Showing posts with label গুরু তর্পণ. Show all posts
Showing posts with label গুরু তর্পণ. Show all posts

Saturday, January 28, 2017

গুরু তর্পণ - উপনিবেশবাদ বিরোধী চর্চা - ধরমপালজীর সাক্ষাতকার৪

কৃঃ আমাদের বিজ্ঞন-প্রযুক্তির বিষয়ে কিছু বলুন।
ধঃ জ্যোতির্বিদ্যা আর অঙ্কই ধরুণ। বাংলার ব্রিটিশ সেনা প্রধান রবার্ট বার্কারের কথাই ধরুণ। পরে তিনি পার্লামেন্টেরিয়ানও হয়েছেন। তিনি বেনারসের মনমন্দির সম্পর্কে লিখেছেন। ১৮২৩ পর্যন্ত এন্সাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা মনে করত যে এটি বিশ্বের সেরা পাঁচটি মানমন্দিরের অন্যতম।১৭৯০ সালের এক প্রবন্ধে, অঙ্কবিদ এবং এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক জন প্লেফেয়ার ফরাসী জ্যোতির্বিদ্যার ঐতিহাসিক বেইলির বইএর বিশদ আলোচনা করেন। এই সময় রুবেন বারো( Ruben Burrow) বাইনোমিয়াল থিওরেম প্রকাশনা করেন। লেফটানেন্ট জেন্টিল, প্রখ্যাত কাসিনির লেখা, কিভাবে তামিলেরা কাগজ কলম ছাড়া, কিছু ঝিনুক আর কিছু অঙ্কের নামতা ব্যবহার করে, গ্রহণের হিসেব করত তার বর্ণনা দিয়েছেন। কৃষি নিয়ে প্রচুর কাজ হয়েছে।
১৮২০ সালের কর্নেল আলেকজান্ডার ওয়াকার মালাবার আর গুজরাটের কৃষি নিয়ে লেখেন। হলওয়েল, কিছু মাত্র সময়ে বাংলার সরকার ছিল। বাংলার বসন্তের টীকা দেওয়া নিয়ে বিশদে লিখেছেন। ১৮০২-৩ সালে ব্রিটিশেরা ভারতীয় পদ্ধতিতে টিকা দান নিষিদ্ধ করে। হ্যালকট দক্ষিণের ড্রিলপ্লাউ নিয়ে বিশদে আলোচনা করেছেন। তার মন্তব্য ছিল এটি খুব সাধারণ অথচ কার্যকর। তিনি লিখছেন তার ধারণা ছিল না এটি ভারতীয় প্রযুক্তি। এছাড়াও ঊজ নামক ভারতীয় ইস্পাত তৈরির বর্ণনা পেশ করেছেন ব্রিটিশরা। ড। হেলেনিয়াস স্কট তাঁদের(সাম্রাজ্য) যতগুলি ইস্পাতের সঙে পরিচিতি রয়েছে, এটি সবকটির থেকে উত্তম। এছাড়াও বরফ তৈরি, কাগজ তৈরি এবং মর্টার তৈরি নিয়েও বিশদ বর্ণনা রয়েছে।
কৃঃ কিন্তু বহু ব্রিটিশ ভারতের জনগণকে গরীব, দরিদ্র্য, অজ্ঞ বলে বর্ণনা করেছেন।
ধঃ আদতে আষ্টাদশ শতকে ভারতে আসা প্রায় সব সিভিলিয়ানদের এই মানসিকতা ছিল। ব্রিটেনের সেই সময়ে নির্দিষ্ট হায়ার্কিক্যাল স্ট্রাকচার ছিল, আইনি ব্যবস্থা এবং বংশ, কুল, পৃষ্ঠপোষকতা, অর্থের জোরে কিনতে পারা যায় এমন পদমর্যাদার সেনাবাহিনী এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল। সেই তুলনায় সাধারণ কিন্তু জীবন্ত ভারতীয় সমাজ ব্যবস্থায় দৃশ্যত মিলেমশে থাকার যে পরিবেশ গড়ে উঠেছিল, বা অর্থ অনির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থা, পরিকাঠামো বা জমির যৌথ মালিকানা ইত্যাদি ব্রিটিশদের চোখে ঢিলেঢালা এবং সম্পদহীন সমাজের প্রতিফলন।
১৮১৩ সালের ভারতবর্ষীয়দের বিষয়ে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে যে আলোচনা হয়, তাতে এতদিনের লুঠ, অত্যাচারের পরেও ভারতীয় সমাজে যে ধরণের জ্ঞানের বহিপ্রকাশ হয়, যেভাবে মানুষে মানুষে আত্মীয়তা গড়ে উঠেছে, যেভাবে তাঁরা সহিষ্ণুতা প্রদর্শন করে তা নিয়ে বেশ কিছু পার্লামেন্টারিয়ান উল্লেখ করেছেন। আদতে উনবিংশ শতকে উইলবার্ফোর্সএর মত তাত্ত্বিকেদের মত এই মনোভাবের জন্য দায়ি। তিনি বলেন গ্রিস যতদিন খ্রিষ্ট ধর্মে মতি পেশ করেনি ততদিন তাঁরা গরীব ছিল। ভারতেরও একই অবস্থা। যতদিন না তাঁরা খ্রিস্টের অনুগামী না হচ্ছে তাঁদের অবস্থা পাল্টাবে না।
আমার মতে ভারতীয়দের অজ্ঞ, মুর্খ, গরীব ইত্যাদি বলার পিছনে যুক্তি ছিল, ভারতের ধর্ম ব্যবস্থা। ভারতীয়রা অনেক বেশি ধার্মিক। আদতে ভারতকে আর্থ-সামাজিকভাবে গরীব, পিছিয়েপড়া হিসেবে দেখানোর চেষ্টা শুরু হয়েছে ১৮০০ সালের পর থেকে। কেন্দ্রিভূত ব্রিটিশ রাজনীতি, সম্পদ সংগ্রহ নীতি আর শাসনপদ্ধতি আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হল - ইংরেজি শিক্ষিতরা তা মেনেও নিলেন - কোন প্রশ্ন না করে, এই শাসন ব্যবস্থা দেশের সমস্ত সম্পদ কুক্ষিগত করল; চিন থেকে সেন্ট হেলেনা পর্যন্ত বিপুল ভৌগোলিক এলাকা সেই সম্পদে শাসিত হল আর প্রভূত বাড়তি নানান সম্পদ নিজের দেশে নিয়েগেল। এছাড়া ভারতে তারা নতুন শহর এবং প্রভূত সেনা ছাউনি তৈরি এবং তার ব্যবস্থাপনা করল এবং (এবং স্বাধীনতার পর এই ব্যবস্থা আমরা সেধে আমন্ত্রণ করে নিয়ে এলাম) সেটাই ভারতের বড় আভিশাপ হয়ে দেখা দিয়েছে।
এই অব্যবস্থা, দারিদ্র্য এবং উপনিবেশিকতা কিন্তু মোট রাজস্ব আদায়ের ওপর প্রভাব ফেলল না। সমগ্র ভারতকে যেন স্থাণুবৎ করে দেওয়া হল। এবং শিক্ষিতরা যে গবেষণা করলেন সেটি এই দারিদ্র্য বজায় রাখতে সাহায্য করল এবং সারা দেশে এই দারিদ্র্য মহামারীর মত ছড়িয়ে গেল।
কৃঃ আমাদের ভারতে এমন কিছু নীতি অনুসরণ করতাম, যা শাসককে একচ্ছত্র ক্ষমতা ভোগ করতে দিত না।
ধঃ মহাভারতে বলা হয়েছে, যে রাজা তার প্রজাদের রক্ষা করতে পারে না, যে অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় করে, এবং তাঁদের সম্পদ হরণ করে সেই রাজাকে হত্যা করতে জনগণ একতাবদ্ধ হবে। সেই রাজা কলিরূপে চিহ্নিত হবে। এই রাজাকে মত্ত কুকুরের মত হত্যা করতে হবে।
কৃঃ কিন্তু আমাদের বহু রাজা সাক্ষাৎ কলি ছিলেন...
ধঃ ঠিক। আমরা রাজনৈতিক তত্ত্বের আলোচনা করছি। কিন্তু প্রাতীচ্যে তত্ত্বগতভাবে রাজা কিন্তু চরম ক্ষমতার আধিকারী ছিলেন।
কৃঃ কিন্তু এদেশে রাজাই চূড়ান্ত ক্ষমতার অধিকারী, এই তত্ত্ব কিকরে শেকড় গজাতে পারল?
ধঃ হয়ত ব্রিটিশ শাসনের সময় যে সব রাজা রাজস্ব করেছেন, তাঁদের শাসন করার পদ্ধতিতে এই ধারণা চারিয়ে গিয়েছে।
কৃঃ জাতিভেদ সম্বন্ধে কিছু বলুন। আপনি নিশ্চই বলবেন না যে জাতিভেদ প্রথা ১৮০০ সালের পরে দেখা দিয়েছে। এটিকে যদি আমরা আমাদের পরম্পরা হিসেবে করি তাহলে আসুবিধা দেখা দেবে।
ধঃ ঠিক। জাতিভেদ ভারতের পিছিয়ে পড়ার বড় কারণ বলে চিহ্নিত হয়েছে। কিন্তু এই সিদ্ধান্তে আমরা এলাম কি করে? গ্রামের মতই, প্রাচীন কাল থেকেই জাতি ব্যবস্থা ছিল। মুনুস্মৃতিতে সমাজকে চার বর্ণে ভাগ করা হয়েছে। এটি ভারতে আজ যেমন রয়েছে, তেমনি আতীত থেকেই ছিল। কিন্তু এটি ভারতের পিছিয়ে পড়ার প্রধান কারণ, এই তত্ত্ব এর আগে দেওয়া হয় নি। প্রত্যেক বর্ণ এবং আদিবাসীরা বহুকাল ধরে পাশাপাশি বাস করে এসেছে, আলাপ আলোচনা করেছে, আবার লড়াইও করেছে। মনুস্মৃতিকে ভুল প্রমান করে বলা যায় ব্রিটিশ যখন ভারত শাসন করতে শুরু করল, তখন ভারতে বহ শুদ্র রাজা। এটাও হতে পারে জাত ব্যবস্থা ভারতের রাজনীতির দুর্বলতার কারণ। বা উলটো ভাবে বলা যায় হয়ত জাতির বিভিন্নতা ভারতীয় সমাজের জোরের কারণ। সেজন্য ভারত বহুকাল ধরে টিকেও রয়েছে। কেন জাতিভেদ ভারতের দুর্বলতার কারণ তার কোন সন্তোষজনক উত্তর আজও পাওয়া যায় নি।
ব্রিটিশ শাসনে জাতিভেদ বড় আসুবিধে হয়ে দাঁড়িয়েছিল, তারা এই ব্যবস্থাকেই বুঝতে পারে নি – এমন নয় যে তারা জাতিহীন সমাজ তৈরি করে সশক্ত ভারত গড়তে চেয়েছিল, বরং তারা জাতিভেদ নির্মূলন করে ভারত ভাঙতে চেয়েছিল। আমার মনে হয় ভারতীয় সমাজকে অণুকরণ(এটমাইজেশন) করা, শাসন করা এবং সারা ভারত জয় করার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে উঠল জাতির বিভিন্নতা। জাতিভেদ এবং জাতিভেদ নিয়ে যে ক্রোধ আজ ভারতীয় রাজনীতিতে দেখা যাচ্ছে, তা কিন্তু ব্রিটিশ শাসনের দান।

গুরু তর্পণ - উপনিবেশবাদ বিরোধী চর্চা - ধরমপালজীর সাক্ষাতকার৩

কৃঃ আপনি তাহলে বলছেন, ১৭৫৭র আগে ভারত ব্রিটেনের থেকে ভাল অবস্থায় ছিল? তখন ভারতের সাধারণ মানুষের কি অবস্থা ছিল?
ধঃ আমাদের হাতে এমন কোনো তথ্য নেই যা দিয়ে আমরা এই দুই সমাজের তুলনা করতে পারি। কিন্তু কয়েকটি তথ্য দিতে পারি যা ভারতের সমাজকে অন্য দৃষ্টিতে দেখতে চেষ্টা করবে। ১৮০৪ সালের জুলাইতে এডিনবরা রিভিউতে ভারতের কৃষি উৎপাদনের হার এবং কৃষি শ্রমিকদের মজুরি নিয়ে লেখা হয়েছিল। তুলনায় দেখা গেল, কৃষি উৎপাদনের হার ব্রিটেনের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি। আর যেটা ব্রিটেনের কর্তাদের স্তম্ভিত করে দিয়ে ছিল সেটা হল, ভারতের কৃষি শ্রমকদের মজুরি তাঁদের দেশের কৃষি শ্রমিকদের থেকে কয়েকগুণ বেশি।
এর থেকে আমরা একটা সিদ্ধান্তে আসতে পারি, তা হল, ভারতের অর্থনীতি যখন ঢালুর পথে যাচ্ছে, সেই ১৮০০ সালেই যদি এই মজুরি হয় তাহলে তার আগে কি ছিল? বা ১৮০৬ সালে বেলারি জেলার কনজামশান প্যাটার্ন নিয়ে আলোচনা করা যাক। এই জেলার তিন ধরণের পরিবারে কনজামশান প্যাটার্ন নিয়ে বিশদে সমীক্ষা করেছিল। পরিবারের মাথাপিছু দৈনিক দানাশস্য ব্যবহার হত আধ সের। এছাড়াও ২৩টি অন্যান্য জিনিস ছিল যেমন দানাশস্য, ঘি, তেল, নারকেল, সবজি, পান, সুপুরি ইত্যাদি। প্রথম শ্রেণীর পরিবারের মাথাপিছু বছরে খরচ হত ১৭ টাকা। দ্বিতীয় শ্রেণীর ৯ টাকা, তৃতীয় শ্রেণীর ৭টাকা(তুলনা করা যাক মূল্যবৃদ্ধির ১৮২০ সালের কলকাতায় মাসে দুটাকা রোজগার করে ঠাকুরদাস, বিদ্যাসাগরের পিতা নিজেকে স্বচ্ছল ভাবছেন, এবং বাড়িতে টাকা পাঠাবার কথা চিন্তা করছেন)।
তাঞ্জোরে ১৮০৫ সালে মিরাসদার(জমির চিরস্থায়ী স্বত্ত্বধারী)দের সংখ্যা ছিল ৬২০০০, যার মধ্যে ৪২০০০ ছিল শুদ্র বা তারও নিম্নশ্রেণীর। ৬ লাখ জনসখ্যার বারামহল(আজকের সালেম) জেলায়, পারিয়া গোষ্ঠীর কৃষকদের সংখ্যা ছিল ৩২৪৭৪। ১৭৯৯ সালে চেঙ্গেলপেট্টু জেলায় মিরাসদারদের যে তালিকা হয় তার সংখ্যা ছিল ৮৩০০, কালেক্টরের ধারণা মোট সংখ্যা, যারা এর বাইরে রয়ে গেলেন তারা এর দশগুণ হবেন। মাদ্রাজের ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থা তৈরি করা আলেকজান্দার রিড লিখছেন হায়দ্রাবাদে বড়মানুষ আর তাঁদের চাকরদের মধ্যে পার্থক্য শুধু কাপড়ের। বড় মানুষদের কাপড় একটু বেশি পরিষ্কার।
কৃঃ আপনার আগামীতে প্রকাশ্য ভারতের ব্রিটিশপূর্ব শিক্ষাব্যবস্থায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বিষয়ে আলোচনা করেছেন-
ধঃ উদাহরণস্বরূপ, ১৯২২-১৯২৫ সালে মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির দেশজ শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে একটা সমীক্ষ হয়। তাতে দেখা যায় ১১৫৭৫টি বিদ্যালয় আর ১০৯৪টি উচ্চবিদ্যালয়(কলেজ) রয়েছে যেগুলির ছাত্র সংখ্যা ১৭৪১৯৫ এবং ৫৪৩১ যথাক্রমে। সেই ছাত্রদের জাতিভাগ নিয়েও অতি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ছিল। তামিলভাষী এলাকায় শুদ্র এবং তার তলার জাতির ছাত্রের সংখ্যা ছিল ৭০-৮০ শতাংশ। ৬২ শতাংশ ছিল ওডিয়া ভাষী এলাকায় এবং ৫৪ শতাংশ ছিল মালায়লম ভাষী এলাকায়। মাদ্রাজের গভর্ণর এটা লেখেন, বিদ্যালয়ের যাওয়ার যাদের বয়স হয়েছে এমন ছাত্রদের ২৫ শতাংশ বিদ্যালয়ে যায় এবং বড় এক অংশ বাড়িতে পড়াশোনা করে। ২৬০০০ ছাত্র বাড়িতে পড়াশোনা করে, ৫৫০০ বিদ্যালয়ে যায়। মালাবারে বাড়িতে উচ্চস্তরের পড়াশোনা করা ছাত্রদের সংখ্যা ১৬০০। সেখানে মুসলমান বিদ্যালয়ে যাওয়া ছাত্রীদের সংখ্যা ১১২২, ছাত্রদের সংখ্যা ৩১৯৬। ব্রিটিশপূর্ব সময়ে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে যে সব ধারণা রয়েছে, সেগুলি নতুন করে ফিরে দেখার সময় এসেছে।
(পরের প্রকাশনায় শেষ হবে)

গুরু তর্পণ - উপনিবেশবাদ বিরোধী চর্চা ধরমপালজীর সাক্ষাতকার২

কৃঃ অন্য একটা প্রশ্ন করি। ব্রিটিশের পক্ষে কেন এই দেশে উপনিবেশ করা সহজ হয়ে পড়ল? ব্রিটিশ-পূর্ব সমাজের কোন দিকটি এর জন্য দায়ী?
ধঃ একটা কথা বলে রাখি ব্রিটিশ পূর্ব ভারতীয় সমাজে জোরের বা ভঙ্গুরতার যায়গাগুলি আমি সত্যিই জানি না। আমার জ্ঞান অষ্টাদশ শতকের ব্রিটিশ পূর্ব সমাজ নিয়ে এবং তাও অধিকাংশ ব্রিটিশ এবং অন্যান্য তথ্য থেকে আহরিত। এই বিষয়ে মন্তব্য করার আগে ব্রিটিশপূর্ব সমাজ সম্বন্ধে আর বহু তথ্য জানা প্রয়োজন। আমি শুধু বলতে পারি ১৭০০ সাল নাগাদ মুঘলদের কেন্দ্রিয় পকড় শিথিল হয়ে পড়ল। এর ফলে বহু স্থানীয় রাজা মহারাজা নবাবেরা তাঁদের নিজেদের অঞ্চলে আধিকার বজায় রাখতে শুরু করলেন। এদের মধ্যে রাজনৈতিক যোগাযোগ ছিল না। ফলে ফরাসিদের মত ইওরোপিয় শক্তি তাঁদের মধ্যে আপাত বিচ্ছিন্নতার সুযোগে তাঁদের সাম্রাজ্য বিস্তার করার কাজ শুরু করে। শেষে যখন ব্রিটিশেরা শক্তি সঞ্চয় করে আঘাত হানতে থাকে তখন তাঁদের আর ঐক্যবদ্ধ হওয়ার সুযোগ হয় নি।
কৃঃ আদতে কি ভারতীয় সামন্ততন্ত্র নব্য পুঁজিবাদের এই আঘাতকে ঠেকাতে পারে নি...
ধঃ জানি না আমাদের সামন্ততন্ত্র ছিল কি না। এই ধরণের সিদ্ধান্ত করে ফেলার সময় আমাদের সমাজিক সঙ্গঠন(সোসাল অর্গানাইজেশন) নিয়ে বেশ কিছু ইওরোপকেন্দ্রিক উপপাদ্য ভেবে ফেলা হয়। একটা উদাহরণ দেওয়া যাক, যখন কেউ মুঘলদের কেন্দ্রিয় শক্তির কথা বলেন, তখনই একটা কেন্দ্রিভূত রাষ্ট্র ধারণা এবং তৎসংক্রান্ত বেশ কিছু উপধারণা তৈরি করে নেন। নাতিদের লেখা ঔরঙ্গজেবের একটী চিঠি আমি দেখেছি। তাতে দুটো বিষয় বলা হয়েছে, ১। জাহাঙ্গীরের সময় রাজস্ব দপ্তর সারা ভারত থেকে ৬০ লাখ টাকা তুলত, আর ব্যয় হত দেড় কোটি টাকার কাছাকাছি। ফলে যে বিপুল ঘাটতি থাকত তা আকবরের সঞ্চয় থেকে পূরণ হত। ২। শাহজাহান জাহাঙ্গীরের উদাহরণ অনুসরণ করেন। তিনি দেড় কোটি টাকা তুলতেন। এবং খরচ কমিয়ে আনেন এক কোটি টাকায়। কিন্তু মুঘলদের রাজত্বে প্রথম দিকে মোট রাজস্ব ছিল ১০ কোটি টাকা, পরের দিকে কুড়ি কোটি টাকা। হিসেব বলছে সম্রাট তার রাজত্বের ন্যুনতম রাজস্ব নিতেন, তাহলে বাকি রাজস্বের কি হত? আমার ধারণা ঐতিহাসিকেরা স্বীকার করেছেন যেঔরঙ্গজেব রাজস্বের ২০ শতাংশ নিতেন। ফলে ধরে নেওয়া হয় বাকি আশি শতাংশ রাজস্ব সামন্তরা নিজেদের মধ্যে ভাগবাঁটোয়ারা করে নিতেন।
আমার সিদ্ধান্ত অন্যরকম। এই বিপুল পরিমান রাজস্ব স্থানীয় অঞ্চলে থাকত। এই সম্পদ স্থানীয় রীতিনীতি পুষ্ট করার কাজ করত – যেমন পাঠশালা, চাত্রম, বিদ্যালয়, পুকুর, সেচ ব্যবস্থা, মন্দিরের জন্য এবং অন্যান্য ধর্মীয় কাজে ব্যয়, জ্ঞনাক, বৈদ্য, কবি, জ্যোতিষ, জাদুকর ইত্যাদিদের মধ্যে বেঁটে দেওয়া হত। এটি আসলে বেশ পুরোনো ব্যবস্থা যা মুঘল শক্তিকেও বজায় রাখতে হয়েছে। কিন্তু ব্রিটিশ সময়ে পুরো ব্যবস্থা পালটে গেল। তারা ধাপে ধাপে মোট উৎপাদনের ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ রাজস্ব হিসেবে কেড়ে নিতে শুরু করল। তার ফল এখন ফলছে। গ্রামে যে উদবৃত্ত থাকত, তা শুষে নিয়ে চলে গেল বিদেশে। ফলে যে পরিকাঠামো তৈরি হয়েছিল কয়েক হাজার বছর ধরে তা ভেঙ্গে পড়ল তাসের ঘরের মত।
কৃঃ ব্রিটিশ এক কাজ জেনেশুনে করেছিল?
ধঃ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পক্ষে যা স্বাভাবিক তাই তারা করেছে। তাঁদের দেশে তারা কৃষকদের থেকে ৫০ শতাংশের বেশি রাজস্ব নিত। ফলে তাঁদের সিদ্ধান্ত ছিল যে শাসক যে জমি তার(নিজেদের দেশেই তারা সবার আগে উপনিবেশ স্থাপন করেছিল)। সেই তত্ত্ব ব্রিটিশ এদেশে এসে আমাদের ওপর চাপিয়ে দিল। তারা এটা শুধু ভারতের জন্য করেছে বললে অপলাপ হবে। তারা বিশ্বে যেখানে যেখানে গিয়েছে সেখানেই একই কাজ করেছে। ব্রিটিশ শাসকেরা মনে করত এটাই স্বাভাবিক কাজ। কেননা তাঁদের সমাজ আর রাষ্ট্র সম্বন্ধে যে ধারণা তা কেন্দ্রিভূত এক সমাজের। এই ধারণা ১০০০ বছর ধরে ব্রিটেনে রয়েছে। এ তত্ত্ব পুঁজিবাদের গর্ভগৃহ থেকে জন্ম হয় নি। উদাহরণস্বরূপ, ১১০০ সালে নর্মানেরা যখন ব্রিটেন দখল করল, তখন থেকেই রাজস্বে ৯৫ শতাংশের বেশি সম্পদ রাজা, চার্চ এবং নতুন সামন্তরা ভাগ করে নিত।

গুরু তর্পণ - উপনিবেশবাদ বিরোধী চর্চা - ধরমপালজীর সাক্ষাতকার১

...গত বছরের প্রকাশনা। ধরমপালজীর এই সাক্ষাতকারটি নিয়েছেন ক্লদ আলভারেজ।
আমরা যে কাজ করছি, পুরোনো বাঙলাকে ফিরে দেখা, সেই কাজের মূল গুরুরা হলের গ্রামীন উদ্যোগীরা। এছাড়াও হাতে গোণা শিক্ষিত, যারা আমদের পা মাটিতে রাখতে শিখিয়েছেন, গ্রামের মানুষকে গুরু ভাবতে শিখিয়েছেন তাদের মধ্য ধরমপালজী অন্যতম।
জীবনী বর্ণনা মোটামুটি ঔপনিবেশিক সভ্যতার অবদান, যেখানে প্রখ্যাতরা সমাজের জ্ঞানে সম্পদ শুষে বেড়ে উঠে সেগুলিকে নিজেদের সম্পত্তি বলে চালান। এই ব্যক্তি কেন্দ্রিক আলোচনা এই পূর্বের সমাজে ছিল না বললেই চলে, বিশেষ করে গ্রাম সমাজে।
এই আলোচনা বাংলায় খুব একটা চল নেই। গত কয়েক দশকে বাংলা তথা ভারতের সমস্ত জ্ঞানচর্চার ঐতিহ্য ধ্বংস করে গয়ে উঠেছে 'কেন্দ্র' উপসর্গওয়ালা কয়েকটি পশ্চিমী ধাঁচের শিক্ষা কেন্দ্র।
এই দেশজ গ্রামীন, অপ্রাতিষ্ঠানিক, বিকেন্দ্রীভূত জ্ঞানচর্চা বাংলায় হয় নি বললেই চলে, বাংলায় তাই ধরমপলাজী প্রায় অশ্রুত ব্যক্তি।
তাঁর জীবনী আলোচনা এখানে অবান্তর - শুধু না বললেই নয় যে সব কথা - তিনি ভারতে গত এক শতক ধরে ইংরেজি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত চর্চিত পশ্চিমি সাম্যবাদের ধারার বাইরে দাঁড়িয়ে ভারতীয় সাম্যবাদের চর্চা করেছিলেন, যে সাম্যবাদের ভিত লুকিয়ে রয়েছে গ্রাম সমাজের জ্ঞানচর্চায়।
সেই দেশচর্চার কুড় আমরা পেয়েছিলাম ধরমপালজীর কাজে।
তিন দশক আগে একটি সাক্ষাতকারের বাংলায় অনুদিত কিছু অংশ তুলে দেওয়া গেল। কয়েকটি ধারাবাহিকে প্রকাশ পাবে -
কৃষ্ণণঃ প্রথমেই খুব বস্তাপচা প্রশ্ন করছি। আপনি কেন এবং কিভাবে ব্রিটিশপূর্ব বিশেষ করে অষ্টাদশ শতকের শেষের দিকের ভারতের সমাজ জানতে উৎসাহী হলেন। আপনাকে এই প্রশ্নটি করছি, কেননা আপনি তথাকথিত শিক্ষাগতভাবে (বিশ্ববিদ্যালয়ে) গবেষক/জ্ঞানচর্চক নন।
ধরমপালঃ আমি দীর্ঘদনধরে এসোসিয়েশন আব ভলান্টারি এজেন্সিজ ফর রুরাল ডেভেলাপমেন্ট(এভার্ড)এর জড়িয়েছিলাম। ১৯৫৮ থেকে ১৯৬৪ পর্যন্ত আমি এর সম্পাদক থেকেছি। এভার্ড আমাদের গ্রামের পঞ্চায়েতি রাজ ব্যবস্থা জানতে উৎসুক ছিল। এই সংগঠনের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে বুঝেছি, ভারতীয় সমাজে পরম্পরাগত ভাবনা বা বিশ্বাসের সঙ্গে বিদেশের দিকে দৃষ্টি রেখে বেড়ে ওঠা মানুষদের দুস্তর ব্যবধান। শহুরে মানুষেরা দেশের সমাজ ব্যবস্থা জানেনইনা বলা যেতে পারে।
এ সম্বন্ধে আপনাকে আমি একটা বাস্তব উদাহরণ দিতে পারি। পঞ্চায়েত ব্যবস্থা বুঝতে, এবং তা নিয়ে কাজ করা একটি দলের সঙ্গে আমি রাজস্থান গিয়েছিলাম।আমরা দেখলাম পঞ্চায়েত একটি নতুন বাড়ি তৈরি করেছে। তার কাজগপত্র পরীক্ষা করে দেখলাম যে পঞ্চায়েতে এই বাড়িটা তৈরি করা নিয়ে কোনো তথ্য রাখা নেই। খোঁজ খবর নিয়ে জানলাম এই সিদ্ধান্তটি নিয়েছে বিশ) পঞ্চায়েত(২০টি পঞ্চায়েতের সংগঠন – উত্তর বাংলায় যেমন বাইশা পঞ্চায়েত নামে একটা ব্যবস্থা ছিল)। এটি একটি পঞ্চায়েত, যা পরম্পরাগতভাবে গ্রামে কাজ করে, এবং এর সঙ্গে বাস্তবে যে নিয়মতান্ত্রিক পঞ্চায়েত ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে, তার কোনো মিল নেই।
এটি একটি শেখার ব্যাপার ছিল আমাদের কাছে – বুঝতে চাইলাম যে গ্রামের মানুষ কি ভাবে কোনো বিষয়কে দেখে, এবং তাঁরা বাইরের নানান ধাক্কায় কিভাবে প্রভাবিত হয়। বুঝলাম, আমরা কত কম গ্রাম সম্বন্ধে জানি। অন্ধ্র, তামিলনাড়ু এবং অন্যান্য এলাকায় আমরা কাজ করতে গিয়ে এই একই অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছি। ১৯৬৩-৬৫ পঞ্চায়েত ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে আমি তামিলনাড়ুতে যাই। বিভিন্ন জেলায় গিয়ে পঞ্চায়েতের কাজের সঙ্গে জুড়ে থাকা নানান মানুষের সঙ্গে কথা বললাম, এবং পঞ্চায়েত কিভাবে চলে তারও একটা আঁচ নেওয়ার চেষ্টা করছিলাম। তাঞ্জোরে আমি স্থানীয় ভারত সেবক সমাজের চেয়ারম্যানের সঙ্গে দেখা করি। তিনি আমাকে জানান তাঞ্জোরের আশেপাশে ১৯৩৭ সাল থেকে ১০০টিরও বেশি সমুদায়ম গ্রামের আস্তিত্ব রয়েছে। সমুদায়ম গ্রাম হল এমন একটা গ্রাম যেখানে সময়ে সময়ে গ্রামের জমির চাষের অধিকার বিভিন্ন পরিবারের ওপর ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বর্তায়, অথচ জমির অধিকার কিন্তু সামগ্রিক সমাজের থাকে। এই ব্যবস্থাটি প্রয়োজন হয় কেননা, বহু সময়ে জমির উর্বরতা, নদীর ঢাল, ইত্যদির মত নানান বিষয় পরিবর্তিত হলে জমি চাষের ব্যবস্থাও পরিবর্তিত হয়। তখন জমি চাষের অধিকার নতুন করে ভাগ হয়।
আমি পরে রাজস্ব সমীক্ষায় দেখি, ১৮০৭ সাল পর্যন্ত তাঞ্জোরের অন্তত ৩০ শতাংশ সমুদায় গ্রাম ছিল। আষ্টাদশ শতের শেষ দিকের আর উনবিংশ শতের প্রথমের দিকের যত ব্রিটিশ তথ্য দেখেছি, তত আমি বুঝতে পারলাম আমরা ভারতীয় সমাজ নিয়ে যে সব ধারণা করেছি, সব ভুল ছিল। আমি এই কাজটি সারাজীবন ধরে করেছি, আমার ধারণা সকলের এই রাস্তায় গবেষণা করলে, নতুন তথ্যে উপনীত হতে পারবেন।
(এর পর পরের প্রকাশনায়)