Showing posts with label রাজেন্দ্রলাল মিত্র. Show all posts
Showing posts with label রাজেন্দ্রলাল মিত্র. Show all posts

Friday, July 20, 2018

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা৫ - বিজ্ঞান ও খবরদারি - উপনিবেশ এবং উপনিবেশ উত্তর ভারতে

সে সময়ের প্রখ্যাত কায়স্থ এবং এশিয়াটিক সোসাইটির প্রথম ভারতীয় সদস্য, এবং বাংলায় বৈদিকতার প্রধান প্রবক্তা রাজেন্দ্রলাল মিত্র টেম্পলের কারিগরি শিক্ষা প্রকল্প বিষয়ে প্রতিবাদ জানালেন। বাংলার পলাশীর পরে উদ্ভুত অভিজাতরা ঐতিহাসিক কারণেই কারিগরি শিক্ষা দর্শন বিরোধী, আদতে তারা মৌলিকভাবে শ্রম বিমুখ, জাতিবাদী, উতপাদনের ওনুষঙ্গ থেকে বিযুক্ত। ব্রিটিশ শাসন, শ্রম বিমুখ উচ্চবর্ণকে ক্ষমতাকেন্দ্রে নিয়ে আসার একমাত্র কারিগর। পলাশীর পরে ব্রাহ্মণ, কায়স্থদের একচ্ছত্র আধিপত্য দেখা দিল।
বাবু রাজেন্দ্রলাল মিত্র, এশিয়াটিক সোসাইটির প্রথম কালা প্রেসিডেন্ট বললেন(এটি মহেন্দ্রলাল সরকারের ভাষ্যে On the Desirability of a National Institution for the Cultivation of the Sciences by the Natives of Indiaয় উল্লিখিত), For three thousand years and upwards their [আর্থাত উচ্চবর্ণের প্রতিভূ মিত্তরবাবুদিগের] ancestors had cherished Sanskrit learning for its own sake, and need it be doubted that their descendents would not be equal to the sciences of the present day’. Temple’s practical science was not acceptable। মিত্তরজা বললেন হুঁশিয়ারি দিয়ে do not ... attempt to make it [the proposed institute] self- supporting by producing remunerative art work in your laboratories. If you do, you will disappoint your pupils, and court signal failure.
মিত্তিরজা এটা বলতেই পারেন কেননা তিনি ১৮৫৪ সালের ক্যালকাটা স্কুল অব ইন্ডাস্ট্রিয়ার আর্টের সাম্মানিক সম্পাদক এবং হিসাবরক্ষও ছিলেন(এবং শতাব্দ শেষে রবীঠাকুর এবং হ্যাভেলের চেষ্টায় এটি শিল্পকলা বিদ্যালয় হিসেবে আবির্ভূত হয়)। টেম্পলের পৌরোহিত্যে একটি জনসভায় ফাদার লাফঁ বললেন, ‘the other Association’ [pro-Temple] wanted ... to transform the Hindus into a nation of mechanics, requiring forever European supervision, whereas Sircar’s object was to emancipate, in the long run, his countrymen from this humiliating bondage।
কাল্টিভেশন অব সায়েন্সেসএর উদ্যোগে কলেজ পাঠ্যে প্রথম বিজ্ঞান অন্তর্ভূক্ত হয় । তবে মৌলিক বিজ্ঞান গবেষণা পাঠ্য হিসেবে মান্যতা পায় ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষিত জগদীশ চন্দ্র বসু আর প্রফুল্ল রায়ের সময়। উল্লেখ্য প্রেসিডেন্সি কলেজে ছয় বছর পড়ানোর সময় বিদ্যুৎ তরঙ্গ নিয়ে গবেষণা করেন জগদীশ বসু। অসাধারণ কিছু বিষয় আবিষ্কারও করেন। কিন্তু নিজের আবিষ্কারের পেটেন্ট নিতে অস্বীকার করেন তিনি(এটা নিয়ে বিশদে আমরা পরম পত্রিকায় আলোচনা করেছি, কিভাবে লন্ডনে তার কাজ চুরি করার চেষ্টা করা হয়, কিভাবে তাকে গবেষণা করতে বিশ্বশ্রুত বৈজ্ঞানিকেরা বাধা দেন, কিভাবে টেলিগ্রাফ কর্পোরেটরা তার গবেষণা কিনতে চেয়ে তাকে অর্থ দিয়ে ভরিয়ে দেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করে)। এবং তাঁকে পাশে পাওয়ার জন্যে উদগ্রীব ব্রিটিশ পুঁজিপতিদের উপহাস করেন।
পরিহাসের হল এই পেটেন্ট আমেরিকায় নেন তাঁর ঘনিষ্ঠ দুই আধ্যাত্মিক বান্ধবী - ব্রিটিশ সন্ন্যাসী মার্গারেট নোবেল এবং আমেরিকিয় সারা বুল। জগদীশ সেই অর্থ নিতে স্রেফ অস্বীকার করেন(সূত্র Science and domination: India before and after independence Rajesh Kochhar)। কিন্তু পেটেন্টের অর্থ বহুকাল পেয়েছেন দুই মহিলা। এ নিয়ে তাকে অনেক কটুক্তিও শুনতে হয়েছে। এই অসাধারণ কাজের জন্যে জগদীশচন্দ্রের ঘনিষ্ঠ বন্ধু, জীবনীকার গেডেস তাকে ব্যঙ্গ করে ঋষি বলেছেন(Simply stated, it is the position of the old rishis of India, of whom he is increasingly recognized by his countrymen as a renewed type, and whose best teaching was ever open to all willing to accept if. Bose carried on his shoulders the full weight of his country’s defensiveness)। প্রফুল্ল রায়ও সরকারি খেতাব নিতে গিয়ে জগদীশ বসুকে প্রকাশ্যে কটুক্তি করেছেন। এবং এই প্রবন্ধে কোছার তাকে কুইকজোটিয় বলেও ব্যঙ্গ করেছেন।
জগদীশচন্দ্রের নানান চিঠি, প্রবন্ধ আর জীবনী পড়ে আমাদের যতদূর সম্ভব মনে হয়েছে তিনি হয়ত লন্ডনে বসে বৈজ্ঞানিকদের ধনের প্রতি অতিমাত্রায় লোভ, বিখ্যাত হওয়ার জন্যে অসাধুতা আর কর্পোরেট গৃধ্নুতা দেখে ১৯০০ সালেই বুঝেছিলেন বেতার তরঙ্গর মত নানান প্রযুক্তি কিভাবে কর্পোরেটদের লাভের সূত্র আর সামরিক প্রযুক্তি হিসেবে বিশ্বপ্রভুত্বের হাতিয়ার হতে পারে। তিনি পরবর্তী জীবনে এ বিষয়ে একটিও গবেষণায় উদ্যোগী হন নি।
আমরা আজ হয়ত আন্দাজ করতে পারি তিনি অন্তত কর্পোরেট লাভের নোংরা লুঠ খেলায় আর বিশ্ব ধ্বংসের ঔপনিবেশিক অত্যাচারের হাতিয়ার হসেবে নিজেকে জড়াতে চান নি। যে মানুষটার একটি স্বাক্ষর এবং তার একটি আবিষ্কারের কর্পোরেট অংশিদারি তাকে লক্ষ কোটিপতি করে দিতে পারত, সেই মানুষটা নির্বিবাদে নিজের দেশে ফিরে এসে বিজ্ঞান সাধনা করেছেন তার মত করে, জীবন চালাবার জন্যে ভিক্ষা করেছেন প্রায়। এবং সে সময় তাঁর পাশে একমাত্র দাঁড়িয়েছিলেন আমাদের খুব পছন্দর মানুষ নয়, রবী ঠাকুর। এমনকি রামবাগানের প্রখ্যাত রমেশ মিত্তির তাকে লন্ডন থেকে বাংলায় ফিরতে বাধাও দিয়েছিলেন লন্ডনে অধ্যাপনার কাজ জুটিয়ে দেওয়ারও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। অসাধারণ, আজ পড়লে রূপকথা মনে হয়। উল্টো দিকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে সরকারকে নানান রাসায়নিক সরবরাহ করেন প্রফুল্ল রায়, এবং সেই জন্য তার রানীর খেতাবও জোটে এবং জগদীশচন্দ্র সেটি নেন না, তিনি প্রকাশ্যে জগদীশচন্দ্রকে কিছুটা ব্যঙ্গও করেন। উপনিবেশ বিরোধী আন্দোলনে জগদীশচন্দ্র আজও আমাদের বড় হাতিয়ার।
দুঃখের কথা, আজ তার প্রতিষ্ঠিত বসু বিজ্ঞান মন্দির সরকারি বিনিয়োগে সামরিক কাজ করে।
রাজেশ কোছারের Science and domination: India before and after independence প্রবন্ধ অবলম্বনে
জগদীশচন্দ্রের হয়ে পেটেন্ট আবেদনের নিস্পত্তির চিঠি

Wednesday, April 25, 2018

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা৬৮ - ঔপনিবেশিকতাবাদ এবং তার জ্ঞানচর্চার আঙ্গিক - সাম্রাজ্যের মন ও মান ।। বারনার্ড কোহন

অধ্যায় ৪
উনবিংশ শতকে, বস্তুকে হস্তশিল্প, পুরাকীর্তি আর শিল্পে রূপান্তর

কর্নেল ম্যাকেঞ্জি এবং অমরাবতীর মার্বেল পাথরের স্থাপত্য
ভারতের প্রথম ইওরোপিয় পন্থার প্রাচীন ভারতের ইতিহাসের সংস্কৃতজ্ঞ বিদ্বান রাজেন্দ্রলাল মিত্র কিন্তু ভারতের স্থাপত্যবিদ্যার আবির্ভাব বিষয়ে ফারগুসনের তত্ত্বের বিরোধিতা করেছেন এশিয়াটিক সোসাইটিতে প্রকাশিত এনটিকুইটি অব ওডিসা নামক প্রবন্ধে, ১৮৭৫ এবং ১৮৮০ সালে দুটি খণ্ডে প্রকাশিত বইতে এবং বুদ্ধ গয়াঃ দ্য হার্মিটেজ অব শাক্যমুনিতে। তিনি সরাসরি ফারগুসনের মত ইওরোপিয়দের মত – যে ভারতের শিল্প আর স্থাপত্যের কোন মৌলিকত্ব এবং উদ্ভাবনী ক্ষমতা নেই, এবং এইগুলি গ্রিক আর রোমিয়দের দ্বারা প্রভাবিত এই মনগড়া তত্ত্বর বিরুদ্ধে কোমর বেঁধে লাগেন। রাজেন্দ্রলাল ঐতিহাসিকতার দৃষ্টিভঙ্গী থেকে ভারতীয় স্থাপত্যকলা বিষয়ে আলোচনা শুরু করেন। এর সঙ্গে জোড়েন নানান সংশ্লিষ্ট লেখমালা সাহিত্য এবং স্থাপত্যের আঙ্গিক এবং তার অন্তর্নিহিত অর্থ এবং ভারতীয় শিল্পকৃতির বিকাশকে।
ফারগুসন এই অ-প্রশিক্ষিত এবং বেহায়া ভারতীয়র বিরুদ্ধে খোলা ব্যক্তিগত আক্রমনের পথ বেছে নিয়ে প্রশ্ন তুললেন, ভারতীয় স্থাপত্যের নানান আঙ্গিক এবং তত্ত্ব বোঝার এবং বিশ্লেষণের ক্ষমতা কি করে একজন ভারতীয়র জন্মায়। তিনি তার রণনীতি সাজালেন ভারতের প্রতি তার অন্তর্নিহিত ভালবাসা প্রকাশের মধ্যে দিয়ে, যেখানে তিনি বললেন কিভাবে তিনি আনন্দ করে সারা হিন্দুস্থান ঘুরে স্থাপত্যের বর্তমান খণ্ডহরের নানান নিদর্শন দেখেছেন। তিনি নিশ্চিতভাবে বললেন, ভারতীয়দের সঙ্গে তার সম্পর্ক খুব মনোহরা এবং সন্তোষজনক। তিনি মধ্য ভারতের রাজাদের আতিথ্য গ্রহণ করেছেন, যেদিন তিনি ভারতে পদার্পণ করেন সেদিন থেকে নানান চাকরবাকর তাকে আস্থাসহকারে, সাধুতার সঙ্গে তাঁর সেবা করে গিয়েছে।
১৮৩৫ থেকে ১৮৪২ পর্যন্ত ফারগুসন ভারতে ছিলেন, যে সময়কে তিনি ব্রিটিশদের স্বর্ণযুগ হিসেবে দেখেন, তারপরে কিছু উন্মার্গগামী দেশি ইওরোপিয় সভ্যতার সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে নিজেদের খারাপ করে ফেলে। এই যে পরিবর্তন এল সেটা হল ভারতীয়রা ব্রিটিশদের সমকক্ষ হয়ে ওঠার চেষ্টার জন্যেই, যা ফারগুসনের মতে ঠিক নয় কারণ দুই সভ্যতা কখোনো মিশ খায় না।
ফারগুসন বললেন বাঙালি রাজেন্দ্রলাল মিত্র এর একটা উল্লেখযোগ্য নিদর্শন – কি সুন্দর তিনি আমাদের ভাষা আয়ত্ত্ব করেছেন, কিন্তু তার তাবৎ ইওরোপিয় বৈজ্ঞানিক এবং সাহিত্যিক সখ্যতা তৈরি হয়েছে ওপরওপরই, ভেতরে প্রবেশ করতে পারেন নি। ভারতীয়দের যোগ্যতা বিপুল বিশাল বিষয় এবং নানান ধরণের বৈজ্ঞানিক সত্য মনে রাখার। ইওরোপিয়রা যে ভাবে দীর্ঘ দিন ধরে সতর্ক কাটাছেঁড়া করে বৈজ্ঞানিক সত্যের কাছে পৌঁছনোর চেষ্টা করেছে, তার কাছে এটা কিছুই নয়। তার আরও অভিযোগ, বাবু(রাজেন্দ্রলাল) জার্মান পদ্ধতি অনুসরণ করেছেন, যা কোনো দিন কোন ব্রিটিশ ছুঁয়েও দেখবে না। ফলে ফারগুসনকে আক্রমন করার উদ্দেশ্যই হল ভারতীয় হিসেবে নিজের অবস্থানটাকে আরও একটু উজ্জ্বল করা মাত্র। আদতে রাজেন্দ্রলাল নিজেকে দেশভক্ত প্রমান করে বলতে চাইছেন যে অজ্ঞ এক বিদেশি ভারতীয়দের শিল্পকলা নিয়ে কুতসা করছে। আদতে তিনি যে রাজেন্দ্রলালের বিরুদ্ধাচরণ করছেন, সেটা শুধু ভারতীয় স্থাপত্য আর শিল্পকলা বিষয়ে বিরোধিতার থেকেও অনেক বেশি। তার এই লেখার সঙ্গে যুক্ত করলেন ইলবার্ট বিলের বিষয়টি যেখানে ইওরোপিয়রা ফৌদারি মামলায় দেশিয় বিচারকদের কাছে বিচার পাওয়া নিয়ে বিতর্ক উঠছে।

ফারগুসন লিখলেন, হোয়াই দ্য ইউওরোপিয়ান রেসিডেন্ট ইন দ্য কান্ট্রি, এন্ড নোয়িং দ্য ক্যারেক্টার অব দ্য পিপল এমং হুম দে আর লিভিং, শুড হ্যাভ স্রাঙ্ক ইন্সটিঙ্কটিভলি, উইথ পিওরলি প্যাট্রিয়টিক মোটিভস, ফ্রম দ্য ফ্রাচুইটি অব দ্য ইলবার্ট বিল। ইট মে হাউএভার ইউজফুল টু দোজ হু রিসাইড এট আ ডিস্ট্যান্স, এন্ড হু হ্যাভ নো লিগ্যাল এক্সপিরিয়েন্স, টু হ্যাভ এক্সপ্লেইনড টু দেম বাই স্ট্রাইকিং লিভিং এক্সামপ্ল, হয়ারইন দ্য স্ট্রেংথ এন্ড উইকনেস অব দ্য কজ রিসাইডস এন্ড ফর দ্যাট পারপাস আই ডু নট নো এনি এক্সামপ্ল দ্যাট ক্যানবি মোর এপ্রোপ্রিয়েট দ্যান দ্যাট বাবু রাজেন্দ্রলাল মিত্র। ইফ আফটার রিডিং দ্য ফলোয়িং পেজেস, এনি ইওরোপিয়ান ফিলস দ্যাট হি উড লাইক টু বি সাবজেক্টেড টু হিজ জুরিসডিকশন, ইন ক্রিমিনাল কেসেস, হি মাস্ট হ্যাভ আ কারেজ পজেসড বাই ফিউ; অর ইফ হি থিঙ্কস হি কুড ডিপেন্ড অন হিজ নলেজ, অর ইম্পার্শিয়ালিটি, টু ডু হিম জাস্টিস, এজ হি কুড অন অয়ান অব হিজ ওউন কান্ট্রিমেন, হি মাস্ট স্ট্রেঞ্জলি কন্সটিটিউটেড ইন মাইন্ড, বডি এন্ড এস্টেট। 

Sunday, March 4, 2018

পশ্চিমি সামরিক বিজ্ঞান-প্রযুক্তির ইতিহাস৪ - লুঠের উপনিবেশের আধিপত্যের ইতিহাস - ভদ্রবৃত্তের পশ্চিম দাসত্বের ইতিহাস

সে সময়ের প্রখ্যাত কায়স্থ এবং এশিয়াটিক সোসাইটির প্রথম ভারতীয় সদস্য, এবং বাংলায় বৈদিকতার প্রধান প্রবক্তা রাজেন্দ্রলাল মিত্র টেম্পলের কারিগরি শিক্ষা প্রকল্প বিষয়ে প্রতিবাদ জানিয়ে বললেন(এটি মহেন্দ্রলাল সরকারের ভাষ্যে On the Desirability of a National Institution for the Cultivation 18 of the Sciences by the Natives of Indiaয় উল্লিখিত), For three thousand years and upwards their [আর্থাত উচ্চবর্ণের প্রতিভূ মিত্তরবাবুদিগের] ancestors had cherished Sanskrit learning for its own sake, and need it be doubted that their descendents would not be equal to the sciences of the present day’. Temple’s practical science was not acceptable। তিনি বললেন হুঁশিয়ারি দিয়ে do not ... attempt to make it [the proposed institute] self- supporting by producing remunerative art work in your laboratories. If you do, you will disappoint your pupils, and court signal failure. মিত্তিরজা এটা বলতেই পারেন কেননা তিনি ১৮৫৪ সালের ক্যালকাটা স্কুল অব ইন্ডাস্ট্রিয়ার আর্টের সাম্মানিক সম্পাদক এবং হিসাবরক্ষও ছিলেন(এবং শতাব্দ শেষে রবীঠাকুর এবং হ্যাভেলের চেষ্টায় এটি শিল্পকলা বিদ্যালয় হিসেবে আবির্ভূত হয়)। টেম্পলের পৌরোহিত্যে একটি জনসভায় ফাদার লাফঁ বললেন, ‘the other Association’18 [pro-Temple] wanted ... to transform the Hindus into a nation of mechanics, requiring forever European supervision, whereas Sircar’s object was to emancipate, in the long run, his countrymen from this humiliating bondage।
কাল্টিভেশন অব সায়েন্সেসএর উদ্যোগে কলেজ পাঠ্যে প্রথম বিজ্ঞান অন্তর্ভূক্ত হয় কালটিভেশনের উদ্যোগে। তবে মৌলিক বিজ্ঞান গবেষণা পাঠ্য হিসেবে মান্যতা পায় জগদীশ চন্দ্র বসু আর প্রফুল্ল রায়ের সময়।
উল্লেখ্য প্রেসিডেন্সি কলেজে ছয় বছর পড়ানোর সময় বিদ্যুৎ তরঙ্গ নিয়ে গবেষণা করেন জগদীশ বসু। নিজের আবিষ্কারের পেটেন্ট নিতে অস্বীকার করেন তিনি(এটা নিয়ে বিশদে আমরা পরম পত্রিকায় আলোচনা করেছি, কিভাবে লন্ডনে তার কাজ চুরি করার চেষ্টা করা হয়, কিভাবে তাকে গবেষণা করতে বিশ্বশ্রুত বৈজ্ঞানিকেরা বাধা দেন, কিভাবে টেলিগ্রাফ কর্পোরেটরা তার গবেষণা কিনতে চেয়ে তাকে অর্থ দিয়ে ভরিয়ে দেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করে)।
পরিহাসের হল এই পেটেন্ট আমেরিকায় নেন তাঁর ঘনিষ্ঠ দুই বান্ধবী, ব্রিটিশ সন্ন্যাসী মার্গারেট নোবেল এবং আমেরিকিয় সারা বুল। জগদীশ সেই অর্থ নিতে স্রেফ অস্বীকার করেন(সূত্র Science and domination: India before and after independence Rajesh Kochhar)।  কিন্তু পেটেন্টের অর্থ বহুকাল পেয়েছেন দুই মহিলা। এ নিয়ে তাকে অনেক কটুক্তিও শুনতে হয়েছে। এই অসাধারণ কাজের জন্যে জগদীশচন্দ্রের ঘনিষ্ঠ বন্ধু, জীবনীকার গেডেস তাকে ব্যঙ্গ করে ঋষি বলেছেন। প্রফুল্ল রায়ও সরকারি খেতাব নিতে গিয়ে জগদীশ বসুকে প্রকাশ্যে কটুক্তি করেছেন।
জগদীশচন্দ্রের নানান চিঠি, প্রবন্ধ আর জীবনী পড়ে আমাদের যতদূর সম্ভব মনে হয়েছে তিনি হয়ত লন্ডনে বসে বৈজ্ঞানিকদের ধনের প্রতি অতিমাত্রায় লোভ, বিখ্যাত হওয়ার জন্যে অসাধুতা আর কর্পোরেট গৃধ্নুতা দেখে ১৯০০ সালেই বুঝেছিলেন বেতার তরঙ্গর মত নানান প্রযুক্তি কিভাবে কর্পোরেটদের লাভের সূত্র আর সামরিক প্রযুক্তি হিসেবে বিশ্বপ্রভুত্বের হাতিয়ার হতে পারে। তিনি পরবর্তী জীবনে এ বিষয়ে একটিও গবেষণায় উদ্যোগী হন নি।
আমরা আজ হয়ত আন্দাজ করতে পারি তিনি অন্তত কর্পোরেট লাভের নোংরা লুঠ খেলায় আর বিশ্ব ধ্বংসের ঔপনিবেশিক অত্যাচারের হাতিয়ার হসেবে নিজেকে জড়াতে চান নি। যে মানুষটার একটি স্বাক্ষর এবং তার একটি আবিষ্কারের কর্পোরেট অংশিদারি তাকে লক্ষ কোটিপতি করে দিতে পারত, সেই মানুষটা নির্বিবাদে নিজের দেশে ফিরে এসে বিজ্ঞান সাধনা করেছেন তার মত করে, জীবন চালাবার জন্যে ভিক্ষা করেছেন প্রায়। এবং সে সময় তাঁর পাশে একমাত্র দাঁড়িয়েছিলেন আমাদের খুব পছন্দর মানুষ নয়, রবী ঠাকুর। এমনকি রামবাগানের প্রখ্যাত রমেশ মিত্তির তাকে লন্ডন থেকে বাংলায় ফিরতে বাধাও দিয়েছিলেন লন্ডনে অধ্যাপনার কাজ জুটিয়ে দেওয়ারও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। অসাধারণ, আজ পড়লে রূপকথা মনে হয়। উল্টো দিকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে সরকারকে নানান রাসায়নুইক সরবরাহ করেন প্রফুল্ল রায়, এবং সেই জন্য তার খেতাবও জোটে। উপনিবেশ বিরোধী আন্দোলনে জগদীশচন্দ্র আজও আমাদের বড় হাতিয়ার।

দুঃখের কথা, আজ তার প্রতিষ্ঠিত বসু বিজ্ঞান মন্দির সরকারি বিনিয়োগে সামরিক কাজ করে।

পশ্চিমি সামরিক বিজ্ঞান-প্রযুক্তির ইতিহাস৩ - লুঠের উপনিবেশের আধিপত্যের ইতিহাস - ভদ্রবৃত্তের পশ্চিম দাসত্বের ইতিহাস

fallen and degraded ভাইবোনেদের উন্নয়নের জন্যে সাম্রাজ্যের উদ্ধারকারী হাত তৈরিই ছিল। হিন্দু কলেজ, বর্তমান প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি হল প্রভাবশালী ইংরেজি শিক্ষিত রামমোহন-দ্বারকানাথ জুটি, অসরকারী ইওরোপিয় ডেভিড হেয়ার এবং কলকাতার বিচারপতি এডওয়ার্ড হাইড ইস্টের সহযোগিতায় এবং কোম্পানির মালিক রথসচাইল্ডদের উদ্যমে। ঠিক একই ঘটনা ঘটল - প্রভাবশালী বাঙালি মহেন্দ্রলাল, জেসুঈট পাদ্রি ইউজিন লাফঁ বাংলার লেফটানেন্ট গভর্নর রিচার্ড টেম্পলের সহযোগিতায় কাল্টিভেশন অব সায়েন্সের স্থাপনায়। সাম্রাজ্যের সরাসরি হাত থাকছে প্রভাবশালী শিক্ষিত ব্যক্তিদের ইওরোপিয় বিজ্ঞান প্রচার এবং প্রসারের উদ্যমের পিছনে।
১৮৭৫ সালে টেম্পল মহেন্দ্রলালকে লিখলেন একটি পলিটেকনিক(আজকের দিনের ভাষায়) তৈরি করার উদ্যোগ নিতে - But science also may be made to add immeasureably to the national wealth and so’ to afford lucrative employment to numberless persons according to their qualifications and acquirements। এরসঙ্গে তিনি জুড়ে দিলেন কোন কোন পেশা এই শিক্ষা ব্যবস্থায় ঢুকতে পারে তারমধ্যে ছিল ভূমি আর ভূতত্ত্ব সমীক্ষা, অসামরিক ইঞ্জিনিয়ারিং, মেকানিক্স, বনবিদ, কাঠ আর পাথর শিল্পী। তিনি আরও লিখলেন, Moreover, by these means not only will many new industries be introduced into Bengal, but almost every one of the old established art, and manufacturers of the country may be rendered more useful and remunerative than at present.।
আজ ১৮৭৫ সালের এই তত্বকে বলতে পারি গ্রাম বাংলার প্রযুক্তিকে ধ্বংস করে লুঠেরা আধুনিক বিদ্যুৎ নির্ভর প্রযুক্তির দিকে যাত্রার প্রথম তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক নির্দেশাবলী। বাংলার লেফটানেন্ট গভর্নর ভারতের ভাইসরয়কে একটি চিঠ লিখে জানালেন ভারতজুড়ে ক্ষোভ বাড়ছে কেননা, partly from our higher education being too much in the direction of law, public administration, and prose literature But we shall do more and more to direct their thoughts towards practical science, where they must inevitably feel their utter inferiority to us।
আমাদের ধারণা টেম্পল ভারতের বিপুল কারিগরদের কথা এখানে উল্লেখ করতে চেয়েছেন যাদের ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ইওরোপে শিল্পায়নের জন্য ধ্বংসের মুখে ফেলে দিয়েছিল। তারা এই প্রস্তাবে কানই দিল না – স্রেফ উপেক্ষাই করল।
উল্টোদিকে বিপুল আলালের দল, যারা পলাশীর পরের লুঠের অংশিদার ছিল, যে অংশিদারিতে পরের দিকে ব্রাহ্মণেরাও ঢুকে গোটা ব্যবস্থাটা দখল করে নেবে, তারা শঙ্কিত হয়ে পড়ল, সাম্রাজ্যের ক্ষমতার অংশ আবার তাদের হয়ত ভাগ করে নিতে হবে।
(চলবে)

Saturday, February 16, 2013

ঢাকাই বস্ত্র২, রাজেন্দ্রলাল মিত্র

ঢাকাই বস্ত্র


ঢাকা প্রদেশে যে সকল স্থানে বস্ত্র প্রস্তুত হয় তন্মধ্যে মলমলখাস, সরকার আলি, ঝুনা, রঙ্গ, আব-রওয়াঁ, খাসা, শবনম, আলাবলী, তাঞ্জেব, তরন্দম, সরবন্দ, সরবতি কমিয, ডোরিয়া, চারখানা এবং জামদানী, এই কএক প্রকার বস্ত্র সর্ব্বপ্রসিদ্ধ।
মলমল খাস মুসলমান রাজাদিগের আধিপত্য সময়ে রাজপরিবারেরা ব্যবহার করিত, তত্প্রযুক্ত ইহা খাস উপাধি প্রাপ্ত হইয়াছে। ইহার টানায় ১৮০০ সূত্র থাকে, এবং এক অর্দ্ধ(আধি) থানের পরিমান ৮ তোলা – আনা মাত্র!!! ঐ থান আনায়াসে এক অঙ্গুরীর মধ্যদিয়া চালিত হইতে পারে। ইহা বপনে ছয় মাস কাল ব্যয় হয়, এবং ইহার মূল্য ১৫০ টাকা।
সরকার আলি পূর্ব্বাপেক্ষা মধ্যম। রাজপ্রতিনিধিরা উহা ব্যবহার করিত, এবং ইহা টানায় ১৯০০ সূত্র থাকে।
ঝুনা বস্ত্র এমত অত্যন্ত সূক্ষ্ম যে ইহা পরিধান করিলে শরীরোপি বস্ত্র আছে এমত বোধ হয় না। ইহার তুলনায় গাজ নামে প্রসিদ্ধ বস্ত্রও অতি স্থূল জ্ঞান হয়। ইহার দুই হস্ত প্রশস্ত বস্ত্রে ২০০০ টানার সূত্র থাকে। মুসলমান রাজমহিষীরা ও নর্ত্তকীরা এই বস্ত্র ব্যবহার করেন, অন্যত্র ইহার ব্যবহার নাই। প্রাচীন বৌদ্ধ-গ্রন্থে এই বস্ত্রের ব্যবহার স্ত্রীলোক-পক্ষে নিষেধ আছে। তাবার্ণিয়ার সাহেব লেখেন যে মুসলমান রাজাদিগের আজ্ঞাক্রমে কোন বণিক এই বস্ত্র ক্রয় করিয়া স্থানান্তর করিতে পারিত না।
রঙ্গ বস্ত্র পূর্ব্ববত্, কেবল বপনের প্রথায় স্বতন্ত্র, ও ইহার টানায় ১২০০সূত্র থাকে।
আব রওয়াঁ অতি প্রসিদ্ধ বস্ত্র। ইহার তুল্য স্বচ্ছ বস্ত্র আর কুত্রাপি নাই। ইহার টানায় ৭০০ সূত্রমাত্র থাকে। যবনেরা ইহার স্বচ্ছতা স্রোতো-জলের তুল্যজ্ঞান করিয়া ইহাকে আব(বারি) রওয়াঁ(গতি বিশিষ্ট) উপাধি দিয়াছেন। এই বস্ত্রেদ্দেশ্য কথিত আছে যে কোন সময়ে আওরঙ্গজেব পাদশাহ স্বতনয়ার বর্ণ তাহার বস্ত্র ভেদ করিয়া প্রকাশ হইয়া ছিল দেখিয়া তাহাকে তিরস্কার করাতে সে কহিয়াছিল, পিতঃ সপ্তস্তর বস্ত্র পরিধান করিয়াছি, তথাপি আমাকে কেন তিরস্কার করেন।
খাসা বা জঙ্গল খাসা পূর্ব্বে সোনারগাঁয়প্রস্তুত হইত। ইহা অন্যান্য মলমল অপেক্ষা ঘন, এবং অধিক প্রশস্ত। ৩ হস্ত প্রশস্ত খাসা অপ্রাপ্য নহে।
শবনম। এই মলমল অতি মনোহর। ইহা রজনী-যোগে তৃণময় ক্ষেত্রে বিস্তৃত করিয়া রাখিলে শিশিরদ্বারা সিক্ত হইয়া পরদিবস প্রাতে অদৃশ্য হয়, ক্রমশঃ যত দিবা বৃদ্ধি হইতে থাকে তত শিশির শুষ্ক হইলে তাহা পুণরায় দৃষ্টিগোচর হয়। সর্ব্বোত্তম শবনমের টানায় ৭৮০ সূত্র থাকে।
স্থানাভাব প্রযুক্ত আলাবলি তাঞ্জব ইত্যাদি বস্ত্রের  বিবরণ অধুনা বিবৃত হইল না। অবকাশমতে এ বিষয়ের পরিশেষ ও ঢাকাই বস্ত্র ধৌত করণ প্রণালীর রীতি সম্বন্ধে পুনরায় যতকিঞ্চিত্ প্রকটিত হইতে পারে।

ঢাকাই বস্ত্র১, রাজেন্দ্রলাল মিত্র

এই প্রথম লোকফোক মসলিন তৈরির পদ্ধতির একটি অংশ উদ্ধার করল রাজেন্দ্রলাল মিত্রের লেখা থেকে. সেই লেখাটি দুটি অংশে প্রকাশ হবে, প্রথমটি মসলিন তৈরি বিষয়ক, অন্যটি মসলিনের বিভাগ বিষয়ক।
১৮৫৮ সালে নানান শিল্পদ্রব্যের প্রস্তুতি বর্ণনা করতে রাজেন্দ্রলাল মিত্র শিল্পীক দর্শন নামক এক পুস্তক প্রকাশ করেন. এই বইতে নানান ধরণের শিল্পবস্তুর প্রস্তুতি পদ্ধতির বর্ণনা রয়েছে। এর অনেকগুলোই ভারতীয় প্রযুক্তি নয়। তার সঙ্গে কিছু ঐতিহাসিক তথ্যও লেখক জুড়ে দিয়েছেন। অধিকাংশ কিন্তু পাশ্চাত্য শিল্প পদ্ধতিতে তৈরির বর্ণনা। শুধু কয়েকটি দেশি বস্তু(প্রযুক্তি) রয়েছে, সেগুলির মধ্যে ঢাকাই বস্ত্র নামে এক প্রবন্ধে মসলিন তৈরির পদ্ধতি বর্ণনা করেছেন। এর আগে বহু লেখায় মসলিন কাপড়গুলোর নানান বর্ণনা পাওয়া গেলেও এই কাপড় তৈরির বর্ননা এই প্রথম পাওয়া গেল। সেই জন্য এই লেখাটির মূল্য অসীম।  
লোকফোকের পক্ষে বিশ্বেন্দু
ঢাকাই বস্ত্র
ঢাকাই বস্ত্র সকলেরই প্রিয়, সকলেই ঐ মনোহর পরিচ্ছেদের প্রশংসায় ব্যগ্রচিত্ত হন, অতএব ক্ষণৈক তদ্বিষয়ের আলোচনায় বোধ হয়, কেহই বিরক্ত হইবেন না। অপিচ হিন্দুদিগের শিল্পকর্ম্মে নৈপুণ্য-বিষয়ে এই অনুপম বস্ত্র এক মহতী ধ্বজ। পৃথিবীর – সকল পারদক্ষ তন্ত্রবায়ের ইহার তুল্য বস্ত্র বপনে বহুকালাবধি যত্নশীল আছে, কিন্তু অম্মদেশীয় ঐ জয়পতাকার গর্ব্ব খর্ব্ব করিতে অদ্যপি কেহই সক্ষম হয় নাই। ঢাকাই বস্ত্র যত্পরোনাস্তি সামান্য যন্ত্রে প্রস্তুত হয়, কিন্তু সেই সামান্য যন্ত্র ও তদ্ব্যবহারকর্ত্তৃদিগের কি আশ্চর্য্য ক্ষমতা, যে বিলাতের অদ্বিতীয় শিল্পকুশল ব্যক্তিরা বহুমূল্য বাষ্পীয়যন্ত্র সহকারেও তাহার সদৃশ সূক্ষ্মপরিচ্ছদ প্রস্তুত করণে পরাস্ত হইয়াছে। দুই সহস্র বত্সর পূর্ব্বে এই অনুপম বস্ত্র প্রাচীন রোমরাজ্যে প্রসিদ্ধ হইয়া হিন্দুদিগের শিল্প-সাফল্যের অনির্ব্বচনীয় প্রমাণ স্বরূপে গণ্য ছিল।
...ঢাকাই বস্ত্র বয়নের প্রথম ক্রিয়া সুতা প্রস্তুত করণ। এই কর্ম্ম তদীয় পল্লীগ্রামের স্ত্রীলোকদ্বারা সম্পন্ন হয়। এই স্ত্রীলোকদিগকে সামান্যলোকে কাটনী বা সূতাকাটনী বলিয়া থাকে। এই কাটনীদিগের ত্বগিন্দ্রীয় তীক্ষ্ন, এবং তদ্বারা ইহারা সূত্রের সূক্ষ্মতা-তারতম্য যে প্রকার উত্তমরূপে অনুভব করতে পারে, পৃথিবী মধ্যে এমত আর কুত্রাপি কোন জাতীয়েরা পারে না। অল্পবয়স্কা স্ত্রীরা সর্ব্বোত্কৃষ্ট সূত্র প্রস্তুত করিয়া থাকে, বয়ঃক্রম ত্রিংশত্ বত্সর অতীত হইলে, তাহাদিগের নয়ন ও ত্বগিন্দ্রিয়তত্কর্মে অপটু হয়, সুতরাম তাহারা আর তত উত্তম সূত্র প্রস্তুত করণে সক্ষম থাকে না। পূর্ব্বহ্নে বেলা ১০ ঘটিকা পর্য্যন্ত ও উপরাহ্নে ৪ ঘটিকার পর সূত্র কাটিবার সময়। এতদ্ব্যতীত অন্য সময়ে রৌদ্র প্রখর থাকিলে, উত্তম সূত্র প্রস্তুত হয় না। নলনল খাস নামক সর্বোত্কৃষ্ট বস্ত্র বুনিবার সূত্র অতি প্রত্যুষে কাটিতে হয়, এবং যদ্যপি কাটনীর চতুর্বর্ত্তিত স্থানে শিশির না থাকে, তবে এক পাত্রে কিঞ্চিত জল রাখিয়া তদুপরি সূত্র কাটিবার প্রযোজন হয়, নচেত্ সূত্র ছিন্ন ভিন্ন হইয়া যায়।   ...ইহার ১৭৫ হস্ত সূত্রের পরিমান এক রতি মাত্র। ফলতঃ ইহার এক সের পরিমাণে সূত্র বিস্তার করিলে প্রায়ঃ ৪০০ জ্যোতিষীয় ক্রোশ স্থানে ব্যপ্ত হয়!!! এই অদ্ভুত সূত্র যাদৃশ সূক্ষ্ম, ইহা প্রস্তুত করণের শ্রমও তত্পরিমাণে বহুল। দুই মাস কাল নিয়মিত পরিশ্রম করিলে এক তোলক পরিমাণ সূত্র প্রস্তুত হয়, সুতরাং উহার মূল্যও অত্যন্ত অধিক। এক সের সর্বেবোত্কৃষ্ট সূত্র ৬৪০ টাকার ন্যুনে প্রাপ্ত হওয়া যায় না।
সূত্র প্রস্তুত হইলে ফেটী অথবা লুটীর আকারে রাখিতে হয়। পরে তন্ত্রবায়েরা ঐ ফেটী বা লুটী জলে ভিজাইয়া বংশ নির্ম্মিত এক চরকিতে বেষ্টন করিয়া ঐ সূত্রকে দুই অংশে পৃথক করে। যাহা উত্তম তাহা টানার নিমিত্তে ব্যবহার হয়, এবং অবশিষ্টাংশ পড়েনের উপযোগ্য। সূত্র এই প্রকারে পৃথক২ হইলে টানার সূত্র তিন দিবস নির্ম্মল জলে ভিজাইয়া রাখিতে হয়।  চতুর্থ দিবসে উহাহইতে জল নিষ্পীড়ন করত ঐ সূত্র এক চরকিতে বেষ্টন করিয়া রৌদ্রে শুষ্ক করিতে হয়। অনন্তর তাহা অঙ্গার-চূর্ণ-মিশ্রিত জলে পুনরায় ভিজাইতে হয়। দুই দিবস এইরূপে থাকিলে পর ঐ সূত্রকে পরিষ্কার  জলে ধৌত করিয়া ছায়ায় শুষ্ক করা যায়। অতঃপর ঐ সূত্র পুনরায় এক রাত্রি কাল পরিষ্কার জলে ভিজান থাকিলে মাড় দিবার উপযুক্ত হয়। ঢাকা প্রদেশে খৈয়ের মণ্ড ব্যবহার আছে, এবং উহা সূত্রোপরি লিপ্ত করিবার পূর্ব্বে তাহার সহিত কিঞ্চিত ধুনা মিশ্রিত করিয়া থাকে। এই প্রকার টানার সূত্র প্রস্তুত হইলে তাহাকে উত্তম, মধ্যম ও অধম এই তিন শ্রেণীতে বিভাগ করিয়া উত্তম সূত্র বস্ত্রের দক্ষিণপার্শ্বে, মধ্যমসূত্র বাম পার্শ্বে ও অধম সূত্র মধ্যমভাগে, ব্যবহার করিয়া থাকে। সর্ব্বোত্কৃষ্ট বস্ত্র-বপন কালেও এই নিয়মের অন্যথা করে না। পড়েন প্রস্তুত করণে পূর্ব্ববত্ পরিশ্রম নাই। তাহাকে এক-রাত্রি-কাল জলে ভিজাইয়া তত্পর দিবস প্রাতে মণ্ডে লিপ্ত করিতে হয়, পরন্তু টানার সূত্র এককালে প্রস্তুত হয়, পড়েনের সূত্র প্রত্যহ প্রস্তুত করিতে হয়, এককালে এক থানের ব্যবহারোপযোগি সূত্র প্রস্তুত করিলে তাহা নষ্ট হইয়া যায়।
পূর্ব্ব প্রকারের সূত্র প্রস্তুত হইলে যথা নিয়মে বপন কর্ম্ম আরম্ভ হয়, কিন্তু স্থানসঙ্কীর্ণতা প্রযুক্ত তাহার বিস্তার বিবরণে অধুনা নিরস্ত থাকিতে হইল। মলমলখাস নামক বস্ত্র বপনের উত্তম সময় আষাঢ়, শ্রাবণ এবং ভাদ্র মাস। এতদ্ভিন্ন অন্য সময়ে তত্কর্ম্ম করিতে হইলে তাঁইতের নীচে কিঞ্চিত জল রাখিয়া কেবল প্রাতঃকালেপরিশ্রম করত তাহা সম্পন্ন করিতে হয়।
ঢাকা প্রদেশে যে সকল স্থানে বস্ত্র প্রস্তুত হয় তন্মধ্যে মলমলখাস, সরকার আলি, ঝুনা, রঙ্গ, আব-রওয়াঁ, খাসা, শবনম, আলাবলী, তাঞ্জেব, তরন্দম, সরবন্দ, সরবতি কমিয, ডোরিয়া, চারখানা এবং জামদানী, এই কএক প্রকার বস্ত্র সর্ব্বপ্রসিদ্ধ।

শোরা-প্রস্তুত-করণের কথা

সম্প্রতি লোকফোকএ পুরোনো বাঙলার কিছু রচনা প্রকাশ করছি. 
প্রফুল্ল রায়, দীনেশ সেন, হরপ্রসাদ শাস্ত্রীরা আমাদের যে পথ দেখিয়ে গিয়েছেন তাঁদের নানান কাজের মধ্যে, এই লেখাগুলি পুনঃ প্রকাশ করে এই দেশপ্রেমিক মানুষদের প্রনাম জানাচ্ছি. 
নতুন করে জানছি তাঁদের কাজ কর্ম, তাঁদের দর্শন, তাঁদের ভালবাসা. 
আরও বেশি মানুষকে জানাতে পারছি, এটাও কম কথা নয়.
লোকফোকের পক্ষে, বিশ্বেন্দু

শিল্পীক দর্শন পুস্তক থেকে, লেখক রাজেন্দ্রলাল মিত্রমহাশয়

ভারতবর্ষে যে সকল বাণিজ্য দ্রব্য প্রস্তত হয়, তন্মধ্যে নীল আফিম চীনী এবং শোরাই প্রধান, ইহার এক২ পদার্থের ব্যবসায়ে লক্ষ লক্ষ টাকা এতদ্দেশে উপার্জ্জিত হইয়া থাকে। ...প্রাচীন অট্টালিকায় লোণা ধরিতে পাঠকবর্গ সকলেই দেখিয়াছেন, কিন্তু তাহা কি প্রকারে ঘটে তাহার অনুসন্ধান অতি অল্প লোকে করিয়া থাকিবেন। অনেকে বিশ্বাস করেন যে তাহার আদিকারণ লবণ – লবণ বিশিষ্ট জল পৃথিবী হইতে ভিত্তিতে উঠিয়া প্রাচীরের ইষ্টকাদি জীর্ণ করিয়া ফেলে, এবং ঐ ঘটনার নাম লোণাধরা। কিন্তু লোণাধরিবার কারন কেবল লবণ নহে। ক্ষার হইতে যত লোণা ধরিয়া থাকে লবণ হইতে তত লোণা কদাপি ধরে না। অক্সিজেন ও নাইট্রোজেন নামক দুই বিশেষ বায়ু মিশ্রিত হইয়া এক সামান্য বায়ু উত্পন্ন হয়, ঐ বায়ুদ্বয় বিশেষ পরিমাণে মিশ্রিত হইলে এক প্রকার অম্ল দ্রাবক জন্মে। ক্ষারের সহিত ঐ দ্রাবক মিশ্রিত হইয়া শোরা উত্পন্ন করে, তাহা চূর্ণের সহিত একত্র হইলে নাইট্রেট অফ লাইম নামক লবণবিশেষ জন্মে, এবং লবণের সহিত সিক্ত থাকিলে নাইট্রেট অফ সোডা উত্পন্ন হয়। ক্ষার এবং চূর্ণ আর্দ্র থাকিলে প্রস্তাবিত পদার্থ অতি সত্ত্বরে উত্পন্ন হইয়া থাকে। এই সকল ক্ষারজ চূর্ণজ পদার্থ  দেখিতে লবণের তুল্য, এবং তাহাহইতেই প্রাচীরে লোণা ধরিয়া থাকে। সমভূমির মৃত্তিকায় খার বা চূর্ণ থাকিলে তথায় লোণা ধরে, সুতরাং যে সকল স্থানের মৃত্তিকায় লোণা ধরিয়া থাকে তদ্বারা অনায়াসে শোরা প্রস্তুত হিতে পারে। তিব্বত-প্রদেশে লোকে মৃত্তিকার সহিত মেষ ও ছাগলের মল ও গো-ময় মিশ্রিত করিয়া অনেকে শোরা প্রস্তুত করিয়া থাকে। ত্রিহুত-প্রদেশের  মৃত্তিকায় এই প্রকারে শোরা প্রভৃতি পদার্থ প্রচুর পরিমাণে জন্মিয়া থাকে, এবং তত্প্রযুক্ত ঐ প্রদেশ শোরার আকর বলিয়া প্রসিদ্ধ হইয়াছে।
শেষোক্ত স্থানে শোরার মৃত্তিকা-সংঙ্গ্রহ-করকরা লুনিয়া নামে প্রসিদ্ধ। অগ্রহায়ণ মাসে তাহারা আপন ব্যবসায়ে প্রবৃত্ত হইয়া প্রাচীণ মাটির ঢিপি, ভগ্ন-প্রাচীর, পড়া ভুঁই প্রভৃতির যে যে স্থান লোণা মৃত্তিকা পাওয়া যাইতে পারে, সেই২ স্থান চাঁচিয়া শোরার মৃত্তিকা সংঙ্গ্রহ করে। ঐ মৃত্তিকা-সঙ্গ্রহ-করণ-ক্রিয়া লবণের মৃত্তিকা-সঙ্গ্রহে সোরার মৃত্তিকা জন্মে। এই মৃত্তিকা সঙ্গৃহীত হইয়া শোরার কুঠীতে আনীত হইলে প্রথমতঃ তাহা ধৌত করিতে হয়। তদর্থে কুঠিতে ৪।৫ হস্ত পরিসর একটা মৃত্কুণ্ড থাকে। তাহার তলায় বাখারি ও শুষ্ক তৃণ দিয়া একপ্রকার ছাঁকনী প্রস্তুত করিতে হয়। ঐ ছাঁকনীর উপর এক প্রস্ত নীলবৃক্ষের ভস্ম ও তদুপরি ২০ মন লোণা মৃত্তিকা স্থাপন-পূর্ব্বক ঐ মৃত্তিকা পা দিয়া দাবিত হইলে তদুপরি এমত পরিমাণে ক্রমশঃ জল দেওয়া আবশ্যিক যাহাতে ঐ জল মৃত্তিকার উপর ৬ অঙ্গুলি পুরু হইয়া থাকে। ২৪ ঘন্টা কাল মধ্যে কুণ্ডের জল সমস্ত-লবণ-পদার্থকে দ্রব করিয়া ছাঁকনী ভেদ করত তাহার নিম্নে পড়িয়া যায়। বৃহত২ পাত্রে ঐ জল কিয়ত্কাল স্থির থাকিলে তাহা অনেক নির্ম্মল হয়, কিন্তু তাহার সহিত লৌহ ও বনজ পদার্থ অনেক মিশ্রিত থাকে। তাহা পৃথক করিবার নিমিত্ত ঐ জল পাক করা আবশ্যক। সদর্থে লুনিয়ারা পয়ঃপ্রণালীবত্ দীর্ঘ চুল্লী নির্ম্মিত করত তদুপরি শোরার জলপূর্ণ একসারি হাঁড়ি রাখিয়া চুল্লীর এক পার্শ্বে আম্রপত্রের জ্বাল দিতে থাকে। তাহাতে সকল পাত্রের জল ক্রমশঃ শুষ্ক হইয়া যায় দুই ঘন্টা কালমধ্যে পাত্রের দশআনা(সংকেত - বিশ্বেন্দু) অংশ জল শুষ্ক হইলে অবশিষ্টাংশ অগভীর মৃতপাত্রে শীতল করা কর্তব্য। ঐ শীতল-করণ-সময়ে জলহইতে সমস্ত শোরা দানা বান্ধিয়া পাত্রের নিম্নে জমিয়া থাকে। এই শোরার নাম ধোয়া শোরা। ইহাতে অনেক লবণ মৃত্তিকাদি মলা বর্ত্তমান থাকে। তাহা পৃথক করিতে হইলে ধোয়া শোরাকে পুনরায় জলে গুলিয়া পাক করত গাদ কাটিয়া দানা বান্ধিতে হয়, তাহা হইলেই কলমী শোরা প্রস্তুত হয়।
শোরার মৃত্তিকা ধৌত করলে পর ছাঁকনীর উপর যে পদার্থ অবশিষ্ট থাকে ও শোরা দানা বান্ধিলে পর যে জল অবশিষ্ট থাকে তাহা শোরা-প্রস্তুত করিতে বিশেষ প্রয়োজনীয়, শোরার ক্ষেত্রে তাহা নিক্ষেপ করিলে পরবত্সর ঐ ক্ষেত্রে প্রচুর পরিমানে শোরা উত্পন্ন হয়।
কলমীশোরা পরিশুদ্ধ পদার্থ নহে, তাহাতে বালুকা, জল, লবণ, গ্লবার শাল্ট প্রভৃতি পদার্থ মিশ্রিত থাকে। বণিকেরা ঐ পদার্থের পরিমাণ নিরূপিত করিতে না পারিলে শোরার বাণিজ্য লাভ করিতে পারে না। অতএব তাহারা অনেক শোরা ক্রয় করবার পূর্ব্বে অর্থ-ব্যয় করত ক্রেতব্য শোরার কিয়দংশ রসায়ন-বিজ্ঞব্যক্তিদ্বারা পরীক্ষিত করিয়া লয়।