Showing posts with label সল্টপিটার. Show all posts
Showing posts with label সল্টপিটার. Show all posts

Sunday, February 17, 2013

ভারতীয় যুদ্ধাস্ত্র এবং একটি সাধারণ সংবাদ

বিভিন্ন গবেষণায় শোনা যায় ভারতকে যুদ্ধে বারুদ ব্যবহার করতে শিখিয়েছে প্রথমে চিন, তার পরে ইওরোপ. এই তথ্যটি নানান তত্যের মতই ব্রিটিশদের ভারতের ন্যুনতা প্রচার করতে তৈরি করা তত্ব. এর পেছনে অন্ততঃ সত্যতার লেশটুকুও নেই. 
আমরা এই ব্লগেই দেখেছি, সংস্কৃত না জেনে কী ভাবে উইলিয়ম জোন্স, ডব্লিউ ডব্লিউ উইলসন, ম্যাক্সমুলারেরমত ইওরোপিয়রা ভারততত্ববিদ হয়ে উঠছেন. দেশিয় পণ্ডতদের অনুবাদগুনে তাঁরা ভারতের নানান শাস্ত্র বিশ্লেষণ করছেন ইওরোপিয় দর্শনে, যেখানে ভারতীয়ত্বের বিন্দুমাত্র ছোঁয়া নেই. ভারতীয় গবেষকদের অধিকাংশ এই ইওরোপিয় পণ্ডিতদের পথ ধরেছেন, কেননা তাঁদের পড়াশোনার জীবন শুরুই হয় সর্ববিদ্যায় ইওরোপ গুরু এই তত্বে. মূলে না গিয়ে তাঁরা অনুসরণ করেন পণ্ডিতস্মণ্য ইওরোপিয়দের রচনা, যা আদতে শুধু ভুলে ভরাই নয়, উদ্দেশ্যপূর্ণভাবে ভারতকে ছোট দেখানের কল.
সোরা আর বারুদ প্রযুক্তিও একই ঘটনা ঘটেছে.
সেই উদ্দেশ্য পুণের এই http://www.orientalthane.com/general/news_5_28_july.htm ওয়েবসাইটটি থেকে এই সংবাদচুম্বকটি প্রকাশ করলাম.
লোকফোকের পক্ষে
বিশ্বেন্দু

Mumbai, July 20 (UNI) Britishers may have given India much in terms of revolutionary ideas and thinking, including the railways, paving way for modernization in the country, but ample historical evidence has brought to light a few amazing facts, one of which being that guns and gun-power were in use in Bengal in the beginning of the 15th century much before the Britishers brought it to India.
The 'Shukraniti' medieval Indian text, describes how gun powder can be prepared using saltpetre, sulphur and charcoal in different ratios for the use of different, types of gnus, says Dr. Vijay Bedekar, the President of Thane-based Institute of Oriental Study.
Dr. Bedekar, who along with Dr R P Kulkarni authored a book Glimpses of Chemistry in ancient and Medical India. Which was released recently, had traced the origins of gunnery in India after almost eight months of through research.
Ancient text reveals that while gunpowder was known as 'Agnicurna', the guns were called 'Nalastra'.
One such combination of 'Agnicurna' as stated in the text consists of five parts of saltpeter, one part of sulphur and one part of charcoal to be dried in the sun. It is finally grinded into a powder which becomes gun-powder.
Following the release of the book at the recently-concluded International Chemistry Olympiad, Dr. Bedekar told UNI here that besides the art of making gunpowder, 'Shukraniti' also descries in detail about guns, which were available during those times.

'Shukraniti' suggests that the 'Nalikas' are of two kinds, large and small - the smaller ones are 112.5 cms long, have a stock of tough wood and a barrel of a bamboo with a bore of three-fourth of an inch.

The small 'Nalikas' are carried by infantry and cavalry. The larger 'Nalikas', has no wooden stock - were made of steel and other metals ands was carried on wheels, according to Dr. Bedekar.
The small shot for smaller arms is made of lead or other metals, and the shots for larger guns are made of iron.
For this the gunpowder is composed of four, five or six parts of 'Suvarchi Lavana' (salt petre), one part of sulphur and one part of Charcoal of plant arka (calotropis gigantea linn), Snuhi and other trees burnt in a pit so as to exclude air.
The mixture is soaked in sap of akra and rasuna (garlic), died in Sun and redacted to a coarse powder like granulated sugar.
Dr. Bedekar points out that there are many kinds of 'Agnichurma' known to experts, and they are composed of varied proportion of charcoal, sulphur, salt petre, regular, orpiment, clax of lead, cinnabar, iron fillings, zinc dust, shell -lac, blue vitriol and resin of pines to name a few. Some even give out white light like that of moon.
Says Dr. Bedekar, "All these things are there in our history books. What is lacking today is a structured course on history of science in India. It is high time that policy makers realize this and devise such courses for universities and colleges.
Talking about his book, he said that they have tried to incorporate several facts of the ancient chemistry in India that is not known today.
The practical knowledge of chemistry is useful in many branches of human activity, namely, to prepare medicines, to purify metals from their ores and to prepare alloy and make gold from base metals, preparation of glass among others. Indian chemistry mainly flourished as a branch of medicine." Dr. Bedekar added.

Saturday, February 16, 2013

The Indian saltpeter trade, the military revolution and the rise of Britain as a global superpower. জেমস ডব্লিউ ফ্রে


সপ্তম অংশ

জেমস ডব্লিউ  ফ্রে, অসকোস, উইসকনসিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক। তিনি বাঙলা সুবার পাটনার সোরা ব্যবসা সম্বন্ধে বিশদে ইতিহাস রচনা করেছেন. এই ইতিহাস যেমন মনোগ্রাহী, তেমনি বাঙলার ইতিহাস এবং প্রযুক্তি চর্চকদের আর শিক্ষার্থীদের কাছে শিক্ষার বিষয়. ব্রিটিশ আধিপত্য বিশ্লষণে নানান দিকগুলি এর আগে বিশদে বিশ্লেষিত হয়েছে, কিন্তু সেই আলোচনায় সোরার ভূমিকার কথা আর সেই উত্পাদনে বাঙলা সুবার পাটনার কথা খুব একটা উঠে আসে নি। বলা দরকার প্রাচীন কাল থেকেই ১৯০০ সাল পর্যন্ত পাটনা বিশ্ব সোরা বাজারে বিশাল এক ভূমিকা নিয়েছে. এই ইতিহাস আমরা বিশদে এই প্রবন্ধে কয়েকটি অংশে ভাগ করে দেখব. এবারে সপ্তম অংশ. 
বিশ্বেন্দু


১৭৯৩ থেকে ১৮০৩ পর্যন্ত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ব্রিটেনের রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত আয়ুধ দপ্তরকে ২৫,১৬৭.৮ টন সোরা সরবরাহ করে। এই পরিমান ব্রিটেনের ব্যক্তিগত মালিকানায় চলা সোরা কোম্পানিগুলির উত্পাদন পরিমানের সমান। ১৭৯১তে Act XXXI of George III (1791), chapter 42এর আইন বলল কোম্পানিকে একতৃতীয়াংশ দামে সরকারকে সোরা সরবরাহ করতে হবে। ভারতে যখন কোম্পানির রোজগারের খাতায় আয়-ব্যায়ের বৈষম্য বেড়ে চলছে, তখন এই ব্যবসায় ৪ লক্ষ ৩৬ হাজার পাউন্ড স্টারলিং ক্ষতি হয়। ১৮১১ সালে সোরা ব্যবসায় একচেটিয়া অধিকার চলে যাওয়ায় কোম্পানির ডিরেক্টররা হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। ১৮১২র যুদ্ধে হেরে আটলান্টিক থেকে ছিটকে আসা ব্যবসায়ীরা পাটনা সোরা বাজারে হামলে পড়ল। এরা নেপোলিয়নের সঙ্গে শেষ দিকের যুদ্ধে লন্ডনে অসম্ভব পরিমানে সোরা সরবরাহ করতে থাকে। পাটনবার বাজারে একসঙ্গে এত খরিদ্দার ঢুকে পড়ায় বাজারে গোলমাল বাধতে শুরু করে। কোম্পানির সঙ্গে ব্যবসা করে সন্তুষ্ট দাদনি বণিকেরা ১৮১৩তে বাজারের ওঠাপড়া বন্ধকরে কোম্পানিকে বাজারে ফিরিয়ে আনে। কোম্পানি দেখল, ইওরোপের যুদ্ধ হওয়া সত্বেও সোরার দাম বাড়ছে না, বরং চাহিদা কমতে শুরু করেছে। ১৮১৫ থেকে ১৮৩০এর মধ্যে কলকাতা বন্দর হয়ে বছরে ১৫২৫২ টন  সোরা কলকাতা বন্দর দিয়ে রপ্তানি হয়। যুদ্ধের সময়ের একতৃতীয়াংশ।
১৮৫০ সালেও পূর্বভারতই সোরা ব্যবসার কেন্দ্র হয়ে দাঁড়ায়। পাটনার সোরা উত্পাদনের ওপর নির্ভর করে ব্রিটিশ পরিকল্পিতভাবে পরপর কূটনৈতিক ও সামরিক সাফল্য লাভ করতে থাকে। দক্ষিণের সোরা কেন্দ্রগুলো আবার নতুন করে খোলার কাজ শুরু হল। সালেম, কোয়েম্বাটোর, মাদুরাই এবং ত্রিচিনাপল্লী এবং ভেলোরসহ কৃষ্ণা জেলার বহু অংশে সোরা উত্পাদন শুরু হল। উত্তরে, আরও উত্তরের দিকে সোরা কেন্দ্র খোঁজার কাজ চলতে থাকে।
নতুন ধরণের অস্ত্র, লাভজনক নতুন নতুন বাজার আর একচেটিয়া ব্যবসা সত্বেও সোরা ব্যবসায় কোম্পানির ক্ষতি সহ্য করতে হচ্ছিল। এই ক্ষতির দায় চাপানো হল ভারতের আপামর জনগণের ওপর। এর পর আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র হয়ে ওঠে পাটনার সব থেকে বড় সোরার বাজার। আমেরিকায় বিশাল পশ্চিমাঞ্চলে জঙ্গল সাফ, পরিকাঠামো তৈরির কাজ এবং চাষের কাজে নাইট্রেট ব্যবহার হতে শুরু করে। বিহারের সোরা ব্যবসার ওপর নির্ভরশীলতা কাটাতে দুপঁ কোম্পানি গবেষণায় শিল্পক্ষেত্রে সোরার বিকল্প হিসেবে সোডা পাউডারের প্রযুক্তি উদ্ভাবন করে। তবে আমেরিকায় গৃহযুদ্ধ তাকে শেষ পর্যন্ত আবার টেনে নিয়ে আসে পাটনায়। যুদ্ধ শুরুর সময় আমেরিকায় সোরা রপ্তানির পরিমান তিনগুণ বাড়ে, ৬ লক্ষ পাউন্ড স্টার্লিং পরে যুদ্ধ শেষের দিকে তা ৯ লক্ষ পাউন্ড স্টার্লিং হয়ে দাঁড়ায়।
এদিকে ১৮৩০এ ব্রিটিশ বিনিয়োগে পেরুতে সোরা তৈরির কাজ শুরু হয়। পাটনা থেকে মুখ ফিরিয়ে ব্রিটেন জার্মানি আর ফ্রান্স পেরুর সোরা আমদানি করতে থাকে। পাটনা দ্রুত বিশ্ব বাজার হারাতে থাকে। কিন্তু পাটনার সোরা আমেরিকা আমদানি করতে থাকে নিয়মিতভাবে। এমনকী ব্রিটেনের থেকেও বেশি পরিমানে। ১৯০৪-১৯০৫এর ভূতত্ব সর্বেক্ষণের সোরার সমীক্ষা বলছে, শুধু উত্তর ভারতের ৩৯৯টি সোরা কারখানা বছরে ১৯,৪৩৮.৮ টন সোরা রপ্তানি করেছে। এর মধ্যে ২৮১টি কোঠি বিহারের। নিযুক্ত ছিল ৫০,৪৬৯ কর্মী এবং বছরে ৪১ লক্ষ টাকা রোজগার করত। পাটনার সোরা বাজার মরে যাওয়াতো দূরস্থান, বড় শিল্প, চাষ আর বাজি তৈরির শিল্পে নতুন করে বাজার খুঁজে নিল। ১৯০৯এ জার্মানির হেবার-বশ পদ্ধতিতে তৈরি সোডিয়াম নাইট্রেট আবিষ্কার পাটনার সোরা ব্যবসা প্রায় বন্ধ হয়ে যেতে বসে। ১৯২০তে চিলির সোরা বাজার থেকে হটে যায়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ আবার পাটনাকে সোরা ব্যবসার কেন্দ্রস্থলে নিয়ে আসে।
আমরা এই প্রবন্ধে দেখলাম, ভারতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সোরার ওপর নিয়ন্ত্রণের এক বড় প্রভাব পড়েছে, ভারতে ব্রিটিশরাজের রাজনৈতিক ও সামরিক প্রভাব বৃদ্ভিতে শুধুনয়, বিশ্বের ইতিহাসেও। যদিও সাম্রাজ্যের সাফল্যের সব কিছুই সোরার ওপর নির্ভর করত না।

The Indian saltpeter trade, the military revolution and the rise of Britain as a global superpower. জেমস ডব্লিউ ফ্রে


ষষ্ঠ অংশ

জেমস ডব্লিউ  ফ্রে, অসকোস, উইসকনসিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক। তিনি বাঙলা সুবার পাটনার সোরা ব্যবসা সম্বন্ধে বিশদে ইতিহাস রচনা করেছেন. এই ইতিহাস যেমন মনোগ্রাহী, তেমনি বাঙলার ইতিহাস এবং প্রযুক্তি চর্চকদের আর শিক্ষার্থীদের কাছে শিক্ষার বিষয়. ব্রিটিশ আধিপত্য বিশ্লষণে নানান দিকগুলি এর আগে বিশদে বিশ্লেষিত হয়েছে, কিন্তু সেই আলোচনায় সোরার ভূমিকার কথা আর সেই উত্পাদনে বাঙলা সুবার পাটনার কথা খুব একটা উঠে আসে নি। বলা দরকার প্রাচীন কাল থেকেই ১৯০০ সাল পর্যন্ত পাটনা বিশ্ব সোরা বাজারে বিশাল এক ভূমিকা নিয়েছে. এই ইতিহাস আমরা বিশদে এই প্রবন্ধে কয়েকটি অংশে ভাগ করে দেখব. এবারে ষষ্ঠ অংশ. 
বিশ্বেন্দু



১৭২০ থেকে ১৭৩০ পর্যন্ত ফরাসি কোম্পানি Compagnie des Indes পাটনা সোরা ব্যবসায়ে মাথা গলাতে শুরু করে। এর পর থেকে ইওরোপের সঙ্গে বাঙলার বাণিজ্য পরিমান গুণিতক হারে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে। ফরাসি ব্যবসায়ী(ফ্যাক্টর) জোসেফ ফ্রান্সিস ডুপ্লে অন্য ইওরোপিয়দের সঙ্গে নিয়ে সোরা ব্যবসায় ইওরোপিয় একচেটিয়া কারবার গড়ে তোলেন। ১৭৩৬এ অসমিয়া বণিদের থেকে নির্দিষ্ট পরিমানে সোরা কোনার চুক্তি করে এই তিন রাষ্ট্রশক্তি। এই চুক্তিতে ডেন, সুইস এবং অস্ট্রিয় বণিকদের বাদ রাখা হয়। আদতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিগুলি ভারতে ব্যবসা করা তিন ভাই একত্রিত হয়ে পরস্পরের সঙ্গে স্বার্থ বন্ধনে আবদ্ধ হয়(এদের মালিকানা ছিল কয়েকজন ব্যবসায়ীদের হাতে)। ভিওসি ডুপ্লে পরিকল্পনায় বাদ সেধে সোরা পরিবহনের জাহাজগুলি নিজেদের অধিকারে আনে। ১৭৪০ পর্যন্ত ভিওসিরই ভারতের সোরা ব্যবসায় প্রধান ভূমিকা ছিল।
আলিবর্দি খাঁ(১৭৪০-১৭৫৬) বাঙলার সুবাদার হয়েই বিদেশি বণিকদের পাটনা বাজারের দখলদারি শেষ করার উদ্যম নেন, যাতে দক্ষিণ ভারতে ইওরোপিয় লড়াই শেষ হয়। এছাড়া ডাচেদের মালাবারের গোলমরিচের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণেরও চেষ্টা করতে থাকেন আলিবর্দি। ভারত এবং বাঙলার নানান পণ্যের ব্যবসার ওপর আধাএকচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ কায়েম করেন তিনি। আমীরচাঁদ বাঙলা সুবার প্রধান ব্যবসায়ী নিযুক্ত হন। ভাই দীপচাঁদ সিরাং(Syrang) জেলার ফৌজদার নিযুক্ত হলেন। ১৭৫০এ চাঁদ ভাইদের ব্যবসায় কোম্পানির ধার দাঁড়াল ১.৬ মিলিয়ন রুপি। পলাশি পর্যন্ত সোরা ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ করতেন চাঁদ ভাইরা এবং ইরানের আর্মেনিয় বণিক খওজা ওয়াজিদ। খওজা সুবাদার নিযুক্ত প্রধান ব্যবসায়ী। এছাড়াও ফরাসীদের এজেন্ট। আর ব্রিটিশদের চরম শত্রু।
১৭৫০এর দশকে ব্রিটিশ সোরা ব্যবসার পরিমান ছিল বছরে ৫১ হাজার মন অথবা ২২৩৮ টন। পলাশির পর শুধু ভারত নয়, বিশ্বের ইতিহাসই উল্টপাল্টে গেল। পলাশীর পর মির জাফর কোম্পানিকেই সোরা ব্যবসার একচেটিয়া অধিকার দিলেন। চন্দননগরে ফরাসী কুঠীর ওপরেও আগাত হানে ব্রিটিশ শক্তি। সোরা ব্যবসা থেকে সরে যায় ফরাসিরা। মির জাফরের প্রধান ব্যবসায়ী খওজা ভিওসির সঙ্গে চক্রান্ত করতে শুরু করে। ব্রিটিশদের সঙ্গে যুদ্ধে ভিওসি ১৭৫৯এর যুদ্ধে হেরে যায়। এর পর থেকে ইওরোপে ভারত থেকে রপ্তানি হওয়া প্রত্যেকটি সোরা ভর্তি জাহাজ ছিল ব্রিটিশদের। ব্রিটেন বিশ্বের ৭০ শতাংশ সোরার মালিক হয়ে বসার প্রভাব পড়ল সাত বছরের যুদ্ধ(১৭৫৬-১৭৬৩)সহ ইওরোপিয় নানান যুদ্ধে।

The Indian saltpeter trade, the military revolution and the rise of Britain as a global superpower. জেমস ডব্লিউ ফ্রে


পঞ্চম অংশ

জেমস ডব্লিউ  ফ্রে, অসকোস, উইসকনসিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক। তিনি বাঙলা সুবার পাটনার সোরা ব্যবসা সম্বন্ধে বিশদে ইতিহাস রচনা করেছেন. এই ইতিহাস যেমন মনোগ্রাহী, তেমনি বাঙলার ইতিহাস এবং প্রযুক্তি চর্চকদের আর শিক্ষার্থীদের কাছে শিক্ষার বিষয়. ব্রিটিশ আধিপত্য বিশ্লষণে নানান দিকগুলি এর আগে বিশদে বিশ্লেষিত হয়েছে, কিন্তু সেই আলোচনায় সোরার ভূমিকার কথা আর সেই উত্পাদনে বাঙলা সুবার পাটনার কথা খুব একটা উঠে আসে নি। বলা দরকার প্রাচীন কাল থেকেই ১৯০০ সাল পর্যন্ত পাটনা বিশ্ব সোরা বাজারে বিশাল এক ভূমিকা নিয়েছে. এই ইতিহাস আমরা বিশদে এই প্রবন্ধে কয়েকটি অংশে ভাগ করে দেখব. এবারে পঞ্চম অংশ. 
বিশ্বেন্দু

ক্রমশঃ পাটনা হয়ে উঠল ভারতের সোরা ব্যবসার মূল কেন্দ্র – শুধু ভারতই নয়, বিশ্বেরও। সপ্তদশ শতকে ইওরোপে সোরার চাহিদা আকাশ ছোঁয়। ডাচ ভিওসির ব্যবসায় ১৬৫৮এ ১০০০ টনের চাহিদা ১৭০১তে বেড়ে দাঁড়ায় ১,৭৫০ টন। ১৬৭১ থেকে ভিওসির ব্যবসা টার্গেট ছিল ১৫০০ টন সোরা, যার মধ্যে ১৩৭৫ টন সোরা নির্দিষ্ট ছিল আমস্টারডামএর জন্য, বাকি বাটাভিয়ার কারখানা আর অন্যান্য এশিয় বাজারের উদ্দেশ্যে পাঠানো হত। কুমকুম বলছেন মুঘল আর আরমেনিয়ন বণিকেরা সোরা ব্যবসায় ততটা গুরুত্ব দেয় নি, অথচ এই ব্যবসায় তারা কিন্তু বড় পরিমানে বিনিয়োগ করে। পাটনার বাজারে ভারতের নানান প্রান্তের ব্যবসয়ীদের সঙ্গে ইরান এবং মধ্য এসিয়ার ব্যবসায়ীদের আনাগেনা ছিল। অরমেনিয় বণিকদের অধিকাংশ ইস্পাহান থেকে আসা। ১৬৯১-৯২তে ফরাসীরা সোরা কিনতে আসছে এমত সংবাদে আরমেনিয়ানরা ৯০৬ টন সোরা বিহারের বাজার থেকে কিনে জাহাজে ভরে। ঐতিহাসিকেরা বলছেন এই জাহাজ মাদ্রাজের দিকে রওনা হয়। কেননা মাদ্রাজ তখন ভারতের সব থেকে কম ডিউটির বন্দর। ১৬৯৮তে বাঙলা থেকে কেডা (Qeddah) বণিকের জাহাজ করে এক আরমেনিয়ান বণিক মসলিন, ক্যালিকো, র সিল্ক, আফিম, লোহা, চিনি এবং সোরা সুরাট বন্দরে দিকে বয়ে নিয়ে গিয়েছে। এই জাহাজটি মালাবারের জলদস্যু উইলিম কিড দখল করে বস্টনে নিয়ে যায়। ১৭০৬-০৭এ ইংরেজ জলদস্যুরা গোয়া থেকে রেড সির দিকে যাওয়া সোরা ভারা পর্তুগিজ দেশি জাহাজ দখল করে জাহাজের তুর্কী বণিকদের থেকে অর্থ চায় এবং এই অর্থ দোফারএ দেওয়া হয়। এই প্রবণতা থেকে পরিস্কার ইরানী এবং অটোমান সাম্রাজ্যের বণিকেরা লাল সাগর এবং পারস্যের উপসাগরের নানান বন্দর মার্ফত ভারতীয় নাইট্রেট আমদানি করতেন। ১৬৭০ থেকে ১৬৮০ পর্যন্ত বালেশ্বর আর হুগলির ২০টি দেশি জাহাজ বিভিন্ন দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলিতে পাড়ি দেয়। তবে এগুলোয় সোরা ছিল কী না তা স্পষ্ট নয়। ১৬৯০এর পর থেকে যেসব মুঘল আমলা এশিয় সমুদ্র বাণিজ্য বিনিয়োগ করেছিলেন, তারা তার পর সেই ব্যবসায় উত্সাহ হারিয়ে ফেলেন।
১৬৪৯ থেকে ১৬৫৪, আমস্টারডামে সোরার দাম প্রতি কুইন্টলে(১ কুইন্টল সমান ৪৮.৯৫ কেজি) ৩৭ গিল্ডার থেকে বেড়ে দাঁড়ায় ৬৬ গিল্ডার। ১০০০ শতাংশ লাভ। তবে ষাটের দশকে দাম কমে আসায় লভ্যাংশ কমে দাঁড়ায় ২৭৫ শতাংশ। ক্রমশঃ দুই দেশের কোম্পানিই সোরা জমিয়েরেখে দাম নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে। অষ্টাদশ শতকে ভিওসি ইওরোপে ২০০ শতাংশ লাভ করে বছরে ৫৫০০০০ গিল্ডার রোজগার করে।
তবে পাটনার সোরার ব্যবসায় প্রথম দিকে ব্রিটিশরা খুব একটা পেরে ওঠে নি। ইওরোপিয়দের সোরা কেনা বন্ধ করার অনুরোধ অটোমান রাজ মুঘলরাজকে করেছেন, এমন গুজবে মাঝে মাঝেই পাটনায় সোরার দাম আকাশ ছুঁত। এছাড়াও স্থানীয় লুঠেরাদের কবলে পড়তে হত। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা ঠিকমত প্যাকিং করে সময়মত কলকাতায় সোরা না পৌঁছে দিলে বহু ক্ষতি হত বণিকদের। বহু বোঝাপড়ার পর ১৭১৮র পর ব্রিটিশদের খুব পুরোনো দালাল জনার্দন শেঠ এবং কয়েকজন মুসলিম আর আর্মেনিয়ান বণিকদের সহায়তায় সোরা ব্যবসা থিতু হয়। সে সময় নবাব, জনার্দন শেঠের ইংরেজদের সঙ্গে সোরা ব্যবসার অধিকারের অনুমতি দেন। পরে ভিওসির সঙ্গে সঙ্গে কোম্পানিও এই দস্তক পায়।

The Indian saltpeter trade, the military revolution and the rise of Britain as a global superpower. জেমস ডব্লিউ ফ্রে


পঞ্চম অংশ

জেমস ডব্লিউ  ফ্রে, অসকোস, উইসকনসিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক। তিনি বাঙলা সুবার পাটনার সোরা ব্যবসা সম্বন্ধে বিশদে ইতিহাস রচনা করেছেন. এই ইতিহাস যেমন মনোগ্রাহী, তেমনি বাঙলার ইতিহাস এবং প্রযুক্তি চর্চকদের আর শিক্ষার্থীদের কাছে শিক্ষার বিষয়. ব্রিটিশ আধিপত্য বিশ্লষণে নানান দিকগুলি এর আগে বিশদে বিশ্লেষিত হয়েছে, কিন্তু সেই আলোচনায় সোরার ভূমিকার কথা আর সেই উত্পাদনে বাঙলা সুবার পাটনার কথা খুব একটা উঠে আসে নি। বলা দরকার প্রাচীন কাল থেকেই ১৯০০ সাল পর্যন্ত পাটনা বিশ্ব সোরা বাজারে বিশাল এক ভূমিকা নিয়েছে. এই ইতিহাস আমরা বিশদে এই প্রবন্ধে কয়েকটি অংশে ভাগ করে দেখব. এবারে দ্বিতীয় অংশ. 
বিশ্বেন্দু



পাটনা সোরা ব্যবসার বিশ্বকেন্দ্র
পাটনায় সোরা ব্যবসা বুঝতে গেলে ভারতে সোরা তৈরির পদ্ধতিটি প্রথমে বোঝা দরকার। পাটনা, তার আশেপাশের গঙ্গার শাখাপ্রশাখা ধরে যেসব গ্রামেগঞ্জে সোরা তৈরি হত, ব্রিটিশ নথিপত্রে সেগুলি সোরা মহল নামে খ্যাত। যে সমাজ সোরা সংগ্রহ আর তৈরি করতেন তাঁদের বংশগত নাম ছিল নুনিয়া। নুনিয়ারা আবার মাটির নানান কাজে নিযুক্ত সমাজের এক অংশ। নুনিয়ারা সাধারণতঃ হিন্দু হতেন, তবে মুসলমান ধর্মাবলম্বীদের সংখ্যাও কম ছিল না। ১৬৩৮এ গুজরাট, রাজস্থানের নুনিয়াদের সঙ্গে থাকার অভিজ্ঞতা নিয়ে Albert von Mandelslo এর লেখা এবং আইনিআকবরির সূত্র ধরে বলা যায়, ভারতের অন্যান্য পণ্যের উত্পাদন ব্যবস্থার মতই সোরা তৈরিটিও ছিল বংশপরম্পররার ব্যবসা। সারা কয়েকটি ব্যতিক্রম ছাড়া, ভারতে প্রায় একই ধরণের উত্পাদন পদ্ধতি অনুসরণ করা হত।
বুদ্ধের আমলেরও আগে থেকেও ভারতে গৃহপালিত পশুর সংখ্যা বিশ্বের যেকোনও দেশের তুলনায় বেশি। সঙ্গে স্যাঁতস্যাঁতে আবহাওয়া, বৃষ্টির সময় গজিয়ে ওঠা প্রচুর গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ গরমের সময় পচেযাওয়ার দরুন এই এলাকার মাটি সোরা জন্মানোর আদর্শ ছিল। নুনিয়ারা পশুদের মুত্র থেকে সোরা বার করত। গ্রামে গঞ্জে নুনিয়াদের এধরণের মাটি সংগ্রহ কাজ ছিল। কৃষকেরা দিনের এক নির্দিষ্ট সময় নিজেদের পশুগুলোকে নুনিয়াদের হাতে ছেড়ে দিত। নুনিয়ারা এই গরুগুলোকে নিয়েযেত গ্রামের কোনও এক নির্দিষ্ট জমিতে(হয়ত ভাড়া করাও হতে পারে) । জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে তারা সেই জমিতে গোমুত্র ছড়িয়ে জমি চাষ করত। অক্টোবরে বর্ষা শেষ হয়েগেলে মাটির ওপরে উঠে আসা নোনা স্তরটি চেঁছে তুলে নিত। এই মাটি, নিজেদের পারিবারিক কারখানা যার দেশি নাম কোঠি, কাঠের জ্বালের উনুনে সেদ্ধ করে পটাসিয়াম আর নাইট্রেট আলাদা করত। বাঁশের মাচা বানিয়ে তার উপর নুনিয়ারা নুনোমাটি জমিয়ে রাখত। এই কাজটি সারা বছর ধরে করত তারা। অন্যান্য ব্যবসারমতই কোঠির সমস্ত কাজ পরিবারের সদস্যরা করত। পুরুষেরা মাটি সংগ্রহ করত আর স্ত্রী আর শিশুরা জ্বালানী কাঠ সংগ্রহ করত। উনবিংশ শতকের এক ব্রিটিশ লেখক বলছেন অক্টোবর থেকে জুন, এই নয় মাসে একএকজন নুনিয়া ৬৩৪.২ থেকে ১১৫৫ কেজি পর্যন্ত সোরা তৈরি করত। এর পর এটি যেত ইওরোপিয় কারখানায়। সেখানে প্রসেস হওয়ার পর এই পরিমানটি কমত প্রায় ৪০-৬০ শতাংশ। যা তৈরি হত, তার নাম কলমী সোরা। ভিওসি ৮০-৮৫ শতাংশ শুদ্ধ সোরা রপ্তানি করে দেশে সেগুলোকে আরও শুদ্ধ করত।
(ইওরোপিয়দের ক্ষমতা কেন্দ্রিক দৃষ্টিতে - বিশ্বেন্দু)নুনিয়ারা ছিল বেশ গরীব। তাদের এই কাজ করতে অর্থ যোগাত অসমিয়া বণিকেরা(এর আগে নুনের ব্যবসায় দেখেছি অসমীয়া ব্যবসায়ীদের আধিপত্য - বিশ্বেন্দু)। অসমিয়া বণিকেরা এই নাইট্রেট পাটনার দাদনি বণিকদের সরবরাহ করতেন। আদতে দাদনি বণিকেরাই সোরা শিল্পের নিয়ন্ত্রণের কেন্দ্রে ছিল। কুমকুম চট্টোপাধ্যায় বিশদে ১৭৩৩ থেকে ১৭৫৭ পর্যন্ত পাটনার সোরা ব্যবসার কাঠামো, ব্যবসাদার এবং নানান  মধ্যসত্ত্বভোগীদের লেখা থেকে আমরা পাই কী ভাবে ব্রিটিশ ব্যবসায়ীরা এক্কেবারে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত শৃঙ্খল তৈরি করে তাদের ব্যবসার স্বার্থ সুরক্ষিত রেখেছিল। ১৭৫০এর আগে পর্যন্ত প্রাদেশিক শাসকদের প্রধান ব্যবসায়ী সরকারের অধীনে দাদানি বণিকেরা সাবকনট্রাকটর হিসেবে কাজ করত। কাপড়ের ব্যবসা বেশ ছড়ানো ছাকলেও, সোরার ব্যবসা ছিল নিয়ন্ত্রিত এবং নির্দিষ্ট এলাকা ভিত্তিক। নুন তৈরি করা হাতে গোণা নুনিয়া সোরা তৈরির অনুমতি পেত। আদতে নুন আর সোরা তৈরির পদ্ধতি অনেকটা কাছাকাছি। এবং একই ধাতে হাতেগোণা দাদনি বণিকের নির্দিষ্ট কিছু ব্যবসায়ী সোরা কেনার অনুমতি পেত।
দাদনি বণিকেরা সরাসরি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে সোরা ব্যবসায় যুক্ত ছিল। খুব কমই দাদনি বণিক একটির বেশি কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত থাকত। অসমিয়াদের ১০০০টাকার দস্তখত দিতে হত। এধরণের সংগঠিত বাজারে ইওরোপিয়রা ঢুকতে শুরু করে। ১৬৮০ থেকে ভারতীয় বণিকেরা এক হয়ে নিজেদের স্বার্থ দেখতে শুরু করল। সোরার দাম কমানোর জন্য ইওরোপিয় কেম্পানিগুলি বণিকদের একে অপরের বিরুদ্ধে লড়িয়ে দিত। মুঘল সরকার দাদনি বণিকদের পাশে দাঁড়ায়।

The Indian saltpeter trade, the military revolution and the rise of Britain as a global superpower. জেমস ডব্লিউ ফ্রে


চতুর্থ অংশ

জেমস ডব্লিউ  ফ্রে, অসকোস, উইসকনসিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক। তিনি বাঙলা সুবার পাটনার সোরা ব্যবসা সম্বন্ধে বিশদে ইতিহাস রচনা করেছেন. এই ইতিহাস যেমন মনোগ্রাহী, তেমনি বাঙলার ইতিহাস এবং প্রযুক্তি চর্চকদের আর শিক্ষার্থীদের কাছে শিক্ষার বিষয়. ব্রিটিশ আধিপত্য বিশ্লষণে নানান দিকগুলি এর আগে বিশদে বিশ্লেষিত হয়েছে, কিন্তু সেই আলোচনায় সোরার ভূমিকার কথা আর সেই উত্পাদনে বাঙলা সুবার পাটনার কথা খুব একটা উঠে আসে নি। বলা দরকার প্রাচীন কাল থেকেই ১৯০০ সাল পর্যন্ত পাটনা বিশ্ব সোরা বাজারে বিশাল এক ভূমিকা নিয়েছে. এই ইতিহাস আমরা বিশদে এই প্রবন্ধে কয়েকটি অংশে ভাগ করে দেখব.  
বিশ্বেন্দু


১৬০০ থেকে ব্রিটিশ আর ডাচেরা ভারতে আসতে শুরু করেছে। তাদের হাত দিয়েই ভারতের অন্যান্য শিল্পেরমত গেঁয়ো এই শিল্পে  লাগল আন্তর্জতিক বাণিজ্যের গ্ল্যামারের ছোঁয়া( ফ্রের ভাষায় A lowly village craft, supplying a raw material to petty bazaar traders, was to become the basis for a major, highly strategic international business)। ইংলন্ড এবং ভিওসির ব্যবসায়ীদের নজর পড়ল এই ব্যবসায়।  লন্ডনের শাসক স্টুয়ার্ট সাম্রাজ্য কোম্পানিকে সোরার নতুন উত্স খুঁজতে  প্রণোদনা দিল। প্রথম এলিজাবেথ থেকেই স্টুয়ার্টরা সোরা এবং বারুদ সংগ্রহের রাষ্ট্রীয়করণের নীতি শুরু করে। ইওরোপে বারুদ নির্ভর যুদ্ধ শুরু হল। ফলে এই যুদ্ধে ইওরোপের সামরিক বারুদ উত্পাদন কম পড়তে শুরু করে। যদিও গবেষকেরা বলছেন ব্রিটিশ ও ভিওসি দুই কোম্পানিই স্বদেশ প্রেমের ওপর ভিত্তি করে বারুদ বা সোরা ব্যবসা শুরু করে, এই ব্যবসার পেছনে কিন্তু লাভের অঙ্কের পরিমান এবং রাজনৈতিক সামাজিক ক্ষমতার আধিপত্যের ইচ্ছেও কাজ করেছে। 
সোরা যতটা প্রয়োজন, পোল্যান্ড এবং রাশিয়া থেকে ততটা পাচ্ছিল না ডাচেরা। ভারতের দিকে নজর ঘোরাল তারা। ভারতের সোরা ব্যবসায় ক্রমশঃ মাথা ঢোকাতে শুরু করে। ১৬২৪এ Wapen van Rotterdam নামক জাহাজটি ১৩৫ মেট্রিক টন (২,৭০,০০০ ডাচ পন্ড) সোরা নিয়ে রওনা হয়। কোনও কোনও জাহাজ শুধুই নাইট্রেট নিয়েও রওনা হত। ১৬৩০এ শুধু করমন্ডল তট থেকে ভিওসি বছরে ৮১.৫ থেকে ১০৮.৭ টনসোরা নিয়ে গিয়েছে, যা তাদের আভ্যন্তরীণ মোট উত্পাদনের ৩০ শতাংশেরও বেশী।
ব্রিটিশ কোম্পানি ১৬২০-২১ থেকে ভারতের বাজার থেকে সোরা বাণিজ্য শুরু করে। শুরু করে আগ্রা থেকে খুব অল্প পরিমানে। এই আগ্রাতেই স্থানীয় ব্যবসায়ী, কনট্রাক্টরেরা মুঘলদের সোরা বেচত। আগ্রা বাজার আর ডাচদের প্যাকিং প্রযুক্তি বুঝে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বড় করে ব্যবসায় নেমে পড়ে। গড়ে বছরে ৩৩৫.২ টন রপ্তানি করে। পর্তুগিজ, ব্রিটিশ আর ডাচেদের লড়াইতে জয়ী হতে শুরু করে ডাচেরাই। বাঙলায় ব্যবসার দেওয়ার মুঘল ফরমান পেয়ে ডাচেরা চুঁচুড়ায় কুঠী স্থাপন করে ছাপড়া এবং সিংগিয়াতে এজেন্ট নিয়োগ করল। ১৬৪১ থেকে ১৬৫৬ পিপলির কারখানা থেকে ডাচেরা ইওরোপে রপ্তানি করেছে ৪০৬ থেকে ৬০৯ মেট্রিক টন সোরা। খরচ বাঁচাতে পিপলির কারখানা চুঁচুড়ায় নিয়ে আসা হয়।
গৃহযুদ্ধে দীর্ণ ব্রিটিশরা যখন ভারতে ব্যবসায় থিতু হচ্ছে, ডাচেরা ততদিনে ভারতে বড় বাণিজ্য শক্তি। গৃহযুদ্ধের পরেই ব্রিটিশ ইন্টারলোপাররা ভারত মহাসাগরে সোরা ব্যবসায় ঝাঁপিয়ে পড়ায় ইওরোপে সোরার দাম মাটি ছুঁতে শুরু করে।  এমনকী ইওরোপের যুদ্ধও এই দাম তুলতে পারে নি। যথেষ্ট লাভের মুখ দেখতে থাকায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সোরা ব্যবসায় টিকে থেকে যায়। সে সময় ব্রিটিশেরা তাদের কারখানায় সোরা প্রসেসিং এবং প্যাকেজিং ব্যবস্থা আর জাহাজজাত করাকে আরও উন্নত করার দিকে নজর দিতে থাকে। ১৬৬৮এ আগ্রা আর আহমেদাবাদের বাজার ছেড়ে আসে, ১৬৮০তে করমণ্ডল উপকূলের পেটাপলি কারখানা বন্ধ করে। হুগলীতে নতুন কুঠী খুলে পাটনা থেকে তাদের চাহিদামত সোরা তারা সংগ্রহ শুরু করে। ১৬৭৯ সালেই পাটনা থেকে ১৩১৮ টন সোরা কেনে। শুধু হুগলিতে যখন নাইট্রেটের মজুদএর পরিমান কমে যেত, তখনই শুধু তারা করমণ্ডল উপকূল থেকে সোরা আনাবার ব্যবস্থা করত।

The Indian saltpeter trade, the military revolution and the rise of Britain as a global superpower. জেমস ডব্লিউ ফ্রে

তৃতীয় অংশ

জেমস ডব্লিউ  ফ্রে, অসকোস, উইসকনসিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক। তিনি বাঙলা সুবার পাটনার সোরা ব্যবসা সম্বন্ধে বিশদে ইতিহাস রচনা করেছেন. এই ইতিহাস যেমন মনোগ্রাহী, তেমনি বাঙলার ইতিহাস এবং প্রযুক্তি চর্চকদের আর শিক্ষার্থীদের কাছে শিক্ষার বিষয়. ব্রিটিশ আধিপত্য বিশ্লষণে নানান দিকগুলি এর আগে বিশদে বিশ্লেষিত হয়েছে, কিন্তু সেই আলোচনায় সোরার ভূমিকার কথা আর সেই উত্পাদনে বাঙলা সুবার পাটনার কথা খুব একটা উঠে আসে নি। বলা দরকার প্রাচীন কাল থেকেই ১৯০০ সাল পর্যন্ত পাটনা বিশ্ব সোরা বাজারে বিশাল এক ভূমিকা নিয়েছে. এই ইতিহাস আমরা বিশদে এই প্রবন্ধে কয়েকটি অংশে ভাগ করে দেখব. এবারে তৃতীয় অংশ. 
বিশ্বেন্দু

মাদ্রাজের ইংরেজদের নথিপত্রে জানাযাচ্ছে স্যানথোমএর পর্তুগিজ বাসিন্দারা ১৬৯০তে খুব বড় আকারে সোরা ব্যবসা করত। দাক্ষিণাত্যের ব্যবসার পথে নিরন্তর গন্ডগোল চলতে থাকায় দক্ষিণ ভারতের সোরা ব্যবসা করমণ্ডল উপকূলে উঠে আসে। মাদুরাই থেকে ব্যবসা করা এজেন্টরা স্থানীয় এলাকা থেকে সোরা জোগাড় করে পুলিকট, সানথোম এবং মাদ্রাজ ডেনিসদের বসতি (Tranquebar!)ত্রিবাঙ্কোর ছাড়াও তাঞ্জাভুর ও রামনাদএর তট ধরে ডাচ ও পর্তুগিজদের কুঠিতে সোরা সরবরাহ করত। এখানেও সোরা ব্যবসা কাপড় আর চালের ব্যবসার অনুগামী হয়ে চলত। ১৬৩০ সালেও দেখা যায় মাদুরাইএর সোরা তুতিকোরিন এবং কয়ালপট্টনমএরমত ছোট বন্দরেও ব্যবসার জন্য পাঠানো হত যতদূর সম্ভব মোপলা(Moplah) এবং লুবাই(Lubbai) পেডলার্সদের দ্বারা এই কাজ সম্পন্ন হত। ১৬৩৩-১৬৩৫ এই সময়টি Antonio Bocarro's Livro das Plantas খুব বিশদে বর্ণনা করেছেন।  সোরা ছাড়াও ব্যবসা হত মুক্তো, কোরাল, হাতি, রুবি, চাল এবং সুতিদ্রব্য। ইক্কেরির রাজা এবং অন্যান্য ব্যবসায়ীরা পর্তুগিজদের সঙ্গে ব্যবসা করতেন।
তবে ভারতে শুধু নয়, বিশ্বের অন্যান্য পণ্যেরমতই সোরা উত্পাদনের অন্যতম প্রধান অঞ্চল বাঙলা আর বিহার। ১৬৩০এ পর্তুগিজদের পাটনায় ব্যবসায় উপস্থিতির হদিস পাওয়া যাচ্ছে ইংরেজদের নথিপত্র থেকে। তবে এই আনঅফিসিয়াল পর্তুগিজেরা সোরা ব্যবসায় ছিল কি না, সেই তথ্য স্পষ্ট নয়। তখনও কিন্তু পাটনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পণ্য সোরা। Barendse বলছেন ম্যাকাওএর ব্যবসায়ী Francisco de Carvalhoর কথা। তিনি বাঙলায় পর্তুগিজদের একচেটিয়া ব্যবসায়ী(মনোপলি কনট্রাক্টর)। কার্ভালো গোয়া শাসকদেরও সুনজরেও ছিলেন। তবে তিনি একাই জাভা থেকে বাঙলা হয়ে গোয়া পর্যন্ত একাই সোরাসহ অন্য ব্যবসা ফেঁদে বসেছিলেন এ তথ্য খুব একটা গ্রহনযোগ্য নয়।
ইওরেপিয়রা মোগল সাম্রাজ্যকে বারুদ নিয়ন্ত্রিত কামান সাম্রাজ্য(গান পাউডার এম্পায়ার – এই অভিধাটি মার্ক্সিয় ঐতিহাসিকদের দান। সোভিয়েত ঐতিহাসিকদের অনুসরনে জি এস হজসন, সাফাভি, অটোমান, হ্যুপসবার্গ, মুঘলদের গান পাউডার সাম্রাজ্য বলে দাগিয়ে দেন। তাঁর দাবি এই সাম্রাজ্যগুলো বারুদ এবং অস্ত্রশস্ত্রের কারখানা রাষ্ট্রীয় করণ করে সাম্রাজ্য টিকিয়ে রেখেছিল। কিন্ত ভারতে অন্ততঃ মেগল আমলে দেশের ভূস্বামীরা বারুদ তৈরির অধিকার নিজেদের হাতে রেখে রাজশক্তির নানানভাবে বিরুদ্ধাচরণ করছেন) বলে দাগিয়ে দিয়েছেন। এ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। মুঘল সাম্রাজ্যে কামান বেশ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। ইব্রাহিম লোদিকে হারিয়ে বাবরের জয়ে ঐতিহাসিকেরা কামানের গুরুত্বকে বড় করে দেখিয়েছেন, কিন্তু বাবর নিজে কামানের থেকে নিজের বুদ্ধি আর পরিকল্পনার ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। পাণিপথ যুদ্ধের পর এই প্রথম ভারত সভ্যতায় কামানের মুখে শত্রুদের দাঁড় করিয়ে ওড়ানো হয়। বাবরের যুদ্ধ জয়ে পদাতিক সৈন্যের ভূমিকা কামানের গুরুত্বের থেকে অনেক বেশি। হুমায়ুন গুজরাটের তুর্কী কামান বিশেষজ্ঞ রুমী শাকে দিল্লীতে আনতে উদ্গ্রীব ছিলেন। এমনকী শের শাহ যত বারুদ ব্যবহার করেছেন তা বেশ নগন্য পরিমানে ছিল। যদিও তিনি বিষ্ফোরনে প্রাণ হারান। আকবরের সঙ্গে সোরা(নিমকীশোর - ইংরেজরা এশিয় শব্দ উচ্চারণ করতে পারত না বলে শব্দ ভেঙে লেখার চল করে, নিমকিশোর লিখিত নথিতে তাই নিমক-ই-শোর) ব্যবসায়ী হিমুর লড়াই হয়। এবং হিমুর মৃত্যু ঘটে চোখে তীর বিঁধে। কামান অথবা বন্দুকের গুলিতে নয়। যদিও যুদ্ধে আকবর কামান ব্যবহার করছেন, কিন্তু আকবর জিতছেন বাবরেরমতই সাংগঠনিক প্রতিভায়। বরং মুঘল সাম্রাজ্যকে বলাভাল কাগজে(অথবা পরিকল্পনা) ভিত্তিক সাম্রাজ্য, টিকেছিল সুচারু কর আদায়, আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং বিশাল পরিমান তথ্য ব্যবস্থাপনার দক্ষতার ওপর। শেরশাহর সেনা বাহিনীতে ছিল গাঙ্গেয় সমভূমির বন্দুকবাজেরা। এর আগে আমরা দেখেছি এই এলাকাটাই কিন্তু ভারতের সোরা উত্পাদনের অন্যতম কেন্দ্রস্থল। পরের দিকে মুঘলদের সেনা বাহিনী এবং ব্রিটিশদের সেনা এই এলাকা থেকেই সংগ্রহ করা হয়েছে।
আকবর কীভাবে বারুদ সংগ্রহ করতেন তার বিশদ বিবরণ পাওয়া যায় না, কিন্তু তিনি যে এটিকে বেশ গুরুত্ব দিতেন তা বোঝা যায় কেননা সোরার উত্পাদনের প্রযুক্তি এবং ব্যবহারেরদিকে অনেক বেশি নজর দিয়েছেন। আবুলফজল বিহারের বিস্তীর্ণ সোরা উত্পাদন এলাকার কথা উল্লেখ করছেন না, যদিও আকবরের সময় তা বিস্তৃতভাবে ব্যবহার হয়েছে। আইনিআকবরি থেকে মোটামুটি ধারণা করা যায় অস্ত্র ব্যবহার এবং বারুদ তৈরি খুব একটা কেন্দ্রীভূত ছিল না, অন্ততঃ আকবরের সময়টুকু। তিনি বলছেন নির্দিষ্ট কিছু অস্ত্র ছাড়া রাষ্ট্রশক্তি অস্ত্র তৈরির ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করত না। এই সূত্র ধরেই আমরা ধারণা করতে পারি তখনও সরকারি আমলাদের এই ব্যবসা এবং উত্পাদনে অংশগ্রহণ ছিল ন। ব্যক্তি সেনা অথবা সেনানায়ক যুদ্ধের জন্য প্রয়োজনীয় বারুদ জোগাড় করতেন। এমনকী রাষ্ট্রশক্তিও বাজার দামে বাজার থেকে বারুদসহ নানান সামরিক দ্রব্য কিনত। ১৫৮০র পর বিশেষ করে জাহাঙ্গীরের সময় থেকেই সমাজ অর্থনীতির অন্য নানান অংশ নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সঙ্গে সোরা উত্পাদনে নিয়ন্ত্রণ কায়েম করল।