Monday, May 20, 2013

আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র – দ্বিধা-দ্বন্দ্বেভরা এক দেশকর্মী - পার্থ পঞ্চাধ্যায়ী5, A book Review on Acharya Frafula Chandra Roy of Rabin Majumder by Partho Panchadhyee(Biswendu Nanda)5


বিশদে উল্লিখিত বিদেশী পুস্তকগুলির বর্ণনা থেকে এই প্রমান আরও সুদৃঢ় হয় যে, যে পশ্চিমি জ্ঞানচর্চার পরিবেশ তৈরি হয়েছিল উপনিবেশিক প্রশাসনের নজরদারিতে, শেষ বয়সে পর্যন্ত তার বাঁশির টান এড়াতে পারেন নি।বিনয় ঘোষ বিদ্যাসাগর ও বাঙালি সমাজ গ্রন্থে, ছাত্রজীবনের সমাজচিত্র অধ্যায়ে ভূদেব মুখোপাধ্যায়ের অভিজ্ঞতার একটি সুদীর্ঘ বর্ণনা দিয়েছেন ভূদেব মুখোপাধ্যায় সংস্কৃত কালেজের ছাত্র ছিলেন ভূদেব মুখোপাধ্যায়ের সহধ্যায়ী ছিলেন কবি মধুসূদন রামচন্দ্র  মিত্র নামক জনৈক শিক্ষক আমাদিগকে পড়াইতেন যেদিন আমি প্রথম ভর্তি হইলাম, সেই দিন রামচন্দ্রবাবু পৃথিবীর গোলত্বের বিষয় আমাদিগকে বুঝাইয়া দেন ইংরেজিওয়ালা মাত্রেই বিশেষতঃ ইংরাজী শিক্ষকেরা, ব্রাহ্মণ পন্ডিত ও স্বদেশী শাস্ত্রের প্রতি শ্লেষ বাক্য প্রয়োগ করিতে বড়ই ভালবাসেন আমার পিতা যে একজন ব্রাহ্মণ পন্ডিত ছিলেন রামচন্দ্রবাবু তাহা জনিতেন এবং সেই কারনেই পড়াইতে পড়াইতে আমারদিকে চাহিয়া বলিলেন, পৃথিবীর আকার কমলা লেবুরমত গেল, কিন্তু ভূদেব, তোমার বাবা একথা স্বীকার করিবেন না আমি কোন কথা কহিলাম না, চুপ করিয়া রহিলাম ছুটির পর বাড়ি আসিলাম কাপড়চোপড় ছাড়িতে দেরি সহিলনা, একেবারে বাবার কাছে আসিয়া জিজ্ঞেস করিলাম বাবা, পৃথিবীর আকার কীরকম! তিনি বলিলেন,  কেন বাবা, পৃথিবীর আকার গোল  এই কথা বলিয়া আমাকে একটি পুঁথি দেখাইয়া দিলেন, বলিলেন, ঐ গেলাধ্যায় পুঁথিখানির অমুক স্থানটি দেখ দেখি  আমি সেই স্থানটি বাহির করিয়া দেখিলাম তথায় লেখা রহিয়াছে, করতল কলিতামনলকবদমলং বিদন্তি যে গোলং রচনাটি পাঠ করিয়া মনে একটু বলের সঞ্চার হইল একখানি কাগজে ঐটি টুকিয়া লইলাম পরেরদিন স্কুলে আসিয়া রামচন্দ্রবাবুকে বলিলাম, আপনি বলিয়াছিলেন আমার বাবা পৃথিবীর গোলত্ব স্বীকার করিবেন না কেন, বাবা ত পৃথিবী গেলই বলিয়াছেন, এই দেখুন তিনি বরং এই শ্লোকটি আমাকে পুঁথির মধ্যে দেখাইয়া দিয়াছেন রামচন্দ্রবাবু সমস্ত দেখিয়া ও শুনিয়া বলিলেন, কথাটা বলায় আমার একটু দোষ হইয়াছিল, তা তোমার বাবা বলিবেন বৈ কি তবে অনেক ব্রাহ্মণ পন্ডিত এ বিষয়ে অনভিজ্ঞ(নজরটান বিনয় ঘোষের)  শুধু শিক্ষক রামচন্দ্র মিত্রই নয়, তত্কালীন কলকাতার ইংরেজি শিক্ষিতদের মধ্যে দেশিয় প্রযুক্তি আর দেশিয় জ্ঞাণ নিয়ে আলোচনার মূল টানটিই ছিল তাচ্ছিল্যের বিভিন্ন সাময়িকপত্রে এর উদাহরণ ভূরিভূরি এই ঘটনার প্রায় ৫০ বছর পর প্রফুল্লচন্দ্রের বাল্য ও যৌবন গড়ে উঠছে।
প্রফুল্লচন্দ্র উচ্চতর পাঠভুমি ইওরোপ ত্যাগ করে বাঙলার কোলে ঠাঁই নিচ্ছেন তখন ইওরোপে শিল্পবিপ্লব সম্পূর্ণ। বাঙলায় মেকলেবাদের কোলে চেপে কেন্দ্রীভূত বড়শিল্প তৈরির ব্রিটিশ পথই দেশ আর সমাজ বিকাশের একমাত্র সাধন, এমন একটা ধারনা বদ্ধমূল হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে শহরেযে দর্শন, বেঙ্গল কেমিক্যালের পটভূমি তৈরি করবেপলাশীর-পূর্ব পর্যন্ত যে গ্রামসমাজের জ্ঞানচর্চা, শিল্প কাঠামো, প্রশাসনিক ব্যাবস্থা আর সময়ের কোষ্ঠীপাথরে বিকশিত প্রযুক্তিতে বাংলা ছিল বিকশিত উদ্বৃত্ত অর্থনীতির অঞ্চল, প্রফুল্লচন্দ্রের সামাজ গঠন আর সংস্কারের উদ্যোগের সময়ে সেই গ্রামসমাজ সবলে ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে। গ্রামসমাজ আর ভারত দেশটি গঠনের মূল কেন্দ্রে নেই। বাংলার বিকেন্দ্রিত শিল্পভাবনা হেঁটমুণ্ড ঊর্ধ্বপদ ততদিনে। বেড়াচাঁপার চন্দ্রকেতুগড়ের পর তাম্রালিপ্ত বেয়ে সিঙ্গুর তখন ইতিহাস। পর্তুগিজ আমল থেকে বক্স বন্দর সপ্তগ্রাম। সেটি বিশ্ববাজারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শৃঙ্খল। সপ্তগ্রামের অর্থনৈতিক বিকাশ এমনই ঘটেছিল, শ্রীচৈতন্যের সময়ে সপ্তগ্রামের দুই শাসক হিরন্য আর গোবর্ধন মজুমদার দিল্লিশ্বরকে বছরে ১২ লক্ষ টাকা কর দিতেন
বাংলার গ্রামভিত্তিক ব্যবসা জগতের কিছুটা উদাহরণ পাওয়া যায় মঙ্গলকাব্যগুলোয়, বিশেষ করে মুকুন্দরামের রচনায়। ব্যবসায়ী পরিবারগুলোর গ্রামের কথা বিশদে কবিরা উল্লেখ করেছেন। ইবন বতুতারমত পৃথিবী ঘোরা ব্যাবসায়ী আসতেন বাঙলার উৎপন্ন দ্রব্য কিনে ইয়োরোপে বিক্রির জন্য। বাংলা তখন একটা কসমোপলিটন ভুভাগ। ইয়োরোপে থেকে এশিয়া, থেকে আমেরিকা থেকে আফ্রিকার সব দেশের শিল্পদ্রব্য সরবরাহ কেন্দ্র তখন বাংলাসুবাবিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের ভিড় বাঙলায় স্বত্বহীন জমিব্যবস্থা, গ্রামীণ জ্ঞানচর্চার দীর্ঘ ইতিহাস আর গণতান্ত্রিক প্রযুক্তি বিকাশকে ভিত্তি করে বিশ্বের উর্বরতম এলাকাগুলোর মধ্যে অন্যতম ভারতের পূর্বপ্রান্ত ক্রমশ হয়ে উঠেছে বিশ্ব উৎপাদন, বিশ্ব ব্যবসা, বিশ্ব জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রবিন্দু। হাজারো উতপাদক, ব্যবসায়ী ব্যবসা করতেন, তাই লভ্যাংশ বেঁটে যেত প্রত্যেক উৎপাদকের হাতে। আফিম, নীলসহ বহু দ্রব্যে বিশ্বে একচেটিয়া উৎপাদন আর ব্যবসায় নিয়ন্ত্রন থাকলেও, বাংলার সমাজ, উতপাদক বা ব্যবসায়ীদের মানুষমারা নীল বা আফিম চাষে উতসাহিত করে নি। বিশাল বিশাল কারখানা তৈরি করে সম্পদের অপচয় বা লভ্যাংশের কেন্দ্রিকরনে উতসাহ দেয় নিবিশ্বজোড়া উৎপাদন-ব্যবসার যুগলবন্দী চলেছে ১৮০০ পর্যন্ত। তারপর মহাশূন্য।  প্রফুল্লচন্দ্রের শিল্প উতসাহ আলোচনায় এই তথ্যটি যেন বিশেষ করে মনে রাখি।  
এই গ্রামভিত্তিক বিশাল ব্যবসা-উৎপাদন-ব্যবস্থা শূন্য থেকে গড়ে উঠতে পারে না। তার জন্য প্রয়োজন ছিল ব্যাপ্ততম বিদ্যাচর্চা আর বিকেন্দ্রিত উৎপাদন ব্যবস্থার পরিকাঠামোর বাংলার গ্রামসমাজ সেই ব্যবস্থা বহু বছরের পরিশ্রমে প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে গড়ে তুলেছিল। ক্লাইভ, হেস্টিংস, কর্নওয়ালিসের লুঠ, চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফাঁসিকাঠ, ছিয়াত্তরের গণহত্যা(আজও মন্বন্তর বলবেন!)য় অযুত বিহারি-বাঙালির শিরদাঁড়া বেঁকিয়ে দেওয়া সময়ের পরেও, গ্রামীণ বাঙলা-বিহারে প্রায় ১ লক্ষ পাঠশালার অস্তিত্ব ছিলএ তথ্য মেকলেবন্ধু পাদ্রি উইলিয়াম অ্যাডামেরবাংলার গ্রামীণ বিস্তৃত ব্যবসা-উৎপাদনক্ষেত্রটি তৈরি হয়েছে ব্যাপকতম বিদ্যাচর্চাব্যবস্থার সঙ্গে জমিব্যবস্থার ব্যক্তিস্বত্বহীনতার মিলনের ফলে
 “সামন্ততান্ত্রিক” গ্রামীণ ভারতের কট্টর সমালোচক, বামপন্থী বিনয় ঘোষ বলছেন, ভারত তথা প্রাচ্য সমাজের গ্রাম সংগঠণের মূল বৈশিষ্ট্য, ভূমিতে ব্যক্তির স্বত্বহীনতার কথা গ্রামসমাজে নানান সময়ে গোষ্ঠীস্বত্ব, সমাজসত্ব, যৌথসত্বর ধারণা বিকাশ ঘটেছে কিন্তু সমাজ জমির ব্যক্তিগত মালিকানা স্বীকার করে নিরাজা জমির মালিক নন। জৈমিনির পূর্ব মিমাংসায় বলা হয়েছে, রাজা ভূমি হস্তান্তর করতে পারেন না যারা খেটে জমি চাষ করে, তারাই জমি কর্ষণের মালিক সায়নাচার্যের নিদান, রাজার কর্তব্য অপরাধীর দণ্ডদান, নিরাপরাধের আশ্রয়প্রদান জমির মালিক রাজা নন চাষীরা জমির অছি রাজা পাল্টেছে, রাজ্য পাল্টেছে, সময় পাল্টেছে কিন্তু বিকশিত ভারত সমাজের এই ব্যবস্থায়, জমির মালিকানা নিয়ে বড় কোনো বিবাদ অথবা কোনও বিতর্ক বাধেনি, কিছুটা মোগল আমল বাদ দিয়ে(সুত্র – বিনয় ঘোষ, বাংলার নবজাগরণ) পাল্টে গেল কোম্পানি শাসনে, ভূমিকে যথেচ্ছ শোষণ করে, প্রয়োজনের মাত্রাতিরিক্ত উত্পাদনের প্রচেষ্টায়
প্রফুল্লচন্দ্র যখন ভারতীয় রসায়নের বিদ্যার ইতিহাস লিখছেন, তার প্রেক্ষাপটে যেন আমরা মনেরাখি, বাংলার বিদ্যাচর্চা, জ্ঞানচর্চার পরম্পরাটিকেবাঙলায় এক শ্রেণীর ব্রাহ্মণগোষ্ঠী (ব্রিটিশদের দেখানো পথ ধরে ব্রাহ্মণ আর পুরোহিত এই দুই সমাজের পার্থক্য আজ বিলুপ্ত, ব্রাহ্মণেরা জ্ঞান বহন করতেন আর পুরোহিতেরা ছিলেন পুজোর কাজে নিযুক্ত, আজও রাঢ়  বাঙলায় ডোম পুরোহিত গাজনে পুজো করেনপ্রত্যেক সমাজের নিজস্ব পুরোহিত রয়েছে, আমাদের বলেছেন বসাক সমাজের মাথা হরিপদ বসাকমশাই) টিকা দেওয়ার বিদ্যা জানত সমাজ সেই ব্রাহ্মণদের ভরণ পোষনের দায় নিত বিশেষজ্ঞরা সামাজিকভাবে শুধু বেঁচে থাকার নিরাপত্তা পেতেন তাই নয়, তাঁরা জ্ঞাণ ব্যবহার আর নিজের অধীত জ্ঞাণের চর্চার সুযোগও লাভ করতেন, সামাজিক নানান বিধিনিষেধের আওতায় থেকেই ভারত বহুকাল ধরেই সমুদ্র বাণিজ্য করতে আফ্রিকা পর্যন্ত ধাওয়া করেছে কিন্তু ভারত আবিষ্কার করতে গিয়ে (যেন ইওরোপিয়রা ভারত আবিষ্কারের আগে বিশ্ব-মানচিত্রে ভারতের আস্তিত্ব ছিলই না), বলাভাল লুঠের নতুন রাস্তা খুঁজতে গিয়ে, পথ ভুল করে, আমেরিকা বা ওয়েস্ট ইন্ডিজ আবিষ্কার করে বসেনি কোনও দেশ দখল করে নি। কোনও দেশের সভ্যতা ধংস করে মানুষদের দাস বানিয়ে, ভারতের ভালর জন্য অর্থনৈতিক শোষনভিত্তিক উপনিবেশ গড়ে তোলেনি ভারতে বা চিনে বিনোদনে বারুদের ব্যবহার প্রচলন থাকলেও ভারতীয়রা বারুদকে মানুষ মারার কাজে ব্যবহার করেনি বিহারের পাটনা ছিল সোরার বিশ্ব ব্যাবসার কেন্দ্র। দামাস্কাস তরোয়ালের মূল পিণ্ডটি তৈরি করতেন ভারতের সনাতন আকরিকবিদেরা যারা সনাতন কাল থেকেই, লোহার, ডোকরা কামার, বিশ্বকর্মা নামে পরিচিত যাদের তৈরি ধাতুপিণ্ডতে আজও জংএর চিহ্ণমাত্র নেই, যাদের কৃতি সারা ভারতে ছড়িয়ে রয়েছে খোলা আকাশের নিচে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ভারতের বস্ত্র বয়ন শিল্প প্রবাদ প্রতীম বাঙলার যে তাঁতে ব্রিটিশ তাঁতি কোরা চটও বুনতে অক্ষম, সেই তাঁতেই বাঙালিরা মসলিন, বালুচরি, জামদানি, কোরিয়াল(একটাই তাঁতে একবারেই বোনা হয়, দুপাশেই ব্যবহার করা যায় এমন পাড়) বুনতেনশুধু বাংলা নয়, ভারতজোড়া তাঁতিরা নানান ধরণের বর্ণময় পরিধেয় বুনতেন
Post a Comment