Showing posts with label Anti-colonial Discourse. Show all posts
Showing posts with label Anti-colonial Discourse. Show all posts

Monday, February 29, 2016

উপনিবেশবাদ বিরোধীচর্চা - আর্যভট থেকে আম্বেদকর৩



কোন গবেষক যদি ‘সঠিক’তার দাবি করা উইকিপিডিয়ায় আর্যভট বিষয়ে দেখতে যান তাহলে কিন্তু কোথাও তাঁর জাত সম্বন্ধে একটা কথাও বলা নেই - বরং তিনি যে উপবীতধারী ব্রাহ্মণ, তাঁর চিহ্নওয়ালা একটা মূর্তির ছবি ছাপা হয়েছে সেখানে। পরোক্ষে বলে দেওয়া হয়েছে তাঁর জাত কি, যেভাবে পাঠ্য অঙ্কপুস্তকে কালো গ্রিসের অঙ্কচর্চকদের ককেসাসিয় চেহারার দেখানো হয়। Inter University Centre for Astronomy and Astrophysics (IUCAA), Puneতে এই অনৈতিহাসিক মূর্তিটি রাখা হয়েছে। রাজুজী বলছেন, IUCAAর জনসংযোগ আধিকারিক তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রশ্ন করেন আর্যভট পৃথিবীকে কোথায় কদম্বাকার বলেছেন তাঁর উল্লেখ জানতে। তিনি তাঁর যথাবিহিত উত্তর দিয়ে বললেন যে তাঁর নামের বানানটা যেন ঠিক করে নেওয়া হয়। সেই আধিকারিক তাঁকে জানালেন সংস্থার প্রতিষ্ঠাকার জয়ন্ত বিষ্ণু নার্লিকর তাঁকে ঠিক বানানটি জানিয়েছেন। তার উত্তর যখন রাজুজী তাঁকে প্রশ্ন করলেন, তাহলে কেন নার্লিকর সম্পাদিত পাঠ্য পুস্তকে আর্যভটের নাম বিকৃত ছাপা হয়েছে, তিনি সেই প্রশ্ন এড়িয়ে যান।

IUCAAসূত্রে উইকিপিডিয়ায় যে ছবিটি ব্যবহার করা হল তাতে একটাই বার্তা গেল ভারতীয় বিজ্ঞানচর্চায় দলিতদের/অব্রাহ্মণদের কোন স্থান ছিল না। ব্রিটিশ অনুগামীরা নতুন ধরণের জাত ব্যবস্থা ভারতে পত্তন করলেন। মেকলে এবং মার্ক্স-এঙ্গেলসদের হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত জ্ঞানে বিজ্ঞানে প্রযুক্তিতে উপনিবেশ উন্নত ছিল – যার তাত্ত্বিক প্রতিধ্বনি বিদ্যাসাগর এবং রামমোহন রায়ের কাজে ছড়িয়ে পড়েছে নব্য জ্ঞানচর্চায় এবং তাঁরা দেশজ পড়াশোনা ছেড়ে ঔপনিবেশিক বিজ্ঞান পড়ানোর দাবি করছেন বুক বাজিয়ে। বা জেসুইট পাদ্রিরা কনণবিদ্যার অক্ষহৃদয় না বুঝেই নকল করে আর্যভটের হাতে শুরু হওয়া বিদ্যাটিকে ইওরোপে নিয়ে গেলেন। তখনকার শ্রেষ্ঠ ইওরোপিয় মাথা, দেকার্ত আর নিউটন সেটাকে বুঝতেই পারলেন না। এ প্রসঙ্গে রাজুজীর অসাধারণ স্তবকটি তুলে দেওয়ার লোভ সামলাতে পারছি না - In the spirit of Kant, a reverse racist might say white-skinned people lacked the brains. However, the inferior Western misunderstanding of the calculus, coated with a redundant Western metaphysics, is what is taught in our universities today. Academics (mostly Western dominated) are unwilling to discuss publicly the claim why Western calculus is superior. The claim of superiority will fall to pieces if discussed publicly।

আবেদন নতুন করে ভাবি। নতুন করে আমাদের পূর্বজরা যে সভ্যতা তৈরি করে গিয়েছেন তার জোরের জায়গা আলোচনা করি। তবেই তৈরি হবে আন্দোলনের ভিত। নয়ত ফক্কা।

উপনিবেশবাদ বিরোধীচর্চা - আর্যভট থেকে আম্বেদকর২



ভারতের অঙ্ক দর্শন এবং ইতিহাসকার চন্দ্র কান্ত রাজুর দারুণ একটা দুপাতার হিন্দি প্রবন্ধ দলিত ঔর বিজ্ঞান। যদিও আমরা পশ্চিমি মতে ভারতীয় ইতিহাসে যুগ বিভাজনে বিশ্বাস করি না, বলতে পারি প্রাচীন থেকে মধ্যযুগে বাংলার দলিতেরা শুদ্ররা মূলত তান্ত্রিক, বৌদ্ধ, এবং পরে ইসলামি রাজত্বের অংশ হয়ে ঈর্ষনীয় বৌদ্ধিক, কৃষ্টিগত এবং অকেন্দ্রিভূত উৎপাদনভিত্তিক বিশ্বজোড়া বাণিজ্য বিকাশের স্তরে পৌছে ছিল। রাজুজী তাঁর কালচারাল ফাউন্ডেশন অব ম্যাথেমেটিক্স শুরুই করছেন আর্যভট(এই নামের বুৎপত্তি নিয়ে কয়েকদিন আগেই একটা প্রকাশনা দিয়েছিলাম। আশাকরি সেটি মাথায় রয়েছে – শুধু বলি, ক্ষমতায় থাকা মানুষজন যখন আর্যভটকে সুচতুর ভাবে আর্যভট্ট বলতে শুরু করে, সেই উচ্চারণকে পাঠ্যপুস্তকের অংশ করে দেন তখনই ইতিহাসকে নতুন করে দেখতে হয়)এর জ্ঞানচর্চার অবদান দিয়ে। তিনি বিলছেন, আর্যভট used a numerical technique of solving differential equations to compute precise sine values। আজও মঙ্গলে চন্দ্রযান পাঠাতে সেই পদ্ধতিতেই গণনা করতে হয়। এবং আর্যভট প্রথম গোল পৃথিবীকে তুলনা করেছেন কদম্বের সঙ্গে তাঁর গোলধ্যায়৭এ।

গত কয়েক দশকে ঔপনিবেশিক পশ্চমি লুঠেরা বড় পুঁজি নির্ভর কেন্দ্রিভূত প্রযুক্তি/বিজ্ঞানকে উচ্চতর বিশ্বজ্ঞনের শ্রেণীতে ফেলে ভারতীয় জ্ঞান-বিজ্ঞানকে দেশজ জ্ঞান হিসেবে দাগিয়ে দিয়েছে এবং এটি আমরা সোনা মুখে মেনে নিয়েছি, ঠিক যেমনভাবে ভুলে ভরা পশ্চিমে কলণবিদ্যাকে উচতর জ্ঞানার্জন বলা হয়েছে। এই যুক্তিতে বলা হচ্ছে নিম্নবর্ণের ভাগ্যভাল তাঁরা এই উচ্চজ্ঞানচর্চার বেদীতে আরোহন করছেন। অর্থাৎ কেউ কেউ সফল হচ্ছেন মাত্র, সেটি নিয়ম নয়। কিন্তু ভারতে আর্যভট একমাত্র অউচ্চবর্ণ ছিলেন না। বলা যাবে না তিনি দলিত হিসেবে ভারতীয় জ্ঞানচর্চায় ব্যতিক্রম ছিলেন। ঠিক তাঁর পাঁচ দশক পরে আবির্ভূত হয়েছিলেন দ্বিতীয় আর্যভট। কৌসাম্বী বা আম্বেদকরের মতে এই সময়ে কিন্তু মনুস্মৃতি সঙ্কলিত হচ্ছিল। তবুও কিন্তু দ্বিতীয় আর্যভট তৈরি হয়েছিলেন। আর পঞ্চম শতের পাটনার আর্যভটের অনুগামী হিসেবে ১৫শ শতে এলেন দক্ষিণ ভারতের উচ্চতম জাতের নাম্বুদ্রি ব্রাহ্মণ, যিনি আর্যভট পদ্ধতির অঙ্কবিদ্যাকে চারিয়ে নিয়ে গেলেন নতুন উচ্চতায়। নীলকান্তের পুঁথি শীর্ষক সোমস্তুভমএ তিনি আর্যভট সম্বন্ধে ভাষ্য লিখছেন। আমাদের নতুন করে ঔপনিবেশিক সময়ের তৈরি করা বিভাগকে নতুন করে ভাঙ্গার চিন্তা করতে হবে যেখানে বলা হয়েছে ভারতের জ্ঞানচর্চায় দলিতদের স্থান ছিল না, এবং দুস্তর ভৌগোলিক ব্যবধান ছিল বিন্ধ্যর দুপাশে।

ভারতে জাতিভেদ একটা বাস্তব কাঠামো। সেটা যেমন বাস্তব, তেমনি ভারতীয় জ্ঞানচর্চায়, উতপাদন-বিতরণ ব্যবস্থায় অউচ্চবর্ণের, দলিতদের অবদান উচ্চবর্ণদের থেকে অনেক বেশি। সেটা আরও ঘোর বাস্তব। গত প্রকাশনায় বাংলার উৎপাদন-বিতরণ, জ্ঞানচর্চার পরিবেশ বর্ণনাতে তা কিছুটা চুম্বকে বলা গিয়েছে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতা এবং তার ধ্বজাধারীদের জ্ঞানচর্চায় নব্য পশ্চিমি জ্ঞানচর্চকদের সূত্রে ভারতে এক্কেবারে অন্য ধরণের জাতিবাদী আখ্যান তৈরি হল। যে ভিত্তিভূমি গড়ে গিয়েছিলেন পূর্বের অব্রাহ্মণ জ্ঞানতাত্ত্বিকেরা, সেই ভিত্তিভূমিকে অস্বীকার করার প্রবণতা শুরু হল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার ছাতায়।

তাঁর জ্বলন্ত উদাহরণ হয়ে উঠলেন আর্যভট। তাঁর জাতি চরিত্র পালটে ফেলার উদ্যম গ্রহণ করা হল। নামের বানান উদ্দেশ্যপূর্ণভাবে পাল্টে দিয়ে তাঁকে দেখানো হল ব্রাহ্মণ রূপে। ব্রহ্মগুপ্ত কিন্তু তাঁর গুরুর নাম আর্যভট লিখেছেন অন্তত একশ বার তাঁর রচনায়। যে মানুষটি পাইএর মান নির্ণয় করলেন, দশমিক ব্যবস্থাকে জোর ভিত্তি দিলেন, আর্ভটিয়া লিখলেন, আল খোয়ারজমি যার নাম উল্লেখ করেছেন তাঁর রচনায়, যিনি সাইন(জ্যা), কোসাইন(কোজ্যা), ভারসাইন(উতক্রমজ্যা), ইনভার্সসাইন(অতক্রম জ্যা), সাইন নামতা(টেবল) নয়, দশমিকের পরে, শুন্য থেকে নব্বই ডিগ্রি পর্যন্ত ৩.৭৫ ডিগ্রি অন্তরে ভার্সসাইন (1 − cos x) তালিকা সঠিক চার সংখ্যা পর্যন্ত গণনা করেছিলেন, আজও মঙ্গলগ্রহে উপগ্রহ পাঠানো হয় আর্যভটের অঙ্ক কষার পদ্ধতিতে, সেই মানুষটার জাতি চরিত্র পাল্টে দিলেন আধুনিক ভারতের জ্ঞানচর্চকেরা।

Sunday, February 28, 2016

উপনিবেশবাদ বিরোধীচর্চা - আর্যভট থেকে আম্বেদকর১




কয়েকদিন আগেই পড়ছিলাম সঞ্জয় পাসোয়ানের কালচারাল ন্যাশনালিজম এন্ড দলিত বইটি। আমরা, বঙ্গীয় পারম্পরিক কারু ও বস্ত্র শিল্পী সংঘ বা গঠিত হতে চলা উইভার, আরটিজান ট্রাডিশনাল আর্টিস্টস গিল্ডের সদস্য, যারা গ্রামজ উতপাদন ব্যবস্থা, প্রযুক্তি আর সংগঠন বিষয়ে অল্পস্বল্প নজর দিয়েছি। আমাদের পথচলা দর্শনের সঙ্গে, এই বইটির ভাষ্য কিছুটা হলেও মিলে যায়। তাঁর বক্তব্য ব্রিটিশ উপনিবেশপূর্ব সময়ে ভারতে দলিতদের অবস্থান খুব খারাপ ছিল না – এই ভাষ্যে কিন্তু তিনি জাত ব্যবস্থায় কোনভাবেই উচবর্ণের অবস্থান সমর্থন করছেন না - আমরাও। তিনি বাল্মিকী, বেদব্যাস, কবীর থেকে রবিদাসের জীবনী আলোচনা করেছেন। দক্ষিণের এজাভা পরিবারের নারায়ণ গুরুর কথা এ প্রসঙ্গে বলা যায়। আমরা এখানে বাংলার নানান সম্প্রদায়ের কথা বলতে পারি। সঞ্জয়জী জোর দিচ্ছেন এডাম সমীক্ষার বাংলা-বিহারের শিক্ষা ব্যবস্থার তথ্যে, যেখানে তথাকথিত বর্ণাশ্রমের উপরের দিককার মানুষদের থেকে সংখ্যাগরিষ্ঠ শিক্ষক-ছাত্র ছিলেন দলিত মানুষেরা।

আজ ভারতে দলিত আন্দোলন নতুন উচ্চতায় পৌঁছচ্ছে। অনাচারের বিরুদ্ধে লড়াইটা তো করতেই হবে, তার আগে প্রয়োজন আমার কি ছিল, সে বিষয়ে নিরন্তর আলোচনা, যার একটি ঝাঁকি আমরা সঞ্জয় পাসোয়ানজীর বইটিতে পেয়েছি, নিজেরা আলোচনা করছি পরম নামক এক চটি মাসিক পত্রিকায়। কি হারিয়েছি, তার হাহুতাশ তো আছেই। কিন্তু যে কেন্দ্রিভূত দর্শনের জাতিবিদ্যা তৈরি হয়েছে ভারতে বিগত কয়েক শতক ধরে ঔপনিবেশিক জ্ঞানচর্চায়, তাকে সবার আগে প্রশ্ন করতে হবে। হাজার হাজার বছর ধরে বিকেন্দ্রীভূত, বৈচিত্র্যময়, আসাধারণ এক সভ্যতার ভিত্তিভূমি গড়ে তুলেছেন মূলত দলিতেরা – তাই ভারত সভ্যতা শুদ্র সভ্যতা – দলিত সভ্যতা – এটা বলতে হবে। তাঁরাই পারেন কেন্দ্রীভূত ক্ষমতাকে নিজেদের দর্শন দিয়েই প্রশ্ন করতে। বড় পুঁজির দর্শনের ভেতরে দাঁড়িয়ে তা হয়ত হবে না। নতুনভাবে দেখতে হবে বড় পুঁজি ভিত্তিক লুঠেরা পশ্চিমি গণতন্ত্র, বিজ্ঞান, সমাজতত্ত্বের ভিত্তিকে – নিজেদের তৈরি পঞ্চায়েতি গণতন্ত্র, নিজেদের বিকশিত জ্ঞানচর্চার মহিমা দিয়ে। ভারতে তৃণমূল স্তরে আজও সেই দর্শনে টিকে থাকার উদ্যম রয়েছে।

দুঃখের বিষয় সেই উদ্যমের অভাব রয়েছে ইংরেজি শিক্ষিতদ দলিত নেতৃত্বের মধ্যে। তাঁদের অধিকাংশই বড় পুঁজির তৈরি করা বিজ্ঞনের অংশ হতে চান, হতে চান এই উৎপাদন ব্যবস্থার একটি শৃঙ্খল। বিনীতভাবে বলার চেষ্টা করব শিক্ষিত দলিত নেতাদের এই তাত্ত্বিক অবস্থানে বড় পুঁজিরই লাভ – যখন তাঁরা বলেন ‘একবিংশ শতাব্দীর জ্ঞান-বিজ্ঞানের এই চরম উৎকর্ষের যুগে সমাজ ও সভ্যতায় অভূতপূর্ব বিপ্লব ঘটেছে। সমাজের সাধারণ মানুষের চিন্তা-চেতনার ক্ষেত্রও প্রসারিত হয়েছে বহুল্যাংশে। আজ প্রত্যন্ত-অজপাড়াগাঁয়ে বসবাসকারী নিতান্ত আখ্যাত, হত-দরিদ্র মানুষও আগামী দিনে উন্নত সভ্যতার সংস্পর্শে এসে নিজের জীবন গড়ার স্বপ্ন দেখে... ইত্যাদি(সমাজ বিপ্লবে মতুয়াধর্ম, কপিলকৃষ্ণ ঠাকুর, সঙ্ঘাধিপতি, মতুয়া মহা সংঘ, শ্রীশ্রীহরিচাঁদ ঠাকুর স্বর্ণ-সংকলন, পাতা ১৭)’। এ নিয়ে এখন তর্কে প্রবেশ করব না। তোলা রইল।

ভারতকে দলিত সভ্যতা বলতে গেলে নিজেদের জোরের জায়গা, কেন আমরা আলাদা, আমরা কি গড়ে তুলেছিলাম, সেটা জানাতে হবেই। ‘উন্নত সভ্যতা’বিশিষ্ট ‘একবিংশ শতাব্দীর জ্ঞান-বিজ্ঞানের এই চরম উৎকর্ষের’ কেন্দ্র বড় শরিকের দর্শনের অনুবর্তী হয়ে হাতেগোণা মানুষ হয়ত স্বচ্ছল থাকতে পারবেন, পিঠ চাপড়ানি পাবেন, কিন্তু নিজস্ব সভ্যতার যে পরিচয় গড়ে উঠেছিল কয়েক সহস্র বছর ধরে, সেই পরিচয় তৈরি হবে না।

Thursday, February 11, 2016

উপনিবেশবাদ বিরোধী চর্চা: কৃষি লুঠ কথা


রিচারিয়াজীর সাক্ষাৎকার৩
 
ক্লঃ মধ্যপ্রদেশ সরকার কবে আপনাকে বলল ধান্য গবেষণাগার স্থাপন করতে?
রিঃ ১৯৭১এ। আমি সরকারের কৃষি উপদেষ্টা হিসেবে যোগ দিই। রায়পুরে ধানের জার্মপ্লাজম ব্যাঙ্ক স্থাপন করার সঙ্গে সঙ্গেই নানান এলাকার বিশেষ করে বস্তারের অবুঝমাঢের পাওয়া ধানের তথ্য যোগ করলাম।
ক্লঃ কি করে এই দ্বিতীয় সংস্থাটিও বন্ধ হয়ে গেল? বিশ্বব্যাংকের আর স্বামীনাথনের ভূমিকা কি ছিল?
রিঃ স্বামীনাথনের আইআরআরআইএর কাজে খুব উতসাহ ছিল। তিনি তখন আইসিএআরএর সেক্রেটারি এবং ভাইস চেয়ারম্যান। ধান বিষয়ে দেশের যত গবেষণা, উদ্যম সব তাঁর হাতে ন্যস্ত ছিল। তাঁরা সব ধানের প্রজাতি সংগ্রহ করে চাইছিলেন আইসিএআরএর এবং কটকের সিআরআরআইএর মাধ্যমে। সিআরআরআই তখন আইসিএআরএর অধীন। তাঁরা আমার কাছে এলেন। আমি বললাম কাগজ না দেখে আমি কোনো মন্তব্য করব না। যে কাজগুলি হয়েছে সেগুলি বিষয়ে মন্তব্য করতে হবে। যা আমি জানি না সেগুলি কি করে অনুমোদন দেব? আইসিএআরএর দুতিনজন আবার আমার সঙ্গে দেখা করতে এলেন। তাঁরা আমার মন বুঝতে চাইলেন। বললেন আমাদের কাগজের বদলে ওরা কি কিছু কাগজ দেবেন? আইআরআরআইএর প্রতিনিধিরা বললেন তাঁরা আমার আর ওদের গবেষণার কাগজ অদল বদল করতে চাইলেন। আমি স্পষ্ট করে দিলাম, ওদের গবেষণায় আমার রুচি নেই। কেননা সেই প্রজাতিগুলি ভাইরাস দূষিত হয়ে রয়েছে। আর আ্মারটি মধ্যপ্রদেশের ছত্তিশগড়ের ধান্য অঞ্চলের উপাত্ত থেকে তৈরি।
ক্লঃ আইসিএআরএর প্রধান(স্বামীনাথন)কি এর পিছনে ছিলেন?
রিঃ তিনিইতো নাটেরগুরু। তিনিই ঠিক করতেন কি কি কত কত প্রজাতি সিআরআরআইতে থাকবে, কি কি দিল্লিতে যাবে সেখান থেকে আইআরআরআইতে যাবে। তাঁর হাতেই তো অসীম ক্ষমতা। আর তিনি তো সরকারের সচিব আর আইসিএআরএর নির্দেশক। তাঁর হাতেই ভারতের খাদ্য তথ্যের সব কিছু রয়েছে। সব উপাত্ত রয়েছে। সেই সব তথ্যের ওপর বসে তিনি ভারতের খাদ্য নীতি তৈরি করলেন। তিনি আমাদের ধানের সমস্ত সম্পদের তথ্য জানতেন।
ক্লঃ ফলে আপনার নতুন সংস্থাকে বন্ধ করে দেওয়া হল?
রিঃ আমি সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের প্রস্তাব বাতিল করি নি। আমি বললাম আগে আমি যে সব সংগ্রহ করেছি, সেগুলি বিষয়ে পড়াশোনা, গবেষণা করি, তাঁর পর জানাব। তাঁদের কিছু বেঁটে জাতের গাছও দিলাম। আমি আইআরআরআইএর বিজ্ঞানীদের বললাম, আমার গবেষণা আর সংগৃহীত প্রজাতি যদি দক্ষিণপূর্ব এশিয় দেশগুলির উন্নতিতে সাহায্য করে, তাহলে আমি এই কাজ করতে এক পায়ে খাড়া – তবে আমার কিছু শর্ত রয়েছে, আমার থেকে নেওয়া প্রজাতিগুলির ওপর আপনারা যে কাজ করবেন, সেগুলির একটা করে সমীক্ষা আমাকে পাঠাতে হবে, বিশেষ করে বেঁটে জাতের প্রজাতি যেগুলি আমি আপনাদের উপহার দিলাম। তাঁরা তা নিয়ে গেল কিন্তু আমায় কোন সমীক্ষাপত্র পাঠায় নি।
আমি সারাজীবন লড়াই করে একটা কথা বলে গিয়েছি, যে দেশে ধান চাষের উদ্গাতা, সে দেশে প্রচুর উন্নতমানের ধানের প্রজাতি রয়েছে। তাঁরা আমার তত্ত্বে সহমত পোষণ করেছেন। তাঁদের লেখা পত্রে মধ্যপ্রদেশে ধান গবেষণা সংস্থায় আমি যে সব কাজ করেছি, সেগুলি উল্লেখ করেছেন। তাই তাঁরা চেষ্টা করেছেন আমার সংগৃহীত প্রজাতিগুলি হাতানোর। মাঝে মধ্যেই তাঁরা রায়পুরে আসতেন। আমার গোপন করার কিছুই ছিল না। তাঁদের ধারণা ছিল আমাকে তাঁরা যে শিক্ষা দিয়েছেন, তাতে আমার শিরদাঁড়া বেঁকে গিয়েছে।
ফলে তাঁরা ধারণা করেছিলেন আমাকে ওরা যা বলবেন আমি তাই অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলব। কিন্তু দেখলেন উল্টোটা হচ্ছে। আমি যে সংস্থায় কাজ করতাম সেটিকে তাঁরা অর্থ সাহায্য করেন নি। সেটি একটি রাজ্য সরকারি সংস্থা। যেটি আমার খাটাখাটনিতে, দীর্ঘ পরিশ্রমে যে জ্ঞান অর্জন করেছি, সেই বলে বেড়ে উঠেছে। আমি বললাম ঠিক আছে, আমি এই বিষয়ে একমত হব, তবে আমায় গবেষণা শেষ হলে তবেই। তাঁরা বুঝলেন আমায় নোয়ানো যাবে না। তাঁরা জানতেন আমাদের কাছে যে সব প্রজাতি রয়েছে সেগুলি নিতে পারলে কেল্লা ফতে করতে পারবেন। তবে আমি যেটি ওদের দিয়েছিলাম, সেটি ওদের এই প্রশিক্ষিত প্রযুক্তিবিদদের হাতে রয়েছে।
তাঁরা একটি ছক কষলেন। আমার ধারণা সরকারি প্রক্রিয়ার এরকম পরিকল্পনা সাধারণত হয় না। তাঁরা আমায় বললেন আমাদের ৪ কোটি টাকা দেবেন(অবশ্যই মাঝের কোন এক দালালের হাত দিয়ে, এক্ষেত্রে এটি হল বিশ্ব ব্যাঙ্ক) ধান গবেষণার জন্য – তবে যেহেতু দু জায়গায় এই ধরণের গবেষণা হচ্ছে, তাই মধ্যপ্রদেশের সংস্থাটিকে এই গবেষণা বন্ধ করতে হবে। তাঁদের উদ্দেশ্য আমাদের সংগ্রহ করা যত জার্মপ্লাজম রয়েছে সেগুলি হাতিয়ে নেওয়া, আর সেগুলি বেঁটে প্রজাতি দিয়ে প্রতিস্থাপিত করা, যাতে দেশে রাসায়নিক সারের কোম্পানিগুলির বাজার বাড়ে।
তাঁদের বিশ্বাস ছিল আমি যদি গবেষণা চালিয়ে যাই তাহলে আমি তাহলে আমাদের দেশের নিজস্ব উন্নত মানের উচ্চফলনশীল ধান বাজারে নিয়ে আসব। সেই চেষ্টা প্রতিহত করতে হবে। তাঁরা আমাকে বঞ্চনা করে আমার গবেষণার কাজকে নষ্ট করে আমায় অসহায় করে দিলেন। আর তাঁর পরে সারা দেশে খুব খারাপ প্রজাতির ধান ছড়িয়ে দিয়ে দেশের ধানের উৎপাদন কমিয়ে দিলেন।
ক্লঃ রিচারিয়াজী, আজ কি ভারতের ধান উৎপাদন বাড়ানোর কোন মান্য পদ্ধতি অবশিষ্ট আছে? আপনি আদিবাসীদের কাজ তাঁদের পদ্ধতি নিয়ে কথা বলেছেন। আপনার তৈরি করা মানুষদের কি একই ধারণা?
রিঃ I had proposed that hybrid vigour exploitation is possible in India, by utilising vegetative propagation technology which constituted a direct challenge to the dwarf plant type technology concept. ।  কিন্তু আজ ধান বিজ্ঞানীদের সমস্ত পরিশ্রম ব্যয় হয়ে যাচ্ছে এই ভুল কাজে। উচ্চফলনশীল বেঁটে প্রজাতি মোটেই ভাল প্রজাতি নয়। এটি প্রমাণিতই হয়ে গিয়েছে। কিন্তু কর্তাদের অঙ্গুলি হেলনে আজও সেই কাজ হয়ে চলেছে।
তাহলে? আমি মনে করি, আজ ভারতের প্ল্যান্ট ব্রিডার্সরা নিজেদের মত করে কাজ করুণ, নিজেদের পদ্ধতি নিজেরা উদ্ভাবন করুক, যাতে আইআরআরআইকে নতুন রণকৌশল গ্রহণ করতে হয়, বিশেষ করে যে রাস্তায় আমি হেঁটেছি। ফলে আইআরআরআই বাধ্য হবে ভারতীয় পদ্ধতিতে ফিরে আসতে। তাঁরা আমায় মেল স্টেরাইল পদ্ধতিতে কাজ করতে বলেছিল। চিন এই পদ্ধতিতে এগিয়েছে। এই কাজ করা খুব সহজ নয়। সময় এবং ভাল প্রজাতির প্রয়োজন – তবুও সাফল্য নাও আসতে পারে। আর এই পদ্ধতিতে বাসমতির মত চালের একই ধরণের গন্ধ আর একই সঙ্গে চরম উতপাদনশীলতার হার ধরে রাখা খুব মুশকিল। বাসমতিকে এই পদ্ধতিতে বিকাশ করা যেতে পারে। হয়ত নয়। কিন্তু আইআরআরআই চাইছে তাঁদের উদ্ভাবিত পদ্দতি নিয়ে, বৈজ্ঞানিকেরা নিজেদের পদ্ধতি জলাঞ্জলি দিক। আমি বলি  why don’t you exploit the hybrid vigour through clonal propagation which insures the economic production of crossed seeds from F1 plans for full normal crop from the F2 population (hybrid vigour persists in later generations also).।
আজ আমরা চিনের ধান আমদানি করছি। সেই টিএন১ আর আইআর৮এর পুরোনো ভুল ঘটে চলেছে। আমার ধারণা ভারতীয় পরিবেশে এই বিদেশী প্রজাতিগুলি সম্পুর্ণ কাজ দেবে কি না। আজো আমাদের নিজস্ব ধান প্রজাতি না নিয়ে আমরা সেই পুরোনো ভুলের চির্বিতচর্বণ করে চলেছি। আমার প্রশ্ন, কবে আর একে গুরুত্ব দিয়ে ভাবব?