শঙ্খপুরান
শঙ্খের বৈজ্ঞানিক নাম টারবিনেলা পাইরাম(Turbinella pyrum)৷ এটি একটি porcelaneous shell৷ অর্থ এমন একটি কাঠামো, যার ওপরের অংশ শক্ত, উজ্জ্বল আর স্বচ্ছ৷ ভারতীয় উপমহাদেশে এই ধরনের শঙ্খ পাওয়া যায় প্রধাণত ভারত মহাসাগর আর তার আশেপাশের সাগরে৷
শঙ্কুআকার অনুযায়ী শঙ্খকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়, দক্ষিণাবর্তী শঙ্খ আর বামাবর্তী শঙ্খ৷
বাদ্যযন্ত্র হিসাবে শঙ্খের ব্যবহার বেশ পুরোনো৷ বিশেষ করে যুদ্ধে৷ একে শঙ্খনাদ বলাহয়৷
প্রচলিত ভারতীয় আচারে শঙ্খনাদ বন্ধুত্বের দ্যোতক আর শত্রুদের হৃদকম্প স্বরূপ৷
শাঁখ বাজিয়ে পুজো করার রীতি বহুদিনের৷ বর্তমানে শাঁখ বাজিয়ে নানান অধর্মীয় অনুষ্ঠানের, আচারভিত্তিক অনুষ্ঠানেরও সূচনা করা হয়৷
ব্রহ্ম বৈবর্ত পুরাণ অনুসারে শঙ্খে যৌথভাবে দেবী লক্ষ্মী আর ভগবান বিষ্ণুর বাস৷ ফলে পুরাণে শাঁখের সঙ্গে বিষ্ণুদেবের একটি সমীকরণ গড়ে তোলা হয়েছে৷ শাঁখে রাখা কোনো জলে স্নানকরা যেকোনো পবিত্র জলে স্নানের সমান৷ শঙ্খ সদ্ম পুরাণ অনুসারে শ্রীবিষ্ণু এবং গাভীর চিত্র সামনে রেখে স্নান করা দশলক্ষ যজ্ঞের সমান৷ আর বিষ্ণুদেবের চিত্র সামনে রেখে শঙ্খ জল মাথায় দেওয়ার অর্থ গঙ্গাজলে স্নানের পূণ্যর সমান৷
ব্রাহ্মণ্যধর্মের পাশাপাশি বৌদ্ধধর্মেও আটটি মহাপ্রতীক অষ্টমঙ্গলের অন্যতম একটি শঙ্খ৷
শঙ্খ ত্রিবাঙ্কুর রাজের প্রতীক৷ প্রতিবেশী শ্রীলঙ্কার জাফনা রাজের পতাকায় ব্যবহার হয় শঙ্খ৷ বাংলার পাশের রাজ্য ওড়িশার বিজু জনতা দলের নির্বাচনী প্রতীক শঙ্খ৷
শঙ্খ ভগবান বিষ্ণুর অন্যতম প্রতীক৷ ভাগবান বিষ্ণু ছাড়াও মত্স্য, কুর্ম, বরাহ এবং নরসিংহ এই চার অবতারও শঙ্খধারী৷ জগন্নাথদেব বিষ্ণুদেবের অবতার বিশেষ, তাই পুরীর অপর নাম শঙ্খ ক্ষেত্র৷
নেপালের গণ্ডকী নদীতেই একমাত্র পাওয়া যাওয়া শালগ্রাম শিলা ভগবান বিষ্ণুর প্রতীক রূপেও পুজো হয়৷ শঙ্খ, চক্র গদা, পদ্ম লাঞ্ছিত শালগ্রাম শিলা ভগবান কেশবরূপে পুজিত হন৷
পুরাণ অনুসারে শঙ্খ এবং লক্ষ্মী দেবী দুই ভাইবোন, দুজনই শমুদ্র উত্থিত৷
এছাড়াও পুরাণে, বা সাহিত্যে জলজ প্রাণীরূপে শঙ্খ আর নাগেদের এক গোত্রভূক্ত করা হযেছে৷ মহাভারত, হরিবংশ আর ভগবত্ পুরাণ অনুসারে নাগেদের কয়েকটি নাম উল্লেখ করা গেল – শঙ্খ, মহাশঙ্খ, শঙ্খপাল, শঙ্খচূড়৷ শেষ দুটি নাম জাতকের কাহিনীতেও পাওয়া যায়৷
Lokfolk লোকফোক forum of folk লোক tribal আদিবাসী culture সংস্কৃতি of West Bengal পশ্চিমবঙ্গ, বাংলা. LOKFOLK is Bengal বাংলা India's ভারতের traditional পারম্পরিক knowledge system জ্ঞানভাণ্ডার, history ইতিহাস, Indigenous technology প্রযুক্তি. We have two mass bodies গনসংগঠন Bongiyo Paromporik Kaaru O ও Bastro Shilpi Sangho; Bongiyo Paromporik Aavikaar Shilpi Sangho. Journal পত্রিকা, PARAM, পরম. Picture - KaaliKaach কালিকাচ, Dinajpur দিনাজপুর, Madhumangal মধুমঙ্গল Malakar মালাকার
Showing posts with label ConchBangles. Show all posts
Showing posts with label ConchBangles. Show all posts
Tuesday, September 14, 2010
শাঁখ শাখার বারোমাস্যা - অলিমিতি
লেবেলসমূহ:
Bengal,
Conch Shell Carving,
ConchBangles,
ConchShell,
FolkCommunity,
FolkCraft,
শাঁখ,
শাখা,
শাঁখারি
শাঁখ শাখার বারোমাস্যা - অন্তমণ্ডল
শাঁখের করাত
খুব বেশী মানুষ জানেন না, যে শাঁখা বাঙালি বউদের, ঐতিহ্যের গর্ব, সেই শাঁখা খুব শক্ত ও কঠিন হওয়ায় এটা যে কেউ কাটতে পারে না৷ শাঁখা কাটার জন্য বিশেষ দক্ষতা ও যন্ত্র লাগে৷ প্রাচীন ভারতে যেহেতু প্রতিটি পেশাকেই আলাদা গোত্রে আলাদা করে দেয়া হয়েছিল, তাই শাঁখার যারা কারিগর, তাদেরও একটা নির্দিষ্ট গোত্র ছিল, যার নাম বাংলায় শাঁখারী৷ শাঁখা কাটা ও কারুকাজ করে বাজারজাত করাই তাদের কাজ, অন্য কেউ এটা করতে পারে না৷
শঙ্খশিল্পের কাজের মধ্যে কুরা ভাঙা, গেঁড়াপাড়া, ঝাঁপানি, শাঁখা কাটাই, গাঁড়াসাজি, ডিজাইন করা, মালামতি করা ও পুটিং দেয়া৷ শাঁখারিরা শঙ্খ কাটতেন শাঁখের করাত দিয়ে, এখন কাটা হয় বিদ্যুতের যন্ত্রে৷ বিদ্যুতকাটাই যন্ত্রর প্রভাবে বিগত কয়েক দশকে তাঁদের জীবিকা থেকে উচ্ছেদ হয়েছেন হাজার হাজার শিল্পী, শিল্পীদের চোখে আজ কাজ না পাওয়া, ঠিকঠাক নজুরি না পাওয়ার হতাশা, অন্যান্য লোকশিল্পের মতই শাঁখা শিল্পে অস্তরাগের ছোঁয়া, যান্ত্রিক যুগে এসে এখন এ কাজে মেশিন ব্যবহৃত হলেও শিল্পটি অগ্রসর হতে পারছে না৷ কেননা শাঁখা বিদ্যুতচালিত যন্ত্রে কাটা হলেও আদতে কিন্তু সূক্ষ্মকাজ করতে হয় হতেই, শাঁখ আর শাঁখার দাম বেড়ে চলেলেও শিল্পীদের মজুরি বাড়ে না, দেড় দুহাজার পেতেই মুখের রক্ত উঠেযায়, একজন দক্ষ শিল্পী দিনে ১৫/২০ জোড়া শঙ্খ পণ্য তৈরি করতে পারেন৷ তাতে তার দিনে একশ পঞ্চাশ থেকে দুইশ টাকা আয় হয়৷ সলভিনস্ ১৭৯২তে কলকাতায় এসে বাংলার শিল্পী, পরিবহনসহ নানান প্রকৃতি, পেশার মানুষের ছবি এঁকেছিলেন৷ সেখানে সুগঠিত শাঁখারি আর শাঁখের করতের একটি ছবিও পাই৷
নক্সী কাঁথার মাঠএও আমরা পাই শাঁখের করাতের উল্লেখ -
আজকে রূপার সকলি আঁধার, বাড়া-ভাতে ওড়ে ছাই, কলঙ্ক কথা সবে জানিয়াছে, কেহ বুঝি বাকি নাই |
জেনেছে আকাশ, জেনেছে বাতাস, জেনেছে বনের তরু ; উদাস-দৃষ্টি য়ত দিকে চাহে সব যেন শূনো মরু |
চারিদিক হতে উঠিতেছে সুর, ধিক্কার! ধিক্কার!! শাঁখের করাত কাটিতেছে তারে লয়ে কলঙ্ক ধার |ব্যথায় ব্যথায় দিন কেটে গেল, আসিল ব্যথার সাঁজ, পূবে কলঙ্কী কালো রাত এল, চরণে ঝিঁঝির ঝাঁজ! অনেক সুখের দুখের সাক্ষী বাঁশের বাঁশীটি নিয়ে, বসিল রূপাই বাড়ির সামনে মধ্য মাঠেতে গিয়ে |
রূপসাধনে শঙ্খের ব্যবহার
গহনারূপে, বাদ্যযন্ত্ররূপে এর ব্যবহার যেমন অবশ্যম্ভাবী তেমনি প্রসাধনী ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে৷ প্রসাধনী রূপে শাঁখাগুঁড়ো, শঙ্খচুরের উল্লেখ পাওয়া যায় ভারতের নানান সাহিত্য আর পুরাণে, অতীতে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে অধিকাংশই শাঁখার গুঁড়াকে পাউডার বা প্রসাধনী হিসেবে ব্যবহার করত৷ আজও নানান জাতের প্রসাধনীর ভীড়ে ব্রণের দাগ তুলতে বা সাধারণভাবে ব্যবহারের জন্য হিন্দু সমাজে তো বটেই মুসলিমদের অনেকেও এগুঁড়ো ব্যবহার করে থাকেন৷ শঙ্খ কাটার সময় শঙ্খের গুঁড়া বের হয়, যা মুখের দাগ দূর করতে ব্যবহার করে মেয়েরা৷ আজ শহরের শাঁখারীবাজারগুলো থেকে শঙ্খগুঁড়া কিনে নিয়ে যায় প্রসাধন কোম্পানি, বিক্রি করে কোটি কোটি কাঞ্চনমূল্যে৷
আয়ুর্বেদে শঙ্খের ব্যবহারের নির্দেশ
শঙ্খধৃত জলেতে ঔষধিগুণের কথা বিশেষভাবে বলা হয়েছে আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে-
1) রাতে শাঁখে জল ধরে রেখে পরেরদিন ত্বকে সেই জল ঘষলে ত্বকের নানান রোগে মুক্তিঘটে
2) ত্বকে সাদা দাগ তুলে বলা হচ্ছে, শাঁখে 12 ঘন্টা জল ঘরে রেখে সেই জল সাদা দাগগুলোতে বোলাতে হবে, কয়েকদিন বাদেই সাদা দাগের উপশম ঘটবে
3) রাতে শাঁখের জলে গোলাপ জল মিশিয়ে পরের দিন সেই জল মাথার চুলে লাগাতে হবে, চুলের ঘণত্ব আর কাজলত্ব বহুদিন বজায় থাকবে, সেই জল ভ্রু বা দাড়িতে ঘসলেও সেচুলগুলিও কালো হবে
4) শাঁখে রাখা 12 ঘন্টার জস পান করলে পাকস্থলী বিষয়ক সমস্যা বা অন্ত্রে ক্ষতও সারানো যায়
5) সেই 12 ঘন্টা রাখা একই জলে সাধারণ জল মিশিয়ে চোখ ধুলে চোখের নানান রোগ ভাল হয়, উজ্জ্বল হয়,
6) চোখের নিচে কালো দাগে এই জল বুলোলে কয়েকদিন পর সেই দাগ উঠে যায়
7) ব্রণর দাগের ওপরে এই জল বোলালে সেই কালো দাগ উঠে যায়
এছাড়াও শাঁখ বাজানোর শব্দের কম্পনে জীবানু নাশের কথাও উল্লেখ পাওযা যায় আয়ুর্বেদে, তাই নানান মঙ্গল কর্যে শঙ্খবাদনের নিদান দেওয়া হয়৷
বাংলার শাঁখারিরা
হাজার হাজার বছর ধরে যে শিল্পীরা, প্রযুক্তিবিদেরা শাঁখ, শাঁখা তৈরী করে আসছেন, তাদের কথা না বললে শাঁখার নিয়ে প্রবন্ধের ইতি টানা যাবে না৷
সাধারণ আমরা ভুলে যাই, আমাদের পথ দেখানো বিশেষজ্ঞরাও ভুলে যান, বাংলা তথা ভারতেরর আবহমানকাল ধরে লৌকিক শিল্পীরা বাজারে যাঁরা শুধুই পশরা সাজিয়ে বসেন, তাঁরা যে শুধু ব্যাপারিই নন, তাঁরা আমাদের প্রত্যহিক জীবনের থোড়-বড়ি-খাড়াভাবে বেঁচে থাকার প্রণোদনার উত্সস্বরূপ৷ এঁদের একটি বড় অংশ বহুদিন ধরেই অবহেলায় সমাজের প্রন্তে পড়ে থাকেন৷ অথচ তাদের এই অবহেলা বোধহয় প্রাপ্য ছিল না৷ এদের তুলনা শুধুই এঁরা৷ লৌকিক শিল্পীদের এক বড় অংশ শাঁখারিরা এক দেহে প্রযুক্তিবিদ, শিল্পী আবার যখন তাঁরা তাঁদের নিজস্ব শিল্পদ্রব্যের পশরা সাজিয়ে বসেন – তখন তাঁরা ব্যাপারী৷ সেই শিল্পদ্রব্যের ওপর নানান শৈল্পিক কাজ করার দায এঁরাই নিজেদের কাঁধে তুলে নেন, আর সেই বংশ পরম্পরায কাজের যেন ঘরানা তৈরি হয়ে যায় শহর থেকে শহরে মহল্লা থেকে মহল্লায়৷
এঁরা যুগযুগ ধরে শঙ্খসহ নানান শিল্পের প্রযুক্তি, প্রজন্মের পর প্রজন্ম বহন করে বাঁচিয়ে রেখে দেশের লৌকিক প্রযুক্তির সেবা করে চলেন৷ হাজার হাজার বছর ধরে আমাদের দেশের লৌকিক শিল্পীরা তাঁদের সাধের প্রযুক্তি বাঁচিয়ে রেখেছেন, শিল্পকে বাঁচিয়ে রেখেছেন, বাজারও তৈরি করে চলেছেন নিজেদের দক্ষতায়৷ এধরণের শিল্পী কারিগরের পাশে আজও কিন্তু সশক্তভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছেন বাংলার মহিলারাই, যাঁরা নীরবে বয়ে নিয়ে চলেন দেশের সংস্কৃতি৷
এক সময় দাক্ষিণাত্যের শিল্পীরা শঙ্খকে 'পারওয়া' নামে অভিহিত করতেন৷ ড. দীনেশ চন্দ্র সেন বলেন- ভগ্নস্তূপ থেকে শঙ্খশিল্প আবিষ্কার হয়, বাংলার গীতিকায়ও শংখের উল্লেখ পাওয়া যায়৷ ঐতিহাসিক জেমস হরনেল লিখেছেন যে, দক্ষিণ ভারতের মাননার উপসাগরের তীরে শঙ্খশিল্পের ব্যাপক প্রসার ঘটে খ্রিস্টীয় দ্বিতীয়-তৃতীয় শতকে৷ তখন গ্রিক ও মিশরীয় বণিকদের মাধ্যমে তামিলের শঙ্খ রপ্তানি হত৷ তবে তামিলনাড়ু, দাক্ষিণাত্য, গুজরাট এবং বাংলায় শঙ্খশিল্পের চূড়ান্ত প্রসার ঘটে৷ বঙ্গের নারীরা দেবালয়ে সূক্ষ্ম কারুকার্য খচিত শঙ্খের অলঙ্কার ব্যবহার করতেন৷ বাংলার মেয়েদের অন্যতম আকর্ষণ ছিল শঙ্খের গহনা৷
শঙ্খ শিল্পায়ন নবশাখ শ্রেণীভুক্ত শঙ্খবণিক সমপ্রদায়ের বৃত্তি বা পেশা৷ শঙ্খ মানুষের পুরনো স্মৃতিবাহী একটি উপাদান৷ কারণ শাঁখা, সিঁদুর সনাতন হিন্দু ধর্মের সদস্যদের ব্যবহৃত চিহ্ন৷ হিন্দু সধবা নারীর জন্য হাতের শাঁখা অপরিহার্য৷ বিয়ের সময় হিন্দু মেয়েদের গায়ে হলুদ দিয়ে ধর্মীয় আচার পালনের মাধ্যমে নবপরিণীতাকে শাঁখা পরানো হয়৷ সুতরাং শাঁখা হিন্দু নারীদের বৈবাহিক অবস্থার ইঙ্গিতবাহী স্বামীর অস্তিত্ব প্রকাশ এবং দাম্পত্য সুখের পরিচায়ক৷ স্বামীর প্রয়াণে হাতের শাঁখা ভেঙে ফেলা হয়৷ শাঁখার ব্যবহার দেখা যায় মন্দির কিংবা গৃহে পূজার উপকরণ হিসেবে৷ সেগুলো হলো বাদ্যশঙ্খ এবং জলশঙ্খ৷ শাঁখারিরা পেশার সঙ্গে ধর্মের ঘনিষ্ঠতা অর্থনৈতিক লাভ-লোকসানের পাশাপাশি নিজেদের পেশাকে পবিত্র এবং গুরুত্বপূর্ণ মনে করে৷ গবেষকদের ধারণা, প্রায় দুই হাজার বছর পূর্বে দক্ষিণ ভারতে শঙ্খশিল্পের উদ্ভব৷ কালক্রমে ঢাকা আর বিষ্ণুপুর শহর শঙ্খশিল্পের প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে৷ শঙ্খশিল্পকে কেন্দ্র করে অতীতে দাক্ষিণাত্য, ঢাকা, বরিশাল, বগুড়া, নদীয়া, মাদ্রাজ, কলকাতা, বিষ্ণুপুর, রংপুর, দিনাজপুর, চট্টগ্রাম প্রভৃতি অঞ্চলে এক বিশেষ শিল্পসমাজ বিকশিত হয়৷ এ শিল্পের সঙ্গে মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বিশেষভাবে জড়িত৷ শঙ্খশিল্পের বিকাশে অর্থনৈতিক ও পৌরাণিক ইতিহাস জড়িত৷ মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস এবং রুচিবোধের মাধ্যমে শঙ্খশিল্পের ঐতিহাসিক পরিচয় ফুটে ওঠে৷
কলকাতার এক শাঁখারিপাড়ায় বাংলার হাজারো শাঁখার দোকানেরমত শাঁখার একটি দোকান সাজিয়ে বসেছেন নাগ পরিবার৷ কতশত বছর আগে তা আর তাদের মনে নেই৷ দোকানে নানা রকমের শাঁখা থরে থরে সাজানো৷ ভারি দৃষ্টিনন্দন, নজরকাড়া এবং একটির কারুকার্য আরেকটির থেকে পুরোপুরি আলাদা৷ কোনোটাতে যদি ময়ূরের ছাপ তোলা, তবে অন্যটাতে আছে হাতির মুখ৷ যথেষ্ট ধৈর্য ও শৈল্পিক মন না থাকলে সম্ভব নয় এমনভাবে সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলা৷ একটা শঙ্খ কেটে পাঁচ থেকে বড়জোর ছটা শাঁখা তৈরি হয়৷ তিন শ থেকে দেড় হাজার টাকায় একজোড়া শাঁখার বিক্রি৷ শাঁখার ওপর নানান পাথর বসানো হয়, বসানো হয় স্বর্ণ৷ শুধু শাঁখাই নয়, হিন্দুদের বিভিন্ন প্রয়োজনীয় জিনিস ও বিয়ের টুকিটাকি সামগ্রী—মুকুট, সিঁদুর, পলা—এসবও পাওয়া যায় এখানে৷ প্রতিদিনের সান্ধ্য আরতির প্রধান বাদ্য শঙ্খও পাওয়া যায় এসব দোকানে৷ পরিবার প্রধান বললেন, শ্রীলঙ্কা বা মাদ্রাজ থেকে একটি শঙ্খের আমদানির দাম পড়ে ৯০০ থেকে এক হাজার টাকা৷ এ রকম একটি শঙ্খ কেটে চার-পাঁচটির বেশি শাঁখা তৈরি করা যায় না৷ এতে এক জোড়া শাঁখার উত্পাদনমূল্য কমপক্ষে ১০০ থেকে ২০০ টাকা পড়ে৷ দেখা গেছে, শঙ্খবণিকেরা এ রকম এক জোড়া দেশি কারুকাজের শাঁখার দাম রাখছেন ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা৷ শঙ্খ ঘরসজ্জা ও অলংকার হিসেবেই সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়৷ পদ্মডুগী, সাত দানা (সাতগাছা চুড়ি), পাঁচ দানা ও তিন দানার চুড়ি এবং সাদা বালা ও আউলাবেশী বালা এখন সবচেয়ে বেশি চলে৷ তবে সামর্থ্যবানেরা শাঁখার ওপর এখন স্বর্ণের কারুকাজ করে হাতের বালা হিসেবেও পরেন৷ যদিও শঙ্খ কাটায় তেমন খরচ নেই৷ তবে এক জোড়া শাঁখায় নকশা করার মজুরি প্রায় ২০০ টাকা৷ বণিকেরা বলেন, এখানে শিল্পীর মজুরি কমানো সম্ভব নয়৷ তাই শাঁখারী, নকশাকার ও শঙ্খ কেনার খরচ মিলিয়ে এক জোড়া শাঁখার যে উত্পাদন খরচ পড়ে, তাতে লাভ রেখে বেশি দামে শাঁখা বিক্রি করে লাভ করা অসাধ্যপ্রায়৷
শাঁখারীপাড়ার আর এক দোকানি নাগপরিবারের পারিবারিক ব্যবসা প্রায় ৭৫ বছরের৷ তিনি বলেন, ‘যে শামুক থেকে শাঁখা বা শঙ্খ এবং অন্যান্য জিনিসপত্র তৈরি করা হয়, তা আসে শ্রীলঙ্কা থেকে৷ এ ছাড়া কেবল মাদ্রাজে এই শাঁখ পাওয়া যায়৷ আমরা ছয় মাস পরপর শ্রীলঙ্কায় যাই, অনেক শঙ্খ নিয়ে আসি৷ তারপর আমরা নিজেরা শাঁখের করাত দিয়ে কাটি এবং তার ওপর শিল্পীদের দিয়ে ডিজাইন করাই৷’ তিনি জানান, ১৫-২০ রকম নকশার শাঁখা এখন বাজারে পাওয়া যায়৷ তার মধ্যে বেকি নামের নকশাটা বেশি চলছে৷ অতীতে শাঁখার গহনা গড়ার জন্য শাঁখের করাত- সংস্কৃতে যাকে কুশ বলে- ব্যবহৃত হত৷ এ এলাকায় এখনো প্রায় ৭০/৮০টি পরিবার এ শিল্পের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এবং তাদের একমাত্র পেশাও বটে৷ কিন্তু সীমিত গন্ডির মধ্যে থেকে বিদেশ, দেশেক নানান প্রান্তথেকে কাঁচামাল আমদানি করে এ শিল্পের মাধ্যমে উপার্জন করাটা দায় হয়ে পড়েছে৷
শাঁখা যদি-বা সব সমুদ্রেই জন্ম নেয় কিন্তু তারা যে শাঁখা দিয়ে কাজ করেন তা কেবল ভারত মহাসাগরে জন্ম নেয়৷ আর এ শ্রেণীর শাঁখা তাদের শ্রীলংকা ও মাদ্রাজ থেকে চড়া দামে আমদানি করতে হয়৷ যার ফলে লাভের অংক খুব বেশি থাকে না কিন্তু তারপরও ক্রেতাদের সন্তুষ্ট রাখা যায় না৷ এ কারণেই অনেক শাঁখারী বাপ-দাদার শিল্পকর্ম বা ব্যবসা ছেড়ে দিয়ে উপার্জনের জন্য অন্য পথ ধরেছেন৷ কিন্তু তারপরও তাদের অনেকেই ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখার কাজে নিয়োজিত রয়েছেন৷
খুব বেশী মানুষ জানেন না, যে শাঁখা বাঙালি বউদের, ঐতিহ্যের গর্ব, সেই শাঁখা খুব শক্ত ও কঠিন হওয়ায় এটা যে কেউ কাটতে পারে না৷ শাঁখা কাটার জন্য বিশেষ দক্ষতা ও যন্ত্র লাগে৷ প্রাচীন ভারতে যেহেতু প্রতিটি পেশাকেই আলাদা গোত্রে আলাদা করে দেয়া হয়েছিল, তাই শাঁখার যারা কারিগর, তাদেরও একটা নির্দিষ্ট গোত্র ছিল, যার নাম বাংলায় শাঁখারী৷ শাঁখা কাটা ও কারুকাজ করে বাজারজাত করাই তাদের কাজ, অন্য কেউ এটা করতে পারে না৷
শঙ্খশিল্পের কাজের মধ্যে কুরা ভাঙা, গেঁড়াপাড়া, ঝাঁপানি, শাঁখা কাটাই, গাঁড়াসাজি, ডিজাইন করা, মালামতি করা ও পুটিং দেয়া৷ শাঁখারিরা শঙ্খ কাটতেন শাঁখের করাত দিয়ে, এখন কাটা হয় বিদ্যুতের যন্ত্রে৷ বিদ্যুতকাটাই যন্ত্রর প্রভাবে বিগত কয়েক দশকে তাঁদের জীবিকা থেকে উচ্ছেদ হয়েছেন হাজার হাজার শিল্পী, শিল্পীদের চোখে আজ কাজ না পাওয়া, ঠিকঠাক নজুরি না পাওয়ার হতাশা, অন্যান্য লোকশিল্পের মতই শাঁখা শিল্পে অস্তরাগের ছোঁয়া, যান্ত্রিক যুগে এসে এখন এ কাজে মেশিন ব্যবহৃত হলেও শিল্পটি অগ্রসর হতে পারছে না৷ কেননা শাঁখা বিদ্যুতচালিত যন্ত্রে কাটা হলেও আদতে কিন্তু সূক্ষ্মকাজ করতে হয় হতেই, শাঁখ আর শাঁখার দাম বেড়ে চলেলেও শিল্পীদের মজুরি বাড়ে না, দেড় দুহাজার পেতেই মুখের রক্ত উঠেযায়, একজন দক্ষ শিল্পী দিনে ১৫/২০ জোড়া শঙ্খ পণ্য তৈরি করতে পারেন৷ তাতে তার দিনে একশ পঞ্চাশ থেকে দুইশ টাকা আয় হয়৷ সলভিনস্ ১৭৯২তে কলকাতায় এসে বাংলার শিল্পী, পরিবহনসহ নানান প্রকৃতি, পেশার মানুষের ছবি এঁকেছিলেন৷ সেখানে সুগঠিত শাঁখারি আর শাঁখের করতের একটি ছবিও পাই৷
নক্সী কাঁথার মাঠএও আমরা পাই শাঁখের করাতের উল্লেখ -
আজকে রূপার সকলি আঁধার, বাড়া-ভাতে ওড়ে ছাই, কলঙ্ক কথা সবে জানিয়াছে, কেহ বুঝি বাকি নাই |
জেনেছে আকাশ, জেনেছে বাতাস, জেনেছে বনের তরু ; উদাস-দৃষ্টি য়ত দিকে চাহে সব যেন শূনো মরু |
চারিদিক হতে উঠিতেছে সুর, ধিক্কার! ধিক্কার!! শাঁখের করাত কাটিতেছে তারে লয়ে কলঙ্ক ধার |ব্যথায় ব্যথায় দিন কেটে গেল, আসিল ব্যথার সাঁজ, পূবে কলঙ্কী কালো রাত এল, চরণে ঝিঁঝির ঝাঁজ! অনেক সুখের দুখের সাক্ষী বাঁশের বাঁশীটি নিয়ে, বসিল রূপাই বাড়ির সামনে মধ্য মাঠেতে গিয়ে |
রূপসাধনে শঙ্খের ব্যবহার
গহনারূপে, বাদ্যযন্ত্ররূপে এর ব্যবহার যেমন অবশ্যম্ভাবী তেমনি প্রসাধনী ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে৷ প্রসাধনী রূপে শাঁখাগুঁড়ো, শঙ্খচুরের উল্লেখ পাওয়া যায় ভারতের নানান সাহিত্য আর পুরাণে, অতীতে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে অধিকাংশই শাঁখার গুঁড়াকে পাউডার বা প্রসাধনী হিসেবে ব্যবহার করত৷ আজও নানান জাতের প্রসাধনীর ভীড়ে ব্রণের দাগ তুলতে বা সাধারণভাবে ব্যবহারের জন্য হিন্দু সমাজে তো বটেই মুসলিমদের অনেকেও এগুঁড়ো ব্যবহার করে থাকেন৷ শঙ্খ কাটার সময় শঙ্খের গুঁড়া বের হয়, যা মুখের দাগ দূর করতে ব্যবহার করে মেয়েরা৷ আজ শহরের শাঁখারীবাজারগুলো থেকে শঙ্খগুঁড়া কিনে নিয়ে যায় প্রসাধন কোম্পানি, বিক্রি করে কোটি কোটি কাঞ্চনমূল্যে৷
আয়ুর্বেদে শঙ্খের ব্যবহারের নির্দেশ
শঙ্খধৃত জলেতে ঔষধিগুণের কথা বিশেষভাবে বলা হয়েছে আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে-
1) রাতে শাঁখে জল ধরে রেখে পরেরদিন ত্বকে সেই জল ঘষলে ত্বকের নানান রোগে মুক্তিঘটে
2) ত্বকে সাদা দাগ তুলে বলা হচ্ছে, শাঁখে 12 ঘন্টা জল ঘরে রেখে সেই জল সাদা দাগগুলোতে বোলাতে হবে, কয়েকদিন বাদেই সাদা দাগের উপশম ঘটবে
3) রাতে শাঁখের জলে গোলাপ জল মিশিয়ে পরের দিন সেই জল মাথার চুলে লাগাতে হবে, চুলের ঘণত্ব আর কাজলত্ব বহুদিন বজায় থাকবে, সেই জল ভ্রু বা দাড়িতে ঘসলেও সেচুলগুলিও কালো হবে
4) শাঁখে রাখা 12 ঘন্টার জস পান করলে পাকস্থলী বিষয়ক সমস্যা বা অন্ত্রে ক্ষতও সারানো যায়
5) সেই 12 ঘন্টা রাখা একই জলে সাধারণ জল মিশিয়ে চোখ ধুলে চোখের নানান রোগ ভাল হয়, উজ্জ্বল হয়,
6) চোখের নিচে কালো দাগে এই জল বুলোলে কয়েকদিন পর সেই দাগ উঠে যায়
7) ব্রণর দাগের ওপরে এই জল বোলালে সেই কালো দাগ উঠে যায়
এছাড়াও শাঁখ বাজানোর শব্দের কম্পনে জীবানু নাশের কথাও উল্লেখ পাওযা যায় আয়ুর্বেদে, তাই নানান মঙ্গল কর্যে শঙ্খবাদনের নিদান দেওয়া হয়৷
বাংলার শাঁখারিরা
হাজার হাজার বছর ধরে যে শিল্পীরা, প্রযুক্তিবিদেরা শাঁখ, শাঁখা তৈরী করে আসছেন, তাদের কথা না বললে শাঁখার নিয়ে প্রবন্ধের ইতি টানা যাবে না৷
সাধারণ আমরা ভুলে যাই, আমাদের পথ দেখানো বিশেষজ্ঞরাও ভুলে যান, বাংলা তথা ভারতেরর আবহমানকাল ধরে লৌকিক শিল্পীরা বাজারে যাঁরা শুধুই পশরা সাজিয়ে বসেন, তাঁরা যে শুধু ব্যাপারিই নন, তাঁরা আমাদের প্রত্যহিক জীবনের থোড়-বড়ি-খাড়াভাবে বেঁচে থাকার প্রণোদনার উত্সস্বরূপ৷ এঁদের একটি বড় অংশ বহুদিন ধরেই অবহেলায় সমাজের প্রন্তে পড়ে থাকেন৷ অথচ তাদের এই অবহেলা বোধহয় প্রাপ্য ছিল না৷ এদের তুলনা শুধুই এঁরা৷ লৌকিক শিল্পীদের এক বড় অংশ শাঁখারিরা এক দেহে প্রযুক্তিবিদ, শিল্পী আবার যখন তাঁরা তাঁদের নিজস্ব শিল্পদ্রব্যের পশরা সাজিয়ে বসেন – তখন তাঁরা ব্যাপারী৷ সেই শিল্পদ্রব্যের ওপর নানান শৈল্পিক কাজ করার দায এঁরাই নিজেদের কাঁধে তুলে নেন, আর সেই বংশ পরম্পরায কাজের যেন ঘরানা তৈরি হয়ে যায় শহর থেকে শহরে মহল্লা থেকে মহল্লায়৷
এঁরা যুগযুগ ধরে শঙ্খসহ নানান শিল্পের প্রযুক্তি, প্রজন্মের পর প্রজন্ম বহন করে বাঁচিয়ে রেখে দেশের লৌকিক প্রযুক্তির সেবা করে চলেন৷ হাজার হাজার বছর ধরে আমাদের দেশের লৌকিক শিল্পীরা তাঁদের সাধের প্রযুক্তি বাঁচিয়ে রেখেছেন, শিল্পকে বাঁচিয়ে রেখেছেন, বাজারও তৈরি করে চলেছেন নিজেদের দক্ষতায়৷ এধরণের শিল্পী কারিগরের পাশে আজও কিন্তু সশক্তভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছেন বাংলার মহিলারাই, যাঁরা নীরবে বয়ে নিয়ে চলেন দেশের সংস্কৃতি৷
এক সময় দাক্ষিণাত্যের শিল্পীরা শঙ্খকে 'পারওয়া' নামে অভিহিত করতেন৷ ড. দীনেশ চন্দ্র সেন বলেন- ভগ্নস্তূপ থেকে শঙ্খশিল্প আবিষ্কার হয়, বাংলার গীতিকায়ও শংখের উল্লেখ পাওয়া যায়৷ ঐতিহাসিক জেমস হরনেল লিখেছেন যে, দক্ষিণ ভারতের মাননার উপসাগরের তীরে শঙ্খশিল্পের ব্যাপক প্রসার ঘটে খ্রিস্টীয় দ্বিতীয়-তৃতীয় শতকে৷ তখন গ্রিক ও মিশরীয় বণিকদের মাধ্যমে তামিলের শঙ্খ রপ্তানি হত৷ তবে তামিলনাড়ু, দাক্ষিণাত্য, গুজরাট এবং বাংলায় শঙ্খশিল্পের চূড়ান্ত প্রসার ঘটে৷ বঙ্গের নারীরা দেবালয়ে সূক্ষ্ম কারুকার্য খচিত শঙ্খের অলঙ্কার ব্যবহার করতেন৷ বাংলার মেয়েদের অন্যতম আকর্ষণ ছিল শঙ্খের গহনা৷
শঙ্খ শিল্পায়ন নবশাখ শ্রেণীভুক্ত শঙ্খবণিক সমপ্রদায়ের বৃত্তি বা পেশা৷ শঙ্খ মানুষের পুরনো স্মৃতিবাহী একটি উপাদান৷ কারণ শাঁখা, সিঁদুর সনাতন হিন্দু ধর্মের সদস্যদের ব্যবহৃত চিহ্ন৷ হিন্দু সধবা নারীর জন্য হাতের শাঁখা অপরিহার্য৷ বিয়ের সময় হিন্দু মেয়েদের গায়ে হলুদ দিয়ে ধর্মীয় আচার পালনের মাধ্যমে নবপরিণীতাকে শাঁখা পরানো হয়৷ সুতরাং শাঁখা হিন্দু নারীদের বৈবাহিক অবস্থার ইঙ্গিতবাহী স্বামীর অস্তিত্ব প্রকাশ এবং দাম্পত্য সুখের পরিচায়ক৷ স্বামীর প্রয়াণে হাতের শাঁখা ভেঙে ফেলা হয়৷ শাঁখার ব্যবহার দেখা যায় মন্দির কিংবা গৃহে পূজার উপকরণ হিসেবে৷ সেগুলো হলো বাদ্যশঙ্খ এবং জলশঙ্খ৷ শাঁখারিরা পেশার সঙ্গে ধর্মের ঘনিষ্ঠতা অর্থনৈতিক লাভ-লোকসানের পাশাপাশি নিজেদের পেশাকে পবিত্র এবং গুরুত্বপূর্ণ মনে করে৷ গবেষকদের ধারণা, প্রায় দুই হাজার বছর পূর্বে দক্ষিণ ভারতে শঙ্খশিল্পের উদ্ভব৷ কালক্রমে ঢাকা আর বিষ্ণুপুর শহর শঙ্খশিল্পের প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে৷ শঙ্খশিল্পকে কেন্দ্র করে অতীতে দাক্ষিণাত্য, ঢাকা, বরিশাল, বগুড়া, নদীয়া, মাদ্রাজ, কলকাতা, বিষ্ণুপুর, রংপুর, দিনাজপুর, চট্টগ্রাম প্রভৃতি অঞ্চলে এক বিশেষ শিল্পসমাজ বিকশিত হয়৷ এ শিল্পের সঙ্গে মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বিশেষভাবে জড়িত৷ শঙ্খশিল্পের বিকাশে অর্থনৈতিক ও পৌরাণিক ইতিহাস জড়িত৷ মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস এবং রুচিবোধের মাধ্যমে শঙ্খশিল্পের ঐতিহাসিক পরিচয় ফুটে ওঠে৷
কলকাতার এক শাঁখারিপাড়ায় বাংলার হাজারো শাঁখার দোকানেরমত শাঁখার একটি দোকান সাজিয়ে বসেছেন নাগ পরিবার৷ কতশত বছর আগে তা আর তাদের মনে নেই৷ দোকানে নানা রকমের শাঁখা থরে থরে সাজানো৷ ভারি দৃষ্টিনন্দন, নজরকাড়া এবং একটির কারুকার্য আরেকটির থেকে পুরোপুরি আলাদা৷ কোনোটাতে যদি ময়ূরের ছাপ তোলা, তবে অন্যটাতে আছে হাতির মুখ৷ যথেষ্ট ধৈর্য ও শৈল্পিক মন না থাকলে সম্ভব নয় এমনভাবে সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলা৷ একটা শঙ্খ কেটে পাঁচ থেকে বড়জোর ছটা শাঁখা তৈরি হয়৷ তিন শ থেকে দেড় হাজার টাকায় একজোড়া শাঁখার বিক্রি৷ শাঁখার ওপর নানান পাথর বসানো হয়, বসানো হয় স্বর্ণ৷ শুধু শাঁখাই নয়, হিন্দুদের বিভিন্ন প্রয়োজনীয় জিনিস ও বিয়ের টুকিটাকি সামগ্রী—মুকুট, সিঁদুর, পলা—এসবও পাওয়া যায় এখানে৷ প্রতিদিনের সান্ধ্য আরতির প্রধান বাদ্য শঙ্খও পাওয়া যায় এসব দোকানে৷ পরিবার প্রধান বললেন, শ্রীলঙ্কা বা মাদ্রাজ থেকে একটি শঙ্খের আমদানির দাম পড়ে ৯০০ থেকে এক হাজার টাকা৷ এ রকম একটি শঙ্খ কেটে চার-পাঁচটির বেশি শাঁখা তৈরি করা যায় না৷ এতে এক জোড়া শাঁখার উত্পাদনমূল্য কমপক্ষে ১০০ থেকে ২০০ টাকা পড়ে৷ দেখা গেছে, শঙ্খবণিকেরা এ রকম এক জোড়া দেশি কারুকাজের শাঁখার দাম রাখছেন ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা৷ শঙ্খ ঘরসজ্জা ও অলংকার হিসেবেই সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়৷ পদ্মডুগী, সাত দানা (সাতগাছা চুড়ি), পাঁচ দানা ও তিন দানার চুড়ি এবং সাদা বালা ও আউলাবেশী বালা এখন সবচেয়ে বেশি চলে৷ তবে সামর্থ্যবানেরা শাঁখার ওপর এখন স্বর্ণের কারুকাজ করে হাতের বালা হিসেবেও পরেন৷ যদিও শঙ্খ কাটায় তেমন খরচ নেই৷ তবে এক জোড়া শাঁখায় নকশা করার মজুরি প্রায় ২০০ টাকা৷ বণিকেরা বলেন, এখানে শিল্পীর মজুরি কমানো সম্ভব নয়৷ তাই শাঁখারী, নকশাকার ও শঙ্খ কেনার খরচ মিলিয়ে এক জোড়া শাঁখার যে উত্পাদন খরচ পড়ে, তাতে লাভ রেখে বেশি দামে শাঁখা বিক্রি করে লাভ করা অসাধ্যপ্রায়৷
শাঁখারীপাড়ার আর এক দোকানি নাগপরিবারের পারিবারিক ব্যবসা প্রায় ৭৫ বছরের৷ তিনি বলেন, ‘যে শামুক থেকে শাঁখা বা শঙ্খ এবং অন্যান্য জিনিসপত্র তৈরি করা হয়, তা আসে শ্রীলঙ্কা থেকে৷ এ ছাড়া কেবল মাদ্রাজে এই শাঁখ পাওয়া যায়৷ আমরা ছয় মাস পরপর শ্রীলঙ্কায় যাই, অনেক শঙ্খ নিয়ে আসি৷ তারপর আমরা নিজেরা শাঁখের করাত দিয়ে কাটি এবং তার ওপর শিল্পীদের দিয়ে ডিজাইন করাই৷’ তিনি জানান, ১৫-২০ রকম নকশার শাঁখা এখন বাজারে পাওয়া যায়৷ তার মধ্যে বেকি নামের নকশাটা বেশি চলছে৷ অতীতে শাঁখার গহনা গড়ার জন্য শাঁখের করাত- সংস্কৃতে যাকে কুশ বলে- ব্যবহৃত হত৷ এ এলাকায় এখনো প্রায় ৭০/৮০টি পরিবার এ শিল্পের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এবং তাদের একমাত্র পেশাও বটে৷ কিন্তু সীমিত গন্ডির মধ্যে থেকে বিদেশ, দেশেক নানান প্রান্তথেকে কাঁচামাল আমদানি করে এ শিল্পের মাধ্যমে উপার্জন করাটা দায় হয়ে পড়েছে৷
শাঁখা যদি-বা সব সমুদ্রেই জন্ম নেয় কিন্তু তারা যে শাঁখা দিয়ে কাজ করেন তা কেবল ভারত মহাসাগরে জন্ম নেয়৷ আর এ শ্রেণীর শাঁখা তাদের শ্রীলংকা ও মাদ্রাজ থেকে চড়া দামে আমদানি করতে হয়৷ যার ফলে লাভের অংক খুব বেশি থাকে না কিন্তু তারপরও ক্রেতাদের সন্তুষ্ট রাখা যায় না৷ এ কারণেই অনেক শাঁখারী বাপ-দাদার শিল্পকর্ম বা ব্যবসা ছেড়ে দিয়ে উপার্জনের জন্য অন্য পথ ধরেছেন৷ কিন্তু তারপরও তাদের অনেকেই ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখার কাজে নিয়োজিত রয়েছেন৷
লেবেলসমূহ:
Bengal,
Conch Shell Carving,
ConchBangles,
ConchShell,
FolkCommunity,
FolkCraft,
শাঁখ,
শাখা,
শাঁখারি
Sunday, September 12, 2010
শাঁখ শাখার বারোমাস্যা - চারুমণ্ডল
বাংলা সাহিত্যে শাঁখ, শাঁখা
হাতে শাঁখা পরে কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোয় বাঙালি মেয়েরা শাঁখ বাজিয়ে স্মরণ করেন সম্পদের দেবী লক্ষ্মী দেবীকে - শঙ্খ বাজিয়ে তোমায় ঘরে এনেছি; সুগন্ধি ধূপ জ্বেলে আসন পেতেছি৷ প্রদীপ জ্বেলে নিলাম তোমায় বরণ করে, জনম জনম থাকো আমার এঘরে, এসো মা লক্ষ্মী বোসো ঘরে৷
বাংলার শহুরে বা লৌকিক সাহিত্যে বার বার উঠে এসেছে শাঁখ আর শাঁখা অনুষঙ্গ, স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও তার গ্রাম্য ছড়া সংগ্রহে উল্লেখ করেছেন পার্বতী আর মহাদেবের শাঁখা আর শাঁখারির এক কৌতুকতর সাংসারিক কোন্দল৷ শত বছর আগে রবীন্দ্রনাথ গ্রাম্যছড়া সংগ্রহের মাধ্যমে বাংলার লোকসম্পদ সংগ্রহের এক আন্দোলনের সূচনা করে এই নাম জানা-অজানা শিল্পীদের, সম্প্রদায়ের প্রতি সম্মাননা জানান, রবীন্দ্র জন্ম সার্ধশতবছরে লৌকিক শিল্পীদের পক্ষথেকে গঙ্গা জলে গঙ্গাপুজোর আদলে ঠাকুর রবীন্দ্রনাথকে প্রণাম জানানো হল রবীন্দ্রনাথের এই লেখাটি ছাপিয়ে-
যে ছড়ার আলোচনায় প্রবৃত্ত হইতেছি তাহাতে দেবদেবীর একটি গোপন ঘরের কথা বর্ণিত আছে৷
শিব সঙ্গে রসরঙ্গে বসিয়ে ভবানী৷ কুতূহলে উমা বলেন ত্রিশূল শূলপাণি৷৷ তুমি প্রভু, তুমি প্রভু ত্রৈলোক্যের সার৷
ইন্দ্র চন্দ্র কুবের বরুণ তোমারি কিংকর৷৷ তোমার নারী হয়ে আমার সাধ নাহি পোরে৷ যেন বেন্যা পতির কপালে প’ড়ে রমণী ঝোরে৷৷ দিব্য সোনার অলংকার না পরিলাম গায়৷ শামের বরন দুই শঙ্খ পরতে সাধ যায়৷৷ দেবের কাছে মরি লাজে হাত বাড়াতে নারি৷ বারেক মোরে দাও শঙ্খ, তোমার ঘরে পরি৷৷
ভোলানাথ ভাবিলেন, একটা কৌতুক করা যাক, প্রথমেই একটু কোন্দল বাধাইয়া তুলিলেন৷
ভেবে ভোলা হেসে কন শুন হে পার্বতী , আমি তো কড়ার ভিখারি ত্রিপুরারি শঙ্খ পাব কথি৷৷ হাতের শিঙাটা বেচলে পরে হবে না, একখানা শঙ্খের কড়ি৷ বলদটা মূল করিলে হবে কাহনটেক কড়ি৷৷ এটি ওটি ঠাক ঠিকাটি চাও হে গৌরী, থাকলে দিতে পারি৷ তোমার পিতা আছে বটে অর্থের অধিকারী৷ সে কি দিতে পারে না দুমুটো শঙ্খের মুজুরি৷৷
এই-যে ধনহীনতার ভড়ং এটা মহাদেবের নিতান্ত বাড়াবাড়ি,….স্ত্রী যখন ব্রেস্লেট প্রার্থনা করে কেরানিবাবু তখন আয়ব্যয়ের সুদীর্ঘ হিসাব বিশ্লেষণ করিয়া আপন দারিদ্র্য প্রমাণ করিতে বসিলে কোন্ ধর্মপত্নী তাহা অবিচলিত রসনায় সহ্য করিতে পারে৷ বিশেষত শিবের দারিদ্র্য ওটা নিতান্তই পোশাকি দারিদ্র্য, তাহা কেবল ইন্দ্র চন্দ্র বরুণ সকলের উপরে টেক্কা দিবার জন্য, কেবল লক্ষ্মীর জননী অন্নপূর্ণার সহিত একটা অপরূপ কৌতুক করিবার অভিপ্রায়ে৷ কালিদাস শংকরের অট্টহাস্যকে কৈলাসশিখরের ভীষণ তুহিনপুঞ্জের সহিত তুলনা করিয়াছেন৷ মহেশ্বরের শুভ্র দারিদ্র্যও তাঁহার এক নিঃশব্দ অট্টহাস্য৷ কিন্তু দেবতার পক্ষেও কৌতুকের একটা সীমা আছে৷ মহাদেবী এ সম্বন্ধে নিজের মনের ভাব যেরূপে ব্যক্ত করিলেন তাহা অত্যন্ত স্পষ্ট৷ তাহাতে কোনো কথাই ইঙ্গিতের অপেক্ষায় রহিল না৷
গৌরী গর্জিয়ে কন ঠাকুর শিবাই, আমি গৌরী তোমার হাতে শঙ্খ পরতে চাই৷৷আপনি যেমন যুব্-যুবতী অমনি যুবক পতি হয়, তবে সে বৈরস রস, নইলে কিছুই নয়৷৷ আপনি বুড়ো আধবয়সী ভাঙধুতুরায় মত্ত, আপনার মতো পরকে বলে মন্দ৷৷
এইখানে শেষ হয় নাই–ইহার পরে দেবী মনের ক্ষোভে আরো দুই-চারটি যে কথা বলিয়াছেন তাহা মহাদেবের ব্যক্তিগত চরিত্র সম্বন্ধে, তাহা সাধারণ্যে প্রকাশযোগ্য নহে৷ সুতরাং আমরা উদ্ধৃত করিতে ক্ষান্ত হইলাম৷ ব্যাপারটা কেবল এইখানেই শেষ হইল না; স্ত্রীর রাগ যতদূর পর্যন্ত যাইতে পারে, অর্থাৎ বাপের বাড়ি পর্যন্ত, তাহা গেল৷
কোলে করি কার্তিক হাঁটায়ে লম্বোদরে, ক্রোধ করি হরের গৌরী গেলা বাপের ঘরে৷৷
এ দিকে শিব তাঁহার সংকল্পিত দাম্পত্য-প্রহসনের নেপথ্যবিধান শুরু করিলেন–
বিশ্বকর্মা এনে করান শঙ্খের গঠন৷ শঙ্খ লইয়া শাঁখারি সাজিয়া বাহির হইলেন-, দুইবাহু শঙ্খ নিলেন নাম শ্রীরাম লক্ষ্মণ৷ কপটভাবে হিমালয়ে তলাসে ফেরেন৷৷ হাতে শূলী কাঁখে থলি শম্ভু ফেরে গলি গলি৷ শঙ্খ নিবি শঙ্খ নিবি এই কথাটি ব’লে৷৷ সখীসঙ্গে বসে গৌরী আছে কুতূহলে৷ শঙ্খ দেখি শঙ্খ দেখি এই কথাটি বলে৷৷ গৌরীকে দেখায়ে শাঁখারি শঙ্খ বার ক’ল্ল৷ শঙ্খের উপরে যেন চন্দ্রের উদয় হল৷৷ মণি মুকুতা-প্রবাল-গাঁথা মাণিক্যের ঝুরি৷ নব ঝলকে ঝলছে যেন ইন্দ্রের বিজুলি৷৷
দেবী খুশি হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন–
শাঁখারি ভালো এনেছ শঙ্খ৷ শঙ্খের কত নিবে তঙ্ক৷৷
দেবীর লুব্ধভাব দেখিয়া চতুর শাঁখারি প্রথমে দর-দামের কথা কিছুই আলোচনা করিল না; কহিল-
গৌরী, ব্রহ্মলোক, বৈকুণ্ঠ, হরের কৈলাস, এ তো সবাই কয়৷ বুঝে দিলেই হয়৷হস্ত ধুয়ে পরো শঙ্খ, দেরি উচিত নয়৷৷
শাঁখারি মুখে মুখে হরের স্থাবর সম্পত্তির যেরূপ ফর্দ দিল তাহাতে শাঁখাজোরা বিশেষ সস্তায় যাইবে মহাদেবীর এমন মনে করা উচিত ছিল না৷
গৌরী আর মহাদেবে কথা হল দড়৷ সকল সখী বলে দুর্গা শঙ্খ চেয়ে পরো৷৷ কেউ দিলেন তেল গামছা কেউ জলের বাটি৷ দেবের ঊরুতে হস্ত থুয়ে বসলেন পার্বতী৷৷ দয়াল শিব বলেন, শঙ্খ আমার কথাটি ধরো–
দুর্গার হাতে গিয়ে শঙ্খ বজ্র হয়ে থাকো৷৷ শিলে নাহি ভেঙো শঙ্খ, খড়েগ নাহি ভাঙো৷ দুর্গার সহিত করেন বাক্যের তরঙ্গ৷৷ এ কথা শুনিয়া মাতা মনে মনে হাসে৷ শঙ্খ পরান জগৎপিতা মনের হরষে৷৷ শাঁখারি ভালো দিলে শঙ্খ মানায়ে৷ ভাণ্ডার ভেঙে দেইগে তঙ্ক, লওগে গনিয়ে৷৷
এতক্ষণে শাঁখারি সময় বুঝিয়া কহিল–
আমি যদি তোমার শঙ্খের লব তঙ্ক৷ জ্ঞেয়াত-মাঝারে মোর রহিবে কলঙ্ক৷৷
ইহারা যে বংশের শাঁখারি তাঁহাদের কুলাচার স্বতন্ত্র; তাঁহাদের বিষয়বুদ্ধি কিছুমাত্র নাই; টাকাকড়ি সম্বন্ধে বড়ো নিস্পৃহ; ইঁহারা যাঁহাকে শাঁখা পরান তাঁহাকে পাইলেই মূল্যের আর কোনোপ্রকার দাবি রাখেন না৷ ব্যবসায়টি অতি উত্তম৷
কেমন কথা কও শাঁখারি কেমন কথা কও৷ মানুষ বুঝিয়া শাঁখারি এ-সব কথা কও৷৷
শাঁখারি কহিল–
না করো বড়াই দুর্গা না করো বড়াই৷ সকল তত্ত্ব জানি আমি এই বালকের ঠাঁই৷৷ তোমার পতি ভাঙড় শিব তা তো আমি জানি৷ নিতি নিতি প্রতি ঘরে ভিক্ষা মাগেন তিনি৷৷ ভস্মমাখা তায় ভুজঙ্গ মাথে অঙ্গে৷ নিরবধি ফেরেন তিনি ভূত-পেরেতের সঙ্গে৷৷
ইহাকেই বলে শোধ তোলা! নিজের সম্বন্ধে যে-সকল স্পষ্ট ভাষা মহাদেব সহধর্মিণীরই মুখ হইতে মধ্যে মধ্যে শুনিয়া আসিয়াছেন, অদ্য সুযোগমত সেই সত্য কথাগুলিই গৌরীর কানে তুলিলেন৷
এই কথা শুনিয়া মায়ের রোদন বিপরীত৷ বাহির করতে চান শঙ্খ না হয় বাহির৷৷ পাষাণ আনিল চণ্ডী, শঙ্খ না ভাঙিল৷ শঙ্খেতে ঠেকিয়া পাষাণ খণ্ড খণ্ড হল৷৷ কোনোরূপে শঙ্খ যখন না হয় কর্তন৷ খড়গ দিয়ে হাত কাটিতে দেবীর গেল মন৷৷ হস্ত কাটিলে শঙ্খে ভরিবে রুধিরে৷ রুধির লাগিলে শঙ্খ নাহি লব ফিরে৷৷ মেনকা গো মা,
কী কুক্ষণে বাড়াছিলাম পা৷৷ মরিব মরিব মা গো হব আত্মঘাতী৷ আপনার গলে দিব নরসিংহ কাতি৷৷
অবশেষে অন্য উপায় না দেখিয়া দুর্গা ধূপদীপনৈবেদ্য লইয়া ধ্যানে বসিলেন৷
ধ্যানে পেলেন মহাদেবের চরণ দুখান৷
তখন ব্যাপারটা বুঝা গেল, দেবতার কৌতুকের পরিসমাপ্তি হইল৷
কোথা বা কন্যা, কোথা বা জামাতা৷ সকলই দেখি যেন আপন দেবতা৷৷
এ যেন ঠিক স্বপ্নেরমতো হইল৷ নিমেষের মধ্যে-
দুর্গা গেলেন কৈলাসে, শিব গেলেন শ্মশানে৷ ভাঙ ধুতুরা বেঁটে দুর্গা বসলেন আসনে৷ সন্ধ্যা হলে দুইজনে হলেন একখানে৷৷
কিন্তু কড়া জবাব দিয়া কার্যোদ্ধার হয় নাই৷ বরং তর্কে পরাস্ত হইলে গায়ের জোর আরো বাড়িয়া উঠে৷ সেই বুঝিয়া দুর্গা তখন-
গুটি পাঁচ-ছয় সিদ্ধির লাড়ু যত্ন ক’রে দিলেন৷
দাম্পত্যযুদ্ধে এই ছয়টি সিদ্ধির লাড়ু কামানের ছয়টা গোলার মতো কাজ করিল; ভোলানাথ এক-দমে পরাভূত হইয়া গেলেন৷ সহসা পিতা কন্যা জামাতার ঘনিষ্ঠ মিলন হইয়া গেল৷ বাক্যহীন নন্দী সকৌতুক ভক্তিভরে দ্বারপার্শ্বে দাঁড়াইয়া মনে মনে হাসিতে লাগিল-
সম্ভ্রমে সম্ভাষণ করি বসলেন তিন জন৷ দুগা, মর্তে যেয়ে কী আনিবে আমার কারণ৷৷ প্রতিবারে কেবলমাত্র বিল্বপত্র পাই৷ দেবী বললেন, প্রভু ছাড়া কোন্ দ্রব্য খাই৷৷ সিঁদুর-ফোঁটা অলকছটা মুক্তা গাঁথা কেশে৷ সোনার ঝাঁপা কনকচাঁপা, শিব ভুলেছেন যে বেশে৷৷ রত্নহার গলে তার দুলছে সোনার পাটা৷ চাঁদনি রাত্রিতে যেন বিদ্যুৎ দিচ্ছে ছটা৷৷ তাড় কঙ্কণ সোন্ পৈঁছি শঙ্খ বাহুমূলে৷ বাঁক-পরা মল সোনার নূপুর, আঁচল হেলে দোলে৷৷ সিংহাসন, পট্টবসন পরছে ভগবতী৷ কার্তিক গণেশ চললেন লক্ষ্মী সরস্বতী৷৷ জয়া বিজয়া দাসী চললেন দুইজন৷ গুপ্তভাবে চললেন শেষে দেব পঞ্চানন৷৷ গিরিসঙ্গে পরম রঙ্গে চললেন পরম সুখে৷ ষষ্ঠী তিথিতে উপনীত হলেন মর্তলোকে৷৷ সারি সারি ঘটবারি আর গঙ্গাজল৷ সাবধানে নিজমনে গাচ্ছেন মঙ্গল৷৷
অথবা সাধারণ গ্রামীণ ছড়ায় বারবার উঠে আসছে শাঁখের কথা
মাসি পিসি বনকাপাসি, বনের মধ্যে টিয়ে৷ মাসি গিয়েছে বৃন্দাবন দেখে আসি গিয়ে৷৷ কিসের মাসি, কিসের পিসি, কিসের বৃন্দাবন৷ আজ হতে জানলাম মা বড়ো ধন৷৷ মাকে দিলাম শাঁখা শাড়ি, বাপকে দিলাম নীলে ঘোড়া৷ ভাইয়ের দিলাম বিয়ে৷৷ আবার মায়ে দিল সরু শাঁখা, বাপে দিল শাড়ি৷ ঝপ্ ক’রে মা বিদেয় কর্-, রথ আসছে বাড়ি৷৷ আগে আয় রে চৌপল-, পিছে যায় রে ডুলি৷
গীতায় পাচ্ছি কুরু পাঞ্চালের নানান বীরের হাতে ধৃত শঙ্খের নাম-
তস্য সঞ্জনয়ন্ হর্ষ্ কুরু-বৃদ্ধঃ পিতামহঃ ৷ সিংহ নাদম্ বিনদ্য উচ্চৈঃ শঙ্খম্ দধ্মৌ প্রতাপবান ৷১২৷ ততঃ শঙ্খাঃ চ ভের্যাঃ চ পনব আনক গোমুখাঃ ৷ সহসা এব অভ্যহন্ন্ত সঃ শব্দঃ তুমুলঃ অভবত্ ৷১৩৷ ততঃ শ্বেতৈঃ হয়ৈঃ যুক্তে মহতি স্যন্দনে স্থিতৌ ৷ মাধবঃ পান্ডবঃ চ এব দিব্যৌ শঙ্খৌ প্রদধ্মতুঃ ৷১৪৷ পাঞ্চজন্যম্ হৃষীক-ঈশঃ দেবদত্তম্ ধনঞ্জয়ঃ ৷ পৌন্ড্রম্ দধ্মৌ মহাশঙ্খম্ ভীমকর্মা বৃক-উদর ৷১৫৷ অনন্ত বিজয়ম্ রাজা কুন্তীপুত্রঃ যুধিষ্ঠিরঃ ৷ নকুলঃ সহদেবঃ চ সুঘোষ-মনিপুস্পকৌ ৷১৬৷ কাশ্যঃ চ পরম-ইষু-আসঃ শিখন্ডী চ মহারথঃ ৷ ধৃষ্টদ্যুম্নঃ বিরাটঃ চ সাত্যকি চ অপরাজিতঃ ৷১৭৷ দ্রুপদঃ দ্রৌপদেয়াঃ চ সর্বশঃ পৃথিবী পতে ৷ সৌভদ্রঃ চ মহা বাহু শঙ্খান দধ্মুঃ পৃথক্ পৃথ্ক ৷১৮৷সঃ ঘোষঃ ধার্তরাষ্ট্রাণাম্ হৃদয়ানি ব্যদারয়াত্ ৷ নভঃ চ পৃথিবীম্ চ এব তুমুলঃ অভ্যনুনাদয়ন ৷১৯৷
বঙ্গার্থ- তখন কুরু বংশের বৃদ্ধ পিতামহ ভীষ্ম দুর্যোধনের হর্ষ উত্পাদনের জন্য সিংহের গর্জ্জনের মত অতি উচ্চনাদে তার শঙ্খ বাজালেন৷ তারপর শঙ্খ ভেরী পনক আনক ঢাক এবং গোমুখ সিংঙ্গা সমুহ হঠাত্ একত্রে ধ্বনিত হয়ে এক তুমুল শব্দের সৃষ্টি হল৷ অন্যদিকে শ্বেত অশ্বসমুহ যুক্ত একদিব্য রথে স্থিত শ্রীকৃষ্ণ এবং অর্জুন উভয়ে তাদের দিব্য শঙ্খ বাজালেন৷ তখন শ্রীকৃষ্ণের পাঞ্চজন্য নামক শঙ্খ বাজালেন৷এবং অর্জুন বাজালেন তার দেবদত্তক নামক শঙ্খ এবং বিপুল ভোজন প্রীয় ভীমকর্মা সেন বাজালেন পৌন্ড্র নামক তার ভয়ঙ্কর শঙ্খ৷ কুন্তীপুত্র মহারাজ যুধিষ্ঠির অনন্ত বিজয় নামক শঙ্খ বাজালেন, এবং নকুল এবং সহদেব বাজালেন সুঘোষ এবং মনিপুস্পক নামক শঙ্খ৷ হে মহারাজ তখন মহান ধনুর্ধর কাশিরাজ, প্রবল যোদ্ধা শিখন্ডি,ধৃষ্টদ্যুম্ন, বিরাট এবং অপরাজিত সাত্যকি, দ্রুপদ দ্রৌপদীর পুত্রগন, সুভদ্রার মহা বলবান পুত্র এবং অন্য সকলে তাদের নিজ নিজ পৃথক শঙ্খ বাজালেন৷ শঙ্খ নিনাদের সেই শব্দে আকাশ বিদীর্ন হল৷ পৃথিবী কম্পিত হল এবং তার ফলে ধৃতরাষ্টের হৃদয় প্রবল ভয়ে বিধ্বস্ত হল৷
সাধারণ তুসু গানেতেও লৌকিক জীবনে শঙ্খ ব্যবহারের উল্লেখ পাই - আমার তুষু সিনানে গেছে কালীদহের পুকুরে, কোথায় এক ব্রাহ্মাণ এসে শঙ্খ পরায় তুষুরে, শঙ্খ যে পরলি মাগো মূল্য লিব কার কাছে, ঘরে আছে অবৈ দেবরাজ মূল্য নাও গা তার কাছে, ওহে ওঠে অবৈ দেবরাজ মূল্য দাও হে আমারে, তোমার কন্যা শঙ্খ পরিল কালীদহের পুকুরে, শঙ্খ যে পরলি মাগো হাতে কেমন সেজেছে, অথবা, কি আনন্দ লাগলো মনে, আদিবাসী পাবনে, শাঁখ বাজালো ও দিদিরা, দে উলু দে সকলে, নিয়ে আয় তোরা বরনডালা, টুসুর মায়ের ঘর সাজা, পদ্ম ফুলটা পাতে দিব, হলুদ ফুলের বিছানা, সুগন্ধর ধূপ জ্বেলে দেব, দেব জ্বেলে দীপ বাতি, সারা রাতি থাকব বসে, টুসুর মায়ের পাশে, কি আনন্দ লাগলো মনে, আদিবাসী পাবনে৷
আবার শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ কথামৃতর প্রথম পরিচ্ছেদে পূর্ণ, ছোট নরেন, গোপালের মা শীর্ষক কথায় পাই শাঁখা পরা হাত আর শাঁখারীর কথা- “রণজিত রায় ওখানকার জমিদার ছিল৷ তপস্যার জোরে তাঁকে কন্যারূপে পেয়েছিল৷ মেয়েটিকে বড়ই স্নেহ করে৷ সেই স্নেহের গুণে তিনি আটকে ছিলেন, বাপের কাছ ছাড়া প্রায় হতেন না৷ একদিন সে জমিদারির কাজ করছে, ভারী ব্যস্ত; মেয়েটি ছেলের স্বভাবে কেবল বলছে, ‘বাবা, এটা কি; ওটা কি৷’ বাপ অনেক মিষ্টি করে বললে -- ‘মা, এখন যাও, বড় কাজ পড়েছে৷’ মেয়ে কোনমতে যায় না৷ শেষে বাপ অন্যমনস্ক হয়ে বললে, ‘তুই এখান থেকে দূর হ’৷ মা তখন এই ছুতো করে বাড়ি থেকে চলে গেলেন৷ সেই সময় একজন শাঁখারী রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল৷ তাকে ডেকে শাঁখা পরা হল৷ দাম দেবার কথায় বললেন, ঘরের অমুক কুলুঙ্গিতে টাকা আছে, লবে৷ এই বলে সেখান থেকে চলে গেলেন, আর দেখা গেল না৷ এদিকে শাঁখারী টাকার জন্য ডাকাডাকি করছে৷ তখন মেয়ে বাড়িতে নাই দেখে সকলে ছুটে এল৷ রণজিত রায় নানাস্থানে লোক পাঠালে সন্ধান করবার জন্য৷ শাঁখারীর টাকা সেই কুলুঙ্গিতে পাওয়া গেল৷ রণজিত রায় কেঁদে কেঁদে বেড়াচ্ছেন, এমন সময় লোকজন এসে বললে, যে, দীঘিতে কি দেখা যাচ্ছে৷ সকলে দীঘির ধারে গিয়ে দেখে যে শাঁখাপরা হাতটি জলের উপর তুলেছেন৷ তারপর আর দেখা গেল না৷ এখনও ভগবতীর পূজা ওই মেলার সময় হয় -- বারুণীর দিনে৷
অরু দত্ত তরু দত্ত দুই বোন শাঁখা পরা হাতের কিংবদন্তী বর্ধমানের যোগাদ্যার কাহিনী লিখেছিলেন ইংরেজি পদ্যয়, গত শতাব্দে, যার কুড় কিন্তু সারা বাংলার গ্রামেগঞ্জের লৌকিক কাহিনীতে ছড়িয়ে রয়েছে৷ ঠিক একই কাহিনি আমরা পাই হাওড়ার রাজবল্লভী দেবীর প্রতিষ্ঠার কিংবদন্তীতেও
আর বাংলার মেয়েদের কথা, বাংলার পরিবেশের কথা জীবনানন্দ ছাড়া আর কেইবা তার তুলতুলে পলিমাটিময় কলমে বলেছেন, রূপসী বাংলায় বারবার লিখেছেন-
১)দেখিব মেয়েলি হাত সকরুণ- শাদা শাঁখা ধূসর বাতাসে, শঙ্খের মতো কাঁদে : সন্ধ্যায় দাঁড়াল সে পুকুরের ধারে,
২)চারিদিকে বাংলার ধানী শাড়ি- শাদা শাঁখা- বাংলার ঘাস, আকন্দ বাসকলতা ঘেরা এক নীল মঠ-আপনার মনে, ভাঙিতেছে ধীরে ধীরে;- চারিদিকে এইসব আশ্চর্য উচ্ছ্বাস-
৩)ঘুমায়ে পড়িব আমি একদিন তোমাদের নক্ষত্রের রাতে, শিয়রে বৈশাখ মেঘ-শাদা-শাদা যেন কড়ি-শঙ্খের পাহাড়, নদীর ওপার থেকে চেয়ে রবে- কোনো এক শঙ্খবালিকার, ধূসর রূপের কথা মনে হবে-এই আম জামের ছায়াতে
৪)সে কত শতাব্দী আগে তাহাদের করুণ শঙ্খের মতো স্তন, তাহাদের হলুদ শাড়ি — ক্ষীর দেহ — তাহাদের অপরূপ মন
৫)চলে গেছে বহু দূরে; — দেখোনিকো, বোঝানিকো, করোনিকো মানা, রূপসী শঙ্খের কৌটা তুমি যে গো প্রাণহীন — পানের বাটায়৷
হাতে শাঁখা পরে কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোয় বাঙালি মেয়েরা শাঁখ বাজিয়ে স্মরণ করেন সম্পদের দেবী লক্ষ্মী দেবীকে - শঙ্খ বাজিয়ে তোমায় ঘরে এনেছি; সুগন্ধি ধূপ জ্বেলে আসন পেতেছি৷ প্রদীপ জ্বেলে নিলাম তোমায় বরণ করে, জনম জনম থাকো আমার এঘরে, এসো মা লক্ষ্মী বোসো ঘরে৷
বাংলার শহুরে বা লৌকিক সাহিত্যে বার বার উঠে এসেছে শাঁখ আর শাঁখা অনুষঙ্গ, স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও তার গ্রাম্য ছড়া সংগ্রহে উল্লেখ করেছেন পার্বতী আর মহাদেবের শাঁখা আর শাঁখারির এক কৌতুকতর সাংসারিক কোন্দল৷ শত বছর আগে রবীন্দ্রনাথ গ্রাম্যছড়া সংগ্রহের মাধ্যমে বাংলার লোকসম্পদ সংগ্রহের এক আন্দোলনের সূচনা করে এই নাম জানা-অজানা শিল্পীদের, সম্প্রদায়ের প্রতি সম্মাননা জানান, রবীন্দ্র জন্ম সার্ধশতবছরে লৌকিক শিল্পীদের পক্ষথেকে গঙ্গা জলে গঙ্গাপুজোর আদলে ঠাকুর রবীন্দ্রনাথকে প্রণাম জানানো হল রবীন্দ্রনাথের এই লেখাটি ছাপিয়ে-
যে ছড়ার আলোচনায় প্রবৃত্ত হইতেছি তাহাতে দেবদেবীর একটি গোপন ঘরের কথা বর্ণিত আছে৷
শিব সঙ্গে রসরঙ্গে বসিয়ে ভবানী৷ কুতূহলে উমা বলেন ত্রিশূল শূলপাণি৷৷ তুমি প্রভু, তুমি প্রভু ত্রৈলোক্যের সার৷
ইন্দ্র চন্দ্র কুবের বরুণ তোমারি কিংকর৷৷ তোমার নারী হয়ে আমার সাধ নাহি পোরে৷ যেন বেন্যা পতির কপালে প’ড়ে রমণী ঝোরে৷৷ দিব্য সোনার অলংকার না পরিলাম গায়৷ শামের বরন দুই শঙ্খ পরতে সাধ যায়৷৷ দেবের কাছে মরি লাজে হাত বাড়াতে নারি৷ বারেক মোরে দাও শঙ্খ, তোমার ঘরে পরি৷৷
ভোলানাথ ভাবিলেন, একটা কৌতুক করা যাক, প্রথমেই একটু কোন্দল বাধাইয়া তুলিলেন৷
ভেবে ভোলা হেসে কন শুন হে পার্বতী , আমি তো কড়ার ভিখারি ত্রিপুরারি শঙ্খ পাব কথি৷৷ হাতের শিঙাটা বেচলে পরে হবে না, একখানা শঙ্খের কড়ি৷ বলদটা মূল করিলে হবে কাহনটেক কড়ি৷৷ এটি ওটি ঠাক ঠিকাটি চাও হে গৌরী, থাকলে দিতে পারি৷ তোমার পিতা আছে বটে অর্থের অধিকারী৷ সে কি দিতে পারে না দুমুটো শঙ্খের মুজুরি৷৷
এই-যে ধনহীনতার ভড়ং এটা মহাদেবের নিতান্ত বাড়াবাড়ি,….স্ত্রী যখন ব্রেস্লেট প্রার্থনা করে কেরানিবাবু তখন আয়ব্যয়ের সুদীর্ঘ হিসাব বিশ্লেষণ করিয়া আপন দারিদ্র্য প্রমাণ করিতে বসিলে কোন্ ধর্মপত্নী তাহা অবিচলিত রসনায় সহ্য করিতে পারে৷ বিশেষত শিবের দারিদ্র্য ওটা নিতান্তই পোশাকি দারিদ্র্য, তাহা কেবল ইন্দ্র চন্দ্র বরুণ সকলের উপরে টেক্কা দিবার জন্য, কেবল লক্ষ্মীর জননী অন্নপূর্ণার সহিত একটা অপরূপ কৌতুক করিবার অভিপ্রায়ে৷ কালিদাস শংকরের অট্টহাস্যকে কৈলাসশিখরের ভীষণ তুহিনপুঞ্জের সহিত তুলনা করিয়াছেন৷ মহেশ্বরের শুভ্র দারিদ্র্যও তাঁহার এক নিঃশব্দ অট্টহাস্য৷ কিন্তু দেবতার পক্ষেও কৌতুকের একটা সীমা আছে৷ মহাদেবী এ সম্বন্ধে নিজের মনের ভাব যেরূপে ব্যক্ত করিলেন তাহা অত্যন্ত স্পষ্ট৷ তাহাতে কোনো কথাই ইঙ্গিতের অপেক্ষায় রহিল না৷
গৌরী গর্জিয়ে কন ঠাকুর শিবাই, আমি গৌরী তোমার হাতে শঙ্খ পরতে চাই৷৷আপনি যেমন যুব্-যুবতী অমনি যুবক পতি হয়, তবে সে বৈরস রস, নইলে কিছুই নয়৷৷ আপনি বুড়ো আধবয়সী ভাঙধুতুরায় মত্ত, আপনার মতো পরকে বলে মন্দ৷৷
এইখানে শেষ হয় নাই–ইহার পরে দেবী মনের ক্ষোভে আরো দুই-চারটি যে কথা বলিয়াছেন তাহা মহাদেবের ব্যক্তিগত চরিত্র সম্বন্ধে, তাহা সাধারণ্যে প্রকাশযোগ্য নহে৷ সুতরাং আমরা উদ্ধৃত করিতে ক্ষান্ত হইলাম৷ ব্যাপারটা কেবল এইখানেই শেষ হইল না; স্ত্রীর রাগ যতদূর পর্যন্ত যাইতে পারে, অর্থাৎ বাপের বাড়ি পর্যন্ত, তাহা গেল৷
কোলে করি কার্তিক হাঁটায়ে লম্বোদরে, ক্রোধ করি হরের গৌরী গেলা বাপের ঘরে৷৷
এ দিকে শিব তাঁহার সংকল্পিত দাম্পত্য-প্রহসনের নেপথ্যবিধান শুরু করিলেন–
বিশ্বকর্মা এনে করান শঙ্খের গঠন৷ শঙ্খ লইয়া শাঁখারি সাজিয়া বাহির হইলেন-, দুইবাহু শঙ্খ নিলেন নাম শ্রীরাম লক্ষ্মণ৷ কপটভাবে হিমালয়ে তলাসে ফেরেন৷৷ হাতে শূলী কাঁখে থলি শম্ভু ফেরে গলি গলি৷ শঙ্খ নিবি শঙ্খ নিবি এই কথাটি ব’লে৷৷ সখীসঙ্গে বসে গৌরী আছে কুতূহলে৷ শঙ্খ দেখি শঙ্খ দেখি এই কথাটি বলে৷৷ গৌরীকে দেখায়ে শাঁখারি শঙ্খ বার ক’ল্ল৷ শঙ্খের উপরে যেন চন্দ্রের উদয় হল৷৷ মণি মুকুতা-প্রবাল-গাঁথা মাণিক্যের ঝুরি৷ নব ঝলকে ঝলছে যেন ইন্দ্রের বিজুলি৷৷
দেবী খুশি হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন–
শাঁখারি ভালো এনেছ শঙ্খ৷ শঙ্খের কত নিবে তঙ্ক৷৷
দেবীর লুব্ধভাব দেখিয়া চতুর শাঁখারি প্রথমে দর-দামের কথা কিছুই আলোচনা করিল না; কহিল-
গৌরী, ব্রহ্মলোক, বৈকুণ্ঠ, হরের কৈলাস, এ তো সবাই কয়৷ বুঝে দিলেই হয়৷হস্ত ধুয়ে পরো শঙ্খ, দেরি উচিত নয়৷৷
শাঁখারি মুখে মুখে হরের স্থাবর সম্পত্তির যেরূপ ফর্দ দিল তাহাতে শাঁখাজোরা বিশেষ সস্তায় যাইবে মহাদেবীর এমন মনে করা উচিত ছিল না৷
গৌরী আর মহাদেবে কথা হল দড়৷ সকল সখী বলে দুর্গা শঙ্খ চেয়ে পরো৷৷ কেউ দিলেন তেল গামছা কেউ জলের বাটি৷ দেবের ঊরুতে হস্ত থুয়ে বসলেন পার্বতী৷৷ দয়াল শিব বলেন, শঙ্খ আমার কথাটি ধরো–
দুর্গার হাতে গিয়ে শঙ্খ বজ্র হয়ে থাকো৷৷ শিলে নাহি ভেঙো শঙ্খ, খড়েগ নাহি ভাঙো৷ দুর্গার সহিত করেন বাক্যের তরঙ্গ৷৷ এ কথা শুনিয়া মাতা মনে মনে হাসে৷ শঙ্খ পরান জগৎপিতা মনের হরষে৷৷ শাঁখারি ভালো দিলে শঙ্খ মানায়ে৷ ভাণ্ডার ভেঙে দেইগে তঙ্ক, লওগে গনিয়ে৷৷
এতক্ষণে শাঁখারি সময় বুঝিয়া কহিল–
আমি যদি তোমার শঙ্খের লব তঙ্ক৷ জ্ঞেয়াত-মাঝারে মোর রহিবে কলঙ্ক৷৷
ইহারা যে বংশের শাঁখারি তাঁহাদের কুলাচার স্বতন্ত্র; তাঁহাদের বিষয়বুদ্ধি কিছুমাত্র নাই; টাকাকড়ি সম্বন্ধে বড়ো নিস্পৃহ; ইঁহারা যাঁহাকে শাঁখা পরান তাঁহাকে পাইলেই মূল্যের আর কোনোপ্রকার দাবি রাখেন না৷ ব্যবসায়টি অতি উত্তম৷
কেমন কথা কও শাঁখারি কেমন কথা কও৷ মানুষ বুঝিয়া শাঁখারি এ-সব কথা কও৷৷
শাঁখারি কহিল–
না করো বড়াই দুর্গা না করো বড়াই৷ সকল তত্ত্ব জানি আমি এই বালকের ঠাঁই৷৷ তোমার পতি ভাঙড় শিব তা তো আমি জানি৷ নিতি নিতি প্রতি ঘরে ভিক্ষা মাগেন তিনি৷৷ ভস্মমাখা তায় ভুজঙ্গ মাথে অঙ্গে৷ নিরবধি ফেরেন তিনি ভূত-পেরেতের সঙ্গে৷৷
ইহাকেই বলে শোধ তোলা! নিজের সম্বন্ধে যে-সকল স্পষ্ট ভাষা মহাদেব সহধর্মিণীরই মুখ হইতে মধ্যে মধ্যে শুনিয়া আসিয়াছেন, অদ্য সুযোগমত সেই সত্য কথাগুলিই গৌরীর কানে তুলিলেন৷
এই কথা শুনিয়া মায়ের রোদন বিপরীত৷ বাহির করতে চান শঙ্খ না হয় বাহির৷৷ পাষাণ আনিল চণ্ডী, শঙ্খ না ভাঙিল৷ শঙ্খেতে ঠেকিয়া পাষাণ খণ্ড খণ্ড হল৷৷ কোনোরূপে শঙ্খ যখন না হয় কর্তন৷ খড়গ দিয়ে হাত কাটিতে দেবীর গেল মন৷৷ হস্ত কাটিলে শঙ্খে ভরিবে রুধিরে৷ রুধির লাগিলে শঙ্খ নাহি লব ফিরে৷৷ মেনকা গো মা,
কী কুক্ষণে বাড়াছিলাম পা৷৷ মরিব মরিব মা গো হব আত্মঘাতী৷ আপনার গলে দিব নরসিংহ কাতি৷৷
অবশেষে অন্য উপায় না দেখিয়া দুর্গা ধূপদীপনৈবেদ্য লইয়া ধ্যানে বসিলেন৷
ধ্যানে পেলেন মহাদেবের চরণ দুখান৷
তখন ব্যাপারটা বুঝা গেল, দেবতার কৌতুকের পরিসমাপ্তি হইল৷
কোথা বা কন্যা, কোথা বা জামাতা৷ সকলই দেখি যেন আপন দেবতা৷৷
এ যেন ঠিক স্বপ্নেরমতো হইল৷ নিমেষের মধ্যে-
দুর্গা গেলেন কৈলাসে, শিব গেলেন শ্মশানে৷ ভাঙ ধুতুরা বেঁটে দুর্গা বসলেন আসনে৷ সন্ধ্যা হলে দুইজনে হলেন একখানে৷৷
কিন্তু কড়া জবাব দিয়া কার্যোদ্ধার হয় নাই৷ বরং তর্কে পরাস্ত হইলে গায়ের জোর আরো বাড়িয়া উঠে৷ সেই বুঝিয়া দুর্গা তখন-
গুটি পাঁচ-ছয় সিদ্ধির লাড়ু যত্ন ক’রে দিলেন৷
দাম্পত্যযুদ্ধে এই ছয়টি সিদ্ধির লাড়ু কামানের ছয়টা গোলার মতো কাজ করিল; ভোলানাথ এক-দমে পরাভূত হইয়া গেলেন৷ সহসা পিতা কন্যা জামাতার ঘনিষ্ঠ মিলন হইয়া গেল৷ বাক্যহীন নন্দী সকৌতুক ভক্তিভরে দ্বারপার্শ্বে দাঁড়াইয়া মনে মনে হাসিতে লাগিল-
সম্ভ্রমে সম্ভাষণ করি বসলেন তিন জন৷ দুগা, মর্তে যেয়ে কী আনিবে আমার কারণ৷৷ প্রতিবারে কেবলমাত্র বিল্বপত্র পাই৷ দেবী বললেন, প্রভু ছাড়া কোন্ দ্রব্য খাই৷৷ সিঁদুর-ফোঁটা অলকছটা মুক্তা গাঁথা কেশে৷ সোনার ঝাঁপা কনকচাঁপা, শিব ভুলেছেন যে বেশে৷৷ রত্নহার গলে তার দুলছে সোনার পাটা৷ চাঁদনি রাত্রিতে যেন বিদ্যুৎ দিচ্ছে ছটা৷৷ তাড় কঙ্কণ সোন্ পৈঁছি শঙ্খ বাহুমূলে৷ বাঁক-পরা মল সোনার নূপুর, আঁচল হেলে দোলে৷৷ সিংহাসন, পট্টবসন পরছে ভগবতী৷ কার্তিক গণেশ চললেন লক্ষ্মী সরস্বতী৷৷ জয়া বিজয়া দাসী চললেন দুইজন৷ গুপ্তভাবে চললেন শেষে দেব পঞ্চানন৷৷ গিরিসঙ্গে পরম রঙ্গে চললেন পরম সুখে৷ ষষ্ঠী তিথিতে উপনীত হলেন মর্তলোকে৷৷ সারি সারি ঘটবারি আর গঙ্গাজল৷ সাবধানে নিজমনে গাচ্ছেন মঙ্গল৷৷
অথবা সাধারণ গ্রামীণ ছড়ায় বারবার উঠে আসছে শাঁখের কথা
মাসি পিসি বনকাপাসি, বনের মধ্যে টিয়ে৷ মাসি গিয়েছে বৃন্দাবন দেখে আসি গিয়ে৷৷ কিসের মাসি, কিসের পিসি, কিসের বৃন্দাবন৷ আজ হতে জানলাম মা বড়ো ধন৷৷ মাকে দিলাম শাঁখা শাড়ি, বাপকে দিলাম নীলে ঘোড়া৷ ভাইয়ের দিলাম বিয়ে৷৷ আবার মায়ে দিল সরু শাঁখা, বাপে দিল শাড়ি৷ ঝপ্ ক’রে মা বিদেয় কর্-, রথ আসছে বাড়ি৷৷ আগে আয় রে চৌপল-, পিছে যায় রে ডুলি৷
গীতায় পাচ্ছি কুরু পাঞ্চালের নানান বীরের হাতে ধৃত শঙ্খের নাম-
তস্য সঞ্জনয়ন্ হর্ষ্ কুরু-বৃদ্ধঃ পিতামহঃ ৷ সিংহ নাদম্ বিনদ্য উচ্চৈঃ শঙ্খম্ দধ্মৌ প্রতাপবান ৷১২৷ ততঃ শঙ্খাঃ চ ভের্যাঃ চ পনব আনক গোমুখাঃ ৷ সহসা এব অভ্যহন্ন্ত সঃ শব্দঃ তুমুলঃ অভবত্ ৷১৩৷ ততঃ শ্বেতৈঃ হয়ৈঃ যুক্তে মহতি স্যন্দনে স্থিতৌ ৷ মাধবঃ পান্ডবঃ চ এব দিব্যৌ শঙ্খৌ প্রদধ্মতুঃ ৷১৪৷ পাঞ্চজন্যম্ হৃষীক-ঈশঃ দেবদত্তম্ ধনঞ্জয়ঃ ৷ পৌন্ড্রম্ দধ্মৌ মহাশঙ্খম্ ভীমকর্মা বৃক-উদর ৷১৫৷ অনন্ত বিজয়ম্ রাজা কুন্তীপুত্রঃ যুধিষ্ঠিরঃ ৷ নকুলঃ সহদেবঃ চ সুঘোষ-মনিপুস্পকৌ ৷১৬৷ কাশ্যঃ চ পরম-ইষু-আসঃ শিখন্ডী চ মহারথঃ ৷ ধৃষ্টদ্যুম্নঃ বিরাটঃ চ সাত্যকি চ অপরাজিতঃ ৷১৭৷ দ্রুপদঃ দ্রৌপদেয়াঃ চ সর্বশঃ পৃথিবী পতে ৷ সৌভদ্রঃ চ মহা বাহু শঙ্খান দধ্মুঃ পৃথক্ পৃথ্ক ৷১৮৷সঃ ঘোষঃ ধার্তরাষ্ট্রাণাম্ হৃদয়ানি ব্যদারয়াত্ ৷ নভঃ চ পৃথিবীম্ চ এব তুমুলঃ অভ্যনুনাদয়ন ৷১৯৷
বঙ্গার্থ- তখন কুরু বংশের বৃদ্ধ পিতামহ ভীষ্ম দুর্যোধনের হর্ষ উত্পাদনের জন্য সিংহের গর্জ্জনের মত অতি উচ্চনাদে তার শঙ্খ বাজালেন৷ তারপর শঙ্খ ভেরী পনক আনক ঢাক এবং গোমুখ সিংঙ্গা সমুহ হঠাত্ একত্রে ধ্বনিত হয়ে এক তুমুল শব্দের সৃষ্টি হল৷ অন্যদিকে শ্বেত অশ্বসমুহ যুক্ত একদিব্য রথে স্থিত শ্রীকৃষ্ণ এবং অর্জুন উভয়ে তাদের দিব্য শঙ্খ বাজালেন৷ তখন শ্রীকৃষ্ণের পাঞ্চজন্য নামক শঙ্খ বাজালেন৷এবং অর্জুন বাজালেন তার দেবদত্তক নামক শঙ্খ এবং বিপুল ভোজন প্রীয় ভীমকর্মা সেন বাজালেন পৌন্ড্র নামক তার ভয়ঙ্কর শঙ্খ৷ কুন্তীপুত্র মহারাজ যুধিষ্ঠির অনন্ত বিজয় নামক শঙ্খ বাজালেন, এবং নকুল এবং সহদেব বাজালেন সুঘোষ এবং মনিপুস্পক নামক শঙ্খ৷ হে মহারাজ তখন মহান ধনুর্ধর কাশিরাজ, প্রবল যোদ্ধা শিখন্ডি,ধৃষ্টদ্যুম্ন, বিরাট এবং অপরাজিত সাত্যকি, দ্রুপদ দ্রৌপদীর পুত্রগন, সুভদ্রার মহা বলবান পুত্র এবং অন্য সকলে তাদের নিজ নিজ পৃথক শঙ্খ বাজালেন৷ শঙ্খ নিনাদের সেই শব্দে আকাশ বিদীর্ন হল৷ পৃথিবী কম্পিত হল এবং তার ফলে ধৃতরাষ্টের হৃদয় প্রবল ভয়ে বিধ্বস্ত হল৷
সাধারণ তুসু গানেতেও লৌকিক জীবনে শঙ্খ ব্যবহারের উল্লেখ পাই - আমার তুষু সিনানে গেছে কালীদহের পুকুরে, কোথায় এক ব্রাহ্মাণ এসে শঙ্খ পরায় তুষুরে, শঙ্খ যে পরলি মাগো মূল্য লিব কার কাছে, ঘরে আছে অবৈ দেবরাজ মূল্য নাও গা তার কাছে, ওহে ওঠে অবৈ দেবরাজ মূল্য দাও হে আমারে, তোমার কন্যা শঙ্খ পরিল কালীদহের পুকুরে, শঙ্খ যে পরলি মাগো হাতে কেমন সেজেছে, অথবা, কি আনন্দ লাগলো মনে, আদিবাসী পাবনে, শাঁখ বাজালো ও দিদিরা, দে উলু দে সকলে, নিয়ে আয় তোরা বরনডালা, টুসুর মায়ের ঘর সাজা, পদ্ম ফুলটা পাতে দিব, হলুদ ফুলের বিছানা, সুগন্ধর ধূপ জ্বেলে দেব, দেব জ্বেলে দীপ বাতি, সারা রাতি থাকব বসে, টুসুর মায়ের পাশে, কি আনন্দ লাগলো মনে, আদিবাসী পাবনে৷
আবার শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ কথামৃতর প্রথম পরিচ্ছেদে পূর্ণ, ছোট নরেন, গোপালের মা শীর্ষক কথায় পাই শাঁখা পরা হাত আর শাঁখারীর কথা- “রণজিত রায় ওখানকার জমিদার ছিল৷ তপস্যার জোরে তাঁকে কন্যারূপে পেয়েছিল৷ মেয়েটিকে বড়ই স্নেহ করে৷ সেই স্নেহের গুণে তিনি আটকে ছিলেন, বাপের কাছ ছাড়া প্রায় হতেন না৷ একদিন সে জমিদারির কাজ করছে, ভারী ব্যস্ত; মেয়েটি ছেলের স্বভাবে কেবল বলছে, ‘বাবা, এটা কি; ওটা কি৷’ বাপ অনেক মিষ্টি করে বললে -- ‘মা, এখন যাও, বড় কাজ পড়েছে৷’ মেয়ে কোনমতে যায় না৷ শেষে বাপ অন্যমনস্ক হয়ে বললে, ‘তুই এখান থেকে দূর হ’৷ মা তখন এই ছুতো করে বাড়ি থেকে চলে গেলেন৷ সেই সময় একজন শাঁখারী রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল৷ তাকে ডেকে শাঁখা পরা হল৷ দাম দেবার কথায় বললেন, ঘরের অমুক কুলুঙ্গিতে টাকা আছে, লবে৷ এই বলে সেখান থেকে চলে গেলেন, আর দেখা গেল না৷ এদিকে শাঁখারী টাকার জন্য ডাকাডাকি করছে৷ তখন মেয়ে বাড়িতে নাই দেখে সকলে ছুটে এল৷ রণজিত রায় নানাস্থানে লোক পাঠালে সন্ধান করবার জন্য৷ শাঁখারীর টাকা সেই কুলুঙ্গিতে পাওয়া গেল৷ রণজিত রায় কেঁদে কেঁদে বেড়াচ্ছেন, এমন সময় লোকজন এসে বললে, যে, দীঘিতে কি দেখা যাচ্ছে৷ সকলে দীঘির ধারে গিয়ে দেখে যে শাঁখাপরা হাতটি জলের উপর তুলেছেন৷ তারপর আর দেখা গেল না৷ এখনও ভগবতীর পূজা ওই মেলার সময় হয় -- বারুণীর দিনে৷
অরু দত্ত তরু দত্ত দুই বোন শাঁখা পরা হাতের কিংবদন্তী বর্ধমানের যোগাদ্যার কাহিনী লিখেছিলেন ইংরেজি পদ্যয়, গত শতাব্দে, যার কুড় কিন্তু সারা বাংলার গ্রামেগঞ্জের লৌকিক কাহিনীতে ছড়িয়ে রয়েছে৷ ঠিক একই কাহিনি আমরা পাই হাওড়ার রাজবল্লভী দেবীর প্রতিষ্ঠার কিংবদন্তীতেও
আর বাংলার মেয়েদের কথা, বাংলার পরিবেশের কথা জীবনানন্দ ছাড়া আর কেইবা তার তুলতুলে পলিমাটিময় কলমে বলেছেন, রূপসী বাংলায় বারবার লিখেছেন-
১)দেখিব মেয়েলি হাত সকরুণ- শাদা শাঁখা ধূসর বাতাসে, শঙ্খের মতো কাঁদে : সন্ধ্যায় দাঁড়াল সে পুকুরের ধারে,
২)চারিদিকে বাংলার ধানী শাড়ি- শাদা শাঁখা- বাংলার ঘাস, আকন্দ বাসকলতা ঘেরা এক নীল মঠ-আপনার মনে, ভাঙিতেছে ধীরে ধীরে;- চারিদিকে এইসব আশ্চর্য উচ্ছ্বাস-
৩)ঘুমায়ে পড়িব আমি একদিন তোমাদের নক্ষত্রের রাতে, শিয়রে বৈশাখ মেঘ-শাদা-শাদা যেন কড়ি-শঙ্খের পাহাড়, নদীর ওপার থেকে চেয়ে রবে- কোনো এক শঙ্খবালিকার, ধূসর রূপের কথা মনে হবে-এই আম জামের ছায়াতে
৪)সে কত শতাব্দী আগে তাহাদের করুণ শঙ্খের মতো স্তন, তাহাদের হলুদ শাড়ি — ক্ষীর দেহ — তাহাদের অপরূপ মন
৫)চলে গেছে বহু দূরে; — দেখোনিকো, বোঝানিকো, করোনিকো মানা, রূপসী শঙ্খের কৌটা তুমি যে গো প্রাণহীন — পানের বাটায়৷
লেবেলসমূহ:
Bengal,
Conch Shell Carving,
ConchBangles,
ConchShell,
FolkCommunity,
FolkCraft,
শাঁখ,
শাখা,
শাঁখারি
Saturday, September 11, 2010
শাঁখ শাখার বারোমাস্যা - মধ্যমণ্ডল
শঙ্খাসুরের রক্ত থেকে শঙ্খ
বাঙালী ঐতিহ্যের একটি নির্দিষ্ট স্থান দখল করে আছে শাঁখা৷ শাঁখা ছাড়া হিন্দু সম্প্রদায়ের কোন ধর্মীয় আচারভিত্তিক কর্মকান্ডই সুসম্পন্ন হয় না৷ হিন্দু নারীদের সধবা হওয়ার প্রতীকই হলো শাঁখা৷ পৌরানিক কাহিনীতে শাঁখার উত্পত্তি সম্পর্কে বলা হয়েছে- শঙ্খাসুরের স্ত্রী তুলসী দেবী ছিল ঈশ্বর নারায়ণে বিশ্বাসী খুবই সতীসাধ্বী নারী৷ কিন্তু শঙ্খাসুর ছিল ঈশ্বরবিমুখ অত্যাচারী৷ তার পাপের শাস্তিস্বরূপ তাকে ঈশ্বরের আদেশে হত্যা করে ভারত মহাসাগরে ভাসিয়ে দেয়া হয়৷ পতিব্রতা তুলসী তা সইতে না পেরে স্বামী এবং নিজের অমরত্বের জন্য ঈশ্বরের কাছে বিনীত প্রার্থনা করে৷ ঈশ্বর তার প্রার্থনা মঞ্জুর করে তার দেহভস্ম থেকে তুলসী গাছ এবং সমুদ্রে হত্যা করা স্বামীর রক্ত থেকে শঙ্খ বা শাঁখা উত্পত্তি করেন৷ এখানেই শেষ নয়, তুলসী দেবীর ধর্মপরায়ণতায় সন্তুষ্ট হয়ে ঈশ্বর তুলসী ও শাঁখাকে তাদের সম্প্রদায়ের ধর্মীয় কাজে ব্যবহারের আবশ্যকতা নির্ধারণ করে দেন৷ সেই থেকে পতিব্রতা তুলসীকে চিরস্মরণীয় করে রাখতে হিন্দু সম্প্রদায় তুলসী ও শাঁখার ব্যবহারের প্রচলন করে৷ এ কাহিনী সূত্রে বলা যায় খ্রীষ্টপূর্ব পাঁচ হাজার বছর আগে (মহাভারতের যুগে) শাঁখার ব্যবহার শুরম্ন হয়৷ হিন্দু সমাজে শান্তির প্রতীক, মঙ্গলের প্রতীক শাঁখার ব্যবহার বহুল প্রচলিত৷ তবে শাঁখা দিয়ে গড়া গহনা ও বাদ্যশঙ্খের ব্যবহার ছাড়া তাদের সামাজিকতা ও ধর্মীয় কার্যাদি অচল বলা চলে৷ বিবাহিত নারীদের তো বরের দেয়া শাঁখার বালা ধারণ করতেই হবে৷ আর পূজা-অর্চনা, সামাজিক, মাঙ্গলিক বা যেকোন শুভ অনুষ্ঠানে বাদ্য শঙ্খের ধ্বনি ছাড়া তা অসম্ভব বলেই ধরে নেয়া যায়৷
শাঁখের প্রকারভেদ
সাধারণত শাঁখা হয় বামাবর্তী, কিন্তু হাতে গোণা যে সব শঙ্খ দক্ষিণদিকে মুখ করা তাদের দক্ষিণাবর্তী শঙ্খ বলাহয়৷ সনাতন ব্রাহ্মণ্যধর্মে কিন্তু দক্ষিণাবর্তী শঙ্খের চাহিদা আর তার গুরুত্ব বেশ বেশি, এ ধরণের শঙ্খ খুব বেশি পাওয়া যায়না বলেই হয়ত৷ দক্ষিণাবর্তী শঙ্খ দেবী লক্ষ্মীর প্রতীক৷ আমরা যেন মনেরাখি ব্রাহ্মণ্য সাহিত্যে দক্ষিণ দিকটি সম্পদের দেবতা কুবেবের দিক, সে জন্যও হয়ত দক্ষিণবর্ত শঙ্খের দাম৷ সুপুরি থেকে বড় নারকেলের পরিমানমত হয়ে থাকে দক্ষিণাবর্তী শঙ্খ৷ আজকের বাজারে একটি সাধারণ দক্ষিণাবর্তী শঙ্খের দাম দেড় হাজার টাকা থেকে দুহাজার টাকা প্রতি গ্রাম, আবার দক্ষিণাবর্তী শঙ্খের দুধেলা প্রকারের দাম হয় গ্রাম প্রতি দু হাজার টাকাও৷ কখোনো আবার লক্ষণ, রং আর নানান উপাদানের উপর নির্ভর করে দাম ওঠে গ্রাম প্রতি দশহাজার টাকা পর্যন্তও৷ মাঝারি পরিমানের একটি দক্ষিণাবর্তী শঙ্খের দাম ওঠে প্রায় দশ থেকে পনের লাখ টাকা৷
ভারতে যেসব শঙ্খ ব্যবহার করা হয়, তার মধ্যে শঙ্খের ব্যবহার হয় দুভাবে ৷ আস্ত শঙ্খ আর কাটা শঙ্খ, যেখানথেকে তৈরি হয় শাঁখা, নানান শঙ্খজাত দ্রব্য৷ আস্ত শঙ্খ আবার ব্যবহার করা হয় দুভাবে৷ তার একটি বাদ্যশঙ্খ অন্যটি জলশঙ্খ৷ আর কাটা শঙ্খ দিয়ে হয় শাঁখা, আংটি, চুনসহ নানা উপকরণ৷
বাদ্যশঙ্খ : শ্রীলঙ্কা থেকে আসা শঙ্খ পরিষ্কার করে পেছনের অংশ কেটে বাদ্যশঙ্খ তৈরি করা হয়৷ এ শঙ্খ বিশেষ কায়দায় ধরে কাটা অংশ মুখে লাগিয়ে ফুঁ দিয়ে শব্দের সৃষ্টি করা হয়৷ এ শব্দকে বলা হয় মঙ্গলধ্বনি৷ পূজার আগে বা বিশেষ ক্ষণে বাদ্যশঙ্খ বাজিয়ে মঙ্গলধ্বনি দেওয়া হয়৷ প্রতিটি মন্দির অথবা হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ঘরে বাদ্যশঙ্খ একটি প্রয়োজনীয় উপকরণ৷
জলশঙ্খ : জলশঙ্খ অনেকটা বাদ্যশঙ্খের মতোই৷ তবে এতে জলশঙ্খের মতো পেছনের অংশ কাটা হয় না৷ আস্ত শঙ্খটিকে চিত করে রেখে তার মধ্যে জল রাখা হয়৷ জল রাখা হয় বলেই এর নাম জলশঙ্খ৷ জলশঙ্খের জল পূজার কাজে ব্যবহৃত হয়৷ হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা জলশঙ্খে রাখা জল গঙ্গার জলের মতোই পবিত্র মনে করেন৷ জলশঙ্খ মন্দিরে বা ঘরে একটি ত্রিপদের ওপর রাখা হয়৷
বাদ্যশঙ্খ ও জলশঙ্খ উভয়ের গায়ে নকশা করা থাকে৷ নকশা ছাড়া শঙ্খও ব্যবহার কম নয়৷
সাধারণত প্রতিটি শঙ্খে গায়ে দেখা যায় ফুল, লতাপাতার নকশা৷ বিশেষ কিছু শঙ্খের ওপর মা কালী, রাধা-কৃষ্ণ, দুর্গা প্রতিমার নকশাও দেখা যায়৷ দিনের পর দিন কাটাকাটি করে একটি শঙ্খের ওপর নকশা ফুটিয়ে তোলা হয়৷ নকশা করা প্রতিটি শঙ্খ বাংলার লোকশিল্পের অন্যতম উপাদান৷ শখের হাঁড়ি, কাঠের পুতুল, মনসার মঞ্জুষ, পাথরের তৈজস, শোলার কদম, লক্ষ্মী সরার মতোই নকশা করা শঙ্খ লোকশিল্পের উপাদান৷ ঐতিহাসিক কেদারনাথ মজুমদারের 'ঢাকার বিবরণ' (১৯১০) গ্রন্থে উল্লেখ হয়েছে সে সময় ঢাকার কারখানার জন্য শ্রীলঙ্কা ও আফ্রিকা থেকে তিন-চার লাখ টাকার শঙ্খ আমদানি করা হতো৷ শঙ্খগুলোর ছিল তিতকৌড়ি শঙ্খ (লঙ্কা দ্বীপ), পটী শঙ্খ (সেতুবন্ধ রামেশ্বর), ধলা শঙ্খ (সেতুবন্ধ রামেশ্বর), জাহাজী শঙ্খ (সেতুবন্ধ রামেশ্বর), গুড়বাকী (মাদ্রাজ), সরতী, দুয়ানী পটী (মাদ্রাজ), আলাবিলা শঙ্খ, জলী শঙ্খ (মাদ্রাজ)৷ শাঁখারিদের অর্থনৈতিক অবকাঠামো দাঁড়িয়ে আছে শঙ্খশিল্পের ওপর৷ শাঁখারিরা শঙ্খের অলঙ্কার তৈরির জন্য বেশ কয়েক প্রকারের শঙ্খ ব্যবহার করে৷ এগুলোর নাম আজকাল আর উল্লেখ পাওয়া য়ায না – আগেকার পুস্তক থেকে য়া পাওয়া গেল দিলাম - তিতপুটি, রামেশ্বরী, জামাইপাটি, পাঁজি, দোয়ানি, মতি ছালামত, পাটী, গায়বেশী, কাব্বাম্বী, ধনা, জাডকি, কলকো, নারাখাদ, খগা, তিতকৌড়ি, গড়বাকী, জাহানী, সুর্কীচোনা, সরতী, আলাবিলা প্রভৃতি৷ এসব শঙ্খের প্রাপ্তিস্থল শ্রীলঙ্কা, মাদ্রাজের উপকূল৷
বাঙালী ঐতিহ্যের একটি নির্দিষ্ট স্থান দখল করে আছে শাঁখা৷ শাঁখা ছাড়া হিন্দু সম্প্রদায়ের কোন ধর্মীয় আচারভিত্তিক কর্মকান্ডই সুসম্পন্ন হয় না৷ হিন্দু নারীদের সধবা হওয়ার প্রতীকই হলো শাঁখা৷ পৌরানিক কাহিনীতে শাঁখার উত্পত্তি সম্পর্কে বলা হয়েছে- শঙ্খাসুরের স্ত্রী তুলসী দেবী ছিল ঈশ্বর নারায়ণে বিশ্বাসী খুবই সতীসাধ্বী নারী৷ কিন্তু শঙ্খাসুর ছিল ঈশ্বরবিমুখ অত্যাচারী৷ তার পাপের শাস্তিস্বরূপ তাকে ঈশ্বরের আদেশে হত্যা করে ভারত মহাসাগরে ভাসিয়ে দেয়া হয়৷ পতিব্রতা তুলসী তা সইতে না পেরে স্বামী এবং নিজের অমরত্বের জন্য ঈশ্বরের কাছে বিনীত প্রার্থনা করে৷ ঈশ্বর তার প্রার্থনা মঞ্জুর করে তার দেহভস্ম থেকে তুলসী গাছ এবং সমুদ্রে হত্যা করা স্বামীর রক্ত থেকে শঙ্খ বা শাঁখা উত্পত্তি করেন৷ এখানেই শেষ নয়, তুলসী দেবীর ধর্মপরায়ণতায় সন্তুষ্ট হয়ে ঈশ্বর তুলসী ও শাঁখাকে তাদের সম্প্রদায়ের ধর্মীয় কাজে ব্যবহারের আবশ্যকতা নির্ধারণ করে দেন৷ সেই থেকে পতিব্রতা তুলসীকে চিরস্মরণীয় করে রাখতে হিন্দু সম্প্রদায় তুলসী ও শাঁখার ব্যবহারের প্রচলন করে৷ এ কাহিনী সূত্রে বলা যায় খ্রীষ্টপূর্ব পাঁচ হাজার বছর আগে (মহাভারতের যুগে) শাঁখার ব্যবহার শুরম্ন হয়৷ হিন্দু সমাজে শান্তির প্রতীক, মঙ্গলের প্রতীক শাঁখার ব্যবহার বহুল প্রচলিত৷ তবে শাঁখা দিয়ে গড়া গহনা ও বাদ্যশঙ্খের ব্যবহার ছাড়া তাদের সামাজিকতা ও ধর্মীয় কার্যাদি অচল বলা চলে৷ বিবাহিত নারীদের তো বরের দেয়া শাঁখার বালা ধারণ করতেই হবে৷ আর পূজা-অর্চনা, সামাজিক, মাঙ্গলিক বা যেকোন শুভ অনুষ্ঠানে বাদ্য শঙ্খের ধ্বনি ছাড়া তা অসম্ভব বলেই ধরে নেয়া যায়৷
শাঁখের প্রকারভেদ
সাধারণত শাঁখা হয় বামাবর্তী, কিন্তু হাতে গোণা যে সব শঙ্খ দক্ষিণদিকে মুখ করা তাদের দক্ষিণাবর্তী শঙ্খ বলাহয়৷ সনাতন ব্রাহ্মণ্যধর্মে কিন্তু দক্ষিণাবর্তী শঙ্খের চাহিদা আর তার গুরুত্ব বেশ বেশি, এ ধরণের শঙ্খ খুব বেশি পাওয়া যায়না বলেই হয়ত৷ দক্ষিণাবর্তী শঙ্খ দেবী লক্ষ্মীর প্রতীক৷ আমরা যেন মনেরাখি ব্রাহ্মণ্য সাহিত্যে দক্ষিণ দিকটি সম্পদের দেবতা কুবেবের দিক, সে জন্যও হয়ত দক্ষিণবর্ত শঙ্খের দাম৷ সুপুরি থেকে বড় নারকেলের পরিমানমত হয়ে থাকে দক্ষিণাবর্তী শঙ্খ৷ আজকের বাজারে একটি সাধারণ দক্ষিণাবর্তী শঙ্খের দাম দেড় হাজার টাকা থেকে দুহাজার টাকা প্রতি গ্রাম, আবার দক্ষিণাবর্তী শঙ্খের দুধেলা প্রকারের দাম হয় গ্রাম প্রতি দু হাজার টাকাও৷ কখোনো আবার লক্ষণ, রং আর নানান উপাদানের উপর নির্ভর করে দাম ওঠে গ্রাম প্রতি দশহাজার টাকা পর্যন্তও৷ মাঝারি পরিমানের একটি দক্ষিণাবর্তী শঙ্খের দাম ওঠে প্রায় দশ থেকে পনের লাখ টাকা৷
ভারতে যেসব শঙ্খ ব্যবহার করা হয়, তার মধ্যে শঙ্খের ব্যবহার হয় দুভাবে ৷ আস্ত শঙ্খ আর কাটা শঙ্খ, যেখানথেকে তৈরি হয় শাঁখা, নানান শঙ্খজাত দ্রব্য৷ আস্ত শঙ্খ আবার ব্যবহার করা হয় দুভাবে৷ তার একটি বাদ্যশঙ্খ অন্যটি জলশঙ্খ৷ আর কাটা শঙ্খ দিয়ে হয় শাঁখা, আংটি, চুনসহ নানা উপকরণ৷
বাদ্যশঙ্খ : শ্রীলঙ্কা থেকে আসা শঙ্খ পরিষ্কার করে পেছনের অংশ কেটে বাদ্যশঙ্খ তৈরি করা হয়৷ এ শঙ্খ বিশেষ কায়দায় ধরে কাটা অংশ মুখে লাগিয়ে ফুঁ দিয়ে শব্দের সৃষ্টি করা হয়৷ এ শব্দকে বলা হয় মঙ্গলধ্বনি৷ পূজার আগে বা বিশেষ ক্ষণে বাদ্যশঙ্খ বাজিয়ে মঙ্গলধ্বনি দেওয়া হয়৷ প্রতিটি মন্দির অথবা হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ঘরে বাদ্যশঙ্খ একটি প্রয়োজনীয় উপকরণ৷
জলশঙ্খ : জলশঙ্খ অনেকটা বাদ্যশঙ্খের মতোই৷ তবে এতে জলশঙ্খের মতো পেছনের অংশ কাটা হয় না৷ আস্ত শঙ্খটিকে চিত করে রেখে তার মধ্যে জল রাখা হয়৷ জল রাখা হয় বলেই এর নাম জলশঙ্খ৷ জলশঙ্খের জল পূজার কাজে ব্যবহৃত হয়৷ হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা জলশঙ্খে রাখা জল গঙ্গার জলের মতোই পবিত্র মনে করেন৷ জলশঙ্খ মন্দিরে বা ঘরে একটি ত্রিপদের ওপর রাখা হয়৷
বাদ্যশঙ্খ ও জলশঙ্খ উভয়ের গায়ে নকশা করা থাকে৷ নকশা ছাড়া শঙ্খও ব্যবহার কম নয়৷
সাধারণত প্রতিটি শঙ্খে গায়ে দেখা যায় ফুল, লতাপাতার নকশা৷ বিশেষ কিছু শঙ্খের ওপর মা কালী, রাধা-কৃষ্ণ, দুর্গা প্রতিমার নকশাও দেখা যায়৷ দিনের পর দিন কাটাকাটি করে একটি শঙ্খের ওপর নকশা ফুটিয়ে তোলা হয়৷ নকশা করা প্রতিটি শঙ্খ বাংলার লোকশিল্পের অন্যতম উপাদান৷ শখের হাঁড়ি, কাঠের পুতুল, মনসার মঞ্জুষ, পাথরের তৈজস, শোলার কদম, লক্ষ্মী সরার মতোই নকশা করা শঙ্খ লোকশিল্পের উপাদান৷ ঐতিহাসিক কেদারনাথ মজুমদারের 'ঢাকার বিবরণ' (১৯১০) গ্রন্থে উল্লেখ হয়েছে সে সময় ঢাকার কারখানার জন্য শ্রীলঙ্কা ও আফ্রিকা থেকে তিন-চার লাখ টাকার শঙ্খ আমদানি করা হতো৷ শঙ্খগুলোর ছিল তিতকৌড়ি শঙ্খ (লঙ্কা দ্বীপ), পটী শঙ্খ (সেতুবন্ধ রামেশ্বর), ধলা শঙ্খ (সেতুবন্ধ রামেশ্বর), জাহাজী শঙ্খ (সেতুবন্ধ রামেশ্বর), গুড়বাকী (মাদ্রাজ), সরতী, দুয়ানী পটী (মাদ্রাজ), আলাবিলা শঙ্খ, জলী শঙ্খ (মাদ্রাজ)৷ শাঁখারিদের অর্থনৈতিক অবকাঠামো দাঁড়িয়ে আছে শঙ্খশিল্পের ওপর৷ শাঁখারিরা শঙ্খের অলঙ্কার তৈরির জন্য বেশ কয়েক প্রকারের শঙ্খ ব্যবহার করে৷ এগুলোর নাম আজকাল আর উল্লেখ পাওয়া য়ায না – আগেকার পুস্তক থেকে য়া পাওয়া গেল দিলাম - তিতপুটি, রামেশ্বরী, জামাইপাটি, পাঁজি, দোয়ানি, মতি ছালামত, পাটী, গায়বেশী, কাব্বাম্বী, ধনা, জাডকি, কলকো, নারাখাদ, খগা, তিতকৌড়ি, গড়বাকী, জাহানী, সুর্কীচোনা, সরতী, আলাবিলা প্রভৃতি৷ এসব শঙ্খের প্রাপ্তিস্থল শ্রীলঙ্কা, মাদ্রাজের উপকূল৷
লেবেলসমূহ:
Bengal,
Conch Shell Carving,
ConchBangles,
ConchShell,
FolkCommunity,
FolkCraft,
শাঁখ,
শাখা,
শাঁখারি
Friday, September 10, 2010
শাঁখ শাখার বারোমাস্যা - নাম্দীমুখ
(এই লেখাটি তৈরির পথে লোকফোক-এর বিশ্বেন্দু বহু মানুষের, বহু ওয়েবসাইটের, বহু সংবাদপত্রের পরামর্শ, সহায়তা, অকৃপণ ও অযাচিত আনুকূল্য নাভ করেছে৷ এই ক্ষুদ্র পরিসরে সকলের নাম বলা না গেলেও, এই লেখাটি দেখে অনেকই বুঝবেন তাদের হস্তবলেপনের তথ্য৷ সব্বাইকে ব্লগ আর কলাবতী মুদ্রার পক্ষথেকে প্রণাম, ভালবাসা আর শুভেচ্ছা)
প্রতিদিন সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে শাঁখা-সিঁদুর পরা একটা মেয়ে ঘরে জ্বালিয়ে দেয় সন্ধ্যাপ্রদীপ৷ উলুধ্বনি দিয়ে বাজায় শঙ্খ, প্রদীপ দেয় তুলসিমঞ্চে৷ পরিবারের প্রতি, স্বামীর প্রতি, স্বজনের প্রতি, নানান সম্পর্কের প্রতি মঙ্গল কামনায় প্রণাম করে এবং তার পরিবেশের প্রতি ভালবাসা আর শ্রদ্ধায় শাঁখা ছোঁয়ায় কপালে৷ প্রান্ত বাংলার গ্রামে গ্রামে লাখো লাখো বিবাহিত মেয়ে আজও তুলসি তলায় শাঁখা হাতে পরে প্রণাম দেয়৷ আমাদের বিবাহিত মেয়েটাও হাজার বছরের বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধরে রেখে দিতে চায় তার শাঁখা পরা হাতে তুলসি তলায় সান্ধ্য প্রণামের রোজকার আচারের মধ্যে৷
আগেরদিনই পুকুরঘাটে তার হাতের শাঁখা ভেঙেছে৷ পরিবার, স্বজনের অমঙ্গলের আশঙ্কায় দুরুদুরু করে ওঠে তার অন্তর৷ হাজার হাজার বছরের সংস্কারেরর বেড়ায় জুড়ে থাকা বিবাহিত স্ত্রীটিধনকে বেঁধে রাখা যায়নি৷ পরের দিনই সক্কাল সক্কাল আপিস যাবার পথে বরকে তাড়া দিয়েই সে নিয়ে গিয়েছে শহরের শাঁখারি বাজারে৷ সেখান থেকে সে প্রায় মনেরমত শাঁখা পরে এসেছে৷ দাম বেড়েছে, মন খারাপ৷ মনেরমত মকরমুখী শাঁখাটি পেতে তাকে গুণতে হয়েছে বেশ কয়েকশ টাকা৷ তবুও আগের ভেঙে যাওয়া শাঁখাটির ওপর করা কাজেরমত হয়নি৷ তবুও সন্তুষ্ট সে৷ বাড়িতে ফিরে নতুন মকরমুখী শাঁখাটিতে একটু সিঁদুর ছুঁইয়েই তার শান্তি৷ সেই সন্ধ্যায় তুলসিতলার পুজোটা আরও একটু গাঢ় হয়ে ওঠে তার৷
সকালে শাঁখারিবাজারের শাঁখা পরার উপাচারের পর সন্ধ্যায়ও মেয়েটার হাত তাই রীতিমতো লাল৷ দু বেলা চলে গিয়েছে, তবু তখনও প্রচণ্ড জ্বলছে হাতখানা৷ তার পরও তার মুখে হাসি৷ পরিবারের মঙ্গল কামনায় তার যত কষ্টই হোক, সে তা সইবে৷ সে জানে তার মা দিদিমা শ্বাশুড়িরাও এই ঐতিহ্যকে বুকে করে বেঁচেছেন, কৃষ্টি সজল চোখে তাদের দেখানো পথে সেও হাঁটতে চায়৷
বাংলার মফস্বলের শহরে শহরে শাঁখারীবাজারে গিয়ে চোখে জল আনা এমন নানান ঐতিহ্যবরণ চিত্র আজও এই শপিংমল সংস্কৃতির ভাঙাহাটে আদুরি সরারমত পরতে পরতে আনন্দে নীরবে খেলা করে চলে৷ বাংলার চিরাচরিত লৌকিক কৃষ্টির ঐতিহ্য মরেও যেন মরে না৷ শতাব্দের পর শতাব্দ মন্বন্তর, লুঠপাট, মারী, রাষ্ট্র বিপ্লব, ঝড়-জল-বণ্যা সয়ে সে তার রেশ টুকু ছড়িয়ে দিয়ে যায় প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে, যুগ থেকে যুগান্তরে, গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে৷ শুধু লৌকিক ধর্ম বিশ্বাসই নয, এই পশ্চিমি সংস্কৃতির পালতোলা সময়েও হাজার হাজার বছরের মাটির গন্ধ ভরা বাঙলিত্বের আঘ্রাণে মাখোমাখো বর্ণময় ভিন্ন ভিন্ন কৃতির সামাজিক-সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধরে রাখতে পেরেছেন বাংলার মেয়ে বউরা৷ বাংলার শহরে শহরে পুরনত্বতে ভরদিয়ে শাঁখারীবাজারের দোকানগুলো বাংলার মিষ্টি মিষ্টি এই ঐতিহ্যকে বিশ্বায়নের নানান ব্যবসায়িক টানা পোড়েনের মধ্যেও ধরে রেখে দিয়েছেন আগলে৷ পেটে প্রায় কিল মেরে শাঁখারিরা আজও নানান আনুষঙ্গিক ব্যবসার মুনাফার হাতছানি উপেক্ষা করে বাংলার এই অমর ঐতিহ্যকে শুধু বাপদাদার ব্যবসারূপেই নয়, বাংলার সংস্কৃতির অঙ্গ রূপেই বহন করে আসছেন৷ তাদের দোকানে বিবাহিত হিন্দু মেয়েরাই মূলত এই শাঁখা কিনতে আসেন৷ শাঁখা পরার অধিকার একমাত্র সধবা বিবাহিত মেয়েরাই৷ ভাঙাগড়ার দিনেও গ্রামের মেয়েদের হাতে শাঁখা আর মাথার সিঁদুরের ঐতিহ্যকে অজর অমর করে রেখেছেন এই শাঁখারিরা তাদের অপার লৌকিক ভালবাসায়৷
যে শাঁখা পরে বাঙালি বিবাহিত মেয়েরা তাদের দেশের ঐতিহ্য বহন করে চলেন, বিশেষজ্ঞরা বলেন, সেই শাঁখার রমরমা ব্যবসার শুরু নাকি ঢাকার শাঁখারি বাজার থেকে৷ মনেরাখতে হবে, বাংলার উপকূলে কিন্তু শাঁখা পাওয়া যায় না৷বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শাঁখারিরা নাকি এসেছিলেন বাংলার বাইরে থেকে – মাত্র কয়েক শতাব্দ আগে৷ অথচ শহরে-গ্রামের নানান লেখায়, কথকতায়, সাহিত্যে অমর হয়ে রয়েছে বাঙালি মেয়েদের শাঁখ আর শাখা৷
বুড়িগঙ্গার উত্তর পাড় থেকে তিনশ গজ দূরে দশ ফুট প্রশস্ত একটি গলিই ঢাকার প্রখ্যাত শাঁখারিবাজার৷ এপার বাংলায় আবার বিষ্ণুপুরের শাঁখার কদর দেশের প্রান্ত ছাড়িয়ে পৌঁছেছে বিদেশের বাজারে, তবুও পশ্চিম বাংলার জেলা শহরগুলো জুড়েই শাঁখারিপাড়ার মাদকতাময় সোঁদা গন্ধ৷ দুই বাংলারই নানান শহরের শাঁখারিবাজারের, শাঁখারিপাড়ার নানান গলির পুরোনো পুরোনা বাড়িঘরের কাঠামোর সঙ্গে শহরের অন্য অঞ্চলগুলোর কোনো মিল নেই৷ একই বাড়িতে বসত, কর্মগৃহ এবং দোকান৷ বাজারের ভেতর সারিবদ্ধভাবে অনেক বাড়িঘর এবং তার সামনে সাজিয়ে রাখা শাঁখারি দোকানের পসরা৷ রোদের আলো দোকানের ভেতরে প্রবেশ করে না৷ স্যাঁতস্যাঁতে ঘর, তার ভেতর শাঁখারিরা বসে শঙ্খের গহনা তৈরি করেন৷ শঙ্খ কাটার জন্য শাঁখের করাত লাগে৷ শঙ্খের মাঝামাঝি চিকন জলের ধারা পড়লে ইস্পাতের সঙ্গে ঘর্ষণ লেগে পুরো ঘর বাষ্পের আকার ধারণ করে৷ ফলে কাটায় শ্রমিকরা স্যাঁতসেঁতে ঘরে বসে কাজ করে৷ এ কারণে পুরুষ শিল্পীরা অনেক সময় গুল ও নেশা জাতীয় দ্রব্য গ্রহণ করে৷ পুরুষদের সঙ্গে নারী শ্রমিকরাও রয়েছেন৷ নারীরা সাধারণত শঙ্খ কাটার পর নকশা ও পলিশ করার কাজের সঙ্গে জড়িত থাকেন৷
সাধারণত আরো অনেক লোকশিল্প ও লোকশিল্পকেন্দ্রিক পেশাদার মানুষের বসবাস কিন্তু শাঁখারি এলাকায়৷ শাঁখারিদের পাশাপাশি মহল্লায় বাস তাঁতব্যবসায়ী, কাঁসারী, কাঠমিস্ত্রি, স্বর্ণকার, কুমারটুলী ইত্যাদি৷ এ বাংলার নানান শহরের শাঁখারি পাড়াগুলোর চেহারাও কিন্তু খুব একটা পার্থক্য নেই, শহরের অন্যান্য পাড়াগুলো যখন বেড়ে চলছে পশ্চিমি ঢংএ তখন এধরনের ঐতিহ্যমণ্ডিত পুরোনো লৌকিক শিল্পীঅধ্যুষিত পাড়াই যেন উন্নয়ণের সঙ্গে তাল মেলাতে না পেরে নিজস্বতা আঁকড়ে বিদ্রোহীরমত মাথাতুলে দাঁড়িয়ে৷
তবে শাঁখা এখন ফ্যাশনও৷ সব সম্প্রদায়ের মেয়েরাই ব্যবহার করে শাঁখা৷ শহরে শহরে শাঁখারীবাজারে বেশ কয়েকটা দোকান আছে শাঁখার৷ তাই বেশ ঘুরে ঘুরে, যাচাই-বাছাই করে শাঁখা কিনতে পারেন ক্রেতারা৷ বাংলার অন্যান্য ব্যবসায়ীদেরমতই আজও শুধু ঢাকার শাঁখারিবাজারের দোকানিরা নয়, এ বাংলার শহরগুলোর প্রায সব শাঁখারিবাজারের শিল্পীরা ক্রেতাকে দেবতা মনে করেন৷ ফলে সমাদরটা একটু বেশিই পান ক্রেতারা৷
প্রতিদিন সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে শাঁখা-সিঁদুর পরা একটা মেয়ে ঘরে জ্বালিয়ে দেয় সন্ধ্যাপ্রদীপ৷ উলুধ্বনি দিয়ে বাজায় শঙ্খ, প্রদীপ দেয় তুলসিমঞ্চে৷ পরিবারের প্রতি, স্বামীর প্রতি, স্বজনের প্রতি, নানান সম্পর্কের প্রতি মঙ্গল কামনায় প্রণাম করে এবং তার পরিবেশের প্রতি ভালবাসা আর শ্রদ্ধায় শাঁখা ছোঁয়ায় কপালে৷ প্রান্ত বাংলার গ্রামে গ্রামে লাখো লাখো বিবাহিত মেয়ে আজও তুলসি তলায় শাঁখা হাতে পরে প্রণাম দেয়৷ আমাদের বিবাহিত মেয়েটাও হাজার বছরের বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধরে রেখে দিতে চায় তার শাঁখা পরা হাতে তুলসি তলায় সান্ধ্য প্রণামের রোজকার আচারের মধ্যে৷
আগেরদিনই পুকুরঘাটে তার হাতের শাঁখা ভেঙেছে৷ পরিবার, স্বজনের অমঙ্গলের আশঙ্কায় দুরুদুরু করে ওঠে তার অন্তর৷ হাজার হাজার বছরের সংস্কারেরর বেড়ায় জুড়ে থাকা বিবাহিত স্ত্রীটিধনকে বেঁধে রাখা যায়নি৷ পরের দিনই সক্কাল সক্কাল আপিস যাবার পথে বরকে তাড়া দিয়েই সে নিয়ে গিয়েছে শহরের শাঁখারি বাজারে৷ সেখান থেকে সে প্রায় মনেরমত শাঁখা পরে এসেছে৷ দাম বেড়েছে, মন খারাপ৷ মনেরমত মকরমুখী শাঁখাটি পেতে তাকে গুণতে হয়েছে বেশ কয়েকশ টাকা৷ তবুও আগের ভেঙে যাওয়া শাঁখাটির ওপর করা কাজেরমত হয়নি৷ তবুও সন্তুষ্ট সে৷ বাড়িতে ফিরে নতুন মকরমুখী শাঁখাটিতে একটু সিঁদুর ছুঁইয়েই তার শান্তি৷ সেই সন্ধ্যায় তুলসিতলার পুজোটা আরও একটু গাঢ় হয়ে ওঠে তার৷
সকালে শাঁখারিবাজারের শাঁখা পরার উপাচারের পর সন্ধ্যায়ও মেয়েটার হাত তাই রীতিমতো লাল৷ দু বেলা চলে গিয়েছে, তবু তখনও প্রচণ্ড জ্বলছে হাতখানা৷ তার পরও তার মুখে হাসি৷ পরিবারের মঙ্গল কামনায় তার যত কষ্টই হোক, সে তা সইবে৷ সে জানে তার মা দিদিমা শ্বাশুড়িরাও এই ঐতিহ্যকে বুকে করে বেঁচেছেন, কৃষ্টি সজল চোখে তাদের দেখানো পথে সেও হাঁটতে চায়৷
বাংলার মফস্বলের শহরে শহরে শাঁখারীবাজারে গিয়ে চোখে জল আনা এমন নানান ঐতিহ্যবরণ চিত্র আজও এই শপিংমল সংস্কৃতির ভাঙাহাটে আদুরি সরারমত পরতে পরতে আনন্দে নীরবে খেলা করে চলে৷ বাংলার চিরাচরিত লৌকিক কৃষ্টির ঐতিহ্য মরেও যেন মরে না৷ শতাব্দের পর শতাব্দ মন্বন্তর, লুঠপাট, মারী, রাষ্ট্র বিপ্লব, ঝড়-জল-বণ্যা সয়ে সে তার রেশ টুকু ছড়িয়ে দিয়ে যায় প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে, যুগ থেকে যুগান্তরে, গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে৷ শুধু লৌকিক ধর্ম বিশ্বাসই নয, এই পশ্চিমি সংস্কৃতির পালতোলা সময়েও হাজার হাজার বছরের মাটির গন্ধ ভরা বাঙলিত্বের আঘ্রাণে মাখোমাখো বর্ণময় ভিন্ন ভিন্ন কৃতির সামাজিক-সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধরে রাখতে পেরেছেন বাংলার মেয়ে বউরা৷ বাংলার শহরে শহরে পুরনত্বতে ভরদিয়ে শাঁখারীবাজারের দোকানগুলো বাংলার মিষ্টি মিষ্টি এই ঐতিহ্যকে বিশ্বায়নের নানান ব্যবসায়িক টানা পোড়েনের মধ্যেও ধরে রেখে দিয়েছেন আগলে৷ পেটে প্রায় কিল মেরে শাঁখারিরা আজও নানান আনুষঙ্গিক ব্যবসার মুনাফার হাতছানি উপেক্ষা করে বাংলার এই অমর ঐতিহ্যকে শুধু বাপদাদার ব্যবসারূপেই নয়, বাংলার সংস্কৃতির অঙ্গ রূপেই বহন করে আসছেন৷ তাদের দোকানে বিবাহিত হিন্দু মেয়েরাই মূলত এই শাঁখা কিনতে আসেন৷ শাঁখা পরার অধিকার একমাত্র সধবা বিবাহিত মেয়েরাই৷ ভাঙাগড়ার দিনেও গ্রামের মেয়েদের হাতে শাঁখা আর মাথার সিঁদুরের ঐতিহ্যকে অজর অমর করে রেখেছেন এই শাঁখারিরা তাদের অপার লৌকিক ভালবাসায়৷
যে শাঁখা পরে বাঙালি বিবাহিত মেয়েরা তাদের দেশের ঐতিহ্য বহন করে চলেন, বিশেষজ্ঞরা বলেন, সেই শাঁখার রমরমা ব্যবসার শুরু নাকি ঢাকার শাঁখারি বাজার থেকে৷ মনেরাখতে হবে, বাংলার উপকূলে কিন্তু শাঁখা পাওয়া যায় না৷বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শাঁখারিরা নাকি এসেছিলেন বাংলার বাইরে থেকে – মাত্র কয়েক শতাব্দ আগে৷ অথচ শহরে-গ্রামের নানান লেখায়, কথকতায়, সাহিত্যে অমর হয়ে রয়েছে বাঙালি মেয়েদের শাঁখ আর শাখা৷
বুড়িগঙ্গার উত্তর পাড় থেকে তিনশ গজ দূরে দশ ফুট প্রশস্ত একটি গলিই ঢাকার প্রখ্যাত শাঁখারিবাজার৷ এপার বাংলায় আবার বিষ্ণুপুরের শাঁখার কদর দেশের প্রান্ত ছাড়িয়ে পৌঁছেছে বিদেশের বাজারে, তবুও পশ্চিম বাংলার জেলা শহরগুলো জুড়েই শাঁখারিপাড়ার মাদকতাময় সোঁদা গন্ধ৷ দুই বাংলারই নানান শহরের শাঁখারিবাজারের, শাঁখারিপাড়ার নানান গলির পুরোনো পুরোনা বাড়িঘরের কাঠামোর সঙ্গে শহরের অন্য অঞ্চলগুলোর কোনো মিল নেই৷ একই বাড়িতে বসত, কর্মগৃহ এবং দোকান৷ বাজারের ভেতর সারিবদ্ধভাবে অনেক বাড়িঘর এবং তার সামনে সাজিয়ে রাখা শাঁখারি দোকানের পসরা৷ রোদের আলো দোকানের ভেতরে প্রবেশ করে না৷ স্যাঁতস্যাঁতে ঘর, তার ভেতর শাঁখারিরা বসে শঙ্খের গহনা তৈরি করেন৷ শঙ্খ কাটার জন্য শাঁখের করাত লাগে৷ শঙ্খের মাঝামাঝি চিকন জলের ধারা পড়লে ইস্পাতের সঙ্গে ঘর্ষণ লেগে পুরো ঘর বাষ্পের আকার ধারণ করে৷ ফলে কাটায় শ্রমিকরা স্যাঁতসেঁতে ঘরে বসে কাজ করে৷ এ কারণে পুরুষ শিল্পীরা অনেক সময় গুল ও নেশা জাতীয় দ্রব্য গ্রহণ করে৷ পুরুষদের সঙ্গে নারী শ্রমিকরাও রয়েছেন৷ নারীরা সাধারণত শঙ্খ কাটার পর নকশা ও পলিশ করার কাজের সঙ্গে জড়িত থাকেন৷
সাধারণত আরো অনেক লোকশিল্প ও লোকশিল্পকেন্দ্রিক পেশাদার মানুষের বসবাস কিন্তু শাঁখারি এলাকায়৷ শাঁখারিদের পাশাপাশি মহল্লায় বাস তাঁতব্যবসায়ী, কাঁসারী, কাঠমিস্ত্রি, স্বর্ণকার, কুমারটুলী ইত্যাদি৷ এ বাংলার নানান শহরের শাঁখারি পাড়াগুলোর চেহারাও কিন্তু খুব একটা পার্থক্য নেই, শহরের অন্যান্য পাড়াগুলো যখন বেড়ে চলছে পশ্চিমি ঢংএ তখন এধরনের ঐতিহ্যমণ্ডিত পুরোনো লৌকিক শিল্পীঅধ্যুষিত পাড়াই যেন উন্নয়ণের সঙ্গে তাল মেলাতে না পেরে নিজস্বতা আঁকড়ে বিদ্রোহীরমত মাথাতুলে দাঁড়িয়ে৷
তবে শাঁখা এখন ফ্যাশনও৷ সব সম্প্রদায়ের মেয়েরাই ব্যবহার করে শাঁখা৷ শহরে শহরে শাঁখারীবাজারে বেশ কয়েকটা দোকান আছে শাঁখার৷ তাই বেশ ঘুরে ঘুরে, যাচাই-বাছাই করে শাঁখা কিনতে পারেন ক্রেতারা৷ বাংলার অন্যান্য ব্যবসায়ীদেরমতই আজও শুধু ঢাকার শাঁখারিবাজারের দোকানিরা নয়, এ বাংলার শহরগুলোর প্রায সব শাঁখারিবাজারের শিল্পীরা ক্রেতাকে দেবতা মনে করেন৷ ফলে সমাদরটা একটু বেশিই পান ক্রেতারা৷
লেবেলসমূহ:
Bengal,
Conch Shell Carving,
ConchBangles,
ConchShell,
FolkCommunity,
FolkCraft,
শাঁখ,
শাখা,
শাঁখারি
Thursday, May 7, 2009
Shankha
Shankha (conch bangles) made of conch shell are worn by Hindu women as ornaments at their weddings as a religious rite. During recitation of wedding hymns, the father or guardian of the bride gives her a pair of conch bangles. The groom also brings a pair for her. Hindu women wear conch bangles with utmost devotion seeking wellbeing of their husbands. Use of broken or cracked bangles is ominous. Wearing conch bangles on her person is symbolic of the purity of a woman's love for her husband. Common conch shells bear an anti-clockwise bend. A clockwise bend on it makes a shell very precious and is regarded as dakhshinbarta or fortune conch. In religious sense this conch is holy. Lord Vishnu holds such a conch in his hand.
Shapewise, the shells are known as lotus conch (held by Vishnu), blow conch (used for blowing at temples), water conch (used for offerings by devotees), cow-face conch (unfit for religious use) and common conch.
The conch bangle makers of Shankharipatti in various deitricts are traditionally dexterous in this handicraft. In the past, many of them used to make conch ornaments during their idle time. Many are still engaged in the art of engraving conches. Rings of various sizes are made cutting the common and cow-face conches by a special type of saw. The craftsman works with deep attention using a rasp or dao sitting on the ground holding the ring with an easel made of three wood pieces. The rings are made smooth by rubbing against stone and then various designs are engraved on their surfaces. The motifs are the product of traditional beliefs, rites and rituals. The conch bangles are decorated with about 25 types of engravings. Lotus bud, lily petal, buds of wild flowers, sheaf of paddy and shape of jasmine are among the common designs. The joints of the bangles are neatly done and covered with engravings so as to make them invisible.
The designs crafted on the bangles to please the wealthy families are indeed very attractive. Designs of fish, Capricorn, butterfly, pitcher, chillum, lotus bud, paddy sheaf; leaf of marigold, parakeet and bamboo line are crafted on these bangles. According to designs these are called banshrekhi (bamboo-lined), karnishdar (arched), khayesha (desired), bachhadar (select), phultaranga (waving flower), diamond karya (diamond work), makarchehara (Capricorn face), rangeela (colored), Ram-Lakshman (holy brothers), paddy sheaf and padmakali (lotus bud). For the use of common people the low-priced conch bangles are decorated with water flowers. Use of gold wire is also in practice in making more expensive bangles.
Shapewise, the shells are known as lotus conch (held by Vishnu), blow conch (used for blowing at temples), water conch (used for offerings by devotees), cow-face conch (unfit for religious use) and common conch.
The conch bangle makers of Shankharipatti in various deitricts are traditionally dexterous in this handicraft. In the past, many of them used to make conch ornaments during their idle time. Many are still engaged in the art of engraving conches. Rings of various sizes are made cutting the common and cow-face conches by a special type of saw. The craftsman works with deep attention using a rasp or dao sitting on the ground holding the ring with an easel made of three wood pieces. The rings are made smooth by rubbing against stone and then various designs are engraved on their surfaces. The motifs are the product of traditional beliefs, rites and rituals. The conch bangles are decorated with about 25 types of engravings. Lotus bud, lily petal, buds of wild flowers, sheaf of paddy and shape of jasmine are among the common designs. The joints of the bangles are neatly done and covered with engravings so as to make them invisible.
The designs crafted on the bangles to please the wealthy families are indeed very attractive. Designs of fish, Capricorn, butterfly, pitcher, chillum, lotus bud, paddy sheaf; leaf of marigold, parakeet and bamboo line are crafted on these bangles. According to designs these are called banshrekhi (bamboo-lined), karnishdar (arched), khayesha (desired), bachhadar (select), phultaranga (waving flower), diamond karya (diamond work), makarchehara (Capricorn face), rangeela (colored), Ram-Lakshman (holy brothers), paddy sheaf and padmakali (lotus bud). For the use of common people the low-priced conch bangles are decorated with water flowers. Use of gold wire is also in practice in making more expensive bangles.
লেবেলসমূহ:
ConchBangles,
ConchShell,
FolkArt,
FolkCommunity,
FolkCraft,
Shankha
Subscribe to:
Posts (Atom)