Showing posts with label নৌবিদ্যা. Show all posts
Showing posts with label নৌবিদ্যা. Show all posts

Monday, August 27, 2018

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা - নৌবিদ্যা, অঙ্ক এবং জ্যোতির্বিদ্যা – একটি পাগান(জনজ্ঞান – লৌকিক) জ্ঞান৬

ডি পি আগরওয়াল, লোকবিজ্ঞান কেন্দ্র, আলমোড়া
(ছবিতে - গ্রিশ্যাম কলেজ, সেখানে রয়্যাল সোসাইটির ভ্রুণ তৈরি হয়)
আরেকটি বড় সমস্যা ছিল পৃথিবীর আয়তন মাপা যা দিয়ে ইন্দো-আরবি পদ্ধতি দ্রাঘিমা নির্ণয় করত। পৃথিবীর মাপের সঠিক হিসেব না থাকায় এই পদ্ধতিটি নির্ভর করে ষোড়শ এবং সপ্তদশ শতকে ইওরোপিয়রা বিশ্বের দ্রাঘিমা নির্ণয় করতে পারত না। বহু কাল আগে ইন্দো-আরব জ্ঞানচর্চা বিশ্বের মাপ এঁচে ফেলেছিল। এটা অল-বিরুনি করেছিল খুব শস্তার পদ্ধতি দিয়ে করেছিলেন আর খালিফা মামুন করেছিলেন বিপুল খরুচে মরুভূমিতে অভিযান পাঠিয়ে, বাস্তবিকভাবে পৃথিবীর বৃত্তচাপের এক ডিগ্রি বলতে কত দূরত্ব বোঝায় জানতে। ইওরোপিয়রা বহুকাল ধরেই ইন্দো-আরবি সঠীক মাপ ও প্রযুক্তি সম্বন্ধে অবগত ছিল ঠিকই, তবুও এটা পরিষ্কার করে বলা দরকার কলম্বাস, তাঁর অভিযানে বিশ্বের যে মাপ দেখিয়ে টাকা পেয়েছিলেন, সেটি ছিল ইন্দো-ইওরোপিয় মাপের মাত্র ৪০%। কলম্বাসের অভিযানের ‘সাফল্যে’ এই ভুল মাপটি আর কেউ নতুন করে এঁচে দেখার সাহস দেখায় না। পেড্রো নুনেজ চেষ্টা করলেও, পর্তুগাল রাষ্ট্র গ্লোবকে ধরে সমুদ্রযাত্রার ধারনায় নিষেধাজ্ঞা জারি করে। শেষ পর্যন্ত নিউটন বিশ্বের মাপের সংস্কারের কথা বলে যে মাপ নির্ধারণ করেন, সেটিও মুল মাপের ২৫% কম ছিল।
মধ্য-ষোড়শ শতে সমুদ্রযাত্রা রাষ্ট্রগুলির এই মাথাব্যথার এতই কারণ হয়ে দাঁড়ায় যে, এই সমস্যা সমাধানে কোন একটা বাস্তব উপায়ের দিকে তারা ক্রমশ ঝুঁকতে থাকে। সমস্যা সমাধানের উপহারের পরিমান ফিলিপ বিপুল পরিমান বাড়িয়ে দেন ১৫৫৮ সালে। উপহারের পরিমানটা এতই বেশি যে সেই প্রলোভনে বৈজ্ঞানিকেরা তাতে আত্মনিয়োগ করেতে থাকেন। যেমন ১৬১৬ সাল থেকে শুরু করে ষোল বছর ধরে গ্যালিলিও চেষ্টা করেছেন। বিফল হয়ে তিনি ১৬৩৬ সালে ডাচ সরকারের ঘোষিত পুরষ্কারের দিকে নজর ফেরান। ফ্রান্সে, মাজারিন এবং রিশল্যুর উত্তরাধিকারী কোলবার্ট সমুদ্রযাত্রার সমস্যার সমাধানের জন্যে বিপুল অর্থ উপহার দেওয়ার কথা ঘোষণা করে হুইজেনস, লিবনিতজ, রোমার, নিউটন, পিকার্ড ইত্যাদির কাছে সমস্যা সমাধানের ব্যক্তিগত অনুরোধ পাঠান। তাদের থেকে যে বার্তা পান সেই উত্তর দিয়ে তিনি ১৫ জনকে নিয়ে ফরাসী রয়্যাল আকাদেমি গঠন করেন।
একইভাবে ব্রিটিশ রয়্যাল একাডেমি সৃষ্টি হয় যেই সব মানুষ নিয়ে যারা লঙ্গিচিউড সমস্যা সমাধানের জন্য মাঝে মাঝে একত্রিত হতেন। ১৬৬১ সালের একটি ছড়ায় আমরা গ্রিশ্যাম কলেজের এক দলের কাজকর্ম নিয়ে কিছুটা জানতে পারি –
The College will the whole world measure,
Which most impossible conclude,
And Navigators make a pleasure
By finding out the longitude.
Every Tarpalling shall then with ease
Sayle any ships to th'Antipodes.
Tarpalling মানে হল নাবিক। গ্রিশ্যাম কলেজের আলোচকদের মধ্যে ছিলেন জন উইলিস এবং রবার্ট হুক – এদের সঙ্গে আরও কিছু দল জুটে গিয়ে তৈরি হল রয়্যাল সোসাইটি অব লন্ডন। গ্রিশ্যাম কলেজের আলোচকদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ক্রিস্টোফার ওরেন, সোসাইটির চার্টার তৈরি করেন। সেই চার্টারের একটা উদ্দেশ্য বলা হল লঙ্গিচিউড নির্নয়।

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা - নৌবিদ্যা, অঙ্ক এবং জ্যোতির্বিদ্যা – একটি পাগান(জনজ্ঞান – লৌকিক) জ্ঞান৫

ডি পি আগরওয়াল, লোকবিজ্ঞান কেন্দ্র, আলমোড়া
(ছবিতে চিনা সেনাপতি জেং হির ২৮ বছর ধরে সমুদ্রযাত্রার বর্ণনা দিলাম - ভাস্কোর প্রায় নব্বই বছর আগে তিনি সমুদ্রবাহিত হয়ে সারা বিশ্ব ঘুরে ফেলেছেন আর ভাস্কো মেলিন্দের উপকূলে ভারত খুঁজে বেড়াচ্ছিলেন। মালামো কানা না হলে তার যে কত বছর লেগে যেত ভারত পৌঁছতে, আদৌ পৌঁছতে পারতেন কিনা প্রশ্ন ওঠে। এর থেকে প্রমান হয় ইওরোপিয়রা সমুদ্র বিদ্যায় কত নাদান ছিল।)
এর আগে বলেছি পঞ্জিকা সংস্কারের জন্যে ম্যাটিও রিশিকে বেসরকারিভাবে ভারতে পাঠানো হল, তিনি কোচিনে ভাষা, অঙ্ক শিখে চিন হয়ে ইওরোপে গেলেন। তবুও অঙ্ক আদতে পঞ্জিকা বা নৌ চলাচলের সমস্যার সমাধানের ইঙ্গিত ইওরোপিয় পঞ্জিকা বা অঙ্ক শাস্ত্রে দেখা গেল না। প্রথম সমস্যা ইওরোপের বেশ পুরোনো – হিসেব করার অক্ষমতা। যদিও ইওরোপিয়রা দশমিক বিদ্যাটা আস্তে আস্তে শিখছিল এবং যোগ বিয়োগ গুণ ভাগের যুক্তিবিদ্যাটাও শিখছিল। তখনও জটিলতম কলনবিদ্যা আর ত্রিকোণমিতি শেখার মত যোগ্যতা তারা অর্জন করে উঠতে পারে নি।
ত্রিকোণমিতি ইওরোপে এসেছিল রেজিওমনটেনাসের(মুল নাম এবং জীবনকাল - Johannes Müller von Königsberg (6 June 1436 – 6 July 1476)) হাত ধরে, উপমহাদেশে বিকাশিত হবার এক হাজার বছর পরে। ত্রিকোনমিতি বোঝার অক্ষমতা বুঝতে পারি যদি আমরা তাদের দেওয়া ত্রিকোণমিতির চলকগুলি নাম দেওয়া থেকে। সাইন(sine) শব্দটা এসেছে ভারতীয় জ্যা(jya বা jiva) শব্দ থেকে। সেখান থেকে আরবিতে গিয়েছে জিবা(jiba) হিসেবে। বহু সময় আরবিতে স্বরবর্ণ লেখা হয় না। ফলে jiba হল jb। যাকে ভুল পড়া হল jmb বা ভাঁজ বা sinus হিসাবে – এই ভাবে ইওরোপে সাইন শব্দের উতপত্তি । করণ বা ক্যালকুলাসকে ঠিকঠাক কাজ করাতে গেলে সাইন চলকের সঠিক মান প্রয়োজন হয়, যা ভারতে ষোড়শ শতের তন্ত্রসংগ্রহে তৈরি করা ছিল। ইওরোপের সে সময়ের অঙ্কতাত্ত্বিক পেড্রো নুনেজ, ক্রিস্টোফ ক্লভিয়াস অথবা সাইমন স্টিভেন সকলেই ভারতীয়দের কাছাকাছি সাইন চলকের মান নির্নয় করার চেষ্টা করে গিয়েছেন যাতে সমুদ্রযাত্রা সঠিক হয়। অক্ষাংশ নির্ণয় করার জন্য সাইন চলকের প্রয়োজন হয়। আগে উল্লিখিত প্রথম ভাষ্করের বা অল-বিরুনির তত্ত্বানুযায়ী দ্রাঘিমাংশ নির্ণয় করতেও অক্ষাংশের মান জানা প্রয়োজন হয়।
ষোড়শ শতকে ইওরোপ যে সাধারণ যোগ বিয়োগ গুণ ভাগ এবং দশমিকের প্রায় প্রাথমিকের পড়াশোনা করে ত্রিকোণমিতি করার যে চেষ্টা করছিল ভারত সে সময় তাদের থেকে বহু আগে সেই কাজ সমাধা করে ফেলেছে। ক্রিস্টোফ ক্লভিয়াসএর সময় থেকে ১৫৮২ সালের পঞ্জিকা সংস্কারের সময় পর্যন্ত ইওরোপিয়রা অঙ্ক এবং পঞ্জিকা তৈরি বিষয়ক ভারত, আরব এবং চিনাদের থেকে জটিল জ্ঞান আহরণ করার চেষ্টা করছিল(কোচিন থেকে ম্যাটিও রিশি কিন্তু চিনে যান)। সমস্যা হল ইওরোপিয়রা সে সময় এত জটিল এশিয় অঙ্ক বুঝতে পারছিল না। এর ফল আমরা দেখতে পাই সপ্তদশ শতে ক্যাভালিয়েরি, ফেরম্যাট, পাসক্যাল, গ্রেগরির কাজে সরাসরি এবং লিবনিতজ, ওয়ালিস এবং নিউটনের কাজে পরোক্ষে, যদিও তারা তাদের কাজে সূত্র মুছে দিয়েছেন এবং তাদের পদ্ধতিটাও বিস্তৃতভাবে বলেন নি। ফেরম্যাট ইওরোপিয় অঙ্কবিদদের বেশ কিছু অঙ্ক সমাধান করতে দিয়েছেন, তার উত্তর বহু আগেই বহু জনপ্রিয় ভারতীয় জ্যোতির্বিদ্যা এবং অঙ্কতত্ত্বে বিশদে কষে দেওয়া আছে – বিশেষ করে ব্রহ্মগুপ্ত এবং দ্বিতীয় ভাষ্করের কাজে। তবে এটা পরিষ্কার ইওরোপের প্রথিতযশা অঙ্কবিদেরা ভারতীয় কলনবিদ্যার মৌলিক বিষয়গুলি বুঝতে পারেন নি – যে জন্য দেকার্ত বলে দেন অসীম শ্রেণী(সিরিজ) মানুষের বোধগম্যতার বাইরের ব্যাপার। এই সমস্যাটা বাস্তব কারণ, ভারতীয়দের কাছে অঙ্ক অতিবাস্তব(practical), ধারনামূলক (computational) এবং প্রয়োগবাদী বা অভিজ্ঞতাজনক(empirical)। অন্যদিকে অঙ্ক সম্বন্ধে ইওরোপিয় ধারণাটি পারমার্থিক(spiritual), প্রমানসিদ্ধ(proof-oriented) আর নিয়মনিষ্ঠ(formal)। যুক্তিভাষায় অসীম শ্রেণী(series)র আকঁ কষা হয়েছে ন্যায়-বৈশেষিক দর্শনের পরমাণুতত্ত্ব অনুযায়ী যেখানে একটি বৃত্তকে ভাঙতে ভাঙতে যখন সেটি পুরমাণু আকারে চলে আসে, তখন থামার কথা ওঠে। কিন্তু যখন জেসুঈট ক্যাভালিয়েরি অঙ্কতে অবিভাজ্য (indivisible) শব্দটা ব্যবহার করেন, এই একই অসীম শ্রেণীর আঁক কষতে কষতে, তখন প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। এই সমস্যাটা অতিক্ষুদ্র(infinitesimal) কলনবিদ্যায় উনবিংশ শতক পর্যন্ত ইওরোপে থেকেই যায়।

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা - নৌবিদ্যা, অঙ্ক এবং জ্যোতির্বিদ্যা – একটি পাগান(জনজ্ঞান – লৌকিক) জ্ঞান৪

ডি পি আগরওয়াল, লোকবিজ্ঞান কেন্দ্র, আলমোড়া
(সঙ্গের ছবি - ম্যাটিও রিশির সময় মার্কাটরের মানচিত্র)
অষ্টাদশ থেকে বিংশ শতক পর্যন্ত পশ্চিমি ঐতিহাসিকেরা দেখানোর চেষ্টা করছেন নবজাগরিত ইওরোপিয় জ্ঞানের সঙ্গে পাগান জ্ঞানের কোন সম্পর্কই নেই। তাদের দাবি বর্তমান যে জ্ঞানভাণ্ডারের ওপর ইওরোপ বসে আছে, সেগুলি মূলত স্বউদ্ভুত, পাগান সংস্পর্শ রহিত।
নব্য ইওরোপের ধ্রুপদী জ্ঞানের দিকচিহ্নটি হল গ্রিস- নবজাগরণ  আধুনিক বিজ্ঞান।
এই সময়সারণি অনুযায়ী খ্রিষ্টধর্মের কাছে ধর্মীয়ভাবে বিরুদ্ধাভাবপন্ন অংশ ইওরোপিয় নবজাগরনীয় জ্ঞানের বিকাশে কোন ভূমিকাই নেয় নি। অথচ আজ আমরা বার্নলের গবেষণায় বুঝতে পারছি, এই সময়সারনীকে নতুন করে সংস্কার করার দরকার আছে কেননা প্রাচীন গ্রিসের জ্ঞানচর্চা আফ্রিকিয় জ্ঞানচর্চা আত্তীকরণ করে বেড়ে উঠেছিল। সে চেষ্টা করেছে আরবি আর ভারতীয় জ্ঞানচচর্চা যতটা পারা যায় এড়ানোর। কোপার্নিকাসের সূর্যকেন্দ্রিক (heliocentric) ব্রহ্মাণ্ডের তত্ত্ব আসলে আরবির গ্রিক অনুবাদের খুব খারাপ ল্যাটিন অনুবাদ। ইওরোপের বিশ্বজোড়া মিথ-মিথ্যা ভিত্তিক ঔপনিবেশিক জ্ঞানচর্চার আজ আমাদের বিশ্বাস করিয়েছে যে ইওরোপের জ্ঞানতাত্ত্বিক বা ধর্মতাত্ত্বিকতা এবং সব ধরণের গুরুত্বপুর্ণ ধারনার বিকাশ ঘটেছে সাদা গ্রিসে এবং তারপরে টপকে এসে পড়েছে আধুনিক নবজাগরিত ইওরোপে - তার মাঝখানে আর কোন পাগান জ্ঞানচর্চার ঘৃণ্য ছোঁয়া নেই এই শুদ্ধ জ্ঞানচর্চায়। অন্যের কাছে শিখেছি, এই কথা বলায় কি অপ্রাকৃতিক ব্যাপার আছে বুঝি না? যেমন আরবেরা প্রকাশ্যে স্বীকার করেছে তারা অন্যের থেকে অনেক কিছু নিয়েছে। অথচ খ্রিষ্টিয় চার্চের কাছে অন্যদের থেকে কিছু শেখা মানেই যেন সম্মান হানির ব্যাপার। চার্চের কাছে এটা একটা ইউনিক চরিত্র ব্যাপার হল সে যা অন্যের থেকে শিখেছে সে সেটাকে লুকিয়ে রাখে। এই পৃষ্ঠভূমিতে ভাবুন, ষোড়শ শতে আকবরের আমলে তাদের প্রয়োজন সঠিক পঞ্জিকা জ্ঞান যেটা ভারতীয়দের আছে, অথচ তাদের নেই, এবং এই জ্যোতির্বিদ্যা বিষয়ে জ্ঞান অর্জনের জন্যে তারা কেরলে বিদ্বানদের একটা বাহিনীও পাঠাল, তারা এদেশে এসে ভাষাটাও শিখল, ছাপাখানও বসাল যে জ্ঞান বহন করে নিয়ে গেল ইওরোপিয় ইতিহাসে তার কোন উল্লেখ পাওয়া গেল না।
দ্রাঘিমা
১৫৮২ সালের পোপ গ্রেগরির নির্দেশে রোমক পঞ্জিকায় খসে পড়া দশদিন যোগ হল, ৫ অক্টোবর তারিখে প্রায় প্রত্যেক দেশে লিপ ইয়ারের গাঁজাখুরিত্বটাকে পাশ কাটিয়ে। ফলে সমুদ্রে অক্ষাংশ নির্ণয়ের ঝামেলাটা পূরণ হল ঠিকই কিন্তু সমুদ্রে যাত্রা করার যে সমস্যাটা ছিল, সেটা থেকেই গেল কেননা দ্রাঘিমার আঁক কষা খুব সহজ নয়। উদাহরণ স্বরূপ স্পতম শতক থেকেই স্থানীয় দ্রাঘিমাংশ এবং অক্ষাংশ নির্নয়ের কাজটা ভারতের পঞ্জিকা শাস্ত্রের জ্ঞানীর আকরে আসছেন এবং এই জ্ঞানটা সারা উপমহাদেশে ছড়িয়ে যাচ্ছে। যেমন আমরা ভাষ্করের কাজের কথা আগেই আলোচনা করেছি। এই জ্ঞান শতকের পর শতক জুড়ে সম্পাদিত হয়েছে এবং পুনর্নবীকরনও ঘটেছে – যেমন অল-নিরুনি তার আঙ্কিক ভূগোলে করেছেন তেমনি অঙ্কবিদ্যার কেরল ঘরাণাও এই কাজে মন দিয়েছিল। এই পুনর্নবীকৃত জ্ঞান সারা দেশের সঙ্গে কোচিনেও ছড়িয়েপড়েছিল পঞ্জিকা এবং জ্যোতির্বিদ্যার পাঠের সঙ্গে সঙ্গে - যেখানে এসে ম্যাটিও রিশি এবং অন্যান্য জেসুইটরা এই বিদ্যা খুঁজে বেড়াচ্ছিলেন। এখানে ভাষা কোন দেওয়াল তোলে নি, ক্ল্যাভিয়াস বা রিশির অঙ্কে অপ্রতুল জ্ঞান কোন দেওয়াল তোলে নি। কিন্তু ভারত আর আরবি নৌবিদদের বহুকাল ধরে ব্যবহৃত এই জ্ঞান সরাসরি ইওরোপিয়দের পক্ষে ব্যবহার করা সহজ হল না কয়েকটি কারণের জন্যে।

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা - নৌবিদ্যা, অঙ্ক এবং জ্যোতির্বিদ্যা – একটি পাগান(জনজ্ঞান – লৌকিক) জ্ঞান৩

ডি পি আগরওয়াল, লোকবিজ্ঞান কেন্দ্র, আলমোড়া
(ছবিতে পেদ্রো নুনেজ, ম্যাটিও রিশির সময়ের বিশ্বমানচিত্র)
সে সময় ইওরোপে যে পঞ্জিকা ব্যবহৃত হত সেটি জুলিয়াস সিজারের তৈরি, তার নাম অনুযায়ী জুলিয়ান পঞ্জিকা। রোমকরা অঙ্ক খুব ভাল জানত না। সহজে অঙ্ক কষতে চাইত। তারা ঠিক করল বছর হবে ৩৬৫.২৫ দিন। এই অঙ্কটা দ্বিতীয় দশমিকেই ভুল হওয়াতে প্রতি শতকে ১ দিনের তফাত হয়ে যেত। ষোড়শ শতে এসে এই তফাতটা গিয়ে দাঁড়াল ১০ দিনে। ফলে অক্ষাংশ দ্রাঘিমাংশ নির্নয়ে এই তফাত বিপুল ভ্রমের সৃষ্টি করল। এই উল্টোদিকে এর ১০০০ বছর আগে প্রথম ভাষ্কর, যাকে প্রায় সারা উপমহাদেশ জানত, তিনি সকাল থেকে সন্ধ্যে পর্যন্ত সূর্যের declination মেপে ফেলেছিলেন! পরের ন্দিকে বোঝা গেল ইওরোপিয় ভ্রম হল ১/৮ ডিগ্রি এবং বিশ্বের জ্যাএর ৩ ডিগ্রি। অতলান্ত সমুদ্রে ঝাঁপ দেওয়া নাবিকের কাছে এটা জীবনমরণের পার্থক্য।
দেখলাম ষোড়শ শতাব্দে রোমক পঞ্জিকা ছিল ভুলে ভরা। সে সময় পর্যন্ত ইওরোপিয় নৌবিদ্যা এমন কোন উচ্চতায় পৌঁছতে পারে নি, যা দিয়ে ইওরোপ সারা বিশ্ব ব্যবসা করার জন্যে সমুদ্রপথে টহল দিতে পারে। ইওরোপেইয় রাষ্ট্রের কাছে প্রথম কাজ ছিল পঞ্জিকা সংস্কার। সূর্যের declinationএর জিরো পয়েন্ট হল মহাবিষুব (equinoxes)। ফলে পঞ্জিকা সংস্কারের প্রাথমিক কাজ হল মহাবিষুবএর দিনক্ষণ নির্ণয়। এটা খুব সহজ কাজ নয়। এর অর্থ ইস্টারের দিন পরিবর্তন। ইনকুইজিশনের দিনগুলির সময়ে ইওরোপে চার্চ তখন মহাশক্তিশালী অক্ষ। এদের হেলানো সহজ কাজ নয়। নাইসেন কাউন্সিল(Nicene council) – যা আদতে চার্চদের সম্মলনী – অনুযায়ী ইস্টারের দিন নাইসেন ক্রিড নামে পরিচিত ছিল – এই দিন পালন খ্রিষ্ট ধর্মের অন্যতম ভিত্তিপ্রস্তর। নাইসেন ক্রিড পরিবর্তন করার চেষ্টার অর্থ হল বিধর্মী কাজ – সে সময়ে ভয়ঙ্কর উদ্যম – এমন কি এর দেড়শ বছর পরে প্রটেস্টান্ট ইংলন্ডে নিউটনও ভয়ে কাটাতেন – ১৭৫২ পর্যন্ত এই সংস্কার ইংলন্ডেও কার্যকর হয় নি। রোমক পঞ্জিকা বদলানোর দাবি এর আগে ইওরোপে উঠেছিল ঠিকই, কিন্তু চার্চ আর রাষ্ট্র যে দাবি পাত্তা দ্যায় নি। রোমান ক্যাথলিক চার্চ পঞ্জিকা সংস্কারের যৌক্তিকতা মেনে নেওয়ার পরেও এটা কার্যকর হতে প্রায় ৫০ বছর লেগে যায়। পঞ্জিকা সংস্কারের মূল কাজটা নিবদ্ধ হল মহাবিষুবের দিন সংস্কার। কিন্তু মাস দিন এবং স্বাভাবিক চান্দ্রচক্রের সঙ্গে সম্পর্কিত না থেকে মাসের হিসেব ২৮ থেকে ৩১ দিনই থেকে গ্যাল। ষোড়শ শতকে ইস্টারের দিনক্ষণ নির্ণয় করা ইওরোপের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক, প্রাযুক্তিক এবং ধর্মীয় সমস্যা হয়ে উঠল।
পেড্রো নুনেজের ছাত্র জেসুইট ক্রিস্টোভ ক্লভিয়াসের ওপর দায় পড়ল পঞ্জিকা সংস্কার কমিটির নেতৃত্ব দেওয়ার। নুনেজ তার সময়ের ইওরোপে অগ্রগণ্য নৌবিদ্যা তাত্ত্বিক ছিলেন। তাঁর ছাত্র ক্লভিয়াস দায়িত্ব নিয়েই প্রথমে জেসুইটদের কলেজ, কলেজিও রোমানোর পাঠ্যক্রমে পরিবর্তন আনলেন – প্রায়োগিক অঙ্ক ঢোকালেন। তিনি সে সময় ইওরোপে এই বিষয়ে মহাতাত্ত্বিক ছিলেন। এই নব্য পাঠ্যক্রমের প্রথম ব্যাচের ছাত্রদের মধ্যে বেরোলেন প্রখ্যাত ম্যাটিও রিশির মত গুনী, যাকে ভারতে জ্ঞান সংগ্রহের জন্যে পাঠানো হয়েছিল। পঞ্জিকা সংস্কারের উদ্দেশ্যে তিনি ভারতে পা রাখেন।
এ সময় চার্চের সঙ্কীর্ণচিত্ততা নতুন মাত্রায় পৌঁছল। যদিও সে পাগান বিদ্যা আত্তীকরণ করতে বেসরকারিভাবে রাজি হয়েছে, কিন্তু প্রকাশ্যে সে এই ধরণেরে কোন উদ্যমের কথা স্বীকারই করল না। ফলে পাগান জ্ঞান থেকে নিজেকে বিচ্যুত দেখাতে সে ইস্টারের ধর্মীয়তাকে আরও উগ্র করে ফেলল। যদিও ম্যাটিও রিশি কোচিনে জ্যোতিষ শিখতে এলেন আকবরের সময় ১৫৮১ সালে। এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকায় উল্লিখিত লেখায় আমরা দেখি যে তিনি স্বীকার করেছেন কোচিনে কোন জ্ঞানী ব্রাহ্মণ বা সত্যবাদী মুর/মুসলমানের থেকে জ্যোতিষ বিদ্যা শিখবেন। অথচ আজও চার্চ লিখিতভাবে বলে তিনি কোচিন এসেছিলেন স্বাস্থ্য উদ্ধারে!

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা - নৌবিদ্যা, অঙ্ক এবং জ্যোতির্বিদ্যা – একটি পাগান(জনজ্ঞান – লৌকিক) জ্ঞান২

ডি পি আগরওয়াল, লোকবিজ্ঞান কেন্দ্র, আলমোড়া
আগেই বলেছি ইওরোপ সে সময় মহাকাশনির্ভর নৌবিদ্যা জানত না তাদের নিজেদের বিদ্যা ছিল ডেড রেকনিং, যা বার বার ভুল প্রমানিত হয়েছে। এ জন্যে তারা হন্যে হয়ে সমুদ্রের মানচিত্র খোঁজার প্রাণপন চেষ্টা করে গিয়েছে, কিন্তু সে চেষ্টাটাও বার বার ব্যর্থ হয়। তারা বাধ্য হয়ে লগ মেজার বলে পদ্ধতি বার করতে – জাহাজ থেকে নির্দিষ্ট সময়ান্তরে কিছু দড়ি ফেলে তাকে তুলে নিয়ে জাহাজের গতিবেগ নির্ণয় করার চেষ্টা করা হত। ১৮৬৪ সালের নাবিকদের নির্দেশনামায় বলা হচ্ছে - if the gale has not been the same during the whole hour, or time between heaving the log, or if there has been more sail set or handed, there must be an allowance made for it, according to the discretion of the officer. Sometimes, when the ship is before the wind and a great sea is setting after her, it will bring home the log; in such cases it is customary to allow one mile in ten, and less in proportion if the sea be not so great; a proper allowance ought also to be made if there be a head sea. In heaving the log, great care should be taken to veer out the line as fast as the log takes it; for if the log be left to turn the reel itself, it will come home, and give an erroneous distance. এবং সেটাও ঠিকঠাক দূরত্ব দিতে পারত না।
নৌবিদ্যায় ইওরোপিয় অজ্ঞতার কথা মোটামুটি সে সময়ে স্বীকৃত ছিল। যদিও ইওরোপ তাদের এই অজ্ঞানতা স্বীকার করে না, ইতিহাস সাক্ষী ষোড়শ থেকে অষ্টাদশ সাল পর্যন্ত সম্ভাব্য অসম্ভাব্য যায়গায় তাদের থেকে উন্নত জ্ঞান খুঁজে গিয়েছে। লিসবন এবং কোয়েম্ব্রার অঙ্কের অধ্যাপক পেড্রো নুনেজকে ১৫২৯ সালে রাজকীয় কসমোগ্রাফার হিসেবে নিয়োগ করা হয়। স্পেনের রাজা দ্বিতীয় ফিলিপ ১৫৬৭ সঠিক নৌজ্ঞান প্রযুক্তি আবিষ্কারের জন্যে বিপুল অঙ্কের অর্থ পুরষ্কার ঘোষণা করেন। এ ধরণের পুরষ্কার এর পর বহু ইওরোপিয় সরকার ঘোষণা করবে।
ষোড়শ শতের মাঝামাঝি পর্যন্ত ধ্রুবতারার altitude নির্ভর করে অক্ষাংশ নির্ণয় করার প্রযুক্তি শিখল। যদিও যে যন্ত্র তারা আবিষ্কার করল তা কোনওভাবেই ইন্দো-আরবি প্রযুক্তির ইন্টারপ্রোলেশন প্রযুক্তির কাছাকাছি আসে না। সেটা তৈরি হল সপ্তদশ শতাব্দে ভার্নিয়ের পরে(যার নামে যন্ত্রটির নাম)। তার পরে সঠিক নৌবিদ্যাটি কার্যকর হতে থাকে।
ধ্রুবতারাকে ভিত্তি ধরে সমুদ্রে যাওয়ার বেশ কিছু সমস্যা আছে। ইওরোপ থেকে উপমহাদেশে আসতে গেলে জাহাজকে বিষুব রেখা পার হতে হয়। উত্তরগোলার্ধ থেকে বিষুবরেখার দিকে এগোলে ধ্রুবতারাকে দিকচক্রবালের কাছাকাছি দেখা যায়। কিন্তু দক্ষিণ গোলার্ধে সেই তারাটি নেই। আর ধ্রুবতারা রাতে দেখা যায়, কিন্তু দিনের ব্যালা?
দিনের বেলায় সমুদ্রে নৌচলাচলের ইন্দো-আরবি পদ্ধতিটি ছিল দুপুর বেলায় সূর্যের altitude নির্নয় করা। ধ্রুবতারার উন্নতিকোণের, কোন মাপার যে কোন প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি দিয়েই সূর্যের altitude নির্নয় করা যেত – ইন্দো-আরবি কৃষ্টিতে এই কাজ করার জন্যে বহু ধরণের যন্ত্র ছিল। এখানে আরও একটা সমস্যা রয়ে গেল। সূর্যের উন্নতি কোণ দিয়ে খুব সহজে অক্ষাংশ নির্নয় করা যায় না। ধ্রুব তারার মত সূর্য স্থির থাকে না – উত্তরগোলার্ধে সে গ্রীষ্ণে উত্তরের দিকে এবং শীতে সে দক্ষিণের দিকে সরে যায়।
ফলে সূর্যের altitude থেকে অক্ষাংশ নির্নয় করতে গেলে উত্তর-দক্ষিণের চ্যুতির বিষুবলম্ব (declination)র আঁক কষা দরকার। সূর্যের বিষুবলম্ব রোজ পাল্টায়। মহাবিষুবের(equinoxes) দিনে এটা শূন্য হয় অয়নকালে(solstices) সবথেকে বেশি হয়। আমরা যদি সব থেকে বেশি চ্যুতির পরিমানটা জানি, তাহলে গড় দিনে আমরা সূর্যের গড় বিষুবলম্ব বের করতে পারব – যদি আমরা জানি মহাবিষুব থেকে কত দিন কেটেছে সে সংখ্যাটা জানতে পারি। উদাহরণস্বরূপ আমরা যদি জানি আজ ২২ জুন গ্রীষ্ম solstice এবং সূর্য দুপুরে ৯০ডিগ্রিতে অবস্থান করছে, আমার অক্ষাংশ হবে কর্কটক্রান্তির রেখায় যা ছিল তাই। কিন্তু আজ যদি ২ জুলাই হয় আমরা তাহলে কর্কটক্রান্তই থেকে দূরে সরছি। ২২ জুন বা ২ জুলাই এই তারিখগুলি কোন মানে রাখে না, যদি না আমরা সঠিক পঞ্জিকার সঙ্গে পরিচিত হই, সে পঞ্জিকা আদতে আমায় মহাবিষুব চিনতে সাহায্য করে। ফলে আমার হাতে যদি সঠিক মানের পঞ্জিকা না থাকে তাহলে কোনদিনই দুপুরে সূর্যের altitude দিয়ে, অক্ষাংশ নির্নয় করতে পারব না।

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা - নৌবিদ্যা, অঙ্ক এবং জ্যোতির্বিদ্যা – একটি পাগান(জনজ্ঞান – লৌকিক) জ্ঞান১

ডি পি আগরওয়াল, লোকবিজ্ঞান কেন্দ্র, আলমোড়া
জানি মারতে উঠবেন। যদি বলি কলম্বাস এবং ভাস্কোদাগামা দক্ষ নাবিক ছিল না। সে সময় ইওরোপিয়রা মূলত সমুদ্র চিনত মানচিত্র এবং চার্ট নির্ভর ডেড রেকনিং প্রযুক্তি নির্ভর করে। ফলে তারা অজানা অচেনা সমুদ্রে পথ খুঁজে পেত না। এই প্রহেলিকার মধ্যে আদতে লুকিয়ে আছে ইওরোপিয়দের অঙ্ক না জানার গপ্পটা। ইওরোপে সময় মাপন – সে পঞ্জিকাতেই হোক বা ঘড়িতেই হোক ষোড়শ শতকে এক্কেবারেই ইনএকিউরেট ছিল। এটা রাষ্ট্র এবং চার্চ উভয়ের কাছে খুব এমবারাসিং অবস্থা। সে তুলনায় উপমহাদেশ সে সময় অনেকটাই এগিয়েছিল। ইওরোপে সে সময় সব থেকে ধনীতম অঞ্চল ছিল মুসলমান শাসন অবসান হওয়া স্পেন আর পর্তুগাল। তারা সম্পদ সংরহে বিশ্বের কারখানা চিন আর ভারতের সঙ্গে ব্যবসা করতে উঠেপড়ে লাগল। সে সময়ে গরীবি হঠানোর একমাত্র রাস্তা ছিল উপমহাদেশ এবং চিনের সঙ্গে সরাসরি বাণিজ্য – কিন্তু সেটাও চরমতম বিপসসঙ্কুল কাজ। সে সময় ভারতের দিকে যাত্রা করা প্রত্যেকটা সফল সমুদ্র অভিযানে এক তৃতীয়াংশ বণিক পথেই প্রাণ হারাত। প্রাকৃতিক কারণে বা জলদস্যু, প্রাইভেটিয়ার্স ইত্যাদির হামলার জন্যে প্রচুর জাহাজ ডুবে যেত, লুঠ হত – এর আরেক অর্থ জাহাজে ব্যবসার জন্যে নিয়ে আসা পণ্যের সলিল সমাধি অথবা তার বিনিময়ে অর্থ না পাওয়া। ফলে ইওরোপিয়রা বাণিজ্য পথ এবং ইওরোপ এশিয়ার যাত্রাপথ সুরক্ষিত করার উদ্যোগ নিতে থাকে। এর একটা হাতিয়ার হল এশিয় অঙ্কের জ্ঞান আহরণ করা, এবং সেই জ্ঞান সম্বল করে ইওরোপিয় প্রাথমিক স্বচ্ছলতার দিকে যাত্রার পথ নির্নয়।
হ্যাঁ কলম্বাস বা ভাস্কো হয়ত দক্ষ নাবিক ছিল না, কিন্তু তারা ভয়ডরহীন অভিযাত্রী ছিল। এদের কেউই ভারত আরব বা চৈনিকদের মত মহাকাশ নির্ভর নৌবিদ্যা জানত না। তারা শুনেছিল আরবি নাবিকেরা এই ধরণের জ্ঞান অর্জন করেছিল, কিন্তু তারা বুঝতে পারে নি।
অক্ষাংশ দ্রাঘিমাংশ নির্ভর করে কলম্বাস যাত্রা শুরু করে কিউবার পৌঁছবার চেষ্টা করে পৌঁছলেন কেপ কডেএ। ভুল কলম্বাস বোঝনি শুধু নয় বরাবরই দাবি করেছে সে তার গন্তব্যে পৌঁছেছেন। এর থেকে প্রমান হয় কলম্বাসের জ্ঞানহীনতা। এরপরেও যত কটা সে চেষ্টা করেছে, সব ভুল দিক নির্দেশ করে ভুল যায়গায় পৌঁছে দিয়েছে।
একইভাবে ভাস্কো ভারতীয় মুসলমান নাবিক মালামো কানার দিক নির্দেশিকা না পেলে তাকে চিরতরে আফ্রিকার মেলিন্দে উপকূলেই ঘুরতে হত। মালামো সদ্মুদ্রের অক্ষাংশ মাপার জন্যে কমল নামে একটি খুব সাধারণ দেখতে – একটা কাঠের চাকতির সঙ্গে গিঁটলাগা একটা দড়ি জোড়া একটা যন্ত্র ব্যবহার করত যার নাম কমল বা রূপলাগি। The local latitude is almost the same as the altitude of the pole star, or its angular elevation above the horizon. To determine the altitude of the pole star, the wooden board is held in front of the eye, at an appropriate distance, so that it blocks the portion between the horizon and the pole star, and the distance from the eye is measured. Holding the string between the teeth, and counting the number of knots, one measures the distance. In the Arabic-Malayalam language, the pole star is hence called kau, which also means 'teeth'. Vasco da Gama, not understanding the principle of the instrument, thought the pilot was telling the distance with his teeth! He further recorded that he carried back a couple of copies of the instrument to get it graduated in inches! (The instrument involves a harmonic scale, whereas inches refer to a linear scale, so that graduating it in inches is intrinsically impossible.)

Monday, June 17, 2013

ব্যবহার নির্ভর করে মালাবার উপকূলের নৌ যান বিভাগ১, types of marine vessels of malabar coat1

ভারতীয় সাহিত্যে জাহাজ(জলযান)গুলির চরিত্র
বিভিন্ন ধরণের জাহাজ তৈরির প্রণোদনা এসেছিল মানুষের বিভিন্ন চাহিদার সূত্র থেকে। ভারতের প্রাচীন সাহিত্যে বিভিন্ন ধরণের জলযানের বিশদ বিবরণ উল্লিখিত রয়েছে। পানিনির অষ্টাধ্যায়ীতে দুটি ধরণের নৌযানের কথা উল্লিখিত রয়েছে দ্বৈপায়(উপকূলের দ্বিপগুলিতে ব্যবসার উদ্দেশ্যে) আর দ্বৈপ বা দ্বৈপক (সমুদ্রস্থ দ্বীপে ব্যাবসার জন্য)।  যুক্তিকল্পতরুতে যা বলা হয়েছে সেটি আমরা পূর্বেই বিশদে আলোচনা করেছি।

ব্যবহার নির্ভর করে মালাবার উপকূলের নৌ যান বিভাগ
মালায়ালি ভাষায় অন্তত ৩৮ টি নৌকোর বিভাগের নাম পাওয়া যাচ্ছে। এগুলো সবই অযান্ত্রিক। নৌকোগুলো ভাগ করা হয়েছে মাছধরা, যাত্রী পরিবহন, পণ্য পরিবহণ, দস্যুতা, ক্রীড়া, এবং সমুদ্রে যাওয়া এই ছয়টি ভাগে।

মাছধরা
আজও মালাবার উপকূলের প্রায় গভীর সমুদ্রে যে সব নৌকো মাছ ধরতে যায় সেগুলির ঐতিহ্য বহু পুরনো। সেগুলির নাম কান্নাটম। মালায়ালি ভাষায় অন্য নামটি হল কাত্তুমারাম এবং কালাত্তাতি। তবে মাছ ধরা, পণ্য এবং যাত্রী পরিবহন, এই তিনটি কাজে যে সব জাহাজ ব্যবহার হয় তাদের নাম পারু, ওটাম, ভালাম, ভান্সি। ক্যাম্পাট্টনি এবং কছুভাল্লাম মাছ ধরার কাজে ব্যাবহার হয়। গুন্ডারত দুটি মাছ ধরার নৌকোর নাম দিচ্ছেন চম্পা আর ওটাম। মাছ ধরা নৌযানগুলো সাধারনত কীল ব্যবহার করে তৈরি হত না, বরং গাছ চেঁছে এবং প্লাঙ্ক বিল্ট করে তৈরি হত।

যাত্রীবাহী  নৌযান
মালায়ালি সাহিত্যে এদের নাম টোনি ছাড়াও কাতাভুটোনি, কেভটনি, কাত্তুটনি, ররনি এবং উড়ু পাওয়া গিয়েছে। প্রণালীগুলো পার হওয়ার জন্য, চামড়া ব্যাবহার করে নৌযান তৈরি হত। এর নাম তোলোটাম।

যাত্রীবাহী নৌযান
মালাবারের বিশাল নদীজাল, হ্রদ এবং সমুদ্র বাহিত হয়ে ব্যবসা করার জন্য বিশেষ নৌকো ব্যবহার হত। পশ্চাৎভূমি থেকে বন্দর, বন্দর থেকে বিদেশে অথবা বিদেশ থেকে পণ্য এনে পসচাৎভুমিতে পণ্য বহন করে নিয়ে যাওয়ার জন্য আলাদা আলাদা জলযান ব্যবহার হত। এদের নাম টোনি, পাটাভু, বটু, ভাল্লাম, ওটি, পাট্টামারি, সিভাটা, প্লাভাম, কাপ্পাল। ওটাম ব্যাবহার হত চিন এবং সুমাত্রায় ব্যাবসার জন্য। ঊরুও বিশাল বড় জাহাল যাতে ১৫০০টি বড়ও গুঁড়ি বয়ে নিয়ে যাওয়া যেত। টম পিরেজ় লাদাস নামে এক ধরণের চ্যাপ্টা তল বিশিষ্ট নৌ যানের কথা বলছেন, যাতে আরও বেশি পণ্য বহন করে নয়ে যাওয়া যেত।


জলদস্যুদের যান
ইবন বতুতা এবং মার্কো পোলোর বর্ণনায় মালাবার উপকূলে জলদস্যুর বর্ণনা পাওয়া যাচ্ছে। প্রচুর ছোট ছোট খাঁড়ি, আঁকা বাঁকা খালের মত নদী, অসমান ভঙ্গুর উপকূল, প্রায় সারা বছরের বানিজ্য, কোনও একটি রাজার আধিপত্য না থাকা ইত্যাদির জন্য হয়ত মালাবার উপকূলে জলদস্যুর প্রাদুর্ভাব হয়। তারা সাধারনতঃ মধ্যম গতির জাহাজ আক্রমন করত, খুবই দ্রুতগামী নৌকোয়। মালায়মে জলদস্যুদের প্রতিশব্দ কাল্লাম। জাহাজগুলোরও প্রায় একই নামে হত। কাল্লাপাট্টাকু, কাল্লাপাকু, কাদালকাল্লামারুদেভানসি, কাল্লাকাপাল এবং ইরুট্টুকুথিভাল্লাম ইত্যাদি।

খেলাধুলোর নৌকো
পূর্বের ত্রাভাঙ্কোর রাজ্যের আলেপ্পে জেলার পাথানামথিটায় প্রচুর বাইচের নৌকো দেখাযায়। ওনামেরমত সাংস্কৃতিক উতসবে জলযানগুলোর মধ্যে ক্রীড়া প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। এগুলির গঠন শৈলী এমনই হয় যাতে দ্রুত জল কেটে চলতে পারে। কুন্ডম ভাল্লম, ভেপ্পু ভাল্লম, ওডি বা ইরুট্টুকুথিভাল্লাম এবং চুরুলাম ভাল্লাম।

যুদ্ধযান
মালাবার উপকূলে চের, জ়ামিরন, ত্রাভাঙ্কুর রাজাদের মধ্যে বৈরিতা ছিল অপরিসীম। যেসব নৌকো যুদ্ধে ব্যবহার হত, সেগুলর নাম ছিল, উরুম কাপ্পাল। পাটাকাপ্পাল এবং অন্তঃবাহিনীকাপ্পালের মত ডুবো জাহাজের নাম মালায়লম সাহিত্যে উল্লেখ রয়েছে।


তৈরির পদ্ধতি অনুযায়ী নৌযানের বিভাগ

র‍্যাফট বা ক্যাটামেরন
মালাবার থেকে করমন্ডল তট হয়ে বিস্তৃত ওডিশা উপকূল পর্যন্ত ক্যাটামেরন প্রকৃতির জলযানের উপস্থিতি ছিল। কোল্লাম এবং ত্রিভান্দ্রম এলাকায় মৎস্যজীবীরা ক্যাটামেরন ধরনের নৌ যান ব্যাবহার করতেন। এ ছাড়াও পরব সমাজও এধরনের নৌযান ব্যবহার করতেন।

গাছের গুঁড়ি চেঁছে নৌকো
নাম থেকে তার তৈরির পদ্ধতিটি পরিস্কার(যেমন বাঙলায় তালগুঁড়ি চেঁছে নৌকো)। একজনের বসার টোনি থেকে আট জনের বসার জন্য তৈরি ওডামস নামের নৌকো। কেরলের দক্ষিণ থেকে উত্তর অঞ্চলে  আজও ব্যবহার হয়। এধরনের নৌকোর নাম ওরুতাডিভালাম, সিনিভালাম, কারামাডি ভালাম, কাম্বাভালাভালাম, টোনি, ভেপ্পুটোনি, ওডাম, কচিভানসি, চেরুভানসি এবং ভিক্কুটোনি। এই নামগুলো দেওয়া হত কতগুলি গুঁড়ি নিয়ে, কত বড়, কত মানুষ বসত সেই বিষয়টি ধরে। যেমন একটি গুঁড়ি দিয়ে তৈরি নৌকোর নাম ওরুটাডিভাল্লাম, কচুভানসি ছোট নৌকো, যাতে একজন বা দু জন বস্তে পারে। এই নৌকোগুলো বেয়ে খালে, বিলে বা নদিতে মাছ ধরা হয়।

প্লাঙ্ক নৌকো
আজকের কেরলে নদী বা খাঁড়িতে বেশ কিছু সাধারন ধরণের নৌকো দেখা যায়। এগুলো ক্যাটামেরন বা চাঁছা নৌকোর গড়ন, চরিত্র এবং কাজের ব্যাবহার থেকে অনেক আলাদা। এগুলো একইধারে মাছ ধরা, যাত্রী বহন, পণ্য পরিবহণ এবং খেলাধুলোর কাজে ব্যাবহার হয়ে থাকে। প্লাঙ্ক জোড়া হিসেবে এগুলি দুভাগে ভাগ করা হয়।

সেলাই এবং প্লাঙ্ক বিল্ট
প্লাঙ্কগুলি জুড়ে জুড়ে সেলাই করে তৈরি হয় নৌকো। নারকেলের ছোবড়ার সুতো দিয়ে এই জুড়ে সেলাইএর কাজ করা হয়। শেল গুলির মধ্যে রিব ব্যাবহার হয়, কীল এবং প্লাঙ্কের সাপোর্ট দিতে। এধরনের নৌকোর নাম, পাট্টি, কাট্টুভাল্লাম,  চন্দন ভাল্লাম, কোম্বান ভাল্লাম, ভালিয়াভাল্লাম, কারাক্কু ভাল্লাম, কেভু ভাল্লাম, চারাক্কু ভাল্লাম, পাট্টারমাড়ি, কাটাট্টু ভাল্লাম। নামগুলো থেকে পরিস্কার এই নৌকোগুলো কোন কাজে লাগে। যেমন ভালিয়াভাল্লাম মানে বড় নৌকো চারাক্কু ভাল্লাম মালপত্র পরিবহণ করে। পাট্টারমাড়ি, চারাক্কু ভাল্লাম, এবং কেভু ভাল্লামএ কীল এবং অন্য কীলার রয়েছে। অনেক সময় এই নৌকোগুলোকে কেভু ভাল্লাম, এই এক নামে ডাকা হয়। উত্তর মালাবারে পাট্টি খুব চলতি নৌকো। আলেপ্পি জেলায় লম্বা নৌকোর নাম চুন্দান ভাল্লাম। কেরলে ব্যাপক হারে সড়ক পরিবহণ শুরু হওয়ার আগে কেভু ভাল্লাম নৌকো দিয়েই পণ্য পরিবহণ হত। আজও বিল, খাল এবং খাঁড়িতে পণ্য পরিবহনের কাজে এ ধরণের হউক ব্যাপক ভাবে ব্যাবহার হয়। এই নৌকোগুলোর বড় সুবিধে হল প্রচুর পরিমানে পণ্য দ্রব্য বয়ে নিয়ে যেতে পারে। এই নৌকোগুলো এটি বড় হয় যে, এই নৌকোতে অনেকগুলো প্লাঙ্ক থাকে এবং এক একটা প্লাঙ্ক জুড়ে জুড়ে বিভিন্ন ধরণের পন্যের জন্য আলাদা আলাদা কুঠুরি তৈরি করা যায়। যেহেতু এই নৌকোগুলো বহুদিনধরে নদিতে থাকে তাই পুরো নৌকোটিকে নারকেল পাতায় ছেয়ে পন্যগুলকে রক্ষার ব্যবস্থা করা হয়। বড় বাঁশের লগি, কাঝুক্কোল দিয়ে নৌকোটি বাওয়ার ব্যাবস্থা আছে। এধরনের নৌকো ব্যাবহার করে ব্যাবসায়ীরা এক্কেবারে দক্ষিণ মালাবার থেকে কোচিন এবং কালিকট রাজ্যএ ব্যাবসা করতে যেত।
পাট্টীমাড়ি আরও একধরনের বিশাল আকারের পাল তোলা নৌকো, যেগুলি দূর দেশে ভ্রমনের জন্য ব্যবহার হত। আরেক ধরণের নৌকোর নাম পুঝা ভান্সি। এগুলো চাল, গোল মরিচ এবং নারকেল বহনের কাজে ব্যাবহার হত।

নেইলেড এবং প্লাঙ্কড নৌকো
এধরনের নৌকোগুলো সাধারনত সমুদ্রে মাছ ধরার কাজে, ফেরি চলাচলের, পণ্য পরিবহনের কাজে এবং খেলাধুলোর জন্য ব্যবহার হয়ে থাকে। ক্যাম্পাট্টোনি, ক্যাভম,সেম্বকটনি, পিলাইভার বট এবং কিলনেট বট।শুধু বাইচের জন্য ব্যাবহার হয় ইরুট্টুকুট্টি, কোভাল্লাম, পাল্লিয়ডাম, ওড়ি, চুন্দানভাল্লাম। এগুলো নেইলেড নৌকো। প্লাঙ্কসগুলো জোড়া লাগানোর কায়দাটি কিন্তু আলাদা এই নৌকোগুলোয়, যেহেতু এগুলতে নেইল ব্যবহার হয়ে থাকে। নেলগুলো তামা, লোহা, এবং কাঠ দিয়ে তৈরি হয়। ইয়োরোপীয়রা লোহার নেল নিয়ে আসার পরেই এ ধরণের নেল ব্যাবহার হওয়া শুরু হয়েছে। কীল এবং প্ল্যাঙ্কগুলোকে সাপোর্ট দেওয়ার জন্য রিবে নেল ব্যবহার জরুরি।

এটি এবং এর আগের লেখাটি শিপবিল্ডিং অ্যান্ড ন্যাভিগেশন ইন ইন্ডিয়া অ্যান্ড দ্য পর্তুগিজ দিউরিং সিক্সটিন্থ অ্যান্ড সেভেন্টিন্থ সেঞ্চুরিজ – জোসেফ সি সি, থিসিস সাবমিটেদ টু য়ুনিভারসিটি অফ পুদুচ্চেরি থেকে নেওয়া।

Sunday, June 16, 2013

মালাবার উপকূলের নৌবিদ্যা, boat making of malabar coast

মুলতঃ ব্রিটিশ প্রচারে একটা সমীকরণ সারা বিশ্বজুড়ে তৈরি হয়ে ছিল, জ্ঞান মানেই ইয়োরোপ, আর সবাই পাদটীকা। বাংলার পাঠশালে শিক্ষা গ্রহণ করা রামমোহন এবং বিদ্যাসাগর দুজনেই নতুন প্রযুক্তির জন্য পশ্চিমের দিকে হাপিত্যেশ করে নতজানু হয়ে তাকিয়ে রয়েছেন। তারা দুজনেই পূর্বের জ্ঞানচর্চাকে টানমেরে পশ্চিমের পায়ে লুটিয়ে দিতে চাইছেন। দেশের শিকড়ে কুড়ুল মেরে বিদেশের ওপর দেশের নির্ভরতা তৈরির প্রথম কারিগর এই দুই ব্যক্তিত্ব। সেই কাজের প্রাপ্য লভ্যাংশ তাঁরা আজও পেয়ে চলেছেন। আজও তাঁরা প্রথম আধুনিক ভারতীয় রূপে পুজ্য রয়ে গিয়েছেন।
বিদ্যাসাগরের সময় রাজেন্দ্রলাল মিত্র, তার পরে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী অথবা দীনেশচন্দ্র সেন এবং আরও নানান মানুষ বলার চেষ্টা করছেন ভারতের জ্ঞানচর্চা, প্রযুক্তিচর্চার নানান দিকগুলিকে অন্ততঃ শহুরে চোখে ঠুলি বাঁধা ইংরেজি শিক্ষিত মানুষদের সামনে নিয়ে আসার। কিন্তু সবই প্রায় অরণ্যে রোদন হয়েছে। কেননা তাঁরা যা প্রমান করতে চেয়েছেন, তাত্বিকভাবে সে সময়, কোনও ইওরপিয় সেই কথাগুলো বলেননি। তাই তাদের বক্তব্য খুব একটা মান্যতা পায়নি। আজও একটি বৃত্তের বাইরে সেই কাজগুলো নিয়ে প্রশ্ন চিহ্ন ঝুলে রয়েছে। জোসেফ নিডহামের সায়েন্স অ্যান্ড সিভিলাইজেসন প্রকাশের পর থেকেই নতুন করে ভারতের জ্ঞানচর্চার দিকে নজর গেল। যদিও নিডহামের নিজেই ইয়োরোপের প্রযুক্তির প্রাধান্যে খুব মুগ্ধ ছিলেন। চিনা প্রযুক্তির আলোচনায়, জাতপাতভেদ, কেন পূর্বের প্রযুক্তি ধ্বংস হল ইত্যাদি বিষয় অবতারনা করেছেন অসীম ইয়োরোপকেন্দ্রিকতায়। তবুও পূর্বের জ্ঞানচর্চা বা প্রযুক্তিকে নানানভাবে ইয়োরোপের জ্ঞানচর্চা বা প্রযুক্তির বিকাশের পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার এক অজানা পথ খোঁজার কাজ শুরু হল, পূর্বের মানুষদের প্রচেষ্টায়। এই খোঁজে বোঝাগেল যে জ্ঞানচর্চা বা প্রযুক্তিগুলোকে ইউরো-আমেরিকিয় তাত্বিকেরা গ্রিসের ভিত্তি বলে দেখাতে চাইছিলেন, তার অধিকাংশেরই সূত্র কিন্তু গাঁথা রয়েছে পূর্বের দেশগুলোর সঙ্গে, বিশেষ করে ভারতের জ্ঞানচর্চার বিকাশের সঙ্গে। এই বোঝানোর বড় তাত্বিকতা নিজের কাঁধে তুলে নিলেন এডওয়ার্ড সইদ, তাঁর ওরিয়েনটাল-ইজম তত্বে। জানাগেল পশ্চিম যেগুলোকে নিজেদের তৈরি বলে বড়াই করছিল তাঁর অধিকাংশই পূর্ব থেকে পশ্চিমে গিয়েছে। যেমন অঙ্ক। জর্জ জোসেফ অপূর্ব দক্ষতায় ক্রেস্ট অব দ্য পিকক বইতে কেরল অঙ্কের কুড় খুঁজেছেন। বলেছেন নিউটন বা লিবনিৎজ় কলনবিদ্যার জনক নন। এর সূত্র খুঁজে পাওয়া যাবে কেরল-এ নীলকান্তর তন্ত্রসংগ্রহে, জয়স্থদেবের যুক্তিভাষায়, পুতুমানা সোমাইয়াজির করণ পদ্ধতিতে এবং শঙ্করভরনমের সদরত্নমালায়। আর এই অঙ্কবিদ্যার ভিত্তিভূমির ওপর গড়ে উঠেছিল দক্ষিণ ভারতের বিশাল নৌযান তৈরি এবং বাণিজ্যে যাওয়ার গর্বিত ঐতিহ্য। তাত্বিকভাবে নৌযান তৈরির বিদ্যা এবং সমুদ্রযাত্রা পরস্পরের হাত ধরাধরি করে এগিয়েছে। লোথালের ড্রাই ডক থেকে চোল রাজের উদ্যমে সমুদ্র কুনহালি মারাক্কারের যাত্রা ভারতের অদম্য জ্ঞানচর্চা ইতিহাসের দিকে আঙ্গুল দেখায়। ভারতের বহুবিধ সংস্কৃতির মতই, কয়েক সহস্রাব্দধরে এই প্রযুক্তি নানান অঞ্চলে, নিজেদের চাহিদা, উপকরণ, সামর্থ্য ইত্যাদির উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল।
এর আগে আমরা ভারতের করমন্ডল উপকূলের নানান ধরণের নৌকো, তার জ্ঞানচর্চা নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছি। বিশদ আলোচনা হয়েছে রাজা ভোজের নামে চলা যুক্তিকল্পতরু নামক পুঁথির বিষয় এবং আদতে এই পুঁথিটি রাজা ভোজের রচনা কিনা তাই নিয়েও পণ্ডিতদের নানান সংশয় নিয়ে। সেই প্রবন্ধে আমরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে, এই রচনাটি রাজা ভোজের নামে, জনৈক বাঙ্গালী তান্ত্রিকের রচনা, এবং রচনাকাল ভোজ রাজার সময়ের অন্ততঃ তিনশ বছর পরের সময়ের। এই প্রবন্ধে আমরা মালাবার উপকূলের সমুদ্রযান এবং সমুদ্রবিদ্যার বিষয়ে আলোচনা করব। 
একদিকে পাহাড়ি ভুমি অন্যদিকে অনন্ত সাগর – এই নিয়ে মালাবার। সমুদ্রের টানে বহু শত বছর ধরেই এই অঞ্চলের মানুষ সমুদ্রকে ভিত্তি করে তার বেঁচে থাকার উপায় করে নিয়েছিল। আমরা যেন মনেরাখি, মানুষের সমুদ্র ভাবনার শুরু কিন্তু প্রচুর সমুদ্রগামিনী নদী, খাঁড়ি ইত্যাদিতে হাত পকিয়ে। এর পরে সমুদ্রযাত্রার ভাবনা। মালাবারের নাবিকেরা ভারত মহাসাগরের নানান দ্বীপে নিজেদের তৈরি সমুদ্রযান নিয়ে ক্রমশঃই পৌঁছতে শুরু করে। মালাবারের প্রভাব আজও দেখাযাবে লক্ষদ্বীপের নৌযান তৈরির কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে।
প্রথম খ্রিস্টাব্দে পেরিপ্লাস অব দ্য এরিথ্রিয়ান সিতে মালাবার উপকূলের দুটি বন্দর ক্রাঙ্গানোর (মু্যিরিজ) আর পোরাক্কাদু(বারেস)র উল্লেখ রয়েছে। ক্রাঙ্গানোরের সঙ্গে রোমের খুব ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। ভারতের সঙ্গে বানিজ্যকে অক্ষুন্ন রাখতে রোমানরা ক্রাঙ্গানোরে অগাস্টাসের মন্দির উৎসর্গ করে। কেরলের বহু স্থান থেকে প্রচুর রোমের মুদ্রা পাওয়া গিয়েছে। এই ২০০০ বছর ধরে দক্ষিণ ভারতীয়রা পারস্য উপসাগর এবং লোহিত সমুদ্রের আদেন, অরমু্য এবং মোকা বন্দরে তাদের জাহাজ নিয়ে যাত্রা করেছে। মারকো পোলো বলছেন ভারতের জলযান চিনের ফু চাউ পারস্য উপসাগরের হরমুজ বন্দরে যেত। পূর্ব আফ্রিকায় মোজাম্বিকের উপকূলে বহু বণিকের কর্মকাণ্ড লক্ষ করেছেন ভাস্কো ডাগামা। মোম্বাসা আর মেলিন্দ পনহোতে বহু গুজরাতি ব্যাবসায়ি ব্যাবসা করতে যেতেন। বহু দেশের নাবিকেরা ভারতীয়দের সঙ্গে কথা বলে এই দক্ষতা অর্জন করার চেষ্টা করতেন। তাদের অপূর্ব দক্ষতার জন্য তাদের সংগে তুলনা চলত ভেনিস এবং জেনোয়ার নাবিকদের (যদিও ইওরপিয় নাবিকদের মত ভারতীয়রা, কোনও একটি দেশ - ভারত, খুঁজতে গিয়ে আরেকটি দেশ - আমেরিকা বা ওয়েস্ট ইন্ডিজ আবিষ্কার করেন নি)।
চের রাজার নাবিকেরা ব্যবসা করতে যেতেন কালিকট, কদুঙ্গাল্লুর, কোল্লমের মত পূর্ব পশ্চিম উভয় উপকুলের বন্দর থেকে। ইবন বতুতা বলছেন আদেন বন্দরে ভারতীয়দের স্থায়ী বসতি ছিল এরা থানা এবং কুইলন থেকে প্রায়শঃই যাত্রা করতেন। থোম পাইরেজের মালাবার উপকূলে ৪০০টি সমুদ্রগামী জাহাজ ছিল, এরা ক্যাম্বে, করমন্দল, শ্রীলংকা এবং মলদ্বীপে ব্যবসা করত। বলোনার লুদভিকো ডি ভারথেমার লেখায় মালাবারের ব্যবসায়িদের, মালাবার থেকে পারস্য উপসাগরে ব্যবসার বর্ণনা রয়েছে। রোম থেকে পূর্ব আফ্রিকার উপকূল থেকে পারস্য উপসাগর এবং লোহিত সাগরে ভারতীয় ব্যাবসায়িদের সমুদ্র যাত্রা বিশ্বজোড়া বিপুল ব্যবসার দিকে ইঙ্গিত করে। অর্থাৎ পতুগিজ বণিকদের(না খুনি) ভারত পদার্পণের বহু সহস্র বছর আগে থেকে ভারতীয়রা বিশ্বজুড়ে ব্যাবসা করেছে। ঔপনিবেশিক সময় থেকে ইয়োরোপীয় বিদ্বানরা প্রমান করতে চাইতেন ভারতের সমুদ্র যাত্রার শিক্ষা পর্তুগিজদের থেকে হয়েছে। অথচ পর্তুগিজ নাবিকেরা ভারতে এসে নতুন সমুদ্রবিদ্যার সন্ধান পাচ্ছেন।
মালাবার উপকূলের সমুদ্রবিদ্যা চর্চার প্রমান লক্ষদ্বীপের নানান পুঁথিতে রয়েছে। নাবিকদের লেখা রহমানি আর রোজনামায় ভারতের নানান উপকূলভূমির বর্ণনা পাওয়াযায়। আরবু-তামিল, আরবু-মালায়লম ভাষায় প্রচুর পুঁথি আজও মালাবার উপকূলের নানান স্থানে পাওয়া যার। পুঁথিগুলো যদিও এই দুই ভাষায় লেখা, কিন্তু লিপি আরবি অক্ষরে। লক্ষদ্বীপ সোসিও-কালচারাল সোসাইটি লক্ষদ্বীপ নাবিকাশাস্ত্র পরম্পারায়মে এ ধরণের বহু পুঁথি প্রকাশি করেছে। মাস্তিন সেখ, আলিয়ার থাঙ্গল আর তাপ্পু কান্নাকুর তিনটি পুঁথি পাওয়া গিয়েছে। এতে সমুদ্র যাত্রায় আকাশ, বাতাস, খারাপ আবহাওয়া, তারা, এবং নৌ যাত্রার জন্য কন্সটেলেশন, অক্ষাংশ-দ্রাঘিমাংশ, বন্দরের স্থান, মরশুম, যাত্রা শুরুর তারিখ ইত্যাদির বিশদ বর্ণনা রয়েছে। 

ভারত সমুদ্রে নৌ যাত্রার জন্য নানান ধরণের জাহাজ তৈরি করা হত। কোন ধরণের জলে, কোন ধরণের বানিজ্য দ্রব্য, কোন আবহাওয়ায় যাত্রা হবে, এই সব বিচার করে জাহাজ তৈরি হত। ক্যাম্বে উপসাগরের উত্তাল সমুদ্রের জন্য নানান ধরণের জাহাজ তৈরি হত। এদের নাম দেওয়া হত বালাম, বাঘলা, কতিয়া, গালিবাত, গ্রাব, পাত্তামার ইত্যাদি।  ১৫০০সালের পরে ভারত মহাসাগরে নতুন ধরণের জাহাজ তৈরি হওয়া শুরু হল। গুজরাট আর মালাবারে এগুলোকে কোটিয়া নামে আর পারস্য উপসাগরে এগুলো বাঘলা নামে চিহ্নিত হত। ভারতের পশ্চিম উপকূলের সমুদ্র আর জাহাজ শিল্প অনেকটা ইসলামের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে। অনেকগুলি সাধারন হাল(common hull) ডিজ়াইন করা হত এবং এতে অনেকগুলো লাতিন সেল(lateen sail)। নৌযান তৈরিতেএই হালগুলির বিশদ ডিটেল আঁকা জরুরি ছিল, নয়ত হাওয়া নিয়ন্ত্রণ(পক্ষে বা বিপক্ষে) বা সমুদ্র স্রোত নিয়ন্ত্রণ করা যেমন কঠিন হত তেমনি জাহাজের যাত্রীদের অবস্থাও শোচনীয় হয়ে পড়ত। পর্তুগিজ আমলের আগে মুলতঃ জাহাজগুলোর মালিক কারিমি ব্যবসায়িরা ছিল। এই জাহাজগুলো প্রধানতঃ লোহিত সাগর এবং ভারতের মধ্যে চলাচল করত। এই জাহাজে সশস্ত্র যোদ্ধা নিয়োজিত থাকত জলদস্যুদের মোকাবিলার জন্য। 
এর পরের লেখটি হবে নৌকোগুলোর বিভাগ বর্ণনা। 

Thursday, May 30, 2013

যুক্তিকল্পতরু কি সত্যি রাজা ভোজের রচনা, নাকি রটনা


আলীগড় জার্নাল অব ওরিয়েন্টাল স্টাডিজের ১৯৮৬এর বসন্ত সংখ্যায় ইউ সি শর্মার সম্পাদনায় একটি প্রবন্ধ, দ্য সোর্সেস অ্যান্ড অথরশিপ অব দ্য যুক্তিকল্পতরু, প্রকাশিত হয়। লেখক শ্রীরামুল রাজেশ্বর শর্মা । এই প্রবন্ধে নানান যুক্তি তর্ক উল্লেখ করে সম্পাদক, এবং লেখক শ্রীরামুল রাজেশ্বর শর্মা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হচ্ছেন যে, এই পুঁথিটি রাজা ভোজের রচনা নয়। লেখক, তাঁর প্রবন্ধে যে যুক্তিগুলি ক্রমান্বয়ে সাজিয়ে দিচ্ছেন, সেগুলি এবারে পরপর সাজান গেল-
১। ইতিহাসের প্রমান রাজা ভোজ বহু ধরণের বিষয় নিয়ে বহু পুঁথি রচনা করেছেন। কিন্তু যুক্তির পরের লেখা কোনও রচনায় এই পুঁথিটির উল্লেখ নেই। এই পুঁথিটি প্রথম আবিষ্কার করেন ১৮৭১এ রাজা রাজেন্দ্রলাল মিত্র(নোটস অন সংস্কৃত মানুস্ক্রিপ্ট। এছাড়াও  ইন্দো-আরিয়ান্সএ,  ফার্নিচার, ডোমেস্টিক ইউটেনসিলস, মিউজিক্যাল ইন্সট্রুমেন্টস, আর্মস, হরসেস অ্যান্ড কারস ইন অ্যানসিয়েন্ট ইন্ডিয়া শীর্ষক প্রবন্ধ রচনার সময় তিনি যুক্তি থেকে নানান তথ্য ব্যাবহার করেছেন)। রাজেন্দ্রলালের বক্তব্য ছিল এটি ভোজের সময়ের অনেক পরে লেখা হয়েছে। কিন্তু যুক্তির তিনটি পুঁথি ধরে ১৯১৭তে ঈশ্বরচন্দ্র শাস্ত্রীর সম্পাদনায় প্রকাশিত পুস্তকএর(যুক্তিকল্পতরুহ মহারাজাশ্রীভোজবিরচিতহ, ক্যালকাটা ওরিয়েন্টাল স্টাডিজ) সংস্কৃত ভাষায় লেখা মুখবন্ধে তিনি দ্ব্যর্থহীনভাবে এই রচনাটির কৃতিত্ব রাজা ভোজকে অর্পণ করেন। সেই মুখবন্ধে তিনি উল্লেখ করেন Aufreche(Theodor Aufreche, Catalogus Catalogorum, Leipzig, 1891) এর সেই কুখ্যাত উদ্ধৃতি, ভোজের নামে যে কয়টি পুঁথি বাজারে চলছে, তাঁর একটিরও রচনাকার রাজা ভোজ নন, হয় তাঁর সময়ের কোনও লেখক অথবা তাঁর পরের সময়ের কোনও যশস্বী। ঈশ্বরচন্দ্রএর বক্তব্য, ভোজের অন্য সব রচনা অন্য গুপ্ত লেখকের হলেও হতেপারে, কিন্তু যুক্তিটি অবশ্যই রাজা ভোজ রচনা করেন। উল্লেখ্য, শাস্ত্রিজি পুঁথিতে যা দেখেছেন, সেটিই তিনি ছেপেছেন। যেহেতু তিনি পুঁথিটি সম্পাদনা করেন নি, পুঁথিটি বিশ্লেষণ করেননি, ফলে অনেক সময় তিনি পথভ্রষ্ট হয়ে অদ্যন্ত ভুল তথ্য উল্লেখ করে গিয়েছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন তাতে ভবিষ্যতে গবেষকদের বেশ অসুবিধাই হয়েছে।
তবুও ভারতীয় জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে যুক্তির অন্য একটি স্থান রয়েছে। প্রায় এক হাজার বছর পূর্বের ভারত সমাজের নানান ব্যাবহারিক বিষয় নিয়ে যেহেতু এটিতে বিশদে আলোচনা রয়েছে, ফলে ভারতেতিহাসের জিজ্ঞাসুদের সামনে যুক্তি একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ সন্দর্ভ।
যদিও পুঁথির শুরু আর শেষ পৃষ্ঠায় রচয়িতা হিসেবে রাজা ভোজের নামোল্লেখ রয়েছে, কিন্তু পুঁথিবিদরা যখন খুব খুঁটিয়ে যুক্তি পড়ছেন, তখনই সন্দেহ ঘনীভূত হচ্ছে। যুক্তির পাশাপাশি ভোজরাজের সমরাঙ্গনসুত্রধর(এখন থেকে সুত্র)কে রাখাযাক। প্রথম পুঁথিতে পাঁচটি যুক্তি বরাদ্দ রয়েছে স্থাপত্যবিদ্যায় – দ্বন্দ্বযুক্তি, নাগরীযুক্তি, বাস্তুযুক্তি, রাজগৃহযুক্তি আর গ্রহযুক্তি। দ্বন্দ্বযুক্তি আলোচনা করেছে দুর্গ বিষয়ে। ভারতীয় কোনও জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে দুর্গের সমনাম দ্বন্দ্ব নয়। মধ্য ভারতেতো নয়ই। এটি যুক্তির একটি বিশেষত্ব। পি এ মানকড ১৯৯৩-৩৬এ, অ্যানালস অব দ্য ভান্ডারকর ওরিয়েন্টাল রিসার্চ ইন্সিটিউটে, সমরাঙ্গনসুত্রধর অ্যান্ড যুক্তিকল্পতরুঃ হোয়েদার দিজ ওয়ার্ক্স আর প্রোডাকসনস অব ওয়ান অ্যান্ড দ্য সেম কিং ভোজ অব ধারা নগরী নামে, দুটি পুঁথিকে পাশাপাশি রেখে তাদের বিষয়, রচনাশৈলী, ভাষা, প্রযুক্তিগত টার্ম, পরিমাপের একক, স্থাপত্যের নিদান ইত্যাদি বিষয়ে বিশদ তুলনা টেনে একটি অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ রচনা করেন। তাঁর বক্তব্য হল এই দুটির একটি যদি রাজা ভোজের হয়, তবে অন্যটি কোনোভাবেই তাঁর রচনা হতে পারে না।
নানান শ্লোক বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে,  যুক্তি এমন কিছু উদ্ধৃতির উল্লেখ করছে, যা নিঃসন্দেহে ভোজের সময়ের পরের রচনা। বিশেষকরে মনিমুক্তা বিষয়ের অধ্যায়টি। এই অধ্যায়টি পুঁথিটির সব থেকে বড়, ৪৮০টি শ্লোক বিশিষ্ট। অগস্ত্যসংহিতা ছাড়া, রত্নপরীক্ষা বিষয়ে যত রকম পুঁথি রয়েছে, সেগুলির থেকেও এই অধ্যায়টি বেশ বড়। এখানে গরুড়পুরাণএর উল্লেখ রয়েছে ১২ বার। বাস্তবে গরুড়পুরাণ থেকে ১৬০টি শ্লোক সরাসরি তুলেছে যুক্তি। ৫টি শ্লোকে বিষ্ণুধর্মোত্তর থেকে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই শ্লোকগুলি আসলে বিনষ্ট হয়ে যাওয়া অগ্নিপুরাণের। একটি শ্লোকে বিষ্ণুধর্মোত্তর এবং গরুড়পুরাণ দুটিরই উল্লেখ রয়েছে। রত্নপরীক্ষার এই অধ্যায়টি পদ্মরাগপরীক্ষা এবং বজ্রপরীক্ষা, এই দুটি বিভাগে বিভক্ত। এটি যুক্তিগুলিকে, যুক্তিকল্পতরুর যে পদ্ধতি, উপকরণযুক্তিতে ভাগ না করে, অধ্যায়গুলি, আসলে যার নাম যুক্তি, সেগুলি উদ্দেশ্যতে ভাগ করা হয়েছে। এই প্রবণতাটি গরুড়পুরাণ থেকে ধার করা।
আর সি হাজরার প্রবন্ধ, ইজ দ্য যুক্তিকল্পতরু আ ওয়ার্ক অব ভোজ(প্রফেসর পি কে গোদে কমেমোরেশন ভল্যুম, এম এম পাটকর আর এইচ এল হারিয়াপ্পার সম্পাদনা, পুনা, ১৯৬০)এ, ভোজ রাজের পুঁথি রচনার ভঙ্গীতে অগ্নি আর গরুড়পুরানের দীর্ঘ ছায়া দেখতে পেয়েছেন। তিনি বলছেন এই দুটি পূর্ব ভারতের তান্ত্রিকদের রচনা। অগ্নিপুরান রচিত হয়েছিল নবম শতাব্দীতে। অগ্নিপুরান কিন্তু অনেক পরে ভারতীয় জ্ঞানচর্চার নানান ধারায় উল্লিখিত হয়েছে শুধু নয়, এটি বাংলার বাইরে খুব একটা পরিচিতও পুরানও নয়, অনেক স্থানে এটি স্বীকৃতও বাংলাতেই ষোড়শ শতাব্দীর পরে এটি সীমাবদ্ধভাবে প্রচলন হয়, বাংলার বাইরে অনেক পরে। সপ্তদশ শতকের পরে এটি বাংলার বাইরে পরিচিত হতে থাকে। আর সি হাজরার যুক্তি হল, এটি রাজা ভোজের রচনা নয়। হয় তাঁর সময়ের কোনও অনুগামীর রচনা, নয়ত তাঁর সময়ের পরের কোনও অনামা বাঙ্গালী তান্ত্রিকের অমর হওয়ার পরিকল্পনা।  
এখানে আরও একটি তথ্য উল্লেখ্য, রত্নপরীক্ষা অধ্যায়টি কিন্তু শুধু গরুড়পুরাণএর অবদান এমন নয়। রত্নপরীক্ষা প্রথম রচনা করেন বুদ্ধভট্ট, পঞ্চম কিংবা ষষ্ঠ শতাব্দীতে। এর শুরুতেই ত্রিরত্ন এবং জিনএর প্রতি শ্রদ্ধা জানআনও হয়েছে। গরুড়পুরাণএর রচয়িতা বৌদ্ধ চিহ্নগুলি লুপ্ত করে দিয়ে পুরো রত্নপরীক্ষাটি গরুড়পুরাণএ টুকেদেন।
যুক্তিতে, চালুক্য রাজা,  ভূলোকমল্ল তৃতীয় সোমেশ্বরদেবএর মানসোল্লাস থেকে নব্বইটি শ্লোক নেওয়া হয়েছে। মানসোল্লাস(বা অভিলাষীতর্থচিন্তামনি নামেও পরিচিত) রচনার তারিখ নিশ্চিত করা গিয়েছে। সোমেশ্বরদেবএর পিতৃব্য আহভামল্ল প্রথম সোমেশ্বরদেব ভোজ জয় করেন। এই রচনাটি ১১২৯এর ২২ মার্চ শেষ হয়। ফলে মানসোল্লাস থেকে ভোজ রাজা এটি নিতে পারেন না। উলটোটাও হওয়া সম্ভব নয়। সোমেশ্বরদেবএর রত্ন সম্বন্ধীয় রচনা অনেক পাণ্ডিত্যপূর্ণ, মেদহীন, লেখকের প্রজ্ঞার সুস্পষ্ট ছাপ রয়েছে। অন্য দিকে যুক্তির ভাষা অনেক শিথিল, একই কথা, তথ্য অনেক বার ঘুরে ফিরে এসেছে। ১০৭ নম্বর পৃষ্ঠার ৪৩ নম্বর শ্লোকের প্রথম অংশ গরুড়পুরাণএর এবং দ্বিতীয় অংশ মানসোল্লাস থেকে নেওয়া। এছাড়াও আকরিক হিরের গড়নে বলা হয়েছে, ছটি কোণ, আঁটটি দল বারটি ধারা বিশিষ্ট। এটিকে চার বার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলা হয়েছে। ৯৮ পাতায় বিষ্ণুধর্মোত্তরপুরাণ এবনহ অগ্নিপুরাণ থেকে, ৯৭ পাতার ৫৩ নম্বরটি গরুড়পুরাণ থেকে এবং ৫৪ নম্বরটি মানসোল্লাস থেকে নেওয়া।
দ্বিতিয়তঃ সোমেশ্বর প্রত্যেক প্রত্যেক অধ্যায় শেষ করেছেন নিজের নামের ধুয়ো দিয়ে, যেমন এবম দোষা গুনাহ প্রোক্তাবজ্রানম সোমাভূজ। যুক্তির রচনাকার, একই শ্লোকের সেই ধুয়ায় সোমেসশ্বরএর নামটি তুলতে ভুলেই গেছেন, পুরো শ্লোকটিই তুলেছেন।
১৯১২তে রাধাকুমুদ মুখার্জী আ হিস্ট্রি অব ইন্ডিয়ান শিপিং লিখছেন। তিনি যুক্তির নৌযান বিভাগটি অবশ্যই দেখেছেন। তিনি মনেকরছেন রাজহস্ত শব্দটিতে রাজা শব্দটি ১৬ হাত(কিউবিট = হস্ত) নির্দেশ করে। পরে তিনি, নোট্‌স অন হিন্দু শিপিং প্রবন্ধে এটিকে সংশোধন করে ১০ হস্ত পরিমাপ বলছেন।
   শেষ পর্যন্ত আমাদের হাজরা মশাইএর তত্ব অবলম্বন করতে হয়। যুক্তির গুহ্য লেখকটি চতুর্দশ শতকের রচনাকার। তিনি অবশ্যই পূর্ব ভারতের বাসিন্দা। বাংলার অধিবাসীও হতে পারেন। এছাড়াও যুক্তির রচনাকার বলছেন পাশ্চাত্য দেশের নৌযানগুলি অপকৃষ্ট বিভাগের। একমাত্র পূর্বা ভারতের বাসিন্দারা এই যুক্তি দিতে পারেন। প্রত্যেকটি পুঁথি বাংলা অক্ষরে লেখা। এছাড়াও গামারি কাঠ দিয়ে লে কোনও কিছু তৈরির নিদান আসলে পূর্ব ভারতের কাঠ কর্মীদের প্রিয়। এছাড়াও মাছরাঙ্গা পাখির উল্লেখ পূর্ব ভারতের কথা মনে পড়িয়ে দেয়। এছাড়াও যুক্তি বাংলার আরো একটি লুপ্তপ্রায় আয়ুর্বেদ পুঁথি লৌহপ্রদীপএর উল্লেখ এই ধারনাকে আরো প্রতিষ্ঠা করে।
শেষ প্রশ্ন, যুক্তিতে বারবার ভোজ রাজের ধুয়া তোলা হয়েছে। কিন্তু রচনাটি কি সত্যি ভোজ রাজের? রাজেন্দ্রলাল মিত্র বলছেন যুক্তিতে যে ভোজ রাজার কথা বলা হচ্ছে তিনি হয়ত ধারার রাজা ভোজ। হাজরামশাইও তাই বলছেন। এটি হয়ত ভোজ রাজের রচনা নয়, কোনও অনামি লেখক যিনি ভোজসহ বহু গ্রন্থের লেখা ধার করে প্রখ্যাত রাজার নামে চালিয়েছেন। পরের দিকে শাকির আলি দেখিয়েছেন, ভোজের নামে যে কয়টি পুঁথি প্রচলিত আছে, সেখানে ভোজের নামে কোনও ধুয়া নেই।     

রাজা ভোজ এবং যুক্তিকল্পতরু


সরস্বতী-হরপ্পা সভ্যতারও আগে থেকে ভারতীয়রা বঙ্গোপসাগর, ভারত মহসাগর বেয়ে নানান দ্বীপে বাসতি স্থাপন করেছে। বেদ, জাতক, পাণিনির অষ্টাধ্যায়ী, বিভিন্ন মহাকাব্য, অর্থশাস্ত্রে বিশদে সমুদ্র যাত্রা, সমুদ্র বাণিজ্যের নানান তথ্য বিশদে উল্লিখিত হয়েছে। নানান চিত্র, খোদাই এবং খননে পাওয়া নানান প্রত্নদ্রব্যতে নৌযানের চিত্র দেখা গেলেও, বহুপরে, এগারশ শতকে রাজা ভোজের নামে একটি পুঁথি যুক্তিকল্পতরুতে সেগুলি তৈরির বিশদ বর্ণনা পাওয়া যায়।
আজকের মধ্যপ্রদেশ, একাদশ শতকের ধারা অঞ্চলের পারমার(উজ্জয়নীর রাজপুত) বংশীয় রাজা, মহারাজাধিরাজ শিষ্ট শিরমনি শ্রী ভোজদেব, সাধারণের ভাষায় রাজা ভোজের নামে চলা যুক্তিকল্পতরু (এখন থেকে যুক্তি বলাহবে) পুঁথিটি নিয়ে বিদেশী বিশেষজ্ঞতো বটেই, ভারতের ঐতিহাসিকদের অনাগ্রহ আশ্চর্যজনকই নয়, পীড়াদায়কও বটে। সম্প্রতি বলদেও সহায় এ প্রসঙ্গে একটি প্রবন্ধ রচনা করেছেন। ভোজ রাজা ৮৪টি পুঁথি রচনা করেছেন। শহর পরিকল্পনা, নৌবিদ্যা(নৌ যাত্রা এবং জাহাজ তৈরি পদ্ধতি), স্থাপত্যবিদ্যা, জ্যোতির্বিদ্যা, জ্যোতিষ, রাজধর্ম, রাজনীতি, সংস্কৃততে কাব্য, গদ্য, লেক্সিকোগ্রাফি, সংগ্রহ(এন্থলজি), ব্যাকরণ, সংগীতবিদ্যা, ভেষজবিদ্যা, দর্শনেরমত নানান বিষয় নিয়ে তিনি লিখেছেন। যুক্তিকল্পতরু ছাড়াও  রাজা ভোজের নামে সমরঙ্গন সুত্রধরেও শহর পরিকল্পনা এবং বাসস্থান সম্পর্কিত বিদ্যা বিষয়ে বিশদে আলোচনা করেছেন। বেশ কয়েক দশক ধরেই যুক্তিকল্পতরু আদৌ ভোজরাজের রচনা কিনা, সেই তথ্য নিয়েও খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠেছে। এই প্রবন্ধ শেষে সেই বিষয়টি নিয়ে আরও বিশদে আলোচনা করা যাবে।
আমরা কিছু আগেই আলোচনা করেছি, সরস্বতী-হরপ্পা সভ্যতার সময় থেকেই ভারতীয়রা নৌবিদ্যায় মাহির ছিলেন। কিন্তু সেই বাস্তবের তাত্বিকস্তরে মাপজোক বা বিশদ বিবরণ পাওয়া যায় নি। বোধহয়, ভারতবর্ষে নৌবিদ্যা বিষয়ে মাপজোকসহ প্রথম আলোচনা পাওয়া যায় রাজা ভোজের নামে চলা পুঁথিটিতে। নৌককে যুক্তিতে দুটি ভাগে ভাগ করা হয় – সামান্য এবং বিশেষ। ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল সায়েন্স আকাদেমির, ড. এ কে বাগেরমত বিশেষজ্ঞরা মনে করেন নদিতে চলাচল করা নৌকোগুলকে তিনি সামান্য অভিধা দিয়েছেন এবং অন্যগুলি হয়ত সমুদ্রগামী নৌকো। তবে ভোজ বলছেন, “all Samanya vessels, except Manthara are ambudhagati, that is sea-going”.
সাধারণ নৌকোর ১০টি বিভাগ ছিল। বড়টি লম্বায় ১২০ হস্ত, চওড়ায় ৬০ হস্ত(১ কিউবিট = ৫০ সেমি) একই উচ্চতা বিশিষ্ট। এর নাম মন্থরা। সবথেকে ছোটটি ১৬ হস্ত দীর্ঘ, চওড়া আর উচ্চতায় ৪ কিউবিট। নাম ক্ষুদ্র। নৌকোর সঙ্গে দীর্ঘ শব্দ যোগ হওয়ার প্রথম শর্ত ছিল সেটি অবশ্যই লম্বা হতে হবে আর উন্নত শব্দটি যোগ হওয়ার শর্ত ছিল সেটি বেশ উঁচু হওয়া। দীর্ঘর দশটি শ্রেণী বিভাগ ছিল। আর উন্নতর পাঁচটি। দীর্ঘর সব থেকে বড়টি ছিল ১৭৬ হস্ত ২২ হস্ত চওড়া ২৭ হস্ত উচ্চতা বিশিষ্ট। এটির নাম বেগিনী।
সবথেকে উঁচু নৌকোটির উন্নতি আর প্রস্থ ছিল ৪৮ হস্তের, আর দৈর্ঘে ৯৬ হস্ত। সবথেকে লম্বা জাহাজটির পরমাপ ছিল ১৭৬ হস্ত, ৬০ হস্ত প্রস্থ আর একই উচ্চতা বিশিষ্ট।

সামান্য জাহাজ – ১০টি বিভাগ
জাহাজের নাম            বর্ণনা                                             পরিমাপ(কিউবিট - হস্ত)
                                                                  দৈর্ঘ                প্রস্থ           উচ্চতা
১। ক্ষুদ্র                    ছোট                                ১৬                 ৪              ৪
২। মধ্যমা                 মাঝারি                             ২৪                ১২            ৮
৩। ভীম                   ওজনদার                          ৪০                ২০            ২০
৪। চপল                   দুদিকেই চলতেপারা             ৪৮                ২৪            ২৪
৫। পাটোলা               ছইয়ালা                            ৬৪                ৩২           ৩২
৬। অভয়                                                       ৭২                ৩৬           ৩৬
৭। দীর্ঘ                    লম্বা                                ৮৮                ৪৪            ৪৪
৮। পত্রপুট                যেন ভাঁজকরা কাপেরমত       ৯৬                ৪৮           ৪৮
৯। গর্ভর                   গলুইতে ঘরওয়ালা               ১১২               ৫৬            ৫৬
১০। মন্থরা                বাঁকানো                           ১২০               ৬০            ৬০

বিশেষ জাহাজ(লম্বা হওয়া প্রথম শর্ত) – ১০টি শ্রেণীবিভাগ

১। দীর্ঘিকা                লম্বা                                ৩২                ৪              ৩
২। তরণী                  স্থানীয়ভাবে যাতায়াত করার জন্য                  ৪৮           ৬      ৪
৩। লোলা                                                       ৬৪                ৮             ৮
৪। গাতভরা               তাড়াতাড়ি নষ্ট হওয়া            ৮০                ৮             ৮
৫। গামিনী                                                      ৯৬                ১২            ৯
৬। তরী                                                         ৯৬                ১২            ৯
৭। জঙ্ঘল                                                      ১২৮              ১৬            ১২
৮। প্লাবিনী                                                     ১৪৪               ১৮            ১৪
৯। ধারিণী                                                      ১৬০               ২০            ১৬
১০। বেগিনী                                                    ১৭৬               ২২            ১৭
উন্নত(উচ্চতা মূল শর্ত) – ৫ টি বিভাগ
১। ঊর্ধ্বব                  উঁচু                                 ৩২                ১৬            ১৬
২। অনুর্ধ্বব               খুব উঁচু নয়                        ৪৮                ২৪            ২৪
৩। স্বর্ণমুখী                চাঁদবদন                           ৬৪                ৩২           ৩২
৪। গর্ভিণী                 মালবাহক                         ৮০                ৪০            ৪০
৫। মন্থরা                  বাঁকা                               ৯৬                ৪৮           ৪৮

যুক্তিতে জাহাজগুলির অনেকগুলিতে নানা ধরণের ঘর তৈরি করা হত। জাহাজজোড়া ঘরের জাহাজকে সর্বমন্দির বলা হত। এগুলো রাজার সম্পদ, ঘোড়া এবং মহিলাদের বহন করত। মধ্যমন্দিরে মাঝে ঘর তৈরি হত। এই জাহাজে রাজা প্রমোদ ভ্রমনে বার হতেন। অগ্রমন্দিরের নৌকোগুলোর সামনের দিকে ঘর থাকত এবং যুদ্ধের সময়, দূর যাত্রায় ব্যবহার হত। প্রাচীন ভারতের নৌ বিশেষজ্ঞ এস আর রাও বলছেন, “even Harappan ships had cabms as indicated by the seal engravings and terracotta amulet &om Mohenjodaro”। নৌকোয় ঘরের আভাস পাওয়া গিয়েছে সাঁচিস্তুপের খোদাই আর অজন্তা শিল্পে।
ভোজরাজ এমন কিছু জাহাজের কথা বলছেন যেগুলির চারটি মাস্তুল এবং তাদের সাদা রং করার নির্দেশ দিচ্ছেন। তিন মাস্তুলের জাহাজগুলির মাস্তুলের আলাদা আলাদা রং করারও সুত্র দিচ্ছেন, একটি লাল, অন্য দুটির একটি হলুদ, আর একটি নীল।  জাহাজের সামনের অংশটি হয় সিংহ, নয় বাঘ, হাতি, মোষ বা সাপের মুখ খোদাই করার দাওয়াই দিচ্ছেন। জাহাজের গা’টি সূর্য, চাঁদ, ময়ূর, কাকাতুয়া, এবং দুটো মৌমাছির ছবি দিয়ে আঁকতে বলছেন। হয়ত এগুলি ব্যাবসায়ী গোষ্ঠীর প্রতীকছিল। অক্ষাংশ আর দ্রাঘিমাংশ মাপতেন উত্তর মেরু থেকে লঙ্কা পর্যন্ত।
জাহাজ তৈরিতে যুক্তি – ব্রাহ্মী, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য আর শূদ্র, এই চারটি শ্রেণীর কাঠ ব্যবহারের নির্দেশ দিচ্ছেন। যুক্তিতে বলা হচ্ছে ক্ষত্রিয় শ্রেণীর কাঠে সব থেকে কার্যকারী ভাল নৌকো তৈরি হয়। এই কাঠ হাল্কা কিন্তু মজবুত। অন্যগুলো বেশিদিন টেঁকে না। ঢেউয়ের হাল্কা ধাক্কা লাগলেই জাহাজের কাঠে চিড় ধরে এবং নষ্ট হয়ে যায়। যুক্তিতে স্পষ্ট বলা হচ্ছে নৌকোতে লোহার কিলক ব্যাবহার না করতে, কেননা সমুদ্রের জলে থাকা চুম্বক জাহাজকে নষ্ট করে দেয়। যুক্তি লোহা ছাড়া অন্য ধাতু ব্যাবহার করতে নির্দেশ দিচ্ছে। একটি জাহাজ মোটামুটি ১০০ থেকে ৬০০ যাত্রী বহন করতে পারে। যাত্রীদের সুবিধার দিকে নজর দিয়ে তিনি জলযানগুলি তৈরি করতে নির্দেশ দিচ্ছেন।