Showing posts with label অড্রে ট্রুস্কে. Show all posts
Showing posts with label অড্রে ট্রুস্কে. Show all posts

Saturday, November 30, 2019

বাংলায় নতুন আওরঙ্গজেবের এক বছর

বাংলায় শেকড় ছড়াচ্ছে উপনিবেশ বিরোধী আন্দোলন
আত্মজার Arunava শেষ দেখেই ছেড়েছিল এক বছর আগে। এক বছর ধরে Audrey Truschkeর অড্রে ট্রুস্কের "আওরঙ্গজেব দ্য ম্যান এন্ড দ্য মিথ" বইটা প্রদর্শন/বিক্রি করেছে আত্মজা পাবলিশার্স। আমরা আওরঙ্গজেব পড়তে শিখেছি আচার্য যদুনাথ সরকার ইত্যাদির একমাত্রিক ঐতিহাসিক বয়ানে। ট্রুস্কের আওরঙ্গজেব আওরঙ্গজেব সাদা-কালোয় চিত্রিত হয়েছেন। সেই ব্যতিক্রমী কাজ বাংলায় নিয়ে আসতে পেরে আনন্দ হচ্ছে। একরামূল হক শেখদাদা, DillUr এবং আরও অনেকেই স্বইচ্ছায় বইটির প্রচার দিয়েছেন, তাঁদের অজস্র কৃতজ্ঞতা।
বইটা উপনিবেশ বিরোধী আন্দোলনের সক্রিয় কর্মীদের খুব কাজের। সব থেকে আকর্ষণীয় দিক, এটা আম-জনতার পাদটিকাহীন সুস্বাদু তরতরিয়ে পড়া যায় এমন জীবনী পাঠের বই যেমন, তেমনি যারা পাদটিকা-রসে বঞ্চিত না থেকে মানুষটার ঐতিহাসিক তাত্ত্বিক রূপ রস গন্ধ খুঁজবেন, তারাও অসামান্য রসদ পাবেন। ট্রুস্কে বেশ কিছু ফার্সি ভাষার পাণ্ডুলিপি থেকে তথ্য আহরণ করেছেন যেগুলি আজও প্রকাশনার মুখ দেখে নি।
অড্রে বইতে সরাসরি বলেছেন আওরঙ্গজেব ইতিহাসের খলনায়ক কেন। তারমানে এই নয় অড্রে আওরঙ্গজেবকে মহান বানাবার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছেন। নানান অনৈতিক কাজের সমালোচনা যেমন করেছেন তেমনি আওরঙ্গজেবকে যেভাবে ঔপনিবেশিক ইতিহাস খলনায়ক বানিয়ে তার প্রয়োজনীয় সম্মানটুকু থেকে বঞ্চিত করেছেন, তিনি সেই ঐতিহাসিক ভুলটা খণ্ডন করেছেন।
আশাকরি বাংলা প্রকাশনা জগতে ট্রুস্কের বইটা নতুন করে বিতর্ক জাগাবে এবং ইতিহাসে সব থেকে ঘৃণিত পাদশার অন্তঃস্থলে অবশ্যই পৌঁছবার চেষ্টা করবে বাঙালি। এইটুকু তো আশাই করা যায়!
----------------------------------------
স্পষ্ট করে কতগুলো কথা বলা দরকার। অড্রে ট্রুস্কে হিন্দুত্ববাদী এবং তাদের জনক ঔপনিবেশিক ইতিহাসকারদের কাছে ঘৃণিততম ব্যক্তিত্ব আওরঙ্গজেবকে নিয়ে কলম ধরেছেন। নেটে গেলে বুঝবেন কিভাবে হিন্দুত্ববাদী ওয়েবসাইটগুলো তার বিরুদ্ধে গোলাগুলি চালাচ্ছে। বলা দরকার হিন্দুত্ববাদীদের ঘৃণার বারুদে জল ছেটানোর কাজ করছেন ট্রুস্কে নিয়মিত হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির বিপক্ষে লিখে।
আমাদের কাছে আওরঙ্গজেব এবং তাঁর সময় বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ এই কারণেই যে আওরঙ্গজেব মারা যান পলাশী চক্রান্তের ঠিক ৫০ বছর আগে। ফলে আমরা যারা ঔপনিবেশিক পূর্ব সময়কে, উদ্বৃত্ত অর্থনীতির দেশ বাংলা তথা সামগ্রিক উপমহাদেশের অবস্থা কারিগরদের চাষীদের অবস্থা জানতে চাই, তাহলে আমাদের অবশ্যই আওরঙ্গজেবকে এবং তাঁর সময়কে জানতে হবে। এই উদ্বৃত্ত অর্থনীতির কিছুটা শ্রেয় আমাদের দিতে হবে আওরঙ্গজেবকেও। তাই ট্রুস্কের বইটাকে ধরা।
আরও একটা বড় ব্যাপার হল, সাধারণতঃ শিক্ষাক্ষেত্রের গবেষণা সংক্রান্ত বইগুলি হয় ধরিমাছ না ছুঁই পানি অথবা সরাসরি উপনিবেশের পক্ষে বিবৃতি দান গোছের। অড্রে ট্রুস্কে সে পথ সযত্নে পরিহার করেছেন, বরং সজোরে তাঁরা ধারণা প্রকাশ্যে বিবৃত করতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠা বোধ করেন নি।
অড্রে ট্রুস্কের আওরঙ্গজেব সংক্রান্ত গবেষণা কতটা সমসাময়িক সেটা বোঝা যায় এই তিন মন্তব্যে -
১) "ভদ্রবিত্তিয় দৃষ্টিভঙ্গীতে কোন এক বড় কাঠামোর পতনের কারণ(মোঘল সাম্রাজ্য পতনের কারণ) খোঁজার সমস্যার সমাধানের গল্প তৈরি হয় সেই ঝামেলার একটি নৈতিকতা নির্ভর গল্প তৈরি করে, সেই গল্পে, সেই পরিবেশে একজন নায়ককে দুর্বৃত্ত হিসেবে গুঁজে দিয়ে, সেই বেঁড়ে ব্যাটাকেই বিশাল বড় সাম্রাজ্যের পতনের মুল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করায়। আজকাল ইতিহাসে মুসলমানেদের দুর্বৃত্ত দেখানোটাই চল হয়েছে। আওরঙ্গজেবের ঐতিহাসিকদের সহজ টার্গেট হন তার গভীর ধর্মচর্চার কারণে।"
২) "আওরঙ্গজেবকে নিয়ে দুটি ভাষ্য বাজারে চালু রয়েছে – ধর্মান্ধ আওরঙ্গজেব এবং ধার্মিক আওরঙ্গজেব। এই দুটোই বিভ্রান্তকারী – এবং বহু সময় বিধ্বংসীও বটে – যেভাবে অতীতে ধর্মান্ধ আওরঙ্গজেবকে উপস্থাপন করা হয়েছে হিন্দু আর হিন্দুস্থানের ধ্বংসকারী হিসেবে। রাজনৈতিক নেতা এবং অন্যান্যরা ভারতে এই ধারনাটা ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন মুসলমান বিরোধিতা এবং বিদ্বেষ চাগিয়ে তোলার জন্যে এবং ভারতীয় মুসলমানেদের দাগিয়ে দেন বিপজ্জনক বিশ্বাসঘাতক হিসেবে। আওরঙ্গজেব নিজে গোঁড়া মুসলমান ছিলেন এই ধারনাটাও সমস্যার – মহম্মদ ইকবালের ভাষায় Muslim—an Abraham in India’s idol house। এই ধারনাটির প্রতীতিটি হল মুসলমানেদের মূলত ধার্মিক বিশ্বাসেই নির্ভরতা এবং ইসলামের সঙ্গে হিন্দুত্বের সঙ্গে ইসলামের তফাত ঘোচার নয়। ভারতের ক্ষেত্রে এটার অর্থ সমঝে দেওয়া হয় মুসলমানেরা পুরপুরি ভারতীয় হতে পারে না, উল্টো দিকে পাকিস্তানের বয়ান বলে সব নাগরিককে একটা নির্দিষ্ট ধরণের ইসলামের অনুগামী হতেই হবে।"
এবং
৩) “তিনি আধুনিককালের আধুনিক মনন সঞ্জাত হিন্দু-মুসলমান দ্বন্দ্ব তৈরিতে উৎসাহীই ছিলেন না – বরং তিনি যাকে ন্যয় বিচার বলে ভাবতেন সেটি দেওয়ার চেষ্টা করতেন, মুঘল প্রথা অনুসরণ করতেন এবং উপমহাদেশে তাঁর পকড় বজায় রাখার উপায় বার করতেন।”
গত এক বছর সহৃদয় পাঠকেরা নতুন এক আওরঙ্গজেবের জন্যে উৎসাহী হয়েছেন। যুবা প্রকাশককে ধন্যবাদ এ ধরণের ব্যতিক্রমী বই বাজারে আনার সাহস দেখাবার জন্যে।

Saturday, December 29, 2018

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা - মিথ-মিথ্যা মুক্ত আওরঙ্গজেব - অড্রে ট্রুস্কের ব্যতিক্রমী কাজ

পলাশী উত্তর সময়ে উপনিবেশ তার লুঠ, খুন, গণহত্যা, অত্যাচার, অনাচার, অভিচার, অরাজক অবস্থা ঢাকার জন্যে উদ্দেশ্যপূর্ণভাবে এক সময়ের বিশ্বকেন্দ্র এশিয়া, তার কেন্দ্র উপমহাদেশ, উপমহাদেশের প্রধানতম উর্বর এলাকা বাংলা ভূখণ্ডের স্বচ্ছলতার জন্যে দায়ি সামাজিক কাঠামোগুলো ভাঙতে পরিকল্পিত মিথ্যা তত্ত্ব তথ্য ছড়ানো শুরু করে। নবাবি আমলের ঐতিহাসিকদের দিয়ে প্রায় অসত্য ইতিহাস লিখিয়ে বাংলা দখলের উপযোগিতা প্রমান করে।
শশাঙ্ক, পাল, সেন, সুলতানি, মুঘল এবং নবাবি আমলে বাংলা ভূখণ্ড ধারাবাহিক বিশ্ব বাণিজ্য প্রচেষ্টায় অসীম উচ্চতায় উঠেছিল। রাজা, পাদশা, সুলতান, নবাবেরা সুপ্রাচীন এশিয় সামাজিক রীতিনীতি মেনে সামাজিক কারিগর উৎপাদন ব্যবস্থাকে শুধু জোরদারই করেন নি, একই সঙ্গে কারিগর, চাষী এবং অন্যান্য সেবাদায়ীদের যতটা পারা যায় সামাজিক সুরক্ষা দিয়েছিলেন। তারাই ছিলেন চাষী আর কারিগরদের শেষ পালক।সারা বিশ্বের বণিকেরা ছুটে আসতেন বাংগালায় ঘাঁটি গেড়ে ব্যবসা করার উদ্দেশ্যে।
বাংলায় শুধু অসামান্য কারিগরই ছিলেন না দুর্দান্ত কৃষকও ছিলেন। দুরন্ত কৃষকেরা বাংলার বিপুল অকৃষি কারিগরদেরই মুখে নিরন্তর অন্ন জোগান নি, তাঁরা উপমহাদেশের কৃষি ঘাটতি এলাকা এবং মহাদেশের নানান দেশে খাবার রপ্তানি করেছেন নিয়মিত। প্রাকৃতিক সামরিক দুর্যোগে কৃষকদের বিনা সুদে হয়ত বা নামমাত্র সুদে তাকাভি নামক ঋণ দেওয়া হত। কৃষক কারিগরের ওপর যে কোন রকম অত্যাচার শক্ত হাতে দমন করা হত নবাব/পাদশার নির্দেশে। মুর্শিদকুলির দরবারে জমিদারেরা ভয়ে থাকতেন যদি তার এলাকায় প্রজাদের ওপর অত্যাচারের অভিযোগ আসে।অভিযোগ তৎক্ষণাৎ বিচার করে প্রমান হলে জমিদারদের বৈকুণ্ঠ দেখানোর ব্যবস্থা থাকত।
তো ক্ষমতায় আসার এক দশক পেরোনোর পরেই বাংলা-বিহারে বিপুল গণহত্যা নামিয়ে আনে কোম্পানি সরকার। মানুষের দুখ লাঞ্ছনা দুরছাই করে সেই বছরইগুলিতেই সব থেকে বেশি রাজস্ব আদায় করে। ব্যবসা দখল, কৃষক কারিগর উচ্ছেদ, এলাকায় এলাকায় শাসন কাঠামোর অবলুপ্তি ঘটতে থাকে। ভদ্রবিত্তরা লুঠ-অত্যাচারের শরিক হয়ে দেশিয় জ্ঞান তুলে দিতে থাকে ব্রিটিশদের, যাতে তাদের লুঠকর্মটা সঠিকভাবে সমাধা হয়।
এই সামগ্রিক গোলোযোগের অবস্থা চাপা দিতে উপনিবেশ আর তার বন্ধুরা ব্রিটিশ সুশাসনের ঢাক পেটানোর সঙ্গে পলাশীপূর্ব অসত্য অরাজক অবস্থার কথা কম্বুকণ্ঠে বলতে থাকে। আড়াই শতকের মিথ্যা ছড়ানোর এই ঔপনিবেশিক প্রচারে অনেকের সঙ্গে দুই প্রকৃত শাসক সিরাজ আর আওরঙ্গজেবের গায়ে যথেষ্ট কালি ছেটানোর কাজ করেন প্রখ্যাত প্রথিতযশারা। ব্রিটিশপূর্ব সময়ে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে সদ্ভাব ছিল না এবং ধর্মীয় ভাবনায় আচ্ছন্ন হয়ে মুসলমান শাসকেরা(নানান লব্জের মধ্যে শাসকদের জাত বিচারের লব্জটাও উপনিবেশের দান, যদিও পশ্চিমিরা নিজেদের খ্রিষ্ট শাসক কোনও দিনই বলে নি) হিন্দুদের ওপর অমেয় অত্যাচার করেছে, বেশ কয়েক হাজার মন্দির ধ্বংস করেছে ইত্যাদি রটনা রটিয়েছে যতটা সম্ভব।
আওরঙ্গজেবের কথিত ধর্মান্ধতা এবং তার সময়ের নানান বিষয়ের পাদশার তথাকথিত অপারগতা নিয়ে যদুনাথ সরকারের অসাধারণ কিছু পথভাঙ্গা কাজের(যেমন মুঘল এডমিনিস্ট্রেশন) মধ্যে দগদগে ঘায়ের মত দাঁড়িয়ে আছে আওরঙ্গজেব সম্বন্ধে অমেয় অনৃত তথ্য। বঙ্গ-পাঞ্জাব ভাগের বহু আগে থেকেই এই আরোপিত ইতিহাস স্বচ্ছল, পশ্চিমি শিক্ষায় শিক্ষিত উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে বিপুল প্রভাব ফেলেছে। এর ধাক্কা আজও গোটা উপমহাদেশীয় দেশগুলি সামলাতে সামলাতে নাজেহাল।
অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়, নিখিলনাথ রায়, ইত্যাদিরা আরোপিত ইতিহাসের কুয়াশা সরিয়ে সত্যের যে লড়াই লড়েছিলেন, সে কাজ এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন রিচার্ড ঈটন এবং খুব সম্প্রতি অড্রে ট্রুস্কে এবং সুশীল চৌধুরী মশাই। ট্রুস্কে অসামান্য দক্ষতায় যেভাবে ঘৃণিত আওরঙ্গজেবের দোষ গুণ এবং তার সময়ের রাজনৈতিক ভাবনায় প্রণোদিত পাদশা হিসেবে মানবিক বিচার করেছেন, সে প্রচেষ্টা দুর্লভ। সাম্প্রতিককালে রাজীব কিনরা রাইটিং সেলফ রাইটিং এম্পায়ার বইতে আওরঙ্গজেব পর্যন্ত তিনজন গুরুত্বপূর্ণ পাদশার সঙ্গে কাজ করা মুন্সি চন্দর ভান ব্রাহ্মণের জীবন এবং সেই সঙ্গে মুঘল শুলইকুল(সবার জন্যে শান্তি) নীতি নিয়ে বিশদে অসাধারণ আলোচনা করেছেন।
যুবা প্রকাশক আত্মজা পাবলিশার্সএর Arunava, অড্রের এই বইটার অনুবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা অসম্ভব ব্যতিক্রমী। আবেগতাড়িত হয়ে বইটা অনুবাদ করেছিলাম এই আশায়, যে ভদ্ররা এতদিন মিথ্যেগুলিকে প্রশ্রয় দিয়ে এসেছেন, তাদের রাজত্ব অন্তত এই বাংলায় গিয়েছে এবং যে সপম্প্রীতির পরিবেশ এই রাজ্যে গড়ে উঠেছে, তাতে এই বই প্রকাশ একমাত্র বাংলাতেই ঘটতে পারে। তবুও মনে আশংকা ছিল, যে ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার সূত্র অবলম্বন করে একদল যেভাবে বিদ্বেষের প্রদাহ সারা দেশে ছড়িয়ে দিচ্ছে, সেই পরিবেশে কোন প্রকাশক এই অনুবাদটি প্রকাশ করতে উৎসাহী আদৌ হবেন কি না। আশংকা মিথ্যে প্রমান করে অকুতোভয় অরুণাভ এই বইটা প্রকাশ করতে যে সব ঝামেলা সামলেছে, তা অনন্য সাধারণ উদাহরণ হয়ে থাকবে বাংলা প্রকাশনা জগতে।
আওরঙ্গজেবের মিথ-মিথ্যে ভাঙ্গার এই উপনিবেশবিরোধী প্রচেষ্টায় বন্ধুরা স্বাগত।

Monday, September 24, 2018

আওরঙ্গজেবঃ দ্য লাইফ এন্ড লেগাসি অব ইন্ডিয়াজ মোস্ট কন্ট্রোভার্সিয়াল কিং৬৪ - অড্রে ট্রুস্কে



কি কি বই – একটি প্রবন্ধ২
তার লেখা বিপুল চিঠিই তাঁর নিজের চরিত্র চিত্রণ – আমি সেই সূত্রধরে তাঁর বক্তব্য অনুসরণ করে, অধিকাংশ মুঘল সাম্রাজ্যের ঐতিহাসিকদের তৈরি করা আওরঙ্গজেবের চরিত্রর বাইরে নতুনভাবে তাঁকে খুঁজে পেয়েছি। আজ আওরঙ্গজেবের দুহাজার চিঠি আমরা পড়তে পাই ফারসিতে। চিঠির যে সব সংকলন বার হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে আদাবইআলমগিরি, কালিমাতইতাইয়াইবাত, রাকিমইকারামি এবং রুকাতইআলমগিরি (আমি মূলত বিলমোরিয়ার অনুবাদ ব্যবহার করেছি, তবে মাঝে মধ্যে মূলের সঙ্গে মিলিয়ে নিয়ে)। এছাড়াও ছাপা না হওয়া দস্তুরঅলআলমাঘহায়ি এবং আহকমইআলমগিরি(যদুনাথ যে এনেকডোটস অব আওরঙ্গজেব অনুবাদ করেছেন, এটা সেটা নয় চিঠির সঙ্কলন)। যদুনাথ সরকারের এনেকডোটস অব আওরঙ্গজেব (কলকাতা ১৯১৭)তে আওরঙ্গজেবকে নিয়ে বেশ চালু, মনোহরণ, চটপটে কিছু গপ্প আছে, কিন্তু অনেকগুলোর ঐতিহাসিক ভিত্তি গণ্ডগোলের। যদুনাথ জানতেন বলেই নিজেই প্রতিটা গল্পের টিকায় সঠিক তথ্য উল্লেখ করেছেন। আমি যদুনাথের এনেকডোট...টা সন্তর্পনে ব্যবহার করেছি, বিশেষ করে তার কথিত দ্বিতীয় ইচ্ছের(উইল) কথা আমি স্বীকার করিনি(Anecdotes, 51–55)।
আওরঙ্গজেব নিজের কথা বলেছেন বেশ কিছু ফরমানে এবং নিশানে। আমি জ্ঞান চন্দ্রের আওরঙ্গজেবের ফরমান বিষয়ে প্রবন্ধ ব্যবহার করেছি – ঐ, আবার সন্তর্পণে তথ্য তুলেছি, বিশেষ করে হিন্দু মন্দির ধ্বংস বিষয়ে এবং S. A. I. Tirmizi’s Mughal Documents (Delhi, 1995)ও ব্যবহার করেছি।
আওরঙ্গজেবের সময়ের খবর সমীক্ষা(নিউজ রিপোর্ট বা akhbarat) বেশ কিছু মহাফেজখানায় থেকে গিয়েছে, আমি সেগুলোর পরোক্ষ সূত্র থেকেই ব্যবহার করেছি। মুনিস ফারুকির প্রিন্সেস অব দ্য মুঘল এম্পায়ার বইতে তিনি কলকাতার ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে রাখা আখবারাতইদরবারইমুয়াল্লার তথ্য ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেছেন।
---
আওরঙ্গজেবকে নিয়ে পরোক্ষ তথ্য প্রচুর কিন্তু আশংকার হল সেগুলি গভীরতাহীন। উনিবিংশ শতকে এলফিনস্টোনের(১৮৪১) এবং স্ট্যানলি লেন-পুল(১৮৯৩)এর ছাপার সংস্করণ পাওয়া যায় কিন্তু তথ্যে গন্ডোগোল আছে। আমি এই বই ব্যবহার করি নি। স্বশিক্ষিত ঐতিহাসিক যদুনাথ সরকার(১৮৭০-১৯৫৮)। বিংশ শতকে আওরঙ্গজেবকে নিয়ে যত কাজ হয়েছে, সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ কাজ তিনিই করেছেন। তিনি ইংরেজিতে আওরঙ্গজেবের চিঠি অনুবাদ করেছেন, এবং অবশ্যপাঠ্য পাঁচ খণ্ডে হিওস্ট্রি অব আওরঙ্গজেব লিখেছেন। বহুকাল ধরে যদুনাথ আওরঙ্গজেব বিষয়ে শেষ কথা বলতেন। কারণ তাঁর আগে আওরঙ্গজেবকে নিয়ে বিশদ গবেষণা কেউই করেন নি প্রায়। আস্তে আস্তে যখন গবেষকেরা আওরঙ্গজেবের সময় জানতে বুঝতে শুরু করলেন, তখন দেখলেন আওরঙ্গজেবকে যদুনাথ যেভাবে উপস্থাপন করেছেন, মানুষটা তার থেকে অনেকটা আলাদা। তার প্রতি সম্মান জানিয়েই বলা দরকার তার তৈরি করা আওরঙ্গজেবের চরিত্র সাম্প্রদায়িক রঙ্গে রাঙ্গানো এবং কিছু কিছু জায়গায় খুব বড় ঐতিহাসিক ভ্রান্তি আছে। যারা যদুনাথ সরকারের কাজের পদ্ধতি এবং ভাবনা বিষয়ে বিশদে জানতে চান তাদের অবশ্যই দীপেশ সরকারের The Calling of History: Sir Jadunath Sarkar and His Empire of Truth (Chicago, 2015) পড়তে হবে।
খুব সম্প্রতি আওরঙ্গজেবকে নিয়ে গবেষণা অনেকদূর এগিয়েছে। আগে যাদের নাম করেছি, তাদের সঙ্গে অবশ্যই পড়তে হবে M. Athar Ali, Satish Chandra, S. M. Azizuddin Husain, Irfan Habib, Harbans Mukhia, and John Richards কে। বহু গবেষক আওরঙ্গজেবের সময়ের নানান বিষয় নিয়ে গবেষণা করেছেন যেমন, Catherine Asher (architecture), Richard M. Eaton (temple desecration), Louis Fenech (relations with Sikhs), Yohanan Friedmann (banning of Sirhindi), Jos Gommans (battles and Deccan years), Stewart Gordon (Mughal-Maratha conflict), B. N. Goswamy (Hindu ascetics), J. S. Grewal (Hindu ascetics and Sikhs), Alan Guenther (Fatawa-i Alamgiri), Robert Hallissey (relations with Rajputs), Shalin Jain (relations with Jains), Heidi Pauwels (Keshava Deva Temple), Katherine Butler Schofield (née Brown) (music), and Taymiya Zaman (Bhimsen Saxena)। বিনয় লালের ওয়েবসাইট মানস ((www.sscnet.ucla.edu/southasia/)) আওরঙ্গজেবের সময়ের নানান বিতর্কিত বিষয় নিয়ে নানা প্রবন্ধ সঙ্কলন করেছে। এছাড়াও আওরঙ্গজেবকে কিভাবে বৃহত্তর মুঘল সাম্রাজ্যের পরিসরে দেখা যায় সেই বিষয় নিয়ে বেশ কিছু কাজ হয়েছে, Michael H. Fisher, A Short History of the Mughal Empire (London, 2016); John F. Richards, The Mughal Empire (Cambridge, 1993); and Francis Robinson, The Mughal Emperors and the Islamic Dynasties of India, Iran, and Central Asia, 1206–1925 (New York, 2007)।
এই বইটি লিখছি লেখার সময় বেশ কিছু অগ্রন্থিত বন্ধু-সহকর্মী কাজ যেমন, Supriya Gandhi (Dara Shukoh), Yael Rice (painting) ইত্যাদি দেখি। এছাড়াও জুরিখে আয়োজিত European Association for South-Asian Studies Conference সম্মেলনের আওরঙ্গজেব বিষয়ে প্যানেলের বহু গবেষকের কাজ দেখেছি। আজ আমরা অনেকে নতুন করে আওরঙ্গজেবকে খুঁজে বার করার চেষ্টা করছি, বহু গবেষক বর্তমানের বহু পরোক্ষ তথ্য অবলম্বন করে সেই সময়ের এই মানুষটাকে জানতে উদ্গ্রীব হয়ে উঠেছেন। 
---
শেষে আওরঙ্গজেব বিষয়ে কিছু কাজ এবং দুর্বলতা উল্লেখ করা যাক। আজকে হয়ত আওরঙ্গজেবের ওপরে মুঘল পরিবারের সদস্যদের তুলনায় সব থেকে বেশি কাজ হয়েছে, কিছু কিছু গুরুত্বপূর্ণ সূত্র অবলম্বনে লিখিত হয়েছে যেমন আখবারাত, যা সাধারণত গবেষকদের আওতার বাইরেই থেকে যায়। এছাড়াও নিয়মিত বেশ কিছু নতুন নতুন তথ্য উঠে আসছে আওরঙ্গজেব বিষয়ে। উদাহরণস্বরূপ ২০১১ সালে আলিগড় মুসলমান বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি আলমারি থেকে তাঁর একটি তরোয়াল টপকে এ সময়ে নেমে পড়েছে। ক্রিস্টিজে নিলামে ওঠা ফরমান ২৭৫০০ ডলারে পাওয়া গিয়েছে। যারা আওরঙ্গজেবকে নিয়ে গভীর গবেষণা করতে চান তাদের তথ্য সম্পদ নিয়ে কোন সমস্যা নেই।
সাধারণ পাঠক এবং গবেষক উভয়কেই ভাবতে হবে ঐতিহাসিক তথ্য আর বৈধ ঐতিহাসিক দাবি কাকে বলে। যারা আওঙ্গজেবের বর্বরতা্র ‘নিদর্শন’ দিয়ে থাকেন, তারা আদতে আধুনিক সময়ে হিন্দু-মুসলমান দ্বন্দ্বের মধ্যে ঢুকে পড়ে মিথ্যা প্রচারে খুবই উৎসাহী হন এবং নির্ভর করেন ভুল অনুবাদে এবং মিথ্যা তথ্যে। যারা আওরঙ্গজেবকে দোষ দ্যান তাদের অধিকাংশেরই ইতিহাসকে কিভাবে দেখতে হবে সে বিষয়ে কোন প্রশিক্ষণ নেই এবং আধুনিকপূর্ব ফারসি বিষয়ে তাদের জ্ঞান শুন্যের কোঠায়। জনগণতান্ত্রিকভাবে লিখিত জনপাঠ্যগুলি বর্জন করুণ চোখবুজে, যেগুলি বাজারে ছেয়ে গিয়েছে বিপুলভাবে। এই বই পরিচিতিটি লিখলাম, বিপুল বিশাল তথ্য পরিসরে খুব কম সত্যভিত্তিক চরিত্র চিত্রিত সম্রাট আওরঙ্গজেব আলমগিরকে উদ্দেশ্য করে।

আওরঙ্গজেবঃ দ্য লাইফ এন্ড লেগাসি অব ইন্ডিয়াজ মোস্ট কন্ট্রোভার্সিয়াল কিং৬৩ - অড্রে ট্রুস্কে

কি কি বই – একটি প্রবন্ধ
আমরা আওরঙ্গজেবের জীবনীটি দাঁড় করিয়েছি আধুনিক এবং প্রাগাধুনিক ঐতিহাসিকদের কাজের ওপর ভিত্তি করে। কোন কোন বইএর প্রতি ঋণী এই লেখাটা তৈরি করতে পারলে আমি একই সঙ্গে বোঝাতে পারব আওরঙ্গজেবের জীবনী নির্মানের জন্যে কোন কোন বই পড়া দরকার। আমি পাণ্ডুলিপির মহাফেজখানা খুব কম ব্যবহার করেছি, আমার অধিকাংশ প্রাথমিক সূত্রই হল ছাপা সংস্করণ। যারা আরও গভীরে যেতে চান, নির্দিষ্ট কিছু উদ্ধৃতি ইত্যাদির সূত্র জানতে, তাদের জন্যে এই প্রবন্ধের সঙ্গে আরও একটা প্রবন্ধ জুড়ে দিয়েছি।
---
আমি প্রথমেই জানিয়েছি এই কাজের মুল সূত্র হল ফারসি ইতিহাস। আওরঙ্গজেবের আগের সময়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার বিষয়ের ইতিহাস শাহজাহানের সময়ের বা তার পরের বইগুলি থেকে আহরিত যেমন আবদুল হামিদ লাহোরির পাদশানামা, ইনায়ত খানের শাহজাহাননামা, মহম্মদ সালেহ কম্বুর অমলইসালিহ এবং তবতাবায়ির শাহজাহাননামা।
আওরঙ্গজেবের সময়ের ইতিহাস বেশ কিছু লেখক লিখেছেন, আবদুল হাই এবং খাদিম হুসেইনের সুসম্পাদনায় মহম্মদ কাজিমের আলমগিরিনামা(কলকাতা ১৮৬৮)য় একমাত্র আওরঙ্গজেবের সরকারিভাবে প্রথম জীবন এবং দরবারের ইতিহাস পাই। বখতাবর খানের(মৃ ১৬৮৫) মিরাটঅলআলম একটি সাধারণ ইতিহাস বই যেখানেও আমরা আওরঙ্গজেবের প্রথম জীবন পাই। পার্সপেক্টিভস অন মুঘল ইন্ডিয়া(করাচি)য় সাজিদা আলভি জানাচ্ছেন আলমগিরিনামা থেকেও কিছু বেশি সূত্র আমরা মিরাট...এ পাই, কিন্তু বইটি খুব বেশি পঠিত নয়। আকিল রাজি খান(মৃ ১৬৯৬/৭)এর ওয়াকিয়তইআলমগিরি সিংহাসন দখলের লড়ায়ের তথ্য পাওয়ার জন্যে সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ, আমি মৌলভি জাফর হাসানের (দিল্লি ১৯৪৬) সংস্করণটি ব্যবহার করেছি। এছাড়াও কিছু কাজ ছাপা হয় নি যেমন হাতিম খানের আলমগিরনামা, মুহম্মদ মাসুমের তারিখইশাহজাহানি এবং আবুল ফজল মামুরির তারিখইআওরঙ্গজেব, আমি বইটি লেখার সময় দেখতে পেরেছি।
আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর এক দশক পর বেশ কিছু বই লেখা হয়। কাফি খানের মুন্তাবাখাবঅললুবুব(১৭৩০), সাকি মুসতায়েদ খানএর মসিরইআলমগিরি(১৭১০) বহু ঐতিহাসিক ব্যবহার করেছেন, অংশত কারণ অনুবাদের সহজলভ্যতা; যথাক্রমে অনুবাদ করেছেন মনিউল হক(করাচি ১৯৭৫) এবং যদুনাথ সরকার (কলকাতা ১৯৪৭), আরও বড় কারণ এইদুটি বই আওরঙ্গজেবের জীবনের অধিকাংশ সময়ের ঘটনা এই দুটিতে উল্লিখিত হয়েছে। তাদের জন্ম তারিখ এবং বিপুল অলঙ্কারের ব্যবহারের জন্যে আমি খুব সাবধানে সেগুলির তথ্য কাঁচিয়ে তুলেছি এবং তথ্যগুলো অন্যান্য সূত্রের সঙ্গে তুলনা করে নিয়েছি। কাফি খানের অনুবাদ হিসেবে এলিয়ট আর ডসনের বইটার তথ্যকে আমি সর্বাংশে বর্জন করেছি। মাসির... যেহেতু খুব সর্বজনগ্রাহ্য তাই তার অনুবাদ হিসেবে যদুনাথ সরকারের কাজটাই উল্লেখ করেছি এটা মাথায় রেখে যে যদুনাথ সরকারের অনুবাদ অসম্পূর্ণ এবং বেশ কিছু ভ্রান্তিও আছে(এইটির অনুবাদ পড়তে ২০১৬ সালের ইওরোপিয়ান ইউনিভার্সিটি ইন্সটিটিউটের পিএইচডি প্রবন্ধ Tilmann Kulkeর A Mughal Munsi at Work অনুসরণ যোগ্য)।
ভীমসেন সাক্সেনার তারিখইদিলখুসা দাক্ষিনাত্যের অসাধারণ তথ্যাবলী উল্লিখিত হয়েছে, আমি যদুনাথ সরকারের অনুবাদের সঙ্গে ব্রিটিশ লাইব্রেরির পাণ্ডুলিপিটি(Or. 23) মিলিয়েছিলাম এবং কয়েকটি পাতা নতুন করে অনুবাদ করে নিয়েছি। নগরের ব্রাহ্মণ এবং যোধপুরের মুঘল প্রশাসনিক আমলা ঈশ্বরদাস ফুতুহাতইআলমগিরি লিখেছিলেন ১৭০০ সালে, যদিও ভুলভাবে যদুনাথ একে ১৭৩০এর কাজ বলেছেন। ফুতুহাত (বরোদা ১৯৯৫)এ যদিও কিছু ঐতিহাসিক তথ্য নিয়ে প্রশ্ন আছে কিন্তু বেশ কিছু প্রাসঙ্গিক তথ্য আছে যা অন্যান্য সূত্রে পাওয়া যায় না। ১৭৫৪ সালের এক্কেবারেই কম ব্যবহার হওয়া মিরাটইআহমদি আওরঙ্গজেবের গুজরাট সময়ের জন্যে ব্যবহার করা যায়। আবদুর রহিম এবং মির্জা আশরফ আলির(কলকাতা ১৮৮৮-৯১) সম্পাদনায় শাহ নাওয়াজ খানের মসিরউলউমরায় ১৭৮০ পর্যন্ত মুঘল অভিজাতদের খুব সংক্ষিপ্ত জীবনী পাই। এর বেভারিজ আর বাণীপ্রসাদের আরও একটি অনুবাদ আছে(পাটনা ১৯৭৯)।
ফারসি কাজ ছাড়া আমি বেশ কিছু হিন্দি কাজ ব্যবহার করেছি যেমন ভূষণের শিবরাজভূষণ(অনুবাদের জন্যে ধন্যবাদ এলিসন বুশ)। জ্ঞান চন্দ্রের গবেষণায় দেশি ভাষায় জৈন লেখকদের কাজ দেখেছি(এর জন্যে বিশদে দেখুন আকরম লারি আজাদএর Akram Lari Azad’s Religion and Politics in India [Delhi, 1990], 234–37 বইটি)। আমি কিছু পরোক্ষ সূত্রে শিখ ইতিহাস দেখেছি। রাজপুত দরবারের কিছু হিন্দি কাজে আওরঙ্গজেবের জীবনের বহু বিশদ ঘটনা উল্লিখিত হয়েছে; এর সঙ্গে লক্ষ্মীপতির সংস্কৃত কাজ অবদুল্লাচরিত এবং নৃপতিনীতিগর্বিতভৃত্ত আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পরবর্তী সময়ের কথা বলে।
ঐতিহাসিকেরা বহুকাল ধরেই আওরঙ্গজেবের জীবনের নানান তথ্য আহরণ করছেন মুসাফিরদের লেখা থেকে যেমন উইলিয়াম আর্ভিংএর অনুবাদে নিকোলি মানুচির স্তোরিয়া দা মোগোর(লন্ডন ১৯০৭-৮), আর্চিবলড কনস্টেবল এবং ভিনসেন্ট স্মিথের অনুবাদে ফ্রানসিস বার্নিয়ের ট্রাভলস ইন দ্য মোঘল এম্পায়ার(লন্ডন ১৮৮৯) এবং ভি বলের অনুবাদে জাঁ ব্যাপটিস্ট তাভার্নিয়ের ভয়েজেস(লন্ডন ১৮৮৯)। এখানে খুব বিখ্যাত নন এমন কিছু মুসাফিরদের কাজ ব্যবহার করেছি Gemelli Careri, Peter Mundy, William Norris, John Ovington, Jean de Thevenot। বিদেশি মুসাফিরেরা মুঘল আমলের দারুণ বর্ণনা দিয়েছেন। কিন্তু গবেষকেরা ভারতীয় সূত্রের থেকেও বিদেশিদের কাজ থেকে নিষ্কর্ষ তথ্যে অনেক বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন, এটা মনে না রেখেই, কিভাবে পশ্চিমি মুসাফিরেরা একই সঙ্গে বাস্তব এবং খোশখেয়ালকে একেঅপরের পিঠেপিঠি ব্যবহার করেছেন।

আওরঙ্গজেবঃ দ্য লাইফ এন্ড লেগাসি অব ইন্ডিয়াজ মোস্ট কন্ট্রোভার্সিয়াল কিং৬২ - অড্রে ট্রুস্কে

মধ্যযুগে ফারসি পাঠ্য বিষয়ে কিছু কথা
আওরঙ্গজেবের জীবন আর সময় বুঝতের বিভিন্ন বিপুল নথিপত্র বর্তমান। মূলত ফারসি ভাষায় লিখিত ইতিহাস, সাম্রাজ্যিক নির্দেশ, খবর, চিঠি, ভ্রমনকাহিনী ছাড়াও আরও বহু তথ্যাবলী মধ্যযুগের সম্রাটের জীবনপঞ্জী গড়ে তোলার জন্যে যথেষ্ট পরিমানে উপস্থিত। এই বিপুল পরিমান তথ্যাবলী থাকা সত্ত্বেও ইতিহাস তার প্রতি সুবিচার করে নি।
আওরঙ্গজেবকে নিয়ে যে সব তথ্য আছে সেগুলি সব ঐতিহাসিকের কাছে সহজলভ্য নয়। বিপুল সংখ্যার পাণ্ডুলিপি ছাপাখানার মুখ দেখে না, মহাফেজখানায় বা গ্রন্থাগারে মুঘ গুঁজে পড়ে থাকে বছরের পর বছর। এগুলি পড়তে গবেষকদের শুধু সময় বা অর্থ থাকাও যথেষ্ট নয়, দুটোই পর্যাপ্ত পরিমানে থাকতে হবে যাতে তিনি দক্ষিণ এশিয়া আর ইওরোপের নানান গ্রন্থাগারে ঘুরে সেগুলি অধ্যয়ন করতে পারেন। বিভিন্ন গ্রন্থাগারে ছবিতোলা আজও নিষিদ্ধ বলে তাদের সংরক্ষিত তথ্যগুলির সম্পূর্ণ ব্যবহার সম্ভব হয়ে ওঠে না। তারপরে আছে ভাষা শিক্ষা। আওরঙ্গজেব সংক্রান্ত অধিকাংশ তথ্য, সে সময়ের দরবারি ভাষা ফারসিতে লিখিত, সেগুলোর ইংরেজি অনুবাদ প্রায় হয়নি বলা চলে। প্রয়োজনের তাগিদে অধিকাংশ ঐতিহাসিক ফারসির মুল পাঠের না গিয়ে ইংরেজি অনুবাদের ওপর নির্ভর করেন। এর ফলে গ্রন্থাগার যাওয়ার সুযোগ কমে যায় ঠিকই কিন্তু অধিকাংশ ফারসি অনুবাদের গুণমানে প্রশ্নচিহ্ন লেগে গিয়েছে, ভুল অনুবাদের সঙ্গে রয়েছে সঙ্খিপ্তিকরণের রোগও এটাও মথায় রাখা দরকার। এই পরিবর্তনগুলি অনুবাদকদের রাজনৈতিক এজেন্ডা(উদ্দেশ্য)কে পুর্ন করার জন্যে করা হয়, বিশেষ করতে ঔপনিবেশিক অনুবাদকদের যারা দেখাতে চায় ইন্দো-মুসলমান সম্রাটেরা ব্রিটিশদের তুলনায় খুব খারাপ(এই তত্ত্বের প্রখ্যাত বই এলিয়ট এবং ডসনের হিস্ট্রি অব ইন্ডিয়া এজ টোল্ড বাই ওন হিস্টোরিয়ান্স)। এগুলি উপনিবেশের মননকে ন্যাংটো করে আমাদের সামনে দাঁড় করিয়ে দ্যায় ঠিকই, কিন্তু মুঘল ভারত সম্বন্ধে তীব্র অসত্য বচন প্রকাশ করে।
যদিও গবেষকেরা আওরঙ্গজেবের সময়ের তথ্যাবলি নিয়ে আজ ভালভাবেই কাজ করতে পারেন, কিন্তু এগুলির যথোপযুক্ত ব্যখ্যা করাটাই সমস্যার মুল ক্ষেত্র হয়ে যায়। আওরঙ্গজেবের সময়ের তথাকথিত গুরুত্বপুর্ণ ঐতিহাসিকদের মধ্যে কাফি খাঁ মুন্তাখাবুললুবাব এবং সাকি মুস্তায়েদ খাঁ মাসিরিআলমগিরি লেখা হয়েছে আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর বেশ পরে এবং তারা সেই সময়ের নানান মানুষের স্মৃতি এবং শোনা ঘটনাকে নতুন করে উপস্থাপন করেছ্যেন পাঠকের সামনে। এই পদ্ধতি ইতিহাস ভাষ্যে অবশ্যম্ভাবী ভুলের সুযোগ তৈরি করে দেবে, যদিও তারা প্রত্যক্ষ্যদর্শীদের বয়ান তুলে ধরছেন। যদি সাম্রাজ্যিক নির্দেশ বা ফরমান বা চিঠি ইত্যাদিও গবেষকদের ভুলপথে এগিয়ে দিতে পারে, ঘটনাকে ভুলভাবে উপস্থিত করতে পারে। এবং আমরা দেখেছি, বহু ফরমান জারি হয়েছে, কিন্তু বাস্তবে রূপায়িত হয় নি।
আর মধ্যযুগের অধিকাংশ লেখকই তথ্যের সত্যতা নিয়ে খুব বেশি চিন্তিত ছিলেন না। আওরঙ্গজেবের সময় অতীতকে ভুলভাবে দেখা একটা স্বাভাবিক ক্রিয়া ছিল – যারা মনে করতেন তারিখ(ফারসিতে ইতিহাসের প্রায় প্রতিশব্দ) ইতিহাসের থেকেও বেশি সাহত্য রচনার প্রতি নিবিষ্ট থাকা অনেক নেশি জরুরি। তারা তাদের সাহিত্যিক লক্ষ্যপুরণ করতে ইতিহাসকে ব্যবহার করতেন, যেমন কাফি খাঁ যে ফুলেল ভাষায়, ব্যঙ্গের কষাঘাতে তার পছন্দ বা অপছন্দের এক ঘটনার তীব্রতা তাদের মত করে উপস্থিত করতেন। এই বিশেষ স্তরীভূত উতসাহের জন্যে সেই সময়ের ইতিহাসের ব্যাখ্যা আধুনিক কালের ইতিহাসের তুলনায় ন্যুন হয়ে যায় না, কিন্তু আমরা সেই কাজগুলি থেকে তথ্য আহরণ করার সময় সাবধান থাকব – তার সাহিত্যিক এবং একইসঙ্গে ঐতিহাসিক তথ্য বিচার করে তৌল করে দেখব, কারণ মুঘল আমলের ইতিহাস দায়িত্বপুর্ণভাবে গঠন করতে আমাদের দ্বায়িত্ব সর্বাধিক।
অধিকাংশ আধুনিক ঐতিহাসিক ফারসি পাঠগুলির পাশাপাশি আধুনিকপূর্ব অন্যান্য ভাষার পাঠ বিশেষ করে ইওরোপিয় মুসাফিরদের লেখা, হিন্দি ও অন্যান্য ভাষার ইতিহাস এবং (খুব কম) সংস্কৃত পাণ্ডুলিপি। এই সব কটি নিয়েও একই কথা বলা যায় যে সেগুলিতেও তথ্যের সঙ্গে মিথ ও গল্পকথা জুড়ে থাকে। ইওরোপিয় ভ্রমনকথাগুলি এ প্রসঙ্গে আলাদা করে বলা দরকার হয়, কারণ বহু মুঘল আমল নিয়ে কাজ করা গবেষক, এইগুলি নিয়ে বেশ বিভ্রান্তির মধ্যে আছেন, এইগুলি কেন সোজাসাপতা ভাবে না বলে এগুলিকে উদ্দেশ্য করা হয়েছে বিসেষ ধরণের পড়ুয়া(বিসেষ করে পুঁজিবাদী সমাজের)দের জন্যে।
আধুনিক ঐতিহাসিক ঐতিহাসিক তথ্যকে খুব ভাল ওজন করে বিচার করে। তার মানে হল আমরা আমাদের ভাষ্যকে বৃহত্তর সামাজিক ও সাহিত্যিক প্রেক্ষাপটে উপস্থাপন করব বিভিন্ন প্রমানকে কঠোরভাবে বিচার করে, এবং পাঠগুলিকে একে অপরের সঙ্গে তুলনা করেই। ঐতিহাসিকেরা আঁকা ছবি, প্রাসাদ বা টাকাকড়ির মধ্যেও তথ্য সন্ধান করেন। শেষ পর্যন্ত ঐতিহাসিকেরা প্রাথমিক পাঠ্যকে চরমভাবে তৈল করে একটি বৈধ ভাষ্য খাড়া করে যার মাধ্যমে ঐতিহাসিক চরিত্র, সংগঠন বা ঘটনার একটা প্রার্থিত বিশ্লেষণ উপস্থিত করে। ইতিহাস নিয়ে মতৈদ্বৈধতার প্রচুর অবকাশ আছে, এবং পালটা ভাষ্য বহু সময় আমাদের কোন কিছু নির্দিষ্ট গঠনমূলক লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে দ্যায়। কিন্তু আওরঙ্গজেব আর তার সময় নিয়ে ঐতিহাসিক সূত্র সংগ্রহ, বিচার এবং ঐতিহাসিক সত্যিকে আকর্ষনীয়ভাবে উপস্থাপন করা অততা জটিল নয়।

Saturday, September 22, 2018

আওরঙ্গজেবঃ দ্য লাইফ এন্ড লেগাসি অব ইন্ডিয়াজ মোস্ট কন্ট্রোভার্সিয়াল কিং৬১ - অড্রে ট্রুস্কে

(মুল বইটির পরিসমাপ্তি ঘটল এই কিস্তিতে কিন্তু আরও লেখা বাকি)
তবুও বলা দরকার সম্রাট হিসেবে আওরঙ্গজেব যে কোন সরল সাধারণীকরনীয় চরিত্রমাত্র নন। তিনি বিপুলভাবে পরস্পর বিরোধী ও বিভ্রান্তিকর চরিত্রের মানুষ যাকে গভীরে গিয়ে পড়াশোনা করে বুঝতে হয়। আওরঙ্গজেব নিজে ছিলেন প্রচুর অধৈর্য নির্দেশদাতা যেমন রাস্তার নিরাপত্তা নিয়ে বড্ড চিন্তিত – কিন্তু নিজের পিতাকে তিনি বহু বছর বন্দী করে রাখেন, যে কাজটা সে সময় এশিয়াজুড়ে নিন্দিত হয়েছে। তিনি দারা শুকোর মত পারিবারিক সদস্যকে যেমন খুন করেন তেমনি শম্ভাজীর মত শত্রুকেও বাস্তবিকভাবে ছিঁড়ে খুঁড়ে ফেলতে নির্দেশ দ্যান। একই সঙ্গে তিনি নিয়মিত ফেজ টুপি সেলাই করে নিজের ধার্মিকতাকেও বজায় রাখেন। তিনি পছন্দ করতেন না দুর্নীতিগ্রস্ত আমলা, পচা আম এবং অনুপযুক্ত পুত্রদের। তিনি সঙ্গীতের রসিক সমঝদার, এমন কি যুবা বয়সে একজন রূপসী সঙ্গীতকলাকার হীরাবাঈএর প্রেমে পড়েন, কিন্তু পরিণত বয়সে নিজেকে সে রসে বঞ্চিত করে রাখেন। তবে তার শেষ বছরগুলো আরেক সঙ্গীতপ্রেমী উদিপুরী মহলের সঙ্গে কাটাতে হয়। তিনি বিশ্বের সব থেকে বড় মসজিদ বানান, কিন্তু নিজেকে আনামা কবরে শয়িত রাখতে নির্দেশ দ্যান। তিনি মুঘল সাম্রাজ্যকে সব থেকে বড় চেহারা দিতে দিতে মারা যান কিন্তু মনে করতেন তার জীবনটাই ব্যর্থতায় ভরা।
আওরঙ্গজেবের জীবন হেঁয়ালিতে ভরা। তাঁর সময়ের প্রখ্যাত ঐতিহাসিক কাফি খাঁএর উক্তি উদ্ধৃত করব, যিনি আওরঙ্গজেবের সময়কে পারস্যের প্রখ্যাত শাসক জামশিদের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন, তিনি বলেন, To attempt a summary of the major events of a fifty-year reign of an emperor the equal of Jamshid is to measure the ocean’s water with a pitcher। এই ভাষাতেই ভারতের বিতর্কিত সম্রাটের বিচার করা দরকার। যদি আমরা আওরঙ্গজেবের সঙ্গে জুড়ে থাকা মিথগুলি ছিঁড়ে ফেলতে পারি, তখন আমরা সম্রাট হিসেবে, মধ্যযুগের অন্যতম গুরুত্বপুর্ণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে, তিনি যে আকর্ষনীয় ধাঁধাগুলি ছেড়ে গিয়েছেন, সেগুলিকে উদ্ধার করতে পারব।

আওরঙ্গজেবঃ দ্য লাইফ এন্ড লেগাসি অব ইন্ডিয়াজ মোস্ট কন্ট্রোভার্সিয়াল কিং৬০ - অড্রে ট্রুস্কে

বন্ধনমুক্ত আওরঙ্গজেব
I am what time, circumstance, history, have made of me, certainly, but I am, also, much more than that. So are we all
- জেমস বল্ডউইন, আমেরিকিয় লেখক, ১৯৫৫
জনগণের স্মৃতিতে যে আওরঙ্গজেব বসবাস করেন, তিনি আর ঐতিহাসিক আওরঙ্গজেবের ছবির মিল, মাটিতে পড়া সম্রাটের ছায়াটুকুই – এর বেশি কিছুই নয়। এই গরমিলটার দিকে দৃষ্টি দেওয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ দুটি কারণে – আগুণেচোবানো সাম্প্রদায়িক ভাবনা ছড়ানো থেকে বেরিয়ে আসা এবং ঐতিহাসিক গবেষণার মুক্তি।
ভারত ও পাকিস্তানে আওরঙ্গজেবের যে ছবি তৈরি হয়েছে, তার জন্যে দায়ি মুঘল অতীত নিয়ে উপমহাদেশের রাজনৈতিক ভাষ্য। এর আগে আমরা দেখেছি আওরঙ্গজেবকে নিয়ে দুটি ভাষ্য বাজারে চালু রয়েছে – ধর্মান্ধ আওরঙ্গজেব এবং ধার্মিক আওরঙ্গজেব। এই দুটোই বিভ্রান্তকারী – এবং বহু সময় বিধ্বংসীও বটে – যেভাবে অতীতে ধর্মান্ধ আওরঙ্গজেবকে উপস্থাপন করা হয়েছে হিন্দু আর হিন্দুস্থানের ধ্বংসকারী হিসেবে। রাজনৈতিক নেতা এবং অন্যান্যরা ভারতে এই ধারনাটা ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন মুসলমান বিরোধিতা এবং বিদ্বেষ চাগিয়ে তোলার জন্যে এবং ভারতীয় মুসলমানেদের দাগিয়ে দেন বিপজ্জনক বিশ্বাসঘাতক হিসেবে। আওরঙ্গজেব নিজে গোঁড়া মুসলমান ছিলেন এই ধারনাটাও সমস্যার – মহম্মদ ইকবালের ভাষায় Muslim—“an Abraham in India’s idol house। এই ধারনাটির প্রতীতিটি হল মুসলমানেদের মূলত ধার্মিক বিশ্বাসেই নির্ভরতা এবং ইসলামের সঙ্গে হিন্দুত্বের সঙ্গে ইসলামের তফাত ঘোচার নয়। ভারতের ক্ষেত্রে এটার অর্থ সমঝে দেওয়া হয় মুসলমানেরা পুরপুরি ভারতীয় হতে পারে না, উল্টো দিকে পাকিস্তানের বয়ান বলে সব নাগরিককে একটা নির্দিষ্ট ধরণের ইসলামের অনুগামী হতেই হবে।
---
দ্বিতীয়ত আওরঙ্গজেবের যে ছবি সাধারণ মানুষের মনে আছে তার বিরুদ্ধাচরণ করতে হবে এই কারনেই যে আমরা যাতে তাকে ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গীতেই দেখতে পারি। আওরঙ্গজেব তার সময়ের মানুষ, আমাদের সময়ের নয়। আমি এর আগে বলার চেষ্টা করেছি, আওরঙ্গজেব তার সময়ের আদাব(রাজনীতি) এবং আখলাক(নৈতিক মূল্যবোধ) আর রাজনীতির বাস্তবতা অনুসরণ করেই চলার চেষ্টা করেছেন। তার ধার্মিকতার ধারনা আর তিনি যে মুঘল কৃষ্টি আত্মীকরণ করলেন, তার মধ্যেই তাঁর বিশ্বদৃষ্টি তৈরি হয়েছে। তিনি আধুনিককালের আধুনিক মনন সঞ্জাত হিন্দু-মুসলমান দ্বন্দ্ব তৈরিতে উৎসাহীই ছিলেন না – বরং তিনি যাকে ন্যয় বিচার বলে ভাবতেন সেটি দেওয়ার চেষ্টা করতেন, মুঘল প্রথা অনুসরণ করতেন এবং উপমহাদেশে তাঁর পকড় বজায় রাখার উপায় বার করতেন।

আওরঙ্গজেবঃ দ্য লাইফ এন্ড লেগাসি অব ইন্ডিয়াজ মোস্ট কন্ট্রোভার্সিয়াল কিং৫৯ - অড্রে ট্রুস্কে

আওরঙ্গজেরব যেমন তার পূর্বসূরীদের অনুসরণ করেছেন বহু প্রথা বয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে, তিনি তার মত করে নিজের পরিচিতিও তৈরি করে নিতে পেরেছিলেন বিশেষ করে গদ্যময়(prosaic concern) বিচার দেওয়ার ক্ষেত্রে, নয়্য বিচারে এবং রণকৌশল উদ্ভাবনের দিক থেকে। যদিও তাঁর আগের সময়ের শাসকেরা ন্যয় বিচার দেওয়া নিয়ে বেশ উৎসাহী ছিলেন, - বিশেষ করে জাহাঙ্গির আগরা দুর্গে ষাটটি ঘন্টা বিশিষ্ট একটি বিচারের শেকল লাগিয়ে রেখেছিলেন, যারই বিচারের প্রয়োজন হত সেই এসে ঘন্টাটা বাজাত। আওরঙ্গজেবের কাছে বিচার যতটা দার্শনিক ততটা দেখনদারি নয় যতটা কার্যকরী ছিল - সর্বসমক্ষে দুর্নীতিপরায়ণ আমলাকে শাস্তি দেওয়া বা ধর্মীয় উতসবের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ইত্যাদি। সম্রাটের ইচ্ছে সত্ত্বেও তার প্রশাসন দুর্নীতিতে আকণ্ঠ ডুবেছিল। এ ছাড়াও আওরঙ্গজেব তার নিজের শৈলীতে, নিজের জীবন দিয়ে অনুশীলন করা নৈতিকতা এবং নন্দনতত্ত্ব প্রয়োগ করতেন, মধ্যযুগের অন্যান্য সম্রাটের মত – কিন্তু ক্ষমতার আগ্রাসনের জন্যে তিনি বারবার যে নৈতিকতা, যে বিচারের কথা বলতেন, সেইটিকে প্রায়শঃই দুঃখজনকভাবে ছিন্নভিন্ন করেছেন।
আওরঙ্গজেবের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সামরিক কৌশলের প্রয়োগ অসাধারণ ছিল – বলা দরকার তার সময়ে তিনি সর্বোত্তম সেনানায়ক ছিলেন। তিনি ময়ূর সিংহাসন দখল করেছিলেন দীর্ঘ দিন ধরে ভাইদের বিরুদ্ধে সিংহাসনের লড়াই লড়ে। বহুকাল ধরে যে অঞ্চলটা বার বার চেষ্টা করেও মুঘলেরা তাদের সাম্রাজ্যের মানচিত্রে আনতে পারে নি, সেই অজেয় দাক্ষিণাত্যকে তিনি জয় করেছিলেন। যদিও পরিণত বয়সের দিকে যেতে যেতে আওরঙ্গজেব হয়ত তার কৌশলী পথটি দাক্ষিণাত্যে হারিয়ে ফেলেছিলেন উদ্দেশ্যহীনভাবে দুর্গ দখল করে এবং সম্রাটের বয়স্কতার আর ক্ষমতাহীন শাহজাহাদের অকার্যকরতার সুযোগ নিয়ে দুর্বৃত্ত আমলাদের দমন করতে না পেরে।
আওরঙ্গজেবের ক্ষমতায় বিচরণের সময় যদি কুড়ি বছর কম হত, জাহাঙ্গিরের বাইশ বছরের রাজত্বের সময়ের মত, অথবা শাহজাহানের তিরিশ বছরের রাজত্বের মত, তাহলে হয়ত ভারতের ইতিহাস অন্য রকমভাবে লিখতে হত। কিন্তু তার পরিণত বয়সে তিনি যেভাবে পুত্রদের পায়ে বেড়ি পরিয়ে রেখেছিলেন, যেভাবে স্বতঃদুর্নীতিপরায়ণ আমলাতন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছিলেন, এবং যুদ্ধে যাওয়ার জন্যে ভুল পরামর্শ শুনছিলেন, সেগুলিও তার উত্তরাধিকারের অংশ হয়ে ওঠে এটাও মানতে হবে। ফলে আমরা এমন এক জটিল মানুষের কথা আলোচনা করছি যার চরিত্র সম্বন্ধে কোন একবগগা কথা বলা যায় না, বরং তাঁকে মিলিয়ে মিশিয়ে দেখা যায় যাঁর বিপুল স্বপ্ন মুঘল ভারতের বাস্তবতায় ছেঁটে গিয়েছিল নির্মমভাবে।

আওরঙ্গজেবঃ দ্য লাইফ এন্ড লেগাসি অব ইন্ডিয়াজ মোস্ট কন্ট্রোভার্সিয়াল কিং৫৮ - অড্রে ট্রুস্কে

(ছবিতে নাদির শাহ ভারত লুঠতে আসার সময়কার মুগথল সম্রাট মহম্মদ শাহ)
যদিও আজ খুব বেশি ঐতিহাসিক, যদুনাথ সরকারের মত মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের কারণ হিসেবে ধর্মান্ধতার প্রভাব খুব বেশি গুরুত্বের বলে মনে করেন না, কিন্তু জনগণের ভাবনায় এই বিষয়টার গুরুত্ব আজও থেকে গ্যাছে। আদতে এটা একটা ধারনা-বর্ণনার সমস্যা – ঐতিহাসিক সমস্যা নয়। আদতে ভদ্রবিত্তিয় দৃষ্টিভঙ্গীতে কোন এক বড় কাঠামোর পতনের কারণ খোঁজার সমস্যার সমাধানের গল্প তৈরি হয় সেই ঝামেলার একটি নৈতিকতা নির্ভর গল্প তৈরি করে সেই গল্পে সেই পরিবেশের একজন দুর্বৃত্তকে গুঁজে দিয়ে সেই বেঁড়ে ব্যাটাকেই বিশাল বড় সাম্রাজ্যের পতনের মুল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা। আজকাল ইতিহাসে মুসলমানেদের দুর্বৃত্ত দেখানোটাই চল হয়েছে, আওরঙ্গজেবের সেই সব ঐতিহাসিকদের সহজ টার্গেট হন তার গভীর ধর্মচর্চার কারণে। সেই প্রবণতার বাইরে দাঁড়িয়ে ঐতিহাসিক সামাজিক, আর্থিক এবং প্রশাসনিক ফ্যাক্টরগুলি মিলেমিশে যে মুঘল ক্ষমতাকে দুর্বল করেছে সেটি বোঝাতে চান। এই ধরণের বিস্তৃত, ব্যবস্থা-ভিত্তিক বিশ্লেষণে ইতিহাসের প্রভুত রেণু খুঁজে পাওয়া গেলেও সেটা জনরূচিসম্মত হয় না।
সত্যিই তো আওরঙ্গজেবের পরে মুঘল ভারত সম্বন্ধে আমরা কতটুকুই বা জানি। এবং আমরা সত্যিই তার সাম্রাজ্যের সময়ের বহু বিষয় সম্বন্ধে জানি না, যেগুলিকে হয়ত আমরা ধরেই নিচ্ছি মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের কারণ হিসেবে। কিন্তু আওরঙ্গজেন যতদূর সম্ভব একটি দোমড়ানো মোচড়ানো উত্তরাধিকার ফেলে যাচ্ছেন এটা দেখতে পাচ্ছিলেন তার সাম্রাজ্যের শেষের দিকে। তাঁর শেষের চিঠিগুলিতে লিখেছেন যে মুঘল সাম্রাজ্যের সামনে কালো দিনগুলির কথা, এবং সেই সাম্রাজ্যকে ঢালের দিকে গড়িয়ে যাওয়ার দিকে থেকে তার মত শক্তিশালী মানুষ এড়াতে পারছেন না।
---
মুঘল সাম্রাজ্য পতনের কারণ হিসেবে আওরঙ্গজেবের দায়িত্ব নিয়ে যে সম্ভাব্যতার আলোচনা আমরা করি, তার বাইরে আমরা এই এত পরস্পর বিরোধী সম্রাটের দীর্ঘকালের রাজত্বকে কিভাবে দেখি সেটা কি ভেবেছি? আধুনিক সময়ের প্রেক্ষিতে হিংসা, ব্যক্তি স্বাধীনতা এবং বরদাস্ত করা বিষয়ে নানাভাবে তার কাজকে প্রশ্ন তোলাই যায়। কিন্তু আমরা তাকে তার সময়ের পূর্বের সম্রাটেদের সঙ্গে তাকে কিভাবে তুলনা করতে পারি এই প্রশ্নটার মুখোমুখি হওয়া যাক।
আকবর এবং তার পরের সম্রাটদের তুলনায় আওরঙ্গজেব মুঘল প্রথা থেকে অনেক বেশি বিচ্যুত হয়েছিলেন। কিন্তু যে পরিবর্তনগুলি তিনি এনেছিলেন যেমন শিল্পকলা, দাক্ষিণাত্য অভিযান, জিজিয়া লাগুকরা, তিনি মুঘল প্রশাসনিক সেনাবাহিনীকগত এবং কৃষ্টিগতভাবে মুঘল সাম্রাজ্যিক ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছিলেন। তাঁকে আমরা আকবরের মত আন্তকৃষ্টির মেলবন্ধনের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব হিসেবে চিহ্নিত অকরি না(এবং ষষ্ঠ শাসক হসেবে সেই কাজটা করা তার দরকারও ছিল না বলে তিনি মনে করেছেন)। তিনি ফতোয়াইআলমগিরির মত আদ্যোপান্ত একটি বিশাল বড় বৌদ্ধিক কাজ করিয়েছেন এবং তাকে উদ্দেশ্য করে বেশ কয়েকটা রামায়নও উতসর্গিত হয়েছিল। তিনি শাহজাহানের মত প্রাসাদ তৈরির মানুষ ছিলেন না, যদিও তিনি লাহোরে অসাধারণ বাদশাহী মসজিদ তৈরি করান। আজকের মানুষ তাকে যা ভাবেন, তিনি তার বাইরে দাঁড়িয়ে তার পূর্বপুরুষদের মতই ছিলেন।

আওরঙ্গজেবঃ দ্য লাইফ এন্ড লেগাসি অব ইন্ডিয়াজ মোস্ট কন্ট্রোভার্সিয়াল কিং৫৭ - অড্রে ট্রুস্কে

(ময়ূর সিংহাসন এবং সিংহাসনে নাদির শাহ)
ঝড়তি পড়তি মুঘল সাম্রাজ্যে যা কিছু ছিল, ১৭৩৯ সালে ইরানি লুঠেরা নাদির শাহ সেটাও লেপে পুছে নিয়ে চলে গ্যাল। নাদির শা মুঘল সম্রাট মহম্মদ শাহকে তার তরোয়ালের তলায় বন্দী করে রাখলেন আর তার সেনাবাহিনী গোটা দিল্লি শহর লুঠপাট করন খুন জখম চালাল। দিল্লির তিজোরি লুঠ হল। হাজারো বিশ্বশ্রুত হিরে জহরত ইত্যাদির সঙ্গে ছিল ময়ূর সিংহাসন এবং কোহিনুর হিরেও ভারতের বাইরে চুলে গ্যাল। আদতে নাদির শাহ শুধু দিল্লির সম্পদ লুঠলেন না, তিনি মুঘল সাম্রাজ্যের সম্মানটাও লুঠে নিয়ে গেলেন।
দিল্লি অভিযানের কিছু পরেই নাদির শাহর একটি মূর্তি আঁকা হল তাতে দেখা যাচ্ছে তাঁকে বিপুল পরিমানে গয়নাগাটি রত্ন্রাজি পরে থাকতে, সত্যিকারের মুঘল সম্পদ পরে থাকতে। মুঘল সাম্রাজ্য আর নাদির শাহের আক্রমনের দুর্বিসহ যন্ত্রণা অপমান থেকে আর মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে নি। সে সময়ের এক মুসলমান বুদ্ধিজীবি মন্তব্য করলেন, sultanate of Delhi had become a child’s game।
মুঘল সাম্রাজ্য খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলেছিল সিপাহি যুদ্ধোত্তর ১৮৫৭র ভারতের জাতীয়করণ না হওয়া পর্যন্ত। কিন্তু চলছিল সাম্রাজ্যের আভরণসূচক নাম নিয়েই। ১৭৬৫র পর থেকে ভারতের শাসক ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি অবনত মুঘলদের সমস্ত ধরণের সার্বভৌমত্ব বলতে যা বোঝায় জমির দখল, সেনাবাহিনী এবং রাজস্ব আদায়ের ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে তাদের নিয়মতান্ত্রিক শাসকে পরিণত করে। দ্বিতীয় বাহাদুর শাহের পূর্বজ দ্বিতীয় আকবর শাহ (রাজত্ব১৮০৭-৩৭)র অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে তার রোজের ক্ষুন্নিবৃত্তি নিবৃত্ত করতে ভারতে ঘুরতে আসা বিদেশিদের তার সঙ্গে দ্যাখা করার জন্যে হাত পেতে প্রণামী চাইতেন!
---
গুণীরা একমত হতে পারেন নি কেন মুঘল সাম্রাজ্যের পত ঘটল, তার কারণই বা কি এবং সত্যি কোন সময়ে মুঘল সাম্রাজ্যের মধ্যে ফাটল কবে ধরতে শুরু করে। অধিকাংশ ঐতিহাসিকই একটা বিষয়ে একমত মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের জন্যে আওরঙ্গজেবই মূলত দায়ি। এই যুক্তিটা আমার কেমন কেমন লাগে কারণ তাঁর আমলেই মুঘল সাম্রাজ্য ভৌগোলিকভাবে সব থেকে বেশি এলাকায় বিস্তৃতি ঘটেছিল। কিন্তু আওরঙ্গজেবের সাফল্যই হয়ত এর পতনেরও কারণ হতে পারে। তিনি হয়ত মুঘল সাম্রাজ্য এত বিপুল বিশাল আকার দিয়েছিলেন, তার জন্যে বিপুল সম্পদ ব্যয় করতে হয়েছিল এবং সাম্রাজ্য চালানোর সামগ্রিক হাতিয়ারগুলো ভোঁতা হয়ে পড়তে থাকে।
কেউ কেউ দ্বিধাগ্রস্তভাবে বলেছেন আওরঙ্গজেবের মিতব্যয়িতা পতনের বড় কারণ। বিংশ শতকে আওরঙ্গজেবের বিষয়ে সব থেকে বেশি গবেষক যদুনাথ সরকার সরকার স্বভাবিত নাটকীয়ভঙ্গীতে লিখলেন, [in Aurangzeb’s reign] the Mughal crescent rounded to fulness [sic] and then began to wane visibly। যদুনাথ সরকার আওরঙ্গজেব নিয়ে তার দৃষ্টিভঙ্গী স্পষ্ট করেছেন, তার বহু বইতে, বিশেষ করে পাঁচ খণ্ডের হিস্ট্রি অব আওরঙ্গজেবএ। শেষ পর্যায়ে আওরঙ্গজেবের চরিত্র বর্ণনা করে তিনি লিখছেন, The life of Aurangzib was one long tragedy,—a story of man battling in vain against an invisible but inexorable Fate, a tale of how the strongest human endeavor was baffled by the forces of the age। যদুনাথ সরকার আওরঙ্গজেবকে ট্রাজিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে দেখছেন। একই সঙ্গে ঔপনিবেশিক সময়ের মনীষা অনুসরণে তিনি আওরঙ্গজেবকে ধর্মীয় মতান্ধ(এবং মুঘল অর্ধচন্দ্র) বলে দাগিয়ে দিচ্ছেন, এবং ভাবছেন, আওরঙ্গজেব যে ধরণের ইসলাম চর্চা করেছেন, সেটি সাম্রাজ্যের ক্ষেত্রে চরম হানিকর হয়েছে।

আওরঙ্গজেবঃ দ্য লাইফ এন্ড লেগাসি অব ইন্ডিয়াজ মোস্ট কন্ট্রোভার্সিয়াল কিং৫৬ - অড্রে ট্রুস্কে

অষ্টম অধ্যায়
আওরঙ্গজেবের উত্তরাধিকার
(ছবিতে প্রথম বাহাদুর শাহ বা মুয়াজ্জম)
আওরঙ্গজেবের পর
None but the Creator has knowledge of the future;
If anyone says he knows it, do not believe him!
-বাবা মুসাফির(মৃ ১৭১৪), নকক্সবন্দী সুফি, আওরঙ্গজেবের পুত্রদের সিংহাসন দখলের লড়াই বিষয়ে
আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর এক দশক কাটতে না কাটতেই মুঘল সাম্রাজ্য ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। তবে সাম্প্রতিক গবেষণা আমাদের জানাচ্ছে, এর আগে আওরঙ্গজেবের পরের সময়ে মুঘল সাম্রাজ্যের ধ্বংস ক্রিয়া যতটা দ্রুত হয়েছে বলে মনে করা হত, তত দ্রুত এবং সামগ্রিকভাবে পতনের ঘটনা ঘটে নি। কিন্তু পার্থক্য যতই সূক্ষ্ম হোক না কেন আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পরে যে পতন ঘটল সেই ঢালটায় চলার গতি লক্ষ্যনীয়।
সম্রাটের তিন সন্তান একে অপরের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরলেন। দুবছরের ভিতরেই দ্বিতীয় পুত্র মুয়াজ্জম অন্য দুজন আজম এবং কাম বক্সকে ধরাধাম থেকে সরিয়ে দিয়ে নিজে সিংহাসনে চড়লেন বাহাদুর শাহ নাম নিয়ে। ওপর ওপর মনে হচ্ছিল সাম্রাজ্যের দৈনন্দিন কাজকর্ম সব ঠিকঠাক চলছে। অতীতে দেখা গিয়েছে মুঘল রাজপরিবারের মধ্যে সিংহাসন দখলের লড়াই আদতে মুঘল সাম্রাজ্যকে সবল করেছে। এখন দেখা গেল সমস্যার শেকড় অনেক গভীরে চারিয়েছে এবং মুঘল সাম্রাজ্যকে ধীরে ধীরে গিলে ফেলতে চাইছে।
পিতার কাজকর্মে মুঘল সাম্রাজ্যের ভিত্তিতে বেশ কিছু সমস্যা গভীর হয়ে দেখা দিচ্ছিল। উত্তরে জাঠ আর শিখেরা অস্ত্র ধরেছিল আর দক্ষিণে মারাঠাদের বিদ্রোহে রাজস্ব ঘাটতি দেখা দিল, ফলে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠল সাম্রাজ্য বন্ধু রাজপুতেরা। বাহাদুর শাহের ক্ষমতায় আসার সঙ্গে সঙ্গে এই সমস্যাগুলো প্রবল হয়ে দেখা দিতে শুরু করে এবং বিদ্রোহীরা এই সুযোগে মুঘল সার্বভৌমত্বকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বসে। কিন্তু বাহাদুর শাহ, তার পিতার মত এই সমস্যা সামাল দিতে অপারগ হয়ে সমস্যার সামনে ঝুঁকে পড়লেন, আর মুঘল সাম্রাজ্যের খণ্ডবিখণ্ড হয়ে যাওয়া এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা।
তিরিশ বছর আগে মারোয়াড়ের রাঠোড় রাজপুর পরিবার আওরঙ্গজেবের বিরোধিতা করে অসফলভাবে বিদ্রোহ করেছিল, তারা এই সুযোগে মুঘল আধিপত্য থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ খুঁজল। রাঠোড় শাসক অজিত সিংহ মুঘল বাহিনীকে যোধপুর থেকে তাড়িয়ে বার করে দিলেন এবং শহরে সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণের সময় তৈরি হওয়া মসজিদগুলিও ভেঙ্গে দিলেন। বাহাদুর শাহ যোধপুর দখল নিলেন। কিন্তু বাহাদুর শাহ পাঞ্জাবে শিখ বিদ্রোহের ফলে অনেক বেশি সেখানে ব্যস্ত হয়ে যাওয়ায়, নতুন করে অজিত সিংহ মারোয়াড়ের আধিপত্য তৈরি করলেন। পাঞ্জাবের শিখ বিদ্রোহ মুঘল সাম্রাজ্যকে ভোগাতে শুরু করল।
বাহাদুর শাহ ১৭১২তে মারা যান, বাবার মৃতুর পাঁচ বছরের মধ্যেই। তারপরে মুঘল সাম্রাজ্যের খণ্ডবিখণ্ড হবার হার বেড়ে গেল। ১৭১২ থেকে ১৭১৯, এই সাত বছরে চারজন মুঘল সম্রাট খুব দ্রুতলয়ে ক্ষমতায় আরোহন করলেন এবং সরেও গেলেন। আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর তের বছরের মধ্যেই পাঁচ জন সম্রাট সিংহাসনে আরোহন করে। এর সঙ্গে তুলনা করুণ তার আগের ১৫০ বছর। সে সময় রাজত্ব করেছিলেন মাত্র চারজন রাজা। এই রাজনৈতিক অস্থিরতায় মুঘল রাজপরিবার অভিজাতদের আস্থা ও নিয়ন্ত্রণ হারাল। ফলে সাম্রাজ্যের সব থেকে মৌলিক কর্ম রাজস্ব আদায় ভীষণ কমে গেল। সমগ্র সাম্রাজ্যের আমলাতন্ত্রে দুর্নীতি ছেয়ে গেল এবং বহু এলাকা মুঘল সাম্রাজ্য থেকে আলাদা হয়ে যায়।

Friday, September 21, 2018

আওরঙ্গজেবঃ দ্য লাইফ এন্ড লেগাসি অব ইন্ডিয়াজ মোস্ট কন্ট্রোভার্সিয়াল কিং৫৫ - অড্রে ট্রুস্কে

আওরঙ্গজেবঃ দ্য লাইফ এন্ড লেগাসি অব ইন্ডিয়াজ মোস্ট কন্ট্রোভার্সিয়াল কিং৫৫ অড্রে ট্রুস্কে
একইভাবে পরের দিকে পুত্র আজম শাহকে লিখিত এক চিঠিতে আওরঙ্গজেব শাহজাহানের সঙ্গীতপ্রেমের দাদ দিচ্ছেন, যা তিনি সহি সম্রাটের নিদর্শন হিসেবে, কয়েক দশক আগেই উপভোগ করা ছেড়ে দিয়েছিলেন। মুঘল সম্রাট হবার বহু রাস্তা ছিল। তার জীবনের শেষ দিককার চিঠিগুলিতে আওরঙ্গজেব তার পরিবারের সূত্রে যে সংশ্লেষী ধারাটি অর্জন করেছেন সেকথা বারবার উল্লেখ করেছেন এবং এই সংশ্লেষীভাবনাই তার সাম্রাজ্যের চালিকাশক্তি এবং জোর ছিল বলে তিনি মনে করতেন।
---
আওরঙ্গজেব ১৭০৭এ মারা যান। স্বাভবিক মৃত্যু। আহমদনগরে। তার ইচ্ছে অনুযায়ী তিনি খুলদাবাদের চিস্তি সুফি দরগা জাইনুদ্দিন শিরাজীর কবরের পাশে অনামা কবরে শয়িত হন। আজও খুব বেশি মানুষ যায় না তার কবর দেখতে – কারণ তার কবরে দেখার মত কিছুই নাই – চাদরে ঢাকা সাদা পাথরে মোড়া একটি কবর - পাথরটাও পরে যোগ হয়েছে - একটা পরিচিতিও যোগ হয়েছে। অথচ প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ মানুষ হুমায়ুন, আকবর বা শাহজাহানের তৈরি কবর দেখতে যান।
আওরঙ্গজেবের সাধারণতায় মণ্ডিত কবর তার বর্ণময় জীবনের সঙ্গে যেন চরমতম বৈপরীত্য সৃষ্টি করেছে। এই নির্জনতা যেন তার ধার্মিকতার প্রকাশভঙ্গী। আওরঙ্গজেব যত প্রবীনতার দিকে অগ্রসর হয়েছেন, ততই তার ধর্মীয়তার প্রতি আকর্ষণ বেড়েছে। কিন্তু আজকে রাজা বললে যে ধরণের ছবি ভেসে ওঠে, আওরঙ্গজেব তার চরম বিপরীত ছিলেন। তিনি তার ধর্মান্ধতা অন্যর ওপরে না ফলিয়ে সেই খোঁজটা নিজের মনের মধ্যে ঝুঁকে থেকে সর্বশক্তিমানের প্রকাশ হিসেবে দেখেছেন। তিনি শেষের দিনের কথা বারবার বলতেন এবং তিনি যে একজন অপরিচিত হয়ে পরের বিশ্বে পা রাখতে যাচ্ছেন সেকথাও লিখেগিয়েছেন।
সম্রাট আওরঙ্গজেবের চরিত্রের মধ্যে একটা বিহুমাত্রিকতার আভাস আছে যা ইসলামের সঙ্গে একটা জটিল সম্পর্ক স্থাপন করে। আওরঙ্গজেবের জীবন আলোচনায় কোন কিছুই সরলভাবে বর্ণনা করা যাবে না। তিনি একন একজন সম্রাট যিনি ক্ষমতার এবং তার প্রসারতার প্রতি নিবেদিত অথচ তার ন্যয়বিচার দেওয়ারও সদিচ্ছা প্রবল। অসম্ভব প্রশাসনিক দক্ষতা আবার প্রশাসনিকভাবেই যে সব সিদ্ধান্ত নেন সেটা অতলান্ত পতন নিশ্চিত করে। যে মানুষটা প্রায় ৫০ বছর ভারতের ক্ষমতায় থেকে গেলেন এবং আজও মানুষের স্মৃতিতে উজ্জ্বল, তাঁকে কোন একভাবে দেখা সম্ভব নয়।

আওরঙ্গজেবঃ দ্য লাইফ এন্ড লেগাসি অব ইন্ডিয়াজ মোস্ট কন্ট্রোভার্সিয়াল কিং৫৪ - অড্রে ট্রুস্কে

আওরঙ্গজেব মনে করতেন না যে তিনি তার নালায়ক পুত্রদের অযোগ্যতার সাম্রাজ্যিক ভার তার কাঁধে বহন করে চলেছেন। Munis Faruqui(প্রিন্সেস অব দ্য মুঘল এম্পায়ার ১৫০৪-১৭১৯) খুব সুন্দরভাবে বলছেন কিভাবে আওরঙ্গজেব শাহজাহাদের রাজকীয় জীবনযাত্রায় অসমিচীন হস্তক্ষেপ করতেন এবং রাজকীয় আটোনমিতেও কাটছাঁট করেছিলেন। ১৭০০ নাগাদ তিনি তার পুত্রদের ছেড়ে নাতিদের পছন্দ করতে শুরু করেন, ফলে ক্ষমতা দখলের লড়াইতে পুত্রদের অবস্থা আরও সঙ্গীন হয়। শাহজাদাদের তুলনায় তিনি বহু ক্ষেত্রে অভিজাতদের বেশি গুরুত্ব দিতেন। প্রধান উজির এবং সেনাপতি জুলফিকার খানকে দিয়ে ১৬৯৩ সালে জিঞ্জিতে মারাঠা রাজারামের সঙ্গে জোট করার অভিযোগে কামবক্সকে গ্রেফতার করান। আওরঙ্গজেবের শেষ ইচ্ছেই তিনি তিন পুত্রকে রাজ্যভাগ করে দিয়ে আসদ খানকে নির্দিষ্ট কাজের অসীম দায়িত্ব দিয়ে যান।
মুঘল শাহজাদারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম রাজপরিবারে নিজেদের অবস্থা এবং তাদের সিংহাসনের দাবি জোরদার করতে বহু পরম্পরার সমাজকে অবিভক্ত মুঘল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত করিয়েছেন। সিংহাসনের লড়াই আদতে মুঘল সাম্রাজ্যের টিকে থাকার বড় কারণ শাহজাদাদের অতিসক্রিয়তা। বিপরীতে আওরঙ্গজেব মুঘল সাম্রাজ্যের ভবিষ্যৎ সম্রাট, তার পুত্রদের নখ দাঁত ভেঙ্গে দিয়েছিলেন ফলে যখন অবস্থা দাবি জানাল তখন তারা অবস্থার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারল না।
---
নিজের পুত্রদের যোগ্য হিসেবে গড়ে তুলছেন না, অন্যভাবে বলতে গেলে তাঁর উত্তরাধিকারী তিনির প্রশ্নকে গুরুত্বই দেন নি, এটা মুঘল সাম্রাজ্যের বিপুল ক্ষতি করেছে। এছাড়াও আরও অনেক গুরুত্বপুর্ন বিষয় পুত্র, নাতিদের উদ্দেশে যে সব ভাবনা প্রকাশ করে লেখা চিঠি থেকে উদ্ধার করি, সেখানেও দেখতে পাই কিভাবে তিনি মুঘল সার্বভৌমত্বকে দেখেছেন।
১৬৯১ দশকের শেষের দিকে একটা চিঠি উদ্ধার করা হয়েছে বড় ছেলে আজম শাহর পুত্র বিদর বখতকে লেখা, সেখানে তিনি স্পষ্ট বলছেন কিভাবে রাজপুরুষদের জীবনযাত্রাকে ঢেলে সাজাতে হয় এবং কিভাবে শাসন করতে হয়। তিনি বলছেন সক্কালে উঠে জল খাওয়ার আগে নামাজ এবং কোরাণ পাঠ করতে। তিনি আরও বলছেন, রোগ সারাতে এবং সুস্থ থাকতে এই আচারটি সম্পন্ন করে যেন জল পান করেন নিয়মিত। এছাড়াও আকবরের সময়ের মুঘল নানান প্রথা প্লান করার নির্দশ দিচ্ছেন - যেমন বিশেষ করে সোনারূপায় নিজেকে ওজন করে সেই অর্থ গরীবদের বিলিয়ে দেওয়ার প্রথা। এটা যে প্রাচীন হিন্দু প্রথা তিনি সেটাও মেনে নিচ্ছেন, Although weighing one’s entire body against gold, silver, copper, grain, oil, and other commodities is not a practice of our ancestral lands or of the Muslims here [in India], nonetheless the practice greatly benefits many needy and poor people। তিনি মনে করিয়ে দিচ্ছেন, শাহজাহান বছরে দুবার নিজেকে ওজন করাতেন কিন্তু তিনি বিদরকে বলছেন এই কাজটা বছর ১৪ বার করতে। এর আগে আমরা উল্লেখ করেছি, প্রথম দশকে তিনি নিজেকে ওজন করালেও পরের দিকে এই প্রথা থেকে বেরিয়ে আসেন – কিন্তু চ্যাপলেইন ওভিঙ্কটন জানাচ্ছেন আওরঙ্গজেব কিন্তু এই কাজটা করেই গিয়েছেন। তিনি মনে করতেন এই হিন্দু প্রথাটি মুঘল পরম্পরা হয়ে উঠেছে, যদিও তিনি নিজে এটি ব্যক্তিগতভাবে এড়িয়ে গিয়েছেন।