Showing posts with label মুঘল আমল কেন লুঠেরা নয়. Show all posts
Showing posts with label মুঘল আমল কেন লুঠেরা নয়. Show all posts

Sunday, October 8, 2017

ব্রিটিশরা কেন প্রাথমিকভাবে লুঠেরা৫

তাদের আগের সময়টা কেন চরিত্রগতভাবে নয়

মালগুজারি জমিদার
অন্যান্য এলাকার জমিদারেরা রাজস্ব দিতেন, মুঘল প্রশাসকেরা এদের নাম দিয়েছিলেন মালগুজারি জমিদার। ১৫৯২-৯৩ সালে আকবর একটি ফরমান জারি করে বলেন, প্রত্যেক জমিদার হয় সশরীরে বা তার সন্তান বা তার প্রতিনিধিদের দরবারে জামিন হিসেবে আসুক/পাঠাক। ১৫৯৫-৯৬ সালে আবুলফজল বলছেন শুধু লাহোরেই এ ধরণের জমিদারের সংখ্যা ছিল ২৭টি। জমিদারদের নিয়ন্ত্রণ করার এটা এক ধরণের তরিকা। ফলে মুঘল আর কিছু জমিদারের মধ্যে সঙ্ঘর্ষ অনিবার্য হয়ে উঠল। আকবরের নিমন্ত্রণে চিতোরের রাণা নিজে গেলেন না বা তার সন্তানকেও পাঠালেন না। কিন্তু জাহাঙ্গিরের সময় চিতোরের রাজাকে ছাড় দেওয়া হল এবং সমস্যা দূর হল। পরের দিকে এই নীতি কড়া হাতে প্রয়োগ করা হয়।

জমিদারদের নিয়ন্ত্রণ
আরেকটা পদ্ধতি ছিল পাদশাহের সঙ্গে অমুসলমান রাজার মেয়ের বিবাহ দেওয়া। ১৫৬৩তে এই ধরণের বিবাহে অম্বর, জয়পুরের জমিদার পরিবারের সম্মান বাড়ল। বিহারীমলের কন্যাকে আকবর বিয়ে করলেন। আবুল ফজলের ১৫৯৫-৯৬এর তালিকায় এ ধরণের ৬১জন জমিদারের নাম আছে। এই ৬১র মধ্যে ৪১ জন জয়পুর/আজমেঢ অঞ্চলের। ৪০ জনের মধ্যে ২৭ জনই ছিলেন অম্বরের কাছোয়া পরিবারের। ফলে ঐতিহাসিকেরা অম্বরের রাজপরিবারের উত্থান বিষয়ে এই ধরণের সিদ্ধান্তে এসেছেন।

কিন্তু সাম্প্রতিক ইতিহাসে জানা যাচ্ছে, শুধু অম্বর নয় নানান রাজ পরিবার মুঘল পরিবারে মেয়ের বিয়ে দিয়েছিল। আবার বহু পরিবার মুঘল বংশে বিয়ে দেয় নি অথচ মুঘল প্রশাসনিক স্তরে উঠেছিল এমন উদাহরণ দিচ্ছেন সাম্প্রতিক কালের বেশ কিছু ঐতিহাসিক।

যোধাবাঈ
১৮৭৩ সালে বেভারেজ এশিয়াটিক সোসাইটি জার্নালে লেখেন বিহারী মলের মেয়ের নাম যোধাবাঈ। তিনি জাহাঙ্গিরের মা বলে ইতিহাসে পরিচিত। পরে এই বিতর্ক বাড়তে থাকে। সাম্প্রতিককালের গবেষণায় জানা যাচ্ছে যে বিহারী মলের কন্যার নাম জানা যাচ্ছে না, অন্তত যোধাবাঈ নয়। জাহাঙ্গীর তার মায়ের নাম জানান নি। যখন কোন অমুসলমান মহিলা মুঘল বংশে আসতেন, তখন তার একটা উপাধিওয়ালা নাম দেওয়া হত, রাজা বিহারী মলের কন্যারও নাম দেওয়া হয়। এই বাবদে একটা ফরমানও জারি হয়, কিন্তু সেখানে বিহারী মলের কন্যার কোন নাম উল্লিখিত নেই। উপরন্তু জানাযাচ্ছে, জাহাঙ্গীর যোধপুর রাজের যে কন্যাকে বিয়ে করেন তার নাম যোধাবাঈ। রাজা বিহারী মল, আকবর, জাহাঙ্গীরের মধ্যের সম্পর্ক অথবা ব্রিটিশ ঐতিহাসিকদের তৈরি ইতিহাস আমাদের নতুন করে পড়তে হবে।
বড় জমিদারেরা তাদের ক্ষমতা আর জমি বাড়াবার চেষ্টা করতেন। অষ্টাদশ শতে অম্বরের জয় সিং অন্যের জমি দখল করে তার রোজগার বাড়াবার চেষ্টা করেছেন।

ব্রিটিশরা কেন প্রাথমিকভাবে লুঠেরা৪

তাদের আগের সময়টা কেন চরিত্রগতভাবে নয়
জমিদারদের চরিত্রবিভাগ
মোটামুটি তিন ভাগ
১) বড় জমিদার যাদের উপাধি রাজা, পারসিতে যাদের বলা হত জমিদারানিউমদা
২) মাঝারি জমিদার, খুব বড় নয় খুব ছোটও নয়
৩) প্রাথমিক স্তরের, ছোট জমিদারি
এইভাবে মোটাদাগে দাগিয়ে দেওয়ার একটা সমস্যা আছে। একটি জমিদারির চরিত্র কোথাও কোথাও আবার অপরের সঙ্গে মিলে মিশে যেত। একটা বড় জমিদারিতে মাঝারি বা প্রাথমিক ছোট জমিদারি থাকত। কিন্তু কখোনো কখোনো বড় জমিদারই কোথাও কোথাও প্রাথমিক জমিদার ছিল। আমার প্রত্যেকটার চরিত্রও একশিলা ছিল না। আবুলফজল বড় জমিদারদের চরিত্র বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বলছেন, ১) কোন এলাকার জমিদার অর্থাৎ কাংড়া বা জম্মুর রাজা, ২) আদিবাসীদের রাজা, বালুচ রাজা। তিনি আদিবাসীদের জমিদারদের আলুস বলছেন।
যদিও এই দুয়ের পার্থক্য খুব সামান্য। আদিবাসীদের রাজার নিজস্ব জোর ছিল তাদের সংঘবদ্ধ সমাজের, যেখানে রাজা সেই সমাজকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। মনে রাখতে হবে তার রাজত্বে আদিবাসি ছাড়াও অন্যান্য সমাজ আছে। ফলে দুটির আভ্যন্তরীণ রাজনীতি আলাদা ছিল। শুধু আদিবাসী এলাকা হলে ব্যাপারটা সরল, কিন্তু অনাদিবাসী রাজত্বের হলে বেশ ঝঞ্ঝাটের।
পেশকাশ
বড় জমিদারদের কেন্দ্রিয়স্তরে উপঢৌকন, যার নাম পেশকাশ, সেটি পেশ করতে হত। পেশকাশ দুধরণের
১) পেশকাশ এবং সামরিক সাহায্য
২) শুধুই পেশপকাশ, কিন্তু কোন সামরিক সহায়তা নয়। এদের বলা হত পেশকাশিজমিদার।
দুধরণের জমিদারই পেশকাশ দিতেন। কিন্তু কোন শর্তে কয়েকজন জমিদার কেন ও কিভাবে সামরিক সাহায্য দিতেন তা আজ আর জানা যায় না। আইনিআকবরি থেকে দ্বিতীয় ধরণের জমিদারদের বিশদ আলোচনা পাচ্ছি।
পেশকাশিজমিদার, অর্থাৎ যারা সামরিক সাহায্য না দিয়ে শুধুই তাদের রাজস্ব নির্ভর করে পেশকাশ দিত তাদের রাজস্বের একটা তালিকা করেছেন আবুলফজল। বড় জমিদারেরা খুব শক্তিশালী ছিল। মুঘল আমল সেটা স্বীকার করত। বাবুরনামায় স্বয়ং বাবুর এ কথা বলে গিয়েছেন। তিনি বলছেন দেশের মোট জমির একষষ্ঠাংশের অধিকার ছিল বড় জমিদারদের। তাদের প্রচুর হাতি, বন্দুক এবং সেনা ছিল, তার সংখ্যাও তিনি দিয়েছেন। তিনি বলছেন মুঘলদের একটা জোরের যায়গা ছিল যে বড় জমিদারেরা যৌথতায়, একতায় বিশ্বাস করত না, তারা প্রত্যেকেই একচ্ছত্র ছিল। ফলে তাদের হারানো সোজা ছিল।
পেশকাশি জমিদারেরা স্বাধীন থাকতে পছন্দ করতেন কিন্তু মুঘল সাম্রাজ্যের উদ্দেশ্য ছিল তাদের রাজস্ব দেওয়া অর্থাৎ মালগুজারি জমিদারে পরিণত করা। ফলে কত তাড়াতাড়ি এই পেশকাশ দেওয়া যাবে সেটা নিয়েও টানাপোড়েন চলত। সাধারণত পাদশাহ যখন জমিদারির আশেপাশে আসতেন তখন রাজা তার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করে পেশকাশ দিতেন। এখানে সমস্যা ছিল। ১৬১০ সালে যশোরের রাজা প্রতাপাদিত্য, সে সময়ে বাংলার সব থেকে বড় জমিদারকে জোড়তালাও অর্থাৎ বিদ্রোহী জমিদার হিসেবে দেগে দেওয়া হল। কেননা তিনি নিজে থেকে সুবাদারের সঙ্গে দেখা করতে আসেন নি। জমিদারদের নিয়ে মুঘলদের অস্বস্তি বোঝা যায় জমিদার আর প্রশাসন/পাদশাহীর মধ্যে হাজারো প্রথা নীতি প্রণয়নের ইতিহাসে।

ব্রিটিশরা কেন প্রাথমিকভাবে লুঠেরা৩

তাদের আগের সময়টা কেন চরিত্রগতভাবে লুঠেরা নয়।

ব্রিটিশদের জমিদারদের জমির সত্ত্ব দেওয়ার নিজস্ব যুক্তি ছিল।

১) স্থানীয় ক্ষমতাশালী মানুষদের প্রশাসনের লুঠের চরিত্রের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া

২) এবং আমাদের দ্বিতীয় যুক্তি হল পলাশীর পর চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের আগের তিন দশকে বিপুল বাংলা লুঠ আর ধ্বংসকার্যে বাঙ্গালার আমলা, দালাল আর ব্যবসায়ীরা যুক্ত ছিলেন। সাম্রাজ্যের ছোটতরফ হিসেবে সেই কাজ করতে গিয়ে তারা লুঠের এক ক্ষুদ্র অংশ যা বাংলার ভদ্রসমাজের নজিরে বিপুল সম্পদ, পেয়েছিলেন উপহার হিসেবে, সেটকে নতুন করে হস্তগত করা।

মুঘল সময়ে রাষ্ট্র নিত জমির উৎপাদনের একাংশ। কিন্তু কোম্পানি ১৭৯৩এর পরে দীর্ঘ পরম্পরার বাইরে বেরিয়ে গিয়ে স্থির করল তারা উৎপন্ন নয় জমির পরিমান ভিত্তিতে তারা রাজস্ব আদায় করবে। মুঘল আমলে ফসল না উৎপন্ন হলে চাষী/রায়তকে রাজস্ব দিতে হত না – ফসলের চরিত্রের ওপরে নির্ভর করত রাজস্বএর পরিমান – বিক্রির জন্য হলে তার রাজস্ব বেশি আর খাদ্যের জন্যে হলে রাজস্ব কম। কিন্তু ব্রিটিশ আমলে রাজস্বের সঙ্গে ফসল উৎপাদনের বিন্দুমাত্র কোন যোগ রইল না। ব্যবস্থাটাই আলাদা হয়ে গেল। ব্রিতিশরা ঠিক করল জমির মালক হল জমিদারেরা ফলে জমির উৎপন্ন ফসলের সঙ্গে জমির রাজস্বের কোন যোগ রইল না। ফসল উৎপাদন হোক আর নাই হোক, জমিদারের দায় হল জমির রাজস্ব দেওয়া।

মুঘল আমলের প্রথম এবং শেষার্ধে ভুমি রাজস্ব বিষয়ে কিছু তথ্য পাচ্ছি। প্রথমটা সপ্তদশ সতের মধ্যখান সময়ের আলি মহম্মদ খান লিখেছিলেন মীরাটিআহমদি। তার বক্তব্য ছিল মুঘল রাজস্বের দুটি ভাগ ছিল একটির নাম ছিল বন্থ, যা জমিদারদের প্রাপ্য, অন্যটি তালপাড়, কেন্দ্রের প্রাপ্য।

ষোড়শ শতের শেষের দিকের পাণ্ডুলিপি গুজরাটের সুবাদার খানইআজম একই মন্তব্য করছেন তার নির্দেশনামায় বা ফরমানে। সেগুলি তুলে দেওয়া গেল

১) সে দেশের মানুষের জন্য একচতুর্থাংশ জমি বরাদ্দ থাকবে। সেই সপব জমি থেকে কোন রাজস্ব আদায় হবে না।

২) জমিদার কন সময়েই মোট উৎপাদনের অর্ধাংশের বেশি রাজস্ব হিসেবে নিতে পারবে না।

৩) খরদকৃত জমি বিক্রি করতে পারবে জমিদার।

অর্থাৎ জমিদার রাজস্ব দেওয়ার পর জমিদারের অধিকার অসীম ছিল। আমাদের ধারনা, যদিও এটা প্রমানের জন্য হাতে কোন প্রামান্য নেই, কিন্তু সারা মুঘল ভারতেই কিন্তু একই ধরণের তত্ত্ব চালু ছিল।

ব্রিটিশরা কেন প্রাথমিকভাবে লুঠেরা২

তাদের আগের সময়টা কেন চরিত্রগতভাবে নয়

মালিকানা
জমির মালিক কে?
এই বিতর্কটা যদিও সমাধা হয় মোটামুটি ১৭৯৩ সালে কর্নওয়ালিস যখন বাংলায় চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তন করলেন(মনে রাখা দরকার এই সময়ে দক্ষিণে কিন্তু কিছুটা জমিদারি এবং ব্যপ্তভাবে রায়তিয়ারি ব্যবস্থা – রায়তের থেকে সরাসরি অর্থ গ্রহনের প্রথা চালু ছিল)। এই বিতর্কটা ইওরোপিয়দের মধ্যে শুরু হয়েছিল সপ্তদশ শতে ফ্রান্সিস বার্নিয়ের মন্তব্য থেকেই। বার্নিয়ের বক্তব্য ছিল জমিদারই জমির মালিক। বার্নিয়েরের পরে যে সব ইওরোপিয় পর্যটক বাংলায়/উপমহাদেশে এসেছেন, তারা বিনাবাক্যব্যয়ে তাঁর অনুমানটাই সত্য ধরেছেন। ১৭৯৩র আগে বাংলায় ব্রিটিশ এবং বাঙ্গালি আমলাদের মধ্যে এই নিয়ে তীব্র বিতর্ক এবং মতভেদ হয়। ফিলিপ ফ্রান্সিসের ধারনা জমির মালিক হলেন জমিদার। তার প্রবল বিরোধী ওয়ারেন হেস্টিংস এবং রিচার্ড বারওয়েলও এই মতের শরিক। কিন্তু ভারতীয় আমলারা নন। বিহারের নায়েব দেওয়ান, সিতাব রায় জমিদার হয়ত জমির মালিক, কিন্তু রাজা হলেন জমির স্বত্ত্বাধিকারি। সমকালীন কানুনগো রাম রাম চৌধুরীর বক্তব্য ছিল জমিদার আর রাজা উভয়েই জমির যৌথ মালিকানা ভোগ করেন। রাজা রাজবল্লভএর মত রাজাই জমির মালিক।

ফলে লুঠ যখন সরকারের প্রশাসনিক হাতিয়ার, তখন সেটা আরও কত সুচারু রূপে করা যায় তা নিয়ে চিরস্থয়ী বন্দোবস্ত পূর্ব সময় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী তাত্ত্বিকদের মধ্যে বিতর্ক চলছিল। ফলে জমির মালকানা আদতে কার, তাই নিয়ে তাদের মাথাব্যথার অন্ত ছিল না – কারণ পলাশীর পরেপরেই বাংলা জুড়ে চলছে লড়ায়ের আবহ – সরাসরি রায়তদের থেকে বর্ধিত রাজস্ব তোলা মুশকিল।

কোম্পানির ভূমি রাজস্ব আমলা মুরল্যান্ড বললেন মুঘল আমল অর্ধস্বাধীন জমিদারদের সময়। তাদের ক্ষমতাও প্রবল ছিল। 'প্রভিনশিয়াল গভর্মেন্ট অব মুঘলস ১৫২৬-১৬৫৮' বইতে পরমাত্মা সারণ বলছেন মুঘল আমলে সব জায়গায় জমিদারদের অস্বিত্ব ছিল না। সমস্যা হল সারণ ব্লকল্যান্ডের আইনিআকবরিকে কোন প্রশ্ন না করেই অনুসরণ করে গিয়েছেন, ফলে তিনি সে সময়ের সামাজিক অবস্থা নিয়ে নানান ভুল সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন।

জমিদারদের ভবিষ্যৎ
কার কাকে দরকার?
মুঘল আমলে জমিদারদের দুটি পরস্পর বিরোধী চরিত্র ছিল
১) জমিদার রাজা/নবাব/পাদশাহের সুরক্ষায় থাকতে চাইতেন, কিন্তু তাদের নির্দেশ মানতে রাজি ছিলেন না
২) রাজা/নবাব/পাদশাহ জমিদারদের থেকে ভূমিরাজস্ব আদায় করতেন, কিন্তু জমিদারদের স্বাধীনতা দিতে তার সমস্যা ছিল।



গোটা মুঘল আমলে এই দুই পরস্পর বিরোধী চরিত্র কাজ করেগিয়েছে। মুঘল আমলে বলা যায় জমিদারি ব্যবস্থা রাবড়ি ব্যবস্থায় কাজ করেছে, ওপর দিক থেকে পাদশাহেরা বাতাস দিয়েছেন আর নিচ থেকে তাদের সুবার প্রতিনিধিরা দিয়েছেন আগুশে সেঁক। জমির মালকানা নিয়ে প্রবল বিতর্ক ছিল। কিন্তু সেটার কোন সমাধান বের হয় নি। সে সময়ের ভারতীয় আমলারাও খুব একটা পরিণত সিদ্ধান্তে আসতে পারেন নি। পাদশাহদের কড়া নির্দেশ ছিল পতিত জমি উদ্ধার এবং সেই কাজে রায়তদের সহায়তা করা এবং তাদের থেকে জমি চাষের পরে উৎপন্ন ফসলের একাংশ রাজস্ব হিসেবে নেওয়া। তারজন্য তারা নানান ধরণের পরিকল্পনা করেছিলেন যা আমরা অতীতে নানান সময়ে আলোচনা করেছি। মন্বন্তর হলে চাষ খারাপ হলে সেই সময়ে ভূমি রাজস্বে ছাড় ছিল। কিন্তু ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের পরে কোম্পানির রাজস্ব আদায় বেড়েছিল।

ব্রিটিশরা কেন প্রাথমিকভাবে লুঠেরা১

তাদের আগের সময়টা কেন চরিত্রগতভাবে নয়

কয়েকদিন আগে আমরা চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নিয়ে একটা লেখা লিখেছিলাম – মূলত বাম ঐতিহাসিকেরা চিরস্থায়ী বন্দোবস্তকে কোন দৃষ্টিতে দেখেছেন সেটা বোঝা এবং আমাদের পথ/তত্ত্ব নির্ণয়। বাম ঐতিহাসিক বর্ণিত সামন্ততন্ত্রতত্ত্ব আমাদের পক্ষে চরিত্রায়ন করা মুশকিল। উপমহাদেশের অর্থনীতি সামন্ততান্ত্রিক নিগড়ে বাঁধা ছিল কি না তাও জানি না। প্রথমে সুলতানি সময়, তারপরে মুঘল আমল তারপরে বাংলার মুঘল-নবাবি আমলের বিভিন্ন দিক আলোচনা করতে গিয়ে দেখেছি, রাষ্ট্রের নীতি ছিল চাষী এবং কারিগরদের লালন-পালন। সে তত্ত্ব আমরা সরাসরি পেয়েছি চরমতম মুঘল রাষ্ট্র বিরোধী আচার্য যদুনাথ সরকারের দ্য মুঘল এডমিনিস্ট্রেশন এবং মুঘল আমল সংক্রান্ত নানান পুঁথি/পাণ্ডুলিপি অনুবাদে এবং ব্রিটিশ পলাশীলুঠ পূর্ব বাংলা আলোচনায়। তো আরেকবার আমরা নতুন করে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের নানান দিক নিয়ে একটু আলোচনা করব। সেখানেও দেখব যে আমাদের এই তত্ত্বের সমর্থন, এবং কেন আমরা ব্রিটিশ আমলকে লুঠের আমল বলতে চাইছি।

জমিদার
জমি পার্সি শব্দ মানে ভূমি, দার উপসর্গ অর্থে ধারক, দুয়ে মিলিয়ে জমিরধারক। কিন্তু সরাসরি বলা হল না জমির মালিক। মুঘল আমল ধারক এবং মালিক, এই দুটি ধারনা নিয়ে কোন সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারে নি। জমির মালিক আদতে কে, তা নিয়ে সে সময়ে বিশদে আলোচনা হয়েছে, তর্ক বিতর্ক হয়েছে।

জমিদারি ব্যবস্থা মোটামুটি মুঘল আমলের সৃষ্টি – যদিও তার বহু আগে থেকেই জমিদারি নামে হয়ত নয়, কিন্তু নানান রূপে এই ব্যবস্থাপনাকে লালনপালন করা হয়েছে। বলা হয়, মুঘল আমলে এমন কোন পরগণা ছিল না যেখানে জমিদারের অস্তিত্ব নেই। কিন্তু বহু গ্রামের অস্তিত্ব ছিল উপমহাদেশে, যেখানে জমিদার ছিল না, কিন্তু গ্রাম পঞ্চায়েতে মোড়োলের/মণ্ডল/মুকদ্দমএর অধীনে গোটা গ্রামের স্বায়ত্ত্বশাসন বর্তমান ছিল। জমিদারদের মধ্যে তারতম্যই শুধু নয় জমিদারি ব্যবস্থার মধ্যে বহুধা পার্থক্য আমাদের বুঝিয়ে দেয় যে জমিদারি ব্যবস্থা মুঘল আমলে উদ্ভুত হয় নি, দীর্ঘকালের নানান পরীক্ষানিরীক্ষার মধ্যে দিয়ে তার বিবর্তন এসেছে।