Saturday, March 4, 2017

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা২৪- উনবিংশ এবং বিংশ শতে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র এবং দেশজ চিকিৎসা ব্যবস্থা ১৮০০-১৯৪৭

পুনম বালা

চতুর্থ অধ্যায়
বাংলায় সাম্রাজ্যবাদ এবং চিকিৎসা - পেশাদারিত্বের উদ্যোগ
অনুন্নত দেশগুলিতে পেশাগুলির সামাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ হয়ই না বলা চলে। অধিকাংশ সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ সংক্রান্ত পুস্তক মূলত উন্নত দেশগুলির বাস্তবতা অনুসারী এবং সেগুলিকে কোনভাবেই অনুন্নত দেশের প্রেক্ষিতে ফেলা যায় না। সাধারণভাবে পেশাদার বলতে শিল্পোন্নত দেশগুলিতে বোঝা হয় যে এইটি গণতান্ত্রিক এবং স্বচ্ছল ভবিষ্যতের অন্যতম পাথেয়১। এই তত্ত্ব অনুন্নত দেশেও প্রযোজ্য হচ্ছে – উদাহরণস্বরূপ ভারতবর্ষেও, যেখানে পেশাদারিত্বে উন্নতিরই সুযোগ নেই। এই অবস্থার দুটি কারন জেফ্রি২ নির্দেশ করেছেন – ভারতে রাষ্ট্রের সর্ব্যব্যাপী হাত এবং সাম্রাজ্যবাদী ভারতে সামাজিকভাবে নিশ্চুপ থাকা।
পেশাকে আমরা কাজ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করতে পারি, পেশার সঙ্গে জুড়ে থাকা কর্মক্ষেত্রের স্বায়ত্ত্ববোধ, রাষ্ট্রের মদতে পেশাদারদের কাজের একচেটিয়াকরণ, গোষ্ঠীবদ্ধতার নীতিমালা, শিক্ষণের সময়াবধি এবং উন্নততর সম্মান এবং স্তরে যাওয়ার ধারণা এবং বাস্তব অবস্থাগুলি। যে দুটি তত্ত্ব থেকে আমরা পেশাদারিত্বের এই সংজ্ঞায় পৌছেছি, সেগুলি হল প্রথমত কারসান্ডার্স, উইলসন এবং পার্সনস পেশাদারিত্ব মূলভাব খুঁজতে নানান ধরণের রেণু(ট্রেট) বর্ণনা করেছেন৪। জনসন একে বলছেন পেশাদারিত্বের রেণু তত্ত্ব(মডেল)।

গায়ারমাতি৬, জনসন৭, ফ্রিডসন অন্যভাবে বিষয়টাকে দেখেছেন। তারা বলছেন এটি বিশেষাধিকারের স্তর – যা পেশাদারেরা অর্জন করার চেষ্টা করছেন বা ইতোমধ্যে করে ফেলেছেন – সেটির জন্য প্রশিক্ষণ এবং অন্যান্য জীবিকার উপাদান ব্যবহার করা। দুটি তত্ত্বের মধ্যে বৈসাদৃশ্য নজরে পড়ার মত। জেফ্রি বলছেন প্রথম তত্ত্বটিতে একচেটিয়াকরণ এবং স্বায়ত্ত্বশাসনের বোধ মোটামুটি নির্ভর করে দীর্ঘদিন ধরে প্রশিক্ষণ এবং গোষ্ঠীগত দৃষ্টিভঙ্গীতে, আর দ্বিতীয়টিতে এগুলিকে ব্যবহার করা হয় পেশার একচেটিয়াকরণের উদ্দেশ্যে। অন্যভাবে বলতে গেলে, দ্বিতীয়টিতে একচেটিয়া করণের উদ্দেশ্যে নানান ধরণের কেরামতির পথ বার করা হয় আর প্রথম তত্ত্বে একচেটিয়া এবং গোষ্ঠীবদ্ধতা লক্ষ্য হিসেবে চিহ্নিত হয়, ধরে নেওয়া হয়, তারা পেশাদারিত্বের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই জুড়ে রয়েছে।
পারসনস পেশাকে সংজ্ঞায়িত করছেন কিছু কাজের সমষ্টি হিসেবে, যেগুলি সেই পেশাদার ব্যবহার ক’রে সাধারণভাবে সমাজে মূল্য যোগ করে এবং এই কর্মগুলি সম্পাদনা করে সর্বক্ষণের কর্মী হয়ে জীবন নির্বাহ করে। কোন এক পেশার সদস্য, সামাজিক দায়বদ্ধতায় নিবেদিত হয়ে, বেশ কিছু নীতিমালা অবলম্বন করে প্রচুর সংখ্যক মানুষের কাছে তার পেশার দক্ষতা বিক্রি করে। এর অর্থ হল, কোন এক পেশার এক সাধারণ পেশাদার বিধিবদ্ধভাবে পড়াশোনা করে। এই পড়াশোনার শর্তে মনে হয়, যারা এই পদ্ধতিতে পড়াশোনা করে একমাত্র তারাই এই পেশায় প্রবেশলাভের সুযোগ অর্জন করবে১০। পারসন ব্যবসা এবং পেশার মধ্যে একটা লক্ষ্মণরেখা টেনেছেন, শিল্পনির্ভর সমাজে ব্যবসা এবং পেশা প্রায় একই ধরণের, কিন্তু পেশাদারেরা সাধারণত ব্যক্তি কেন্দ্রিক না হয়ে সমষ্টিগতরূপ ধারণ করে। এই রূপ নিশ্চিত করে যে, সে বিজ্ঞান নির্ভর হয়ে মানব সভ্যতায় সেবা দান করবে১১।

পশ্চিমি সমাজে স্বনিযুক্ত পেশাদারদের সংঘ তৈরি করা পেশাদারির একমাত্র শর্ত বা এই ধরণের প্রবণতা কোন কালেই ছিল না। উনবিংশ শতকের পূর্বে এই শব্দ দ্বারা চার্চ এবং সেনাবাহিনীর সদস্যদের বোঝাত। বিংশ শতকে পেশাদার বলতে বোঝাত সমাজ-কর্মী নয়ত বা শহর পরিকল্পক। এরই সঙ্গে পরম্পরার পেশায় চাকরির পদমর্যাদা অন্যতম প্রধান শর্ত ছিল।

প্রাণ্ডি এবং অন্যান্যরা উনবিংশ শতকে পেশাদারদের বাড়বৃদ্ধি এবং পেশাদারিত্বের শর্তের পরিবর্তনের প্রসঙ্গে বলছেন, বিপুল সংখ্যক মানুষের কাছে নিজের দক্ষতাকে বিক্রি করার চরিত্র পেশাদারিত্বের একমাত্র শর্ত হয়ে দাঁড়াল না। তারা বলছেন উনবিংশ এবং বিংশ শতকে ব্রিটেনে পেশাদারদের সংঘ তৈরি করা, স্বধিকার বা ব্যক্তিগতভাবে পেশার দক্ষতা পসার(বা বিক্রি) পেশাদারিত্বের একমাত্র চরিত্র হয়ে রইল না, বরং রাষ্ট্রের সবলহাত অবলম্বন করে এবং রাষ্ট্রের অনুজ্ঞায় একচেটিয়া পসার তৈরি করাই পেশাদারদের একমাত্র চেষ্টা হয়ে দাঁড়াল১৩।

উনিবিংশ শতকের শুরুর দিকে পেশাদারিত্বের দিক থেকে দেখতে গেলে দেশজ চিকিৎসা চরম পেশাদারিত্বের রূপ পেয়েছিল। কাজের পরিস্থিতি স্বাধিকারপূর্ণ ছিল, সে সময়ের যাজক এবং শাসকদের দেওয়া সামাজিক নিরাপত্তা ছিল, এবং চিকিৎসায় তাদের উদ্দেশ্য ছিল সমাজের সেবা করা। একই সঙ্গে টোলে দু বছর ধরে যে সব চিকিতসা বিষয়ক পাঠ পড়াশোনা হত, সেগুলি সফলভাবে শেষ করে ছাত্ররা চিকিৎসক রূপে কাজ করতে পারতেন। শেষ কথা হল অন্যান্য সমপেশাদারদের তুলনায় সমাজে চিকিতকদের বিপুল সম্মান ছিল এবং এটি চরম পেশাদারিত্বের মোড়কে আচ্ছাদিত ছিল।
(চলবে)

No comments: