Showing posts with label দেশিয় প্রযুক্তি. Show all posts
Showing posts with label দেশিয় প্রযুক্তি. Show all posts

Thursday, July 5, 2018

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা - কষ্টের, কিন্তু আনন্দের প্রকাশ - বাংলার মাটির বাড়ি

বন্ধু Anamul Haque Humaid জানতে চাইছিলেন দু/তিনতলা মাটির বাড়ি কিভাবে তৈরি হয় -
মানুষের জীবনটাই তো কষ্টের। যত ভাল জিনিস তৈরি হয়েছে বিশ্বে সব কষ্টের ফসল - বিদ্যুৎ আসার আগের সৃষ্টি। বিদ্যুৎ আসার পরে পৃথিবীটা একটেরে হয়ে গ্যাছে। আজও সব ভাল জিনিস বিদ্যুৎ ছাড়া প্রযুক্তি দিয়েই তৈরি হয়। পাকা বাড়ি, ফাঁকি দেওয়া স্থাপত্য এবং কৃতি - এই বাড়ি তৈরি আর ব্যবস্থাপনায় গৃহস্থের কোন কৃতিত্ব নাই। মনে হয় সব সিমেন্ট-ইঁটের বাড়িই এক ধাঁচের।
ইংরেজদের বাংলো, বাংলার মাটির বাড়ির স্থাপত্য আর নাম থেকে চুরি করা। ওরা স্বীকার করেন না। কিন্তু নামে পরিষ্কার। মাটির বাড়ির প্রযুক্তি আর স্থাপত্য বিশাল বিপুল ব্যাপার। Shahinur Rashid Tutul মাটির বাড়ির স্থাপত্য বিষয়ে বিশদে কাজ করেছেন। তাঁর লেখা আমরা পরমে ছেপেছি।
বাড়ি তৈরির মাটি তৈরি দীর্ঘকালের বিপুল জ্ঞানচর্চা আর দক্ষতা আর সৌন্দর্যচর্চা। অন্যান্য গ্রাম্য প্রযুক্তির মত বাটির বাড়ির তৈরির উপাদান প্রযুক্তিবিদেরা গ্রামের আশপাশ থেকেই সংগ্রহ করেন।
মাটির বাড়ি তৈরি জন্য সব মাটি ব্যবহার হয় না। মাঠের বা বিশেষ এলাকার মাটি ব্যবহার হয় - কোন মাটি ব্যবহার হবে সেটা প্রযুক্তিদ জানেন। সেই মাটি নিয়ন্ত্রিতভাবে জল দিয়ে দিয়ে পা দিয়ে চটকে মাখা হয় বেশ ভাল করে।মাটির সঙ্গে থাকা নানান অবাঞ্ছিত বর্জ্য পদার্থ একে একে বার করে দেওয়া হয়। কোথাও কোথাও মাটি গুঁড়ো করে প্রথমে চেলেও নেওয়া হয়।
এবারে আসতে আসতে এই মাটি মাখার সময় মাটিতে নানান আঠাল দ্রব্য যেমন ডিম, খয়ের, পাট, ডালগুঁড়ো, চালগুঁড়ো, তেঁতুল দানা গুঁড়ো, বেলের আঠা ইত্যাদি নানান মিশেল মেশায় যাতে মাটির আঁটটা দীর্ঘকাল ঠিক থাকে।
তারপরে যত উঁচু বাড়ি, এবং বাড়ির স্থাপত্য, সেই অঙ্ক করে চওড়া আর গভীর করে ভিত কাটা হয়। তারপর ঐ তৈরি করা মাটি বিশেষ আকারে কেটে ভিতের ওপর থাক থাক করে রাখা হয়। এর সঙ্গে চলতে থাকে নানান উপাচার, গান ইত্যাদি। তারপর প্রথম তলার মাটির দেওয়ার শোকানোর পালা।
প্রত্যেকতলা তৈরি হওয়ার পর ছাদের জন্যে মূলত বাঁশ লম্বাভাবে দিয়ে তার তলায় চওড়া করে তাল ইত্যাদি গাছের চার চেরা কাণ্ড দেওয়া হয় যার ওপর বাঁশগুলি থাকতে পারে। বাঁশের ওপর মাটি লেপে এক/দুতলার ছাদ করা হয়। পিটানোও হয়। তলায় ওঠার জন্যে মাটির সিঁড়িও তৈরি হয়।
কেউ কেউ গোটা মাটির বাড়িটা তৈরি হওয়ার পর পুড়িয়ে পোড়ামাটির চরিত্র দেন। গোটা শুকনো বাড়িটাকে কাঠকয়লা দিয়ে ঢেকে দ্যাওয়া হয়। তারপরে শুকনো গুল্মের লতাপাতা সেই কাঠকয়লার ওপরে রেখে আগুণ ধরিয়ে দেওয়া হয়। এটা শোনা কথা। একজন গ্রাম্য প্রযুক্তিবিদের কাছে শুনেছিলাম। তবে তা বেশ খরচসাধ্য। কিন্তু দীর্ঘদিন থাকে।
এর পরে মাঠের হলদে মাটি গোবর দিয়ে লেই করে বাড়ির ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয় বাড়ির দেওয়ালকে বাইরের ঝড়, জল, রোদ ইত্যাদি প্রাকৃতিক রোষ থেকে বাঁচাবার জন্যে। রাঢ বাংলায় এই দেওয়ালে নানান ধরণের কাজ করা হয়।
শুনেছি একশ বছরের মাটির তিনতলা বাড়ি রাঢ় বাংলায় দেখা যায়।
এই লেখাটা তৈরির জন্যে বন্ধু Anindyaর তোলা বাঁকড়োর মাটির বাড়ির ছবি দায়ি। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলাম।

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা২ - দেশিয় প্রযুক্তিচর্চা - মাটির বাড়ি

ফরিদপুরের মধুখালির ছরোয়ার জান মিঞার মাটির বাড়ি
এই ঘরখানি প্রথমে ওস্তাদ রাজীবলোচন ঘরামী প্রস্তুত করিতে উদ্যত হইয়া শেষে ভয় পাইয়া মিঞার নিকট অস্বীকার করে। কিন্তু তাহার এক আনাড়ী সাগরেৎ মহিম নমঃশূদ্র এই ঘর অতি প্রশংসা ও গৌরবের সহিত সমাধা করে। ইহা প্রস্তুত করিতে প্রায় একশত বসর পূর্ব্বে ১২০০০ টাকা খরচ পড়িয়াছিল। পূর্ব্বে এই ঘরে একটিমাত্র আলো জ্বালাইলে সমস্ত ঘরখানি মিনাপাত ও অভ্রে প্রতিবিম্বিত হইয়া আলোকিত হইত। কিন্তু বর্তমানে মিনাপাত এক্কেবারেই নাই, অভ্র কিছু আছে। যে ঘরামী দিনে একটিমাত্র রুয়ো প্রস্তুত করিতে পারিত সে চাকুরী পাইয়াছে; এবং মহিম নাকি প্রত্যেকটি জিনিসেরই পরীক্ষা করিবার জন্যে জিনিষগুলির ওপর একগাছি রেশমী সুতা টানিয়া লইয়া যাইত, যদি সূতাটি ছিঁড়িয়া যাইত, তাহলে বুঝা যাইত যে জিনিস ভালভাবে মসৃণ হয় নাই। পূর্ব্বেই উক্ত হইয়াছে, এই চিত্রবিচিত্র সর্বাঙ্গসুন্দর শিল্পীর তপস্যার ফলস্বরূপ ঘরখানি দেখিলেই অজন্তার কারিগরদের কথা মনে পড়িবে। সে সার্বভৌম রাজচক্রবর্তীরা আর নাই, সুতরাং পাথরের সে বিরাট স্বপ্ন গড়িবার পরিকল্পনা কে করিবে? কিন্তু তথাকার কারিগরদের বংশধরেরা যে অপূর্ব শিল্প তাঁহাদের দীন দরিদ্র উপকরণ লইয়া এইরূপ শ্রদ্ধা ভক্তি ও তপস্যার অর্ঘ্যে সাজাইয়াছে, তাহাতে কে সন্দেহ করিবে? ধন্য শিল্পিকুল, তাহারা নাম যশ অর্থ চাহে নাই, কিন্তু বহু কষ্ট দারিদ্র্য ও অভাব উপেক্ষা করিয়া যুগযুগান্তের তপস্যার ফল লইয়া আসিয়া আমাদিগকে দিয়াছে। যদি তাহারা অর্থ কি প্রতিষ্ঠা চাহিত, তবে এ তপস্যার ফল দেশের দুর্দ্দিনে আমরা দেখিতে পাইতাম না। শিল্পছিল তাহাদের হেমিকুণ্ড, অনাহারে, অর্দ্ধনগ্নদেহে এই অহিতাগ্নিগণ সেই হোমানল জ্বালাইয়া রাখিয়াছে। আমরা মূঢ়, দুপাতা ইংরাজী শিখিয়া ইহাদিগকে ঘৃণা করিতেছি, কলালক্ষ্মী মুখ ফিরাইয়া একটুই অশ্রু মুছিতেছেন।
যিনি নিজ চক্ষে এই ঘরখানি না দেখিবেন, তিনি এই শোভার একটা ধারণা করিতে পারিবেন না। প্রতি অবকাশস্থল, প্রত্যেক রুয়া, ছাটন ও ফুরশী এমন সামজস্য সহকারে নিয়মিত এবং প্রত্যেক জিনিসের ব্যবধান এইরূপ সুনিয়ন্ত্রিত যে মনে হয় যে কারিগর প্রতি সূক্ষ্ম কার্যের জন্য গজকাঠি হাতে করিয়া কাজ করিয়াছেন। কিন্তু আমাদের দেশের এই শিল্পশিক্ষা বংশানুক্রমে এইরূপ বিশুদ্ধভাবে হইয়া আসিয়াছে, যে কোন গজকাঠি বা মানদণ্ডের সাহায্য ব্যতিরেকে সমস্ত জনিষ কারিগরের স্বতঃসিদ্ধজ্ঞানে সম্পাদিত হইয়াছে।, চালটা পুর্ব্বে দুইহস্ত পরিমিত পুরুছিল, এখন আর উহা অত পুরু নাই। এই পুরু চালের নীচে দাঁড়াইয়া দারুণ গ্রীষ্ম কালেও সর্বাঙ্গ জুড়াইয়া যায়। চালের মধ্যে মধ্যে সুদর্শন আবের চিত্রিত ছবির কারিগরী সর্ব্বত্র। অপরাপর বিবরণ – ৪ খানি চালা, চালা হইতে মুখপাত পর্যন্ত এক একটি ধয়ো ৪০ হাত। ঘরের দৈর্ঘ্য ৩৫ ফিট – এক একটি আঠনও ৩৫ ফিট। ঘরখানি প্রস্থে ৩০ ফিট। এক একটি চালে ৯০টি ধয়ো, ৫৪টি আঠন, ১৮৫টি ফুরিশি, ৪৫০টি ছাটন, ১৭০টা সলা, ১৮টি পট, ৭টি মুখপাত, ৫টি পাড়, ৪০টি ডাফ, ১০টি খুঁটি, বারান্দায় ৮টি খুঁটি(ভিতরের) ও ২০টি তীর উপতিভাগে একটি ঢালা।
ছারওয়ার জান মিঞা এখন জীবিত নাই। তিনি অতি বৃদ্ধ বয়সে মারা গিয়াছেন, তাঁহার পুত্রের বয়সই প্রায় পঞ্চাশ। এই ঘরখানি ৮০ বৎসর উর্দ্ধকাল হইল নির্মিত হইয়াছিল। পূর্ব্বেই উল্লিখিত হইয়াছে, সেই সময় ইহাতে ব্যয় পড়িয়াছিল ১২০০০ (বার হাজার) টাকা। তখন বাঁশ বেত প্রভৃতি উপকরণের মূল্য এবং শিল্পীদের দক্ষিণা অতি অল্প ছিল। সেই সময়কার খোড়ো ঘরে যে বার হাজার টাকা ব্যয় হইতে পারে তাহা অসম্ভব মনে হইবে, কিন্তু ঘরখানির ভিতর দাঁড়াইলে মনে হইবে যে এখন যদি উহা কেহ নির্ম্মান করিতে চাহেন, তবে উহা অপেক্ষা অনেকগুণ খরচ করিয়াও কারিগরের অভাবে তিনি সফলকাম হইবেন না। কথিত আছে, কোন বড়লোকের মেয়েকে ছরওয়ার জান বিবাহ করেন, তিনি পিত্রালয়ে বড় পাকা বাড়িতে বাস করিয়া স্বামিগৃহের খড়ো ঘরের কথা শুনিয়া একটা ক্রুর ইঙ্গিত করিয়াছিলেন। মিঞা মনে বড় দাগা পাইয়া তাঁহার জন্যে এমন একটি খড়ো ঘর তৈরি করাইলেন, যাহা এখোনো বহু দূর হইতে লোকে দেখিতে আসে; অথচ সারওয়ার জানের শ্বশুর গৃহের শেষ ইষ্টকখানাও এখন বিলুপ্ত হইয়াছে; খড়ো ঘরের মহিমায় লোকে এখনো মুগ্ধ হয়। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শিল্প দেবারধানা বা রমণীর প্রেমের প্রেরণা পাইয়া চিরকাল বিকাশ পাইয়াছে।
*** এই লেখার সঙ্গে দীনেশ সেন মশাই একটা খবরের টিকা দিয়েছেন - এই ঘর অতি কয়েকদিন হইল নিষ্ট হইয়াছে, ২০শে আষঢ়ের (১৩৩১বাং) আনন্দবাজার এই বিবরণ সংবাদটি প্রকাশিত হইয়াছে। ৩০০০০ টাকার মূল্যের খড়ের ঘর – অপূর্ব্ব শিল্পবস্তু বজ্রপাতে ভস্মীভূত। (নিজস্ব সংবাদদাতার পত্র) বালিয়াকন্দি, ২রা জুলাই। সংবাদ পাওয়া গিয়াছে, ভূষণা থানার অধীন বনমালদিয়া নিবাসী জমিদার সারাজান মিঞা সাহেবের খড়ের ঘর খানি বজ্রপাতে ভষ্মীভূত হইয়াছে।
সূত্র, বৃহৎ বঙ্গ, প্রথম খণ্ড, চতুর্দ্দশ অধ্যায়, দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ 'পরবর্তী শিল্প ও স্থাপত্য'

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা১ - দেশিয় প্রযুক্তিচর্চা, মাটির বাড়ি

ফরিদপুরের মধুখালির ছরোয়ার জান মিঞার মাটির বাড়ি
ছরোয়ার জান মিঞার বাড়ীর কতটা ধারনা নিম্নলিখিত বিবরণে পাওয়া যাইবে।
ঘর খানি চারি চালা বিশিষ্ট, সেদেশে ইহাকে ‘চৌরি’ ঘর বলে। পূর্ববঙ্গে এক রূপ ছন জন্মে তাহাকে ‘উলু ছন’ বলে। এই উলু ছনের উল্লেখ পূর্ববঙ্গ-গীতিকায় অনেক স্থলে পাওয়া যায়। সাধারণ ছন হইতে এই উলু ছন দীর্ঘ সূক্ষ্ম ও অনেককাল স্থায়ী। এই উলু ছনকে খুব কায়দা করিয়া ‘কুলি ছন’ (হিসেবে) তৈরী করিতে হয়। মুঠির মধ্যে উলু ছন এক একটি আঁটি ধরিয়া ধরিয়া তাহা ছাঁটিতে হয়, কোন একটি খড় বড় বা ছোট না হয় এইভাবে বাছাই হয় এবং সমান করিয়া কাটিতে হয়। তৎপরে এই কুলি ছনের এক একটি আঁটি বিস্তৃত করিয়া সাজানো হয়। চালের উপর ছন খুব পুরু করিয়া প্রত্যেকটি স্তর নির্মিত হয়, প্রত্যেক ছয় ইঞ্চি ব্যাপক ছনের স্তরের পর আঁঠন (বাঁশের চটা – উহা খুব সরু করিয়া গোলাকৃতি করে তাহারই নাম ছাওনী কাঠি।)। এইরূপ স্তরে স্তরে কুলি ছন চালের সঙ্গে বাঁধিয়া ঢালা(উপরের দিক) পর্যন্ত লইয়া যাওয়া হয়। উপরের দিকটা ওই ছন মোড় দিয়া ঘুরাইয়া ঘুরাইয়া এমন করিয়া বাঁধে যে তাহা দেখিতে খুব সুন্দর হয়। এই চালের নিচের দিকটায় অতি সরু কারুকার্যময় পাটি থাকে এই পাটিকে পূর্ববঙ্গে শীতল পাটি বলে। ইহার দাম খুব বেশী। কখনো কখনো একখানি দাম ৫০০ টাকা পর্যন্ত হইত। শীতল পাটিতে আটকাইবার জন্য ছাটন(সূক্ষ্মভাবে চাঁচা বাসের চটা) ব্যবহৃত হয়। পাশাপাশি প্রত্যেক চার আঙ্গুল পরে পরে ‘ছাটন’ থাকে, ছাটনগুলির সঙ্গে ‘ফুরসো’(ছাটন হইতে অর্ধগোলাকৃত চাঁচা বাঁশ) বক্র ও আড়িভাবে আবদ্ধ থাকে। এই সমস্ত বাঁধনে কুলি ছন খুব শক্ত ভাবে আঁটা থাকে। ‘ফুরসো’র সঙ্গে সঙ্গে ঘন ঘন পাকা বাঁশের নাতিস্থূল গোলাকৃতি ‘রুয়ো’ আড়াআড়িভাবে বাঁধা হয়, ইহাতে চাল এত শক্ত হয় যে কেহ চালের উপর তান্ডব নৃত্য করিলেও তাহা হেলেনা। রুয়োকে আটকাইবার জন্য বাঁশের চটা সর্বনিম্নে আবদ্ধ হয়, এই প্রশস্ত চটা কে মুখজোত বলে। চালের একেবারে সন্মুখে সাজানো দিকটাকে মুখ পাত বলে। এখন ঘরের মধ্যে গিয়া ঊর্ধ্বে তাকাইলে যে দৃশ্য দেখা যায় তাহা বর্ণনাতীত যে সকল বাঁধ আঁটনের কথা বলা হইয়াছে সেই সমস্তই নানা বর্ণে রঞ্জিত ও তাহার প্রত্যেকটিতে অসীম ধৈর্যের পরিচায়ক শিল্পকার্য্য আছে। বিচিত্র বর্ণের ফুল ও লতাতে উপরকার দৃশ্য অতি মনোরম হয়। নানা কারুকার্যমন্ডিত খুঁটির সঙ্গে কাঠের ডাফ দিয়া চাল আঁটা হয়। ডাফগুলি কোনটি নরাআকৃতি কোনটি হাতির শুঁড়ের মত, কোনোটিতে পরী বা অন্য কোন জীবজন্তুর মূর্ত্তি গড়া থাকে। যেখানে যেখানে বেতের ‘গোরা’ সেখানে সেখানে বিচিত্র বর্ণ পশু পক্ষী ও ফুলপল্লবের কারিগরী। সুন্ধি বেত অতি সুক্ষ্ম ভাবে চাঁচিয়া তাহাতে নানান কায়দা করিয়া লতা পাতা ফুলের আকারে গেঁড়োগুলি(গ্রন্থি) গড়া হয়। নিম্ন হইতে ঊর্ধ্বে তাকাইলে মাঝে মাঝে শীতল পাটি ও বিচিত্র বর্ণে রঞ্জিত গেঁড়ো এবং ঠেকাগুলি অদ্ভুত অদ্ভুত মূর্তিতে এমন শোভাময় দেখায় যে চক্ষু সেই চারু দৃশ্যে ভুলিয়া যায়। খাম্বা অথবা বাঁশের খুঁটিতে যে বাঁশ থাকে এবং যাহার সঙ্গে চাল-আঁটা থাকে তাহাকে পাড় বলে। আবার ঘরের ভিতর চালাকে শক্ত করিয়া এবং উঁচু করিয়া রাখিবার জন্য ডাফের যে সরু বাঁশ দিয়া চালা বাঁধা থাকে সেই বাঁশকে তীর বলে, যে বাঁশের বিস্তৃত চাটার দ্বারা বাঁধা থাকে তাহাকে রুয়ো আঠন বলে। এই শিল্প-শোভা প্রতিপদে অজন্তার ছাতের কথা স্মরণ করাইয়া দেয়।
ছারওয়ার জান মিঞার খড়ো ঘর, পো মধুখালি, গ্রাম বনমালদিয়া, জেলা ফরিদপুর।
(চলবে)
আগামী লেখায় ছারওয়ার জান মিঞার বাড়ির আরও বিস্তৃত বর্ণনা দেব।
সূত্র, বৃহৎ বঙ্গ, প্রথম খণ্ড, চতুর্দ্দশ অধ্যায়, দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ 'পরবর্তী শিল্প ও স্থাপত্য'

Friday, June 1, 2018

ইওরোপিয় আঁকিয়েদের তুলিতে দেশিয় সুতি প্রযুক্তি

ইওরোপিয় আঁকিয়েদের তুলিতে দেশিয় সুতি প্রযুক্তি
রিওলো, পার্থসারথীর - দ্য স্পিনিং ওয়ার্ল্ড থেকে

দেশিয় প্রযুক্তি - তুলো ধোনার যন্ত্র - দ্বিতীয় শতাব্দের উপমহাদেশিয় প্রযুক্তি

সঙ্গের ছবিতে যে চেনা প্রযুক্তি দেখা যাচ্ছে, সেটি বিজয়া রামস্বামীর( 'Notes on Textile Technology in Medieval India with Special Reference to the South', Indian Economic and Social History Review, 17/z (1980), 227-8.) মতে এই প্রযুক্তি দক্ষিণ ভারতের এবং এটি দ্বিতীয় শতাব্দে থেকে ষষ্ঠ শতাব্দের মধ্যের প্রযুক্তি। এবং কোনভাবেই এটা ষষ্ঠ শতের পরের প্রযুক্তি নয়। 
বলা দরকার বাংলায় এই প্রযুক্তির উল্লেখ পাই চর্যাপদে এবং গীতি কবিতায়। আজও নাথ যুগিরা এই কাজ করেন গ্রামে/শহরে ঘুরে ঘুরে। কিছু দিন আগেও যুগি ডেকে মধ্যবিত্ত পরিবারে লেপ ধোনা হত শীতের আগে।
The bow was far more efficient than the technique it supplanted, which was to beat the raw cotton with a stick. The bowstring was placed on the surface of the raw cotton and the bow handle hit with a hammer or mallet (সঙ্গের ছবিতে). With the bow, the vibration of the string separated the cotton fibre from dirt, twigs, leaves, stones, and other foreign matter. The vibrations of the bowstring also placed the cotton strands in parallel which made the spinning easier and faster. Evidence from south India indicates that in that region the carding bow pre-dated the arrival of Islam. According to Vijaya Ramaswamy, literary evidence suggests the use of the bow from possibly the second century and certainly not later than the sixth century.
জর্জিও রিয়োলো, প্রসন্নন পার্থসারথীর দ্য স্পিনিং ওয়ার্ল্ড, আ গ্লোবার হিস্ট্রি অব কটনটেক্সটাইল ১২০০-১৮৮ থেকে

কম জানা শরীর মনের পক্ষে খুবই উপকারী। তাতে বড় পুঁজির তত্ত্বের অনুগামী হওয়া যায় কোন প্রশ্ন ছাড়াই।

প্রাচীন যুগে ভারতের প্রযুক্তি উন্নত ছিল তারপরে তা ধ্বংস হয়, এই ধারণা ঔপনিবেশিক ম্যাক্সমুলারীয় প্রাচ্যবাদীদের তৈরি। সাম্রজ্যবাদী বড় পুঁজির কেন্দ্রিভূত বেকনিয় বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির লুঠকর্মের খুদকুঁড়োর উদ্বৃত্তে বাঙালি ভদ্রবিত্তের দিনগুজরান এবং সামাজিক সম্মান লাভ। সে নবজাগরণীয় খোঁয়ারিতে বুঁদ থাকবে এতে আর বিষ্ময় কি।
কেন্দ্রিয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায় এবং শ্রম প্রতিস্থাপনকারী এই প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ করে কয়েকজন পুঁজিপতি। লুঠ, খুন আর নিয়ন্ত্রণকেই অগ্রগতি বলা হচ্ছে। বলুন। ক্ষতি নেই। এই প্রযুক্তি বিশ্বকে ধ্বংসের মুখোমুখি এনে ফেলেছে। বিশ্বজুড়ে অনেকেই এখন শিল্পবিপ্লববের আগের প্রযুক্তিতে ফিরতে চাইছে। রাসায়নিক কৃষির মত প্রযুক্তি আজ ধিক্কৃত। বড় কারখানা বিপুল বর্জ্য আর দূষণ তৈরি করে। আজ ইওরোপে কারখানা খোলা সব থেকে কঠিন কাজ। যে ইওরোপ এই লুঠেরা প্রযুক্তি শুরু করেছিল তারাই এই প্রযুক্তি থেকে বেরিয়ে এসে এগুলিকে এশিয়ায় আফ্রিকায় লাতিন আমেরিকায় ঠেলে দিতে চাইছে।
আমরা যারা কারিগরদের নিয়ন্ত্রণে থাকা সামাজিক প্রযুক্তি সামাজিক সাম্য নিয়ে কথা বলি তারা এই ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদী প্রযুক্তিকে ঘেন্না করি। এটা কিছু মানুষের হাতে লুঠের অর্থ জোগাড়ের কাজ করে। আর দেশিয় প্রযুক্তি সমাজে যথাযম্ভব সাম্য আনে।
এই লুঠেরা সঙ্গে সংখ্যাগরিষ্ঠ গ্রাম্য বাঙ্গালি, তাদের প্রযুক্তি, উতপাদন ব্যবস্থার কোন সম্পর্ক নেই। ইওরোপিয় লুঠ প্রযুক্তির খিদমত যদি বাঙ্গালিয়ানা হয় সে বাঙ্গালিয়ানাকে ধিক্কার।

Sunday, November 19, 2017

বাংলার দেশিয় প্রযুক্তি - বাংলার দেশিয় প্রযুক্তিবিদ - বাংলার প্রযুক্তি ভাবনা

Abhishek Sarkar অসাধারণ কিছু ভাবনা লিখে পাঠিয়েছিলেন। তাঁর অনুমতি না নিয়েই সেটা ছেপেদিলাম বন্ধুদের অবগতির জন্য-
...ভেবে সত্যিই আশ্চর্য হতে হয় যে শুধু ঘর ছাওয়া বা মাটি ল্যাপা নয়, বাড়ির প্ল্যান এবং গ্রামীণ বাস্তুশাস্ত্রের প্রয়োজনমাফিক নির্মাণ শুধু প্রায় শ্রুতিনির্ভর এমন একটা বিদ্যাক্ষেত্র বহন করেছে বহুযুগ!!
...কামার,কুমোর,মালাকার,চর্মকার বা এমন বংশানুক্রমিক শ্রুতিনির্ভর বিদ্যা হয়তো গোটা পৃথিবীতেই হয়েছে তবু তাঁদের সাথে বাস্তুশিল্পের মতন কাজের তুলনা করছিনা কারণ হাত পাকানোর জন্যে বাস্তুবিদ্যার স্কেলটা অনেক বড় এবং ভুল হলে ক্ষতির সুযোগটাও তাই বড়। পড়ে গিয়ে চোটের রিস্কও আছে।
...কুমোরের সন্তান মাটি ভুল মাখলে বা আঁচ কম করলে ক্ষতি কম,কামারের ক্ষেত্রেও। বাস্তুকার নবিশি করতে গিয়ে কিন্তু মারা পড়তে পারে।
আমাদের উত্তর ছিল -
আপনি পাথর, হাতিরদাঁতের আর শাঁখের ওপর কাজের কথা ভাবুন, একটা ভুল আঁচড় মানেই সর্বনাশ। আমাদের দেশে অন্তত মূর্তি, জোড়া পাথরে হয় না। ফলে একটা বড় পাথরে ভুল বাটালির ঘা আর ছোট্ট আঁচড় বিশালাকায় গোটা পাথরটিকে অকেজো করে দিতে পারে। শাঁখ বাংলার নয়, প্রচুর দাম, আসে ভারত্মহাসাগর অঞ্চল থেকে। সেটার ওপরে যে সূক্ষ্ম কাজ হয়, তাতেও তাই, অবাঞ্ছিত আঁচড় পড়লেই চিত্তির, গোটা মহার্ঘ শাঁখটাই অকেজো হয়ে যায়। হাতর দাঁতেও একই সমস্যা।
বা আপনি পুকুর স্থাপনের কথা ভাবুন। কোথায় কোন কোণে বা কোন ঢালে, কত গভীর পুকুর হবে, পাড়ের ঢাল কত থাকলে চরমতম শুকনো গ্রীষ্মেও জল থাকবে সে হিসেব করে তাদেরকে পুকুর কাটতে হত। পুকুর যেখানে সেখানে কাটলে হয় না, মাটির তলায় জল কোথায় কেমন রয়েছে সেওটাও তাকে আন্দাজ করতে হত।
জয়াদি বলছিলেন রাজস্থানের গজধরদের কথা, লিখেছেন জলের নাম ভালবাসা বইতে। সেখানে বাৎসরিক বৃষ্টির গড় ৮০ সেমি, সেখানেও কেউ জলের অভাবের কথা বলে না, কারণ।।জধরেরা মাটির তলার জিপসাম বেল্টের ওপর মাটির(আদিতে বালুর) সূক্ষ্ম ঢাল দেখে বুঝিতেন বৃষ্টি আর কুয়াশার মহার্ঘ জলটা মাটির তলায় চুঁইয়ে কোথায় গিয়ে আটকা পড়তে পারে, সেখানে কুঁয়ো খুঁড়তেন - সেই কুঁয়ো খোঁড়া, রাজস্থানেই হোক বা বাংলায় আরেক প্রযুক্তির কাজ। মাথায় গজ কাঠি নিয়ে চলেন বলে তাদের নাম গজধর।
ফলে দক্ষতার চূড়ান্তে উঠে একজন কারিগরকে তার দক্ষতাকে শান দিয়ে কাজগুলি করতে হয়।
এই আমাদের দেশের প্রযুক্তিবিদ। আমাদের গর্ব আমরা এদেশে জন্মেছি এবং তাঁরা আজও সক্রিয়।
এই সক্রিয়তা বজায় রাখানো আমাদের কর্তব্য।
জয় বাংলা!
জয় বাংলার অদম্য কারিগরের জয়!

Thursday, October 5, 2017

খুনি লুঠেরা পশ্চিমি প্রযুক্তি - মূলত লুঠ আর খুনের জন্য - সামরিক প্রয়োজনে বড় পুঁজির গর্ভগৃহ গবেষণাগারে তৈরি

আমরা কেন পশ্চিম প্রযুক্তিকে লুঠেরা বলছি সেটা সঙ্গের ছবিতে বোঝা যাচ্ছে না?
দেশিয় প্রযুক্তিতে তৈরি হাঁড়ি, কড়া, হাতা, দৈনন্দিনের নানান ব্যবহারের জিনিসগুলি এতই সুচারুভাবে তৈরি যে হাজার হাজার বছর ধরে তার বিন্দুমাত্র পরিবর্তনের প্রয়োজন হয় নি। সরস্বতী সভ্যতা থেকে ইলেক্ট্রনিক যুগ- তার প্রয়োজনীয়তা, গড়ন পাল্টায় না। কারণ সামাজিক প্রযুক্তি। সারাক্ষণ অভাব তৈরি তাকে বাঁচতে হয় না। অসীম লাভেরও তার প্রয়োজন নেই।
আজ যে সব তথাকথিত উচ্চমানের প্রযুক্তি আমাদের ভদ্রদের জীবনে জুড়ে রয়েছে, বিকাশ ঘটেছে বড়পুঁজির গবেষনার গর্ভগৃহে, সামরিক প্রয়োজনে। জনগণেশের করের টাকায় সামরিক অভিযান মিটলেই প্রযুক্তির দাম উঠে যায়।
কিন্তু তাতে তো বড় পুঁজির খাঁই মেটে না - সে ক্রমাগত লুঠ খুন করে সম্পদ বাড়িয়ে চলে। একে সে নাম দেয় সম্পদ তৈরি করা। এবারে সেটা সে তুলে দিল প্রযুক্তি সওদাগরেদের হাতে। তারা সেটিকে জনগণের হাতে দিয়ে নিংড়ে নিংড়ে পয়সা উসুল করে। লাভের একাংশ গিয়ে হয় ৬% ভদ্রের ক্ষুদ্রতম অংশের। আর সব ছাগলের তৃতীয় সন্তানের মত লাফিয়ে চলে।
এই যে ফুটবল খেলার জন্য সল্টলেকে বস্তি, হকার উচ্ছেদ হল, এর জন্য দায়ি বড়পুঁজির লুঠেরা চরিত্র। বিপুল বড় ব্যবস্থা না করলে তার পুঁজি নিবেশিত হবে কোথায়? বিপুল বড় খেলার মাধ্যমেই সে তার প্রযুক্তির ঝলক দেখায় ভদ্রদের।
আর উলুখাগড়ার প্রাণ যায়।
আমরা তাই ফিরে যেতে চাই ১৭৫৭র আগের ব্যবস্থায়।
(ছবিটা পেলাম চিন্তাবিদ-বন্ধু Sourav Royএর সৌজন্যে)

Monday, March 28, 2016

উপনেবেশবাদ বিরোধী চর্চা - কেন আমরা বড় পুঁজির বিরোধী

আমরা যারা গাঁইয়া ছোটলোকেদের রাজনীতি করি, তাদের কাছে ২০১৬ সালের এই চলতি নির্বাচনটা খুব অদ্ভুত ঢাপুয়া বাতাস। বাংলার রাজনীতিতে পুঁজির ব্যাখ্যাকারেদের রোল রিভার্সাল বেশ মজার কান্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে রাজনৈতিক দলের বড় পুঁজির দালালি করার কথা - তারা না করে, পথের ব্যবসায়ীদের পাশে দাঁড়াচ্ছে - ঘোমটা পরে নয়, সরাসরি - এতদিন যাদের পশ্চিমি উচ্চশিক্ষা পাত্তাই দেয়নি - স্বীকারই করে নি সেটা অর্থনীতি আর প্রযুক্তি বলে - যাদের সেই অবস্থানটি নেওয়ার কথা নয় তারা তাঁদের মান্যতা দিল - আর যাদের বড় পুঁজির পাশে দাঁড়াবার কথাই নয়, শৃঙ্খল ভাঙার কথা - তারা কিন্তু রাজনৈতিকভাবেই বড় পুঁজির পাশে দাঁড়াবার কাজ খুব জোর দিয়ে ক্রে চলেছেন; সেই পরিচয় বদলের কম্মটা বিন্দুমাত্র আনন্দের নয় এবং বোধহয় নতুন করে শিক্ষা নেওয়ার সময় এসেছে।
বড় পুঁজি নির্ভর শিল্পবিপ্লবের প্রাথমিক দর্শন হল উৎপাদনের কেন্দ্রিকতা এবং এই কেন্দ্রিকতা সফল হয় না যদি না শ্রমকে বৃহতভাবে প্রতিস্থাপন করা যায় বিপুল যন্ত্র ব্যবহার এবং বিশ্বজোড়া প্রাকৃতিক সম্পদ লুঠের মাধমে। ফলে শ্রম প্রতিস্থাপনকারী প্রযুক্তি বিকাশ ঘটতে শুরু করে বিদ্যুৎবাহী স্বতঃচল মাকু চালানোর মাধ্যমে। তাতেও কাপড়ের মিলের লাভ দেখা যায় নি যতদিন না পলাশী উত্তর সময়ে বাংলা লুঠের সম্পদ লন্ডনে যায় নি আর ভারতের বস্ত্রশিল্পকে গায়ের জোরে উচ্ছেদ আর দেশিয় বাজার দখল করে মিলগুলির খুব খারাপ উৎপাদন এই বাজার গুলোতে বিক্রির ব্যবস্থা করা যায় নি।
বড় পুঁজির এই দখলদারির কাজে সরাসরি সাহায্য করেছে ঔপনিবেশিক প্রযুক্তি আর শিক্ষায় শিক্ষিত মধ্যবিত্ত এবং তাঁদের উচ্চমধ্যবিত্ত হয়ে ওঠার প্রণোদনা। সে এই সম্পদ লুঠ আর শ্রম প্রতিস্থাপনের কাজে বড় পুঁজিকে নিঃশর্ত সাহায্য করে গিয়েছে এবং সিঙ্গুরের কারখানার একটা হিসেব দেখেছি, ১৫০০ কোটি টাকার কোম্পানিতে সরাসরি কাজ হওয়ার কথা মেরেকেটে ১০০০-১৫০০ সাদা কলারের শ্রমিকের। সেটা সরাসরি আসত মধ্যবিত্ত পরিবার থেকেই। ফলে বড় পুঁজির বিকাশের সঙ্গে মধ্যবিত্তের স্বার্থ আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িত - ফলে বড় পুঁজির দখলদারির স্বার্থ মধ্যবিত্ত দেখবে এটা আর আশ্চর্যের কি?
আমরা যারা ছোট গ্রামীন উতপাদকেদের রাজনীতিতে জড়িয়ে রয়েছি, তারা মনে করি ভারতের/এশিয়ার গ্রামীন উৎপাদন ব্যবস্থা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দর্শন - যেখানে হাজারো বিক্রেতা, হাজারো উৎপাদক বিরাজ করে - পুঁজির, লাভের মালিকানা একজন বা কয়েকজনের হাতে জড়ো হয় না, সারা সমাজে ছড়িয়ে যায়। ফলে সামাজিক সাম্য বজায় থাকে। তেমনি বড় পুঁজি প্রণোদিত হোস্টাইল টেকওভারের মত শুধুই গায়ের জোরে, বড় পুঁজির তৈরি প্রশাসনের আইনের লাঠি দেখিয়ে অনিচ্ছুক উতপাদকের উৎপাদন পরিকাঠামো কিনে নেওয়ারও সুযোগ নেই গ্রামীণ উৎপাদন ব্যবস্থায়। এই উৎপাদন ব্যবস্থা অনেক বেশি গণতান্ত্রিক, অনেক বেশি পরিবেশ বান্ধব, কম অপচয়ী, প্রযোজনভিত্তিক, স্থানীয় অর্থনীতিকে জোরদার করে, স্থানীয়ভাবে কর্ম সৃষ্টি করে, স্থানীয় জ্ঞানভিত্তিক - লাভ দূর দেশে বসে থাকা একজন বা কয়েকজনের হাতে গিয়ে জড়ো হয় না। ফলে আমরা সরাসরি এই শ্রম প্রতিস্থাপন দর্শনের বিরোধী, বড় পুঁজির গায়ের জোরে দখলদারির বিরোধী, শ্রমের অবমাননার বিরোধী।
অবশ্যই এই ব্যবস্থায় বড় পুঁজির ব্যবস্থাপক মধ্যবিত্তের পুনর্বাসনের জায়গা নেই। স্বাভাবিকভাবেই এই দর্শনটি যে মধ্যবিত্ত তাঁদের স্বার্থেই অপছন্দ করবেন এবং করছেনও। গত কয়েক দশক ধরে বড় পুঁজি, জমি, মালিকানা, উৎপাদন পদ্ধতি বিষয়ে সারা ভারতে যে বিতর্ক উঠেছে তা মনের জানালা খুলে দেয়। নতুন করে ভাবতে শেখায়।

Saturday, March 19, 2016

কেন বড় পুঁজির বিরোধিতা, Why we oppose corporate capital

এই শিক্ষিত বিতর্কে অশিক্ষিত, অজ্ঞ, মুর্খ, কুসংকারাচ্ছন্ন, সভ্যতার ষড়ৈশ্বর্য না দেখে গ্রামের মধ্যে বাস করা কুপমণ্ডুকদের সংগঠনের পক্ষ থেকে কিছু কথা - গুছিয়ে বলতে পারব কি না জানি না চেষ্টা করছি।
বড় পুঁজি ছোট্ট পুঁজি বিতর্কে আমরা সাধারণের স্বার্থবাহী ছোট্ট পুঁজির পক্ষে - ছোট্ট পুঁজি খুব বেশি মানুষ/গোষ্ঠীর হাতে পুঁজি পুঁজি জমতে দেয় না - অনেক ছোট উৎপাদক বিক্রেতা থাকলে সেই উতপাদন-বিতরণ ব্যবস্থায় লাভ ছড়িয়ে যায় সমাজের মধ্যে। ঐতিহাসিকভাবে ব্রিটিশ আগ্রাসনের পূর্বে ভারত/এশিয়া/লাতিন আমেরিকা/আফ্রিকা মূলত ছোট পুঁজির অঞ্চল ছিল। বড় পুঁজি কি ছিল না? ছিল। ব্যবসায়ীরা যে সপ্তডিঙ্গা সাজিয়ে বিদেশে ব্যবসা করতে যেতেন, তা তো আদতে বড় পুঁজি - কিন্তু কর্পোরেট পুঁজি ছিল না। তার ওপর সামাজিক নিয়ন্ত্রণ প্রবল ছিল। তাঁকে ঘাড় ধরে সিএসআর করাতে হত না।
পলাশির আগেও বড় পুঁজি সমাজ-রাষ্ট্রের সার্বিক নীতি নির্ধারণ করার অবস্থায় ছিল না। তার কিছু বিধিনিষেধ ছিল। এক উৎপাদক অন্য উতপাদকের উৎপাদন পরিকাঠামো কিনে নিতে পারত না - শিল্পবিপ্লবীয় উৎপাদন ব্যবস্থায় যেমন কোন উৎপাদক না চাইলেও তার ব্যবসা অন্য উৎপাদক কিনে নিতে পারেন হোস্টাইল টেকওভারএর মাধ্যমে - জানি বড় পুঁজি আরও বড়দের আশীর্বাদ নিয়ে তার থেকে পাঁচগুণ বড় কোম্পানি কিনে নিয়ে তা সামলাতে না পেরে ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি অবস্থা হয় - এ তত্ত্ব-তথ্য খুব সম্প্রতির ইতিহাসে প্রমানিত। কৃষককে যদি ছোট্ট পুঁজির উতপাদন ব্যবস্থার অংশ ধরি, রাষ্ট্রের মদতে সেই লাভের(কৃষিকে শুধু লাভজনক উতপাদন ব্যবস্থা হিসেবে দেখতে গিয়ে কৃষির কর্পোরেটাইজেশন ঘটছে, সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে) উতপাদন-ব্যবসাকে জোর করে সারা বিশ্বজুড়ে দখল করা হচ্ছে, বুকে বন্দুকের নল ঠেকিয়ে।
ভারত বহুকাল ধরে বহু কৃষি ও শিল্প উৎপাদন সারা বিশ্বে একচেটিয়া ব্যবসা করে এসেছে - নীল থেকে ইস্পাতের মণ্ড পর্যন্ত - তখন জ্ঞানচর্চা, প্রযুক্তি তার নিজস্ব ছিল। তার জোরে ১৮০০ পর্যন্ত সে ছিল ব্যবসায় উতবৃত্ত দেশ। বড় পুঁজির বিতরণ ব্যবস্থা(এমন কি ছোট্ট পুঁজিও) সেগুলি নিয়ে বিদেশে গিয়েছে, কিন্তু সামগ্রিক উৎপাদন ব্যবস্থায় দাঁত ফোটাতে পারে নি। প্রসন্নন পার্থসারথি বা ওম প্রকাশজীদের তাঁতিদের বিষয়ে গবেষণা বলছে, পলাশীর আগে পর্যন্ত তাঁতিরা ব্যবসায়ীদের দাদন ফিরিয়ে দিতে পারতেন - তাদের রোজগার ছিল ইওরোপের তাঁতিদের তুলনায় অনেক বেশি। নীল উতপাদন-বিতরণ ব্যবস্থাই ধরা যাক, ২০০০ বছর আগে রোমে ভারতীয় নীল যেই - নাম ইন্ডিগো ভৌগোলিকতার সূত্র ধরে - নীল লাতিন আমেরিকা থেকেও সে সময়ের ইওরোপে আসত - কিন্তু তারও নাম ছিল ইন্ডিগো - এই ব্যবসাকে ১৮০০ সালের পর রাষ্ট্রের মদতে, বড় পুঁজি উতপাদকেদের বুকে বন্দুক ঠেকিয়ে দখল - তারপর ধ্বংস করল, সে সময়ের আগে একচেটিয়া ব্যবসা করেও কেন্দ্রিয় দখলদারির, চাষীদের নিংড়ে লাভের শেষ কপর্দক তুলে নেওয়ার নীলকর তৈরি হয় নি। ম্যাঞ্চেষ্টারের অতিরিক্ত উতপাদনের কাপড় মিলগুলি লাভ করতে ততদিন পারে নি, যতদিন না বন্দুকের মুখে দাঁড় করিয়ে ভারতের আড়ংগুলি ধ্বংস করা হয় নি, নীল চাষ-ব্যবসা দখল করা হয় নি, ইওরোপে ইস্পাতের (ধাতুর) কারখানা চলে নি যতদিননা ভারত ব্যপ্ত ৩০০০০ চলন্তিকা ছোট্ট গলনচুল্লির ধারক-বাহক, দেশের ছোট সামাজিক উৎপাদন ব্যবস্থার অংশ ডোকরা উতপাদকেদের ধ্বংস করা হয় নি - এই ইস্পাত মণ্ড দিয়ে এক সময় বিশ্ববিখ্যাত দামাস্কাস তরোয়াল তৈরি হত।
আর্যভটের হাত ধরে আরও হাজারো গুনীর চেষ্টায় যে নিয়ন্ত্রণমুক্ত কলন বিদ্যা তাঁতিদের, নাবিকদের, চাষীদের হাতে প্রতিকূলতা জয় করার করার সুযোগ করে দিয়েছিল, বিশিল্পিয়ায়ন করার উদ্যমে সেই ব্যপ্ত কেন্দ্রবিহীন ভারতজোড়া বিদ্যাচর্চাকেও উদ্দেশ্যপূর্ণভাবে ধ্বংস করা হল, ইওরোপে গিয়ে সেই মুক্ত প্রাথমিক জ্ঞানচর্চা হয়ে উঠল উচ্চতম শিক্ষাব্যবস্থার অংশ। বাংলা তথা ভারতের স্বাস্থ্য ববস্থার অন্যতম ধারক বসন্তের টিকাকারদের নিষিদ্ধ করে জেনারের উদ্ভাবিত টিকা ব্যবস্থাকেই চালাতে হয়েছে।
ছোট্ট উৎপাদন ব্যবস্থায় উতপাদকের নিয়ন্ত্রণে থাকে প্রযুক্তির প্রয়োগে। কেন্দ্রিয় নিয়ন্ত্রণযুক্ত বড় পুঁজি চেষ্টা করেই যাচ্ছে প্রযুক্তি, জ্ঞানচর্চার দখল পেটেন্ট, কপিরাইট ইত্যাদি ব্যবস্থা করে নিজেদের দখলে নিয়ে আসতে। তাহলে সামগ্রিক উৎপাদন ব্যবস্থায় তার দখলদারি নিশ্চিত হয়। তাই উৎপাদন ব্যবস্থার চরিত্র বিচারে আমাদের প্রাথমিক প্রশ্ন প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ কার হাতে? পুঁজির চরিত্র কি - সে অন্য উৎপাদন ব্যবস্থাকে কন্সোলিডেশনের নাম করে, উন্নয়নের নাম করে সমাজের সম্পদ দখল করার ছাড়পত্র পায় কি না।
অন্য সভ্যতার কথা জানি না, ভারত মূলত শুদ্র সভ্যতা - জ্ঞানচর্চা, উতপাদন বিতরণ ব্যবস্থায় তাদের নিয়ন্ত্রণহীন পকড় নতুন ভাবে ভারতকে বসিয়েছিল বিশ্ব উতপাদন ব্যবস্থায়। ইতর, ছোটলোকেদের হাতে ছিল দেশের মূল উতপাদন বিতরণ ব্যবস্থা - তাঁরাই তৈরি করেছিলেন এই ব্যবস্থার দর্শন। কয়েক হাজার বছর ধরে শুদ্ররা, বৈশ্যরা, নিজেদের বিকেন্দ্রিভূত উৎপাদন দর্শন তৈরি করেছিলেন - যে দর্শনকে ধ্বংস করার চেষ্টা করে গিয়েছে ইওরোপ ৫০০ বছর ধরে। পলাশির পর রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করে বিশিল্পিয়ায়ন, জ্ঞানচর্চা ধ্বংস, লুঠ, খুন ব্যবস্থা নামিয়ে এনে সেই দর্শন ধ্বংস বাস্তবে রূপ পায়, তা চরম রূপ ধারণ করেছে স্বাধীনতার পর - তার জন্য কয়েক কোটি গ্রামীন শুদ্রকে উচ্ছেদ করতে হয়েছে - সে লড়াই চলছে আজও। তবুও রক্তবীজের বংশধরেরা তাদের মত করে দেশের গ্রাম উতপাদন ব্যবস্থা ধারণ করে রয়েছেন বলেই বিশ্ব মন্দা ভারতে প্রভাব ফেলে না।
আর কেন এই উতপাদন ব্যবস্থায় রয়েছি, কেন এই বড় পুঁজির প্রযুক্তি ব্যবহার করি? এই দখলদারির রাষ্ট্র ব্যবস্থা না মেনে নিয়েও যেমন করে কাশ্মীর, উত্তরপূর্ব ভারতকে বন্দুকের নলের জোরে দখল রাখা, দেশের মানুষের বিরুদ্ধে লড়াই চালানো ভারত রাষ্ট্রের অংশ হয়ে থাকি, তার দেওয়া নানান ভর্তুকি খেয়ে ফুলে ফলে বেড়ে উঠতে থাকি, ঠিক সেই যুক্তিতেই বড় পুঁজির দখলদারির প্রতিবাদ জানিয়েও সেই ব্যবস্থাকে মেনে নিই নিমরাজি হয়েও।