Showing posts with label জাফরখানি ব্যবস্থার পটভূমিকা. Show all posts
Showing posts with label জাফরখানি ব্যবস্থার পটভূমিকা. Show all posts

Tuesday, March 26, 2019

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা৩ - পলাশীপূর্ব রাজস্ব ব্যবস্থা - জাফরখানি ব্যবস্থার পটভূমিকা

(এর আগে বাংলার জমিদারির আদায় নিয়ে আলোচনা করেছি আমার পলাশীর পূর্বে বাংলার ৫০ বছর বইতে। বইটির দ্বিতীয় খণ্ডের ভাবনা ভাবছি। জমি আর রাজস্ব ব্যবস্থা প্রথন খণ্ডে আলোচিত হয় নি। তাই এখানে ছুঁয়ে যাচ্ছি জাফরখানি ব্যবস্থার পটভূমিকা। কয়েক কিস্তিতে আলোচনা করব জাফরখানি ব্যবস্থা কেন আলাদা ছিল মুঘল শাসন থেকে। এটি মূলত নরেন্দ্র কৃষ্ণ সিংহর দ্য ইকনমিক হিস্ট্রি অব বেঙ্গল আর রমেশ দত্তর দ্য ইকনমিক হিস্ট্রি অব ইন্ডিয়া আরও বেশ কিছু বইএর অবলম্বনে তৈরি হয়েছে। এখানে বিশদে লেখার সুযোগ নেই - তাই পটভূমি আলোচনা। বিশদে থাকবে বইতে - বিশ্বেন্দু}
এর জন্য অবশ্য সরকার থেকে তাদের বেতন দেওয়া হত। অনেক সময় এই বেতন দেওয়া হত নগদ টাকায়। এই সব মনসবদারকে বলা হত ‘মনসব-ই-নগদি’। কিন্তু অধিকাংশ সময় রাষ্ট্র নগদ বেতনের পরিবর্তে জমি দেওয়া হত এবং পদমর্যাদা অনুযায়ী জমি থেকে প্রাপ্ত আয় ছিল তাদের বেতনের সমতুল। এই যে তাকে নির্দিষ্ট একটি ভূখন্ড ব্যয় নির্বাহের জন্যে দেওয়া হল একে জায়গির বলা হত। জায়গির পেতে হলে নিয়োগের মত আরেকটি দপ্তরে আরেকটি দীর্ঘ আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে তাকে যেতে হত। যারা জমি থেকে রোজগার করত, তারা ছিল একই সঙ্গে মনসবদার এবং জায়গিরদার। তবে জমির উপর মনসবদারদের অবশ্য কোন চিরস্থায়ী অধিকার বা মালিকানা থাকত না এবং চাকরির শর্ত অনুযায়ী তারা এক জায়গির থেকে অন্য জায়গিরে বদলি হত। মনসবদারদের নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি, অপসারণ এর সবকিছুই নির্ভর করত সম্রাটের মর্জির উপর। মনসবদারদের পুত্র সবসময় মনসবদার হতে পারত না, যদিও যোগ্যতা থাকলে পিতার স্থালাভিষিক্ত হতে বাধা থাকত না। এই ব্যবস্থার কার্যকারিতা সবটাই নির্ভর করত সম্রাটের দক্ষতা ও যোগ্যতা আর নিয়ন্ত্রণের ওপর। মনসবদারদের কঠোর নিয়ন্ত্রণে না রাখতে পারলে বা তারা বিদ্রোহ করলে, সৈনিকরা সম্রাটের পক্ষে যুদ্ধ না করে মনসবদারের পক্ষ নিত ; কারণ তাদের কাছে তিনিই ছিলেন কাছের মানুষ । সম্রাটকে তারা চিনত না। সেই জন্যে বাদশাহী নির্দিষ্ট মনসবদার পদের আর সওয়ারের মনসবদার না হলে ফৌজদার পদ দেওয়া হত না।
সমস্যা দাঁড়াল আওরঙ্গজেবের সময়। দাক্ষিণাত্যে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ করতে তার বিশাল এনা বাহিনীর দরকার ছিল। ফলে জায়গিরদারদের সংখ্যা গুণোত্তর হারে বাড়তে থাকে। এই অবস্থা বাংলায় দেখলেন মুর্শিদকুলি। এর আগেও বলেছি, বাদশাহী শাসন ব্যবস্থা তাঁর সময়ে প্রভূতভাবে পরিবর্তিত হল। মুর্শিদকুলিকে আওরঙ্গজেব বাংলা শাসনের পুরপুরি স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। মুর্শিদকুলি সেই স্বাধীনতাকে অবলম্বন করে বাংলা শাসন ব্যবস্থাকে নিজের মত করে ঢেলে সাজালেন। দাক্ষিণাত্যে আওরঙ্গজেব দেখলেন দীর্ঘকালের নানান ঘাতপ্রতিঘাতে গড়ে ওঠা মুঘল শাসন ঐতিহ্যকে ভেঙ্গে ফেলছেন তার প্রিয় মুর্শিদকুলি। তিনি নিরূপায়। কিন্তু বাংলার প্রশাসন সাজাবার কাজটা মুর্শিদকুলি করতে পারলেন কারণ সে সময় উপমহাদেশে নতুন এক অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। দাক্ষিণাত্যে যুদ্ধে ব্যস্ত এবং আর্থিক টানাটানিতে জেরবার আওরঙ্গজেব তার প্রিয়পাত্রের কাজে বাধা দিতে পারেন নি। আর ১৭০৭ সালে আওরঙ্গজেবের মৃত্যর পর দিল্লির সিংহাসন দখলের যে লড়াই চলল তাতে মুর্শিদকুলির ব্যতিক্রমী কাজ করার স্বাধীনতা আরও বৃদ্ধি পেল।
বাংলা-বিহার-ওডিসার শাসক হিসেবে মুর্শিদকুলি ফিবতসর বাদশাহীর দাবি মত রাজস্ব পাঠিয়ে একটা নতুন রাজনৈতিক অবস্থার সৃষ্টি করলেন বাংলায়। তার আগে পর্যন্ত সাম্রাজ্যজুড়ে মনসবদার নিয়োগ, অপয়ারণ, উন্নতি ইত্যাদি নিয়ন্ত্রিত হত দিল্লি থেকে। মুর্শিদকুলি আসার কিছু বছর আগে মামা শায়েস্তা খান বদলি হওয়ার পর বহু নবাব এসেছেন আবার বদলিও হয়ে গিয়েছেন। কিন্তু বাংলা সুবায় আওরঙ্গজেব মুর্শিদিকুলিকে খোলা হাতে শাসন চালানো অধিকার অঙ্গীকার করায় মুর্শিদকুলি দেখলেন পাদশার নাতি আজিমুশ্বানের দুর্নীতিতে দেওয়ান চোখ বন্ধ করে আছেন। তিনি নিজের মত করে প্রশাসন চালিয়ে বেশ কিছু রাজস্ব বাড়িয়ে আওরঙ্গজেবকে পাঠিয়ে পাদশাহকে খুশি করলেন। শোভা সিংহ, হিম্মত সিংহ এবং চন্দ্রকোণার রাজার বিদ্রোহ দমন করে তিনি পাদশাহকে আরও খুশি করলেন। ১৭০৩ সালে তিনি রুখে দাঁড়ানোয় আজিমুশ্বান পাটনা পালালেন। আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর তার অবস্থান একটু নড়বড়ে হয়ে যায়। তাকে বাংলা থেকেও সরিয়ে দেওয়া হয়। তিনি নগদি সেনাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেও নতুন দেওয়ান জায়াউল্লা খাঁ নগদী সৈন্যের হাতে খুন হলেন। ১৭১০ সালের শীতে তাকে আবার বাংলায় ফেরত আনা হল তিনহাজারি মনসবদার হিসেবে।
১৭১৩য় ফারুখশিয়র নতুন মুঘল পাদসা হলে তিনি উপদেওয়ান হলেন। সিংহাসন দখলের লড়াইতে তিনি ফারুখশিয়রের বিরোধিতা করেছিলেন। কিন্তু তিনি ফিবছর প্রচুর অঙ্কের রাজস্ব পাঠাতেন বলে তাকে কোনও সম্রাটই ঘাঁটতে সাহস পায় নি। ১৭১৭য় উপদেওয়ান সুবাদার হলেন।
তিনি আজমুশ্বান তার ভয়ে পালিয়ে যাওয়ায় তিনি দেওয়ানি আর ফৌজদারি দুই বিভাগ সামলাতে লাগলেন – যা মুঘল আমলে অচিন্ত্যনীয় ছিল। ফলে নিজামত আর দেওয়ানির পার্থক্য মুছে গেল। বাংলার নবাবেরা এক দিকে নিজামত অন্য দিকে নাজিম নিয়ন্ত্রণ করায় মোঘল অভিজাতদের এই সুবায় কাজ পাওয়ার সুযোগ কমে এল। নবাবেরা সাত হাজারি মনসবদার হয়ে প্রধান ওমরাহের অন্তর্ভূক্ত হলেন, কিন্তু সরকারি আমলা অভিজাতদের নিয়োগ আর পদোন্নতি দিল্লি থেকে সরাসরি প্রথমে ঢাকা পরে মুর্শিদাবাদে চলে আসায় বাংলার মনসবদারেরা দিল্লির ক্ষমতার প্রসাদ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে দুর্বল হতে শুরু করল। মুর্শিদকুলি তার মত করে মনসবদার, ব্যাঙ্কার এবং জমিদারদের নিয়ে নতুন ক্ষমতাকেন্দ্র হয়ে উঠলেন এবং বাংলাকে নতুনভাবে চালাবার উদ্যম নিলেন।

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা২ - পলাশীপূর্ব রাজস্ব ব্যবস্থা - জাফরখানি ব্যবস্থার পটভূমিকা

(এর আগে বাংলার জমিদারির আদায় নিয়ে আলোচনা করেছি আমার পলাশীর পূর্বে বাংলার ৫০ বছর বইতে। বইটির দ্বিতীয় খণ্ডের ভাবনা ভাবছি। জমি আর রাজস্ব ব্যবস্থা প্রথন খণ্ডে আলোচিত হয় নি। তাই এখানে ছুঁয়ে যাচ্ছি জাফরখানি ব্যবস্থার পটভূমিকা। কয়েক কিস্তিতে আলোচনা করব জাফরখানি ব্যবস্থা কেন আলাদা ছিল মুঘল শাসন থেকে। এটি মূলত নরেন্দ্র কৃষ্ণ সিংহর দ্য ইকনমিক হিস্ট্রি অব বেঙ্গল আর রমেশ দত্তর দ্য ইকনমিক হিস্ট্রি অব ইন্ডিয়া আরও বেশ কিছু বইএর অবলম্বনে তৈরি হয়েছে। এখানে বিশদে লেখার সুযোগ নেই - তাই পটভূমি আলোচনা। বিশদে থাকবে বইতে - বিশ্বেন্দু}

এই ছিল বাদশাহী আমলের কাঠামো। আমরা প্রথম খণ্ডেও দেখেছি, ইয়েলকোণ্ডার প্রশাসক, প্রশাসনবেত্তা ফৌজদার মহম্মদ হাজি, যিনি পরে মুর্শিদকুলি খাঁ নামে পরিচিত হবেন, বাংলায় পাঠিয়েছিলেন যতটা পারা যায় সুবা বাংলা থেকে রাজস্ব আদায় করে তাঁকে দাক্ষিণাত্যে পাঠাতে। মুর্শিদকুলির প্রশাসনিক সমস্ত দাবি তিনি মেনে নিয়েছিলেন। এমনকি নিজের আত্মীয়দের তীব্র তিরষ্কার করেছিলেন মুর্শিদকুলির বিরোধিতা করার জন্যে। এবং তার সারা জীবন তিনি কার্যত স্বাধীনভাবে রাজত্ব চালিয়েও মুঘল সাম্রাজ্যের বশ্যতা স্বীকার করে প্রতি বছর নিয়ম করেও দিল্লিতে রাজস্ব পাঠিয়ে গিয়েছেন। এমন কি আওরঙ্গজেবের এন্তেকালের পর এ সিংহাসনের লড়াই দেখা দেয়, সে সময়ও তিনি স্বাধীনতা ঘোষণা করেন নি।
বাংলায় এসে মুর্শিদকুলি খাঁর প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল রাজস্ব বৃদ্ধি। সেই উদ্বৃত্ত রাজস্ব তার অন্নদাতা আওরঙ্গজেবের তহবিলে পাঠানো। তিনি বাংলায় প্রশাসন সামলে দেখলেন তহবিলে রাজস্ব বাড়াবার উপায় নেই। দাক্ষিণাত্যে উদ্বৃত্ত পাঠাবার কথা তো দূরস্থান, বাংলায় নবাবি চালানোর মত উদ্বৃত্তও তৈরি হচ্ছে না। মুর্শিদকুলি নিজে কৃচ্ছসাধন করার মত মানুষ। জাঁকজমক আতিশয্যে তাঁর খুব বেশি আকর্ষণ ছিল না – ফলে রাজস্ব বৃদ্ধি তাঁর নিজের ভোগের জন্যে নয় এটা পরিষ্কার। তিনি দেখলেন, বাংলা সুবার অধিকাংশ কৃষিযোগ্য জমি জায়গিরদারদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। এগুলি জায়গিরদারদের রোজগার।
এমতাবস্থায় খুব সরল করে এই সময়ের বাংলার অর্থ সমস্যার রূপ এবং তার কারণটা বুঝে নেওয়া যাক। মুঘল রাজত্ব সামরিক শক্তির জন্য মনসবদের উপর নির্ভরশীল ছিল। মুর্শিদকুলি খাঁ যখন বাংলায় এলেন তখন পরিপূর্ণ মুঘল প্রাসনিক ব্যবাস্থা। মুঘল প্রাসনিক ব্যবস্থার একক সেনাবাহিনী বলছেন যদুনাথ সরকার, দ্য মুঘল এডমিনিস্ট্রেসনএ। ‘মনসব’ কথাটির অর্থ হল পদ। কোন নির্দিষ্ট পদ বা মনসবের অধিকারকে বলা হত মনসবদার। মনসবদাররা মূলত সামরিক দায়দায়িত্ব পালন করলেও সামরিক ও বেসামরিক উভয় দায়িত্বই তাদের পালন করতে হত। জে জে এল গোমানস Mughal Warfare: Indian Frontiers and Highroads to Empire 1500–1700 বইএর ৮৪ পাতায় মনসবদারিকে সংজ্ঞায়িত করতে গিয়ে বলছেন In practice, every candidate for mansab needed the political and, as we shall see, financial backing of an already influential, high-ranking patron at court. The latter introduced the candidate and proposed a rank to the emperor, sometimes through the Mir Bakhshi, the main recruitment officer. After a personal assessment in public audience by the emperor, who was reportedly able to see ‘through men at the first glance’, the candidate received a fitting mansab to be followed by a lengthy bureaucratic procedure of registration and confirmation. Invested with dignity and nobility, the new mansabdar was now responsible for the enrolment and the equipment of a number of mounted retainers in accordance with his rank, mostly to be paid from jagirs for which he entered into another elaborate selection procedure involving another set of rules controlled by different officials. Thus an important element of the mansabdar’s quality was his function as a kind of military employment agency.
মনসবদার এমন এক পদাধিকারী, যার মুঘল দরবারে কোন না কোন প্রভাবশালী অভিজাতর সঙ্গে যোগাযোগ আছে এবং তাকে অবশ্যই আর্থিকভাবে স্বচ্ছল হতে হবে। সেই দরবারি অভিজাত তাকে অর্থ দপ্তরের মীর বক্সীর মাধ্যমে দরবারে পাদসাহের পরিচিতি করান। এবার সম্রাট তার সর্বসমক্ষে পরীক্ষা নিয়ে স্থির করতেন এই ব্যক্তিটি কত পরিমান মনসবদারির যোগ্য। যদুনাথ সরকার, দ্য মুঘল এডমিনিস্ট্রেসনএ বলছেন শুধু সেনাবাহিনী নয়, মুঘল প্রাশাসনের প্রত্যেকটি পদকে মনসবদারি হিসেবে চিহ্নিত করা হত এবং সেনা বাহিনীর বেতনদার মীর বক্সী এদের মাইনে দিতেন। যার দরবারে যোগাযোগের মাত্রা যত বড়, তার মনসবদারি ততবেশি। মনসবদারি কিন্তু কোনভাবেই সেনাবাহিনীর কামান স্তর নির্নায়ক নয়। পাদশাহ কাকে কতটা পছন্দ করেন, মনসবদারি তার নিদর্শনমাত্র। তারপরে একটি দীর্ঘ আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় তার নিযুক্তি ঘটত। মনসবদারদের একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ সেনাবাহিনী গঠন করতে হত এবং ১০ থেকে ১০,০০০ সৈনিকের ভিত্তিতে তাদের পদমর্যাদা ঠিক করা হত। অর্থাৎ একজন মনসবদারের অধীনে যত সৈন্য ও ঘোড়া থাকত, সেই সংখ্যা অনুযায়ী তাকে তত হাজারি মনসবদার বলা হত। সাধারণত দশ হাজার মনসবদারি পদ নিরাপত্তার দিকে নজর রেখে কেবলমাত্র রাজ পরিবারের কোন ঘনিষ্ঠ আত্মীয় যেমন সন্তান অথবা সম্রাটের বিশেষ অনুগ্রহপ্রাপ্ত ব্যক্তিকেই প্রদান করা হত। যুদ্ধের প্রয়োজনে মনসবদাররা সম্রাটকে তাদের সেনাবাহিনী দিয়ে সাহায্য করত। সেনাবাহিনীর ভরণপোষণ, অস্ত্রশস্ত্র বা ঘোড়ার জোগান– এর সবকিছুই মনসবদারকে করতে হত।