Showing posts with label ফরাসী. Show all posts
Showing posts with label ফরাসী. Show all posts

Sunday, June 3, 2018

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা - বাংলার তাঁত ব্যবস্থা ধ্বংসের প্রাথমিক কারণ সাম্রাজ্যের অত্যাচার - মেট্রোপলিটনে অতিরিক্ত উতপাদন নয়

১৭৫৭র পরে ব্রিটিশেরা ইওরোপিয় জাতভাইদের কাপড় কেনার সমস্ত পরিকল্পনা ভেস্তে দিতে তাঁতি আর দাদালদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে থাকে। ডাচ আর ফরাসীরা প্রতিবাদ জানায় মালদা, মেদিনীপুর, জাঙ্গিপুর, হরিপাল, ঢাকা ইত্যাদি আড়ং থেকে মালপত্র কিনতে বাধা দেওয়া হচ্ছে।
অভিযোগ ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে। কয়েকবার বৈঠকের পর ১৭৬৭ সালে ৪ মার্চ ফরাসী, ডাচ আর ব্রিটিশদের নিয়ে আড়ং ঘোরার পরিদর্শক কমিটি তৈরি করা হল। কমিটিতে রইল ডাচ কুঠিয়াল Johannes Mathias Ross এবং সাগরেদ Martinus Koning। ব্রিটিশদের পক্ষে রইল John Bitter আর Claude de la Porte(মেদিনীপুরের আড়ং জুড়ে ইনি বিপুল অত্যাচার করবেন)। ফরাসীদের পক্ষে রইল Roeland আর Des Granges। ঠিক হল ৬ জনের দলের নেতৃত্ব দেবেন রস। তিনি কলকাতার ব্রিটিশ কর্তা হেনরি ভেরলেস্টকে তাদের আড়ং ঘোরার সমীক্ষাটি জমা দেবেন। এই দলের কাজ হিসেবে বলা হল investigate the best procedures to be followed to put out the contracts so that each of the three nations was served satisfactorily. Towards that end, you would make an accurate estimate of the amount of land in each aurung which was used for planting cotton as well as of the average annual output of cotton in each aurung. You would also fi nd out the number of weavers and classify them as being of excellent, middling or poor quality।
১১ এপ্রিল রস এবং কোনিং এবং ফরাসীরা কলকাতা থেকে আড়ং সমীক্ষায় বেরোলেও ব্রিটিশেরা সেই দলে যোগ দিল না। বলা হল তারা ৪মে হরিপাল আর ধনেখালিতে দলের সঙ্গে যোগ দেবে। ডাচেরা বলল এটা চুক্তি বিরোধী। তিন দেশের দলকেই একসঙ্গে যেতে হবে। ইতোমধ্যে ব্রিটিশ হুমকিতে ফরাসীরা সরে গ্যাছে। ব্রিটিশদের ভয়ে দ্বারহট্টে এবং অন্যান্য অড়ঙ্গে কোন তাঁতি বা দালাল ব্রিটিশদের সঙ্গে দ্যাখা করতে রাজি হল না। তাঁতিরা, দালালেরা ডাচেদের অগ্রিম দেওয়া অর্থ ফিরিয়ে দিতে লাগল। ফরাসী আর ডাচেরা অসহায় ভাবে দেখতে থাকল।
শুরু হল বাংলা বাজারে লুঠ। বাংলা বাজার থেকে ব্রিটিশেরা তাদের জাতভাইদের সরিয়ে দিয়ে কম দামে কাপড় কেনা শুরু করল।ডাচ ফরাসিরা অভিযোগ করলে ব্রিটিশেরা বেমালুম অস্বীকার করল।তাঁতিরা কলকাতায় আর্জি জানাল এই দামে কাপড় সরবরাহ করা যাচ্ছে না। ক্ষিরপাই থেকে ৫০ জনের মত তাঁতি ততদিনে তাঁত ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছে। পালাবার আগে জগতশেঠদের প্রতিকারের জন্যে আর্জি জানালে তারা জানাল তাদের পক্ষে কিচ্ছু করা সম্ভব নয়। এইভাবে পরের তিন/চার দশকে গোটা বাংলার ২২টা মসলিন আড়ং বন্ধ হয়ে গেল। ঢাকা জনশূন্য হল।
অথচ Fort William থেকে 28 April 1775 বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হল - the weavers of the province of Bengal and Bihar should enjoy a perfect and entire liberty to deal with any persons whom they pleased and that no person should use force of any kind to oblige the weavers or other manufacturers to receive advances of money or to engage in contracts for the provision of clothes against their will, and that all persons off ending against this order should suffer severe punishment.
যাই হোক শেষ কয়েকটি আড়ং ঘুরলেন ডাচেরা। হরিপাল আর ধনেখালি, কিছুটা চন্দ্রকোণা আড়ঙে বিশদ তথ্য পেলেন। সেই অসাধারণ সমীক্ষা নিয়ে লিখেছেন ওম প্রকাশ।সেই তথ্য এখানে তুলে দেওয়া গেল কয়েটি তালিকায়। এটিই একমাত্র মসলিন আড়ংএর বিশদ উতপাদ বর্ণনা। সঙ্গে তিনি ব্রিটিশ কোম্পানির তথ্য দিয়েছেন।
এই কথাগুলো বার বার বলা দরকার। শুধু লন্ডনের অতি উতপাদনের ধ্বংস হয় নি, তার জন্যে বাংলার তাঁতিদের ওপর বিপুল অত্যাচার নামিয়ে আনতে হয়েছিল।
---
রিওলো-তীর্থঙ্করের সম্পাদিত বই হাউ ইন্ডিয়া ক্লোদ দ্য ওয়ার্ল্ডে ওম প্রকাশের প্রবন্ধে FROM MARKET-DETERMINED TO COERCION-BASED: TEXTILE MANUFACTURING IN EIGHTEENTH-CENTURY BENGAL

Thursday, March 15, 2018

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা - ফোর্ট উইলিয়ম কলেজ তৈরির পশ্চাদপট৭ - ফরাসী বিপ্লবের তাত্ত্বিক বিরোধিতা

প্রবন্ধের শেষপ্রান্তে এসে আমি(কপিল রাজের উক্তি, আমাদের নয়) অন্য ধরণের একটা দৃষ্টিভঙ্গী উপস্থাপনা করব। আপাত দৃষ্টিতে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ যতই বৈপ্লবিক লাগুক(যদিও আমাদের, মানে কারিগরদের কাছে এইটা একটা ঔপনিবেশিক কাঠামো চাপিয়ে দেওয়া ছাড়া আর কিছুই নয় - লেখক), এটা কিন্তু উনবিংশ শতকের প্রথমপাদের ব্রিটিশ ব্যবস্থায় নতুন কিছুই ছিল না। আদতে এটির উদ্ভব কোন ব্যক্তিকেন্দ্রিক মানুষের ক্রিয়ায় নয়, এটাকে সেই সময়ের লন্ডনের মোটামুটি সংখ্যাধিক্যের মনোভাবের প্রতিফলন হিসেবেই দ্যাখা দরকার।
আদতে বেশ কিছু ব্রিটিশ সংস্কারক ফরাসী বিপ্লব তত্ত্ব উদ্ভুত ব্রিটিশ ভদ্রবিত্তের ভয় আর অস্বস্তিকে কাজে লাগিয়ে রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণকে নিজেদের স্বার্থানুকূলে নিয়ে আসার উদ্যম নেয়। এছাড়াও ঘরের মধ্যে আরও একটি বিপ্লব সংগঠিত হচ্ছিল যার নাম শিল্পবিপ্লব, এই সবগুলি একসঙ্গে জুড়ে নিয়ে নতুন ধরণের নীতি নির্ধারণ করার দিকে এগোতে শুরু করল রাজনীতিকেরা। তাদের তত্ত্বে শিল্পবিপ্লবের ফলে উদ্ভুত অবস্থা গ্রাম্য দারিদ্রনাশক, লে এই অবস্থা সাময়িকভাবে সামাজিক বিপর্যয় তৈরি করবে। বিজ্ঞান আর ধর্ম পরস্পর শয্যাসঙ্গী – উদাহরণস্বরূপ উইলিয়াম পালেকে জন মেয়ার্ড কেনস ম্যালথাসের আর্থ-রাজনৈতিকতার তাত্ত্বিক গুরু হিসেবে অতীব সম্মান প্রদর্শন করেছেন। তিনি মনে করতেন কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর নিউটন ছাড়া যার প্রভাব সব থেকে বেশি তিনি হলেন পালে। পালে মূলত বৈজ্ঞানিক চিন্তায় স্তরীভূত প্রকৃতি তত্ত্বএর উদ্গাতা, যে তত্ত্বের সরাসরি প্রভাব পড়েছে স্তরীভূত সমাজ তত্ত্বে।
উযোগিতাবাদীদের বৈজ্ঞানিকভাবে ভালকরার তত্ত্ব(scientific philanthropy – ডেভিড আওয়েনের ইংলিশ ফিনাথ্রপিতে পাচ্ছি হাম্ফ্রে ডেভির বক্তব্য – যা উনি ১৮০২-১৮১২র মধ্যে বিভিন্ন বক্তৃতায় বলেছিলেন এবং উল্লিখিত হয়েছে Elements of Agricultural Chemistry, in a Course of Lectures for the Board of Agriculture বিষয়ক বক্তৃতামালায় – প্রথম বক্তৃতাটাতেই ডেভি বলছেন - It is from the higher classes of the community, from the proprietors of land,— those who are fitted by their education to form enlightened plans, and, by their fortunes, to carry such plans into execution: it is from these that the principles of improvement must flow to the labouring classes of the community; and in all classes the benefit is mutual; for the interest of the tenantry must be always likewise the interest of the proprietors of the soil. The attention of the labourer will be more minute, and he will exert himself more for improvement, when he is certain he cannot deceive his employer, and has a conviction of the extent of his knowledge. Ignorance in the possessor of an estate, of the manner in which it ought to be treated, generally leads either to inattention or injudicious practices in the tenant or the bailiff) সম্বল করে Society for Bettering the Condition of the Poor এবং Board of Agriculture জন নীতি গ্রহণের উদ্যম নেয়।
উনবিংশ শতাব্দে মেট্রোপলিটন এবং উপনিবেশের নানান শিক্ষা কেন্দ্রর সহযোগিতায় এই তত্ত্ব ফুলে ফলে বিকশিত হয়ে বাড়তে থাকা গোটা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক বিশ্বকে বিপুলভাবে প্রভাবিত করে। এই দুই বিপ্লব(ফরাসী আর শিল্প) শুধু যে নতুন শিক্ষাকেন্দ্রর পৃষ্ঠভূমিই তৈরি করে নি, নব্য জ্ঞানচর্চার দ্বার উন্মুক্ত করেছে। একইসঙ্গে যে নতুন ধরণের পরিবেশ তৈরি হল, সেই পরিবেশের নানান স্পর্ধা সামলাতে এটি নতুন ধরণের জ্ঞানচর্চাকেন্দ্র তৈরি আর তার ব্যবস্থাপনার বাস্তব দাবি পেশ করেছে।

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা - ফোর্ট উইলিয়ম কলেজ তৈরির পশ্চাদপট৬ - ফরাসী বিপ্লবের তাত্ত্বিক বিরোধিতা

ব্রিটিশ সংগঠনের দৃষ্টিতে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ

কিছু ঐতিহাসিক বিশ্বাস করতেন, উত্তমাশা অন্তরীপ পেরিয়ে আসার পরই বহু ব্রিটন ওরিয়েন্টের দিকে যাওয়ার সময় একটা অদ্ভুত মনোভাব চারিয়ে যেত যে তারা একটা অদ্ভুত এলাকায় প্রবেশ করছেন। এই মনোভাব ছড়িয়ে যেত ইওরোপিয়দের হাতে চালিত ভারতীয় প্রশাসন চালনায়, এবং প্রভাব পড়ত মেট্রোপলিটনে(at home) ব্রিটিশ সমাজেও।
তিনটি বিষয়ের আলোচনা এই অবস্থা বুঝতে সাহায্য করবে। বোর্ড অব কন্ট্রোল কিন্তু ওয়েলেসলির ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ সংক্রান্ত প্রকল্পটিতে খুব উৎসাহী হয়ে পড়ে। কিছু হাতে গোণা ধর্মযাজক বলেছিল উপনিবেশের পরিবেশে বেশি দিন থাকলে খ্রিষ্টিয় নৈতিকতা হারিয়ে যেতে পারে, কিন্তু সে বক্তব্য খুব বেশি পাত্তা পায় নি। শুধু তাত্ত্বিক এবং প্রায়োগিক দর্শন পাড়ানোর যোগ্য মানুষ নেই বলে কোর্ট অব ডিরেক্টর তাদের খরচে মেট্রোপলিটন থেকে একজন স্কটিশ জ্ঞানী জেমস ডুইন্ডল(১৭৪৬-১৮১৫)কে পাঠান। পুর্বের সঙ্গে ব্যবসা বিষয়ে বিশেষজ্ঞ, ডুইন্ডল কিন্তু বিষ্ফোরক বিশেষজ্ঞও ছিলেন এবং ফরসাসীদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বিষ্ফোরক বিষয়ে শেষতম গবেষণা সম্বন্ধে সচেতন ছিলেন।
কলেজের শুরুর পর্বে ওয়েলেসলির বিপুল বিনিয়োগ কিন্তু কোম্পানির অংশিদারেরা ভালোভাবে নেয় নি কেননা, কোম্পানির লভ্যাংশ কমায় ততদিনে কোম্পানির অংশিদারদের দেয় লাভের পরিমান, ডিভিডেন্ড কমেছে। কিন্তু ওয়েলেসলি দেশিয় আইরিশ অভিজাতদের সঙ্গে রক্ষণশীল লর্ড ক্যাসেলরে(Castlereagh)র সক্রিয় সমর্থন পেয়েছেন। ক্যাসলরে ১৮০২ সালে বোর্ড অব কন্ট্রোলের চেয়ারম্যান ছিলেন এবং তিনি ওয়েলেসলির বিপ্লব বিরোধী মনোভাবকে মান্যতা দিতেন বলেই এই প্রস্তাবের গুরুত্বটা বুঝেছিলেন। ফলে কোম্পানির উচ্চতম কর্তৃপক্ষ ওয়েলেসলির পাশে দাঁড়ানোয় এই প্রকল্পকে বানচাল করা অংশিদারদের পক্ষে সম্ভব না হলেও, তাদের চাপে কোম্পানি একটা সমঝোতায় আসতে বাধ্য হয়। সিদ্ধান্ত হয় যে ইওরোপিয় কৃষ্টি বিষয়ে শিক্ষা ইংলন্ডেই দিতে হবে বাকিটা ভারতে হোক। কোম্পানির অন্যতম কর্তা ডেভিড স্কটের ভাষায়, ‘the College was sacrificed to the private trade agitation।
এতদ সত্ত্বেও ওয়েলেসলি, যৌথভাবে ভারতীয় এবং ইওরোপিয় শিক্ষকদের দিয়ে পড়ানোর পরিকল্পনায় ডেঁটে থাকলেন। ১৮১৬য় যখন হেলিবেরিতে নতুন শিক্ষাকেন্দ্র স্থাপিত হল, তখন ব্রিটিশ অর্থনীতিক টমাস ম্যালথাস পড়াতেন; এছাড়াও ভারত থেকে শিক্ষক নিয়ে গিয়ে সেখানে পড়ানো হত। ওয়েলেসলির পরিকল্পনার সুফল ভোগ করে গিয়েছে কোম্পানি। ১৮৩১ সালে কলেজ বন্ধ হয়ে যাওয়া পর্যন্ত ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ থেকে প্রত্যেক বছর বের হওয়া ৪১ জন পড়ুয়া কোম্পানিতে যোগ দিতেন। এরা ভারতে অন্তত দশ থেকে কুড়ি বছর কাটিয়ে মানুষেরা লন্ডনে ফিরিতেন ব্যাঙ্গার্থে ‘নবোব’ উপাধি নিয়ে এবং হয় কোম্পানির উচ্চতম পদে অথবা রাজনীতিতে যোগ দিতেন। কিছু সফল নবোব পার্লামেন্টেও পৌঁছে যেতেন, কিছু মানুষ বিজ্ঞানের সেবক হতেন। এটাও মনে রাখা দরকার, ১৮৩০এর ভারত এবং ব্রিটেনে চলতে থাকা ফোর্ট উইলিয়ামকেন্দ্রিক শিক্ষা কেন্দ্রিক বিতর্কের মধ্যে দিয়ে উঠে এলেন জেমস মিল আর ব্যাবিঙ্কটন মেকলে। ওয়েলেসলির প্রকল্পে তৈরি হল নতুন ধরণের ভদ্রবিত্ত যারা পেশাদার, মেট্রোপলিটন স্বার্থিক যে কোন কাজ সম্পাদনে দক্ষ।
১৮৫৮সালে কোম্পানি আর তার সঙ্গে হেলিবেরির বিলয়ে আমলা তৈরির কারখানার দায়িত্ব দেওয়া হল অক্সফোর্ডকে। ১৮৮৩ দসালে অক্সফোর্ডের আধুনিক ইতিহাস পাঠনের দপ্তর, ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউটে যে সংস্কৃত শ্লোকটি খোদিত করে বসানো হয়, সেটিতে স্পষ্টভাবে স্বীকার করা হয় যে ঔপনিবেশিক কাঠামোয় প্রশাসকেরা তৈরি হয়েছেন - This Building, dedicated to eastern sciences, was founded for the use of Aryas (Indians and Englishmen) by excellent and benevolent men desirous of encouraging knowledge. . . . By the favour of God may the learning and literature of India be ever held in honour, and may the mutual friendship of India and England constantly increase।(আর্যত্ব বিষয়ে এটা কপিলের মন্তব্য, অনুবাদকের নয়)
যদি মেনেও নিই, ভারতে কাজ করা ব্রিটিশেরা দুর্বিনীত ছিল। এই তত্ত্ব মেনে নিয়েই বলছি, ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ বিষয়ে ওঠা বিতর্ক, উপনিবেশ এবং মেট্রোপলিটনে উভয় ক্ষেত্রের শিক্ষানীতি প্রণয়নে বিপুল প্রভাব ফেলেছিল। আমি এখানে পাঠকদের এতদিনের তৈরি করা উল্টো মনোভাবটাও মাথায় রাখতে বলব উপনিবেশে আধুনিকতার তত্ত্ব প্রয়োগের গবেষণাগার ছিল মেট্রোপলিটন – এটা সম্ভব হয়েছিল সেই তত্ত্ব সফলভাবে চর্চিত হওয়া এবং সেটি উপনিবেশে প্রয়োগের সফল প্রক্রিয়া প্রণয়নে।

Wednesday, March 14, 2018

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা - ফোর্ট উইলিয়ম কলেজ তৈরির পশ্চাদপট৫ - ফরাসী বিপ্লবের তাত্ত্বিক বিরোধিতা

উল্লেখ্য তখনও ইওরোপের কোন বিশ্ববিদ্যালয়েই এতসব কিছুই পড়ানো হত না। এর আগে হেস্টিংস একবার আর্থিক লাভের টোপ দিয়ে কিছু বিষয় পড়াবার চেষ্টা করেছিলেন তা চরমতম ব্যর্থ হয়েছিল। এই প্রকল্পে কিছু উৎসাহী মানুষ তাদের মুন্সীর থেকে স্থানীয় গপ্পগাছা বা ভাষা জানার চেষ্টা করেছল মাত্র, যা তখন স্বভাবিক ছিল গবেষণা পদ্ধতি ছিল।
১৭৮৪তে মাটি থেকে বিচ্ছিন্ন হবার জন্যেই জন্ম হয়েছিল এশিয়াটিক সোসাইটির। উদ্দেশ্য ভারতের অতীত গৌরব কীর্তন এবং মহার্ঘ উপনিবেশের সঙ্গে তার যোগাযোগ নির্নয়। সেই শতকে এই সংগঠনে কোন দেশিয়কে অংশ নেওয়ানো হয় নি, কিন্তু কিছু কিছু দেশিয় মানুষ যোগ দিয়েছিলেন কাজে। এশিয়াটিক রিসার্চেসে বহু প্রখ্যাত সমাজ, অর্থনীতি, ধ্রুপদী ভাষা, শিল্পকলা এবং দক্ষিণ এশিয়ার সমাজকাঠামো নিয়ে লিখেছেন। তারা ভারতের দুটি চরিত্র বর্ণনা করেছে – হিন্দুতে একটা পুরনো একদেহী ধর্মকথা, অসাম্যের ভিত্তিতে তৈরি সমাজ ভারতকে ভাগ্যবান করে তৈরি করেছে।
এশিয়াটিকে সদস্যপদ পাওয়া ছিল ব্যক্তিগত জ্ঞানচর্চার আকাঙ্ক্ষার উচ্চাশা। একটি সামাজিক সংগঠনের মত এক সংঘ যেখানে বৌদ্ধিক আলোচনা হত। নিজেরা নিজেদের নির্বাচিত করে পরস্পর পিঠচাপড়ানি ক্লাব তৈরি করেছিলেন। কিন্তু শতাব্দ শেষে সেই ভৌগোলিক এলাকার আইন এবং ভাষা জানা জরুরি হয়ে পড়ছিল এবং সেই দক্ষতা অর্জন কোম্পানি নিজের চাকুরের দয়ার ওপরে ছেড়ে দিলনা কোম্পানি। ১৯৮৯ সালের ২১ ডিসেম্বর ওয়েলেসলি বলছেন no Civil Servant should be nominated to certain offices of trust and responsibility until it shall have been ascertained that he is sufficiently acquainted with the laws and regulations enacted by the Governor General in Council, and the several languages, the knowledge of which is requisite for the due discharge of the respective functions of such offices. [N]o servant will be deemed eligible to any . . . offices [of responsibility], until he shall have passed an examination (the nature of which will be hereafter determined) in the laws and regulations, and in the languages, a knowledge of which is hereby declared to be an indispensable qualification for such respective office.
ইউনিভার্সিটি অব দ্য ওরয়েন্ট স্থাপনের প্রস্তাবে ওয়েলেসলি বাংলায় ইওরোপিয়দের তৈরি ওরিয়েন্ট তত্ত্বে যে সব খামতিগুলো ছিল, সেগুলি মিটিয়ে ওরিয়েন্ট বিষয়ে পড়াকে বাধ্যতামূলক করলেন এবং একইসঙ্গে ব্রিটিশ আর তাদের দেশিয় বন্ধুদের(কপিল intermediaries শব্দটা ব্যবহার করেছেন) এতদিনের বন্ধনহীন এই সম্পর্ককে প্রাতিষ্ঠানিকতায় বেঁধে ফেলতে চাইলেন। এখানে পড়াবার জন্যে তিনি এশিয়াটিক সোসাইটির ব্রিটিশ ওরিয়েন্টালবাদী সদস্য এবং সেখানকার দেশিয় জ্ঞানী সহযোগীদের বেছে নিলেন। পড়ানো ছাড়াও ছাত্রদের কোম্পানি শাসিত এলাকাগুলিতে মহাবিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারের জন্যে নতুন ধরণের পুথি জোগাড়েও উতসাহ দিলেন ওয়েলেসলি। ১৮০৫ সালের মধ্যে বিভিন্ন এলাকার ভাষার প্রমিতিকরণ এবং ব্যকরণের কেন্দ্রিকরণের কাজ সম্পন্ন হল। বিপুল এলাকায় পড়াবার জন্যে ভাষার প্রমিতিকরণ জরুরি ছিল।


প্রথম তিন বছরে ২ লক্ষ ৫০ হাজার ডলার বিদ্যালয়ের জন্যে ব্যয় করলেন যা দুটি প্রখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্যে বরাদ্দ মোট ব্যয়ের সঙ্গে তুলনীয়। প্রথম বছর খরচ হল ৭৮৭৫০ টাকা। ব্রিটিশ শিক্ষকেরা মাইনে পেতেন ৩২০ পাউন্ড/মাসে এবং দেশিয় সহযোগীরা পেতেন ইওরোপিয় শিক্ষকদের তুলনায় একদশমাংস থেকে এক পঞ্চাশাংস।

Tuesday, March 13, 2018

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা - ফোর্ট উইলিয়ম কলেজ তৈরির পশ্চাদপট৪ - ফরাসী বিপ্লবের তাত্ত্বিক বিরোধিতা

এই সব কিছু নিয়েই ওয়েলেসলির আদত অকাট্য লক্ষ্য ছিল, during the convulsions with which the doctrines of the French Revolution have agitated the Continent of Europe, erroneous principles of the same dangerous tendency had reached the minds of some individuals in the civil and military service of the Company in India; and the state, as well of political, as of religious opinions, had been in some degree unsettled. The progress of this mischief would at all times be aided by the defective and irregular education of the writers and cadets; an Institution tending to fix and establish sound and correct principles of religion and government in their minds at an early period of life, is the best security which can be provided for the stability of the British power in India।
তিনি বললেন, তার এই প্রকল্পে কোম্পানির আমলাদের প্রশিক্ষিত করবে দেশিয় শিক্ষিতরা। ভারত যে স্তরীভূত সমাজ, হেস্টিংসের বিচার সভায় বার্কের মুখবন্ধিক তত্ত্বের অনুগামী হয়ে তিনিও জানালেন, তিনি বার্কের এই তত্ত্বে আস্থা পেশ করছেন। তিনি এমন এক ধরণের শিক্ষা ব্যবস্থা চাইছেন যা আগামী দিনের কোম্পানির আমলাদের স্থিতিশীল সামাজিক অবস্থায় কাজ করতে বাধ্য করবে। বলা দরকার তিনি এবং বার্ক দুজনের ভারতকে গ্যালিক সাম্যতত্ত্বের দৃষ্টিতে দেখেছিলেন।
এই সব কারণে এবং ভারত এবং ইওরোপেও এই ধরণের কোন শিক্ষাকেন্দ্র ছিল না, তাই ওয়েলেসলি কলকাতার ফোর্ট উইলিয়ামে এ ধরণের শিক্ষাকেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাব পাঠালেন ওয়েলেসলি। টিপু হত্যার প্রথম বছর পূর্তিতে ৪ মে ১৮০০ সালে এ বিষয়ে একটা ডিক্রি জারি করা হল। বিস্তৃতির পরিকল্পনা করা হল ক্রেম্ব্রিজ আর অক্সফোর্ডের ব্যপ্তিতে। উদ্বোধন হল ১৮০০ সালের ২৪ নভেম্বর তারিখে।
ঠিক হল ল্যাটিন, গ্রিক ছাড়াও শেখানো হবে ইংরেজি, ন্যাচারাল হিস্ট্রি, ন্যাচারাল এবং এক্সপেরিমেন্টাল ফিলোজফি, রসায়ন, জ্যোতির্বিদ্যা, অর্থনীতি, রাজনৈতিক অর্থনীতি এবং ভূগোল। নতুন চাকরিজীবিরা বাংলায় পা দিয়েই আরবি, পার্সি, সংস্কৃত, ছটা আঞ্চলিক ভাষা হিন্দুস্তানি, বাংলা, তেলুগু, মারাঠি, তামিল আর কন্নড়, হিন্দু ইসলামি আর ব্রিটিশ আইন, ইওরোপিয় ইতিহাস এবং ভারতীয় ইতিহাস এবং পুরাতত্ত্ব(antiquities) শিখবে। এই বিদ্যাগুলির অধিকাংশই ফোর্ট উইলিয়ামে জ্ঞানী দেশিয়রা পড়াবেন ঠিক হল।

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা - ফোর্ট উইলিয়ম কলেজ তৈরির পশ্চাদপট৩ - ফরাসী বিপ্লবের তাত্ত্বিক বিরোধিতা

বিপ্লবতত্ত্বের প্রভাব রুখতে শিক্ষাকেন্দ্র
১৮০০ সালের ১০ জুলাই একটি প্রতিবেদনে ওয়েলেসলি লন্ডনের কর্তাব্যক্তিদের তাঁর বিদ্যালয় তৈরির পরিকল্পনা বিস্তৃতভাবে পাঠালেন। বার্ক ১২ সাল পূর্বে ওয়ারেন হেস্টিংসকে বিচারে দাঁড় করানোর জন্যে যে পদ্ধতি অবলম্বন করেছিলেন, কোম্পানির চরিত্র বিশ্লেষণ, ওয়েলেসলি তার প্রস্তাবে বার্কের তাত্ত্বিক অবস্থানটাই নকলই করলেন।
তিনি লিখলেন কোম্পানি আর শুধু বাংলার বিপুল অঞ্চল আর তিনটে প্রেসিডেন্সিতে আটকে নেই দক্ষিণ ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলও তার কবলে। কোম্পানি এমন এক সাম্রাজ্যের মালিক, যার আয়তন অধিকাংশ ইওরোপিয় রাষ্ট্রের আয়তনের থেকেও বড়। ফলে এই অবস্থায় কোম্পানির দায় এবং দায়িত্বকে নতুন দৃষ্টিতে দেখতে হবে। বিশেষ করে এই প্রতিবেদনে তিনি বললেন কোম্পানির কর্মচারীদের এই বহুভাষিক দেশে আরও বেশি দায়িত্বপূর্ণ হতে হবে To dispense justice to millions of people of various languages, manners, usages and religions; to administer a vast and complicated system of revenue throughout districts equal in extent to some of the most considerable kingdoms in Europe; to maintain civil order in one of the most populous and litigious regions of the world; these are now the duties of the larger proportion of the civil servants of the Company. The senior or junior merchants, employed in the several magistracies and Zillah Courts, the writers or factors filling the stations of registers and assistants to the several courts and magistrates, exercise in different degrees, functions of a nature, either purely judicial, or intimately connected with the administration of thepolice, and with the maintenance of the peace and good order of their respective districts.।
ওয়েলেসলি জানালেন কোম্পানির রাজত্বের ভিন্ন ভিন্ন এলাকায় ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় আদালতের কাজকর্ম চলছে। এছাড়াও যে আইন অনুসারে কোম্পানির কর্মচারীরা শাসন করে সেগুলিও ব্রিটিশ জাত নয় বরং to which the natives had long been accustomed under their former sovereigns, tempered and mitigated by the voluminous regulations of the Governor-General in council, as well as by the general spirit of the British constitution। একই তত্ত্বে জুড়ে দিলেন রাজস্ব আদায় এবং ব্যবসায়িক চুক্তিগুলোকেও। ইওরোপে যে ধরণের ব্যাঙ্কিং, প্রশাসনিক, ব্যবসায়িক নিয়মনীতি চলে, তা এদেশের থেকে আলাদা। ফলে আমলাদের এ উপমহাদেশের ভাষা, আইন, ব্যবহার এবং প্রথা ইত্যাদি শেখানো খুব জরুরি কাজ।

এদেশে আসা রাইটার, ফ্যাক্টর বা মার্চেন্ট যে ধরণের শপথ নেয়, তার কাজ সেই পরিধির অনেক বাইরে ছড়িয়ে গিয়েছে। তার দাবি এখন কোম্পানির আমলাদের একমাত্র শপথ নিতে হবে যে তারা যে কোন ব্যবসায়িক স্বার্থের বাইরে থাকবে। ভারতে এসেছে ১৪ থেকে ১৮ বছর বয়সের মধ্যের অধিকাংশ কোম্পানির যুবা আমলা শুধুই প্রাথমিকস্তরের অঙ্ক আর হিসাব করার জ্ঞান সম্বল করে। কিন্তু তারা এখন নতুন দায়িত্ব সামলাতে প্রস্তুত। এছাড়াও অধিকাংশের শিক্ষার অভাব এবং পরম্পরার সংস্কৃতি বিষয়ে জ্ঞান না থাকার জন্যে প্রায়শই indolence, dissipation, and licentious indulgence ঢলে পড়তে বাধ্য হয়। এই প্রেক্ষিতে এবং তাদের নবতম বিপুলতম দায়িত্ব সামলানোর জন্যে একটি শিক্ষা ব্যবস্থা প্রয়োজন যাতে involving the combined principles of Asiatic and European policy and government শিক্ষার পাঠ্যক্রম থাকবে।

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা - ফোর্ট উইলিয়ম কলেজ তৈরির পশ্চাদপট২ - ফরাসী বিপ্লবের তাত্ত্বিক বিরোধিতা

উনবিংশ শতে ভারত ব্রিটেন আর ফ্রান্স
এই প্রেক্ষিতে লর্ড মর্নিংটন ওরফে রিচার্ড ওয়েলেসলি ১৭৯৭ সালে ভারতীয় উপমহাদেশের কোম্পানি সাম্রাজ্যের সর্বেসর্বা, গভর্নর জেনারেল রূপে মনোনীত হলেন। ওয়েলেসলি তাত্ত্বিকভাবে সরাসরি মুক্ত বাণিজ্যের সমর্থক, আইরিশ অভিজাত, ভাই আর্থার ওয়েলেসলি ভবিষ্যতের ডিউক অব ওয়েলিংটন হবেন এবং ফরাসী বিপ্লবের প্রতি বিরুপ বার্কের তাত্ত্বিকতার অনুগামী। যেহেতু তিনি কোম্পানির বোর্ড অব কন্ট্রোলের সদস্য ছিলেন, ভারতের সে সময়ের অবস্থা আর ফরাসীদের মনোভাব সম্বন্ধেও তিনি সম্পূর্ণ অবহিত ছিলেন।
১৭৯৮ সালে উপনিবেশের রাজনীতি পৌঁছতে না পৌঁছতেই নতুন গভর্নর জেনারেলের টেবলে স্থানীয় খবর কাগজগুলো থেকে একটা খবর পৌঁছল নেপোলিয়ানের নেতৃত্বে ফরাসীরা মিশর হয়ে ভারত আক্রমণের পরিকল্পনা করছে। তিনি আরও জানলেন মালাবার উপকূলে ফরাসী আর তাদের বন্ধু টিপু সুলতান যৌথভাবে উপমহাদেশের ব্রিটিশ স্বার্থে ঘা দেওয়ার পরিকল্পনা ছকছে। কলকাতার একটা খবরের কাগজ সূত্রে জানা গেল আজকের মরিসাস(Isle de France)এর গভর্নর Anne Joseph Hyppolite Malartic টিপু আর ফরাসীদের মধ্যে সন্ধি করে ফরাসি নাগরিকদের টিপুর সেনা বাহিনীতে স্বেচ্ছাব্রতের ডাক দিয়েছেন। একইভাবে জানলেন নিজাম শাসিত হায়দ্রাবাদে ১৪০০০ ফরাসী সেনা উপস্থিতির খবর।
১৭৯৮ সালের ২৬ন নভেম্বর কোম্পানির গোপন কমিটি তাকে নেপোলিয়নের মিশর দখলের সংবাদ পাঠাল লন্ডন থেকে। নীল নদের যুদ্ধে নেলসনের বাহিনীর জয় সত্ত্বেও ১৯ এপ্রিল ১৭৯৯ সালের এক ডেসপ্যাচে কোম্পানি ওয়েলেসলিকে জানাল তিনি প্রয়োজনে ভারতীয় ব্রিগেড নিয়ে লোহিত সমুদ্র মার্ফত নেপোলিয়নকে আক্রমণ করে চমকে দেওয়ার কথা ভাবতে পারেন।
ওয়েলেসলি দেরি করেন নি। সম্ভাব্য ভারত আক্রমণ রুখতে তিনি ৩ হাজার সেনা মিশরে পাঠালেন। পারস্য উপসাগরের বুশহরের কোম্পানির রেসিডেন্ট মেহদি আলি খান এবং জন ম্যালকমকে পারস্যের শাহের কাছে পাঠিয়ে ফরাসীদের ভারত আক্রমণের কোন সম্ভাবনায় তাঁর সাহায্যের প্রার্থনা জানিয়ে রাখলেন। বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে হায়দ্রাবাদে সেনাবাহিণী পাঠিয়ে অবাক ফরাসীদের হারিয়ে দিয়ে গোটা সেনাবাহিনীকে বন্দী করলেন। রাণীর ৩৩তম পদাতিক বাহিনীর সেনানায়ক, ভাই কর্নেল আর্থার ওয়েলেসলিকে সেনাপতি জর্জ হ্যারিসের নেতৃত্বে ফরাসীদের যে কোন রকম সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন রুখতে দায়িত্ব দিলেন। হায়দ্রাবাদের নিজামের বাহিনীর সহায়তায় বিপুল ইংরেজ সেনাবাহিনী মহীশূর আক্রমণ করে ১৭৯৯ সালের মার্চ মাসে। শ্রীরঙ্গপত্তনমের যুদ্ধে টিপুর মৃত্যু হলে ভারতে ফরাসীদের সাম্রাজ্য বিস্তারের সমস্ত পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। মহীশূরের পূর্ববর্তী রাজার নাবালক সন্তানকে সিংহাসনে বসিয়ে টিপুর অর্ধেক রাজ্য গ্রাস করে ইংরেজ।

বলপ্রয়োগে ফরাসীদের হারাবার পর ওয়েলেসলি কলকাতার রাজধানীতে বসে বৌদ্ধিক বিজয়ের তোড়জোড় শুরু করলেন। প্রথমেই এল খবর কাগজের ওপর নজরদারি। তারপর ভারতে সরকারিভাবে থাকা প্রত্যেক ইওরোপিয়র জন্যে বাধ্যতামূলক ভিসা বলবত হল। কিন্তু ব্রিটিশ কোম্পানির যুবা আমলারা স্বাভাবিকভাবেই ফরাসী বিপ্লবের সাম্যের ডাকে কিছুটা হলেও প্রভাবিত হতে পারেন এমন আশংকা করে, এই প্রথম কোম্পানির চরিত্রে বদল আনার চেষ্টা করলেন ওয়েলেসলি। কোম্পানিকে শুধু একটি কর্পোরেট সওদাগর থেকে ভারতের প্রশাসনিক শাসকে রূপান্তরিত করার উদ্যম নিলেন। 

Tuesday, December 26, 2017

ব্রিটিশপূর্ব বাংলা - পলাশীতে ইংরেজদের ভূমিকা - ব্যবসা, দামিধাতু এবং ক্ষমতায় আরোহণ৭ - সুশীল চৌধুরী - ফ্রম প্রসপারিটি টু ডিক্লাইন - দশম অধ্যায়

ফরাসী ব্যবসার বাড়বাড়ন্ত, কলকাতা ভিত্তিক ব্রিটিশ ব্যক্তিগত(বিশেষ করে কোম্পানি আমলাদের) ব্যবসা পতনের বড় কারণ। ১৭৫২ সালে কলকাতাবাসী ক্যাপ্টেন ফেনউইক লিখলেন, The French it is probable are now in their zenith of trade in Bengal। ডাচ মহাফেজখানায় জাহাজের তালিকা থেকে প্রমান হয় ১৭৫০এর মাঝামাঝি সময়ে বাংলা থেকে চরম শক্তিশালী ফরাসি ব্যবসায়িক জাহাজের বহর ব্রিটিশদের চরম প্রতিযোগিতায় ফেলে দেয় এবং ব্যবসায় ব্রিটিশ প্রাধান্য খর্ব হতে শুরু করে। ১১.২ তালিকায় ১৭৫০এর মাঝামাঝি সময়ের ব্রিটিশ-ফরাসি জাহাজের তালিকা আমার তত্ত্ব প্রমান করতে সাহায্য করবে, তবে তালিকায় কতগুলি শূন্যস্থান থাকায় পরিপূর্ণ সিদ্ধান্তে আসা গেল না।
আলোচ্য তালিকা আমাদের বলে ১৭৫০এর মাঝামাঝি সময়ে ফরাসী ব্যক্তিগত ব্যবসা ডুপ্লের স্বর্ণিল সময়কেও ছাড়িয়ে যাচ্ছিল। ১৭৫৪ সালে কলকাতায় আসা মোট ব্রিটিশ জাহাজের সংখ্যা ছিল ২০টি(১২টি কোম্পানির, মাত্র ৮টা ব্যক্তিগত ব্যবসায়ীদের)। উল্টোদিকে ফরাসী ২৭টি জাহাজের মধ্যে ব্যক্তিগত ব্যবসায়ীদেরই জাহাজ ছিল ২২টা। ১৭৫১ সালে ব্রিটিশ জাহাজের মোট টনেজ ছিল ৭৪২০ টন, সেখানে ১৭৫৪ সালে ফরাসিদের মোট ব্যবসা ছিল ১০৪৫০ টন আর ব্রিটিশ ব্যক্তিগত ব্যবসায়ীদের অর্ধেক ৫০২০ টন, আর ফরাসি ব্যক্তিগত ব্যবসায়ীদের টনেজ ছিল ৭৪৫০ টন। এর থেকেও প্রমান হয় ফরাসীদের ব্যবসা বিপুলভাবে বেড়েছে।

ব্রিটিশদের ব্যক্তিগত ব্যবসাকে খর্ব করছিল ফরাসীরা, এই তথ্য ফোর্ট উইলিয়াম কাউন্সিলকে ভীত করেছিল। ব্রিটিশ ব্যবসায় পতন রুখতে নানান ধরণের পদক্ষেপ নিয়েছিল। প্রথমটি হল ১৭৫০এর দস্তক সংস্কার, যাতে এশিয় আর ফরাসী ব্যক্তিগত ব্যবসায়ীরা সেটি ব্যবহার না করতে পারে। তাদের উদ্দদেশ্য ছিল পরিষ্কার ব্রিটিশ আমলা ব্যবসায়ী ছাড়া আর কেউ এই কর ছাড়ের সুবিধে না পায়। এছাড়াও ১৭৫৩ সালে কোম্পানির কর্মচারীদের ব্যবসা ছাড়পত্র, ট্রেডিং পাস দেওয়ারও প্রথা শুরু করে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ যাতে বন্দরে ব্যক্তিগত ব্যবসায়ীদের কর দিতে না হয়। কলকাতার কোম্পানির ব্যবসায়ী কর্মচারীদের বাইরে থাকা ব্যবসায়ী জন উড এই প্রথাতে রেগে লেখেন, এর ফলে কোম্পানির কর্মচারীরাই শুধু একচেটিয়া সমুদ্রপথ ব্যবসা করতে পারবে। কোম্পানির দস্তক আর ট্রেডিং পাস সংস্কারের সঙ্গে সঙ্গে জুড়ল ১৭৫৩র বিনিয়োগে দাদনি প্রথা থেকে গোমস্তা প্রথায় সরে আসা। এই যে সংস্কারের ঝড় চলল ফোর্ট উইলিয়ম কান্সিলের পক্ষে, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে এর কারণ হল কোম্পানির আমলাদের ব্যক্তিগত ব্যবসা অক্ষুণ্ণ রাখার প্রচেষ্টা। এতক্ষণ আমরা যে বিষয়গুলি নিয়ে আলোচনা করলা সেটি হল, এক দিকে বাংলা আর অন্য দিকে ফরাসী চন্দননগর দখল করার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল কোম্পানির বাংলা-আমলাদের ব্যক্তিগত ব্যবসার স্বার্থকে বজায় রাখা। 

ব্রিটিশপূর্ব বাংলা - পলাশীতে ইংরেজদের ভূমিকা - ব্যবসা, দামিধাতু এবং ক্ষমতায় আরোহণ৬ - সুশীল চৌধুরী - ফ্রম প্রসপারিটি টু ডিক্লাইন - দশম অধ্যায়

১৭৪০এর প্রথমের দিকে ব্রিটিশ ব্যক্তিগত ব্যবসা এতই কোণঠাসা হয়ে পড়ে যে ফোর্ট উইলিয়াম কাউন্সিল ফরাসিদের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ ব্যক্তিগত ব্যবসা নষ্ট করে দেওয়ার অভিযোগ আনে। ব্রিটিশ ব্যক্তিগত ব্যবসা উদ্ধারে ফোর্ট উইলিয়াম কাউন্সিল, চন্দনগরের মূল ফরাসি বসতির সঙ্গে সমস্ত রকমের ব্যবসায়িক যোগাযোগ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ১৭৪২ সালে কাউন্সিল এই প্রস্তাবনাটি গ্রহণ করে, The French having for· some time past been of great disservice to the private trade of this place by the assistance and· supply of money and goods that they have had from Calcutta ·and more particularly to the ports of Judda, Mocha and in the Gulph of Persia and as we have ships bound this year ,to those places. In order therefore to prevent any ill consequence in future such as we have formerly experienced thereby.
Resolved that no merchants of this place white or black either in the Company's service or otherwise under their protection be permitted to sell or furnish the French with any sortments of goods whatever o~ to freight goods on any of the French ships bound out of this river. ... ।(Virginia M. Thompson, Dupleix)
চন্দননগরের গভর্নর হিসেবে থাকাকালীন ডুপ্লে, I made the English tremble for they saw their commerce dwindling and their merchants forced to declare themselves bankrupt. I accomplished all this' in nine years যে লেখাটি লেখেন সেটিকে কি শুধুই বাগাড়ম্বর হিসেবে উড়িয়ে দেওয়া যায়?
১৭৫০এর প্রথমপাদ থেকে ব্রিটিশ কর্পোরেট কোম্পানি আর ব্যক্তিগত ব্যবসা দুরন্ত সঙ্কটের আবর্তে ঘুরপাক খেতে থাকে। ১৭৪৮ সালে ব্রিটিশ-ফরাসি যুদ্ধের শেষে এবং মারাঠা আর বাংলার নবাবের মধ্যে যে শান্তিচুক্তি হল, তাতে একটা জিনিস পরিষ্কার যে ফরাসী আর এশিয় ব্যবসায়ীরা বাংলার আন্তঃএশিয় ব্যবসায় নতুন করে জাঁকিয়ে বসার সুযোগ পেল। বাংলা ব্যবসাকে নতুন উদ্যমে ঢেলে সাজাতে শুরু করল ফরাসীরা হুগলী, কাশিমবাজার, ঢাকা এবং পাটনায় কুঠি খুলে। এর সঙ্গে জুড়ল আর্মেনিয় সহ অন্যান্য এশিয় ব্যবসায়ীদের কড়া প্রতিদ্বন্দ্বিতা। বাংলার মুদ্রা ব্যবস্থার সঙ্কুচনে কোম্পানির পক্ষে বিশেষ করে শেঠেদের মোকামের গদি থেকে ঋণ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছিল, ৪০এর দশক থেকে কোম্পানি যে ধার নিয়েছে আগে সেগুলি শোধ করলে আগামী দিনে ঋণ পাওয়া যাবে, তারা এমনও শর্ত দিল ব্রিটিশদের।

ব্যক্তিগত ব্যবসা ক্ষেত্রটা খুবই প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠছিল বাংলায়। consulageএর(বাণিজ্যে যেতে নির্দিষ্ট দেশের দূতাবাসকে দেওয়া শুল্ক) দ্রুত পতনের ফলে কলকাতায় ব্রিটিশ ব্যক্তিগত ব্যবসা ঢালুর দিকে যেতে থাকে। সে সময়ে কলকাতার দায়িত্বে থাকা রবার্ট ওরমে বন্ধু রবিনসকে লিখছে, The consulage in years of extensive trade used to be from 20 to 30 thousand rupees to the best of my memory, it is now scarce 5· or 6 clear। ফোর্ট উইলিয়াম কাউন্সিলের প্রধান সদস্য চার্লস ম্যানিঙ্গহ্যাম আর উইলিয়ম ফ্রাঙ্কল্যান্ড ক্লাইভকে লেখা চিঠিতে যতদূর সম্ভব ব্যক্তিগত ব্যবসার পতন সম্বন্ধে মন্তব্য করেছে, ... the situation of trade since you left us has continued so bad।

Monday, December 25, 2017

ব্রিটিশপূর্ব বাংলা পলাশীতে ইংরেজদের ভূমিকা ব্যবসা, দামিধাতু এবং ক্ষমতায় আরোহণ৫ সুশীল চৌধুরী - ফ্রম প্রসপারিটি টু ডিক্লাইন - দশম অধ্যায়

বাংলায় ১৭৫৬-৫৭য় চলা ব্রিটিশ-নবাব দ্বন্দ্বকে বুঝতে গেলে আমাদের দুর্গ তৈরি আর দস্তক ব্যবহারের দুর্নীতির বিষয় আলোচনার বাইরেও বেরোতে হবে। ব্রিটিশ-নবাব দ্বন্দ্ব সম্পর্কিত এই গোলযোগকে আরও ভালোভাবে বোঝা যায় যদি কোমপানির ব্যবসা আর ব্রিটিশ ব্যক্তিগত ব্যবসাকে আমরা নবাবি প্রশাসন এবং ফোর্ট উইলিয়াম কাউন্সিলের মধ্যের নাজুক সম্পর্কর ভিত্তিতে দেখার চেষ্টা করি। ব্রিটিশেরা কলকাতায় বাস শুরু করার পর কলকাতা কোম্পানি আর তার আমলাদের ব্যক্তিগত আন্তঃএশিয় ব্যবসার অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠল। কলকাতা ১৭২০র মাঝামাঝি থেকে শুরু করে মধ্য ১৭৩০ পর্যন্ত ব্রিটিশ আমলাদের ব্যক্তিগত ব্যবসার স্বর্ণালী সময়। কিছু প্রাসঙ্গিক চলকের প্রভাব ব্রিটিশ ব্যবসার সহায়ক হয়ে ওঠে। যে বাজারে তারা ব্যবসা করত, সেটা তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল এবং তারা নির্ভর করত কলকাতা, বম্বে, মাদ্রাজের এক ঝাঁক ব্যক্তিগত ঋণদান ব্যঙ্কার আর এশিয় ব্যবসায়িক সংগঠনের ওপর। তিনটি প্রেসিডেন্সির কোম্পানি আমলাদের মধ্যে গভীর বোঝাপড়া ছিল, তাদের ব্যবসায়ীক সংগঠন এবং অংশিদারিত্ব আর অভিজ্ঞতা ব্যবসার পরিমান বাড়াতে সহায়ক হয়েছে। এছাড়াও ডাচ ও ফরাসী ব্যবসায়ীদের উচ্চ ৫০% লাভের বিপরীতে ব্রিটিশ ব্যক্তিগত ব্যবসায়িকরা প্রত্যেক সমুদ্রযাত্রায় মাত্র ২০% লাভ রেখে মালপত্র ছেড়ে দিতেন। এছাড়াও কোম্পানির কর্মচারীরা দস্তক আর ফরমানের আড়াল নিয়ে বিভিন্ন বন্দরে, এশিয় বণিকদের তুলনায় অনেক শস্তায় ব্যবসা করতে পারত। একটা উদাহরণ দেওয়া যাক, ১৭৪০ সালে হুগলির আরমেনিয় ব্যবসায়ি খ্বাজা ওয়াজিদ ফরাসী পতাকা তুলে বসরার উদ্দেশ্যে জাহাজ ছাড়েন তার একটাই কারণ সেখানে ফরাসীরা ৩ শতাংশ শুল্ক দিত আর এশিয়রা দিত ৬ শতাংশ শুল্ক।
কিন্তু কলকাতা থেকে ব্রিটিশ ব্যক্তিগত ব্যবসা ১৭৩০এর পরে দ্রুত কমতে শুরু করে। আর চন্দননগরের উৎসাহী ফরাসী নেতৃত্ব আর ব্যক্তিগত ব্যবসায়ীরা ডুপ্লের নেতৃত্বে বিপুল উদ্যমে ব্যবসা করতে শুরু করলে ১৭৪০এর পরে ব্রিটিশ ব্যক্তিগত ব্যবসা চরম দুর্দশাগ্রস্ত হয়ে পড়তে থাকে। মধ্য ১৭৩০ থেকে চন্দননগরের ফরাসী কর্তৃপক্ষ ১৭২০র পরের খাদে পড়া ব্যবসা টেনে তুলতে শুরু করে এবং তার ব্রিটিশ ব্যবসার কাছাকাছি পৌঁছে যায়। প্রাথমিকভাবে ফরাসী আমলাদের ব্যক্তিগত ব্যবসা নিষিদ্ধ থাকলেও ১৭২২এর পরে তাদের সেই সুযোগ করে দেওয়া হয়। ফলে ক্রমশঃ তারা ব্রিটিশ ব্যক্তিগত ব্যবসায়ীদের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে শুরু করে। ডুপ্লে নিজে সরাসরি আন্তঃএশিয় ব্যক্তিগত ব্যবসায় যোগ দেওয়ায় এবং ফরাসী ব্যক্তিগত ব্যবসায়ীদের উৎসাহ দেওয়ায় ফরাসী ব্যবসা উদ্যম বিপুল বেড়ে যায়। চন্দননগরে ডুপ্লের প্রাথমিক উদ্যম রাজনৈতিক ছিল না, ছিল ব্যবসায়িক। ১৭৩১ সাল থেকে ১৭৪২ পর্যন্ত ডুপ্লে অন্তত ৯০টা সমুদ্র যাত্রা আয়োজন করেছে। সে যে ধরণের জাহাজের চরিত্র বেছেছে, তা Holden Furber(John Company)এর তত্ত্ব অনুযায়ী সে সময়ের ভারতীয় এশিয় ব্যবসার ট্রন্ড অনুযায়ী মূলতঃ পূর্ব-পশ্চিম দিকমুখী।

বাংলার এশিয় ব্যবসায় ফরাসিরা ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ অংশিদার হয়ে উঠছে ব্রিটিশদের তুলনায়, সেটা মোটেই ব্রিটিশদের পছন্দের বিষয় ছিল না। ফলে ব্রিটিশ-ফরাসী ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব বাড়তে থাকল। ১৭৪০এর প্রথমের দিকে বাংলায় ব্রিটিশদের প্রধানতম প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে থাকে। এই দ্বন্দ্বটির মূল সূত্রটি আমি উল্লেখ করেছি ১১.১ তালিকায় যেখানে আমরা বাংলা থেকে ছাড়া ব্রিটিশ-ফরাসি জাহাজের তথ্য দেখব।

ব্রিটিশপূর্ব বাংলা - পলাশীতে ইংরেজদের ভূমিকা - ব্যবসা, দামিধাতু এবং ক্ষমতায় আরোহণ৬ - সুশীল চৌধুরী - ফ্রম প্রসপারিটি টু ডিক্লাইন - দশম অধ্যায়

১৭৪০এর প্রথমের দিকে ব্রিটিশ ব্যক্তিগত ব্যবসা এতই কোণঠাসা হয়ে পড়ে যে ফোর্ট উইলিয়াম কাউন্সিল ফরাসিদের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ ব্যক্তিগত ব্যবসা নষ্ট করে দেওয়ার অভিযোগ আনে। ব্রিটিশ ব্যক্তিগত ব্যবসা উদ্ধারে ফোর্টউইলিয়াম কাউন্সিল, চন্দনগরের মূল ফরাসি বসতির সঙ্গে সমস্ত রকমের ব্যবসায়িক যোগাযোগ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ১৭৪২ সালে কাউন্সিল এই প্রস্তাবনাটি গ্রহণ করে, The French having for· some time past been of great disservice to the private trade of this place by the assistance and· supply of money and goods that they have had from Calcutta ·and more particularly to the ports of Judda, Mocha and in the Gulph of Persia and as we have ships bound this year ,to those places. In order therefore to prevent any ill consequence in future such as we have formerly experienced thereby.
Resolved that no merchants of this place white or black either in the Company's service or otherwise under their protection be permitted to sell or furnish the French with any sortments of goods whatever o~ to freight goods on any of the French ships bound out of this river. ... ।(Virginia M. Thompson, Dupleix)
চন্দননগরের গভর্নর হিসেবে থাকাকালীন ডুপ্লে, I made the English tremble for they saw their commerce dwindling and their merchants forced to declare themselves bankrupt. I accomplished all this' in nine years যে লেখাটি লেখেন সেটিকে কি শুধুই বাগাড়ম্বর হিসেবে উড়িয়ে দেওয়া যায়?
১৭৫০এর প্রথমপাদ থেকে ব্রিটিশ কর্পোরেট কোম্পানি আর ব্যক্তিগত ব্যবসা দুরন্ত সঙ্কটের আবর্তে ঘুরপাক খেতে থাকে। ১৭৪৮ সালে ব্রিটিশ-ফরাসি যুদ্ধের শেষে এবং মারাঠা আর বাংলার নবাবের মধ্যে যে শান্তিচুক্তি হল, তাতে একটা জিনিস পরিষ্কার হল যে ফরাসী আর এশিয় ব্যবসায়ীরা বাংলার আন্তঃএশিয় ব্যবসায় নতুন করের জাঁকিয়ে বসার সুযোগ পেল। বাংলা ব্যবসাকে নতুন উদ্যমে ঢেলে সাজাতে শুরু করল ফরাসীরা হুগলী, কাশিমবাজার, ঢাকা এবং পাটনায় কুঠি খুলে। এর সঙ্গে জুড়ল আর্মেনিয় সহ অন্যান্য এশিয় ব্যবসায়ীদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা। বাংলার মুদ্রা ব্যবস্থার সঙ্কুচনে কোম্পানির পক্ষে বিশেষ করে শেঠেদের মোকামের গদি থেকে ঋণ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছিল, ৪০এর দশক থেকে কোম্পানি যে ধার নিয়েছে আগে সেগুলি শোধ করলে আগামী দিনে ঋণ পাওয়া যাবে, তারা এমনও শর্ত দিল ব্রিটিশদের।

ব্যক্তিগত ব্যবসা ক্ষেত্রটা খুবই প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠছিল বাংলায়। consulageএর(মানে কি?) দ্রুত পতনের ফলে কলকাতায় ব্রিটিশ ব্যক্তিগত ব্যবসা ঢালুর দিকে যেতে থাকে। সে সময়ে কলকাতার দায়িত্বে থাকা রবার্ট ওরমে বন্ধু রবিনিসকে লিখছে, The consulage in years of extensive trade used to be from 20 to 30 thousand rupees to the best of my memory, it is now scarce 5· or 6 clear। ফোর্ট উইলিয়াম কাউন্সিলের প্রধান সদস্য চার্লস ম্যানিঙ্গহ্যাম আর উইলিয়ম ফ্রাঙ্কল্যান্ড ক্লাইভকে লেখা চিঠিতে যতদূর সম্ভব ব্যক্তিগত ব্যবসার পতন সম্বন্ধে মন্তব্য করেছে, ... the situation of trade since you left us has continued so bad।

ব্রিটিশপূর্ব বাংলা - পলাশীতে ইংরেজদের ভূমিকা - ব্যবসা, দামিধাতু এবং ক্ষমতায় আরোহণ৪ - সুশীল চৌধুরী - ফ্রম প্রসপারিটি টু ডিক্লাইন - দশম অধ্যায়

উপসাম্রাজ্যবাদিতার তত্বতে আমরা ফিরে যাই। ১৬৬৯ সালেই সুরাতের প্রেসিডেন্ট এবং বম্বের গভর্নর জেনারেল অঙ্গিয়ার শান্তিপূর্ণ ব্যবসাদার থেকে কোম্পানিকে শস্ত্র নির্ভর ব্যবসায়ীতে রূপান্তরের ডাক দিল যাতে ভারতবর্ষে কোম্পানির ব্যবসা স্থায়ী হতে পারে। ১৬৭৭ সালে তিনি কোর্ট অব ডায়রেক্টর্সকে লিখল, Justice 'and necessity of your estate now require that in violent distempers, violent cures are only successful that the times now require you to manage your general commerce with your sword in your hands। অঙ্গিয়ারের ডাকে লন্ডনে বসে থাকা কর্তাদের কানে জল গেল। আগ্রাসী গর্ভর্নর জশুয়া চাইল্ড ভারতে এগিয়ে যাওয়ার নীতি(forward policy) নেওয়ার ডাক দিলেন। একই সঙ্গে এজেন্ট হেজেস বাংলায় এবং স্যর জন চাইল্ড সুরাটে বহুকাল ধরেই কোম্পানির বসতি সুরক্ষা করেই(দুর্গ প্রতিষ্ঠা করে) ব্রিটিশ ব্যবসা বাড়াবার প্রস্তাব দিচ্ছিলেন।
১৬৮০ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মুঘল ভারতে লক্ষ্যগুলির মধ্যে অন্যতমটি ছিল বাংলার বসতিকে দুর্গিকরণ। কোর্ট অব ডায়রেক্টর্স লিখল, We shall be exceeding glad to hear you have obtained a
fortified settlement in Bengal, which if it pleases God to grant us, we would have you cultivate with all the vigour and strength you can; that we may be well fixed and settled, in a good posture of defence before the Dutch can form any design to drive us out; which may. be a means to prevent any attempts from them as well as to secure our interest if they should attempt to disturb us under any colour or pretence ....।
আরও গুরুত্বপূর্ণ এবং আলোচ্য বিষয় হল, যুদ্ধটা তারা করতে চাইছিল ভারতে বাণিজ্য চালাবার জন্যে, এবং এই কথাবার্তা ১২ ডিসেম্বর ১৬৮৭ সালের ফোর্ট সেন্ট জর্জএর কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট লন্ডনের কর্তাদের লিখল That which we promise ourselves in a most especial manner from our new President and Council is that they will establish such a politie of Civil and Military power, and create and secure such a large revenue to maintain both at, that place, as may be the foundation of a.large, tvell grounded, sure English dominion in India for all time to come.।
ভারতে বিস্তৃত, সুরক্ষিত এবং শক্ত ভিত্তিভূমির ওপরে প্রতিষ্ঠিত ব্রিটিশ সাম্রাজ্য স্থাপনে মাদ্রাজ কাউন্সিল যে স্বপ্ন দেখছিল, সেটি সফল হল সত্তর বছর পর। ফলে ১৭৫৭র বিজয় কি করে অনভিপ্রেত এবং দুর্ঘটনাপ্রসূত বলা যায়?

মুঘলদের সঙ্গে ব্রিটিশদের যুদ্ধ অসম্ভব ব্যর্থতায় পর্যবসিত হল, ফলে বাংলা বা অন্য কোথাও তাদের বসতিতে দুর্গ স্থাপন করা সম্ভব হল না। কিন্তু সপ্তদশ শতকের শেষে, বাংলায় কিছু অপ্রত্যাশিত ঘটনায় দুর্গ তৈরির ব্রিটিশ স্বপ্ন সফল হওয়ার দিকে এগোল। ১৬৯৬ সালের শোভা সিঙ্গির উৎপাতের ফলে বাংলার সামরিক নেতৃত্ব, মুঘল সুবাদার খুব চিন্তিত হয়ে প্রত্যেক ইওরোপিয়কে দুর্গ তৈরির পরামর্শ দিলে ব্রিটিশেরা খুব তাড়াতাড়ি এই পরামর্শর পথ ধরে দুর্গ তৈরির পরিকল্পনা আঁচতে থাকে। এটা ব্রিটিশদের দুর্গ তৈরির প্রথম পদক্ষেপ এবং বহুসময় তারা নবাবের কর্তৃত্বকে অস্বীকার করে দুর্গ তৈরি এবং তাকে জোরদার করার কাজে এগিয়ে গিয়েছে। ১৭৫৬-৫৭ সালে নবাবা আর ব্রিটিশ দ্বন্দ্বের প্রধান কারণ ছিল দুর্গ কেন্দ্রিক।

ব্রিটিশপূর্ব বাংলা - পলাশীতে ইংরেজদের ভূমিকা - ব্যবসা, দামিধাতু এবং ক্ষমতায় আরোহণ৩ - সুশীল চৌধুরী -ফ্রম প্রসপারিটি টু ডিক্লাইন দশম অধ্যায়

যদি কেউ গভীরে গিয়ে নিরপেক্ষাভবে ব্রিটিশ বণিক আর দেশিয় প্রশাসনের মধ্যে সম্পর্কটা খুঁজতে যান, বিশেষ করে যে বাংলায় ১৭৫৭র ভিত্তিপ্রস্তির স্থাপিত হয়েছে, তাহলে তিনি অবশ্যই নবাবেরা ব্রিটিশদের দুধেলা গাই মনে করত, এমন চালু তত্ত্ব চালানো নির্থক হয়ে পড়বে। অবশ্যই ইওরোপিয়দের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে নবাবেরা যে ধোয়া তুলসিপাতা এটা মনে করারও কোন কারন দেখি না। ইওরোপিয় কোম্পানিগুলিকে এদেশে ব্যবসা করার জন্য বেশ কিছু রাষ্ট্রীয় ফরমান জারি করা হয়েছিল, কিন্তু বিপদের সময় নবাব যেমন দেশিয় ব্যবসায়ীর স্মরণাপন্ন হত তেমনি বিদেশিদেরও। সঙ্গে এটাও বলা যাবে না যে নবাবেরা দেশিয় ব্যবসায়ীদের লুঠত; ঠিক তেমনি বলা যাবে না নবাবেরা ইওরোপিয় কোম্পানিকে দুধেলা গাই ভাবত(ফরমান সম্বন্ধে জানতে সুশীলবাবুর বই Trade and Commercial Organization দেখতে পারেন)।
বাস্তব ঘটনা হল কোম্পানির আমলারা বিপুল ব্যক্তিগত ব্যবসায় আর কোম্পানিকে দেওয়া রাষ্ট্রের দস্তক, নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের জন্যে পথ কর আর শুল্ক ছাড়ের জন্য এশিয় ব্যবসায়ীদের বিক্রি করার বেআইনি ব্যবসায় বিপুল সম্পত্তি মালিক হয়েছে। ঠিক এই জন্য নবাবের আধিকারিকেরা প্রায়শই ব্রিটিশ আমলাদের কুকীর্তি ধরে ফেলে তাদের থেকে অর্থ আদায় করত। কোম্পানির ব্যবসার সঙ্গে ব্যক্তিগত ব্যবসার ভেদ রেখা অনেক সময় মুছে যেত। নিজেদের স্বার্থ বিঘ্নিত হওয়ার আশংকায় এই বিষয়টা বাংলার প্রশাসনের কাছে তারা পরিষ্কার করত না। দস্তক কিভাবে দুর্নীতিপূর্ণভাবে ব্যবহার হত তার হাতে গরম বর্ণনা সমসাময়িক কালের এক অজ্ঞাতনামা লেখক লিখে গিয়েছে, shameful prostitution did this trade in Dustuks arrive। সে এমন কি লিখছে, দস্তকের দুর্ব্যবহার, যথাযোগ্য কারণের জন্য, ফলে এটা অস্বাভাবিক নয়। আদতে সিরাজ, declared.he would prove from vouchers in his possession that since the grant of the Firman by Ferroekseer [in I7l7], the English had defrauded the Shah in· his legal revenue of customs to the amount of a er.ore and half [15 million rupees] by covering the trade of the Natives ·with the Company's dustuck'.।
তবুও কোম্পানির আমলারা দেশিয় প্রশাসনের বিরুদ্ধে উচ্চৈঃস্বরে স্যর টোমাস রো’র প্রণোদনায় তৈরি শান্তিপূর্ণ ব্যবসায় তোলা আদায়ের অভিযোগ এনেছে। তারা যে সকলে কোম্পানির ব্যবসা সফল করাতে খুব বেশি উদ্বিগ্ন ছিল এমন মনে করার কোন কারণ নেই, তাদের লক্ষ্য ছিল শুধুই নিজেদের ব্যবসা বাড়ানো।

এটা যুক্তিসঙ্গতভাবে তর্ক করা যেতে পারে, কোম্পানির চাকুরেদের ব্যবক্তিগত ব্যবসার স্বার্থ বাঁচানো, আদতে ব্রিটিশদের বাংলা দখলের অন্যতম অন্যতম উদ্দেশ্য। ১৭৫৩ সালে কোম্পানির বিনিয়োগ চরিত্রের পরিবর্তন – দাদনি থেকে গোমস্তা পদ্ধতিতে যাওয়ায় ফোর্ট উইলিয়ম কাউন্সিল ব্যবসায়িক দুর্দশা রোধ করার চেষ্টা করতে লাগল – বিশেষ করে আরও বেশি ব্যক্তিগত ব্যবসায় ঝুঁকে পড়ার দিকে গেল আমলারা। দাদনি বণিকদের ছেঁটে দিয়ে গোমস্তা পদ্ধতিতে পণ্য কেনার চেষ্টা কোম্পানির আমলাদের ব্যক্তিগত ব্যবসাকে বাড়তে সাহায্য করল। ১৭৫৭র মার্চে চন্দননগরে কোম্পানির আক্রমণের উদ্দেশ্যই ছিল ব্যক্তিগত ব্যবসা বাঁচানো এবং পলাশীর দিকে এক কদম হাঁটা। এটা দেখানো যায় যে ব্রিটিশ ব্যক্তিগত ব্যবসা ১৭৪০এর দশক থেকে পড়তে থাকে এবং ১৭৫০এর শুরুতে এসে এক্কেবারে খাদে পৌঁছয়। বাংলার ফরাসী এবং হুগলির বণিকদের আন্তঃএশিয় ব্যবসা, হুগলী থেকে জোর কদমে চলছিল, এবং সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছে ছিল। ব্রিটিশদের হুগলীর দ্বৈত ব্যবসা(ফরাসী এবং দেশিয় বণিক) ধ্বংস করা ব্রিটিশ বানিজ্যের বাঁচার এবং তাকে অসীম উচ্চনায় নিয়ে যাওয়ার পক্ষে খুব জরুরি হয়ে পড়ছিল। সেটা সম্ভব ছিল যদি বাংলা দখল করা যায়। ফলে হুগলী আর চন্দননগরে আক্রমণ ব্রিটিশদের পক্ষে জরুরি ছিল। সাধারণভাবে ঐতিহাসিকেরা বলে থাকেন বঙ্গ-ফরাসী জোট ভাঙার জন্যে চন্দননগর আক্রমণ জরুরি ছিল অথবা বলা হয় যে ঈঙ্গ-ফরাসী যুদ্ধের জন্যই ব্রিটিশদের এই আক্রমণ। আদতে ব্রিটিশদের বড় কাজ ছিল বিপুলভাবে বাড়তে থাকা ফরাসী ব্যক্তিগত ব্যবসাকে ধ্বংস করা। এই ধ্বংসকাজ না করা গেলে ব্রিটিশ ব্যক্তিগত ব্যবসাকে টেনে তোলা খুব মুশকিল হয়ে পড়ছিল।