Showing posts with label আনন্দবাজার পত্রিকা. Show all posts
Showing posts with label আনন্দবাজার পত্রিকা. Show all posts

Wednesday, July 11, 2018

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা - ইংরেজি শিক্ষিত বামেরাও মনে প্রাণে ঔপনিবেশিক - কোথায় ম্যাকলে আর কোথায় পার্থ চট্টোপাধ্যায়?

গত কালই লিখেছিলাম ইংরেজি শিক্ষিত বর্ণবাদী বাঙালি মনে প্রাণে চরিত্রে ঔপনিবেশিক, মেকলেবাদী। আনন্দবাজারে প্রকাশিত এই প্রবন্ধের লেখক অন্যান্য বামপন্থীর মত জাতিবাদী মেকলে, সাম্রাজ্যবাদী ট্রেভলিয়ানের মধ্যেও প্রগতিশীলতা খুঁজে পেলেন। পাবেনই বা না কেন, মেকলেদের জন্যেই আজকে সঙ্খ্যালঘিষ্ঠ ইংরেজি শিক্ষিত প্রমিত বাঙালি করে কম্মে খাচ্ছে। না হলে অধমর্ণ দশা হত প্রত্যেকের - এটা কেউ না জানুক বাম আর আবাপ জানে।
স্বাভাবিকভাবে আনন্দবাজার এদের মধ্যেই প্রগতিশীলতা দেখবে এতে আর আশ্চর্য কি! এবং আশ্চর্যের নয়, এক প্রবীণ মার্ক্সবাদী এই লেখাটা পড়তে নিদান দিচ্ছেন শিক্ষা বিস্তারের দিনকাল বুঝতে, ঔপনিবেশিকতা("ম্যাকলে এবং আরও অনেকেই আমাদের দেশের শিক্ষার প্রসারের জন্য অনেক কাজ করেছেন") বুঝতে নয়। তারা তাঁদের গুরুর প্রথম বয়সের ঔপনিবেশিক নিদানের মত মনে প্রাণে বিশ্বাস করেন ব্রিটিশেরা অজ্ঞ, অশিক্ষিত ভারতের উদ্ধারকর্তা হয়ে দেখা দিয়েছিল।
সাম্রাজ্য তাত্ত্বিক ট্রেভলিয়নের নাতি(তিনি আবার বিয়ে করেছেন মেকলের নাতনিকে - বদ্যি, বামপন্থীদের মত সাম্রাজ্যবাদীদেরও পারিবারিক সম্বন্ধ বানাতেন সাম্রাজ্যবাদীদের সঙ্গে) বইটিতে মেকলে ইত্যাদির নন্দিতবাক্য তুলে দেওয়ার পরে কলমচি তাঁর প্রবন্ধ শেষ করছেন এই বাক্যটি দিয়ে - "কোথায় ম্যাকলে আর কোথায় পার্থ চট্টোপাধ্যায়? সুদীর্ঘ অবনমনের ইতিহাস!"

Sunday, June 25, 2017

উপনিবেশবাদ বিরোধী চর্চা - অভীক সরকারের পতন ও মুর্চ্ছা - ছোটলোকেদের রাজনীতি

(গত বছরের লেখা)

অরূপশঙ্করদা ফেবুতে লিখেছেন অসাধারণ এক ব্যজস্তুতি, সেটা তুলে দেওয়া গেল-
আনন্দবাজার-অভীক সরকার=%$&#;)(+$!
চিন্তায় রাতের ঘুম উবে গেছে বাঙালির বিবেকবান কবি শিল্পী সাহিত্যিক নাট্যব্যক্তিত্বর দল!
আমাদের কী হবে?
কিচ্ছু হবেনা! নিশ্চিন্ত থাকুন!
আনন্দবাজার+অরূপ সরকার= উন্নততর আনন্দবাজার!
হে আনন্দিত ভক্ত বুদ্ধিজীবীগণ,
আপানারা নিশ্চিন্তে আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে বিরাজ করুন!
'' আগুনে পোড়ে না
হুশ করলে ওড়ে না,
বাসে-ট্রামে-ইউরিনালে
পাবলিক ভাবে সে বলছে,
আসলে বলছে আনন্দবাজার"
(চন্দ্রিল)
পাবলিক ভাবে সে বলছে, আসলে বলছে আনন্দবাজার! পাবলিক ভাবে সে বলছে, আসলে বলছে আনন্দবাজার! পাবলিক ভাবে সে বলছে, আসলে বলছে আনন্দবাজার!
---
এবারে আমাদের মত-
আমরা 'উন্নততর আনন্দবাজার' নিয়ে Arupsankarদার মতই নাক উঁচুত্বে ভুগছি - বাংলার তাবড় তৈরি করা ভাববার মাথাদের তার সৃষ্টির সামনে মাথা নামাতে বাধ্য করিয়েছেন, এটা অভীক সরকারের যোগ্যতা ১৯৮৩ থেকে ২০১৬ এই এক প্রজন্মের বেশি সময়ধরে করেছেন, এখন তাঁর বর্তমানে?

১। পার্থক্য হবেই হতেই হবে - আপনি যাই মনে করুন না কেন - অভীক সরকার মধ্যবিত্ত বাঙ্গালিকে বড় পুঁজির সেবাদাস হওয়ার দুশ বছরের পরম্পরার ইতিহাসের সঙ্গী করেছিলেন বুকে পুষে রাখা একটুকরো ইওরোপের(কয়েক দশক ধরে ইওরোপের যায়গা একটু একটু করে দখল করছিল আমেরিকা) ঝুটা কোয়ালিটি অব লাইফ - এবং দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হয়ে ওঠা আর সেখানকার তুলনার কম মাইনেতেই "ভাল" জীবনযাত্রার স্বপ্ন দেখিয়ে।এটা সফলভাবে রূপায়িত করতে ধঁক লাগে, যেমন পলাশীর পরে গ্রাম-বিপ্লবী বাংলার দিকে সেনা লেলিয়ে আর মধ্যবিত্তের পিঠ ফিরিয়ে ব্রিটিশিয় ট্রেভরিয়ান-মেকলে জুটি সফলভাবে বলে বলে করতে পেরেছিল। তাদের আগে ক্লাইভ, হেস্টিংস, কর্নওয়ালিস অত্যাচার করেছে, লুঠ করেছে, ধ্বংস করেছে কিন্তু ভদ্রদের পুরোপুরি দাস বানাতে সক্ষম হয় নি, যতদিননা সংস্কৃত কালেজ, গৌরমোহন আঢ্যের পথ বেয়ে, রামমোহন-দ্বারকানাথ জুটির সঙ্গত আর বঙ্গীয় 'মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণ ধুলার পরে' জাতীয় ঔপনিবেশিক কলক্কাত্তিয়া মধ্যবিত্ত নাট্যশালায় তালপাতার চটি আর খেঁটো ধুতি পরা বিদ্যাসাগরের প্রবেশ ঘটে নি আর সাংস্কৃতিক দাসত্বে গলায় গড্ডলের গলবন্ধ পরতে উন্মুখ বাঙালির জন্য কর্পোরেটিয় ট্রেভরিয়ান-মেকলে জুটি আসেন নি।
.
২। স্বাধীনোত্তরকালে অভীকবাবু তাঁদের যোগ্যতম উত্তরসূরী - আগামী কয়েক বছরের জন্য হয়ত - আনন্দবাজারের এই বঙ্গীয় দবদবা নিশ্চই থাকবে - শঙ্খ-সুনীল-শীর্ষেন্দু-স্বপ্নময় বানানো আর উচ্চজীবনযাত্রার স্বপ্ন দেখানো রাজনীতি থাকবে - অভীকবাবুর তৈরি করা দাসত্বের অনুরণন এত তাড়াতাড়ি মুছে যাবে না - এবাবদে অভীক সরকারের রণনীতি ট্রেভলিয়ন-মেকলে সূচক, বোধহয় তাঁর থেকেও বেশি - এবং তাঁর পদত্যাগটা যদি লোকদেখানো পরিবর্তন না হয় - দৈনন্দিনের মধ্যবিত্ত বাঙ্গালিকে ইওরোপ আমেরিকার দাস হওয়ার স্বপ্ন দেখানোতে অভীকিয় ক্ষুরধার(মধ্যবিত্তের ভাষায় -আর আমাদের ভাষায় গাড়োলিয়) বুদ্ধির ঘাটতি পড়বেই - এবং আনন্দবাজার এবং ইংরেজিশিক্ষিত দেরিদাফুকো কপচানো মধ্যবিত্ত সেই ঘাটতি অনুভব করবে আরও কিছু বছর পর। এটা আমি নিশ্চিত - আশাকরি ততদিন আমি আপনি বেঁচে থাকতে পারব - সেই আনন্দময় দুর্দশা চাক্ষুষ দেখতে

৩। এবং এই ঘটনাটার সঙ্গে চেপে থাকা মানুষের উত্থানের বড় যোগ থাকবে - থাকবেই।

জয় বাংলা!

Thursday, September 26, 2013

আমাদের ছোট নদীরা ছিল, সত্যিই১

প্রকৃতি বীরভূমকে অনেক দিয়েছিল। উন্নয়নের উত্তেজনায় আরও অনেক কিছু আদায় করতে গিয়ে সেই প্রকৃতিকে বিপন্ন করেছে মানুষ। এখন নদী অগভীর হয়েছে, তার বয়ে আনা বালিতে চাপা পড়ে যায় ধান খেত।
জয়া মিত্র 

২০০৪ সালে প্রথম যখন মল্লারপুরের গড়িয়া গ্রামে যাই, ঘরমোড়া কাঁদরের ওপরের কালভার্ট থেকে নদীর বুক ছিল প্রায় দেড় মিটার নীচে। এই সব ছোট ছোট জলধারাকে কাঁদরই বলে বীরভূমে। আর বলে জোড়। অধুনা মাসাঞ্জোর তো আসলে মশান জোড়-ই। শ্মশান-লাগোয়া ছোট কোনও জলধারা, যে কিনা ময়ূরাক্ষীতে এসে পড়ত। ময়ূরাক্ষীই বা কীসে! পুরনো কাগজপত্রে ইস্তক গেজেটিয়ারে এখনও নাম লেখা আছে ‘মর’ নদী। এলাকায় বসবাস করা সাঁওতালরা নদীর আয়তন দেখে বুঝি কোনও ভরা-বর্ষার দিনের নাম দিয়েছিলেন ‘মর’। তাদের হড় ভাষায় ওই শব্দের মানে বড় নদী। ‘মর’ থেকে ‘মোর’ হয়ে শেষমেশ স্বচ্ছতোয়া নদী নাম নিল ময়ূরাক্ষী।
সে মর হল বড় নদী। মাঝারি নদীই কি কম? অজয়, ব্রাহ্মণী, কোপাই, বক্রেশ্বর, দ্বারকা, হিংলো, বাঁশলই বীরভূমের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত জোড়া নদীনামের মালা। এঁরা হলেন সব রেজিস্ট্রি খাতায় নাম লেখানো নদী। আপাত রুক্ষ এই লালমাটির দেশে এত এত মাঝারি ছোট-মাঝারি নদীই বা এল কোথা থেকে? কর্ণের জন্মপরিচয় নিয়ে বিদ্রুপরত অর্জুনকে ভর্ৎসনা করতে গিয়ে এ প্রশ্নের খানিক হদিশ দিয়েছিলেন যুবরাজ দুর্যোধন ‘সন্ন্যাসীর কুল আর নদীর জন্মস্থান কেউ জানে না’। বীরভূম তল্লাটে কোনও তুষারশিখর নেই, হ্রদ নেই, নেই প্রকাণ্ড কোনও জলপ্রপাত। কোথা থেকে আসে এত নদীর জল?
হতে পারে যে, এ জল আসে মাটি থেকে? হতেও পারে হয়তো। বৃষ্টি তো তেমন কম নয় বীরভূমে, ঝরে পড়া জল নিজের নিয়মেই ঢালু দিকে চলে। বীরভূমে এই ঢালু দিকগুলি বড় সুন্দর। ঢেউ খেলানো উঁচু-নিচু কাঁকুরে মাঠ শুয়ে আছে গ্রানাইট আর ব্যাসল্ট পাথরে পিঠ রেখে। সছিদ্র কাঁকুরে সেই ঝুরো ল্যাটেরাইট মাটির ঠিক নীচে, শক্ত শিলাস্তরের ওপরে জমা হচ্ছে ঝরে পড়া সেই বৃষ্টির জলের ভাণ্ডার। বাকিটা গড়িয়ে গড়িয়ে আসছে এ পাশ ও পাশ হয়ে, নিচু জায়গা দিয়ে। চলতে চলতে সে জল আর একটু গভীর করে নিচ্ছে নিজের চলার পথ। ঝুরো মাটির মাঠ বেয়ে এ রকম অসংখ্য ছোট ছোট ধারা নামে বৃষ্টির পরই। দৌড়ে চলে লালমাটির কণা-কণা ভাসানো লাল জল। নিচু পথ যত গভীর হয়, উঁচু এলাকাগুলো রয়ে যায় অনড়, সুরক্ষিত।
হড় ভাষায় ‘বির্’ অর্থ জঙ্গল। সে নাম সার্থক করে শাল-মহুয়া-নিম-পড়াসি হাজার গাছের নীচে নীচে ঝোপঝাড়ের ঘন জঙ্গল। লতার আদিম বাঁধন। নানা রকমের ঘাস। মাটি পালিয়ে যায় তার সাধ্য কী। সেই মাটিকে দেখি আরও মাইক্রো লেভেলে বৃষ্টির আহ্লাদে আরও ছোট ছোট উঁচু-নিচু তৈরি করে চলছে আরও ছোট ছোট জলের ধারা, যেন পিঁপড়ে মাপের নদী। আর সেই সব জলের ধারা, যেখানে অনেক ক’জন মেলে, নিচু জায়গার মাটি ভাসিয়ে নেয়, সেখানে তৈরি হত খোয়াই। যেখানে জমি অত নিচু নয়, কিছু সমতল, কিছু তৃণাচ্ছাদিত, সে রকম জায়গায় এক একটি জমিতে নীচ থেকে জল বেরিয়ে আসছে। বক্রেশ্বরের মাটি ফেটে ওঠা গন্ধক গন্ধ প্রস্রবণের মতো নয়, বরং সদ্য কথা বলতে শেখা কচির আপন মনে বিড়বিড় করার মতো সামান্য চেহারায়। কিছুটা মাটি একটু কাদা-কাদা, গড়িয়ে আসছে নিতান্ত ক্ষীণ একটি ধারা। দেখে কোনও মতে বিশ্বাস হয় না এ পাঁচ হাতের চেয়ে বেশি দূর যাবে। কিন্তু সেই পাঁচ হাত, আট হাত চলতে চলতে দুর্জয় অশ্বত্থ চারার মতোই যত সামনে যাবে, বড় হতে থাকবে একটু একটু করে।

এই জন্মঘরই কাঁদর। কেবল বীরভূম নয়, এ রকমই জন্মঘর পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, পশ্চিম বর্ধমানের অনেক নদীর। যাদের গায়ে ঝুরো মাটি আর তার নীচে পাথর, মাটির নীচে লুকিয়ে পড়া জলকে যা পাতালে চলে যেতে দেয় না, উপরিতলের কাছাকাছিই ধরে রাখে। সব কাঁদর কাঁসাই, বরাকর, অজয় বা কোপাই হয় না। ম্যাপ মেললে দেখা যায়, এ সব নদীর প্রত্যেকের আশপাশে জালের মতো অসংখ্য ছোট ছোট গড়িয়ে আসা জলধারার ছবি আঁকা আছে। ওই মাটি, পাথর, জল আর গাছপালায় মিলে এমনই ছিল এই লালমাটি অঞ্চলের রূপসংস্থান। গাঙ্গেয় পলিমাটির স্তরীয় মসৃণতা থেকে ভিন্ন, রূপে স্বভাবে।