Showing posts with label FolkRitual. Show all posts
Showing posts with label FolkRitual. Show all posts

Friday, November 5, 2010

জলদেগে জলাইশোরী


পশ্চিম দিনাজপুরে জলদেগে জলাইশোরী নামে একটি আচার অনুষ্ঠান আজও প্রচলিত আছে। এটি আদতে বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা গান আর কিছুটা নাচও। এই গান নাচে কেবল মেয়েরাই অংশগ্রহণ করেন। খরায় যখন এলাকার মাঠঘাট জ্বলে, মেঘের লেশমাত্র থাকেনা তখন গ্রামের মেয়েরা বিবস্ত্রা হয়েই একটি ঘট নিয়ে গ্রামজুড়ে প্রার্থনায় বের হন। কোনো একটি মেয়ের মাথায় থাকে ঘট তাই তার নাম হবে ঘটধরি। ঘটধরি কন্যার হাতে থাকবে পুরোনো একটি ছাতা আর তার সখির হাতে থাকবে একটি বড় ধামা। এই ধামায় থাকে নানান পুজো উপাচার। এই আচার-অনুষ্ঠানের পরিচালিকার কাছে থাকে সকলের পরিধেয় বস্ত্র। বিবস্ত্রা রমনীরা গান গাইতে গাইতে একের পর এক গৃহস্থের বাড়ি আঙিনাতে প্রবেশ করেন। এই গান চলাকালীন কোনো পুরুষের প্রবেশ নিষেধ – এবং চিরাচরিত ঐতিহ্যশালী সমাজের প্রত্যক সদস্যেরমতই এই সমাজের সদস্যরা এই সামাজিক বিধিনির্দেশ কড়ায়-গণ্ডায় মেনে চলেন। ঘট নামানো হলে চলে চাষের অভিনয়। তারপর ব্রতচারিনী আর গৃহস্থ রমনীরা সকলে মিলে গান গাইতে থাকেন – সঙ্গে চলে নাচও।
আইস মেঘা বইস কাছে
খাও বাটাং পান
তোমার জন্য বাটাং পান
সাজাইয়ে রাখিছি
বরসিয়া খাওরে
----
মোঘো ওদে নাগায় ভাইরে
মেঘে অন্ধকার
মেঘের ভিতি দেখি ভাইরে
হালি ছাড়ে হাল
জমীতে পানি নাইরে
কিসে বহিম হাল
বাসুয়া বলদিয়া বইছে হাল
ওমোর গসাই রে
তাহনে দুব্বা নোতা ওঠে
এপ পাট মই দুই পাট মই
তাহনে দুব্বা নোতা ওঠে।

জাগ গান


জাগ গান
উত্তরবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকায় মদনকাম পুজোর সময় জাগ গান অনুষ্ঠিত হয়। রাজবংশী অধ্যুষিত এলাকায় বসন্তকালে ব্যাপক ভাবে বাঁশ পুজো করা হত। এখনও এই পুজোর রেশ চলে আসছে। চৈত্র মাসের মদন চতুর্দশীর তিথিতে কামেরদেবতা মদনকামদেব পুজো হয়। এ উপলক্ষে লম্বা লম্বা বাঁশের মাথায় চামর বেঁধে বাঁশগুলোকে লাল শালু দিয়ে মুড়ে তুলসী তলায় দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। বাঁশ হাতে নিয়ে চলে নৃত্যগীত। কামকে জাগানোর জন্য বা কামসংক্রান্ত কথা বা অঙ্গভঙ্গীর প্রচলন আছে বলেই এই গানের নাম জাগ গান। গানে ঘট সৃজন, কামদেব সৃজন, প্রভৃতি বর্ণনা আছে। বহু পূর্বসূরী গবেষক এ ধরনের গানকে অশ্লীল, আশ্রাব্য ইত্যাদি অভিধায় অভিহিত করেছেন - যারা এক কথায় বলা চলে ভিক্টোরিয় সংস্কৃতির প্রতিভূ – দেশজ সংস্কৃতির মূল বিষয় নিয়ে যাঁদের কোনো মাথা ব্যাথা নেই।
জাগ গানের দুটি রূপ – পালা গান আর মাঙনের গান বা ছুট গান। কামদেবের গান ও বাঁশ পুজার গানকে জাগ গানের দুই অঙ্গ হিসেবে বর্ণনা করা যায়। অনেকে বলেন পালাগানগুলির ছুটগান পরবর্তী কালে ভাওয়াইয়া-চটকা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। মনেরাখতে হবে তথাকথিত কলকাত্তাই বা শিষ্ট বাংলার সঙ্গে এ অঞ্চলের কামরূপী ভাষার একটি মৌল প্রভেদ রয়েছে। যে সব বাগরীতি সাধুভাযায় মেলে, সে বাগরীতি কামরূপীতে পাওয়া যায়। এখানে একটি তাত্বিক কথা স্পষ্ট করে পরিষ্কার করা দরকার - কলাবতী মুদ্রা এখানে কামরূপী ভাযাকে কলকাতার পণ্ডিত সমাজে প্রচলিত একটি শব্দবন্ধ - বাংলার অন্যতম কামরূপী উপভাষা বলার প্রবণতা থেকে আলাদা করছে।
এই ভাযায় রচিত কামদেবের কয়েকটি গান – কামদেবের জন্মগীত, বাঁশ সৃজন ও পুজোর গান, কামদেব বন্দনা প্রভৃতি। বহুকাল আগে রংপুর সাহিত্য পরিষদ পত্রিকায় যাদবেশ্বর তর্করত্নসহ কয়েকজন সংগ্রাহক জাগ গান প্রকাশ করেন। এই প্রবন্ধে রাধার শাক তোলা, কৃষ্ণের বঁড়শিতে মাছ ধরা, রাস, কুলটা রমনীক উপপতি বর্ণনা, কৃষ্ণের বংশী সৃজন প্রভৃতি প্রকাশ পায়। এগুলি লীলা ধেমালি নামে পরিচিত। মনেরাখতে হবে রংপুর সাহিত্য পরিষদ পত্রিকার সন্পাদক ছিলেন কোচবিহার জেলার রাজনৈতিক ও সামাজির ব্যক্তিত্ব ঠাকুর পঞ্চানন বর্মা। এই মানুযটি রাজবংশী ক্ষত্রিয় মহামিলন আন্দেলনের পুরোধা, সেই তত্বের উদ্গাতা ছিলেন রতিরাম দাস। ১৭৮১-৮২তে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাংলা লুঠের সময়ে গুডল্যান্ড সাহেবের ইজারাদার দেবী সিংএর অত্যাচারের বর্ণনা পাওয়া যায় রতিরামের জাগ গানে। জমিদার শিবচন্দ্র আর জয়দুর্গা দেবীচৌধুরানীর প্রতিবাদ আন্দেলনও সেই সাহিত্যে ঠাঁই পায় –
শিবচন্দ্রের হুকুমেতে সব প্রজা খেপে।
হাজার হাজার প্রজা যায় এর ক্ষ্যাপে।।
নাঠি নিল খল্তি নিল নিল কাচি দাও।
আপত্য করিতে আর থাকিলনা কাও।।
ঘাড়েতে বাকুয়া নিল হালের জোয়াল।
জাঙলা বলিয়া সব চলিল কাঙাল।।
এবং সবশেষে -
খিড়কি দুয়ার দিয়া পালাইল দেবী সিং।

পশ্চিম রাঢ়ের জিহুড় দিন

পশ্চিম রাঢ় এলাকায় আশ্বিন সংক্রান্তিকে বলে জিহুড় দিন। 
এই দিনটিতে স্থানীয় মানুষেরা আতপ চালের গুঁড়ি জলে গুলে ছিটা দেন ধান্য ক্ষেত্রকে, গাঠপালাকে, আসবাবপত্রকে, রান্নাঘরের বাসনপত্রকে। আদতে তাঁদের জীবনযাত্রার পরিবেশের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা নানান বন্ধুবান্ধবকে তাঁরা এদিন শৈল্পিকভাবে, মাথা নামিয়ে অনন্ত শ্রদ্ধারভাবে স্মরণ করেন। এর সঙ্গে গোলার ধান-চালকে জাগানো হয় বা প্রস্তুত করা হয়, খেতের আসন্ন ফসলকে আহ্বান ও অর্চনা করা হয়। বাড়িতে খামারে যে আরলনা দেওয়া হয়, সেই সাদা চালগুোঁড়োর আলপনার মাঝে থাকে ছোট্ট একটি লাল টিপ। সাদা আলপনার মাঝে যারা সেই লাল টিপের মাহাত্ম্য দেখেন নি, তাঁরা জীবনে অনেক কিছুই হারিয়েছেন। 
পশ্চিম রাঢ়ে আশ্বিন সংক্রান্তিকে বলে জিহুড় দিন। এই দিনে স্থানীয় মানুষেরা আতপ চালের গুঁড়ি জলে গুলে ছিটা দেন ধান্য ক্ষেত্রকে, গাঠপালাকে, আসবাবপত্রকে, রান্নাঘরের বাসনপত্রকে। আদতে তাঁদের জীবনযাত্রার পরিবেশের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা নানান বন্ধুবান্ধবকে তাঁরা এদিন শৈল্পিকভাবে, মাথা নামিয়ে অনন্ত শ্রদ্ধারভাবে স্মরণ করেন। এর সঙ্গে গোলার ধান-চালকে জাগানো হয় বা প্রস্তুত করা হয়, খেতের আসন্ন ফসলকে আহ্বান ও অর্চনা করা হয়। গান গেয়ে বাড়িতে খামার বাড়ির সঙ্গে নানান স্থানে আলপনা দেওয়া হয় – জাগো গো জাগো মা দেবি, জাগো লক্ষ্মীঠাকুরাণী, বন্দনা জানাই গো মা অর্চনা করি তোমায়, আবাহন জানাই তোমায় মা, আরতি করি গো তোমায়। অচলা হয়ে থাকো মা গো আলোকিত করে আমাদের ছোটো কুঁড়ে। জাগো গো জাগো মা দেবি, লক্ষ্মীঠাকুরাণী।
লক্ষ্মীকে আবাহন আর অলক্ষ্মীকে ঝেঁটিয়ে হেনস্থা করে বিদায় দিতে ভাঙা হাঁড়ি, পুরোনো ঝাঁটা, ভাঙা কুলো আর কেঁদ কাঠের লগুড় রাখা হয়। জিহুড় দিনে ২১ রকমের শাক-পাতা রান্না করে খাওয়ার বিধি সর্বজনমাণ্য – আজও এই পশ্চিমি ধারাকে মাথায় নিয়ে দেশজ চিকিত্সা ধারায় অবিশ্বাসের দিনেও গুরুজনেরা জানেন এই শাক-পাতার ঔষধিগুণ। ভারতীয় চিকিত্সা শাস্ত্রের হাত ধরে আর গ্রামীণ গৃহচিকিত্সার টোটকা বিধি ধরে মেনেই গ্রামীণেরা বেঁচে এসেছেন হাজার হাজার বছর। এটি এমন এক দিন যে দিন সমগ্র ভৌগোলিক সমাজ নতুন নতুন করে স্মরণ করেন চিরাচরিত নানান ঐতিহ্যবাহী আচার আচরণ আর বিধিগুলোকে। এই ২১টি শাক-পাতাগুলির নাম হল – ওল, কেঁউ, বেতো, সরিযা, কাল কাসুন্দে, নিম, জয়ন্তী, শাঞ্চে, হিলঞ্চ, পলতা, শোলফা, গুলঞ্চ, ভাঁট পাতা শুশুনি, কলমি, কুদ্রুম(কুদ্রুং), কুলেখাড়া, থানকুনি, ব্রাহ্মী, কালমেঘ, বাসক।
সমগ্র সমাজের বিশ্বাস এই জিহুড়ের রাতে সার্পকূল গর্তে প্রবেশ করে মুদ নেয়, আবার তারা গর্ত থেকে বেরিয়ে আসে জৈষ্ঠের ১৩ তারিখে। জিহুড় দিনে আরও একটি কাজ করা হয়, মা মনসার প্রতি পুষ্পাঞ্জলি দেওয়া হয় কোনো মানসার মন্দিরে নয়, নিজের বাড়ির তুলসি মঞ্চের সামনে দাঁড়িয়ে। এদিন থেকে আর্থাত্ আশ্বিন সংক্রান্তি থেকে কার্তিক সংক্রান্তি পর্যন্ত পূর্বপুরুষের স্মরণে আকাশ প্রদীপ দেওয়া হয়। পুরুলিয়ায় বনাঞ্চল সে অঞ্চলের অধিবাসীদের জীবিকার সংস্থান। সেদিন সমগ্র মানভূম এলাকায় বনদেবীর পুজো করে লাক্ষার চাষ শুরু হয়।
প্রবীণরা বলেন জিহুড়ের রাতে হালকা বৃষ্টিপাত হয় – এই বৃষ্টির ফোঁটা মাথায় মুখে নিলে সৌভাগ্যলাভ সুনিশ্চিত। অনেক বিশ্বাসী মানুষ তাই বৃষ্টি পেতে সারারাত মাঠে অপেক্ষা করেন। সমাজের প্রবীণদের আরও বিশ্বাস জিহুড়ের অধিষ্ঠাত্রী দেবী গভীর রাতে তিনবার ডাক দেন – একে বলে জিহুড়ের ডাক – সেই ডাক শোমার জন্য বৃদ্ধবৃদ্ধারা সারারাত উত্কীর্ণ হয়ে থাকেন।