Showing posts with label ইওরোপমুখ্যতা অতিক্রম. Show all posts
Showing posts with label ইওরোপমুখ্যতা অতিক্রম. Show all posts

Sunday, May 20, 2018

ইওরোপকেন্দ্রিকতা বিরোধী চর্চা - ইওরোপবিদ্য ভাবনার শেষ বিদায়৩১ - ক্লদ আলভারেজ

সমাজ বিজ্ঞান পাঠ্যের বিবর্তন

ইওরোপমুখ্যতা অতিক্রম – নতুন  কাঠামো এবং পদ্ধতি বিষয়ক কিছু ভাবনা
চ) আমরা যদি সমাজবিজ্ঞানকে ঠিকঠাকভাবে নামকরণ করতে পারি তাহলে এগুলিতে স্বচ্ছতা আসবে। আমরা যদি অন্যান্য সমাজতত্ত্ব আলোচনায় সমাজতত্ত্বের ইওরোপিয় তত্ত্ব আলোচনার সময় সেটাকে ইওরোপিয় সমাজতত্ত্ব নাম দিই বা আমেরিকিয় তাত্ত্বিকদের কাজ পড়ার সময় আমেরিকিয় সমাজতত্ত্ব বলি তাহলে বোঝা যাবে। এটি জ্ঞানচর্চায় সমতা নিয়ে আসবে এবং পাঠককে মনে করিয়ে দেবে অন্যান্য জাতিবাদী বিজ্ঞানের মত ইওরোপিয় বিজ্ঞান চর্চা আদতে এথনোসায়েন্স, সেগুলো ইওরোপের জন্যে হয়ত ঠিক আছে, কিন্তু আমাদের জন্যে উদ্ভট এবং হাস্যকর।
ছ) এতদিন ধরে চলে আসা নৃতাত্ত্বিক বিভাগগুলি বন্ধ করে দেওয়া দরকার। যেহেতু প্রচুর মানুষ এই কাজে জুতে আছেন, এটা খুব তাড়াতাড়ি করা যাবে না, তাদের উল্টো-নৃতত্ত্বের(রিভার্স আন্থ্রোপলজি) পাঠ পড়ানো দরকার। ইয়োরোপের সমাজ সম্বন্ধে গবেষণা করতে আমাদের অইওরোপিয় জ্ঞানী প্রয়োজন। তাদের প্রাচ্যবিদ্যার মত আমাদের হাতে তৈরি ইওরোপবিদ্যা(Europology) দিয়ে আমরা যেভাবে ইওরোপিয়রা এবং বর্তমানে আমেরিকিয়রা সারা বিশ্বের ছড়িয়ে পড়ে প্রত্যেক সমাজ এবং পরিবেশে ঢুকে তাদের মত মাথা গলিয়ে বিশ্বকে অবাসযোগ্য দুঃস্বপ্নে ভরপুর করে তুলেছে তার বিরুদ্ধে আমাদের কি করনীয় তার পথ দেখতে পারব। ইওরোপবিদ্যা আমাদের বর্তমানের ইওরোপসৃষ্ট নানান অনাচার যেমন দক্ষতা আর উত্পাদনশীলতা ওপরে অসীম জোর, সমসত্ত্বতার দিকেও ঝোঁক, অর্থনীতিকে অতিরিক্ত প্রাধান্য দেওয়া, ব্যক্তিগত কৃতিত্বর ওপরে অতিনির্ভরতা, বিশ্বকে একদেহী (হোমোজিনিয়াস) করে তোলা, কৃষ্টিগত বৈচিত্রের ন্যুনতা(flatten cultural diversity), বিভিন্ন কারখানাসম বিদ্যালয়ে একই ছাঁচের মানুষ তৈরির উদ্যমের মত কৃষ্টিগতভাবে ঘৃণ্য এবং রাজনৈতিকভাবে প্রতারক বিষয়গুলির দিকে দৃষ্টি ফেরাতে সাহায্য করবে। অইওরোপিয়রাই বিশ্লেষণের কাজ হাতে নিলে সেটি ইওরোপিয় সমাজেরও কাজে আসবে। কিন্তু আমরা কেন এই দলদলে পা ঢুকয়ে নিজেদের ফাঁসাব? আমাদের কৃষ্টি আর ধর্ম বলেছে যন্ত্র দিয়ে নিজেদের মাপানোর কাজ না করিয়ে বাঁচার কি আনন্দ সেটা আমরাই জানি।
জ) বর্তমানে চলতে থাকা এবং গভীরভাবে প্রভাবশালী ইওরো-আমেরিকয় প্রত্যক্ষ্যবাদী পদ্ধতিকে প্রশ্ন করা দরকার। প্রয়োজনে তাকে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া দরকার। বিশ্ববিদ্যালয়কে জ্ঞানের সৃজনশীল কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা দরকার, যেটা মানব সভ্যতা আর অন্যান্য প্রজাতির প্রাণজগতের কাজে আসবে, যেখানে বিশ্বের বাস্ততন্ত্রকে শ্রদ্ধা করা হবে। প্রত্যেকের সঙ্গে সমভাবে আলোচনা করার উদ্যম নেবে বিশ্ববিদ্যালয়। এতে প্রত্যক্ষ্যবাদিতা উপে যাবে না ঠিকই, বা চুঁইয়ে পড়ার তত্ত্বর প্রভাব পুরোপুরি আটকানোও যাবে না, কিন্তু এটা শিক্ষার্থীরা মনে রাখবে চুঁইয়ে পড়া পদ্ধতির তুলনায় সৃষ্টিশীল পন্থাই পথ, না হলে আটকে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়।
ঝ) ক্ষমতাশালী অধ্যাপকেদের লেখা পাঠ্য পুস্তক আর প্রকাশনা সংস্থাকে খুব তাড়াতাড়ি বর্জন করা দরকার। বৌদ্ধিক পড়াশোনার শ্রেণী নিজের পাঠ্যপুস্তক রচনা করুক, নিজেদের সমাজের জ্ঞানচর্চার পথ নির্ধারণ করুক, অবশ্যই সমালোচনার দৃষ্টিতে, কিন্তু নিজের দৃষ্টিভঙ্গী অবলম্বন করে। ফরাসি, জার্মান বা আমেরিকিয়রা এই কাজটি করতে পারে, তাহলে পদ্ধতিগতভাবে কেন আমরা করতে পারব না? এটা যদি তাদের অধিকার হয়, তাহলে এটা আমাদেরও অধিকার। আমরা নিজেরা নিজেদের পাঠ্য পুস্তক রচনা করলে, বাজারে বন্যার মত ছেয়ে যাওয়া পশ্চিমী পদ্ধতিতে লিখিত বইএর হাত থেকে মুক্তি মিলবে।
ঞ) গবেষণার পদ্ধতিটা বক্তৃতা আর পাঠ্যপুস্তক নির্ভর না হয়ে অনেক বেশি আলোচনা সাপেক্ষ এবং নানান ধরণের মাধ্যম নির্ভর হওয়া দরকার। আমাদের সময় পাঠ্যপুস্তক জ্ঞানের অপকর্ষ হিসেবে বিবেচিত হয়ে রয়েছে। আধুনিক সময়ের বিশ্ববিদ্যালয়ের উপজাত এগুলি। আমাদের সমাজগুলি যেমন কোরাণ বা মহাভারত থেকে কোন বছরের পর বছর নানা জ্ঞান গ্রহণ করে চলেছি, তেমনি এইগুলোকেও একইভাবে চিকিৎসা করা দরকার নেই, এগুলোকে প্রশ্ন করা দরকার। বরং এই ধ্রুপদী পাঠ্যগুলি আমাদের শ্রেণীর মৌলিক পাঠ্য হওয়ার দরকার, এগুলিকে নিয়ে শ্রেণীতে বিশদ আলোচনা করা দরকার।
চ) পশ্চিমি সমাজবিজ্ঞানী, পেশাদারদের আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় এসে অবাধে গবেষণা করার সুযোগ বন্ধ করে দেওয়া উচিত, যদি না তারা সমাতরালভাবে তাদের সমাজে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে আমাদের গবেষকদের কাজ করার সুযোগ করে দেয়।
ছ) পশ্চিমি সমাজ ও জ্ঞানচর্চাকে সর্ব্ব্যাপী(inclusive) করে তুলতে হবে, এই ধারণা থেকে খুব তাড়াতাড়ি বেরিয়ে আসা দরকার। কারণ এতে তারা অপশ্চিমি জ্ঞানচর্চাকে তাদের নিজেদের ঘাটতিওয়ালা জ্ঞানচর্চায় প্রবেশ করিয়ে তাদের জ্ঞানচর্চার প্রসার বাড়াবে এবং পশ্চিমের চলতি কাঠামো আরও প্রভাবশালী হয়ে উঠবে। এতে তাদের উন্নতি হবে, তাতে আমাদের কি, তারা তো আর আমাদের জ্ঞানচর্চার বিস্তার ঘটাবে না।

এখানে ওখানে খুটুর খাটুর করে সারাই করা পাঠ্যক্রম কোনভাবেই আমাদের শিক্ষাকেন্দ্রিগুলির ইওরোপকেন্দ্রিকতা থেকে বের হয়ে আসার নিদান নয়। ইওরোপকেন্দ্রিক সমাজবিজ্ঞান এবং ইওরোপিয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলি থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা আমাদের নতুন শুরুয়াতের রক্ষাকবচ হয়ে উঠতে পারে। 

ইওরোপকেন্দ্রিকতা বিরোধী চর্চা - ইওরোপবিদ্য ভাবনার শেষ বিদায়৩০ - ক্লদ আলভারেজ

সমাজ বিজ্ঞান পাঠ্যের বিবর্তন

ইওরোপমুখ্যতা অতিক্রম – নতুন  কাঠামো এবং পদ্ধতি বিষয়ক কিছু ভাবনা
ক) সমাজ বিজ্ঞানে বিশ্বাসযোগ্য এবং অর্থপূর্ণ অইওরোপমুখ্যার কাঠামো তৈরির দিকে অগ্রসর হওয়ার প্রাথমিক কর্মপদ্ধতি হল, বৌদ্ধিকভাবে বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলির পাঠ্যক্রমে চালু ইওরোপমুখ্য জ্ঞানচর্চাগুলির তাত্ত্বিক অবস্থান থেকে বেরিয়ে আসার কর্মপদ্ধতি নির্ণয় করা। স্বাভাবিকভাবেই এই অইওরোপিয় পাঠ্যক্রম তৈরির ক্ষেত্রে সব থেকে সোজা পথ হল সমাজতত্ত্ব, মনোবিদ্যা এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানের মত সাম্রাজ্যবাদী ইওরোপমুখ্যতায় ভরপুর জ্ঞানচর্চাগুলি প্রাথমিকভাবে বাদ দিয়ে খুব সহজেই যেগুলিতে পরিবর্তন আনা যায় যেমন ইতিহাস, সাহিত্য ইত্যাদিগুলিতে মনোনিবেশ করা। আমাদের মনে রাখা উচিত পশ্চিমি জাতিবিজ্ঞানকে মূলস্রোতের বিজ্ঞানের পাঠ্যক্রম হিসেবে গণ্য না করা। আমাদের নিজেদের উচিত কৃষ্টি নৈতিকতা এবং পরিবেশ এবং জীবন বিষয়ে গবেষণা কর্ম, পদ্ধতি এবং প্রণালীতে কৃষ্টির শেকড় নির্ভরতা এবং কৃষ্টিতে গ্রহনযোগ্য ধারনাগুলি কি হতে পারে সেগুলি গভীরভাবে আলোচনা। আমরা সমআলোচনার মাধ্যমেই দেশিয় বৌদ্ধিক পরম্পরার সঙ্গে যুক্ত হব। আফ্রিকিয়, মাওরি, অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীরা প্রত্যেকেই ইওরোপমুখ্যতাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছেন, তাদের কর্মকাণ্ড আমাদের আলোচনা করা দরকার। এ বিষয়ে আমাদের পথ দেখাতে পারেন পাকিস্তানি উপনিবেশ বিরোধী আন্দোলনের বৌদ্ধিক চর্চক ইকবাল আহমেদ এবং তাঁর খালদুনিয়া বিশ্ববিদ্যালয় তৈরির ভাবনা। বিকল্প বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারনায় পেরুর PRATEC, the Andean Project for Peasant Technologies (Proyecto Andino para las Tecnologías Campesinas)  অথবা Universidade de la Tierra in Oaxacaয় মিলবে। এই ধারনাগুলি বয়ে যেতে দেওয়া ঠিক হবে না।
খ) বৈকল্পিক আলোচনা/বিতর্ক শব্দটাই বিভ্রান্তিকর। কারণ এটি আদতে আমাদের তথাকথিত মূলস্রোতের দিকে টেনে নিয়ে যাওয়ার কাজ করে। আমরা যদি আহরণমূলক, ব্যতিক্রমী না বলে যদি বহুত্ববাদী আলোচনা বা প্রতর্ক শব্দবন্ধটা ব্যবহার করি তাহলে কিছুটা কাছাকাছি পৌঁছতে পারব হয়ত। এটাকে নৈতিকভাবে দেখা দরকার। এই পদ্ধতিতে হয়ত আমরা সমাজ বিজ্ঞানের হাজারো ফুল ফোটাতে পারব।
গ) আমাদের অইওরোওপিয় অআমেরিকয় বিশ্ববদ্যালয়ের বা কৃষ্টি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত বৌদ্ধিক এবং পাঠ্যজগতের মানুষদের, এই ভাবনা চিন্তা বদলের কাজে অংশগ্রহণ না করিয়ে আমাদের দেশজ বিদ্বানদের নিয়ে কাজ করা দরকার। সিঙ্গাপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ব বিভাগ দারুণ কিছু কাজ করেছে ভারতীয় এবং ফিলিপিন্সের বিদ্বানদের নিয়ে এসে। Linda Tuhiwai Smith এবং অন্যান্য মাওরি গবেষক এ বিষয়ে অনেক দূর এগিয়েছেন। পশ্চিমি বিদ্যাচর্চার পরম্পরা থেকে পাঠ নকল না করে, আমাদের নিজেদের বিদ্যাচর্চার পরম্পরায় মনোনিবেশ করা দরকার।
ঘ) প্রাথমিকভাবে গবেষণা বা প্রবন্ধ লেখায় প্রায়োগিকভাবে পশ্চিমি ঔপপনিবেশিক লেখকদের উদ্ধৃতি, বইএর নাম ইত্যাদি ব্যবহার না করা দরকার। শুরুর দিকে এই কাজটা যদি ঠিকভাবে না করা যায় তাহলে পশ্চিমি বিদ্বানদের থেকে উদ্ধৃত বাক্য ব্যবহারের হার কমিয়ে দিয়ে দেশিয় বিদ্বানদের কাজ নিয়ে আলোচনা করতে হবে।

ঙ) ছাত্রছাত্রীদের শুধুই উদ্ধৃতিকন্টকিত গবেষণা লেখায় উতসাহিত না করে কিভাবে উদ্ধৃতি ব্যতীত গবেষণায় মনোনিবেশ করা যায় যে বিষয়ে তাদের ভাবনাচিন্তাকে প্রবাহিত করাতে হবে। আজকের দিনের বৈদ্ধিক জগত অন্যের কাজ ব্যবহার করা ছাড়া কোন গবেষনাই শেষ করতে পারে না। পূর্বধারণাছাড়া দর্শনশাস্ত্রীয় কাজ ব্যর্থ হবে(No doubt presuppositionless philosophizing failed)। কিন্তু উদ্ধৃতিকন্টকিত ব্যতীত গবেষণা সে কাজ করে না। মহত্মা গান্ধী ৯০ খণ্ডের লেখা সংগ্রহে কোথায় উদ্ধৃতি ব্যবহার হয়েছে খুঁজে দেখতে হয়। বিশ্বের সব থেকে শুদ্ধতম লেখা – সাহিত্যে কোন উদ্ধৃতিকন্টক নেই। সত্যের ঠেকনা দরকার হয় না। আপনি যদি আপনার জ্ঞান আর অভিজ্ঞতা ছাড়া কোপ্ন কাজ করতে অক্ষম হন তাহলে আপনি যতই উদ্ধৃতি ব্যবহার করুণ, সে কাজ ব্যররত্রহ হবেই।