Showing posts with label পলাশীপূর্ব বাংলার আর্থ-ব্যবস্থা. Show all posts
Showing posts with label পলাশীপূর্ব বাংলার আর্থ-ব্যবস্থা. Show all posts

Thursday, September 14, 2017

বাংলা যখন বিশ্ব সেরা - পলাশীপূর্ব বাংলার আর্থ-ব্যবস্থা৪

আবার ফিরি নবাবি আর্থব্যবস্থায়। চালানি টাকা ও মাদ্রাজ টাকার মধ্যে বিনিময় হার বেড়ে যাওয়ায় ব্রিটিশ কোম্পানির বেশ ক্ষতি হচ্ছিল। বাংলাদেশে রূপো এনে জগতশেঠেদের কাছে বিক্রি করতে হত। ডলার রূপোর ২৪০ সিক্কা ওজনের জন্য তারা পেত ২০১-২০৬.৫ চালানি টাকা। অথচ মাদ্রাজে তারা পেত ২১৮ চালানি টাকা। এবং বাংলায় টাঁকশালে বাটা দিয়ে ছাপাতে পারলে তারা পেতে পারত ২৩৩ চালানি টাকা। কিন্তু জগতশেঠেদের বাধায় তারা সে লাভ করতে পারত না।

ফলে ইংরেজরা সুজার সময় রূপো আনা কমিয়ে দিয়ে বেশি করে মাদ্রাজি টাকা বাংলা বাজারে আনতে থাকে। তাতে টাঁকশালের রাজস্ব কমে গেল এবং রূপোর অভাবে রূপোর সিক্কা টাকা তৈরি হওয়ার অসুবিধে দেখা দিল। ১৭৩১/১১৩৮এ সুজা বাংলার বাইরের সমস্ত বিদেশি টাকা অবৈধ ঘোষণা করলেন। শুধু তাদের ধাতুগত মূল্য স্বীকার করবেন কথা হল। আর চালানি টাকা আর আর্কট টাকার মধ্যে বিনিময় বাটা সুজাউদ্দিনের আগে ছিল ৩.৫ – ৪.৫ শতাংশ(যদিও তাদের ধাতুগত মূল্যে পার্থক্য ছিল ০.৫৬ শতাংশ)। তিনি তা বাড়িয়ে ৭.৫ শতাংশ করে দিলেন। ১৭৩৭এ উপদেওয়ান আলমচাঁদকে ইংরেজদের গত পাঁচ বছরে বাংলায় আনা সোনা রূপোর হিসেব দাখিল করতে বললেন। ইংরেজরা এই হিসেব দাখিল করতে বাধ্য হয়েছিল। নতুন বিনিময়ের হারে কর্পোরেট কোম্পানিগুলো বিপদে পড়ল। বাংলার ব্যবসায়ী আর মহাজনেরা জগতশেঠেদের অঙ্গুলি হেলনে মাদ্রাজ/আর্কট টাকা নিতে না চাওয়ায়, এ টাকার দাম আরও পড়ে গেল। ফলে ইংরেজদের আরও বেশি করে রূপো আনতে হল। নতুন বিনিময় হারে মাদ্রাজ টাকা এনে লাভ নেই।

জন কোম্পানির বাংলাদেশে মাল কিনতে যে সোনা রূপো নিয়ে আসত, সেটা এদেশিয় টাকায় রূপান্তরিত করার তিনিটে পথ ছিল বলছেন কীর্তিনারায়ণ চৌধুরী, দ্য ট্রেডিং ওয়ার্ল্ড অব এশিয়া এন্ড দ্য ইংলিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বইতে। প্রথমত সোনা রূপো এদেশের টাঁকশালে দিয়ে টাকা নেওয়া। এটার প্রধান অসুবিধে হল এই কাজে বেশ সময় লাগে – ফলে প্রয়োজনমত টাকার যোগান পাওয়ায় অসুবিধে হয়। আর নবাবদের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হলে গোটা দামি ধাতুই নবাবের কোষাগারে চলে যায়। এদেশি বণিকেরা টাঁকশাল কর দিয়ে টাকা ছাপানোর অধিকার ভোগ করত, কিন্তু সে অধিকার ছিল না বিদেশিদের। পরের অদ্ধতি হল সোনা রূপো এনে জগতশেঠেদের গদিতে দিয়েতাদের নির্ধারিত দামে টাকা সংগ্রহ। এটা তাড়াতাড়ি ঘটত। কিন্তু বিনিময় হার ব্যাঙ্কারদের হাতে থাকায় ইওরোপিয়রা ক্ষতিগ্রিস্ত হত। তৃতীয় পদ্ধতি হল বাংলার বাইরে তাদের নিয়ন্ত্রিত টাঁকশালের টাকা এনে বাংলায় ব্যবহার – যা তারা সুজার সময় করেছিল রূপো আনা কমিয়ে। কিন্তু চালানি টাকা আর বাংলার বাইরের টাকার বিনিময়ের হাত নির্ধারিত করত ব্যাঙ্কারেরা। সুজার পরে আবার দ্বৈত পদ্ধতি শুরু হয়।

বাংলার ব্যঙ্কিং ব্যবস্থায় হুজুরুমল, জনার্দন শেঠ, বানারসী শেঠ, রামকিষেণ শেঠ, আনন্দিরাম ও শ্রীকৃষ্ণ প্রভৃতি ব্যাঙ্কারেরা ছিল, কিন্তু এদের মধ্যমণি ছিল জগতশেঠ। এদের কাজ ছিল টাকার বিনিময় করা, হুণ্ডিকাটা, আমানত নেওয়া, দুদে টাকা ধার দেওয়া, টাকার বিনিময় করা এবং বিভিন্ন ব্যবসায় লিপ্ত থাকা। এদের রাজনৈতিক যোগাযোগ ছিল অভূতপুর্ব যা এর আগে কিছুটা আলোচনা করা গিয়েছে।

বাংলা যখন বিশ্ব সেরা - পলাশীপূর্ব বাংলার আর্থ-ব্যবস্থা৩

যতদিন মুর্শিদকুলি খাঁএর টাঁকশালের বিশ্বস্ত দারোগা রঘুনন্দন বেঁচেছিলেন ততদিন নবাবের খাজাঞ্চিখানার চাবি জগতশেঠ পদবিধারী ফতেহচাঁদের পরিবারের কব্জায় থাকলেও, তাঁরা টাঁকশালের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ পান নি। রঘুনন্দন যখন মৃত্যুশয্যায়, সে সময় দিল্লি থেকে ফারুফশিয়রের ফরমান আনিয়ে ইংরেজরা বাঙলা সুবায় টাঁকশাল চালানোর অধিকারের জন্য জোর দরবার শুরু করে। ইংরেজেরা ফারুখশিয়রের থেকে ১৭১৭/১১২৪এ বাংলার টাঁকশাল ব্যবহারের অনুমতিপত্রে বলা ছিল ইংরেজদের মাদ্রাজ টাকার ওপর বাংলার টাঁকশাল কোন বাটা নিতে পারবে না। মুর্শিদকুলি, জগতশেঠ ফতেহচাঁদের সক্রিয় বিরোধিতায় এই ফরমান লাগু করা যায় নি। কারণ এরাই দেশের একচেটিয়া সোনা রূপোর ক্রেতা। অভূতপূর্ব লাভ। সেজন্য বিদেশিদের টাঁকশালের অধিকার দিতে চাইত না।

রঘুনন্দনের মৃত্যুতে টাঁকশালের আশায় থাকা ইংরেজরা দেখলেন, নবাবি কারসাজিতে ইংরেজদের বঞ্চিত করে ফতেহ্চাঁদ সেই ফরমান পেয়ে গিয়েছেন। আগেই বলেছি শতকরা মাত্র দু থেকে আড়াই টাকা হারে বাজার থেকে তারা পুরোনো সিক্কা কিনতেন। বাজার থেকে জনগণের কাছ থেকে পুরোনো মুদ্রা বা অন্য প্রদেশের মুদ্রা এনে টাঁকশালের ছাপ মেরে নতুন সিক্কা বানাতেন। ইংরেজরা তাদের দেশ থেকে আনা সমস্ত রূপো ফতেহ্চাঁদদের পরিবারে বেচতে বাধ্য হত।

১৭৪০এর পর থেকে হিন্দুকুশ থেকে সুরাট বন্দর হয়ে দেশি বণিকের হাতে সোনা-রূপো আসা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ইংরেজদের আনা টন টন রূপো বাঙলায় টাঁকশালে জগতশেঠের প্রভুত্বের বলয়ে ঢুকে পড়ত। আদতে মুর্শিদাবাদের নবাবেরা পুরোনো বছরের মুদ্রায় খাজনা নিতেন না। অর্থাত বিগত বছরের ইংরেজদের মাদ্রাজের টাঁকশালের তৈরি আর্কট মুদ্রা বাজারের অন্যান্য সাধারণ পণ্য দ্রব্য হয়ে চড়া বা মন্দায় উঠত পড়ত। বাজারের অন্যান্য পণ্যেরমতই এই ভূতপূর্ব বছরের টাকা বা সনওয়ত ডিসকাউন্টে কেনা বেচা হত। এই বাটা ছিল জনতার ওপর অদৃশ্য কর। এইভাবেই আর্কটের দাম কমিয়ে দিয়ে, মুদ্রা বিনিময়ের হার নিয়ে ব্যবসা করার জন্য সরকার জগতশেঠদের ইজারা দিত টাঁকশালের। জগতশেঠেরা এর জন্য জনগণের কাছ থেকে তোলা ট্যাক্সের এক বড় অংশ নবাবকে দিত থোক টাকা হিসেবে। টাঁকশালের কর্তৃত্ব হাতে নিয়ে ফতেহচাঁদ পুরোনো মুদ্রা কিনে নিয়ে তা গলিয়ে ছাপ মেরে পুরো দামে বাজারে ছাড়তেন। আর অন্যান্য সাধারণেরমতই বাটা দিয়ে আর্কট বা অন্য মুদ্রা ফতেহচাঁদদের কাছে বিক্রি করে প্রত্যেক বছর বাণিজ্যের জন্য সিক্কা সংগ্রহ করতে হত ইংরেজদের। ফতেহ্চাঁদ পরিবার মুদ্রার বিনিময় নিয়ন্ত্রণ করত বলে ইংরেজরা বছরের পর বছর তাদের টাকা তৈরি করতে খাজনা দিতে বাধ্য হত।

তবে জগতশেঠেরা শুধুই বাঙলার সরকারের সরাফ ছিলেন না, তারা দেশি বিদেশি সব বণিকদেরও মহাজন ছিলেন। ১৭৪০ পর্যন্ত ইংরেজরা তাদের কাছ থেকে ১২শতাংশ হারে ধার করত। ৪১সাল থেকে তা কমে ৯ শতাংশ হয়। মধ্য এশিয়ার তুরানী বণিক, বসরা, জেদ্দা, মোখায় রপ্তানি করা আরমানী বণিক, ইংরেজ ওলান্দাজ, ফরাসিরা সকলেই তার দেওয়া ধারে আর হুন্ডিতে ব্যবসা করত। হুন্ডি চলত আভ্যন্তরীণ বাণিজ্যেও। দেশ-বিদেশের বাণিজ্যে তাদের পরিবারের এই দবদবার কারণ ছিল দিল্লির দরবারে তার পকড়। পারিবারিক জগতশেঠ উপাধি স্বয়ং দিল্লির বাদশাহের দান, বাদশাহের পাশে বসা বাদশাহের প্রধাণ প্রতিনিধি, নবাব নাজিমের ঠিক পাশেই জগতশেঠ ফতেহচাঁদের স্থান ছিল। তার জীবতকালেই পুত্র আনন্দচাঁদ মারাগেলে দুই নাতি কুঠির কর্তৃত্ব পান। ১৭৪৩এ কুঠি প্রধান হন জগতশেঠ মহতাব রায় আর তার খুড়তুতো ভাই সহযোগী মহারাজ স্বরূপচাঁদ। আহমদশাহ স্বয়ং মহাতব রায়ের জগতশেঠ উপাধি অনুমোদন করেন। দেশের যত ছোটবড় সরাফ যা বাটা নেন তা ঠিক হয় জগতশেঠএর কুঠিতে। যারা আলাদা হয়ে ব্যবসা করতেন বা তার কুঠির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না তাদের কুঠিতে লাল বাতি জ্বলে।

প্রবাদ রয়েছে মারাঠী দস্যু মির হাবিব জগতশেঠদের কুঠি থেকে ২ কোটি টাকার আর্কট রূপাইয়া লুঠ করে নিয়ে যায়। সে সময়কার ঐতিহাসিকেরা বলছেন লুঠের পর এই দুই ভাইএর লোকসান হল যেন দুআঁটি খড় চুরি হয়েছে। দিল্লিতে চড়াও হয়ে যখন আহমদশাহ আবদালি লুঠপাঠ করছেন, তখনও দেওয়ানই-আমের দরবারে কাবুলি নরপতির কাছে সম্মানিত লোক জগতশেঠের উকিল, কেননা আমীর ওমরাদের কাছ থেকে যে টাকা আদায় করা হচ্ছে তার জামিন হতে পারেন একমাত্র জগতশেঠ।

বাংলা যখন বিশ্ব সেরা - পলাশীপূর্ব বাংলার আর্থ-ব্যবস্থা২

নবাবী আমলের শহুরে নবাবী আর্থব্যবস্থা বুঝতে জগৎশেঠেদের কাজকারবারে উঁকি দেওয়া জরুরি। কোন জগত শেঠ? যাদেরকে ইংরেজপন্থী বাঙালিরা বাঙলার রথসচাইল্ড নাম দিয়ে আজও কটুতম আত্মপ্রসাদ লাভ করে। জগতশেঠদের কাজকর্মই আদতে তখনকার রাজন্য বাঙলার অর্থনীতি। ফরাসিদের ধারণা ছিল জগতশেঠ ভাইরাই পলাশি চক্রান্তের মূল জন্মদাতা, তাদের ছাড়া ইংরেজরা পলাশির চক্রান্তেরমত হঠকারি-গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে পারত না। পলাশি উত্তর সময়ে আমীরচাঁদকে ক্লাইভ জোর করে তীর্থে যেতে নির্দেশ দিয়ে মালদায় নদিতে বিসর্জন দিলেন, আমীরচাঁদ মারা গেলেন অমৃতসরে তীর্থ করার অপূর্ণ বাসনা নিয়ে।

সিক্কার তুলনায় আর্কট(দক্ষিণ ভারতের টাকার নাম। সে এলাকায় টাকা ছাপা নিয়ন্ত্রণ করত ইংরেজরা। মাদ্রাজে সে সময় টাঁকশাল চালাচ্ছিল তারা)এর দাম বা নানান ভারতীয় মুদ্রার সঙ্গে বাঙলার টাকার দাম কত হবে তা নিয়ন্ত্রণ করতেন জগতশেঠেরা। ওলান্দাজ আর ফরাসি ব্যবসায়ীরা সকলেই জগত শেঠের গদির নিয়ন্ত্রণে ব্যবসা করত। বাঙলার বাণিজ্যে ইওরোপ থেকে আসা সব সোনা-রূপোই কিনত জগত শেঠ। টাঁকশালে টাকা বানিয়ে সুবিধামত বাজারে ছেড়ে তা দিয়ে মুদ্রার বিনিময় ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করতেন শেঠ ভাইরাই। নবাবের দরবারে রেসিডেন্ট বসিয়েও জগত শেঠের সাম্রাজ্য সিরাজ হত্যার আগে ভাঙতে পারেনি ইংরেজরা। মির কাসেমকে মসনদে তুলে ইংরেজরা প্রথমেই যে পরোয়ানা জারি করে তা হল, জগতশেঠরা যেন কলকাতার সিক্কার ওপর বাটা না চায়।

জগতশেঠ পরিবারের বাতসরিক আয়ের পরিমানের একটা ধারণা হতে পারে, পলাশির চক্রান্তের পরে মুর্শিদাবাদ থেকে কর্নেল ক্লাইভকে জগতশেঠের ব্যবসার বাৎসরিক আয়এর একটা সমীক্ষা পেশ থেকে,
on the revenue at 10% Rs।10,60,000,
interest from zamindars at 12% rs।13,50,000,
on reconing rs।50lskhs at 7% rs।3,50,000,
interest on rs।40lakhs at 37।5% Rs।15,00,000,
interest on batta on exchange rs।7,00,000,
Rate Rs।7 to 8 lakhs;
toal – rs।49,60,000

সবমিলিয়ে প্রায় ৫০ লক্ষ টাকার কাছাকাছি। ঐতিহাসিকেরা বলছেন, যাদের বছরের আয় আধ কোটি টাকা, তাদের মূলধন সে সময়ে পাঁচ বা ছ কোটি বা তারও অনেক বেশি টাকা হওয়া অসম্ভব নয়। গোটা বাঙলার খাজনার দুই তৃতীয়াংশ জগতশেঠের কুঠিতে জমা পড়ত আর নবাব সরকার জগতশেঠের কুঠির ওপরই বরাত(ড্রাফট) দিতেন। কোম্পানির ইংরেজরা জগতশেঠদের অর্থনীতির এই ব্যবস্থাকে নাক উঁচু করে বলত একচেটিয়া ব্যবসা। যে কোম্পানি নিজেই বাঙলায় তার দেশের হয়ে একচেটিয়া ব্যবসা চালাচ্ছে, ছুঁচ আবার চালুনির ছিদ্রের সমালোচনা করে!

সে সময় সায়ের বা শুল্ক যথেষ্ট কম থাকায়, জগতশেঠদেরমত ব্যবসায়ীদের কোষাগারে বেশি অর্থ জমত। নানান সময়ে তারা নবাবকে অর্থ সাহায্য করে, নজরানা দিয়ে নবাবের দরবার থেকে জগত শেঠ বা ফকরিতুজ্জর খেতাবও অর্জন করেছিল। ইংরেজরা ভারতীয় প্রশাসনিক ঘাঁতঘোঁত রীতিনীতি না বোঝায় যে কর্মকাণ্ড পরে বিদেশি ব্যবসায়ীদের উতকোচ বলে মনে হত – ঠিক যেমন ফাউ মানে এক্সট্রা নয় তার বেশি অনেক কিছু। ব্যবসায়ী শেঠেরা প্রায় নবাবেরমতই ঠাটেবাটে থাকতেন। কেমন ঠাটবাট? তাদের মত ব্যবসা করা খ্বাজা ওয়াজিদের সম্পদ বিষয়ে মন্তব্য করা যাক - হাতিশালে ১৫টি হাতি, ৫০টা ঘোড়া, হারেমে ১৫০ জেনানা, ১৫ চোপাদার, ২০০ চাকর – ৫টা জাহাজ আর ২০০০ নৌকো। তার তুলনায় ইংরেজ গভর্নর তো নিষ্প্রভই থাকতেন। আলিবর্দির শাসনের শেষের দিকে জগতশেঠ পরিবারের দুই ভাই, পাটনার আমীরচাঁদ আর দীপচাঁদ এবং হুগলির খ্বাজা ওয়াজিদ বাঙলার ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করতেন। সোনারূপা, হুন্ডি, টাকাপয়সার ব্যবসা করতেন তাদের মাথা ছিলেন আমির চাঁদ। পাইকারির ব্যবসার রাজা ছিলেন খ্বাজা ওয়াহিদ।

নবাবি আমলে মুর্শিদাবাদ থেকে আমিল পাঠিয়ে জমিদারির খাজনা আদয় করা হত। সাধারণতঃ জগত শেঠেদের দেওয়া কর্জের মাধ্যমে ঠিক সময়ে জমিদারেরা খাজনা জমা করতেন। মুর্শিদকুলি খানের আমল থেকেই বৈশাখের প্রথম দিনে পুণ্যাহের সময় জমিদারেরা বা তার উকিলেরা মুর্শিদাবাদে পৌঁছে যেতেন। হান্টার বলছেন তারা জমায়েত হতেন জগতশেঠের কুঠিতে – নবাবি দরবারে কিন্তু নয়। সেই সভায় নবাবকে আগের বছরের আয় ব্যয়ের পাই পয়সা হিসেব নিকেশ দিতে হত। তারপর বাটার দরাদরি করে জমিদারেরা টাকা ধার করতেন শেঠদের কাছ থেকে। সেই কারবারে শেঠ পরিবার, নবাব সরকারকে জমিদারের খাজনার খাতে টাকার পাট দিতেন, ভাগ পেতেন দশ শতাংশ হারে, যার নাম পাটোয়ান। সেই খাজনা জগত শেঠের হুন্ডির মাধ্যমে বাদশাহী নজরানা রাজধানীতে পৌঁছে যেত। তখন জগত শেঠের কুঠিই বাদশাহী তোষাখানা। জমিদারি কিস্তি আর মুর্শিদাবাদে বড় আর রাজমহলে ছোট টাঁকশাল নিয়ন্ত্রণ করে জগত শেঠেরা বাঙলা সুবার অর্থনীতির ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছেন। কর্তৃত্ব এতদূর পৌঁছেছিল যে বাঙলার অথবা নবাবের টাঁকশালের চাবি নবাবের হেফাজতে না থেকে থাকত জগতশেঠদের ট্যাঁকে।

বাংলা যখন বিশ্বসেরা - পলাশীপূর্ব বাংলার আর্থ-ব্যবস্থা১

মুর্শিদকুলি খাঁ যখন বাংলায় এলেন তখন রাজমহল আর ঢাকায় দুটো টাঁকশাল। ১৭০৮/১১১৬য় রাজমহলের টাঁকশালটা তিনি মুর্শিদাবাদে আনলেন।

সোনার টাকা মোহর নামে পরিচিত। সোনার মোহরের সঙ্গে রূপোর টাকার বিনইময় মূল্য ছিল চৌদ্দ থেকে ষোল সিক্কা(সেই জন্য কি আমি অন্তত আমার বাল্যকালে কথ্য ভাষায় ষোল সিকি কথাটা শুনতাম)। সোনার টাকা ছিল মূলত রাজস্ব, উপঢৌকন, উপহার বা সঞ্চয়ের জন্য। রূপোর টাকা(যেখান থেকে রূপিয়া) প্রায় ১০০ ভাগ খাঁটি। সিক্কা টাকা বাজারে সরকারের ছাপমারা টাকা। তামার পয়সার নাম দাম। এক রূপোর টাকা সমান চল্লিশ দাম। শতাব্দের শুরুতে তামার দামকে প্রতিস্থাপিত করল ব্যপ্তভাবে কড়ি, বলা দরকার কড়ি ছিলই বহুকাল থেকেই, কিন্তু তামার মুদ্রা এই প্রথম বাজার থেকে হঠে গেল। বাংলাকে যেহেতু তামা সরবরাহের জন্য ডাচেদের ওপর নির্ভর করতে হত, তাই কড়ি হল বৈধ খুচরো মুদ্রা। এক টাকা সমান ৩২ পণ কড়ি(২০ গণ্ডায় এক পণ)।

বাংলায় ব্যাঙ্কিংএ হরিশ চন্দ্র সিংহ লিখছেন, বাংলা বাজারে সারা ভারত থেকে বহুরকমের মুদ্রা আসত। আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর সারা ভারতে অনেকগুলো স্বাধীন রাজ্য স্থাপিত হয়েছিল। তারা নিজেরাই মুদ্রা চালু করেছিলেন। সেই কয়েকশ ধরণের মুদ্রা নানান মাপের নানান দামের নানান ওজনের। মুঘলদের টাকার আকৃতি আর ওজনও ছোট হয়ে গেল। বাংলা ছাড়া দক্ষিণ আর পশ্চিম ভারতে ইংরেজ, ফরাসি, ওলান্দাজেরা নিজের নিজের টাকা ছাপাত। বাংলার বাজারে আর্কটের প্যাগোডা, ইংরেজ ফরাসি আর ওলান্দাজদের আর্কট, সুরাট বোম্বাই, কাশী আর অযোধ্যার টাকাও আসত। বাংলা বাজারে সে সময় ভিন্ন আকৃতি আর ওজনের বত্রিশ রকমের মুদ্রার খবর পাওয়া যায়। শুধু আন্তর্জাতিক ব্যবসাই নয় আন্তঃরাজ্য ব্যবসার লাভের গুড় দেখাগিয়েছে বাংলার পক্ষেই থাকত। ফলে সক্কলে বাংলার সঙ্গে ব্যবসা করতে চায় – তাই প্রচুর মুদ্রা। বাংলার কেন্দ্রিয় ব্যাঙ্কিং পরিবার জগতশেঠেরা এই বিনিময় হার ঠিক করত, এছাড়াও দেশ জোড়া মুঘলদের বিভিন্ন টাঁকশালের মুদ্রাও অভিন্ন ছিল না। ঢাকা, পাটনা, কটকের টাকা মুর্শিদাবাদের টাকার সমান বিনিময় হার ছিল। বাংলায় প্রচুর পোদ্দার, স্রফ মুদ্রা বিনিময় ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিল। জগৎশেঠ পরিবারের সঙ্গে তাদের ব্যবসা ছিল। যারা তাদের বিরোধিতা করত বা সমান্তরাল আর্থিক লেন্দেন চালাত তারা বাজার থেকেই বার হয়ে যেত।

বাংলায় চালু ছিল চালানি টাকা। কোন কাল্পনিক টাকা নয়, সব ধরণের টাকার বিনিময় ঠিক হত এর মাধ্যমে – এই টাকার কোন ক্ষয় নেই, পরিবর্তন নেই। এর আগেই বলেছি তিন বছর অন্তর টাকা নতুন করে ছাপাবার জন্য টাঁকশালে আসত। সেখান থেকে বেরোবার পর এক বছর সে টাকা বাজারে পূর্ণদ্যোমে চলত। দ্বিতীয় তৃতীয় বছরে ক্ষয়ের জন্য দাম কমতে থাকত তার। তখন এর নাম হত সোনাত বা সোনার মত। সিক্কা টাকা এক বছর পর তিন আর দু বছর পর পাঁচ শতাংশ দাম কমত।

আরেকভাবে উদাহরণ দিয়ে বোঝাবার চেষ্টা করা যাক। সিক্কা টাকার সঙ্গে চালানি টাকার বিনিময়ের হার হল ১০০ সিক্ষা টাকা সমান ১১২.৫ চালানি টাকা। এটা সরকারি হার, খোলা বাজারের দর ১১৮ চালানি টাকা। ক্ষয় হোক আর নাই হোক সিক্কা দ্বিতীয় তৃতীয় বছর সোনাত হলে সেই সোনাতের সঙ্গে চালানি টাকার বিনময় হল ১০০ সোনাত সমান ১১১ চালানি টাকা।

সরকারিভাবে সিক্কা আর সোনাতের মধ্যে পার্থক্য রাখা হয়েছিল। মুখ্য উদ্দেশ্য হল সিক্কার শ্রেষ্ঠত্ব এবং তার একমাত্র বৈধতা বজায় রাখা। সেই জন্য তিন বছর পরে সোনাতকে সিক্ষায় রূপান্তরিত করার উদ্দেশ্যটাই তাই। নাহলে সোনাতই বাজারের প্রধান মুদ্রা হত। দামে কম বলে বাংলার ব্যসায়ীরা তৃতীয় বছরে পোদ্দার আর স্রফেদের(যারা টাকার মূল্য ঠিক করত) কাছে সোনাত নিয়ে যেত আর তারা টাঁকশালে সেই সোনাত নিয়ে যেত সিক্কা করার জন্য। তাতে টাঁকশালের আয়ও হয়। দুশতাংশ বাটা দিয়ে তারা সোনাতের সঙ্গে সিক্কা বদল করত। কারণ তিন বছর পরে মুদ্রার আর কোন মূল্য থাকত না, তার ধাতু মুল্যেই তার দাম ঠিক হত। চালানির সঙ্গে ইংরেজদের আর্কট মুদ্রার বিনিময় ছিল ১০০ আর্কট সমান ১০৯ চালানি টাকা।