Showing posts with label rituporno. Show all posts
Showing posts with label rituporno. Show all posts

Sunday, June 2, 2013

ঋতু, সম যৌনতা, বৃহন্নলা এবং অতীত ও বর্তমানের রক্ষণশীল ভারতীয় সমাজ২, rituporno, homosexuality, brihonnola, third sex and so called conservative indian society2

দিপা মেহতার ফায়ার চলচ্চিত্রে রাধাকে আদর করতে করতে প্রেমিকা সীতা আক্ষেপে বলছে, আমরা যে কাজটি করছি, সেই কাজটির শব্দ আমাদের ভারতীয় ভাষায় পাইনি। ঐতিহাসিক বিনীতা রুথ প্রশ্ন করছেন, কোন ভাষার কথা দিপা উল্লেখ করছেন! বাংলা, উর্দু, গুরমুখী না তামিল না অন্য ভারতীয়  ভাষা? সিনেমায় দীপার চরিত্র দুটি ইংরেজিতে কথা বলে। যদিও ২৫০ বছর ভারত ইংরেজি বলছে, তবুও তার পকড় শহরের গণ্ডী ছাড়ায়নি। আজও গ্রামে ইংরেজি শহুরে বিদেশী ভাষা। গ্রামীণেরা রুখে দিতে পেরেছেন ইংরেজির অগ্রগতি। দুর্ভাগ্য ভারতের ইংরেজি মাধ্যমে বেড়ে ওঠাদের চিন্তা প্রায় দীপারই মত।
রুথ আরও একটা উদাহরণ দিচ্ছেন, ক্লদ সামারসএর ইন্টারন্যাশনাল লেসবিয়ান অ্যান্ড গে লিটারেরি হেরিটেজএ শুধু আধটি পাতা বরাদ্দ করচ্ছেন ভারতীয় ভিন্ন ভাষায় সম যৌনতার, তৃতীয় লিঙ্গের উদাহরনে আর দু পাতারও বেশী ব্যয় করছেন ভারতের ইংরেজি লেখা থেকে উদাহরণ তুলতে। সামারসএরমতো ইউরোপ, আমেরিকার বিভিন্ন গবেষক মস্ত মস্ত কেতাব লিখে জানিয়ে দিয়েছেন এই অঞ্চলের সাম্প্রতিক ইংরেজি সাহিত্যে একমাত্র এ ধরণের মানুষদের দেখা যাচ্ছে। এর আগে দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার প্রাচীন সাহিত্যে, ইতিহাসে এধরনের ঐতিহ্য ছিলনা। সামারস কাণ্ড কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ঔপনিবেশিক সময় থেকে গড়ে ওঠা এ অঞ্চলের নারী আন্দোলনের ইতিহাসও এ ভাবনা পোষণ করে। নারী আন্দোলনের ভিত্তিভূমিই এই তত্ব, নারী কতটা দুর্বল, অত্যাচারিত, অবদমিত। নারী আন্দোলন বলে, শুধু নারীরা নয়, পুরুষ বাদে সব ধরণের মানুষ, যৌনতা, আচার-আচরন এ অঞ্চলে অবদমিত। সীতার তত্ব(এ অঞ্চলে সমলিঙ্গে ভালবাসার শব্দের অভাব) আদতে ভারতীয় ঐতিহ্যকে পশ্চিমি দৃষ্টিতে দেখার ফল। বিনীতা রুথ এবং সালিম কিদওয়াই ভারতীয় অতীত এবং সমকালীন ঐতিহ্য খুঁড়ে তুলে নিয়ে আসেন নতুন এক দৃষ্টি, পুরনো সব তথ্য নতুন আলোকে।  
       রক্ষণশীল ভারতের বিতর্কে নেমে আমরা অর্ধনারীশ্বরের উদাহরণ ভুলে যাই। ভুলে যাই উর্দু গজলে সম যৌনতার মসনউভির গর্বিত ঐতিহ্য। এর জন্য গভীরে উর্দুও জানতে হয় না, সংস্কৃত জানতে হয়না, পুরাণও জানার প্রয়োজন নেই – শুধু জীবনের প্রতি, আশেপাশের সবকিছুর দিকে নজর দিলেই অনুভব করা যায়। অর্ধনারীশ্বরে ঈশ্বর অর্ধেক পুরুষ অর্ধেক নারী। গজলে পুরুষ কবিরা যে সাকির আরাধনা করেন তারা বালক। বাউলেও বলেছে নিতাইও অধেক পুরুষ, অধেক নারী। একই ভাবে হরিহরএর ধারনা গড়ে উঠেছে ভারতীয় সাহিত্যে। ভগবৎ পুরাণে, বিষ্ণু মোহিনী রূপ ধারন করে দৈত্যদের অমৃত পান থেকে বঞ্চিত করেন। শিব মোহিনীর প্রতি আকর্ষিত হন। তাদের একটি সন্তান জন্মায়। তাঁর নাম আয়াপ্পা। পরে শিব আবার নতুন করে বিষ্ণুকে মোহিনী রূপ ধারন করতে অনুরোধ করেন। তাঁর ইচ্ছে তিনি নিজের চোখে এই রূপপরিবর্তনটি দেখবেন। এই গল্পতে যদিও বিপরীতগামিতার কথা পাচ্ছি, আসলে এটি সমকামিতার অন্য রূপ। পুরাণে বলা হচ্ছে ব্রহ্মাণ্ডে শিবের যৌন কামনা জাগাতে পারেন একমাত্র বিষ্ণু। তাই থেকে হরিহরএর ধারনার জন্ম।
          আয়াপ্পা জন্মের গল্পে পাচ্ছি মোহিনীরুপী বিষ্ণুর দ্বারা শিব উত্তেজিত হলে শিব এবং মোহিনীর ঔরসে যে সন্তান জন্মায় তিনিই দেব আয়াপ্পা। মোহিনীকে আলিঙ্গন করার সময় কামোত্তেজিত শিবের বীর্য স্খলন হয়। সেই বীর্য থেকে আয়াপ্পার জন্ম। এই গল্পেরই অন্য একটি স্থানীয়(দক্ষিণ ভারতীয়) সংস্করণে পাই, পাণ্ড্য রাজা রাজশেখর সেই শিশুকে দত্তক গ্রহণ করেন। সেই গল্পে আয়াপ্পাকে অযোনি জাত বলা হচ্ছে। অর্থাৎ যিনি যোনিদ্বারা জন্মগ্রহণ করেন নি। হরিহর পুত্র আয়াপ্পা, অপূর্ব বীরে রূপান্তরিত হলেন।
           তামিল মহাভারতে বিষ্ণুর অবতার কৃষ্ণ দৈত্যদের ভোলাতে মোহিনী রূপ ধারন করেন। কৃষ্ণ বার মোহিনীরূপে ইরাবন(ইরাবন = ইরাবন্ত = আরাবন, মহাভারতের চরিত্র। অর্জুন নাগ রাজকন্যা উলুপির সন্তান। তিনি তামিল সমাজ কুট্টানটাবর(Kuttantavar)এর প্রধান আরাধ্য দেবতা। এবং ভারতের বিশাল দ্রৌপদি (আরাবানের বিমাতা, অর্জুনের অন্য স্ত্রী) সমাজের(কাল্ট) অন্যতম অন্যতম প্রধান চরিত্র। দক্ষিণ ভারতে ইরাবন, আরাবন নামে গ্রাম দেবতারুপে পুজিত হন। তিনি হিজড়া(দক্ষিণ ভারতে আলি সমাজ) সম্প্রদায়ের দেবতা। মহাভারতে ১৮ দিনের কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে নিহত হন। অন্য এক বিশ্বাসে বলা হয় কুরুক্ষেত্রে পাণ্ডবদের বিজয়ের জন্য আরাবন, দেবী কালির সামনে আত্মাহুতি দেন)কে বিবাহ করেন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে আরাবানের মৃত্যুর পর কৃষ্ণ মোহিনীরূপে দুঃখ প্রকাশ করেন। আরাবানের বিবাহ আর মৃত্যুকে দক্ষিণ ভারতের হিজরারা তালি(thali) উতসবের মাধ্যমে পালন করেন। ১৮ দিনের এই উতসব শেষ হয় হিজড়াদের বুক চাপড়ানি, আচার নৃত্য, চুড়ি ভাঙ্গা এবং সাদা কাপড় পরে আরাবানের সমাধির দেয়নের মাধ্যমে।
             শুধু দেবতাই নয়, যৌন রূপান্তর, বিপরীত সাজ আর ক্লিবলিঙ্গ আর বৃহন্নলাদের উদাহরণ পাই প্রখ্যাত পৌরাণিক চরিত্রগুলোর মধ্যে। মহাভারতের শিখণ্ডী। পাঞ্চাল রাজ দ্রুপদ-কন্যা। শিখণ্ডিনী নামে স্ত্রীরূপে তাঁর জন্ম। পূর্বজন্মে শিখণ্ডীর নাম ছিল অম্বা। ভীষ্মকে না পেয়ে বহু কঠোর আরাধনা করে অম্বা ভীষ্মের মৃত্যুর কারন হিসেবে নিজের পরজন্মকে বেছে নেন। তিনি দ্রুপদ রাজের বংশে জন্মান শিখণ্ডীরূপে। দৈববাণী শুনে দ্রুপদ রাজ শিখণ্ডীকে পুরুষরূপে প্রতিপালন করতে থাকেন। বিয়ের রাতে তাঁর স্ত্রী তাঁকে মহিলারূপে আবিষ্কার করে লাঞ্ছনা করেলে, তিনি জঙ্গলে পালিয়ে যান। জঙ্গলে এক যক্ষ শিখণ্ডীর সঙ্গে লিঙ্গ পরিবর্তন করেন। শিখণ্ডী ফিরে এসে, বৌ, সন্তান নিয়ে সুখী বিবাহিত জীবন যাপন করেন। কুরুক্ষেত্রর যুদ্ধে ভীষ্ম শিখণ্ডীকে পূর্ব জন্মের অম্বা হিসেবে চিনতে পারেন। কোনও মহিলার সঙ্গে তিনি যুদ্ধ করেন না, এই ধর্ম-প্রতিজ্ঞায় ভীষ্ম অস্ত্র নামিয়ে রাখলেন। অর্জুনের বাণে নিহত হয়ে ইচ্ছা মৃত্যু বরণ করেন। জাভা গল্পে শ্রীখণ্ডী (শিখণ্ডীর সে দেশের নাম) পুরুষ নন। মহিলা। কিন্তু চরিত্রে পুরুষের সমান। অর্জুনের স্ত্রী। শিখণ্ডীর মৃত্যুর পর তার পুরুষত্ব যক্ষের দেহে ফিরে যায়।
উর্বশীর শাপে অর্জুন এক বছর ক্লিব লিঙ্গ ধারন করবেন। এক বছরের অজ্ঞাতবাসে লুকিয়ে থাকার সময় এই অভিশাপ বর হয়ে ওঠে। মতস্য রাজ বিরাটের রাজত্বে বৃহন্নলা নামে, মহিলা সাজেন অর্জুন। তাঁর সুদৃঢ় লোমশ হাতে বিরাট রাজার কন্যা উত্তরাকে নৃত্য গীত, বাদন শেখান। অর্জুন যখন মতস্যরাজ বিরাটের (একমাত্র মতস্য বংশীয় রাজা যিনি কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে পাণ্ডবদের পক্ষ গ্রহণ করেন, অন্য মতস্য রাজা কৌরব পক্ষে সামিল হন) সামনে উপস্থিত হন, তখন রাজা ভাবতেই পারেননি যে তাঁর সামনে যিনি দাঁড়িয়ে রয়েছেন তিনি অর্ধনারী। তাঁর জীবনে তিনি এমন কোনও মানুষকে তিনি দেখেন নি, যিনি সুগঠিত কিন্তু চরিত্রে প্রকৃতি(নারী)সম্ভবা। তাঁর হাত দর্শনে বিরাটরাজ আন্দাজ করলেন অর্জুন অবশ্যই অপ্রতিদ্বন্দ্বী ধনুর্ধর হবেন। উত্তরে অর্জুন বললেন, যে তন্ত্রটি তিনি বাজাতে পারেন, সেটি বীণার তার। তাঁর দক্ষতা পরখ করার পর অর্জুনকে বিরাট রাজের নানান সংস্কৃতি পটীয়সী মহিলাদের সামনে আবারও সংস্কৃতির এবং নতুন করে যৌনতারও পরীক্ষা দিতে হল। নিজের নাম বললেন বৃহন্নলা। ভারতীয় প্রথা অনুযায়ী তিনি যদি শুধুই নপুংশক হতেন তাহলে তার অণ্ডকোষ পরীক্ষা করত পুরুষেরা, মহিলারা নন। কন্যা উত্তরাকে বিরাট রাজ অর্জুনের প্রশংসা করে তাঁকে রানীর মর্যাদা দিয়ে অন্তঃপুরে রাখার নির্দেশ দেন। বিরাট রাজ বৃহন্নলাকে প্রকৃতি(স্ত্রী)রূপেই দেখছেন। তিনি বৃহন্নলাকে উপহাস করেন নি। বা পুরুষের পরিধেয় পরার নির্দেশও দেননি। অর্জুনকেকে তাঁর প্রকৃতি অনুযায়ী রাজবংশে গ্রহণ করেছেন।  পদ্মাপুরানে অর্জুন মহিলাতে রুপান্তরিত হয়ে, কৃষ্ণের সখীদের সঙ্গে নৃত্য করেন।
           ইলা। বৈবস্বত মনু আর শ্রাদ্ধার একাধারে ছেলে এবং মেয়ে উভয়েই। ইলা চন্দ্র বা সোমবংশের প্রতিষ্ঠাতা। ইলার ভাই ইক্ষাকু(সৌর বা অর্ক বংশের প্রতিষ্ঠাতা), সূর্যের নাতি। রামায়নে, লিঙ্গ পুরাণে ইলা বহ্লিক (পামির/হিন্দুকুশ এলাকা – উত্তর আফগানিস্তান, আমুদরিয়ার কাছে) রাজা হন। তিনি শিকারে গেলে বিশেষ কারনে শিব তাঁকে অভশাপ দেন। পার্বতী সদয় হলে তিনি এক মাস পুরুষ এক মাস স্ত্রীবেশে রূপান্তরিত হতে পারতেন। পুরুষ বেশে তিনি  সুদ্যুম্ন আর স্ত্রী বেশে তিনি ইলা। ইলার বুধের সঙ্গে বিবাহ হয়। সন্তানের নাম হয় পুরুরভ(চান্দ্র বংশের প্রথম রাজা)। পুরুরভর জন্মের পর তিনি পুরুষ দেহ ধারন করে তিন সন্তানের পিতা হন।
             দেবতাদের মধ্যে সমযৌনতা খুব একটা অপ্রচলিত নয়। যদিও অনেক সময় এগুলি সঙ্গমের চিত্র বহন করে না, বরং আচারে প্রকাশ পায়। অগ্নি অন্য দেবতার বীর্য গ্রহণ করেন। যদিও তিনি স্বাহার স্বামী, কিন্তু সোমের(চাঁদ) সঙ্গে রমন করেন, কেননা তিনি মুখ দিয়ে পৃথিবীর উৎসর্গ স্বর্গে বসে পান করেন। হিন্দু শাস্ত্র বলে এটি আসলে মিথুন ভঙ্গিমা, যেখানে অগ্নির মুখ যোনির কাজ করে। রামায়ণ আর শৈব পুরাণে যখন পার্বতী আর শিব উপগত হন, তখন দেবতাদের আশঙ্কা হল এই অনন্ত কাল ধরে চলা সঙ্গমে বিশ্বে প্রলয় আসন্ন। এবং তাঁরা বিশ্ব পিতামাতার মিলনে বাধা দান করে। উচ্ছ্রিতদণ্ড রাগান্বিত শিব স্বর্গে উপগত তাঁর অস্খলিত বীর্য কোনও দেবতাকে ধারন করার নির্দেশ দিলে, অগ্নি সেই বীর্য ধারন করে পান করেন। তবে কথাসারিতসাগরে বলা হয়েছে শিব অগ্নিকে এটি পান করতে বাধ্য করেন। বেদে মিত্রা আর বরুনের বহু অন্তরঙ্গতার গল্প রয়েছে। ভগবৎ পুরাণে এদের দুজনের এক অযোনিসম্ভূত সন্তানের কথা বলা হয়েছে। বরুনের বীর্য বল্মীক স্তুপের ওপর পড়লে বাল্মীকির জন্ম হয়। উর্বশীকে দেখে মিতা এবং বরুণ বীর্য স্খলন করে জলে পড়লে অগস্থ্য আর বশিষ্ঠর জন্ম হয়।
বাঙলায় কৃত্তিবাস রামায়নে সূর্য বংশের অন্যতম প্রধান রাজা দিলীপের মৃত্যু হলে শিব দুই বিধবা রানিকে পরস্পরের সঙ্গে উপগত হওয়ার নির্দেশ দেন। একটি হাড় হীন শিশুর জন্ম হয়। পরে অষ্টাবক্র মুনির বরে শিশুটি পূর্ণাঙ্গ মানুষ হয়ে ওঠেন। নাম হয় ভগীরথ – যে দুটি ভাগে জন্মেছে। গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মে রাধা অনুগামিরা খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ত্রয়োদশ শতকের কাশ্মীরী পুঁথি, জয়দ্রথের হরচরিতাচিন্তামনিতে, পার্বতীর মাসিক নিঃসরন গঙ্গায় ধুতে ধুতে সেই জল পার্বতীর হাতি মাথা সহচরী মালিনী গলার্ধকরণ করেন এবং মালিনীর ঔরসে হাতিমাথা গনেশের জন্ম হয়। অর্থাৎ গনেশের জন্ম পুরটাই মহিলা সংসর্গে। শৈব পুরাণে বলা হয়েছে পার্বতী স্নান করতে গেলে মাটির গনেশকে পাহারায় বসিয়ে যান যাতে কেউ না এসে পড়ে। শিব আসলে মাটির গনেশ বাধা দেয়। শিব তাঁর মাথা কাটে। পরে জুড়ে দেয়।
            কথাসারিতসাগরে এক মহিলা অন্য মহিলাকে সম্বোধন করছেন স্বয়ম্বর সখি। আমরা জানি স্বয়ম্বর মানে শুধুই দুটি লিঙ্গের বিয়ে নয়, নিজে নিজের প্রেমাস্পদকে বেছে নেওয়ার অধিকার।
ভারতীয় শাস্ত্রে প্রায়শঃ তৃতীয় লিঙ্গে(প্রকৃতি)র উল্লেখ পাই। নারদ স্মৃতি, বা সুশ্রুত সংহিতায় মহিলা চরিত্রের পুরুষ বা পুরুষ চরিত্রের মহিলার উল্লেখ পাই। সমকামী পুরুষকে মহিলা চরিত্রের পুরুষ বলা হয়েছে। কামসুত্রে সরাসরি বলা হয়েছে, ক্লীবলিঙ্গের মানুষের দ্বৈত সত্তা থাকে। ভারতীয় সমাজে তৃতীয় লিঙ্গের অবস্থান রয়েছে নিজেদের মত করে। ভারতে হিজড়া, আলি, কোটি – নানান ধরণের সমাজ রয়েছে, নিজেদের পঞ্চায়েত রয়েছে। ভারতের সমাজে দুটি পুরুষের মধ্যে যৌনতাকে মিলন বা সঙ্গম হিসেবে দেখা হয় না।
আমরা যেন মনে রাখি, কোম্পানি আমলে আইন করে তৃতীয় লিঙ্গকে বিনাশ করার চেষ্টা হয়। আমরা দেখেছি অস্কার ওয়াইলড জেলে গিয়েছেন। বরং যাকে আমরা রক্ষণশীল ভারত বলে দেগে দিয়েছি, সেই ভারতে হিজড়েরা নিজেদের মত করে সামাজিক সম্মান লাভ করতেন। আজও করেন। শিশু জন্মালে এদের আশীর্বাদ অবশ্যই প্রার্থনীয়। হাজার হাজার বছর ধরে ভারতীয় সমাজে তৃতীয় প্রকৃতি নিজেদের মত করে অবস্থান করত। অন্ততঃ ভাজপা, বামপন্থী আমল ছাড়া হাজার হাজার বছর ধরে হিজড়া বা সমকামিদের নিষিদ্ধ করার দাবি ওঠে নি।
          রুথ বিনীতা লাভ রাইটসে স্পষ্ট বলছেন বর্তমান কালে হাজারো সমলিঙ্গে বিয়ের উদাহরণ। গ্রামে দুই মহিলার বিয়ে বন্ধ করতে পুলিস এলে স্থানীয় এক মহিলা বলেন বিয়ে হল দুটি হৃদয়ের মিলন। কে বলেছে দুটি আলাদা লিঙ্গ হতে হবে? নিউ আমেরিকা মিডিয়া, নিউজ ফিচারে, সন্দীপ রায় লিখছেন, ব্রাহ্মণদের মধ্যে সমলিঙ্গে বিবাহের কথা। ব্রাহ্মণদের মধ্যে কেউ এই বিবাহে নিদান দিচ্ছেন পূর্বজন্মে এটি ঠিক করা ছিল, কেউ বলছেন শুধুই দুটি চিত্তের মিলনের কথা। ভারতীয় ধর্ম শাস্ত্রে তৃতীয় প্রকৃতিকে শাস্তি দেওয়ার বিধান নেই। পুরুষের দেহে নারী প্রকৃতি বা উলটো ধরণের মানুষদের জোর করে বিবাহ দেওয়া হত না (তৃতীয় প্রকৃতিঃ পিপল অব থে থার্ড সেক্সঃ আন্ডারসট্যান্দিং হোমোসেক্সুয়ালিটি – অমর দাস উইলহেম)।

আরও কিছু ছড়ানো ছিটনো চিন্তা
বেদ অনুযায়ী সূর্য, জুপিটার, মঙ্গল পুরুষ, চন্দ্র, ভেনাস আর রাহু প্রকৃতি এবং মারকারি, শনি আর কেতু তৃতীয় বা লিঙ্গহীন নপুংশক(যৌনতারহিত, কিন্তু পুরুষ আর প্রকৃতি(নারী) এই দুই চরিত্র বিশিষ্ট) গ্রহ। শিশুদের যতদিন যৌনতা বোধ না জাগছে অথবা বয়ঃসন্ধিকালে না পৌঁছচ্ছে ততদিন তাদের নিয়ন্ত্রন করবেন মারকারি। সুশ্রুত সংহিতায় পাঁচ প্রকার ক্লীবের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে ১) অসেক্য – যিনি পুরুষের বীর্য পান করে উত্তেজিত হন। ২) সৌগন্ধিকা – যিনি অপরের লিঙ্গের ঘ্রানে উত্তেজিত হন। ৩) কুম্ভিকা – যিনি পায়ু সঙ্গমে নিস্ক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ৪) ইরশ্যকা – অন্যদের যৌন ক্রীড়া করতে দেখে ঈর্ষায় যৌন উত্তেজনা বোধ করেন। ৫) শন্ধা – যার প্রকৃতি(নারী)র মত চরিত্র। প্রথম চার প্রকার ক্লীব পুরুষের বীর্য পান করে যৌন উত্তেজনা বোধ করে। শব্দকল্পদ্রুমে শন্ধার ২০টি আলাদা প্রকার উল্লেখ করা হয়েছে। সুশ্রুত এবং চরক সংহিতাতে লিঙ্গ জন্মের ১০টি কারন বর্ণনা করা হয়েছে  - ১) সুকর্ম, ২) কাম, ৩) সংস্কার, ৪) বিকর্ম, ৫) শুক্রবালা, ৬) মিথুনবিধি, ৭) পৌরুষ, ৮) দোষ, ৯) প্রকৃতি, ১০) দৈব।
এর পরে অন্য কোনও প্রবন্ধে ব্রিটেন এবং ভারতের ঔপনিবেশিক আমলে এনাদের অবস্থা খুঁজে দেখা যাবে। তত দিনে আমরা আবারও নিজেরা নিজেদের মধ্যে ঢুকে নিজেদের দেখার চেষ্টা করি। 

ঋতু, সম যৌনতা, বৃহন্নলা এবং অতীত ও বর্তমানের রক্ষণশীল ভারতীয় সমাজ১, rituporno, homosexuality, brihonnola, third sex and so called conservative indian society1

ঋতুপর্ন ঘোষের অকাল মৃত্যু শহুরে উচ্চ-মধ্যবিত্ত সমাজকে নাড়িয়েছে। ঋতু নিজের সৃষ্টিকে উৎসর্গ করে ছিলেন পশ্চিমি ভাবনায়(যাকে অনপনেয় বাঙালিত্ব বলে চালান হচ্ছে) ভাবিত চোস্ত ব্রিটিশ কায়দায় ইংরেজি বলা(সত্যজিত ফেলুদার জবানীতে লালমোহনবাবুর ইংরেজি জানাকে যেমন মস্করা করে খোঁটা দেন, আর তোপসে ফেলুদার ব্রিটিশ কেতায় চোস্ত ইংরেজি বলায় মুগ্ধ। এখনও কলকাতায় ইংরেজি না জানা, না বলতে পারা মানুষজনকে অশিক্ষিত বলা হয়) শহুরে মেকলে পুত্র কন্যাদের তৈরি সংস্কৃতি বিকাশের কাজে, কিন্তু নিজের মত করে। রাজেন-মৃণাল-সত্যজিত-ঋত্বিক-গৌতম-অপর্ণা হয়ে মধ্যবিত্ত বর্ণিত পরিশীলিত, বুদ্ধিদীপ্ত, মূল্যবোধযুক্ত, বিশ্ব ধারার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা চলচ্চিত্র তৈরির ঘরানাটা শুকিয়ে যেতে যেতে ঋতুর আলোছায়া কারুসাজির কল্যাণে শহরের মধ্যবিত্তের মননে আবার ঘাঁটি গড়তে শুরু করল, উঠে এলেন আরও এক ঝাঁক নতুন পরিচালক।
এই উচ্চ-মধ্যবিত্তভিত্তিক সংস্কৃতিটির ভিত্তিভূমি দুশ বছর আগে, ১৮০০ আশেপাশে থেকে উপনিবেশের মদতে ইওরোপমুগ্ধ রামমোহন, বিদ্যাসাগর, দ্বারকানাথের হাত ধরে মেকলেদের নির্দেশনায় শুরু হয়েছিল। এই মহাতেজেরা বাংলার স্বাধীনতার জন্য লড়াই(১৭৬৩ থেকে ফকির-সান্ন্যাসী স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু) করা গ্রামীণদের অজ্ঞ, মূর্খ, জ্ঞানহীন, বোধহীন ইত্যাদি বিশেষণে লাঞ্ছিত করেছিলেন। বামপন্থী আন্দোলনের সুত্রে গ্রামীণদের পিঠে দাগানো এই সুভাষিতগুলোর সঙ্গে জুড়ল সবলা গরুপুজক, হনুমান পুজক, গাছ পুজক, সামন্ততন্ত্রে গলাপর্যন্ত ডুবে থাকা, ইতিহাসহীন, মুখাবয়বহীন, দারিদ্রের করাল গ্রাসে লাঞ্ছিত কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজের বিশেষণসহ নানান বাছা বাছা মধ্যবিত্তিয় অভিধা। বললেন গ্রামীণদের অশিক্ষিতের পটুত্ব এবং অর্ধদক্ষতা প্রমাণিত। পশ্চিমের তৈরি নব্য জ্ঞানচর্চা সমাজতত্ত্বে, মধ্যবিত্ত নিজেকে ত্রিভুজ সমাজের মাঝখানে বসিয়ে, উচ্চবিত্তকে সেই ত্রিভুজের মাথায় বসাল। অন্য সক্কলকে প্রান্তিক, মূর্খ, গরীব, দলিত, সংখালঘু ইত্যাদি দেগে দিয়ে পেল উচ্চবিত্তের- এক) পিঠচাপড়ানি, চাকরি, ব্যাবসার অংশিদারি, উমদোরির দায়ভাগ, আর দুই) চুঁইয়ে পড়া লুঠ সম্পদের ছিটেফোঁটা।
ঠিক সেই ধারার উত্তরাধিকারে ভারতে গ্রাম-সংস্কৃতিকে করুনার দৃষ্টিতে দেখা(আজও ভারতীয় মধ্যবিত্তের সিনেমার অন্যতম দিকফলক মৃগয়ায় ছো নাচে মাদল বাজার শব্দ হয়। থাকে না বিন্দুমাত্র ছো নাচের শাস্ত্রীয়তার ব্যাকরন। মৃগয়ার আলোচনায়, এতদিন এই তুচ্ছ দেশী বিষয়ে বিন্দুমাত্র অস্বস্তি প্রকাশ করা হয় না। সমালচকেরা এগুলো সোনামুখে গিলে ফেলেন(জনেন কি?)। মনের মানুষ নিয়ে যত কম কথা বলা যায় তত ভাল) মধ্যবিত্তকেন্দ্রিক সিনেমা সংস্কৃতির, পথ চলা শুরু হল স্বাধীনতার পরপর। মধ্যবিত্তরা যেহেতু উচ্চবিত্তদের সম্পদ বাড়ানোর কাজটির প্রধান পরিচালক এবং বুদ্ধিদাতা, ক্রমশঃ নতুন ছবি করিয়েরা উচ্চবিত্ত, ক্ষমতার কেন্দ্রে, সরকারে থাকা মানুষদের বোঝাতে সমর্থ হলেন এই সিনেমাগুলিকে পৃষ্ঠপোষণ জরুরি, তাতে ইয়োরোপে দেশের মান বাড়ে(দেশে কি হল, সিনেমা চলল কিনা, এ সব ভাবনা গুলিমারুন)। সরকারি মদতদান শুরু হল। যেখানে সরকার সাহায্য করতে পারছে না, বড়ও পুঁজি এগোচ্ছে না, সেখানে মধ্যবত্ত উদ্ধারে এগিয়ে এল ইওরোপীয় সিনেমা সংগঠকরা। ভারতের ছবিগুলো বিদেশে পিঠ চাপড়ানি, পুরস্কার, এমনকি অর্থ সাহায্য পেল। এমনকি মুলধারার সিনেমা সম্মান, অস্কারও উপহার স্বরূপ দেওয়া হতে শুরু হল।
বিপরীতে এদের ঘরানার বাইরে যত সিনেমা সেগুলো সব যাত্রা, লাউড, মেলোড্রামাটিক, গাদ্গ্যাদে, মাঠ পেরোনো ইত্যাদি ছাপ পেয়েছে। নব্বইয়ের পর মধ্যবিত্তিয় পিঠচাপড়ানি সিনেমায় ভাঁটার টানকে উপেক্ষা করে সোনার আংটি থেকে চিত্রাঙ্গদা সিনেমাযাত্রায় ঋতু নতুন করে নানান ধরণের মধ্যবিত্তকে হলমুখী করাতে পেরেছিলেন। তিনি খুঁজে নিচ্ছিলেন নতুন ভাষা। তাঁর সিনেমা ক্রমশঃ শহুরে মধ্যবিত্তর নানান স্তরের নানান খাঁজ খুঁজে পেল। মধ্যবিত্ত সমাজের স্তরগুলোর নানান সমস্যা, ব্যথা বেদনা এই প্রথম ঋতুর হাতযশে মুখ খোলার সুযোগ পেল। ভারতের সত্যজিত ঘরানার চলচ্চিত্রের যৌন সংস্করনের উত্তরাধিকারী হিসেবে তিনি সেই কাজে পুরোপুরি সফল তাঁর উদাহরণ, মৃত্যুর পর তাঁর বাড়ির সামনে মানুষের ঢল, ১২টি জাতীয় পুরস্কার, এবং বড় পুঁজি নিয়ন্ত্রিত প্রচারমাধ্যমগুলোতে নিরন্তর সাধুধ্বনি।
চলচ্চিত্র ছাড়াও তাঁর নানান কাজের আলোচনা, বিশেষ করে, যৌনতার ভাবনা অথবা তাঁর লিঙ্গ পরিবর্তনের উদগ্র প্রচেষ্টা(আমাদের ধারনা তাঁর মৃত্যুর বড় কারনও বটে), তৃতীয় লিঙ্গের সাম্যের আন্দোলনে জড়িয়ে থাকার চেষ্টা বড় প্রচারমাধ্যমগুলোয় এসেছে, সরাসরি নয়, নারীত্বের জয়গানের টিকা হিসেবে। যে মানুষটি ১৮৩৬এ ভারতের প্রথম দণ্ডসংহিতা রচনা করে সমযৌনতার আশেপাশে থাকা নানান সমাজকে নিষিদ্ধ করবেন, সেই মেকলের সন্তান সন্ততিদের কাছে সংস্কৃতির প্রকাশভঙ্গিতে যৌনতার ব্যাবহার আজও অনেকটা নিষিদ্ধ এলাকা। ঋতু শহুরে বাংলার আকাশ বাতাসে সেটিকে অনেকটা জলচল করার চেষ্টা করেছিলেন, নিজগুণে। শুধু ঋতুর যৌনতার ধারনাই নয় - অস্বস্তির সমকামিতা, বৃহন্নলা ইস্যু, বাস বদলেরমত হাজারও শহুরে মেকলে ঘরানার উচ্চ-মধ্যবিত্তের চৌহদ্দিতে সামাজিকভাবে নিষিদ্ধ বিষয়গুলি, স্বস্তির মোড়কে যতটা চিনির সিরা দিয়ে গ্রহণযোগ্য করে উচ্চ-মধ্যবিত্ত সমাজে বাংলা ভাষায় খাওয়ানো যায়, তার প্রচেষ্টা চলেছে সংবাদ মাধ্যমগুলোতে। ফলে পুরুষ দেহে নারীত্বের অস্তিত্ব অথবা নারীতে পুরুষ অথবা সমাজে সমকামিতা অথবা বৃহন্নলাদের সামাজিক অধিকার ইত্যাদি বিষয়গুলো হঠাৎই যেন কলকাতার নাগরিক রাষ্ট্রিক জ্ঞানচর্চার অস্বস্তির অঙ্গ হয়ে ওঠে। সেই অস্বস্তি ঢাকতে বিশ্বায়নের যুগের প্রেসিডেন্সিয় বা বালিগঞ্জীয় বাংলিশ চক্করবক্কর পুঁটুলি ভাষায় ঋতুর নানান ধরণের যৌনতার যাপন, তাঁর যৌনতার সাংস্কৃতিক প্রকাশভঙ্গী এড়িয়ে যেতে, তাঁর কাজে কতটা তিনি নারীত্বের জয়গান গেয়েছিলেন, সেই সাধুবাদে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন আলোচনার মধুর সমাপ্তি ঘটে, বন্ধুদের চোখের জলের বাধ্যতামূলক সেন্সরশিপ আরোপে। চিত্রাঙ্গদা শুধুই উঠে আসে একটা ব্যাতিক্রমী উদ্যমের টিকাসূত্র হিসেবে। ব্যাস।
নবদ্বীপ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা লিখতে গিয়ে, পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি বইতে বিনয় ঘোষ, সুনীতি চাটুজ্যের এক লেখা তুলে লিখছেন, রাধা সেজে যখন একটি পুরুষ উদ্দাম নৃত্য করছিলেন তখন সুনীতিবাবুর জুগুপ্সা হচ্ছিল। শিল্পবিপ্লবোত্তর বড় পুরুষতান্ত্রিক পুঁজি, পুরুষত্ববলে বিশ্বের সব সম্পদ লুঠের রাজনীতি অনুসরন করছিল। ভারতে মেকলের ইংরেজি শিক্ষিত সন্তান-সন্ততিরা পুরুষত্বের স্পর্ধা বন্দিত পথকেই(সম্প্রতি এক মধ্যবিত্তিয় চলচ্চিত্র স্রষ্টার জৈবনিক সিনেমার বিজ্ঞাপনের এক স্তবক – তুমি গেছ, স্পর্ধা গেছে, বিনয় এসেছে – পুরুষতন্ত্রের প্রবল নির্ঘোষ, আদতে শক্তি চ্যাটুজ্জের এক পদ্যর স্তবক) সংস্কৃতি বিকাশের পথ হিসেবে দেখেছেন। সুনীতি কুমার থেকে বিনয় ঘোষ হয়ে, শক্তি বেয়ে, সত্যজিত আজও বাংলার পৌরুষ সংস্কৃতির মুখ। সেই বৃত্তে থেকেও ব্যাতিক্রম, ঋতু।
বাংলা-ভারতের গ্রাম সমাজ যেন ভরপুর নারীত্ব। তাই আট হাজার বছর ধরে এই সমাজ মায়ের মমত্বে হাজারও উদ্ভিদ আর প্রাণীকে কোল দিয়েছেন, নিজের মত করে বাঁচার সুযোগ করে দিয়েছেন, কোনও কিছু চাপিয়ে না দিয়ে। ঋতু নিজের মত করে সেই নারীত্বের মমতার, ছাঁচে ঢালা শিল্পবিপ্লবীয় পুরুষতান্ত্রিকতার বাইরে বেরিয়ে এসে, বুঝতে চেষ্টা করছিলেন মধ্যবিত্তের নানান রকমসকম। সব্বাইকে নিয়ে চলার চেষ্টা করছিলেন। বুঝেছিলেন এই কাজটা করতে গেলে মায়ের মমতার বড্ড প্রয়োজন। তাই তিনি হয়ত মা হতে চাইছিলেন। কিন্তু মেকলের উত্তরপুরুষেরা তাঁর কাজকে বুঝতে চায় নি। পর্ণো বলেছে। তাই ঋতু মরিয়া প্রমান করিল, সে যে বিষয়টি নিয়ে মুখর ছিল, সেগুলি মরে নাই- আলোচনায় বারবার উঠে আসতে চাইছে অদম্য উদ্যমে।
         আলোচনাগুলোয় বারবার উঠে আসছে সমকামিতা ইত্যাদি রক্ষণশীল ভারতের সংস্কৃতি নয়। একটি পশ্চিমি বিষয়। একে ভারতে নিয়ে এসে রক্ষণশীল ভারত(হিন্দুদের)কে আধুনিক, পশ্চিমের সমাজের উপযোগী করে তোলা হচ্ছে। এ ধরণের সিনেমায় যৌনতা ব্যবহারের ফলে সাবালক হচ্ছে বাংলা সিনেমা। আমতা আমতা করে বলা হচ্ছিল রক্ষণশীল ভারতের বিরুদ্ধে যে লড়াই চলছিল, সেই সমাজে লড়াইয়ের কথাগুলো ঋতুর সিনেমা, লেখনির কৃতির মধ্যে উঠে এসেছিল। রক্ষণশীল ভারতে সাংস্কৃতিকভাবে নীরব, প্রান্তিক এই মানুষদের জন্য সারা জীবন ধরে ঋতু শুধু লড়াইই করেন নি, নিজের লিঙ্গ পরিবর্তন করে সেই আন্দোলনকে যথেষ্ট মর্যাদা দান করে ছিলেন। প্রখ্যাতরা কোনও আন্দোলনে এলে আন্দোলনের ছড়ানো দাবিগুলোয় ছাঁকনি বসে আপাত দৃষ্টিতে প্রায় গুরুত্বহীন দাবিগুলো লঘু হয়ে যায় কিনা বা পশ্চিমি ভাবনাগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করে, রাষ্ট্রকে নমনীয় করে যত কিছু অধিকার অর্জন করা গিয়েছে, প্রখ্যাতরা আন্দোলনে এলে সে অধিকারের অনেকগুলি ন্যূন হয়ে যায় কিনা, আন্দোলনের সমস্ত শ্রেয় সেই প্রখ্যাতরা টেনে নেন কিনা, এ বিতর্কে না ঢুকে একটা কথা আমরা বলতে পারি, ঋতুর হাত ধরে রক্ষণশীল ভারত বনাম প্রগতিশীল পশ্চিমি সমকামিতা, তৃতীয় লিঙ্গ, যৌন পরিবর্তন ইত্যাদি বিষয়গুলো শহরের সমাজে আলোচনা হচ্ছে। কলাবতী মুদ্রা যেহেতু বহু বছর ধরে পুরনো বাংলা-ভারতের ঐতিহ্য বোঝার চেষ্টা করছে, তাই দেখার চেষ্টা করবে, ভারতে এর কোনও রেশ ছিল কি না। কিছুটা নজর দেব বর্তমান সমাজেও। সেই কাজে বেদ, মহাকাব্যগুলো, নানান আঞ্চলিক কথা এবং পুরাণের নানান গল্পে নতুন করে আলো ফেলার চেষ্টা করব।

Friday, May 31, 2013

ঋতুর প্রতি দ্বিতীয় এলিজি - শঙ্করের কথা।। শঙ্করের কথা - second elegy to iswor ritu

এই লেখাটি তৈরি করেছিলাম মার্চ মাসে, যখন আমরা দিনাজপুরের এক অজ পাড়াগাঁয়ের একটি হাট, চান্দল থেকে মেলা শেষ করে ফিরি।

আজ ঋতুর মৃত্যুর পরের দিনে কেন যেন মনে হল এই লেখাটা বড্ড প্রাসঙ্গিক। কিছুটা হলেও ইঙ্গিতে ঋতুর প্রতি হুল ফোটানো আছে।
পাঠকেরা নিশ্চয় বুঝবেন।
বিশ্বেন্দু



সদাহাস্য দম্পতিকে চিনে নিন। 

নীল জামা গলায় কণ্ঠী এই প্রায়-যুবকটি বঙ্গীয় পারম্পরিক কারু ও বস্ত্র শিল্পী সংঘের অন্যতম সক্রিয় সদস্য শংকর সরকার। বয়স খুব বেশ হলে ১৭। সাকিন উত্তর দিনাজপুর জেলার কালিয়াগঞ্জের ফতেপুর গ্রাম। বছরখানেক হল শঙ্কর বিয়ে করেছে – গত বছর সংঘের ঠাকুরপুকুরের মেলায় অভিনয় করে যাওয়ার পরপরই। 


শঙ্কর অসামান্য অসামান্য অভিনেতা। দিনাজপুর জেলার নিজস্ব নাটক খন। খনে মহিলার ভূমিকায় অভিনয় করে সে। মঞ্চে বোঝার উপায় নেই তার পুরুষত্ব। অসামান্য তার বাচনিক দক্ষতা, অসামান্য তার সম্মোহনী যাদু, অসামান্য তার শারীরি আবেদন, অলৌকিক তার উপস্থাপন ক্ষমতা। অঞ্চলে তার অসামান্য জনপ্রিয়তা।  

আমরা শহুরে কলকাত্তাইরা স্ত্রীবেশী অভিনেতা পুরুষ নিয়ে প্রচুর আদিখ্যেতা করেছি। রাতের পর রাত তিন দিক ঘেরা শহুরে মঞ্চে নাটক করেছি। সবুজ পত্রে গল্প লিখেছি। তার সামাজিক অবস্থাকে দুর্বিসহ ভেবে আহাউহু করেছি। ইন্তালেকচুয়াল সিনেমা বানিয়েছি। সিনেমা হিট করেছে। বহু অর্থ লাভ করেছি। দেশে-বিদেশে খ্যাতিও লাভ করেছি। সেইখ্যাতির পিছন পিছন এসেছে আরো অনেক উপাদান। হয়ে উঠেছি গুরুঠাকুর।

চলচ্চিত্র এক্কেবারেই পশ্চিমি শিল্প মাধ্যম। নির্দেশকের পশ্চিমি সভ্যতার শংসাপত্র লাভকরার মান্যতা অর্জন করা অন্যতম উদ্যেশ্য হয়ে পড়ে। পশ্চিমি দর্শণ,সামাজিক প্রথা, সংস্কৃতির প্রতি আদিখ্যেতা প্রদর্শণ করতে হয় অসীম দাম্ভিকতায়।  এই দম্ভিকতার জন্মায় নিজের দেশ, নিজের সমাজকে না জানার শর্তে। কেননা শহুরেরা আজন্ম ভেবেছি, এ দেশে জন্মে পদাঘাতই শুধু পেলাম। গ্রামীণ সত্যি জানলেও দেশের সমাজকে ন্যুন দেখানোর শর্ত জুড়ে থাকে অদৃশ্যভাবে। ফলে বাস্তবতা প্রকাশ পায় না বললেই চলে। বাল্যের পড়াশোনাই(ইংরেজি অথবা বাংলা মাধ্যম) দম্ভ প্রকাশের দক্ষতা তিলে তিলে তৈরি করে দেয় (একটা ছোট্ট উদাহরণ দিলে বিষয়টা স্পষ্ট হবে। আজও ভারতীয় সিনেমার অন্যতম দিক ফলক মৃগয়া। আথচ ছো নাচে মাদল বাজে। থাকে না বিন্দুমাত্র ছো নাচের শাস্ত্রীয়তার ব্যকরণ। একজনও বিশেষজ্ঞ এই তুচ্ছ দেশী বিষয়ে বিন্দুমাত্র অসূয়া প্রকাশ করেন না(বোধহয় জানেনও না)। আজও মৃগয়া নিয়ে শহুরে আদিখ্যতা শেষ হয় নি। আর মনের মানুষ নিয়ে যত কম কথা বলাযায় তত ভাল)।  

নারীবেশী, পুরুষ অভিনেতাদের বিষয়ে তৈরি সিনেমার পরিচালক আরও প্রগতিশীল - এমন এক ছাপ্পা পেয়ে সামাজিকভাবে অন্যান্য শহুরে ছাপ্পায় কুসংস্কারগুলো নিয়ে ছবি করার পিঠচাপড়ানি এবং বিনিয়োগ লাভ করেন। অসামান্য ব্রিটিশ উচ্চারণে ভারতীয় (গ্রাম)সমাজ কত পিছিয়ে পড়া, এই তত্ব পরিস্কার বুঝিয়ে ছাড়েন। বিভিন্ন চলচ্চিত্র উত্সবে সিনেমায় তিনি গুরুঠাকুর জুরির মর্যাদা পান। বাঙলা সিনেমা পথ ভাঙা কাজ করেছে, এই চিন্তায় কলকাত্তাই মধ্যবিত্ত আহ্লাদে ডগমগ - অনুগামীরা আনন্দে উদ্বাহু। 

মাত্র হাজার দেড়-দুয়েক বছরের সভ্যতায় আজও পশ্চিমের নারীরা লড়াই করছেন অধিকারের জন্য। গ্রামীণ ভারতীয় সমাজে মহিলারা নানান বিধিনিষেধ মান্য করেই অসম্ভব নিজস্বতা বজায় রাখেন। তাঁত চালান, চাষ করেন, সংস্কৃতির নানান দিক ধরে রাখেন অসামান্য ঋজুতায়। কৌম স্মৃতিতে ধরা থাকে সামাজিক ইতিহাস। ভারতের পশ্চিমি জ্ঞাণচর্চা গ্রামীন মহিলাদের কোনও দক্ষতা স্বীকার করে না। অথচ বহু সমাজে আজও নারীরা চালিকা শক্তি। বুননে, চাষে, শিল্প উত্পাদনে, সংসার পরিচালনায় নারীদের দক্ষতা অপ্রতিদ্বন্দ্বী। তবুও শহুরেরা মনেকরে সমাজের কোন স্তর কেন্দ্রীয় ক্ষমতার কত কাছাকাছি, তাই দিয়ে সেই স্তরের সামজিক অবস্থান বিচার হয়, দক্ষতা নির্ণয় হয়। হয়ত সেই জন্যই গ্রামীণদের বর্ণনা করতে প্রান্তিক, দলিত, পিছড়ে বর্গ ইত্যাদিসব অশ্লীল অভিধা তৈরি হয় জ্ঞাণচর্চায়।

শহুরেরা অধিকাংশই গ্রাম থেকে শহরে এসেছি। গ্রামের বাস্তবতা ভুলেছি। ঠিক যেমন ভুলে ছিলেন বিদ্যাসাগর, রামমোহনসহ অগুন্তি প্রায় সব আলকপ্রাপ্তরাই। তাদের পথ ধরে সহজ স্বাভাবিক গ্রামীণ প্রকাশভঙ্গী ভুলেছি অসামান্য শহুরে সভ্যতার মোড়কে। কেউ কেউ দেখিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলেও সেই দেখাকে গ্রামীণ দর্শণে বোঝার চেষ্টা করিনা। ঠেকায় পড়ে কিছুখানি স্বীকার করলেও তাকে পশ্চিমি আধুনিকতার ছোঁয়ায় কোনও না কোনও একটা মোড়ক দিতে ভীষণ ব্যস্ত হয়ে পড়ি। একই ঘটনা নারী বেশী পুরুষ অভিনেতা সাবজেক্টদের জীবন আলোচনায়ো ঘটেছে। তার সঙ্গে ক্যামারা বা কলম বাগিয়ে মাত্র তিন চার দিন কাটিয়েই পশ্চিমি বয়ানে সামাজিক এই কুসংস্কারটি ডকু করে বিভিন্ন ফোরামে ছুঁড়ে সাংস্কৃতিক মসিহার মর্যাদা অর্জন করেছেন নানান গবেষক। কেউ আখের গুছিয়ে ইউরোপ-আমেরিকার নামি-অনামিসব বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজতত্ব বিভাগে অধ্যাপনার সম্মান(আদতে আরও সাংস্কৃতিক চাটুকারিতা) অর্জন করেছেন, কেউবা গবেষণা, অথবা লাখোইয়েন-পাউন্ড-ডলারের সাংস্কৃতিক প্রজেক্ট বাগিয়ে বিভিন্ন ফোরামে আমার এই কাজ এই প্রথমবার আপনাদের সামনে এল, এই তথ্যে সব্বাইকে রাঙিয়ে, এগিয়ে থাকা ইওরোপের(আরআমেরিকার) দেশগুলির তুলনায় ভারত কত পিছিয়ে তার বয়ান বিবৃত করার কাজ করেছেন। 

অথচ পুরুষ শঙ্কর, রাতের পর রাত, খন নাটকে স্ত্রী বেশে অভিনয় করে চলে। সমাজ তাকে শহুরেদের দৃষ্টিতে দেখে না। তার দাদা, বাবা অথবা মা কেউই অনুযোগ করে না, কেন মহিলা চরিত্রে আভিনয় করে সে তাদের সামাজিক সুনামে সে কলঙ্ক লেপন করছে। না, তথাকথিত পিছিয়েপড়া, কুস্কারগ্রস্ত গ্রামবাংলার সমাজ তাকে একঘরে করে রাখে নি। শহুরে ভাষায় নারীবেশী পুরুষ অভিনেতা শঙ্করকে সামাজিক ট্যাবুর বিরুদ্ধে লড়াইও করতে হয় নি। উত্তর দিনাজপুরের ফতেপুর এলাকায় তার মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকতে বিন্দুমাত্রও কষ্টতো হয়ই নি বরং সে অসামান্য এক সামাজিক মর্যাদা প্রতিদিন সে এনজয় করে। তাই শঙ্করকে নিয়ে সিনেমা হয় না, গল্পও অসম্ভব।  

সম্প্রতি তার বিয়ে হয়েছে। সে এক ছোট্ট সুন্দর বউ ঘরে এনেছে(এই দম্পতির বয়স পশ্চিম প্রভাবিত বুদ্ধিজীবিদের তৈরি সংবিধান অনুমোদিত না হলেও হাজার হাজার বছরের পরম্পরা বাজার রাখা বাঙলার সমাজ অনুমোদিততো বটেই)। শ্বশুরবাড়ির লোকেরা মাঝেমধ্যে বড্ড আহ্লাদ করে শঙ্করের  অভিনয় দেখতে এসে আনন্দে লুটোপুটি খায়। নাটকে তার তথাকথিত অশ্লীল বাক্যবাণে আঁচলের তলায় মুখ লুকোয় না অথবা শঙ্করকে বলে না নাটকে তার অশ্লীল বাচন সমাজকে দূষিত করছে। অভিনয়ে শঙ্কর যখন শাড়ি তুলে অসম্ভব যৌনআবেদনময় কমনীয় উরুতট প্রকাশ করে পটু হাতে, তার এলাকায় তৈরি সোনালী পাটের সুতো তক্তিতে পাকায় অসম্ভব সামাজিক লাস্যে, যখন পর-পুরুষের সঙ্গে হাতের চুড়ির রিনিঝিনি তুলে ফস্টিনস্টি  করে গায়ে গা ঠেকনা লাগিয়ে, যখন বুকের আঁচল সরিয়ে একটি নকল সোনালী গোলার্ধ খুলে স্বামীর বন্ধুকে হাল্কা করে যৌনতার প্রলোভন দেখায় রাজবংশী ছড়ায়, যখন অসামান্য পুরুষালি মহিলা গলায় ও মা... বলে লাস্যের ঢং করে তখন নাটক দেখতে জড়ো হওয়া পুরুষদের শ্বাস ঘন হয়ে আসে, কারোর কারোর দীর্ঘশ্বাস পড়ে, কারোর প্রাণ হয়ত আকুলিবিকুলি করে একটিবার অন্তত শঙ্করের হাত ধরতে, পাশে দাঁড়াতে, হয়ত নিষিদ্ধস্থানগুলো ছুঁয়ে দেখতে।  আবার যখন মায়ের ভুমিকা অথবা অন্য অভিঘাতের হালুয়া-হালুয়ানিতে বোকা হালুয়ার চালাক স্ত্রীর চরিত্রে অভিনয় করে তখনও তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর হৃদয় আকুলিবিকুলি করে কেঁদে বা হেসে ওঠে খলবলিয়ে। সে যৌনতা পারিবেশন করে না, নারী চরিত্র উপস্থাপন করে মাত্র।  

মঞ্চে উঠলেই শঙ্কর যেন রূপান্তরিত হয়ে যায় অপার্থিব কিন্তু বাস্তবের রেণুগুলোয় ঢালা এক মায়াময় বাঙালি নারীর ভুমিকায়- যার পরিবার নেই, যার স্ত্রী নেই, যার সংসার নেই, যার রোজ দোকানে বসার দায় নেই, যার বাইকে চড়ে ঘোরার আকাঙ্খা নেই, যার মোবাইলে নতুন ধরণের গান বাজাবার ইচ্ছে নেই –শুধু রয়েছে ভারতীয় সভ্যতার এই অসামান্য দানের প্রতি অসামান্য আনুগত্য প্রদর্শণের নিবেদন। হাজার হাজার বছরের স্বীকৃত গ্রামীণ এই পরম্পরাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার আর সামনে বসে থাকা আকুলিবিকুলি অগুন্তি দর্শককে জীবনের মধুর স্বাদ দেওয়ার দায়। সে এই কাজ সজ্ঞাণে মাথায় তুলে নেয়। 

আমরা ভুলে যাই বাঙলার অথবা অধিকাংশ ভারতীয় সমাজেই নারীর যৌনতা কোনও দিনই আলাদা চর্চার বিষয় ছিল না - আদতে দৈনন্দিন জীবনযাত্রার অঙ্গ। আজও। বাঙলার পোড়ামাটি, মধ্যপ্রদেশের খাজুরাহো অথবা  কোণার্কএর মন্দির অলঙ্করণে রতিচিত্র, কালিদাসের কাব্যে শিবপার্বতীর বিপরীত রতিতুরাম বর্ণনা অথবা কুচযুগলশোভিত মুকুতা হারের প্রার্থনাসম্বলিত স্ত্রোত্র অথবা নানান গ্রামীণ কাব্যে সহজ স্বাভাবিকভাকে দেহবল্লরী বর্ণনা অথবা মৈথুন ভঙ্গীমা অতীতে প্রকাশিত হয়েছে, আজও হয়। মধ্যবিত্ত শহুরেরা ভিক্টোরিয় সংস্কৃতিতে আবাল্য জারিত থেকে যেগুলিকে গালাগালি ভেবে এসেছে, আজও গ্রামীণ সমাজ সেই শব্দবন্ধগুলো, সেই সাংস্কৃতিক প্রকাশভঙ্গীগুলো অসামান্য স্বাভাবিকতায় দৈনন্দিন ব্যবহার করে বহন করে নিয়ে চলে। তাই গ্রাম গ্রামই আছে, শহর হয় নি।

স্ত্রীবেশী পুরুষ শঙ্করই ১০ দিন ধরে অপার্থিব দক্ষতায় মেলা সঞ্চালন করে তার স্বেচ্ছাসেবক বন্ধুদের সঙ্গে মেলাস্থান ঝাঁটা নিয়ে ঝাঁট দিয়ে পরিষ্কার করে, মেলায় উদ্ধত যুবক সাইকেল চড়ে ঢুকে এসে স্বাভাবিকভাবেখবরদারি করে (কেউ বলার সাহস রাখে না তুই মেয়ের ভুমিকায় আভিনয় করিস, আমাকে কিছু তোর বলার অধিকার নেই), গ্রামের বাইরে থেকে আসা শিল্পী বন্ধুদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে দোকান সাজায়-তোলে, আমন্ত্রিতসব্বাইকে খেতে দেয়, মেলায় কাজ ছাড়াও বাড়িতে গিয়ে দোকান দেয়, চাষ করে, হাট করে, বাড়ির কাজ করে, রুগ্ন মায়ের সেবা করে। সব কিছুই এত্ত স্বাভাবিক, এত্ত সামাজিক যে তাকে নিয়ে নতুন করে গল্পলেখা খুবই কষ্টকর। 

গ্রামীণ সংস্কৃতিতে এত্ত স্বাভাবিক এই ঘটনা শহুরে আমাদের দৃষ্টি এড়িয়ে যায়। গ্রাম কত্ত পিছিয়ে পড়া তাই নিয়ে পরিশিলীত নাটক নভেল প্রবন্ধ লেখা হয়, রাজনৈতিক দল তৈরি হয়, এনজিওরা কোটি কোটি টাকায় মহিলাদের ক্ষমতায়ণের নামে করে-কম্মে খায়, টিভিতে মুখ দেখিয়ে সমাজ সংস্কারে ব্রতী হয়, অর্থনীতিবিদ-সমাজতাত্বিকেরা ভারি ভারি প্রবন্ধ লিখে বিশ্ববন্দিতসব প্রাইজ কুড়োন, সমাজ সংস্কারের নামে, গ্রাম সমাজকে আরও ইওরোপিয়-আমেরিকিয় করে গড়ে তুলতে উঠতি যুবক যুবতীরা নতুন করে সাগর পারের সমাজ পরিবর্তনের তত্বে দীক্ষিত হয়। 

এই মেলার সাত দিনে দেখলাম শঙ্করের বড় বন্ধু হয়ে উঠছেন মেলায় আসা গ্রামের শিল্পী দিদিরা। আমার সঙ্গে শঙ্করের যত বন্ধুত্ব, ঠিক তত বন্ধুত্ব বাতাসীদি অথবা আরতিদি আথবা দিল্লিদির সঙ্গে। আদতে আজও গ্রামের মেয়েরাই ভারাতীয় সংস্কৃতির প্রায় সবকিছু বয়ে নিয়ে চলেছেন। অসম্ভব মরমী স্বর-এ তারা শোনে শঙ্করের জীবন কথা। সে আক্ষেপে বলছিল তার মৃত বড় দাদার কথা। শঙ্করেরা তিন ভাই। ১০-১২ বিঘা সম্পত্তি, একটা দোকান, বাবা মা, বড় ভাই, বৌদিদি তাদের বাচ্চা কাচ্চা নিয়ে ভরা সংসার। সে তার এলাকায় প্রায় তারকার মর্যাদা অর্জন করেছে নিজস্ব দক্ষতায়। শঙ্কর জানে বোঝে এক জীবনে একজনের এর থেকে বেশি আর কী চাই! আমাদের জীবন খুব সুন্দরভাবে চলছিল। আমাকে নিয়ে পরিবারের সব্বাই আর পরিবারের সব্বাইকে নিয়ে আমি ভীষণ সুখী ছিলাম।

সময়মত বড় দাদার বিয়ে হল। বৌদি সংসারের সঙ্গে মিশে গেলেন। আমাদের সংসার যেমন ভাবে চলছিন তেমনিই চলতে লাগল। কিন্তু হঠাত দাদার মনে হতে লাগল বাড়ির চাষের, দোকানের রোজগারের তার পোষাচ্ছে না। আমি জানি দাদার এই মন বদলে বৌদির হাত ছিল না। দাদা পাশের ইটভাটায় কাজ নিল ট্রাক্টর চালানোর। বৌদি না চাইলেও উদয়াস্ত খাটুনি যে দাদার পোষাচ্ছে না বোঝা যাচ্ছিল তার স্বাভাবের পরিবরতনে। চাষের কাজে আনন্দ আছে, মেসিনের কাজে দুঃখ। দিনের শেষে ধুলিধুসরিত শরীর নিংড়ে অর্জিত অর্থ নিয়ে বাড়ি ঢোকা। বাড়িতে থেকেও যেন দিন দিন অচেনা হয়ে ওঠে দাদা। ট্রাক্টরের সঙ্গে থাকতে থাকতে দাদা মেসিন হয়ে যায় যেন। হঠাত একদিন ট্রাক্টরের পেছনে দাঁড়ানো দাদাকে অন্য ট্রাক্টরে পিষে দিল। হাসপাতাল পর্যন্ত পৌঁছতে দেয়নি। তার আগেই শেষ হয়ে গেল জীবন।

বাবা আজ বিছানা শয্যায়। বৌদির দীর্ঘশ্বাস। আমি আর পারি না। শঙ্কর কেঁদে বলে এত টাকার কী দরকারছিল! আমরাতো বেশ সুখে ছিলাম। কেন যে দাদার অত টাকার দরকার হল আজও বুঝিনি। টাকাই দাদাকে মেরে ফেলল।  কে উত্তর দেবে! মেলায় দোকান দিতে আসা শিল্পী মেয়েরা মুখে কাপড় দিয়ে কেঁদে ওঠে। 

নারীবেশের পুরুষত্ব নয়, শঙ্করের পরিবারের জীবনকে ছারখার করেদিল আরও বেশি আরও বেশি চাওয়ার উন্নয়ণ তত্ব। এ নিয়ে কোনও গল্প লেখা হবে না, কোনও হাহুতাশ হবে না। মেশিন আর আরও চাওয়ার দর্শনেরউন্নয়ণ তত্ত্ব যে আধুনিকতার শহুরে চিহ্নবাহী। সেই তত্বে প্রশ্ন তোলার অধিকার কারোর নেই।

তবুও মঞ্চে নারীর বেশ ধরা শঙ্করেরা গ্রামেই সুস্থভাবে বেঁচে থাকে। রাতের পর রাত জমিয়ে অভিনয় করে। অসামান্য লাস্যে, অদম্য উতসাহে গ্রাম-ভারত সভ্যতার প্রবাহমানতা বয়ে নিয়ে যায় নিজেরমত করে। গ্রামীণ এই সভ্যতার অন্যতম ধারকবাহক তারমত অভিনেতারা। তার দ্বায়িত্ব বোধহয় সে বোঝে। জানেও। এই বোধই তাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায় মঞ্চে মঞ্চে রাতের পর রাত। দাদার মৃত্যুর পর সে বোঝে উন্নয়ণ আসলে মৃত্যুই ডেকে আনে। কেউ শরীরে মরে কেউবা মনে।

শঙ্করেরা তাদের চোখ দিয়ে দেখে সেই উন্নয়ণ যজ্ঞথেকে গ্রামীণদের চোখ ফেরাবার চেষ্টাকরে নিজেদেরমত করেই। খন আর তার অভিনয় প্রকাশভঙ্গী হয়েওঠে আরও ধারালো আরও মায়াময়, জীবনের বড্ড কাছাকাছি। সংস্কৃতি যে জীবনেরই প্রকাশভঙ্গী। আরও বেশী করে জীবন আঁকড়ে ধরার কাজ সে করে চলে।