Showing posts with label malabar coast. Show all posts
Showing posts with label malabar coast. Show all posts

Monday, June 17, 2013

ব্যবহার নির্ভর করে মালাবার উপকূলের নৌ যান বিভাগ১, types of marine vessels of malabar coat1

ভারতীয় সাহিত্যে জাহাজ(জলযান)গুলির চরিত্র
বিভিন্ন ধরণের জাহাজ তৈরির প্রণোদনা এসেছিল মানুষের বিভিন্ন চাহিদার সূত্র থেকে। ভারতের প্রাচীন সাহিত্যে বিভিন্ন ধরণের জলযানের বিশদ বিবরণ উল্লিখিত রয়েছে। পানিনির অষ্টাধ্যায়ীতে দুটি ধরণের নৌযানের কথা উল্লিখিত রয়েছে দ্বৈপায়(উপকূলের দ্বিপগুলিতে ব্যবসার উদ্দেশ্যে) আর দ্বৈপ বা দ্বৈপক (সমুদ্রস্থ দ্বীপে ব্যাবসার জন্য)।  যুক্তিকল্পতরুতে যা বলা হয়েছে সেটি আমরা পূর্বেই বিশদে আলোচনা করেছি।

ব্যবহার নির্ভর করে মালাবার উপকূলের নৌ যান বিভাগ
মালায়ালি ভাষায় অন্তত ৩৮ টি নৌকোর বিভাগের নাম পাওয়া যাচ্ছে। এগুলো সবই অযান্ত্রিক। নৌকোগুলো ভাগ করা হয়েছে মাছধরা, যাত্রী পরিবহন, পণ্য পরিবহণ, দস্যুতা, ক্রীড়া, এবং সমুদ্রে যাওয়া এই ছয়টি ভাগে।

মাছধরা
আজও মালাবার উপকূলের প্রায় গভীর সমুদ্রে যে সব নৌকো মাছ ধরতে যায় সেগুলির ঐতিহ্য বহু পুরনো। সেগুলির নাম কান্নাটম। মালায়ালি ভাষায় অন্য নামটি হল কাত্তুমারাম এবং কালাত্তাতি। তবে মাছ ধরা, পণ্য এবং যাত্রী পরিবহন, এই তিনটি কাজে যে সব জাহাজ ব্যবহার হয় তাদের নাম পারু, ওটাম, ভালাম, ভান্সি। ক্যাম্পাট্টনি এবং কছুভাল্লাম মাছ ধরার কাজে ব্যাবহার হয়। গুন্ডারত দুটি মাছ ধরার নৌকোর নাম দিচ্ছেন চম্পা আর ওটাম। মাছ ধরা নৌযানগুলো সাধারনত কীল ব্যবহার করে তৈরি হত না, বরং গাছ চেঁছে এবং প্লাঙ্ক বিল্ট করে তৈরি হত।

যাত্রীবাহী  নৌযান
মালায়ালি সাহিত্যে এদের নাম টোনি ছাড়াও কাতাভুটোনি, কেভটনি, কাত্তুটনি, ররনি এবং উড়ু পাওয়া গিয়েছে। প্রণালীগুলো পার হওয়ার জন্য, চামড়া ব্যাবহার করে নৌযান তৈরি হত। এর নাম তোলোটাম।

যাত্রীবাহী নৌযান
মালাবারের বিশাল নদীজাল, হ্রদ এবং সমুদ্র বাহিত হয়ে ব্যবসা করার জন্য বিশেষ নৌকো ব্যবহার হত। পশ্চাৎভূমি থেকে বন্দর, বন্দর থেকে বিদেশে অথবা বিদেশ থেকে পণ্য এনে পসচাৎভুমিতে পণ্য বহন করে নিয়ে যাওয়ার জন্য আলাদা আলাদা জলযান ব্যবহার হত। এদের নাম টোনি, পাটাভু, বটু, ভাল্লাম, ওটি, পাট্টামারি, সিভাটা, প্লাভাম, কাপ্পাল। ওটাম ব্যাবহার হত চিন এবং সুমাত্রায় ব্যাবসার জন্য। ঊরুও বিশাল বড় জাহাল যাতে ১৫০০টি বড়ও গুঁড়ি বয়ে নিয়ে যাওয়া যেত। টম পিরেজ় লাদাস নামে এক ধরণের চ্যাপ্টা তল বিশিষ্ট নৌ যানের কথা বলছেন, যাতে আরও বেশি পণ্য বহন করে নয়ে যাওয়া যেত।


জলদস্যুদের যান
ইবন বতুতা এবং মার্কো পোলোর বর্ণনায় মালাবার উপকূলে জলদস্যুর বর্ণনা পাওয়া যাচ্ছে। প্রচুর ছোট ছোট খাঁড়ি, আঁকা বাঁকা খালের মত নদী, অসমান ভঙ্গুর উপকূল, প্রায় সারা বছরের বানিজ্য, কোনও একটি রাজার আধিপত্য না থাকা ইত্যাদির জন্য হয়ত মালাবার উপকূলে জলদস্যুর প্রাদুর্ভাব হয়। তারা সাধারনতঃ মধ্যম গতির জাহাজ আক্রমন করত, খুবই দ্রুতগামী নৌকোয়। মালায়মে জলদস্যুদের প্রতিশব্দ কাল্লাম। জাহাজগুলোরও প্রায় একই নামে হত। কাল্লাপাট্টাকু, কাল্লাপাকু, কাদালকাল্লামারুদেভানসি, কাল্লাকাপাল এবং ইরুট্টুকুথিভাল্লাম ইত্যাদি।

খেলাধুলোর নৌকো
পূর্বের ত্রাভাঙ্কোর রাজ্যের আলেপ্পে জেলার পাথানামথিটায় প্রচুর বাইচের নৌকো দেখাযায়। ওনামেরমত সাংস্কৃতিক উতসবে জলযানগুলোর মধ্যে ক্রীড়া প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। এগুলির গঠন শৈলী এমনই হয় যাতে দ্রুত জল কেটে চলতে পারে। কুন্ডম ভাল্লম, ভেপ্পু ভাল্লম, ওডি বা ইরুট্টুকুথিভাল্লাম এবং চুরুলাম ভাল্লাম।

যুদ্ধযান
মালাবার উপকূলে চের, জ়ামিরন, ত্রাভাঙ্কুর রাজাদের মধ্যে বৈরিতা ছিল অপরিসীম। যেসব নৌকো যুদ্ধে ব্যবহার হত, সেগুলর নাম ছিল, উরুম কাপ্পাল। পাটাকাপ্পাল এবং অন্তঃবাহিনীকাপ্পালের মত ডুবো জাহাজের নাম মালায়লম সাহিত্যে উল্লেখ রয়েছে।


তৈরির পদ্ধতি অনুযায়ী নৌযানের বিভাগ

র‍্যাফট বা ক্যাটামেরন
মালাবার থেকে করমন্ডল তট হয়ে বিস্তৃত ওডিশা উপকূল পর্যন্ত ক্যাটামেরন প্রকৃতির জলযানের উপস্থিতি ছিল। কোল্লাম এবং ত্রিভান্দ্রম এলাকায় মৎস্যজীবীরা ক্যাটামেরন ধরনের নৌ যান ব্যাবহার করতেন। এ ছাড়াও পরব সমাজও এধরনের নৌযান ব্যবহার করতেন।

গাছের গুঁড়ি চেঁছে নৌকো
নাম থেকে তার তৈরির পদ্ধতিটি পরিস্কার(যেমন বাঙলায় তালগুঁড়ি চেঁছে নৌকো)। একজনের বসার টোনি থেকে আট জনের বসার জন্য তৈরি ওডামস নামের নৌকো। কেরলের দক্ষিণ থেকে উত্তর অঞ্চলে  আজও ব্যবহার হয়। এধরনের নৌকোর নাম ওরুতাডিভালাম, সিনিভালাম, কারামাডি ভালাম, কাম্বাভালাভালাম, টোনি, ভেপ্পুটোনি, ওডাম, কচিভানসি, চেরুভানসি এবং ভিক্কুটোনি। এই নামগুলো দেওয়া হত কতগুলি গুঁড়ি নিয়ে, কত বড়, কত মানুষ বসত সেই বিষয়টি ধরে। যেমন একটি গুঁড়ি দিয়ে তৈরি নৌকোর নাম ওরুটাডিভাল্লাম, কচুভানসি ছোট নৌকো, যাতে একজন বা দু জন বস্তে পারে। এই নৌকোগুলো বেয়ে খালে, বিলে বা নদিতে মাছ ধরা হয়।

প্লাঙ্ক নৌকো
আজকের কেরলে নদী বা খাঁড়িতে বেশ কিছু সাধারন ধরণের নৌকো দেখা যায়। এগুলো ক্যাটামেরন বা চাঁছা নৌকোর গড়ন, চরিত্র এবং কাজের ব্যাবহার থেকে অনেক আলাদা। এগুলো একইধারে মাছ ধরা, যাত্রী বহন, পণ্য পরিবহণ এবং খেলাধুলোর কাজে ব্যাবহার হয়ে থাকে। প্লাঙ্ক জোড়া হিসেবে এগুলি দুভাগে ভাগ করা হয়।

সেলাই এবং প্লাঙ্ক বিল্ট
প্লাঙ্কগুলি জুড়ে জুড়ে সেলাই করে তৈরি হয় নৌকো। নারকেলের ছোবড়ার সুতো দিয়ে এই জুড়ে সেলাইএর কাজ করা হয়। শেল গুলির মধ্যে রিব ব্যাবহার হয়, কীল এবং প্লাঙ্কের সাপোর্ট দিতে। এধরনের নৌকোর নাম, পাট্টি, কাট্টুভাল্লাম,  চন্দন ভাল্লাম, কোম্বান ভাল্লাম, ভালিয়াভাল্লাম, কারাক্কু ভাল্লাম, কেভু ভাল্লাম, চারাক্কু ভাল্লাম, পাট্টারমাড়ি, কাটাট্টু ভাল্লাম। নামগুলো থেকে পরিস্কার এই নৌকোগুলো কোন কাজে লাগে। যেমন ভালিয়াভাল্লাম মানে বড় নৌকো চারাক্কু ভাল্লাম মালপত্র পরিবহণ করে। পাট্টারমাড়ি, চারাক্কু ভাল্লাম, এবং কেভু ভাল্লামএ কীল এবং অন্য কীলার রয়েছে। অনেক সময় এই নৌকোগুলোকে কেভু ভাল্লাম, এই এক নামে ডাকা হয়। উত্তর মালাবারে পাট্টি খুব চলতি নৌকো। আলেপ্পি জেলায় লম্বা নৌকোর নাম চুন্দান ভাল্লাম। কেরলে ব্যাপক হারে সড়ক পরিবহণ শুরু হওয়ার আগে কেভু ভাল্লাম নৌকো দিয়েই পণ্য পরিবহণ হত। আজও বিল, খাল এবং খাঁড়িতে পণ্য পরিবহনের কাজে এ ধরণের হউক ব্যাপক ভাবে ব্যাবহার হয়। এই নৌকোগুলোর বড় সুবিধে হল প্রচুর পরিমানে পণ্য দ্রব্য বয়ে নিয়ে যেতে পারে। এই নৌকোগুলো এটি বড় হয় যে, এই নৌকোতে অনেকগুলো প্লাঙ্ক থাকে এবং এক একটা প্লাঙ্ক জুড়ে জুড়ে বিভিন্ন ধরণের পন্যের জন্য আলাদা আলাদা কুঠুরি তৈরি করা যায়। যেহেতু এই নৌকোগুলো বহুদিনধরে নদিতে থাকে তাই পুরো নৌকোটিকে নারকেল পাতায় ছেয়ে পন্যগুলকে রক্ষার ব্যবস্থা করা হয়। বড় বাঁশের লগি, কাঝুক্কোল দিয়ে নৌকোটি বাওয়ার ব্যাবস্থা আছে। এধরনের নৌকো ব্যাবহার করে ব্যাবসায়ীরা এক্কেবারে দক্ষিণ মালাবার থেকে কোচিন এবং কালিকট রাজ্যএ ব্যাবসা করতে যেত।
পাট্টীমাড়ি আরও একধরনের বিশাল আকারের পাল তোলা নৌকো, যেগুলি দূর দেশে ভ্রমনের জন্য ব্যবহার হত। আরেক ধরণের নৌকোর নাম পুঝা ভান্সি। এগুলো চাল, গোল মরিচ এবং নারকেল বহনের কাজে ব্যাবহার হত।

নেইলেড এবং প্লাঙ্কড নৌকো
এধরনের নৌকোগুলো সাধারনত সমুদ্রে মাছ ধরার কাজে, ফেরি চলাচলের, পণ্য পরিবহনের কাজে এবং খেলাধুলোর জন্য ব্যবহার হয়ে থাকে। ক্যাম্পাট্টোনি, ক্যাভম,সেম্বকটনি, পিলাইভার বট এবং কিলনেট বট।শুধু বাইচের জন্য ব্যাবহার হয় ইরুট্টুকুট্টি, কোভাল্লাম, পাল্লিয়ডাম, ওড়ি, চুন্দানভাল্লাম। এগুলো নেইলেড নৌকো। প্লাঙ্কসগুলো জোড়া লাগানোর কায়দাটি কিন্তু আলাদা এই নৌকোগুলোয়, যেহেতু এগুলতে নেইল ব্যবহার হয়ে থাকে। নেলগুলো তামা, লোহা, এবং কাঠ দিয়ে তৈরি হয়। ইয়োরোপীয়রা লোহার নেল নিয়ে আসার পরেই এ ধরণের নেল ব্যাবহার হওয়া শুরু হয়েছে। কীল এবং প্ল্যাঙ্কগুলোকে সাপোর্ট দেওয়ার জন্য রিবে নেল ব্যবহার জরুরি।

এটি এবং এর আগের লেখাটি শিপবিল্ডিং অ্যান্ড ন্যাভিগেশন ইন ইন্ডিয়া অ্যান্ড দ্য পর্তুগিজ দিউরিং সিক্সটিন্থ অ্যান্ড সেভেন্টিন্থ সেঞ্চুরিজ – জোসেফ সি সি, থিসিস সাবমিটেদ টু য়ুনিভারসিটি অফ পুদুচ্চেরি থেকে নেওয়া।

Sunday, June 16, 2013

মালাবার উপকূলের নৌবিদ্যা, boat making of malabar coast

মুলতঃ ব্রিটিশ প্রচারে একটা সমীকরণ সারা বিশ্বজুড়ে তৈরি হয়ে ছিল, জ্ঞান মানেই ইয়োরোপ, আর সবাই পাদটীকা। বাংলার পাঠশালে শিক্ষা গ্রহণ করা রামমোহন এবং বিদ্যাসাগর দুজনেই নতুন প্রযুক্তির জন্য পশ্চিমের দিকে হাপিত্যেশ করে নতজানু হয়ে তাকিয়ে রয়েছেন। তারা দুজনেই পূর্বের জ্ঞানচর্চাকে টানমেরে পশ্চিমের পায়ে লুটিয়ে দিতে চাইছেন। দেশের শিকড়ে কুড়ুল মেরে বিদেশের ওপর দেশের নির্ভরতা তৈরির প্রথম কারিগর এই দুই ব্যক্তিত্ব। সেই কাজের প্রাপ্য লভ্যাংশ তাঁরা আজও পেয়ে চলেছেন। আজও তাঁরা প্রথম আধুনিক ভারতীয় রূপে পুজ্য রয়ে গিয়েছেন।
বিদ্যাসাগরের সময় রাজেন্দ্রলাল মিত্র, তার পরে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী অথবা দীনেশচন্দ্র সেন এবং আরও নানান মানুষ বলার চেষ্টা করছেন ভারতের জ্ঞানচর্চা, প্রযুক্তিচর্চার নানান দিকগুলিকে অন্ততঃ শহুরে চোখে ঠুলি বাঁধা ইংরেজি শিক্ষিত মানুষদের সামনে নিয়ে আসার। কিন্তু সবই প্রায় অরণ্যে রোদন হয়েছে। কেননা তাঁরা যা প্রমান করতে চেয়েছেন, তাত্বিকভাবে সে সময়, কোনও ইওরপিয় সেই কথাগুলো বলেননি। তাই তাদের বক্তব্য খুব একটা মান্যতা পায়নি। আজও একটি বৃত্তের বাইরে সেই কাজগুলো নিয়ে প্রশ্ন চিহ্ন ঝুলে রয়েছে। জোসেফ নিডহামের সায়েন্স অ্যান্ড সিভিলাইজেসন প্রকাশের পর থেকেই নতুন করে ভারতের জ্ঞানচর্চার দিকে নজর গেল। যদিও নিডহামের নিজেই ইয়োরোপের প্রযুক্তির প্রাধান্যে খুব মুগ্ধ ছিলেন। চিনা প্রযুক্তির আলোচনায়, জাতপাতভেদ, কেন পূর্বের প্রযুক্তি ধ্বংস হল ইত্যাদি বিষয় অবতারনা করেছেন অসীম ইয়োরোপকেন্দ্রিকতায়। তবুও পূর্বের জ্ঞানচর্চা বা প্রযুক্তিকে নানানভাবে ইয়োরোপের জ্ঞানচর্চা বা প্রযুক্তির বিকাশের পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার এক অজানা পথ খোঁজার কাজ শুরু হল, পূর্বের মানুষদের প্রচেষ্টায়। এই খোঁজে বোঝাগেল যে জ্ঞানচর্চা বা প্রযুক্তিগুলোকে ইউরো-আমেরিকিয় তাত্বিকেরা গ্রিসের ভিত্তি বলে দেখাতে চাইছিলেন, তার অধিকাংশেরই সূত্র কিন্তু গাঁথা রয়েছে পূর্বের দেশগুলোর সঙ্গে, বিশেষ করে ভারতের জ্ঞানচর্চার বিকাশের সঙ্গে। এই বোঝানোর বড় তাত্বিকতা নিজের কাঁধে তুলে নিলেন এডওয়ার্ড সইদ, তাঁর ওরিয়েনটাল-ইজম তত্বে। জানাগেল পশ্চিম যেগুলোকে নিজেদের তৈরি বলে বড়াই করছিল তাঁর অধিকাংশই পূর্ব থেকে পশ্চিমে গিয়েছে। যেমন অঙ্ক। জর্জ জোসেফ অপূর্ব দক্ষতায় ক্রেস্ট অব দ্য পিকক বইতে কেরল অঙ্কের কুড় খুঁজেছেন। বলেছেন নিউটন বা লিবনিৎজ় কলনবিদ্যার জনক নন। এর সূত্র খুঁজে পাওয়া যাবে কেরল-এ নীলকান্তর তন্ত্রসংগ্রহে, জয়স্থদেবের যুক্তিভাষায়, পুতুমানা সোমাইয়াজির করণ পদ্ধতিতে এবং শঙ্করভরনমের সদরত্নমালায়। আর এই অঙ্কবিদ্যার ভিত্তিভূমির ওপর গড়ে উঠেছিল দক্ষিণ ভারতের বিশাল নৌযান তৈরি এবং বাণিজ্যে যাওয়ার গর্বিত ঐতিহ্য। তাত্বিকভাবে নৌযান তৈরির বিদ্যা এবং সমুদ্রযাত্রা পরস্পরের হাত ধরাধরি করে এগিয়েছে। লোথালের ড্রাই ডক থেকে চোল রাজের উদ্যমে সমুদ্র কুনহালি মারাক্কারের যাত্রা ভারতের অদম্য জ্ঞানচর্চা ইতিহাসের দিকে আঙ্গুল দেখায়। ভারতের বহুবিধ সংস্কৃতির মতই, কয়েক সহস্রাব্দধরে এই প্রযুক্তি নানান অঞ্চলে, নিজেদের চাহিদা, উপকরণ, সামর্থ্য ইত্যাদির উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল।
এর আগে আমরা ভারতের করমন্ডল উপকূলের নানান ধরণের নৌকো, তার জ্ঞানচর্চা নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছি। বিশদ আলোচনা হয়েছে রাজা ভোজের নামে চলা যুক্তিকল্পতরু নামক পুঁথির বিষয় এবং আদতে এই পুঁথিটি রাজা ভোজের রচনা কিনা তাই নিয়েও পণ্ডিতদের নানান সংশয় নিয়ে। সেই প্রবন্ধে আমরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে, এই রচনাটি রাজা ভোজের নামে, জনৈক বাঙ্গালী তান্ত্রিকের রচনা, এবং রচনাকাল ভোজ রাজার সময়ের অন্ততঃ তিনশ বছর পরের সময়ের। এই প্রবন্ধে আমরা মালাবার উপকূলের সমুদ্রযান এবং সমুদ্রবিদ্যার বিষয়ে আলোচনা করব। 
একদিকে পাহাড়ি ভুমি অন্যদিকে অনন্ত সাগর – এই নিয়ে মালাবার। সমুদ্রের টানে বহু শত বছর ধরেই এই অঞ্চলের মানুষ সমুদ্রকে ভিত্তি করে তার বেঁচে থাকার উপায় করে নিয়েছিল। আমরা যেন মনেরাখি, মানুষের সমুদ্র ভাবনার শুরু কিন্তু প্রচুর সমুদ্রগামিনী নদী, খাঁড়ি ইত্যাদিতে হাত পকিয়ে। এর পরে সমুদ্রযাত্রার ভাবনা। মালাবারের নাবিকেরা ভারত মহাসাগরের নানান দ্বীপে নিজেদের তৈরি সমুদ্রযান নিয়ে ক্রমশঃই পৌঁছতে শুরু করে। মালাবারের প্রভাব আজও দেখাযাবে লক্ষদ্বীপের নৌযান তৈরির কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে।
প্রথম খ্রিস্টাব্দে পেরিপ্লাস অব দ্য এরিথ্রিয়ান সিতে মালাবার উপকূলের দুটি বন্দর ক্রাঙ্গানোর (মু্যিরিজ) আর পোরাক্কাদু(বারেস)র উল্লেখ রয়েছে। ক্রাঙ্গানোরের সঙ্গে রোমের খুব ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। ভারতের সঙ্গে বানিজ্যকে অক্ষুন্ন রাখতে রোমানরা ক্রাঙ্গানোরে অগাস্টাসের মন্দির উৎসর্গ করে। কেরলের বহু স্থান থেকে প্রচুর রোমের মুদ্রা পাওয়া গিয়েছে। এই ২০০০ বছর ধরে দক্ষিণ ভারতীয়রা পারস্য উপসাগর এবং লোহিত সমুদ্রের আদেন, অরমু্য এবং মোকা বন্দরে তাদের জাহাজ নিয়ে যাত্রা করেছে। মারকো পোলো বলছেন ভারতের জলযান চিনের ফু চাউ পারস্য উপসাগরের হরমুজ বন্দরে যেত। পূর্ব আফ্রিকায় মোজাম্বিকের উপকূলে বহু বণিকের কর্মকাণ্ড লক্ষ করেছেন ভাস্কো ডাগামা। মোম্বাসা আর মেলিন্দ পনহোতে বহু গুজরাতি ব্যাবসায়ি ব্যাবসা করতে যেতেন। বহু দেশের নাবিকেরা ভারতীয়দের সঙ্গে কথা বলে এই দক্ষতা অর্জন করার চেষ্টা করতেন। তাদের অপূর্ব দক্ষতার জন্য তাদের সংগে তুলনা চলত ভেনিস এবং জেনোয়ার নাবিকদের (যদিও ইওরপিয় নাবিকদের মত ভারতীয়রা, কোনও একটি দেশ - ভারত, খুঁজতে গিয়ে আরেকটি দেশ - আমেরিকা বা ওয়েস্ট ইন্ডিজ আবিষ্কার করেন নি)।
চের রাজার নাবিকেরা ব্যবসা করতে যেতেন কালিকট, কদুঙ্গাল্লুর, কোল্লমের মত পূর্ব পশ্চিম উভয় উপকুলের বন্দর থেকে। ইবন বতুতা বলছেন আদেন বন্দরে ভারতীয়দের স্থায়ী বসতি ছিল এরা থানা এবং কুইলন থেকে প্রায়শঃই যাত্রা করতেন। থোম পাইরেজের মালাবার উপকূলে ৪০০টি সমুদ্রগামী জাহাজ ছিল, এরা ক্যাম্বে, করমন্দল, শ্রীলংকা এবং মলদ্বীপে ব্যবসা করত। বলোনার লুদভিকো ডি ভারথেমার লেখায় মালাবারের ব্যবসায়িদের, মালাবার থেকে পারস্য উপসাগরে ব্যবসার বর্ণনা রয়েছে। রোম থেকে পূর্ব আফ্রিকার উপকূল থেকে পারস্য উপসাগর এবং লোহিত সাগরে ভারতীয় ব্যাবসায়িদের সমুদ্র যাত্রা বিশ্বজোড়া বিপুল ব্যবসার দিকে ইঙ্গিত করে। অর্থাৎ পতুগিজ বণিকদের(না খুনি) ভারত পদার্পণের বহু সহস্র বছর আগে থেকে ভারতীয়রা বিশ্বজুড়ে ব্যাবসা করেছে। ঔপনিবেশিক সময় থেকে ইয়োরোপীয় বিদ্বানরা প্রমান করতে চাইতেন ভারতের সমুদ্র যাত্রার শিক্ষা পর্তুগিজদের থেকে হয়েছে। অথচ পর্তুগিজ নাবিকেরা ভারতে এসে নতুন সমুদ্রবিদ্যার সন্ধান পাচ্ছেন।
মালাবার উপকূলের সমুদ্রবিদ্যা চর্চার প্রমান লক্ষদ্বীপের নানান পুঁথিতে রয়েছে। নাবিকদের লেখা রহমানি আর রোজনামায় ভারতের নানান উপকূলভূমির বর্ণনা পাওয়াযায়। আরবু-তামিল, আরবু-মালায়লম ভাষায় প্রচুর পুঁথি আজও মালাবার উপকূলের নানান স্থানে পাওয়া যার। পুঁথিগুলো যদিও এই দুই ভাষায় লেখা, কিন্তু লিপি আরবি অক্ষরে। লক্ষদ্বীপ সোসিও-কালচারাল সোসাইটি লক্ষদ্বীপ নাবিকাশাস্ত্র পরম্পারায়মে এ ধরণের বহু পুঁথি প্রকাশি করেছে। মাস্তিন সেখ, আলিয়ার থাঙ্গল আর তাপ্পু কান্নাকুর তিনটি পুঁথি পাওয়া গিয়েছে। এতে সমুদ্র যাত্রায় আকাশ, বাতাস, খারাপ আবহাওয়া, তারা, এবং নৌ যাত্রার জন্য কন্সটেলেশন, অক্ষাংশ-দ্রাঘিমাংশ, বন্দরের স্থান, মরশুম, যাত্রা শুরুর তারিখ ইত্যাদির বিশদ বর্ণনা রয়েছে। 

ভারত সমুদ্রে নৌ যাত্রার জন্য নানান ধরণের জাহাজ তৈরি করা হত। কোন ধরণের জলে, কোন ধরণের বানিজ্য দ্রব্য, কোন আবহাওয়ায় যাত্রা হবে, এই সব বিচার করে জাহাজ তৈরি হত। ক্যাম্বে উপসাগরের উত্তাল সমুদ্রের জন্য নানান ধরণের জাহাজ তৈরি হত। এদের নাম দেওয়া হত বালাম, বাঘলা, কতিয়া, গালিবাত, গ্রাব, পাত্তামার ইত্যাদি।  ১৫০০সালের পরে ভারত মহাসাগরে নতুন ধরণের জাহাজ তৈরি হওয়া শুরু হল। গুজরাট আর মালাবারে এগুলোকে কোটিয়া নামে আর পারস্য উপসাগরে এগুলো বাঘলা নামে চিহ্নিত হত। ভারতের পশ্চিম উপকূলের সমুদ্র আর জাহাজ শিল্প অনেকটা ইসলামের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে। অনেকগুলি সাধারন হাল(common hull) ডিজ়াইন করা হত এবং এতে অনেকগুলো লাতিন সেল(lateen sail)। নৌযান তৈরিতেএই হালগুলির বিশদ ডিটেল আঁকা জরুরি ছিল, নয়ত হাওয়া নিয়ন্ত্রণ(পক্ষে বা বিপক্ষে) বা সমুদ্র স্রোত নিয়ন্ত্রণ করা যেমন কঠিন হত তেমনি জাহাজের যাত্রীদের অবস্থাও শোচনীয় হয়ে পড়ত। পর্তুগিজ আমলের আগে মুলতঃ জাহাজগুলোর মালিক কারিমি ব্যবসায়িরা ছিল। এই জাহাজগুলো প্রধানতঃ লোহিত সাগর এবং ভারতের মধ্যে চলাচল করত। এই জাহাজে সশস্ত্র যোদ্ধা নিয়োজিত থাকত জলদস্যুদের মোকাবিলার জন্য। 
এর পরের লেখটি হবে নৌকোগুলোর বিভাগ বর্ণনা।