Showing posts with label যুক্তিকল্পতরু. Show all posts
Showing posts with label যুক্তিকল্পতরু. Show all posts

Thursday, May 30, 2013

যুক্তিকল্পতরু কি সত্যি রাজা ভোজের রচনা, নাকি রটনা


আলীগড় জার্নাল অব ওরিয়েন্টাল স্টাডিজের ১৯৮৬এর বসন্ত সংখ্যায় ইউ সি শর্মার সম্পাদনায় একটি প্রবন্ধ, দ্য সোর্সেস অ্যান্ড অথরশিপ অব দ্য যুক্তিকল্পতরু, প্রকাশিত হয়। লেখক শ্রীরামুল রাজেশ্বর শর্মা । এই প্রবন্ধে নানান যুক্তি তর্ক উল্লেখ করে সম্পাদক, এবং লেখক শ্রীরামুল রাজেশ্বর শর্মা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হচ্ছেন যে, এই পুঁথিটি রাজা ভোজের রচনা নয়। লেখক, তাঁর প্রবন্ধে যে যুক্তিগুলি ক্রমান্বয়ে সাজিয়ে দিচ্ছেন, সেগুলি এবারে পরপর সাজান গেল-
১। ইতিহাসের প্রমান রাজা ভোজ বহু ধরণের বিষয় নিয়ে বহু পুঁথি রচনা করেছেন। কিন্তু যুক্তির পরের লেখা কোনও রচনায় এই পুঁথিটির উল্লেখ নেই। এই পুঁথিটি প্রথম আবিষ্কার করেন ১৮৭১এ রাজা রাজেন্দ্রলাল মিত্র(নোটস অন সংস্কৃত মানুস্ক্রিপ্ট। এছাড়াও  ইন্দো-আরিয়ান্সএ,  ফার্নিচার, ডোমেস্টিক ইউটেনসিলস, মিউজিক্যাল ইন্সট্রুমেন্টস, আর্মস, হরসেস অ্যান্ড কারস ইন অ্যানসিয়েন্ট ইন্ডিয়া শীর্ষক প্রবন্ধ রচনার সময় তিনি যুক্তি থেকে নানান তথ্য ব্যাবহার করেছেন)। রাজেন্দ্রলালের বক্তব্য ছিল এটি ভোজের সময়ের অনেক পরে লেখা হয়েছে। কিন্তু যুক্তির তিনটি পুঁথি ধরে ১৯১৭তে ঈশ্বরচন্দ্র শাস্ত্রীর সম্পাদনায় প্রকাশিত পুস্তকএর(যুক্তিকল্পতরুহ মহারাজাশ্রীভোজবিরচিতহ, ক্যালকাটা ওরিয়েন্টাল স্টাডিজ) সংস্কৃত ভাষায় লেখা মুখবন্ধে তিনি দ্ব্যর্থহীনভাবে এই রচনাটির কৃতিত্ব রাজা ভোজকে অর্পণ করেন। সেই মুখবন্ধে তিনি উল্লেখ করেন Aufreche(Theodor Aufreche, Catalogus Catalogorum, Leipzig, 1891) এর সেই কুখ্যাত উদ্ধৃতি, ভোজের নামে যে কয়টি পুঁথি বাজারে চলছে, তাঁর একটিরও রচনাকার রাজা ভোজ নন, হয় তাঁর সময়ের কোনও লেখক অথবা তাঁর পরের সময়ের কোনও যশস্বী। ঈশ্বরচন্দ্রএর বক্তব্য, ভোজের অন্য সব রচনা অন্য গুপ্ত লেখকের হলেও হতেপারে, কিন্তু যুক্তিটি অবশ্যই রাজা ভোজ রচনা করেন। উল্লেখ্য, শাস্ত্রিজি পুঁথিতে যা দেখেছেন, সেটিই তিনি ছেপেছেন। যেহেতু তিনি পুঁথিটি সম্পাদনা করেন নি, পুঁথিটি বিশ্লেষণ করেননি, ফলে অনেক সময় তিনি পথভ্রষ্ট হয়ে অদ্যন্ত ভুল তথ্য উল্লেখ করে গিয়েছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন তাতে ভবিষ্যতে গবেষকদের বেশ অসুবিধাই হয়েছে।
তবুও ভারতীয় জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে যুক্তির অন্য একটি স্থান রয়েছে। প্রায় এক হাজার বছর পূর্বের ভারত সমাজের নানান ব্যাবহারিক বিষয় নিয়ে যেহেতু এটিতে বিশদে আলোচনা রয়েছে, ফলে ভারতেতিহাসের জিজ্ঞাসুদের সামনে যুক্তি একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ সন্দর্ভ।
যদিও পুঁথির শুরু আর শেষ পৃষ্ঠায় রচয়িতা হিসেবে রাজা ভোজের নামোল্লেখ রয়েছে, কিন্তু পুঁথিবিদরা যখন খুব খুঁটিয়ে যুক্তি পড়ছেন, তখনই সন্দেহ ঘনীভূত হচ্ছে। যুক্তির পাশাপাশি ভোজরাজের সমরাঙ্গনসুত্রধর(এখন থেকে সুত্র)কে রাখাযাক। প্রথম পুঁথিতে পাঁচটি যুক্তি বরাদ্দ রয়েছে স্থাপত্যবিদ্যায় – দ্বন্দ্বযুক্তি, নাগরীযুক্তি, বাস্তুযুক্তি, রাজগৃহযুক্তি আর গ্রহযুক্তি। দ্বন্দ্বযুক্তি আলোচনা করেছে দুর্গ বিষয়ে। ভারতীয় কোনও জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে দুর্গের সমনাম দ্বন্দ্ব নয়। মধ্য ভারতেতো নয়ই। এটি যুক্তির একটি বিশেষত্ব। পি এ মানকড ১৯৯৩-৩৬এ, অ্যানালস অব দ্য ভান্ডারকর ওরিয়েন্টাল রিসার্চ ইন্সিটিউটে, সমরাঙ্গনসুত্রধর অ্যান্ড যুক্তিকল্পতরুঃ হোয়েদার দিজ ওয়ার্ক্স আর প্রোডাকসনস অব ওয়ান অ্যান্ড দ্য সেম কিং ভোজ অব ধারা নগরী নামে, দুটি পুঁথিকে পাশাপাশি রেখে তাদের বিষয়, রচনাশৈলী, ভাষা, প্রযুক্তিগত টার্ম, পরিমাপের একক, স্থাপত্যের নিদান ইত্যাদি বিষয়ে বিশদ তুলনা টেনে একটি অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ রচনা করেন। তাঁর বক্তব্য হল এই দুটির একটি যদি রাজা ভোজের হয়, তবে অন্যটি কোনোভাবেই তাঁর রচনা হতে পারে না।
নানান শ্লোক বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে,  যুক্তি এমন কিছু উদ্ধৃতির উল্লেখ করছে, যা নিঃসন্দেহে ভোজের সময়ের পরের রচনা। বিশেষকরে মনিমুক্তা বিষয়ের অধ্যায়টি। এই অধ্যায়টি পুঁথিটির সব থেকে বড়, ৪৮০টি শ্লোক বিশিষ্ট। অগস্ত্যসংহিতা ছাড়া, রত্নপরীক্ষা বিষয়ে যত রকম পুঁথি রয়েছে, সেগুলির থেকেও এই অধ্যায়টি বেশ বড়। এখানে গরুড়পুরাণএর উল্লেখ রয়েছে ১২ বার। বাস্তবে গরুড়পুরাণ থেকে ১৬০টি শ্লোক সরাসরি তুলেছে যুক্তি। ৫টি শ্লোকে বিষ্ণুধর্মোত্তর থেকে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই শ্লোকগুলি আসলে বিনষ্ট হয়ে যাওয়া অগ্নিপুরাণের। একটি শ্লোকে বিষ্ণুধর্মোত্তর এবং গরুড়পুরাণ দুটিরই উল্লেখ রয়েছে। রত্নপরীক্ষার এই অধ্যায়টি পদ্মরাগপরীক্ষা এবং বজ্রপরীক্ষা, এই দুটি বিভাগে বিভক্ত। এটি যুক্তিগুলিকে, যুক্তিকল্পতরুর যে পদ্ধতি, উপকরণযুক্তিতে ভাগ না করে, অধ্যায়গুলি, আসলে যার নাম যুক্তি, সেগুলি উদ্দেশ্যতে ভাগ করা হয়েছে। এই প্রবণতাটি গরুড়পুরাণ থেকে ধার করা।
আর সি হাজরার প্রবন্ধ, ইজ দ্য যুক্তিকল্পতরু আ ওয়ার্ক অব ভোজ(প্রফেসর পি কে গোদে কমেমোরেশন ভল্যুম, এম এম পাটকর আর এইচ এল হারিয়াপ্পার সম্পাদনা, পুনা, ১৯৬০)এ, ভোজ রাজের পুঁথি রচনার ভঙ্গীতে অগ্নি আর গরুড়পুরানের দীর্ঘ ছায়া দেখতে পেয়েছেন। তিনি বলছেন এই দুটি পূর্ব ভারতের তান্ত্রিকদের রচনা। অগ্নিপুরান রচিত হয়েছিল নবম শতাব্দীতে। অগ্নিপুরান কিন্তু অনেক পরে ভারতীয় জ্ঞানচর্চার নানান ধারায় উল্লিখিত হয়েছে শুধু নয়, এটি বাংলার বাইরে খুব একটা পরিচিতও পুরানও নয়, অনেক স্থানে এটি স্বীকৃতও বাংলাতেই ষোড়শ শতাব্দীর পরে এটি সীমাবদ্ধভাবে প্রচলন হয়, বাংলার বাইরে অনেক পরে। সপ্তদশ শতকের পরে এটি বাংলার বাইরে পরিচিত হতে থাকে। আর সি হাজরার যুক্তি হল, এটি রাজা ভোজের রচনা নয়। হয় তাঁর সময়ের কোনও অনুগামীর রচনা, নয়ত তাঁর সময়ের পরের কোনও অনামা বাঙ্গালী তান্ত্রিকের অমর হওয়ার পরিকল্পনা।  
এখানে আরও একটি তথ্য উল্লেখ্য, রত্নপরীক্ষা অধ্যায়টি কিন্তু শুধু গরুড়পুরাণএর অবদান এমন নয়। রত্নপরীক্ষা প্রথম রচনা করেন বুদ্ধভট্ট, পঞ্চম কিংবা ষষ্ঠ শতাব্দীতে। এর শুরুতেই ত্রিরত্ন এবং জিনএর প্রতি শ্রদ্ধা জানআনও হয়েছে। গরুড়পুরাণএর রচয়িতা বৌদ্ধ চিহ্নগুলি লুপ্ত করে দিয়ে পুরো রত্নপরীক্ষাটি গরুড়পুরাণএ টুকেদেন।
যুক্তিতে, চালুক্য রাজা,  ভূলোকমল্ল তৃতীয় সোমেশ্বরদেবএর মানসোল্লাস থেকে নব্বইটি শ্লোক নেওয়া হয়েছে। মানসোল্লাস(বা অভিলাষীতর্থচিন্তামনি নামেও পরিচিত) রচনার তারিখ নিশ্চিত করা গিয়েছে। সোমেশ্বরদেবএর পিতৃব্য আহভামল্ল প্রথম সোমেশ্বরদেব ভোজ জয় করেন। এই রচনাটি ১১২৯এর ২২ মার্চ শেষ হয়। ফলে মানসোল্লাস থেকে ভোজ রাজা এটি নিতে পারেন না। উলটোটাও হওয়া সম্ভব নয়। সোমেশ্বরদেবএর রত্ন সম্বন্ধীয় রচনা অনেক পাণ্ডিত্যপূর্ণ, মেদহীন, লেখকের প্রজ্ঞার সুস্পষ্ট ছাপ রয়েছে। অন্য দিকে যুক্তির ভাষা অনেক শিথিল, একই কথা, তথ্য অনেক বার ঘুরে ফিরে এসেছে। ১০৭ নম্বর পৃষ্ঠার ৪৩ নম্বর শ্লোকের প্রথম অংশ গরুড়পুরাণএর এবং দ্বিতীয় অংশ মানসোল্লাস থেকে নেওয়া। এছাড়াও আকরিক হিরের গড়নে বলা হয়েছে, ছটি কোণ, আঁটটি দল বারটি ধারা বিশিষ্ট। এটিকে চার বার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলা হয়েছে। ৯৮ পাতায় বিষ্ণুধর্মোত্তরপুরাণ এবনহ অগ্নিপুরাণ থেকে, ৯৭ পাতার ৫৩ নম্বরটি গরুড়পুরাণ থেকে এবং ৫৪ নম্বরটি মানসোল্লাস থেকে নেওয়া।
দ্বিতিয়তঃ সোমেশ্বর প্রত্যেক প্রত্যেক অধ্যায় শেষ করেছেন নিজের নামের ধুয়ো দিয়ে, যেমন এবম দোষা গুনাহ প্রোক্তাবজ্রানম সোমাভূজ। যুক্তির রচনাকার, একই শ্লোকের সেই ধুয়ায় সোমেসশ্বরএর নামটি তুলতে ভুলেই গেছেন, পুরো শ্লোকটিই তুলেছেন।
১৯১২তে রাধাকুমুদ মুখার্জী আ হিস্ট্রি অব ইন্ডিয়ান শিপিং লিখছেন। তিনি যুক্তির নৌযান বিভাগটি অবশ্যই দেখেছেন। তিনি মনেকরছেন রাজহস্ত শব্দটিতে রাজা শব্দটি ১৬ হাত(কিউবিট = হস্ত) নির্দেশ করে। পরে তিনি, নোট্‌স অন হিন্দু শিপিং প্রবন্ধে এটিকে সংশোধন করে ১০ হস্ত পরিমাপ বলছেন।
   শেষ পর্যন্ত আমাদের হাজরা মশাইএর তত্ব অবলম্বন করতে হয়। যুক্তির গুহ্য লেখকটি চতুর্দশ শতকের রচনাকার। তিনি অবশ্যই পূর্ব ভারতের বাসিন্দা। বাংলার অধিবাসীও হতে পারেন। এছাড়াও যুক্তির রচনাকার বলছেন পাশ্চাত্য দেশের নৌযানগুলি অপকৃষ্ট বিভাগের। একমাত্র পূর্বা ভারতের বাসিন্দারা এই যুক্তি দিতে পারেন। প্রত্যেকটি পুঁথি বাংলা অক্ষরে লেখা। এছাড়াও গামারি কাঠ দিয়ে লে কোনও কিছু তৈরির নিদান আসলে পূর্ব ভারতের কাঠ কর্মীদের প্রিয়। এছাড়াও মাছরাঙ্গা পাখির উল্লেখ পূর্ব ভারতের কথা মনে পড়িয়ে দেয়। এছাড়াও যুক্তি বাংলার আরো একটি লুপ্তপ্রায় আয়ুর্বেদ পুঁথি লৌহপ্রদীপএর উল্লেখ এই ধারনাকে আরো প্রতিষ্ঠা করে।
শেষ প্রশ্ন, যুক্তিতে বারবার ভোজ রাজের ধুয়া তোলা হয়েছে। কিন্তু রচনাটি কি সত্যি ভোজ রাজের? রাজেন্দ্রলাল মিত্র বলছেন যুক্তিতে যে ভোজ রাজার কথা বলা হচ্ছে তিনি হয়ত ধারার রাজা ভোজ। হাজরামশাইও তাই বলছেন। এটি হয়ত ভোজ রাজের রচনা নয়, কোনও অনামি লেখক যিনি ভোজসহ বহু গ্রন্থের লেখা ধার করে প্রখ্যাত রাজার নামে চালিয়েছেন। পরের দিকে শাকির আলি দেখিয়েছেন, ভোজের নামে যে কয়টি পুঁথি প্রচলিত আছে, সেখানে ভোজের নামে কোনও ধুয়া নেই।     

রাজা ভোজ এবং যুক্তিকল্পতরু


সরস্বতী-হরপ্পা সভ্যতারও আগে থেকে ভারতীয়রা বঙ্গোপসাগর, ভারত মহসাগর বেয়ে নানান দ্বীপে বাসতি স্থাপন করেছে। বেদ, জাতক, পাণিনির অষ্টাধ্যায়ী, বিভিন্ন মহাকাব্য, অর্থশাস্ত্রে বিশদে সমুদ্র যাত্রা, সমুদ্র বাণিজ্যের নানান তথ্য বিশদে উল্লিখিত হয়েছে। নানান চিত্র, খোদাই এবং খননে পাওয়া নানান প্রত্নদ্রব্যতে নৌযানের চিত্র দেখা গেলেও, বহুপরে, এগারশ শতকে রাজা ভোজের নামে একটি পুঁথি যুক্তিকল্পতরুতে সেগুলি তৈরির বিশদ বর্ণনা পাওয়া যায়।
আজকের মধ্যপ্রদেশ, একাদশ শতকের ধারা অঞ্চলের পারমার(উজ্জয়নীর রাজপুত) বংশীয় রাজা, মহারাজাধিরাজ শিষ্ট শিরমনি শ্রী ভোজদেব, সাধারণের ভাষায় রাজা ভোজের নামে চলা যুক্তিকল্পতরু (এখন থেকে যুক্তি বলাহবে) পুঁথিটি নিয়ে বিদেশী বিশেষজ্ঞতো বটেই, ভারতের ঐতিহাসিকদের অনাগ্রহ আশ্চর্যজনকই নয়, পীড়াদায়কও বটে। সম্প্রতি বলদেও সহায় এ প্রসঙ্গে একটি প্রবন্ধ রচনা করেছেন। ভোজ রাজা ৮৪টি পুঁথি রচনা করেছেন। শহর পরিকল্পনা, নৌবিদ্যা(নৌ যাত্রা এবং জাহাজ তৈরি পদ্ধতি), স্থাপত্যবিদ্যা, জ্যোতির্বিদ্যা, জ্যোতিষ, রাজধর্ম, রাজনীতি, সংস্কৃততে কাব্য, গদ্য, লেক্সিকোগ্রাফি, সংগ্রহ(এন্থলজি), ব্যাকরণ, সংগীতবিদ্যা, ভেষজবিদ্যা, দর্শনেরমত নানান বিষয় নিয়ে তিনি লিখেছেন। যুক্তিকল্পতরু ছাড়াও  রাজা ভোজের নামে সমরঙ্গন সুত্রধরেও শহর পরিকল্পনা এবং বাসস্থান সম্পর্কিত বিদ্যা বিষয়ে বিশদে আলোচনা করেছেন। বেশ কয়েক দশক ধরেই যুক্তিকল্পতরু আদৌ ভোজরাজের রচনা কিনা, সেই তথ্য নিয়েও খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠেছে। এই প্রবন্ধ শেষে সেই বিষয়টি নিয়ে আরও বিশদে আলোচনা করা যাবে।
আমরা কিছু আগেই আলোচনা করেছি, সরস্বতী-হরপ্পা সভ্যতার সময় থেকেই ভারতীয়রা নৌবিদ্যায় মাহির ছিলেন। কিন্তু সেই বাস্তবের তাত্বিকস্তরে মাপজোক বা বিশদ বিবরণ পাওয়া যায় নি। বোধহয়, ভারতবর্ষে নৌবিদ্যা বিষয়ে মাপজোকসহ প্রথম আলোচনা পাওয়া যায় রাজা ভোজের নামে চলা পুঁথিটিতে। নৌককে যুক্তিতে দুটি ভাগে ভাগ করা হয় – সামান্য এবং বিশেষ। ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল সায়েন্স আকাদেমির, ড. এ কে বাগেরমত বিশেষজ্ঞরা মনে করেন নদিতে চলাচল করা নৌকোগুলকে তিনি সামান্য অভিধা দিয়েছেন এবং অন্যগুলি হয়ত সমুদ্রগামী নৌকো। তবে ভোজ বলছেন, “all Samanya vessels, except Manthara are ambudhagati, that is sea-going”.
সাধারণ নৌকোর ১০টি বিভাগ ছিল। বড়টি লম্বায় ১২০ হস্ত, চওড়ায় ৬০ হস্ত(১ কিউবিট = ৫০ সেমি) একই উচ্চতা বিশিষ্ট। এর নাম মন্থরা। সবথেকে ছোটটি ১৬ হস্ত দীর্ঘ, চওড়া আর উচ্চতায় ৪ কিউবিট। নাম ক্ষুদ্র। নৌকোর সঙ্গে দীর্ঘ শব্দ যোগ হওয়ার প্রথম শর্ত ছিল সেটি অবশ্যই লম্বা হতে হবে আর উন্নত শব্দটি যোগ হওয়ার শর্ত ছিল সেটি বেশ উঁচু হওয়া। দীর্ঘর দশটি শ্রেণী বিভাগ ছিল। আর উন্নতর পাঁচটি। দীর্ঘর সব থেকে বড়টি ছিল ১৭৬ হস্ত ২২ হস্ত চওড়া ২৭ হস্ত উচ্চতা বিশিষ্ট। এটির নাম বেগিনী।
সবথেকে উঁচু নৌকোটির উন্নতি আর প্রস্থ ছিল ৪৮ হস্তের, আর দৈর্ঘে ৯৬ হস্ত। সবথেকে লম্বা জাহাজটির পরমাপ ছিল ১৭৬ হস্ত, ৬০ হস্ত প্রস্থ আর একই উচ্চতা বিশিষ্ট।

সামান্য জাহাজ – ১০টি বিভাগ
জাহাজের নাম            বর্ণনা                                             পরিমাপ(কিউবিট - হস্ত)
                                                                  দৈর্ঘ                প্রস্থ           উচ্চতা
১। ক্ষুদ্র                    ছোট                                ১৬                 ৪              ৪
২। মধ্যমা                 মাঝারি                             ২৪                ১২            ৮
৩। ভীম                   ওজনদার                          ৪০                ২০            ২০
৪। চপল                   দুদিকেই চলতেপারা             ৪৮                ২৪            ২৪
৫। পাটোলা               ছইয়ালা                            ৬৪                ৩২           ৩২
৬। অভয়                                                       ৭২                ৩৬           ৩৬
৭। দীর্ঘ                    লম্বা                                ৮৮                ৪৪            ৪৪
৮। পত্রপুট                যেন ভাঁজকরা কাপেরমত       ৯৬                ৪৮           ৪৮
৯। গর্ভর                   গলুইতে ঘরওয়ালা               ১১২               ৫৬            ৫৬
১০। মন্থরা                বাঁকানো                           ১২০               ৬০            ৬০

বিশেষ জাহাজ(লম্বা হওয়া প্রথম শর্ত) – ১০টি শ্রেণীবিভাগ

১। দীর্ঘিকা                লম্বা                                ৩২                ৪              ৩
২। তরণী                  স্থানীয়ভাবে যাতায়াত করার জন্য                  ৪৮           ৬      ৪
৩। লোলা                                                       ৬৪                ৮             ৮
৪। গাতভরা               তাড়াতাড়ি নষ্ট হওয়া            ৮০                ৮             ৮
৫। গামিনী                                                      ৯৬                ১২            ৯
৬। তরী                                                         ৯৬                ১২            ৯
৭। জঙ্ঘল                                                      ১২৮              ১৬            ১২
৮। প্লাবিনী                                                     ১৪৪               ১৮            ১৪
৯। ধারিণী                                                      ১৬০               ২০            ১৬
১০। বেগিনী                                                    ১৭৬               ২২            ১৭
উন্নত(উচ্চতা মূল শর্ত) – ৫ টি বিভাগ
১। ঊর্ধ্বব                  উঁচু                                 ৩২                ১৬            ১৬
২। অনুর্ধ্বব               খুব উঁচু নয়                        ৪৮                ২৪            ২৪
৩। স্বর্ণমুখী                চাঁদবদন                           ৬৪                ৩২           ৩২
৪। গর্ভিণী                 মালবাহক                         ৮০                ৪০            ৪০
৫। মন্থরা                  বাঁকা                               ৯৬                ৪৮           ৪৮

যুক্তিতে জাহাজগুলির অনেকগুলিতে নানা ধরণের ঘর তৈরি করা হত। জাহাজজোড়া ঘরের জাহাজকে সর্বমন্দির বলা হত। এগুলো রাজার সম্পদ, ঘোড়া এবং মহিলাদের বহন করত। মধ্যমন্দিরে মাঝে ঘর তৈরি হত। এই জাহাজে রাজা প্রমোদ ভ্রমনে বার হতেন। অগ্রমন্দিরের নৌকোগুলোর সামনের দিকে ঘর থাকত এবং যুদ্ধের সময়, দূর যাত্রায় ব্যবহার হত। প্রাচীন ভারতের নৌ বিশেষজ্ঞ এস আর রাও বলছেন, “even Harappan ships had cabms as indicated by the seal engravings and terracotta amulet &om Mohenjodaro”। নৌকোয় ঘরের আভাস পাওয়া গিয়েছে সাঁচিস্তুপের খোদাই আর অজন্তা শিল্পে।
ভোজরাজ এমন কিছু জাহাজের কথা বলছেন যেগুলির চারটি মাস্তুল এবং তাদের সাদা রং করার নির্দেশ দিচ্ছেন। তিন মাস্তুলের জাহাজগুলির মাস্তুলের আলাদা আলাদা রং করারও সুত্র দিচ্ছেন, একটি লাল, অন্য দুটির একটি হলুদ, আর একটি নীল।  জাহাজের সামনের অংশটি হয় সিংহ, নয় বাঘ, হাতি, মোষ বা সাপের মুখ খোদাই করার দাওয়াই দিচ্ছেন। জাহাজের গা’টি সূর্য, চাঁদ, ময়ূর, কাকাতুয়া, এবং দুটো মৌমাছির ছবি দিয়ে আঁকতে বলছেন। হয়ত এগুলি ব্যাবসায়ী গোষ্ঠীর প্রতীকছিল। অক্ষাংশ আর দ্রাঘিমাংশ মাপতেন উত্তর মেরু থেকে লঙ্কা পর্যন্ত।
জাহাজ তৈরিতে যুক্তি – ব্রাহ্মী, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য আর শূদ্র, এই চারটি শ্রেণীর কাঠ ব্যবহারের নির্দেশ দিচ্ছেন। যুক্তিতে বলা হচ্ছে ক্ষত্রিয় শ্রেণীর কাঠে সব থেকে কার্যকারী ভাল নৌকো তৈরি হয়। এই কাঠ হাল্কা কিন্তু মজবুত। অন্যগুলো বেশিদিন টেঁকে না। ঢেউয়ের হাল্কা ধাক্কা লাগলেই জাহাজের কাঠে চিড় ধরে এবং নষ্ট হয়ে যায়। যুক্তিতে স্পষ্ট বলা হচ্ছে নৌকোতে লোহার কিলক ব্যাবহার না করতে, কেননা সমুদ্রের জলে থাকা চুম্বক জাহাজকে নষ্ট করে দেয়। যুক্তি লোহা ছাড়া অন্য ধাতু ব্যাবহার করতে নির্দেশ দিচ্ছে। একটি জাহাজ মোটামুটি ১০০ থেকে ৬০০ যাত্রী বহন করতে পারে। যাত্রীদের সুবিধার দিকে নজর দিয়ে তিনি জলযানগুলি তৈরি করতে নির্দেশ দিচ্ছেন। 

কাপ্পাল সাত্তিরাম অথবা সপ্তদশ শতকে তামিল পুঁথিতে নৌকো বা জাহাজ তৈরির বর্ণনা২


কাপ্পাল সাত্তিরাম
মাদ্রাজএর গভর্নমেন্ট ওরিয়েন্টাল ম্যানুস্ক্রিপট লাইব্রেরি, কাপ্পাল সাত্তিরাম পুঁথিটি টি পি পালানিয়াপ্পান পিল্লাইকে অনুবাদ, সম্পাদনার দায়িত্ব দেয়। পুস্তক প্রকাশ করে মুখবন্ধে সম্পাদক জানান, পুঁথিতে অনেকগুলি ভুল ছিল। এই ভুলগুলি হয়েছে অনুবাদকের অপর্যাপ্ত জ্ঞান, আর  বিষয়গুলি সম্বন্ধে না জানার জন্য। কাপ্পাল সাত্তিরাম পুঁথিটি ৭১ পাতার। সাধারণ কাগজে লেখা। এতে ৪৬টি ভিরুত্তায়াপ্পু ধারার শ্লোকসহ অমিত্রাক্ষর ছন্দে গদ্যাংশ রয়েছে। চার নম্বর শ্লোকের শেষ স্তবকে এই পুঁথির অন্য একটি সংস্কৃতগন্ধী নাম পাওয়া গিয়েছে, নিগম চিগামনি।
পুঁথিটি অনেকগুলি ছোট ছোট বিভাগে বিভক্ত, প্রত্যেকটি বিভাগ বিষয় গুরুত্বে যুক্তিপূর্ণভাবে শিরোনামযুক্ত। এই বইটিতে লেখকের নাম নেই। শুধু লেখা রয়েছে সালাইকাটিরঙ্গন চোরপাদি এতানাইত্তামিল সাইতিত্তান(salaikatirangan corpadi etanaittamil ceytittan) সালাইকাটিরঙ্গনএর মৌখিক নির্দেশে এই শ্লোকগুলি তামিল ভাষায় গ্রন্থিত হল।
পুঁথি শুরু দেবী সরস্বতীকে উদ্দেশ্য করে স্তোতিরমএর মুখবন্ধে। তিন নম্বর শ্লোকে বিভিন্ন পরিমাপকগুলোর একক বর্ণনা করা আছে। মুলাক্কোল, বা পরিমাপক দণ্ড হল এক কিউবিট(=এক হস্ত?)। এই পরিমাপগুলো যতদুর সম্ভব ভুলভাবে বর্ণনা করা রয়েছে। তামিল অঙ্ক বিষয়ক পুঁথি, কনক্ককাটিকরমএর সঙ্গে মিলিয়ে এই পরিমাপগুলি পরে নতুন করে হিসেব করা হয়েছে।   
                        ৮ অণু                                        ১ কাতিরেলুতুগাল(সূর্যালোক)
                        ৮ কাতিরেলুতুগাল                          ১ পাঞ্চিরুক্কাল(সুতা)
                        ৮ পাঞ্চিরুক্কাল                               ১ মাইর মুনানি(চুলের আগা)
                        ৮ মাইর মুনানি                              ১ নুনমানাল(সূক্ষ্ম বালির বিন্দু)
                                                                             ৮ নুনমানাল    ১ চিরুকাতিগু বা ইয়েলু(সর্ষে দানা বা তিলের দানা)
                             ৮ ইয়েলু                                      ১ নেল্লু(ধান)
                             ৮ নেল্লু                                        ১ ভিরাল(আঙ্গুল)
                             ৮ ভিরাল                                     ১ চান(৯ ইঞ্চি)
                             ৮ চান                                        ১ মুলম(১ কিউবিট = ১৮ ইঞ্চি)
শেষের তিনটি একক ছাড়া অন্য এককগুলো নৌকো তৈরির কাজে লাগত না।

একটি নৌকোর চরিত্র নির্ধারণ
পাঁচ নম্বর শ্লোকে বলা হচ্ছে কি ভাবে সমুদ্রে যাওয়া জাহাজএর চরিত্র চিহ্নিত হবে। ‘একটি সমুদ্রগামী জাহাজের গুনমান(ভঙ্গম) নির্ধারণ হবে, যতগুলি এড়া(কীল - keel) রয়েছে তাঁর মোট দৈর্ঘ জুড়ে দশটি ভাগে ভাগ করতে হবে। যদি কোনও ভাগশেষ না থাকে, তবে সেই জাহাজটি সমুদ্রে যাওয়া জাহাজের মর্যাদা পাবে। জাহাজের সাতটি অংশ – প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়, ষষ্ঠ, সপ্তম, নবম এবং দশমের সব কটি কান্নিদাই, কারুভিদাই, এলাক্কিডাই এবং চুলিক্কাদাই(এগুলি সব কাঠের চরিত্র) দিয়ে তৈরি হয়। এই চার প্রকার চরিত্রের কাঠদিয়ে তৈরি জাহাজের কিলগুলোর জোড় নরম হতে দেয় না, বরং এগুলকে আরও শক্ত করে। করমন্ডল উপকূলের জাহাজ প্রযুক্তিবিদেরা বহু প্রাচীন কাল থেকেই নৌকো বা জাহাজ তৈরিতে এই চার প্রকার চরিত্রের কাঠ ব্যাবহার করে আসছেন। পুঁথির রচনাকার নৌকোর কারিগরদের নৌকো তৈরির সময় অনেকগুলো দিক বিচার করতে বলেছেন। যেমন, চতুর্থ, পঞ্চম এবং অষ্টম বিভাগ তৈরির সময় অবশ্যই গিঁট বা নোড(কানু) দেওয়া কাঠ ব্যাবহার থেকে বিরত থাকতে হবে। কোনও কাঠে গিঁট থাকলে, নৌকো তৈরির সময় হয় তা কেটে ফেলতে হবে, নয় সেই কাঠকে বাদ দিতে হবে। যে কিলের ওপর গোটা নৌকো অথবা জাহাজটি তৈরি হচ্ছে, সেটিতেই যদি গলদ থাকে তাহলে, জাহাজ তৈরিতেই সমঝোতা করতে হবে এবং হামেশাই দেখাযায়, এর ফলে নৌকো বা জাহাজের গায়ে সূক্ষ্ম চিড় ধরতে পারে।

জাহাজ জলে ভাসানর জন্য সঠিক দিন নির্বাচন করা
যে কোনও কাজের শুভ দিন নির্ণয় করা, ভারতবর্ষের খুব পুরনো একটি প্রথা। শুধু এই একটি বিষয়েই একটি অধ্যায় নির্বাচন করেছেন লেখক, যাতে প্রমান হয় বিশেষ দিনে জলযানটি সমুদ্রে ভাসানোর বিষয়টির গুরুত্ব। এরই সঙ্গে জাহাজ যিনি তৈরি করছেন তাঁর ব্যাবহার, চরিত্রও কি হওয়া উচিত, তাও পুঁথিতে বিশদে বর্ণনা হয়েছে। বলা হয়েছে জাহাজের চরিত্র আর গুনমান ঠিক করে তৈরি হবে ভাঙ্গানাল (ভঙ্গম = জাহাজ, নাল = দিন), অর্থাৎ কোণ দিনে জাহাজটি কত ভালভাবে তৈরি হল তাঁর জন্য, ঐ দিনটি বেছে টেস্ট রান করা হত।
ভাঙ্গানালের জন্য এই কয়েকটি বিষয় বাছা হত – জাহাজের কীলটি হস্ত মাপনী(কিউবিট)তে করা হত, যা আদতে ২৫ আঙ্গুল।  কীলের মাপকে ২৪ দিয়ে গুণ করা হত। এই পরিমাপ থেকে ২৭ বিয়োগ করা হয় (২৭ হল মোট চান্দ্র কন্সটেলেসন)। যদি ফল ১ হয় তবে ভাঙ্গানাল হবে অশ্বিনীতে, যদি ফল হয়ই ২ তবে ভাঙ্গানাল হবে ভারনীতে ইত্যাদি। জ্যোতিষ সিদ্ধান্তের মতে এই চান্দ্র কন্সটেলেসন শুরু হয় অশ্বিনী নক্ষত্রকে দিয়ে, ২৭তমতি রেবতী। কিন্তু যদি ফল ২৭এর বেশী হবে তাহলে কি ভাবে গনা হত জানা যায় না – হয়ত আবার অশ্বিনী নক্ষত্র দিয়ে গোনা শুরু হত।

জাহাজের মাস্তুল স্থাপন
১৩ নম্বর শ্লোকে জাহাজের মাস্তুল(পায়-মরম) স্থাপন হবে রাশি অনুযায়ী, সুভ গ্রহ দেখে। তবে কিভাবে তা নির্ধারণ করা হত তা বলা নেই।

দেবতা স্থাপন
১৫, ১৬, ১৭তম শ্লোক তিনটিতে বিশদে বিগ্রহ(বাস্তু পুরুষন) স্থাপনের কথা বলা হয়েছে। জাহাজএর চরিত্র নির্বিশেষে দেবতা স্থাপন করতে হবে বলা হয়েছে। এবং নির্দিষ্ট স্থানে তাঁকে স্থাপন করতে হবে। লেখক বলছেন এড়া যদি বাস্তু পুরুষনের মাথার নিচে স্থাপন করা হয় তবেই সেই জলযানকে উত্তমম বলা হবে। বাস্তু পুরুষনের মাথার অবস্থান এবং দিক পরিবর্তন না করার নির্দেশও দিচ্ছেন লেখক।

জ্যোতিষ নির্দেশ
পুঁথিতে, জাহাজ তৈরি সংক্রান্ত কোন কাজ কোন দিনে করতে হবে, তাঁর বিশদ বর্ণনা রয়েছে। ৯ নম্বর শ্লোকে বলা হচ্ছে, মিথুন, কুম্ভ, মীন, ধনুষ এবং মকর, এই পাঁচটি রাশিতে জাহাজ সংক্রান্ত যে কোনও কাজ আরম্ভ  না হওয়া প্রয়োজন। ১৪তম শ্লোকে বলা হয়েছে দূর দেশ থেকে দেশের দিকে আসার সময় নানান ধরণের জ্যোতিষ চিহ্ন দেখেই রওনা হওয়া প্রয়োজন। এ বিষয়ে পুঁথিতে জ্যোতিষ গ্রহ চিন্তামনির নির্দেশ পালন করতে বলা হয়েছে। ২১ থেকে ৪৬ শ্লোকে বিশদে সমুদ্র যাত্রায় নানান ধরণের জ্যোতিষ চিহ্ন বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

সেল এবং মাস্তুল - মাস্টের পরিমাপ
বিভিন্ন ধরণের জলযানের জন্য নানান পরিমাপের হাল এবং মাস্তুলের আলোচনা করা হয়েছে। একটি উদাহরণ- যদি কোনও জলযানের কীলের(এড়া) দৈর্ঘ ৪৫ হস্ত, এবং ১৫ হস্ত চওড়া হয়, তাহলে হাওয়া এবং ঝড়ের আঘাত রুখতে আড়াই হস্ত লম্বা এবং ৩৭ হস্তের মাস্তুলের হাল(ওদুতাই) তৈরি প্রয়োজন। হালের দীর্ঘ হবে ৩৭ হস্ত। এধরনের ১০ টি আলাদা আলাদা পরিমাপ দেওয়া হয়েছে।
এখানে দুটি সেল মাস্তুলের কথাও বলা হয়েছে, যাতে জলজান, সমুদ্র বাতাস অলম্বন করে দ্রুত জল কেটে এগিয়ে যেতে পারে। আর দুটো সেল ব্যাবহার করা হত আরও বেশী মাল বহন করার উদ্দেশ্যে।
নোঙরের মাপ
চার ধরণের নোঙরের(নাঙ্গুরাম) কথা বলা হয়েছে এই পুঁথিতে। জাহাজের চরিত্র এবং ওজন অনুযায়ী নোঙরের পরিমাপ করা হত। প্রথমে এড়ার মাপ নিয়ে সেতিকে ফুটে পরিণত করা হত। এক ফুট এড়া মানে ২৬ রাত্তাল(পাউন্ড) হয়, তবে কীলের দৈর্ঘের সঙ্গে ২৬ গুণ করে নোঙরের মাপ তৈরি হত। আরও অনেকগুলি মাপের কথা বলা হয়েছে।

কাপ্পাল সাত্তিরাম অথবা সপ্তদশ শতকে তামিল পুঁথিতে নৌকো বা জাহাজ তৈরির বর্ণনা১


(সুত্রঃ আ তামিল ট্রিটিজ অন শিপবিল্ডিং ডিউরিং থে সেভেন্থ সেনচুরি এ ডি – এন কে পানিক্কর, টি এম শ্রীনিভাসন, ন্যাশনাল কমিশন ফর থে কম্পাইলেসন অব হিস্ট্রি অব সায়েনসেস ইন ইন্ডিয়া, মেরিন সায়েন্স ইউনিট, ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল সায়েন্স আকাদেমি, নিউ দিল্লি)

তামিল দেশে নৌকো বা জাহাজ তৈরির উদ্যম অন্তত ২০০০ বছরের ইতিহাস। খ্রিষ্টীয় প্রথম দু শতকে করমন্ডল উপকূল থেকে তামিলরা পূর্ব এবং পশ্চিমের নানান দেশে ব্যাবসা করত। সঙ্গম পর্বের নানান সাহিত্যে এ বিষয়ে বিশদ বিবরণ উল্লিখিত হয়েছে। এ ছাড়াও গ্রীক বা রোমের নানান লেখকদের রচনাতেও এর উল্লেখ রয়েছে। রোমের মুদ্রাতেও এই বাণিজ্যের উল্লেখ আছে।
অন্ধ্রের সাতবাহন রাজারা তামিল দেশ দখল করার পর শুরু হল বৈদেশিক বাণিজ্যের স্বর্ণযুগ। সে সময়ের মুদ্রাতেও এই বিষয়টি প্রতিফলিত হয়েছে। তৃতীয় শতকে সাতবাহন রাজত্বের পতনের পর পূর্বদিকের করমন্ডল উপকূলের ব্যাবসা কাঞ্চি (কাঞ্চিভরম)র পল্লবদের অধিকারে যায়। এর নানান উদাহরণ নানান তাম্র ও পাথুরে লিপিতে উৎকলিত রয়েছে।
খ্রিষ্টীয় নবম শতকে পল্লবদের পতনের পর তাঞ্জোরের চোল বংশ তামিল দেশ অধিকার করে। এই সময় থেকে শুধু তামিল অঞ্চলই নয়, সমগ্র প্রায় দক্ষিণ ভারতে সমুদ্র যাত্রা উদ্যমের স্বর্ণযুগ শুরু হয়। চোল রাজা প্রথম রাজা রাজার(খ্রিষ্টীয় ৯৮৫-১০১৪) এবং প্রথম রাজেন্দ্র(১০১৪-১০৪২), এই সময়টি প্রথম কার্যকরী সমুদ্র নীতি তৈরি করেন এবং নৌবাহিনী তৈরি হয়। দক্ষিণ ভারতের সঙ্গে পুবের নানান দেশ এবং চিনের সঙ্গে সমুদ্র মারফৎ যোগাযোগ হয়। এই সময় থেকে শুরু করে, একেবারে মধ্যযুগ পর্যন্ত করমন্ডল উপকূলে বৈদেশিক বাণিজ্য তার উচ্চতম শৃঙ্গে আরোহন করে। সে সময়ে বৈদেশিক নানান ভ্রমন সাহিত্যে এই উচ্চতার প্রতিফলন পাই। যদিও এই সব নানান উল্লেখে বিভিন্ন ধরণের জাহাজ, বিভিন্ন শ্রেণীর নৌকো, তাদের বিভিন্ন অংশ ইত্যাদির বর্ণনা, এছাড়াও নৌযাত্রা বিষয়েও নানান তথ্য পাই। কিন্তু সেগুলি এতই অল্প অথবা ভাসা ভাসা যে, করমন্ডল উপকূলে যে জটিল নৌ বাণিজ্যের উদ্যম দীর্ঘ সময় ধরে চলছিল, তার নানান অংশের বিস্তৃত উদাহরণ খুব বিশদে পাওয়া যায় না। কিন্তু এই সহস্রাব্দের মাঝের দিকে যখন এই উপকূলে নৌবিদ্যা তাঁর স্বর্ণ যুগে পৌঁছেছে, তখন তামিল ভাষায় কাপ্পাল সাত্তিরাম(kappal sattiram) এই উদ্যমের বড় উদাহরণ বহন করে চলেছে। এই পুঁথিটিতে করমন্ডল উপকূলের নৌ উদ্যমের কতগুলি নতুন অজানা তথ্য আমরা আবিষ্কার করি।

তরঙ্গমবাডি(ত্রাঙ্কুবার)তে ডেন অধিবাসীরা
তামিল দেশে জাহাজ তৈরির প্রথম বর্ণনা পাই মাদ্রাজ প্রদেশের তরঙ্গমবাডিতে ১৬৯৮ সালে। ডেনমার্কের তিনামারাকা ভাষায়, তুবাসি কলিঙ্গরায়ান পিল্লাই এই পুঁথিটি অনুবাদ করেন। ইংরেজিতে ত্রাঙ্কুবার, তামিলে তরঙ্গমবাডি শহর, করমন্ডল উপকূলের তাঞ্জাভুর জেলার ময়ুরম শহরের পূর্বপানে সুচিত। তামিল ভাষায় তরঙ্গমবাডির আর এক নাম আলাইপত্তনম – বাংলা অর্থ ঢেউয়ের গ্রাম।
ডেনমার্কের চতুর্থ ক্রিস্তান(১৫৮৮-১৬৪৮)এর সময় ড্যানিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তৈরি হয়ই ১৬১৬ সালে। প্রথম সমুদ্র যাত্রা ভারতের দিকেই। পর্তুগিজরা তখন মালাবার উপকূল দখল করে রয়েছেন, পাশাপাশি ইন্দোনেশিয়া ডাচেদের দখলে। ফলে ডেনিশরা নজর দিল করমন্ডল উপকূলে। প্রথম জাহাজটি পর্তুগিজদের প্রবল আক্রমণের মুখে পড়ে বেঁচেযান জাহাজের প্রধান আর ১৩ জন নাবিক। তাঁরা তাঞ্জোরের রাজার সঙ্গে দেখা করেন। ১৬১৮তে ভারতের দিকে দ্বিতীয় সমুদ্র যাত্রা। এবং তখন থেকে করমন্ডল উপকূলে ডেনদের ব্যবসা শুরু। 

সাহিত্যে ও প্রত্নতত্বে ভারতের সমুদ্রযাত্রা এবং নৌ প্রযুক্তি২


প্রত্নতাত্বিক নিদর্শন
লোথালের(আজকের গুজরাতের মংগ্রোল বন্দর) ২৩০০ বছর আগে সরস্বতী-হরপ্পা সভ্যতা ড্রাই ডক তৈরি করতে পেরেছিল অবলীলায়। প্রত্নতাত্বিক নিদর্শন বলছে ১৮-২০ মিটার লম্বা, ৪ মিটার চওড়া পরিমাপের অন্তত দুটো জাহাজের একসঙ্গে বন্দরে ঢোকা নিয়ন্ত্রণ করতে পারত লোথাল বন্দর কর্তৃপক্ষ। সরস্বতী-হরপ্পা সভ্যতা সেদিনের মেসোপটেমিয়া(টাইগ্রিস আর ইউফ্রেটিস নদীর মধ্যভাগ, বর্তমানের ইরাক, উত্তর সিরিয়া, দক্ষিণ পূর্ব তুর্কী), আরব এবং ক্যাম্বের উপসাগর অঞ্চলে ব্যবসা করত। এই অঞ্চল থেকে ভারতের উৎপন্ন দ্রব্য বিশ্বের নানান দেশে বিতরিত হত। সিন্ধু নদীর মুখ থেকে মেসোপটেমিয়ার দূরত্ব প্রায় ২০০ কিলোমিটার। সিন্ধুর ধোলাভিরা অঞ্চল থেকে ভারতের ব্যবসায়ীরা আরব উপকূলভাগের নানান বন্দরে ব্যাবসা করতে করতে মেসোপটেমিয়ায় পৌঁছতেন। ফলে দিক নির্দেশের সঙ্গে সঙ্গে সমুদ্র পথে, যথেষ্ট পরিমানে পণ্য বহন করে প্রায় ২০০০ কিমি দুরত্ব পার করার মত জলযানও প্রস্তুত করতে হত। শুধু আরব বা প্রাচ্য এলাকাই নয়, এশিয়ার নানান দেশ, ইউরোপে, আফ্রিকাতেও ভারত ব্যবসা করেছে সমুদ্র পথে। শুধু ভারত মহাসাগরে বা পারস্য উপসাগরেই নয়, তাঁরা লহিত সাগর এবং মধ্যপ্রাচ্য হয়ে আগিয়ান (Aegean) সমুদ্রেও ব্যবসা করতেন। সভ্যতার শুরু থেকে ভারতীয় ব্যবসায়ীরা বিশ্বের নানান সমুদ্রপথের খবর রাখতেন। মিশর ভারতকে ভগবানের দেশ বলে অভিহিত করত। কেননা, ভারত নিজেকে, নিজের মত করে বিকশিত হয়েছিল। মিশরের রাজপরিবারে অথবা পূজনের কাজে অপর্যাপ্ত পরিমানে নানান ধরণের দামী গন্ধ দ্রব্য, গাছ গাছড়া প্রয়োজন হত। ৪২৫ খৃস্ট পুর্বাব্দের দার্শনিক হেরডোটাস বিশদে লিখেছেন ভারত থেকে কত ধরণের গাছ গাছড়া আমদানি করত মিশর। মেয়েদের সাজসজ্জা, রূপটানের প্রায় সমস্ত দ্রব্য ছিল ভারতের তৈরি।
উত্তরের মধ্য এশিয়া থেকে দক্ষিণের ইন্দোনেশিয়া আর ফিলিপিন্স থেকে পশ্চিমের পারস্য এবং পূর্বের চিন, জাপানের সভ্যতা থেকে একটা বিষয়ই প্রমান হয়, ভারত তাত্বিক আর সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে এই দেশগুলোকে প্রভাবিত করতে পেরেছিল। রোমেও ভারতের মশলা, পরিধেয়, দামী ধাতু, রং, ইত্যাদি নানান পণ্য আদৃত ছিল। ভারতের নানান স্থানে রোমের মুদ্রা পাওয়া গিয়েছে।

সাহিত্যে ও প্রত্নতত্বে ভারতের সমুদ্রযাত্রা এবং নৌ প্রযুক্তি১


এস রামা কৃষ্ণ পিসিপাতি (S. Rama Krishna Pisipaty, Prof  & Geo-archaeologist, SCSVMV University, Enathur, Kanchipuram)

বিশ্বে ভারতের ভৌগোলিক অবস্থানের দরুন প্রাচীন কাল থেকেই নৌবিদ্যার বিকাশ হয়েছে এবং আজও মানুষ অনেকটা জলযানের ওপর নির্ভরশীল। বিশ্বমানচিত্রে সমুদ্রের মাঝখানেই ভারতের অবস্থান। বৃহত্তর হিমালয় এবং বিভিন্ন ঘাট থেকে বহু নদী সমুদ্রে পড়েছে। ফলে নদী এবং সমুদ্রযাত্রা উপযোগী নৌবিদ্যার বিকাশ ঘটেছে ভারত জুড়ে। খৃস্ট জন্মের ২০০০ বছর আগে সরস্বতী-হরপ্পা সভ্যতায় উচ্চস্তরের নৌ বিদ্যার বিকাশ ঘটেছিল। তার নানান উদাহরণ বহু ভারতীয় সাহিত্যে ধরা রয়েছে। সেই সুত্র ধরে ইতিহাসের নানান স্তর তৈরি করা হচ্ছে।  
মোটামুটি ধরে নেওয়া হয়, সরস্বতী-হরপ্পা সভ্যতা শুরুর বেশ কিছু সময় পরে ঋক বেদ লেখা হয়েছিল। সংস্কৃত সাহিত্যে বৈদেশিক বাণিজ্যের বিশদ উল্লেখ রয়েছে। পশ্চিমি নেভি শব্দটির উতপত্তি যতদূর সম্ভব নৌ শব্দ থেকে। বেদের সঙ্গে সমুদ্রের খুব আত্মিক সম্পর্ক রয়েছে। ঋক বেদেই সমুদ্রটি ১৩৩ বার উল্লিখিত হয়েছে। সমুদ্রের বর্ণনায় সপ্তসমুদ্রও বর্ণিত হয়েছে। বলা হয়েছে বিশ্বের জলধারকদের মধ্যে সমুদ্রই সব থেকে প্রাচীন এবং প্রত্যেক নদী অবশ্য সমুদ্রে পড়তে হবে। দেবতাদের মধ্যে বরুণদেবই সমস্ত সমুদ্র পথের জ্ঞান সম্পন্ন দেবতা। লোভের বশবর্তী হয়ে বনিকেরা সমুদ্র বেয়ে দূর দেশের প্রায় প্রত্যেকটি বন্দরের বাণিজ্যে যাচ্ছে, তার উল্লেখ রয়েছে। সপ্তম মণ্ডলে উল্লেখ রয়েছে বরুণ এবং বশিষ্ঠের যৌথভাবে অপূর্ব এক জলযানে শান্তি মনে দূর দেশে বাণিজ্যে যাওয়ার কথা। প্রথম মণ্ডলে একটি সুন্দর গল্প রয়েছে, যদিও গল্পটি এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়, যতটা গুরুত্বপূর্ণ সাগরের সঙ্গে গল্পটির কুশীলবের সংলগ্ন হওয়া। রাজা তুগ্র, পুত্র ভজ্যুকে দূর দেশে সমুদ্র যাত্রা করে শত্রুদের ধংস করতে পাঠালেন। জাহাজগুলি ঝড়ের প্রভাবে ধংস হয়ে যায়। ঋকে বলা হচ্ছে, যেখানে কারোর সাহায্য পাওয়া যায় না, যেখানে হাত বা পা রাখা যায় না, সেখানে ভজ্যুকে সাহায্য করতে এগিয়ে এলেন তার যমজ দুই ভাই, অশ্বিনরা। ঋকে আরও বলা হয়েছে পানি সম্প্রদায় সমুদ্রযাত্রা করে বিশ্বজোড়া বানিজ্য করতেন। এরা ফিনিসয় সম্প্রদায়, লাতিন ভাষায় ফোনেই। এর থেকে একটাই বিষয় পরিস্কার, বেদ যারা রচনা করেছিলেন, তারা সকলেই সমুদ্র উপকূলের অধিবাসী। ঋক বেদে সমুদ্র যাত্রা এবং উন্নতির জন্য জলযান চাওয়া হচ্ছে।
বিশ্বের অন্যতম আইন ও নীতি পুস্তক, সংস্কৃত ভাষায় লিখিত মনুস্মৃতিতে ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব মেটাবার নীতি বর্ণনা করা রয়েছে। শুধু সমুদ্র যাত্রাই নয় নদী পথে বাণিজ্যের দ্বন্দ্ব মেটানর দাওয়াই দিয়েছেন মনু। রামায়নে যবন দ্বীপ এবং সুবর্ণ দ্বীপ(জাভা এবং সুমাত্রা), লোহিত সাগরের(রেড সি) কথা রয়েছে। কিষ্কিন্ধ্যা কাণ্ডে এবং অযোধ্যা কাণ্ডেও ইঙ্গিতে নৌবাহিনীর বর্ণনা দেওয়া রয়েছে। রামেশ্বরমে সমুদ্রে বাঁধ তৈরি করার বর্ণনা, সেসময়ে নৌ বিদ্যার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক।
বিষ্ণুপুরাণ, ভাগবতপুরাণ আর মহাভারতে বর্ণিত সমুদ্র মন্থনের গল্পটি অতি পরিচিত। পরিচিত সেই গল্পটি আজ নতুন ভাবে সেই ভারতের জ্ঞান ভাণ্ডারকে দেখার দৃষ্টিতে পঠিত হচ্ছে। ক্ষীর সাগর মন্থন করে উঠেছিল চতুর্দশ রত্ন এবং অনেক ওষুধের গাছ গাছড়া। পঞ্চম শতকের বিষ্ণুপুরাণ অথবা প্রথম শতকের পেরিপ্লাস অব দ্য এরিথ্রিয়ান সিতে সমুদ্র স্রোত এবং সমুদ্রপথ নিয়ে বহু তথ্য পাওয়া যায়।  
বুদ্ধের অনুগামীদের মধ্যে বনিকরা প্রায় সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল, তাই জাতকগুলোয় নৌ বাণিজ্যের উদাহরণ প্রচুর পরিমানে পাওয়া যায়। জাতক ছাড়াও, ১০০০ থেকে ৫০০ খৃস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত অন্যান্য বৌদ্ধ সাহিত্যেও সমুদ্র বাণিজ্যের খোঁজ পাওয়া যায়।  অশোক পূর্ব সময়ে বভ্রু জাতকে স্পষ্টভাবে ব্যাবিলনের সঙ্গে বাণিজ্যের বর্ণনা করা হয়েছে। খৃস্ট পূর্ব দ্বিতীয় শতকে কুশান রাজাদের সময় প্রাকৃতে রচিত Angavijja (অঙ্গবিজ্জ) পরে গুপ্ত রাজাদের সময়ে সম্পাদিত হয়। এতে Nava, Pota, Kotimba, Salika, Sarghad, Plava,Tappaka, Pindika, Kanda, Katha, Velu, Tumba, Kumba and Dati নামে নৌকোর উল্লেখ পাওয়া যায়। এগুলর মধ্যে অনেকগুলোর নাম, Tappaka (Trappaga), Kotimba and Sarghad পেরিপ্লাসেও উল্লিখিত হয়েছে। এগুলো বেশ বড় জাহাজ। সমুদ্রতট ধরে এবং মাঝ সমুদ্রেও চলাচলের যোগ্য ছিল। কয়েক শতাব্দী পূর্বের তামিল পুঁথি Silappadikaram এবং Manimekhalai ভারতের সমুদ্র বাণিজ্যের কথা বলে।
ভোজ রাজের রচনা বলে পরিচিত যুক্তিকল্পতরুতে বিশদে নানান জলযানের নানান চরিত্র আলোচিত হয়েছে। এই বিষয়টি পরে যুক্তিকল্পতরু বিভাগে আলচিত হবে।  এ প্রসঙ্গে বলা যাক, ভারতের দিকনির্নায়ক যন্ত্র মৎস্য যন্ত্র। এটি আসলে একটি তেল পাত্রে রাখা একটি মৎস্যের আকারের যন্ত্র, যা উত্তরের দিকটি নির্ণয় করতে সাহায্য করে। এস আর রাও বলছেন, ৫৫০ খৃস্টপূর্ব সময়ের ঋষি কনাদের কনাদসুত্র বলছে একটি ছুঁচের আকারের যন্ত্রের কথা, Manigamanam sucyabhi sarpanam drastakaranam” (Kanadasutra.V.I.15)। ৫০০ খৃস্ট পুর্বাব্দে কালিদাস কুমারসম্ভবে বলছেন, Siva’s mind has been fixed steadily because of penance. And therefore, now try to distract his attention just like an iron piece is attracted or drawn towards a magnet (ayaskantena lohavat akarshtum)।
চতুর্থ-পঞ্চম খৃস্টাব্দের রচনা মিলিন্দোপনহোতে  বলা হচ্ছে, একটি যন্ত্রের কথা যা থাকে জলযান প্রধান চালকের হাতে। অনেকের বক্তব্য এটি আসলে দিকনির্নায়ক যন্ত্র। ঋষি ভরদ্বাজের যন্ত্র সর্বস্ব প্রাচীন ভারতের প্রযুক্তির দিকে নতুন নজর ফেরাতে সাহায্য করে। বৈমানিক শাস্ত্রের এক চতুর্থাংশ ব্যয়িত হয়েছে বিমান গবেষণায়। এখানে চার রকম বিমানের কথা বিশদে বলা হয়েছে – শকুন, সুন্দর, রুক্ম এবং ত্রিপুর। ত্রিপুর বিমান তিনটি স্তরেই – জল, স্থল এবং অন্তরীক্ষে চলতে পারে(এটি এখানে খুব বিশদে আলোচনা করার সুযোগ নেই)।