Showing posts with label জাহানকোষা. Show all posts
Showing posts with label জাহানকোষা. Show all posts

Friday, February 2, 2018

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা - বাংলা আর বাঙালির শূদ্র প্রযুক্তি লোহা-ইস্পাত শিল্প - উৎপাদনের গুণমান হরবল্লভ দাস এবং জনার্দন কর্মকারের প্রতি প্রণাম

কাটরার দক্ষিণ-পূর্বদিকে দুইটি অশ্বত্থতরুর, অথবা একটি অশ্বথতরুর দুইটি সংলগ্ন কাণ্ডের মধ্যস্থলে এক বিশাল কামান অবস্থিতি করিতেছে। এই কামানের নাম জাহানকোষা বা জগজ্জয়ী। এই স্থানে মুর্শিদকুলী খাঁর কামানাদি রক্ষিত হইত বলিয়া কথিত আছে। সেইজন্য এই স্থানটিকে আজিও সাধারণে তোপখানা কহিয়া থাকে। এই তোপখানার উত্তর দিয়া একটি ক্ষুদ্র নদী সর্পগতিতে আপনার ক্ষুদ্র কলেবরে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র তরঙ্গ তুলিয়া আপন মনে বহিয়া যাইতেছে। জাহানকোষা অনেকদিন পর্যন্ত ধরণীবক্ষে স্বীয় বিশাল বপু বিস্তার করিয়া অবস্থিতি করিতেছিল; ইহার পার্শ্বে অশ্বত্থ বৃক্ষ জন্মিয়া জাহানকোষাকে ভূতল হইতে কতকটা উর্ধ্বে উত্তোলন করিয়াছে।
কামানটি দৈর্ঘ্যে প্রায় ১২ হাত হইবে। বেড় ৩ হাতের অধিক, মুখের বেড়টি ১ হাতের উপর। অগ্নিসংযোগ-ছিদ্রের ব্যাস ১৷৷ ইঞ্চি হইবে। কামানের গাত্রে ফারসী ভাষায় খোদিত ৯ খণ্ড পিত্তলফলক আছে। ৩ খণ্ড অশ্বত্থবৃক্ষের কাণ্ড মধ্যে প্রবিষ্ট, অবশিষ্ট কয়েকখানিও অস্পষ্ট হইয়া পড়িয়াছে।
পিত্তলফলকে বাঙ্গলার শাসনকর্তা ইসলাম খাঁর গুণবর্ণনা ও কামানের নির্মাণাব্দাদি খোদিত আছে। এইরূপ লিখিত আছে যে, এই জাহানকোষা সাজাহানের রাজত্বকালে ও ইসলাম খাঁর বাঙ্গলাশাসনের সময়, জাহাঙ্গীরনগরে দারোগা শের মহম্মদের অধীন হরবল্লভ দাসের তত্ত্বাবধানে জনাৰ্দন কর্মকার(এই জনাৰ্দনকে বেভারিজ প্রভৃতি জর্নাজন বলিয়া লিখিয়াছেন। পিত্তল-ফলকের লেখা এক্ষণে অস্পষ্ট হইয়াছে, ভাল করিয়া পড়িবার সুবিধা নাই; কিন্তু উহা জনাৰ্দন হওয়াই সম্ভব।- পাদটিকা) কর্তৃক ১০৪৭ হিঃ(১৬৩৭ সাল) ১১ই জমাদিয়স্ সানি মাসে নির্মিত হয়। ইহা ওজনে ২১২ মণ; ইহাতে ২৮ সের বারুদ লাগিয়া থাকে।
জাহানকোষাকে এক্ষণে হিন্দু-মুসলমান উভয় জাতিই সিন্দুরাদি লেপন করিয়া পূজা করিয়া থাকে। ঢাকায় ইহা অপেক্ষা আরও একটি বিশাল তোপ ছিল; তাহা এক্ষণে নদীগর্ভে পতিত। বিষ্ণুপুর প্রভৃতি স্থানেও বৃহৎ তোপের কথা শুনা গিয়া থাকে।
আমাদের দেশে পূর্বে যেরূপ শিল্পের উন্নতি হইয়াছিল, অনুসন্ধান করিলে, এখনও তাহার অনেক চিহ্ন দেখিতে পাওয়া যায়। বাঙ্গলার শিল্পের দিন দিন যেরূপ অবনতি হইতেছে, তাহাতে লোকে ইহার পূর্বশিল্পের কথা প্রবাদ বাক্য বলিয়া মনে করিবে।
মুর্শিদাবাদ-কাহিনী; নিখিলনাথ রায়
কাটরার মস্‌জেদ
(জাহানকোষা তোপ)

Friday, January 18, 2013

JahanKosha & Market Price of Pre-British Time, বাঙলার জাহানকোষা আর সায়েস্তা খাঁ বিষয়ের প্রবাদ


জাহানকোষা
মুর্শিদকুলি খাঁর সময়ের কামান। জাহানকোষার অর্থ জগজ্জয়ী। দৈর্ঘের ১২ হাত প্রস্থে সাড়ে তিন হাত। কলকাতা সেকালে একালে পুস্তকে গ্রন্থকার লিখছেন, এই তোপে সাতখানি পিত্তল ফলক মারাছিল। এই সমস্ত পিত্তলফলকে, সম্রাট শাহজাহান ও তাঁহার সময়ের বঙ্গের সুবেদার ইসলাম খাঁ এবং এই তোপেরও যশকীর্ত্তন লিখিত আছে। একখানি ফলক হইতে প্রমাণিত হয় এই জাহানকোষা তোপ জাহাঙ্গীরনগরে(ঢাকায়) দারোগা সের মহম্মদের ও পরিদর্শক হরবল্লভ দাসের তত্বাহধানে, প্রধান কর্ম্মকার জনার্দ্দন দ্বারা ১০৮৭ হিজরা(১৭৩৭ খ্রীষ্টাব্দে) নির্ম্মিত হয়। ইহার ওজন ২১২মণ ও অগ্নি সংযোগ করিতে ২৮ সের বারুদের প্রয়োজন হয়। ইহা ভিন্ন বাদসাওয়ালী বলিয়া আর একটী সুবৃহত তোপও মুরশীদাবাদ কেল্লায় দেখা যায়। ইহার মুখের ব্যাস প্রায় দুই হাত। এই দুইটী তোপ ও মুরশীদাবাদের শেলেখানায় রক্ষিত সেকালের পুরাণো অস্ত্রশস্ত্রাদি হইতে প্রমাণিত হয়, বাঙ্গালী কারিকরের দ্বারা এই বাঙ্গালা দেশেই এইরূপ প্রকাণ্ড তোপ ও অস্ত্রাদি নির্ম্মিত হইত।

লেখক লিখছেন, প্রসিদ্ধ পর্যটক বার্ণিয়ার সাহেব সাহজাহান ও ঔরঙ্গজেবের আমলে এ দেশে উপস্থিত ছিলেন। তিনি তাঁহার ভ্রমণ বৃত্তান্তের একস্থানে লিখিয়াছেন – মিশর দেশই চিরকাল অতি উর্বর ও শস্যশালিনী বলিয়া প্রসিদ্ধ – কিন্তু আমি দুইবার বাঙ্গালায় গিয়া যাহা দেখিয়া আসিয়াছি, তাহাতে বঙ্গদেশই উর্ব্বরতা সম্বন্ধে শ্রেষ্ঠ দেশ। এখানে তণ্ডুল এত উত্পন্ন হয়, যে নিকটবর্তী প্রদেশের কথা ছাড়িয়া দিয়াও অনেক দূরবর্ত্তী স্থান সমূহের অধিবাসীগণ বাঙ্গালার অন্নে প্রতিপালিত হয়। সমস্ত ভারতবর্ষের নানান স্থানে এমন কি আরব, মিসোপটেমিয়া  প্রভৃতি দেশেও বাঙ্গালার শস্য প্রেরিত হয়। নানান বিধ সুমিষ্ট ফল ও মিষ্টান্নের জন্য, বাঙালা দেশে চিরপ্রসিদ্ধ। এখানকার লোকে অন্নভোজী বলিয়া, গমের চাষ খুব কম হয়। চাউল, ঘৃত ও নানান প্রকার তরকারী এখানে অতি অল্পমূল্যে বিক্রীত হইয়াথাকে। টাকায় কুড়িটার উপর উত্কৃষ্ট পক্ষী পাওয়া যায়। ছাগ ও মেষ এদেশে প্রচুর। শূকর এতই প্রচূর যে পর্ত্তুগীজেরা এই মাংস খাইয়া প্রাণধারম করে। এখানে নানা শ্রেণীর মত্স্য অপর্যাপ্ত পাওয়া যায়। এক কথায় লোকের জীবনধারণোপযোগী দ্রব্যে বঙ্গদেশ পরিপূর্ণ। এই জন্যই পর্ত্তুগীজেরা এদেশে স্থায়ীভাবে বাস করিতেছে।
...সায়েস্তা খাঁর ধানের গোলা প্রবাদের কথা নহে। ঢাকার এই গোলা নির্ম্মাণ করিয়া তাহার তোরণের শিরোদেশে লিখিয়া দেন – যে শাসনকর্ত্তার শাসনকালে এই রূপ সুলভ মূল্যে চাউল পাওয়া না যাইবে – তিনি যেন আমার গোলার দরজা না খুলেন। নবাব শায়েস্তা খাঁর বহুপরে মুরশিদকুলী খাঁর আমলেও চাকায় পাঁচ ছয় মণ চাউল বিকাইত। চাউল শস্তা থাকিলেই অন্যান্য দ্রব্য সুলভ হইবে। এই জন্যই বিয়াজের গ্রন্থকার লিখিয়া গিয়াছেন – নবাবের আমলে মাসে এক টাকা আয় হইলে একজন লোক দুবেলা উদরপূর্ণ করিয়া পোলাও-কালিয়া খাইতে পারিত। দরিদ্র ফকিরগণ এই শস্তা গণ্ডার দিনে স্বচ্ছন্দে দিন কাটাইত।