Thursday, May 30, 2013

সাহিত্যে ও প্রত্নতত্বে ভারতের সমুদ্রযাত্রা এবং নৌ প্রযুক্তি১


এস রামা কৃষ্ণ পিসিপাতি (S. Rama Krishna Pisipaty, Prof  & Geo-archaeologist, SCSVMV University, Enathur, Kanchipuram)

বিশ্বে ভারতের ভৌগোলিক অবস্থানের দরুন প্রাচীন কাল থেকেই নৌবিদ্যার বিকাশ হয়েছে এবং আজও মানুষ অনেকটা জলযানের ওপর নির্ভরশীল। বিশ্বমানচিত্রে সমুদ্রের মাঝখানেই ভারতের অবস্থান। বৃহত্তর হিমালয় এবং বিভিন্ন ঘাট থেকে বহু নদী সমুদ্রে পড়েছে। ফলে নদী এবং সমুদ্রযাত্রা উপযোগী নৌবিদ্যার বিকাশ ঘটেছে ভারত জুড়ে। খৃস্ট জন্মের ২০০০ বছর আগে সরস্বতী-হরপ্পা সভ্যতায় উচ্চস্তরের নৌ বিদ্যার বিকাশ ঘটেছিল। তার নানান উদাহরণ বহু ভারতীয় সাহিত্যে ধরা রয়েছে। সেই সুত্র ধরে ইতিহাসের নানান স্তর তৈরি করা হচ্ছে।  
মোটামুটি ধরে নেওয়া হয়, সরস্বতী-হরপ্পা সভ্যতা শুরুর বেশ কিছু সময় পরে ঋক বেদ লেখা হয়েছিল। সংস্কৃত সাহিত্যে বৈদেশিক বাণিজ্যের বিশদ উল্লেখ রয়েছে। পশ্চিমি নেভি শব্দটির উতপত্তি যতদূর সম্ভব নৌ শব্দ থেকে। বেদের সঙ্গে সমুদ্রের খুব আত্মিক সম্পর্ক রয়েছে। ঋক বেদেই সমুদ্রটি ১৩৩ বার উল্লিখিত হয়েছে। সমুদ্রের বর্ণনায় সপ্তসমুদ্রও বর্ণিত হয়েছে। বলা হয়েছে বিশ্বের জলধারকদের মধ্যে সমুদ্রই সব থেকে প্রাচীন এবং প্রত্যেক নদী অবশ্য সমুদ্রে পড়তে হবে। দেবতাদের মধ্যে বরুণদেবই সমস্ত সমুদ্র পথের জ্ঞান সম্পন্ন দেবতা। লোভের বশবর্তী হয়ে বনিকেরা সমুদ্র বেয়ে দূর দেশের প্রায় প্রত্যেকটি বন্দরের বাণিজ্যে যাচ্ছে, তার উল্লেখ রয়েছে। সপ্তম মণ্ডলে উল্লেখ রয়েছে বরুণ এবং বশিষ্ঠের যৌথভাবে অপূর্ব এক জলযানে শান্তি মনে দূর দেশে বাণিজ্যে যাওয়ার কথা। প্রথম মণ্ডলে একটি সুন্দর গল্প রয়েছে, যদিও গল্পটি এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়, যতটা গুরুত্বপূর্ণ সাগরের সঙ্গে গল্পটির কুশীলবের সংলগ্ন হওয়া। রাজা তুগ্র, পুত্র ভজ্যুকে দূর দেশে সমুদ্র যাত্রা করে শত্রুদের ধংস করতে পাঠালেন। জাহাজগুলি ঝড়ের প্রভাবে ধংস হয়ে যায়। ঋকে বলা হচ্ছে, যেখানে কারোর সাহায্য পাওয়া যায় না, যেখানে হাত বা পা রাখা যায় না, সেখানে ভজ্যুকে সাহায্য করতে এগিয়ে এলেন তার যমজ দুই ভাই, অশ্বিনরা। ঋকে আরও বলা হয়েছে পানি সম্প্রদায় সমুদ্রযাত্রা করে বিশ্বজোড়া বানিজ্য করতেন। এরা ফিনিসয় সম্প্রদায়, লাতিন ভাষায় ফোনেই। এর থেকে একটাই বিষয় পরিস্কার, বেদ যারা রচনা করেছিলেন, তারা সকলেই সমুদ্র উপকূলের অধিবাসী। ঋক বেদে সমুদ্র যাত্রা এবং উন্নতির জন্য জলযান চাওয়া হচ্ছে।
বিশ্বের অন্যতম আইন ও নীতি পুস্তক, সংস্কৃত ভাষায় লিখিত মনুস্মৃতিতে ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব মেটাবার নীতি বর্ণনা করা রয়েছে। শুধু সমুদ্র যাত্রাই নয় নদী পথে বাণিজ্যের দ্বন্দ্ব মেটানর দাওয়াই দিয়েছেন মনু। রামায়নে যবন দ্বীপ এবং সুবর্ণ দ্বীপ(জাভা এবং সুমাত্রা), লোহিত সাগরের(রেড সি) কথা রয়েছে। কিষ্কিন্ধ্যা কাণ্ডে এবং অযোধ্যা কাণ্ডেও ইঙ্গিতে নৌবাহিনীর বর্ণনা দেওয়া রয়েছে। রামেশ্বরমে সমুদ্রে বাঁধ তৈরি করার বর্ণনা, সেসময়ে নৌ বিদ্যার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক।
বিষ্ণুপুরাণ, ভাগবতপুরাণ আর মহাভারতে বর্ণিত সমুদ্র মন্থনের গল্পটি অতি পরিচিত। পরিচিত সেই গল্পটি আজ নতুন ভাবে সেই ভারতের জ্ঞান ভাণ্ডারকে দেখার দৃষ্টিতে পঠিত হচ্ছে। ক্ষীর সাগর মন্থন করে উঠেছিল চতুর্দশ রত্ন এবং অনেক ওষুধের গাছ গাছড়া। পঞ্চম শতকের বিষ্ণুপুরাণ অথবা প্রথম শতকের পেরিপ্লাস অব দ্য এরিথ্রিয়ান সিতে সমুদ্র স্রোত এবং সমুদ্রপথ নিয়ে বহু তথ্য পাওয়া যায়।  
বুদ্ধের অনুগামীদের মধ্যে বনিকরা প্রায় সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল, তাই জাতকগুলোয় নৌ বাণিজ্যের উদাহরণ প্রচুর পরিমানে পাওয়া যায়। জাতক ছাড়াও, ১০০০ থেকে ৫০০ খৃস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত অন্যান্য বৌদ্ধ সাহিত্যেও সমুদ্র বাণিজ্যের খোঁজ পাওয়া যায়।  অশোক পূর্ব সময়ে বভ্রু জাতকে স্পষ্টভাবে ব্যাবিলনের সঙ্গে বাণিজ্যের বর্ণনা করা হয়েছে। খৃস্ট পূর্ব দ্বিতীয় শতকে কুশান রাজাদের সময় প্রাকৃতে রচিত Angavijja (অঙ্গবিজ্জ) পরে গুপ্ত রাজাদের সময়ে সম্পাদিত হয়। এতে Nava, Pota, Kotimba, Salika, Sarghad, Plava,Tappaka, Pindika, Kanda, Katha, Velu, Tumba, Kumba and Dati নামে নৌকোর উল্লেখ পাওয়া যায়। এগুলর মধ্যে অনেকগুলোর নাম, Tappaka (Trappaga), Kotimba and Sarghad পেরিপ্লাসেও উল্লিখিত হয়েছে। এগুলো বেশ বড় জাহাজ। সমুদ্রতট ধরে এবং মাঝ সমুদ্রেও চলাচলের যোগ্য ছিল। কয়েক শতাব্দী পূর্বের তামিল পুঁথি Silappadikaram এবং Manimekhalai ভারতের সমুদ্র বাণিজ্যের কথা বলে।
ভোজ রাজের রচনা বলে পরিচিত যুক্তিকল্পতরুতে বিশদে নানান জলযানের নানান চরিত্র আলোচিত হয়েছে। এই বিষয়টি পরে যুক্তিকল্পতরু বিভাগে আলচিত হবে।  এ প্রসঙ্গে বলা যাক, ভারতের দিকনির্নায়ক যন্ত্র মৎস্য যন্ত্র। এটি আসলে একটি তেল পাত্রে রাখা একটি মৎস্যের আকারের যন্ত্র, যা উত্তরের দিকটি নির্ণয় করতে সাহায্য করে। এস আর রাও বলছেন, ৫৫০ খৃস্টপূর্ব সময়ের ঋষি কনাদের কনাদসুত্র বলছে একটি ছুঁচের আকারের যন্ত্রের কথা, Manigamanam sucyabhi sarpanam drastakaranam” (Kanadasutra.V.I.15) ৫০০ খৃস্ট পুর্বাব্দে কালিদাস কুমারসম্ভবে বলছেন, Siva’s mind has been fixed steadily because of penance. And therefore, now try to distract his attention just like an iron piece is attracted or drawn towards a magnet (ayaskantena lohavat akarshtum)
চতুর্থ-পঞ্চম খৃস্টাব্দের রচনা মিলিন্দোপনহোতে  বলা হচ্ছে, একটি যন্ত্রের কথা যা থাকে জলযান প্রধান চালকের হাতে। অনেকের বক্তব্য এটি আসলে দিকনির্নায়ক যন্ত্র। ঋষি ভরদ্বাজের যন্ত্র সর্বস্ব প্রাচীন ভারতের প্রযুক্তির দিকে নতুন নজর ফেরাতে সাহায্য করে। বৈমানিক শাস্ত্রের এক চতুর্থাংশ ব্যয়িত হয়েছে বিমান গবেষণায়। এখানে চার রকম বিমানের কথা বিশদে বলা হয়েছে – শকুন, সুন্দর, রুক্ম এবং ত্রিপুর। ত্রিপুর বিমান তিনটি স্তরেই – জল, স্থল এবং অন্তরীক্ষে চলতে পারে(এটি এখানে খুব বিশদে আলোচনা করার সুযোগ নেই)। 
Post a Comment