Showing posts with label জালালাবাদের লড়াই. Show all posts
Showing posts with label জালালাবাদের লড়াই. Show all posts

Wednesday, September 25, 2013

আজও প্রীতিলতারা জেগে থাকেন, The Dreams of Pritilata Still Alive and Kicking

আগের পোস্টের লেখাটি পেয়েছি কনক বর্মনের ফেবু থেকে।  

এবারে আমার কিছু কথা।

আমার মামাতো বোন বুলি যখন একুশ , কলকাতায় মহাবিদ্যালয়ে পড়ত, দেখতে সে ঠিক ছিল যেন প্রীতিলতা। প্রীতিলতা বিষয়ে বুকের ভেতরের জমে থাকা কয়েকটা কথা বলার আগে একটি তথ্য বলে নিই। 

নবম শ্রেণীতে পড়ার সময়ে প্রীতিলতাকে নিয়ে লেখা অমর শহীদ বিষয়ে একটা লেখা করেছিলাম। অনেককে ছেড়ে প্রীতিলতা কেন? জেনেছিলাম, প্রীতিলতা আত্মহত্মা করেছিলেন এই নয় যে তিনি গোরাদের লাঞ্ছনা এড়াতে চাইছিলেন। তিনি বিশ্বকে জানাতে চাইছিলেন যে বাংলার শহরের মেয়েরাও এনকউন্টারের যুদ্ধে যথেষ্ট পারদর্শী এবং সফল হতেও জানে। বাংলার গ্রামের মেয়েরা তার আগের দেড়শ বছর, পলাশীর পর থেকে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে জান বাজি রেখে লড়ছেন। প্রীতিলতা জালালাবাদের যুদ্ধ শেষে অক্ষত দেহে থেকে গেলে বিপ্লব-পাগল মধ্যবিত্ত বাঙ্গালিরা সেই সত্যে বিশ্বাস নাও করতে পারত হয়ত। তিনি প্রাণ দিয়ে বুঝিয়ে গিয়েছিলেন অকম্পিত চরিত্র, অবুঝ অসমঝোতার দেশপ্রেম, নিজের, দশের বা ন্যুনতম নিজের গোষ্ঠীর তৈরি করা দুর্দম স্বপ্নের মালা গাঁথা মানুষেরাও নিজেদের কাজ সফলভাবে সম্পাদন করেও ঠাণ্ডা মাথায় মরতে জানেন। 

মহীয়সী নারী কথাটি আজ বহু ব্যবহারে দীর্ন, জীর্ন। সে তার সৌরভ হারিয়েছে প্রায় চিরতরে। কিন্তু প্রীতিলতাদের সম্বন্ধে আর অন্য কোনও শব্দ বোধহয় ব্যবহার করা যায় না। ক্ষুদিরামের আত্মদানের পর, বাংলার শহুরে সমাজে এটি যে কত বড় ঘটনা, আজ এই বিশ্বায়নের সরকারি-বেসরকারি লুঠের মুখে দাঁড়িয়ে ,হয়ত আমরা বুঝব না। আমাদেরই মধ্যে অনেকেই সেই লুঠের ভাগীদার যে। আজ প্রীতিলতাদের স্বপ্ন সব সরকারি চাকরি, সরকারি প্রকল্প আর কর্পোরেটদের সিন্দুকে লুকিয়েছে। 

অন্ততঃ এই ভারতীয় বাংলায় ক্ষুদিরাম এখন ব্যঙ্গাত্মক শব্দ। প্রীতিলতারও অনেক আগে কলকাতার দেশপ্রেমী মধ্যবিত্তের সমস্ত ক্রুরতা উপেক্ষা করে চুপ থেকে ছিলেন কলকাতার বাইরে থেকে আসা ক্ষুদিরাম। ফাঁসির দড়ি পরা প্রায়-নিশ্চিত হয়েগিয়েছে, ক্ষুদিরাম প্রতিশোধ নিতে, তার বড় নেতাদের ব্রিটিশ পুলিশের(হায় সেখানেও চাকরি করছেন বাংলার মানুষই) কাছে নানান গোপন তথ্য প্রকাশ করে ফাঁসিয়ে দিতে পারেন, এই ভয় ছড়িয়ে পড়েছিল কলকাতার বিপ্লবী সমাজের মাথাজুড়ে। ক্ষুদিরাম তার নিজের পক্ষ, বিপক্ষের নানান ছল, প্ররোচনা উপেক্ষা করেই নির্বিকল্প চিত্তে প্রাণ দিয়েছিলেন।

ক্ষুদিরাম, প্রীতিলতারা নিজেদের তৈরি করেছিলেন অধরা এক স্বপ্ন বাস্তব করতে। তারা পারেন নি, কিন্তু বীজ পুঁতে গিয়েছিলেন। তার পরের প্রজন্ম আঞ্জলিভরে পেয়েছিল সেই ব্যাপ্ত সুযোগ। কিন্তু সেই পড়ে পাওয়া চৌদ্দ আনা স্বপ্ন লুঠ হতে বসেছে রাষ্ট্রব্যবস্থার কর্নধারদের আত্মসমর্পনে। বিদেশের ঠাকুর পুজোর কাছা খোলা প্রতিযোগিতায় উদ্বাহু নৃত্যবান তারা।

তবুও প্রীতিলতাদের স্বপ্ন সফল করতে আজও হাজারে হাজারে মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়েন মাঠে ময়দানে, বন্দুকের সামনে, কর্পোরেট-রাষ্ট্রের উদ্যত তর্জনীর সামনে বুক চিতিয়ে। 



তাদের জন্য বাংলার গ্রাম-শিল্পীদের পক্ষ থেকে রইল, ক্ষুদিরাম-প্রীতিলতাদের স্বপ্নভরা দুর্মদ সম্মান, ভালবাসা, প্রণাম।

Tuesday, September 24, 2013

প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, Pritilata Waddedar



বয়স কত? একুশ। পরনে মালকোঁচা ধুতি। মাথায় গৈরিক পাগড়ি, গায়ে লাল ব্যাজ লাগানো শার্ট। ইনিই দলনেতা। এক হাতে রিভলবার, অন্য হাতে হাতবোমা। দলের সদস্যসংখ্যা সাত। সবার পরনে রাবার সোলের কাপড়ের জুতো। সবাই প্রস্তুত। দলনেতার মুখে ‘চার্জ’ শুনতেই সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ল শত্রুর ওপর। তারা তখন ক্লাবে মত্ত নাচ-গানে। পিকরিক অ্যাসিডে তৈরি বোমাটি বর্জ্রের মতো ভয়ংকর শব্দে ফেটে পড়ল; হলঘরে তখন শুধু ধোঁয়া। দলনেতাই এগিয়ে গেল সবার আগে। অথচ এটাই তার প্রথম অভিযান। বোমার বিস্ফোরণ, গুলির শব্দ, শত্রুর মরণ চিত্কার—সব মিলে এলাকাটা যেন পরিণত হলো এক দক্ষযজ্ঞে!
এটা কোনো অ্যাডভেঞ্চার ফিল্মের দৃশ্য নয়। এটি ইতিহাসের এক অনন্য ঘটনা। আমরা আরও রোমাঞ্চিত হই—যখন জানি, ২১ বছরের সেই দলনেতা পুরুষ বেশে একজন নারী! বাংলাদেশেরই নারী! নাম প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার।
১৯৩২ সাল। যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সেই বাঙালি নারী। তত্কালীন বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিধর রাষ্ট্র ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে। পরাক্রমশালী ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন ‘প্রীতিলতা’। আত্মদান করে প্রমাণ করেছেন, মেয়েরাও পারে মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য জীবন উত্সর্গ করতে।
১৯১১ সালের ৫ মে, মঙ্গলবার প্রীতিলতার জন্ম। মা প্রতিভা দেবী। বাবার নাম জগদ্বন্ধু ওয়াদ্দেদার। তিনি মিউনিসিপ্যালিটির হেড ক্লার্ক। ছয় ভাইবোনের মধ্যে দ্বিতীয় ছিলেন প্রীতিলতা। মা আদর করে ডাকতেন রানী বলে। ছাত্রী হিসেবে ঝলমলে সব রেকর্ড। ১৯২৭ সালে চট্টগ্রামের খাস্তগীর উচ্চবিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে প্রবেশিকা পরীক্ষায় পাস করেন এবং ভর্তি হন ঢাকার ইডেন কলেজে। ১৯২৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মহিলাদের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করে আইএ পাস করেন। পরে কলকাতায় গিয়ে বেথুন কলেজে ভর্তি হন। ১৯৩২ সালে চট্টগ্রামে ফিরে নন্দনকানন বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা পদ গ্রহণ করেন। ছোটবেলায় যখন দাদা পূর্ণেন্দুর দেওয়া বইয়ে ‘ক্ষুদিরামের ফাঁসির’ কথা পড়তেন, তখন ভাবতেন এও কি সম্ভব! মনে তাঁর প্রশ্ন জাগে, আমরা মেয়েরা কি এঁদের মতো হতে পারি না?
বেথুন কলেজে পড়ার সময় ‘দিপালী সংঘের’ সঙ্গে পরিচয়। সংঘের দিদিদের দেওয়া বইয়ের প্রচ্ছদে ছিন্ন লালপাড়ের শাড়ি পরা এক শৃঙ্খলিত নারীর ছবি। নিচে লেখা ‘ভাঙ্গনের পালা শুরু হল আজি, ভাঙ্গ ভাঙ্গ শৃঙ্খল।’ এ বই পড়েই উত্তেজিত প্রীতিলতা। তিনিও ভাঙতে চান ব্রিটিশদের শৃঙ্খল। কিন্তু পথ খুঁজে পান না। একদিন পত্রিকায় খবর হয়, ‘চাঁদপুর স্টেশনের ইন্সপেক্টরের’ হত্যাকারী দুই বাঙালি যুবক গ্রেপ্তার। তাঁদের নাম রামকৃষ্ণ বিশ্বাস ও কালিপদ চক্রবর্তী। প্রীতিলতার সঙ্গে রামকৃষ্ণের পরিচয় ছিল না। নিজেকে বোন পরিচয় দিয়ে জেলের ভেতর ৪০ বারের মতো রামকৃষ্ণের সঙ্গে দেখা করেন প্রীতিলতা। তাঁর মুখেই শোনেন সূর্য সেনের দৃঢ়চরিত্র ও বীরত্বের কথা। দাদা রামকৃষ্ণের কাছেও প্রীতির একই প্রশ্ন, ‘আমরা মেয়েরা কি তোমাদের মতো হতে পারি না, দাদা?’
১৯৩২ সালের মে মাসে রানীর জীবনে এল সেই স্মরণীয় দিন। জীর্ণ এক ঘরের কোনায় জ্বলছিল একটি প্রদীপ। ঘরের এক পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন ‘মাস্টারদা’। সেই প্রথম দেখা মাস্টারদার সঙ্গে। এমন সময় ব্রিটিশ সৈন্যরা বাড়িটি ঘিরে ফেলে। শুরু হয় দুই দিক থেকে গুলি চালাচালি। সে যুদ্ধে প্রাণ দেন বিপ্লবী নির্মল সেন ও অপূর্ব সেন। সূর্য সেন প্রীতিলতাকে নিয়ে বাড়ির পাশে ডোবার পানিতে ও গাছের আড়ালে লুকিয়ে থাকেন। সৈন্যরা চলে যাওয়ার পর মাস্টারদা বলেন, ‘প্রীতি, তুমি বাড়ি ফিরে গিয়ে স্কুলের কাজে যোগ দেবে, তাহলে গত রাতের ঘটনায় কেউ তোমাকে সন্দেহ করবে না।’ ধলঘাটের সেই যুদ্ধে ব্রিটিশ ক্যাপ্টেন ক্যামারুনও নিহত হন।
মাস্টারদা উপলব্ধি করতে লাগলেন মেয়েরাও দেশের জন্য যুদ্ধ করতে পারে। এর আগে সশস্ত্র সংগ্রামে গুটিকয় মেয়ে কর্মী ছিল। কিন্তু এদের কাজ ছিল বিপ্লবীদের খবর আদান-প্রদান, অস্ত্রশস্ত্র জমা রাখা, চাঁদা তোলা এবং বিপ্লবীদের আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা। সামনাসামনি অস্ত্র হাতে শত্রুদের সঙ্গে লড়াই করেনি। সূর্য সেন সিদ্ধান্ত নেন ইউরোপীয় ক্লাব আক্রমণে নেতৃত্ব দেবে ‘প্রীতিলতা’।
শুরু হয়ে গেল প্রস্তুতি। সাতজনের দলে দলনেতা প্রীতিলতা ছাড়াও ছিলেন—বিপ্লবী কালীকিংকর, শান্তি, সুশীল, মহেন্দ্র, বীরেশ্বর, প্রফুল্ল ও পান্না। অভিযানের আগে পড়া হলো ইশতেহার। মাস্টারদা বললেন, ‘জালিয়ানওয়ালাবাগের রক্তঋণ, ওদের রক্ত দিয়েই আজ শোধ করতে হবে। এ দায়িত্ব তোমাদের। সবাই দেখবে অপমানে জবাব দিতে আমরা আর পিছিয়ে থাকব না।’
১৯৩২ সাল। ২৪ সেপ্টেম্বর। ইউরোপীয় ক্লাব থেকে বিপ্লবীদের সংকেত পাওয়ার পর, প্রীতিলতার নেতৃত্বে সাতজন তরুণ ঝাঁপিয়ে পড়লেন ইংরেজদের ওপর। সফল(!) হলো বিপ্লবীদের অভিযান। সকলেই নিরাপদে ফিরে এলেন, ফিরে এলেন না দলনেতা প্রীতিলতা। ধরা পড়ার অপমান ঠেকাতে ‘পটাশিয়াম সায়ানাইড’ খেয়ে আত্মদান করলেন। পরের দিন পুলিশ ক্লাবের পাশে পড়ে থাকা লাশকে পুরুষ ভেবেছিল। কিন্তু মাথার পাগড়ি খুলে লম্বা চুল দেখে শুধু ব্রিটিশ পুলিশ নয়, গোটা ব্রিটিশ সরকারই নড়েচড়ে উঠল। আলোড়িত হলো গোটা ভারতবাসী।
যাওয়ার আগে মায়ের কাছে চিঠি লেখেন প্রীতি, ‘মাগো, অমন করে কেঁদোনা! আমি যে সত্যের জন্য, স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দিতে এসেছি, তুমি কি তাতে আনন্দ পাও না? কী করব মা? দেশ যে পরাধীন! দেশবাসী বিদেশির অত্যাচারে জর্জরিত! দেশমাতৃকা যে শৃঙ্খলভাবে অবনতা, লাঞ্ছিতা, অবমানিতা!
তুমি কি সবই নীরবে সহ্য করবে মা? একটি সন্তানকেও কি তুমি মুক্তির জন্য উত্সর্গ করতে পারবে না? তুমি কি কেবলই কাঁদবে?’

২৪ সেপ্টেম্বর, মহান এই বিপ্লবীর ৮১তম আত্নাহতি দিবস। বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি মহান বিপ্লবী প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের প্রতি।