Showing posts with label গৌতম ভদ্র. Show all posts
Showing posts with label গৌতম ভদ্র. Show all posts

Friday, June 9, 2017

গৌতম ভদ্র'র ইমান ও নিশান থেকে একটা গুরুত্বপূর্ণ পাঠ৬

ইমান ও নিশান থেকে এই পর্বে শেষ কিছু কথা...

কীসে থেকে কীসে রূপান্তর? নিছক 'ধর্মীয়' আন্দোলন থেকে রাজনৈতিক আন্দোলন? অথচ এর মধ্যে বীরসার পরিচিতিই বিপরীত মুখে পালটে গেল। নিছক রাজনৈতিক নেতা থেকে তিনি হলেন ধর্মীয় নেতায়, অলৌকিক পুরুষে। আন্দোলনের চরিত্র রূপান্তরিত হল ধর্মীয় থেকে রাজনৈতিক এবং নেতা রূপান্তরিত হলেন রাজনৈতিক থেকে অলৌকিক পুরুষে।

আসলে এই স্ববিরোধিতার উৎস হচ্ছে যে পূর্ব ভারতের কৃষক আন্দোলনের অন্যতম অগ্রগণ্য ঐতিহাসিক এখনও কোন কোন পর্যায়ে ধর্ম ও রাজনীতির মধ্যে ফারাক টানেন, বিশ্বাস করেন যে কতগুলি বিশেষ ক্ষেত্রেই ধর্ম ও রাজনীতি অঙ্গাঙ্গীভাবে মিলেমিশে যায়। যেমন মুণ্ডাদের ক্ষেত্রে, যেমন উপজাতিদের সমাজে। ধর্ম আর রাজনীতির সম্পর্কে কোন অনিবার্যতা নেই। তার মধ্যে ভেদ আছে, ছেদ আছে; ঐতিহাসিক পরিস্থিতিতে একটা আরেকটায় রূপান্তরিত হয়।

এ কথা অনস্বীকার্য যে ধর্মবিশ্বাস অনড় নয়, তাতে অভিযোজন হয়, আন্দোলন মাফিক ধর্মের নিজস্ব রূপ থাকে, রূপের অন্তরও হয়। কিন্তু ক্ষমতা বিন্যাস যদি রাজনীতির মর্মবস্তু হয় তবে প্রাক-ঔপনিবেশিক বা ঔপনিবেশিক সমাজে এমন কোন ধর্ম বিশ্বাস নেই যা রাজনীতি রহিত। আসলে রাষ্ট্রকেন্দ্রিকতা অথবা রাজনীতি সম্পর্কে এক বিশেষ ধারণা নিম্নবর্গের আন্দোলন আমাদের রাজনীতির কতগুলি লক্ষ্মণ খুঁজতে প্রণোদিত করে; যেমন সঙ্গঠনের নেতা, প্রচারক, অনুগামীদের কার্যবিধি আর কার্যক্রমের ছককে। সেই সব লক্ষ্মণের ব্যতিরেকে আমরা ক্ষমতাকে চিনতে পারি না, সেই সব লক্ষ্মণের ভিত্তিতে আমরা কতকগুলি আন্দোলনকে ধর্মীয়, কতকগুলি আন্দোলনকে রাজনৈতিক বলি। অবশ্যই নিম্নবর্গের কতকগুলি আন্দোলন তুলনামূলমকভাবে আপসকামী ও কতকগুলি তুলনামূলকভাবে প্রতিবাদী। ফলে তাদের রাজনীতিও আলাদা। কিন্তু নিম্নবর্গের চৈতন্যে এমন কোন ধর্মবোধ নেই যা ক্ষমতা রহিত অথবা রাজনীতি বিবর্জিত। নিম্নবর্গের নিম্নতম আন্দোলনও যে আদর্শ থাকে তা দীন বা আদাব দ্বারা পরিষিক্ত, তা শুধু সংহতি বা জমায়েতের সূত্র নয়। আদর্শ ছাড়া, রাজনীতি ছাড়া নিম্নবর্গের আন্দোলন হয় না এবং সেই রাজনীতির মূলে থাকে কোন না কোন ইমান বা বিশ্বাস।

ধার্মিক ঐতিহ্যের পুনর্নির্মিতির ধারণার পাশাপাশি আরেকতি প্রতীতি সম্পর্কে আমাদের সচেতন থাকা দরকার। দূরদর্শন বা ইতিহাসের পাঠ্যপুস্তকের মাধ্যমে বর্তমান ভারতীয় শাসকশ্রেণী বার বার সেই প্রতীতিই লোকেদের কাছে পেশ করছেন। তা হল এক সমস্বর অতীতের ধারণা। এর তাগিদ আসে বুর্জোয়ার ক্ষমতার ইচ্ছা থেকে, নানা সময়, নানা চৈতন্যকে বুর্জোয়ারা একটি সমীকরণের মধ্যে আনতে চেষ্টা করে। যেরকম বাজারে একীকরণ দরকার, সেরকম দরকার ভাষার একীকরণ, অতীতের একীকরণ, তা না হলে বুর্জৈয়া জাতীয় রাষ্ট্রের ইতিহাস লিখতে পারে না।

এই দর্শনের নান্দীমুখ পাঠ করেছেন জওহরলাল নেহরু তাঁর 'ডিসকভারি অব ইন্ডিয়া'য়। নিজের জবানীতে স্বীকার করেছেন যে ত্রিশের দশকের দিনগুলিতে রাজনৈতিক প্রচারের সময় তিনি বার বার চেষ্টা করেছেন অগণিত কৃষকের কাছে প্রশ্ন করতে ভারতমাতা বলতে তারা কী বোঝে। জাঠ কৃষকদের কাছে ভারতমাতার অর্থ তার জমি, তার চষা মাঠ। নেহরু তাদের কাছে তুলে ধরে ছিলেন এমন এক ছবি যা তাদের গ্রাম জমিকে ছাড়িয়ে অনাদি অনন্ত ভারতের ধারণা হাজির করেছিল। distinctively Indian, with the same national heritage and the same set of moral and mental qualities.

নেহেরুর এই ভারত আবিষ্কার প্রকৃতপক্ষে জাঠ কৃষকের ভারতমাতার ধারণা থেকে বহু দূরে, তাদের দেশ আর সময়ের ধারণাকে আত্মসাৎ করে এমন এক ভারতের দর্শন তৈরি করেন যার সাহায্যে শাসকশ্রেণী র স্বার্থে এক পরম কেন্দ্র গড়ে তোলা যায়, যেখানে ভারতীয় ঐতিহ্য আর ঐক্যকে বিজায় রাখার দাবিতে কেন্দ্রের নিঃশর্ত সর্বময় গুরুত্বে আস্থা রাখা যায়। কিন্তু অতিআধুনিক কালেও আমাদের অভিজ্ঞতা দেখায় যে রাষ্ট্রীয় আধিপত্যের ব্যাপকতা সত্ত্বেও বুর্জোয়ার সর্বেশ্বরতা আজও অসম্পূর্ণ। বিহারের সশস্ত্র প্রাঙ্গণে বুর্জোয়া রাষ্ট্রের সশস্ত্র ফৌজ আজও লোরিক সেনা, ভূমি সেনা, কুঁয়র সেনার সঙ্গে হাত মেলায়।

ঐ অর্থে ভারতীয় ইতিহাস আজও অসমস্বর। ...আজও নিম্নকোটির মানুষেরা বুর্জোয়া রাষ্ট্র ও দর্শনের নতুন ভাষা সেভাবে আত্মস্থ করে নি যাতে করে সে ধার্মিক ঐতিহ্যকে সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করে তার চেতনা ও সত্ত্বাকে সম্পূর্ণভাবে নতুন ভাষায় বলতে পারবে। জাতীয়তাবাদী যোজকদের হাজারো চেষ্টা সত্ত্বেও উত্তোরণের সেই কাজ অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। এই অসমতার যন্ত্রণা আর সমস্যা কারুরই চোখ এড়িয়ে যাবার কথা নয়।

Thursday, June 8, 2017

গৌতম ভদ্র'র ইমান ও নিশান থেকে একটা গুরুত্বপূর্ণ পাঠ৫

ইমান ও নিশান থেকে আরও কিছু

প্রথমত, এই এলাকাভিত্তিক ছোট ছোট বিদ্রোহগুলি সমাজের নানান ক্ষেত্রে আধিপত্য ও পরবশ্যতার সংঘাতকে চিহ্নিত করে। ঐ সব বিন্দুগুলিকে না চিনলে আমরা ক্ষমতার পুরো ইতিহাস ধরতেই পারব না। বুঝতেই পারবনা কী করে প্রাক-ধনতান্ত্রিক বা ঔপনিবেশিক সমাজে নানা ক্ষেত্রে গ্রামে ও গঞ্জে ক্ষমতা বিন্যাসের ছক কীভাবে বিন্যস্ত আছে। বৃহত্তর কাঠামোর ভিত সেই ক্ষেত্রেই প্রোথিত আছে।

দ্বিতীয়ত মার্ক্স নিজে সচেতন ছিলেন এই বলে যে সামন্ততান্ত্রিক সমাজে আধিপত্য ও পরবশ্যতার সম্পর্ক কীভাবে সরাসরি রাজনৈতিক(directly political) ও ঘনিষ্ঠভাবে মানবিক (human, intimate) রূপেই প্রকাশিত হয়। ওয়াতন দাঁড়ায় এক ধরণের সীমিত জাতীয় পরিচয়(a constricted sort of nationality)। তাই প্রাক ধনতান্ত্রিক সমাজে কৃষকের রাজনৈতিক সত্তাকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারি।

তৃতীয়ত ক্ষমতার সব কেন্দ্রই, আধিপত্যের সব ভাবাদর্শই কোন না কোন বিপরীতের সঙ্গে বন্ধনে ও সংঘাতে আবদ্ধ। আদর্শ বা কার্যক্ষেত্রে যে কোন কায়েমি ক্ষমতার নির্ধারক নীতি বিপরীতের অবস্থানকে স্বীকার করতে বাধ্য। সত্যযুগ/কলিযুগ, লক্ষ্মী/অলক্ষ্মী, ধর্ম/অধর্ম/আপদ্ধর্ম-এর ধারণা আমাদের অজানা নয়। বিপরীতের সব রূপকে না বুঝে, ক্ষুদ্রকে না ধরে বিক্ষিপ্তকে চিহ্নিত না করে কেউ বৃহত্তর ক্ষমতা কেন্দ্র বা একাধিপত্য নির্মাণ বা বিনির্মাণ করার কোন কাজে হাত দেয় না। বিক্ষিপ্ত বিদ্রোহ বা প্রতিবাদী আদর্শের প্রভাবকে বৃহত্তর কাঠামো কখোনোই অস্বীকার করতে পারে না। সেই জন্যই ত লেখা হয় নানা চিঠি-চাপাটি, ঢাউস প্রতিবেদন, ব্যর্থ বিদ্রোহের অভিজ্ঞতার আলোকেই সাজান হয় নূতন করের ক্ষমতার খুঁটি, তৈরি করা হয় রাজধর্ম/প্রজাতত্ত্বের তত্ত্ব। নিজস্ব ভাবমূর্তিতে আত্মবিশ্বাস ছাড়া কোন ক্ষমতাই টিকে থাকতে পারে না। নানাভাবে নিম্নকোটির রাজনীতি বা চৈতন্যকে আত্মসাৎ করার চেষ্টা উচ্চকোটি সবসময় করে চলে। নিম্নকোটিরপরবশ্যতা ও আনুগত্যের সক্রিয় অভিজ্ঞতা ব্যতিরেকে শোষণ শ্রেণীর রাজনীতি গঠিত হতে পারে না।

চতুর্থত, হবসবম বা নরেন্দ্রকৃষ্ণ সিংহ মহাশয়ের চিন্তাধারার মধ্যে পরম কেন্দ্রিকতা বা রাষ্ট্রীয়তার ঝোঁক আছে। রাজনৈতিক ইতিহাসের সর্বোত্তম প্রকাশ কেন্দ্রিয় রাষ্ট্রের ইতিবৃত্ত, এই ধারনায় তাঁরা যেন বিশ্বাসী। তারই মাপকাঠিতে তাঁরা অন্যান্য সামাজিক ক্ষমতার চাহিদাকে দেখেন। কিন্তু রাষ্ট্রের সার্বিকতার বাইরে ক্ষমতা সম্পর্ক যে অন্যভাবে আবর্তিত হতে পারে এবং ক্রমে তা রাষ্ট্রকেই মোকাবিলা করতে পারে, সেই ইতিহাসের মাত্রা যে আলাদা সেটাকে বোঝা ও তার মধ্যে হাজারো নিহিত সম্ভাবনাকে তুলে ধরা হয়ত জরুরি। তা না হলে রাষ্ট্রের ইতিহাসের মধ্যেই সমাজের যাবতীয় অভিজ্ঞতাকে আমরা ধরব, বিচার করব, ভুলে যাব আমাদের স্বপ্ন যে রাষ্ট্র একদিন থাকবে না, কিন্তু রাষ্ট্রহীন সমাজ থাকবে।

গৌতম ভদ্র'র ইমান ও নিশান থেকে একটা গুরুত্বপূর্ণ পাঠ৪

এবারও গৌতম ভদ্র'র ইমান ও নিশান থেকে
"এ কথা বলা হয় যে ধর্মীয় চেতনা বা ধর্মাশ্রয়ী চৈতন্যের রাজনৈতিক প্রভাব সীমিত, কৃষক আন্দোলন ও বিদ্রোহী চৈতন্য কখোনোই বৃহত্তর কাঠামোকে প্রভাবান্বিত করতে পারে না। হবসবমের মত পরিশীলিত মার্ক্সবাদী ঐতিহাসিকের মতে, শ্রেণী হিসেবে কৃষকেরা কম সচেতন, তাদের চৈতন্য তুলনামকূলকভাবে নিম্নমানের(a class of low classness). বৃহত্তর অর্থে কৃষকদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাস আছে কিন্তু বড় একটা রাজনৈতিক ইতিহাস নেই(Peasants appear to belong in economic & social history, but rarely in political history). তাঁর মতে চীনের ইতিহাস এদিক দিয়ে দলছুট নজির।
"কিন্তু শুধু সাহেবেরাই নন, ভারতের ঐতিহাসিকদের মধ্যেও কেউ কেউ এই মত পোষণ করেছিলেন। হবসবমের লেখার বহুদিন আগে অষ্টাদশ ও উনিশ শতকের কৃষক আন্দোলন প্রসঙ্গে নরেন্দ্র কৃষ্ণ সিংহ মহাশয় মোটামুটি এক ধরণের বক্তব্য রেখেছিলেন। কৃষকদের খুচরো বিদ্রোহের তালিকা দেখতে শুনতে ওজনদার হলেও তাদের গুরুত্ব অতিরঞ্জিত করা ঠিক নয়, বৃহত্তর কাঠামোর ওপর তাদের প্রভাব সীমিত।
"...কৃষকদের পিছিয়ে থাকা মানসিকতা বেশ চালু তত্ত্ব। বাইরে থেকে আসা যোজকরাই কৃষক আন্দোলনের প্রকৃত রাজনৈতিক সম্ভাবনাকে কার্যকর করে। তবু খটকা থেকেই যায়।"

গৌতম ভদ্র'র ইমান ও নিশান থেকে একটা গুরুত্বপূর্ণ পাঠ৩

আবারও গৌতম ভদ্র'র ইমান ও নিশান থেকে

"... আবার পঞ্চম জর্জের রাজ্যাভিষেকের সময় মাদ্রাজের বামুন পণ্ডিতরা মজার রাজপ্রশস্তি লেখেন। সেখানে টেমস নদী হয় তমসা, ভিক্টোরিয়ার নাম হয় বিজিতার্ষা, গর্গ হন জয়ারজী ও রাণী মেরী মের্ষা। এই রূপান্তরের পাশেই উত্তর ভারতের সাধারণ লোকের মুখের ভাষায় 'প্রমিসারি নোটের' নামান্তর হয় 'পরমেশ্বরী নোট'। এইরকম লাগসই মোক্ষম নামান্তর বুঝিয়ে দেয় বোধের চরিত্রে নানা স্তরে কীভাবে ক্রিয়াশীল ছিল। এখানে মার্ক্সের একটা উক্তি আমাদের ভাবায়। প্রথম ভাষা শিক্ষার্থী সব সময় নতুন শেখার ভাষার অর্থকে তার নিজের মাতৃভাষায় অনুবাদ করে বোঝার চেষ্টা করে।

"কোম্পানির শাসনের প্রথম পর্বে ভারতীয় সমাজের নানা মানুষ কোম্পানির ও সাঙ্গপাঙ্গদের আনা ক্ষমতার নতুন অভিজ্ঞতাকে তাদের নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও ঐতিহ্যের মাধ্যমে বোঝার চেষ্টা করছিল, 'যুক্তিবাদ', 'উপযোগিতাবাদ', 'প্রগতি' আর 'আইনি' অধিকারকে বার বার ধরার চেষ্টা হচ্ছিল 'ইমান', 'দীন', আর 'ধর্মের' মধ্যে, কর্তব্য আর প্রথার মধ্যে, 'ইজ্জত' আর 'হুকুমতের' ধারনায়। ফলে বার বার নানা অসঙ্গতি দেখা যায়, সৃষ্টি হয় নানা ফাঁক ও জটিলতা। সেখানে সমর্পণ ও আনুগত্যের ছবিও বহুবার পাওয়া যায়। সেই ক্ষেত্রের ছকে বাজারি লাভ-লোকসান একমাত্র বিবেচ্য নয়; বরং শরণের ধারনা, পাপ-পুণ্য, ধর্মাধর্মের চৈতন্য সেখানে ক্রিয়াশীল থাকে।

"এই কথা বার বার বলা দরকার যে সরকার, সাহুকার আর জমিদারের গাঁঠবন্দীর অভিজ্ঞতাকে নিজস্বতাকে ভাষায় বুঝতে গিয়ে কৃষকরা কোন আদি মৌলে অনড়ভাবে আবদ্ধ থাকে নি, তাদের শেখার যোগ্যতা ছিল। নানা চাপের মুখে তাদের উদ্ভাবনেরও সম্ভাবনার অন্ত ছিল না। ফলে ঐতিহ্যে অনুকারিতার সঙ্গে অভিযোজন ও প্রতিসরণের সম্ভাবনাও প্রবল ছিল। যে কোন ধার্মিক ঐতিহ্যেই এই রদবদল আমরা দেখতে পাই।"

গৌতম ভদ্র'র ইমান ও নিশান থেকে একটা গুরুত্বপূর্ণ পাঠ২

ইমান ও নিশান থেকে--
"এই ধর্মবোধ ধার্মিক ঐতিহ্য, তথাকথিত অর্থে 'সনাতনী', প্রাক ঔপনিবেশিক যুগ থেকে আহৃত। কিন্তু এই ঐতিহ্য স্থানু নয়, বরং ক্রিয়াশীল। এর মধ্যে নানান রদবদল হয়, আঞ্চলিক ও দেশীয় এমনকি ব্যক্তিগত নিজস্ব অভিজ্ঞতার আলোকে অনুকারীরা ঐতিহ্য বদলে নেন। এমনকি আনকোরা অভিজ্ঞতাকেও ঐতিহ্যবলে চালু করা হয়। ধার্মিক ঐতিহ্য গড়ে ওঠার প্রক্রিয়ার কাজ জটিল, বোধহয় ভারতের ইতিহাসে অন্যতম দুরুহ বিষয়, তার মধ্যে আদান প্রদান, সমঝোতা, দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের শেষ নেই। বর্তমান প্রসঙ্গে (গারো স্বাধীনতা সংগ্রাম - পাগলাই ধুম এবং তিতুমীরের স্বাধীনতা সংগ্রাম) আমরা শুধু বলতে পারি যে এই ঐতিহ্যে 'ব্যক্তিগত রাজনৈতিক অধিকার' সদর্থকভাবে নেই। এই ঐতিহ্যে কর্ত্যব্যের প্রত জোর দেওয়া হয়েছে। সামাজিক থাকবন্দে (হায়ারর্কি) স্থিত নানা মানুষের নানা কর্ত্যব্যের তালিকার মধ্যেই ক্ষমতার সম্পর্ককে বলা হয়েছে। দ্বিতীয়ত গ্রাম, সমূহ, সম্প্রদায়, কুল বা গণের মাধ্যমেই রাষ্ট্র বা তার প্রতিনিধির কাছে ব্যক্তি হাজির করা হয়েছে। ব্যক্তির সত্ত্বা কোথাও কখনো জাহির হয় নি, এ কথা বলা সত্যের অপলাপ হবে। কিন্তু ক্ষমতার বিন্যাসে কোন না কোন সমূহের প্রতিনিধিত্ব বার বার ব্যক্তিকে ছাপিয়ে উঠেছে, 'আমির' চাইতে 'আমরা', 'তারা' বা 'তোমার' কণ্ঠস্বর তুলনামূলকভাবে জোরে শোনা গেছে, ব্যক্তি ছিল, ব্যক্তি সত্ত্বাও খুঁজে পাওয়া যাবে, কিন্তু ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদ-এর অস্তিত্ব 'সনাতনী' ঐতিহ্যে ছিল না।
"ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র, তার আইনি শাসন, বেহুদা শোষণ, তার সর্বেশ্বরতা পাবার ইচ্ছা, অক্ষমতা ও তজ্জনিত গড়ে ওঠা সরকার, সাহুকার এবং জমিদারের গাঁঠবন্দীর রূপকে ভারতীয় সমাজের নানা মানুষ তাদের দেশজ ধার্মিক ঐতিহ্যে, 'আমরা', 'তারা' ও 'তোমরা' বর্গে বোঝার চেষ্টা করেছিল।"

গৌতম ভদ্র'র ইমান ও নিশান থেকে একটা গুরুত্বপূর্ণ পাঠ

"বাখতিন আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন উচ্চতম মার্গ সংস্কৃতিতে শব্দ আর অর্থএর রকমফের থাকলেও তা সীমার মধ্যে আবদ্ধ, প্রত্যাশিত এবং ব্যকরণ-সম্মত। সব কিছুই সেখানে সূত্রে এবং নিয়মে বেঁধে ফেলা হয়। সংস্কৃত আর আরবী ব্যাকরণের সঙ্গে পরিচিত যে কোন লোকই এই কথার যথার্থ্য স্বীকার করবেন। অন্যদিকে নিম্নকোটির সংস্কৃতিতে শব্দ আর অর্থের সীমা নিয়ত পরিবর্তনশীল, অপ্রত্যাশিতের আর 'আকস্মিকতার' চমক সেখানে অনেক বেশি। কারণ নানা সূত্রে আহৃত রসদ সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থে সেখানে ব্যবহার হতে পারে, উৎসের আর সূত্রের সমত্ব থাকে না, নিয়মের নিগড়ও সেখানে হালকা হয়ে যায়, অর্থের সীমারেখা হয়ে পড়ে দুর্নিরীক্ষ্য।

মধ্যযুগের ইতিহাসে উতসব বা কার্নিভ্যালের সময় কী করে চিরাচরিত প্রথাগুলোর আনুষ্ঠানিক বিপরীত আচরণ বাস্তবে বিদ্রোহের জন্ম দিত, তার নানা সুন্দর বিবরণ আছে। যা 'স্বাভাবিক' তা হঠাৎ বদলে যেত, হত 'অস্বাভাবিক' সময় সময় শাসক শ্রেণীর হাতের বাইরে সামগ্রিক পরিস্থিতি চলে যেত। ব্যবহারিক ক্ষেত্রে অর্থ আর শব্দ, প্রথা আর রীতির উৎসে অসমত্ব থাকে। তার ফলে পরিবর্তনশীলতা, রঙ বদলানোর ক্ষমতা, 'আকস্মিকতা' নিম্নকোটির সংস্কৃতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হয়ে পড়ে। সেই ক্ষেত্রে কোন কাঠামোয় ধারা আর বোঝাও দুরুহ। নিম্নকোটির শব্দের অর্থের তার নানান চিহ্নের এই রূপান্তর, পরিবর্তনশীলতা আর নমনীয়তা নানান ঐতিহাসিক উপাদানের ওপর নির্ভরশীল। কার মার্ফতে শব্দ আর তত্ত্ব প্রচারিত হচ্ছে? ঐতিহ্য পরম্পরাতেই ভগবতের কথক ঠাকুর এবং মঙ্গলকাব্যের গায়ক বা জারিগানের গায়েন গভীর ধর্মতত্ত্বের কথা বলবেন কিন্তু ঘরানা আলাদা, বিষয় আলাদা, অর্থেরও নানা প্রতিসরণ ঘটবার সম্ভাবনা আছে।

আবার জুলুমের বিরুদ্ধে ইমানের জেহাদ কোম্পানির আমলে আর রঞ্জিৎ সিংহের রাজত্বে যে অর্থ আনবে, অন্য জালিম মুসলমান শাসকের বাদসাহিতে তার অর্থ সেরকম হবে না। সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থতি সেক্ষেত্রে ভিন্ন। ঠিক একই কারেওণে সাঁওতাল বিদ্রোহের(১৮৫৫) সময় সুভো ঠাকুরের আবির্ভাব আর বাণী এবং বিদ্রোহের চরম পরাজয়ের অভিজ্ঞতার প্রেক্ষিতে ভগীরথ মাঝি(১৮৭৪) ও দুবিয়া গোঁসাইয়ের আবির্ভাব(১৮৮০) আর প্রচার সাঁওতালি সমাজে সম অর্থ বহন করে না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঠাকুর বনাম মারাং বুরুর ধারণাও বদলে যায়।

আবার কৌম আর জনসংস্কৃতির আঞ্চলিক জোর ও ক্ষমত কেন্দ্রও ক্ষেত্র বিশেষ বিবেচ্য হতে পারে। ফুরফুরা শরিফের সনাতনী ইসলামি পথে যাত্রা এবং ঘুটিয়ারি শরীফের নানান অনুষ্ঠানে সহজিয়া আচার ভক্তের মনে 'উরসকে' দুই জায়গায় দুই ভিন্ন মাত্রায় চিহ্নিত করেছে। তাই যে কোন ভাষায় তথা সংস্কৃতিতে চালু শব্দের আভিধানিক অর্থ জানান দরকার ব্যকরণও পড়া প্রয়োজন। কিন্তু শুধু সেটাই যথেষ্ট নয়। শব্দের অর্থ জানা যায় কাব্য বিন্যাসের মধ্যে, নানা অন্বয়ের প্রেক্ষিতে, বাচকের কথার সুরে, লেখার ভঙ্গীতে। নিম্নকোটির সংস্কৃতি তথা রাজনীতিতে হিন্দু আর মুসলমান ধর্মের নানা রূপের প্রকাশ বোঝার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।"