Showing posts with label উইলিয়াম এডাম. Show all posts
Showing posts with label উইলিয়াম এডাম. Show all posts

Thursday, May 19, 2011

উইলিয়ম এডাম-এর শিক্ষা সমীক্ষার সময় অক্সফোর্ডের পঠনপাঠন


এবার যে দেশকে লক্ষ্যধরে ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, সেই ব্রটিশদের পড়াশেনার ইতিহাসের পাট কী ছিল তা একটু নজর দিয়ে দেখে নেওয়া যাক A E Dobbs: Education and Social Movements 1700-1850, London পুস্তক থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে ধরমপাল বলছেন, যোড়শ শতকের পর থেকে ব্রিটেন জুড়ে একটি আইন প্রণীত হয়, যে আইনে বলা হয়, ইংরেজি বাইবেল চার্চেও পড়া যাবে না বাইবেল পড়তে পারেন একমাত্র  nobles, gentry and merchants that were householders পড়ার নিযেধাজ্ঞা জারি করা হল Artificers’prentices, to journeymen and serving men “of the degree of yeomen or under”, to husbandmen and labourers’ so as ‘to allay certain symptoms of disorder occasioned by a free use of the Scriptures নতুন আইনে বলা হল, meet for the ploughman’s son to go to the plough, and the artificer’s son to apply the trade of his parent’s vocation: and the gentlemen’s children are meet to have the knowledge of Government and rule in the commonwealth For we have as much need of ploughmen as any other State: and all sorts of men may not go to school এর প্রায় এক শতাব্দ পরে, সপ্তদশ শতকের শুরু থেকে ক্রমে ক্রমে ইংলন্ডে সাধারণ মানুষের পড়ার জন্য চ্যারিটি স্কুলখেলা হতে থাকল এই স্কুলগুলির উদ্দেশ্য, ‘some leverage in the way of general education to raise the labouring class to the level of religious instruction’; এমনকী ওয়েলসএও এই উচ্চ পাঠশালা খোলাহল, ‘with the object of preparing the poor by reading and Bible study for the Sunday worship and catechetical instruction চ্যারিটি স্কুল আন্দোলনে ভাটা পড়তে থাকায়, ১৭৮০ নাগাদ সানডে স্কুল আন্দোলন গড়ে উঠল তবু তখনও ‘Popular education’, even at this period, ‘was still approached as a missionary enterprise এর একটাই উদ্দেশ্য সাধারণ মানুয যাতে বাইবেল পড়তে পারে এর কিছু পরে জে স্কুলের ধারণাটি জন্মায় এমনকী ১৮৩৪ পর্যন্ত ‘the curriculum in the better class of national schools was limited in the main to religious instruction, reading, writing and arithmetic: in some country schools writing was excluded for fear of evil consequences ডে স্কুল আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তিই ছিল ১৮০২এর পিলএর আইন এই আইন বলে প্রত্যেক কারখানার মালিক শিশুশ্রমিকের জন্য, ‘to provide, during the first four years of the seven years of apprenticeship, competent instruction in reading, writing and arithmetic, and to secure the presence of his apprentice at religious teaching for one hour every Sunday and attendance at a place of worship on that day কিন্তু এই আইন জনসাধারণের কাছে খুব জনপ্রিয় হয় নি এরই কাছাকাছি সময়ে জোসেফ ল্যাঙ্কাস্টার এবং ভারত থেকে ধার করে এন্ড্রু বেল ভারত থেকে পোড়ো পদ্ধতি(মনিটরাল মেথড) ধার করে, যা পরে ল্যঙ্কাস্টার-বেল পদ্ধতি নামে পরিচিত হবে, ইংলন্ডে(এবং পরে বিশ্বে নানান দেশে) প্রয়োগ করে উচ্চ পাঠশালা স্থাপনের চেষ্টা করলেন ১৭৯২তে এ ধরণের স্কুলে ছাত্রের সংখ্যা দাঁড়াল ৪০,০০০, ১৮১৮তে ৬,৭৪,৮৮৩, এবং ১৮৫১তে ২১,৪৪,৩৭৭ ১৮০১এ যেখানে ৩,৩৬৩টি সরকারি-বেসরকারি স্কুল মিলিয়ে মিশিয়ে ছিল ৩৩৬৩, সেখানে ১৮৫১তে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ৪৬,১১৪টি শুরুতে ‘the teachers were seldom competent’, এবং ‘Lancaster insinuates that the men were not only ignorant but drunken ডবকে উদ্ধৃত করে ধরমপাল বলছেন, ‘allowing for irregularity of attendance, the average length of school life rises on a favourable estimate from about one year in 1835 to about two years in 1851
একই সময়ে ইংলন্ডে সরকারি স্কুলে ছাত্রসংখ্যা অসম্ভবভাবে কমে এল, শ্রেয়সবেরির খ্যাতনামা স্কুলে ছাত্র সংখ্যা দাঁড়াল চার ইটনেরমত সরকারি স্কুলে পড়ানো হত লেখন আর অংক(পড়ানো হত ইংরেজি আর ল্যাটিন বই) পঞ্চম শ্রেণী থেকে খগোল আর বীজগণিত আর যারা ইটনে বেশিদিন থাকতেন তাদের ইউক্লিডও শিখতেন তবে ‘not till 1851 that Mathematics became a part of the regular school work and even at that date those who taught the subject were not regarded as persons of full standing on the staff of masters আদতে ইংলন্ডে সর্বজনশিক্ষার ধারণাটিই তখন গড়ে ওঠেনি তবুও ধর্মপালজী ভারতের তক্ষশিলা বা নালন্দা অথবা নবদ্বীপের সঙ্গে সেসময়কার অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ অথবা এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনা করছেন ১৭৭৭এর পর যে সব অভিযাত্রী, মণীষী, বিচারক ভারত ভ্রমণে এসেছেন তাদের অধিকাংশই এই তিন বিশ্ব বিদ্যলয় থেকে পাঠ গ্রহণ করেছেন ধর্মপালজী ১৮০০র আশেপাশের সময়ে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যলয়ের ছাত্রসংখ্যা আর তার পাঠ্য বিষয় নিয়ে আলোচনা করছেন রোম থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যলয়ের ১৫৪৬এর পর থেকে নানান অধ্যাপক পদের বিকাশ নিয়ে বিশদে ধরমপালজী অলেচনা করেছেন-
১৫৪৬এ সপ্তম হেনরি পদ সৃষ্টি করলেন ডিভিনিটি, সিভিল ল, মেডিসিন, হিব্রু, গ্রিক
১৬১৯এ জিওমেট্রি,এস্ট্রোনমি,
১৬২১এ ন্যাচারাল ফিলোজফি, মরাল ফিলোজফি(মরাল ফিলেজফিটি ১৭৭০ থেকে ১৮২৯ পর্যন্ত পড়ানো হয় নি),
১৬২২   এনশিয়েন্ট হিস্টোরি(হিব্রু আর ইওরোপ),
১৬২৪ গ্রামার, রেটরিক, মেটাফিজিক্স(১৮৩৯এর পরথথেকে লজিক পড়ানো হতে থাকে),
১৬২৪ এনাটমি,
১৬২৬ মিউজিক,
১৬৩৬ আরবিক,
১৬৬৯ বটানি,
১৭০৮ পোয়েট্রি,
১৭২৪   মডার্ন হিস্টোরি মডার্ন ল্যাঙ্গুয়েজ,
১৭৪৯   এক্সপেরিমেন্টাল ফিলজফি,
১৭৫৮ কমন ল,
১৭৮০ ক্লিনিক্যাল ইন্সট্রাকশন,
১৭৯৫   এংলো-স্যাকসন(ল্যাংগুয়েজ, লিটারেচার ইত্যাদি),
১৮০৩  কেমিস্ট্রি
উনবিংশ শতকের শুরুতে অক্সফোর্ডের অধীনে ১৯টি উচ্চতর পাঠশালা এবং অক্সফোর্ডএর পাঁচটি হল ঘর ছিল উচ্চতর পাঠশালাগুলোতে ৫০০দল ফেলে ছিলেন, তারা নির্দষ্ট উচ্চতর পাঠশালাগুলিতে পড়াতেনও ১৮০০তে ১৯জনপ্রফেসরও ছিলেন ১৮৫৪তে সংখ্যাটি বেড়ে দাঁড়ায় ২৫এ ধর্মতত্ব আর ধ্রুপদী রচনা সমূহ ছিল মূল বিষয় পরীক্ষা নেওয়া হত Literae Humanioresএ যাতে থাকত গ্রিক, ল্যাটিন ল্যাঙ্গুয়েজ ও লিটারেচর, মরাল ফিলজফি, রেটরিক, লজিক, এলিমেন্ট ইন ম্যাথমেটিক্যাল সায়েন্স আর ফিজিক্স ল, ফিজিক্স, জিওলজিও পড়ানো হত উনবিংশ শতকের প্রথমপাদের ৭৬০ ছাত্রসংখ্যা থেকে ১৮২০-২৪এ দাঁড়াল ১৩০০ উচ্চতর পাঠশালাগুলির আয়ের উত্স ছিল দান, জমি থেকে আয়, আর ছাত্রদের মাইনে মাইনে উচ্চতর পাঠশালা থেকে কলেজে আলাদা ছিল ১৮৫০ সালে একজন ছাত্রের জামাকাপড়, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিধেয়, যাওয়া আসার খরচসহ চার বছরের মোট খরচ পড়ত ৬০০ থেকে ৬০০ পাউন্ড
১৮৩৫এর পরে এংলিসিস্টদের প্রচারে ইংরেজি শিক্ষাপদ্ধতি প্রচার পেল উঠেগেল এক লাখেরও বেশি পাঠশালা এর পরেও নানান ভাবে দেশিয় ভাষায় শিক্ষাদানের প্রচেষ্টা হয়েছে, ১৮৪০এ পাটনা হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক এস ম্যাকিনটশ এগারোটা দেশিয় ভাষার উচ্চ পাঠশালা খুললেও তা বন্ধ হয়ে যায় একই ভাবে দ্বারভাঙা রাজও ১৮৬০এ ২৬টি গ্রামে উচ্চ পাঠশালা খুলে, চালানোর জন্য যথেষ্ট অর্থ ব্যবস্থা করলেও নানান কারনে তা বন্ধ হয়ে যায় ফলে বৃহত্তর বাংলার বিশাল পাঠশালার ঐতিহ্য নষ্ট হয়ে পড়ে ১৮৭২এ ওম্যালি বলছেন, "In 1872, Sir George Campbell's scheme of educational reform was introduced, under which grants were given in aid of schools hitherto unaided and many of the indigenous rural schools called pathshalas were absorbed into the departmental system

উইলিয়ম এডাম-এর শিক্ষা সমীক্ষা৫

 ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের উচ্চ পাঠশালাগুলির বিভাগকরণ
শিখ দেশি পাঠশালা গুরমুখী
মুসলমান দেশি শিক্ষা ব্যবস্থা মক্তব, মাদ্রাসা(ধর্মীয়, অধর্মীয়), কোরাণ পাঠশালা
হিন্দু দেশি পাঠশালা চাটশালা(ব্যবসায়ীগের জন্য), পাটশালা(ধর্মীয়), পাটশালা(আধা ধর্মীয়), বিভিন্নস্তরের অধর্মীয় পাঠশালা
মেলানো মেশানো দেশি পাঠশালা পারসি পাঠশালা, ভারনাকুলার পাঠশালা, এংলে-ভার্নাকুলার পাঠশালা
মেয়েদের জন্য দেশি পাঠশালা শিখ মেয়েদের জন্য, মুসলমান মেয়েদের জন্য, হিন্দুমেয়েদের বাড়িতে পড়ার জন্য
তাঁর করা বাংলার এবং দেশের নানান প্রান্তের সমীক্ষা ভিত্তি করে এডাম দেশিয় পাঠশালাগুলোর আরও বিশদ বিভাগ তৈরি করেছেন
ক)মক্তব অথবা মাদ্রাসা বিভিন্ন স্তরের এবং নির্দিষ্ট বিষয় পড়াবার জন্য আরবি পাঠশালা(স্কুল) আর উচ্চ পাঠশালা(উচ্চতর পাঠশালা) ২ বিভিন্ন স্তরের এবং নির্দিষ্ট বিষয় পড়াবার জন্য পারসিক-আরবি পাঠশালা(স্কুল) আর উচ্চ পাঠশালা(উচ্চতর পাঠশালা) ৩ কোরাণ পাঠশালা- শুধুই কোরাণ পড়াবার জন্য ৪ পারসিক-কেরাণ পাঠশালা, ৫ কোরাণ-আরবি পাঠশালা, ৬ পার্সি-কোরাণ-আরবি পাঠশালা, ৭ পারসিক পাঠশালা, ৮ পারসি-উর্দু পাঠশালা, ৯ পারসি-উর্দু-আরবি পাঠশালা, ১০ আরবি বৈদ্য উচ্চ পাঠশালা, ১১ পার্সি-আরবি বৈদ্য উচ্চ পাঠশালা,
খ) গুরমুখী পাঠশালা ১২ গুরমুখী পাঠশালা ১৩ গুরমুখী এবং ল্যান্ডে পাঠশালা
গ) মহাজনী পাঠশালা ১৪ বিভিন্ন ধরনের ল্যান্ডে পাঠশালা(চাটশালা), ১৫ নাগরি ল্যান্ডে পাঠশালা, ১৬পার্সি ল্যান্ডে পাঠশালা
ঘ) পাঠশালা-  ১৭ নাগরি-সংস্কৃত পাঠশালা ১৮ সংস্কৃত ধর্মীয় পাঠশালা, ১৯ সংস্কৃত অ-ধর্মীয় পাঠশালা(বিভিন্ন বিষয় পড়ানো হয়), ২০ সংস্কৃত আধা-ধর্মীয়(সেমি-সেকুলার) পাঠশালা, ২১ সংস্কৃত বৈদ্য পাঠশাশালা(চিফলি) ২২ হিন্দি সংস্কৃত পাঠশালা, ২৩ সংস্কৃত জোতির্বিদ্যা ও জ্যোতিষবিদ্যা পাঠশালা(চিফলি)
ঙ) মহিলাদের দেশি পাঠশালা(আগে বলা হয়েছে)
যে সব সংস্কৃত পুঁথি পড়ানো হত
বালবোধ, অক্ষর দীপিকা
ব্যকরণ- সারস্বত, মনোরমা, চন্দ্রিকা, ভাষ্য, লঘু কৌমুদী, পাণীনি ব্যকরণ, কৌমুদী, সিদ্ধান্ত কৌমুদী, শেখর, প্রাকৃত প্রকাশ
শব্দার্থবিদ্যা(লেক্সিকলজি) - অমর কোষ, মালিনী কোষ, হলায়ুধ
কবিতা, নাটক এবং ধর্মীয় ইতিহাস রঘুবংশ, মহাভারত, মেঘদূত, বেণীসংহার, মাঘ, শকুন্তলা, কীরাত অর্জুণ, নৈষধ চরিত, রামায়ণ, মৃচ্ছকটিক, শ্রীমদ ভাগ্বত, কুমার সম্ভব, অন্যান্য পুরাণ
রেটরিক কাব্য দীপক, কাব্যপ্রকাশ, সাহিত্য দর্পণ, দশরূপ, কুবলয়ানন্দ
অঙ্ক, জ্যোতির্বিদ্যা, জ্যোতিষবিদ্যা- সিদ্ধান্ত শিরেমণি নীলকান্তি, শীঘ্রবোধ, বৃহত্ জাতক, পারাশরীয়, গর্ভলগ্ন
বৈদ্যবিদ্যা শ্যামরাজ, নিঘান্ত, শুশ্রুত, শারঙ্গধর, চরক, ভাষ্য পরিচ্ছেদ, মাধব নিদান, ভাগবত
ন্যায় ন্যায় শ্রুত বৃত্তি, গদাধরী, ভূতপ্রতিবাদ, তর্কালঙ্কার, তারক সংগ্রহ, কারিকাবলী,
৮, বেদান্ত আত্মবোধ শরীরক, পাঁচদশী
স্মৃতি মনুস্মৃতি, পরাশর স্মৃতি, যাজ্ঞবল্ক গৌতম, মীতাক্ষর
১০ দর্শণ সাংখ্য তত্ব কৌমুদী, পতঞ্জলী ভাষ্যসহ সূত্র বৃত্তি সূত্র, সাংখ্য প্রবচণ ভাষ্য যোগ সূত্র, বেদান্ত- ভাষ্যান্তর, বৈশেষিক- সিদ্ধান্ত মুক্তাবলী সূত্রসহ ভাষ্যসহ বিবৃতি(আ কমেন্ট্রি), মীমাংসা সূত্রসহ ভাষ্য অর্থসংগ্রহ
১১ প্রসডি শ্রুত বোধ, ভৃত্য় রত্নাকর
১২ গদ্য সাহিত্য হিতোপদেশ, দশাবতার, দশকুমার চরিত
১৩ ধর্ম(রেলিজিয়ন) ঋগ্বেদ সংহিতা, সংবাদ মন্ত্রভাগ, যয়ুর্বেদ, শুক্ল য়জুর, ছন্দস্য আচারিকা(বেশি পড়ানো হয় না), বাজস্নেয়ী(Vajasneyi) সংহিতা

উইলিয়ম এডাম-এর শিক্ষা সমীক্ষা৪


বাঙলা মাধ্যমে শিক্ষাদানের চারটি স্তর ছিল প্রথম পর্বে মাটিতে বাঁশের বাঁখারি বা লাঠি দিয়ে আঁক কেটে অক্ষর শেখানো হত জেলায় সাধারণতঃ অর্থ সাশ্রয়ের জন্য বালির বেদি ব্যবহার করা হত এই পর্ব দশ দিনের বেশি চলত না দ্বিতীয় পর্বে তালপাতার ওপর লেখা আর অক্ষরের উচ্চারণ শেখানো হত এসময় অক্ষরগুলোর মাপ শেখানো হত না এই পর্ব চলত দুবছর থেকে চার বছর পর্যন্ত এ সময় যুক্তাক্ষর, স্বরভক্তি(syllables formed by the junction of vowels with consonants), সাধাহর স্থান নাম, ব্যক্তির নামও শেখানো হত অন্য গ্রামগুলিতে জাতি, নদী, পর্বত এত্যাদের নামও শেখানো হত কড়ি আর শতকিয়াও শেখানো হত কাথা(জমির মাপ) তালিকা, সের তালিকা(ওজনের মাপ)ও শেখানো হত তৃতীয় স্তরও দুই থেকে তিন সপ্তাহ এ সময় প্ল্যানটোন পাতা(কলাগাছের পাতা!) দিয়ে শব্দ দিয়ে সরল বাক্য শেখানো হত শব্দের কথ্য আর লেখন পার্থক্যও মুখে শেখানো হত(abbreviated in speech by the omission of a vowel or a consonant, or by the running of two syllables into one) এই শেখাকে লিখতেও শেখানো হত correct orthography of words of Sanscrit origin which abound in the language of the people এই সময়ে বটুদের শেখানো হত সরল অঙ্ক, যোগ-বিয়োগ কিন্ত গুণ আর ভাগ আলাদা আলাদা করে শেখানো হত না গুনের নামতা ২০ অবদি মুখস্ত করতে হত রোজ পাঠশালা শুরু হওয়ার পরই এই নামতা পড়ানো হত
সাধারণ অঙ্ক শেখার পর কৃষি আর সাধারণ বাণিজ্যের অঙ্কও শেখানো হত কৃষিতে বা বাণিজ্যে জমা-খরচের খাতা কীভাবে রাখতে হয়, তাও শেখানো হত দৈনিক মজুরির হার থেকে মাসিক অথবা বার্ষিক মজুরির হার বার করতে হত কাঠা আর বিঘার মধ্যেকার সম্পর্কও অঙ্ক কষে বার করতে হত দৈর্ঘ, প্রস্থ দেওয়া থাকলে একটি জমির সাধারণ ক্ষেত্রফল কী হবে তাও জানতে হত একটি নির্দিষ্ট পরিমান জমি থেকে কত খাজনা দেয় হয় তাও জানতে হত বটুদের খাতা রাখার সাধারণ হিসেবও শিখতে হত বটুদের সের মনএর মধ্যেকার আর তোলা আর ছটাক সম্পর্কও কষতে হত প্রত্যক টাকায় আনা আর কড়ির সংখ্যাও শেখানো হত এক টাকার সুদও কষতে হত একটাকার কমের মুদ্রামানের বিনিময় মূল্য বাটাও শেখানোর ব্যবস্থা ছিল চতুর্থ বা শেষস্তরে দুই বা তিন বছরের মধ্যে শেষ হত এই পর্বে থাকত ব্যবসার পদ্ধতি, ব্যবসার চিঠি, গ্রান্ট, লিজ, একসেপটেন্স, হাত চিটা ইত্যাদি শেখানো হত এক বছরের মধ্যে যে বটু নিজে নিজেই এ সমস্ত লিখতে পারত তাকেই কৃতকার্য রূপে ধরে নেওয়া হত এছাড়াও রামায়ন মনসা মঙ্গলের নানান ছত্রও আবৃত্তি করতে হত
সমীক্ষা অনুসারে বাংলায় তিন ধরণের উচ্চশিক্ষার উচ্চ পাঠশালা ছিল কোথাও ব্যকরণ, অলঙ্কার, আর কোথাও কোথাও পৌরাণিক কাব্যও পড়ানো হত দ্বিতীয়গুলিতে স্মৃতি আর কিছুটা পৌরাণিক কাব্য পড়ানো হত তৃতীয় উচ্চ পাঠশালাগুলি লজিককে কেন্দ্র করে গড়ে উঠত এই তিনধরণের বিদ্যালয়ে নির্দিষ্ট কিছু পাঠ্য পড়ানো হত গুরুমশাই কিন্তু এই সব পাঠদান কেন্দ্রে দীর্ঘ বক্তৃতা দিতেন না পাঠশালাগুলিতে ছাত্ররা নানান প্রশ্ন করত আর গুরুমশাই তার উত্তর দিতেন প্রত্যেক শ্রেণীকক্ষে নির্দষ্ট মানের ছাত্রদের তাদের পাঠগ্রহণের ক্ষমতা অনুযায়ী আলাদা আলাদা করে বসানো হত সামনে পুঁথি খুলে সবথেকে ভাল পড়তে পারা ছাত্রটি সশব্দে পাঠগুলি উচ্চারণ করত, শিক্ষক তার উত্তর দিতেন এই ভাবে পড়াশোনা এগোত সাধারণ ব্যকরণ শিখতে দুই  থেকে ছয় বছর পর্যন্ত সময় লাগত, কিন্তু পাণিনী শিখতে নিদেন পক্ষে লাগত দশ বছর কখোনো আবার বারো বছরও ব্যকরণ শেখার পর কাব্য, মীমাংসা আর দর্শণও পাঠ নিতে পারত যে সব ছাত্র ন্যায় অথবা মিমাংসা পড়ত তাদের সময় লাগত ছবছর পর্যন্ত এমনকী তাকে অন্য বিদ্যালয়েও যেতে হত ওয়ার্ড বলছেন একলাখ ব্রাহ্মণের মধ্যে এক হাজারমাত্র সংস্কৃত ব্যকরণ শিখতেন, এদের মধ্যে চারশ থেকে পাঁচশ কাব্য পড়তেন, পঞ্চাশ জন হয়ত অলঙ্কার শাস্ত্রে পন্ডিত ছিলেন এই হাজারের মধ্যে শচারেক স্মৃতির পাঠোদ্ধার করতে পারতেন এদের মধ্যে মাত্র জনা দশেক তন্ত্র সম্বন্ধে বিশারদ ছিলেন ন্যায় বিশারদ ছিলেন শতিনেক, পাঁচ থেকে ছজন শুধু মিমাংসা, বেদান্ত, পতঞ্জলি, বৈশেষিক অথবা বেদ পড়াতে পারতেন দশজন জ্যোতির্বিদ্যায় পারদর্শী ছিলেন পঞ্চাশ জনের কাছাকাছি শ্রীভাগবত বা পুরাণ মুখস্ত করতেন

উইলিয়ম এডাম-এর শিক্ষা সমীক্ষা৩


গুরুদের মাইনে মাসে চার আনা থেকে শুরু করে পাঁচ টাকা পর্যন্ত হত যারা কম অর্থ পেতেন তাদের কাপড় দেওয়া হত, আর চাষীদের কাছ থেকে চাষের জিনিষও পেতেন এছাড়াও কেউ হয়ত শুধুই প্রতিদিনকার খাদ্য পেতেন, কেউবা এর সঙ্গে পরিধেয় ধোয়া, অথবা তাঁর সমস্ত খরচপাতিও পেতেন যিনি খাদ্যপেতেন তাঁর হয় নিজের বাসস্থান থাকত অথবা গ্রামের অবস্থাপন্ন ব্যক্তির ভদ্রাসনে থাকতেন সামগ্রিকভাবে শুধু আর্থিক অথবা কিছুটা আর্থিক আর কিছুটা অন্যান্যভাবে যাঁরা রোজগার করতেন, তাঁদের প্রত্যেক মাসের রোজগার ছিল তিনটাকা আটআনা থেকে  সাত টাকা আট আনা পর্যন্ত, গড়ে পাঁচটাকার বেশি সকলেই রোজগার করতেন তিনি উদাহরণস্বরূপ ধারাইলের বিদ্যালয়ের কথা উল্লেখ করেছেন এই গ্রামে চৌধুরিদের চারটি পরিবার বাস করত এরাই গ্রামের সম্ভ্রান্ত কিন্তু এদের আর্থিক অবস্থা এত ভাল ছিলনা, যে অন্যান্যদের সাহায্য ব্যাতীত তাঁরা গুরুমশাই নিয়োগ করতে পারেন এংরা বাড়ির এক অংশে গুরুমশাইএর থাকার ব্যবস্থা করেন, যেখানে বটুরা পড়াশোনাও করত এই স্থানটি পুজোর জন্যও ব্যবহার হত আবার অতিথি নিবাসও ছিল দুটি পরিবার চারআনাকরে, তৃতীয় পরিবার আটআনা আর চতুর্থজন বারো আনা এই কাজে দিতেন এর বাইরে তাঁরা আর কোনো কিছুই দিতেন না এই অর্থে পাঁচটি বটু বাঙলা ভাষায় শিক্ষা পেত কিন্ত এই অর্থে গুরুমশাইএর চলা মুশকিল ছিল, তাই তিনি অন্য পরিবার থেকে বটুর ব্যবস্থা করতেন এক বটু দিত একআনা, একজন তিন আনা, পাঁচজন চার আনা করে গুরুমশাইকে মাসে সাম্মানিক দিত এর বাইরে নানান শষ্য, মাঠ, চাল আর কখোনো কখোনো কেউ রুমাল(গামছা!), ফতুয়ারমত(আপার গার্মেন্ট) নানান পরিধেয়ও দিত কাগবাড়িয়ার দুটি পরিবারের পাঁচটি বটু ধারাইল পাঠশালায় পাঠ নিত এই দুই গ্রামের মধ্যে প্রায় এক মাইলের পার্থক্য
তিনি গুরুমশাইদের পাওয়া মাইনের সঙ্গে গ্রামের প্রায় একই স্তরের কাজ করা মানুষের রোজগারের বিশদ বর্ণনা দিয়েছেন স্থানীয় জমিদারদের নানান কাজে যারা নিযুক্ত হতেন তাঁদের মধ্যে ছিলেন পাটওয়ারি, আমিন, শুমারনাভি আর খামারনভিস পাটওয়ারির কাজ ছিল বাড়ি বাড়ি গিয়ে জমিদারদের খাজনা উশুল করা, মাইনে পেতেন দুটাকা আট আনা সঙ্গে রায়তদের কাছথেকে শষ্য উঠলে বেশ কিছু জিনিষপত্তরও যার প্রায় মূল্য আট আনা, সবে মিলিয়ে তিন টাকা আমিনদের কাজ ছিল জমিদারদের পক্ষে গ্রমের জমিজমার পরিমান মেপে বিবাদের সমাপ্তি ঘটাতেন তিনি পেতেন মাসে সাড়ে তিন টাকা থেকে চার টাকা শুমারনভিস পাটওয়ারিদের আদায়ের হিসেব রাখতেন, পেতেন পাঁচ টাকা প্রতি মাসে আর অনেক জমিদার জমির ফসল থেকেই যখন খাজনা আদায় করার জন্য খামারনভিস রাখতেন তারা অনেক কম অর্থ পেতেন জমিদারিতে যেসব আমলা কাজকরতেন তাদের অনেকেরই উপরি আয়ের সুযোগ থাকত, যে সুযোগটি এই গুরুমশাইদের ছিলনা
গ্রামে পাঠশালার জন্য আলাদা করে গৃহ স্থাপিত হত না যে স্থানে বটুরা পাঠ নিত সেই স্থানটি নানান কাজে নানাম সময়ে ব্যবহৃত হত কেউ কেউ চন্ডিমন্ডপেই পাঠদিতেন, পাঠগ্রহণ ছাড়াও সেখানে সারা বছর নানান ধরনের পুজো, পার্বন ও অনুষ্ঠান হত কোথাও কোথাও গ্রামের আড্ডার জন্য নির্দিষ্ট বৈঠকখানায়ও এই পাঠশালা আয়োজিত হত কোনো কোনো পৃষ্ঠপোষক আবার নিজের বাস্থানের এক অংশ ছেড়ে দিতেন পাঠশালের জন্য ৩০-৪০বটর জন্য যে সব পাঠশাল, সেগুলো বছরের শুকনো সময়ে খোলা যায়গায় আর বর্যার সময় তিন চারটি অস্থায়ী পাতায় ছাওয়া কুঁড়ে ঘরে হয় বেশি বর্যা এলে বটুদের পাততাড়ি্ গুটেতে হত ছাপার হরফে পুস্তকের কথা গ্রামাঞ্চলে কেউ জানতইনা বলা চলে তবে কিছু কিছু ছাপাই পঞ্জিকা(এলম্যনাক) অবস্থাপন্ন পরিবারের গৃহস্থরা কলকাতা থেকে কিনে নিয়ে যেতেন একজনও গুরুমশাই ছাপার বই দেখেননি এডাম এদের স্কুল বুক সোসাইটির প্রকাশনায় পুস্তক দেখান গুরুমশাইরা এগুলো খুবেশি গুরুত্ব দেননি সোসাইটি বইগুলি বিক্রির জন্য বাউলিয়ায় একজন দালাল ঠিক করেছে বলেও তিনি জানান প্রত্যেক গুরুমশাই তাঁর স্মৃতি থেকে আবৃত্তি করে পাঠদান করতেন পাঠশাল শেষ হত স্বরস্বতী বন্দনা দিয়ে একজন নেতা পোড়ো এই বন্দনা আবৃত্তি করত, বটুদের প্রত্যেককে ভুঁইএ মাথা ঠেকিয়ে বন্দনার একটার পর একটা স্তবক আবৃত্তি করতে হত যাতে এই বন্দনাটি তাদের স্মরণে থাকে এছাড়াও ছড়ায় ছড়ায় শুভঙ্করী(এডামের ভাষায় ককার অব বেঙ্গল)ও শেখানো হত

উইলিয়ম এডাম-এর শিক্ষা সমীক্ষা২


এডাম পাঁচটি জেলায় যে বিষয়গুলি নিয়ে বিশদে তথ্য গ্রহণ করেন, ১) বুনিয়াদি পাঠাশালা আর বটুদের জাত বিভাগ, ২) ঐ আর গুরুমশাইদের জাত বিভাগ, ৩) কী ধরনের পাঠদানব্যবস্থা ছিল, ৪) সংস্কৃত শিক্ষার অবস্থা কী ছিল, ৫) সংস্কৃত শিক্ষায় কী ধরনের বই ব্যবহৃত হত, ৬) পারসিক আর আরবি উচ্চ পাঠশালাগুলির বিশদ ৭) এই উচ্চ পাঠশালাগুলোতে কী ধরনের বই ব্যবহার হত ইত্যাদি পাঠশালাগুলি নিয়ে এডাম কী বলছেন একটু শুনি তাঁর মতে বাংলা আর বিহার মিলিয়ে, ১,৫০,৭৭৪টি গ্রামে বাংলা-বিহারে এক লাখেরও বেশি পাঠশালা রয়েছে সবকটি গ্রামে নাথাকলেও অধিকাংশতেই পাঠশালা বিদ্যমান কোনো কোনো গ্রামে ছটাও পাঠশালার খবর পাওয়া যাচ্ছে পাঠশালাগুলির উপযোগিতা নিয়ে এডামের বক্তব্য, It is not, however, in the present state of these schools, that they can be regarded as valuable instruments for this purpose The benefits resulting from them are but small, owing partly to the incompetency of the instructors, and partly to the early age at which through the poverty of the parents the children are removed
পাঠদান শুরু হত পাঁচ বা ছবছরেই এই বুনিয়াদি শিক্ষাদান চলত পাঁচ বছর ধরে বটুদের দেয় অর্থের ওপরেই গুরুমশাইদের দিনগুজরান হত নিজেদের রোজগার বাড়াবার জন্য গুরুমশাইরা প্রতিবেশি অঞ্চল থেকে সম্মানীয় বা অর্থবান পরিবারের বটু ভর্তি করত পাঠদানপদ্ধতি নিয়েও এডাম বিশদে বলেছেন স্বরবর্ণ শিক্ষা সমাপ্ত হলে ব্যাঞ্জনবর্ণ শিক্ষাদান হত মাটিতে বালি লেপে তার ওপরে আঙুল অথবা লাঠি্দিয়ে এই বর্ণগুলি মকশ করা হত এরপর মাটিতে সাদা লাঠি দিয়ে ফুটিয়ে তোলাহত বর্ণগুলোর চেহারা এই কাজটি চলত আট থেকে দশদিন পর্যন্ত এরপর লালা রঙএ খাগের কলম তালুতে(এডাম স্পষ্ট বলছেন আঙুলে নিয়ে নয়) ধরে সেটি তালপাতার ওপর কালোরঙএর ভুসো কালিতে চুবিয়ে, স্বরবর্ণের সঙ্গে ব্যাঞ্জন বর্ণের মিলন, যুক্তবর্ণ, স্বরভক্তি(সিলেবল), শব্দ শিখতে হত এ ছাড়াও তারা শিখত নিউমারেশন, টাকা, ওজন(ওয়োটস ওন্ড মোজার্স) আর বিভিন্ন ব্যক্তি, জাতি, ও স্থানের নাম সঠিকবর্ণে সঠিকভাবে লিখতে পারা শেখানো হত এই কাজগুলি চলত এক বছর ধরে এরপর এডভানসড স্টাডি বাতির কালোশিষ ধরে কলাপাতায় শেখানো হত সাধারণ যোগ বিয়োগ গুণ ভাগ এরপর খুব সরল জমি, বাণিজ্য ও কৃষিকাজের জন্য পাটিগণিত শেখানো হত গ্রামের পাঠশালাগুলিতে কৃষিবিযয়ক অঙ্ক বিশেষ করে করানো হত আর শহরে নানান বাণিজ্যে দিকগুলি নিয়ে অঙ্ক শেখানো হত তিনি বলছেন বটুদের নীতি শিক্ষা দেওয়ার জন্য কোনো বিদ্যালয়েই পাঠ্যপুস্তকের প্রচলন ছিলনা তাঁর মতে এতে বটুদের নীতিশিক্ষা হত না
তিনি বলছেন হিন্দু আইন অনুযায়ী বটুদের পাঠগ্রহনের প্রবেশের বয়স ছিল পাঁচ বছর পাঁচবছরে না হলে, সাত বা নয়, বিজোড় বছরেও পাঠ শুরু হত বছরের এক নির্দিষ্ট মাস, মাসের এর নির্দিষ্ট সপ্তাহ আর  সপ্তাহের এক নির্দিষ্ট দিনেই একটি ছাত্রের পাঠদানপ্রক্রিয়া শুরু হত এই দিনেই পরিবারের পুরোহিত, দেবী সরস্বতীর পুজো দিয়েই ছাত্রের হাত ধরে বর্ণের ওপর মকশ করিয়ে সেগুলি উচ্চারণ করতে বলতেন তবে প্রত্যেক হিন্দুই যে এ ধরণের পুজো-অর্চনা পালন করত তা বলা যায় না, যাদের বিশেষরূপে পাঠদানের সামর্থ রয়েছে, একমাত্র তারাই এ ধরনের পুজার্চনা করতেন এবং পরেরদিন থেকেই সন্তানকে বিদ্যালয়ে পাঠাতেন তবে রাজসাহিতে এ ধরনের কোনো নির্দিষ্ট বয়স দেখিনি ছাত্রের পাঠ গ্রহণ ক্ষমতা অথবা পরিবারের আর্থিক সামর্থের ওপরেই নির্ভর করত পাঠশালায় প্রবেশের বয়স তবে কোন বয়সে শুরু করছে, তার ওপরেই নির্ভর করত কবে সে উচ্চ পাঠশালা থেকে কবে ছাড়া পাবে তিনি নাটোরএর ১৭৬টি পাঠশালার উল্লেখ করছেন, যেখানে পাঠশালায় প্রবেশর বয়স পাঁচ থেকে শুরু করে দশ বছর পর্যন্ত ছিল কোনো শিক্ষক থেকে শিক্ষকে পাঠদানের সময়সীমা বদলাত পাঁচ থেকে দশ বছর
শিক্ষকেরা তরুণ থেকে প্রবীণ পর্যন্ত হতেন তারা সরল, সধারণ, অজ্ঞ(ইগনোরেন্ট) এবং গরীব তাই অন্য কোনো পেশায় প্রবেশের সুযেগ থাকে না কিন্তু যে অঞ্চলে তাঁরা পাঠদান করেন সেই অঞ্চলে তাঁদের সম্মান ছিল অপরিমিত তারা অনেকেই জানতেন না কী গুরুত্বপূর্ণ কাজ তাঁরা করছেন যে কাজ করছেন, তার পেছেনে তাদের খুব একটা ভাবনা চিন্তাও ছিল না বটুদের ওপরেও তাদের প্রভাবও বেশি হত না এছাড়াও শিক্ষকদের সম্বন্ধে তিনি খুব একটা উচ্চধারণা পোষণ করতেন না তা তাঁর প্রতিবেদন থেকেই স্পষ্ট শিক্ষকদের সাম্মানিক আসত শুধুমাত্র বিভিন্ন সূত্রে দুজন শিক্ষক তাঁদের সমগ্র আর অন্যরা সাম্মানিকটুকুর একাংশ পেতেন গ্রামের কোনো সহৃদয় দানশীল ব্যক্তির দান থেকে এক চতুর্থাংশের সাম্মানিক আসত বটুদের দেয় অর্থের থেকে অন্যান্যদের সাম্মানিক আসত কিছুটা অর্থ আর কিছুটা পণ্যদ্রব্যের বিনিময়ে সাধারণ ভাবে তিনটিস্তরে পড়াবার মাধ্যমের বিস্তৃতি ছিল, প্রথমটি মাটি, তালপাতা, শেষ মাধ্যম ছিল কাগজ প্রত্যেক স্তরে পাঠাদানের শুরু থেকে আরও একটু বেশি মাইনে ধার্য হত কোথাও কোথাও প্রথম আর দ্বিতীয়স্তর একটিস্তর হিসেবেই দেখা হত কোথাও কোথাও দ্বিতীয় আর তৃতীয়স্তরে একই মাইনে দাবি করা হত কোথাও আবার প্রত্যক স্তরের জন্য একই অর্থের মাইনে ছিল তবে সাধারণঃ প্রত্যেকস্তরের জন্য আলাদা আলাদা পরিমান অর্থই দাবি করা হত আবার বটুদের পরিবারের স্বচ্ছলতার ওপর নির্ভর করত মাইনে অর্থবানদের তুলনায় গরীব বটুদের কখোনো অর্ধেক, কোথাও একচতুর্থাংশ, কোথাও আবার একতৃতীয়াংশ অর্থ মাইনে হিসেবে নেওয়া হত

উইলিয়ম এডাম-এর শিক্ষা সমীক্ষা১


অষ্টাদশ শতাব্দ পর্যন্ত নানান সামাজিক-অর্থনৈতিক ঝড়-ঝাপটা সহ্যকরে বাংলার সার্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা দাঁড়িয়েছিল মাথা উঁচু করে উইলিয়ম এডাম ১৮৩৫-৩৮ পর্যন্ত সমীক্ষা করে বাংলা-বিহারে অন্ততঃ এক লাখ পাঠশালা দেখেছেন এই তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই রেভারেন্ড এফ ই কে লিখছেন, “there was---, before the British Government took over the control of education in India, a widespread, popular, indigenous system It was not confined to one or two provinces, but was found in various parts of India, though some districts were more advanced than others In the inquiry made for the Madras Presidency in 1822-26, it was calculated that rather less than one-sixth of the boys of school-going age received education।।। In the similar inquiry made for the Bombay Presidency (1823-28), the number of boys under instruction was put down to about one in eight।।। ১৮১৪ সালের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ডিরেক্টরদের পাঠানো প্রথম এডুকেশন ডেসপ্যাচ এপর নির্ভর করে এ পি হাওয়েল ১৮৫৪তে বলবেন, “There is no doubt that from time immemorial indigenous schools have existed।।। In Bengal alone, in 1835, Mr Adam estimated their number to be 100,000; in Madras, upon an inquiry instituted by Sir Thomas Munro in 1822, the number of schools was reported to be 12,498, containing 188,650 scholars; and in Bombay, about the same period, schools of a similar order were found to be scattered all over the Presidency
এর থেকে পরিষ্কার ভারতের প্রায় প্রত্যেক প্রান্তে দেশিয় পাঠশালার অস্তিত্ব বর্তমান ছিল প্রত্যেক অঞ্চলের বিদ্যালয়ের শিক্ষা কাঠামো, পাঠদান বা অন্যান্য পরিকাঠামো আলাদা আলাদা, সেই অঞ্চলের প্রয়োজনের ওপর ভিত্তি করে, ষ্পষ্টতঃই তখোনো বাংলার শিক্ষা ব্যবস্থায় ব্রিটিশ প্রণীত এককেন্দ্রিকতা গড়ে ওঠেনি শেখার বিষয় হিসেবে মগধে পড়ানো হত তুলসিদাস রামায়ণের নানান ঘটনাবলী নির্ভর দান লীলা, সুদামা চরিত, রাম জনম বাংলায়ও একই জিনিষ পড়ানো হত, তবে ভাষা আলাদা, বাংলা ত্রিহুতের শিক্ষার মাধ্যম ছিল মৈথিলি বা ত্রিহুতিয়া এই উচ্চ পাঠশালাগুলোতে সংস্কৃত বা পারসিক মাধ্যমে পড়ানো হত না বাংলা প্রদেশের অভিজ্ঞতা থেকে পরিস্কার, বাংলার গ্রামে গ্রামে দেশজ ভাষায় পড়ানোর একটি সুসংগঠিত ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল ব্রিটিশ শাসন আমলের অনেক আগে থেকেই কারা পড়তেন! এডাম বলছেন, “Commercial accounts।।। are chiefly acquired by the class of money-lenders and retail traders, agricultural accounts।।। by the children of those families whose subsistence is exclusively drawn from the land, and both accounts by those।।। who expect to gain their livelihood as writers, accountants, etc গ্রামের পাঠশালাগুলো ছিল গ্রামের নানান শ্রেণীর মানুষের চাষী, কর্মকার, শিল্পী আর ব্যবসায়ীদের সন্তানদের শিক্ষা কেন্দ্র আর এস শর্মা বলছেন ছ শতাব্দ থেকে গ্রামের সমষ্টির মধ্যে শ্রেণীগত ঐক্য গড়ে উঠেছিল, আর গ্রামের নানান উত্পাদনের প্রক্তিয়ার মধ্যে দিয়ে গ্রামীণদের মধ্যে আত্মীয়তার আর পণ্যদ্রব্যগুলির প্রতি অধিকারবেধের গর্ববাখান তৈরি হচ্ছিল কৃষির সঙ্গে কর্মশালার সরাসরি মেলবন্ধনে গড়ে উঠছিল নিজে কাজ করার গর্ব, কাজের প্রতি অধিকারবোধ, নিজের কৌমের প্রতি ভালবাসা এবং স্বনির্ভর গ্রাম গোষ্ঠী গ্রামে জাতিবিভেদ ছিল কিন্তু গ্রামের সামগ্রিকতাবোধ এতই জোরালো ছিল যে, এই ভেদাভেদ উত্পাদনের কাজকর্মে খুব একটা বড় হয়ে দেখা দিত না আর আমরা জানি কৃষি আর শিল্পে, উভয়ের বিকাশে গ্রাম পঞ্চয়েতের বড় একটা ভূমিকা ছিল পঞ্চায়েত নিজের রোজগারে সেচ ব্যবস্থা, সাধারণ পতিত জমি উদ্ধারেরমত নানান কাজে অংশ নিত সরাসরি
এডামের শিক্ষা সমীক্ষায় বলাহচ্ছে মেদিনীপুর, বর্ধমান, বীরভূম বা ত্রিহুতেরমত জেলাতে বিস্তৃতভাবে সমীক্ষা করে লিখছেন, একলাখ পাঠশালায় গুরুমশাইদের কখোনো অর্থে আবার বা কখোনো পণ্যে বিদায় দেওয়া হত পাঠশালার স্থান নির্বাচন করতেন গ্রামের মানুষেরাই তিনি স্পষ্টভাবে লিখছেন, "indigeneous elementary schools।।। are those ।।। in which instruction in the element of knowledge is communicated, and which have been originated and are supported by the natives themselves, in contradistinction from those that are supported by religious or philanthropic societies" এই উচ্চ পাঠশালাগুলি চালানোর দায় ছিল গ্রাম সমষ্টির ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের আরও একটা বড় প্রচার ছিল যে, বাংলার হিন্দু-মুসলসমানের মুখ দেখাদেখি ছিলনা এই ধারণা সর্বৈব মিথ্যে এই পাঠশালাগুলোর বটুদের মধ্যে দুই ধর্মেরই শিশু পাঠ নিত এক সঙ্গে বসে গুরুজীর সামনে সমাজের নানান বর্ণের বটুরা একসাথেই পাঠ নিত আট বছর পর্যন্ত দক্ষিণ বিহারের এক পাঠশালার হিসেব দিচ্ছেন এডাম শিক্ষকদের মধ্যে মুসলমান ছাড়াও ছিলেন কায়স্থ, মগধ, গন্ধবণিক, তিলি, কোইরি, সোনার শ্রেণীর হিন্দুদের বটুদের মধ্যে ছিল দেসাধ, পাসি, সুশাহর, ধোবি, তাঁতি, কালাবর, বেলদার, গোয়ালা, নাপিত, কাহার, কুর্মি, কোইরি, ব্রাহ্মণ, কায়স্থ ইত্যাদি বীরভূমে তিনি হিন্দু, মুসলমানএর সঙ্গে খ্রিষ্টিয় শিক্ষকের নাম পাচ্ছেন(এ সব সত্বেও সাম্রাজ্যবাদীদের অনুসরণ করে মেকলের পুত্রকন্যাদের বলতেই হবে, বাংলা তথা ভারতের সমাজ ছিল জাতপাত ভিত্তিক, একজাতের লোক অন্যজাতের ছোঁয়া পর্যন্ত মাড়াত না) ৪০০ জন শিক্ষক ছিলেন হিন্দু এদের মধ্যে ছিল ২৪টি জাতি চন্ডাল(হায়! আমি চন্ডালের কন্যাও লিখেফেল্লেন নোবেলিয় কবি, না হলে নোবেল লাভ!), ধোবি, তাঁতি, কৈবর্ত, গোয়ালাও বটুদের মধ্যে ছিল মুসলমান, খ্রিস্টান, সাঁওতাল, ধাঙড়, ডোম, চন্ডাল, তেলি, ব্যধ, যুগি, তাঁতি, হাড়ি, কুর্মি, মালি, ব্রাহ্মণ, কায়স্থ প্রভৃতি এডাম স্পষ্ট লিখছেন, "Parents of good caste do not hesitate to send their children to schools conducted by teachers of an inferior caste and even of different religion For instance, the Musalman teacher।।। has Hinuds of good caste among his scholars and this is equally true of the Chandal and other low caste teachers enumerated ।।। "the Musalman tecahers have Hindu as well as Musalman scholars and the different castes of the former assemble in the same school-house, receive the same insturctions from the same teacher, and join in the same plays and pastimes অথচ উন্নতিশীল বাংলার মধ্যবিত্ত আর বুদ্ধিজীবিদের প্রচেষ্টায় উঠেগেল বাংলার সার্বজনীন শিক্ষা ব্যবস্থা মেকলের আগেও জেনারেল কমিটি অব পাবলিক ইন্সট্রাকশনের সদস্য হোল্ট ম্যাকেঞ্জি ১৮৩২এ বলছেন To provide for the education of the great body of the people seems to be impossible আদতে পার্মানেন্ট সেটলমেন্টএর, চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের হাত ধরে তৈরি হল এক শ্রেণীর জমিদার গোষ্ঠী, যাদের জমির মালিক হিসেবে অধিকার দেওয়া হল গ্রামে যতরকম এজমালি জমি ছিল সব প্রায় দখল নিয়ে খাজনা আদায়ের ব্যবস্থা হল গ্রাম সমাজের সলিল সমাধির সঙ্গে ভেঙেগেল সমাজের যত পরিকাঠামো, গড়ে উঠেছিল হাজার হাজার বছর ধরে তিল তিল করে গ্রামীণদের অনবরত প্রচেষ্টায়