Sunday, June 5, 2016

দ্য মুঘল এডমিনিস্ট্রেশন - যদুনাথ সরকার

ষষ্ঠ অধ্যায়
আইন ও বিচার ব্যবস্থা


৯। আওরঙ্গজেবের সময়ের দণ্ডসংহিতা
পূর্বতন মামলার নজির-আইন(কেস-ল)এর সঙ্কলন, আওরঙ্গজেব শেখ নিজামএর নেতৃত্বে কয়েকজন ধর্মতাত্ত্বিকের সমারোহে বানিয়েছিলেন, নাম ফতোয়াইআলমগিরি। এছাড়াও তিনি ১৬ জুন, ১৬৭২ গুজরাটের দেওয়ানকে যে ফর্মান লেখেন, তাতে তাঁর ভাবনার দণ্ড সংহিতার একটি রূপরেখা রয়েছে। নিচে আমি সেটির অনুবাদ উপস্থাপন করছি, চেস্টিজ বা তাড়ন শব্দের অনুবাদ করা গেল বিচারকেদের বিবেচনাক্রমে তাজির বা দৈহিক শাস্তি। তাঁর ফরমানটি নিম্নরূপ-
‘সম্রাট জানতে পেরেছেন যাদের বিনা বিচার কারাকক্ষে নিক্ষিপ্ত করা হয়েছে, তাদের স্থানীয় আধিকারিকরা বিচার করার কাজে ঢেলে দিচ্ছে। বিনা বিচারে যাতে কাউকে কারারুদ্ধ না করা হয়, তার জন্য নিম্নলিখিত আইনগুলি করে দেওয়া গেল-
১। যখন কাজির সামনে আইনি সাক্ষ্য-প্রমানে চুরির মামলা প্রমানিত হল বা অভিযুক্ত নিজে এমনভাবে তার দোষ স্বীকার করে নিয়েছে/প্রমানিত হয়েছে, যেখানে হদএর শাস্তিগুলি প্রয়োগের সুযোগ রয়েছে, অভিযুক্তর উপস্থিতিতে কাজি শাস্তি ঘোষণা করবেন, এবং যতক্ষণনা সে তার পাপের জন্য অনুতাপ-স্বীকার পর্চায় স্বাক্ষর না করছে, ততক্ষণ কারাগারে রাখবে,
২। যখন দেখা যাবে কোন শহরে চুরি বেড়েই চলেছে, এবং চোরকে গ্রেপ্তার অনুমানবলে করা হয়েছে, এটি যদি তাঁর প্রথম চৌর্যবৃত্তি হয়, তাহলে তাঁর মস্তকচ্ছেদন করবে না বা শূলে দেবে না,
৩। কোন চোর যদি একবার অপরাধ করে থাকে, এবং সেটি নিসাবএর(কোরাণ সূত্রে বলা হচ্ছে, চুরি যাওয়া বস্তুর দাম যদি চার দিনারের নিচে হয়, তাহলে চোরের অঙ্গহানি করা যাবে না) কাছাকাছি হয় – এবং হদএর শাস্তি আইনগতভাবে প্রযোজ্য হচ্ছে না, তাকে তখন তাজির অনুযায়ী শাস্তি দাও। কিন্তু যদি সে আবার অপরাধ করে, তাজির অনুযায়ী শাস্তির পরেও তাকে কারাগারে নিক্ষেপ কর যতক্ষণ না সে অনুতাপ করছে। তাজির এবং কারাগারের শাস্তি যদি তাঁর কাছে যথেষ্ট বলে না মনে হয়, এবং আবার চুরি করে, তখন তাকে বেশি দিনের জন্য কারাগারে নিক্ষেপ কর(সিয়াসাল) বা মৃত্যুদণ্ড দাও, এবং চুরি হওয়া সম্পত্তির প্রমান নিয়ে, তার উপস্থিতিতে, মালিকের কাছে পৌছে দাও, নাহলে সেই সম্পত্তিটি বাইতুলমালের অছি(আমানত)তে গচ্ছিত রাখ।
৪। সে যদি দুবার চুরির দায়ে, দুবারই হদএর শাস্তি পেয়ে থাকে, এবং আরও একবার  তার চুরির আইনি প্রমান থাকে, এবং সে যদি স্বভাবতই গাঁটকাটা হয়, তাজিরের শাস্তির পরেও তাকে কারাগারে রাখবে, যতক্ষণনা সে অনুতাপ করছে। কিন্তু এই পদ্ধতি যদি তাকে শোধরাতে না পারে, সে যদি আরও একবার চুরি করে, তাকে দীর্ঘদিনের শাস্তি(কারাবাস) দাও।
৫। কেউ যদি কবর খুঁড়ে শব বার করে, তাকে বকেঝকে(রেপ্রিমান্ড) ছেড়ে দাও। কিন্তু সে যদি একে তাঁর পেশা হিসেবে নিয়ে থাকে, হয় তাকে নির্বাসিত কর না হয় তাঁর সিয়াসত অনুযায়ী তার দুহাত কেটে দাও। প্রশাসনিক আধিকারিক বা সুবাদারের ভাবনায় যেটা সুবিধের মনে হয়, সেই রায়টি তুমি প্রয়োগ করবে।
৬। কেউ যদি রাজপথে ডাকাতি করে কাজির সামনে উপনীত হয়, এবং যথাযোগ্যভাবে সে তাঁর দুষ্কর্মটি স্বীকার করে যাতে তাকে কারাগারে রাখা যায় – তাহলে কাজি তাঁর উপস্থিতিতে তাঁর উপযুক্ত শাস্তি ঘোষণা করবেন। কিন্তু তাঁর অপরাধ যদি মৃত্যুদণ্ড যোগ্য বা অন্যান্য হদএর শাস্তিযোগ্য না হয়, এবং সুবাদার আর আদালতের আধিকারিকদের মত তাঁর মৃত্যুদণ্ডের বিপরীতে যায়, তাহলে তাঁর শাস্তি হবে সিয়াসিত বা অঙ্গহানি।
৭। চোর যদি স্বীকার করে তাঁর চৌর্যলব্ধ জিনিসটি অন্য একজনের জিম্মায় রয়েছে, এবং সেটি তাঁর তাঁবেতে পাওয়া যায়, এবং তদন্তে যদি দেখা যায়, সেই মানুষটি তাঁর কাজের স্যাঙাত ছিল – এবং এটি তাঁর প্রথম অপরাধ, তাহলে তাকে তাজির অনুযায়ী শাস্তি দাও; কিন্তু সেটি যদি তার স্বভাব হয়ে গিয়ে থাকে, তাহলে তাজির অনুযায়ী তাকে কয়েদ করবে এবং তাকে সংশোধনের সুযোগ দেবে। কিন্তু তাতেও যদি সে না শোধরায়, তাকে বরাবরের জন্য কয়েদ করে রাখবে। চুরি যাওয়া সম্পত্তি ৩ নম্বর সূত্র অনুযায়ী ফেরত দিতে হবে। না জেনে সেই সম্পত্তি যদি কেউ কেনে তাকে হয়রাণ করা যাবে না, কিন্তু সেটি তার মালিকের কাছে প্রমানসহ ফেরত পাঠাতে হবে বা বাইতুলমালে জমা দিতে হবে।
৮। স্বভাবী অপরাধী যারা গৃহস্থের বাড়িতে ডাকাতি করে তাদের জীবন ও সম্পত্তির ক্ষতিসাধন করে, তাদের প্রমান সহ সিয়াসত করবে।
৯। গুজরাটের বংশপরম্পরার ডাকাত ও লুঠেরা জমিদারদের বিষয়ে বলা যাক জনস্বার্থে তাদের মৃত্যু প্রয়োজন এবং তাদের প্রতি প্রমান সহ সিয়াসত করবে।
১০। একজন অপ্রমানিত সন্দেহভাজন ঠগী, যার কাজ প্রমান করা যায় নি, তাকে তাজির করবে এবং তাকে অনুতাপ করতে দেবে। কিন্তু যদি তার কাজ আইনিভাবে প্রমান করা যায়, এবং সে স্বভাবতই ঠগ হয়, এবং তার দুষ্কৃতি সেই এলাকায় মানুষ এবং প্রশাসকের পরিচিত হয় এবং হতভাগ্য গলায় দড়ি পড়া মানুষটির আর তার লুঠ হওয়া সম্পত্তির খোঁজ মেলে, এবং সুবাদার এবং আদালতের আধিকারিকরা যদি মনে করে এই কাজটি গ্রেপ্তার হওয়া দুষ্কৃতির করা, তাহলে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেবে।
১১। কাউকে যদি চুরি, রাজপথে ডাকাতি, ঠগিকর্ম, এবং নিষ্ঠুর হত্যা করার দায়ে গ্রেপ্তার করা হয়, সুবাদার এবং আদালতের আধিকারিকরা যদি প্রমান পান যে এই মানুষটি, এই ঘৃণ্য কাজের সঙ্গে সরাসরি জড়িত, তাকে কারারুদ্ধ করবে এবং অনুশোচনার সময় দেবে। আর যদি কেউ ত্যার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনে, তাহলে তাকে কাজির সামনে পেশ করবে,
১২। যারা মানুষের বাড়িতে আগুণ লাগায়, বড় জমায়েতের সুযোগে মানুষের গাঁট কাটে, যারা ধুতুরা, ভাং, নক্স ভমিকার(?) বীজ খাওয়ায়, এ ধরণের নানান অসত(উইকেড) মানুষদের কাজ বন্ধ করতে প্রমান সহ তাদের শাস্তি দেবে এবং কারাগারে নিক্ষেপ করবে, যাতে তারা অনুশোচনার সুযোগ পায়। ছাড়া পাওয়ার পরেও যদি তারা অনুশোচনাহীনভাবে তাদের পুরোনো দুষ্কর্মগুলি চালিয়ে যায় তাহলে তাদের সিয়াসত করবে। এদের কাছে যদি কোন সম্পত্তি উদ্ধার হয়, তাহলে তা কাজির কাছে নিয়ে যাবে, প্রমান সহ, আসল মালিকের কাছে পৌঁছে দেবে, এবং যাদের বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে তাদের ক্ষতিপূরণ দেবে(দুষ্কৃতিদের সম্পত্তি থেকে)।
১৩। যদি কোন বিদ্রোহী দল, বিদ্রোহের জন্য শস্ত্র সংগ্রহ করে, এবং সে কাজের জন্য নিজেদের তৈরি করতে থাকে, যদি তারা কোন ভৌগোলিক এলাকা দখল না করে থাকে, তাদের মাল বাজেয়প্ত করবে, এবং গ্রেপ্তার করে তাদের অনুশোচনার সুযোগ দেবে। তারা যদি যুদ্ধের জন্য তৈরি হয়, তাহলে তাদের আক্রমন করে উতখাত করবে, আহত এবং পরাজিতদের খতম করবে, যতক্ষণনা তারা পালিয়ে যায়। তারা পালিয়ে যেতে থাকলে তাদের আক্রমন বা হত্যা করবে না। তাদের মধ্যে যদি কেউ গ্রেপ্তার হয়, তাকে হয় হত্যা করবে না হয় কারাগারে নিক্ষেপ করবে, যতক্ষণনা গোটা দল ধ্বংস হয়। যদি কিছু তারা লুঠ করে তাহলে সেগুলি সঠিক মালিকের জিম্মায় পৌছে দেবে, এবং দেখবে ভবিষ্যতে এ ধরণের কাণ্ড যাতে আর না ঘটে, তাদের সম্বন্ধে হুঁশিয়ার থাকবে।
Post a Comment