Showing posts with label ইতিহাস. Show all posts
Showing posts with label ইতিহাস. Show all posts

Monday, December 2, 2019

ক্ষমতা আর ইতিহাস

ক্ষমতার লেখ্য ইতিহাসের বাইরে বিপুল ব্যপ্ত ইতিহাসের কুড় লুকিয়ে আছে যা ঔপনিবেশিক ক্ষমতাধরদের তৈরি কেন্দ্রিভূত, শুধু রাজা গজাদের বর্ণনার ইতিহাসের অংশ নয়, সেখানে মানুষ সাঁটে বলে রাখে বাইশা বা ষোলআনা মেলা বা বিদ্যালয় আদতে বলে এই সম্মিলত সামাজিক ব্যবস্থাপনার মানে কি, যদু মহেন্দ্রই বা কে বা হরিরামপুরের হরিই বা কে রামই বা কে বা আমাতি মানে কি রামাবতি, ছিরিমতী মানে কি শ্রীমতী, বাণরাজার ঢিবিতে বসে যে মানুষটা এই ১৪২৬ সনের শীতে পিঠ করে গরুকে জাবনা দেয় সে কি মধ্যবিত্ত প্রণোদিত হেরিটেজে আগ্রহী? দিনাজপুরের মালাকারেরা কেন শোলা আর বাঁশ দিয়ে ঘোড়া তৈরি করেন, যে ঘোড়া যুদ্ধ সমাজ নয় বলে পরিচিত সাঁওতালেরা নিয়ে বিয়েতে যায় - হাতি নিয়ে যান না কেন, যে হাতি বাংলার নিজস্ব - ঘোড়া ত নয় - ঘোড়া তো বহিরাগত এবং সাঁওতালদের সঙ্গে ঘোড়ার সঙ্গে দূরতম সম্পর্ক আছে বলে সাঁওতালেরাও বলেন না?
ইতিহাস লুকিয়ে আছে এই খোঁজগুলোর মধ্যে, ক্ষমতার ইতিহাস অতীত জানার একটা মাত্র ঘুলঘুলি উন্মুক্ত করে। যার ইচ্ছে থাকে সেই এই সাঁটগুলি থেকে হাঁচড়ে পাঁচড়ে ইতিহাস বার করে।
ইতিহাস মানে মেডিজি নয়, গুলে খাইয়ে দেওয়া নয়, পথেঘাটে কথ্যভাষায় ছড়িয়ে থাকা হাজারো ইঙ্গিতে উদ্দিষ্ট বার্তা পৌঁছে দেয় অধিকারীর হাতে, যার লেগে থাকার দম থাকে।

Friday, May 18, 2018

ইওরোপকেন্দ্রিকতা বিরোধী চর্চা - ইওরোপবিদ্য ভাবনার শেষ বিদায়২৮ - ক্লদ আলভারেজ

সমাজ বিজ্ঞান পাঠ্যের বিবর্তন
হোয়াইট স্টাডিজ আর অনুমানগুলির সমস্যার সমালোচনা

সাদা সাম্রাজ্যবাদী পাঠ্যক্রমের সঙ্গে মিলিতভাবে কোন মধ্যপন্থা তৈরি সম্ভব কি না
এর আগে বিভিন্ন সমাজ বিজ্ঞানের পাঠ্যক্রমে ইওরোপমুখ্য ভাবনা-তত্ত্বের কলুষিতকরণের বিশদ বর্ণনা আমরা পাই ওয়ার্ড চার্চিলের বই হোয়াইট স্টাডি থেকে। যখন কোন পরম্পরার সমাজের ছাত্রছাত্রী আমেরিকিয় বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমগুলি গভীর নজর দিয়ে দেখে, তখন তার সত্যকারের বিবিমিষা হয়। তার মনে হয়, পূর্বজরা তাকে যে পরম্পরার জ্ঞান দিয়ে গিয়েছিল, সেগুলির কোন অস্তিত্বই বিশ্ববিদ্যালয়গুলির পাঠ্যক্রমে নেই, তাই তার মনে হয় যে সে সব কটা পাঠ্যক্রমেই বাতিল হিসেবে গণ্য হচ্ছে, সেই জ্ঞান থেকে, যা জীবনধারণের রূপরেখা তৈরি করে, পরিবেশের সঙ্গে এবং অন্যান্য প্রজাতির সঙ্গে আলাপের ভিত্তি তৈরি করে। যদিও এই জ্ঞানের খুব কম অংশই আজ অবশিষ্ট আছে, কিন্তু সেই পরম্পরার জ্ঞান, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিপুল বিশাল ইওরোপকেন্দ্রিক জ্ঞানউতপাদনের থেকে অনেকি বেশি শ্রেয় এবং গ্রহনীয়।
ওয়ার্ড চার্চিলের কাজ থেকে আমরা পাচ্ছি, উচ্চশিক্ষার বিপুল বিশাল অংশ, বলা দরকার গোটা অংশটার উদ্ভব, মাথাব্যথা, উদ্দেশ্য, পদ্ধতি এবং অনুসৃত নীতি সাদাদের দ্বারা এবং সাদাদের জন্যেই তৈরি হয়েছে। সেই পরম্পরার ছাত্রছাত্রীর মনে হয় এই পশ্চিমি জ্ঞানের যেহেতু কোন বিশ্বজনীনতা নেই, তাহলে সে কেন এই পাঠ্যক্রম পড়বে। অথচ এই পাঠ্যক্রমগুলি অসাদা পড়ুয়াকে আত্মস্ম্যাত করতে হয় তার কারণ, এটি বিমূর্ত ধারণা, বিমূর্ত পদ্ধতিহিসেবে তার কাছে আসে, ঠিক যেভাবে সে ইংরেজি অক্ষরগুলি শেখে।
সিঙ্গাপুরের ফরিদ আলাতাস বা আফ্রিকার ইমানুয়েল নগারা বিভিন্ন সমাজবিজ্ঞানে সাদা চামড়ার মানুষদের হাতে তৈরি নানান তত্ত্বের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বলেছেন কেন এগুলি তাদের সমাজে কোন গুরুত্ব নেই। পশ্চমি সমাজ বিজ্ঞানের সফলতা হল অন্যান্য সমাজের কৃষ্টিগত অর্জনগুলি বা তাদের বৌদ্ধিক পরম্পরার বা অভিজ্ঞতা না জেনে বুঝেই সামাজিক সমীক্ষা করার ক্ষমতা। অন্য সমাজের সঙ্গে সাদা চামড়ার মানুষদের তৈরি পাঠ্যক্রমের যদিও কোন আদানপ্রদান হয়ে থাকে সেটির উদ্দেশ্য হল, সেই সমাজকে তারা আয়না হিসেবে ধরে নিয়ে, তাদের নিজেদের স্বশ্রেষ্ঠত্বের দাবিকে নতুন করে প্রতিষ্ঠা করা।
এখানে মাঝে মাঝেই প্রশ্ন ওঠে, তাহলে আমরা কেন নিজেদের পাঠ্যক্রম চর্চার দায় নিজেদের ওপর নিতে পারি না, বিশেষ করে যখন আমরা আমাদের নিজেদের নিয়ন্ত্রণ নিজেরাই করছি? যদি ইওরোপের রাষ্ট্রবিজ্ঞান চর্চার পাঠ্যক্রমের সংস্করণ, অন্যান্য সমাজের রাষ্ট্র পরিচালনা তত্ত্ব, ধারণা, অভিজ্ঞতা, সূত্র ব্যতিরেকেই পড়ানো যেতে পারে, তাহলে তাদের দেখাদেখি অন্যান্য সমাজ কেন এই কাজটা নিজেরা করে উঠতে পারবে না, বোঝা দায়। তথাকথিত মূলস্রোত বা ইওরোপিয়বাদ যে সব সমাজের সমাজবিজ্ঞানের মূলসূত্র, ধারণা, শ্রেণীবিন্যাসকে নস্যাৎ করে নিজেকেই শ্রেষ্ঠ ঘোষণা করতে পারে, কেন তার বিপরীতে সেই সমাজগুলি তাদের মত করে সমাজ বিজ্ঞানকে তৈরি করতে পারবে না? এই চিন্তাকে, সম্ভাবনাকে নস্যাৎ করে দেওয়ার অর্থ হল, একটা কৃপাপূর্ণ বাস্তবতা তৈরি করা, যেখানে বলা হবে, ইওরোপই শেষ কথা বলে এবং এটি সর্বজনমান্য, যা মিথ্যা এবং গ্রহণযোগ্য নয়। যদি কোন সমাজ বিজ্ঞানের পড়ুয়া বলে সে পশ্চিমের সমাজ তাত্ত্বিকদের ভাবনা তত্ত্ব এবং পদ্ধতি ছাড়া কাজ করার কথা ভাবতেই পারে না, তাহলে সেটা তার নিজের ভাবনা, কিন্তু এই ভাবনাকে সার্বজনীন হিসেবে দাগিয়ে দেওয়ার, বা অন্যান্যদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার কোন যৌক্তিকতা নেই।
বিষয়টা হল ইওরো-আমেরিকিয় চিন্তাবিদদের তৈরি করে দেওয়া কাঠামোর মধ্যে দাঁড়িয়ে, অ-সাদা সমাজের চিন্তকদের ভাবনাচিন্তা জ্ঞানচর্চার ধারাকে বাদ দিয়ে তৈরি করা সমাজ বিজ্ঞানের পাঠয়ক্রমকে প্রশ্নহীনভাবে অনুসরণ করে যাওয়ার মধ্যে কিন্তু সাদা চামড়ার পাঠ্যক্রমকে কিন্তু সবল করা যাবে না, যদি অন্যচিন্তার প্রবেশ না ঘটে সেই পাঠ্যক্রমে। প্রত্যেক মিনিট, প্রত্যেক ঘন্টা, প্রত্যেক দিন, প্রত্যেক বছর এই কাঠামোটি তৈরি করে পশ্চিম আমাদের ভাবনাকে রুদ্ধ করে চাপিয়ে দিচ্ছে, সেখানে আমাদের অসাদাদের, আমাদের অভিজ্ঞতা, জ্ঞানচর্চা, শ্রেণীবিভাগ করা কাঠামোর কোন অস্তিত্ব নেই, যার মাধ্যমে আমদানি করা শ্রেণী বিভাগে অভ্যস্ত হয়ে পড়া আমরা, আমাদের পরিবেশ ইত্যাদির সঙ্গে অর্থপূর্ণভাবে সংযোগসাধন করতে পারি।

Thursday, May 17, 2018

ইওরোপকেন্দ্রিকতা বিরোধী চর্চা - ইওরোপবিদ্য ভাবনার শেষ বিদায়২৭ - ক্লদ আলভারেজ

সমাজ বিজ্ঞান পাঠ্যের বিবর্তন
হোয়াইট স্টাডিজ আর অনুমানগুলির সমস্যার সমালোচনা

শিক্ষা সাম্রাজ্যবাদ হিসেবে ভূগোল পাঠ
২০০৫ সালের পেনাঙ্গের মাল্টিভার্সিটি দ্বিতীয় সম্মিলন Redesign of Social Sciences Curriculum শীর্ষকে উপস্থিত হয়ে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল শিক্ষক, অনু কাপুর আহূত শ্রোতাদের জানালেন, কেন তিনি তার স্নাতকোত্তর শ্রেণীর ছাত্রদের বলেন ভূগোলের পাঠ্যক্রমের সেই সব ভাবনাগুলি ঝালিয়ে এবং ছেঁকে নিতে, যেগুলোকে তারা সার্বজনীন ভূগোল বলছেন, সেগুলোর মধ্যে কোন কোনটা এবং কতদূর ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থার প্রেক্ষিতে কার্যকর।
ছাত্রছাত্রীরা নতুন করে শুরু করল পাঠ্যকে ভারত আর পশ্চিমের দৃষ্টিভঙ্গীতে দেখতে, এবং তারা যখন এই বিভাগ করাটা শেষ করল, তখন দেখা গেল মোটামুটি ৪০০র আশেপাশের পাতার পাঠ্যক্রমের মধ্যে চতুর্থাংশ পশ্চিমে, পশ্চিমের লেখক এবং পশ্চিমের দৃষ্টিভঙ্গীতে লিখিত হয়েছে। আর যে সব মডেল পড়ানো হয়, বিশেষ করে কৃষিতে, জমি ব্যবহারের প্যাটার্নটা মূলত ইওরোপ থেকে ধার করা। দেশিয় ভাবনাটা নেইই। ইন্ডিয়ার রাজনৈতিক স্বাধীনতা ৫০ বছর পেরিয়ে গেলেও অবস্থার খুব বেশী কিছু পরিবর্তন হয় নি।
এই চরিত্রগুলো সেই ঔপনিবেশিক ইতিহাসের দ্বারা তৈরি হয়েছিল এবং আজও বহাল তবিয়তে অবস্থান করছে। নৃতাত্ত্বিকদের মতই ভূগোলবিদেরা এবং কার্টোগ্রাফাররা অইওরোপিয় দেশগুলি দখল আর লুঠের কাজে সাম্রাজ্যকে সরাসরি সহায়তা করেছিল। ভূগোলবিদেরা সাম্রাজ্যের সীমানা বিস্তারে সাহায্য করে সাম্রাজ্যের সীমা নতুন করে নির্ধারণ করে। ভূগোলবিদেরা সাম্রাজ্যের সঙ্গে মিলে বিভিন্ন অঞ্চল এবং ক্ষেত্রর নাম পাল্টানোতে সহায়তা করে, এবং নিজেদের দেশের এলাকার নাম ধার করে এবং নামগুলির খ্রিষ্টিয়করণও করে এনে উপনিবেশের শহর, এলাকা, শহরতলীর নাম পালটে দেয় যাতে দেশ থেকে নতুন করে সাম্রাজ্যে আসা চাকরিজীবি আর ব্যবসায়ীরা দেশের কথা মনে করতে পারে।
এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ সাম্রাজ্যের কবল থেকে বেরিয়ে আসার পরে কিভাবে দেশগুলো তাদের এলাকার নাম পালটে ফেলছে। এটা কিন্তু দেখার। নতুন নামকরণ আরেক ধরণের ক্ষমতা তৈরির আভাস। বম্বের নাম হোল মুম্বই এরকম প্রত্যেকেরই কিছু কিছু উদাহরণ নিশ্চই মনে পড়বে। সমস্যা হোল এই রাজনৈতিক হাতিয়ারকে ভোট হাতানো বা রাজনৈতিক সমর্থন জোগাড় করার জন্যে কাজে লাগানো হয়। কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, যারা আমেরিকিয় রাজনৈতিক চিন্তকদের তত্ত্ব অনুসরণ করে রাষ্ট্রবিজ্ঞান পড়ান, তাদের থেকে কোন তুল্যমূল্য উদ্যোগ দেখা যায় না।
এই রকম কড়া প্রতিবাদ সত্ত্বেও(যা কয়েক দশক ধরে হয়ে চলেছে) স্বাধীন ইন্ডিয়ার রাজধানীর কেন্দ্রস্থলে স্থাপিত এই বিপুল অর্থবান ক্ষমতাশালী বিশ্ববিদ্যালয়ে আজও ইওরোপিয় ধারণা এবং ইওরোপিয় ভাবনাচিন্তা কোন রকম লজ্জা ছাড়াই পড়ানো হয়। ডুর্খেইম, ওয়েবার, মার্ক্সএর তত্ত্ব ইওরোপিয় বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্যে ঠিক আছে। নিজেকে বিজ্ঞাপিত করতে এবং অন্যদের বাজার থেকে হঠিয়ে দিতে ভোক্ত্রাদের জন্যে দূরদর্শনে নিয়মিত কোকাকোলা বিজ্ঞাপন দেখে প্রভাবিত হওয়ার মতই, আমরাও এই মানুষদের আলাপ আলোচনা দেখে মনে করি যেহেতু ইংরেজি শিক্ষিত বাবুরা এই তত্ত্বগুলো বারবার আওড়ান এবং ইওরোপিয় শিক্ষা ব্যবস্থা আর অন্যান্য ভাবনাগুলোকে তাড়িয়ে দিয়ে নিজের নিজের রাজত্বে স্বরাট হয়ে বসে আছে বলেই আমাদের মনে হয় এই ভাবনাগুলোর কোন প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। আমরা অন্য তাত্ত্বিকদের কথা জানি না কারণ আমরা ইংরেজি ছাড়া অন্যান্য ভাষাই জানি না।
আমার প্রশ্ন হল এই সমাজতাত্ত্বিক, তাত্ত্বিক এবং রাজনৈতিকতাত্ত্বিকদের মধ্যে মিল কোথায়? কেন আমরা মেনে নিই না, আমরা তাদের মহত্ব স্বীকার করে নিয়েছি কারণ তাদের নাম উঠতে বসতে নিয়মিত শুনি, প্রচার করি, ফলে প্রভাবিত হয়েই মেনে নিই। আমাদের নিজস্ব কোন ধারণা গড়ে ওঠে না। কি করেই বা গড়ে উঠবে। এই তাত্ত্বিকেরা দুশতাব্দ আগে জার্মান ভাষায় লিখেছিলেন তাঁদের তত্ত্ব। তারপরে সেগুলো ইংরেজিতে অনুদিত হয়েছে। আমাদের হয় ইংরেজি বা জার্মান জানতে হবে সেগুলো বুঝতে। কোন লেখাই আমাদের মাতৃভাষায় লিখিত নয়। তাহলে কেন বার বার আমরা তাদের নাম উল্লেখ করা থেকে বিরত থাকছি না। আমরা কি মুর্খ হয়ে যাব? আজ সেগুলো আমরা শুধুই নকল করে চলেছি, সেই শৃঙ্খল থেকে কি আমরা মুক্ত হব না – নাকি আমরা সেই দূর সময় বসে মানুষগুলোর দৃষ্টিভঙ্গীতে দেখা বিশ্বকে আজও দেখতে থাকব? তাহলে কি এটা ঠিক হল, আমরা কোন মানসিক ক্রাচ ছাড়া আর বেশি দূর হাঁটতে পারব না।

Wednesday, May 16, 2018

ইওরোপকেন্দ্রিকতা বিরোধী চর্চা - ইওরোপবিদ্য ভাবনার শেষ বিদায়২৬ - ক্লদ আলভারেজ

সমাজ বিজ্ঞান পাঠ্যের বিবর্তন
হোয়াইট স্টাডিজ আর অনুমানগুলির সমস্যার সমালোচনা

শিক্ষা সাম্রাজ্যবাদ হিসেবে সমাজতত্ত্ব পাঠ
ফলে আমাদের গভীরভাবে ভাবতে এবং গবেষণা করে বার করতে হবে আধুনিক সমাজতত্ত্ব কোন কোন ধারনার ওপর ভিত্তি করে রয়েছে এবং সেই উপাত্তগুলি নির্ভর করে সেগুলিকে কিভাবে এশিয় দেশিয় বৌদ্ধিক পরম্পরার সঙ্গে জুড়ে এশিয় সমাজতত্ত্বে সাজিয়ে তুলতে পারি এবং আমাদের ভবিষ্যতের ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে দেশজ ভাবনার সূত্র জুড়তে পারি। আজ পর্যন্ত ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে আমাদের যা অভিজ্ঞতা, তাতে দেখেছি, ছাত্রছাত্রীরা অন্য কোন বিভাগে সুযোগ না পেলে একটা বিশ্ববিদ্যালয়ী শংসাপত্রের জন্যে সমাজতত্ত্বে ভর্তি হয়ে যায়, সে জানে বিন্দুমাত্র কিছু না বুঝে, বিন্দুমাত্র পরিশ্রম না করে সে বিপুল নম্বর পেয়ে যাবে। আমাদের ভাবতে হবে আদৌ এই সমাজতত্ত্ব পড়ানোর কোন যুক্তি আছে কিনা।

শিক্ষা সাম্রাজ্যবাদ হিসেবে রাষ্ট্রবিজ্ঞান পাঠ
রাষ্ট্রবিজ্ঞান পাঠেও ইওরোপমুখ্যতাই প্রায় শেষ কথা। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পাঠ্যপুস্তকে পশ্চিমের তৈরি হাজারো বাতিল, অযৌক্তিক তত্ত্ব ঠুসে দিয়েছে যাতে আগামী দিনে এই বিষয়ে ছাত্রদের মধ্যে বাস্তব রাজনৈতিক সমস্যা নিয়ে সদর্থক আলাপ আলোচনার পরিবেশই তৈরি না হয়।
সব কটা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পাঠ্যক্রম, অন্যান্য সমাজবিজ্ঞানের পাঠ্যক্রমের মতই প্রথমে ইওরোপে সূচনা হয়, এবং তার পরে আমেরিকিয়রা তাদের স্বার্থেই এটি দখল করে। আমাদের এই বিশ্বে গবেষণার একটাই লক্ষ্য ইওরোপ আমেরিকার কোন নব্য তত্ত্বকে তুলে নিয়ে তার ওপরে পিএইচডি থিসিস করা। The Achieving Society বইতে David McClelland কৃতিত্ব অর্জনের প্রেরণা(achievement motivation) নিয়ে গবেষণা করেছেন। তারপরে তিনি লিখলেন Power: The Inner Experience। ক্ষমতার ভাষ্য রচনা করতে গিয়ে আমরা সেগুলি অবলম্বনে গাদা গাদা প্রবন্ধ লিখেছি। একই কথা বলতে পারি মাইকেল ফুকো, দেরিদা বা আরও শয়ে শয়ে ইওরোপিয় আমেরিকিয় লেখক সম্বন্ধে। ইওরোপ আমেরিকার তাত্ত্বিক চিন্তার প্রতি মানসিক দাসত্ব সম্পূর্ণ হয়েছে এবং এটি আমাদের পক্ষে খুবই অবমাননাকর।
অবাক কাণ্ড যে আমাদের কারোরই অবিশ্বাস করা উচিত না যে অসাদা সমাজের খুব জোরালো রাজনৈতিক চিন্তার পরম্পরা রয়েছে। ভারত এবং চিনের প্রচুর রাজনৈতিক ধারনার বই রয়েছে যেমন Book of Mencius, The Analects of Confucius  বা কৌটিল্যের Arthashastra ইত্যাদি। কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্রছাত্রীদের উদ্দেশ্যপূর্ণভাবে নিকোলো মাকিয়াভেলির দ্য প্রিন্স গেলানো হচ্ছে। পশ্চিমি বিদ্বতজনেরা এতই অশিক্ষিত যে তারা এই এশিয় রাজনৈতিক চিন্তাগুলি পাঠ্যক্রমে রাখার কথাই ভাবে নি। এবং আমরাও আর কতকাল এই পশ্চিমি অশিক্ষা এবং/অথবা উপেক্ষা সহ্য করে তাদের শিক্ষণের পদপ্রান্তে বিনা প্রশ্নে নকল করে যাব।
রামায়ণ এবং মহাভারতের মত দুটি মহাকাব্য রাজনৈতিক শিক্ষার বড় হাতিয়ার হতে পারত। মহাকাব্যগুলিতে নৈতিকতা, দর্শন এবং রাজনীতি বিষয়ে বিশদে আলোচনা থাকলেও ভারতের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পাঠ্যসূচীতে এদুটির কোন অস্তিত্বই লক্ষ্য করা যায় না। বিশেষ করে মহাভারতের যুদ্ধে, যুদ্ধ ক্ষেত্রে যুদ্ধ চলাকালীন নানান চরিত্রের মুখে যে রকমের হিংসার বহিঃপ্রকাশের নানান তাত্ত্বিক আলোচনা দেখা যায় তা কোনদিন পড়াবার চিন্তা করাই হয়নি।

তাই আজকের ভারত, থাইল্যান্ড বা শ্রীলঙ্কা বা ইন্দোনেশিয়ায়(মুসলমান দেশ হওয়া সত্ত্বেও) হাজারো শিক্ষার্থী শিক্ষা কেন্দ্রের ইওরোপিয়দের তৈরি করে দেওয়া পাঠের সীমান্তের বাইরে বেরিয়ে এসে শিক্ষাকেন্দ্রের চত্ত্বরের বাইরে এই পাঠগুলি নিয়ে নিজেরা আলোচনা করছে। এবং এটা তাদের দোষের নয়। 

ইওরোপকেন্দ্রিকতা বিরোধী চর্চা - ইওরোপবিদ্য ভাবনার শেষ বিদায়২৫ - ক্লদ আলভারেজ

সমাজ বিজ্ঞান পাঠ্যের বিবর্তন
হোয়াইট স্টাডিজ আর অনুমানগুলির সমস্যার সমালোচনা

ভাগ্য ভাল সারা বিশ্বের সমাজজুড়ে ইওরোপ-আমেরিকার নানান বিষয় নকলকরার এই ভুলভাল ভাবনাটা খুব বেশি এগোয় নি। তবে আন্তর্জাতিক অর্থ সঙ্গঠনগুলি এই নীতি প্রয়োগ করায় দৃঢবদ্ধ – অ-সাদা সমাজকে সাদা সমাজের মত করে গড়ে তোলার তত্ত্ব প্রচার প্রসার করার জন্যে প্রচুর বিনিয়োগ করেছে, যেমন ঠিক চামড়া সাদা করার করার প্রসাধনী অ-সাদা দেশগুলির বাজারে বিপুল বিজ্ঞাপন করে বিক্রি করা হয়। যদি এই কাজটা সত্যি সত্যি সফল করে ফেলতে পারে তাহলে কি আতঙ্কের এবং সর্বনাশের ব্যাপার হবে। কারণ আমরা জানি আমেরিকিয় সমাজতত্ত্বের ভিত্তিটাই হোল সাদামধ্যবিত্ত আমেরিক পুরুষ – এবং সারা পৃথিবীর কথা ভুলে যান, তারা আমেরিকার রোলমডেল হিসেবে সব থেকে বায়ুগ্রস্ত হিসেবে চিহ্নিত এবং স্বব থেকে অবাঞ্ছিত।
সমাজতাত্ত্বিক Farid Alatas খুব সম্পতি এক আলোচনায় বলছেন বলছেন, কিভাবে এবং কতদুর এবং কত গভীর পর্যন্ত অ-সাদা সমাজগুলিতে ইওরোপমন্যতা সমাজতাত্ত্বিক পড়াশোনায় প্রবেশ করেছে। তিনি Alternatives Discourses in Asian Social Science বইতে বলছেন বিভিন্ন সমাজ বিজ্ঞান চর্চায় অস্বাভাবিকভাবে ইওরোপমন্যতার প্রভাব পড়েছে। যে সব বিষয় নিয়ে উনি দীর্ঘ আলোচনা করেছেন(তার এই সমালোচনা আমদানিকৃত অন্যান্য সমাজ বিজ্ঞানের শাখা নিয়েও একই কথা বলা চলে) সেগুলির কয়েকটি আমি এখানে উল্লেখ করে দিলাম
• The principal thrust of developments in social sciences continues to originate from the work of American, British, French and
German scholars (the so-called Gang of Four Social Science powers). Universities in other parts of the world have reduced themselves to copying or studying the output of the social scientists of these countries, including new ideas, selection of problems, methodologies and research priorities.
• For this reason, there is scant attention paid to local literary and philosophical traditions. These are invariably never considered as proper sources for concepts (theory) in the social sciences. The general habit is to neglect them altogether.
• Alatas notes the complete inability of social scientists outside of the Euro-American cultural area to generate original theories and methods while working in their areas. There is also a massive lack of confidence in this respect. There is very little capacity to create new theoretical models or methods.
• Western science models or theories or concepts are uncritically adopted and applied in societies, resulting in theories or works with little utility or value. We also face the problem of “auto-orientalism” in which orientalist ideas are themselves adopted as true pictures of non-Western societies by scholars and intellectuals in non-Western societies.
• Alatas observes that European discourses on non-Western societies invariably tend to produce essentialist constructions of these societies, thus ‘confirming’ that they are the opposite of what Europe represented and for this reason can be labelled “barbaric,” “backward” and “irrational.”
• Most social science perspectives are elitist. They focus on the dominant groups in society and their concerns. They do not take into consideration the existence of minority points of view. Neither do they look seriously at ethnic minorities, underprivileged groups or subalterns.

• Of course, most social science also aligns with the State and its concerns. In this sense, social scientists are mostly conservative, status-quoist. Once Western anthropologists and geographers were handmaidens of the State. Today, their role is taken over by Indian or Malay anthropologists or geographers. The relationship with the State has remained untransformed.

Tuesday, May 15, 2018

ইওরোপকেন্দ্রিকতা বিরোধী চর্চা - ইওরোপবিদ্য ভাবনার শেষ বিদায়২৪ - ক্লদ আলভারেজ

সমাজ বিজ্ঞান পাঠ্যের বিবর্তন
হোয়াইট স্টাডিজ আর অনুমানগুলির সমস্যার সমালোচনা

শিক্ষা সাম্রাজ্যবাদ হিসেবে ইতিহাস পাঠ
এই কর্তৃত্ব প্রমানের দৃষ্টিভঙ্গীটা আমরা বুঝতে পারি কিভাবে আমেরিকা, নিউজিল্যান্ড এবং অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাস লেখা হয়েছে, সেই পাঠ অনুসরণ করে। অন্তত এই তিন দেশের ইতিহাস আদতে সাদাদেরই এবং সাদাদেরই তৈরি করা ইতিহাস, এবং সে উদ্যমে দেশের প্রাচীন অধিবাসীদের কথা নেই বললেই চলে। আর যদি থাকেও তাহলে তাদের দৃষ্টিভঙ্গীই উপস্থিত থাকে না।
আরেকটি বিষয় আলোচনা চলছে, জ্ঞানচর্চা হিসেবে ইতিহাসের অস্তিত্ব বজায় রাখার যৌক্তিকতা আদৌ আর আছে কি না। বিশেষ করে ভারতের মত সমাজে, যে সমাজ অতীতের সত্য জানতে গেলে যেতে গেলে সে ঐতিহাসিক সময়ের থেকে বেশি গুরুত্ব দেয় অন্য সব জ্ঞানচর্চার মাধ্যমকে বিশেষ করে মিথকে। সেই সব সমাজে ইতিহাসের প্রয়োজন আদৌ আছে কিনা ভাবতে হবে। উদাহরণস্বরূপ ভারতে অধিকাংশ জনগন ইতিহাস বুঝতে বিশদে মিথের আশ্রয় নেয়, যা ঐতিহাসিক সত্যকে উপস্থিত করে। এবং তাদের কাছে ঐতিহাসিক সত্যের মানে হোল ঐতিহাসিক ঘটনার থেকে তার অন্তর্নিহিত অর্থের মানে খোঁজা এবং সেই ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে নানান ধরণের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব যার একটা অংশ পশুও। এই বিষয়টা আরও বর্ণিল হয়েছে সাম্প্রতিক কালে কয়েকটি ভারতীয় পঞ্জিকা প্রকাশে যা সারাবিশ্বে চালু গ্রেগরিয় পঞ্জিকাকে নস্যাৎ করে দিয়ে রমরম করে চলছে। বিনয় লাল এই বিষয়টা নিয়ে বিশদে আলোচনা করেছেন বিভিন্ন লেখায় মাল্টিভার্সিটিতে দেওয়া বক্তৃতায়। এ বিষয়ে আরও জানতে আপনি এই সূত্রে www.multiworldindia.org/  যেতে পারেন।

শিক্ষা সাম্রাজ্যবাদ হিসেবে সমাজতত্ত্ব  পাঠ
আজকের সমাজতত্ত্ব সামগ্রিকভাবে আমেরিকিয়(তার সব দৃশ্যমান বিকার নিয়েই), গোটা সমাজতত্ত্ব ইওরোপিয় পদ্ধতি, চিন্তাভাবনা, বিশ্বাস এবং অভিজ্ঞতা দিয়ে গড়া। আমি ভারতীয় সমাজতাত্ত্বিকদের সঙ্গে কথা বলে একটা বিষয় স্পষ্টভাবে বুঝেছি, তারা বিশ্বাস করেন, অগাস্ট কোঁত, ম্যাক্স ওয়েবার বা এমিলি ডুরখেইম ইত্যাদি তাত্ত্বিক সূত্র ব্যবহার করা ছাড়া তাদের পক্ষে ভারতীয় সমাজের সমাজতত্ত্বের ভিত তৈরি করা সম্ভব নয়, কেননা তাদের তত্ত্ব তারা পড়ে এসেছেও এবং বিদ্যালয়ে-বিশ্ববিদ্যালয়স্তরে আজও পড়ান। যদিও তাঁরা স্বীকার করেন ভারতীয় সমাজের মত এত বৈচিত্র্যপূর্ণ গতিশীল সমাজ খুব বেশি নেই, তার এই চরিত্রগুলোর জন্যই সে হাজার হাজার বছর নিজের মত করে বেঁচে এসেছে। সমাজতাত্ত্বিকেরা যেহেতু তাদের রোজগার সেই জ্ঞানচর্চা নির্ভর করেই করে থাকেন, তাই তাদের সমাজতত্ত্ব আদৌ সমাজ বিজ্ঞান কি না এবং তার কাজ সত্যিই কোন উদ্দেশ্যপূরণ করে কিনা এই প্রশ্নগুলো জিজ্ঞাসা করা তাদের কাছে খুব বেশি চাওয়া হয়ে যায়।
ভারতীয় সমাজতত্ত্বের চর্চার ইতিহাসকে গত ৩০০ বছরের ইওরোপের সমাজ নির্ভর সমাজতত্ত্বের বিকাশে কিভাবে খাপ খায় এই প্রশ্ন করাটা খুব অনুপযুক্ত এবং হাস্যকরও বটে কারণ, এই দুয়ের মধ্যে ব্যবধান দুস্তর, আলাপ আলোচনাই তেমন প্রায় নেই আর যদিও কিছু হয়ে থাকে তাহলে সেটি প্রভু-ভৃত্য মার্কা।
প্রথম দিকে ইওরোপিয় এবং পরের দিকে আমেরিকিয় সমাজতত্ত্বের ওপর অপার নির্ভরতা বেশ কিছু সমস্যারও জন্ম দিয়েছে।
সমাজতাত্ত্বিকদের মূলত যুক্তি দেন, আধুনিক(পড়ুন ইওরোপিয়, আমেরিকিয়) সমাজের নানান আধুনিক চরিত্রগুলিকে তাত্ত্বিকভাবে আলোচনা করে অপরিহার্য এবং নিশ্চিতভাবে অ-সাদা সমাজে জোর করে ধাক্কা দিয়ে ঢুকিয়ে দিতে হবে। অন্যভাষায়, ইরানি, বা ভারতীয় বা ফিলিপনো সমাজকে অপরিহার্যভাবে আজকের ইওরোপ-আমেরিকার নানান সামাজিক রেণুকে আত্মস্থ করে নিতে হবে, তাহলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। এই দৃষ্টিভঙ্গী গম্ভীরভাবে আলোচিত হয়েছে এবং প্রচারিতও হয়েছে।

Monday, May 14, 2018

ইওরোপকেন্দ্রিকতা বিরোধী চর্চা - ইওরোপবিদ্য ভাবনার শেষ বিদায়২৩ - ক্লদ আলভারেজ

সমাজ বিজ্ঞান পাঠ্যের বিবর্তন
হোয়াইট স্টাডিজ আর অনুমানগুলির সমস্যার সমালোচনা

শিক্ষা সাম্রাজ্যবাদ হিসেবে মনোবিদ্যা পাঠ
একে যত কম বিজ্ঞান হিসেবে চিহ্নিত করা যায় ততই ভাল। এটা ভাল খবর আজ এটি নিজেকে এথনোগ্রাফি হিসেবে চিহ্নিত করতে চায়। এবং তার পূর্ণ ঔজ্জ্বল্যের দিনে নৃতত্ত্ব সাম্রাজ্যবাদের পঞ্চম বাহিনী হিসেবে প্রশাসনের সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করেছে। সাম্রাজ্যবাদ রাজনৈতিক তত্ত্ব হিসেবে তার সম্মান হারালে এটির উদ্দেশ্য এবং বিধেয় দুটিরই অভিষ্ঠ ঝড়ে উত্তাল সমুদ্রে পড়া ভেলার মত দিগভ্রষ্ট হয়ে যায়, এবং আফ্রিকা, আলাতোলিয়া ইত্যাদি এলাকায় বিপুল বিরোধিতার সম্মুখীন হয় এই বিদ্যাচর্চা, যেখানে নৃতত্ত্বকে খুব খারাপভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল। এর থেকে একটা জিনিস উঠে আসে, প্রাথমিকভাবে ইওরোপ দুটি সমাজবিজ্ঞান চর্চা শুরু করেছিল, প্রথমটি সমাজবিদ্যা তার সাম্রাজ্যের নিজের সভ্য সমাজ এবং মানুষ বিশ্লেষণের জন্যে আর দ্বিতীয়টির নাম হল নৃতত্ত্ব, বাকি মানব সমাজের জন্যে, বিশেষ করে বর্বর, আদিম এবং জংলীদের সমাজ বিশ্লেষণের জন্যে(শুধু বিশ্লেষণ নয় জ্ঞান চুরির জন্যেও - অনুবাদক)।
যখন এই দুই বিভাগের পার্থক্য মুছে গেল, বিনয় লাল বলছেন, ১৯৪৯এ প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান বিশ্বকে দুটি সমাজে ভাগ করলেন উন্নত আর অনুন্নত – পুরোনো মদ নতুন বোতলে পুরে ফেরি করা।
আজও তাত্ত্বিকভাবে এটা প্রমাণিত যে নৃতত্ত্ব একমুখী রাস্তা যেখানে Europeans descending on the rest
of the world with their quaint filters and mirrors and eventually using their experience as little more than confirmation of their own (superior) way of life। এই ইওরোপকেন্দ্রিক তাত্ত্বিক অবস্থান বিপুল বিশাল নৃতাত্ত্বিক লেখাপত্রেও উঠে এসেছে যেখানে তারা মহান বর্বর আর প্রাচীন সমাজ নিয়ে চর্চা করেছে আজ করছে উন্নত অনুন্নত সমাজ নিয়ে বিশদ বিতর্ক। নৃতত্ত্বের হেঁটমুণ্ড উর্ধ্বপদকে সোজা করে দেখার চেষ্টা খুব বেশি হয় নি, অর্থাৎ অইওরোপিয়দের চোখে ইওরোপিয়দের দেখার উদ্যম নেওয়া হয় নি, যদি কিছু হয়ে থাকে তা ব্যতিক্রম। ড্যানিশ সমাজ নিয়ে ভারতীয় এক সমাজতাত্ত্বিক কাজ করেছেন দ্বিতীয়টা একজন আফ্রিকিয় জার্মান সমাজে বাসের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন। ব্যস।
নৃতত্ত্ব যদি তার কালিমালিপ্ত ছবিকে নতুন করে সাজাতে বসে তাহলে তাকে বিপরীত কিছু করার কথা ভাবতে হবে – সেখানে অইওরোপিয়, ইওরোপিয় সমাজ নিয়ে তার গবেষণার কথা বলবেন। আমরা পশ্চিমকে দেখি শিল্পোন্নত দেশ হিসেবে। ফলে অইওরোপিয় সমাজে যে সব সমস্যার কথা ভাবাই যায় না, সেই সব পশ্চিমি সমাজে এবং পরিবারগুলিতে বহু দুরারোগ্য সমস্যা দেখা দিচ্ছে, এটা উদ্দেশ্যপূর্ণভাবে চোখ বন্ধ করে রাখার সিদ্ধান্ত না নিলে সহজেই বোঝা যায়। জাগতিক প্রাচুর্য সত্ত্বেও সুখে থাকার সূচকে পশ্চিমের মানুষেরা কেউ সুখে নেই এটা স্পষ্ট। এছাড়াও লুকোনো আর প্রত্যক্ষ দারিদ্রের ছাপ নিয়ে আর যে মানুষটা উতপাদন ব্যবস্থার অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন, অবসরপ্রাপ্ত, তার মানবিক সত্ত্বার ওপর বিপুল অত্যাচার নিয়ে সেই সমাজেই কেউই যে কিছুই ভাবছে না এটা বড়ই দুঃখের।

শিক্ষা সাম্রাজ্যবাদ হিসেবে ইতিহাস পাঠ
যে কটা শিক্ষণ বিদ্যায় অতীতের সাম্রাজ্যবাদী ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে লেখালিখি করে এবং শিক্ষা ক্ষেত্রেও কিছু এগোবার চেষ্টা করা গিয়েছে সেটা ইতিহাস। যদিও দীর্ঘকালীন এই পক্ষপাত, মিথ্যা এবং ঘটনার তথ্যবিকৃতি নিয়ে বিতর্ক আছে থাকবে এবং কখোনোই সক্কলকে একযোগে একমতে আনা যাবে না।  
যারা ১৯৫০, ১৯৬০ সালে বিদ্যালয় পাঠ্যে ইতিহাস পড়েছেন, তাঁদের স্মৃতিতে নিশ্চই আছে সেই পাঠ্যপুস্তকগুলিতে স্পষ্ট দাবি করা হত এশিয়া ইওরোপিয় অভিযাত্রীদ্বারা আবিষ্কৃত হয়েছিল। অক্সব্রিজ ঐতিহাসিকদের, অর্থাৎ সেই সব ঐতিহাসিক যারা ইংলন্ডের প্রথিতযশা ঐতিহাসিকদের তাত্ত্বিক নজরদারিতে পড়াশোনা চালিয়েছেন এবং দেশে ফিরে এসে পূর্ণ উদ্যমে তাদের শেখা তত্ত্বকে উগরে দেওয়ার কাজ করেছেন। তাদের পশ্চিমবিদ্যতাপূর্ণ লিখিত ইতিহাস সেই পথ থেকে খুব বেশি দূরে যেতে পারে নি। শুধু হাতে গোনা কয়েকজন কিন্তু এই দাবির মৌলিকত্ব নিয়ে জোর প্রশ্ন তুলেছেন।

ঠিক এই কারণেই ইন্দো-ইওরোপিয় ঐতিহাসিক চৈতন্যের পথ ধরেই ভাস্কোডাগামার ভারত ‘আবিষ্কার’ ইতিহাসের পাঠ্যপুস্তকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলির অন্যতম হিসেবে বিবেচিত হতে থাকে এই উপনিবেশউত্তর ভারতবর্ষে। অথচ চিনা খোজা সেনাপতি জেং হো(অথবা হি)র যে বাহিনী নিয়ে বিশ্ব ভ্রমণে বেরোন সেটার তুলনায় ভাস্কোর এই ভ্রমণকে পুঁচকে মনে হয়(এবং মেলিন্দের উপকূলে পথ হারা ভাস্কোকে উদ্ধার করে কালিকটে নিয়ে আসেন মালামো কানা নামে এক গুজরাটি মুসলমান নাবিক, সাধারণ থেকে সাধারণতম রূপলাগি যন্ত্র নির্ভর করে - অনুবাদক)। এছাড়াও আমরা আজ জানি ইওরোপিয় অভিযাত্রীদের ভারতে আসার আগে ভারত মহাসাগর এলাকায় ভারত-ইওরোপ বাণিজ্য নগণ্য ছিল(আজ আমরা সুশীল চৌধুরীর অসামান্য গবেষনা সূত্রে জানতে পারছি পলাশীর আগে মোট এশিয় এবং ইওরোপিয় বাণিজ্যের পরিমানে এশিয় বণিকদের অর্ধেক বাণিজ্য করত ইওরোপিয়রা – এবং তাদের বিপুল টাকা বাংলা থেকে ধার করতে হত - অনুবাদক)।