Showing posts with label শ্রীলা ত্রিপাঠি. Show all posts
Showing posts with label শ্রীলা ত্রিপাঠি. Show all posts

Friday, November 23, 2018

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা - পূর্বের উপকূলের নাবিকদের অতীত সমুদ্র যাত্রার স্মৃতি - ইওরোপমুখ্য ইতিহাসচর্চা আমাদের শেকড়ে যেতে বাধা দ্যায়

কেন পূবভারতের সঠিক অসাম্রাজ্যবাদী ইতিহাস চর্চায় বাংলা-ওডিসা-বিহারের তথাকথিত অশিক্ষিত গাঁইয়া মহিলা, তাদের উৎসব, ব্রত, গল্পকথা, আলপনা, আচার-বিচার, কৌমস্মৃতি ইত্যাদিতে বারবার মাথা নামিয়ে সম্মান জানিয়ে ফিরে যেতে হবে, কেন নতুন ভাষ্যে এই গণ-ইতিহাস চর্চকদের সম্মান জানাতে হবে তার একটামাত্র উদাহরণ বাংলার লক্ষ্মীপুজো এবং ওডিসার বৈতা বন্ধন। পূবদেশের মহিলারা সেই গণ- ইতিহাস শত শত বছর ধরে নিজেদের বুক দিয়ে আগলে ধরে আছেন ঔপনিবেশিক বিকৃতির বিরুদ্ধে আড় হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে। আজও। প্রণাম অদম্য মায়েরা!
কেন বিশ্ববিকাশের ইতিহাস নিয়ে ইওরোপিয় ভাষ্য নির্বিবাদে মেনে নেওয়া উচিত হবে না, এবং কেন বহু সময়েই বিশ্ব ইতিহাসের ঔপনিবেশিক ইওরোপিয় ভাষ্য অইওরোপিয় ইতিহাসচর্চাকে ভুল পথে চালিত করে মৌসুমী বায়ু হিপ্পালাসকে আবিষ্কার হিসেবে দাবি তার মুখ্য প্রমান। ঔপনিবেশিক সময় থেকে ইওরোপমুখ্য ইতিহাসের মিথ্যা/ভুল/উদ্দেশ্যপূর্ণপাঠ, তাদের দৃষ্টিভঙ্গীকেই বিনা বিতর্কে মাথা নামিয়ে মেনে নিতে বাধ্য করেছে।
পূর্বউপকূলের নাবিকদের সমুদ্রযাত্রা নিয়ে শ্রীলা ত্রিপাঠীর একটি অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ লেখা আছে। পরমের নৌকো সংখ্যায় এটির অনুবাদ ছেপেছি (তার প্রথম পাতাটি আপনাদের জন্যে তুলে দিলাম)। তিনি বলছেন মৌসুমী বায়ু হিপ্পালাসের আবিষ্কার হিসেবে ঔপনিবেশিক ইতিহাসে পড়ানো হয়। বাস্তব হল তারও বহু আগেই পূর্ব দেশের নাবিকেরা সেই বাতাস অনুসরণ করে দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় যেতেন এবং পালটা বাতাসে ফিরতেন এই তথ্য আজও পূব বাংলা-ওডিসা এবং দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার বহু দেশে বিদ্যমান।
এই অইওরোপিয় গণ-ইতিহাসচর্চার একটা উদাহরণ আমরা এই প্রকাশনায় দিলাম। নবকুমার দুয়ারি দাদা ওডিসার বৈতা বন্ধন উতসবের যে ছবি দিয়েছেন তার সঙ্গে বাংলা-ওডিসার নাবিকদের ঐতিহাসিক সমুদ্র যাত্রার স্মৃতি স্পষ্ট। প্রথম ছবিটা পাঁচ বছর আগের, আমার তোলা, অন্যদুটো Nabakumar Duaryদার তোলা এবং আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন Indranil Biswasদাদা।
দুজন মানুষের ইতিহাস চর্চককে ছবির জন্যে কৃতজ্ঞতা জানালাম।

Sunday, November 19, 2017

বেরা ভাসান উৎসব১১ - সমুদ্র যাত্রার পাঁচালি - রীলা মুখার্জী

যেহেতু শুক্রবার ভজনা আর বিশ্রামের বার, অন্যভাষায় ছুটির বার, ফলে বেরা উৎসবের দিন বুধ আর বৃহস্পতিবার ঠিক করা হল। বৃহস্পতিবার গুরুত্বপূর্ণ পূণ্যাহের অথবা বাজারের দিন আর পরের দিন শুক্রবার সারা ইসলামিক বিশ্বে দুপুরে নামাজ পড়া। বৃহস্পতিবার বাজার দিবস, নবাবেরা জনগণকে দর্শন দিতেন, তাদের দুঃখ দুর্দশা শুনতেন, এবং এ দিন তিনি নিজের আদালতে কাজি হয়ে বসাতেন।
Goiten বুধবার আর শুক্রবার, এই দুটি দিন বাছার একটা সামাজিক কারন দেখছেন(তিনি এটিকে ইসলামপূর্ব এবং জুডাপন্থীদের সমাজ থেকে ভাবছেন)একটি বিচারের অন্যটি প্রার্থনা দিয়ে শুরু হচ্ছে এবং আস্তে আস্তে সেটি ধার্মিক চরিত্র গ্রহণ করছে। আরবিতে যাকে বলা হচ্ছে, yawm al-jum’a বা জমায়েতের দিন, সেটি বেরা ভাসানের সময়ে এসে বুধবার থেকে এক দিন সরে গিয়েছে বৃহস্পতিবার – যে দিন বাংলার নবাবেরা জনগনকে দর্শন দিতেন, নজর গ্রহণ করতেন এবং আদালত বসাতেন এবং জনগণের ওপর তাঁদের সার্বভৌমত্ব আরোপ করতেন। বৃহস্পতিবারের রাত উৎসবের জন্য নিবেদিত। কেন এটা হল সেটাই আমি আমার গবেষণায় তুলে ধরব।
বাজার না উৎসব?
সেদিন উৎসবের শুরু, বুধবার, সেদিন সাধারণত পরম্পরার ইসলামিক সমাজে বাজার দিবস, সেদিন নবাবি সাড়া(procession) শুরু হত মাহিনগর থেকে, দ্বিতীয় দিন ভাগীরথীর অন্যপাশের মুর্শিবাবাদ থেকে। এই সাড়ায় আমলা এবং সভাসদেরদের বিপুল ভিড় হত। সাধারণেরা গোটা সাড়ার শেষের দিকে থাকতেন স্বাভাবিকভাবেই। নদীর ধারে পৌঁছে নবাব নদীতে একটি সোনার দীপের বেরা, জগতশেঠ রূপোর দীপের বেরা এবং অন্যান্য অভিজাত এবং অন্যান্যরা সাধারণ কাগজের নৌকো ভাসিয়ে নদীকে নজর দিতেন।
কারা কি ধরণের বেরা ভাসাবেন তার আকার পরিমাণ নির্দিষ্ট ছিল। প্রথমে ভাসত নবাবের সোনার বেরা তার পরে জগত শেঠের রূপোর বেরার। এবারে একে একে আসত সাধারণ মানুষের সাধারণ কিন্তু সুসজ্জিত বেরা। মূল বেরাটি হত ৩০ স্কোয়ার ফুট আকারে চৌকাকৃতি কলার মান্দাস করে তারোপরে বাঁশের কঞ্চির চারটি নৌকো বসানো হত। এই গোটা বেরাটিকে কালো কাগজে মুড়ে সামনে মকরের আর পিছনে হাতির মুখ বসানো হত। এটাই ছিল নবাবী বজরার পরম্পরার চেহারা(Anon.এর Voyage dans les Deltas du Gange et l’Irraouaddy;, 1521, উপস্থপনা এবং সম্পাদনা প্যারিসের Genevieve Bouchon and Luis Filipe Thomaz, Fondation Calouste Gulbenkian)। প্রত্যেক বড় বেরাতে ছোট মাটির গড় তৈরি করা হত। প্রত্যেক বেরাকে রঙিন কাগজের, পুঁতি, মালা, ফুল, পতাকা, নিশান, সোনার মোমবাতি এবং মিষ্টি ইত্যাদি দিয়ে সাজানো হত যাতে এটিকে মনে হয় মুর্শিদাবাদের ছলন প্রাসাদ। এই ছলন প্রাসাদের গায়ে নানান ধরণের বাজি লাগিয়ে দেওয়া হত। বেরা ভাসানের সঙ্গে সঙ্গে সেই বাজিগুলিতে আগুণ ধরানো হত। তারিখিমানিকুড়ি আর স্টুয়ার্ট সূত্রে পাচ্ছি সঙ্গে সঙ্গে চলত কামানের গর্জন এবং সানাইয়ের সুর।

প্রত্যক্ষ্যদর্শীরা বলছেন চার দিকে মোমবাতি লাগানো সুসজ্জিত বেরার দল সানাইয়ের সুরে যখন ভাগীরথীর ওপর দিয়ে ভেসে যেত বর্ষার গুমোট রাতে, তখন জনগনের মধ্যে অপূর্ব অচিন্ত্যনীয় ভাব উদায় হত। উৎসবের শেষে গোটা সাড়া আবার প্রাসদাদে ফিরে আসত এবং সেখানে বিপুল আকারে খাওয়াদাওয়ার সমারোহ চলত। এটাই হল রাজ্যের প্রাথগত ধন্যবাদ দেওয়ার দিন। এই উৎসবের রেশটি শুক্রবার, ছুটির দিনেও গড়িয়ে চলত। 

Saturday, November 18, 2017

বেরা ভাসান উৎসব১০ - সমুদ্র যাত্রার পাঁচালি - রীলা মুখার্জী


গ্রামীন হিন্দু মানসিকতায় খিজর

(সঙ্গে ওডিসার খুদুরকুনি ওশার দুটি ছবি দেওয়া গেল)

স্থানীয় প্রেক্ষিত আর কৃষ্টিগত চলকের জেরে বহু সময় দ্যাখা যায় মূলের প্রেক্ষিত আর উদ্দেশ্য পাল্টে যেতে থাকে। বেরাও এই নিয়মের ব্যতিক্রম নয়। ব্লকম্যান এবং আশুবাবু দুজনের বেরার স্থানীয় উদ্ভব দেখেছেন। হিন্দু চাষীরা, মূলত চাষীণীরা পৌষ সঙ্ক্রান্তিতে সেদো নামক একটা আচার পালন করেন। এই আচারে তাঁরা জলে ছোট ছোট নৌকো ভাসিয়ে জল আর বর্ষার দেবতাকে সন্তুষ্ট করেন। পরের বছর ভাল চাষের জন্য এই ছল নৌকো গুলোতে তারা ফুল, আলো আর মিষ্টি ভরে ভাসিয়ে দেন। বহরমপুরের গঙ্গা পুজো একই ধরণের আচার প্রায়। আমরা কি বলতে পারি বেরা ভাসান হল হিন্দু সেদো আর গঙ্গাপুজোর সঙ্গে মুসলমান আচারগুলির সংশ্লেষের উৎসব?

বেরা
তবে বেরা সেদো বা খিজর উৎসবের থেকে চরিত্রগতভাবে আলাদা। সেই বিশেষ চরিত্রটা আমরা এখন আলোচনা করব। সেদো জানু্যারি মাসে অনুষ্ঠিত হয়। নাবিকেরা মানুষ যখন সমুদ্র যাত্রায় যায় তখনই সে খিজরের উপাসনা করে (তবে সময়ের টানে আমরা এর আগে স্থানীয় লিখিত উপাদান সূত্রে জেনে গিয়েছি যে ক্রমশঃ এটা বাৎসরিক উতসবে রূপান্তরিত হয়েছে)। হিন্দুদের এটা ফসল/নদী/বর্ষা উৎসব, অন্যদিকে মুসলমানের কাছে এটা সমুদ্রযাত্রার উৎসব।

উল্লেখ্য, যৌথভাবে দুটি ধারনাকে মিলিয়ে বেরা ভাসান উৎসব তৈরি হয়েছে। এটি আগস্ট সেপ্টেম্বরে আয়োজিত হয়। এখন প্রশ্ন এই সময়টা বাছা হল কেন? কারণ এক সময় বাংলা ছিল সমুদ্রযাত্রা/উপকূলবর্তী ভৌগোলিক অঞ্চল, এবং তার জন্য সমুদ্রে যাওয়ার নানা উপকরণ – মৌসুমী বায়ু, সামুদ্রিক স্রোত ইত্যাদিগুলির ধারণ বোঝা খুব জরুরি ছিল। আরব আর গ্রিকে নাবিকেরা গ্রীষ্ম বাতাস বেয়ে সমুদ্র যাত্রা করতেন আর ফিরে আসতেন শীতের সময়ে। অন্যদিকে দক্ষিণ এশিয়ার পূর্ব উপকূলের নাবিকেরা শীতের সময় সমুদ্র যাত্রা করে গ্রীষ্মের বাতাস বয়ে ফিরে আসতেন। অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে উত্তরপূর্বর বাতাস আর সমুদ্র স্রোত জাহাজকে দক্ষিন এশিয়া থেকে শ্রীলঙ্কা হয়ে দক্ষিণ পুর্ব এশিয়ার দিকে বয়ে যেতে সাহায্য করত। যাওয়ার সময়ে উত্তরপূর্ব বায়ু দ্যাখা গেলেই কার্তিক পূর্ণিমা পালিত হত, এবং বাড়ির মানুষেরা প্রবাসের দিকে যাওয়া তাদের আত্মীয় স্বজনদের সুরক্ষার জন্য এই উৎসব পালন করতেন। জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে দক্ষিণ পশ্চিম মৌসুমী বায়ূ অর্ণবপোতগুলিকে আবার পূর্বের উপকূলে ফিরিয়ে আনার কাজ করে। দূরে গিয়ে ভায়েদের বাণিজ্য করে নিরাপদে ফিরে আসা কামনার ঐতিহাসিক স্মৃতি আজও ওডিসার অনুঢা কন্যারা সেপ্টেম্বর মাসে পালন করেন খুদুরুকুনি ওশা(Khudurukuni Osha (ভায়ের সুরক্ষায় মঙ্গল দেবীকে পুজা করা হয় খুদ দিয়ে)) উৎসবের মধ্যে দিয়ে।

Goiten S.D. 1968, Studies in Islamic History and Institutions পাঠে আমরা আরও একটা কারণ খুঁজে পাচ্ছি। বেরা ভাসান হয় এমন সময় যখন বাংলায় দেওয়া নেওয়ার পালা শুরু হত। আদতে ভাদ্র মাসের বুধ আর বৃহস্পতিবার বাংলায় নবাবী thanksgivingএর পালা চলে। বেরার সঙ্গে যদি রমজান মাস পড়ে যায় তাহলে বেরার তারিখ পিছিয়ে দেওয়া হয়। বাংলার নবাবেরা বেরার আগেই ভাদ্র মাসের বৃহস্পতিবারে পুণ্যাহের আয়োজন করতেন মুর্শিদাবাদের দরবারে। সেই দিন সারা বাংলার আভ্যাগতরা আসতেন এবং তাদের দরবারিস্তরেই আপ্যায়িত করা হত। কিন্তু প্রশ্ন হল কেন বুধ আর বৃহস্পতি এই দুদিন? অন্য দিনগুলো নয় কেন?

Goiten বলছেন এই দুই বারের সঙ্গে রামজানের আত্মিক যোগ আছে। বৃহস্পতিবার বাজার হবে আর শুক্রবার ঈশ্বর আরাধনা। এই প্রথাটাকে আমরা বিস্তার ঘটাতে পারি বাংলার বেরা ভাসানের সূত্রেও। রামজান হল স্বর্গের দ্বার, এই এই সময়ে দৈত্যদের শিকলিতে বেঁধে রাখা হয়। এই সময়ে কোরাণকে বিশ্বে পাঠানো হয়েছিল এবং সেই কৃতি স্মরণে এই দীর্ঘ সময় ধরে আত্মপীড়নের উৎসব করেন বিশ্বজোড়া মুসলমানেরা। ফলে আমরা যদি কৃষি আর সমুদ্র যাত্রার বিষয়টা সরিয়েও রাখি, আগস্ট সেপ্টেম্বর মুসলমান সমাজের জন্য পবিত্রতম সময়। এবং বেরা ভাসান উৎসব এই সময়ের পরেই আয়োজন করা হয়। খ্রিষ্টিয় পঞ্জিকায় এটা লেন্টএর সময়, এবং আগামী দিনগুলি আরও সখময়তায় ভরার সময়।
(চলবে)

বেরা ভাসান উৎসব৯ - সমুদ্র যাত্রার পাঁচালি - রীলা মুখার্জী

দরয়া-ইয়ে খিজরঃ জল, জীবন এবং চৈতন্য
গবেষকেরা মোটামুটি স্থির সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন খজরের উতপত্তি কাস্পিয়ান সমুদ্রের তীরে ঘটেছে। বাড়(Bahr) এবং দরিয়া দুই শব্দই সমুদ্রের অনুষঙ্গে জড়িত। খাজার সমুদ্র শব্দবন্ধটা সাধারণত ব্যবহার করে থাকেন তুর্ক, আরব এবং পারসিকরা। আরবেরা উচ্চারণ করে কাজভিন, ইওরোপিয় উচ্চারণে হয়েছে ক্যাসপিয়ান। ক্যাসপিয়ান সাগরের আরও কিছু নাম আছে - Tabarestan, Bahr-e (sea) Jorjan (Gorgan), Abskoun-e Deilam, Bahr-e (sea) A'ajem, Jilan (Gilan), Astarabad, Sari, Shirvan, Mazandaran, Moghan, Badkoubeh, Haji Tarkhan, Gol-o-Galan, Talisan, Kamroud, Zereh Ojestan, Akfoudeh Darya (Dera Akfoudeh), Kharazm, Khorassan, Jili, Bahr-ol-Ajam, Jebal and Bab-ol-Abvab। আরব ভুগোলবিদ নাভিরি সূত্রে আরও একটি নাম পাচ্ছি ফার্স বাড়(Fars Bahr) বা হজ(Hoz) বা পারস্য (উপ)সাগর। একটি সমুদ্রের এতগুলি নামের পেছনে কারনগুলি হল ১) এই সব এলাকাজুড়ে নানান ধরণের সমাজের মানুষ বাস করে, তারা তাদের মত নাম দেয়, ২) আশেপাশের শহরের নামে, ৩) উপকূল এলাকার শহরগুলির নামে সমুদ্র চিহ্নিত হয়, ৪) সমুদ্রের সমনাম শব্দ Deniz, Darah, Darya, Sala, Sihaie, Zarayeh, and Voroushka থেকে এসেছে, ৫) এই সমুদ্র দিয়ে যাওয়া আসা করা মানুষজন ভুল করে অন্য সমুদ্রের নামে কাজভিনকে ডাকা থেকে।

হ্রদ আর সমুদ্র, দুটি চরিত্র নিয়েই কাজভিন বা ক্যাসপিয়ান সমুদ্র। কখোনো কখোনো একে বিশ্বের সব থেকে বড় মিঠে জলের হ্রদ বলেও বর্ণনা করা হয়। এটি ভুগোলের ভাষায় endorheic অর্থাৎ এখান থেকে কোন প্রাকৃতিক জল নির্গমনের(বাষ্পীভবন ছাড়া) জায়গা নেই, ফলে সমুদ্র হিসেবে কাজভিন অস্থিতিশীল। শত শত বছর ধরে বহুবার এর জলস্তর কখোনো বেড়েছে, কখোনো কমেছে। এই সমুদ্রের স্থানীয় মাছগুলির প্রজাতি হল kutum, roach, bream and salmon। ফলে এই ধরণের অস্থিতিশীল জলাশয়ে যে সমুদ্র রক্ষাকারী দেবতার উদ্ভব হবে সেটা কি খুব আশ্চর্যের?

পুরুত্থানিক চেহারায় খিজর, ডিওনিসাস, হার্মেজ(ইদ্রিস), ওসাইরিস এবন্মগ স্কন্দ-কুমারের সঙ্গে তুলনীয় হবেন। এটা মনে রাখা দরকার অল-খিদর আদিরূপকে(archetype) সুফিরা তাঁকে প্রাকৃতিক সব কটি শক্তির প্রতিনিধি হিসেবে চিহ্নিত করেন। কেউ কেউ আবার বলছেন শিবের পুত্র স্কন্দের রূপক থেকে দক্ষিণ এশিয় সুফিবাদের হাত ধরে অল অল-খিদরএর বিবর্তন ঘটেছে। দক্ষিণ এশিয়ায়, স্কন্দ অল-স্কন্দ নামে পরিচিত, যিনি আবার ডিওনিসাসের সমান্তরাল। অল-স্কন্দ, ইসলামি ইস্কান্দারে পরিণত হন। এই নামে এশিয় কৌম স্মৃতিতে আলেকজান্দার আজও টিকে আছেন। এর আগে আমরা দেখেছি খজা খিজিরের সঙ্গে আলেকজান্ডারের সম্পর্ক কি ছিল।



খিজর নিয়ে আরও একটি ইন্তারপ্রিটেশন আছে। পবিত্র কুরাণের অষ্টাদশ সুরা আলোচনায় কার্ল গুস্তাভ য়ুং, খিজর পাতার সবুজ অংশের ক্লোরফিলের দ্যোতকই নন, বা সুর্যালোক জলের মিশ্রেণে তার বেঁচে থাকা আর পুষ্টিই নয়, বা আলোর বর্নালীর মধ্যের সবুজ আলোটাই সে নয়, সেটি প্রাথমিক মৌলিক শুদ্ধ চেতনার অংশ বিশেষ। য়ুং বলছেন খিজর হলেন আত্ম অহং। সব কটি সূত্র থেকে একটাই বিষয় উঠে আসে, সেটি হল খিজর ইসলামে রুক্ষাকর শক্তি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন, কেননা খ্রিস্টধর্মের মত ইসলামে মোক্ষ(salvation)র ধারনাটিই নাই, শুধু আছে পথপ্রদর্শকের হাত ধরে আত্মজাগরণ(revelation)।

বেরা ভাসান উৎসব৮ - সমুদ্র যাত্রার পাঁচালি - রীলা মুখার্জী

মাছ বাহনে সবুজ জোব্বা পরা অল খিজর

জল, বর্ষা এবং সমুদ্রগমণ আর বাণিজ্যr নানান বর্ণনা আগে উল্লিখিত আখ্যানগুলিতে স্থান পেয়েছে। কিন্তু আমাদের সামনে দুটি পরস্পরবিরোধী সংস্করণ উপস্থপিত হচ্ছে – প্রথম আর শেষ দুটিতে বলা হচ্ছে এই প্রথাটি শুরু হয়েছিল ভাগীরথীতে অষ্টাদশ শতকে মুর্শিদাবাদে বাংলার নবাবদের হাতে। কিন্তু্ তৃতীয় আখ্যানে বলা হচ্ছে, এটির উদ্ভব কিন্তু ঢাকায়, পদ্মা নদীর পূর্ব তীরে, ১৬২৬-২৭ সালে সুবাদার মুকরম খাঁএর আমলে। তবে এটা পরিষ্কার প্রত্যেকটি বয়ানে আমরা পাচ্ছি যে এটি শুরু হয়েছিল সামাজিক উৎসব হিসেবে, দীর্ঘ এলাকা জুড়ে, খিজিরের স্মরণে, এবং এটা পরের দিকে শাসক শ্রেণী আত্তীকরণ করে নেয়।

কার হাতে শুরু হয়েছিল, তা নিয়ে পরস্পর বিরোধী মন্তব্য আছে। ব্লকম্যান(Blochmann, Notes on Sirajuddaulah and the Town of Murshidabad, taken from a Persian manuscript of the Tarikh-i-Mancuri) আর আশুবাবুর বয়ানে সিরাজের হাতে ১৭৫৬-৫৭ সালে, কিন্তু সালিম আল্লার তারিখিবাংলার তথ্য বলছে, বাংলার প্রথম নবাব মুর্শিদকুলি খাঁর জানামায়(১৭০৪-১৭২৭)।

আমরা এর আগে দেখেছি বাংলার মূর্তিবিদ্যায় মাছের স্থান বেশ গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করেছে। মনে রাখা দরকার পবিত্র কোরাণে খিজরের সঙ্গে মাছের অঙ্গাঙ্গী সম্পর্ক তৈরি করা হয়েছে – বলা হয়েছে দুটি সমুদ্রের মিলনস্থলে তিনি মাছের পিঠে চড়ে আবির্ভূত হলেন। প্রশ্ন হল স্থানটি কোথায়? এটা কি বাস্তব আর পরাবস্তবের মাঝামাঝি যায়গা, যেখানে দুটি সমুদ্র মিশেছে? ফলে খিজরের সঙ্গে জুড়ে থাকা সবুজ রং শুধু যে শক্তি বা নবজীবনের সঙ্গে সশ্লিষ্ট তাই নয়, পরলৌকিকতার ধারণাও যুক্ত। এটাও মনে রাখা দরকার প্রাচীন ইসলামি ধর্মতত্ত্বে খিজর হলেন এমন এক প্রতিনিধি/ব্যক্তিত্ব, যিনি আত্মসত্ত্ব এবং রক্ষাকারী দেবতার সত্তাতত্ত্বীয় (ontological) পৌরাণিকতা, যেখানে দুটি সাগর মিশেছে(আধ্যাত্মিক হৃদয়), সেটির মধ্যে সম্পর্ক রক্ষা করেন। সত্তাতত্ত্বীয় বিস্তারে পরাবুদ্ধিগত(nondiscursive), পরাবাস্তব(upra-rational) বুদ্ধিসূত্র অনুযায়ী অনুব্রহ্মাণ্ডসূত্রে(macrocosmically), প্রকৃতি এবং ব্রহ্মাণ্ডের(theophany= মানুষের মধ্যে দেবতার প্রকাশ) ধ্যানে খিজিরের পথ নির্দেশ। খিজিরের ধ্যান হল আদতে জীবনের মানে খোঁজার পথের আধ্যাত্মিক যাত্রা।

কিছু জাতিতাত্ত্বিক আবার খিজিরের সঙ্গে দরিয়া পীরের যোগসূত্র নির্মান করেন, কিন্তু আমাদের মনে হয় এটা প্রমাদপূর্ণ তত্ত্ব। এর আগে আমরা বরদারাজন বা আশুবাবু সূত্র উল্লেখ করে দেখিয়েছি পশ্চিম উপকূল আর বাংলায় দরিয়াপীর পুজিত হন কিন্তু তার সঙ্গে খোজা খিজিরের কোন সম্পর্ক নেই। পারসি শব্দভাণ্ডারে সমুদ্রের সমার্থক শব্দ হল দারা বা দরিয়া, ফলে দরিয়া(সমুদ্র) পীর হলেন সমুদ্র যাত্রায় রক্ষাকারী যে কোন পীর, এবং এই সাধারণিতে দরিয়া পীরের ধারণাও আছে। মনে রাখতে হবে দরিয়া পীর কোনভাবেই খোজা পীরের সমার্থক নয়।



কেউ কেউ বলছেন খিজর ইসলাম পূর্ব(পাগান = লৌকিক) দেবতা, এবং এই তত্ত্ব আমার মন টানে, কারণ আমরা দেখেছি, খিজর কাস্পিয়ান সমুদ্রের আশেপাশের পারস্যের তাজিকদের অঞ্চল থেকে শুরু হয়ে সক্ষিণ সমুদ্র অঞ্চলে এসেছে। শুরুতেই আমি বলেছি, হয়ত তাজিকরা এই প্রথাটি দক্ষিণপূর্ব বাংলায় শুরু করে। ইসলামপূর্ব পারসিক নিগূঢ ইসলামি শিয়াবাদের পরম্পরায় খিজর, Hidden Imam বা mahdiর আগেই আবির্ভূত হয়েছেন। নবী আসার আগে তিনিই ছিলেন একমাত্র নবী। পরের অংশে আমরা বিশেষ জলাশয়ের সঙ্গে খিজরের সম্পর্ক আলোচনা করব।

বেরা ভাসান উৎসব৩ - সমুদ্র যাত্রার পাঁচালি - রীলা মুখার্জী

এই পর্বের অনুবাদক সৌরভ রায়(Sourav Roy)।
বেরা-কে 'সঞ্চার' হিসেবে দেখা

ভিক্টর টার্নারের ভাষ্যে 'সঞ্চারের বৈশিষ্ট্য হল যে তা সবসময়েই দোরোখা...সঞ্চারী অস্তিত্বের আঁটো শাঁস কিছু নেই ('লিমিনালিটি অ্যান্ড কমিউনিটি')।' 

কিন্তু বেরা-ভাসান নিয়ে লিখতে গিয়ে আমি রিচুয়াল- সংক্রান্ত 'সঞ্চার'-তত্ব টেনে আনছি কেন? কারণ আমার মনে হয়, 'বেরা'-র চিহ্ন এমন এক দশা-বদলের দিকে ইঙ্গিত করে, যা অন্তর-বাহির আর ব্যক্তিগত-ব্যষ্টিগত-র মধ্যে এক মানস-সেতু।

বেরা এই সম্ভাব্য দশা-বদলের বা সঞ্চারী অস্তিত্বের অনুপান। সেই সঞ্চারী অস্তিত্বের আঁটো শাঁস না থাকলে-ও তা কিন্তু ফাঁপা নয়, কারণ ফাঁপা হলে তাতে নতুন দশার অঙ্কুর আসবে না। খোজা খিজির , যাঁকে বেরা ভাসানের একরকম অধিদেবতা বা এই দশা-বদলের এক আলকেমিস্ট বলা যায়, তিনিও কিন্তু দুই মানসিক দশার এবং জল-স্থলের এক সেতু, যেখানে স্থল যা কিছু ভূত-গত তার, আর জল যা কিছু আধ্যাত্মিক তার, চিহ্ন। অতএব বেরা সঞ্চারের এক অনুপান, তাকে ভাসান দেওয়া এক সঞ্চারী ক্রিয়া। যে মুহুর্তে বেরা জল স্পর্শ করে, তৎক্ষণাত জল-স্থল ও ভৌতিক-আধ্যাত্মিক জুড়ে দিয়ে এক জীবন-সেতু রচনা হয়, যাতে অধিষ্ঠান করেন খিজির।

পল গিলরয় আফ্রো-আমেরিকীয় মানস নিয়ে আলোচনায় দাসবাহী জাহাজ-কে 'মাঝপথ' বলেন। ণীশে-র উদ্ধৃতি তুলে দেন: ' ডাঙ্গা ছেড়ে ভেসে চলেছি। সব পিছুটান কাটিয়ে - মন থেকে ডাঙ্গার সব স্মৃতি রগড়ে মুছে দিয়েছি। এবার মাঝদরিয়ায় এই মোচার খোলের মত 'ছোট্ট নৌকো'-ই ভরসা ! এই দরিয়া কখনও খেপে উঠে গর্জায়, কখনও সোনা-বোনা চীনাংশুকের মত মৃদু লহর দেয়। কিন্তু ভাসতে ভাসতে এক সময় মনে হবে নিঃসীম, আর সীমাহীনতার থেকে ভয়ঙ্কর- সুন্দর আর কিছু-ই নেই।'

ণীশে-র ঐ 'ছোট্ট নৌকো'-ই আমাদের বেরা, যা দুই জগতের মাঝের সেতুচিহ্ন: বাংলার সুফলা জমিন আর সুজলা নদীজাল – যার ওপর ভরসা করে বাংলার মানুষ আজ-ও বেঁচে আছে। এই 'মাঝপথ' তাই এক বানিজ্যপথ যা বেয়ে জমির ও জমির মানুষের উৎপন্ন ধনভার মধ্যগাঙ্গেয় এলাকা আর বঙ্গোপসাগর পারের দেশে দেশে ছড়িয়ে পড়ে ও উপার্জন হয়ে ফিরে আসে। বেরা-ভাসান বাংলার বিভিন্ন জাতের মধ্যেও এক 'মাঝপথ' , যারা বেঁচে থাকে জমি ও দরিয়ার ফসলের ভরসায় । বেরা-ভাসান তাই এমন দরজার চৌকাঠ যাতে সব জাতের পায়ের ধুলো সমান ভাবে পড়ে। এ দরজা সবার জন্য খোলা রাখতেই হয়, কারণ সমাজের সবার রুজিরুটি এই দরজা পেরিয়েই আসে। আর আমরা যদি বেরা-র পারসি-আরবী চিহ্নতন্ত্র কে মানি, তাহলে এই জলযান দুই দরিয়ার 'মাঝপথ', ভৌতিক-আধ্যাত্মিকের যোগ, টার্নারের 'সঞ্চারী'।

বেরা-র এত অর্থ আর এত গুরুত্বের মধ্যে বাছ-বিছার করতে গেলে কি খুঁজতে হবে এর উৎসমুখ ? একে শুরু করেছিল কি জেলেরা না মধ্যযুগের বাংলার জাহাজীরা? 'আরব'-দের কি নিজেদের আলাদা বেরা-ভাসান ছিল, যা পরে এতে মিশে যায়? বাংলার সুলতানি আর মোগল শাসন কি এই প্রথা-কে দাবাতে চেয়েছিল না চাগাতে? এখনো অব্দি এসব প্রশ্নের উত্তর অধরা-ই। 

বেরা অতএব শুধু এক নিরুদ্দেশ যাত্রার অনুপান নয়, এর ভাসান-ও নয় এক ফাঁপা আচার। বেরা-ভাসান দুই ভুবনের, দুই ভূগোলের, দুই বাণিজ্যের সেতুসম্ভব। 

বেরা ভাসান উৎসব৭ - সমুদ্র যাত্রার পাঁচালি - রীলা মুখার্জী

খোজা খিজির প্রহেলিকা

নীলবর্ণের খোজা খিজর সমুদ্রের গভীরতা এবং জলের শুদ্ধতার ইঙ্গিত। তিনি আরবি গল্পকথাতেও খুব জনপ্রিয়। অল খিদরএর(শব্দগতভাবে নীল মানুষ, আর উচ্চারিত হয় খিদর, খিদার, খিজর, খিজার রূপে) অবস্থান গবেষক-তাত্ত্বিকদের কাছে অবিবাদী নয়, কারোর কাছে তিনি ঋষি(Abdan Saalih), কারোর কাছে তিনি নবী। কেউ কেউ বলেন তিনি বাস্তবে ছিলেন। কেউ বলেন তিনি বিশ্বজয়ী উজির, যিনি আব্রাহামের সময় বর্তমান ছিলেন, কেউ আবার তাঁকে আলেকজান্দারের পরামর্শদাতাও বলে থাকেন। Qur’an sura as-Kahf (18:66)এর উল্লেখে মনে করা হয় তাঁর সঙ্গে মোজেস দ্যাখা করেন, মোজেসের জ্ঞান বৃদ্ধি করতে সঙ্গ দিতে অনুরোধ করেন।

আল খিদরের সঙ্গে আলেকজান্ডারের নাম জড়িয়ে আছে। তিনি তাঁর সঙ্গে ছিলেন। তিনি এবং আলেকজান্দার অন্ধকারের পথ পেরিয়ে জীবনের জলের কাছে পৌঁছান। আলেকজান্ডার সেই পথ হারিয়ে ফেললেও খিদর সেখানে যান এবং অনন্ত জীবন লাভ করেন। জর্ডনের মাহিতে খিদরের নামে একটি সমাধি মন্দির আছে। কুয়েতের ফাইলাকা উপকূলে তাঁর নামে উদ্দেশ্য করে বহু প্রাচীন একটি দরগা আছে, অনেকে বলেন সেটি খোঁড়া হলে মেসোপটেময়ার বিপুল বন্যার গল্পকথার সূত্র হয়ত খুঁজে পাওয়া যাবে। যদি পরিকল্পিতভাবে ভারত সাগর, পারস্যের উপসাগর এবং লোহিত সাগর উপকূল অঞ্চলের লোককথা, উৎসব, সামুদ্রিক কৃষ্টির সঙ্গে জুড়ে প্রত্নতাত্ত্বিক খোঁড়াখুঁড়ি করা হয়, তাহলে খিজরের নামে বিপুল সংখ্যক দরগা নজরে আসবে। এই ধরণের নেটওয়ার্কএর দিকে নজর রাখলে দ্যাখা যাবে প্রত্যেক সমাজ তাদের সামাজিক কৃষ্টিগত প্রথা অনুযায়ী খোজা খিজিরকে আপন করে নিয়েছে। ঢাকার কাছে নারায়ণগঞ্জের মধ্যযুগের খিজিরপুরে ষোড়শ শতে ইশা খাঁর রাজধানী ছিল। এটি মুঘলদের হাতে আসার পর সুবা ঘোষিত হয় এবং নাম হয় সরকার বাজুহা খিজিরপুর।

আর্থারের Sir Gawain and the Green Knight গল্পতে যে সবুজ নাইটের কথা বলা হয়েছে, তিনিই খিজর। ধর্ম যুদ্ধের সময় হয়ত সবুজ নাইটের ধারনাটি আরব থেকে ইওরোপে যায় এবং ইওরোপের সবুজ মানুষের চেহারা নেয়। ১২৩৭ সালে তৈরি বাম্বার্গের গ্রিনম্যানের একটা মূর্তি দেখি বামবার্গের ক্যাথিড্রালে ২০০৭এর গ্রিষ্মে, কিন্তু তিনি ছিলেন উর্বরতার প্রতীক। আদতে খাজা খিজরের গল্প গোটা পূর্ব পশ্চিমে ছড়িয়ে গিয়েছে(Cheetham, Tom, 2004, Green Man, Earth Angel: The Prophetic Tradition and the Battle for the
Soul of the World)।

বাংলায় বেরা ভাসানের উতসব খিজরের উদ্দেশ্যে নিবেদিত হয়। সালিম আল্লা তারিখিবাংলায় বলছেন, মুর্শিদকুলি খাঁ আলো দিয়ে সাজানো কাগজের নৌকোগুলি নদীতে ভাসিয়ে নবী খিজরের উদ্দেশ্যে নিবেদন করতেন। ১৯৬১ সালের মুর্শিদাবাদ বিষয়ে West Bengal District Census Handbook, 1961 বলা হচ্ছে, Another old ceremony still observed at Murshidabad … is the Bera or festival of Khwaja Khizr। চার্লস স্টুয়ার্টের History of Bengalএ বলছেন The eastern parts of Bengal are
intersected by rivers and creeks, navigable at all seasons of the year – the mode of travelling is by water – the veneration of the inhabitants for the tutelary deities, who are

supposed to preside over the rivers and waters, is carried to an extreme, both by Hindoos and Mohameddans – even the present governors are obliged to comply with the superstition of their subjects by making, at Dacca, an annual offering to Khwaja Khizr (supposed to be the Prophet Elias) to propitiate his good offices in protecting their inland commerce। ব্লকম্যানের ধারণা এটি হিন্দু উৎসব কিন্তু খিজিরের উদ্দেশ্যে নিবেদিত - the guide of wanderers who lose their way in the darkness of the night। আশুবাবু ব্লকম্যানের দৃষ্টিভঙ্গীকে সমর্থন করছেন। তিনি মনে করেন এটি সিদো, নদী আর গঙ্গাপুজা(পরে এ নিয়ে আলোচনা হবে), এবং খিজিরের মুসলমান উৎসব শুরু করেন নবাব সিরাজউদ্দৌলা। 

Friday, November 17, 2017

বেরা ভাসান উৎসব৬ - সমুদ্র যাত্রার পাঁচালি - রীলা মুখার্জী

পারস্য সূত্র
এবারে আমরা বিপদের দিকে হাঁটছি। যদি শব্দটা খেজর হয় তাহলে এটি পারসি শব্দ হতে বাধ্য। আরবি ভাষীরা একে খিদর উচ্চারণ করবে। Sulayman Hayyim’s New Persian-English Dictionary দুটি শব্দ খেজর আর খেজের পাচ্ছি - noun A Khezr, or the prophet Elias (whose soul is transmigrated into other forms). [Khezr is said to have discovered and drunk of the Water of Life whence he became immortal]’ কিন্তু খেদর নয়। আরবি হলে খিদর হলে এটা আরবি হওয়া উচিৎ। কিন্তু এর আগে আমরা বলেছি, বাংলায় ইলিয়াস নবির পুজা আরবি ব্যবসায়ীরা বাংলায় নিয়ে আসে, কিন্তু খিদর বা খেদর শব্দের কোন উল্লেখ আমরা ইংরেজি-আরবি অভিধানে পাচ্ছি না। কারণ পারসি ভাষায় চারটে জেড অক্ষর আছে, যেগুলোর মধ্যে খুব বেশি উচ্চারণ ভেদ নেই। আরবেরা এই চারটে জেডকে নানাভাবে তাদের ভাষায় ব্যবহার করে। তারা যদি কোন পারসি শব্দ নেয় সেখানে জেডকে কঠোর(harsh) উচ্চারণে ব্যবহার করে। ফলে আরব খিজর/খিদরএ যে জেড ব্যবহার করেছে, তা ইংরেজি উচ্চারণে ড(d)এর মত হবে, ফলে ইংরেজি বয়ানে সেটা খিদরই দাঁড়ায়। আবার জেড উচ্চারণ নিয়ে আরবি পারসি অভিধানে কিন্তু খিজর আর খিদর দুটোই এক।

মনে রাখা দরকার নবম শতের শেষে আব্বাসি খালিফার নেতৃত্বে পারস্য দখল করে বিশেষ করে ক্যাসপিয়ান (Qazvin) অঞ্চলে(El Hibri, Tayeb, Reinterpreting Islamic Historiography: Harul-al-Rashid and the Narratives of the Abbasid Caliphate)। ফলে বহু পারসি শব্দ, বিশ্বাস, প্রথা আজ আরবি কৃষ্টি আর শব্দে ঢুকে পড়েছে।


বাংলায় পার্সি সূত্র থেকে আসা আরবি পারসি শব্দ বহু পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে গিয়েছে। বাংলার উপকূলে নবম শতে আরবি ব্যবসায়ীরা পা রাখেন, অন্যদিকে পার্সিরা আসেন সপ্তদশ শতকে। এটাও হতে পারে আরব ব্যবসায়ীরা ইচ্ছে করে পার্সি আঙ্গিকটা অনুসরণ করে বাংলায় এই প্রথাটা আনার ক্ষেত্রে ব্যবহার করেছে। এটাও এ প্রসঙ্গে মনে রাখা দরকার অনেক সময় নবম শতের পরে দীর্ঘ দিন ধরে পারস্য থেকে বিতাড়িত তাজিকদেরও আরব বলা হত(Ali, M.M., 1985, History of the Muslims of Bengal)। আমরা যথা সময়ে এই বিষয়টা আলোচনা করব। বাংলাদেশে খিজর হলেন খোয়াজ খিজির, যার জলের ওপর নিয়ন্ত্রণ আছে। 

বেরা ভাসান উৎসব৫ - সমুদ্র যাত্রার পাঁচালি - রীলা মুখার্জী

হিন্দু-ইসলামি বিশ্ব
বাংলা আর বাঙালির মনে জল যে একটা অঙ্গাঙ্গী সম্পর্ক তৈরি করেছে তা আমরা প্রতিষ্ঠা করলাম। মাছ, সাপ, শুশুক, কচ্ছপ(tortoises, turtles), গোধিকা(lizards) বাংলার মূর্তিবিদ্যায় বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে(লেখিকার Strange Riches)। ১৫৭৫ সালে বাংলা মুঘল সাম্রাজ্যের অংশ হলে আকবর বাংলায় যে সুবাদার পাঠালেন তার রৌপ্য ফলকে একটি মাছের প্রতীক আঁকা ছিল। সেটি এখনও মুর্শিদাবাদের হাজার দুয়ারি প্রাসাদে রাখা আছে।

কিন্তু ইসলামি কৃষ্টি যেটি মরুভূমির মধ্যে জন্মেছিল, তার সঙ্গে জলের সম্পর্ক কি ছিল? বেরা ভাসানের মত প্রথার উদাহরণ পাচ্ছি প্রথম সময় থেকে পারস্য-বিশ্বজুড়ে এবং ভারতের প্সচিম উপকূলজুড়ে যে সব আরবি ব্যবসায়ী বহুকাল ধরে আসছেন, তাদের সূত্রে(বম্বের উদাহরণ Dr. John Fryer, A New Account of East India and Persia এবং গুজরাটের উদাহরণ Varadarajan, Lotika 1980, ‘Traditions of Indigenous Navigation in Gujarat’, South Asia: Indian Ocean Issue,)। দুটি জায়গাতেই দুটি প্রথা হিন্দু মুসলমান উভয়কেই যুক্ত করেছিল, কারণ সমুদ্র সকলের(সৌরাষ্ট্র আর কচ্ছে দরিয়া লাল উদারিয়ার নাম সাগর দেব আর হিন্দওয়ায়ি পীর জিন্দ – যিনি আদতে লোহানি আর খারওয়াদের বরুণদেবের মতই এবং খিজির পীরকে হিন্দু মসলমান উভয়েই শ্রদ্ধা করেন। বরদারাজন বলছেন খিজিরের নাম দরিয়া পীর বা জিন্দা পীর। আশুতোষ ভট্টাচার্যের বাংলার লোকসংস্কৃতিতে দেখি দরিয়া পীর বাংলাতেও পুজ্য)। ফলে আমাকে এখন দেখাতে হবে বাংলার বেরা ভাসান কিভাবে এবং কেন ভারতীয় সমুদ্র জগতে সমুদ্র দেবতা আর জন্তজানোয়ারদের স্তুতির জায়গা থেকে অন্যান্যদের তুলনায় আলাদা।

কখোনো কখোন এই আচারগুলি কোন পীর বা রক্ষক দেবতা(guardian spirit)কে ঘিরে আবর্তিত হয়। খাজা খিজির, মুসলমান বিশ্বের সমুদ্র যাত্রার রক্ষক দেব, ভারতীয় সমুদ্র বিশ্বের প্রায় সব জায়গায় পূজিত হন। খাজা খিজির ওরফে ইলিয়াস নবিকে বাংলায় নিয়ে আসেন আরব ব্যবসায়ীরা, যখন তারা নিঝঞ্ঝাট সমুদ্র যাত্রা কামনা করত। এই তথ্যগুলি আমাদের ইতিহাস শিখিয়েছে।
(চলবে)

বেরা ভাসান উৎসব৪ - সমুদ্র যাত্রার পাঁচালি - রীলা মুখার্জী

বাংলার নদীমাতৃক বিশ্ব
১৭৮০ সালে জেমস রেনেল বাংলার নদীজাল নিয়ে লিখেছিলেন(Memoirs of a Map of Hindoostan or the Mogul Empire), This inland navigation gives constant employment to 30,000 boatmen – a large proportion of the food, consumed by ten millions of people, are conveyed by water, within the kingdom of Bengal and its dependencies. To these must be added the transport of its commercial exports and imports – the fisheries and the articles of traveling. কোম্পানির এক আমলার কলমে বাংলার উপযোগবাদী নদীজ জালের বর্ণনা কবিত্বময়।

অন্যদিকে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, বেনের মেয়ে উপন্যাসে, মধ্যযুগের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন বন্দর, সপ্তগ্রামে জলটুঙ্গিতে দাঁড় করিয়েছিলেন তার নায়িকা মায়াকে - Maya faced the river which was almost an ocean. She felt that just as there was a city on land, so was there one on water. As far as she could see, boats filled the river. So many people lived and worked on these boats. (When) the boats sailed away she thought; how strange! Just a while back there was this great city on water, now there is only this vast expanse of water. One can barely see land on the other side. There is nothing, just the sky above and the water below (my translation).।(বইটা হাতের কাছে পেলে মূলটা দেওয়া যেত)।

এবারে অষ্টাদশ শতকের এক ভারতীয়, দীন মহম্মদের কলমে নদীর বর্ণনা শুনি(The Travels of Dean Mahomet, A Native of Patna in Bengal, Through Several Parts of India, While in the Service of The Honourable The East India Company Written by Himself, In a Series of Letters to a Friend, ed. Michael, H. Fisher, Berkeleyএর ৩৫ নম্বর চিঠিটা পড়ুন), Here (in Dhaka) is also the residence of a grand Nabob, who, at his accession to the throne, conformable to an old custom, something similar to that of the Doge of Venice on the Adriatic, enjoys a day’s pleasure on the river, (in a barge) sheathed with silver.

দীন মহম্মদ এখানে একটি ভেনিসিয় প্রথার উল্লেখ করছেন, যেখানে প্রতি ২৪ মার্চ Doge(ভেনিসের ম্যাজিস্ট্রেট) প্রবাদপ্রতীম Bucintoro জাহাজ থেকে একটি আংটি জলে ছুঁড়ে ফেলে শহরের সঙ্গে সমুদ্রের বিবাহ নিশ্চিত করেন(রীলার বই The Lost Worlds of Europe)। A Concise History of India বইতে Barbara. Metcalf and ThomasMetcalf লিখছেন Bengal’s wealth was thus at once
made to appear nearly boundless and made familiar by evoking Italy’s canal-laced
‘mistress of the seas’।

সমুদ্র বাণিজ্য যাত্রার সঙ্গে বাংলার অনন্ত ঐশ্বর্যের যোগ অনেকেই লক্ষ্য করেছেন। বেরা ভাসান দুটো সমাজ এবং দুটি ভূচিত্র(landscape)- ভূমিজ এবং সমুদ্রকে একসাথে জোড়ে। এই যোগসূত্র তিনটি খাসএলাকাকে চিহ্নিত করে – সামুদ্রিক, ভূমিজ/নদীজ এবং কৃষি, যা তিনটি কর্ম সমাধা করে – সওদাগরি, চাষ এবং সমুদ্রে ভাসা এবং এই তিনটির পারম্পর্যকে একসাথে বহন করে নিয়ে চলে। এটা আবার জাগতিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক যোগসূত্রকে নিশ্চিত করে।
(চলবে)

বেরা ভাসান উৎসব২ - সমুদ্র যাত্রার পাঁচালি - রীলা মুখার্জী

আমাদের মনে রাখা জরুরি যে, অষ্টাদশ শতক থেকে দক্ষিণ বঙ্গের ঢাকা অঞ্চল জাতি গঠনের আন্দোলনে বিপুল ভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। নবাবি আমলের পরে প্রথম বঙ্গভাগ হয় ১৯০৫ সালের ব্রিটিশ শাসনে, তারপরেরটি ১৯৪৭ সালে পূর্বাঞ্চলটি পূর্ব পাকিস্তান নামে পরিচিত হল এবং ১৯৭১ সালের পরে এই ভূখণ্ডের নাম হল বাংলাদেশ। এই কারণের অবিভক্ত বাংলার উৎসব বেরা ভাসান সীমান্তের দুইপারের বাঙালির একটি যোগসূত্র।

বাংলার ঐতিহাসিক ভূগোলে বেরা ভাসান উৎসবের নানান তাৎপর্য
অবিভক্ত বাংলার তিনটি আলাদা আলাদা ভৌগোলিক এলাকা দক্ষিণ এবং পুর্বে বদ্বীপ, উত্তরে ও পশ্চিমে ছোটনাগপুর মালভূমি এবং বিহারের পাহাড়ি অঞ্চল আর উত্তরপূর্বে পূর্বহিমালয়। যদিও তার উপকূলিয় ভূমি (littoral) খুবই দীর্ঘ - তেমনি বাংলায় পাহাড় আছে, গিরিখাত আছে সমতল জমিও আছে, এই তিনিটি ভৌগোলিক ক্ষেত্র জুড়লে যেন মনে হয় সে সমুদ্র থেকে দূরের(inland) একটি রাজ্য। কৃষি খুব গুরুত্বপূর্ণ উদ্যম, তারপরেই আসে মাছ চাষ।

তাহলে বেরা উৎসবকে আমরা কিভাবে দেখব –সমুদ্র থেকে দূরে থাকা একটি উপকূলিয় ভূমির রাজনৈতিক পঞ্চাঙ্ক হিসেবে? না এই উতসবটা সামগ্রিকভাবে ধর্মীয় চরিত্রের? আজকে কি একে হিন্দু-মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে ঐক্যের নজরে দেখব? না কি একে নবাবদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের বিবৃতি হিসেবে দেখব? ড্রিক কফ (Dirk Kolff, verbal communication, Leiden, September 2006) আমাদের জানিয়েছেন bhashan underscores the fact that capital (either social or material) was seen by nawabi Bengal as becoming fluid। তাহলে কি ধরে নিতে হবে বেরা ভাসান এক সময়ের বাংলার অসাধারণ উতপাদকতা এবং বাণিজ্য প্রচেষ্টার প্রতীক? এটাকে কি আমরা দেখব একটি উৎসব হিসেবে, যেটি সাধারণ জলদেবতাকে সন্তুষ্ট করার উৎসব থেকে শুরু হয়ে বাংলার নবাবদের হাতে পড়ে এটি to create a universal cosmic sphere of power – their own mandala, as it were – by asserting control over natural elements? পরের দিকে বেরার সঙ্গে আলেকজান্ডারের পুরাকথা(myth) নিয়েও আলোচনা করব।

আজও বাংলা সৌর পঞ্জিকার ভাদ্র মাসে বেরা ভাসান উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। আমার ধারণা এই উৎসবটি অনুষ্ঠিত হয় সমুদ্র যাত্রা করে ফিরে আসার মধ্যিখানের সময়টিতে। সামাজিক, ধার্মিক উৎসব এবং বায়ু এবং স্রোত চলাচলের তথ্য থেকে আমরা আন্দাজ করে নিতে পারি, পূর্ব উপকূলের বাংলা এবং ওডিসা থেকে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দিকে বাণিজ্য যাত্রা শুরু হত নভেম্বর ফেব্রুয়ারির মধ্যে এবং সেই যাত্রা ফিরে আসত জুন আর সেপ্টেম্বরে(শ্রীলা ত্রিপাঠি, এল এন রাউতের Monsoon Wind and Maritime Trade: a Case Study of Historical Evidence from Orissa, India প্রবন্ধ দেখুন। একই সঙ্গে পরম পত্রিকার নৌকো সংখ্যায় প্রকাশিত শ্রীলা ত্রিপাঠির একটি লেখাও জুড়ে দেওয়া গেল)। ফলে ভাদ্র, আগস্ট সেপ্টেম্বর বাণিজ্য থেকে ফিরে আসা এবং আবার যাওয়ার মধ্যের মাস হিসেবে গণ্য হয়।

এই সময়টা আদতে বর্ষা মরশুমের শেষের সময় – জল ঝরার মাস – ‘the sending away of the waters’ (Anthony Reid, South East Asia in an Age of Commerce 1450-1680, V.1, The Lands Below the Winds, New Haven and London, দেখুন)। এটি নতুন একটি কৃষি চক্র শুরুর উদ্যমের সময়। নতুন কৃষিচক্র শুরু হওয়ার সময় এই উৎসবের অর্থ, বেরা উৎসব দিয়ে নতুন ফসলি(রাজস্ব) বছর শুরু। তাহলে আমরা দেখলাম বেরা ভাসান সামুদ্রিক বাণিজ্য চক্র আর কৃষি চক্র শেষে অনুষ্ঠিত হওয়ার উৎসব। এর থেকে আমরা ইঙ্গিত পাচ্ছি, এই সাধারণ উৎসবকে বাংলার নবাবেরা কৃষি আর বাণিজ্যযাত্রার ওপরে মণ্ডল (mandala)ভিত্তিক ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের উতসবে পরিণত করেছিলেন।



কিন্তু সাধারণ জল উৎসব বহু সময়ে রাজনৈতিক আগ্রাসন এবং সামরিক বিজয়ের প্রয়োজনে ব্যবহৃত হয়েছে (Reid, Anthonyর ওপরের প্রবন্ধটি দেখুন, তার সঙ্গে দেখুন তাঁর Les Immigrés Intha, La Transhumance des Buffles et la Circumnavigation Bouddhique du Lac Inle: Etat Shan de Birmanie’ in Etudes Birmanes en Hommage à Denise Bernot, Réunis par Pierre Richard et Francois Robine প্রবন্ধটিও)। আমরা জানি বাংলার নবাবি আমল আরাকান, পর্তুগিজ, আফগান এবং মারাঠাদের মত বহিঃশক্তির আক্রমণকে বিফল করেছিল। বাংলার উপকূলে নৌবাহিনী বা নাওয়ারাকে সবসময় যুদ্ধের জন্য তৈরি রাখা হত, এবং সারাক্ষণ উপকূল টহল দিত। আলিবর্দির খাঁয়ের সারা জীবনটাই গিয়েছে বিজিত অবিভক্ত বাংলা বিহার ওডিসার সীমান্তকে রক্ষা করতে।