Showing posts with label পলাশী. Show all posts
Showing posts with label পলাশী. Show all posts

Sunday, June 9, 2019

কেন আজ পলাশীকে ঘুরে দেখা? শুধুই কি অতীতাচার?

ঢাকা বাতিঘরে আলোচনা শুরুর আগে পলাশী বিষয়ে তিনটে মূল ধরতাই দেওয়া দরকার, আজকে দাঁড়িয়ে পলাশীর ২৬২ বছর পরেও আমরা কেন সেই সময়টা ছুঁতে চাইছি।
এক।
পলাশী বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদের সময় সারণিতে গুরুত্বতম বিন্দু, যে বিন্দুকে ব্যবহার করে ইওরোপ, এশিয়া/আফ্রিকার সঙ্গে কয়েক হাজার বছরের ঘাটতি বাণিজ্যের হেঁটমুণ্ড ঊর্ধপদ করল, যে বাংলা সে সময় ছিল বিশ্ব ধনসম্পদের সিঙ্ক, ১৭৫৭ থেকে ১৭৬৫ - এই সাত বছর বাংলার সেই অমিত সম্পদ লুঠে পশ্চিম ইওরোপের ধনসম্পদে অপুষ্ট দ্বীপ রাষ্ট্রটি সম্পদশালী হল এবং বিশ্বের দরবারে শ্রেষ্ঠ লুঠেরা অত্যাচারী খুনি সামরিক রাষ্ট্র হয়ে উঠল।
১৭৫৭য় কার্যত তার দখলে চলে যাওয়া সোনার বাংলায় সে ক্রমশ নামিয়ে আনল অমিয় কুমার বাগচী কথিত ২০০ বছর ধরে স্ট্রাকচারাল এডজাস্টমেন্ট পলিসি, যে নীতিগুলির মধ্যে প্রধানতমগুলি ছিল নুন সুপুরি আফিম চট বাঁশের মত হাজারো নগণ্য ব্যবসার একচেটিয়া করণ, বাংলার রাজস্বকে ব্যবহার করে বিনামূল্যে বা অর্ধমূল্যে বাংলায় পণ্য সংগ্রহ এবং সেই আর্থিক এবং ধনসম্বল নিজের দেশে লুঠেরা এককেন্দ্রিক শিল্পতে বিনিয়োগ করা, ১১৭৬তে পরিকল্পিত গণহত্যা করে বাংলার জনসংখ্যা একতৃতীয়াংশে নামিয়ে আনা যাতে নিয়মিত বাংলার ব্যবসায়িক গঞ্জ হাট এবং বাজার দখল করা যায়, কম মূল্যে বিনামূল্যে নিজের দেশের শিল্পের জন্যে কাঁচামাল রপ্তানি করা যায়, বাংলার উতপাদন ব্যবস্থার বিশিল্পায়ণ করা হল, ১৭৯৩তে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করা হল যার ফলে বাংলার জমির বাজার তৈরি হয় এবং এর সঙ্গে শিল্প ধংসের ফলে বিশাল কারিগর দিন মজুর এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজের মত নানান দেশে দাস খাটতে যেতে বাধ্য হয়। সাম্রাজ্য একই সঙ্গে রেনেলকে দিয়ে মুঘল মানচিত্র আর সমীক্ষা জ্ঞান কাজে লাগিয়ে সম্পদ লুঠের জন্যে মানচিত্র আর কোলব্রুককে কাজে লাগিয়ে পণ্য উতপাদন সমীক্ষা করায়, যে নীতি, জ্ঞান হাতিয়ারগুলি ব্যবহার করে শুরুতে বাংলা পরে গোটা উপমহাদেশকে অধমর্ণ করবে চিরকালের মত আর ইওরোপকে বসবে চালকের আসনে, হবে উত্তমর্ণ। আজকে ইওরোপিয় যে সব সেবা বা প্রযুক্তি পাই তার সলতে পাকানো বিভিন্ন উপনিবেশের জ্ঞান ধার করে, মেট্রোপলিটনে নয়।
দুই।
এই সামগ্রিক ব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক বাজার থেকে উতপাদক কারিগর আর হকারদেরে চাষীদের নিষ্ক্রমণ ঘটল।পলাশীর আগে যে জ্ঞান দক্ষতা বাজার নির্ভর করে কারিগরেরা এই উপমহাদেশকে সোনার বাংলা বানিয়েছিলেন, ইওরোপকে নতুন ফ্যাশান দিয়েছিলেন, উপনিবেশের কবল থেকে মুক্তির পরও কারিগরদের তো পুনর্বাসন ঘটলই না, একই সঙ্গে উপমহাদেশিয় তিনটি প্রধানতম দেশের অধমর্ণতাও ঘুচল না উপমহাদেশ ভাগের আট দশক পরেও।
এই দুটি ঘটনার মধ্যে আমরা মনে করি বিপুল যোগসূত্র আছে। আজও পশ্চিমের ধারের জ্ঞানে, প্রযুক্তিতে, বিদ্যায় বলীয়ান হয়েও উপমহাদেশিয় ত্রয়ী অধমর্ণই থেকে গেলাম। পলাশীর ৪ দশক পরেও যে উপমহাদেশিয় ভৌগোলিক ভূখণ্ডর জিডিপি ছিল ২৫, যে উপমহাদেশের পূবভাগের জিডিপি ছিল ৬, আজকের ভারত ভূখণ্ড তদানীন্তন বাংলার ৬ জিডিপি ছুঁতেই হিমিশিম।
তিন।
যে নিজের দেশের ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয় না যে সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গী। যার ইতিহাস চর্চা নেই সে খড়ের মানুষ।
আমাদের শিক্ষক কারিগরদের দেখানো পথে, গণ কমিটির ডাকে ৬ জৈষ্ঠ বিকেল চারটে থেকে ফেলে আসা সময়টাকে দেখব।
জয় বাংলা।

Monday, August 20, 2018

ফরিদা আপু, সুশীল চৌধুরী আর ঔপনিবেশিক শিক্ষিতরা

Farida আপু আমায় প্রশ্ন করেছেন, সুশীল চৌধুরীর লেখা/গবেষণা কোথায় পড়লে ? আর কেউ পড়ে না কেন? ব্রিটিশ মিথ্যা অপবাদে ভরপুর ইতিহাস পাঠ থেকে বিরত হয় না কেন শিক্ষিত বাঙ্গালী ?
আমাদের উত্তরছিল
সুশীলবাবুর নিচের দুটো বই পড়াগিয়েছে
১) From Prosperity to Decline_ Eighteenth Century Bengal 
এবং
২) Michel Morineauর সঙ্গে Merchants, Companies and Trade_ Europe and Asia in the Early Modern Era
পলাশীর আগের ৫০ বছর এবং তার পরের বাণিজ্য ইত্যাদি বুঝতে ভীষণ সাহায্য করেছে প্রথম বইটা।
এতদিন পলাশীপূর্ব বাংলা আর পলাশী সম্বন্ধে আমরা যা জানতাম-
১) পি জে মার্শালের মত বেশ কিছু ইওরোপিয় ও বাঙালি কেম্ব্রিজতাত্ত্বিক পলাশীতে ইংরেজদের স্বার্থ কিছু ছিল না দেখিয়েছেন।
২) লুঠও খুব বেশি ইংরেজ করে নি সেটাও এরা দেখিয়েছেন। বলেছেন ইংরেজ যা নিয়েছে(লুঠেছে) দিয়েছে অনেক বেশি। পলাশী না হলে এই ইওরোপিয় সুবিধেগুলো বাংলা পেত না। পলাশী বাংলার পক্ষে আশীর্বাদ - যা আদতে মধ্যবিত্তের দৃষ্টিভঙ্গী - এবং মুসলমান-অমুসলমান ভদ্রদের পলাশীতে সত্যিই লাভ হয়েছে।
৩) কেম্ব্রিজ তাত্ত্বিকদের বক্তব্য অসীম ধনী ইওরোপিয়রা বাংলায় বিপুল সোনা আনত, সেই সোনা দেখে নবাবদের মাথা খারাপ হয়ে যায় এবং তা দখল করতে যায়। পদে পদে তারা ইংরেজদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে।
৪) তাই ইংরেজদের স্বার্থের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা জমিদার, সদাগর ইত্যাদিরা নবাবের ওপর খেপে যায়।
৫) ইওরোপিয়রা সেই বিপুল সোনা আনা কমিয়ে দেওয়ায় এদের স্বার্থে ঘা পড়ছিল। ফলে ইংরেজরা নয় মূলত দেশিয় স্বার্থীরা পলাশি করে।
সুশীল চৌধুরী মশাই প্রস্পারিটি টু ডিক্লাইন বইতে ইংরেজ ফরাসী ডাচ ইত্যাদি মহাফেজখানা থেকে নেওয়া যথেষ্ট তথ্য দিয়ে এর এক্কেবারে উল্টো মত প্রতিষ্ঠা করেছেন । তাঁর মোদ্দা যুক্তি হল-
১) ইওরোপিয়রা বিশ্ব লুটে বাংলায় মোট যে সোনা এবং বিনিয়োগ আনত বাংলায় সে পরিমান তাদের বাংলার বিপুল ব্যবসার জন্যে যথেষ্ট ছিল না।
২) ইওরোপিয়দের বাংলায় এশিয় নানান ব্যাঙ্কারের কাছে বিপুল পরিমান মোট বিনিয়োগের এক তৃতীয়াংশ অর্থ ধার করতে হত।
৩) ইওরোপিয়দের মোট বাণিজ্য ছিল এশিয়দের অনেক কম।
৪) বাংলায় শুধু অইওরোপিয়দের সোনা দিয়ে ব্যবসা করতে হত না, এশিয় বণিকদেরও একই শর্তে তাদেরো সোনা দিয়েই বাংলায় ব্যবসা করতে হত। মানে একটা লেভেল-প্লেলেয়িং ফিল্ড ছিল - দেশিয় বণিকদের অনাবশ্যিক সুবিধে ছিল না - যে সুবিধেরা এখন বিশ্বায়নের যুগে ইওরোপিয় বণিকেরা নেয়।
৫) তথাকথিত ধনী ইওরোপিয় বণিকদের দুর্দশায় ক্ষুণ্ণ হয়ে বাংলায় পলাশী হয়েছে এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা।
৬) ইংরেজ আমলাদের রাষ্ট্রীয় ফরমান নকল করে বিনা শুল্কে ব্যক্তিগত ব্যবসা বন্ধ করার উদ্যম নেন নবাবেরা, তার বিরুদ্ধে এবং ডুপ্লের অসীম উদ্যমে ফরাসীদের ব্যবসা ভাগ্য ঈর্ষান্বিত হয়েই ইংরেজরা পলাশী চক্রান্ত করে।
৭) তাই পলাশীর আগে তারা প্রথমে ফরাসডাঙ্গা দখল করে, তারপরে পলাশি করে।
৮ ) পলাশীর দায় সম্পূর্ণ ইংরেজদেরই।
---
ব্যতিক্রমী ঐতিহাসিক সুশীল চৌধুরী মশাইএর ফ্রম প্রস্পারিটি টু ডিক্লাইন বাংলার ভাগ্য বিপর্যয়ের অকথিত কাহিনী। এটা পড়া প্রত্যেক বাঙ্গালির আবশ্যিক কর্ম। বিশেষ করে যে মিথ্যাচার ইওরোপিয়রা আর তাদের বশংবদরা গত আড়াইশ বছর ধরে করে আসছে সে চক্রান্ত জাল ছিন্ন করে আদত তথ্য প্রকাশ করতে এই বই হাতিয়ার হতে পারে।
https://l.facebook.com/l.php?u=https%3A%2F%2Fdrive.google.com%2Ffile%2Fd%2F1mUcCfqBpa0zyedMCkL9t1zBE_geum8r3%2Fview%3Fusp%3Dsharing&h=AT1ExT0fJYz99K_8yHG9iW2hguPweN1VXMLinMKz3T_tZRq9YlD9GI9U4hw6ZJWsLEz7DtMQXoQP0NyVxh_fjZaXirz3GT9JI4_DxNc82Tlq7c4pWHA3n7osa_mlisdw

Farida আপা ডালরিম্পলের নতুন বইএর আলোচনা তুলেছেন

আলোচক বলেছেন, লেখক ইংরেজদের ভারত দখলে বক্সারএর গুরুত্ব অসীম দেখেয়েছেন। এছাড়াও মুঘলদেরও নাকি প্রশংসা করেছেন।
এ প্রসঙ্গে আমাদের কথা
মুঘলেরা সে সময় বিশ্বের গুরুত্বপুর্ণতম সাম্রাজ্য ছিল এটা না বল্লেও চলে। সে সময় বিশ্বের সেরা অঞ্চল ছিল উপমহাদেশ আর উপমহাদেশের সেরাতম অঞ্চল প্রথমে বাংলা পরে দাক্ষিনাত্য। সারা বিশ্ব থেকে লোক আসত উপমহাদেশে ভাগ্য ঘোরাতে।
ইংরেজদের বক্সার যুদ্ধের নিয়ে বহুত দ্বিমত আছে। আমরা মনেকরি বক্সার নয় পলাশীর চক্রান্ত বিশ্ব ইতিহাসের মোড় ঘোরাল। বক্সারকে প্রাধান্য দিয়েছেন প্রাথমিকভাবে হাবিব থাপার ইত্যাদির মত বামপন্থী ঐতিহাসিকেরা। যারা লুঠ নিয়ে কাজ করবেন, তাদের বাংলাকে গুরুত্ব দিতেই হবে।
কারণ সুশীল চৌধুরীমশাই স্পষ্ট বলছেন
১) পলাশী সফল করতে চন্দননগর দখল করা প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। কারণ আলিবর্দি আর সিরাজ ইংরেজদের ব্যক্তিগত ব্যবসা বন্ধ করে দিয়েছিলেন প্রায়। উলটে ফরাসীদের প্রভূত গুরুত্ব দিচ্ছিলেন। ১৭৩০এর ডুপ্লের সময় থেকে জাহাজ রপ্তানি ইত্যাদির সংখ্যায় এটা প্রমান করেছেন সুশীলবাবু।
২) পলাশীর আগে ইওরোপিয়রা যৌথভাবে বাংলায় যা বাণিজ্য করতে তার থেকে প্রায় দেড়গুণ বেশি বাণিজ্য করত বাংলার এশিয় বণিকেরা - এবং প্রত্যেককে রূপো বা অন্যান্য দামি ধাতু নিয়েই বানংলায় বাণিজ্য করতে হত।
৩) ইওরোপিয়রা যা বিনিয়োগ আনত তার দেড়্গুণ ধার করত বাংলায় দাদনি বণিকদের থেকে। ফলে তারা যে খুব ধনী ছিল তা বলা যাবে না। তাদের সম্পদের দিকে লক্ষ্য রেখে পলাশী হয়েছে বলা যাবে না। তার প্রমান পলাশীর আগে তারা উপমহাদেশেই একটাও যুদ্ধ জেতে নি।
৪) পলাশীর লুঠ ছিল আদতে বিশ্ব ইতিহাসের উলটপুরাণ। যে কাজটা ইওরোপিয়রা করার চেষ্টা করছিল ক্রুসেড থেকে। সে কাজটা করতে পারল ইংরেজরা।
৫) পলাশীর পরে বিশ্বের সমৃদ্ধতম অঞ্চল থেকে কত সম্পদ নিয়ে গিয়েছে তার কোন হিসেব হয় নি। সেই সম্পদে শিল্পায়ন হয়েছে, ভারতের অন্যান্য অঞ্চল জয় হয়েছে।
ফলে পলাশি না হলে বক্সার অবদি যেতেই পারে না ইংরেজরা

Wednesday, March 28, 2018

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা১৫ - ঔপনিবেশিকতাবাদ এবং তার জ্ঞানচর্চার আঙ্গিক - সাম্রাজ্যের মন ও মান ।। বারনার্ড কোহন

অধ্যায়২
ভাষার আধিপত্য আর আধিপত্যের ভাষা
ব্রিটিশেরা যেভাবে ভারতে জীবনযাত্রা নির্বাহ করত, তাতে ভাষা শেখার একটা প্রতিবন্ধকতা তো ছিলই তার সঙ্গে যুক্ত হল ভারতীয় সংস্কৃতিতে যুক্ত না হওয়ার তাদের মানসিক বাধা। সপ্তদশ শতকের মাঝখান থেকে অষ্টদশ শতকের মধ্যিখানের সময় পর্যন্ত ভারতে কোম্পানির হাতে গোণা চুক্তিবদ্ধ আমলা ছিল। ১৭৪০ সালে ১৭০, ১৭৫৬য় পলাশীর আগের সময় পর্যন্ত ২২৪ জন। অধিকাংশ আমলাই বন্দর শহর আর উপকূলে মূলত তাদের কুঠির আশেপাশে বাস করত। তাদের যোগাযোগের ঘেরাটোপ ছিল মূলত ইওরোপিয় সমাজ। কোম্পানির ভারতীয় গৃহভৃত্য বা দপ্তরভৃত্যরা কিছু বাণিজ্য(পিজিন) ইংরেজি আর পর্তুগিজ জানত – যে দুটো আদতে উপকূলীয় বাণিজ্য ভাষা হিসেবে মান্য ছিল। অধিকাংশ ব্রিটিশ মনে করত যে তারা এই দুটি ভাষার সঙ্গে আর কিছু স্থানীয়, তাদের ভাষায় মুর ভাষা ব্যবহার করেই কাজ চালিয়ে নিতে পারবে। তাই ভাষা ভাল জানত না বলে অধিকাংশ কোম্পানি আমলা খুব কম দিনই ভারতে চাকরিতে থাকত – কোম্পানির নিয়মে খুব বেশি হলে পাঁচ বছর তারপরে ইংলন্ডে ফিরে যেত। কেউ অসুখে বা সেনা বাহিনীতে কাজ করতে গিয়ে মারা যেত। মূলত পর্তুগিজ এবং ভারতে জন্মানো ইওরোপিয়রাই ভারতীয় ভাষা জানত এবং বলতেও পারত। এদের অধিকাংশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নিচের স্তরে কাজ করত এবং তার সঙ্গে ছোটখাট ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করত। কোম্পয়ানি কর্তারা এদের সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখত। কর্তারা মনে করত নিচুস্তরের কোম্পানি ভৃত্যরা খুব বেশি বিশ্বাসের পাত্র নয় এবং নিজেদের ব্যবসায়িক স্বার্থ, কোম্পানির স্বার্থের কাছে জলাঞ্জলি দেবে না।
১৭১৩ সালে ভারতের আভ্যন্তরীণ বাণিজ্যে শুল্ক কম করার জন্যে এবং তাদের ব্যবসার প্রথম সময় থেকে পাওয়া নানান ধরণের সুবিধে একসঙ্গে করে একটা স্থায়ী ফরমান পাওয়ার চেষ্টা করছিল, সে সময় বাংলায় এই দরকষাকষির কাজটি করার জন্য ফারসি ভাষা জানা কোন ব্যক্তিকে তারা জোগাড় করে উঠতে পারে নি। ফলে তাদের এই গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করতে আরমেনিয় বণিকের স্বারস্থ হতে হয়। দোভাষীকে নিয়ে নানান ঝামেলা ঝক্কির পরে ব্রিটিশ কুঠি এবং দৌত্যের প্রধান ব্যক্তি, জন সুরনাম ফারসি শিখে নেয়। তাদের দৌত্য সফল হয়, কিন্তু কলকাতায় ফিরেই সুরনাম মারা যান এবং ফারসির জ্ঞান তার সঙ্গে কবরে চলে যায়।
১৭৪০ এবং ৫০এর দশকে ক্রমান্বয়ে কোম্পানির অধিকাংশ আমলা কোন না কোন ভারতীয় ভাষা শিখে নেয় এবং উপকূল ছাড়িয়ে তারা ভারতের অভ্যন্তরেও কোম্পানির সেবা করতে থাকে এবং এই ভাষা শেখার জন্যে আরও বেশি দিন তাদের ভারতে থাকার মেয়াদ বাড়ে। সুরাটে ১৯ বছর ধরে কাজ করা জেমস ফ্রেজার ফারসি শিখে পারসিক সূত্রে প্রাপ্ত পারসিক এবং মুঘলদের চিঠি বিনিময়ের সূত্র ধরে নাদির শাহের দরবারের ইতিহাস লেখেন। তিনি একজন পারসিকের থেকে ফারসি শেখেন এবং ক্যাম্বের মুসলমান আইন সম্বন্ধে জ্ঞানীর থেকে তিনি পাঠও নেন।
সেই শতের মাঝখান থেকে অধিকাংশ ব্রিটিশ আধিকারিক তাদের লব্জে মুর বা ইন্দোস্তানি ভাষা আর ফারসি এবং অন্যান্য ভারতীয় অসভ্য(ভালগার) ভাষা শিখতে থাকে। ওয়ারেন হেস্টিংস কাশিমবাজারে ব্যবসায়িক এবং দৌত্যাদি করার সময় ফারসি আর মুর ভাষা শেখে। ব্ল্যাকহোল (কু)খ্যাত হলওয়েল যথেষ্ট বাংলা অর্থাৎ ইন্দোস্তানি জানত যার বলে সিরাজের কলকাতা আক্রমনের বছরে জমিদারি আদালতে বিচারকের চাকরি করত এবং হিন্দুস্তানি শাস্ত্র ইংরেজিতে অনুবাদ করে। উইলিয়াম ওয়াটস, হেনরি ভ্যান্সিস্টার্ট বা লুক স্ক্রাফটনের মত ইওরোপিয়রা এত ভাল দেশিয় ভাষা জানত যে তারা পলাশীর চক্রান্তে সামিল হয়ে উমিচাঁদের মত রাজনৈতিক দালালকে ঘোল খাইয়ে দিতে পেরেছিল। তবে পলাশীর মূল নায়ক ক্লাইভ কিন্তু পর্তুগিজ বাণিজ্য ভাষা ছাড়া বোধহয় অন্য কোন ভাষা জানতেন না। ফলে সে শাসকদের সঙ্গে দরকষাকষি আর অনুবাদকর্মে মূলত তার বানিয়ান নবকৃষ্ণের ওপরে পুরোটাই নির্ভর করত। পলাশী জয় এবং তারপরে রাজস্ব লুঠের কাজে জুড়ে থাকার ফলে প্রচুর আমলা নানান ধরণের ভারতীয় ভাষা শিখতে শুরু করে।

Thursday, February 15, 2018

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা - কেন আমরা ১৭৫৭র আগে যেতে চাই - আজও আপনারা ইওরোপিয় স্বার্থ দেখছেন নির্লজ্জভাবে

মশাইরা, সমাজপতিরা, রাষ্ট্র পরিচালকেরা, হুজুরেরা, 
 আমরা বাংলার কারিগরেরা চাষীরা একদা বাংলাকে করে তুলেছিলাম বিশ্বের কাছে স্বর্গ রাজ্য। বিশ্বের প্রত্যেক দেশের নাগরিক বাংলায় আসত পণ্য কেনার জন্যে। পলাশীর পরে আপনাদের পূর্বপুরুষেরা আমাদেরকে বিশ্ববাজার থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে নিজেরা রাজা উজির হয়ে সিংহাসন দখল করেছেন - বকলমে সাদা-লালমুখোরাই আজও আমাদের শাসন করছে।
আমরা যখন বাংলার উৎপাদন ব্যবস্থার ধারক ছিলাম, সে সময় বাংলা সম্বন্ধে কারা কি বলেছে মন দিয়ে পড়ুন -
১) বাংলা ছিল মুঘলদের কাছে জিন্নতুল বিলাদ, সুবাগুলোর মধ্যে স্বর্গ ভূমি।
২) ঔরঙ্গজেব তার প্রত্যেক চিঠিতে বাংলাকে বলতেন ভারতের স্বর্গ।
৩) ১৬৬০এ বার্নিয়ে বলছেন, বাংলা এতই সম্পদশালী যে প্রবাদ আছে বাংলায় (সম্পদ) ঢোকার রাস্তা অসংখ্য কিন্তু বেরোবার রাস্তা নেই।
৪) আলেকজান্ডার ডাও বলছেন, আন্তর্জাতিক দাঁড়িপাল্লা বাংলার দিকেই ভারি ছিল, তখন বাংলায় একমাত্র পাত্র(sink) যেখানে সোনাদানা এসে জমত, আর কিছুমাত্র কখনও বেরোত না।
৫) ১৭৩৫ সালে লন্ডনের কোম্পানির পরিচালক সমিতি লিখছে - সারা ভারতবর্ষের মধ্যে বাংলাই যে সবচেয়ে সস্তাগণ্ডার দেশ শুধু তাই নয়, সারা ভারতের মধ্যে এটাই সবচেয়ে প্রাচুর্যের দেশ।
(পলাশীর অজানা কাহিনী, সুশীল চৌধুরী)
বাংলাভাগ, আপনারা যাকে স্বাধীনতা বলেন, তার সত্তর বছর কেটেছে, তিন তিনটে প্রজন্ম মরে হেজে গিয়েছে। আজও ওপরের পাঁচটি বর্ণনার ধারেপাশে বাংলাকে পৌঁছে দিতে পারেন নি। তা সত্ত্বেও আপনাদের লজ্জা নেই ইওরোপিয়-আমেরিকয় দালালি করে চলেছেন নির্লজ্জ মুখে।
আমরা ১৭৫৭র আগে- ফিরে যেতে চাইলে মহা দোষ হল?
জয় বাংলা।

Saturday, December 2, 2017

পলাশী আর সিরাজের দায়িত্ব - সুশীলবাবুর বক্তব্য আমাদের কথা

১৮ মে ১৯৯১য় দেশে ‘পলাশী কার চক্রান্ত?’ শিরোনামে এক প্রবন্ধে শ্রী সুশীল চৌধুরী লিখেছেন : স্কুল-কলেজের পাঠ্যপুস্তকে শুধু নয়, লব্ধপ্রতিষ্ঠ ঐতিহাসিকদের গবেষণা সম্বন্ধে কতগুলো বক্তব্য স্বতঃসিদ্ধ হিসেবে বহুদিন ধরে চলে আসছে। সাধারণভাবে এ বক্তব্য হলো সিরাজউদ্দৌলা এতই দুর্বিনীত, দুশ্চরিত্র এবং নিষ্ঠুর ছিল যে তাতে রাজ্যের অমাত্যবর্গ শুধু নয়, সাধারণ মানুূষ পর্যন্ত কোম্পানির সঙ্গে যে সংঘর্ষের পরিণতি হিসেবে সিরাজ বাংলার মসনদ পর্যন্ত হারাল, তার জন্য দায়ী সে নিজেই; মীর জাফরই পলাশী চক্রান্তের নায়ক এবং তার বিশ্বাসঘাতকতার জন্যই পতন হয়েছিল বাংলার শেষ স্বাধীন নবাবীর। কোনো কোনো ঐতিহাসিক আবার এতেই ক্ষান্ত নন, ইংরেজদের বাংলা বিজয়ের যতার্থ প্রমাণে ব্যস্ত এসব ঐতিহাসিক প্রাক পলাশী বাঙালি সমাজের একটি দ্বিধাবিভক্ত চিত্রকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার চেষ্টায় খুবই সচেষ্ট। এদের বক্তব্য পলাশী যুদ্ধের প্রাক্কালে বাংলার সমাজ সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে সম্পূর্ণ বিভক্ত ছিল। মুসলমান শাসনের নিপীড়নে নির্যাতিত সংখ্যাগুরু হিন্দু সম্প্রদায় মুসলমান নবাবের হাত থেকে অব্যাহতির জন্য কোনো ত্রাণকর্তার প্রত্যাশ্যায় অধীর হয়ে পড়েছিল এবং ইংরেজদের জালিয়েছিল সাদর অভ্যর্থনা। অতিসম্প্রতি আবার কিছু ঐতিহাসিকের বক্তব্য, ইংরেজদের বাংলা বিজয় একটি আকস্মিক ঘটনা, এর পেছনে ইংরেজদের কোনো পূর্ব পরিকল্পনা ছিল না। পলাশী বিপ্লবের ব্যাখ্যা হিসেবে বলা হচ্ছে, সিরাজউদ্দৌলা নবাব হয়ে প্রভাবশালী শাসকগোষ্ঠীর তার প্রতি বিরূপ করে তোলার ফলে বাংলায় যে অভ্যন্তরীণ সঙ্কট দেখা দেয়, তার শেষ পরিণতিই পলাশী বিপ্লব।
উপরোক্ত বক্তব্যগুলো কতোটা সঠিক এবং তথ্য ও যুক্তিনির্ভর তার সূক্ষ্ম এবং নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ প্রয়োজন। সম্প্রতি ইউরোপের বিভিন্ন মহাফেজখানায় যেসব নতুন তথ্যের সুন্ধান পেয়েছি, তার পাশাপাশি আগের জানা তথ্য ও সমসাময়িক ফার্সি ইতিহাস ও বাংলা সাহিত্যের পুনর্বিচার করে সমগ্র বিষয়টির পুনর্মূল্যায়ন সম্ভব। বর্তমান আলোচনা ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে দেখা যাবে উপরের অধিকাংশ বক্তব্যই সঠিক নয় এবং নির্ভরযোগ্য তথ্য দিয়ে এই বক্তব্যগুলোকে খ-ন করা যায়। (পৃ. ৬৫)।
অতঃপর শ্রী চৌধুরী দেখিয়েছেন যে, নবাব হওয়ার আগে তার চরিত্র যেমনই থাক, নবাব হওয়ার পর সিরাজের চরিত্রদোষের কোনো প্রমাণ নেই। পনের মাসের স্বল্প রাজত্বকালে সিরাজ কোনো পাগলামি, অর্বাচীনতা বা নিষ্ঠুরতার পরিচয় যে দেয়নি, ঐতিহাসিক দলির-গস্তাবেজ থেকে তা নিঃসন্দেহে প্রমাণ করা যায়। (পৃ. ৬৬)।
কে বা কারা পলাশীর বিশ্বাসঘাতক এ সম্পর্কে শ্রী চৌধুরীর সিদ্ধান্তমূলক তন্তব্য হচ্ছে সুতরাং দেখা যাচ্ছে বিশ্বাসঘাতকতার দায় শুধু মীর জাফরের নয় জগৎশেঠদের দায় মীর জাফরের চাইতে বেশি বৈ কম নয়। আসলে ইতিহাস পরিক্রমায় একটু পিছিয়ে গেলেই দেখা যাবে যে অষ্টাদশ শতকের প্রথমার্ধে বাংলার সব কটা রাজনৈতিক পালাবদলে জগৎশেঠরাই মুখ্য অংশ নিয়েছে। এ সময়কার রাজনীতিতে পটপরিবর্তনের চাবিকাঠি ছিল জগৎশেঠদের হাতে। .. রবার্ট ক্লাইভের লেখা চিঠিপত্র দেখার পর সন্দেহের অবকাশ থাকে না যে, পলাশী চক্রান্তের পেছনে ইংরেজরা সবচেয়ে বেশি মদদ পেয়েছিল জগৎশেঠদের কাছ থেকে।
প্রাক-পলাশী বাংলার সমাজ দ্বিধাবিভক্ত ছিল কি না এবং সংখ্যাগুরু হিন্দু সম্প্রদায় নির্যাতিত ছিল কি না এ সম্পর্কে প্রবন্ধকারের তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত হলো- সিরাজউদ্দৌলার পতন হয়েছিল শাসক শ্রেণীর এক চক্রীদল ও ইংরেজদের মিলিত ষড়যন্ত্রে, সম্প্রদায়ভিত্তিক দ্বিধাবিভক্ত বাঙালি সমাজের জন্য নয়। ... লন্ডনের রাজকীয় মহাফেজখানায় ঠিক প্রাক-পলাশী বাংলার উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারী ও জমিদারদের দুটি তালিকা আমি পেয়েছি। প্রথমটিতে (রবার্ট ওরমের তালিকা) দেখা যাচ্ছে আলিবর্দীর সময় (১৭৫৪ তে) দেওয়ান, তন দেওয়ান, সাব দেওয়ান, বকসী প্রভৃতি সাতটি গুরুত্বপূর্ণ পদের মধ্যে ছয়টিই হিন্দুরা অলংকৃত করেছে একমাত্র মুসলমান বকসী হলো মীর জাফর। আবার ১৯ জন জমিদার ও রাজার মধ্যে ১৮ জনই হিন্দু। বাংলার ওলন্দাজ কোম্পানির প্রধান ইয়ান কারসেবুমের (Ian kerseboom)) তালিকাতেও (১৭৫৫ সালে) নায়েব দেওয়ান রায় রায়ান উমিদ রায়ের নেতৃত্বে হিন্দুদের একচ্ছত্র প্রাধান্য। ১৭৫৪/৫৫’র এই যে চিত্র নবাব সিরাজউদ্দৌলার সময় তার কোনো পরিবর্তন হয়নি। সুতরাং নিঃসন্দেহে বলা যায় মুসলমান রাজত্বে হিন্দুরা মুসলমানদের চাইতেও অনেক বেশি সুবিধাজনক অবস্থায় ছিল।... বাংলার সমাজ যদি সত্যিই দ্বিধাবিভক্ত হতো, তাহলে সমসাময়িক বাংলা সাহিত্য ও ফার্সি ইতিহাসে তার প্রতিফলন দেখতে পাওয়া যেত। কিন্তু সে রকম কোনো নির্দিষ্ট ইঙ্গিত আমরা তৎকালীন সাহিত্য বা ইতিহাসে পাই না।.. বাংলায় হিন্দু-মুসলমান, বিশেষ করে এ দুই সম্প্রদায়ের সাধারণ মানুষ, বহুদিন ধরে পাশাপাশি বাস করে এসেছে। (পৃ. ৬৯, ৭০)।
এবার ইংরেজদের সুবে বাংলার কর্তৃত্ব হস্তগত করার পূর্ব পরিকল্পনার কথা। বলা হচ্ছে, পলাশী সম্বন্ধে ইংরেজদের নাকি কোনো পূর্ব পরিকল্পনাই ছিল না; পলাশী চক্রান্তে ইংরেজদের কোনো ভূমিকাই ছিল না এবং নবাব দরবারের অন্তর্দ্বন্দ্বই নির্যাতিত মানুষদের মুক্তির লক্ষ্যে ইংরেজদের বাংলার রাজনীতিতে টেনে এনেছিল। এ সম্পর্কে শ্রী সুশীল চৌধুরী বলেন, কিন্তু পলাশী প্রাক্কালের যেসব ঘটনাবলী এবং আমাদের কাছে যেসব নতুন তথ্য-প্রমাণ আছে তার সূক্ষ্ম ও নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ করে স্পষ্ট দেখা যাবে ইংরেজরাই পলাশীর মূল ষড়যন্ত্রকারী। সিরাজউদ্দৌলাকে সরিয়ে অন্য কাউকে মসনদে বসাবার ব্যাপারে তারাই সবচেয়ে বেশি উৎসাহ যুগিয়েছিল। শুধু তাই নয়, পলাশী যুদ্ধের আগের মুহূর্ত পর্যন্ত প্রধান প্রধান দেশীয় চক্রান্তকারীরা যাতে শেষ পর্যন্ত ষড়যন্ত্রে যুক্ত থাকে, তার জন্য ইংরেজরা বারবার চেষ্টা করে গেছে। (পৃ. ৭০)।
১৬৯০ সালের চুক্তিতে কোম্পানিকে দস্তক প্রদানের অধিকার অনুমোদনের কথা এখানে আমরা আবার স্মরণ করতে পারি। স্মরণ করতে পারি ১৭১৭ সালের চুক্তির কথা। কোম্পানি কর্মচারীদের ব্যক্তিগত গোপন ব্যবসায়ে দস্তকের যথেচ্ছ ব্যবহারে বাধা আসছিল প্রথম থেকেই। নবাব মুর্শিদকুলী খাঁ, নবাব আলীওয়ার্দী খাঁ এবং নবাব সিরাজউদ্দৌলা কোম্পানি কর্মচারীদের এই কাজে বাধা দিয়ে আসছিলেন। তাতে আঁতে ঘা লাগছিল কোম্পানি কর্মচারী-কর্মকর্তা সকলেরই। ইংরেজরা দিব্যদৃষ্টিতে দেখতে পাচ্ছিল যে, এই বিশাল ভারতবর্ষে মুসলিম মুঘল সাম্রাজ্যের অবসান নিশ্চিতভাবেই ঘনিয়ে আসছে। মারাঠা নায়ক শিবাজীর মৃত্যুর পর মারাঠা সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার ব্যাপারটাও সন্দেহের ঊর্ধ্বে ছিল না। এমনি অবস্থায় ক্রমবর্ধমান শক্তির অধিকারী ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি অদূর ভবিষ্যতে মস্ত বড় কোনো কিছুরই আশা করবে বা না কেন? বস্তুত কলকাতায় ইংরেজ কোম্পানির প্রধান ইঞ্জিনিয়ার স্কট পঞ্চাশের দশকের প্রথম দিকে বাংলা বিজয়ের এক বিশদ পরিকল্পনা পর্যন্ত তৈরি করে ফেলেছিল। তাতে এ গৌরবময় ঘটনায় কোম্পানি কি পরিমাণ লাভবান হবে তার বিস্তারিত বর্ণনা ছিল। স্কট এটাও জোর দিয়ে বলেছিল যে, বাংলা জয় করতে পারলে immense gains would accrue to the English nation ... ... রাজ্য বিজয় সম্বন্ধে বাংলায় কোম্পানির কর্মচারীদের মধ্যে একটা স্পষ্ট মতলব ও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা লক্ষ্য করা যায়। আসলে ১৭৪০ দশকের শেষ দিকে ও পঞ্চাশ দশকের প্রথম দিকে ইংরেজ কোম্পানির কর্মচারীদের ব্যক্তিগত ব্যবসা-বাণিজ্য চরম সঙ্কটের মুখোমুখি হয়, ফলে তাদের ব্যক্তিগত ব্যবসার স্বার্থে তারা বাংলা বিজয় চাইছিল। অবশ্য এই সময় কোম্পানির বাণিজ্য ও ব্যক্তিগত ব্যবসার মতোই সমস্যাসঙ্কুল পরিস্থিতিতে পড়েছিল। কোম্পানির কর্মচারীদের সঙ্কটাপন্ন ব্যক্তিগত বাণিজ্য স্বার্থকে পুনরুদ্ধার করার জন্য ফরাসীদের বিতাড়ন এবং রাজ্য জয়ের মাধ্যমে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের প্রয়োজন ঘটেছিল তাতে শুধু যে আন্তঃএশীয় এবং অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত ব্যবসার স্বার্থ রক্ষার উন্নতি ঘটবে তা না, উৎপাদন ক্ষেত্র থেকে সরবরাহ, বাজারহাট, ব্যবসায়ী তাঁতী অন্যান্য কারিগরদের ওপর সার্বিক নিয়ন্ত্রণও নিশ্চিতভাবে বৃদ্ধি পাবে। এ কথা যে শুধু পশ্চাৎ সমীক্ষাতেই ধরা পড়ছে তা নয়, তৎকালীন কোম্পানির কর্মচারীদের বিবৃতি ও কাজকর্মের মধ্য দিয়েও প্রকাশ পেয়েছে। স্কটের বাংলা বিজয়ের পরিকল্পনা, ফ্যাম্বল্যান্ড ও ম্যানিংহামের ক্লাইভকে লেখা চিঠি (১ সেপ্টেম্বর ১৭৫৩) যাতে ইংরেজ বাণিজ্যের বিশেষ করে ব্যক্তিগত ব্যবসার ক্রমাবনতির কথা করুণভাবে প্রকাশ পেয়েছে। কোম্পানির বেচাকেনায় দাদনি থেকে গোমস্তা ব্যবস্থার পরিবর্তন, নবাবের প্রতিফোর্ট উইলিয়াম কাউন্সিল, গবর্নর ও গবর্নর ড্রেকের অনমনীয় এবং মারমুখো মনোভাব এ সবই ইংরেজদের রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের যে অভিপ্রায় তারই নির্দেশক। (পৃ. ৬৭)
‘কেন এই পলাশী চক্রান্ত? এ প্রসঙ্গে শ্রী সুশীল চৌধুরী বলেন, মুর্শিদাবাদের শাসকগোষ্ঠীর একটি অংশ এবং ইংরেজরা সিরাজউদ্দৌলার অপসারণ চেয়েছিল বলেই পলাশী চক্রান্তের উদ্ভব। উভয়ের কায়েমী স্বার্থের পক্ষে সিরাজ ছিল অত্যন্ত এটা স্পস্ট যে বাংলার সামরিক অভিজাত শ্রেণী, ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ও জমিদারদের নিবিড় জোটবদ্ধতা বাংলার নবাবের পূর্ণ ক্ষমতার ওপর যে চাপ সৃষ্টি করেছিল, সিরাজউদ্দৌলা তা মেনে নিতে মোটেই রাজি ছিলেন না। নবাব হয়েই সিরাজউদ্দৌলা সামরিক ও বেসামরিক উভয় শাসন ব্যবস্থা নতুন করে ঢেলে সাজাতে শুরু করল। মোহন লাল, মীর মদন ও খাজা আব্দুল হাদি খানের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ এই নতুন ব্যবস্থার ইঙ্গিত বহন করে।... আসলে সিরাজউদ্দৌলার মতো বেপরোয়া তরুণ নবাব হওয়ায় শাসকশ্রেণীর একটি গোষ্ঠী ভীত ও সন্ত্রস্ত হয়ে ওঠে। আগের নবাবদের আমলে এই বিশেষ গোষ্ঠীই সম্পদ পুঞ্জীভবনে লিপ্ত ছিল। এখন তাদের ত্রাসের কারণ সিরাজউদ্দৌলা হয়তো তাদের সম্পদ পুঞ্জীভবনের পথগুলো বন্ধ করে দেবে। সৈন্যাধ্যাক্ষের পদ থেকে মীর জাফরের অপসারণ, রাজা মানিকচাঁদের কারাদ- এবং সর্বোপরি আলিবর্দীর একান্ত বিশ্বস্ত ও প্রভূত ক্ষমতাশালী হুকুম বেগের দেশ তেকে বিতাড়নের মধ্যে শাসক শ্রেণীর চক্রীদল বিপদ সঙ্কেত পেয়ে যায়। এসব সত্ত্বেও ইংরেজদের সক্রিয় সংযোগ ছাড়া পলাশী বিপ্লব সম্ভব হতো না। সিরাজউদ্দৌলা নবাব হওয়ায় ইংরেজদের কায়েমী স্বার্থও বিঘিœত হয়ে পড়ার সম্ভাবনা দেখা দিল। সিরাজ নবাব হওয়ার পর ইংরেজ কোম্পানির কর্মচারিরা ভষিণভাবে শঙ্কিত হয়ে উঠল, পাছে নতুন নবাব তাদের দুই কল্পতরুকে নিজেদের ব্যক্তিগত ব্যবসা ও দস্তকের যথেচ্ছ অপব্যবহার সমূলে বিনাশ করে বসে (পৃ. ৭২)। তাই এই তরুণ নবাকে ধ্বংস করার জন্যই পলাশীর এই চক্রান্ত। এই চক্রান্তের প্রদান হোতা ইংরেজ এবং এ দেশীয়রা তাদের সহযোগী।
দস্তকের যথেচ্ছ অপব্যবহার করার সুযোগটাই ছিল কোম্পানিওলাদের স্বার্থের ক্ষেত্রে আসল ব্যাপার। ১৭৫৬ সালের ১লা জুন ইংরেজদের কাছে নবাবের বিশেষ দূত খাজা ওয়াজেদের কাছে লিখিত নির্দেশে অন্যাণ্য কারণের মধ্যে দস্তক সম্পর্কিত ব্যাপারটাও স্পষ্টভঅবে উল্লেখ করা হয়েছিল। নির্দেশে নবাব তার মনোভাব স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেন, ইংরেজদের আমার রাজ্য থেকে বহিষ্কৃত করার তিনটি প্রকৃত কারণ বিদ্যমান। প্রথমত, দেশের প্রচলিত নিয়মকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে রাজ্যের মধ্যে তারা সুদৃঢ় দুর্গ নির্মাণ ও পরিখা খনন করেছে। দ্বিতীয়ত, তারা দস্তকের সুযোগ-সুবিধার যথেচ্ছ অপব্যবহার করেছে এবং যারা কোনোভাবেই এই দস্তক ব্যবহারের অধিকারী নয়, তাদেরও বাণিজ্য শুল্ক বাবদ নবাবের রাজস্বের প্রচুর ক্ষতি স্বীকার করতে হয়। তৃতীয়ত, ইংরেজরা নবাবের এমন সব প্রজাকে আশ্রয় দেয় যারা বিভিন্ন প্রকার বিশ্বাসভঙ্গকারী কার্যকলাপ ও অন্যায় ব্যবহারের জন্য নবাবের নিকট কৈফিয়ত দিতে বাধ্য।
শ্রী চৌধুরীর সমাপ্তি মন্তব্যের সাথেও আমরা সম্পূর্ণ একমত। যেখানে তিনি বলেন, শুল্ক ফাঁকি দিয়ে এ ব্যক্তিগত ব্যবসাই ছিল রাতারাতি বড়লোক হওয়ার সবচেয়ে সহজ পথ এটা যতো অন্যায়ই হোক না কেন, তারা ছাড়তে মোটেই রাজি ছিল না। গবর্নর ড্রেক থেকে শুরু করে সব ইংরেজ কর্মচারীই এই ব্যক্তিগত ব্যবসায়ে লিপ্ত ছিল এবং কেউই এটার মতো লোভীয় জিনিস ছাড়তে চায় না। সুতরাং ইংরেজরাও চাইছিলো সিরাজউদ্দৌলাকে হঠাতে। তাই শাসক শ্রেণীর চক্রীদলের সঙ্গে হাত মেলাতে এগিয়ে এলো ইংরেজরা।


এভাবে পলাশী চক্রান্ত সফল হলো। সফল হলো প্রধানত এদেশীয় বেঈমানদের বিশ্বাসঘাকতার জন্যই এবং আশ্চর্যই বলতে হবে দেশী-বিদেশী চক্রান্তকারীদের অনেকেরই জীবনের অবসান হয়েছিল খুই নির্মমভাবে।

Thursday, September 7, 2017

পলাশীর আগে বাংলার জাতিভেদ - মূল ঝোঁক বৃত্তি পরিবর্তনের

পলাশীর কিছু আগে বাংলার হিন্দু সমাজে দুই বর্ণ – ব্রাহ্মণ ও শূদ্র। দুই বর্ণে মিলিয়ে ছত্রিশ জাতি বলছেন গঙ্গারাম ‘মহারাষ্ট্র পুরাণ’এ(হান্টার, এনালস...)। দ্বাদশ-ত্রয়োদশ শতক থেকেই বাংলার বর্ণ বিন্যাস বোঝা যায় বৃহদ্ধর্মপুরাণ এবং ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ-এ। বৈদ্য/অম্বষ্ঠ এবং করণ বা কায়স্থরা ব্রাহ্মণের নিচে ছিলেন। পুরাণ অনুসারে এরা সৎ শূদ্র বা উত্তম শঙ্কর। নবদ্বীপের স্মার্ত রঘুনন্দন যিনি বাংলার ক্রিয়াকর্ম, পূজা, পার্বন, বিবাহের নানান নিদান দিয়ে যান, তিনিও বৈদ্য কায়স্থদের শূদ্র বর্ণে অন্তর্ভূক্ত করেছেন। দুশ বছর পর ক্রমশঃ বৈদ্য আর কায়স্থরা আস্তে আস্তে স্বতন্ত্র স্তর হিসেবে উঠে আসতে শুরু করছে – স্ববর্ণের বণিক আর কারিগরদের থেকে বেশ কিছু দূরে সরে যান তাঁরা।

তবুও শূদ্ররা সংখ্যাগরিষ্ঠ। এদের তিন ভাগ – উত্তম সঙ্কর –মধ্যম সঙ্কর বা জলঅচল শূদ্র আর অন্তজ অস্পৃশ্য শূদ্র। বৈদ্য, কায়স্থ আর নবশাখেরা হল উত্তম সঙ্কর। নবশাখেরা হল গোপ, মালী, তাম্বুলী, তাঁতি, শাঁখারী, কাঁসারী, কুম্ভকার, কর্মকার ও নাপিত। গঙ্গারাম আর ভারতচন্দ্র উভয়েই নবশাখেদের কথা উল্লেখ করেছেন। ব্রাহ্মণেরা এদের বাড়িতে পুজোপাঠ করত বা জল খেত। এদের নিচে ছিল মধ্যম সঙ্কর – কৈবর্ত, মাহিষ্য, আগুরি, সুবর্ণ বণিক, সাহা শুঁড়ি, গন্ধ বণিক, বারুই, ময়রা, তেলি, কলু, জেলে, ধোপা ইত্যাদি। অধম সঙ্কর জাতি হল যুগি, চণ্ডাল, নমঃশূদ্র, পোদ, চামার, মুচি, হাড়ি, ডোম, বাউরি, বাগদি ইত্যাদি। মধ্যম শঙ্করদের সঙ্গে এদের বৈবাহিক সম্পর্ক ছিল না।

এদের মধ্যে আবার প্রচুর স্তরভাগ – ‘সামাজিক কাঠামোয় একটি বিশেষ স্তরে অবস্থান, একটি পারিবারিক বৃত্তি বা পেশা অবলম্বন এবং বিবাহ ও খাদ্যাভ্যাসসহ কতকগুলি সামাজিক নিয়ম কানুন মেনে চলা। এই সাধারণ জাতি বৈশিষ্ট্যগুলি মেনে চলা সত্ত্বেও এই জাতিগুলির মধ্যে পার্থক্য ও বিভেদ লক্ষ্য করা যায়। ব্রাহ্মণেরা পাঁচ শ্রেণীতে বিভক্ত – রাঢী, বারেন্দ্র, বৈদিক, সপ্তশতী ও কান্যকুব্জ। বৈদ্যরাও পাঁচ গোষ্ঠী – উত্তর রাঢী, দক্ষিণ রাঢী, বারেন্দ্র, বঙ্গজ ও পূর্বকূল। কায়স্থদের মধ্যে ছয় ভাগ উত্তর রাঢী, দক্ষিণ রাঢী, বারেন্দ্র, বঙ্গজ, শ্রীহট্টবাসী ও দাসকায়স্থ। কৌলিন্যে ব্রাহ্মণেরা পাঁচ ভাগে বিভক্ত – কুলীন, শ্রোত্রীয়, গৌণকুলীন, বংশজ, সপ্তশ্তী গোষ্ঠী। দেবীবর ঘটক কুলীন ব্রাহ্মণেদের মধ্যে দোষানুসারে ছত্রিশটি মেল বন্ধন সৃষ্টি করেন (জাতিভেদ প্রথা ও উনিশ শতকের বাঙ্গালি সমাজএ দোযান মেলয়রীতি মেল প্রবন্ধ, অমিতাভ মুখোপাধ্যায়)। নির্মল বসু বলছেন, বৃত্তিমূলক বর্ণ সৃষ্টির উদ্দেশ্য ছিল প্রতিযোগিতাহীন উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তোলা। বর্ণ বা জাতি সেই গোষ্ঠীর লোকেদের জন্য জোবিকা নিরাপদ ও নিশ্চিত রাখত। এই কারণেই বর্ণ ও জাতিভিত্তিক সমাজ যুগ যুগ ধরে চলল এবং এমনকি মুসলমানেরাও এদিকে কিছুতা ঝুঁকল(নির্মল বসু, এম কে চৌধুরী সম্পাদিত সোসিও ইকনমিক চেঞ্জ ইন ইন্ডিয়ায় উদ্বোধনী ভাষণ)।

ভারতচন্দ্র ও গঙ্গারাম, বর্ণ ও জাতিভিত্তিক অনেক পেশার পরিচয় দিয়েছেন। ব্রাহ্মণ সাধারণত বেদ, ব্যাকরণ, স্মৃতি, ন্যায়, দর্শনচর্চা, আর পুজার্চনা নিয়ে থাকতেন। ব্রাহ্মণ করণিকের কাজ করবেন অসুবিধে হলে, কিন্তু সেনাবাহিনীতে নাজির বা জমাদারের কাজ বা কূটনৈতিক কাজ করত না। বৈদ্যরা চিকিতসাই করত। কায়স্থরা একচেটিয়া করণিক – রাজস্ব বিভাগে বা প্রশাসনে তাদের পদ রাখা থাকত। সিরাজ পর্যন্ত নবাবেরা কায়স্থদের রাজস্ব আদায় ও প্রশাসনে ব্যাপক হারে নিযুক্ত করেছেন।

নবশাখেরা ব্যবসায়ী কারিগর – তাম্বুলি তিলি ও গোপ ব্যবসায়ী আর শাঁখারী, তাঁতি, মালাকার, কুম্ভকার, কর্মকার, নাপিত। দ্বিতীয় শ্রেণীর শূদ্ররা চাষ-আবাদ ও ব্যবসায়ে নিযুক্ত। অন্যরা তেল তৈরি করা, মাছ ধরা, কাপড় কাচা ইত্যাসি জাতিগত বৃত্তিধারী। অন্তজরা চাষী, শ্রমিক, পশুপালক, শিকারী, লাঠিয়াল, পাইক, বরকন্দাজ ইত্যাদি।

পলাশীর আগের সময়ে হিন্দুদের সমস্ত বর্ণ ও জাতের মধ্যে বৃত্তি পরিবর্তনের ঝোঁক দেখা যায়। বেশ কিছু ব্রাহ্মণ জমিদার পরিবার তৈরি হয় নবাবী আমলে – নাটোর(রামজিবন, রামকান্ত, রানী ভবানী), ময়মনসিংহের শ্রীকৃষ্ণ হালদার, মুক্তাগাছার বারেন্দ্র ব্রাহ্মণ শ্রীকৃষ্ণ আচার্য চৌধুরী বড় জমিদার। রাজশাহী, তাহিরপুর, পুথিয়া ইত্যাদিতে ব্রাহ্মণ ছোট জমিদার বা ভুঁইয়া ছিল। ভারতচন্দের পিতা নরেন্দ্রনাথ রায় ভুরসুট পরগণার পাণ্ডুয়াতে জমিদার ছিলেন(রায় বা হালদার কি করে, কোন অঙ্কে ব্রাহ্মণ হয় জানি না – হয়ত যে করে পশুপালক নন্দরা ব্রাহ্মণ হয়)। ব্রাহ্মণ কায়স্থরা প্রশাসনে ছিলেন। আবুল ফজল কায়স্থদের জমিদার বলে উল্লেখ করেছেন। সামাজিক প্রতিপত্তিতে এবং বাংলার দরবারী রাজনীতিতে এরা জমিদারদের থেকে অনেক উঁচুতে।

বৈষ্ণবদের মধ্যে বহু অব্রাহ্মণ ব্রাহ্মণদের দীক্ষা দিত। নবসাখদের মধ্যে তাম্বুলিরা ব্যবসা করত। জমিদারিও কিনেছে। রানাঘাটের পালচৌধুরী পরিবারের কৃষ্ণচন্দ্র পান্তি ছিলেন তাম্বুলি। তার জমিদারি কেনায় রামপ্রসাদ গেয়েছিলেন – ঐ যে পান বেচে খায় কৃষ্ণ পান্তি তারে দিলে জমিদারি। দীঘাপাতিয়ার দয়ারাম রায় ছিলেন তিলি। ক্ষত্রিয়ের কাজ করত গোয়ালা, বাগদী, হাড়ি, ডোম। সুবর্ণবণিকদের অনেকেই বেনিয়ান মুৎসুদ্দি, সরকার, গোমস্তা হিসেবে কাজ করেছে। ফলে পলাশীর আগে বৃত্তি পরিবর্তনের ঘটনা ঘটেছে নিয়মিতভাবে।

পলাশী এবং তার পরের ঘটনা নিয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গী

অরূপদা, নীলাঞ্জন সঈদের সিরাজের মৃত্যু বিষয়ক একটি লেখা পড়তে দিয়েছেন, সোমনাথো য়ামাদের মন্তব্য জানতে চেয়েছেন। নীলাঞ্জন যে ইওরোপিয় ঐতিহাসিকের প্রতিপাদ্য নিয়ে কাজ করেছেন সেটা হল পলাশী হয়ই নি, সিরাজকে খুন করে মীরজাফর, ইত্যদি ইত্যাদি। আমাদের কাছে সিরাজ কি করে মারা গেলেন ইতিহাস গৌণ তো বটেই কিন্তু সিরাজ যে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন সে তথ্যটা প্রাথমিক।
এবারে আমাদের কথা---
আমরা এই ধরণের ইতিহাস খুঁজি - ব্যতিক্রমী, কিন্তু জোরালো। সুশীল চৌধুরী স্পষ্ট ব্যতিক্রমী ইতিহাসবিদ যিনি উল্টো রাস্তায় হেঁটে সোজাসুজি বলেছিলেন সিংহাসনে বসার পরে সিরাজ অন্য মানুষ। এটা অনেকেই মেনে নিতে পারেন নি। সিরাজ নিয়ে আমরা আজও সুশীলবাবুর অনুগামী, যদি না কোন ব্যতিক্রমী ভাবনা সেটাকে পেড়ে ফেলতে পারে। এই বইটা পড়ার আগে কোন মন্তব্যে যাচ্ছি না। সিরাজ বিষয়ে আপাতত সুশীলবাবু পথ দেখাচ্ছেন। অন্য কিছুতে আমরা তাঁর অনুগামী নই - কেননা আমাদের খোঁজ ছোটলোকের ব্যবসা আর তাদের ব্যবসা কেড়ে নেওয়ার ইতিহাস খোঁজা। অন্য সব গৌণ। এই বিষয়টা নিয়ে কেউই প্রায় কাজ করেন নি বলতে গেলে। তাই আমাদের খোঁজা শুরু হয়েছে শূন্য থেকেই।
ইওরোপিয়রা ভারতে এসেছিল প্রাথমিকভাবে দুটি উদ্দেশ্য নিয়ে
১) বাণিজ্য
২) বাণিজ্যে যে অধমর্ণতা ছিল সেটিকে বদলানো ইওরোপের পক্ষে।
পর্তুগিজ থেকে ফরাসী থেকে ডাচ থেকে ব্রিটিশ সক্কলেই চেষ্টা করেছে সোনার দেশ ভারতউপমহাদেশ দখলের, সফল হয়েছে ব্রিটিশ। এবং ব্রিটিশেরা যুদ্ধে অজেয় পলাশীর আগে এ রকম তত্ত্ব ওঠেই নি। বহুবার মুঘলদের সঙ্গে লড়াইতে তারা গোহারাণ হেরেছে - স্বয়ং সিরাজের সঙ্গে হেরেছে। ১৮০০/১২০৭ সালেও টিপু সুলতানের সঙ্গেই পেরে উঠছিল না তার মারণ হাউয়ের বিরুদ্ধে। তারা সেই হাউই উলরিচে নিয়ে গিয়ে গবেষণা করে নতুন ধরণের হাউই উদ্ভাবন করে এবং তাতেও সফল হয় না - শেষে একজন বিশ্বাসঘাতকএর সাহায্যে টিপুকে বশ করে। এবং সেই হাউই নিয়ে তারা ফরাসীদের বিরুদ্ধে জেতে।
ভারতে ইওরোপিয় মারের ইতিহাসটা পলাশী থেকে শুরু নয় তার অনেক আগে থেকেই চলছে - সেটা পলাশীতে গিয়ে পূর্ণতা পেল।
কি করে?
কারণ দিন চার পাঁচেক আগে এক লেখায় আমরা দেখিয়েছি শুধু পলাশী থেকে ক্লাইভই আইনি ঘুষে রোজগার করেছিল ১১২২৮ কোটি টাকা আজকের মুদ্রায়। তার বাঙ্গালি ব্রিটিশ অনুগামীদের কথা হিসেবে আনি নি।

পলাশী ছিল বিশ্ব ইতিহাসের ব্যতিক্রমী বিন্দু - যেখানে ছলে বলে কৌশলে ইওরোপ তার ব্যালেন্স অব পেমেন্টের গতি পালটে ফেল্ল। এতদিন ওয়েস্ট ইন্ডিজ, লাতিন আমেরিকা, আমেরিকা, আফ্রিকা, দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া কোথাও বাণিজ্যের নামে, কোথাও দাস ব্যবসায়, কোথাও শুধু দস্যুতা চালিয়ে, কোথাও বাজার থেকে(যেমন্ আমস্টারডামের দামি ধাতু বাজার থেকে রূপো আর সোনা কিনে) সোনা রূপো লুঠ করে এই উপমহাদেশ, চিন আর পারস্যে ব্যবসা করতে আসত - এই উপমহাদেশে ব্যবসার রীতিই ছিল মূলত দামি ধাতু আর দামি রত্ন বিনিময় - যে জন্য আজও বিনিময়ে রূপিয়া কথাটা থেকে গিয়েছে - এবং এই দামি ধাতু ছাড়া মদ্য, আর ঘোড়া ছিল উপমহাদেশের একমাত্র আমদানি। এই যে সম্পদ ইওরোপিয়রা উপমহাদেশে বাণিজ্যের জন্য যোগাড় করত সারা বিশ্বে সন্ত্রাস চালিয়ে, সেটা কোম্পানির ভাষায় ইনভেস্টমেন্ট। 
পলাশীর পরের লুঠে কোম্পানি এত আইনি রোজগার করল(বেআইনি রোজগারের কথা বলছিই না) যে তাকে আর ইওরোপ বা সারা বিশ্বজুড়ে আর এই ইনভেস্টমেন্ট জোগাড় করতে হল না, এক বছর আগেও ১৭৫৭/১১৬৪ সে জাহাজ ভরে সোনারূপো এনেছে ইওরোপ থেকে ১৭৫৮/১১৬৫ থেকে তারা জাহাজ ভরে নিয়ে যেতে শুরু করল দামি ধাতু বাংলা থেকে। বাংলার টাঁকশালের দখল নিল ব্রিটিশ যা সিরাজের সময় পায় নি। তাকে রূপো আরাই শতাংশ বাটা দিয়ে টাকায় ভাঙ্গাতে হত বাংলায়।
ফলে সারা বিশ্বের বাণিজ্য ইতিহাস পালটে গেল। 
কিন্তুয় ব্রিটিশেরা বাংলার খাজানায় তো হাত দিয়ে বিনিয়োগ তুলল, কিন্তু ন্য ইওরোপিয় কর্পোরেট কোম্পানির কি দশা হল? তারাও তো সারা বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগ আনত বাংলায়।
এটা আরও গুরুত্বপূর্ণ, ব্রিটিশ ফ্রি মার্চেন্ট, ইন্টারলোপার্স আর কোম্পানির চাকুরেরা ব্যক্তিগত বাণিজ্য করে যা রোজগার করত, সেই লাভ আইনিভাবে লন্ডনে নিয়ে যাওয়া মুশকিল ছিল। তারা সেই বিপুল লাভ বিনিয়োগ করল ফরাসী, ডাচ ইত্যাদি কোম্পানিতে এবং সেই বিল আমস্টার্ডামে বা প্যারিসে গিয়ে তারা ভাঙ্গাত। ফলে ইওরোপিয় কোম্পানিগুলোকে আর বাংলায় ব্যবসা করতে অর্থ বিনিয়োগ করতে হল না, ব্রিটিশ ব্যক্তি ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগেই বাংলায় ব্যবসা চালিয়েছে তারা। ফলে ইওরোপ এক বছরেই উত্তমর্ণ হয়ে উঠল।
বিশ্বের ইতিহাস পালটে গেল চিরতরে।
তারপরে শুরু হল ব্রিটিশদের বাংলার বিশিল্পায়ণ।
গোটা ইতিহাসটা আসলে আমরা এই দিক থেকে দেখি - শেষ পর্যন্ত সিরাজ একটা বাঁধ দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, পারেন নি।
অন্য সব কিছু অনুগল্প।