধার্য হয়।
২০) আকবর নগর বা রাজমহলের সায়ারাৎ অর্থাৎ শুল্ক প্রভৃতি নিয়ে ২ পরগনা ধরে ৫৪৪৩২ টাকা ধার্য হয়, পরে এটা কাঁকজোলের জমিদারিতে ঢুকে যায়।
২১) অন্যান্য ছোট মহাল - গোটা বাংলায় যে সব পরগণার অংশ বা মৌজা উল্লিখিত জমিদারিগুলোর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছিল, তাদের এক সঙ্গে ৮ পরগনা ধরে মোট ৪৮৯৯২ টাকা জমা ধার্য হয়।
সব মিলিয়ে মাজকুরি মহালের ১৩৬ পরগণা ও ৭৮৫২০১ টাকা রাজস্ব নির্ধারিত হয়।
(ক্রমশঃ)
সূত্রঃ বাংলার ইতিহাস(আষ্টাদশ শতাব্দী) - নবাবী আমল - কালীপ্রসন্ন বন্দ্যোপাধ্যায়

বাংলার জমিদারি৩ জাফরখানি বন্দোবস্ত

{বাংলায় মুর্শিদকুলি খাঁ - মুতামিন-উল-মুলক আলা-উদ-দৌলা জাফর খান নাসিরী নাসির জঙ্গ বাহাদুর' উপাধি পেয়ে সাত হাজারি মনসব পান এবং ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে রাজধানী স্থাপন করেন। বাংলাকে তিনি ১৩টি চাকলায় ভাগ করে সেগুলিকে ২৫টি জমিদারি ও ১৩টি জায়গিরে বন্দোবস্ত করেন। এই বন্দোবস্তের নাম জমা কামেল তুমারী, এবং সমগ্র ব্যবস্থাটি জাফর খানি জমিদারি বন্দোবস্ত নামে পরিচিত। এই আলোচনায় পরিষ্কার হবে বাংলার জমিদারেরা বংশপরম্পরায় জমিদারি ভোগ করছিলেন। মোটামুটি আগামী দিনে, পলাশীর পরে এবং ব্রিটিশ আমলেও বাংলার রাজস্ব ব্যবস্থা জাফর খানি কাঠামো ধরে তৈরি হয়েছে।
এবারে তৃতীয় অংশ}
সতের - কলকাতা
কলকাতার চারপাশ নিয়ে ২৭ পরগণায় ২২২৯৫৮ টাকায় এই জমিদারি তৈরি হয়। হুগলির ফৌজদার রাজস্ব আদায় করতেন। ইংরেজ কোম্পানি ২৪টা হস্তগত করে বর্তমান জেলার নাম করণ করে। মীরকাশেমের সময় এর রাজস্ব দেখানো হয় ৫৫৫০৩৬টাকা।
আঠের - ফকিরকুণ্ডী রঙ্গপুর
চাকলে ঘোড়াঘাটের পুরো উত্তরভাগ, অর্থাৎ কুচবিহারের দক্ষিণ পর্যন্ত সমগ্র ভূভাগ এবং সরকার বাজুহার মাঝখানে কুণ্ডী প্রভৃতি পরগনা নিয়ে ফকিরকুণ্ডীর সৃষ্টি। এতাই পরে রঙ্গপুর জেলা হয়। এতে অনেক ছোট ছোট তালুক ছিল। ৯০৫৪৮ টাকা জায়গির বাদে ২৪৪ পরগপণায় এর রাজস্ব ২৩৯১২৩ টাকা নির্দিষ্ট হয়, মীর কাশেমেরর সময় জমা বেড়ে হয় ৬৩৭৬৩২টাকা।
উনিশ - কাঁকজোল রাজমল
রাজমহলের পাশে কাঁকজোলের ছোট ছোট পরগনা নিয়ে কাঁকজোল পরগণা তৈরি হয়েছিল। জায়গির বাদে ১০ পরগণায় এর রাজস্ব ৭৪৩১৭ টাকা হয়। মীর কাশেমের সময় হয় ১৭৭৪৪৭ টাকা।
কুড়ি - তমলুক
ওডিসা খারিজী সরকার গোয়ালপাড়া এবং মহিষাদল, জালামুঠা, সুজামুঠা প্রভৃতি পরগণা নিয়ে এই জমিদারি তৈরি হয়। হিজলির সমস্ত খালসাভূমি ও নিমক মহালও এর মধ্যে ছিল। জনার্দন প্রথম জমিদারি পান, তার উত্তরপুরুষ আনন্দলাল নিঃসন্তান, আত্মীয় গুরুপ্রসাদ গর্গ এর উত্তরাধিকারী হন। আনন্দলালের পিতা শুকলালের সঙ্গে মুর্শিদকুলি খাঁর ১৬ পরগণায় ১৮৫৭৬৫ টাকা জমা ধার্য হয়। মীর কাসেমের সময় বেড়ে ৮৩৬৮৭৪ টাকায় দাঁড়ায়।
একুশ - শ্রীহট্ট
চাকলা শ্রীহট্টের জায়গির জমা বাদে ক্ষুদ্র তালুকদারের সঙ্গে ৩৬ পরগণায় এই জমিদারিতে ৭-০১৬ টাকা জমা ধার্য হয়। সরাইল পরগনা এর অন্তর্ভূক্ত নয়। মীর কাশেমের সময় ৪৮৫৬১৪ টাকা হয়। এটা নিয়ে শ্রীহট্ট জেলার উৎপত্তি।
বাইশ - ইসলামাবাদ বা চট্টগ্রাম
আওরঙ্গজেবের সময় শায়েস্তা খাঁ চট্টগ্রামকে বাংলার অন্তর্ভূক্ত করান। এই সময় থেকে চট্টগ্রাম ইসলামাবাদ নাম হয়। মুর্শিদ কুলি খাঁ একে আলাদা চাকলা করেন - কিন্তু সমস্তটাই জায়গিরের জন্য। সীমান্ত প্রদেশ বলে খালসা সেরেস্তায় কর দিতে হত না । মীর কাশেম ইংরেজ কোম্পানিকে চট্টগ্রাম দিয়ে এর রাজস্ব করেন ৩৩৫১৩৫টাকা।
তেইশ - সুহেন্ত ও খোন্তাঘাট
চাকলা বন্দর বালেশ্বরের অন্তর্গত সুহেন্ত প্রভৃতি পরগণা ও চাকলা কড়াইবাড়ির অন্তর্গর খোন্তাঘাট এই দুই জমিদারি এক সঙ্গে বন্দোবস্ত দেখানো হয়েছে। ২৮ পরগনায় এর সদর জমা ১২৯৪৫০ টাকা তার মধ্যে বালেশ্বরের ৯২৮৭৫ টাকা ছিল।।
চব্বিশ - মজকুড়ি তালুক
ওপরের তালুকগুলি ছাড়া বাংলার ছোট ছোট জমিদারি ও তালুকদারি মহাল নিয়ে ২১ট তালুককে মজকুড়ি তালুক তৈরি করা হয়। এগুলির বিবরণ পরেরটায় দেওয়া হবে
(ক্রমশঃ)
সূত্রঃ বাংলার ইতিহাস(আষ্টাদশ শতাব্দী) - নবাবী আমল - কালীপ্রসন্ন বন্দ্যোপাধ্যায়

বাংলার জমিদারি২ জাফরখানি বন্দোবস্ত

{বাংলায় মুর্শিদকুলি খাঁ - মুতামিন-উল-মুলক আলা-উদ-দৌলা জাফর খান নাসিরী নাসির জঙ্গ বাহাদুর' উপাধি পেয়ে সাত হাজারি মনসব পান এবং ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে রাজধানী স্থাপন করেন। বাংলাকে তিনি ১৩টি চাকলায় ভাগ করে সেগুলিকে ২৫টি জমিদারি ও ১৩টি জায়গিরে বন্দোবস্ত করেন। এই বন্দোবস্তের নাম জমা কামেল তুমারী, এবং সমগ্র ব্যবস্থাটি জাফর খানি জমিদারি বন্দোবস্ত নামে পরিচিত। এই আলোচনায় পরিষ্কার হবে বাংলার জমিদারেরা বংশপরম্পরায় জমিদারি ভোগ করছিলেন। মোটামুটি আগামী দিনে, পলাশীর পরে এবং ব্রিটিশ আমলেও বাংলার রাজস্ব ব্যবস্থা জাফর খানি কাঠামো ধরে তৈরি হয়েছে।
এবারে পরের অংশ}
নয় - ইয়ুসুফপুর বা যশোর
উত্তররাঢীয় কায়স্থ বংশীয় ভবেশ্বর রায়, পুত্র মহাতপ, প্রতাপাদিত্যর বিরুদ্ধে মানসিংহকে সাহায্য করে যশোরের সৈয়দপুরের জমিদারি পান। মহাতপের পৌত্র মনোহর ইউসুফপুর জমিদারি পেয়ে রাজা হন।পুত্র কৃষ্ণরাম মুর্শিদ কুলির সঙ্গে ২৩ পরগণার বন্দোবস্তে ১৮৭৭৫৪ টাকা জমা ধার্য হয়। এঁদের বংশাবলীতে এরা যশোরের চাঁচড়ার রাজা বলে পরিচিত। জমিদারি যশোরের আর্ধেক, বর্ধমান, খুলনা ও ২৪ পরগণার কিছু অংশ নিয়ে গঠিত। মীর কাশেমের সময় রাজস্ব দাঁড়ায় ৪১৬৩১৮ টাকা।
দশ - লস্করপুর বা পুঁটিয়া
গিয়াসুদ্দিন তুঘলকের সময় বিদ্রোহ দমন করে বৎসরাচার্য লস্করপুর বা পুঁটিয়া লাভ করেন। পুত্র পীতাম্বর এবং তার চতুর্থ পুরুষ দর্পনারায়ন আর তার উত্তরপুরুষ অনুপনারায়ণ মুর্শিদকুলির সঙ্গে বন্দোবস্তে আসেন ১৫টি পরগণায় বার্ষিক ১২৫৫১৬ টাকায়। ১৯০০ সালের রাজশাহীর এক তৃতীয়াংশ এই জমিদারির অংশ ছিল। মীরকাশেমের বন্দোবস্তে ২,২০,৭১০ টাকা হয়। পরে পুঁটিয়ার রাজারা আজও অনেক জমিদারি বন্দোবস্ত করে নেন।
এগারো - রুকুনপুর বা কানুনগোয়ি জমিদারি
বাংলায় কানুনগো বংশের প্রতিষ্ঠাতা ভগবান রায়ের ভাই বঙ্গবিনোদ রায়ের মৃত্যুর পরে হরিনারায়ণ আওরঙ্গজেবের আদেশে অর্ধেক কানুনগোয়ি ফরমান পান।বাদশাহের দরবার থেকে এরা বঙ্গাধিকারী উপাধি পান। মুর্শিদকুলি খাঁর সময়ে শিবনারায়ণের আমলে ৬২ পরগণার রাজস্ব ২৪২৯৪৩ টাকা নির্দিষ্ট হয়। মালদহের শেরশাহাবাদ, রুকনপুর, বর্ধমানের মণ্ডলঘাট, আরঙ্গাবাদ এবং ঘোড়াঘাট চাকলার মধ্যে বারবেকপুর, ভূষণার জাহাঙ্গীরাবাদ এদের জমিদারিতে ছিল। মীর কাশেমের সময় অল্প ৭৩৯৬৮ টাকা বৃদ্ধি হয় মাত্র।
বারো - ফতেসিংহ
মানসিংহের সময় জিঝোতিয়া বংশীয় সবিতা রায় মুর্শিদাবাদ অঞ্চলে ফতেসিংহ পরগনা পান। উত্তরপুরুষ শোভা সিঙ্গির বিদ্রোহে যোগদান করায় জমিদারি থেকে বঞ্চিত হয়। পরে মুর্শিদ কুলিখাঁর দয়ায় সেটি ফিরে পান। পরে এদের আত্মীয় সূর্যমণি এই জমিদারি পান - ইনি বাঘডাঙ্গা বংশের স্থপয়িতা এবং জেমোর রাজা বলে পরিচিত। সূর্যমণির পুত্র হরিপ্রসাদ মুর্শিদ কুলি খাঁর সঙ্গে ১১ পরগণায় ১৮৬২১ টাকায় রফা করেন। পরে এটি জেমো আর বাঘডাঙ্গা বংশের মধ্যে ভাগ হয়ে যায়। নাজাই বাদে এর রাজস্ব ১৩৭২৯১ টাকা ধার্য হয়; মীর কাশেম এতে মাত্র ১২১০৩টাকা আবওয়াব ধার্য করেন।
তেরো - মহমুদশাহী ভূষণা
নলডাঙ্গা বংশের আদি পুরুষ বিষ্ণুদেব হাজরা বাদশাহী সৈন্যের রসদ সংগ্রহ করে দেওয়ায় ৫টি গ্রাম জমিদারি প্রাপ্ত হন। উত্তরপুরুষ শ্রীমন্ত রায় মামুদশাহী এবং সীতারাম রায় বড় অংশ দখল করেন। সীতারাম পতনের পর নলদীর মত বেশ কিছু ভূভাগ রাজসাহীতে জুড়ে যায়। জায়গির বাদে ২৯ পরগনার ১১০৬৩৩ টাকা নির্ধারিত হয়, পরে আরও একটু বাড়ে। মীর কাশেমের সময় আবওয়াব এবং আরও কিছু রাজস্ব মিলে ১১৮১৮৮ এবং রাজা কৃষ্ণদেবের সময় ২৭৩৪৩৪ টাকা হয়।
চৌদ্দ - ইদ্রাকপুর (ঘোড়াঘাট)
নির্বোধ জমিদার ভগবানের হাত থেকে দেওয়ান ভগবান, জমিদারিটি হাত করেন। পরে মামলা লড়ে জমিদার পান ২ আনা, আর দেওয়ান পায় ৭ আনা। দেওয়ানের অংশ দিনাজপুরের রাজাদের অংশে আসে। পরে আওরঙ্গজেবের সময় রাজাদের উত্তরপুরুষ সেটি দখল করেন। পোলাদেশী, কুণ্ডী, সেরপুর প্রভৃতি প্রসিদ্ধ পরগণা এই জমিদারির অন্তর্ভূক্ত ছিল। বংশের বিশ্বনাথের সঙ্গে মুর্শিদ কুলি খাঁয়ের ৬০ পরগণার ৮১৯৭৫ টাকা রাজস্ব সিদ্ধ হয়। জায়গির ছিল ২১৪৬০ টাকা। মীর কাশেমের বন্দোবস্তে ৭৪৮৯১ টাকা আবওয়াব প্রভৃতি চেপে মোট রাজস্ব ১৮৩৩২১ টাকা হয়।
পনের - জালালপুর প্রভৃতি
চাকলে জাহাঙ্গীরনগর বা ঢাকার সমগ্রত খালসা ভূমি এবং ভূষণা ও ঘোড়াঘাটের সামান্য অংশ নিয়ে এই জমিদারি তৈরি হয়। ত্রিপুরার সরাইল পরগনা এর অন্তর্গত। জায়গির বাদ দিয়ে খালসা ভূমির ১৫৫ পরগণায় ৮৯৯৭৯০ টাকা ধার্য হয়।
ষোল - সেরপুর পুর্ণিয়া
পূর্ণিয়া অঞ্চলের জায়গির বাদী অবশিষ্ট দুটি প্রধান পরগণার নামে সেরপুর ধরমপুর জমিদারি তৈরি হয়।এটিও সৈফ খাঁএর অধীনে ছিল। ৩৩ পরগণার রাজস্ব ৯৮৬৬৪ টাকা। মীর কাশেমের সময় ২০ গুণ বেড়ে হয় ২০৯৮৭১১ টাকা।
(ক্রমশঃ)
সূত্রঃ বাংলার ইতিহাস(আষ্টাদশ শতাব্দী) - নবাবী আমল - কালীপ্রসন্ন বন্দ্যোপাধ্যায়

বাংলার জমিদারি১ - জাফরখানি বন্দোবস্ত

বাংলায় মুর্শিদকুলি খাঁ - মুতামিন-উল-মুলক আলা-উদ-দৌলা জাফর খান নাসিরী নাসির জঙ্গ বাহাদুর' উপাধি পেয়ে সাত হাজারি মনসব পান এবং ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে রাজধানী স্থাপন করেন। বাংলাকে তিনি ১৩টি চাকলায় ভাগ করে সেগুলিকে ২৫টি জমিদারি ও ১৩টি জায়গিরে বন্দোবস্ত করেন। এই বন্দোবস্তের নাম জমা কামেল তুমারী, এবং সমগ্র ব্যবস্থাটি জাফর খানী জমিদারি বন্দোবস্ত নামে পরিচিত। এই আলোচনায় পরিষ্কার হবে বাংলার জমিদারেরা বংশপরম্পরায় জমিদারি ভোগ করছিলেন। মোটামুটি আগামী দিনে, পলাশীর পরে এবং ব্রিটিশ আমলেও বাংলার রাজস্ব ব্যবস্থা জাফর খানি কাঠামো ধরে তৈরি হয়েছে।
প্রথম - ত্রিপুরা
ত্রিপুরার নরপতিরা প্রাচীন কাল থেকেই স্বাধীন ছিলেন। আরাকানের সঙ্গে লড়াইতে তাদের শক্তি ক্ষয় হওয়ায় মোঘলদের হাতে বশ্যতা স্বীকার করেন। বরাবরই যেহেতু ত্রিপুরা যুদ্ধের হাতি সরবরাহ করে, তাই রাম মাণিক্যের সময় হাতি ধরে দেওয়ার বাবদ ৪৫ হাজার টাকা বাদ দিয়ে রাজস্ব স্থির হয় ৪৭৯৯৩ টাকায়। মীর কাশেমের সময় তা প্রায় দ্বিগুণ হয় ৯৬৭৫৮টাকা। যেহেতু এটি সীমান্ত রাজ্য, তাই অন্যান্য শুল্ক প্রায় মুঘল সাম্রাজ্য আদায় করত না
দ্বিতীয় - পঞ্চকোট
মোগল আমলেও তারা আধা স্বাধীন রাজ্য নামে পরিচিত ছিল। এরা শুধু পেশকাশ দিত। পঁচেট আর শেরগড়ের মোট পেশকাশ ছিল ১৮২০৩ টাকা। মীর কাশেমের সময় এর ওপর ৩৩২৩ আবওয়াব চেপেছিল।
তৃতীয় - বিষ্ণুপুর
পঁচেটের থেকেও প্রাচীন বলে কথিত। অষ্টম শতে রঘুনাথ মল্ল এটির প্রতিষ্ঠাতা। তার পর থেকে ৫৫ পুরুষ রাজত্ব করেন। বীর হাম্বীরের সময় থেকে শ্রীনিবাস আচার্যের নির্দেশে বৈষ্ণব ধর্ম স্থাপন করেন। মুর্শিদ কুলি খাঁর সময় গোপাল সিংহ(গোপাল সিংহের বেগার নামে খ্যাত)এর আমলে বিষ্ণুপুর আর সেরপুরের ওপর ১৭৯৮০৩ টাকা এবং মীর কাশিমের বন্দোবস্তে এর ওপর ২০,০৭৯ টাকা আবওয়াব ধার্য হয়।
চার - বর্ধমান
চার পুরুষের পর শোভা সিংহের বিদ্রোহে জগতরাম শোভা সিংহের জমিদারিগুলি পান। পুত্র কীর্তিচন্দ্রের সময় বর্ধমানের মধ্যে ছিল হুগলির ভুরসুট ইত্যাদি এবং মুর্শিদাবাদ চাকলার মনোহর শাহী মহাল প্রাপ্ত হন। এটা একটা প্রায় রাজ্য হয়ে দাঁড়ায়। ১৭২২এ মুর্শিদ কুলি খাঁর সময় ৫৭ পরগনায় ২০৪৭৫০৬ টাকা রাজস্ব স্থির হয়। ধান আখ রেশম ছিল তার প্রধান পণ্য দ্রব্য। মীর কাশেমের সময় আবওয়াব নিয়ে রাজস্ব দাঁড়ায় ৩২২৬৯৩৪ টাকা।
পাঁচ - দিনাজপুর
শাহজাহানের সময় শ্রীমন্ত চৌধুরী সুজার থেকে এটার জমিদারি পান। তার উত্তরপুরুষ প্রাণনাথ এবং তার পুত্র রামনাথ এটাকে চরম উচ্চতায় নিয়ে যান। মুর্শিদাবাদের নবাবেবা দিনাজপুরের জমিদারদের থেকে অনেক সময় কর্জ করতেন। জমিদারির তুলনায় রাজস্ব অল্প ছিল। মুর্শিদকুলি খাঁর সময় এই জমিদারির ৮৯ পরগণা ৪৬২৯৬৪ টাকা রাজস্ব নির্ধারন করেন। মীর কাশেমের সময় ১৮২০৭৮০ টাকা হয়।
ছয় - নবদ্বীপ
ভবানন্দ মজুমদার রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা। প্রতাপাদিত্যকে সাহায্য করে ভবানন্দ নদীয়া উখরা সমেত ২০ পরগণার জমিদারি পান। তার উত্তর পুরুষ রাজা রঘুরাম মুর্শিদকুলিকে উদয়নারায়ণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। নদিয়ার জমিদারির আয়তন বৃদ্ধি পায়। রাজা রঘুরামের সঙ্গে মুর্শিদিকুলি খাঁর ৭৩ পরগণার বন্দোবস্ত হয় ৫৯৪৮৪৬ টাকা। মীর কাশেমের সময় হয় প্রায় দ্বিগুণ - ১০৯৮৩৭৯ টাকা হয়।
সাত - নাটোর
১৭২৫এ রামজীবনের নামে নতুন বন্দোবস্ত করেন মুর্শিদকুলি খাঁ। ১৩৯ পরগণায় জায়গির বাদে ১৬৯৬০৮৭ টাকা নির্ধারিত হয়। মুর্শিদাবাদ, ভূষণা ও ঘোড়াঘাট এই তিন চাকলা জুড়ে রাজশাহী জমিদারি - নাটোর নাম পরে হয় - কেননা এটায় মুর্শিদাবাদের অংশ বেশিই ছিল। রাণী ভবানীর সময় রাজসাহীর সঙ্গে আরও কিছু পরগনা জুড়ে, রাজসাহীর নাটোর পরগণা একটা বৃহৎ রাজ্যে রূপান্তরিত হয়। রাজমহল থেকে বগুড়া পর্যন্ত ছিল এর বিস্তৃতি। বীরভূমের পূর্বাংশ, মুর্শিদাবাদের উত্তরপূর্ব ভাগ, রাজশাহি বগুড়া পাবনার অংশ, মালদহের পূর্বভাগ, এবং যশোর ও নদীয়ার উত্তরপূর্বাংশ এর অন্তর্গত ছিল। মুর্শিদাবাদ, চুনাখালি, কাশিমবাজার, ভগবানগোলা, গোদাগাড়ি, বোয়ালিয়া, কুমারখালির মত বাণিজ্য স্থান এই রাজসাহীর মধ্যেই ছিল। মীর কাশেমের বন্দোবস্তে ৩৫৫৩৪৮৫ টাকা হয়। তখন জমিদারিতে ভিতরবন্দ, বাহিরবন্দ পরগনা জুড়ে আরও একটু বাড়ে। কিন্তু রাজস্ব বাড়ে নি।
আট - বীরভূম
মোগল আমলে রণমন্ত খাঁ সীমান্ত রক্ষার ভার পান। তার পৌত্র সাধুশীল আসাদুল্লার সঙ্গে মুর্শিদকুলি খাঁর বন্দোবস্ত হয় - মুর্শিদাবাদের পশ্চিমাংশ, বীরভূম, সেনভূম, ভুরকুণ্ড ছিল এই জমিদারির অংশ। এটাই বাংলার প্রধান মুসলমান জমিদারি। ২২ পরগণায় সদর জমা হয় ৩৬৬৫০৯ টাকা ধার্য হয়। মীর কাশেমের সময় বীরভূমের রাজারা বিদ্রোহী হন - রাজস্ব চারগুণ বর্ধিত হয়ে হয় ১৩৪২১৪৩ টাকা।
(ক্রমশঃ)
সূত্রঃ বাংলার ইতিহাস(আষ্টাদশ শতাব্দী) - নবাবী আমল - কালীপ্রসন্ন বন্দ্যোপাধ্যায়