Showing posts with label corporate capital. Show all posts
Showing posts with label corporate capital. Show all posts

Monday, March 28, 2016

উপনেবেশবাদ বিরোধী চর্চা - কেন আমরা বড় পুঁজির বিরোধী

আমরা যারা গাঁইয়া ছোটলোকেদের রাজনীতি করি, তাদের কাছে ২০১৬ সালের এই চলতি নির্বাচনটা খুব অদ্ভুত ঢাপুয়া বাতাস। বাংলার রাজনীতিতে পুঁজির ব্যাখ্যাকারেদের রোল রিভার্সাল বেশ মজার কান্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে রাজনৈতিক দলের বড় পুঁজির দালালি করার কথা - তারা না করে, পথের ব্যবসায়ীদের পাশে দাঁড়াচ্ছে - ঘোমটা পরে নয়, সরাসরি - এতদিন যাদের পশ্চিমি উচ্চশিক্ষা পাত্তাই দেয়নি - স্বীকারই করে নি সেটা অর্থনীতি আর প্রযুক্তি বলে - যাদের সেই অবস্থানটি নেওয়ার কথা নয় তারা তাঁদের মান্যতা দিল - আর যাদের বড় পুঁজির পাশে দাঁড়াবার কথাই নয়, শৃঙ্খল ভাঙার কথা - তারা কিন্তু রাজনৈতিকভাবেই বড় পুঁজির পাশে দাঁড়াবার কাজ খুব জোর দিয়ে ক্রে চলেছেন; সেই পরিচয় বদলের কম্মটা বিন্দুমাত্র আনন্দের নয় এবং বোধহয় নতুন করে শিক্ষা নেওয়ার সময় এসেছে।
বড় পুঁজি নির্ভর শিল্পবিপ্লবের প্রাথমিক দর্শন হল উৎপাদনের কেন্দ্রিকতা এবং এই কেন্দ্রিকতা সফল হয় না যদি না শ্রমকে বৃহতভাবে প্রতিস্থাপন করা যায় বিপুল যন্ত্র ব্যবহার এবং বিশ্বজোড়া প্রাকৃতিক সম্পদ লুঠের মাধমে। ফলে শ্রম প্রতিস্থাপনকারী প্রযুক্তি বিকাশ ঘটতে শুরু করে বিদ্যুৎবাহী স্বতঃচল মাকু চালানোর মাধ্যমে। তাতেও কাপড়ের মিলের লাভ দেখা যায় নি যতদিন না পলাশী উত্তর সময়ে বাংলা লুঠের সম্পদ লন্ডনে যায় নি আর ভারতের বস্ত্রশিল্পকে গায়ের জোরে উচ্ছেদ আর দেশিয় বাজার দখল করে মিলগুলির খুব খারাপ উৎপাদন এই বাজার গুলোতে বিক্রির ব্যবস্থা করা যায় নি।
বড় পুঁজির এই দখলদারির কাজে সরাসরি সাহায্য করেছে ঔপনিবেশিক প্রযুক্তি আর শিক্ষায় শিক্ষিত মধ্যবিত্ত এবং তাঁদের উচ্চমধ্যবিত্ত হয়ে ওঠার প্রণোদনা। সে এই সম্পদ লুঠ আর শ্রম প্রতিস্থাপনের কাজে বড় পুঁজিকে নিঃশর্ত সাহায্য করে গিয়েছে এবং সিঙ্গুরের কারখানার একটা হিসেব দেখেছি, ১৫০০ কোটি টাকার কোম্পানিতে সরাসরি কাজ হওয়ার কথা মেরেকেটে ১০০০-১৫০০ সাদা কলারের শ্রমিকের। সেটা সরাসরি আসত মধ্যবিত্ত পরিবার থেকেই। ফলে বড় পুঁজির বিকাশের সঙ্গে মধ্যবিত্তের স্বার্থ আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িত - ফলে বড় পুঁজির দখলদারির স্বার্থ মধ্যবিত্ত দেখবে এটা আর আশ্চর্যের কি?
আমরা যারা ছোট গ্রামীন উতপাদকেদের রাজনীতিতে জড়িয়ে রয়েছি, তারা মনে করি ভারতের/এশিয়ার গ্রামীন উৎপাদন ব্যবস্থা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দর্শন - যেখানে হাজারো বিক্রেতা, হাজারো উৎপাদক বিরাজ করে - পুঁজির, লাভের মালিকানা একজন বা কয়েকজনের হাতে জড়ো হয় না, সারা সমাজে ছড়িয়ে যায়। ফলে সামাজিক সাম্য বজায় থাকে। তেমনি বড় পুঁজি প্রণোদিত হোস্টাইল টেকওভারের মত শুধুই গায়ের জোরে, বড় পুঁজির তৈরি প্রশাসনের আইনের লাঠি দেখিয়ে অনিচ্ছুক উতপাদকের উৎপাদন পরিকাঠামো কিনে নেওয়ারও সুযোগ নেই গ্রামীণ উৎপাদন ব্যবস্থায়। এই উৎপাদন ব্যবস্থা অনেক বেশি গণতান্ত্রিক, অনেক বেশি পরিবেশ বান্ধব, কম অপচয়ী, প্রযোজনভিত্তিক, স্থানীয় অর্থনীতিকে জোরদার করে, স্থানীয়ভাবে কর্ম সৃষ্টি করে, স্থানীয় জ্ঞানভিত্তিক - লাভ দূর দেশে বসে থাকা একজন বা কয়েকজনের হাতে গিয়ে জড়ো হয় না। ফলে আমরা সরাসরি এই শ্রম প্রতিস্থাপন দর্শনের বিরোধী, বড় পুঁজির গায়ের জোরে দখলদারির বিরোধী, শ্রমের অবমাননার বিরোধী।
অবশ্যই এই ব্যবস্থায় বড় পুঁজির ব্যবস্থাপক মধ্যবিত্তের পুনর্বাসনের জায়গা নেই। স্বাভাবিকভাবেই এই দর্শনটি যে মধ্যবিত্ত তাঁদের স্বার্থেই অপছন্দ করবেন এবং করছেনও। গত কয়েক দশক ধরে বড় পুঁজি, জমি, মালিকানা, উৎপাদন পদ্ধতি বিষয়ে সারা ভারতে যে বিতর্ক উঠেছে তা মনের জানালা খুলে দেয়। নতুন করে ভাবতে শেখায়।

Saturday, March 19, 2016

কেন বড় পুঁজির বিরোধিতা, Why we oppose corporate capital

এই শিক্ষিত বিতর্কে অশিক্ষিত, অজ্ঞ, মুর্খ, কুসংকারাচ্ছন্ন, সভ্যতার ষড়ৈশ্বর্য না দেখে গ্রামের মধ্যে বাস করা কুপমণ্ডুকদের সংগঠনের পক্ষ থেকে কিছু কথা - গুছিয়ে বলতে পারব কি না জানি না চেষ্টা করছি।
বড় পুঁজি ছোট্ট পুঁজি বিতর্কে আমরা সাধারণের স্বার্থবাহী ছোট্ট পুঁজির পক্ষে - ছোট্ট পুঁজি খুব বেশি মানুষ/গোষ্ঠীর হাতে পুঁজি পুঁজি জমতে দেয় না - অনেক ছোট উৎপাদক বিক্রেতা থাকলে সেই উতপাদন-বিতরণ ব্যবস্থায় লাভ ছড়িয়ে যায় সমাজের মধ্যে। ঐতিহাসিকভাবে ব্রিটিশ আগ্রাসনের পূর্বে ভারত/এশিয়া/লাতিন আমেরিকা/আফ্রিকা মূলত ছোট পুঁজির অঞ্চল ছিল। বড় পুঁজি কি ছিল না? ছিল। ব্যবসায়ীরা যে সপ্তডিঙ্গা সাজিয়ে বিদেশে ব্যবসা করতে যেতেন, তা তো আদতে বড় পুঁজি - কিন্তু কর্পোরেট পুঁজি ছিল না। তার ওপর সামাজিক নিয়ন্ত্রণ প্রবল ছিল। তাঁকে ঘাড় ধরে সিএসআর করাতে হত না।
পলাশির আগেও বড় পুঁজি সমাজ-রাষ্ট্রের সার্বিক নীতি নির্ধারণ করার অবস্থায় ছিল না। তার কিছু বিধিনিষেধ ছিল। এক উৎপাদক অন্য উতপাদকের উৎপাদন পরিকাঠামো কিনে নিতে পারত না - শিল্পবিপ্লবীয় উৎপাদন ব্যবস্থায় যেমন কোন উৎপাদক না চাইলেও তার ব্যবসা অন্য উৎপাদক কিনে নিতে পারেন হোস্টাইল টেকওভারএর মাধ্যমে - জানি বড় পুঁজি আরও বড়দের আশীর্বাদ নিয়ে তার থেকে পাঁচগুণ বড় কোম্পানি কিনে নিয়ে তা সামলাতে না পেরে ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি অবস্থা হয় - এ তত্ত্ব-তথ্য খুব সম্প্রতির ইতিহাসে প্রমানিত। কৃষককে যদি ছোট্ট পুঁজির উতপাদন ব্যবস্থার অংশ ধরি, রাষ্ট্রের মদতে সেই লাভের(কৃষিকে শুধু লাভজনক উতপাদন ব্যবস্থা হিসেবে দেখতে গিয়ে কৃষির কর্পোরেটাইজেশন ঘটছে, সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে) উতপাদন-ব্যবসাকে জোর করে সারা বিশ্বজুড়ে দখল করা হচ্ছে, বুকে বন্দুকের নল ঠেকিয়ে।
ভারত বহুকাল ধরে বহু কৃষি ও শিল্প উৎপাদন সারা বিশ্বে একচেটিয়া ব্যবসা করে এসেছে - নীল থেকে ইস্পাতের মণ্ড পর্যন্ত - তখন জ্ঞানচর্চা, প্রযুক্তি তার নিজস্ব ছিল। তার জোরে ১৮০০ পর্যন্ত সে ছিল ব্যবসায় উতবৃত্ত দেশ। বড় পুঁজির বিতরণ ব্যবস্থা(এমন কি ছোট্ট পুঁজিও) সেগুলি নিয়ে বিদেশে গিয়েছে, কিন্তু সামগ্রিক উৎপাদন ব্যবস্থায় দাঁত ফোটাতে পারে নি। প্রসন্নন পার্থসারথি বা ওম প্রকাশজীদের তাঁতিদের বিষয়ে গবেষণা বলছে, পলাশীর আগে পর্যন্ত তাঁতিরা ব্যবসায়ীদের দাদন ফিরিয়ে দিতে পারতেন - তাদের রোজগার ছিল ইওরোপের তাঁতিদের তুলনায় অনেক বেশি। নীল উতপাদন-বিতরণ ব্যবস্থাই ধরা যাক, ২০০০ বছর আগে রোমে ভারতীয় নীল যেই - নাম ইন্ডিগো ভৌগোলিকতার সূত্র ধরে - নীল লাতিন আমেরিকা থেকেও সে সময়ের ইওরোপে আসত - কিন্তু তারও নাম ছিল ইন্ডিগো - এই ব্যবসাকে ১৮০০ সালের পর রাষ্ট্রের মদতে, বড় পুঁজি উতপাদকেদের বুকে বন্দুক ঠেকিয়ে দখল - তারপর ধ্বংস করল, সে সময়ের আগে একচেটিয়া ব্যবসা করেও কেন্দ্রিয় দখলদারির, চাষীদের নিংড়ে লাভের শেষ কপর্দক তুলে নেওয়ার নীলকর তৈরি হয় নি। ম্যাঞ্চেষ্টারের অতিরিক্ত উতপাদনের কাপড় মিলগুলি লাভ করতে ততদিন পারে নি, যতদিন না বন্দুকের মুখে দাঁড় করিয়ে ভারতের আড়ংগুলি ধ্বংস করা হয় নি, নীল চাষ-ব্যবসা দখল করা হয় নি, ইওরোপে ইস্পাতের (ধাতুর) কারখানা চলে নি যতদিননা ভারত ব্যপ্ত ৩০০০০ চলন্তিকা ছোট্ট গলনচুল্লির ধারক-বাহক, দেশের ছোট সামাজিক উৎপাদন ব্যবস্থার অংশ ডোকরা উতপাদকেদের ধ্বংস করা হয় নি - এই ইস্পাত মণ্ড দিয়ে এক সময় বিশ্ববিখ্যাত দামাস্কাস তরোয়াল তৈরি হত।
আর্যভটের হাত ধরে আরও হাজারো গুনীর চেষ্টায় যে নিয়ন্ত্রণমুক্ত কলন বিদ্যা তাঁতিদের, নাবিকদের, চাষীদের হাতে প্রতিকূলতা জয় করার করার সুযোগ করে দিয়েছিল, বিশিল্পিয়ায়ন করার উদ্যমে সেই ব্যপ্ত কেন্দ্রবিহীন ভারতজোড়া বিদ্যাচর্চাকেও উদ্দেশ্যপূর্ণভাবে ধ্বংস করা হল, ইওরোপে গিয়ে সেই মুক্ত প্রাথমিক জ্ঞানচর্চা হয়ে উঠল উচ্চতম শিক্ষাব্যবস্থার অংশ। বাংলা তথা ভারতের স্বাস্থ্য ববস্থার অন্যতম ধারক বসন্তের টিকাকারদের নিষিদ্ধ করে জেনারের উদ্ভাবিত টিকা ব্যবস্থাকেই চালাতে হয়েছে।
ছোট্ট উৎপাদন ব্যবস্থায় উতপাদকের নিয়ন্ত্রণে থাকে প্রযুক্তির প্রয়োগে। কেন্দ্রিয় নিয়ন্ত্রণযুক্ত বড় পুঁজি চেষ্টা করেই যাচ্ছে প্রযুক্তি, জ্ঞানচর্চার দখল পেটেন্ট, কপিরাইট ইত্যাদি ব্যবস্থা করে নিজেদের দখলে নিয়ে আসতে। তাহলে সামগ্রিক উৎপাদন ব্যবস্থায় তার দখলদারি নিশ্চিত হয়। তাই উৎপাদন ব্যবস্থার চরিত্র বিচারে আমাদের প্রাথমিক প্রশ্ন প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ কার হাতে? পুঁজির চরিত্র কি - সে অন্য উৎপাদন ব্যবস্থাকে কন্সোলিডেশনের নাম করে, উন্নয়নের নাম করে সমাজের সম্পদ দখল করার ছাড়পত্র পায় কি না।
অন্য সভ্যতার কথা জানি না, ভারত মূলত শুদ্র সভ্যতা - জ্ঞানচর্চা, উতপাদন বিতরণ ব্যবস্থায় তাদের নিয়ন্ত্রণহীন পকড় নতুন ভাবে ভারতকে বসিয়েছিল বিশ্ব উতপাদন ব্যবস্থায়। ইতর, ছোটলোকেদের হাতে ছিল দেশের মূল উতপাদন বিতরণ ব্যবস্থা - তাঁরাই তৈরি করেছিলেন এই ব্যবস্থার দর্শন। কয়েক হাজার বছর ধরে শুদ্ররা, বৈশ্যরা, নিজেদের বিকেন্দ্রিভূত উৎপাদন দর্শন তৈরি করেছিলেন - যে দর্শনকে ধ্বংস করার চেষ্টা করে গিয়েছে ইওরোপ ৫০০ বছর ধরে। পলাশির পর রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করে বিশিল্পিয়ায়ন, জ্ঞানচর্চা ধ্বংস, লুঠ, খুন ব্যবস্থা নামিয়ে এনে সেই দর্শন ধ্বংস বাস্তবে রূপ পায়, তা চরম রূপ ধারণ করেছে স্বাধীনতার পর - তার জন্য কয়েক কোটি গ্রামীন শুদ্রকে উচ্ছেদ করতে হয়েছে - সে লড়াই চলছে আজও। তবুও রক্তবীজের বংশধরেরা তাদের মত করে দেশের গ্রাম উতপাদন ব্যবস্থা ধারণ করে রয়েছেন বলেই বিশ্ব মন্দা ভারতে প্রভাব ফেলে না।
আর কেন এই উতপাদন ব্যবস্থায় রয়েছি, কেন এই বড় পুঁজির প্রযুক্তি ব্যবহার করি? এই দখলদারির রাষ্ট্র ব্যবস্থা না মেনে নিয়েও যেমন করে কাশ্মীর, উত্তরপূর্ব ভারতকে বন্দুকের নলের জোরে দখল রাখা, দেশের মানুষের বিরুদ্ধে লড়াই চালানো ভারত রাষ্ট্রের অংশ হয়ে থাকি, তার দেওয়া নানান ভর্তুকি খেয়ে ফুলে ফলে বেড়ে উঠতে থাকি, ঠিক সেই যুক্তিতেই বড় পুঁজির দখলদারির প্রতিবাদ জানিয়েও সেই ব্যবস্থাকে মেনে নিই নিমরাজি হয়েও।