Showing posts with label হকার বিল. Show all posts
Showing posts with label হকার বিল. Show all posts

Sunday, September 8, 2013

ভারতের তৃণমূলস্তরের ব্যবসায়ী আর ব্যবসা৯, Grassroot Hawkers of India9

হাজার হাজার বছর ধরে ভারতীয় বণিক কিন্তু সেই পণ্যদ্রব্যগুলি নিয়ে প্রায় একচেটিয়া ব্যবসা করে এসেছে বিশ্ববাজারজুড়ে। কিন্তু সেই একচেটিয়া বাজার বাড়াতে, বিশ্ব বাজারের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে এনে, প্রাকৃতিক সম্পদকে নিংড়ে অতিরিক্ততম উতপাদনকরে, নিজের দেশের, সাম্রাজ্যভুক্ত দেশের উত্পাদকদের উতপাদনক্ষমতা শেষপর্যন্ত ব্যবহার করার অধিকার দেয় নি ভারতীয় সমাজ। এবং ভারতীয় বণিকেরাও, সে তৃণমূলস্তরেরই বণিকই হোক অথবা পাইকারি বিশ্ববাজারের বণিকই হোক, সেই নিয়ন্ত্রণ মেনে ভারতে এবং বিশ্ব বাজারে ব্যবসা করে এসেছে। এই সামাজিক শৃঙ্খল ছিঁড়ে গেল ইংরেজের ভারত তথা বাঙলা দখলের মধ্যে দিয়ে। কয়েক স্তবক আগেই আমরা দেখেছি বিকেন্দ্রিকৃত ভারতীয় সভ্যতার নানান রেণুকে ভাঙতে ইংরেজ আর ইংরেজদের স্নেহধণ্য ব্যবসায়ীরা এক যোগে বংলার সমাজ সংগঠণের ওপর বিশাল একটা অত্যাচার নামিয়ে এনেছিল। বিপরীতভাবে আমরা দেখেছি সেই অত্যাচারী লুঠেরা সময় পেরিয়ে আজও ভারতীয় অর্থনীতিতে পথ ব্যবসায়ীরা তাদের চিরাচরিত সামাজিক-ব্যবসায়িক জ্ঞাণ প্রয়োগ করে বিশ্বায়ণের ব্যবপারীদের বিপরীতে দাঁড়িয়ে তৈরি করার চেষ্টা করছেন ভারতবর্ষের চিরাচরিত দর্শণ, যে দর্শণের মূল লক্ষ্য সবাইকে নিয়ে সমানতালে সমভাবে বাঁচা।
স্বাধীণোত্তর ভারতের প্রচলিত রাষ্ট্রিক অর্থনীতি যে ভাষ্যই পেশ করুক না কেন, প্রথাগত ভারতীয় সমাজে তৃণমূলস্তরের উত্পাদক এবং ব্যবসায়ীরা যে সামাজিক সুরক্ষার বলয়টির পরিবেশ অনুভব করতেন ইংরেজ শাসনের পূর্বে, ইংরেজ আমল থেকে আর সেই পরিবেশ বর্তমান নেই। সনাতন সমবায়ী সমাজের সামাজিক রীতিনীতি, সমাজবন্ধন বিলয় হয়ে যাওয়ার পর থেকেই বিগত আড়াইশ বছর ধরে বহু উত্পাদক, ব্যবসায়ী তাঁদের বংশপরাম্পরিক ব্যবসা ছেড়ে কায়িক শ্রম থেকে রোজগারের তুলনামূলকভাবে সহজ সোজা পথ ধরেছেন। পশ্চিমি জ্ঞাণচর্চা পদ্ধতিতে কায়িক শ্রম অর্থে অদক্ষ অথবা অর্ধদক্ষ শ্রমিক- শ্রমিক দক্ষতা বিরোধী, ভারতীয় সামাজিক সভ্যতা বিরোধী এই তত্ব প্রচারের কাজ যে লেখকেরা করছেন না সে কথা কম্বুকন্ঠে জনিয়ে দেওয়া যাক। অস্বীকার করার উপায় নেই, ব্রিটিশ পূর্ব সময় পর্ষন্তু ভারতীয় গ্রামীণ উত্পাদক, ব্যবসায়ীরা যে সামাজিক সুরক্ষার অদৃশ্য বলয়ে বাস করতেন, ভারতের বহুগ্রামসমষ্টিতে সেই অবস্থাটি ভেঙে দিতে সক্ষম হয়েছে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য। তবু আজও যতটুকু পাওয়া যায় সেইটুকু নিয়েই গ্রামীণ উত্পাদক এবং তৃণমূলস্তরের ব্যবসায়ীরা সমাজের তৃণমূলস্তরের মানুষদের নানান সামান্য চাহিদাটুকুও মিটিয়ে আসতে পেরেছেন।
দীনেশ সেন মশাইএর ভাষায় বিগত একসহস্র বছর ধরে গৌড়বঙ্গের রাষ্ট্রিক-সামাজিক পরিবর্তন নিরন্তর ভাঙাগড়ার মধ্যেদিয়ে চলেছে। প্রথমে আগ্রাসী মুসলিম সাম্রাজ্য, পরে ধংসাত্মক ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রতিঘাতে বাঙলার সমাজজীবনে এসেছে নানান পরিবর্তন। ইসলামের সঙ্গে বাঙলার অভিঘাতি পারম্পরিক সংস্কৃতির পরিবর্তন ঘটেছে, অনেক অত্যাচারও ঘটেছে ঠিকই- কিন্তু ইসলামের বড় একটি দিক ছিল, সে বাঙলা তথা ভারতের সম্পদ লুঠ করে যে দেশগুলি থেকে ভারত আক্রমণ করতে এসেছিল, সেই সব দেশে নিয়ে যাওয়ার কথা ভাবেনি। প্রথম যুগে লুঠেরা সাম্রাজ্য স্থাপন করলেও, দীর্ঘ সময় ধরে ভারত তথা বাঙলার সংস্কৃতির সঙ্গে মিলেমিশে বাস করে নতুন এক সংশ্লেষী সংস্কৃতির নমুনা স্থাপন করে গিয়েছে। যতটুকু অত্যাচারী পরিবর্তন এসেছে, তা সমাজের বহিরঙ্গে, অন্তরে যে পরিবর্তন ঘটেছে তা দেওয়া নেওয়ার। পারম্পরিক সমাজের ভেতরে প্রবেশ করে নিজের কেন্দ্রীভূত দর্শণ ভিত্তিকরে, সমাজকে ভেঙেচুরে নিজের সংস্কৃতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে নি।
মুঘল শাসনের উত্তুঙ্গ সময়েই ব্রিটিশ বণিক-শাসকেরা ভারতে পদার্পণ করেছেন। ভারতে পা রাখার অনেক আগে থেকেউই সারা বিশ্বে অন্যান্য ইওরোপিয় শক্তিরমত ব্রিটিশরা যে ধংসাত্মক অত্যাচার চালিয়ে এসেছিল, সেই কাজটি তারা অনেক আগেই ভারতের মাটিতে শুরু করতে চাইছিল, কিন্তু নানান কারণে পারছিলন না। ১৭৭৫৭র পর থেকেই ভারতের শাসন ব্যবস্থায় তারা মাথাগলিয়েদেওয়ার কাজটি করতে সক্ষম হল তারা। মুঘলদেরমত শুধুই শাসন করে তাদের আশ মেটেনি, ব্রিটিশদের প্রথমথেকেই উদ্দেশ্য ছিল ইংলন্ডের বিকাশ, এবং ভারতবর্ষসহ এশিয়ার আমূল ধংস প্রক্রিয়া। তাই যে কোনও  মূল্যেই তারা চেষ্টা করেগিয়েছে, প্রথমে বাঙলা, পরে ভারতের নানান স্থানের সম্পদ আহরণ করে, ভারতের বিকশিত প্রযুক্তি আর জ্ঞাণ দখল করে, ভারতের শিল্পউত্পাদন ব্যবস্থাকে সমূলে ধংস করে, ভারতের চিরাচরিত শিক্ষাব্যবস্থা ধংস করে এক বিকশিত সভ্যতা থেকে অধস্তন দেশ হিসেবে গড়ে তুলবে। তার জন্য তার যা যা করণীয় ঠিক ততটুকু করতে পিছপা হয় নি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীরা। পলাশির পর প্রথম ৭০ বছর লুঠতরাজি চালাবার পর ভারত এবং তার মধ্যবিত্তকে নিজেদের দর্শণে পাখিপড়ারমতকরে গড়ে তুলেছে। ১৯০বছরের শাসন ব্যবস্থায় দেশ স্বাধীণ হয়েও ব্রিটিশ শিক্ষায় শিক্ষিত বিপুল সংখ্যক মধ্যবিত্ত আজও বিশ্বাস করে ব্রিটিশের ভারত শাসনের আগে ভারত এক গরীব পিছিয়ে পড়া দেশ ছিল, ব্রিটিশরা না এলে ভাকত পড়ে থাকত মধ্যযুগে, তথাকথিত নতুন প্রযুক্তি আর সমাজের বিকাশ ঘটত না। ব্রিটিশ যে শিক্ষাব্যবস্থার বীজ রোপণ করে গিয়েছে, সেই বীজ আজ মহীরূহ হয়ে শহরে শহরে ছড়িয়ে পড়েছে।
ব্রিটিশ সরকার দেশের অকেন্দ্রীভূত শিক্ষাব্যবস্থাকে ভেঙে, এমন এক শিক্ষাব্যবস্থার বীজ রোপণ করে গিয়েছিল, যে ব্যবস্থায় ভারতের বাস্তব সামাজিক পরিস্থিতির বিন্দুমাত্রও যোগাযোগ ছিলনা। যোগাযোগ থাকুক এমন কেনো উদ্দেশ্যও তাদের ছিল না। তত্কালীন বঙ্গের মহাবলীরা যে সময় হিন্দু কালেজ থেকে সে যুগে মাসে পাঁচ টাকা(ঠিক সেসময় কলকাতায় বিদ্যাসাগরমশাইএর পিতাঠাকুর ঠাকুরদাসমশাই দুটাকা রোজগার করেই নিজেকে স্বচ্ছল এবং গাঁয়ে অর্থ পাঠাবার যোগ্য ভাবতে শুরু করেছিলেন) দেয় অর্থে ব্রিটিশ পদ্ধতিতে পড়াশোনা করেছেন, তাঁরাও বিচ্ছিন্ন থাকতে চেয়েছিলেন কীনা সে বিষয়ে অনেকেই অনেক কথা লিখেছেন – বিশেষ করে ভারতের নবজাগরণ বিষয়ে গবেষণায় এধরণের অনেক তথ্য প্রকাশ পেয়েছে। সমস্যা হল, যে সব বামপন্থী, ডানপন্থী অথবা মধ্যপন্থী গবেষক এই বিচ্যুতি নিয়ে আলোচনা করেছেন, তারা প্রগতিকে দেখেছেন ব্রিটিশিয় প্রগতির শিল্পবিপ্লবীয় মাপকাঠিতে। ফলে দেশের মানুষ যখন স্বাধীণতা ঘোষণা করছেন, যখন গ্রামে গ্রামে সেনা আর চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে উদ্ভুত নব্য জমিদারদের লেঠেলরা মানুষমারার রক্ত হোলি খেলছে, দেশের সমাজ-শিল্পধংস করার পরিকল্পনায় মাতোয়ারা, শিল্পভিত্তিক গ্রামের পর গ্রাম মানুষ বাপদাদার বৃত্তি থেকে উচ্ছেদ হয়ে মজুরে পরিণত হচ্ছে, ভারতের অকেন্দ্রিকৃত সমাজের পরিকাঠামো ভেঙে যখন ব্রিটিশিয় নানান পরিকাঠামোর বীজ বোণা হচ্ছে, তখনকার অবস্থা বিশ্লেষণে গবেষকেরা হাহুতাশ করছেন যে, কেন বড় শিল্প স্থাপনে ভারতের ধণীরা উদ্যোগী হচ্ছেন না, ভারত তথা বাঙলার সমাজ ভেঙে কেন ব্রিটেনের সমাজের মতকরে ভারত তথা বাঙলাকে গড়ে তোলা হচ্ছে না।

ডান, বাম, সাবঅল্টার্ণ সব ঐতিহাসিক-গবেষকই ব্রিটিশ তথা ইওরোপের বিকাশের পথকেই একমাত্র বিকাশের পথরূপেই দেখেছেন। সাবঅল্টার্ণরা বলছেন ব্রিটিশেরা ভারতে অমিত অত্যাচার চালিয়েছে, ব্রিটিশেরা যাকে ডাকাত বলেছে, তাকে আমরা স্বাধীণতা সংগ্রামী বলছি। ঠিকই। অসম্ভব সাধুবাদযোগ্য প্রকল্প। কিন্তু, এর সঙ্গে সঙ্গে এটাও হয়ত পরোক্ষে মানতে বলছেন, ব্রিটিশদের তৈরি করা প্রায় সবকটি পরিকাঠামো, দর্শণ প্রগতিশীলতার লক্ষণযুক্ত। আমলাতন্ত্র, শিক্ষাব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থার আদতেই কিন্তু ন্যায়ের ধারণা ভিত্তিকরেই গড়ে উঠেছে। ভারতে সার্বজনীক ন্যায়ের ধারণাটি পশ্চিমের কাছ থেকে পেয়েছে, এ তথ্য লেখকদের ই-মেল করে দাবি করেছেন প্রখ্যাত ঐতিহাসিক রামচন্দ্র গুহন। ফলে দেশের গ্রামীণ মানুষ এক তিমিরে ভাবছেন, জাবন ধারণ করছেন, ঠিক বিপরীতে শহুরে, উচ্চবর্ণ অথবা পড়াশোনা করে প্রায়উচ্চবর্ণ হয়ে ওঠা মানুষেরাও ইংরেজি পদ্ধতিকেই নিজেদের সমাজ বিকাশের মোক্ষরূপে ভাবছেন। শহরে এসে উচ্চবর্ণের দেখানো পথকেই নিজেদের বিকাশের পথরূপে ভাবছেন। ভাবছেন সেই বিকাশের পথ রূদ্ধ করতুলছে উচ্চবর্ণ। শহরে এসে সকলেই কমবেশি নিজেরমতকরে উচ্চবর্ণীত হয়ে উঠছেন। আদতে ব্রিটিশ এককেন্দ্রিক দর্শণ চারিয়ে যাচ্ছে প্রায় প্রতিটি ইংরেজি জানা মানুষের মধ্যে। এরমধ্যে হয়ত হাতেগেণা কয়েকজন ব্যতিক্রমমাত্র।

ভারতের তৃণমূলস্তরের ব্যবসায়ী আর ব্যবসা৮, Grassroot Hawkers of India8

আবারও বলা যাক, বংশ পরম্পরায় এই তৃণমূলস্তরের ব্যবসায়ীদের হাত ধরে আজও বেঁচে এসেছে এ দেশ, ভারতবর্ষের উত্পাদন ব্যবস্থা, সর্বোপরি ভারতীয় গ্রামীণ সমাজ। ইংরেজদের বলপ্রয়োগে পরিকাঠামো ধংসযজ্ঞের পরও যতটুকু পরিমান ভারতের উত্পাদনব্যবস্থা বেঁচেবর্তেছিল, সেই উত্পাদন ব্যবস্থার অস্তিত্ব নির্ভর করত দেশিয় এই তৃণমূলস্তরের ব্যবসায়ীদের ব্যবসার জ্ঞাণে, পরিশ্রমে আর ভালবাসাসম ব্যবসায়। আজকের শহুরে ভারতের জ্ঞাণচর্চা নিজের চিরাচরিত পথ থেকে সরে, সরাসরি শেকড়ছেঁড়া পশ্চিমি জ্ঞাণ ও বিদ্যাচর্চার ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে, যার মূল মন্ত্র আর দর্শণ, সনাতন ভারতের অকেন্দ্রিকৃত সামাজিকতার দর্শণের সরাসরি বিপরীত। ভারতে আজ জ্ঞাণ ও বিদ্যাচর্চার প্রাঙ্গণে তাই ব্রাত্য তৃণমূলস্তরের ব্যবসার উদ্যমের নানানস্তর, নানান দিক চর্চার বিষয়টি। এর একটি বড় কারণ হল শিল্পবিপ্লব নির্ভর পশ্চিমি সভ্যতা কেন্দ্রীকরণের দর্শণে বিশ্বাসী এবং সেই দর্শণ ভিত্তিকরেই গড়ে উঠেছে মূলগত পশ্চিমি জ্ঞাণচর্চার প্রক্রিয়া, সেই পরিবেশে ভারতীয় গুণীদের জ্ঞাণের বিকাশ। উল্টোদিকে ভারতীয় গ্রামীণ সমাজের তৃণমূলস্তরের নানান উদ্যম সামগ্রিকভাবেই বিকেন্দ্রিকৃত দার্শণিকতার ভিত্তি।
তৃণমূলস্তরের ব্যবসায়ীরা এই ভারতীয় সমাজেরই অন্যতম বিকাশ শৃঙ্খল। সমাজের অন্যান্য অংশেরমতই তাঁরা তাঁদের অবদান পেশ করে এসেছেন হাজার হাজার বছর ধরেই সমাজের রীতি নীতি মেনেই, সামাজিক নানান বিধিবাধাবন্ধন মান্য করেই। শিল্পবিপ্লবোত্তর পশ্চিমি ব্যবসায়ীরা সমাজ শৃঙ্খলের সমস্ত বেড়াজাল ভেঙে পৃথিবীকে শোষণ করে ব্যক্তিগত সম্পত্তির পাহাড় বানিয়ে বিশ্বকে, মানব সভ্যতাকে ঠেলে দিচ্ছেন ধংসের মুখোমুখি, তখনই ভারতের তৃণমূলস্তরের ব্যবসায়ীরা, যাদের অন্যতম অংশ এই পথ ব্যবসায়ীরা, সেরিবা-সেরিবানের উত্তরাধিকারীরা, আজও চেষ্টা করে চলেছেন যতটুকু তাঁরা রোজগার করছেন, তাদের ব্যবসার জ্ঞাণের এক অংশ সমাজগঠণের কাজে লাগাতে, মুনাফা একহাতে জড়ো না করে সমাজের নানান অংশিদারের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে। বংশ পরম্পরায় তাঁরা সেই নৈতিকতা এবং সামাজিক ব্যবসার ধর্ম, জ্ঞাণটুকু অর্জন করেছেন। এই বিশ্বায়ণের লুঠেরা বাজারেও পথ ব্যবসায়ীরা যতটাসম্ভব পরম্পরা মেনে দেশিয় নানান দ্রব্য নিজেরা বিক্রি করার চেষ্টা করছেন নানান লোভ লালসার বেড়াজাল পেরিয়েও।

ভারতীয় শহুরে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে তৃণমূলস্তরের ব্যবসায়ীদের ব্যবসার পারস্পরিক রীতিনীতি সম্পূর্ণভাবে বিপরীতধর্মী হলেও, একটিমাত্র বিন্দুতে তারা পরস্পরের সঙ্গে মিলতেন, সেটি হল সামাজিক নিয়ন্ত্রণ মেনে ব্যবসা – দেশেই হোক আর বিদেশের মাটিতেই হোক, সমবায়িক সমাজের সুকঠোর অকেন্দ্রিভূত দর্শণের রীতিনীতি মেনে চলতেন তাঁরা। অন্ততঃ ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য স্থাপণের পূর্বে, ভারতীয় বণিকেরা সমাজের এঁকে দেওয়া সামাজিক রীতিনীতিবিশিষ্ট অদৃশ্য লক্ষণরেখা টকপাবার বিন্দুমাত্র প্রচেষ্টা করেননি। একরমই ছিল বণিকদের ওপর সমাজের নিয়ন্ত্রণ। অথচ এর তুঙ্গবিপরীতদর্শণবিন্দুতে দাঁড়িয়ে ইংলন্ডের শিল্পবিপ্লবের প্রাক্কালে সারা বিশ্বের সম্পদ লুঠ করতে বণিকের তুলাদন্ড, শাসকের রাজদন্ডে পরিণত হয়েছে অবলীলায়। বিশ্বের নানান প্রান্তের নানান দেশের নানান সমাজের প্রকৃতিক, সামাজিক, পরমার্থিক নানান ধরণের সম্পদ লুঠ আর চুরি (যে কোনও  সমাজেই তথ্য, জ্ঞাণ, সম্পদ আহরণের সূত্র লোপাট করে ফেলাকেই চুরি বলে বোধহয়) করে, এমনকী বলপ্রয়োগে নিজের দেশেরও সামাজিক নিয়ন্ত্রণ ভেঙে, মাটির তলার সম্পদকে প্রাকৃতিক সম্পদ আখ্যাদিয়ে, বলপ্রয়োগ করে দখল করে, কয়েকজন হাতেগোণা বণিকের উদ্যমে বিশ্বপণ্য, বিশ্বসম্পদ বাজার দখলের চেষ্টা শুরু হয়েছিল। মনেরাখতে হবে, ভারতীয় বণিককে সেই অবাধ বাণিজ্যের, অবাধ উত্পাদনের ছাড়পত্র শহুরে অথবা গ্রামীণ সমাজ কোনও দিনই দেয় নি। একদা বিশ্ববাজারে যেসব ভারতীয় পণ্যদ্রব্য প্রায় একচেটিয়া ব্যবসা করত সেগুলোর মধ্যে কাপড় ছোপানোর নীল রং যার ব্যবসায়ী নাম ইন্ডিগো, অথবা ডেকরা কামারদের তৈরি লোহারমন্ড, তাঁতিদের তাঁত অথবা রেশম তন্তু, বাঙলার সুপুরি, হাতি ইত্যাদি ছিল অন্যতম চাহিদাবন্ত পণ্যবস্তু।

ভারতের তৃণমূলস্তরের ব্যবসায়ী আর ব্যবসা৭, Grassroot Hawkers of India7

পশ্চিমি ব্যবসা অথবা উত্পাদন প্রক্রিয়ার একটা বড় প্রক্রিয়াই হল ব্যবসা অথবা উত্পাদনের একচেটিয়াকরণ, আজকের ব্যবসার ভাষায় কনসোলিডেশন। আজ ভারতীয় বড় ব্যবসায়ীরা দার্শণিকভাবে সেই দর্শণএর অংশিদার। কিন্তু তৃণমূলস্তরের ব্যবসায়ীরা তাঁদের পালক সমাজের চিরাচরিত সামাজিক রীতিনীতি মান্যকরেই সামাজিক বিকেন্দ্রিক পণ্য উত্পাদকদেরমতই কোনও  ব্যবসাকেই একজন অথবা এক ব্যক্তির একচেটিয়া ব্যবসারূপে প্রতিভাত করার চেষ্টা করেন নি কোনও দিনই। ব্যবসায় অথবা উত্পাদনে ব্যক্তিগত দখলদারি ছিল সমাজেরকাছে ঘৃণ্য দর্শণ। চিরাচরিত সমাজে তাই ব্যবসাজাত মুনাফা একহাতে না রেখে বেঁটে দিয়েছে সমাজের নানান স্তরে।
তৃণমূলস্তরের ব্যবসার অন্যতম বড় দর্শণ, সাম্যবোধেরভাব। পশ্চিমি জ্ঞাণ আর শিক্ষাচর্চার দর্শণ অনুসরণ করে ছোট ব্যবসায়ীদের বড় ব্যবসায়ী হয়ে ওঠাকে এতদিন পর্যন্ত সামাজিক প্রগতির অন্যতম সহায়করূপে ভেবে নেওয়া হয়েছে, এবং এই প্রক্রিয়াকে সহর্ষে সমর্থনও করা হয়ছে মধ্যবিত্তপোষিত নানান গবেষণা উদ্যমে, এমনকী বামপন্থী রাজনৈতিক আঙিনাতেও। লেখকদের দৃঢ় বিশ্বাস, চোখের সামনে থেকেও সহজে দেখতে না পাওয়া, এই তৃণমূলস্তরের ব্যবসায়ীদের বড় ব্যবসায়ী না হয়ে ওঠার দর্শণএর মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে এদের প্রতি শাসক মধ্যবিত্তিয় অবহেলার প্রতিক্রিয়া। মধ্যবিত্তের গবেষণায় তাই এতদিনই উজ্জ্বলসম বড় ব্যবসার প্রক্রিয়াই নজরে এসেছে। সে তথ্য জেগাড় করাও তুলনামূলকভাবে সহজ। পশ্চিমের বিদ্যাচর্চা বড়ব্যবসার গুণগ্রাহী। তাদের পাতে সহজে সে তথ্য পরিবেশন করলে প্রচারলাভ ঘটে। তবুও অনেকসময় মনে হয় আবার নতুনভাবে নতুন দর্শণে পুরোনো ভারতীয় সাম্যভাবী ব্যবসার, উত্পাদনের নীতিতে কী ফিরে যেতে পারি না। পারিনা যদি সিদ্ধান্তও হয়, তাহলে কী তৃণমূলস্তরের উত্পাজন এবং ব্যবসার উদ্যমের এই আলোচনাও কী ব্রাত্য থেকে যাবে!

তৃণমূলস্তরের ব্যবসার মূলগ্রন্থিটি ছিন্ন হয়ে যায়, রাষ্ট্রভিত্তিক ইংরেজ শাসন, দেশের পারম্পরিক উত্পাদন আর ব্যবসার পরিকাঠামোকে ধংস করে দেওয়ার পর থেকেই। হাজার হাজার বছর ধরে বিকশিত বাঙলার পারম্পরিক সামাজের রীতিনীতিগুলি ছিন্ন করে ব্রিটেনে বিকশিত কেন্দ্রিভূত নেশনরাষ্ট্রভিত্তিক দর্শণএর গোড়াপত্তন করা হয় এদেশে। বিকশিত ভারতীয় সমাজের নানান রূপরসগন্ধও একইসঙ্গে বিলীন হয়ে যেত শুরু করে এই উত্পাদন আর ব্যবসার ব্যবস্থা ধংসের মধ্যে দিয়ে। এর আগেই আমরা বলেছি, পথ ব্যবসায়ী অথবা তৃণমূলস্তরের ব্যবসায়ীরা এই দেশজ উত্পাদকেদের সঙ্গে সরাসরি আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়েছিলেন। তাই দেশজ উত্পাদকেদের পরিকাঠামো জ্ঞাণভান্ডার ধংসের সঙ্গে সঙ্গে তৃণমূলস্তরের ব্যবসায়ীদের অবস্থাও আর্থিক ও সামাজিকভাবে নিম্নাভিমুখী হয়ে পড়ে। তবুও তৃণমূলস্তরের পথ ব্যবসায়ীদের তৈরি পরিকাঠামোর মজা হল, এরা গায়েগতরে খেটে, তৃণমূলস্তরে দাঁড়িয়ে থেকে যে বাজারটি তৈরি করেছেন দার্ঘ দিন ধরে, সেই বাজারে সহজে অন্য এককেন্দ্রিক ব্যবসায়ীর দখলি প্রবেশ খুব সহজে হয় না। এঁদের ক্রেতা যেহেতু মূলতঃ ছোট গৃহস্থ এবং এক্কেবারে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, তাই ক্রেতা-বিক্রেতার সরাসরি ব্যক্তিগত সম্পর্কও তৈরি হয়ে পড়ে খুব সহজেই। ভারতীয় তৃণমূলস্তরের ব্যবসার রীতিনীতি মেনে শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে কিন্তু সম্পর্কটুকু। এই সম্পর্ক দিয়ে তৈরি হয় মানবিকতা।

ভারতের তৃণমূলস্তরের ব্যবসায়ী আর ব্যবসা৬, Grassroot Hawkers of India6

ইংরেজ আমলে কলকাতায় আশ্রয় নেওয়া বাঙালির নুনের ব্যবসায় নজর ফেলে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে, সরকার অথবা রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত লবন মহলে, লবন উত্পাদন করে কলকাতায় নিয়ে এসে বিপুলপরিমান লবন নীলামবাজারে তুলেদিয়েই হাত ধুয়ে ফেলত ইংরেজ। বাজার থেকে ইংরেজ আশ্রিত বাঙালি নানান পাইকার, সেই লবন নীলাম বাজার থেকে কিনে তার গোষ্ঠীভূক্ত ব্যবসায়ী মার্ফত ছড়িয়ে দিতেন জেলার বাজারে, জেলার পাইকারদের হাতে, যার উল্লেখ বিশদে করা হয়েছে আগেই। জেলার পাইকারদের কাছ থেকে কিনে নিয়ে আরও একধরণের ব্যবসায়ীরা লবন ছড়িয়ে দিতেন নানান আঞ্চলিক বাজারে। কলকাতার বাজারে যিনি খুচরো ক্রেতা তিনি আবার জেলার বাজার পাইকার। এই আঞ্চলিক বাজার থেকে আরও গভীরে পণ্য পরিবহন করে নিয়ে যেতেন কিন্তু পথ ব্যবসায়ীরাই। শুধু নুনই নয়, হাজারো উত্পাদকের পণ্যদ্রব্য বাঙলা তথা ভারতের নানান গ্রামে গঞ্জে পথে প্রান্তরে পৌঁছে দিতে মাহির ছিলেন এই তৃণমূস্তরের পথ ব্যবসায়ীরা।
ভারতবর্ষের মূল সামাজিক দর্শণ আলোচনার সময় আমরা দেখেছি, ভারতের হাজারো সমাজ নিদেরমত করে শাসনের নীতি তৈরি করে নিয়েছিল। কোনও  শাসকের উপায় ছিলনা সেই স্বশাসিত ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ করে। নিজেদের শাসন এলাকায় গ্রামীণরা নিজেরই স্বরাট। প্রত্যেকটি গ্রামগোষ্ঠী উত্পাদনের সঙ্গে প্রশাসনকর্মেও ছিল স্বয়ংসম্পূর্ণ। একটি সমাজের শাসননীতি অন্যসমাজের সেই নীতির সঙ্গে নানান ধারায় নানাবিধ পার্থক্য থাকতেই পারত, সেটাইছিল স্বাভাবিক। শুধু একটি মৌলিক বিষয়ে ভারতের গ্রামগোষ্ঠীগুলি একাট্টা ছিল সেটি হল স্বশাসিত শাসন ব্যবস্থা। ভারতীয় সমাজের নানান বিভাগ সাধারণে অসাধারণ বিকেন্দ্রিকতার দর্শণ নিষ্ঠাভরে পালন করত। এবং সে অর্থে কোনও  কেন্দ্রিভূত শক্তিদ্বারা চালিত হত না বলেই মস্ত এক সভ্যতার রথের চাকা গড়গড়িয়ে চলেছে হাজার হাজার বছর ধরে। পশ্চিমি লুঠভিত্তিক শিল্পবিপ্লবজাত সভ্যতারমত কয়েক শতকেই ভেঙেপড়ার অবস্থা হয় নি। তাকে ধংসকরতে গিয়ে লড়াই চালাতে হয়েছে প্রায় একশতাব্দ।
এই অকেন্দ্রিভূত সভ্যতার অন্যতম বড়, গুরুত্বপূর্ণ অংশিদার ছিলেন আমাদের আলোচ্য তৃণমূলস্তরের ব্যবসায়ীরা, যারা সমাজের মৌল দর্শণবিন্দুটুকু মেনে সমাজের নানান উত্পাদন পৌঁছে দিতেন অন্যান্য সমাজের দোর গোড়ায়। বংশপরম্পরায় তাঁরা এই কাজটি করতে গিয়ে নিজেদেরমতকরে একটি ব্যবসাভিত্তিক জ্ঞাণভান্ডার রচনা করতে পেরেছিলেন, যার মৌল উদ্দেশ্য ছিল সমাজেরমধ্যে মানুষে মানুষে যতটাসম্ভব সাম্যবোধেরভাব তৈরি করা। বড় পাইকারি ব্যবসার অন্যতম অন্তর্নিহিত দর্শণ মানুষে মানুষে বিভেদ, কেন্দ্রিকতা আর অবশ্যম্ভাবীভাবে ব্যক্তির অথবা সংস্থার অতিরিক্ততম মুনাফা অর্জণ। সব থেকে বড় কথা এই শহর কেন্দ্রিক বড় ব্যবসাগুলির সঙ্গে ভারতীয় সমবায়ী সমাজগুলির মৌলকাঠামো দর্শণের বিন্দুমাত্র মিলমিশ ছিলনা। শহুরে বড় ব্যবসায়ীদের ব্যবসা দর্শণএর অন্যতম উদ্দেশ্য হল মানুষে মানুষে বঞ্চনা আর বিভেদ সৃষ্টি আর ব্যবসার মাধ্যমে অমিত ঐশ্বর্য নিজের হাতে আনয়ণ।
অথচ ঠিক উল্টো দর্শণে বিশ্বাসী ছিলেন কিন্তু ভারতীয় তৃণমূলস্তরের ব্যবসায়ীরা। তাঁদের অন্যতম দর্শণ মানুষের মধ্যে বেঁচে থাকা, মানুষকে নিয়ে বাঁচা। দৈনন্দিনের নানান চাহিদাবস্তুগুলি তাঁরা মানুষের দোরে দোরে পৌঁছনোর কাজ করতেন সমবায়ী সমাজের বিকেন্দ্রিকতার সূত্র মেনেই। এঁদের কাজে মুনাফা একটা বড় ব্যাপারছিল সন্দেহ নেই, কিন্তু এঁরা কেউই কিন্তু দার্শণিকভাবে সবমুনাফা একহাতে নিয়ে আসার বিরোধী ছিলেন, আজও আছেন। এর আগে সোনাধর বিশ্বকর্মার উদ্যম আলোচনায় দেখেছি সনাতন সমবায়ী সমাজ ব্যক্তির হাতে অতিরিক্ত পুঁজি কেন্দ্রিভূত হওয়ার নীতির ঘোরতর বিরেধী ছিল।

ভারতের তৃণমূলস্তরের ব্যবসায়ী আর ব্যবসা৫, Grassroot Hawkers of India5

স্বাধীণতার পর গ্রামীণ সমাজবদ্ধ মানুষদের ইংরেজি পড়াতে, ইওরোপের ধাঁচে শিল্প পরিকাঠামোয় যোগ্য করে তুলতে, নতুন উত্পাদনব্যবস্থায় টেনে আনতে রাষ্ট্রব্যবস্থার অর্বুদ পরিমান অর্থ ব্যয়িত হচ্ছে। কিন্তু সাদাচোখে দেখা যাচ্ছে, কাজের কাজ খুব একটা কিছু হচ্ছে না। এই কাজে গ্রামীণ মানুষের অংশগ্রহণই নেই। বিশাল সংখ্যক এই মানুষেরা যে সমাজে বাস করতেন, সেই সমাজকে বলপূর্বক ভেঙে দেওয়া হয়েছে মধ্যবিত্ত পরিচালিত রাষ্ট্রব্যবস্থার নানান পরিকাঠামো ব্যবহার করে। ইংরেজদের নীতি অনুসরণ করতেগিয়ে প্রশাসনে এবং পাইকারি ব্যবসার বড় অংশে উচ্চবেতনের চাকরি দখলকরে রাখা মধ্যবিত্তরাই আজও কেন্দ্রিকৃত দর্শণে বিশ্বাসী এবং আজও তৃণমূলস্তরে সেই নীতিই প্রয়োগ করে চলেছেন। পশ্চিমি নানান দর্শণের প্রভাবে আজও তারা চেষ্টা করে চলেছেন সেই শহুরে পাইকারি ব্যবসা পরিকাঠামোর গ্ল্যামার বৃত্তান্ত প্রচারের। তৃণমূলস্তরের ব্যবসার মূলগত প্রকৃতিই হল অকেন্দ্রীকৃত ব্যবসার নীতি যা আদতে চোখে পড়ে না। এই ব্যবসা কেন্দ্রিকৃত শক্তির পক্ষে চিরকাল দখল রাখাও কঠিন। সেই ব্যবসায় আঘাত করেও অতীতের অভিজ্ঞতায়দেখা গিয়েছে, সামরিক কেন্দ্রিভূত দৃঢ়তায় সাময়িক সাফল্য পাওয়া গেলেও, এক সময়ে সেই সফল্য কর্পুরেরমত উবে গিয়েছে। বাঙলায় অন্ততঃ তৃণমূস্তরে ব্যবসা দখলের ইংরেজি সাফল্য খুব একটা দীর্ঘস্থায়ী হয় নি।
ভারতবর্ষের বিভিন্ন সনাতন সমবায়ী সমাজের বিকেন্দ্রভূত দর্শণকে তাঁদের ব্যবসার মাধ্যমে বাঁচিয়ে রাখতে সাহায্য করেছেন তৃণমূলস্তরের পথ ব্যবসায়ীরা। পথ ব্যবসায়ীরা ছিলেন বলেই ভারত সমাজের ছোট ছোট উত্পাদকেরা, লুঠেরা ইংরেজদের সময়েও তাদের উত্পাদিত নানান দ্রব্য স্থানীয় অথবা আঞ্চলিক বাজারে এমনকী ব্যক্তিমানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছনোর কাজ করতে পারতেন। বৌদ্ধ আমলের সৃষ্টি জাতকের সেরিবা সেরিবানের গল্প আমরা অনেকেই জানি। এঁরা মাথার ঝাঁকা নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় ঘুরতেন স্থানীয় উত্পন্ন দ্রব্য বিক্রি করতে। এ ছাড়াও পঞ্চতন্ত্র অথবা নানান অতীতের সাহিত্যে ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের উত্পন্ন দ্রব্য বিভিন্ন এলাকায় পাওয়া যাওয়ার উল্লেখ রয়েছে। এই কাজগুলিও করতেন এই পথ ব্যবসায়ীরা। যেহেতু পাইকারদের সঙ্গে দামদস্তুর করা বেশ ঝামেলার কাজ ছিল, সেহেতু এই ধরণের তৃণমূলস্তরের ব্যবসায়ীদের হাত ধরেই অনেক শিল্পী সমাজই বেঁচে থাকতেন, নিজেরদের আবিষ্কারকে বাঁচিয়ে রাখতে পারতেন, আবার কেউ কেউ উত্পাদনের সঙ্গে ব্যবসাও করতেন সমান তালে। এই দুই পরস্পরেরপ্রতি নির্ভরশীল গোষ্ঠীবদ্ধ সমাজ দার্শণিকভাবেও পরস্পরের সঙ্গে টান অনুভব করতেন।
পূর্ব মেদিনীপুরের চন্দনপুরের কাঁসার নানান দ্রব্য যারা তৈরি করেন, তাঁরা লেখকদের জানিয়েছিলেন, সুদূর অতীত থেকেই পাইকারদের তাঁরা ধারে পণ্যদ্রব্য বেচতেন ঠিকই, কিন্তু সেই ব্যবসা এই গ্রামীণ উত্পাদকদের পক্ষে খুব সুখপ্রদ হত না। পাইকারদের পাশাপাশি ছিলেন নানান খুচরো বিক্রেতা, যারা প্রাথমিকভাবে ধারে এই বিচিত্র ধরণের উত্পাদিত দ্রব্য ঝাঁকায় নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন বৃহত বাঙলার নানান অঞ্চলে – ওড়িশা, বিহার(এখন কিছুটা ঝাড়খন্ড), অসম রাজ্যের গাঁয়ে গাঁয়ে। সেখানে সহজেই গ্রমীণদের কাছে বিক্রি করতেন এইসব কাঁসার দ্রব্য। তাঁরা বিক্রি করে এনে দাম মেটাতেন নানান উপায়ে – কখোনো অর্থ, কখোনোবা পণ্যে। তৃণমূলস্তরের খুচরো ব্যবসায়ীরাই ভারতের নানান খোলা বাজারে সাধারণ গৃহস্থ, ছোট ব্যবসায়ীদের নানান নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য বিক্রি করতেন বিভিন্ন হাট, মেলা, উত্সব, পরব, পুজোসহ নানান মানব সংমিলনে। আজও আমরা দেখি বিভিন্ন পারম্পরিক মেলা, উত্সবে সারা ভারত থেকেই নানান পারম্পরিক ব্যবসায়ী বিভিন্ন এলাকার উত্পাদিত দ্রব্য নিয়ে এসে বিক্রি করছেন। এই প্রচেষ্টাটি কিন্তু অতীতেও ছিল। বাণভট্টের হর্ষচরিতে উজ্জয়ণীর হোলি উত্সবের সাড়ম্বর বর্ণনায় পথ পাশের দেকানগুলির বর্ণনা যেমন পাওয়া যাচ্ছে, তেমনি পরোক্ষে অস্থায়ী নানান দেকানদারদের কথাও তিনি উল্লেখ করছেন। পারস্পরিক একটি নির্ভরতাবোধও ছিল সমমাজের নানান সেবা প্রদাণকারী এবং উত্পাদক-তৃণমূলস্তরের পণ্য বিক্রেতাদের মধ্যে। আজ মধ্যবিত্ত আমলারা এয় উদ্যম উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ধংস করে দিয়েছেন বড় পুঁজির স্বার্থে। নিরক্ষর ঝাঁকাওয়ালাদের কাগজপত্রদেখতে চাওয়া হয়, হিসেব চাওয়া হয়, নানানভাবে হেনস্থাও করা হয়। কাগজ না থাকলেই জরিমানা। মুখে বর্ণিত ইতিহাসের চর্চা করি পশ্চিমের দেখাদেখি, ঐ টুকুই। সে যে গবেষণা। বাস্তবে কাগজ না থাকলে সবই মিথ্যে। ফেরিওয়ালারা বলেন ভিক্ষে চাই না মা, কুকুর সামলাও। নিজের দেশে যেন নিজেরাই পরদেশি।

ভারতের তৃণমূলস্তরের ব্যবসায়ী আর ব্যবসা৪, Grassroot Hawkers of India4

বাঙলার ব্যবসায়ী সংক্রান্ত স্তবকে যে ব্যবসায়ীদের কথা উল্লিখিত হয়েছে, তা মূলতঃ বড় পাইকারি ব্যবসায়ীদের কথা। শুধু ইওরোপিয় ব্যবসার দার্শণিকেরাই নয়, বাঙলার তথা ভারতের ব্যবসায়ীদের কথা আলোচনায় এতদিন শুধু বড় ব্যবসায়ীদের কথা আলোচিত হয়ে এসেছে, সে বুদ্ধসখা-অনুগামী নানান শ্রেষ্ঠীপুত্ররাই হোন অথবা বাঙলার নানান কাব্যে উল্লিখিত বিদেশে বাণিজ্যে যাওয়া প্রখ্যাত শ্রেষ্ঠীরাই হোন। ইংরেজের তৈরি করে দেওয়া দার্শণিক ও জ্ঞাণচর্চার প্রথার বাইরে বেরিয়ে এসে বাঙলা তথা ভারতের নতুন করে পরিচয় খোঁজার সময়ে, এই কাজটি আজও যদি বক্ষ্যমান পুস্তকের সম্পাদকেরাও করেন, কেন্দ্রিকৃত দর্শণের পথে হাঁটার চেষ্টা করেন, তাহলে কিন্তু তারাও অন্যদেরমত একদেশদর্শীতার অভিযোগে অভিযুক্ত হবেন। তাই সময় এসেছে তৃণমূলস্তরের যে সব ব্যবসায়ী গোষ্ঠী-মানুষ তাঁদের নিজেদের পরিচয়ে স্বীকৃত হন নি, তাঁদের আজ স্বীকৃতি দেওয়ার উদ্যম গ্রহণের। অস্বীকার করার যুক্তি নেই যে বড় পাইকারি বৈদেশিক ব্যবসায়রত ব্যবসায়ীরা ভারত তথা বাঙলার সমাজের সাবেক উন্নতিতে অভূতপূর্ব সাহায়তা দিয়েছেন। বিশেষ করে বিশ্বের নানান প্রান্তে বাঙলা তথা ভারতীয় ছোট উত্পাদকদের নানান সূক্ষ্মতম শৈল্পিক পণ্যদ্রব্যের বাজার তৈরি করে ভারত তথা বাঙলার তৃণমূলস্তরের কারিগর ও শিল্পীদের বিশ্বের মানচিত্রে নতুন করে স্থান করে দিয়েছেন। তাই এতদিন ধরে যে সব পাঠ্যপুস্তকের জ্ঞাণচর্চাভিত্তিক ভারতীয় ব্যবসা আর ব্যবসায়ীদের নিয়ে গবেষণাকর্ম হয়েছে তাতে একটা বড় পরিশ্রম ব্যায়িত হয়েছে বিশ্ববাজারে ভারতীয় পাইকারি ব্যবসায়ী আর তাদের ব্যবসার নানান উদ্যম, প্রক্রিয়া বিশ্লষণে। ভাল কথা সন্দেহ নেই। বহু গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা, প্রখ্যাত গবেষক এই বিষয়ে নিরবিচ্ছিন্নভাবে কাজ করেছেন, সমৃদ্ধ ভারতের অর্থনীতির নানান পরিকাঠামো তুলেধরেছেন তা সাধুবাদযোগ্য। গৌতম ভদ্র, অশীন দাশগুপ্তেরমত প্রথিতযশা ঐতিহাসিকদের ক্ষুরধার বিশ্লেষণী মস্তিষ্ক এই উদ্যমকে নতুন আলোয় দেখাতে চেষ্টা করেছেন।
অথচ বিশ্ব বাজারের ভারত তথা বাঙলার সাফল্যের বাইরেও বড়রকমভাবে ভারতমহাদেশিয়স্তরে, আঞ্চলিকস্তরে, স্থানীয়স্তরেও নানানস্তরীয় সমাজে লাভজনকভাবে ব্যবসা হত, সে তথ্য কিন্তু মধ্যবিত্ত গবেষক ঐতিহাসিকদের খুব একটা নজরে সহজে আসে নি, হাতেগোণা কয়েকজনের কাজ ছাড়া। এদের মধ্যে চিত্তব্রত পালিত, প্রাঞ্জলকুমার ভট্টাচার্য, ইন্দ্রজিত রায় প্রভৃতি অন্যতম। সেই ব্যবসা সম্পাদন করতেন কারা সেই প্রশ্ন আজ তোলা নিতান্ত করণেই দরকার। শহরবাজারের আপাত ঔজ্জ্বল্যের বাইরে যে বিশাল গ্রামীণ জনসমষ্টি বাস করতেন, যাদের বাস্তবিক চাহিদা নিতান্তই স্বল্প, গৃহস্থালিরর দৈনন্দিনের নানান অগৌরবমন্ডিত অথচ বর্ণময় কর্মসম্পাদনে, নানান ব্যক্তিগত অথবা গোষ্ঠীগত আচার-আচরণ পালনে, পুজা-পার্বণ-উত্সবে, বছরভর নানান সাংস্কৃতিক ক্ষুত্পিপাসা মেটাতে, সামাজিকতার নানান গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সম্পাদনে, ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের সমাজের উত্পাদকের উত্পাদিত পণ্য ন্যুনতম পরিমানে প্রয়োজন হত সারা বছর জুড়ে। সেই চাহিদা কারা পূর্ণ করতেন, কিভাবে পূর্ণ করতেন, সেই প্রশ্ন আজকে তোলা অবশ্যই প্রয়োজন। লেখকদের ধারণা এর উত্তরেই লুকিয়ে থাকতে পারে চোখে না দেখতে পাওয়া ভারতের তৃণমূলস্তরের উত্পাদন আর ব্যবসার পরিকাঠামোর ভিত্তিমূল। বিশেষ করে ভারতের এক এলাকার উত্পন্ন দ্রব্য অন্য এলাকায় বয়ে এনে, সেই বাণিজ্য কী ভাবে সম্পাদিত হত তার পদ্ধতিও আলোচনায় নিয়ে আসা জরুরি। পাইকারি ব্যবসায়ীদের আপাত প্রাচারমাধ্যমের ঔজ্জ্বল্যের পাশাপাশি দেশজ বাজারে সক্রিয়ভাবে, সমাজের রীতিনীতি মেনে অংশগ্রহণের কাজটিও যে কোনও ভাবেই ন্যুন ছিলনা, সেই কথা কম্বুকণ্ঠে ঘোষণার সময় এসেছে আজ। এই চোখে দেখা না যাওয়া ব্যবসার কাজটি অসম্ভব প্রার্থিত দক্ষতায় রূপায়িত করতে পারতেন ভারতজোড়া তৃণমূলস্তরের সমাজভিত্তিক ব্যবসায়ীরা। বিশ্বে ভারতের আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ীদের অবদান নিয়ে বহুআলোচনা হয়েছে কিন্তু তার কয়েকভগ্নাংশও যদি ভারতে ভারতীয় তৃণমূলস্তরের ব্যবসায়ীদের কর্মকান্ড নিয়েও আলোচিত হত, তাহলে কিন্তু নতুন উদ্যম, নতুন অবদানের, ভারতীয় সমাজের নতুন পরিচয় পাওয়া গেলেও যেতে পারত।
বাঙলার ব্যবসা এবং নানান ব্যবসায়ীদের আলোচনায় আমরা দেখেছি, ইংরেজ আমলে ইংরেজ আশ্রয়ে না থাকা আমবাঙালি-ভারতীয় ব্যবসায়ী এবং তাদের ব্যবসার পরিকাঠামো সবলে ভেঙেদেওয়া হয়েছে। এই কাজে ইংরেজ শাসক বণিকদের সহায়তা দিয়েছেন বাঙলারই কিছু ইংরেজ আশ্রিত প্রখ্যাত ধনী, দাদনী বনিকেরা। ইংরেজরা গায়ের জোরে বাঙলায় আমপাইকারি ব্যবসায়ীদের ব্যবসা দখল করে নেয়। গ্রামীণ উত্পাদকদের পণ্যদ্রব্য সম্বল করে তৃণমূলস্তরে যে সব বাঙালি ব্যবসায়ী কাজ করতেন, সেই ব্যবসা ধংসকরার কাজ করেছেন ইংরেজ প্রশাসক এবং ইংরেজের প্রাসাদধণ্য বাঙালি ব্যবসায়ীরা। দেশের উত্পাদন পরিকাঠামো ভাঙার পর, বিশেষ করে ইংলন্ডের দৈত্যমস বড় বড় কলে উত্পাদিত পণ্যদ্রব্য গ্রামেগঞ্জে বিক্রিকরতে বাঙলার তৃণমূলস্তরের ব্যবসায়ীদের শ্রমে তৈরি গ্রামের বাজার দখল করা উদ্যম নেওয়া হয়েছিল ইংরেজ অথবা তার আশ্রিত ব্যবসায়ীদের নানান প্রচেষ্টার দ্বারা। বাঙলা সাহিত্যে এই পর্বের খুব বিস্তৃত উদাহরণ না পাওয়াগেলেও কিছুটা চন্ডীচরণ সেনের নন্দকুমার এবং... উপন্যাসে, রবীন্দ্রনাথের ঘরে বাইরে উপন্যাসে অথবা চারণ কবি মুকুন্দদাসের নিরন্তর অতিমানবিক সংগ্রামের গানে, নিতান্ত কিছু অখ্যাত সাধারণ সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে এই সংগ্রামী পরিস্থতির তুল্যমূল্য কিছু উদাহরণ পাওয়া যাবে। আজ, এই বিশ্বায়িত ভারতের বদলে যাওয়ার তরল সময়ে সেই উদাহরণ একটু কষ্টকরে খোঁজার চেষ্টা করতে হবে। গ্রামেগঞ্জে বাঙলার হাতেবোনা তুলনামূলকভাবে দামি কাপড়ের বদলে, মিলের শস্তাতম কাপড়, বিদেশি কাঁচের চুড়ি, রামমোহন রায়ের সুপারিশে ব্রিটিশ নুন খাওয়ানোসহ নানান উত্পাদিতদ্রব্য বিক্রির প্রচেষ্টা খুব সম্ভব খুব বেশিভাবে সফল হয় নি। সমগ্র ভারতের কথা লেখকেরা হয়ত বলতে পারবেন না, কিন্তু বাঙলার প্রণম্য গ্রামীণ মানুষ বহু সময়েই সে সব বিদেশি পণ্যদ্রব্য প্রত্যাখ্যন করার চেষ্টা করেছেন, নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে, তার প্রমাণ আজও রয়েছে সমাজ জুড়ে।

বাঙলার গ্রামীণ মানুষদের আজও তাঁর নিজস্ব সভ্যতার প্রতি টান বিগত আড়াইশ বছর ধরে ভেঙে পড়া সময়েও অটুট রয়েছে। অটুট রয়েছে নিজেদের অবাধ ভালবাসা দিয়ে তৈরি দেশজ সমাজের নানান সূত্রের প্রতি অসম্ভব আস্থারভাব। ১৭৬৩ থেকে ফকির-সন্ন্যাসীদের লড়াইতে ভারতজোড়া যে ব্যাপক স্বাধীণতা সংগ্রামের শুরু, সেই স্বাধীণতা সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় দেশস্বাধীণ হয়েছে, আমরা সকলেই অসীম গর্ব অনুভব করেছি। সত্যিই। কিন্তু স্বাধীণতার পর মধ্যবিত্ত ভারতের শাসন ক্ষমতা দখলের পর, বিপরীতে গ্রামীণেরা কী দেখলেন! গ্রামীণেরা নিজের অভিজ্ঞতায় দেখেছেন স্বাধীণতার পরও ইংরেজদের অনুসৃত নানান সামাজিক, রাষ্ট্রীয় নীতির মৌলিক কাঠামোর খুব বেশি পরিবর্তন হল না। বিদেশি অনুসৃত নীতিগুলির ভারতীয়করণ হলমাত্র। পঞ্চতন্ত্রের দর্শণ অনুসরণে বলাযায়, কে যেন কার চামড়া গায়ে পরে মনভোলাবার কাজ করেচলেছে। গ্রামীণ ভারত জানে দেশে মৌল পরিবর্তন আসে নি। ১৭৬৩থেকে দেশের গ্রামীণ বিদ্রোহী মানুষেরা অনেকে তাদেরমতকরে নানাভাবে স্বাধীণতা সংগ্রামের দীপ জ্বালিয়ে চলেছেন – কেউ সশস্ত্র বিদ্রোহের পথ ধরেছেন কেউ বা এই রাষ্ট্র ব্যবস্থায় অংশ না নিতে বদ্ধ পরিকর, কেউবা পুরাতন সমাজব্যবস্থায় টিকে থাকতে বদ্ধপরিকর।

ভারতের তৃণমূলস্তরের ব্যবসায়ী আর ব্যবসা৩, Grassroot Hawkers of India3

দর্শণটির তাত্বিকদের বক্তব্য ইওরোপের শিল্প বিপ্লবের এবং ব্যাপক নিখুঁত প্রযুক্তির বিকাশ এবং তত্কান্ডে ইওরোপের প্রযুক্তি আর অর্থনৈতিক বিকাশের পিঠেপিঠি যে কান্ডটি ঘটেছে, সেটি হল তথাকথিত পিছিয়ে পড়া বাঙলা, ভারত অথবা এশিয়ার নানান দেশের প্রাগৈতিহাসিক উতপাদন ব্যবস্থা স্বাভাবিক পদ্ধতিতেই মৃত্যুবরণ করেছে। এর জন্য ইংরেজ সাম্রাজ্যের ওপর দোষ চাপানো এশিয়দের বরাবরের ঘৃণিত উদ্দেশ্যপ্রণোদিত উদ্যম। এই তত্ব বহুপ্রাচীণ। আজকের ইওরোপে এই মিথ-মিথ্যাভিত্তিক তত্বের সফলতম প্রবক্তা পি জে মার্শাল – এবং তাঁর অনুগামী বহু ভারতীয়, বলাভাল বহু বাঙালি মণীষা। তিনি এবং তাঁর সঙ্গীসাথীরা বলার চেষ্টা করছেন, শিল্পবিপ্লবজাত পশ্চিমি নতুন সমাজের বিস্তৃত এবং উন্নততর উত্পাদন ব্যবস্থা সমগ্র ইওরোপে, এশিয় দ্রব্যের চাহিদার অন্ত ঘটায়। ফলে চাহিদার অভাবে ক্রমশঃ ভারতীয় তথা এশিয় উত্পাদনব্যবস্থা প্রায় মৃত্যুমুখে ঢলে পড়তে থাকে।
ভুক্তভোগী ভারতীয়রা এর উত্তরে বলতে পারেন ভারত তথা বাঙলা লুঠের সম্পদে আর জ্ঞাণে ইওরোপে যে দৈত্যসম উতপাদন পরিকাঠামো আর সেই উত্পাদনব্যবস্থাজাত পণ্যের বাজার তৈরি হয়েছে, তার প্রধাণ অনুঘটক ছিল গায়ের জোরে বাঙলা তথা ভারতীয় জ্ঞাণচর্চা, উত্পাদন পরিকাঠামো আর বাণিজ্য ব্যবস্থাকে ধংস করা। নইলে ভারতজুড়ে ইওরোপিয় জ্ঞাণ, প্রযুক্তি আর উত্পাদিত দ্রব্যের বাজার গড়ে উঠতে হয়ত পারত না। চিরাচরিত এশিয় জ্ঞাণ-প্রযুক্তি চুরি, জাগতিক সম্পদ লুন্ঠণ এবং সামাজিক উত্পাদন এবং ব্যবসার পরিকাঠামো ভেঙে যে বিশ্বধংসজনক শিল্পবিপ্লব পরিকাঠামো প্রথমে ইংলন্ডে পরে ইওরোপের নানান দেশে গড়ে উঠেছিল তাকেও শহুরে সামাজের, শিক্ষার এবং জ্ঞাণচর্চাগত বৈধতা দেওয়া যায় না। বাঙলা এবং পরে ভারতের তৃণমূলস্তরের উত্পাদন এবং বাণিজ্য পরিকাঠামো ভাঙতে সুসভ্য ইংরেজরা সেনা পর্যন্ত নামিয়ে, গ্রামীণ স্বাধীণতা সংগ্রাম দমন করে, অবাধ বাণিজ্যের মূলসূত্রগুলি প্রয়োগ করার কাজ করার কাজ করে গিয়েছে নিরন্তর।
ছিয়াত্তরের মন্বন্তর, ক্লাইভ, হেস্টিংসের লুঠেরা সময় পেরিয়ে এসেও, ১৮০০ সাল পর্যন্ত ভারত-চিনের শিল্প উত্পাদন মোট বিশ্ব শিল্প উত্পাদনের ৭০ শতাংশ। নাটকীয়ভাবে ১৮৩০এর পর এই অংশিদারি কমতে কমতে আজ স্বাধীণতার পর মাত্র ১ শতাংশে উপনীত হয়েছে। যতদিন অকেন্দ্রিভূত উত্পাদন ব্যবস্থা এবং বিতরণ ব্যবস্থা টিকে ছিল, ততদিন কিন্তু বিশ্বে শিল্প উত্পাদনে ভারত নেতৃত্ব দিয়েছে। যেদিন থেকে সে কেন্দ্রিভূত বড় বড় দৈত্যসম উত্পাদন ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকেছে, সেদিন থেকেই শিল্প উত্পাদনের ক্ষেত্রে ভারতের পতনের শুরু। বিশ্বায়িত রাজনীতির প্রেক্ষিতে বিদেশি ইওরোপিয়দের বলপ্রয়োগে ধংসকরে ফেলা কেন্দ্রবিহীন ভারতীয় সনাতন সমাজ, সাধারণ মানুষের অর্থনীতি, ব্যবসা নিয়ে বোধহয় বিদ্যালয়, পঠনপাঠনস্তরে খুব বেশি আলোচনা হয় না। এই অকেন্দ্রিক অর্থনীতি একদা কয়েক হাজার বছর ধরে তথাকথিত আর্থিক ঔজ্জ্বল্য প্রদর্শণ না করেও বিশ্ব অর্থনীতিতে ভারতের স্থানকে এক অনন্যমাত্রায় তুলে ধরতে সাহায্য করে ছিল, দেশিয় অর্থনীতিকে নিজেরমতকরে গড়ে তোলার কাজ করেছিল অবিরত। সারা বিশ্বে বাঙলা তথা ভারতের উত্পাদন আর ব্যবসার অকেন্দ্রিকৃত অর্থনীতিই এশিয় বাজারকে সারা বিশ্বের গন্তব্যস্থলরূপে গড়ে তুলেছিল। ভারত-চিন-পারস্যকেন্দ্রিক এশিয় অর্থনীতি বরাবরই ইওরোপের লুঠেরা দর্শণভিত্তিক কেন্দ্রিভূত অর্থনীতির বিপরীত পথে হেঁটে নিজেরমতকরে এক বিকেন্দ্রভূত অর্থনীতির রূপরেখা তৈরি করেছে হাজার হাজার বছর জুড়ে। বড় বড় প্রাকার বিশিষ্ট সমাজ বিচ্ছিন্ন দৈত্যসম কারখানাগুলোর বিপরীতে কোনও রূপ কেন্দ্রাতিগ শক্তিব্যাতিরেকে দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য ছোটছোট উতপাদন ব্যবস্থা, আর সেই উত্পাদন সারা দেশে, অঞ্চলে, বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে নানান ধরণের তৃণমূলস্তরের ব্যবসায়ীর অংশগ্রহণের অর্থনীতি, একদা ভারত-চিন-পারস্যকে বিশ্বঅর্থনীতির অক্ষদন্ডরূপে দাঁড়িয়ে ছিল সবলেই। সমাজের দর্শণ মেনে এই উত্পাদকদের সামাজিক কর্মকান্ডে, ব্যবসায়ীরা সমাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশিদাররূপে সমাজে স্বীকৃতও হয়েছে। শুধু শহুরে সমাজ এদের অবদান স্বীকার করতে বরাবরই কুণ্ঠা প্রকাশ করেছে। আজও সেই অভিমুখের আজও বদল ঘটেছে কী না সন্দেহ।

ভারতের তৃণমূলস্তরের ব্যবসায়ী আর ব্যবসা২, Grassroot Hawkers of India2

ভারতপথিক ধরমপালজীর হিসেবে, দুইশতাব্দ পূর্বসময়ে ভারতীয় সমাজের সামাজিক উত্পাদনব্যবস্থায় ধংসলীলা চালানো ব্রিটিশ রাজের আমলেও জং ছাড়া লোহাগলানোর চলন্তিকা চুল্লির সংখ্যাছিল ৩০,০০০এর কাছাকাছি। প্রত্যেকটি উত্পাদনক্ষমতা ছিল বছরে ২০ টন! এই তৃণমূলস্তরের উত্পাদকেরা কেউই শহর ভিত্তিক ছিলেন না। দিল্লির মিনার, দলমাদল অথবা মদনমোহনেরমত হাজারো কামান, স্তম্ভ সগর্বে আজও মাথায় বিনাছাতায় অবলীলায় রাস্তায় পড়ে থাকতে পারে। অথচ বিশ্বখ্যাত পশ্চিমি প্রযুক্তিতে তৈরি বাড়ির জানলা দরজার লোহার খাঁচাকে ঢাকতে হয় রং, প্রাইমার মেরে, তার ওপরে প্লাসটিক অথবা সিমেন্টের চাদর দিসে, তবুও জংপড়া আটকানো যায় না। বিশ্বকর্মার সন্তান, ডোকরা কামারেরা সেদিন পর্যন্তও সারাভারতের গ্রামেগঞ্জেই ঘুরে বেড়াতেন। কমলকুমার মুখোপাধ্যায় অথবা মীরা মুখোপাধ্যায়ের প্রণামভরা রচনায়, কাজে এদের বিস্তৃত উদাহরণ পাচ্ছি। বাঙলার গ্রামেগঞ্জের হাজারো ডোকরা কামার অথবা ছত্তিসগড়ের বিশ্বকর্মা সমাজের সন্তান, সোনাধর পৈয়াম বিশ্বকর্মার সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনায় লেখকেরা দেখেছেন তাঁদের সমাজের নানান কর্মপদ্ধতি এবং প্রযুক্তি। এঁদের সঙ্গে ধরমপালজীর লেখা পথ দেখতে সাহায্য করেছে। এঁরা অতীত থেকে আজও ঈর্ষণীয়ভাবে জং ছাড়া লোহা (পশ্চিমি ভাষায় ক্রুসিবল স্টিল) তৈরিতে অসম্ভব দক্ষ – এঁদের বাজার শুধু গ্রামই ছিল না, ছিল বিশ্ববাজারও – যতদিন না ইওরোপিয় ধণতান্ত্রিক অথবা বামপন্থী দর্শণের পথধরে মধ্যবিত্ত ভারতবাসী শহরকে স্বাভাবিক বাসস্থানের মোক্ষভূমিরূপে ধরে নিয়েছে। আজ ডোকরা কামারদের কথা অনেকেই ভুলেগিয়েছেন। আজও বিভিন্ন দেশি-বিদেশি প্রাযুক্তিক সংস্থা নানান গম্ভীরতম গবেষণা করেও তাঁদের প্রযুক্তির কুড়ও খুঁজে পান নি। লোহায় জংপড়া সাধের পশ্চিমি প্রযুক্তি আজ ভারতীয় শহুরে সমাজে সাদরে বরেণ্য, আর এঁরা নিজেদের সমাজে ব্রাত্য।
আমরা যেন মনেরাখি পশ্চিমি উত্পাদন ব্যবস্থা অথবা ব্যবসার সূত্রমেনে লোহারদের কেউই কিন্তু একক উদ্যমে বড় কারখানা তৌরিতে উদ্যমী হন নি। শুধুই কী দারিদ্র্য! না তথাকথিত শিল্পবিকাশে নেতৃত্বদেওয়ার যোগ্যতার অভাব! না পুঁজির অভাব! কোনটি! মীরা মুখোপাধ্যায়ের কাজের জেরে সোনাধর পৈয়াম বিশ্বকর্মা অথবা তাঁর পিতা বিশ্বজুড়ে যে খ্যাতি আর প্রতিপত্তি অর্জন করতে পেরেছিলেন, সেই খ্যাতির পুঁজি কাজে লাগিয়ে সহজেই গোষ্ঠীর অনেকরই ব্যবসা মেরে নিজের একটা বড়সড় কারখানা বানিয়ে ফেলার উদ্যম ছিল চুটকির ব্যাপার। তারপর সাফল্য পেলে আরও বড়, তারপর তার থেকেও বড়, চলতে থাকত বড়ত্বের বাড়াবাড়ি। পুঁজি এসে জমাহত সোনাধরদের পুঁটুলিতে। কোনও  শিল্পপতিত দাক্ষিণ্য পেয়ে হয়ত সোনাধর বড় ক্রুসিবল স্টিলের কারখানাও গড়ে ফেলতে পারতেন। সে হাতছানি হয়ত তাঁর সামনে থাকতেও পারত। অথচ ভারত জোড়া তুচ্ছ মেলাতেও তাঁর দেখা পাওয়া সাধারণ ঘটনা। সেখানেও তার কোনও  সঙ্গী নেই। তিনি একা। অথচ একা ধণী হওয়াপ পথে তিনি কদাচ হাঁটেন নি। ভারতের সমবায়ী সমাজ শুধু সোনাধরই নয়, তৃণমূলের উত্পাদক অথবা ব্যবসায়ীকে সেই কাজটি করার কদাচ অনুমতি দেয় নি। হাজার হাজার বছর ধরে বিকশিত, সমবায়ী অএককেন্দ্রিক সমাজের নিয়ম মেনে, উত্পাদক অথবা ব্যবসায়ী নিজের হাতে সবপুঁজি জড়ো করতে পারেন না। অথচ এতদিন গবেষকেরা, রাজনৈতিক কর্মীরা নানান দর্শণে জারিত হয়ে এই একহাতেপুঞ্জীভূত পুঁজিকেই সমাজের প্রগতির পথরূপেভেবে এসেছেন, তাতে সামাজিক প্রগতির বিশেষ কোনও  বিকাশ ঘটেছে এমন নজির বোধহয় আজও পাওয়া যায় নি।  
ভারতীয় নানান শহুরে, লৌকিক অথবা আদিবাসী সাহিত্যে আমরা দেখতে পাব, সানাতন ভারতীয় সমাজে তৃণমূলস্তরের উত্পাদকদের সঙ্গে গায়েপিঠে জড়িয়ে রয়েছেন অসংখ্য অবয়বহীন তৃণমূলস্তরের বিক্রেতা সমাজ। অপ্রতিরোধ্য সেই দেশজ উত্পাদন ব্যবস্থা শুধু ধংসই নয়, সেই উত্পাদন ব্যবস্থার সঙ্গে সঙ্গতিরেখে দেশজুড়ে যে বিতরণ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল সেটিও সেই দার্শণিক বিকেন্দ্রিভূত বিতরণ ব্যবস্থার অংশিদার বলেই ইংরেজ শাসক-বণিক সেই ব্যবসা পরিচালন ব্যবস্থাকেও ধংস করে দেওয়ার উদ্যম নেয়। সেই কাজে যোগ্য সহচর হয়েছেন ইংরেজ আমলের বর্ণময় বাঙালি দালাল, দেওয়ান, গোমস্তা, কর্মচারীরা – যাঁদের অধিকাংশ আজও বাঙলার ঘরে ঘরে পুজিত, সর্বামান্য। ইংরেজ-পূর্ব, বাঙলা অথবা গ্রমীণ ভারতের উত্পাদন ব্যবস্থা শুধুই যে বিদেশের বাজারের মুখাপেক্ষী ছিল, এমন এক ধারণা তৈরি করার চেষ্টা চলেছে ইংরেজ সাম্রাজ্যের দয়া দাক্ষিণ্যে – ইংরেজ বাত্সল্যের অধীণে, ইওরোপিয় দর্শণের ঘেরাটোপে বাসকরা বাঙালি মধ্যবিত্তের প্রাণান্তিক প্রচেষ্টায়। এই তত্ব যে দেশজ অর্থনীতির মূলগত দর্শণএর সম্পূর্ণ বিরোধী তাই নয়, এই তত্ব বিশ্বব্যাপী প্রচার করতে পারলে বাঙলা তথা ভারতজুড়ে ছড়িয়েথাকা যে উত্পাদন আর ব্যবসা পরিকাঠামোর ওপর ইংরেজরা যে বিপুলতম ধংসলীলা চালিয়েছে, তার ওপরেও সহজে ঘোমটা পরাবার ব্যবস্থা করা যায়।