Showing posts with label ম্যাক্স মুলার. Show all posts
Showing posts with label ম্যাক্স মুলার. Show all posts

Friday, July 20, 2018

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা৪ - বিজ্ঞান ও খবরদারি - উপনিবেশ এবং উপনিবেশ উত্তর ভারতে

রাজেশ কোছার
তখন ১৯২২। আর মাত্র ২৫ বছর বাকি বঙ্গ আর পাঞ্জাবভঙ্গে। রমন The acoustical knowledge of the ancient Hin শীর্ষক প্রবন্ধে লিখলেন It would form a fascinating chapter of history to try and trace the gradual development of musical instruments and musical knowledge, from the rhythmic chanting of the Rigveda in the ancient home of the Aryan race to the Indian music of the present day। এটা কিন্তু তাঁর প্রবন্ধের মুল বিষয় ছিল না, একটা হাল্কা মন্তব্য শুধু। এর থেকে একটা বিষয় প্রমানিত যে আর্যতার দাবি সে যময় উচ্চবর্ণের মনের মধ্যে প্রাতিষ্ঠা পেয়ে গেঁথে বসেছে।
মহেন্দ্রলাল প্রথম স্বচ্ছল সুবিধেপ্রাপ্ত সমাজের ভারতীয় প্রতিনিধি যিনি নিজের কার্জ উদ্ধারে আর্যতত্ত্বকে ব্যবহার করলেন। তিনি ছিলেন British Association for the Advancement of Scienceএর ভারতীয় আজন্ম প্রতিনিধি, যারা এ সম্বন্ধে লিখছিল। ১৮৬৯ সালে তিনি নিজের Calcutta Journal of Medicine পত্রিকায় লিখলেন, On the desirability of a national institution for the cultivation of the Sciences by the Natives of India। এই প্রবন্ধটা পরে পুস্তিকা হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে এবং কিছু কিছু জায়গায় উদ্ধৃতি হিসেবে ব্যবহৃতও হয়েছে। এই লেখাটা যতটা বেশি প্রচার হওয়া দরকার ছিল ততটা হয় নি।
মহেন্দ্রলাল দেশিয় সমস্যার সমাধান করলেন ম্যাক্ষমূলারের পথ ধরে। তিনি লিখলেন, The Hindu mind, thanks to this religion which has been swaying it for centuries without number, and thanks no less to its other surroundings, has lost much of its original Aryan vigor and energy। তার নিদান হল, the only method... by which the people of India can be essentially improved, by which the Hindu mind can be developed to its full pro- portions is ... by the cultivation of the Physical Sciences।
তাঁর উদ্যমে মহেন্দ্রলাল ব্রিটিশ সমাজের থেকে সাহায্য প্রত্যাশা করলেন উচ্চাভিলাষী প্রয়োজনে ... thanks to the current of inherent generosity that flows through every British heart, some obstacle or other is being removed, that stood in the way of our being recognized as brethren, though now fallen and degraded’. ‘She [England] has become aware that her true glory should consist not in simply holding under subjugation the people of India, but in elevating them in the scale of nations, in taking them by the hand and reconciling them to their long-alienated brethren, her own children।
পতিত এবং আত্মসম্মান হারানো ভাইএরা সাহায্য গ্রহীতার হাত বাড়িয়ে দিল। হিন্দু কলেজ তৈরিতে তিনি বিখ্যাত ব্যক্তির হাত ছিল রামমোহন রায়, অসরকারি ইওরোপিয় ডেভিড হিউম এবং উচ্চাধিকারী ব্রিটিশ আমলাকলকাতার সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি এডওয়ার্ড হাইড। একইভাবে গড়ে উঠেছিল কাল্টিভেশন অব সায়েন্স বেলজিয়ান জেসুইট পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক ইউজিন লাফোঁ, বাংলার লেফতানেন্ট গভর্নর রিচার্ড টেম্পল। অবস্থান, সময় সব কিছুর পরিবর্তন ঘটে গিয়েছে। সে সময় প্রধান বিচারপতি মূল উদ্যোক্তা ছিলেন, আজ বাংলার প্রশাসক জনগণের চাপে নিমরাজি হয়ে বাধ্য হয়েছেন সমিতিতে থাকতে।
১৮৭৫ সালে টেম্পল মহেন্দ্রলালকে লিখলেন একটি পলিটেকনিক (আজকের দিনের ভাষায়) তৈরি করার উদ্যোগ নিতে - But science also may be made to add immeasureably to the national wealth and so’ to afford lucrative employment to numberless persons according to their qualifications and acquirements। এরসঙ্গে তিনি জুড়ে দিলেন কোন কোন পেশা এই শিক্ষা ব্যবস্থায় ঢুকতে পারে তারমধ্যে ছিল ভূমি আর ভূতত্ত্ব সমীক্ষা, অসামরিক ইঞ্জিনিয়ারিং, মেকানিক্স, বনবিদ্যা, কাঠ আর পাথর শিল্পী। তিনি আরও লিখলেন, Moreover, by these means not only will many new industries be introduced into Bengal, but almost every one of the old established art, and manufacturers of the country may be rendered more useful and remunerative than at present।
আজ ১৮৭৫ সালের এই তত্বকে বলতে পারি গ্রাম বাংলার প্রযুক্তিকে ধ্বংস করে লুঠেরা আধুনিক বিদ্যুৎ নির্ভর প্রযুক্তির দিকে যাত্রার প্রথম তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক নির্দেশাবলী। বাংলার লেফটানেন্ট গভর্নর ভারতের ভাইসরয়কে একটি চিঠ লিখে জানালেন ভারতজুড়ে ক্ষোভ বাড়ছে কেননা, partly from our higher education being too much in the direction of law, public administration, and prose literature But we shall do more and more to direct their thoughts towards practical science, where they must inevitably feel their utter inferiority to us।
আমাদের ধারণা টেম্পল ভারতের বিপুল কারিগরদের কথা এখানে উল্লেখ করতে চেয়েছেন যাদের ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ইওরোপে শিল্পায়নের জন্য ধ্বংসের মুখে ফেলে দিয়েছিল। তারা এই প্রস্তাবে কানই দিল না – স্রেফ উপেক্ষাই করল।
উল্টোদিকে বিপুল আলালের দল, যারা পলাশীর পরের লুঠের অংশিদার ছিল, যে অংশিদারিতে পরের দিকে ব্রাহ্মণেরাও ঢুকে গোটা ব্যবস্থাটা দখল করে নেবে, তারা শঙ্কিত হয়ে পড়ল, সাম্রাজ্যের ক্ষমতার অংশ আবার তাদের হয়ত ভাগ করে নিতে হবে।
রাজেশ কোছারের Science and domination: India before and after independence প্রবন্ধ থেকে

Sunday, March 4, 2018

পশ্চিমি সামরিক বিজ্ঞান-প্রযুক্তির ইতিহাস২ - লুঠের উপনিবেশের আধিপত্যের ইতিহাস - ভদ্রবৃত্তের পশ্চিম দাসত্বের ইতিহাস

আধুনিক লুঠেরা প্রযুক্তির সহায়তায় পশ্চিম প্রায় সারা পৃথিবী দখল করে বসল। তার এবং তার ক্ষমতা সামলানো উপনিবেশের বন্ধুদের যুক্তি, আধুনিক বিজ্ঞান মানেই অগ্রগতি আর আধুনিকতা। শিল্প সাহিত্যে আধুনিকতা আর অগ্রগতির তত্ত্বকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে রোমান্টিসাইজ করে মধ্যবিইত্ত সমাজে পেশ করা হতে থাকল বছরের পর বছর ধরে। ঠিক সেই চক্করে তৈরি হল ওরিয়েন্টালিজম নামক একটি আধসেদ্ধ তত্ত্ব, যে তত্ত্বে আজও ঔপনিবেশইক বামেরা বেতর, যার ঘোমটা খুলে দিয়েছিলেন অবাম-এডওয়ার্ড সঈদ মশাই। আমরা হয়ত নানাভাবে আজকে দাঁড়িয়ে সঈদের তত্ত্বের নানান ফাঁকফোঁকর খুঁজে পাব ঠিকই, কিন্তু এই প্রাচ্যবাদকে হাতিয়ার করে আজও প্রাচ্যের ওপরে পশ্চিমের ঔপনিবেশিক নিগড়ের সমর্থন তৈরি হয়। ওরিয়েন্টালিজম বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন রূপধরেছে সাম্রাজ্যবাদের প্রয়োজন ভিত্তি করে।
একটা বিশেষ লব্জ এখানে আলোচ্য, সেটি হল বিদেশিদের ফিরঙ্গি ডাক। মুঘল আমলে ফিরঙ্গি বলতে মধ্য এশিয়ায় আসা ইওরোপিয় মানুষ বোঝাত। আর ধর্মযুদ্ধের সময় গোটা মুসলমান বিশ্বে ইওরোপিয়দের ডাকা হত ফ্রাঙ্ক নামে – যা আদতে ফরাসীদের এমধ্যেশিয়ার নাম। সেই শব্দটা আমরা আত্তীকরণ করে নিলাম। এর থেকে একটা বিষয় পরিষ্কার হয়ে যায় ইওরোপ আর ইসলাম তার হাজার বছরের লড়ায়ের স্মৃতি ভোলে নি। কিন্তু ব্রিটিশরা ভারতে তাদের সাম্রাজ্যবাদী প্রকল্পে হাত দিয়েই ভারতের ভদ্রবিত্ত(তখন সকলে বামুন ছিল না, ধনী আজকের ভাষায় ওবিসিও ছিল) জনগনকে ইন্দো-ইওরোপিয় সমাজে টেনে নিল। ইসলামের উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে ক্ষমতার দিকে হাত বাড়ানো অমুসলমান নিজেকে ইওরোপের পায়ে সঁপে দিল।
বিজ্ঞানের ব্রাহ্মণীকরণ
রামমোহন রায় সরাসরি সংস্কৃতের বদলে ইংরেজি পড়াতে সাম্রাজ্যকে অনুরোধ করলেন, কেননা তাতে পাশ্চাত্যের জ্ঞান বিজ্ঞান বিষয়ে মানুষ জানতে পারবে, এবং the improvement of the native population হবে, যা a more liberal and enlightened system of instruction, embracing mathematics, nature philosophy, chemistry and anatomy, with other useful sciences ... by employing a few gentlemen of talents and learning educated in Europe বাংলা তার দূরতম ভাবনাতেও ছিল না। ১৮৩৫ সালে অন্ধ্রতে কলন বিদ্যা পড়ানো হচ্ছে, যা তখনও ইওরোপে ততটা চালুই হয়নি, তার অনুসন্ধান করা হল না। ততদিনে রথসচাইল্ডদের বিনিয়োগে, ফ্রিম্যাসন আর শিক্ষিত বাঙালিদের উদ্যোগে কলকাতায় ১৮১৭ সালে হিন্দু কালেজ তৈরি হয়ে গিয়েছে। রামমোহনের আবেদনের বারো বছর পরে সাম্রাজ্যেরে তাত্ত্বিক মেকলে ইংরেজকে শিক্ষার আবশ্যিক ভাষা হিসেবে ঘোষণা করলেন। যে প্রথা আজও চলছে এবং দিনে দিনে ভদ্রবৃত্তেরা তার দাসত্ব করছে আরও বেশি করে।
এই শিক্ষাকেন্দ্রগুলি থেকে প্রাথমিকভাবে প্রচুর সংখ্যায় মাথামোড়ানো শিক্ষিতরা বেরোলেন। সক্কলে ইওরোপিয় জ্ঞানবিজ্ঞানের অনুগামী হলেন। এদের মধ্যে অন্যতম মহেন্দ্রলাল সরকার, যিনি প্রথম পশ্চিমি বিজ্ঞান প্রযুক্তি পড়ানোর জন্য ইন্ডিয়ান এসোসিয়েশন অব কাল্টিভেশন অব সায়েন্স তৈরি করলেন ১৮৭৬ সালে, কংগ্রেসের পূর্বসূরী ইন্ডিয়ান এসোসিয়েশনের সক্রিয় সহযোগিতায়। এটি স্থাপনের ৫০ বছর পর আমরা দেখতে পাব রমনের নোবেল পাওয়ার কেন্দ্রর গবেষণাগার হিসেবে চিহ্নিত হবে – যা আদতে এই কেন্দ্রটি স্থাপনের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল।
ম্যাক্সমুলারের আর্যতত্ত্ব(এবং তার বিরোধীদের অনার্য তত্ত্ব) ভদ্রবৃত্তের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হল ব্রিটিশদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের প্রক্রিয়ায়। ১৮৭৭তে কেশবচন্দ্র ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ভগবানের উদ্দিষ্ট কর্ম দাগিয়ে দিয়ে সরাসরি রাণীর অনুগামী হলেন। তিনি শিক্ষতদের বার্তা দিয়ে বললেন, হে ভাই শিক্ষিতজনগণ, British government that came to your rescue, as God’s ambassador, when your country was sunk in ignorance and superstition and hopeless jejuneness, and has since lifted you to your present high position.ম্যাক্সমূলারের তত্ত্ব অবলম্বন করে জানালেন, India in her present fallen condition seems destined to sit at the feet of England for many long years to learn Western art and science ... Thus while we learn modern science from England, England learns ancient wisdom from India. Gentlemen, in the advent of the English nation in India we see a re-union of parted cousins, the descendents of two different families of the ancient Aryan race। ম্যাক্সমুলার ব্রাহ্মদের চার্চ অব ইংলন্ডের সদস্য হতে বললেন। ভদ্রবৃত্তের ইওরোপের শ্রীপদপ্রান্তে আশ্রয় নেওয়ার দাসত্ব পথ সম্পূর্ণ হল।

Monday, October 30, 2017

ইওরোপ পদপ্রান্তে লুঠের কাজে দক্ষ - ছোটলোক কৃষ্টি অর্থনীতি নিধনে বিশেষজ্ঞ - ভদ্র ইংরেজিশিক্ষিত বাঙ্গালি চিরজীবি হোক

কিভাবে উন্নয়ন নামক উপনিবেশ শহুরেদের মাথায় বাসা বাঁধে তার উদাহরণ দিতে আমরা অনুবাদ শুরু করেছি এসকোবারের এনকাউন্টারিং ডেভেলাপমেন্টঃ দ্য মেকিং এন্ড আন্মেকিং অব দ্য থার্ড ওয়ার্লড বইটি। কিন্তু উন্নয়ন বিষয়ে আমরা ছোটলোকেরা যা বলছি বহুকাল ধরে তা আবার এই মুহূর্তে বলা গেল Dipankarদার তাড়নায়।

তৃতীয় বিশ্বে এসে প্রথমে মেকলে-ট্রেভলিয়ান-মূলার, পরে মার্ক্স বুঝিয়ে দিলেন এই উপনিবেশের ইংরেজি শিক্ষিত গাণ্ডুরা, যারা এখনও পরম্পরা থেকে বেরোতে পারে নি - নিজের দেশ সম্বন্ধে যা ভাবে তা ঠিক নয়, ইওরোপিয় জ্ঞানচর্চা যা বলে দেবে সেটাই আপ্ত বাক্য হবে।

মার্ক্স ভারতের/বাংলার গাঁইয়াদের সম্বন্ধে তার যৌবনে যে সব অমার্জনীয় অশ্লীল উক্তি করেছিলেন, তার জন্য কোন দিন ক্ষমা চান নি, বা বলেন নি, ভুল বলেছেন।

আর মেকলে, ট্রেভলিয়ান খিস্তি করলেন ইংরেজ শিক্ষিতিদের, কি করে ইংরেজি শিক্ষিত ভদ্রলোকেরা সুসভ্য ইংরেজ জাতির কাছে শিক্ষিত হয়েও, দেশের এই অজ্ঞ, অদক্ষ, অশিক্ষিতদের সঙ্গে বাস করে, তা তাদের মাথায় ঢোকেনা। শিক্ষিতদের নবজাগরণীয়দের মধ্যে নিজের কৃষ্টি, সমাজ অর্থনীতি সম্বন্ধে হীনমন্যতা জাগল। ঠিক যে রকমভাবে স্বাধীনতার পরে ইওরোপ আমেরিকা যখন বলত(আজও বলে) এই বিপুল সংখ্যার অশিক্ষিতকে নিয়ে কি করে দেশ নতুন সহস্রাব্দে ভারত যাবে, তার প্রতিক্রিয়ায় বাম ডান মধ্যরা দেশ জুড়ে নানান ধরণের শিক্ষা কেন্দ্র খুলতে লাগল - কেউ বলল না প্রথাগত বিদ্যার বাইরে জ্ঞান আর শিখাটাও শিক্ষা - কারণ প্রথাগত শিক্ষা মানুষকে কর্পোরেট অনুগামী করায় - তাই প্রথাগত শিক্ষায় রাষ্ট্র আর স্বেচ্ছাসেবিদের এই জোর। আজও এই সাম্রাজ্য আর ঔপনিবেশিকতাবাদ কোন শিক্ষিতর মাথা থেকে যায় নি।

ম্যাক্সমুলার এলেন স্তুতির বকলমে খিস্তির বন্যা নিয়ে। বললেন আর্যরা এ দেশে সভ্যতা নিয়ে এসেছিল বেদ লিখে, তারপর তারা চলে যাওয়ায় দেশ অন্ধকারে ডুবে যায়। বর্তমান সময়ে ইংরেজরা এসেছে নতুন আলোর সভ্যতা নিয়ে। তারাই তো সে দিনের আর্য, তারা আদতে ভারতীয়, তারা আবার এসেছে ভারত উদ্ধারে - এদের বিরুদ্ধে তোমরা বলছ কেন? এরাই ত তোমাদের পুরনো রাজা, তোমাদের আবার সভ্য করতে এসেছে, এদের অনুগামী হও, সভ্য হও।

মার্ক্স বললেন ব্রিটিশ ভারত ধ্বংস করে দারুণ কাজ করেছে, এটা খারাপ, অমার্জনীয় অপরাধ হলেও বাঞ্ছনীয় কর্ম, দেশে বিপ্লব এল বলে, ভদ্রদের ক্ষমতায় আসা সময়ের ব্যাপার।
---
মার্ক্স, মেকলে-ট্রেভলিয়ান আর ম্যাক্ষ্মূলরের ত্রহোস্পর্শে ইওরোপিয় ভদ্র-মধ্যবিত্তের দেশ লুঠ, দেশ ঘেন্নার দীক্ষা লাভ শুরু।

ফলে যা কিছু দেশিয় তার সবই ত্যজ্য - যা কিছু ইওরোপিয় নিদান তার সব কিছুই না হলেও অধিকাংশই মাথা নামিয়ে গ্রাহ্য - নিয়মমাফিক কিছু কিছু ছদ্ম বিরোধতা চালিয়ে যেতে হয়।

আমরা ছোটলোকেরা উল্টোটা বললাম। ইওরোপ তো সেদিনের যোগী। আড়াইশ বছরেই তারা বিশ্বেকে ধ্বংসের মুখোমুখি এনে ফেলেছে। কিন্তু সারা বিশ্বে প্রায় একচেটিয়া ব্যবসা চালিয়েও বাংলার কারিগর আর চাষী প্রচুর সামাজিক সম্পদ রেখে গেছেন যে সামাজিক জ্ঞান আর পার্থিব সম্পদগুলি রাষ্ট্রের হাত দিয়ে দখল করে সব প্রায় শেষ করে দেওয়ার খেলায় নেমেছে কর্পোরেটরা। পরম্পরার সমাজ হাজার হাজার বছর নিজের, বিশ্বের চাহিদা পূরণ করেও সম্পদ আগলে রেখেছিল। পরম্পরার সমাজ ব্যবস্থাপনার নীতিগুলি, যেগুলি কর্পরেট লুঠের জন্য খিস্তি করে পিছিয়ে পড়া, অসভ্য, অবৈজ্ঞানিক দাগিয়ে দিয়েছিলাম, যে সব বাঁধন ছিল সামাজিক সম্পদ ব্যবহারের ওপর নিয়ন্ত্রণ। সেই বাঁধনগুলোকে সম্পদ লুঠের জন্য ছিঁড়ে ফেললাম। ভদ্রদের মনের মধ্যে, যে কোন বাঁধন মানেই পিছিয়ে পড়া ভাবিয়ে তোলা হল। সে পরম্পরার প্রথা, নিয়ম, বাঁধনগুলোকে আবার মান্য করার কাজ করতে হবে। আমরা ছোটলোকেরা মনে করি পরম্পরার সমাজ ব্যবস্থাপনার নীতিগুলি অনুসরনীয়, যদি মনে হয় বিশ্ব বাঁচানো দরকার।

ফলে হায়নার মত করে লুঠেরা কর্পোরেটদের আমরা ভদ্ররা সাহায্য করলাম সামাজিক সম্পদ লুঠে নিতে - নিয়মগিরিতে অনিল আগরওয়াল যা করার পরিকল্পনা করেছিল তার বহুগুণ দখল হয়েছে তার আগের আড়াইশ বছরে আমলা দালাল ভদ্রদের মার্ফত। তার জন্য ভদ্রদের মাথা মুড়িয়েছে ইওরপিয়রা দীর্ঘদিন ধরে।
---
মোক্ষ লাভ ইওরোপে এটা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল। যারা ব্রিটিশদের পছন্দ করত না তারা হয় ফ্রান্স না হয় রেনেঁসার ইতালি না হয় মুজতাবার মত জার্মানিতে শিক্ষিত হতে আশ্রয় নিলেন, খুব খারাপ হলে(ইওরোপে যেতে না পারলে) জাপানে। মুজতাবা চাচা কাহিনীতে বললেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ হারলে বিশ্বাসঘাতকতা লোপ পাবে কিন্তু ফ্রান্স হারলে শিল্প কলা, জার্মানি হারলে বিজ্ঞান ইতালি হারলে কি কি যেন লোপ পাবে আমাদের মনে নেই। শেকড়ে পা রাখা রবীন্দ্রধন্য ভদ্রদের প্রতিভূ মুজতাবাই যদি এই মনোভাব পোষণ করেন, তাহলে অন্যান্য ইংরেজবিদ্য বাঙ্গালি দেশকে নিয়ে কি ভাবত! বলে দেওয়া হল যা কিছু প্রগতিশীল সবই ইওরোপধন্য, তার বাইরে কিস্যু নাই।

আমাদের আজকের বাংলাবাদী দাদারাও তাই, তারা ইংরেজির বাইরে কিছু বুঝতে চান না। ইংরেজি খারাপ তো ফরাসি, ইতালি না হয় জারমান নিদেন পক্ষে রুশ ভাষ শেখ। বাংলায় বরাবরই ইওরোপি ভাষা শিক্ষার রমরমা ব্যাপারটা থেকেই গিয়েছে, সেটা একটা আভিজাত্যিক ব্যাপারস্যাপার – রামকৃষ্ণ মিশনও এই ভদ্র অন্তরটিপুনিটা ধরে ফেলেছে – গোলপার্কে ইওরোপমন্য ভদ্রছানাপোনাদের বড় ভিড়।

দেশভাগের পরে ইওরোপিয় বুলডোজার নিয়ে দেশকে আধুনিক করতে ঝাঁপিয়ে পড়লেন বাম, ডান এবং মধ্যপন্থী নেহরু।
---
ভদ্রদের মনের মধ্যে যে কোন দেশজ বাঁধন মানেই পিছিয়ে পড়া ভাবিয়ে তোলা হল। ইওরোপ(আর উত্তর আমেরিকা) হল নব্য ইওরোপিয় লুঠেরা সামরিক জ্ঞানচর্চায় শিক্ষিতদের শেষতম গন্তব্য, তারা হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন সেখানে গিয়ে।

যে রকমভাবে ব্রিটিশ লুঠ বিরোধিতার প্রথম তাত্ত্বিক রামবাগানের রমেশ দত্ত সুসভ্য লন্ডনে শেষ জীবনে কাটান আর জগদীশচন্দ্রকে মন্ত্র দেন এ পোড়া দেশে না ফেরার জন্য – রবীন্দ্রনাথ জগদীশের পাশে না দাঁড়ালে তিনি ব্রিটেনেই হয়ত থেকে যেতেন। আদতে সারা বিশ্বে লুঠ চালাচ্ছে কর্পোরেটরা, এবং সে সব সম্পদ নিয়ে এসে জড়ো করছে সেখানে তারা।

ইওরোপিয়দের লুঠ করার কাজে ২৫০ বছরের ঐতিহ্য সম্পন্ন সাহায্যকারী নিবেদিতপ্রাণ ভদ্ররা কর্পোরেটদের বিশ্ব লুঠ ধ্বংস খুনের কাজে সাহায্য করিয়ে দিতে না পারলে শান্তি পান না। তাই দলে দলে পশ্চিম গমন।

আমরা পরম্পরাকে কোন দৃষ্টিতে দেখি, সেটা নিচের উদাহরণে বোঝাব - কারন Dipankarর যুক্তির বিরোধিতা করতে গিয়ে এই বস্তাপচা বিষয়কে টেনে এনেছেন আধুনিক শিক্ষাবিদেরা - যে সব যুক্তি বড় পুঁজি তার লুঠের কাজ সমাধা করতে হামেশাই দিয়ে থাকে।
---
ওয়াপাগের স্বাস্থ্য বিধায়ক নারায়ণ মাহাত নৈবেদ্য চিকিৎসা করছেন - এই উদাহরণ দিচ্ছি কেন না ইওরোপমন্যবাবুদের বোঝানো হয়েছে চরণামৃত, নৈবেদ্য ইত্যাদি মানেই গণ্ডগোলের, টিকার থেকে বৈজ্ঞানিক আর কিছুই নাই। দেশিয় পরম্পরা, তথ্য, জ্ঞান বিষয়ে কোন রকম না জেনে না বুঝে তারা কোমর বেঁধে ট্রেভলিয়ান, মেকলে, ম্যাক্ষ্মুলর আর মার্ক্সের দেখানো পথে নেমে পড়েছেন পরম্পরার নিন্দা করতে।

নৈবেদ্য আর চরণামৃত নামে যা দেওয়া হয়, তা আদতে ওষুধ আর চিরায়ত মানুষকে সুস্থ করার গাছগাছালি সংরক্ষণের নিদান। চরণামৃততে থাকে দুধ ছাড়া যে কটা জিনিস থাকে তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ন হল কর্পুর (ভদ্র বাঙালির বিবাহিত জীবনে ক্যাটারার নামক সমাজ ধ্বংসাত্মক কৃষ্টি আসার আগে বিয়েতে পাড়ার ভুতো, ফুটো ইত্যাদিরা পরিবেশন করত। সে সময় জলে যাতে বিষক্রিয়া না হয় তার জন্য জলে কর্পুর দেওয়া হত - পুরোনো যদি কোন মানুষের সে সব সুখস্মৃতি স্মরণে থাকে মনে করুণ), বেলপাতা (শৈবদের ভগবান), তুলসী পাতা(বৈষ্ণবদের ভগবান) - প্রত্যেকটাই এই যৌগতে বিষক্রিয়া নষ্ট করার জন্য, এবং নিদান, এটি তৈরি করা থেকে নির্দিষ্ট সময়ে পান করে ফেলতে হবে। সমস্যা হল বড় পুঁজি, বড় পুঁজির সংবাদমাধ্যম এটিকে ব্রাত্য করে দেওয়ার প্রচারের বাইরে এই যৌগ সম্বন্ধে আমরা কিস্যু জানি না প্রায়।

বড় পুঁজি যা বলতে শেখায় সেটাই ধ্রুব সত্য বলে মেনে নিই কারণ আমার বাড়ির ছেলে মেয়ে নাতি নাতনির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে আছে বড় পুঁজির চাকরি তৈরি করার ক্ষমতার ওপর, নিদেন পক্ষে দালালি, সেটা হয় ছোটলোকেদের অর্থনীতি কৃষ্টি স্বাস্থ্যব্যবস্থা, পড়াশোনা, জ্ঞানচর্চা ধ্বংস করেই।

ফলে সে ছোটলোকেদের অশিক্ষিত অজ্ঞ, কুসংস্কারাচ্ছন্ন বলতে আমাদের যতটা উৎসাহ, ততটা বিন্দুমাত্র উৎসাহ দেখা যায় না ছোটলোকেদের যেগুলো বড় পুঁজি কুসংস্কার দাগিয়ে দিয়েছে সেগুলির মূল খুঁজে বার করার।
---
যদি কেউ বড় লুঠেরা পুঁজির যুদ্ধ নির্ভর প্রযুক্তি বিজ্ঞান যুক্তিবাদের ওপর নির্ভর করে সেই জ্ঞানচর্চায়, আধুনিক পরজীবি জীবনযাত্রায় সুখ পান তো আমাদের কোন অসুবিধে নেই - কারণ ভদ্রদের এই লুঠের কাড় কাঠি হয়ে কাজ করার পরম্পরা চলে আসছে আড়াইশ বছর ধরে ব্রিটিশদের জামানায়। ইওরোপ পদপ্রান্তে থাকা লুঠের কাজে দক্ষ, ছোটলোক কৃষ্টি অর্থনীতি নিধনে বিশেষজ্ঞ ভদ্র বাঙ্গালি চিরজীবি হোক।

তবুও আমরা বলব ছোটলোকেরা যা পালন করেন, বলেন, করেন সেটাই সভ্যতা, সেটাই বিশ্বকে বাঁচানোর হাতিয়ার।
বিশ্ব এখন ধ্বংসের মুখোমুখি।
আপনাকে পথ বেছে নিতে হবে আপনি কোন দিকে।