Showing posts with label Mir jumla. Show all posts
Showing posts with label Mir jumla. Show all posts

Tuesday, February 7, 2017

বাংলা যখন বিশ্ব সেরা৮১ - লাইফ অব মীর জুমলা, জেনারেল অব আওরঙ্গজেব

জগদীশ নারায়ণ সরকার
আষ্টম অধ্যায়

চরিত্র এবং কৃতিত্ব

১। ইতিহাসে মীর জুমলার স্থান
সপ্তদশ শতকের ভারতে মীর মহম্মদ সৈয়দ মীর জুমলা অন্যতম অসাধারণ চরিত্র।কুতবনামাইআলমএর লেখক বলছেন, তিনি সময়ের পাতায় নিজের নাম লিখেছেন। উদ্যমী, উচ্চাকাঙ্ক্ষী এবং নিজেকে নিজের বলেই তৈরি করার মানুষ ছিলেন তিনি। তিনি যে চওড়া কপালের জন্য এই উপমহাদেশের রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় বিজয়প্রাপ্ত হয়েছেন, এবং কর্ণাটক থেকে দিল্লি, এবং খণ্ডেশ থেকে অসমের রাজনীতিকে প্রভাবিত করতে পেরেছিলেন, এছাড়াও ভারতের সমুদ্র বাণিজ্যে তার বড় অংশ ছিল। পারস্যের এক ভাগ্যান্বেষী অভিযাত্রীর সন্তান হয়ে গোলকুণ্ডায় ভাগ্যপরীক্ষায় এসেছিলেন, তার দক্ষতায় ধাপে ধাপে নথি রক্ষক থেকে মছলিপত্তনমের প্রশাসক এবং তার পরে গোলকুণ্ডার উজির পদের সাফল্যের সিঁড়িতে ওঠেন। সুলতান তাকে কর্ণাটক বিজয়ের দায়িত্ব দিলে তিনি বিজয়ের পরে সেখানে মুক্ত রাজতন্ত্রের স্বাদ অর্জন করে কার্যত কর্ণাটকের প্রথম নবাব হয়ে বসেন। তার পরে তিনি শাহাজানের অনুগত হলে তাকে মুঘল সাম্রাজ্য তাকে দেওয়ানিকুল পদে অভিষিক্ত করে। আওরঙ্গজেবের সময় তিনি কিছুকাল খণ্ডেশের প্রদেশের প্রশাসক হয়ে বাংলার মত গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলের সুবাদার নিযুক্ত হন।

ভারতে মীর জুমলা বিজয়নগর রাজত্বের শেষ ৩০ বছর ধরে কর্মক্ষম ছিলেন। যদিও বিজয়নগর রাজত্ব ১৫৬৫ সালের তালিকোটার যুদ্ধের আঘাত সামলে নেয়, কিন্তু সপ্তদশ শতেই তার বিলয় নিশ্চিত হয়ে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। কেন্দ্রিয় শাসনের রাশ ক্রমশ কমতে কমতে সিংহাসন দখলের লড়াই ছড়িয়ে পড়ে মূলত মাদুরা, জিঞ্জি, এবং তাঞ্জোরের নায়েকদের মধ্যে এবং তামিল এবং কানাডিদের মধ্যে বিবাদ বাড়ার সুযোগ নেয় মুসলমান সাম্রাজ্য। প্রচণ্ড লড়াই করা সত্ত্বেও রয়্যাল দেখতে পায় যে তার হাত থেকে ক্ষমতার রাশ বেরিয়ে যাচ্ছে একের পর এক। এই সব কটি এবং অন্যান্য নগন্য রাজনৈতিক শক্তি একসঙ্গে মিলেমিশে একটা গোলোযোগের অবস্থা তৈরি হয় দাক্ষিণাত্যে। রয়াল আর নায়েকদের মধ্যে যে জোট ছিল তা সেই মুহূর্তের চাহিদার দাবিতে চ্ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে দাক্ষিণাত্যের রাজনীতি আরও জটিল হয়ে পড়ে। তার সঙ্গে জোড়ে ইওরোপিয় কোম্পানিগুলির কার্যকৃতি।

মীর জুমলা বিজয়নগর রাজত্বের পতনকে আরও গতি দিয়েছিলেন। ১৬৩৬ সালের মে-জুন মাসে মুঘলদের সঙ্গে চুক্তির জন্য উত্তর দিকে অগ্রসর হওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যায়। তখন দাক্ষিণাত্যের বিজাপুর আর গোলকুণ্ডার সুলতানেরা কৃষ্ণা, তুঙ্গভদ্রা নদীর অববাহিকায় দক্ষিণ-পূর্ব জেলাগুলিতে কৃষ্ণার কর্ণাটক থেকে তাঞ্জোরের কাবেরি পর্যন্ত বিস্তৃত ভেঙ্গে পড়া বিজয়নগর সাম্রাজ্যে, সাম্রাজ্য বিস্তারে মন দেয়। কুতুবশাহী সেনাপতি মীর জুমলা এই কাজে বিপুল ভূলিকা পালন করেন।

এই ভেঙ্গে পড়ার সময়ে দাক্ষিনাত্যের মোঘল সুবাদার আওরঙ্গজেব দূর থেকে মজা দেখার মানুষ ছিলেন না। কর্ণাটককে গিলে খাবার সময় খোঁজার অপেক্ষায় ছিলেন তিনি। তাঁরই উদ্যমে দিল্লি যোগাযোগে মীর জুমলা গোলকুণ্ডার সুলতানের প্রতি বিদ্রোহ ঘোষণা করেন।

মুঘল সাম্রাজ্যের দুই স্তম্ভ, শাহজাহান এবং আওরঙ্গজেব মীর জুমলার রণনৈতিক নেতৃত্ব এবং দক্ষিণী রাজনীতিতে তার অগাধ জ্ঞান সাম্রাজ্য বিস্তৃতিতে ব্যবহার করার পরিকল্পনা করেন। ১৬৪৯ সালে কান্দাহার হাতছাড়া হওয়া এবং পর পর তিন বছর ব্যর্থ কান্দাহার অভিযানে সামরিক বাহিনীতে হতাশার ছাপ ছড়িয়ে যায়। শাহজাহানের পরিকল্পনা ছিল মীর জুমলার নেতৃত্বে পারস্যে বাহিনী পাঠিয়ে তার সাম্রাজ্যের হৃতগৌরব পুনরুদ্ধার করা এবং পারস্যের সেনাবাহিনীর শৌর্য দমন করা। আওরঙ্গজেব, দারা বা সাদুল্লা খান যে যুদ্ধে ব্যর্থ হয়েছেন সেই যুদ্ধ মীর জুমলা জিতবেন এমন একটা ধারনা ছিল তার। কিন্তু মীর জুমলা শাহেনশাহের দৃষ্টি উত্তর-পশ্চিম থেকে সফলভাবে দাক্ষিণাত্যের পানে ঘুরিয়ে দেওয়ার কাজটি করতে পেরেছিলেন। শাহজাহান, কান্দাহার জেতার পরিকল্পনা ত্যাগ করে বিজাপুর জিততে মরিয়া হয়ে ওঠেন। মীর জুমলার পরামর্শটা খুব মনে ধরেছিল শাহজাহানের কেননা তিনি জানতেন মীর জুমলা দাক্ষিণাত্যের দরবারি রাজনীতিকে হাতের চেটোর মত চেনেন। ১৬৫৭-৫৮ সালের বিজাপুরী অভিযানের মূল প্ররোচক মীর জুমলাই। আওরঙ্গজেবের প্রধান পরামর্শদাতা এবং সেনানায়ক হওয়ায়, সুজার বিরুদ্ধে লড়াইতে মীর জুমলাই তাকে রাজসিংহাসনটির দখল নিশ্চিন্ত করান। এবং কোচবিহার আর অসম দখলের অভিযানে মীর জুমলার সাফল্য মুঘল সাম্রাজ্যের ভিত বহুদূর নিয়ে যেতে সাহায্য করে।

মুঘল সাম্রাজ্যের রণনীতি নির্ধারণে মীর জুমলার প্রভাব বেশ বড় যেমন ছিল, তেমনি, দরবারি রাজনীতি আর প্যাঁচকষাকষিতে সক্রিয় উপস্থিতিও আমরা দেখতে পাই। দিল্লির রাজনীতিতে দারা দাক্ষিনাত্যের শিয়া সুলতানির স্বাতন্ত্রের পক্ষেই ছিলেন। সম্রাটের স্নেহধন্য শাহজাদার বিপক্ষে গিয়ে, আওরঙ্গজেবের সাম্রাজ্যবিস্তারের পরিকল্পনায় দাক্ষিণাত্যে শিয়া সুলতানিকে গ্রাস করার রাজনীতিটির নীতি প্রভাবিত করতে পেরেছিলেন সফলভাবে। মুঘল সাম্রাজ্যের বড় সময় কেটেছে উদারপন্থী দারা আর ধর্মপালক সাম্রাজ্যবাদী আওরঙ্গজেবের পরস্পর বিরোধী নীতিতে সামঞ্জস্য আনতে গিয়ে। শাহজাহানের নীতি প্রায়শই দুই শিবিরের নীতিই প্রতিপালন করত। দাক্ষিণাত্যের শান্তি প্রস্তাবে দরবারে প্রাথমিকভাবে দারার নীতিটি মান্যতা পায়। অথচ সাদুল্লা খানের মৃত্যুর পর, উজির পদে বৃত হন আওরঙ্গজেব ঘনিষ্ঠ সামরিকবাদী মীর জুমলা। দরবারে আগ্রাসী আওরঙ্গজেবের সাম্রাজ্যবাদী নীতি সাফল্য পেল, দারার শান্তি নীতির বিপক্ষে। অথচ ১৬৫৭-৫৮ সালে শাহজাহানের অনুমোদনে যে দাক্ষিণাত্যের বিজাপুরী অভযান শুরু হয়, সেটি দারার হস্তক্ষেপে হঠাতই বন্ধ করে দিতে হয়।
মীর জুমলার জীবন শুধু যে রাজনীতি বা কূটনৈতিক ইতিহাসের ছাত্রদের পাঠযোগ্য তাই নয়, এটি ভারতের অর্থনৈতিক ইতিহাসের পাঠ্যক্রমে প্রবেশেরও দাবি রাখে। কর্ণাটকের খনির উদ্যম তাকে কুড়ি মন হিরের মালিক করেছিল। কর্ণাটক এবং বাংলায় তার ব্যবসার মূল ভিত্তিটাই ছিল দৈনন্দিনের খাদ্য বস্ত্রের একচেটিয়া উদ্যম। পশ্চিম এশিয়া এবং দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার সমুদ্র বাণিজ্যের অন্যতম উদ্যমী ছিলেন তিনি। সেই যুগের অর্থনীতির ইতিহাসে তার ব্যবসা বিষয়ে আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ কেননা, তখন বিজয়নগর সাম্রাজ্য অস্তাচলে, পর্তুগিজ কোম্পানির উদ্যম ঢালের দিকে, আর এশিয় সমুদ্রগুলিতে ডাচ আর ব্রিটিশে কোম্পানি সবে ডানা মেলছে। দুই স্বজাতি, পর্তুগিজদের হাঠিয়ে দেওয়ার আগেই মীর জুমলা বিজয়নগরের সমুদ্র বাণিজ্যের বড় অংশ দখল করে প্রথমে ডাচেদের এবং পরে ব্রিটিশদের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠেন। ইওরোপিয়রা তার ক্ষমতাকে ভয় পেত কিন্তু সাহায্য নিতে ভোলে নি। এদের সঙ্গে পূর্ব উপকূলের বাণিজ্য সম্বন্ধ তার শেষ দিন পর্যন্ত বজায় ছিল।
(চলবে)

Saturday, February 4, 2017

বাংলা যখন বিশ্ব সেরা৮০ - লাইফ অব মীর জুমলা, জেনারেল অব আওরঙ্গজেব

জগদীশ নারায়ণ সরকার

৩। মীর জুমলার অসম অভিযানের তাৎপর্য, অহোমদের বিরুদ্ধে তার বিজয়ের কারণ
জীবনের শেষতম অভিযানটি মীর জুমলার সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। মুঘল সাম্রাজ্যের পক্ষে এটি তার প্রথম এবং শেষ অভিযান, যা মুঘল সাম্রাজ্যকে অসম সীমান্ত পর্যন্ত বাড়িয়ে দেবে। ইখতিয়ারুদ্দিন মহম্মদ ইবন বখতিয়ারের সময় থেকে মুসলমান শাসকেরা উত্তরপূর্বে মুঘলদের শাসন এলাকা বাড়াবার পরিকল্পনা করে চলেছিলেন, এটি সেই চেষ্টার ফলবতী রূপ। বাস্তবে রণনীতিগতভাবে এটি অসাধারণ এক যুদ্ধ অভিযান। দিল্লি মহম্মদ বিন তুঘলক এবং বাংলার হুসেন শাহ যেখানে চরম ব্যার্থ হয়েছেন সেখানে মীর জুমলা কিন্তু সফল হলেন। জাহাঙ্গীরের সময়ে মুঘল অভিযান প্রাথমিকভাবে সফল হলেও শেষ পর্যন্ত ব্যার্থই হয়েছিল। রাজার সঙ্গে শোলাগড়ের শান্তিচুক্তির দরকষাকষির সময় মীর জুমলা মন্তব্য করেছিলেন, রাজা যেন তাকে তার পূর্বের মুঘল বাহিনীর সেনানায়কদের মত না ভাবেন, তারা হেরে চলে গিয়েছিলেন, তিনি কিন্তু জিততেই এসেছেন। শিহাবুদ্দিন তালিশ লিখছেন, অতীতে কোন বিদেশি রাজা অসমের এত ভিতরে প্রবেশ করতে পারে নি, এবং কোন বিদেশি এই দেশ জিতিতেও পারে নি। মহম্মদ কাজিম লিখছেন, আসমের রাজারা আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে তাদের মাথা নোয়ায় নি, দেশের সব চেয়ে শক্তিশালী শাসককেও তারা রাজস্ব দেয় নি, তারা দেশের সব থেকে বড় সাম্রাজ্যবাদী শক্তির মাথা হেঁট করে দিয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে যে সব বিশ্ববিজেতা জিততে এসেছিল তারা সেই দেশে ঢুকে জেতার পথ হারিয়ে ফেলেছে।

মীর জুমলা মাত্র একমাসের মধ্যে মুঘল কামরূপ, আর ভীতিপ্রদ, দুর্বোধ্য অসম জয় করে ফেলেছিলেন আড়াই মাসেই। কোচবিহার থেকে অহোম রাজধানীতে পৌঁছনোই বিজয় যাত্রা ছিল। অহোম রাজা তার বাহিনী সমাধায় জড়ো করেছিলেন, সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষার গড়, এবং তার ধারণা ছিল অতীতে যে ঘটনা ঘটেছে, সেই ইতিহাস বর্তমান কালেও চক্রবত ঘুরবে একইভাবে। কিন্তু অতীতের অভিযাত্রীদের অসম জেতা স্বপ্নই থেকে গিয়েছিল, মীর জুমলা সেটিকে বাস্তবে রূপ দিয়েছিলেন। ডাচ শল্য চিকিৎসক জানাচ্ছেন, মীর জুমলার পরিকল্পনা এবং সৈন্য সাজানোর পরিকল্পনা এমন ছিল যে অসম জেতার পরে তিনি পেগু হয়ে চিনেও অভিযানের পরিকল্পনা করেফেলেছিলেন। সাম্রাজ্যের বাহিনী ছ মাসের জন্য বিচ্ছিন্ন হয়েছিল, তার জন্য তাকে চরম দুর্ভোগও পোয়াতে হয়েছে। মন্বন্তর, বন্যা বা মহামারী কোনটারই নিদান মীর জুমলার হাতে ছিল না। এটা বলা দরকার তার বাহিনী অহোমদের হাতে হারে নি। অহোম রাজারা এতই ভয় পেয়ে গিয়েছিল যে তারা দিল্লির শাসন মাথা পেতে নিয়েছিল, যা অতীতের কোন অসম রাজা করে নি। অসমের ইতিহাসে মীর জুমলার নাম বরাবরের জন্য লেখা থাকবে, বুরুঞ্জীতে তার পাকা স্থান তো হয়েই গিয়েছে।

তাদের পুরোনো সফলতায় অহোমেরা মনে করেছিল এবারেও তারা জিতবে। জমিদারদের থেকে মীর জুমলা দেশের সঠিক খবর পাবেন ভাবেন নি। অথচ প্রত্যেক যায়গায় অহমিয়াদের প্রতিরোধ তাসের ঘরের মত ভেঙ্গে পড়ে, পঞ্চতরন এবং সিমলাগড় ছাড়া তারা মুখোমুখি যুদ্ধে যায়ই নি, এবং যুদ্ধে তাদের বড় ক্ষয়ক্ষতিও হয় নি। যোগিগুপায় মহামারী ঘটে আর শ্রীঘাটে পিছনের সৈন্য আসায় দেরি হয়েগিয়েছিল বটে, কিন্তু অহোমেরা যদি বর্ষা আসার সময় পর্যন্ত কঠোরভাবে নিজেদের প্রতিরোধ বেঁধে রাখতে পারত তাহলে হয়ত তালিশ বলছেন মুঘলেরা একটাও দুর্গ দখল করতে পারত না।

অহোমদের প্রখ্যাতি তাদের শৌর্য আর রণকুশলতায়। তারা সারাক্ষণ নজরদারি করত। সেনানায়কদের মত তাদের দুর্গও কঠোর কঠিন পাথরে তৈরি। তাদের বিপুল বাহিনী ছিল, অর্থ ছিল এবং যুদ্ধ করার প্রচুর রসদও ছিল। সিমলাগড়ের মত কঠিন দুর্গও ছিল, অসম সাঁজোয়া বাহিনী আর তাদের বারুদের গুণমানও অত্যাশ্চর্য ছিল। তবে এগুলি সঠিক নেতৃত্ব ছাড়া একযোগ হলেও বাস্তবে কার্যকরী হয় না, যদি আদতে সেনানায়ক সেনানীদের মনে অতিরিক্ত জেদ চাপিয়ে দিতে পারেন। রাজা জয়ধ্বজের দোদুল্যমানতা, রাজধানীতে শত্রু আসার আগেই পালিয়ে যাওয়া, যার জন্য অসম বুরুঞ্জীতে তার (বদ)নামই হয়ে গেল ভাগানিয়া রাজা – কখনো মীর জুমলার মত নেতার প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারে না। প্রথম শিখ যুদ্ধ সম্বন্ধে কানিংহ্যাম যা বলেছেন, ঠিক সেই কথা ১৬৬১-৬২ সালের অহোমদের সম্বন্ধেও বলা যায়, বিদ্রোহীর হৃদয় ছিল, লড়াই করার হাজারো মানুষ ছিল, কিন্তু সবাইকে একসঙ্গে করে পথ দেখাবার মানুষটাই ছিল না।

কামরূপের বিভিন্ন শিবির থেকে পশ্চাদপসরণ কিন্তু অহোমদের উদ্দেশ্যপূর্ণ রণনীতি ছিল না। মানস থেকে গুয়াহাটি পর্যন্ত যেসব অহোম সেনানায়ক বিভিন্ন বাহিনীর দায়িত্বে ছিলেন, তাদের রাজার প্রতি অনাস্থা এবং শিবির বদলের জন্য রাজাকে বাধ্য হতে হয়েছিল পশ্চাদপসরনের সিদ্ধান্ত নিতে। মুঘল কামরূপে তাংচু সান্দিকৈওএর থেকে প্রচুর মালপত্র গুয়াহাটির মুঘল প্রশাসক দখল করেছে, এমন একটা খবর পেয়ে রাজা নিম্ন অসমের সেনা বাহিনীর জন্য একজন অনঅসমিয়া মনথির ভরালী বরুয়াকে অসম বাহিনীর সেনানায়ক এবং প্রশাসক নিযুক্ত করে। রাজার এই পদক্ষেপে অসমের প্রশাসন এবং সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে ৪০০ বছরের অসমিয়া নেতৃত্ব দেওয়ার ঐতিহ্যের ছেদ ঘটল। এক দুর্গ থেকে অন্য দুর্গের অহমিয়া সেনাধ্যক্ষরা প্রায় নিষ্ক্রিয় হয়ে গেল বা কোন রকম প্রতিরোধ দিলই না, তারা নাকি মন্তব্য করেছিল, বেজদলইরা এবার থেকে যুদ্ধ করুক। রাজার নিজের শ্বশুর রাজশাহুর বরফুকনই রাজার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে মুঘল বাহিনী যাতে অপ্রতিরোধ্যভাবে নওগাঁয় ঢুকতে পারে তার সুযোগ করে দিয়েছিল। রাজাকে ছেড়ে যাওয়া সেনানায়কেরা একে একে মুঘল বাহিনীর সঙ্গে জুড়ে গিয়ে লাখাউ এবং গড়গাঁওএর দিকে পথ দেখিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। এছাড়াও গ্রামগুলি দখল করার কাজে বা নির্দিষ্ট খবর দিয়ে নির্দিষ্ট কবর খুঁড়ে দামি ধনরত্ন উদ্ধারে সাহায্য করেছিল। অজানা ডাচ সেনানায়ক(এখন আমরা জানি তার নাম হেডেন - অনুবাদক) অহোমদের মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়ার তত্ত্বে খুব একটা গুরুত্ব দেন নি, তিনিও বলছেন, আমরা যখন শত্রুর রাজ্যে ঢুকলাম, অসাধারণ ত্রাস শত্রু পক্ষকে গ্রাস করল, এবং নবাবের ভাগ্য সুপ্রসন্ন করতে অহমিয়ারা আমাদের পাশে এসে দাঁড়াল। বলা দরকার তাদের রণনৈপুন্য আর ঐতিহ্যের সঙ্গে তাদের আত্মসমর্পন খাপ খায় না।

মীর জুমলা অসমের কৃষকদের ওপর সেনাবাহিনীর অত্যাচার না করতে দেওয়ার যে মানবিক অথচ রণনৈপুন্যের নীতি নিয়েছিলেন সেটি দুর্দান্ত কাজ দিয়েছিল, তিনি থানেদারদের স্থানীয় মানুষজনের সঙ্গে কথা বলে তাদের বিরোধিতা দূর করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। স্থানীয় প্রজারা বহু সময়ে অহমিয়া বিদ্রোহী সেনানায়কদের ধরিয়ে দিয়েছে। আর অহোমদের পোড়ামাটি নীতিতে যসে সব গ্রামবাসী গ্রাম থেকে পালিয়ে গিয়েছিলেন, তারা মুঘলদের প্রতিশ্রুতিতে ফিরে এসে ঘরদোর তৈরি করেছেন, নিজেদের জীবিকা ফিরে পেয়েছেন ফলে তারা মুঘলদের রসদ সংগ্রহে সহায়তা করেছেন। অসমের যুদ্ধ মানুষের যুদ্ধ হয়ে উঠতে পারে নি। গড়গাঁওএ থাকাকালীন মুসলমান প্রজাদের থেকে অহোমদের বহু গুপ্ত তথ্য পেয়েছেন মীর জুমলা।

দিলির খান দাউজাদির মত দৃঢবল বহু সেনানায়ক মীর জুমলার সেনা বাহিনীতে ছিলেন যারা জয় ছিনিয়ে নিয়ে এসেছিলেন প্রত্যেক যুদ্ধক্ষেত্র এবগ দুর্যোগ থেকে। ছিলেন ফারাদ খান, মহম্মদ বেগ, রশিদ খান, য়াগদার খান উজবেগ এবং তাদের বাহিনীর দৃঢ মনোভাবের সেনানীরা। মীর জুমলা তাদের ওপর যে প্রভাব বিস্তার করেছিলেন, তা অন্য কোন সেনানায়ক করে উঠতে পারেন নি। তার নেতৃত্ব, রণনীতি, শৃঙ্খলা, যুদ্ধের পরিকল্পনার সঙ্গে মন্বন্তর এবং মহামারী মোকাবিলা করার ক্ষমতা বাহিনীকে এক করে রেখেছিল। দুর্যোগের সময়ে ঠাণ্ডা মাথা, প্রজ্ঞা, প্রয়োজনের সময় প্রয়োজনীয় সাহায্য পাঠানো, ১৬৬২ সালের বর্ষার দুর্যোগে তার সেনা সংগঠনের উদ্যম তাকে এবং তার বাহিনীকে বহু দুর্যোগ থেকে বাঁচিয়েছিল এবং শেষে জয় দেখতে পেয়েছেন। তিনি অসম্ভবভাবে সুশৃঙ্খল – বর্ষায় যেমন তেমনি অসম ছেড়ে চলে আসার সময়েও। তার কঠোর মনোভাব বাদুলি ফুকনের মত অদম্য সেনা নায়ককে শিবির বদল করতে বাধ্য করেছিল।

বাদুলি ফুলন তার রাজাকে ছেড়ে এসে মীর জুমলার বাহিনীতে প্রবেশ করে ৩-৪ হাজার সেনা জোগাড় করে শোলাগুড়ি আর টিপামে মুঘলদের পথ দেখিয়ে নিয়ে গিয়েছেন। পূর্ব অসমের গড়গাঁও এবং নামরূপের মধ্যে এলাকার ডেকা-রাজা নামে অভিষিক্ত করেন মীর জুমলা। তিনি রাজা এবং অন্যান্য অমাত্যকে ধরে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন মীর জুমলাকে। এই পরিকল্পনাটা পথভ্রষ্ট হয়ে যায় অতন বরগোহাঁইর জন্য। বাদুলির নির্দেশে তার ভাই মাউপিয়া মেকুরিখোয়ায় নিজের দেশের বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন। বাদুলির পথ ধরে জগন্নাথ ডেকা, রঘুনাথ মজুমদার এবং পুত্র মনোহর, উদ্ধব দুরিয়া এবং ডাংধরা বা অন্যান্যরা শিবির পালটে তার দেশকে মুঘলদের হাতে তুলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন বাদুলিকে নবাব বানানোর শর্তে। মীর জুমলা সরাসরি উত্তর না দিয়ে বলেছিলেন, আমি যা চইছি সেটা পাওয়ার যথেষ্ট তথ্য-প্রমান পেলে আপনারা যা চাইছেন পাবেন। এমনকি মন্থির ভরালি বরুয়া মীর জুমলার বাহিনীতে যোগ দেন জয়ধ্বজকে ধরিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে।

তবে অস্বীকার করা যাবে না, মীর জুমলাকে এই জেতার জন্য প্রচুর মূল্য দিতে হয়েছিল। তার বাহিনী অভূতপূর্ব দুর্যোগের মধ্যে পড়েছিল। ১৬৬২ সালে তার দুর্যোগের কথা স্মরণ করে তালিশ লিখছেন, লোহাকে গ্রেফতার করা সোজা, জল নয়। এবং মীর জুমলার মৃত্যুতে সম্রাটের নতুন দেশ বিজয় বিস্বাদ হয়েগিয়েছিল। যার জন্য তাকে দোষ দেওয়া যায় না, কিন্তু তার কাছের ওয়াকিয়ানবিশ কিন্তু এই বিজয়ে চোনা ফেলে লিখলেন ফাতিয়াইইব্রিয়া(বিজয় পুস্তক, যার নাম হুঁশিয়ারি) নামক বই।

(চলবে)

Thursday, February 2, 2017

বাংলা যখন বিশ্ব সেরা৭৮ - লাইফ অব মীর জুমলা, জেনারেল অব আওরঙ্গজেব

জগদীশ নারায়ণ সরকার
চতুর্থ পর্ব

১। মীর জুমলার নতুন করে আক্রমন
অভিযানের মাঝামাঝি সময়ে(২০ সেপ্টেম্বর ১৬৬২) যে দুর্যোগের ঘনঘটা ছেয়ে গিয়েছিল মীর জুমলার বাহিনীর ওপর সেটা পুরপুরিই কেটে গেল। দেখতে দেখতে বর্ষা চলে গেল, বন্যার জল নেমে গেল, রাস্তা নতুন করে সারাই করা হল এবং খবরাখবর আদান প্রদান হতে লাগল। দেবলগাঁও থানা তৈরি হবার পর মীর জুমলা গড়গাঁওএর সঙ্গে লাখাউএর সংযোগ তৈরির কাজটি সম্পন্ন করতে উদ্যোগী হলেন। ২৫ সেপ্টেম্বর আবুল হাসান সাইরাং এবং দেবলগাঁওএর দিকে এগোলেন দিখুর তীরে গোলাকার পাড় ঘুরলেন। অহোম পথ প্রদর্শকদের সঙ্গে নিয়ে তিনি অহোম বিদ্রোহীদের দমন করলেন গাজি খানের নেতৃত্বে সাইরাং, গজপুরে সৈয়দ আহমেদ জামাতদারের নেতৃত্বে থানা তৈরি করলেন। দেবলগাঁওতে ঢুকে তিনি তার বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করলেন। অসমের অবস্থা বর্ণনা করে সম্রাটের উদ্দেশ্যে এবং ঢাকার উদ্দেশ্যে লেখা মীর জুমলার চিঠি, দরঙ্গের রানী-ডোগারের উদ্দেশ্যে পরওয়ানা, গুয়াহাটির মুঘল ফৌজদারকে, এবং কালিয়াবরের থানাকে দেওয়ার উদ্দেশ্যে চিঠিগুলি পাঠানোর জন্য দেওয়া হল। খুব তাড়াতাড়ি ইস্তিয়াখ খানকে অসমের সুবাদার, রশিদ খানকে কামরূপের ফৌজদার করার পাদশাহের ফরমানটি পৌঁছল। প্রত্যেকেই তাদের পদ নিতে অস্বীকার করেন। যেহেতু নদী পথ তখনও সুরক্ষিত নয়, তাই নৌসেনাধ্যক্ষ্যের মার্ফত দেবলগাঁও এবং তার পরে গড়গাঁও পর্যন্ত ভূমিপথে বাহকদের সাহায্যে ব্যাপারীদের রসদ এবং পশু পাঠানো হল। সেগুলি গড়গাঁওতে পৌঁছল ২৪ অক্টোবর। আবুল হাসানের নৌবহরে করে কিছু রসদ সেখানে পৌঁছল ৩১ তারিখ। ‘দীর্ঘ দিন পরে সাম্রাজ্যের বাহিনীর প্রত্যেকের প্রত্যেকটি চাহিদা পূর্ণ হল’।

২। টিপামের উদ্দেশ্যে মীর জুমলার পভিযান
মাঠঘাট শুকনো হয়ে যাওয়ায় মুঘল সেনাবাহিনী পুরোন আমলের মত অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠল। অহোম রাজা আগের মত নামরূপের পাহাড়ে চলে গিয়েছিলেন। বাদুলি ফুকন দুদিক রেখে তার ঘুটি সাজাতে লাগল। একদিকে তিনি এবং গড়গাঁওনি ফুকন দিল্লি নদীর তীরে বাঁধ চওড়া আর জোরদার করছেন, অন্যদিকে মীর মুর্তাজা মার্ফত মীর জুমলার কাছে শান্তিবার্তাও পাঠালেন। কিন্তু মীর জুমলা অহোমদের শর্তহীন আত্মসমর্পন চান আর যতক্ষণ না ফুকনেরা তার জন্য অপেক্ষা করবে ততক্ষণ তিনি কোন শান্তিচুক্তি মান্য করবেন না। গড়গাঁওএর ২০ মাইল উত্তরপূর্বে দুদিক থেকে বাদুলি ফুকনের শিবির আক্রমন করার পরিকল্পনা নিলেন। আবুল হুসেইন ১০ নভেম্বর দিল্লির দিকে নদী বাহিত হয়ে পিছন দিক থেকে গেল আর মীর জুমলা নিজে ১৬ নভেম্বর দান্দগা এবং দিল্লি নদি হেঁটে পেরোলেন। বাদুলি ফুকন তার বিশাল এবং সুরক্ষিত গড় ছেড়ে পালিয়ে গেলেন।

২০ নভেম্বর মীর জুমলা দিহিঙ্গে পোঁছে দেখলেন বুড়াগোহাঁই সুরক্ষিত দুর্গ ছেড়ে বরকটে পালিয়ে গিয়েছেন। দক্ষিণে টাওকাক, উত্তরে দিহিং পশ্চিমে শোলাগুড়ি এলাকা নিয়ন্ত্রণ করা সেনানায়ক মীর জুমলার নাম শুনেই পালিয়ে গেলেন।
বহুকাল ধরে অসমজুড়ে অভিযান, মন্বন্তর-মহামারী এবং বিপ্রতীপ পরিবেশ মীর জুমলার শ্রীরের ওপর কামড় বসাতে শুরু করল। যে রোগে তিনি মারা যাবেন সেই রোগটি তাকে আক্রমন করল। শত্রুর পরিখা দেখার সময় ঘোড়া থেকে তিনি অচেতন হয়ে মাটিতে পড়ে গেলেন। যতক্ষণনা তার বিছানা তৈরি হল ততক্ষণ তিনি অজ্ঞান ছিলেন। দিলির খান কোলে তার মাথা নিয়ে বসে রইলেন। শিহাবুদ্দিন তালিশ দশ দিন পরে দেখতে এলেন।

৩০ নভেম্বর রাজার দ্বিচারিতা অনুভব করে বাদুলি ফুকন শিল্লিখাটোলে মীর জুমলার সঙ্গে তিন ভাইকে সঙ্গে নিয়ে দেখা করতে এসে রাজাকে ধরিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেন। মীর জুমলা তাকে ডেকা রাজা(ছোট রাজা) উপাধি দিলেন। পূর্ব অসমের মুঘল প্রশাসনিক প্রধান হওয়ায় গড়গাঁও থেকে নামরূপ পর্যন্ত গ্রাম এবং শহরের এবং ত্রিমোহনী পর্যন্ত পথ এবং জলসীমায় দায়িত্ব পেলেন ফুকন।
দলত্যাগী ফুকনের পথ দেখানোয় অসুস্থতা সত্ত্বেও মীর জুমলা এগিয়ে চললেন। ২ ডিসেম্বর দরবেশ বেগকে দায়িত্ব দিলেন অহোমদের তাড়িয়ে নিয়ে এসে তাদের শোয়ালগুড়ির হাতিগুলি দখল করার। ৬ তারিখে তিনি নামরূপের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে পরের দিন তিনি শোয়ালগুড়ি পৌঁছলেন। ৮ তারিখে শোয়ালগুড়ি নদী পেরিয়ে দরবেশ বাগ এবং বাদুলি ফুকনকে নিয়ে চললেন।

১০ ডিসেম্বর অসুস্থ হওয়ার এই প্রথম তিনি ধারাস্নান করলেন এবং পরিপূর্ণ খাওয়ার খেলেন, অথচ পাকস্থলীতে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব করতে লাগলেন। রাতে ধুম জ্বর আর বুকে ব্যথা হতে লাগল। গিলানের ডাক্তার কারিমা তার চিকিতসা করাতে অস্বস্তি কিছুটা লাঘব হল। কিন্তু রক্ত পরীক্ষা করতে দিতে আস্বীকার করলেন রোগী। দুই বা তিন দিন পরে প্লুরিসি(ফুসফুসের রোগ) দেখা দিল।
তবুও মীর জুমলা বাদুলি ফুকনের সাহায্যে রাজাকে ধরতে বদ্ধপরিকর। কিন্তু নেতার অসুস্থতায় মনভেঙ্গে যাওয়া মুঘল বাহিনী নামরূপ ঢুকতে অস্বীকার করল। এলাকা দেখে তাদের ধারণা হল সেখানে বাহিনীর সব কিছু হারিয়ে যাবে – এই এলাকার বাতাসে মৃত্যু আছে, এখানে জলস্থল বাহিত হয়ে কোন রসদ এসে পৌঁছবে না, যখন শুনল এখানে জানুয়ারির শুরুতেই বর্ষা আসে, অনদূর অতীতে মন্বন্তর-মহামারী থেকে ভুগে ওঠার, খালি পেট থাকার স্মৃতি, সাথী হারানোর স্মৃতি তখনও জ্বলজ্বল করচ্ছে প্রত্যেক সেনার মনে। নামরূপের পাহাড়ি এলাকার উঁচু পথ দেখে তাদের মনে হল, রাজাকে গ্রেপ্তার করার চেষ্টার জেদে যদি তারা এই রাস্তায় ঢোকে, তাহলে হয়ত তাদের বেরিয়ে যাবার কোন পথ থাকবে না, রাজার বাহিনী তাদের চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলে কচুকাটা করবে। দিহিং পেরোনোর সময়েই সাধারণ এবং সেনাপতিরা তাদের নেতাকে ছেড়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছিল। দিলির খান তাদের শান্ত রেখে মহম্মদ বেগকে দিয়ে মীর জুমলাকে অবস্থা জানাতে খবর পাঠান।

সেনার দোদুল্যমান মনোভাবে মীর জুমলা আশ্চর্য হয়ে গেলেন। শারীরিক অবস্থা আরও খারাপ হতে থাকল। ১৫ ডিসেম্বর যখন একটা পালকিতে তোলা হল তাঁকে তার চেহারা খুবই ভেঙ্গে পড়েছে এবং চোখে মুখে আশংকার অন্ধকার। ১৮ তারিখে মানরূপের গিরিপথের মুখের গ্রাম টিপামে শিবির ফেললেন দিহিঙ্গের অন্যান্য এলাকার সুরক্ষা মিয়ানা খানের দায়িত্বে দিলেন।

৩। শান্তির দিকে
টিপাম মীর জুমলার অসম অভিযানের যেমন শেষ বিন্দু, তেমনি এটি তার পিছিয়ে আসারও এলাকা। শান্তিচুক্তির দরকষাকষি শুরু হল। দুপক্ষই শান্তি চায়। অহোমদের দিক থেকে তাদের এলাকা বিদেশিদের কবলে গিয়েছে এবং তাদের রাজা – স্বর্গদেওকে সেই বাহিনী রাজধানী চ্যুত করেছে। ছোটখাট লড়াই দিয়ে তাদের জাতীয় অবমাননার বিচার করা যাবে না। শত্রুর হাত থেকে দেশকে উদ্ধারের ক্ষেত্রে অহোমদের কাছে কোন মূল্যই যথেষ্ট নয়। আপাতত পেশকাশ বা রাজস্ব দেওয়ার শর্তে একজটা কার্যকরী শান্তিচুক্তিতে উপনীত হতে তারা তীব্রভাবে আগ্রহী। আভ্যন্তরীণ উদ্গীরণ বা কোন বহিঃপ্রভাব যুক্ত অবস্থার পরিবর্তনের বাহানায় আগামী দিনে সেই চুক্তি উল্লঙ্ঘন করা যেতে পারে। অহোমেরা নিশ্চিত ছিল মুঘলদের সঙ্গে আরও বেশি দিন লড়াই চললে আসমের দুর্গতি আরও বাড়বে, এই বার্তা নিয়ে প্রধান সেনাপতি আতন বুড়াগোঁহাই রাজার প্রবাস প্রাসাদে দেখা করে তাকে চাঙ্গা করার চেষ্টা করেন, বর্তমান অবস্থার অনুকূল প্রতিকূলতা বোঝা, এবং শেষ পর্যন্ত শান্তিচুক্তিতে রাজাকে রাজি করান। বাদুলি ফুকন এবং অন্য অভিজাত অহোমের শিবির ত্যাগ রাজাকে চিন্তায় রেখেছিল। যে সেনাপতি না হারতে এবং শেষ দেখতে দৃঢপ্রতিজ্ঞ, তার বিরুদ্ধে বেশিদিন লড়াই চালানো যাবে না বুঝেই রাজা আর তার ফুকনেরা দেশকে বাঁচাতে শান্তিকেই একমাত্র হাতিয়ার রূপে বেছে নেন, এবং মীর জুমলার উদ্দেশ্যে দূত এবং উপহারের ডালি পাঠানো শুরু করেন।

কিন্তু অহোমদের শান্তির দেখনদারির চেষ্টা মীর জুমলা বাতিল করে দিলেন(৩০ নভেম্বর)। দিন পনেরো পরে এক গুরুত্বপূর্ণ অহোম দূত দিলির খানকে রাজি করিয়ে ফেলেন মীর জুমলাকে বোঝানোর দায় নিতে। বাস্তবে সেনাপতি সব থেকে অবাঞ্ছনীয় অবস্থায় পড়ে রয়েছেন। তিনি বুঝে গিয়েছেন, মুঘল সেনাবাহিনীর অসম বিজয়েও শান্তিপূর্ণ সরকার গঠন অসম্ভব। জনগনের সাহায্যে বিদ্রোহীরা সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়াবেই যতই মুঘলেরা প্রজাদের স্বার্থে কাজ করুক। সেনা শাসিত সরকার তৈরি করা অবাস্তব এবং সেটা তার মনের কোণেও ঠাঁই পায় নি। অথচ এই বিদেশে তার একমাত্র সম্বল সেনাবাহিনীই। দুর্দশার চরমে পৌঁছে গিয়ে সেনারা দেশে জয়ের সংবাদ নিয়ে ফিরতে চায় – এবং তারা বিদ্রোহের মুখে দাঁড়িয়ে। নিজের রোগ, নিজের স্বাস্থ্য ভেঙ্গে পড়া, শান্তিচুক্তি বাতিলের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া এবং মুসলমান যুদ্ধ বন্দীদের অবস্থা আন্দাজ করে অনিচ্ছা সত্ত্বেও মীর জুমলা শান্তিচুক্তিতে রাজি হতে বাধ্য হন। বাস্তবিক অবস্থা, তাকে বাধ্য করেছে শান্তিচুক্তিতে উপনীত হতে এবং এটাই এখানকার সক্কলের জন্য সব থেকে চাহিদাপূর্ণ সমাধান বলে তার মনে হল। রোগ শয্যায় শুয়ে থেকেও তিনি হারের মুখ নয়, কঠোরতাপূর্ণ মনোভাবে নির্দেশ দিলেন মুঘল বাহিনী আরও এগোতে চায় কিন্তু টিপামে শান্তিচুক্তির দরকষাকষি শুরু হোক। তার দূত রাজা ভোর মল রাজার দূত ফুকনদের মীর জুমলার মনোভাব জানিয়ে দিলেন। দিলির খানের মধ্যস্থতায় ঘিলাঝরি ঘাট, টিপামের চুক্তি সম্পন্ন হল ৯ মাঘ ১৫৮৫ শক, ২৩ জানুয়ারি, ১৬৬৩তে।

মীর জুমলা এই চুক্তির মাধ্যমে সম্মানের শান্তি দাবি করতে পারলেন। প্রাথমিকভাবে সম্রাটের সম্মান উঁচুতে থাকল এবং অহোম রাজাকেই মাথা নোয়াতে হল। সম্রাটের অধীনস্থ হয়ে জয়ধ্বজ রাজ্য চালাবার অনুমতি পেলেন। এর জন্য গুয়াহাটির মুঘল দরবারে একজন দূত এবং পাইক বাহিনী পাঠানোর শর্তে রাজি হলেন। উপযুক্ত উপঢৌকন সহ তার এক কন্যা এবং টিপামের রাজার পুত্রকে দরবারে পাঠাবার শর্তে রাজি হলেন।

দ্বিতীয়ত, যুদ্ধের বিপুল ক্ষতিপূরণ রাজার থেকে চাওয়া হল – তাকে সেই মুহূর্তে দিতে হবে ২০ হাজার তোলা সোনা, ১,২০,০০০ তোলার রূপো(রূপিয়া), ২০টি সুসজ্জিত হাতি। পরের বছর থেকে বছরে ৩ লাখ রৌপ্য(রূপিয়া), বছরে তিনবার ৯০টা হাতি। তৃতীয়ত অসম রাজ্যের চারটি বড় স্তম্ভ বুড়াগোঁহাই, বরগোঁহাই, গড়গাঁওনিয়া ফুকন(রাজসুয়ার রাজমন্ত্রী) এবং বড়পাত্র ফুকনদের একজন করে পুত্রকে দিল্লিতে জামিন হিসেবে রাখা হবে যতক্ষণনা এই ক্ষতিপূরনটির কিস্তিগুলি মুঘলদের হাতে এসে না পোঁছাচ্ছে। চতুর্থত রাজা গুয়াহাটিতে বছরে ২০টা করে হাতি উপঢৌকন হিসেবে পাঠাবে। পঞ্চমত মুঘলদের অসমের আধিকার পূর্ব দিকে বাড়বে, রাজাকে তার রাজ্যের প্রায় অর্ধেক মুঘলদের দিতে হল – উত্তরাকোলে দরং - হাতি সমৃদ্ধ, নাকটি রানী, গারো পাহাড়, বেলতলা এবং ডিমারুয়া(বা দক্ষণকোলের ডুমারিয়া পরগণা) এলাকা। পূর্ব দিকে মুঘলদের সীমান্ত মানস থেকে বেড়ে ভরালী পর্যন্ত গেল, এবং উত্তরে কলং নদী দক্ষিণে ব্রহ্মপুত্রের দক্ষিণ পাড়। কামরূপের মুঘল এলাকার যুদ্ধ বন্দীসহ, গ্রেপ্তার হওয়া বাদুলি ফুকনের পরিবারকে মুক্তি দিতে সম্মত হল।

আওরঙ্গজেবকে জয়ধ্বজের আত্মসমর্পনের চিঠিটি মীর জুমলা পাঠালেন দরবারে। চুক্তি অনুমোদন এবং স্বাক্ষর করে পাদশাহ মীর জুমলাকে যথাবিহিত উপহার দিলেন।

তবে চুক্তিতে যে সব ধারার বা শর্তের কথা বলা হয়েছিল সেগুলির সব কটি রূপায়ণ হওয়া সম্ভবপর হবে না তা বোঝা গেল। মীর জুমলা অসমে থাকালীনই জামিনদার, কিস্তির পরিমান সহ হাতির সংখ্যা, সীমান্ত নিরূপন, মীর জুমলার বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হওয়া যুদ্ধবন্দী আহোমদের ছেড়ে দেওয়া ইত্যাদি নিয়ে বিরোধ বাধল। ১৬৬৩ সালের ৫ জানুয়ারি রাজা, রাজকন্যা, চাহিদামত ৩০০০০ তোলা সোনা, ৪০০০০ তোলা রূপো, ১০টা হাতি মুঘল শিবিরে পৌঁছে দিলেন। তখনও মীর জুমলা লাখাউতে পৌঁছন নি। কিন্তু মীর জুমলা জামিনদারদের হাতে নিতে ইচ্ছুক। অহোমেরা বুড়াগোঁহাইয়ের ছেলের যায়গায় ভাইপোকে পাঠাল। মীর জুমলার কঠোর দাবিতে একজন গুটিবসন্তে ভোগা ছেলে পাঠানো হল, মীর জুমলা বুড়াগোঁহাইএর অন্য সন্তান(রাজার বোনের পুত্র) দাবি করলেন। কিন্তু সে কিছুদিন আগেই মারা গিয়েছে। মীর জুমলা তখন বরফুকনের (রাজার আর এক বোনের) দুই সন্তান দাবি করলেন। কিন্তু দিলির খান এবং রাজা ভুর মলের চাপ সত্ত্বেও ফুকনেরা এই দাবি মানতে রাজি নয়, চুক্তিতে নেই যুক্তিতে। মীর জুমলার মনে হল দিলির খান যদি আরও বেশি চাপ দিতেন তা হলে হয়ত হাতবদলটা হয়েই যেত। দিলির খান নিজে সেনাপতির ঘরে এসে তার মনের বিরুদ্ধতা দূর করার চেষ্টা করলেন।
(চলবে)

বাংলা যখন বিশ্ব সেরা৭৭ - লাইফ অব মীর জুমলা, জেনারেল অব আওরঙ্গজেব

জগদীশ নারায়ণ সরকার

৪। গড়গাঁও ধরে রাখার লড়াই
বাদুলি ফুকন এবারে গড়গাঁও অবরোধের পথে হাঁটলেন। এই শিবিরে মীর জুমলা উপস্থিত না থাকলেও, এখানে সাম্রাজ্যের সম্পত্তি, রসদ, পশু, গোলাবারুদ এবং কিছু যুদ্ধ নৌকোও রয়েছে, তাই এই শিবিরের নিরাপত্তা আঁটসাঁট করে রেখেছেন তিনি। ১৪ জুন তিনি ফারহাদ খানের নেতৃত্বে একটি বাহিনী পাঠালেন মীর মুর্তাজার নিরাপত্তাকে জোরদার করার জন্য। ১৬টি জলবা আর ১৮ খাসাকে তৈরি রাখা হল, বাগানের পশ্চিমে শত্রুর কাটা পরিখা বোজানো হল, শহরের উত্তরপশ্চিম প্রান্তে দিখুর তীর পর্যন্ত বাঁশের কেল্লা তৈরি হল, বিভিন্ন দিকে প্রয়োজনীয় টহলদার মোতায়েন করা হল। অসমের চাচনি গ্রাম থেকে মুসলমান বন্দুকবাজ দিয়ে উত্তরের দিকে নিরাপত্তা বিধান করা হল।

রাজধানীতে পরপর কয়েকটি রাত জুড়ে আক্রমন চালিয়ে গেল অহোমেরা। ৮ জুলাই, উত্তরের বাঁশের বেড়ার পিছনে নিরাপত্তায় বাকসারিয়া বন্দুকবাজদের খতম করে দুর্গের অর্ধেকটা দখল করে নিল তারা। দুর্গের ভিতর থেকে প্রবল প্রতিরোধ হওয়ায় এই আঘাত সামলে নিল মুঘলেরা। তার ভুল বুঝতে পেরে পরের দিন বাঁশের দেওয়ালের বদলে মাটির দেওয়ালের প্রতিরোধ গড়লেন সেনাপতি। এক হপ্তার মধ্যে কয়েকটি বুরুজ দিয়ে একটি বিশাল চওড়া দেওয়াল তৈরি হয়ে গেল। গড়গাঁওএর নিরাপত্তা বিধানে মীর জুমলা এই দেওয়ালের খুব প্রশংসা করেছিলেন। অহোমদের রাতের আক্রমন চলতেই থাকল, কিন্তু যুদ্ধে আসত অসুস্থ ফারহাদ সারা রাত নিজে পাহারায় থাকলেন। মীর জুমলা অহোম বন্দুকবাজদের থেকে ডাঙ্গা নালার মুখের সেতু পাহারা দেওয়ার জন্য প্রত্যেক রাতে ২০০জনের বাহিনী নিয়োগ করেছিলেন, তারা নিজের সুখ স্বাচ্ছন্দ্য না দেখে গোটা রাজধানীর নিরাপত্তায় নজর রাখত। তারা সারা রাত জেগে থেকে ভোরে মথুরাপুরে ফিরে যেত।

ফরহাদ মীর জুমলার আস্থার পরিপূর্ণ প্রতিদান দিলেন। ১২ তারিখ রাতে চারদিক থেকে চারটি বাহিনী রাজধানী আক্রমন করায় ফারহাদের রণিনীতিতেই বেঁচেছিল সৈয়দ সালারের দারিয়াবাদী বাহিনী গণহত্যার হাত থেকে। তিনি শহরের মাঝে দাঁড়িয়ে যুদ্ধের জন্য প্রয়োজনীয় রদস মুহুর্মুহু চার দিকে পাঠাবার ব্যবস্থা করছিলেন। শিহাবুদ্দিন তালিশ লিখছেন, একমাত্র তার বাহিনীরই পরাক্রমে উত্তরপশ্চিমে আহোমদের আক্রমন থেকে শহরটি বেঁচেছিল।
গড়গাঁওএর ভবিষ্যৎ চিন্তা করে উদ্বিগ্ন মীর জুমলা রাতদিন ‘দূরের গোলমালের দিকে কান খাড়া’ করে রেখেছিলেন। সুউচ্চ কাঠের মিনারে দাঁড়িয়ে গড়গাঁওতে আগুণ দেখা যাচ্ছে কিনা তার নিরাপত্তা কর্মীরা লক্ষ্য রাখতেন। শাহাবুদ্দিন তালিশকে তিনি বলেছিলেন, ‘সকালের নামাজের পরে সবাইকে ধন্যবাদ দিয়ে আমি পাতা কার্পেটের ওপরেই ঘুমোতাম। সেখানেই আমার সারা রাত দিন কাটত।’

১৫, ১৬, ১৮ জুলাই অহোমিয়ারা নতুন করে আক্রমন শানাল। কিন্তু গড়ের নিরাপত্তা ভাঙতে পারল না। অসুস্থ, আহত ফারহাদের জায়গায় মীর জুমলা রশিদ খানকে দায়িত্বে দিলেন। গড়গাঁওএর চারপাশের কাটা পরিখাগুলি, বিশেষ করে কাকুজানের(২৩ জুলাই) রশিদ খান নিজে ঝটিকা আক্রমন করে বুজিয়ে দিলেন তাঁর পরাক্রম অহোমদের। দিল্লি নদীর পাশে কাটা পরিখা থেকে নিজেদের সরিয়ে নিল অহোমবাহিনী এবং দাঙ্গা নদী পেরিয়ে চলেও গেল। বহুকাল পরে গড়গাঁওতে শান্তি ফিরে এল।

রণঅক্লান্ত ফুকন তার ব্যার্থতাগুলি বুঝতে পারলেন। রাতের আক্রমন, রসদের ওপর আঘাত বা মুঘল শিবিরের ওপর আক্রমনেও মুঘল বাহিনীর সেনাপতির মনোবলে চিড় ধরল না। হয় নিজের উদ্যোগে বা রাজার নির্দেশে ফুকন শান্তি প্রস্তাব দিলেন(জুন-জুলাই) দিলির খানের মধ্যস্থতায়। মীর জুমলা খুব কিছু কঠিন শর্ত দিলেন, যাতে তাকে অহোমেরা দুর্বল না ভাবে - রাজাকে প্রথম দাঁত কাটা ৫০০ হাতি দিতে হবে, ৩০ লাখ তোলা সোনা আর রূপো দিতে হবে, রাজার মেয়েকে সম্রাটের হারেমে পাঠাতে হবে, প্রথম দাঁত ওঠা ৫০টা মদ্দা যুদ্ধ হাতি বার্ষিক উপহার হিসেবে দিতে হবে, এবং রাজা শুধু নামরূপ এবং তার আশেপাশের পাহাড়গুলি দখল রাখতে পারবেন। মীর জুমলার দূত খ্বাজা ভুর মলকে ফুকনকে জানালেন তিনি মুঘল বাহিনিতে যোগ দিতে ইচ্ছুক যদি রাজা এই শান্তি প্রস্তাব না মানেন। মীর জুমলা মথুরাপুর থেকে বড়গাঁওএর দিকে রওনা হলেন ১৭ আগস্ট মহামারীর আশংকায়। অহোমেরা শান্তিশর্ত বাতিল করল।

৫। মথুরাপুর আর গড়গাঁওএর মুঘল শিবিরে মহামারী এবং মন্বন্তরের প্রকোপ
আগস্টে মথুরাপুরে মহামারী আক্রমন করল মুঘল শিবিরে। এবং সেটি অহোমদেরও ছাড় দিন না। মীর জুমলার ভাইপো সহ দুইতৃতীয়াংশ সেনা মারা গেল। অহোমদের প্রায় ২৩ লক্ষ লোক মারা গেল। মৃতদের ঠিকভাবে পোড়ানো বা কবর দেওয়াও গেল না। ব্রহ্মপুত্রর জলে হাজারে হাজারে মৃতদেহ ভাসতে লাগল এবং জল অপেয় দূষিত হয়ে গেল, লাখাউএর মুঘল সেনাকে ফুটিয়ে সেই জল খেতে হত।

মীর জুমলার পক্ষে শিবিরে মজুদ চাল বা অন্যান্য রসদ না নিয়ে মহামারীতে ভোগা শিবির ছেড়ে যাওয়া মুশকিল। কিন্তু গতায়াতের অসুবিধের জন্য সেগুলি নিয়ে যাওয়া যাবে না। কিন্তু মহামারীর সঙ্গে শুরু হল খাবারের অপ্রতুলতা। ১৭৩টা ধানের গোলার মধ্যে মাত্র ১৬টা বন্যার জলের বা শত্রুর লুঠের থেকে বাঁচানো গিয়েছিল। এর মধ্যে ৬টা পশুদের জন্য আর ১০টা মানুষের জন্য বরাদ্দ করে দিলেন মীর জুমলা। লাল, মোটা চাল খেতে হল সক্কলকে। প্রথমের দিকে গরুর মাংস জলে ফুটিয়ে খাওয়া, তার পরে লুঠ করা ষাঁড়গুলির চর্বিতে গরুর মাংস ফুটিয়ে, তার পরে ঘোড়ার, উট এবং হাতির মাংস খাওয়া শুরু হল। দৈনন্দিনের চাল, লাল, তেল, ঘি, মিষ্টি, আফিম, তামাক বা নুনের উভাব দিনের পর দিন বাড়তে বাড়তে শিবিরের সেনারা পাগলপারা হতে থাকে। ঘি বিক্রি হতে থাকল ১৪টাকা সের, ছোলার দাম উঠল ১টাকা সের। আফিমের তোলার দাম উঠল ১টি সোনার মোহর, এক ছিলিম তামাকের দাম উঠল ৩টাকা, মুগডাল আর নুন পাওয়া যেত একযোগে ১০টাকা সের। মহম্মদ বেগ মীর বক্সী যাদের তামাক অতি প্রয়োজন সেনাদের দিয়ে দিলেন, নিজের আফিম খাওয়ার মাত্রা কমিয়ে দিলেন।

মথুরাপুরে জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠল। ১৭ আগস্ট সন্ধ্যায় প্রাসাদে নামাজ সেরে বিপুল বর্ষার মধ্যে শিবির ছেড়ে পরের দিন ভোরে গড়গাঁও পোঁছলেন মীর জুমলা। কয়েকটি সাঁজোয়া গাড়ি রাস্তায় কাদায় আটকে রয়ে গেল। দিলির খান সেগুলি উদ্ধার করে ১৮ তারিখ সন্ধ্যায় নিয়ে আসেন। নির্দেশ সত্ত্বেও গুদামের তিন চতুর্থাংশ ধান নিয়ে আসা গেল না। বহু অসুস্থ সেনাও শিবিরে ছেড়ে আসতে।
কোন সাফল্য ছাড়া অহোমদের গড়গাঁওতে রাতের আক্রমন চলতে থাকে। মীর জুমলা তার সেনানায়ককে ঠিক সময় সৈন্য পাঠাতে পারেন। ১৫ সেপ্টেম্বর চাঁদনি রাতের আক্রমনে আবুল হাসান এবং রাজা সুজন সিং আহোমদের এমনভাবে পর্যুদস্ত করে যে তারা আর তার পরে আক্রমন শানাবার কথা ভাবে নি।
মারী আক্রান্ত মথুরাপরের উদ্বাস্তুরা গড়গাঁও এসে পৌঁছলে, মন্বন্তর আর মহামারী একসঙ্গে আক্রমন করে মুঘল বাহিনীকে। বমি আর দাস্ত একসঙ্গে চলতে লাগল... শরীর জলশূন্য হয়ে গেল...মরণ যেন ধন্বন্তরী...তার কোলে টেনে নেয়...লাল মোটা চাল আর গাছের লাল পাকা লেবু ছাড়া সব ধরণের খাদ্যদ্রব্যের অভাব ঘটতে লগল...লালচালের ভাত খেলেই কম্প দিয়ে জ্বর আসতে লাগল...। গরীবেরা গাছের পাতা মাঠের ঘাস বা নদীর ধারের শাকপাতা খেতে লাগল। তার জন্য বরাদ্দ মীর জুমলা দিয়ে দিলেন সৈন্যদের। ঐতিহাসিক মহম্মদ মুনিম তাব্রেজি, অসুস্থদের শুশ্রূষা করতে করতে মারা গেলেন।

৬। অসমে মুঘল নৌবহর
দুর্দশার মাসগুলোয় মুঘল নৌবাহিনী নিজেদের বাঁচিয়ে রাখে এবং সেনাদের সাহায্যও করে। বর্ষায় মীর জুমলার থেকে সংযোগ চ্ছিন্ন হয়ে গেলেও লাখাউতে নৌবাহিনী প্রধান ইবন হুসেন তার সৈন্যদের মানসিকতা উত্তেজকর বক্তৃতা দিয়ে উঁচু তারে ধরে রেখেছিলেন। আলি বেগের নেতৃত্বে একটি নৌবহর গজপুরে পাঠানো হয়। কিন্তু জলের টানে বাঁশবাড়ি (দেওলগাঁও আর গজপুরের মাঝে) পর্যন্ত ফিরে আসতে হয়। সেখানে যোগ দেন মুনাবার খান। তারা তামুলি দলাইএর থেকে দুটি জাহাজ উদ্ধার করে লাখাউতে ফিরে আসে। আলি বেগ অন্য একটা অচেনা জলপথে গড়গাঁওতে মীর জুমলার সঙ্গে মিলিতে যাবার কথা ভাবলেও সেই পরিকল্পনা দেওলগাঁওএর থানেদার য়াদগার খান বাতিল করায়।

লাখাউ ছিল মন ভেঙ্গে যাওয়া মুঘলদের শেষ ভরসাস্থল। মীর জুমলা নৌসেনাকে বার্তা পাঠালেন যে সেনাদের জন্য আলাদা করে না ভেবে তাদের জন্য যেন তারা রসদ পাঠাব্র ব্যবস্থা করে। এবং কালিয়াবর, সমধারা এবং দেবলগাঁও থেকে বাহিনী নিয়ে লাখাউতে জড়ো করার নির্দেশ দেন।

৭ জুলাই ইবন হুসেন মীর জুমলাকে নৌ বহরের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত না হওয়ার কথা বলেন। কিন্তু সমধারা আর কালিয়াবরের থানা তুলে নেওয়ার প্রতিবাদ জানায়, তার ফলে বাংলার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে। তবে তিনি দেবলগাঁওএর থানা তুলে নেন কেননা এটি দখল করতে মাজুলি থেকে ভিটারুল ফুকন এগোচ্ছিলেন। তিনি বাঁশের কেল্লা পরিখা তৈরি করে ফুকনের রাত আক্রমণের প্রতিষেধক প্রতিরক্ষা সাজান, এবং গুয়াহাটির সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে চলেন। এক সময়ে লাখাউ পশ্চিম, দক্ষিণ এবং উত্তর থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। কিন্তু ব্রহ্মপুত্রের উত্তর তীরের স্থানীয় চাষীদের থেকে প্রচুর ধান জোগাড় করলেন এবং শোলাগড়ে(লাখাউ এবং কালিয়াবরের মধ্যে) অকারণে বহু অহোমকে হত্যা করেন। ভয় পেয়ে বহু চাষী তাদের নেতাকে ধরয়ে দিয়ে মুঘলদের কাছে আত্মসমর্পন করেন(৫ আগস্ট) এবং পশ্চিম দিকের বার্তাবিনিময়ের রাস্তাটি তারা সুরক্ষা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেন। কালিয়াবর হয়ে লাখাউ থেকে গুয়াহাটির মধ্যে বার্তা লেনদেনের রাস্তার সুরক্ষা নিশ্চয় হয়ে যায়। মৃত শ্বশুর সৈয়দ নাসিরুদ্দিনের স্থলে সৈয়দ হুসেন কালিয়াবরের থানাদার হলেন(১২ আগস্ট) আর সমাধায় মৃত সৈয়দ মির্জার স্থলাভিষিক্ত হলেন কিসান সিং। ইবন হুসেন দেশটি ধরে রাখার সমস্ত রকমের চেষ্টা করলেন, কেননা তিনি জানেন মুহূর্তের অসতর্কতায় চরম বিপদ ঘটে যেতে পারে এবং তার সেনাবাহিনীর মনোবল ভেঙ্গে যেতে পারে।

গড়গাঁওতে মুঘল সেনার হাতে পর্যুদস্ত হয়ে অহোমেরা নৌ বাহিনীর ওপরে আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেয়। ভিটারুয়াল ফুকনের লাখাউতে এবং অন্যন্য থানায় রাতের আক্রমন ব্যর্থ হয়। তবে অসমিয়াদের গণহারে হত্যালীলা চালিয়ে গেলেন ইবন হুসেন। ভয়ে ভীত রায়তেরা চিঙ্গুলাং লুথুরি দায়াঙ্গিয়া রাজখোয়া এবং বুড়াগোহাঁইকে ধরিয়ে দিলেন মুঘল নৌ সেনাধ্যক্ষ্যের কাছে। লাখাউ আর গড়গাঁওএর মাঝে অহোম বিদ্রোহীদের হারানোর জন্য মুঘলদের সাহায্য করতে থাকে সাধারণ প্রজারা। প্রজাদের অসন্তোষে ভিটারুল ফুকনকে দেবলগাঁও থেকে মাজুলি দ্বীপের রাঙ্গালি চাপরিতে পালিয়ে যেতে হয়। এবারে ইবন হুসেন দেবলগাঁওতে নতুন করে থানা তৈরি করে মীর জুমলার কাছে দু’দন অহোমের মার্ফত এই খুশির খবর পাঠালেন(৫ সেপ্টেম্বর)। এদিকে তামুলি দলাই বাঁশবাড়িতে হারার পরে পালিয়ে যায়। গজপুর এবারে মুঘলদের দখলে এল।
(চলবে)

বাংলা যখন বিশ্ব সেরা৭৬ - লাইফ অব মীর জুমলা, জেনারেল অব আওরঙ্গজেব

জগদীশ নারায়ণ সরকার

তৃতীয় পর্ব
অসমে মীর জুমলার দুর্দশার শুরু

১। মীর জুমলার বাস্তবিক দুর্দশা
বিজিত দল নিয়ে এর আগে অসম অভযানে যে সব দুর্দশার মুখোমুখি হয়েছিলেন, সেগুলি ফিকে হয়ে পড়ল এবারে বর্ষায় যে দুর্যোগে তিনি পড়তে চলেছেন। রাশিয়ার শীত সমতলে যে প্রভাব সৃষ্টি করে, অসমের বৃষ্টিও সেই ভূমিকা পালন করেছে। নদীগুলি সমুদ্রের মত ফুলে ফেঁপে ওঠে আর নালাগুলি যেন নদীতে রূপান্তরিত হয়। অহমিয়াদের আতঙ্ক মুঘল ঘোড়াগুলি বর্ষায়, কাদায় আর জলাজমিতে কোন কাজই করল না। সামনা সামনি লড়াই না করে অহমিয়ারা মুঘলদের ব্যতিব্যস্ত করার পদ্ধতি আরও ঘন ঘনভাবে কজে লাগাতে লাগল। লুকিয়ে থেকে হঠাত হঠাতই এখান সেখান থেকে রাতে মুঘল থানাগুলি আক্রমণ করলেও মুঘলেরা তার প্রত্যুত্তর দিতে পারল না। এছাড়াও যে সব গ্রামীনেরা মুঘলদের কাছে আত্মসমর্পন করেছিল, তাদের ওপর আক্রমন চালাতে লাগল অহমিয়ারা। সমস্ত রাস্তা বন্ধ করে দিল, খবর দেওয়া নেওয়ার ব্যবস্থাকে বিপর্যস্ত করল, লাখাউ আর গড়গাঁওএর মধ্যের নৌ বাহিনীর রসদ আনায় বাধা দিল অহমিয়ারা। রক্তচোষা তীর ব্যবহার করে তারা মুঘলদের খোলামেলাভাবে ঘোরাফেরা প্রায় বন্ধ করে দিল এমন কি মথুরাপুর আর গড়গাঁওতেও, এখন মুঘলদের তীরান্দাজ সেনা নিয়ে বেরোতে হয়। আত্মসমর্পনকারী গ্রাম দেবলগাঁওয়ের ওপরে আক্রমণ জাগ্রত থানাদারের জন্য ব্যহত হলেও ভিটারুয়াল ফুকন অতর্কিতে হানা দিয়ে আনোয়ার বেগের থেকে গজপুর দখল করে নেয়। ত্রিমোহনী থেকে গজপুর পর্যন্ত দিহিং নদীতে মুঘল সেনার জন্য রসদ আনায় বাধা সৃষ্টি করল অহোম বাহিনী। তিয়ক থেকে আরও ওপর পর্যন্ত সমস্ত মুঘল ব্যাপারী জাহাজ গতায়াত বন্ধ হয়ে গেল অহমিয়াদের আক্রমনে, ফলে রসদ আসাও বন্ধ হয়ে গেল। দিহিংএর বন্যা আর শালপানি পাহাড় থেকে নেমে আসা তীব্র বেগের জল মুঘল দারিয়াবাদীদের গতায়াত বন্ধ করে দেয় এবং মিয়ানা খানের পদাতিক বাহিনী আর রিসালাও বসে যায়। ফলে পাহাড় থেকে বর্ষার মধ্যেই অহোমরা তীব্রবেগে নেমে আসতে আসতে গড়োগাঁও ঘিরে ফেলে যদিও সতর্কভাবে মুর্তাজা বাধা দিতে থাকে এই জেনে যে তার সাহায্যের আর উদ্ধারের জন্য কোন বাহিনী আসবে না। বরগোঁহাইর নেতৃত্বে ১০-১২০০০ সেনা দেওপানি থানা ঘিরে ধরলেও তাদের নেতা মারা যাওয়ায় তারা পিছিয়ে যায়। গড়গাঁও, মথুরাপর আর অভয়পুরের অভয়ে বাস করছিলেন যে সব গ্রামীন, গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যায়।
মুঘল আর আহোমদের মধ্যে একেরপরেক লড়াই, খুন, জখম এত বেশি শুরু হয় যে তা আর গণনা করা বন্ধ করে দেওয়া হয়। কবর খুঁড়ে তার পূর্বজকে বার করার শাস্তিদিতে মুঘলদের হত্যা করার নির্দেশ দেন। কয়েক শকে হত্যা করলেও অহোমরা দেখল, মুঘল সেনার শক্তি কমছে না।

থানাগুলির বিচ্ছিন্নতা মীর জুমলার মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ১৬৬২ সালের মে থেকে অক্টোবর পর্যন্ত মুঘল বাহিনী তাদের শিবিরে বসেই থাকে। কিন্তু সেনাপতিদের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ এতই প্রবল ছিল যে এই বসে থাকার মধ্যেও তার বাহিনী নানান আঘাতের বিরুদ্ধে প্রত্যাঘাত করতে থাকে তাদের জীবনের বিনিময়ে। তালিস লিখছেন, পরিচ্ছদ একেবারের জন্যও খোলার সময় পাচ্ছেনা সেনারা। যে সেনা একটাও ধুলো সহ্য করতে পারে না, তাকেই কাদা মেখে সারাদিন জলে ভিজে, সূর্যের রোদ্দুরে পুড়ে যুদ্ধ করতে হয়, ঘোড়ার জিন একদিনের জন্যেও খোলা হয় না, চাকরেরা তাদের প্রভুদের সেবা করতে পারে না, এবং পালগাঘন্টি শুনলেই কোন সময় না নিয়েই প্রত্যেককে হাতে খোলা তরোয়াল ধরতে হয়।

২। নৌবাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করার ব্যার্থতা
মীর জুমলা ছাড়া অন্য কোন সেনা নায়কের পক্ষে বর্ষার অসমের মৃত্যুমুখী পরিবেশ থেকে মুঘল সেনা বাহিনীকে বের করে আনা সম্ভব ছিল না। তার ঠাণ্ডা মাথা, প্রজ্ঞা, ব্যবস্থাপনার দক্ষতার জন্য এই কাণ্ডটি সম্ভবপর হয়েছিল। যেখানে যখন প্রয়োজন সেখানে তিনি প্রয়োজনীয় ত্রান পাঠালেন। তার প্রথম পরিকল্পনা ছিল নৌবাহিনীকে ব্যভার। সেটি তার অসম আক্রমণের প্রাথমিক শক্তি, এবং তার প্রথম কাজ হল নৌবহরের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা। দেওয়লগাঁওয়ে আলি রাজাকে সাহায্যের জন্য গেলেন য়াদগার খান উজবেগ, আক্রমনকারীরা পালাল। কিন্তু গজপুরের থানাদার সারান্দাজ খান লাখাউয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে ব্যর্থ হলেন। নালায় বন্যার জন্য তিনি তিয়ক থেকে বেশি দূর পর্যন্ত পৌঁছতে পারেন নি। মীর জুমলা মহম্মদ মুরাদকে নৌবাহিনী দিয়ে এবং পরে পদাতিক দিয়ে সারান্দাজ খানকে উদ্ধারের জন্য নির্দেশ দিলেন। কিছু আধিকারিকের অযোগ্যত্যার জন্য পরিকল্পনাটি মাঠে মারা গেল লড়াই না করেই সেই বাহিনীকে ধরতে সমর্থ হল আহোমরা। ২৩ মে মুরাদ ত্রিমোহনীর দিকে পালাল আর দিলির খানের নেতৃত্বে কিছু নৌকো সুরক্ষিত অবস্থায় দেওলগাঁওতে আসতে পারল। মীর জুমলা হাসানকে দেওপানি ঘিরে বসে থাকা অহোমদের ধংস করতে পাঠিয়েছিলেন, তিনি সেই কাজ করে দেখালেন। গড়গাঁওএর নিরাপত্তার জন্য এবারে সৈয়দ সালার খানের নেতৃত্বে ৫০টি ঘোড়সওয়ার বাহিনী রইল।

ফারহাদ খানকে মীর জুমলা নির্দেশ দিলেন লাখাউ থেকে রসদ আনা, রাস্তার দুপাশে অহোমদের বাধা হটানো এবং গজপুরে থানা বসানো আর ত্রিমোহনি আর রান্ডাংএর সিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার জন্য। ফারহাদ খানকে সাহায্য করার জন্য মীর জুমলার নিজের সিপাহি দিলেন আবুল হাসানকে। কিন্তু এই বিশাল কাজটি ব্যর্থ হতে বসল নৌকোর অভাবের জন্য। গড়গাঁও থেকে ২৭ মে রাতে বেরিয়ে তারা তিয়কে(ত্রিমোহনী আর গজপুরের মাঝে) আটকে গেলেন বন্যার দুর্বিপাকে। জলে ভরা সমতল মাঠ যেন দিহিংএর তুলনায় বিপুলাকায় নদীর মত দেখাতে লাগল। কোনখানেই রাস্তা দেখা গেল না। আকাশ থেকে জল ঝরছে আর মাটির নিচ থেকে আরও বেশি জল উঠছে। তাঁবুগুলো যেন জলের বুদবুদের মত দেখা যেতে লাগল। রিসালারা তাদের ঘোড়ার ওপরে আর পদাতিকেরা তাদের পায়ের ওপরে দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য হল সারারাত। অসহায় ফারহাদ ফিরতে গেলেন সারান্দাজকে নিয়ে ত্রিমোহনী থেকে, পিছন ফিরে দেখলেন, রাস্তা গভীর খাত আর শালবল্লার খুঁটি দিয়ে আটকানো এবং খাতগুলিকে দিহিঙ্গের সঙ্গে জুড়ে দিয়ে তাদের দ্বীপের মত করে আটকে দিয়েছে। এবারে ভিটারুটয়াল ফুকন তার নৌবহর নিয়ে মুঘলদের চারপাশে ঘুরতে লাগল। নৌবহর আর প্রয়োজনীয় রসদ ছাড়া সেনাপতির প্রায় অসহায় অবস্থা।এই সময় তাদের নিজেদের ঘোড়া আর ষাঁড় কেটে খেতে হয়েছে। মহম্মদ মুনিম বেগ আর একাতাজ খান মীর জুমলার নির্দেশে এলেও তারা ত্রিমোহনীতে বন্যার জন্য আটকে গিয়েছেন। হাতির পিঠে চাপিয়ে উদ্ধারকারী দল পাঠানোর অবাস্তব পরিকল্পনা বাতিল করতের হল। ফারহাদের ইঙ্গিতে সুজন সিংএর বাহিনী অহোমদের নৌবাহিনীর একাংশের দৃষ্টি ঘুরিয়ে দিলে ফারহাদ ভোরে কয়েকটি ছিটিয়ে থাকা অহোম নৌবাহিনীর ওপর অতর্কিতে হানা দিয়ে ৪১টা আহমিয়া নৌকো দখল করেন, অধিকাংশ খাসা। সেগুলির ওপর নির্ভর করে ত্রিমোহনী পৌঁছতে পারলেন।

৩, গড়গাঁও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ল
ফারহাদ খানের উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ রূপে ব্যর্থ হয়ে পড়ায় অহোমেরা পূর্ণদ্যোমে সব রাস্তা বন্ধ করে দিল। এমন হল যে থানাগুলি থেকে কেউ বেরোতেও পারবে না কেউ ঢুকতেও পারবে না। মীর জুমলয়া সব থানা বন্ধ করে দিলেন। অভয়পুর থেকে মথুরাপুর খুব কষ্ট করে ফিরে এলেন আজম খান। অন্যেরা গড়গাঁওতে ফিরে এলেন। দিখু পূর্ব দিকে পাহারা দিচ্ছিল সারান্দাজ খান আর মিয়ানা খান, পশ্চিমে মীর মুর্তাজার নেতৃত্বে জালাল খান দারিয়াবাদী, গাজি খান এবং মহম্মদ মুকিম। লাখাউএর পূর্ব দিকের সম্পূর্ণ দেশটি অহোমদের দখলে চলে যায়, শুধু মুঘলদের হাতে থাকে গড়গাঁও এবং মথুরাপুরটুকু। নিরাপত্তা বাহিনী ছাড়া বাইরে বেরোনো অসম্ভব হল। মীর জুমলার সামনে আর কোন আশা নেই, কোন বাহিনীও উদ্ধারে আসতে পারবে না। খাদ্য সহ কোন রসদ মুঘল শিবিরে প্রবেশ করছে না। সক্কলে বাড়ি ফিরে যাবার সব আশা ছেড়ে দিল। তাদের কোন খবরই বাইরে বেরোতে পারছে না, হিন্দুস্তানের বাড়িতে বাড়িতে সেনাবাহিনীতে যাওয়া মানুষদের শেষ কৃত্য করে ফেলল। তালস লিখছেন, বাবা আদমের সময় থেকে ১২ হাজার পদাতিক বহু সংখ্যক রিসালা, অসংখ্য শিবির ছ মাস কোন কাজ ছাড়া ক্ষমতাহীন হয়ে বসে রয়েছে। এ যেন বইয়ের মধ্যে বৃত্ত। তার বাইরে কেউ পা ফেলতে সাহস করছে না।

অহোমেরা দ্বিগুণ উতসাহে পরিকল্পনা সাজাতে লাগল। অভিজাতদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে রাজা তাদের যুদ্ধে যাবার জন্য উৎসাহিত করতে লাগলেন। তিনি নামরূপ থেকে বেরিয়ে গড়গাঁও থেকে মাত্র চার দিনের পথ শোলাগুড়িতে শিবির ফেললেন। বাদুলি ফুকনকে তার নং ফুকনরূপে বা প্রধানমন্ত্রী এবং সেনানায়ক পদে বৃত করলেন এবং নির্দেশ দিলেন মুঘল সেনানীদের হত্যা করে মীর জুমলাকে ধরে আনার জন্য। অহোমদের নির্দেশ দেওয়া হল বাদুলি ফুকনকে যে কোন প্রকারে সাহায্য করতে। ২-৩ দিনেই ফুকন চওড়া, ৬ মাইল লম্বা উবং উঁচু আর শক্ত বুরুজুওয়ালা দেওয়াল মথুরাপুর পূর্বের দিল্লি নদীর তীরে তুলে দক্ষিণী পাহাড়ের সঙ্গে দিহিং নদীর সংযোগ ঘটিয়ে ফেলল। মথুরাপুরের ওপর তার রাতের আক্রমন দিলির খান বফল করে দিয়েছিলেন।বাদুয়লি ফুকন আর বর গোহাঁইএর যৌথ বাহিনীর আক্রমন হওয়ার আগেই শিলিঘাটের মুঘলেরা নামরূপের দক্ষিণে বুরহাটে চলে এসেছিল। সাইরিঙ্গএর রাজা আগামী দিনের চিক্রধ্বজ সিংহ, বা চারিং রাজা গড়গাঁওএ আক্রমণ করলে সুজন সিং তা প্রতিহত করেন। এরকম প্রচুর ছোটখাট লড়াই চলতে থাকে।

Wednesday, February 1, 2017

বাংলা যখন বিশ্ব সেরা৭৫ - লাইফ অব মীর জুমলা, জেনারেল অব আওরঙ্গজেব

জগদীশ নারায়ণ সরকার

গ। কামরূপ অসমে মীর জুমলার প্রশাসনিক ব্যবস্থা

১। সেনা শাসন
বাঙলার সঙ্গে যোগাযোগের সুবন্দোবস্ত করতে, জিতে আসা দেশটিকে শাসনে রাখতে, অহোম বিদ্রোহীদের বশে রাখতে, স্থানীয় রায়তদের শান্ত রাখতে যত তিনি এগিয়েছেন, প্রত্যেক জায়গায় সেনা শিবির তৈরি করেছেন। প্রত্যেকটিতে একজন সেনা আধিকারিক আর তার নেতৃত্বে একটি বাহিনী রাখা ছিল। গৌহাটির ফৌজদারির জন্য মহম্মদ বেগ আর কালিয়াবরের জন্য নাসিরুদ্দিন খানকে নিয়োগ করলেন। আর আতাউল্লা হুসেন বেগ, সৈয়দ আলি মির্জা, আলি রাজা বেগ, আনওয়ার বেগ, মীর নুরুল্লা এবং মহম্মদ মুকিমকে যথাক্রমে যোগীগুপা, কাজলি, সমধারা, দেওলগাঁও, গাজপুর, ত্রিমোহনী এবং রামডাঙ্গের থানাদার নিযুক্ত করা হল। ইবন হুসেনের নেতৃত্বে ৩২৩টা নৌবহর রাখা হল। তাকে সাহায্যের জন্য দেওয়া হল জামাল খান, আলি বেগ, অন্যান্য আধিকারিক এবং মুনাবর খান এবং অন্যান্য বাংলার জমিদারকে, অহোমদের মাজুলির জবাবে লাখাউ হল মুঘলদের নৌঘাঁটি। সাধারণের হাতের বাইরে রাখার জন্য গড়গাঁওএর প্রাসাদে পাহারা বসানো হল। সেখানে একটা টাঁকশাল তৈরি হল সম্রাটের নামে টাকা আর খুচরো তৈরির উদ্দেশ্যে। কিন্তু স্থায়ী প্রশাসনের কোন সম্ভাবনাই দেখা যাচ্ছিল না।

মীর জুমলার সঠিক তথ্য পাওয়া খুব জরুরি ছিল। এক মুসলমান চর যে কালিয়াবরে ভুল খবর দিয়েছিল তার জিভ কেটে নেওয়া হয় এবং চাকু চালাবার মত তার পিঠে চাবুক চালানো হয়।

অহোম রাজধানী দখলের অর্থ কিন্তু অহোম বিদ্রোহ শেষ হওয়ার ইঙ্গিত নয়। বিভিন্ন এলাকায় থানা বা চৌকি তৈরি করা হলেও সেগুলোর ওপরে রাজার অনুগত অহোমি সেনা বাহিনীর হঠাত আক্রমণের বিরাম ছিল না। মীর জুমলা যখন গড়গাঁওতে পৌঁছন, তার কিছু দিন পরে গড়গাঁওয়ের উদ্দেশ্যে সোনারুপায় ভর্তি ছটা নৌকো অহোমিরা দখল করে নাবিক-সেনাদের হত্যা করে। রাজার প্রাক্তন আমলা আর গুপ্তঘাতকদের দল মুঘল বাহিনীকে অতিষ্ঠ করে তুলছিল যাতে বর্ষা আসা পর্যন্ত তাদের শিবিরে রসদ পৌঁছতে না পারে।

আশ্চর্যের, সেই বছরের অনেক আগেই বর্ষা এসে গেল। মীর জুমলার পরিকল্পনা ছিল গোটা বর্ষাকালটা তিনি লাখাউতে কাটাবেন যাতে রসদের অভাব না হয়। কিন্তু গতায়াতের অসুবিধেয় জন্য দখল করা মালপত্র পাঠানো সমস্যা হয়ে দাঁড়াল। তিনি গড়গাঁওয়ের ৭ মাইল দক্ষিণপূর্বে মুথুরাপুরে তার মূল বাহিনীর ছাউনি ফেললেন(৩১ মার্চ)। এটি উচ্চ এবং সৌন্দর্যময় জমিতে অবস্থিত ছিল, আর এটি জুড়ে প্রচুর ফলএর গাছ আর ধান চাষের জমি ছিল ফলে নিত্য খাবারের সমস্যা ছিল না। অহোমিয়াদের হঠাই চোরাগোপ্তা আক্রমণের রুখতে জরুরি সতর্কতা নিলেন।

গড়গাঁওতে গোলান্দাজ ভাণ্ডার, হাতিশাল রসদের ভাণ্ডার আর সেনাবাহিনীর সম্পত্তি রক্ষার ভার দেওয়া ছিল মীর মুর্তাজা, রাজা অমর সিং এবং ৫০জন রিসালাদার আর কিছু বন্দুকবাজকে। কিছু প্রয়োজনীয় অস্ত্রশস্ত্র রেখে বাকিগুলি ঢাকায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। দেওয়ানিতন মীর সৈয়দ মহম্মদকে স্থানীয় রায়তদের শান্ত করার ভার দেওয়া হয়েছিল। মহম্মদ আবিদ, বাজেয়াপ্ত মালের দাম নিরূপক, রাজার প্রাসাদের সম্পত্তির খতিয়ান, সেনা বাহিনীর বেতন দেওয়া এবং বাকি অর্থ ঢাকায় পাঠাবার ব্যবস্থা করছিলেন। মহম্মদফ খলিল আমিনি পদে এবং সপত্তি দেখাশোনার কাজে মহম্মদ আশরফ নিযুক্ত হলেন।

গড়গাঁও আর মথুরাপুরের চারপাশ পুলিশি চৌকি দিয়ে সুরক্ষিত ছিল। অহোম সেনাবাহিনী ছেড়ে আসা সেনাদের সাহায্যে মীর জুমলা প্রধাণত মোটামুটি ১০০টা গ্রাম সাইরিং, শিলঘাট, টাউকাক, ছররা, রাওখাম, সিনাতোলি দখল করেন। দক্ষিণের পাহাড়ের সালপানি মিয়ানা খানের প্রশাসনে দেওয়া হল যাতে তিনি বড় গোঁহাইদের আক্রমন আটকাতে পারেন। গড়গাঁও আর সালপানির মধ্যের দেওপানির কর্তৃত্ব দেওয়া হল গাজি খানকে, গড়গাঁওয়ের উত্তরপূর্বের দিহিংএর তীরের দায়িত্ব দেওয়া হল জালাল খানকে। অহোমদের নিয়মিত আক্রমন সত্ত্বেও মুঘল ছাউনিগুলি দাঁড়িয়ে থাকল।

২। অসম যুদ্ধে অধিকৃত জিনিসপত্রের ব্যবস্থা
যুদ্ধে অধিকৃত দ্রব্য গুলি যেহেতু সাম্রাজ্যের, তাই সেগুলির নিরাপত্তার দায়িত্ব মীর জুমলা নিজের বলে মেনে নিয়েছিলেন। সিমলাগড় বা কালিয়াবরে হাতি বা কামান, জাম্বুরক, বন্দুক, বারুদ অহোমিয়ারা ছেড়ে গিয়েছিল, সেগুলি মীর জুমলা দখল নিয়ে তালিকাভুক্ত করিয়েছিলেন বিশেষ এক আধিকারিককে দিয়ে। দেওলগাঁওতে মীর জুমলা কয়েকজন মুসলমান রায়তের থেকে শুনলেন হাতি সহ বেশ কিছু শনাক্ত না করা দ্রব্য রাজা সঙ্গে নিয়ে যেতে পারেন নি, ফেলে রেখে গিয়েছেন। দিওয়ানিতন মীর সৈয়দ মহম্মদ এবং ফরহাদ খানকে সেই দ্রব্যগুলি আনতে পাঠালেন। উতসাহী সেনাপতি ভাগানিয়া রাজা আর ফুকনদের পদ্ম পুকুরিতে ছুঁড়ে ফেলা প্রচুর এ ধরণের অস্ত্রশস্ত্র নিজে উদ্ধার করিয়েছেন। মথুরাপুরেও তিনি মীর মুরতাজাকে দিয়ে যুদ্ধাস্ত্র সংগ্রহ করেছেন।

অসমে যুদ্ধ অধিকৃত সংগ্রহগুলি পরিমানে বিশাল, ৮২টি হাতি, সব থেকে দামি ৩ লাখ টাকা নগদ, আর রাজার ফেলে যাওয়া নানান ধরণের মালপত্র। অভিযানের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত উদ্ধার হয়েছে ৬৭৫টা কামান – তার মধ্যে একটা বড়, লোহার ৩ মন গোলা ছুঁড়তে পারে, ১৩৪৩টা উটের সুইভেল, ১২০০ রামছাঙ্গি, ৬৫৭০টা গাদা বন্দুক(ম্যাচলক), ৩৪০ মন বারুদ, ১৯৬০ সিন্দুক সোরা – এক একটার ওজন দুই থেকে আড়াই মন, ৭৮২৮টা লোহার ঢাল, ওজন করা হয় নি লোহা, সোরা আর গন্ধক, ১৭৩টা ধানের গোলা – প্রত্যেকটায় ১০ থেকে ১০০০ মন ধান, বহু বছরের রাজা আর ফুকনদের জন্য সঞ্চিত খাদ্য, যা তারা পোড়াতে ভুলে গিয়েছিল – যার অভাবে মীর জুমলার বাহিনীকে হয়ত অভুক্ত মরতে হত।
কালিয়াবরের ওপরে অহোম নৌবাহিনী পর্যুদস্ত হওয়ায় মনে করার কারণ নেই যে রাজার সব জাহাজ নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা নৌ বহর বাদ দিলে রাজার নৌশালে প্রচুর নৌকো রাখা ছিল। একটি নৌশাল লাখাউএর দূরে আর একটি ত্রিমোহনীতে মীর জুমলা ঘুরে দেখেন। লাখাউতে১০০টা বাছারি ছপ্পর(ঘাসের ছাদ)ওয়ালা জাহাজ, ৭০, ৮০, ১০০, ১২০ হাত(কিউবিটস) লম্বা, পোক্ত এবং দারুণ সাজসজ্জাওয়ালা। যদিও অসমিয়ারা গড়গাঁও নৌশালায় ১২০টা সমুদ্রে যাওয়া সাজসজ্জাওয়ালা বাছারি জাহাজ ডুবিয়ে চলে গিয়েছিল, তবুও ৬০, ৭০, ৮০ নাবিক বহনক্ষম সমুদ্রগামী ১০০০ জাহাজ মীর জুমলা উদ্ধার করেন।
অসমিয়া বন্দুক এবং বারুদ তৈরির প্রযুক্তিবিদদেরকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ জারি করেন। হাতি প্রশিক্ষণের মাহুত নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন।
কর্নাটকের মত অসমেও মীর জুমলা মন্দির লুঠ করে প্রচুর অর্থ লাভ করেন। কাজলি দখল করার পর তিনি কামাখ্যা, লুনা চামরি এবং ইসমাইল যোগী মন্দিরগুলি নিজের আওতায় নিয়ে আসেন।

উত্তরী অসমে থাকার সময় মীর জুমলা জানতে পারলেন যে ময়দামের কবরগুলিতে প্রচুর সোনাদান থাকে। নির্দিষ্ট একটা কবর থেকে তিনি ৮০ বছর আগের এক রাণীর ৯০০০০ টাকার পানবাটা লুঠ করে তার হাড় গোড় ছড়িয়ে ফেলে দেন। অহোম রাজা দুঃখে মন্তব্য করেন যে তিনি তারে পূর্বজদের হাড়টাও বাঁচাতে পারলেন না। এক অজানা ডাচ নাবিক লিখছেন, ধনীদের কবর (লুঠ করতে)পেলে আর তাদের কে চায়? মানুচি ঢাকায় দেখেন গড়গাঁও এবং অন্যান্য এলাকা থেকে জাহাজ বোঝাই করে লুঠের মাল আসছে।

৩। অসমিয়াদের প্রতি মীর জুমলার ব্যবহার
যারা বিদ্রোহ কররেছে তাদের চরম সাজা হয়েছে। তিনি সেনাদের নির্দেশ দিয়ে বলেছিলেন অবাধ্য অসমিয়াদের খুন করতে। একজন ডাচ নাবিক বলছেন প্রত্যেক কাটা মাথার জন্য ৫০ টাকা আর জীবিত ধরে নিয়ে এলে ১০০টাকা পারিতোষিক দেওয়া হত। মুঘলদের হাতে যে সব অসমিয়া ধরা পড়েছে তাদের প্রচণ্ড অত্যাচার করে মাথা কেটে মারা হয়েছে। এর কারণ ছিল তারা যাতে ভয় পেয়ে মুঘলদের বাহিনীতে যোগদান করে।

অন্যদিকে যারা মুঘলদের সাহায্য করেছে, তাদের অসম্ভব ভাল ব্যবহার করা হয়েছে। তবে যে সব মানুষ যুদ্ধে যুক্ত ছিল না, তাদের উন্নতির জম্য মীর জুমলা ব্যবস্থা করেছেন। তিনি কৃষকদের মন জেতার চেষ্টা করেছেন যাতে তারা বিদ্রোহীদের দলে যোগ না দেয়। সেনা বাহিনীতে লুঠ, ধর্ষণ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করে দিয়েছিলেন। এতে নারীলোলুপ সেনারা হতাশ হয়েছিল। সেনাবাহিনী অসম থেকে ফেরা পর্যন্ত এই নির্দেশ জারি ছিল – বাহিনীর কোন আমীর, সেনা, তাঁবেদার কোন মহিলার বা তার পরিবারের সম্পত্তির দিকে লাস্যভরা চোখ তুলে তাকাবে না। আর যদি কোন উচ্চাবচ এই কাজটি করে তাহলে তাকে সারা শহর ঘোরানো হবে এবং শাস্তি দেওয়া হবে।

একবার ফারহাদ খান পালয়ে যাওয়া এক গ্রামবাসী ফিরে এসে মুঘলদের রাস্তায় বাধা দান করেছে এই অভিযোগে মহম্মদ মুকিম বেগকে নির্দেশ দেন গ্রামে গিয়ে সেই ধরা পড়া মানুষটিকে খুন করতে, তার সম্পত্তি লুঠ করতে এবং তার স্ত্রী আর সন্তানদের ওপর অত্যাচার করতে। মীর জুমলা এই নির্দেশ খারিজ করে সেই গ্রেপ্তার হওয়া মানুষটিকে ছেড়ে দিতে আর অন্যান্য গ্রামীনদের সুরক্ষা দিতে আদেশ দেন। যারা অহোমদের অত্যাচারে দেশ ছেড়ে চলে গিয়েছিল, তাদের বিভিন্ন শহরে ফিরিয়ে এনে পুনর্বাসনের দায়িত্ব নেন মীর জুমলা। সিমলাগড়ে অনেক কামরূপী মুসলমান বন্দী ছিল তাদের ছেড়ে দেন মীর জুমলা।

গড়গাঁওতে পৌঁছে তিনি ঘরছাড়া রায়তদের ফিরিয়ে এনে, পুনর্বাসনের নির্দেশ জারি করেন এবং কামরূপের অধিবাসীদের বাড়ি তৈরি বা চাষে তাদের একবছরের জন্য সব রকম রাজস্ব ছাড় দেওয়ার নির্দেশ দেন। আরও একটি নির্দেশে হিন্দু মসলমান নির্বিশেষে রাজা বা অহোম অভিজাতদের কাছে যারা দাসের মত থাকতেন, এবং মুক্তির আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন, তাদের মুক্তির নির্দেশ দিয়ে খাসা নৌকো করে তাদের বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার এবং জীবিকার বন্দোবস্ত করেন।

এই সবেও প্রজাদের মন জয়ের বিষয়টি সহজ হয় নি। তালিশ দুঃখ করে লিখছেন, মীর জুমলার মহানুভবতা বা রাজার অত্যাচারেও অসমিয়ারা ইসলাম ধর্ম বরণ করে নিল না। হয়ত মীর জুমলার মন্দির ধ্বংস-লুঠ বা কবর লুঠে মানুষের মনে এমন ঘৃণা জেগেছিল যে তারা ইসলামে পরিবর্তিত হওয়ার কথাই ভাবে নি। তবে বিদ্রোহীদের প্রতি কঠোরতা আর জনগণের প্রতি তার মহানুভবতায় মানুষেরা বুঝতে পারল যে মুঘল থানাগুলি আক্রমন করে লাভ নেই। দুখিনকোলের গ্রামের মানুষেরা মুঘলদের প্রতি বশ্যতা স্বীকার করে নিল, এবং উত্তরকোলের গ্রামের মানুষ আস্তে আস্তে বুঝতে পারল যে তাদেরও মুঘলদের কাছে অবনত হতে হবে যখন প্রাকৃতিক দুর্যোগ বর্ষার আকারে নেমে এল।
(চলবে)

বাংলা যখন বিশ্ব সেরা৭৪ - লাইফ অব মীর জুমলা, জেনারেল অব আওরঙ্গজেব

জগদীশ নারায়ণ সরকার

৪। অহোমদের রক্ষণাত্মক চোরাগোপ্তা(গেরিলা) হামলার রণনীতি
দুর্ভেদ্য সিমলাগড়ের পতন, সমধারা থেকে পালিয়ে যাওয়া আর শেষ পর্যন্ত বিপুল নৌবহর ধ্বংসে অহোমদের মনোবলে চিড় ধরিয়ে দিল। এখন আত্মরক্ষার ভার এসে পড়ল আতন বুড়াগোঁহাইয়ের কাঁধে। আজকের রণনীতিতে যাকে গেরিলা কায়দায় যুদ্ধ বলে, তিনি সেই পথ ধারণ করলেন অসাধারণ পরিকল্পনায়। বর্ষা আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করার জন্য অহোমেরা পাহাড়ে পালিয়ে গেল। সামনাসামনি লড়াই না করে তারা চোরাগপ্তা লড়ায়ের পরিকল্পনা করল। প্রাথমিকভাবে অনির্দিষ্ট দিক থেকে, কোন নর্দিষ্ট শিবির বাহিত না হয়ে রাতে ছোট ছোট দলে অতর্কিতে হানা দিতে শুরু করে। সেনা বাহিনী কয়েকটি ভাগে ভাগ হয়ে মুঘলদের এগোনো আর পিছোনোর সমস্ত রাস্তা ধরে আক্রমন শানাত। গোটা শিবিরে নয়, দল বেঁধে কিছু কাজ করতে বেরোনো যেমন আগুব জ্বালাবার কাঠ আনার দলকে হঠাত হঠাত আঘাত করত, খুন করত, ধরে নিয়ে গিয়ে তুর্কি ধরণের লোহার কুলুপের মত হাতিয়ার দিয়ে অত্যাচার করে ছেড়ে দিত, যাতে তারা শিবিরে ফিরে গিয়ে মারা যায়। দ্বিতীয়ত মুঘলদের বাহিনীর জন্য রসদের রাস্তা কেটে দেওয়া বা সেগুলি লুঠ করে লাখু, গড়গাঁও এবং মথুরাপুরের মুঘল শিবিরে প্রায় অনাহারের মত অবস্থা নেমে এল। মুঘল বাহিনীর জন্য সমস্ত খাবারের রসদএর সূত্র কেটে দেওয়া হল, জমা খাবারে আগুণ লাগিয়ে দেওয়া হল এবং গ্রাম থেকে কোন খাবার যাতে শহরে যেতে না পারে রাজার সে নির্দেশ সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া হল। তৃতীয়ত আজকের পোড়ামাটির নীতি অনুসরণ করে মুঘল সেনার যতকিছু রসদ লাগতে পারে যেমন খাদ্য, নৌকো, স্থলযান, সোরার গুদাম সব কিছু মাটিতে মিশিয়ে, আগুণ ধরিয়ে নষ্ট করে ফেলা হল। উত্তর অসমে সমধরা ছেড়ে আসার আগে বারুদের গুদামে আগুণ ধরিয়ে আসা হল। পূর্ব দিকে আসার সময় তারা তিলান নদীর উত্তর পাড়ের সব মানুষকে গ্রাম ছাড়া করিয়ে মুঘলেরা কোন রসদ যাতে না পায় তার ব্যবস্থা করল। জানমুনগের দুর্গের বসতি জ্বালিয়ে দেওয়া হল। চতুর্থত সেগুলিকে হয়ত যুদ্ধ বলা যাবে না অথচ সামনা সামনি ছোটখাট হঠাত উদয় হয়ে লড়াই লাগিয়ে দিত। মীর জুমলা হয়ত যুদ্ধে জিতল, কিন্তু মানুষের হৃদয় জিততে পারল না, তার ক্ষমতার প্রয়োগ করতে পারল না। অহোমেরা মুঘলদের সামনাসামনি যুদ্ধে হয়ত হারাতে পারে নি, কিন্তু চোরাগোপ্তা লড়ায়ে মুঘলদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে দিতে পারল এবং এর ফলেই তাদের ফিরে আসতে হয়।

৫। লাখাউতে মীর জুমলার আগমন
অহোমদের চোরাগোপ্তা লড়ায়ের মধ্যেই মীর জুমলা ব্রহ্মপুত্রের দক্ষিণ পাড় ধরে তার মত করেই এগিয়ে চলছিলেন অসমের অক্ষ হৃদয়ের পানে। মুঘলদের আসমের আরও ভেতরে নিয়ে আসার রণনীতিতে অহোমদের ছেড়ে যাওয়া সোলাগড় দুর্গ দখল করার পরেই ফুকনেরা তাকে শান্তি বার্তা পাঠাল। কিন্তু আগের অভিজ্ঞতায় তিনি সেই বার্তা উপেক্ষা করলেন, কেননা এর আগের শান্তিবার্তায় তারা কোন উত্তর দেয় নি। তার মনে হয়েছিল এই শান্তিবার্তা শুধুই সময় কেনার আছিলা আর মুঘলদের সতর্ক প্রহরা এড়ানোর বাহানা।

রাজা, বরগোহাঁই ভিটারুয়াল ফুকন, দুয়ারিয়া গোষ্ঠীর দিহিঙ্গিয়া ফুকনকে লাখাউএর নদীর দুপাশের মুঘল বাহিনীর ওপর আক্রমন করতে নির্দেশ দিলেন, কিন্তু অহোম বাহিনী মীর জুমলার বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হল। দিহিং এবং ব্রহ্মপুত্রের মিলনস্থল লাখাউতে ঢুকলেন মীর জুমলা। পেশকাশ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তার ব্রাহ্মণ গুরু আর তাম্বুলি ফুকনকে দিয়ে আবারও শান্তিবার্তা পাঠালেন রাজা। কিন্তু মীর জুমলা এই প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যান করে বললেন তিনি শীঘ্রই গড়গাঁওতে পৌঁছবেন এবং তখন অবস্থা মত ব্যবস্থা নেবেন।

শ্বশুরের বিশ্বাসঘাতকতা এবং তার বাহিনীর বহু সেনানায়কেরা তাকে ছেড়ে চলে যাওয়ায় রাজা জয়ধ্বজ পশ্চাদপসণের সিদ্ধান্ত নিলেন – যতটা পারা যায় তার সম্পত্তি নিলেন – কেননা সব নিতে অন্তত ১০০০টি নৌকো লাগত – পেলেন না – যা পেলেন তাই নিয়ে চারাইদেও বা নাগা পাহাড়ের নিচের নামরূপের চারাই-খোরং এবং তার পরে তারাইসতএ গিয়ে তার মন্ত্রী এবং অনুরাগীদের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত হল যে বিশাল মুঘল বাহিনীর সঙ্গে মুখোমুখি লড়াই করে যুদ্ধে জেতা যাবে না। শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হওয়ায় কিছু অভিজাত, মহিষীদের নিয়ে আরও ভিতরে টিপামে গিয়ে বসতি করে ভবিষ্যতের জন্য ১ লক্ষ তীরান্দাজ সংগ্রহের পরিকল্পনা করলেন।

৬। গড়গাঁওএর পতন
বহু অহোম সেনাবাহিনী ত্যাগীকে নিয়ে মীর জুমলা লাখাউতে পদার্পন করলেন ১২ই মার্চ। বিপুল বাহিনীর অধিকাংশই বাইরেই থাকল। ছোট দিহিং নালা দিয়ে তারা আসতেই পারল না। প্রয়োজনীয় রসদ ছোট ছোট নৌকো করে নদীপথে সেনাবাহিনীর জন্য নিয়ে আসা হল। পদাতিক বাহিনী নিয়ে মীর জুমলা গড়গাঁওএর দিকে দেওলগাঁও(১৩-১৪ মার্চ), গাজপুর(১৫ মার্চ) এবং ত্রিমোহনী(১৬ মার্চ) হয়ে নালার পর নালা পেরিয়ে এগোতে থাকলেন। শেষ পর্যন্ত তিনি দিখু নালা পেরিয়ে গড়গাঁওতে ঢুকে রাজার প্রাসাদের পূর্ব পাশে শিবির গাড়লেন।
নাগা রাজা মুঘলদের কাছে বার্তা পাঠাল তারা মুঘলদের সাহায্য করতে চায়। মীর জুমলা প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেন, কিন্তু জানালেন তারা যদি অহোমদের সাহায্য না করে তাহলে তাদের মুঘলেরা সুরক্ষা দেবে।

নাগা পাহাড় পেরতে না পেরে নামরূপের নাগা ফৌজ শিবিরে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে দিন কাটাতে হচ্ছিল। রাজধানীর পূর্ব দিকে ১৪ দিনের দূরত্বে ভাগানিয়া রাজার ৪৯৮০ জন সঙ্গী বাহিনী বর্ষার আগমনের জন্য দিনগুণতে লাগল। বরগোহাঁই তিরুতে আর ফুকনেরা মাজুলির চরে আশ্রয় নিলেন। ঐতিহাসিক মহম্মদ মুনিমের পুত্র লিখছেন
খানইখানান সর্বোচ্চ সেনাপতি,
তার চেষ্টায় যুদ্ধ সমাপ্তির পথে,
তিনি যখন দুটি রাজধানী দখল করলেন আমরা দেখলাম,
সময় কিছু গোপনীয়তায় ছিদ্র বানায়।
এক বছরে অনেক কিছুই ঘটল,
(যেমন) কোচবিহার আর অসমের জয়।
(চলবে)

বাংলা যখন বিশ্ব সেরা৭৩ লাইফ অব মীর জুমলা, জেনারেল অব আওরঙ্গজেব

জগদীশ নারায়ণ সরকার

খ। গুয়াহাটি থেকে গড়গাঁও
গুয়াহাটিতে বিজয়ী সেনানায়ক দুদিন কাটিয়ে অহোমদের থেকে তার প্রস্তাবের কোন উত্তর না পেয়ে আসম দখল করার মনস্থ করলেন(৭ ফেব্রুয়ারি)। অহোমদের অতর্কিতে এবং রাতে হানার রণনীতিকে বেচাল করতে তিনি প্রত্যেক সেনানীকে সতর্ক করে দিলেন, রাতে পাহারা দেওয়া সেনাদের অস্ত্র হাতে সারারাত জাগতে নির্দেশ দিলেন, ঘোড়ায় জিন চড়িয়ে রাখতে বললেন। রাস্তায় থানা তৈরি করে যোগাযোগ ব্যবস্থা পাকা করা হল। অহোমদের রাজধানী গড়গাঁও ব্রহ্মপুত্রের দক্ষিণ পাড়ে অবস্থিত ছিল। গুয়াহাটি আর সমধারার মাঝের একটি জায়গায় মীর জুমলা সমস্ত বাহিনী নিয়ে নদী পেরোলেন(১৫-১৬ ফেব্রুয়ারি)। অহোমদের আক্রমণের আশংকা উপেক্ষা করেই মীর জুমলা সিমলাগড়ের দিকে এগোতে শুরু করলেন। কাজলি পতনের পরে নদীর উত্তরপাড়ের দরঙ্গের রাজা এবং দক্ষিণপাড়ের ডিমারুয়ার রাজা বশ্যতা স্বীকার করলেন, এবং ডিমারুয়ার রাজার ভাইপো মুঘল সেনার সঙ্গে যোগ দিলেন।

২। সিমলাগড় এবং সমধারা
মীর জুমলার পথে একটাই কাঁটা তেজপুরের পূর্বে ভরালী নদীর তীরে ভ্রমরগুড়ি পাহাড়ে অহোম রাজধানী সমধাগড়। এর উল্টো দিকে দক্ষিণ তীরে সিমলাগড়। এই দুটি এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করে মীর জুমলার অগ্রগতিকে রুখতে রাজা সেনাবাহিনিকে দুটুকরো করে ভাগ করলেন, বয়স্ক সেনাদের বাতিল করে নবীন যুবাদের আনলেন সামনে। ব্রহ্মপুত্রের দুপাশের বাহিনীর সেনাপত্যের দায়িত্ব দেওয়া হল অতন বুড়াগোঁহাইকে। সমধারাকে সুরক্ষায় উত্তরের সেনার নেতৃত্ব দেওয়া হল সেনাপতি ঘোরা কবরক, তার সহকারী হলেন বাদুলি ফুকন, বারুকিল(বা লাঙ্গিছান) বরগোঁহাই, কেন্দতগুরিয়া বরপাত্র(গোহাঁই)। দক্ষিণের সিমলাগড়ের বাহিনীর নেতৃত্বে রইলেন বাহগড়িয়া বুড়াগোহাঁই, তার সাহায্যে রইলেন শিরিঙ্গিয়া রাজা, ভিটারুল গোঁহাই, বরচেতিয়া নামনিয়াল রাজশাহুর বরফুকন।

রণনৈতিকভাবে ব্রহ্মপুত্র এবং দুখিণের পাহাড়ের মধ্যের সুবিধাজনক দীর্ঘ সমতল সুউচ্চস্থানে অবস্থিত সিমলাগড়ের দুর্গটি উঁচু দেওয়াল আর কামানদ্বারা সুরক্ষিত ছিল। ফাঞ্জি আর লুকোনো গর্ত দিয়ে চারদিক সাজানো দুর্গে ঢোকা খুব মুশকিল ছিল। যারা দুর্গের সুরক্ষা দিচ্ছিলেন তারা পিঁপড়ের মত অগণন হয়ে সুরক্ষার সরঞ্জামগুলি ঠিকঠাক সাজিয়ে রেখেছিলেন। মানুষ আর প্রকৃতির সুরক্ষায় সাজানো এই দুর্গ অভেদ্য ছিল।

২০ ফেব্রুয়ারি দুর্গের দক্ষিণ থেকে পশ্চিমের দিকে বয়ে যাওয়া একটি নালার ধারে শিবির ফেললেন মীর জুমলা। দুর্গ থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে গোলাগুলি ধেয়ে এল তাদের দিকে। জাম্বুরক গোলা তার তাঁবুর ওপর দিয়ে উড়ে গেল। দুর্গ আক্রমন করলে বহু প্রাণহানি হবে তাই তিনি দুর্গ অবরোধের রাস্তা নিলেন। সাম্রাজ্যের বক্সী মহম্মদ বেগের সুযোগ্য নেতৃত্বে অভিজাতরা শিবিরের রাতের সুরক্ষায় থাকলেন। পরিখা কেটে তার ওপরে কামান রেখে প্রচুর গোলা ছোঁড়া হল দিলির খান আর মীর মুর্তাজার নেতৃত্বে, কিন্তু দুর্গের মোটা দেওয়ালে তার কোন প্রভাবই পড়ল না। শালবল্লার খুঁটির দেওয়াল তুলে দিলির খান কিছু সহযোগী নিয়ে দুর্গের দেওয়ালের কাছে গিয়ে সকাল থেকে সন্ধ্যে পর্যন্ত গোলা ছুঁড়লেন, কিন্তু সে আক্রমন কোন কাজেই এল না।

দীর্ঘকাল ধরে অবরোধ চলায় মীর জুমলা তার রণনীতিতে পরিবর্তন আনলেন। দুর্গকে দু ধার থেকে ঘিরে একযোগে আক্রমন শুরু করলেন। অহোম এক অভিজাতর পুত্রকে সঙ্গে নিয়ে তিনি জানলেন, দুর্গের দেওয়ালের কোন অংশটা খুব দুর্বল এবং কোথায় লুকোনো খাদ অগভীর এবং ফাঞ্জির সুরক্ষা কোথায় দুর্বল। ২৫ ফেব্রুয়ারি দিলির খান ১৫০০ রিসালা গোলান্দাজ নিয়ে রাতে সজ্জা করে ভোরবেলা অসতর্ক অহোমদের ওপর আক্রমন চালালেন। মীর মুর্তাজা আর মিয়ানা খানকে আগুন জ্বালিয়ে অন্য দিকে অহোম বাহিনীর মনোযোগ আকর্ষণের দায়িত্ব দিয়ে দিলির নিজে আক্রমনের নেতৃত্ব দিলেন, কিন্তু তার পথনর্দেশক তাকে ভুল পথে চালিত করে সব থেকে দুর্গম পথে নিয়ে গেল এবং দুর্গ থেকে মুহূর্মুহু গোলার আঘাত আসতে থাকল, দিলিরের হাতি ২৫টি তীরে বিদ্ধ হলের প্রচণ্ড যুদ্ধ করে দুর্গ প্রাকার চড়তে সক্ষম হল। দুর্গ ছেড়ে পালানো অহোম কিছুকে সৈন্যকে মহম্মদ বেগ বক্সী নালার দিকে ধাওয়া করে ধরলেন, কিছুকে হত্যা করলেন। ২৬ ফেব্রুয়ারি মীর জুমলা দুর্গে প্রবেশ করে তার সুরক্ষার পরিকল্পনা দেখে আশ্চর্য হয়ে গেলেন। অসম সূত্রে বলা হচ্ছে যে, দুর্গ সুরক্ষা সামলাতে কত সেনা আর রসদ লাগবে সেই হিসেবের পরিকল্পনা করতেই লাঙ্গিছাঙ্গ বড়ফুকনের ভুল হওয়ায় দুর্গটার পতন ঘটল।

অভেদ্য সিমলাগড়ের পতনে হতোদ্যম হয়ে পড়লেন সমধারার রাজা, সেনা নায়ক। বুড়াগোঁহাই রাজার সঙ্গে পরামর্শ করতে রাজধানীতে গেলেন।

৩। কালিয়াবরে মুঘল নৌসেনার বিজয়
তেজপুরের পূর্ব দিকে এই প্রথম মুঘল সেনা ঢুকল এবং যুদ্ধ না করেই কালিয়াবর দখল হল। তিনি কালিয়াবর ছাড়লেন ২ মার্চ। নদীর তীরটি পাহাড়ি হওয়ায় পদাতিক বাহিনী নৌ বাহিনী থেকে ছয় মাইল দূরে সমতল পথ দিয়ে এগোতে শুরু করল। মুঘলদের যৌথবাহিনীর ভয়ালতা অনুমান করে এবং নৌ বাহিনীর সঙ্গে পদাতিকের যথেষ্ট দূরত্ব অনুধাবন করে অহোমেরা পদাতিক বাহিনীর রসদের সূত্র কেটে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তাদের কাছে আরেকটা খবর ছিল মুঘল সেনানায়ক ইবন হাসান সেনার সঙ্গে ছিল না। ৩ মার্চ সন্ধ্যার আজানের ঠিক পরেপরেই বরগোঁহাইর নেতৃত্বে ৭০০-৮০০ নৌবহর ১০০টি মুঘল সেনা বহরকে আক্রমন করে চকিতে কুকুরাকাটার কাছে। সব থেকে সুসজ্জিত ডাচ যুদ্ধ জাহাজগুলিও হতবাক হয়ে যায়, যেন খাবার থালায় করে কেউ মাংস সাজিয়ে উপহার দিয়েছে কচুকাটা হওয়ার জন্য। নদীর টানে ভেসে গিয়ে পর্তুগিজ জাহাজগুলি বেঁচে যায়। মুনাবর খান যতটা পারেন চেষ্টা করলেন অহোমদের বিরুদ্ধে লড়ার আর অপেক্ষা করছিলেন কখন নতুন বাহিনী তার সাহায্যে এসে পড়বে। রাত দু’প্রহরে সাহায্যের জন্য বাহিনী এসে পড়ল। এবং তিনি ডাচ আর পর্তুগিজদের বাঁচাতে তাদের পাঠালেন। তারা অহোমদের বিরুদ্ধে বাতাসের উল্টো দিকে যততা দ্রুত পারা যায় যেতে চাইল কিন্তু ডাচেদের বাহিনীকে স্রোতের বিরুদ্ধে গুণটানার জন্য মুসলমানদের তীরে নামতেই হল।
রাতভর কামানের গোলার আওয়াজ শুসুনতে পেয়ে মীর জুমলা মহম্মদ মুনিম বেগ একাতজ খানকে আক্রান্ত ব্রিটিশ, ডাচ আর পর্তুগিজদের সাহায্যের জন্য পাঠালেন। রাস্তায় বাড়িঘরদোর না থাকায়, বসাল জঙ্গল বেয়ে, জলা জমি আর কাদার তাল পেরিয়ে পরের দিন সকালে মাত্র ১০-১২ জন অশ্বারোহী নিয়ে তীরে পৌঁছে ভেরি বাজালেন।

এই ঘটনায় যুদ্ধের মোড় ঘুরে গেল, অহোমেরা হতোদ্যম হয়ে পড়ল আর মুঘলেরা তেড়েফুঁড়ে নতুন করে লড়াই করা শুরু করল। মুঘলেরা বড় কামানযুক্ত ৩০০-৪০০ জাহাজ এবং অস্ত্রশস্ত্র দখল নিল। সব থেকে ছোট জাহাজে ৭০-৮০ জন সৈন্য ধরত। ২১০০০ সেনাকে যুদ্ধ বন্দী করা হল। অনেকেকে হত্যা করা হল যে ৫০ জন সেনা পালিয়ে এসেছিল তাদের রাজা কঠিনতম সাজা দিলেন। ছদ্মবেশ সত্ত্বেও অহোম সেনাপতিকে গ্রেফতার করা হল, মীর জুমলার সেনানায়কদের সঙ্গে কথা বলার পর তাকে মুক্তি দেওয়া হয়। মীর জুমলার শিবির থেকে মাইল খানেক দূরে থাকা আরও ৩০০ নৌবহরকে দূর থেকে কামান দেগে ডুবিয়ে দেয়া হল, কিছু পালাল, কিছু দখল নেওয়া হল। অসমিয়া নৌ-বহরের কার্যকারিতা শেষ হয়ে গেল।

কালিয়াবরের ঠিক ওপরের যুদ্ধে কিন্তু অহোমদের নৌ বাহিনীর সংখ্যা অনেক অনেক বেশি ছিল। এবং নদীর স্রোতও তাদের পক্ষে ছিল। চকিত আক্রমনে সাম্রাজ্যের বাহিনী হেরে যাওয়ার মুখে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু ৬০-৭০ জনের অহোম বাছারি যুদ্ধ জাহাজগুলি মুঘল জাহাজগুলির তুলনায় বেশি ভারি ছিল। তার পাশাপাশি মুঘল আর ইওরোপিয় সেনানায়কদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ সব থেকে দুর্যোগের মুহূর্তেও তাদের হারের করাল গ্রাস থেকে বার করে নিয়ে আসতে সাহায্য করেছিল। আর সঠিক সময়ে মীর জুমলা মহম্মদ মুনিম বেগকে যুদ্ধ ক্ষেত্রে পাঠানোটাই যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার সব থেকে বড় সহায়ক হয়েছে। একজন অনামা ডাচ সেনানীর যুক্তি এখানে প্রণিধান যোগ্য, গুয়াহাটিতেই হঠাই আক্রমণ করে নৌবহরকে দুর্বল করে দেওয়া আর তার রসদ কেটে দেওয়ার রাজার নির্দেশ অহোম সেনানায়কেরা মানে নি। জনৈক প্রৌঢ আহত অহোম সেনানী তালিসকে বলেছিল, মুঘলদের আহোম বাহিনীর সামনে দাঁড়িয়ে থাকাই আশ্চর্যের এবং তালিশেরও ধারনা হচ্ছিল যে মুঘলেরা এর বেশি এগোতেই পারবে না।
(চলবে)