Showing posts with label charka. Show all posts
Showing posts with label charka. Show all posts

Friday, August 23, 2013

সংবাদপত্রে, সমাচার চন্দ্রিকায় এক চরকা কাটনির দরখাস্ত, Letter of a Charka Lady to a News Paper, Samacar Chandrika

শ্রীযুত সমাচার পত্রকার মহাশয়। আমি স্ত্রীলোক অনেক দুঃখ পাইয়া এক পত্র প্রস্তুত করিয়া পাঠাইতেছি আপনারা দয়া করিয়া আপনারদিগের আপন ২ সমাচারপত্রে প্রকাশ করিবেন শুনিয়াছি ইহা প্রকাশ হইলে দুঃখ নিবারণকর্ত্তারদিগের কর্ণগোচর হইতে পারিবেক তাহা হইলে আমার মনস্কামনা সিদ্ধ হইবেক অতয়েব আপনারা আমার এই দরখাস্তপত্র দুঃখিনী স্ত্রীর লেখা জানিয়া হেয়জ্ঞান করিবেন না।

আমি নিতান্ত অভাগিনী আমার দুঃখের কথা তাবৎ লিখিতে হইলে অনেক কথা লিখিতে হয়। কিন্তু কিছু লিখি যখন আমার সাড়ে পাঁচ গণ্ডা বয়স তখন বিধবা হইয়াছি কেবল তিন কন্যা সন্তান হইয়াছিল। বৃদ্ধ শ্বশুর শাশুড়ি আর ঐ তিনটি কন্যা প্রতিপালনের কোন উপায় রাখিয়া স্বামি মরেন নাই তিনি নানা ব্যবসায়ে কাল যাপন করিতেন আমার গায়ে যে অলঙ্কার ছিল তা বিক্রয় করিয়া তাঁহার শ্রাদ্ধ করিয়াছিলাম শেষে অনাভাবে কএক প্রাণী মারা পড়িবার প্রকরণ উপস্থিত হইল তখন বিধাতা আমাকে এমত বুদ্ধি দিলেন যে জাহাতে আমারদিগের প্রাণ রক্ষা হইতে পারে অর্থাৎ আসনা ও চরকায় সুতা কাটিতে আরম্ভ করিলাম প্রাতঃকালে গৃহকর্ম্ম অর্থাৎ পাটি ঝাট্টি করিয়া চরকা লইয়া বসিতাম বেলা দুই প্রহর পর্য্যন্ত কাটনা কাটিতাম প্রায় এক তোলা সুতা কাটিয়া স্নানে যাইতাম স্নান করিয়া রন্ধন করিয়া শ্বশুর শাশুড়ি আর তিন কন্যাকে ভোজন করাইয়া পরে আমি কিছু খাইয়া সরু টেকো লইয়া আসনা সূতা কাটিতাম তাহাও প্রায় এক তোলা আন্দাজ কাটিয়া উঠিতাম এইপ্রকার সূতা কাটিয়া তাঁতিরা বাটীতে আসিয়া টাকায় তিন তোলার দরে চরকার সূতা আর দেড় তোলার  দরে সরু আসনা সূতা লইয়া যাইত এবং যত টাকা আগামি চাহিতাম তৎক্ষণাৎ দিত ইহাতে আমাদের অন্ন বস্ত্রের কোন উদবেগ ছিল না পরে ক্রমে ২ ঐ কর্ম্মে বড়ই নিপুন হইলাম কএক বৎসরের মধ্যে আমার হাতে সাত গণ্ডা টাকা হইল এক কন্যার বিবাহ দিলাম ঐ প্রকারে তিন কন্যার বিবাহ দিলাম তাহাতে কুটুম্বতার যে ধারা আছে তাহার কিছু অন্যথা হইল না রাঁড়ের মেয়্যে বলিয়া কেহ ঘৃনা করিতে পারে নাই কেননা ঘটক কুলীনকে যাহা দিতে হয় সকলি করিয়াছি ততপরে শ্বশুরের কাল হইল তাঁহার শ্রাদ্ধে এগার গণ্ডা টাকা খরচ করি তাহা তাঁতিরা আমাকে কর্জ্জ দিয়াছিল দেড় বৎসরের মধ্যে তাহা শোধ দিলাম কেবল চরকার প্রাসাদাৎ  এত পর্য্যন্ত হইয়া ছিল এক্ষনে তিন বৎসরাব্ধি দুই শাশুড়ি বধূর অন্নাভাব হইয়াছে সূতা কিনিতে তাঁতি বাটীতে আসা দূরে থাকুক হাটে পাঠাইলে পুর্ব্বাপেক্ষা সিকি দরেও লয় না ইহার কারন কি কিছুই বুঝিতে পারি না অনেক লোককে জিজ্ঞাসা করিয়াছি অনেকে কহে যে বিলাতি সূতা বিস্তর আমদানি হইতেছে সেই সকল সূতা তাঁতিরা কিনিয়া কাপড় বুনে। আমার মনে অহঙ্কার ছিল যে আমার যেমন সূতা এমন কখন বিলাতি সূতা হইবেক না পরে বিলাতি সূতা আনাইয়া দেখিলাম আমার সূতা হইতে ভাল বটে তাঁহার দর শুনিলাম ৩।৪ টাকা করয়া সের আমি কপালে ঘা মারিয়া কহিলাম হা বিধাতা আমা হইতে দুখিনি আর আছে পুর্ব্বে বিলাতে তাবৎ লোক বড় মানুষ বাঙ্গালি সব কাঙ্গালী এক্ষণে বুঝিলাম আমা হইতেও সেখানে কাঙ্গালিনী আছে কেননা তাঁহারা যে দুঃখ করিয়া এই সূতা প্রস্তুত করিয়াছে সে দুঃখ আমি বিলক্ষণ জানিতে পারিয়াছি এমত দুঃখের সামগ্রী সেখানকার হাটে বাজারে বিক্রয় হইল না একারণ এ দেশে পাঠাইয়াছেন এখানেও যদি উত্তম দরে বিক্রয় হইত তবে ক্ষতি ছিল না তাহা না হইয়া কেবল আমারদিগের সর্ব্বনাশ হইয়াছে সে সূতায় যত বস্ত্রাদি হয় তাহা লোকে দুই মাসও ভালরূপে ব্যবহার করিতে পারে না গলিয়া যায় অতয়েব সেখনাকার কাটনিদিগকে মিনতি করিয়া বলিতেছি যে আমার এই দরখাস্ত বিবেচনা করিলে এদেশে সূতা পাঠান উচিত কি অনুচিত জানিতে পারিবেন। শান্তিপুর কোন দুঃখিনী সূতা কাটনির দরখাস্ত। সং চং

(সমাচার চন্দ্রিকা, ৫ জানুয়ারি ১৮২৮, ২২ পৌষ ১২৩৪)

Friday, January 18, 2013

বাংলার সুতাকাটা আর বস্ত্র বয়ন শিল্প২, Thread Making by Charka & Weaving in Bengal2


...১৮০৮-১৮১৫ খৃঃ পর্যন্ত উত্তর ভারতের আর্থিক আবস্থা আলোচনা করিয়া বুকানন হ্যামিলটন একখানি বহি লিখেন। উহা হইতে কতকগুলি তথ্য আমি উদ্ধৃত করিতেছি।– কৃষির পরেই সূতাকাটা ও বস্ত্র বয়ন ভরতের জতীয় ব্যবস্থা। সমস্ত কাটুনীই স্ত্রীলোক এবং জেলার(পটনা সহর ও বিহার জেলা) ডাঃ বুকাননের গণনা মতে তাহাদের সংখ্যা ৩,৩০,৪২৬। ইহাদের অধিকাংশ কেবল বিকালে কয়েকঘন্টা মাত্র সূতা কাটে এবং প্রত্যেকে গড়ে বার্ষিক ৭ আনা ৮ পাই মূল্যের সূতা কাটে। সুতরাং এই সমস্ত কাটুনীদের কাটা সূতার মোট মূল্য আনুমানিক(বার্ষিক) ২৩,৬৭,২৭৭। এইভাবে হিসাব করিলে দেখযায় ইহাদের সূতাকাটার জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচা তূলার মূল্য ১২,৮৬,২৭২ টাকা এবং কাটুনীদের মোট লাভ থাকে ১০,৮১,০০৫ টাকা অর্থত প্রত্যেক কটুনীর বার্ষিক লাভ গড়ে সাড়ে তিন আনা। ...সূতাকাটা ও বস্ত্র বয়ন সীহাবাদ জেলার প্রধান জাতীয় ব্যবসা। এই জেলার প্রায় ১,৫৯,৫০০ জন স্ত্রীলোক সূতাকাটার কাজে নিযুক্ত আছে এবং তাহাদের উত্পন্ন সূতার মোট মূল্য বার্ষিক ১২,৫০,০০০ টাকা। ...পূর্ণিয়া জেলা সম্বন্ধে বলা হইয়াছে, - কার্পাস বস্ত্র বয়নরকারীর সংখ্যা বিস্তার এবং তাহারা গ্রামের লোকেদের ব্যবহারের জন্য মোটা কাপড় বুনে। সূক্ষ্ম বুনিবার জন্য সাড়ে তিন হাজার তাঁত আছে। তাহাতে ৫,০৬,০০০ টাকা মূল্যের বস্ত্র উত্পন্ন হয় এবং মোট ১,৪৯,০০০ টাকা লাভ হয় অর্থাত্ প্রত্যেক তাঁতে বার্ষিক গড়ে ৮৭ শিলিং লাভ হয়। মোটা কাপড় বুনিবার জন্য ১০ হাজার তাঁত নিযুক্ত আছে এবং তাহাদের উত্পন্ন কাপড়ের মূল্য ১০,৮৯,৫০০ এবং মোট ৩,২৪,০০০ টাকা লাভ হয়, অর্থাত প্রত্যেক তাঁতে বার্ষিক গড়ে ৬৫ শিলিং লাভ হয়। রমেশ দত্ত কৃত ভারতের আর্থিক ইতিহাস গ্রন্থ হইতে এই সমস্ত বিবরণের কিয়দংশ উদ্ধৃত হইয়াছে। তিনি উপসংহারে বলিয়াছেন – উনবিংশ শতীব্দীর প্রথম পাদ পর্যন্ত নানা শিল্প কার্যে নিযুক্ত ছিল। লক্ষ লক্ষ স্ত্রীলোক সূতা কাটিয়া জীবিকার্জন করিত।
এইচ. এইচ. উইলসন মিল-কৃত ব্রিটিশ ভারতের ইতিহাসের পরিশিষ্ট লিখেন। ভরতের বস্ত্র বয়ন শিল্প কিভাবে ধ্বংস হইয়াছিল তত্সম্বন্ধে ক্ষোভের সঙ্গে তিনি নিম্নলিখিত রূপ বর্ণনা করিয়ছেনঃ- পরাধীন ভরতবর্ষের উপর প্রভু ব্রিটেন যে অন্যায় করিয়াছে, ইহা তাহার একটি শোচনীয় দৃষ্টান্ত। কমিশনের সাক্ষ্যে(১৮১৩খৃঃ) বলা হইয়াছে যে, ভারতের কার্পাস ও রেশমের বস্ত্রদি ইংলন্ডের ঐ শ্রেণীর বস্ত্রজাত অপেক্ষা শতকরা ৫০।৬০ টকা কম মূল্যে বিক্রয় হইত। সুতরাং ভারতীয় আমদানী বস্ত্রের উপর শতকরা ৭০।৮০ ভাগ শুল্প বসাইয়া অথবা ঐগুলির আমদানী একেবারে নিষিদ্ধ করিয়া ইংলন্ডের বস্ত্রজাতে রক্ষার ব্যবস্থা হইল। যদি এইরূপ করা না হইত, যদি এই সমস্ত অতিরিক্ত শুল্ক ও নিষেধ বিধি না হইত, তবে পেইসলি ও ম্যনচেস্টারের কাপড়-কারখানাগুলি গোড়তেই বন্ধ হইয় যইত এবং বাষ্পীয় শক্তির দ্বারাও তাহাদিগকে চালানো যাইত না।

বাংলার সুতাকাটা আর বস্ত্র বয়ন শিল্প, Thread Making by Charka & Weaving in Bengal


সুতো কাটা
(আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, জীবনচরিত থেকে)লর্ড কর্ণওয়লিস চিরস্থয়ী বন্দোবস্তের অল্প কাল পরে কেলব্রুক সিভিল কর্মচারী হিসবে বাংলার সর্বত্র ভ্রমণ করেন এবং বংলর কৃষকদের অবস্থা সম্বন্ধে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা লাভ করেন। ১৮০০ খৃষ্টাব্দে প্রকাশিত তত্কৃত হাজব্যান্ড্রি অব বেঙ্গল নামক পুস্তক খনি মূল্যবন তথ্যে পূর্ণ।
চরকাকে দরিদ্রের সহায়ক রূপে বর্ণনা করিয়া তিনি বলেন, - ব্রিটিশ ভরত যে সভ্য গভর্মেন্ট কর্তৃক শসিত হইতেছে, তঁহদের পক্ষে এদেশের দরিদ্রদের জন্য জীবিকার ব্যবস্থা কর তুচ্ছ বিষয় নহে। বর্তনামে এই প্রদেশে সাধারণের পক্ষ হইতে দরিদ্র ও অসহায়দের সাহায্যের ব্যবস্থা নাই। যে সব বিধবা ও অনাথা স্ত্রীলোকেরা রুগ্ন বলিয়া সামাজিক মর্যাদার জন্য কাজ করিতে পারে না, তাহাদের পক্ষে জীবিকার্জনের একমাত্র উপায় চরকায় সূতাকটা। পুরুষেরা যথন শারীরিক অক্ষমতা বা অন্য কোনও কারনে শ্রমের কাজ না করিতে পারে, তখনও স্ত্রীলোকেরা কেবলমাত্র এই উপায়েই পরিবারের ভরণপোষণ করিতে পারে। ইহা সকলের পক্ষেই সহায় স্বরূপ, এবং জীবিকার জন্য একান্ত প্রয়োজনীয় না হলেও, দরিদ্রের দুর্দশা অনেক লাঘব করিতে পারে। যে পরিবার এককালে ধনী ছিল, দরিদ্রের দিনে তাহাদের দুর্দশাই সব চেয়ে বেশী মর্মান্তিক হয়। গবর্মেন্টের নিকট আইনতঃ তাহাদের দাবী থাকুক আর নাই থকুক, মনুষ্যত্বের দিক হইতে তাহারা নিশ্চই গবর্মেন্টের সহানুভূতি দাবী করিতে পারে। এই সমস্ত বিচার করিলে বুঝা যাইবে দরিদ্রের পক্ষে সহায় স্বরূপ এমন একটি শিল্পকে উ্তসাহ দেওয়া উচিত।