Showing posts with label প্রফুল্ল রায়. Show all posts
Showing posts with label প্রফুল্ল রায়. Show all posts

Tuesday, May 27, 2014

জগদীশ চন্দ্র বসু - দেশের মাটিতে পা রাখা এক সারস্বত সাধক৪, Jagadish Chandra Bose A True Indian Scientist4

আজকের কর্পোরেট আধিপত্যের খবরদারির যুগে বুঝতে পারাযাচ্ছে তিনি কতটা দূরদর্শী ছিলেন। জগদীশচন্দ্র তাঁর শিকড়ে দাঁড়িয়ে থাকার দূরদৃষ্টিতে বুঝেছিলেন, উপনিবেশের বিনিয়োগে বিজ্ঞান-প্রযুক্তির সাধনার দুটি ফল- ১) হয় জাতি রাষ্ট্রের যুদ্ধপ্রস্তুতিতে সাহায্য করা, ২) নয়ত প্রকৃতিকে প্রাকৃতিক সম্পদ হিসেবে ছাপ্পা মেরে তাকে কর্পোরেটদের জন্য আরও বেশিকরে লুঠ, মুনাফার বাজার তৈরি করা। এর জন্য প্রফুল্ল রায় মশাইকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় সেনা বাহিনীকে নানান ভাবে সাহায্য করতে হয় উৎপাদন বাড়িয়ে। তার উপহারও পেয়েছেন হাত ভরে। অন্যদিকে জগদীশ চন্দ্র পরম সুহৃদ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ১৭ মে, ১৯০১ সালের লন্ডন থেকে লেখা ২৭ সংখ্যার চিঠিতে (পত্রাবলী, আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসু, দিবাকর সেনের সম্পাদনা, প্রকাশনা বসু বিজ্ঞান মন্দির) জগদীশ চন্দ্র লিখছেন, ‘...আমার বক্তৃতার কিয়ৎক্ষণ পুর্ব্বে একজন অতি বিখ্যাত টেলিগ্রাফ কম্পানির ক্রোড়পতি প্রোপ্রাইটর টেলিগ্রাফ করিয়া পাঠাইলেন, দেখা করিবার দরকার; আমি লিখিলাম সময় নাই, তার উত্তরে পাইলাম আমি নিজেই আসিতেছি, অল্পক্ষণ মধ্যে স্বয়ং উপস্থিত। হাতে পেটেন্ট ফর্ম। আমাকে বিশেষ অনুরোধ করিলেন, আপনি আজ বক্তৃতায় সব কথা খুলিয়া বলিবেন না  There is money in it – let me take out patent for you. You do not know what money you are throwing away ইত্যাদি। আশা  I will only take half share in the profit – I will finance it ইত্যাদি। এই ক্রোড়পতি আর কিছু লাভ করিবার জন্য আমার নিকট ভিক্ষুকের ন্যায় আসিয়াছে। বন্ধু তুমি যদি এদেশে টাকার ওপর মায়া দেখিতে – টাকা – টাকা – টাকা - কি ভয়ানক সর্বগ্রাসী লোভ। আমি যদি এই যাঁতাকলে পড়ি তাহা হইলে উদ্ধার নাই। দেখ আমি যে কাজ লইয়া আছি তাহা বাণিজ্যের লাভালাভের উপরে মনে করি, আমার জীবনের দিন কমিয়া আসিতেছে, আমার যাহা বলিবার তাহারও সময় পাই না, আমি অসম্মত হইলাম। কিন্তু সেদিন আমার বক্তৃতা শুনিতে অনেক টেলিগ্রাফ কম্পানির লোক আসিয়াছিল, তাহারা পারিলে আমার সম্মুখ হইতেই আমার কল লইয়া প্রস্থান করিত। আমার টেবলে এসিস্টেন্টএর জন্য হাতে লেখা নোট ছিল, তাহা অদৃশ্য হইল।’ ১১ জুলাই, ১৯০১ তারিখের লন্ডন থেকে পাঠানো ৩১ সংখ্যার চিঠিতে লিখছেন, ‘আমরা বহুবাদী এরূপ কিংবদন্তী আছে। - প্রকৃত বহুবাদী কে এখন বুঝিতে পারিয়াছি। তুমি হিং টিং ছট লিখিয়া আমাদের দেশবাসীকে গালাগালি দিয়াছ। যদি এদেশের হিং টিং ছট দেখিতে। সম্পূর্ণ অর্থহীন ঘোর বাগাড়ম্বর – যে বিষয় সর্বাপেক্ষা কম জানে সে বিষয়েই সর্ব্বাপেক্ষা শব্দাড়ম্বর’।

জগদীশচন্দ্রের দেশজ শিকড় বোঝার আরও একটা দিক, তিনি একটাও আবিষ্কারকে কুক্ষিগত করেননি। সেই আবিস্কার পেটেন্টযোগ্য করে ধনী হতে চাননি। তার প্রযুক্তি ব্যাবহার করে বিশাল আকৃতির শিল্প কারখানা করতে চান নি। জগদীশচন্দ্রের দুই বান্ধবী সিস্টার নিবেদেতা আর সারা বুল, আমেরিকায় জগদীশচন্দ্রের বিশেষ এক আবিষ্কারের পেটেন্ট নিয়েছেন। কিন্তু জগদীশচন্দ্র তার লভ্যাংশ নিতে অস্বীকার করেন (Exasperated by Bose's "quixotic" approach towards money, two of his lady friends, British-born Margaret Noble (better known as Sister Nivedita) and American-born Mrs Sara Bull on their own initiative obtained in 1904 an American patent in Bose's name (for his " galena single contact-point receiver"). Bose, however, remained unmoved and refused to encash the patent. The irony of the situation seems to have gone unnoticed. Here in Nivedita we have a spiritualist advocating the cause of patents and royalties and a physics professor dismissing the idea. The reason must be sought in their backgrounds: Nivedita was a product of industrial Europe while Bose was a child of the orientalised East -  J.C. BOSE: The Inventor Who Wouldn’t Patent -Prof Rajesh Kochhar, http://www.qsl.net/vu2msy/JCBOSE1.htm)।  মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন। 

জগদীশ চন্দ্র বসু - দেশের মাটিতে পা রাখা এক সারস্বত সাধক৩, Jagadish Chandra Bose A True Indian Scientist3

তিনি পশ্চিমের দেখানো পথ থেকেও ক্রমশঃ সরতে যে চাইছিলেন তার প্রমান নিজের আবিষ্কৃত যন্ত্রগুলোর নাম সংস্কৃত বা মাতৃভাষায় দিয়েছিলেন। পত্রাবলীর সম্পাদক লিখছেন ‘সম্ভবতঃ তিনি এ ব্যাপারে রবীন্দ্রনাথের সাহায্য চেয়েছিলেন। জগদীশ চন্দ্র প্রথম দিকে তাঁর যন্ত্রের নাম করণ করেছিলেন মাতৃভাষায়। কিন্তু অল্প সময়ের ব্যবধানে তিনি তাঁর সিদ্ধান্ত পাল্টাতে বাধ্য হয়েছিলেন। এ বিষয়ে জগদীশ চন্দ্রের বর্ণনা উপভোগ্য, ‘রেস্কোগ্রাফ’ যন্ত্রের নামকরণ প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন, ‘ইচ্ছা ছিল যন্ত্রের নাম রেস্কোগ্রাফ না রাখিয়া ‘বৃদ্ধিমান’ রাখি। কিন্তু হইয়া উঠিল না। আমি প্রথম প্রথম আমার কলগুলির সংস্কৃত নাম দিয়াছিলাম। যেমন ‘কুঞ্চনমান’, ‘শোষণমান’। স্বদেশী প্রচার করিতে যাইয়া অতিশয় বিপন্ন হইতে হইয়াছে। প্রথমতঃ এই সকল নাম কিম্ভুতকিমাকার হইয়াছে বলিয়া বিলাতি কাগজ উপহাস করিলেন। কেবল বোস্টনের প্রধান পত্রিকা অনেকদিন আমার পক্ষ সমর্থন করিয়াছিলেন। সম্পাদক লেখেন ‘যে আবিষ্কার করেন তাহারই নামকরণের প্রথম অধিকার। তাহার পর কলের নাম পুরাতন ভাষা ল্যাটিন ও গ্রীক হইতেই হইয়া থাকে। তাহা যদি হয় তবে অতি পুরাতন অথচ জীবন্ত সংস্কৃত হইতে কেন হইবে না?’ বলপূর্ব্বক যেন নাম চালাইলাম। কিন্তু ফল হইল অন্যরূপ। গতবারে আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়ের বক্তৃতার সময় তথাকার বিখ্যাত অধ্যাপক আমার কল ‘কাঞ্চনম্যান’ সম্বন্ধে ব্যাখ্যা করিবার জন্য অনুরোধ করিলেন। প্রথমে বুঝিতে পারি নাই। শেষে বুঝিলাম ‘কুঞ্চনমান’ কাঞ্চনম্যানে রূপান্তরিত হইয়াছে। হান্টার সাহেবের প্রণালীমত কুঞ্চন বানান করিয়াছিলাম, ইহা হইয়া উঠিল কাঞ্চন। রোমক বর্ণমালার বিশেষ গুণ যে ইহার কোনও একটি স্বরকে অ হইতে ঔ পর্যন্ত যথেচ্ছরূপে উচ্চারণ হইতে পারে; কেবল হয় না ঋ আর ৯। ...সে যাই হউক বুঝিতে পারিলাম হিরণ্যকশিপুকে দিয়া বরং হরিনাম উচ্চারণ করানো যেতে পারে, কিন্তু ইংরেজকে বাংলা কিম্বা সংস্কৃত বলানো একেবারেই অসম্ভব। এই জন্যই আমাদের হরিকে হ্যারি হইতে হয়। এই সকল দেখিয়া কলের ‘বৃদ্ধিমান’ নামকরণের ইচ্ছা একেবারেই চলিয়া গিয়াছে।(সম্পাদকীয় টিকা – পত্রাবলী, পত্র ২৫। পাতা ৫৫। )’। সামগ্রিক বিষয়টি জগদীশ চন্দ্র হাল্কা চালে পেশ করলেও উপনিবেশের তাত্ত্বিক এই বিষয়টি বেশ গুরুত্বপূর্ণ, আজও। জগদীশ চন্দ্র পিছু হটেছিলেন। ততদিনে পিছু হটে গিয়েছিল দেশীয় জ্ঞান বিজ্ঞান চর্চা। তখনও জগদীশ চন্দ্র পশ্চিমের বিজ্ঞানচর্চায় সম্পূর্ণরূপে আস্থাবান। জগদীশ চন্দ্র শুধু নির্বিষভাবে নাম করণ করতে চেয়েছিলেনমাত্র। পিছিয়ে পড়া, বিজিত পূর্বের এই দাবি মেনে নেবে কেন সাম্রাজ্য জ্ঞানগর্বী পশ্চিম!

শেষ বয়সে প্রযুক্তির বিধ্বংসী অগ্রগতিতে আতঙ্কিত হয়ে রেডিও তরঙ্গ গবেষণার ভাবনাটিই ত্যাগ করেছিলেন। একজনও ছাত্র তৈরি করেননি, যিনি রোডিও তরঙ্গের আবিষ্কারকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেন। এই “অবিমৃষ্য” কাজের জন্য রাজেশ কোছারমশাই জগদীশচন্দ্রকে যথেষ্ট অভিশাপমন্দ করেছেন। More importantly, he would perhaps have become an Indian role-model for production of wealth through science - J.C. BOSE: The Inventor Who Wouldn’t Patent - Prof Rajesh Kochhar (http://www.qsl.net/vu2msy/JCBOSE1.htm)। ঋষি বলে, কিহোতর বাজে নকল বলে গালি দিয়েছেন। জগদীশচন্দ্র বড় পুঁজি নির্ভর ব্যবসা বা সেনা উদ্যমের সঙ্গে প্রযুক্তি বা বিজ্ঞানচর্চা মেলাতে পারতেন না। তিনি সচেতনভাবেই পুঁজিবাদের রোলমডেল হতে চান নি। হয়ত বুঝেছিলেন, শেষ পর্যন্ত তাঁর উদ্ভাবনীটি সেনাবাহিনীর খপ্পরে পড়বে, এবং শেষে বড় পুঁজি সেটিকে নিয়ে যথেচ্ছ মুনাফা কামানোর পরিকাঠামো তৈরি করবে। রাজেশ কোছারের আফসোস, জগদীশচন্দ্র সেই গবেষণার সুযোগ নিলে ভারত তরঙ্গ গবেষণায় আজ অনেক দূর এগিয়ে থাকতে পারত। এই আক্ষেপ ছিল দেশজ রসায়ণ চর্চারপ্রতি নিবেদিতপ্রাণ প্রফুল্ল রায়মশাইএর। শিল্পবিপ্লবের মহত বেকনিয় মনোভাবের স্বপ্নে গড়ে তুললেন বিশালতম বেঙ্গল কেমিক্যাল(চরখার অন্যতম সমর্থক তিনি, শেষের দিকে তাকে তাঁর প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়)। বহিরাঙ্গে দেশজ কিন্তু অন্তরে পশ্চিমের শিল্পবিপ্লবের অনুকরণপ্রিয়তায় আত্মগর্বী। ১৯১৬তে জগদীশচন্দ্রের নাইটহুডের সম্বর্ধনায় রায়মশাই আচার্যকে বেশ একটু খোঁচা দিয়েই বললেন, If he had taken out patents for the apparatus and instruments which he had invented, he could have made millions by their sale.  (J.C. BOSE: The Inventor Who Wouldn’t Patent -Prof Rajesh Kochhar, http://www.qsl.net/vu2msy/JCBOSE1.htm)।

Wednesday, June 26, 2013

ব্রিটিশ সময়ে মন্বন্তর না গণহত্যা - একটি হিসেব

যে সব ব্রিটিশ আজ সাম্রাজ্যের ফলাফলে গর্বিত তাদের অবস্থান আমরা এই পোড়া উপনিবেশউত্তর-ভারতের সামান্য প্রজা হয়েও বুঝতে পারি। নানান কুকর্মে দুষ্কর্মে জড়িত দেশি পূর্বজদের পাশে দাঁড়াবার একটা স্বাভাবিক দেশি প্রণোদনা থাকে, সে বোঝার দায় বয়ে বেড়ানোর উত্সাহ অনেক ব্রিটেনবাসীরই হয়। কিন্তু স্বাধীণ দেশের ভারতীয়রা, যাদের আর ব্রিটেন থেকে সামান্য কিছু পাউন্ডের খুদকুঁড়ো আর কিছু সরকারি খেতাব ছাড়া আর কিছুই পাওয়ার নেই, তাদের আজও ঔপনিবেশিক ব্রিটেনের কুকর্মগুলির পাশে দাঁড়ানোর অর্থ সাধারণ যুক্তিবদ্ধ কারনে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। ব্রিটিশ ব্যতীত ভারতের উন্নতি হওয়া অসম্ভব ছিল যাদের মত, তাদের নতুন করে জানানোযাক, লুঠেরা ব্রিটিশ সাম্রাজ্য উত্তরাধিকার সূত্রে মোগলদের তৈরি করা ভারতের সেচ ব্যবস্থাকে বিনিয়োগ না করে ধংস করেছে, ধংস করেছে ভারত সমাজের প্রাণ কেন্দ্র, একেরপরএক পুকুর, বিড়ম্বনাজনকশর্তে পুঁজি এনে আর ভারতের সাধারণ রায়তদের করের অর্থে বছরেরপরবছর ক্ষতিতে রেল চালিয়ে ভারতের কাঁচামাল আর টন টন ভারতীয় শষ্য ব্রিটেনে নিয়ে যাওয়ার জন্য মানুষমারা রেলপথ তৈরি করেছে, রেল রাস্তার আশে পাশের অঞ্চলে মন্বন্তর ঘটেছে শয়ে শয়ে, আর রেলরাস্তা তৈরি করতে আর বাঁচাতে, সম্পদ লুঠ করতে রেলপথের পাশে বড়বড় বাঁধ আর রাস্তা তৈরি করে বাঙলা তথা ভারতের হাজার হাজার বছর ধরে বিকশিত স্বাভাবিক, অবশিষ্টতম সেচ ব্যবস্থাও ধংস হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় তাঁর আত্মজবনী আত্মচরিতএ বলছেন, ১৯২২ সালের উত্তরবঙ্গ বন্যা সম্বন্ধে বলা যেতে পারে যে, যদি গ্রামবাসীর প্রর্থনা গ্রাহ্য করা হইত, তাহা হইলে এই বন্যা নিবারিত হইতে পারিত, ইন্ততঃপক্ষে ইহার প্রকোপ খুবই হ্রাস পাইত। ...বন্যা হইবার এক বত্সর পূর্বে গ্রামবাসীরা রেলওয়ে বাঁধ সম্পর্কে গবর্ণমেন্টের নিকট দরখাস্ত করিয়াছিল। দরখাস্তকারিগণ অজ্ঞ গ্রামবাসী, কিন্তু এ কথা তাহারা বেশ বুঝিতে পারিয়ছিল যে, যদি রেলওয়ে বাঁধের সঙ্কীর্ণ কলভার্টগুলির পরিবর্তে চওড়া সেতু করিবার ব্যবস্থা না হয়, তবে তাহাদিগকে সর্বদাই বন্যার বিপত্তি সহ্য করিতে হইবে। কিন্তু কার্যতঃ ঠিক ইহাই ঘটিয়াছিল। আসল কথা এই যে, বিদেশী অংশীদারদের স্বার্থের দিকে দৃষ্টি রাখিয়া রেলওয়ে রাস্তা ও বাঁধগুলি তৈরী করা হয়। খরচা যত কম হইবে, অংশীদারদের লাভের অঙ্কও তত বেশী হইবে। এই কারনে রেলপথ নির্মাণ করিবার সময় বহু পরিসর এত কম করা হয় যাহাতে সঙ্কীর্ণ কালভার্ট দ্বারাই কাজ চলিতে পারে। আনন্দবাজার পত্রিকা ১৯২২ সালের ২১শে নবেম্বর তারিখে রেলওয়ে বাঁধই যে দেশের সর্বনাশের কারন এই প্রসঙ্গে সম্পাদকীয় মন্তব্যে লিখিয়াছিলেনঃ- রেলওয়ে লাইনই যে উত্তরবঙ্গের লোকেদের অশেষ দুঃখ-দুর্দশর কারন এ বিষয়ে আমরা কয়েকটি প্রবন্ধ ইতিপূর্বে লিখিয়াছি। আমদীঘি ও নসরতপুর অঞ্চলের(সান্তাহারের উত্তরে দুইটি রেলওয়ে স্টেশন) গ্রামবাসীরা, বগুড়ার জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের মার্ফত্ রেলওয়ে এজেন্টের নিকট দরখাস্ত করে যে, পূর্বোক্ত দুইটি স্টেশনের মধ্যে রেলওয়ে লাইনে সঙ্কীর্ণ কলভার্টের পরিবর্তে চওড়া সেতু করা হোক, তাহা হইলে প্রবল বর্ষার পর উচ্চভূমি হইতে যে জলপ্রবাহ, তাহা বাহির হইবার পথ পাইবে। ইহার উত্তরে রেলওয়ে এজেন্ট জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে নিম্নলিখিত পত্র লিখেনঃ- মহাশয়, আপনার ১৯২১ সালের ২৫শে এপ্রিল তারিখের পত্র পাইলাম। উহার সঙ্গে উমিরুদ্দীন জেদ্দার এবং আমদীঘি ও তন্নিকটবর্তী গ্রামসমূহের অধিবাসীগণের যে দরখাস্ত আপনি পাঠইয়ছেন, তাহাতে এই আবেদন করা হইয়াছে যে আমদীঘি ও নসরতপুর ষ্টেশনের মধ্যে একটি সেতু নির্মাণ করা হউক। তদুত্তরে আমি জানাইতেছি যে, যথাযোগ্য তদন্তের পর আমরা এই সিদ্ধান্ত করিয়াছি যে, উক্ত স্থনে সেতু নির্মাণের কেন প্রয়োজন নাই। এবং স্বাধীণতার পর এ ধরণের অত্যাচার অনাচার রোখা যাবে এধরণের ভাবনা নিয়ে স্বাধীণতা আন্দোলনে সামিল হয়েছিলেন বহু মানুষ। স্বাধীণতার পর যে কী হয়েছে, কত মানুষ তথাকথিত উন্নয়ণের জোয়ারে উচ্ছেদ হয়েছেন, তা আজ আর নতুন করে বলার নেই।
একদা যখন ভারত আর রাশিয়া বিশ্বে খাদ্যশষ্য রপ্তানির প্রধানতম দেশ ছিল, সে সময় বাঙলা তথা ভারতে মন্বন্তরে কোটি কোটি মানুষ খাদ্যের অভাবে মারাগিয়েছে- সহজ ভাষায় বললে ব্রিটিশদের লোভ লালসায় খুন হয়েছে। বাল মুকুন্দ ভাটিয়া, ফেমিন ইন ইন্ডিয়াতে বলছেন, ১৮০০র আগের মন্বন্তরে মারাগিয়েছে মেটামুটি তিরিশ লাখ(৭৬ ধরে কি?)। ১৮০০ থেকে ১৮২৫এর মধ্য পাঁচটিতে খুব কম (দশলাখ), ১৮৫০-৭৫এ ছয়টি কম(পঞ্চাশ লাখ), ১৮৭৬-১৯০০ পর্যন্ত মোটামুটি (সাড়ে ছকোটি) মানুষ মারা গিয়েছে, মারা গিয়েছে খুব আলতো শব্দ হল, বলা দরকার ছিল ব্রিটিশরা ঠান্ডামাথায় মন্বন্তর ঘটিয়ে গণত্যা ঘটিয়েছে। এত মানুষকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য খুন করার উত্তরে ম্যানচেস্টারের মিল মালিকদের আফসোস ছিল ভারতে তাদের বস্ত্র পণ্যের বাজার শেষ হয়ে যাওয়ার।
ব্রিটিশ শাসনের আগে যেসব মহামারী ঘটেছে তার বিশদ তালিকা
কবে                            স্থান                                         কারণ
একাদশ শতাব্দ(দুটি)       স্থানীয়                                      অনাবৃষ্টি
ত্রয়োদশ শতাব্দ(একটা)    দিল্লিতে                                     কারণ জানা য়ায় না  
চতুর্দশ শতকে(তিনটে)     স্থানীয়                                      যুদ্ধের জন্য শষ্যহানি
পঞ্চদ শতকে(দুটি)          ঐ                                           ঐ
ষোড়শ শতাব্দ(তিনটি)      ঐ                                           অনাবৃষ্টি
সপ্তদশ শতাব্দ(তিনটি)      সর্বত্র                                       অরাজকতা
অষ্টাদশ শতাব্দের প্রথমার্ধ(চারটে)                                      স্থানীয়         অনাবৃষ্টি

এবার ব্রিটিশ শাসনে যে সব মন্বন্তর ঘটেছে তার বিশদ
১৭৬৯-৭০           ছিয়াত্তরের মন্বন্তর- বাঙলা সুবা         ইংরেজদের খাদ্যসশ্যের ব্যবসা, অনাবৃষ্টি, বাঙলায় এককোটি, বিহারে অন্ততঃ তিরিশ লক্ষেরও বেশি মানুষকে না খেতে দিয়ে মন্বন্তর ঘটিয়ে হত্যাকন্ড করেছে ব্রিটিশ রাজ
১৭৮৩                মাদ্রাজ, বোম্বাই                           মৃত কত আজও হিসেব চলছে
১৭৮৪                উত্তর ভারত                               ঐ
১৭৯২                মাদ্রাজ, হায়দারাবাদ, বোম্বাই           ঐ
                        দাক্ষিণাত্য, গুজরাট, মারোয়াড়
১৮০২                বোম্বাই                                     ঐ
১৮০৩-৪            উত্তরপশ্চিম সামান্ত প্রদেশ, রাজপুতানা ঐ
১৮০৫-০৭           মাদ্রাজ                                     ঐ
১৮১১-১৪           ঐ                                           সামান্য
১৮১২-১৩           রাজপুতানা পাঞ্জাব                       ২০ লক্ষ
১৮২৩                মাদ্রাজ                                     কত কেউ জানেনা
১৮২৪-২৫           বোম্বাই, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত           ঐ
১৮৩৩-৩৫          উত্তর মাদ্রাজ, বোম্বাই                    ঐ
১৮৩৭-৩৮          উত্তর ভারত                               ১০ লক্ষ
১৮৫৪                মাদ্রাজ                                     কত কেউ জানেনা
১৮৬০-৬১           উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত পাঞ্জাব            ৫ লক্ষ
১৮৬৫-৬৬           ওড়িশার ৬টা জেলা, বিহার ও
                        উত্তরবঙ্গ, মাদ্রাজ                         ১,৩০,০০০ ১,৩৫,০০০, ৪,৫০,০০০,
১৮৬৮-৬৯          রাজপুতানা                                ১২ লক্ষ ৫০ হাজার
                        উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ             ৬ লক্ষ
                        পাঞ্জাব                                      ৬ লক্ষ
                        মধ্যভারত                                 ২,৬০,০০০
                        মুম্বাই                                       কত কেউ জানেনা
১৮৭৩-৭৪          বাঙলা, বিহার, অযোধ্যা,
                        উত্তর পশ্চিম সীমান্ত                      ঐ
১৮৭৬-৭৭           বেম্বাই                                      ৯ লক্ষ
                        হায়দারাবাদ                                ৭০ হাজার
                        মাদ্রাজ, উত্তর পশ্চিম সীমান্ত          
                        আর অযোধ্যা                              ৮২,৫০,০০০
                        মহীশূর                                     ১১,০০,০০০
১৮৮০                দাক্ষিণাত্য, দক্ষিণ বোম্বাই,
                        মধ্যপ্রদেশ, হায়দারাবাদ,
                        উত্তর পশ্চিম সীমান্ত                      অজ্ঞাত
১৮৮৪                বাঙলা, বিহার, ছোটনাগপুর,
                        মাদ্রাজের কয়েকটি জেলা,              অজ্ঞাত
১৮৮৬-৮৭          মধ্যভারত                                 অজ্ঞাত
১৮৮৮-৮৯          বিহার, ওড়িশা, গঞ্জাম
                        মাদ্রাজ, কুমায়ুন, গাড়োয়াল            ১৫ লক্ষ
১৮৯১-৯২           মাদ্রাজ, বোম্বাই, দাক্ষিণাত্য, বাঙলা   ১৬ লক্ষ ২০ হাজার
১৮৯৫-৯৭           বুন্দেলখন্ড, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত      
                        বাঙলা, অযোধ্যা, মধ্যভারত            ৫৬,৫০,০০০
১৮৯৯-১৯০০       ভারতের সর্বত্র                            ২৫ লক্ষ
১৯০১                গুজরাট, দাক্ষিণাত্য, বোম্বাই
                        কর্ণাটক, মাদ্রাজ, পাঞ্জাবের দক্ষিণ    ৭,০৫,০০০
অমর্ত্য সেন বন্দিত গণতন্ত্রিক ব্রিটিশ সরকারের হিসেবে ১৮৫৪ থেকে ১৯০১ পর্যন্ত ভারতে দুর্ভিক্ষের মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৮৮ লক্ষ ২৫ হাজার। এগুলি শুধুই সংখ্যামাত্র। এ আগে কত ঘটেছে শুধু অনুমান করাযায়মাত্র। ভারতে রেলপথ সৃষ্টির সঙ্গে দুর্ভিক্ষের সরাসরি সম্পর্কটি চোখে আঙুলদেওয়া। কিন্তু খুব একটা প্রকাশ্যে আসে নি আজও। বাল মুকুন্দ ভাতিয়া ছাড়া ঐতিহাসিকদের আজও নজর পড়েনি এই রেললাইন সৃষ্ট মন্বন্তরগুলিতে। ১৮০২ থেকে ১৮৫৪ পর্ষন্ত ভারতে মোট ১৩টি দুর্ভিক্ষ হয়েছে আর কোম্পানি সরকারের হিসেবে মৃত্যু ঘটেছে মাত্র ৫০ লক্ষের কাছাকাছি কোনও  একটা সংখ্যা। অথচ রেলপথ পাতার পরে, ১৮৬০ থেকে ১৮৭৯ পর্যন্ত ভারতে ঘটেছে ১৬টা বড় মন্বন্তর আর তাতে মারা গিয়েছেন ১ কোটি ২০ লক্ষ মানুষ। এটিও সদাশয় ব্রিটিশ সরকারের তৈরি হিসেব। আদত হিসেব কত কেউ জানেনা।